📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়নের পদ্ধতি

📄 রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়নের পদ্ধতি


রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়নের অর্থ হল আল্লাহ স্বীয় গ্রন্থে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সুন্নায় সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিতভাবে তাদের সম্পর্কে যে সংবাদ দিয়েছেন সেগুলোকে বিশ্বাস করা।

আর (তাদের প্রতি) সংক্ষিপ্ত ঈমান হল:

এ বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ যে, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন যিনি তাদেরকে আহ্বান করেন একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করার প্রতি যার কোন শরীক নেই এবং আল্লাহর পরিবর্তে যা কিছুর ইবাদাত করা হয় তা অস্বীকার করার প্রতি। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُونَ ﴾ (النحل: ٣٦)
"আর অবশ্যই আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল প্রেরণ করেছি (এ নির্দেশ দিয়ে) যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর”। [সূরা আন-নাহ্লঃ ৩৬]।

আর এ দৃঢ় বিশ্বাস পোষণও যে, তারা সকলেই ছিলেন সত্যবাদী, পুণ্যবান, বুদ্ধিমান, সম্মানিত, সদাচারী, মুত্তাকী, বিশ্বস্ত, সুপথ প্রদর্শক ও সুপথপ্রাপ্ত। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿هذَابًا وَعَدَ الرَّحْمَنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُونَ (يس: ٥٢)
"দয়াময় (আল্লাহ) তো এরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্যই বলেছিলেন”। [সূরা ইয়াসীনঃ৫২]

আল্লাহ তা'আলা বড় এক দল নবী ও রাসূলগনের কথা উল্লেখ করার পর বলেন:
﴿وَمِنْ بابِهِمْ وَذُرِّيَّتِهِمْ وَإِخْوَانِهِمْ وَاجْتَبَيْنَهُمْ وَهَدَيْنَهُم إِلى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ * ذَلِكَ هُدَى اللهِ يَهْدِي بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِي (الأنعام: ৮৭-৮৮)
"এবং এদের পিতৃপুরুষ, বংশধর এবং ভাইদের কতেককে, আর আমরা তাদেরকে মনোনীত করেছিলাম এবং সরল পথে পরিচালিত করেছিলাম। এটা আল্লাহর হেদায়াত, স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি এর দ্বারা সৎপথে পরিচালিত করেন”। [সূরা আল-আন'আমঃ৮৭-৮৮]

এবং এ বিশ্বাস করা যে, তারা সকলেই স্পষ্ট সত্য ও সুস্পষ্ট হেদায়াতের উপর ছিলেন। জাতির লোকদের কাছে স্বীয় প্রভুর পক্ষ থেকে তার প্রমাণ নিয়ে আগমন করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা জান্নাতবাসীদের ভাষায় তাদের কাহিনী বর্ণনা করে বলেনঃ
لَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُ رَبَّنَا بِالْحَقِّ (الأعراف: ٤٣).
"আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ তো অবশ্যই সত্য নিয়ে এসেছিলেন”। [সূরা আল-আ'রাফঃ৪৩]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالبَيِّنَاتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتٰبَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ (الحديد : ٢٥)
“নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সাথে অবতীর্ণ করেছি গ্রন্থ ও ন্যায়দন্ড যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে"। [সূরা আল-হাদীদঃ২৫]

এ বিশ্বাসও রাখা যে, তাদের মূল দাওয়াত ছিলো একটিই। তা হল আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি আহ্বান। তবে তাদের শরীয়ত ছিলো বিভিন্ন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ (الأنبياء: ٢٥)
“আমরা আপনার পূর্বে যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তার প্রতি এ ওহী পাঠিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন হক্ক ইলাহ্ নেই সুতরাং আমারই ইবাদাত কর। [সূরা আল-আম্বিয়াঃ২৫]

মহান আল্লাহ আরো বলেন:
لِكُلِّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا (المائدة: ٤٨)
"তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমরা শরীয়ত ও পথ নির্ধারণ করে দিয়েছি"। [সূরা আল-মায়িদাহঃ৪৮]

আর এ বিশ্বাসও রাখা যে, তাদেরকে যে রিসালাত দিয়ে পাঠানো হয়েছিলো তারা এর সমস্তই সুস্পষ্টভাবে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে সৃষ্টির উপর হুজ্জত ও প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لِيَعْلَمَ أَنْ قَدْ أَبْلَغُوا رُسُلَتِ رَبِّهِمْ وَأَحَاطَ بِمَا لَدَيْهِمْ وَأَحْطَى كُلِّ شَيْ عَدَدًا (الجن : ۲۸)
"যেন তিনি জানেন যে, তারা তাদের প্রতিপালকের রিসালত (বাণী) পৌঁছিয়ে দিয়েছেন কিনা এবং রাসূলগণের নিকট যা আছে তা তাঁর আয়ত্বাধীন, আর তিনি সমস্ত কিছুর বিস্তারিত হিসাব রাখেন"। [সূরা আল-জ্বিনঃ২৮]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ (النساء: ١٦٥)
“সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করেছি যাতে রাসূলগণ আসার পরে আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন প্রমাণ না থাকে”। [সূরা আন-নিসাঃ১৬৫]

এ ঈমান রাখা ওয়াজিব যে, রাসূলগণ সৃষ্ট মানব ছিলেন। রুবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বের কোন বৈশিষ্ট্য তাদের ছিলো না। তারা আল্লাহর এমন বান্দাই শুধু ছিলেন যাদেরকে তিনি রিসালাত দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قَالَتْ لَهُمْ رُسُلُهُمْ إِنْ نَحْنُ إِلا بَشَرُ مِثْلُكُمْ وَلَكِنَّ اللهَ يَمُنُّ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ
(إبراهيم: (۱۱)
"তাদের রাসূলগণ তাদেরকে বলত, আমরা কেবল তোমাদের মতই মানুষ, কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন”। [সূরা ইব্রাহীমঃ১১]

আল্লাহ তা'আলা নূহ সম্পর্কে বলেনঃ
وَلَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ إِنِّي مَلَكُ (هود: (۳۱)
"আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার নিকট আল্লাহর ধনভান্ডার আছে, আর আমি গায়েবও জানি না। আমি এও বলি না যে, আমি ফিরিস্তা। [সূরা হুদঃ৩১]

মহান আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নির্দেশ দেন যেন তিনি স্বীয় জাতিকে বলেন:
قُلْ لَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكُ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَى (الأنعام: ٥٠)
"বলুন, আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার নিকট আল্লাহর ধনভান্ডার আছে, আর আমি গায়েবও জানি না এবং তোমাদেরকে এও বলি না যে, আমি ফিরিস্তা। আমার প্রতি যা ওহীরূপে প্রেরণ করা হয়, আমি তো শুধু তারই অনুসরণ করি। [সূরা আল-আন'আমঃ৫০]

রাসূলগণ সম্পর্কে আরো যে আক্বীদা পোষণ করা আবশ্যক তা হল তারা আল্লাহর পক্ষ হতে সাহায্য ও সহযোগিতাপ্রাপ্ত এবং তাদের ও তাদের অনুসারীদের জন্য রয়েছে সুপরিণাম। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
إِنَّا لَتَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ (غافر : ٥١)
"নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রাসূলগণ ও মু'মিনদেরকে দুনিয়ার জীবনে এবং যেদিন সাক্ষীগণ দন্ডায়মান হবে সেদিন সাহায্য করব"। [সূরা গাফিরঃ৫১]

অনুরূপভাবে রাসূলগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের তারতম্যে বিশ্বাস রাখাও আবশ্যক, যেমনটি মহান আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন স্বীয় বাণীতে:
تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِنْهُمْ مَنْ كَلَّمَ اللهُ (البقرة: ٢٥٣)
"সে রাসূলগণ তাদের একের উপর অন্যকে আমরা শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি, তাদের মধ্যে এমন কেউ রয়েছেন যাদের সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ২৫৩]

অতএব এ সব কিছু এবং রাসূলগণ সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নায় সাধারণভাবে যতকিছু এসেছে তার প্রতি সংক্ষিপ্তরূপে ঈমান রাখা ওয়াজিব।

আর (তাদের প্রতি) বিস্তারিত ঈমান হল:

তাদের মধ্য হতে যাদের নাম আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গ্রন্থে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সুন্নায় উল্লেখ করেছেন তাদের প্রতি বিস্তারিতভাবে ঈমান আনয়ন করা যেভাবে তাদের নাম, সংবাদ, মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের কথা দলীলসমূহে এসেছে।

নবী ও রাসূলগণের মধ্যে কুরআনে যাদের উল্লেখ এসেছে তারা হলেন পঁচিশ জন। তাদের মধ্যে আঠার জনের উল্লেখ এসেছে আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত বাণীতে :
وَتِلْكَ حُجَّتُنَا آتَيْنَاهَا إِبْرَاهِيمَ عَلَى قَوْمِهِ نَرْفَعُ دَرَجَتٍ مَّن نَّشَاءُ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ كُلًّا هَدَيْنَا وَنُوحًا هَدَيْنَا مِن قَبْلُ وَمِن ذُرِّيَّتِهِ دَاوُدَ وَسُلَيْمَنَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى وَهَرُونَ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ * وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَى وَعِيسَى وَإِلْيَاسَ كُلٌّ مِّنَ الصَّالِحِينَ * وَإِسْمَعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوطًا وَكُلًا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ ﴿الأنعام: ٨٣-٨٦﴾
"আর এটাই আমাদের যুক্তি-প্রমাণ যা আমরা ইব্রাহীমকে দিয়েছিলাম তার জাতির মোকাবেলায়, যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় আমরা উন্নীত করি, নিশ্চয়ই আপনার প্রতিপালক প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞ। আর আমরা তাকে দান করেছিলাম ইসহাক ও ইয়া'কুব, এদের প্রত্যেককে হেদায়াত দিয়েছিলাম। পূর্বে নূহকেও আমরা হেদায়াত দিয়েছিলাম, এবং তার বংশধর দাউদ, সুলাইমান, আইয়ূব, ইউসূফ, মূসা ও হারুনকেও। আর এভাবেই আমরা সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কৃত করি। আর যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, 'ঈসা এবং ইলিয়াসকেও হেদায়াত দিয়েছিলাম। এরা প্রত্যেকেই সৎকর্মপরায়ণ ছিলেন। এবং ইসমা'ঈল, আল-ইয়াসা', ইউনুস ও লুতকেও। আর তাদের প্রত্যেককে আমরা শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম বিশ্ব জগতের উপর”। [সূরা আল-আন'আমঃ৮৩-৮৬]

আর বাকী রাসূলগণের উল্লেখ এসেছে কুরআনের অন্যান্য স্থানে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا ﴾ [الأعراف : ٦٥]
"আর আদ জাতির নিকট আমি তাদের ভাই হুদকে পাঠিয়েছিলাম”। [সূরা আল-আ'রাফঃ৬৫]

তিনি আরো বলেনঃ
وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا ﴾ [الأعراف: ۷৩]
"আর সামূদ জাতির নিকট আমি তাদের ভাই সালেহকে পাঠিয়েছিলাম”। [সূরা আল-আ'রাফঃ৭৩]

তিনি বলেন :
وَإِلَى مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا ﴾ [الأعراف: ٨٥]
"আর মাদইয়ানবাসীদের নিকট আমি তাদের ভাই শু'আইবকে পাঠিয়েছিলাম”। [সূরা আল-আ'রাফঃ৮৫]

