📄 রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়নের হুকুম ও এর দলীল
আল্লাহর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়ন এ দ্বীনের যে সকল শিরোধার্য বিষয়সমূহ রয়েছে তার একটি এবং ঈমানেরও একটি মহান রুকন। কুরআন ও সুন্নার দলীলসমূহ এ ব্যাপারে প্রমাণ বহন করছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
ا مَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلِّ مَنَ بِاللهِ وَمَلَيْكَتِهِ وَكُتُبِهِ رسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا (البقرة: ٢٨٥) وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ
“বলুন, রাসূল ঈমান এনেছেন তার প্রতি তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে এবং মু'মিনগণও। তাদের সকলে আল্লাহ, তাঁর ফিরিস্তাগণ, তাঁর গ্রন্থসমূহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান এনেছে। তারা বলে, আমরা তাঁর রাসূলগণের কারো মধ্যে কোন তারতম্য করি না। আর তারা বলে, আমরা শুনেছি ও মেনে নিয়েছি"। [সূরা আল-বাকারাহ : ২৮৫]
ঈমানের যে সকল রুকনসমূহের প্রতি রাসূল ও মু'মিনগণ ঈমান এনেছিলেন সে সবের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা এখানে রাসূলগণের প্রতি ঈমানের বিষয়টি উল্লেখ করলেন এবং এ কথা বর্ণনা করলেন যে, রাসূলগণের প্রতি ঈমানের ক্ষেত্রে তারা তাদের মধ্যে এমন তারতম্য সৃষ্টি করে না, যাতে তাদের কয়েকজনকে বাদ দিয়ে অন্য কয়েকজনের প্রতি তারা ঈমান আনবে। বরং তারা তাদের সকলের প্রতিই বিশ্বাস স্থাপন করে।
রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়নকে যারা পরিত্যাগ করে আল্লাহ স্বীয় গ্রন্থে তাদের হুকুম বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَنْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا * أُولَئِكَ هُمُ الكَفِرُونَ حَقًّا ) (النساء: ١٥٠-١٥١)
"নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে (ঈমানে) পার্থক্য সূচিত করতে চায় এবং বলে, আমরা কতকের উপর ঈমান আনি এবং কতেককে অস্বীকার করি। আর তারা এর মাঝামাঝি একটা পথ অবলম্বন করতে চায়। এরাই প্রকৃত কাফির"। [সূরা আন-নিসা: ১৫০-১৫১]
যে ব্যক্তি রাসূলগণকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে অথবা তাদের কয়েকজনের প্রতি ঈমান এনে এবং কয়েকজনকে অস্বীকার করে তাদের মধ্যে তারতম্য সৃষ্টি করে তার ক্ষেত্রে আল্লাহ কুফ্র শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অতঃপর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, এরাই প্রকৃত কাফির অর্থাৎ কুফ্র বাস্তবায়িত হয়েছে এবং স্পষ্টভাবে নিশ্চিত হয়েছে। আবার এর বিপরীতে আল্লাহ একই প্রসঙ্গে ঈমানদারগণ যে বিশ্বাসের উপর রয়েছে তা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন:
وَالَّذِينَ آمَنُوا بِاللهِ وَرُسُلِهِ وَلَمْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ أُولَئِكَ سَوْفَ يُؤْتِيهِمْ أَجُورَهُمْ وَكَانَ اللهُ غَفُورًا رَحِيمًا (النساء: ١٥٢)
"আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনে এবং তাদের একের সাথে অপরের পার্থক্য করে না, অচিরেই তাদেরকে তিনি তাদের পুরস্কার দেবেন। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়”। [সূরা আন-নিসা: ১৫২]
তিনি তাদের এ গুণ বর্ণনা করেছেন যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর সকল রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনে, রাসূলগণের কারো উপর ঈমান এনে ও কাউকে অস্বীকার করে তাদের মধ্যে কোন তারতম্য সৃষ্টি না করেই। তারা শুধু এ বিশ্বাসই পোষণ করে যে, এরা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে প্রেরিত।
কুরআন যেরূপ প্রমাণ বহন করছে একইভাবে সুন্নাও এ বিষয়ে প্রমাণ বহন করছে যে, রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়ন ঈমানেরই একটি রুকন। এ বিষয়ে 'ফিরিস্তাদের প্রতি ঈমান' এর পরিচ্ছেদে স্পষ্ট বক্তব্যসহ পূর্বোল্লেখিত হাদীসে জিবরীল প্রমাণ বহন করছে। তাতে রয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈমান সম্পর্কে জিবরীল আলাইহিস সালামের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন:
أَنْ تُؤْمِنَ بِاللهِ وَمَلائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ...
"তা হল আল্লাহ, তাঁর ফিরিশতাগণ, তাঁর গ্রন্থসমূহ, তাঁর রাসূলগণ ও আখিরাতের প্রতি আপনার ঈমান আনয়ন....."¹ আল-হাদীস। তিনি এখানে রাসূলগণের প্রতি ঈমানকে ঈমানের অন্যান্য রুকনসমূহের সাথে উল্লেখ করেছেন যা বাস্তবায়ন করা এবং বিশ্বাস করা মুসলমানদের কর্তব্য।
রাতে তাহাজ্জুদ নামায আদায়কালে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দো'আর মধ্যে বলতেন:
اللهم لك الحمد أنت نور السموات والأرض، ولك الحمد أنت قيم السموات والأرض، ولك الحمد أنت رب السموات والأرض ومن فيهن، أنت الحق، ووعدك الحق، وقولك الحق، ولقاؤك الحق، والجنة حق، والنار حق، والنبيون حق، والساعة حق..