তিনি বলেন:
إِنَّ اللهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا (آل عمران : ٣٣)
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আদম এবং নূহকে মনোনীত করেছিলেন”। [সূরা আলে ইমরানঃ৩৩]

তিনি বলেন:
وَإِسْمَاعِيلَ وَإِدْرِيسَ وَذَا الْكِفْلُ كُلُّ مِّنَ الصَّابِرِينَ (الأنبياء: ٨٥)
“এবং স্মরণ করুন ইসমা'ঈল, ইদ্রীস ও যুলকিফলের কথা, তাদের প্রত্যেকেই ছিলেন ধৈর্যশীল”। [সূরা আল-আম্বিয়াঃ৮৫]

তিনি বলেন:
مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ (الفتح : ٢٩)
“মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, তার সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল”। [সূরা আল-ফাতহঃ২৯]

সুতরাং এ নবী ও রাসূলগণের প্রতি বিস্তারিতভাবে ঈমান আনয়ন করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের ব্যাপারে যেরূপ অবহিত করেছেন সেরূপ তাদের প্রত্যেকের জন্য নবুওয়াত কিংবা রিসালাতের স্বীকৃতি প্রদান আবশ্যক।

অনুরূপভাবে যে সকল দলীলে তাদের মর্যাদা, বৈশিষ্ট্য ও সংবাদের উল্লেখ এসেছে সেগুলোর বিশুদ্ধতার প্রতি বিশ্বাস রাখা আবশ্যক। যেমন আল্লাহ কর্তৃক ইব্রাহীম ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিমা ওয়া সাল্লাম এ দু'জনকে বন্ধুরূপে গ্রহণ; কেননা আল্লাহ বলেনঃ
وَاتَّخَذَ اللهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا) (النساء: ١٢٥)
"আর আল্লাহ ইব্রাহীমকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন”। [সূরা আন-নিসাঃ১২৫]

আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
«إن الله اتخذني خليلاً كما اتخذ إبراهيم خليلاً»
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন যেভাবে ইব্রাহীমকে তিনি অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছিলেন"¹। ইমাম মুসলিম এ হাদীস সংকলন করেন।

আরো যেমন আল্লাহ তা'আলা মূসার সাথে কথা বলেছিলেন; কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَكَلَّمَ اللهُ مُوسَى تَكْلِيما (النساء : ١٦٤)
"আর আল্লাহ মূসার সাথে সুস্পষ্টভাবে কথা বলেছেন”। [সূরা আন-নিসাঃ১৬৪]।

অনুরূপভাবে পাহাড় ও পাখিদেরকে দাউদের অধীনস্ত করে দেয়া, এগুলো দাউদের তাসবীহ পাঠের সাথে তাসবীহ পাঠ করতো। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَسَخَّرْنَا مَعَ دَاوُدَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَالطَّيْرَ وَكُنَّا فَاعِلِينَ ﴿الأنبياء: ٧٩﴾
"আর আমরা পর্বত ও পাখিদেরকে দাউদের অনুগত করে দিয়েছিলাম, তারা পবিত্রতা ঘোষণা করত, আমরাই ছিলাম এ সবের কর্তা”। [সূরা আল-আম্বিয়াঃ ৭৯]

এবং দাউদের জন্য লোহাকে নরম করে দেয়া হয়, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَقَدْ آتَيْنَا دَاوُدَ مِنَّا فَضْلًا يُجِبَالُ أَوْ بِي مَعَهُ وَالطَّيْرَ وَأَلَنَّا لَهُ الحَدِيدَ ﴿سبا: ١٠﴾
"নিশ্চয়ই আমরা আমাদের পক্ষ হতে দাউদকে অনুগ্রহ করেছিলাম (এবং আদেশ করেছিলাম,) হে পর্বতমালা! তোমরা তার সাথে আমার পবিত্রতা ঘোষণা কর এবং পাখিদেরকেও (আদেশ করেছিলাম), আর তার জন্য আমরা নরম করে দিয়েছিলাম লোহাকে। [সূরা সাবাঃ১০]

আর বায়ুকে সুলাইমানের অধীনস্ত করে দেয়া হয়েছিল, তার নির্দেশে তা প্রবাহিত হতো। জ্বিনকেও তার অধীনস্ত করে দেয়া হয়, তিনি যা চাইতেন তার সামনে তারা তাই করতো। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَلِسُلَيْمَنَ الرِّيحَ غُدُوُّهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ وَأَسَلْنَا لَهُ عَيْنَ الْقِطْرِ وَمِنَ الْجِنِّ مَنْ يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ ﴾ (سبا: ١٢)
"সুলাইমানের অধীন করেছিলাম বায়ুকে, যা প্রভাতে একমাসের পথ অতিক্রম করত এবং সন্ধ্যায় একমাসের পথ অতিক্রম করত। আমরা তার জন্য গলিত তামার এক ঝরণা প্রবাহিত করেছিলাম, তার প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে জ্বিনদের কেউ কেউ তার সামনে কাজ করত”। [সূরা সাবাঃ১২]

আর পাখিদের ভাষা সুলাইমানকে শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَوَرِثَ سُلَيْمَنُ دَاوُدَ وَقَالَ يَأَيُّهَا النَّاسُ عُلِّمْنَا مَنْطِقَ الطَّيْرِ وَأُوتِينَا مِنْ كُلِّ شَى (النمل : ١٦)
"আর সুলাইমান হয়েছিলেন দাউদের উত্তরাধিকারী এবং তিনি বলেছিলেন হে মানুষ! আমাদেরকে পাখিদের ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং আমাদেরকে সবকিছু দেয়া হয়েছে”। [সূরা আন-নামলঃ১৬]।

অনুরূপভাবে স্বজাতির সাথে রাসূলদের যে সব ঘটনা ও তাদের মধ্যকার যে সব ঝগড়া-বিবাদের কথা এবং রাসূলগণ ও তাদের অনুসারীদের প্রতি আল্লাহ তা'আলার যে সাহায্যের কাহিনী আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন সেগুলোর প্রতি বিস্তারিত ঈমান আনয়ন আবশ্যক। যেমন ফেরাউনের সাথে মূসার কাহিনী, স্বজাতির সাথে ইব্রাহীমের কাহিনী এবং নূহ, হুদ, সালেহ, শু'আইব, লুতের কাহিনী, আল্লাহ আমাদের কাছে ইউসুফের ভ্রাতৃবৃন্দ ও মিশরীদের সাথে ইউসুফের ব্যাপারে যা কিছু বর্ণনা করেছেন, স্বজাতির সাথে ইউনুসের কাহিনী ইত্যাদি কুরআনে নবী ও রাসূলদের আরো যে সব ঘটনার বর্ণনা এসছে এবং অনুরূপভাবে সুন্নায়ও যা এসেছে সে সব কিছুর উপর বিস্তারিত ঈমান আনা। অতএব দলীলে ঠিক যেমনটি এসেছে সে অনুসারে বিস্তারিত ঈমান রাখা ওয়াজিব।

এভাবেই রাসূলগণের প্রতি সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত ঈমান আনয়ন বাস্তবায়িত হবে। আল্লাহ তা'আলাই অধিক অবগত।

টিকাঃ
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৫৩২)

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 রাসূলগণের প্রতি আমাদের করণীয়

📄 রাসূলগণের প্রতি আমাদের করণীয়


উম্মাতের উপর রাসূলগণের অনেক বড় অধিকার রয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে দ্বীনের সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন করেছেন, মহান উন্নত স্তরে তাদেরকে উপনীত করেছেন, তাদের উপর মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব ন্যস্ত করে তাদেরকে সম্মানিত করেছেন, আর তাঁর ওহী ও শরীয়ত সমস্ত সৃষ্টি জগতের কাছে পৌঁছানোর জন্য তাদেরকে মনোনীত করেছেন। তাদের সে সমস্ত অধিকার সমূহের মধ্যে নিম্মলিখিতগুলো অন্যতমঃ

১. তারা যা নিয়ে এসেছে সে ব্যাপারে তাদের সবাইকে সত্য বলে বিশ্বাস করা। আরো বিশ্বাস করা যে, তারা তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়েছেন, আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে তাদেরকে যা প্রচারের নির্দেশ দিয়েছেন তা তারা যাদের কাছে প্রেরিত হয়েছেন তাদের কাছে প্রচার করেছেন এবং এ ব্যাপারে রাসূলগণের মাঝে কোন প্রকার পার্থক্য নিরূপণ না করা।
মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴾وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَّسُوْلٍ اِلَّا لِيُطَاعَ بِاِذْنِ اللهِ۬ (النساء: ٦٤).﴿
"আল্লাহর অনুমতিক্রমে রাসূলদের আনুগত্য করার জন্যই আমরা কেবলমাত্র রাসূলদের প্রেরণ করেছি”। [সূরা আন-নিসাঃ ৬৪]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ
﴾ وَاَطِيْعُوا اللّٰهَ وَاَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَاحْذَرُوْا فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوْا أَنَّمَا عَلٰى رَسُوْلِنَا الْبَلٰغُ الْمُبِيْنُ ﴿ (المائدة: ٩٢).
"আর তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও রাসূলের আনুগত্য কর এবং সাবধানতা অবলম্বন কর, তারপর যদি তোমরা ফিরে যাও তবে জেনে রাখ নিশ্চয়ই আমাদের রাসূলের দায়িত্ব হলো সুস্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৯২]

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
﴾ اِنَّ الَّذِيْنَ يَكْفُرُوْنَ بِاللّٰهِ وَرُسُلِهٖ وَيُرِيْدُوْنَ أَنْ يُّفَرِّقُوْا بَيْنَ اللّٰهِ وَرُسُلِهٖ وَيَقُوْلُوْنَ نُؤْمِنُ ۬ ﴿
بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا * أُولَئِكَ هُمُ الكَفِرُونَ حَقًّا (النساء: الآية ١٥٠-١٥١)
"যারা আল্লাহকে ও তাঁর রাসূলগণকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে (ঈমানের ব্যাপারে) তারতম্য করতে চায় এবং তারা বলেঃ আমরা কিছু স্বীকার করি, আর কিছু অস্বীকার করি। আর তারা এর মধ্যবর্তী কোন পথ অবলম্বন করতে চায়। তারাই প্রকৃত কাফির। [সূরা আন-নিসাঃ ১৫০-১৫১]

সুতরাং রাসূলগণ যে রিসালাত নিয়ে এসেছেন তাতে বিশ্বাস করা ওয়াজিব। মূলতঃ তাদের উপর ঈমানের দাবীও তাই।

আর এটাও জানা আবশ্যক যে, সমস্ত মানুষের জন্য প্রেরিত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পরে জ্বিন ও মানব কারো পক্ষেই পূর্ববর্তী কোন রাসূলের অনুসরণ করা জায়েয নেই; কেননা তার শরীয়তের আগমন ঘটেছে পূর্ববর্তী সমস্ত নবীর শরীয়তকে রহিত করে, ফলে আল্লাহ তাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তার বাইরে কোন দ্বীন নেই, এ সম্মানিত নবী ব্যতীত আর কারো অনুসরণ গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَسِرِينَ (آل عمران : ٨٥)
"কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ হতে কবুল করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্ন্তভুক্ত হবে। [সূরা আলে-ইমরানঃ ৮৫]

তিনি আরো বলেনঃ
وَمَا أَرْسَلْنَكَ إِلا كَافَةُ لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (سبأ : ۲۸)
"আমরা আপনাকে কেবলমাত্র সমস্ত মানুষের জন্য সুসংবাদদানকারী এবং ভয় প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করেছি, অথচ অনেক লোকরাই তা জানে না”। [সূরা সাবাঃ ২৮]

আল্লাহ আরো বলেনঃ
قُلْ يَاأَيُّهَا النَّاسُ إِنِّى رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا (الأعراف : ١٥٨).
"বলুন, হে মানব সম্প্রদায়! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর রাসূল”। [সূরা আল-আ'রাফঃ ১৫৮]

২. তাদের সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখা, তাদেরকে ভালবাসা, তাদের বিরোধিতা করা ও তাদের সাথে শত্রুতা করা থেকে বেঁচে থাকা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَمَنْ يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ (المائدة : ٥٦).
“আর যারা আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মু'মিনদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তাহলে আল্লাহর দল তো বিজয়ী হবেই”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৫৬]

আল্লাহ আরো বলেনঃ
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ (التوبة: ٧١)
"আর মু'মিন নর ও মু'মিন নারী পরস্পর পরস্পরের বন্ধু”। [সূরা আত-তাওবাহঃ ৭১]

এ আয়াতে ঈমানদারদের গুণের মধ্যে একে অপরের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাকেও গণ্য করা হয়েছে, ফলে আল্লাহর রাসূলগণ যেহেতু সমস্ত ঈমানদারদের থেকে পূর্ণ ঈমানের অধিকারী সেহেতু তারাও এর অন্তর্ভুক্ত হবেন। সুতরাং দ্বীনের মধ্যে তাদের সুউচ্চ সম্মান ও মহান মর্যাদার কারণে মু'মিন হৃদয়ে অন্য সৃষ্টিজগতের চেয়ে তাদের প্রতি বেশী বন্ধুত্ব ও ভালবাসা রাখা ওয়াজিব। আর এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলগণের সাথে শত্রুতা করার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন এবং তাঁর নিজের ও তাঁর ফিরিশতাদের সাথে শত্রুতা করাকে তাঁর রাসূলদের সাথে শত্রুতা পোষণের সমপর্যায়ে উল্লেখ করে উভয়ের শান্তি ও পরিণাম একসাথে বর্ণনা করেছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ
مَنْ كَانَ عَدُوا لِلَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَرُسُلِهِ وَجِبْرِيلَ وَمِيكَالَ فَإِنَّ اللَّهَ عَدُوٌّ لِلْكَافِرِينَ (البقرة : ۹۸)
“যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাদের ও তাঁর রাসূলদের এবং জিবরীল ও মীকাঈলের শত্রু, আল্লাহ অবশ্যই কাফিরদের শত্রু”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ৯৮]

৩. এ কথা বিশ্বাস করা যে, তারা সমস্ত মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, সৃষ্টি জগতের কেউ তাকওয়া ও যোগ্যতার দিক থেকে যত উপরেই উঠুক না কেন, তাদের মর্যাদায় পৌঁছতে পারবে না; কেননা রিসালাতের গুরুদায়িত্ব আল্লাহর মনোনয়নের উপর নির্ভরশীল, তিনি যাকে ইচ্ছা করেন তাকে এর দ্বারা বিশেষিত করেন। কোন প্রকার প্রচেষ্টা ও কর্ম দ্বারা তা পাওয়া যায় না।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
اللهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلًا وَ مِنَ النَّاسِ إِنَّ اللهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ (الحج: ٧٥).
“আল্লাহ ফিরিস্তা ও মানব জাতি হতে রাসূলদের মনোনীত করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্ব দ্রষ্টা”। [সূরা আল- হাজ্জঃ ৭৫]

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
وَتِلْكَ حُجَّتُنَا أَتَيْنَا إِبْرَاهِيمَ عَلَى قَوْمِهِ تَرْفَعُ دَرَجَتٍ مَنْ نَشَاءُ (الأنعام: ۸۳)
"আর তা আমাদের যুক্তি-প্রমাণ যা আমরা ইব্রাহীমকে দিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের মোকাবিলায়; যাকে আমরা ইচ্ছা করি তাকে মর্যাদায় উন্নীত করি"। [সূরা আল-আন'আমঃ৮৩]

নবী ও রাসূলদের এক বিরাট শ্রেণীকে উল্লেখ করার পর আল্লাহ বলেনঃ
وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَلَمِينَ (الأنعام: ٨٦ )
"তাদের প্রত্যেককে আমরা সমস্ত সৃষ্টি জগতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি”। [সূরা আল-আন'আমঃ ৮৬] এ ধরনের আলোচনা এ অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদে করা হয়েছে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত হয়েছে যে, সৃষ্টি জগতের কেউ রাসূলদের সমমর্যাদায় পৌঁছতে পারবে না। বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ
(لا ينبغي لعبد أن يقول: أنا خيرٌ من يُونُسُ بْنِ مَتَى)
"কোন বান্দার জন্য এটা বলা উচিত নয় যে, আমি 'মাত্তা'র পুত্র ইউনুসের থেকে উত্তম"¹। বুখারীর অন্য বর্ণনায় এসেছেঃ
(مَنْ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّىٰ فَقَدْ كَذَبَ)
“যে কেউ বললঃ আমি ‘মাত্তা’র ছেলে ইউনুসের চেয়ে উত্তম সে মিথ্যা বলল”¹。

কোন কোন ব্যাখ্যাকারী বলেছেনঃ ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথাটি মূলতঃ ধমকের সুরে বলেছেন যাতে করে কোন মুর্খ লোক কুরআন কারীমে ইউনুস আলাইহিস সালামের যে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইউনুস আলাইহিস সালামের মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় এমন ধারণা না করে বসে’। আলেমগণ এও বর্ণনা করেছেন যে, ‘ইউনুস আলাইহিস সালামের ব্যাপারে যা ঘটেছে তাতে তার নবুওয়াতের মর্যাদা সামান্য পরিমাণও কমেনি। ইউনুস আলাইহিস সালামকে বিশেষ করে উল্লেখ করার কারণ হলো আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক তার ঘটনাকে কুরআনে কারীমে উল্লেখ করা। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
وَذَا النُّونِ إِذْ ذَهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَنْ لَنْ نَقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَى فِي الظُّلُمَتِ أَنْ لا إلهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَنَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّلِمِينَ * فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَيْنَهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ تُجِي الْمُؤْمِنِينَ ﴾ [الأنبياء: ٨٧، ٨٨].
“আর স্মরণ করুন, যুন-নুনের কথা, যখন তিনি ক্রোধ ভরে চলে গিয়েছিলেন, এবং মনে করেছিলেন যে, আমরা তাকে পাকড়াও করব না, তারপর তিনি অন্ধকারে এ আহবান করেছিলেন যে, আপনি ব্যতীত হক্ক কোন মা’বুদ নেই, আপনি কতইনা পবিত্র, নিশ্চয়ই আমি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছি’। তখন আমরা তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা হতে উদ্ধার করেছিলাম, আর এভাবেই আমরা মু’মিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি”। [সূরা আল-আম্বিয়াঃ ৮৭-৮৮]

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
وَإِنَّ يُونُسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ ﴿ ... الآيات (الصافات: ١٣٩-١٤٨)
“নিশ্চয়ই ইউনুস রাসূলদের অন্তর্গত”। [সূরা আস্ সাফ্ফাতঃ ১৩৯] এর পরবর্তী ১৪৮ নং আয়াত পর্যন্ত’।

৪. এ কথা বিশ্বাস করা যে, তাদের মধ্যে মান-মর্যাদাগত ভিন্ন ভিন্ন স্তর রয়েছে, তারা সবাই একই স্তরের নন বরং আল্লাহ তাদের কারো উপর অপর কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ
تلك الرُّسُلُ فَضَلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِّنْهُم مَّن كَلَّمَ اللَّهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ (البقرة: ٢٥٣).
“এ রাসূলগণ, আমরা তাদের মধ্যে কাউকে অপর কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। তাদের মধ্যে এমন কেউ রয়েছে যার সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন, আবার কাউকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছেন”। [সূরা আল- বাকারাহঃ ২৫৩]

ইমাম ত্বাবারী এ আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ 'আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এরা আমার রাসূল তাদের কারো উপর অপর কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি, তাদের কারো সাথে আমি কথা বলেছি যেমন মূসা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাদের কারো উপর অপর কাউকে সম্মান ও উচ্চ মর্যাদায় বহুগুণ উন্নীত করেছি'। সুতরাং কুরআন ও সুন্নার দলীলের চাহিদা মোতাবেক তাদের প্রত্যেককে তার জন্য নির্দিষ্ট সম্মান ও মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা উম্মাতের উপর তাদের অধিকার।

৫. তাদের উপর সালাত ও সালাম পাঠ করা, কারণ আল্লাহ তা'আলা তা করার নির্দেশ দিয়েছেন, আর আল্লাহ এও জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি রাসূলদের জন্য পরবর্তী উম্মাতদের পক্ষ হতে উত্তম প্রশংসা ও সালাম অবশিষ্ট রেখেছেন। মহান আল্লাহ নূহ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেছেনঃ
وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ * سَلَمُ عَلَى نُوحٍ فِي الْعَلَمِينَ (الصافات: ۷۸-۷۹)
"আমরা তাকে পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি, সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহের উপর শান্তি বর্ষিত হোক”। [সূরা আস-সাফ্ফাতঃ ৭৮-৭৯]

ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম সম্পর্কেও বলেছেনঃ
وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ * سَلَمُ عَلَى إِبْرَاهِيمَ (الصافات: ۱۰۸-۱۰৯)
"আমরা তাকে পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি, ইব্রাহীমের উপর সালাম বর্ষিত হোক”। [সূরা আস-সাফ্ফাতঃ ১০৮-১০৯]

অনুরূপভাবে মূসা ও হারুন আলাইহিমাস সালাম সম্পর্কে বলেছেনঃ
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ وَتَرَكْنَا عَلَيْهِمَا فِي الْآخِرِينَ * سَلٰمٌ عَلٰى مُوْسٰى وَهٰرُوْنَ (الصافات: ۱۱۹-۱۲۰)
"আমরা তাদের দু'জনকে পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি, মূসা ও হারূনের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। [সূরা আস্-সাফ্ফাতঃ ১১৯-১২০]

আরো বলেছেনঃ
وَسَلٰمٌ عَلَى الْمُرْسَلِيْنَ (الصافات: ۱۸۱)
"আর সমস্ত রাসূলদের উপর সালাম"। [সূরা আস- সাফ্ফাতঃ ১৮১]

ইবনে কাসীর বলেনঃ 'মহান আল্লাহর বাণীঃ "সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক” (আস-সাফ্ফাতঃ৭৯) এ আয়াতের ব্যাখ্যা হলো তাকে ভালোভাবে স্মরণ ও তার উত্তম প্রশংসা অবশিষ্ট রাখা, কারণ যাবতীয় সম্প্রদায় তার উপর সালাম প্রেরণ করে। ইমাম 'নববী' সমস্ত নবীদের উপর সালাম দেয়া জায়েয হওয়া ও তা মুস্তাহাব হওয়ার উপর আলেমদের ইজমা' তথা সর্বসম্মত মত বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেনঃ 'তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দরূদ পড়ার উপর একমত হয়েছেন, অনুরূপভাবে ভিন্ন ভিন্নভাবে যাবতীয় নবী ও ফিরিস্তাদের উপরও দরূদ পড়া জায়েয হওয়ার ব্যাপারেও যাদের ঐক্যমত গ্রহণযোগ্য তারা সবাই একমত হয়েছেন। কিন্তু নবী-রাসূলগণ ব্যতীত অন্যদের উপর অধিকাংশ আলেমের মতে সরাসরি সালাত বা দরূদ পড়া যাবেনা।