"হে আল্লাহ আপনার জন্যই সকল প্রশংসা, আপনি আকাশসমূহ ও যমীনের জ্যোতি। আপনার জন্যই সকল প্রশংসা, আপনি আকাশসমূহ ও যমীনের ধারক। আপনার জন্যই সকল প্রশংসা, আপনি আকাশসমূহ ও যমীন এবং এতদুভয়ে যারা রয়েছে তাদের প্রতিপালক। আপনি সত্য, আপনার ওয়াদা সত্য, আপনার কথা সত্য, আপনার সাক্ষাত সত্য, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, নবীগণ সত্য, কিয়ামাত সত্য..."¹。
অতএব নবীগণ যে সত্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ সাক্ষ্য আল্লাহর প্রতি, জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্বের প্রতি এবং কিয়ামাত সংঘটিত হওয়ার ন্যায় ঈমানের মহান যে সব মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছে তারই অন্তর্গত। আর তার দো'আয় ও রাতের কিয়ামে তা পেশ করাই রাসূল ও আম্বিয়াগণের প্রতি ঈমানের গুরুত্ব ও দ্বীনে এ ঈমানের মর্যাদার প্রমাণ বহন করছে।
অতএব এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে গেল যে, রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়ন অপরিহার্য, এ দ্বীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভসমূহের অন্তর্গত এবং ঈমানের সবচেয়ে মহান বৈশিষ্ট্যসমূহের একটি। আর যে ব্যক্তি রাসূলগণকে কিংবা তাদের কোন একজনকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে সে ঈমানের এ মহান রুকনটিকে অস্বীকারের মাধ্যমে মহান আল্লাহর প্রতি স্পষ্ট কুফরে লিপ্ত কাফির।
রাসূলগণের প্রতি ঈমানের ফলাফল :
রাসূলগণের প্রতি ঈমানের ব্যাপারটি নিশ্চিত হলে মু'মিন ব্যক্তির উপর তা অনেক উত্তম প্রভাব এবং সুন্দর ফলাফল রেখে যায়। তম্মধ্যে রয়েছেঃ
১. সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর তা'আলার করুণা ও অনুগ্রহ সম্পর্কে জ্ঞানার্জন; কেননা তিনি হেদায়াত ও দিক নির্দেশনা দেয়ার জন্য তাদের কাছে ঐ সকল সম্মানিত রাসূলগণকে প্রেরণ করেছিলেন।
২. এ বিশাল নেয়ামত লাভের ফলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।
৩. রাসূলগণকে ভালবাসা, সম্মান করা ও তাদের মর্যাদা অনুযায়ী তাদের প্রশংসা জ্ঞাপন; কেননা তারা আল্লাহ তা'আলার রাসূল এবং তাঁর বান্দাদের সারাংশ। এছাড়াও তারা সৃষ্টির কাছে আল্লাহর বাণী প্রচার ও স্বীয় জাতির লোকদেরকে নসীহত করার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তাদের কষ্টদানের উপর ধৈর্য ধারণ করেছেন।
টিকাঃ
¹ দেখুন পৃঃ ১৪২-১৪৪。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৭৪৯৯)
📄 নবী ও রাসূলের সংজ্ঞা এবং উভয়ের মধ্যকার পার্থক্য
অভিধানে 'নবী' শব্দটি আরবী النبأ থেকে গৃহীত, যার অর্থ হল বড় উপকারী সংবাদ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿عَمَّ يَتَسَاءَلُونَ عَنِ النَّبَا الْعَظِيمِ﴾ (النبا : ১-২)
"এরা একে অপরের নিকট কি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করছে? সেই মহাসংবাদ সম্পর্কে"। [সূরা আন-নাবা : ১-২]
আর নবীকে এজন্যই নবী বলা হয় যে, তিনি আল্লাহর পক্ষ হতে সংবাদপ্রাপ্ত ও আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ প্রদান করেন। তিনি তাই সংবাদপ্রাপ্ত ও সংবাদদাতা।
কেউ কেউ বলেন, নবী النياوة থেকে গৃহীত, যার অর্থ হল উঁচু বস্তু। এ অর্থে নবীকে নবী এজন্যই বলা হয়েছে যে, সকল মানুষের চেয়ে তার মর্যাদা উচ্চে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَرَفَعْنَهُ مَكَانًا عَلِيًّا﴾ (مريم : ٥٧)
"আমরা তাকে উন্নীত করেছিলাম উচ্চ মর্যাদায়”। [সূরা মারইয়াম: ৫৭]
আর 'রাসূল' শব্দটি আরবী الإرسال থেকে গৃহীত, যার অর্থ প্রেরণ করা, পাঠানো। আল্লাহ তা'আলা সাবা' জাতির রাণী সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন:
﴿وَإِنِّي مُرْسِلَةٌ إِلَيْهِم بِهَدِيَّةٍ فَنَاظِرَةٌ بِمَ يَرْجِعُ الْمُرْسَلُونَ﴾ (النمل: ٣٥)
"আমি তাদের নিকট উপঢৌকন পাঠাচ্ছি। দেখি, দূতেরা কি নিয়ে ফিরে আসে”। [সূরা আন-নামল: ৩৫]
ওলামাগণ নবী ও রাসূল এ দু'টোর প্রত্যেকটির শরয়ী সংজ্ঞার ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। অনেকগুলো মতের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী মত হলঃ
নবী হলেন তিনি যার কাছে আল্লাহ এমন বিষয়ে ওহী প্রেরণ করেছেন যা তিনি নিজে করবেন ও মু'মিনদেরকে করার নির্দেশ দেবেন।
আর রাসুল হলেন ঐ ব্যক্তি যার কাছে আল্লাহ ওহী প্রেরণ করেছেন এবং আল্লাহর নির্দেশ অমান্যকারী ব্যক্তির কাছে তাকে পাঠিয়েছেন যাতে তিনি আল্লাহর রিসালাত পৌঁছিয়ে দেন।
এতদুভয়ের মধ্যে পার্থক্য:
নবী হলেন ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তাঁর আদেশ ও নিষেধের সংবাদ জানিয়ে দেন যাতে তিনি মু'মিনদেরকে সম্বোধন করেন ও সে অনুযায়ী নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি কাফিরদেরকে সম্বোধন করেন না এবং তাদের কাছে প্রেরিতও হন না।
অন্যদিকে রাসূল হলেন সে ব্যক্তি যাকে কাফির এবং মু'মিন সকলের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে যাতে তিনি তাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দেন ও তাদেরকে আল্লাহর ইবাদাত করার প্রতি আহ্বান করেন।