উম্মতের উপর রাসূলদের কি কি অধিকার রয়েছে, কুরআন ও সুন্নার দলীল অনুসারে এবং আলেমদের মতামতের ভিত্তিতে এখানে তার কিছু বর্ণনা করা হলো। মহান আল্লাহ সবচেয়ে বেশী জানেন।

টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৩৪৬), মুসলিম (হাদীস নং ২৩৭৬), বুখারীর শব্দ চয়নে。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৪৬০৪)।

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ

📄 দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ


দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূল বলতে বুঝায়ঃ অত্যন্ত সাবধানী ও ধৈর্য্যশীল রাসূলদেরকে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُوا الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ (الأحقاف: ٣٥).
"সুতরাং আপনি ধৈর্য্য ধারণ করুন যেমনটি ধৈর্য্য ধারণ করেছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ”। [সূরা আল-আক্বাফঃ ৩৫]

দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বলতে কাদেরকে বুঝানো হয়েছে এ ব্যাপারে আলেমগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। কেউ কেউ বলেনঃ এখানে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূল বলতে সমস্ত রাসূলগণকেই বুঝানো হয়েছে। আর তখন مِنَ الرُّسُلِ শব্দদ্বয়ের (من) দ্বারা কিছু সংখ্যক না বুঝিয়ে শ্রেণী বুঝানো উদ্দেশ্য হবে। ইবনে যায়েদ বলেনঃ 'সমস্ত রাসূলই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন, আল্লাহ তা'আলা কেবলমাত্র দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, অত্যন্ত সাবধানী, বুদ্ধিসম্পন্ন এবং পূর্ণ বিবেকবান লোকদেরকেই নবী হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন'।

কেউ কেউ বলেনঃ তারা পাঁচজনঃ নূহ, ইব্রাহীম, মূসা, 'ঈসা এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিম ওয়া সাল্লাম। ইবনে আব্বাস বলেনঃ 'দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূল হলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, নূহ, ইব্রাহীম, মূসা ও 'ঈসা'। মুজাহিদ, 'আতা আল খোরাসানী ও এ মত পোষণ করেন আর পরবর্তী অনেক আলেম এ মত গ্রহণ করেছেন।

আল্লাহ এ পাঁচজনকে কুরআনের দু'টি স্থানে এক সাথে উল্লেখ করেছেন। উপরোক্ত মতের সমর্থনে এর দ্বারাই দলীল নেয়া হয়ে থাকে। প্রথমটি সূরা আল-আহযাবে, মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّنَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنْكَ وَمِنْ نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَأَخَذْنَا مِنْهُم مِينَا فَا غَلِيظًا (الأحزاب : ٧)
"আর স্মরণ করুন যখন আমরা নবীদের নিকট হতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং আপনার থেকেও এবং নূহ, ইব্রাহীম, মূসা ও মারইয়াম পুত্র 'ঈসা থেকেও, আর তাদের নিকট থেকে আমরা গ্রহণ করেছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার। [সূরা আল-আহযাবঃ ৭]

দ্বিতীয়টি সূরা আশ-শুরায়, মহান আল্লাহ বলেনঃ
شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَطَى بِهِ نُوحًا وَ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ ﴾ (الشورى: ۱۳)
"তিনি তোমাদের জন্য শরীয়ত হিসাবে প্রবর্তন করেছেন এমন এক দ্বীন যার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন নূহকে, আর যা আমি আপনার নিকট ওহী করে পাঠিয়েছি, এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও 'ঈসাকে এ বলে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর, এতে মতভেদ করোনা। [সূরা আশ-শুরাঃ ১৩]

কোন কোন মুফাস্সির বলেনঃ 'তাদেরকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলোঃ এ কথা জানিয়ে দেয়া যে, তাদের বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান রয়েছে কারণ তারা বিখ্যাত শরীয়তসমূহের ধারক বাহক, আর তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ রাসূলদের অন্তর্গত।

আর এ পাঁচ জনই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ রাসূল এবং বনী আদমের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তিত্ব। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ "আদম সন্তানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন পাঁচ জনঃ নূহ, ইব্রাহীম, মূসা, 'ঈসা, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিম ওয়া সাল্লাম, তাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলেন মুহাম্মাদ, আল্লাহ তার উপর দরূদ ও সালাম পাঠ করুন, অনুরূপভাবে তাদের সবার উপরও দরূদ ও সালাম পাঠ করুন"¹。

তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, এর প্রমাণ ইমাম বুখারী কর্তৃক আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(أنا سيد ولد آدم يوم القيامة وأول من ينشق عنه القبر وأول شافع وأول مشفع)
“আমিই ক্বিয়ামতের দিন সমস্ত আদম সন্তানের নেতা, আর আমার কবরই প্রথম বিদীর্ণ হবে, আমিই প্রথম সুপারিশকারী এবং আমিই ঐ সর্বপ্রথম ব্যক্তি যার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে”¹。

টিকাঃ
¹ ইমাম বায্যার হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, দেখুনঃ কাশফুল আসতার (৩/১১৪), ইমাম হাইছামী, মাজমাউয যাওয়ায়েদ (৮/২৫৫), এবং বলেনঃ এ হাদীসের বর্ণনাকারীগণ সহীহ হাদীসের বর্ণনা কারী। ইমাম হাকিম হাদীসটি বর্ণনা করে বলেনঃ বিশুদ্ধ সনদে, ইমাম যাহাবী তাঁর মত সমর্থন করেছেন, মুসতাদরাকঃ হাকিম (২/৫৪৬)。
¹ ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেন (হাদীস নং ২২৭৮), আবু দাউদ (৫/৩৮ হাদীস নং ৪৬৭৩)。

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বৈশিষ্ট্যসমূহ, উম্মতের উপর তার অধিকারসমূহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখা যে হক তার বর্ণনা

📄 আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বৈশিষ্ট্যসমূহ, উম্মতের উপর তার অধিকারসমূহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখা যে হক তার বর্ণনা


প্রথমতঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বৈশিষ্ট্যসমূহঃ

মহান আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনেক বৈশিষ্ট্য ও সম্মানে বিশেষিত করে অন্যান্য রাসূলদের উপর তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং সমস্ত সৃষ্টিজগত থেকে স্বতন্ত্র করেছেন। তম্মধ্যে রয়েছেঃ

১. তার রিসালাত জ্বিন ও মানব সবার জন্য; সুতরাং তাদের কারো পক্ষে তার অনুসরণ ও তার রিসালতের উপর ঈমান আনা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴿وَمَا أَرْسَلْنَكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا ﴾ (سبا: ২৮)
"আমরা তো আপনাকে সমস্ত লোকের জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি”। [সূরা সাবা'ঃ ২৮]

তিনি আরো বলেনঃ
﴿تَبْرَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَلَمِينَ نَذِيرًا ﴾ (الفرقان : ١)
"বরকতময় তিনি যিনি তার বান্দার প্রতি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন যাতে তিনি সৃষ্টি জগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারেন”। [সূরা আল- ফুরকানঃ ১]

ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেনঃ এ আয়াতে )العالمين( 'আলআলামীন' দ্বারা জ্বিন ও মানবকে বুঝানো হয়েছে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ
فضلت على الأنبياء بست أعطيت جوامع الكلم، ونصرت بالرعب، وأحلت لي الغنائم، وجعلت لي الأرض طهوراً ومسجداً، وأرسلت إلى الخلق كافة، وختم بي النبيون)¹
“আমাকে নবীদের উপর ছয়টি বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা হয়েছে, আমাকে ব্যাপকার্থ বোধক পূর্ণ বাক্যসমূহ প্রদান করা হয়েছে, আমাকে (শত্রুদের মনে) ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে সাহায্য করা হয়েছে, আমার জন্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হালাল করা হয়েছে, আমার জন্য যমীনকে পবিত্র ও মসজিদ বানিয়ে দেয়া হয়েছে, আমাকে সমস্ত সৃষ্টি জগতের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে এবং আমার দ্বারা নবীদের ধারার পরিসমাপ্তি করা হয়েছে”।

ইমাম মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ
(والذي نفس محمد بيده لا يسمع بي أحد من هذه الأمة يهودي ولا نصراني، ثم يموت ولم يؤمن بالذي أرسلت به إلا كان من أصحاب النار)²
‘যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার শপথ করে বলছি, এ উম্মাতের যে কেউ চাই সে ইয়াহুদী হোক বা নাছারা হোক আমার কথা শুনবে তারপর আমাকে যা দিয়ে পাঠানো হয়েছে তার উপর ঈমান না আনা অবস্থায় মারা যাবে সে অবশ্যই জাহান্নামের অধিবাসী হবে।

২. কুরআন ও হাদীসের ভাষ্য থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে তিনি সর্বশেষ নবী ও রাসূল, মহান আল্লাহ বলেনঃ
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللهِ وَخَاتَمَ النَّبِينَ (الأحزاب: ٤٠)
"মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী”। (সূরা আল-আহযাবঃ ৪০]

বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেনঃ
إن مثلي ومثل الأنبياء من قبلي كمثل رجل بني بيتاً فأحسنه وأجمله، إلا موضع لبنة من زاوية، فجعل الناس يطوفون به ويعجبون له ويقولون: هلا وضعت هذه اللبنة؟ قال: فأنا اللبنة وأنا خاتم النبيين)¹
'আমার এবং আমার পূর্ববর্তী অন্যান্য নবীদের উদাহরণ হলো এমন লোকের মত যে একটি ঘর বানিয়ে তাকে সুন্দর পরিপাটি করেছে, এর এক কোণে এক ইট পরিমাণ স্থান ব্যতীত। ফলে মানুষ এ ঘরের পাশে ঘুরাফিরা করতে শুরু করল, এবং এ ব্যাপারে তাদের বিস্ময় প্রকাশ করে বলতে লাগলঃ কেন এ ইটটি রাখা হলোনা? তিনি বললেনঃ আমিই সে ইট, আর আমিই শেষ নবী'।

এ সমস্ত কুরআন ও হাদীসের দলীল প্রমাণাদির উপর ভিত্তি করে এ বিশ্বাসের উপর উম্মাতের পূর্বাপর সবার ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অনুরূপভাবে তারা এ ব্যাপারেও একমত হয়েছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে যে কেউ নবুওয়াতের দাবী করবে সে কাফের বলে বিবেচিত হবে। যদি সে তার দাবীর উপর অটল থাকে, তবে তাকে হত্যা করা ওয়াজিব হবে। আলুসী বলেনঃ 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ নবী হওয়ার ব্যাপারে কুরআন সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে, রাসূলের হাদীসে তা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে এবং এর উপর উম্মাতের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং এর বিপরীত দাবীদার কাফির বলে পরিগণিত হবে, যদি এর উপর অটল থাকে তাকে হত্যা করা হবে'।