রাসূলের জন্য এমন শর্ত নেই যে, তিনি নতুন কোন শরীয়ত নিয়ে আসবেন; কেননা ইউসুফ ছিলেন ইব্রাহীমের দ্বীনের উপর, আর দাউদ ও সুলাইমান দু'জনই ছিলেন তাওরাতের শরীয়তের উপর, অথচ এরা প্রত্যেকেই ছিলেন রাসূল। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَ لَقَدْ جَآءَكُمْ يُوسُفُ مِنْ قَبْلُ بِالْبَيِّنَتِ فَمَا زِلْتُمْ فِى شَكٍّ مِّمَّا جَآءَكُمْ بِهِ حَتَّى إِذَا هَلَكَ قُلْتُمْ لَّنْ يَّبْعَثَ اللهُ مِنْ بَعْدِهِ رَسُولًا (غافر: ٣٤)
"পূর্বেও তোমাদের নিকট ইউসুফ এসেছিলেন স্পষ্ট নিদর্শনসহ; কিন্তু তিনি তোমাদের নিকট যা নিয়ে এসেছিলেন তোমরা তাতে সর্বদা সন্দেহ পোষণ করতে। পরিশেষে যখন ইউসুফের মৃত্যু হল তখন তোমরা বলেছিলে, 'তার পরে আল্লাহ আর কোন রাসূল প্রেরণ করবেন না'। [সূরা গাফির: ৩৪]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّنَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَوْحَيْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَعِيلَ وَإِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَعِيسَى وَأَيُّوبَ وَيُونُسَ وَهُرُونَ وَسُلَيْمَنَ وَاتَيْنَا دَاوُدَ زَبُورًا * وَرُسُلًا قَدْ قَصَصْتُهُمْ عَلَيْكَ مِنْ قَبْلُ وَرُسُلًا لَّمْ نَقْصُصُهُمْ عَلَيْكَ وَكَلَّمَ اللهُ مُوسَى تَعْلِيمًا
(النساء: ١٦٣-١٦٤)
“আমরা আপনার নিকট ওহী প্রেরণ করেছিলাম, যেমন নূহ ও তাঁর পরবর্তী নবীগণের প্রতি ওহী প্রেরণ করেছি। ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁর বংশধরগণ, ঈসা, আইয়ুব, ইউনুস, হারুন ও সুলাইমানের নিকটও ওহী প্রেরণ করেছিলাম। আর দাউদকে প্রদান করেছিলাম যাবুর। অনেক রাসূলের কথা আমরা আপনাকে পূর্বে বলেছি এবং অনেক রাসূল যাদের কথা আপনাকে বলিনি। আর মুসার সাথে আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে কথা বলেছিলেন”। [সূরা আন-নিসা : ১৬৩-১৬৪]
কখনো নবীর ক্ষেত্রে রাসূল শব্দ ব্যবহার করা হয়। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন :
وَ مَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ وَلَا نَبِيَّ إِلَّا إِذَا تَمَنَّى أَلْقَى الشَّيْطَانُ فِي أُمْنِيَّتِهِ (الحج : ৫২)
“আর আমরা আপনার পূর্বে যে রাসূল কিংবা নবী প্রেরণ করেছি তাদের কেউ যখনই (ওহীর কিছু) তেলাওয়াত করেছে তখনই শয়তান তাদের তেলাওয়াতে (কিছু) নিক্ষেপ করেছে”। [সূরা আল-হাজ্জ : ৫২]
মহান আল্লাহ এখানে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি নবী ও রাসূল প্রেরণ করেন। এর বিবরণ হল এই যে, আল্লাহ তা’আলা নবীকে কোন একটি বিষয়ের দিকে মুমিনদেরকে আহ্বান করার নির্দেশ প্রদান করেন। অতএব তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের প্রতি প্রেরিত। কিন্তু এ প্রেরণ সীমাবদ্ধ ও নির্দিষ্ট। আর ব্যাপক প্রেরণ হল রাসূলগণকে মুমিন ও কাফিরসহ সৃষ্টির সকলের প্রতি প্রেরণ করা।
📄 রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়নের পদ্ধতি
রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়নের অর্থ হল আল্লাহ স্বীয় গ্রন্থে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সুন্নায় সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিতভাবে তাদের সম্পর্কে যে সংবাদ দিয়েছেন সেগুলোকে বিশ্বাস করা।
আর (তাদের প্রতি) সংক্ষিপ্ত ঈমান হল:
এ বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ যে, আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন যিনি তাদেরকে আহ্বান করেন একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করার প্রতি যার কোন শরীক নেই এবং আল্লাহর পরিবর্তে যা কিছুর ইবাদাত করা হয় তা অস্বীকার করার প্রতি। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُونَ ﴾ (النحل: ٣٦)
"আর অবশ্যই আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল প্রেরণ করেছি (এ নির্দেশ দিয়ে) যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর”। [সূরা আন-নাহ্লঃ ৩৬]।
আর এ দৃঢ় বিশ্বাস পোষণও যে, তারা সকলেই ছিলেন সত্যবাদী, পুণ্যবান, বুদ্ধিমান, সম্মানিত, সদাচারী, মুত্তাকী, বিশ্বস্ত, সুপথ প্রদর্শক ও সুপথপ্রাপ্ত। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿هذَابًا وَعَدَ الرَّحْمَنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُونَ (يس: ٥٢)
"দয়াময় (আল্লাহ) তো এরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্যই বলেছিলেন”। [সূরা ইয়াসীনঃ৫২]
আল্লাহ তা'আলা বড় এক দল নবী ও রাসূলগনের কথা উল্লেখ করার পর বলেন:
﴿وَمِنْ بابِهِمْ وَذُرِّيَّتِهِمْ وَإِخْوَانِهِمْ وَاجْتَبَيْنَهُمْ وَهَدَيْنَهُم إِلى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ * ذَلِكَ هُدَى اللهِ يَهْدِي بِهِ مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِي (الأنعام: ৮৭-৮৮)
"এবং এদের পিতৃপুরুষ, বংশধর এবং ভাইদের কতেককে, আর আমরা তাদেরকে মনোনীত করেছিলাম এবং সরল পথে পরিচালিত করেছিলাম। এটা আল্লাহর হেদায়াত, স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি এর দ্বারা সৎপথে পরিচালিত করেন”। [সূরা আল-আন'আমঃ৮৭-৮৮]
এবং এ বিশ্বাস করা যে, তারা সকলেই স্পষ্ট সত্য ও সুস্পষ্ট হেদায়াতের উপর ছিলেন। জাতির লোকদের কাছে স্বীয় প্রভুর পক্ষ থেকে তার প্রমাণ নিয়ে আগমন করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা জান্নাতবাসীদের ভাষায় তাদের কাহিনী বর্ণনা করে বলেনঃ
لَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُ رَبَّنَا بِالْحَقِّ (الأعراف: ٤٣).
"আমাদের প্রতিপালকের রাসূলগণ তো অবশ্যই সত্য নিয়ে এসেছিলেন”। [সূরা আল-আ'রাফঃ৪৩]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالبَيِّنَاتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتٰبَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ (الحديد : ٢٥)
“নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সাথে অবতীর্ণ করেছি গ্রন্থ ও ন্যায়দন্ড যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে"। [সূরা আল-হাদীদঃ২৫]
এ বিশ্বাসও রাখা যে, তাদের মূল দাওয়াত ছিলো একটিই। তা হল আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি আহ্বান। তবে তাদের শরীয়ত ছিলো বিভিন্ন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ (الأنبياء: ٢٥)
“আমরা আপনার পূর্বে যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তার প্রতি এ ওহী পাঠিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন হক্ক ইলাহ্ নেই সুতরাং আমারই ইবাদাত কর। [সূরা আল-আম্বিয়াঃ২৫]
মহান আল্লাহ আরো বলেন:
لِكُلِّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا (المائدة: ٤٨)
"তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমরা শরীয়ত ও পথ নির্ধারণ করে দিয়েছি"। [সূরা আল-মায়িদাহঃ৪৮]
আর এ বিশ্বাসও রাখা যে, তাদেরকে যে রিসালাত দিয়ে পাঠানো হয়েছিলো তারা এর সমস্তই সুস্পষ্টভাবে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে সৃষ্টির উপর হুজ্জত ও প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لِيَعْلَمَ أَنْ قَدْ أَبْلَغُوا رُسُلَتِ رَبِّهِمْ وَأَحَاطَ بِمَا لَدَيْهِمْ وَأَحْطَى كُلِّ شَيْ عَدَدًا (الجن : ۲۸)
"যেন তিনি জানেন যে, তারা তাদের প্রতিপালকের রিসালত (বাণী) পৌঁছিয়ে দিয়েছেন কিনা এবং রাসূলগণের নিকট যা আছে তা তাঁর আয়ত্বাধীন, আর তিনি সমস্ত কিছুর বিস্তারিত হিসাব রাখেন"। [সূরা আল-জ্বিনঃ২৮]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ (النساء: ١٦٥)
“সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করেছি যাতে রাসূলগণ আসার পরে আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন প্রমাণ না থাকে”। [সূরা আন-নিসাঃ১৬৫]
এ ঈমান রাখা ওয়াজিব যে, রাসূলগণ সৃষ্ট মানব ছিলেন। রুবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বের কোন বৈশিষ্ট্য তাদের ছিলো না। তারা আল্লাহর এমন বান্দাই শুধু ছিলেন যাদেরকে তিনি রিসালাত দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قَالَتْ لَهُمْ رُسُلُهُمْ إِنْ نَحْنُ إِلا بَشَرُ مِثْلُكُمْ وَلَكِنَّ اللهَ يَمُنُّ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ
(إبراهيم: (۱۱)
"তাদের রাসূলগণ তাদেরকে বলত, আমরা কেবল তোমাদের মতই মানুষ, কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন”। [সূরা ইব্রাহীমঃ১১]
আল্লাহ তা'আলা নূহ সম্পর্কে বলেনঃ
وَلَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ إِنِّي مَلَكُ (هود: (۳۱)
"আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার নিকট আল্লাহর ধনভান্ডার আছে, আর আমি গায়েবও জানি না। আমি এও বলি না যে, আমি ফিরিস্তা। [সূরা হুদঃ৩১]
মহান আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নির্দেশ দেন যেন তিনি স্বীয় জাতিকে বলেন:
قُلْ لَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ وَلَا أَقُولُ لَكُمْ إِنِّي مَلَكُ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَى (الأنعام: ٥٠)
"বলুন, আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার নিকট আল্লাহর ধনভান্ডার আছে, আর আমি গায়েবও জানি না এবং তোমাদেরকে এও বলি না যে, আমি ফিরিস্তা। আমার প্রতি যা ওহীরূপে প্রেরণ করা হয়, আমি তো শুধু তারই অনুসরণ করি। [সূরা আল-আন'আমঃ৫০]
রাসূলগণ সম্পর্কে আরো যে আক্বীদা পোষণ করা আবশ্যক তা হল তারা আল্লাহর পক্ষ হতে সাহায্য ও সহযোগিতাপ্রাপ্ত এবং তাদের ও তাদের অনুসারীদের জন্য রয়েছে সুপরিণাম। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
إِنَّا لَتَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ (غافر : ٥١)
"নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রাসূলগণ ও মু'মিনদেরকে দুনিয়ার জীবনে এবং যেদিন সাক্ষীগণ দন্ডায়মান হবে সেদিন সাহায্য করব"। [সূরা গাফিরঃ৫১]
অনুরূপভাবে রাসূলগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের তারতম্যে বিশ্বাস রাখাও আবশ্যক, যেমনটি মহান আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন স্বীয় বাণীতে:
تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِنْهُمْ مَنْ كَلَّمَ اللهُ (البقرة: ٢٥٣)
"সে রাসূলগণ তাদের একের উপর অন্যকে আমরা শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি, তাদের মধ্যে এমন কেউ রয়েছেন যাদের সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ২৫৩]
অতএব এ সব কিছু এবং রাসূলগণ সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নায় সাধারণভাবে যতকিছু এসেছে তার প্রতি সংক্ষিপ্তরূপে ঈমান রাখা ওয়াজিব।