৩. আল্লাহ তা'আলা তাকে সবচেয়ে বড় মু'জিযা ও সুস্পষ্ট নিদর্শন দিয়ে সাহায্য করেছেন, আর তা হচ্ছে মহান কুরআন, যা আল্লাহর বাণী, যাবতীয় পরিবর্তন ও পরিবর্ধন থেকে সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত, যতদিন উঠে যাওয়ার জন্য আল্লাহর নির্দেশ না হবে ততদিন তা এ উম্মতের মধ্যে বাকী থাকবে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
قُل لين اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنِّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهيرا (الإسراء: ۸۸)
"বলুন, যদি এ কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জ্বিন পরস্পর সমবেত হয় এবং যদিও তারা একে অপরকে সাহায্য করে তবুও তারা এর অনুরূপ আনয়ন করতে পারবে না”। (সূরা আল- ইসরা'ঃ ৮৮)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
۞أَوَلَمْ يَكْفِهِمْ أَنَّا أَنزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ يُتْلَىٰ عَلَيْهِمْ ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَرَحْمَةً وَذِكْرَىٰ لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ (আল-আনকাবুত: ৫১)
“এটা কি তাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, আমরা আপনার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি, যা তাদের নিকট পাঠ করা হয়, এতে অবশ্যই অনুগ্রহ ও উপদেশ রয়েছে সে জাতির জন্য যারা ঈমান আনে”। [সূরা আল-আনকাবুতঃ ৫১]

বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ
(ما من الأنبياء نبي إلا أعطي من الآيات ما مثله آمن عليه البشر، وإنما كان الذي أوتيته وحياً أوحاه الله إلي، فأرجو أن أكون أكثرهم تابعاً يوم القيامة)
'প্রত্যেক নবীকেই এমন সব নিদর্শন দেয়া হয়েছে যার উপর মানুষ ঈমান এনেছে, আমাকে যা দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে আল্লাহ আমার কাছে যে বাণী পাঠিয়েছেন সে বাণী সম্বলিত ওহী, সুতরাং আমি আশা করি ক্বিয়ামতের দিন তাদের সবার থেকে বেশী অনুসারীর অধিকারী হব'¹。

৪. তার উম্মাত সমস্ত উম্মাত হতে শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে বেশী জান্নাতের অধিবাসী। মহান আল্লাহ বলেনঃ
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ ۗ ﴿آل عمران: ١١٠﴾
"তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মাত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে, তোমরা সৎকার্যের নির্দেশ দান করবে, অসৎকার্যে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনবে”। [সূরা আলে-ইমরানঃ ১১০]

অনুরূপভাবে মুয়াবিয়া ইবনে হাইদাহ আল-কুশাইরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহর বাণীঃ
وَ كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ 1
এ আয়াত সম্পর্কে বলতে শুনেছিঃ
(إنكم تتمون سبعين أمة أنتم خيرها وأكرمها على الله)
“তোমরা সত্তরটি জাতিকে পূর্ণ করবে, তাদের সবার মধ্যে তোমরাই আল্লাহর নিকট সবচেয়ে উত্তম ও বেশী সম্মানিত”¹。

বুখারী ও মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনে মাস'উদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে একটি গম্বুজের নীচে ছিলাম ইত্যবসরে তিনি বললেনঃ
(أترضون أن تكونوا ربع أهل الجنة). قلنا : نعم. قال: (أترضون أن تكونوا ثلث أهل الجنة). قلنا نعم. قال: (أترضون أن تكونوا شطر أهل الجنة). قلنا: نعم. قال: (والذي نفس محمد بيده إني لأرجو أن تكونوا نصف أهل الجنة وذلك أن الجنة لا يدخلها إلا نفس مسلمة وما أنتم في أهل الشرك إلا كالشعرة البيضاء في جلد الثور الأسود، أو كالشعرة السوداء في جلد الثور الأحمر)
“তোমরা জান্নাতের এক চতুর্থাংশ হলে কি সন্তুষ্ট হবে?” আমরা বললামঃ হাঁ, তিনি বললেনঃ “তোমরা জান্নাতের এক তৃতীয়াংশ হলে কি সন্তুষ্ট হবে?” আমরা বললামঃ হাঁ, তিনি বললেনঃ "তোমরা জান্নাতের অর্ধেক হলে কি সন্তুষ্ট হবে?” আমরা বললামঃ হাঁ, তিনি বললেনঃ "যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার শপথ করে বলছিঃ অবশ্যই আমি আশা করি তোমরা জান্নাতের অর্ধেক হবে; আর সেটা এজন্যই যে, জান্নাতে কেবলমাত্র মুসলিম ব্যক্তিই প্রবেশ করবে, শির্ককারীদের সাথে তোমাদের অনুপাত হবে কালো ষাঁড়ের চামড়ায় একটি সাদা চুলের মত, অথবা লাল ষাঁড়ের চামড়ায় কালো চুলের মত"²。

৫. ক্বিয়ামতের দিন তিনি সমস্ত বনী আদমের সর্দার; আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(أنا سيد ولد أدم يوم القيامة وأول من ينشق عنه القبر وأول شافع وأول مشفع)
"আমি কিয়ামতের দিন সমস্ত বনী আদমের সর্দার, আমার কবরই প্রথম বিদীর্ণ হবে (হাশরের মাঠে যাওয়ার জন্য), আমিই প্রথম সুপারিশকারী আর আমার সুপারিশই প্রথম কবুল করা হবে"¹。

৬. তিনি মহাসুপারিশের অধিকারী। আর তাহলো যখন সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ রাসূলগণ সুপারিশ করা থেকে নিজেদের অপারগতা পেশ করবেন তখন তিনি হাশরের মাঠে অবস্থানকারীদের মধ্যে বিচার ফয়সালা করার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন। মহান আল্লাহর বাণীঃ
عَسَى أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا (الإسراء: ٧٩)
"আশা করা যায় আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে”। [সূরা আল-ইসরাঃ৭৯]

এখানে “মাকামে মাহমুদ তথা প্রশংসিত স্থান" বলতে এ বড় সুপারিশের কথাই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। হুযাইফা, সালমান, আনাস, আবু হুরায়রা, ইবনে মাস'উদ, জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ, ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, ক্বাতাদা প্রমূখ সাহাবা, তাবেয়ীদের একাংশ "মাকামে মাহমুদ” তথা প্রশংসিত স্থানের তাফসীর করেছেন বড় সুপারিশ। ক্বাতাদা বলেনঃ 'কিয়ামতের দিন তার সুপারিশকে 'আলেমগণ মাকামে মাহমুদ বলে মত প্রকাশ করতেন'।

রাসূলের সুন্নাহ দিয়েও প্রমাণ পাওয়া যায় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্বিয়ামতের মাঠে অবস্থানকারীদের জন্য সুপারিশ করবেন; যেমনটি শাফা'আতের বড় হাদীসে এসেছে, যা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেন, তাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আদম তারপর নূহ তারপর ইব্রাহীম তারপর মূসা তারপর 'ঈসা সুপারিশ করার অনুরোধ কবুল করতে অপারগতা প্রকাশ করবেন এবং প্রত্যেকেই বলবেনঃ "আমি এ কাজের জন্য নই”, শেষ পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ
فَيَأْتُونِي فَأَنْطَلِقُ، فَأَسْتَأْذِنُ عَلَى رَبِّي فَيُؤْذَنُ لِي عَلَيْهِ، فَإِذَا رَأَيْتُ رَبِّي وَقَعْتُ لَهُ سَاجِدًا فَيَدَعُنِي مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَدَعَنِي، ثُمَّ يُقَالُ لِي: اِرْفَعْ مُحَمَّدُ، قُلْ يُسْمَعْ، وَسَلْ تُعْطَهْ، وَاشْفَعْ تُشَفَّعْ فَأَحْمَدُ رَبِّي بِمَحَامِدَ عَلَّمَنِيهَا ثُمَّ أَشْفَعُ ...
“তারপর তারা আমার কাছে আসার পরে আমি যাব এবং আমার প্রভুর কাছে যাওয়ার অনুমতি চাইব, তখন আমাকে অনুমতি দেয়া হবে, আমি আমার প্রভুকে দেখা মাত্রই সিজদায় পড়ে যাব, তারপর যতক্ষণ আল্লাহর ইচ্ছা আমাকে এ অবস্থায় থাকতে দিবেন। তারপর আমাকে বলা হবেঃ মুহাম্মাদ উঠুন, আপনি বলুন, আপনার কথা শুনা হবে, আপনি চান আপনাকে দেয়া হবে, আর আপনি সুপারিশ করুন আপনার সুপারিশ কবুল করা হবে। তারপর আমার প্রভু আমাকে যে প্রশংসা শিক্ষা দিয়েছেন তা দিয়ে আমি তার প্রশংসা করব, তারপর সুপারিশ করব...'¹。

৭. তিনি প্রশংসার ঝান্ডার অধিকারী। সেটা এক বাস্তব ঝান্ডা, কিয়ামতের দিন তিনি তা বহন করার বিশেষত্ব পাবেন। আর সমস্ত মানুষ তার অনুসারী হবে, তার ঝান্ডার নীচে থাকবে।

কোন কোন আলেম বলেনঃ তাকে এ ঝান্ডা দিয়ে বিশেষভাবে সম্মানিত করার কারণ হলোঃ তিনি আল্লাহর এমন প্রশংসা করবেন তিনি ব্যতীত আর কেউ তাকে তেমন প্রশংসা করতে সক্ষম হবে না। রাসূলের সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি এ মহান সম্মানে ভূষিত হওয়ার বৈশিষ্ট্য অর্জন করবেন। আবু সা'ঈদ আল- খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(أنا سيد ولد آدم يوم القيامة، وبيدي لواء الحمد ولا فخر، وما من نبي يومئذ آدم فمن سواه، إلا تحت لوائي، وأنا أول من تنشق عنه الأرض ولا فخر)
"আমি কিয়ামতের দিন সমস্ত আদম সন্তানের সর্দার, আমার হাতে থাকবে প্রশংসার ঝান্ডা, আর আমি তা গর্ব করে বলছিনা, আদম ও অন্যান্য সকল নবীই আমার ঝান্ডার নীচে থাকবে, আমিই প্রথম যার জন্য যমীন বিদীর্ণ হবে। আমি তা গর্ব করে বলছি না”¹。

৮. তিনিই অসীলার অধিকারী, আর তা হলো জান্নাতের এক উচ্চাসন, যা কেবলমাত্র একজনের জন্যই নির্ধারিত। তা জান্নাতের সর্বোচ্চ সোপান।

আব্দুল্লাহ ইবনে 'আমর ইবনুল 'আস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেনঃ
(إذا سمعتم المؤذن فقولوا مثل ما يقول ثم صلوا عليّ، فإنه من صلى علي صلاة صلى عليه الله بها عشراً، ثم سلوا الله لي الوسيلة، فإنها منزلة في الجنة لا تنبغي إلا لعبد من عباد الله، وأرجو أن أكون أنا هو فمن سأل لي الوسيلة حلت له الشفاعة)
"যখন তোমরা মুআজ্জিনের আজান শুনতে পাও তখন সে যে রকম বলে সেরকম বলো। তারপর আমার উপর দরূদ পাঠ করিও; কেননা যে আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করে আল্লাহ তার বিনিময়ে তার উপর দশবার দরূদ পাঠ করেন, তারপর তোমরা আমার জন্য অসীলার দো'আ করো; কেননা তা জান্নাতের এমন এক মর্যাদাপূর্ণ স্থানের নাম যা কেবল আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এক বান্দার জন্যই সমীচিন হবে, আর আমি আশা করি সে ব্যক্তিটি আমিই হবো, সুতরাং যে কেউ আমার জন্য অসীলার প্রার্থনা করবে তার জন্য আমার সুপারিশ হালাল হয়ে যাবে”²。