আর (তাদের প্রতি) বিস্তারিত ঈমান হল:
তাদের মধ্য হতে যাদের নাম আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গ্রন্থে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সুন্নায় উল্লেখ করেছেন তাদের প্রতি বিস্তারিতভাবে ঈমান আনয়ন করা যেভাবে তাদের নাম, সংবাদ, মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের কথা দলীলসমূহে এসেছে।
নবী ও রাসূলগণের মধ্যে কুরআনে যাদের উল্লেখ এসেছে তারা হলেন পঁচিশ জন। তাদের মধ্যে আঠার জনের উল্লেখ এসেছে আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত বাণীতে :
وَتِلْكَ حُجَّتُنَا آتَيْنَاهَا إِبْرَاهِيمَ عَلَى قَوْمِهِ نَرْفَعُ دَرَجَتٍ مَّن نَّشَاءُ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَقَ وَيَعْقُوبَ كُلًّا هَدَيْنَا وَنُوحًا هَدَيْنَا مِن قَبْلُ وَمِن ذُرِّيَّتِهِ دَاوُدَ وَسُلَيْمَنَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى وَهَرُونَ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ * وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَى وَعِيسَى وَإِلْيَاسَ كُلٌّ مِّنَ الصَّالِحِينَ * وَإِسْمَعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوطًا وَكُلًا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ ﴿الأنعام: ٨٣-٨٦﴾
"আর এটাই আমাদের যুক্তি-প্রমাণ যা আমরা ইব্রাহীমকে দিয়েছিলাম তার জাতির মোকাবেলায়, যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় আমরা উন্নীত করি, নিশ্চয়ই আপনার প্রতিপালক প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞ। আর আমরা তাকে দান করেছিলাম ইসহাক ও ইয়া'কুব, এদের প্রত্যেককে হেদায়াত দিয়েছিলাম। পূর্বে নূহকেও আমরা হেদায়াত দিয়েছিলাম, এবং তার বংশধর দাউদ, সুলাইমান, আইয়ূব, ইউসূফ, মূসা ও হারুনকেও। আর এভাবেই আমরা সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কৃত করি। আর যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, 'ঈসা এবং ইলিয়াসকেও হেদায়াত দিয়েছিলাম। এরা প্রত্যেকেই সৎকর্মপরায়ণ ছিলেন। এবং ইসমা'ঈল, আল-ইয়াসা', ইউনুস ও লুতকেও। আর তাদের প্রত্যেককে আমরা শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম বিশ্ব জগতের উপর”। [সূরা আল-আন'আমঃ৮৩-৮৬]
আর বাকী রাসূলগণের উল্লেখ এসেছে কুরআনের অন্যান্য স্থানে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا ﴾ [الأعراف : ٦٥]
"আর আদ জাতির নিকট আমি তাদের ভাই হুদকে পাঠিয়েছিলাম”। [সূরা আল-আ'রাফঃ৬৫]
তিনি আরো বলেনঃ
وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا ﴾ [الأعراف: ۷৩]
"আর সামূদ জাতির নিকট আমি তাদের ভাই সালেহকে পাঠিয়েছিলাম”। [সূরা আল-আ'রাফঃ৭৩]
তিনি বলেন :
وَإِلَى مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا ﴾ [الأعراف: ٨٥]
"আর মাদইয়ানবাসীদের নিকট আমি তাদের ভাই শু'আইবকে পাঠিয়েছিলাম”। [সূরা আল-আ'রাফঃ৮৫]
তিনি বলেন:
إِنَّ اللهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا (آل عمران : ٣٣)
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আদম এবং নূহকে মনোনীত করেছিলেন”। [সূরা আলে ইমরানঃ৩৩]
তিনি বলেন:
وَإِسْمَاعِيلَ وَإِدْرِيسَ وَذَا الْكِفْلُ كُلُّ مِّنَ الصَّابِرِينَ (الأنبياء: ٨٥)
“এবং স্মরণ করুন ইসমা'ঈল, ইদ্রীস ও যুলকিফলের কথা, তাদের প্রত্যেকেই ছিলেন ধৈর্যশীল”। [সূরা আল-আম্বিয়াঃ৮৫]
তিনি বলেন:
مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ (الفتح : ٢٩)
“মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, তার সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল”। [সূরা আল-ফাতহঃ২৯]
সুতরাং এ নবী ও রাসূলগণের প্রতি বিস্তারিতভাবে ঈমান আনয়ন করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের ব্যাপারে যেরূপ অবহিত করেছেন সেরূপ তাদের প্রত্যেকের জন্য নবুওয়াত কিংবা রিসালাতের স্বীকৃতি প্রদান আবশ্যক।
অনুরূপভাবে যে সকল দলীলে তাদের মর্যাদা, বৈশিষ্ট্য ও সংবাদের উল্লেখ এসেছে সেগুলোর বিশুদ্ধতার প্রতি বিশ্বাস রাখা আবশ্যক। যেমন আল্লাহ কর্তৃক ইব্রাহীম ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিমা ওয়া সাল্লাম এ দু'জনকে বন্ধুরূপে গ্রহণ; কেননা আল্লাহ বলেনঃ
وَاتَّخَذَ اللهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا) (النساء: ١٢٥)
"আর আল্লাহ ইব্রাহীমকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন”। [সূরা আন-নিসাঃ১২৫]
আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
«إن الله اتخذني خليلاً كما اتخذ إبراهيم خليلاً»
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন যেভাবে ইব্রাহীমকে তিনি অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছিলেন"¹। ইমাম মুসলিম এ হাদীস সংকলন করেন।
আরো যেমন আল্লাহ তা'আলা মূসার সাথে কথা বলেছিলেন; কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَكَلَّمَ اللهُ مُوسَى تَكْلِيما (النساء : ١٦٤)
"আর আল্লাহ মূসার সাথে সুস্পষ্টভাবে কথা বলেছেন”। [সূরা আন-নিসাঃ১৬৪]।
অনুরূপভাবে পাহাড় ও পাখিদেরকে দাউদের অধীনস্ত করে দেয়া, এগুলো দাউদের তাসবীহ পাঠের সাথে তাসবীহ পাঠ করতো। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَسَخَّرْنَا مَعَ دَاوُدَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَالطَّيْرَ وَكُنَّا فَاعِلِينَ ﴿الأنبياء: ٧٩﴾
"আর আমরা পর্বত ও পাখিদেরকে দাউদের অনুগত করে দিয়েছিলাম, তারা পবিত্রতা ঘোষণা করত, আমরাই ছিলাম এ সবের কর্তা”। [সূরা আল-আম্বিয়াঃ ৭৯]
এবং দাউদের জন্য লোহাকে নরম করে দেয়া হয়, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَقَدْ آتَيْنَا دَاوُدَ مِنَّا فَضْلًا يُجِبَالُ أَوْ بِي مَعَهُ وَالطَّيْرَ وَأَلَنَّا لَهُ الحَدِيدَ ﴿سبا: ١٠﴾
"নিশ্চয়ই আমরা আমাদের পক্ষ হতে দাউদকে অনুগ্রহ করেছিলাম (এবং আদেশ করেছিলাম,) হে পর্বতমালা! তোমরা তার সাথে আমার পবিত্রতা ঘোষণা কর এবং পাখিদেরকেও (আদেশ করেছিলাম), আর তার জন্য আমরা নরম করে দিয়েছিলাম লোহাকে। [সূরা সাবাঃ১০]
আর বায়ুকে সুলাইমানের অধীনস্ত করে দেয়া হয়েছিল, তার নির্দেশে তা প্রবাহিত হতো। জ্বিনকেও তার অধীনস্ত করে দেয়া হয়, তিনি যা চাইতেন তার সামনে তারা তাই করতো। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَلِسُلَيْمَنَ الرِّيحَ غُدُوُّهَا شَهْرٌ وَرَوَاحُهَا شَهْرٌ وَأَسَلْنَا لَهُ عَيْنَ الْقِطْرِ وَمِنَ الْجِنِّ مَنْ يَعْمَلُ بَيْنَ يَدَيْهِ بِإِذْنِ رَبِّهِ ﴾ (سبا: ١٢)
"সুলাইমানের অধীন করেছিলাম বায়ুকে, যা প্রভাতে একমাসের পথ অতিক্রম করত এবং সন্ধ্যায় একমাসের পথ অতিক্রম করত। আমরা তার জন্য গলিত তামার এক ঝরণা প্রবাহিত করেছিলাম, তার প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে জ্বিনদের কেউ কেউ তার সামনে কাজ করত”। [সূরা সাবাঃ১২]
আর পাখিদের ভাষা সুলাইমানকে শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَوَرِثَ سُلَيْمَنُ دَاوُدَ وَقَالَ يَأَيُّهَا النَّاسُ عُلِّمْنَا مَنْطِقَ الطَّيْرِ وَأُوتِينَا مِنْ كُلِّ شَى (النمل : ١٦)
"আর সুলাইমান হয়েছিলেন দাউদের উত্তরাধিকারী এবং তিনি বলেছিলেন হে মানুষ! আমাদেরকে পাখিদের ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং আমাদেরকে সবকিছু দেয়া হয়েছে”। [সূরা আন-নামলঃ১৬]।
অনুরূপভাবে স্বজাতির সাথে রাসূলদের যে সব ঘটনা ও তাদের মধ্যকার যে সব ঝগড়া-বিবাদের কথা এবং রাসূলগণ ও তাদের অনুসারীদের প্রতি আল্লাহ তা'আলার যে সাহায্যের কাহিনী আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন সেগুলোর প্রতি বিস্তারিত ঈমান আনয়ন আবশ্যক। যেমন ফেরাউনের সাথে মূসার কাহিনী, স্বজাতির সাথে ইব্রাহীমের কাহিনী এবং নূহ, হুদ, সালেহ, শু'আইব, লুতের কাহিনী, আল্লাহ আমাদের কাছে ইউসুফের ভ্রাতৃবৃন্দ ও মিশরীদের সাথে ইউসুফের ব্যাপারে যা কিছু বর্ণনা করেছেন, স্বজাতির সাথে ইউনুসের কাহিনী ইত্যাদি কুরআনে নবী ও রাসূলদের আরো যে সব ঘটনার বর্ণনা এসছে এবং অনুরূপভাবে সুন্নায়ও যা এসেছে সে সব কিছুর উপর বিস্তারিত ঈমান আনা। অতএব দলীলে ঠিক যেমনটি এসেছে সে অনুসারে বিস্তারিত ঈমান রাখা ওয়াজিব।
এভাবেই রাসূলগণের প্রতি সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত ঈমান আনয়ন বাস্তবায়িত হবে। আল্লাহ তা'আলাই অধিক অবগত।
টিকাঃ
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৫৩২)
📄 রাসূলগণের প্রতি আমাদের করণীয়
উম্মাতের উপর রাসূলগণের অনেক বড় অধিকার রয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে দ্বীনের সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন করেছেন, মহান উন্নত স্তরে তাদেরকে উপনীত করেছেন, তাদের উপর মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব ন্যস্ত করে তাদেরকে সম্মানিত করেছেন, আর তাঁর ওহী ও শরীয়ত সমস্ত সৃষ্টি জগতের কাছে পৌঁছানোর জন্য তাদেরকে মনোনীত করেছেন। তাদের সে সমস্ত অধিকার সমূহের মধ্যে নিম্মলিখিতগুলো অন্যতমঃ
১. তারা যা নিয়ে এসেছে সে ব্যাপারে তাদের সবাইকে সত্য বলে বিশ্বাস করা। আরো বিশ্বাস করা যে, তারা তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়েছেন, আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে তাদেরকে যা প্রচারের নির্দেশ দিয়েছেন তা তারা যাদের কাছে প্রেরিত হয়েছেন তাদের কাছে প্রচার করেছেন এবং এ ব্যাপারে রাসূলগণের মাঝে কোন প্রকার পার্থক্য নিরূপণ না করা।
মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴾وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَّسُوْلٍ اِلَّا لِيُطَاعَ بِاِذْنِ اللهِ۬ (النساء: ٦٤).﴿
"আল্লাহর অনুমতিক্রমে রাসূলদের আনুগত্য করার জন্যই আমরা কেবলমাত্র রাসূলদের প্রেরণ করেছি”। [সূরা আন-নিসাঃ ৬৪]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ
﴾ وَاَطِيْعُوا اللّٰهَ وَاَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَاحْذَرُوْا فَإِنْ تَوَلَّيْتُمْ فَاعْلَمُوْا أَنَّمَا عَلٰى رَسُوْلِنَا الْبَلٰغُ الْمُبِيْنُ ﴿ (المائدة: ٩٢).