এ ছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্যান্য আরো অনেক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও মহান মর্যাদা রয়েছে, যেগুলো প্রমাণ করছে যে, তিনি তার প্রভুর কাছে অনেক সম্মানিত আর দুনিয়া ও আখেরাতে অধিক উচ্চাসন সম্পন্ন।

দ্বিতীয়তঃ উম্মাতের উপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অধিকারসমূহঃ

উম্মাতের উপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনেক অধিকার রয়েছে। ইতিপূর্বে সমস্ত রাসূলদের প্রতি উম্মাতের অবশ্য পালনীয় যে সাধারণ অধিকার রয়েছে, সেগুলো আলোচনার সময় তার কিছু উল্লেখ করা হয়েছে। নীচে উম্মাতের উপর তার যে বিশেষ হক্ক রয়েছে তার কিছু পেশ করা হচ্ছেঃ

১. তার নবুওয়াত ও রিসালতের উপর বিস্তারিত ঈমান আনয়ন করা, আর এ কথা বিশ্বাস করা যে, তার রিসালত পূর্ববর্তী সমস্ত রিসালতকে রহিত করে দিয়েছে, যার অর্থ হচ্ছেঃ তিনি যা কিছু সম্পর্কে খবর দিয়েছেন তা বিশ্বাস করা, যা নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন করা, যা থেকে নিষেধ ও সাবধান করেছেন তা পরিত্যাগ করা এবং তার প্রদর্শিত পদ্ধতি ব্যতীত অন্য কোন পদ্ধতিতে আল্লাহর ইবাদাত না করা।

এর উপর কুরআন ও সুন্নায় অনেক দলীল-প্রমাণাদী রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনঃ
فَامِنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ وَالنُّورِ الَّذِي أَنْزَلْنَا (التغابن : ٨).
"সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ও যে জ্যোতি আমরা অবতীর্ণ করেছি তার উপর ঈমান আনয়ন কর"। [সূরা আত-তাগাবুনঃ ৮]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ
فَامِنُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللهِ وَكَلِمَتِهِ وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمُ تَهْتَدُونَ (الأعراف: ١٥٨)
"অতএব তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি ও তাঁর বার্তাবাহক উম্মী নবীর প্রতি যিনি আল্লাহ ও তার বাণীতে ঈমান আনেন এবং তোমরা তার অনুসরণ কর, যাতে তোমরা সঠিক পথ পাও”। [সূরা আল-আ'রাফঃ১৫৮]

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
وَمَا انْتَكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا (الحشر:7)
"আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক”। [সূরা আল-হাশরঃ ৭]

অনুরূপভাবে ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
أمرت أن أقاتل الناس حتى يشهدوا أن لا إله إلا الله، وأن محمداً رسول الله، ويقيموا الصلاة ويؤتوا الزكاة، فإذا فعلوا ذلك عصموا مني دماءهم وأموالهم إلا بحق الإسلام وحسابهم على الله)¹
"আমাকে মানুষের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এ সাক্ষ্য দেয়া পর্যন্ত যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে। যদি তারা তা করে তখন আমার থেকে তারা তাদের রক্ত ও সম্পদ নিরাপদ রাখবে, ইসলামের হক্ক ব্যতীত, আর তাদের হিসাবের ভার আল্লাহর উপর"।

২. এ কথার উপর ঈমান আনা ওয়াজিব যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রিসালাতের দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করেছেন, তার উপর অর্পিত আমানত আদায় করেছেন, উম্মাতকে সংশোধন করনের নিমিত্তে নসীহত করেছেন।

সুতরাং তিনি যাবতীয় ভাল বিষয়ই উম্মাতকে দেখিয়ে গেছেন এবং করার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। আর যা কিছু খারাপ আছে তা থেকে উম্মাতকে নিষেধ করে গেছেন এবং সাবধান করেছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا ﴾ (المائدة : ٣)
"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাংগ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৩]

অনুরূপভাবে আবুদ্দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
... وأيم الله لقد تركتكم على مثل البيضاء، ليلها ونهارها سواء)
"...আর আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি তোমাদেরকে এমন স্বচ্ছ শুভ্রতার মধ্যে রেখে যাচ্ছি যার দিন ও রাত্রি স্বচ্ছতার দিক দিয়ে একই রকম”²。

আর সাহাবায়ে কিরাম নবীর প্রচার কার্যের পক্ষে সবচেয়ে বড় সম্মেলনে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যখন তিনি বিদায় হজ্জের দিন তার যুগান্তকারী মর্মস্পর্শী ভাষণ দিয়েছিলেন এবং তাদের উপর আল্লাহ কি ওয়াজিব করেছেন ও কি হারাম করেছেন তা বর্ণনা করেছেন, আর তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে অসীয়ত করেছেন। সবশেষে বললেনঃ
(وأنتم تسألون عني فما أنتم قائلون). قالوا: نشهد أنك قد بلغت وأديت ونصحت. فقال بإصبعه السبابة يرفعها إلى السماء وينكتها إلى الناس: (اللهم اشهد اللهم اشهد ثلاث مرات)¹
"তোমাদেরকে আমার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। তখন তোমরা কি বলবে?” তারা বললঃ আমরা সাক্ষ্য দেব যে, অবশ্যই আপনি প্রচার করেছেন, আদায় করেছেন এবং নসীহত করেছেন। তারপর তিনি তার শাহাদত অঙ্গুলি আকাশের দিকে উঠালেন এবং মানুষের দিকে নামিয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষ্য থাক, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষ্য থাক, তিন বার”।

আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ “মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এমন অবস্থায় রেখে গেছেন যে, আকাশে কোন পাখি তার দু' ডানা মেলে নড়াচড়া করলে তার সম্পর্কেও তিনি আমাদেরকে জ্ঞান দান করেছেন”²。

এ ব্যাপারে সলফে সালেহীনদের থেকে অনেক বাণী রয়েছে।

৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসা, তার ভালবাসাকে নিজের এবং সমস্ত সৃষ্টিজগতের ভালবাসার উপর প্রাধান্য দেয়া। যদিও সমস্ত নবী ও রাসূলদের ভালবাসা ওয়াজিব, তবুও আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য এ ভালবাসার বিশেষত্ব রয়েছে। আর সে জন্যই তার ভালবাসা সমস্ত মানুষের ভালবাসা তথা সন্তান-সন্ততি, পিতামাতা ও অন্যান্য যাবতীয় আত্মীয় স্বজন বরং নিজকে ভালবাসার উপরও প্রাধান্য দেয়া ওয়াজিব। মহান আল্লাহ বলেনঃ
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالُ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَ مَسْكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُم مِّنَ اللهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادِ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللهُ بِأَمْرِهِ وَاللهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَسِقِينَ (التوبة : ٢٤).
"বলুনঃ তোমাদের নিকট যদি আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং আল্লাহর পথে জ্বিহাদ করা অপেক্ষা অধিক প্রিয় হয় তোমাদের পিতৃবর্গ, তোমাদের সন্তানগণ, তোমাদের ভ্রাতাগণ, তোমাদের স্ত্রীগণ, তোমাদের স্বগোষ্ঠী, তোমাদের অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যার মন্দা পড়ার আশংকা কর এবং তোমাদের বাসস্থান যা তোমরা পছন্দ করছো, তবে অপেক্ষা কর আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত। বস্তুত আল্লাহ দূরাচারী সম্প্রদায়কে হেদায়াত দেন না”। [সূরা আত-তাওবাহঃ২৪]

এখানে মহান আল্লাহ তাঁর ভালবাসার সাথে তাঁর রাসূলের ভালবাসাকে একসাথে উল্লেখ করেছেন এবং যার কাছে তার সম্পদ, পরিবার-পরিজন, সন্তান- সন্ততি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চেয়ে বেশি প্রিয় হয় তাকে ধমক দিয়ে বলছেনঃ "তবে অপেক্ষা কর আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত, বস্তুত আল্লাহ দূরাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না"।

অনুরূপভাবে বুখারী ও মুসলিমে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من والده وولده والناس أجمعين)¹
"তোমাদের কেউই মু'মিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তার কাছে আমি তার পিতা মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং সমস্ত মানুষ থেকে প্রিয় না হব”।

অনুরূপভাবে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমার কাছে আমার নিজেকে ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে বেশী প্রিয়। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ
لا والذي نفسي بيده حتى أكون أحب إليك من نفسك. فقال له عمر: فإنه الآن والله لأنت أحب إلى من نفسي. فقال النبي ﷺ: (الآن يا عمر).¹
"না, যার হাতে আমার জান তার শপথ করে বলছি, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমার কাছে তোমার নিজের চেয়েও বেশী প্রিয় না হব ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না"। তারপর উমর বললেনঃ "এখন অবশ্যই আপনি আমার কাছে আমার নিজের চেয়েও বেশী প্রিয়”। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ "এখন হে উমর” (অর্থাৎ এখন তোমার ঈমান পূর্ণ হয়েছে)।

৪. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্মান করা, তাকে মর্যাদা দেয়া এবং শ্রদ্ধা করা; কেননা এটা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সে প্রাপ্ত অধিকারসমূহের অন্তর্গত, যা আল্লাহ স্বীয় গ্রন্থে শিরোধার্য করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴿ لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ ﴾ (الفتح : ٩)
"যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং তাকে সাহায্য- সহযোগিতা ও সম্মান কর”। [সূরা আল-ফাতহঃ ৯]

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ এখানে تعزروه অর্থঃ তাকে তোমরা শ্রদ্ধা কর, আর توقروه অর্থঃ তাকে তোমরা সম্মান কর। ক্বাতাদা বলেনঃ تعزروه অর্থঃ তাকে সাহায্য কর, আর توقروه দ্বারা আল্লাহ তাকে তাদের সর্দার বা নেতা বানাতে নির্দেশ দিয়েছেন।

অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿ يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللهِ وَرَسُولِهِ ﴾ (الحجرات: 1)
"হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে (কোন বিষয়ে) অগ্রণী হয়ো না”। [সূরা আল-হুজরাতঃ১]

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
﴿ لَا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءَ بَعْضِكُمْ بَعْضًا ﴾ (النور: ٦٣)
"তোমরা রাসূলের আহবানকে তোমাদের একে অপরের প্রতি আহবানের মত গণ্য করো না। [সূরা আন-নূরঃ ৬৩]