"আর তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর ও রাসূলের আনুগত্য কর এবং সাবধানতা অবলম্বন কর, তারপর যদি তোমরা ফিরে যাও তবে জেনে রাখ নিশ্চয়ই আমাদের রাসূলের দায়িত্ব হলো সুস্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৯২]
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
﴾ اِنَّ الَّذِيْنَ يَكْفُرُوْنَ بِاللّٰهِ وَرُسُلِهٖ وَيُرِيْدُوْنَ أَنْ يُّفَرِّقُوْا بَيْنَ اللّٰهِ وَرُسُلِهٖ وَيَقُوْلُوْنَ نُؤْمِنُ ۬ ﴿
بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا * أُولَئِكَ هُمُ الكَفِرُونَ حَقًّا (النساء: الآية ١٥٠-١٥١)
"যারা আল্লাহকে ও তাঁর রাসূলগণকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে (ঈমানের ব্যাপারে) তারতম্য করতে চায় এবং তারা বলেঃ আমরা কিছু স্বীকার করি, আর কিছু অস্বীকার করি। আর তারা এর মধ্যবর্তী কোন পথ অবলম্বন করতে চায়। তারাই প্রকৃত কাফির। [সূরা আন-নিসাঃ ১৫০-১৫১]
সুতরাং রাসূলগণ যে রিসালাত নিয়ে এসেছেন তাতে বিশ্বাস করা ওয়াজিব। মূলতঃ তাদের উপর ঈমানের দাবীও তাই।
আর এটাও জানা আবশ্যক যে, সমস্ত মানুষের জন্য প্রেরিত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পরে জ্বিন ও মানব কারো পক্ষেই পূর্ববর্তী কোন রাসূলের অনুসরণ করা জায়েয নেই; কেননা তার শরীয়তের আগমন ঘটেছে পূর্ববর্তী সমস্ত নবীর শরীয়তকে রহিত করে, ফলে আল্লাহ তাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তার বাইরে কোন দ্বীন নেই, এ সম্মানিত নবী ব্যতীত আর কারো অনুসরণ গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَسِرِينَ (آل عمران : ٨٥)
"কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ হতে কবুল করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্ন্তভুক্ত হবে। [সূরা আলে-ইমরানঃ ৮৫]
তিনি আরো বলেনঃ
وَمَا أَرْسَلْنَكَ إِلا كَافَةُ لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (سبأ : ۲۸)
"আমরা আপনাকে কেবলমাত্র সমস্ত মানুষের জন্য সুসংবাদদানকারী এবং ভয় প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করেছি, অথচ অনেক লোকরাই তা জানে না”। [সূরা সাবাঃ ২৮]
আল্লাহ আরো বলেনঃ
قُلْ يَاأَيُّهَا النَّاسُ إِنِّى رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا (الأعراف : ١٥٨).
"বলুন, হে মানব সম্প্রদায়! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর রাসূল”। [সূরা আল-আ'রাফঃ ১৫৮]
২. তাদের সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখা, তাদেরকে ভালবাসা, তাদের বিরোধিতা করা ও তাদের সাথে শত্রুতা করা থেকে বেঁচে থাকা।
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَمَنْ يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ (المائدة : ٥٦).
“আর যারা আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মু'মিনদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তাহলে আল্লাহর দল তো বিজয়ী হবেই”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৫৬]
আল্লাহ আরো বলেনঃ
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ (التوبة: ٧١)
"আর মু'মিন নর ও মু'মিন নারী পরস্পর পরস্পরের বন্ধু”। [সূরা আত-তাওবাহঃ ৭১]
এ আয়াতে ঈমানদারদের গুণের মধ্যে একে অপরের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাকেও গণ্য করা হয়েছে, ফলে আল্লাহর রাসূলগণ যেহেতু সমস্ত ঈমানদারদের থেকে পূর্ণ ঈমানের অধিকারী সেহেতু তারাও এর অন্তর্ভুক্ত হবেন। সুতরাং দ্বীনের মধ্যে তাদের সুউচ্চ সম্মান ও মহান মর্যাদার কারণে মু'মিন হৃদয়ে অন্য সৃষ্টিজগতের চেয়ে তাদের প্রতি বেশী বন্ধুত্ব ও ভালবাসা রাখা ওয়াজিব। আর এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলগণের সাথে শত্রুতা করার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন এবং তাঁর নিজের ও তাঁর ফিরিশতাদের সাথে শত্রুতা করাকে তাঁর রাসূলদের সাথে শত্রুতা পোষণের সমপর্যায়ে উল্লেখ করে উভয়ের শান্তি ও পরিণাম একসাথে বর্ণনা করেছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ
مَنْ كَانَ عَدُوا لِلَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَرُسُلِهِ وَجِبْرِيلَ وَمِيكَالَ فَإِنَّ اللَّهَ عَدُوٌّ لِلْكَافِرِينَ (البقرة : ۹۸)
“যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাদের ও তাঁর রাসূলদের এবং জিবরীল ও মীকাঈলের শত্রু, আল্লাহ অবশ্যই কাফিরদের শত্রু”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ৯৮]
৩. এ কথা বিশ্বাস করা যে, তারা সমস্ত মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, সৃষ্টি জগতের কেউ তাকওয়া ও যোগ্যতার দিক থেকে যত উপরেই উঠুক না কেন, তাদের মর্যাদায় পৌঁছতে পারবে না; কেননা রিসালাতের গুরুদায়িত্ব আল্লাহর মনোনয়নের উপর নির্ভরশীল, তিনি যাকে ইচ্ছা করেন তাকে এর দ্বারা বিশেষিত করেন। কোন প্রকার প্রচেষ্টা ও কর্ম দ্বারা তা পাওয়া যায় না।
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
اللهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلًا وَ مِنَ النَّاسِ إِنَّ اللهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ (الحج: ٧٥).