মুজাহিদ বলেনঃ 'তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা তাকে নম্র ও ভদ্রভাবে ডাকবেঃ হে আল্লাহর রাসূল!, কঠোর ভাবে হে মুহাম্মাদ! বলবেনা'। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্মানের ব্যাপারে সবচেয়ে চমৎকার নজীর সৃষ্টি করেছিলেন। উসামা ইবনে শারীক বলেনঃ 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসলাম, তিনি সাহাবা বেষ্টিত ছিলেন, মনে হলো যেন তাদের মাথার উপর পাখি বসে আছে' (অর্থাৎ কোন প্রকার নড়া চড়া নেই)।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার জীবিতাবস্থার মত মৃত্যুর পরেও সম্মান করা ওয়াজিব। ক্বাজী 'ইয়াদ বলেনঃ 'মনে রাখবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর তাকে সম্মান করা, শ্রদ্ধা করা এবং উঁচু মর্যাদা দেয়া অবশ্য কর্তব্য যেমনিভাবে তার জীবদ্দশায় ছিল। আর তা করতে হবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উল্লেখ করার সময়, তার হাদীস ও সুন্নাহ বর্ণনা করার সময়, তার নাম ও চরিত শুনার সময়, তার স্বজন ও বংশধরদের সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবাদের সম্মান করার সময়'।

৫. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর সালাত ও সালাম পাঠ করা। আর তা বেশী বেশী করা; যেমনটি আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا (الأحزاب: ٥٦)
"অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর ফিরিস্তাগণ নবীর উপর সালাত পাঠ করেন, হে মু'মিনগণ তোমরা তার উপর সালাত পাঠ কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম দাও”। [সূরা আল-আহযাবঃ ৫৬]

মুবাররাদ বলেনঃ 'সালাত শব্দের আসল অর্থ হলোঃ রহমত করা, সুতরাং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত, ফিরিস্তাদের পক্ষ থেকে আল্লাহর কাছে করুণা ও রহমত চাওয়া'।

অনুরূপভাবে আব্দুল্লাহ ইবনে 'আমর ইবনে 'আস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ
‎(من صلى علي صلاة صلى الله عليه بها عشراً)‎
"যে আমার উপর একবার সালাত পাঠ করবে আল্লাহ এর বিনিময়ে তার উপর দশবার সালাত পাঠ করবেন"¹。

আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ
‎(البخيل الذي من ذكرت عنده فلم يصل علي)‎
"বড় কৃপণ হলো ঐ ব্যক্তি যার কাছে আমার উল্লেখ করা হলো তারপর সে আমার উপর দরূদ পাঠ করলোনা"²。

যদিও সমস্ত নবী-রাসূলগণের উপরই সালাত ও সালাম দেয়া বৈধ, যেমনটি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু তা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষেত্রে খুব বেশী তাগিদ দেয়া হয়েছে। আর সেটা উম্মাতের উপর তার মহান দাবীসমূহের অন্যতম। তাই তা তাদের উপর ওয়াজিব। আর এজন্যই আমরা এখানে উম্মাতের উপর তার যে বিশেষ বিশেষ হক্ব বা অধিকারসমূহ রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখ করলাম। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দরূদ পড়া যে ওয়াজিব তা আলেমগণ সুস্পষ্টভাবে বলে গেছেন। তাদের কেউ কেউ আবার এ ব্যাপারে উম্মাতের ইজমা' তথা ঐক্যমত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন। ক্বাজী 'ইয়াদ বলেনঃ 'জেনে রাখ যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর কোন সময়ের সাথে নির্দিষ্ট না করে দরূদ পড়া সার্বিকভাবে ফরয; কেননা আল্লাহ তা'আলা তার উপর দরূদ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ইমাম ও আলেমগণ তা ওয়াজিব বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এবং এর উপর তারা একমত হয়েছেন'।

৬. ইতিপূর্বে প্রথম পরিচ্ছেদের শুরুতে বর্ণিত তার ব্যাপারে যে সমস্ত মহান গুণাবলী, সুমহান বৈশিষ্ট্য, সুউচ্চ সম্মান ও মর্যাদা সাব্যস্ত হয়েছে ও এতদ্ব্যতীত আরো যা কিছু কুরআন ও সুন্নার দলীল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, সেগুলির স্বীকৃতি প্রদান করা, এ সবগুলোর উপর বিশ্বাস করা, এগুলো দিয়ে তার প্রশংসা করা, মানুষের কাছে প্রচার ও প্রসার করা, ছোটদেরকে তা শিক্ষা দেয়া এবং তাকে ভালবাসা, সম্মান করা এবং মহান আল্লাহর কাছে তার যে বিশেষ উচ্চ মর্যাদা রয়েছে সেগুলো তাদেরকে জানানোর মাধ্যমে তাদেরকে গড়ে তোলা।

৭. উপরোক্ত মর্যাদা ও সম্মানের বর্ণনায় বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন না করা এবং তা থেকে সাবধান থাকা; কেননা এর মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সবচেয়ে বেশী কষ্ট দেয়া হবে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে উম্মাতের উদ্দেশ্যে এ ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন যে,
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَى أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا (الكهف : ١١٠).
"বলুনঃ আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষই, আমার প্রতি ওহী আসে যে, তোমাদের মা'বুদ মাত্র একজন, সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে ও তার প্রতিপালকের 'ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে”। [সূরা আল- কাহফঃ১১০]

আরো নির্দেশ দিয়েছেন যে,
قُلْ لَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكُ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ ۚ (الأنعام: ٥٠).
"বলুনঃ আমি তোমাদেরকে এটা বলিনা যে, আমার নিকট আল্লাহর ধনভান্ডার আছে, গায়েব সম্পর্কেও আমি অবগত নই আর তোমাদেরকে এটাও বলিনা যে, আমি ফেরেস্তা, আমার প্রতি যা ওহী আসে আমি শুধু তারই অনুসরণ করি"। [সূরা আল-আন'আমঃ ৫০]

সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার উম্মাতের প্রতি এ কথার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল, রবুবীয়্যাহ তথা প্রভুত্ব জনিত গুণাগুণের কিছুই তার মধ্যে নেই। আবার তিনি ফিরিস্তাও নন, তিনি তো কেবলমাত্র তার প্রভুর নির্দেশ ও ওহীর অনুসরণ করেন। অনুরূপভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তার উম্মাতকে তার ব্যাপারে অতিরঞ্জন এবং তার প্রশংসা ও মান মর্যাদা নির্ধারণে সীমালংঘন করার ব্যাপারে সাবধান করে গেছেন; সহীহ বুখারীতে উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ
(لا تطروني كما أطرت النصارى ابن مريم فإنما أنا عبده، فقولوا: عبدالله ورسوله)
"নাসারাগণ যেমন করে ইবনে মারইয়াম ('ঈসা)র অতিরিক্ত প্রশংসা করে সীমালংঘন করেছে তেমনিভাবে তোমরা আমার অতিরিক্ত প্রশংসা করে সীমালংঘন করো না; কেননা আমি তো তাঁর বান্দা। সুতরাং তোমরা বলঃ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল"¹。

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সীমাতিরিক্ত প্রশংসা বুঝাতে যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন তা হলোঃ الإطراء যার অর্থ বর্ণনায় ইবনুল আসীর বলেনঃ 'মিথ্যা প্রশংসা এবং প্রশংসায় সীমালংঘন করা'।

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ এক লোক নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসল, তারপর তার সাথে কথাবার্তার এক পর্যায়ে বললঃ 'যা আল্লাহ চেয়েছেন এবং আপনি চেয়েছেন'! উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ
(أجعلتني الله نداً بل ما شاء الله وحده)
"তুমি কি আমাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়েছ? বরং (সঠিক হলো) একমাত্র আল্লাহ যা চেয়েছেন”²。

সুতরাং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ব্যাপারে অতিরঞ্জন ও তাকে তার সুনির্দিষ্ট মর্যাদার উপরে এমন স্থান দেয়া যা মহান রাব্বুল আলামীনের জন্য নির্দিষ্ট, তা থেকে সাবধান করে গেছেন। এর মাধ্যমে তিনি উল্লেখিত বিষয়াদি ছাড়া অন্যান্য যাবতীয় সীমালংঘন জনিত বিষয়সমূহের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন; কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় সীমালংঘন বা অতিরঞ্জনই হারাম।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সংশ্লিষ্ট যে সমস্ত অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি শির্কের পর্যায়ে পৌঁছে দেয় তন্মধ্যে রয়েছেঃ তার কাছে দো'আ করা, এভাবে বলা যে, হে আল্লাহর রাসূল! আমায় এরকম এরকম করে দিন; কেননা এটা দো'আ, আর দো'আ হলো ইবাদাত যা আল্লাহ ব্যতীত অপর কারো উদ্দেশ্যে করা জায়েয নেই।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সংশ্লিষ্ট, সে সমস্ত অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ির মধ্যে আরো কিছু উদাহরণ হলোঃ তার উদ্দেশ্যে যবেহ করা, তার জন্য মানত করা, তার কবরের তাওয়াফ করা, তার কবরকে সালাত বা ইবাদাতের জন্য ক্বিবলা হিসাবে নির্ধারণ করা, সুতরাং এ সবগুলিই হারাম; কেননা তা ইবাদাত, আর আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি জগতের কারো উদ্দেশ্যে কোন প্রকার ইবাদাত করতে নিষেধ করেছেন, মহান আল্লাহ বলেনঃ
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ * لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ ﴾ (الأنعام: ١٦٢، ١٦٣).
"বলুনঃ আমার সালাত, আমার ইবাদাত (কুরবানী ও হজ্জ), আমার জীবন ও আমার মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর উদ্দেশ্যেই, তাঁর কোন শরীক নেই। আর আমি এর জন্যই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি প্রথম মুসলমান”। [সূরা আল-আন'আমঃ ১৬২-১৬৩]

৮. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অধিকারসমূহের অন্যতম হচ্ছে তার সাহাবীগণকে ভালবাসা, তার পরিবার-পরিজন ও স্ত্রীগণকে শ্রদ্ধা করা, তাদেরকে বন্ধু ও মিত্র বলে মেনে নেয়া। তাদেরকে অসম্মানিত করা, গালি-গালাজ করা বা তাদের কারোর প্রতি কটাক্ষ করা থেকে দুরে থাকা।

কেননা মহান আল্লাহ এ উম্মাতের উপর তাঁর নবীর সাহাবীদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা ওয়াজিব করে দিয়েছেন এবং যারা তাদের পরে আসবে তাদের উপর সাহাবাদের জন্য ইস্তেগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করার এবং সাহাবাদের ব্যাপারে তাদের অন্তরে কোন প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ না রাখার জন্য আল্লাহর কাছে দো'আ করার আহবান জানিয়েছেন। তাই তিনি মুহাজির ও আনসারদের কথা উল্লেখ করার পর বললেনঃ
وَالَّذِينَ جَاءُو مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا عَلَالِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ ﴾ (الحشر : ١٠)
"আর যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে, 'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা কর এবং মু'মিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে বিদ্বেষ রেখোনা। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি অত্যন্ত দয়ালু, রহমতকারী'"। [সূরা আল-হাশরঃ ১০]

আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আত্মীয়-স্বজন ও পরিবার-পরিজনদের অধিকার সম্পর্কে আরো বলেনঃ
قُلْ لَا أَسْلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى (الشورى:۲۳)
"বলুনঃ আমি এর বিনিময়ে তোমাদের নিকট হতে আত্মীয়দের প্রতি সৌহার্দ্য ব্যতীত অন্য কোন প্রতিদান চাইনা”। [সূরা আশ-শূরাঃ ২৩]

এ আয়াতের তাফসীরে এসেছেঃ 'আপনার অনুসরণ করে এমন মু'মিনদের বলুনঃ আমি তোমাদের কাছে যা নিয়ে এসেছি তার বিনিময়ে কোন প্রতিদান চাইনা তবে তোমাদের কাছে আমার আত্মীয়দের জন্য ভালবাসা চাইব'।

সহীহ মুসলিমে যায়েদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের মাঝে ভাষণ দিতে দাঁড়িয়ে বললেনঃ
(أما بعد ألا أيها الناس فإنما أنا بشر يوشك أن يأتي رسول ربي فأجيب وأنا تارك فيكم ثقلين: أولهما كتاب فيه الهدى والنور. فخذوا بكتاب الله واستمسكوا به. فحث على كتاب الله ورغب فيه ثم قال: (وأهل بيتي أذكركم الله في أهل بيتي. أذكركم الله في أهل بيتي، أذكركم الله في أهل بيتي)¹
"তারপর, সাবধান হে মানব সম্প্রদায়! আমি তো কেবলমাত্র একজন মানুষ, অচিরেই আমার কাছে আমার প্রভুর কাছ থেকে দূত আসলে তার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যাব। কিন্তু আমি তোমাদের মাঝে দু'টি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছিঃ তার একটি হলোঃ কুরআন যাতে রয়েছে হিদায়াত এবং আলো। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কিতাবকে গ্রহণ করবে এবং দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকবে"। তার পর তিনি আল্লাহর কিতাব তথা কুরআনের উপর জোর দিলেন এবং এ ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহিত করলেন, তারপর বললেনঃ "আর আমার পরিবার-পরিজন, আমি তোমাদেরকে আমার পরিবার-পরিজন সম্পর্কে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আমি তোমাদেরকে আমার পরিবার-পরিজন সম্পর্কে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আমি তোমাদেরকে আমার পরিবার-পরিজন সম্পর্কে আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি”।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তার পরিবার-পরিজনের নিকটতম সম্পর্ক থাকায় ও তাদের সম্মানের কারণে তিনি তাদের সাথে ইহসান তথা সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করার এবং তাদের সম্মান, মান-মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে জানার নির্দেশ দিয়েছেন।

অনুরূপভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন, তাদেরকে গালি-গালাজ এবং তাদের সম্মানহানি করা থেকে নিষেধ করেছেন। আবু সা'ঈদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ
(لا تسبوا أصحابي فلو أن أحدكم أنفق مثل أحد ذهبا ما بلغ مد أحدهم ولا نصيفه).
"তোমরা আমার সাহাবাদের গালি দিওনা; কেননা তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পাহাড়ের পরিমাণ স্বর্ণও ব্যয় কর তাহলেও তা তাদের এক মুদ বা তার অর্ধেক ব্যয় করার মত হবে না"²। হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

আর এজন্যই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের সবচেয়ে বড় মূলনীতি-যার উপর তাদের ঐক্যমত সাব্যস্ত হয়েছে- তা হচ্ছেঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাদেরকে, তার আত্মীয় স্বজন ও পরিবার পরিজনদেরকে ভালবাসা। তারা তাদের ব্যাপারে কোন প্রকার কটাক্ষ করাকে কেবলমাত্র বক্রতা ও ভ্রষ্টতা বলে গণ্য করে।

আবু যুর'আহ্ বলেনঃ 'যখন তুমি কোন লোককে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন সাহাবী সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করতে দেখবে তখন তুমি বুঝতে পারবে যে সে একজন যিন্দীক।

ইমাম আহমাদ বলেনঃ 'যখন তুমি কোন লোককে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন সাহাবী সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করতে দেখবে তখন তার ইসলাম সম্পর্কে সন্দেহ কর'।

উম্মাতের উপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে সকল অধিকার রয়েছে তার কিছু অংশ অত্যন্ত সংক্ষেপে বর্ণিত হলো। আল্লাহ তা'আলা আমাদের এবং আমাদের অন্যান্য ভাইদেরকে এগুলো আদায় করার ও এগুলোর উপর আমল করার জন্য সঠিক পথ দেখান এ দো'আই করি।

তৃতীয়তঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখা যে সত্য তার বর্ণনাঃ
রাসূলের সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখা সম্ভব এবং যে তাকে স্বপ্নে দেখল সে বাস্তবিকই তাকে দেখল (অন্য কাউকে নয়)।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেনঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
(من رآني في المنام فقد رآني. فإن الشيطان لا يتمثل بي)
“যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল সে অবশ্যই আমাকে দেখেছে; কেননা শয়তান আমার মত রূপ ধারণ করতে সক্ষম নয়”¹। হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

ইমাম বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে অন্য শব্দে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এসেছে, তিনি বলেছেনঃ
(من رآني في المنام فسيراني في اليقظة، ولا يتمثل الشيطان بي)¹
"যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল সে অবশ্যই আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখতে পাবে; আর শয়তান আমার রূপ ধারণ করতে পারে না'। বুখারী বলেনঃ ইবনে সীরীন বলেছেনঃ তার অর্থ 'যদি তাঁকে তার নিজস্ব আকৃতিতে দেখতে পায়'।

অনুরূপভাবে জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ
(من رآني في النوم فقد رآني فإنه لا ينبغي للشيطان أن يتشبه بي)
"যে আমাকে স্বপ্নে দেখবে সে অবশ্যই আমাকে দেখতে পেল; কেননা শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে সক্ষম নয়”²। ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেন।

এ সমস্ত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, স্বপ্নে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখা সঠিক এবং তাকে দেখতে পেলে তার দেখা বাস্তব; কেননা শয়তান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আকৃতি গ্রহণ করতে পারে না। তবে এ ব্যাপারে অবশ্যই সাবধান হতে হবে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখা ঐ সময়ে বিশুদ্ধ বলে পরিগণিত হবে, যখন সে রাসূলের বাস্তব যে সমস্ত গুণাগুণ বর্ণিত হয়েছে তদনুযায়ী তাকে দেখতে পাবে। যেমনটি পূর্বে সহীহ বুখারী থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। আর এ জন্যই ইমাম বুখারী হাদীসটি উল্লেখের পর রাসূলকে কিভাবে দেখলে বাস্তবিক তাকে দেখেছে বলে সাব্যস্ত হবে তার ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে সীরীনের ভাষ্য উল্লেখ করেছিলেন। এর সমর্থন পাওয়া যায় 'আসেম ইবনে কুলাইবের বর্ণনায় হাকিম কর্তৃক চয়নকৃত হাদীসে, তিনি বলেনঃ আমার পিতা আমার কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেনঃ আমি ইবনে আব্বাসকে বললামঃ আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখেছি, তিনি বললেনঃ তুমি তাকে কি রকম দেখেছ তা বর্ণনা কর, তিনি বললেনঃ আমি হাসান ইবনে আলীর উল্লেখ করে বললামঃ তার মত দেখেছি, তিনি বললেনঃ অবশ্যই হাসান ইবনে আলী রাসূলের আকৃতি সম্পন্ন ছিল"³। ইবনে হাজার বলেনঃ এর সনদ উত্তম।

আইয়ূব বলেনঃ 'মুহাম্মাদ অর্থাৎ ইবনে সীরীনের কাছে যখন কেউ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছি বলে দাবী করত, তিনি তাকে বলতেনঃ যাকে দেখেছ তার বর্ণনা দাও, যদি সে লোক তাকে অপরিচিত কোন গুণে বর্ণনা করত তিনি বলতেনঃ তুমি তাকে দেখনি'। ইবনে হাজার তার ফাতহুলবারীতে বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেনঃ এর সনদ বিশুদ্ধ।

তবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীঃ
(من رآني في المنام فسيراني في اليقظة)
“যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল সে অবশ্যই আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখতে পাবে” এ হাদীসে বর্ণিত জাগ্রত অবস্থার ব্যাখ্যায় আলেমগণ বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তম্মধ্যে তিনটি মত বেশী বিখ্যাতঃ

একঃ এটা উপমা ও উদাহরণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মুসলিম শরীফে আবু হুরায়রা হতে এক বর্ণনায় এসেছে "ধারণা করুক যেন সে আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখতে পেল” এর প্রমাণ হিসাবে উল্লেখ্য।

দুইঃ এটা তার যুগের লোকদের যারা তাকে দেখার আগে তার উপর ঈমান এনেছিল তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট।

তিনঃ সে দেখা ক্বিয়ামতের দিন সম্পন্ন হবে। সুতরাং কেউ তাকে স্বপ্নে দেখলে তা তার জন্য বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসাবে বিবেচিত হবে তাদের উপর যারা তাকে স্বপ্নে দেখতে পায়নি। আর আল্লাহ তা'আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

টিকাঃ
¹ ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেন (হাদীস নং ৫২৩)。
² ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন (হাদীস নং ১৫৩)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৫৩৫), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২৮৬), শব্দ চয়ন বুখারী থেকে。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৪৯৮১), মুসলিম (হাদীস নং ১৫২)。
¹ হাদীসটি ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদে বর্ণনা করেন (৪/৪৪৭), তিরমিযী (৫/২২৬), এবং বলেছেন হাদীসটি হাসান। হাকিমও তার মুস্তাদরাকে বর্ণনা করে সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন, আর ইমাম যাহাবী তা সমর্থন করেছেন。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৬৫২৮), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২১)。
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২৭৮)। পূর্বেও এ হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে, পৃঃ নং ২৩১。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৩৪০), মুসলিম (হাদীস নং ১৯৩)。
¹হাদীসটি তিরমিযী বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, হাসান সহীহ, (৫/৫৮৭ হাদীস নং ৩৬১৪), ইমাম আহমাদ তার মুসনাদের (৩/২) ও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন。
²মুসলিম (হাদীস নং ৩৮৪)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ২৫), মুসলিম (হাদীস নং ২২)。
² সুনান ইবনে মাজাহ, মুকাদ্দিমাহঃ (১/৪, হাদীস নং ৫)。
¹ হাদীসটি ইমাম মুসলিম জাবির ইবনে عبدالله থেকে বর্ণিত বিদায় হজ্জের বর্ণনায় উল্লেখ করেন (হাদীস নং ১২১৮)。
² হাদীসটি ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে (৫/১৫৩) বর্ণনা করেন。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ১৫), মুসলিম (হাদীস নং ৪৪)。
¹ হাদীসটি ইমাম বুখারী উবাইদুল্লাহ ইবনে হিশামের বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করেন। (হাদীস নং ৬৬৩২)。
¹ হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন (হাদীস নং ৩৮৪)。
² হাদীসটি ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেন, (৫/৫৫১, হাদীস নং ৩৫৪৬) এবং হাসান সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন। অনুরূপভাবে ইমাম আহমাদও হাদীসটি তার মুসনাদে (১/২০১) এ বর্ণনা করেছেন。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৪৪৫), অনুরূপভাবে ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে (১/২৩) ও উল্লেখ করেছেন。
² হাদীসটি ইমাম আহমাদ তার মুসনাদ (১/২১৪) বর্ণনা করেছেন, ইবনে মাজাহ্ তার সুনানেও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন (হাদীস নং ২১১৭)。
¹ সহীh মুসলিম (হাদীস নং ২৪০৮)。
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৬৭৩), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৫৪১)। তবে শব্দ চয়ন ইমাম বুখারীর。
¹সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২৬৬)。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৬৯৯৩), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২৬৬)。
² সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২৬৮)。
³ আল মুস্তাদরাক (৪/৩৯৩), তিনি তা বিশুদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন, আর ইমাম যাহাবী তা সমর্থন করেছেন。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00