“আল্লাহ ফিরিস্তা ও মানব জাতি হতে রাসূলদের মনোনীত করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্ব দ্রষ্টা”। [সূরা আল- হাজ্জঃ ৭৫]
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
وَتِلْكَ حُجَّتُنَا أَتَيْنَا إِبْرَاهِيمَ عَلَى قَوْمِهِ تَرْفَعُ دَرَجَتٍ مَنْ نَشَاءُ (الأنعام: ۸۳)
"আর তা আমাদের যুক্তি-প্রমাণ যা আমরা ইব্রাহীমকে দিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের মোকাবিলায়; যাকে আমরা ইচ্ছা করি তাকে মর্যাদায় উন্নীত করি"। [সূরা আল-আন'আমঃ৮৩]
নবী ও রাসূলদের এক বিরাট শ্রেণীকে উল্লেখ করার পর আল্লাহ বলেনঃ
وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَلَمِينَ (الأنعام: ٨٦ )
"তাদের প্রত্যেককে আমরা সমস্ত সৃষ্টি জগতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি”। [সূরা আল-আন'আমঃ ৮৬] এ ধরনের আলোচনা এ অধ্যায়ের প্রথম পরিচ্ছেদে করা হয়েছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত হয়েছে যে, সৃষ্টি জগতের কেউ রাসূলদের সমমর্যাদায় পৌঁছতে পারবে না। বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ
(لا ينبغي لعبد أن يقول: أنا خيرٌ من يُونُسُ بْنِ مَتَى)
"কোন বান্দার জন্য এটা বলা উচিত নয় যে, আমি 'মাত্তা'র পুত্র ইউনুসের থেকে উত্তম"¹। বুখারীর অন্য বর্ণনায় এসেছেঃ
(مَنْ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّىٰ فَقَدْ كَذَبَ)
“যে কেউ বললঃ আমি ‘মাত্তা’র ছেলে ইউনুসের চেয়ে উত্তম সে মিথ্যা বলল”¹。
কোন কোন ব্যাখ্যাকারী বলেছেনঃ ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথাটি মূলতঃ ধমকের সুরে বলেছেন যাতে করে কোন মুর্খ লোক কুরআন কারীমে ইউনুস আলাইহিস সালামের যে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইউনুস আলাইহিস সালামের মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় এমন ধারণা না করে বসে’। আলেমগণ এও বর্ণনা করেছেন যে, ‘ইউনুস আলাইহিস সালামের ব্যাপারে যা ঘটেছে তাতে তার নবুওয়াতের মর্যাদা সামান্য পরিমাণও কমেনি। ইউনুস আলাইহিস সালামকে বিশেষ করে উল্লেখ করার কারণ হলো আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক তার ঘটনাকে কুরআনে কারীমে উল্লেখ করা। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
وَذَا النُّونِ إِذْ ذَهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَنْ لَنْ نَقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَى فِي الظُّلُمَتِ أَنْ لا إلهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَنَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّلِمِينَ * فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَيْنَهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ تُجِي الْمُؤْمِنِينَ ﴾ [الأنبياء: ٨٧، ٨٨].
“আর স্মরণ করুন, যুন-নুনের কথা, যখন তিনি ক্রোধ ভরে চলে গিয়েছিলেন, এবং মনে করেছিলেন যে, আমরা তাকে পাকড়াও করব না, তারপর তিনি অন্ধকারে এ আহবান করেছিলেন যে, আপনি ব্যতীত হক্ক কোন মা’বুদ নেই, আপনি কতইনা পবিত্র, নিশ্চয়ই আমি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছি’। তখন আমরা তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা হতে উদ্ধার করেছিলাম, আর এভাবেই আমরা মু’মিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি”। [সূরা আল-আম্বিয়াঃ ৮৭-৮৮]
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
وَإِنَّ يُونُسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ ﴿ ... الآيات (الصافات: ١٣٩-١٤٨)
“নিশ্চয়ই ইউনুস রাসূলদের অন্তর্গত”। [সূরা আস্ সাফ্ফাতঃ ১৩৯] এর পরবর্তী ১৪৮ নং আয়াত পর্যন্ত’।
৪. এ কথা বিশ্বাস করা যে, তাদের মধ্যে মান-মর্যাদাগত ভিন্ন ভিন্ন স্তর রয়েছে, তারা সবাই একই স্তরের নন বরং আল্লাহ তাদের কারো উপর অপর কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেনঃ
تلك الرُّسُلُ فَضَلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِّنْهُم مَّن كَلَّمَ اللَّهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ (البقرة: ٢٥٣).
“এ রাসূলগণ, আমরা তাদের মধ্যে কাউকে অপর কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। তাদের মধ্যে এমন কেউ রয়েছে যার সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন, আবার কাউকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছেন”। [সূরা আল- বাকারাহঃ ২৫৩]
ইমাম ত্বাবারী এ আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ 'আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ এরা আমার রাসূল তাদের কারো উপর অপর কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি, তাদের কারো সাথে আমি কথা বলেছি যেমন মূসা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাদের কারো উপর অপর কাউকে সম্মান ও উচ্চ মর্যাদায় বহুগুণ উন্নীত করেছি'। সুতরাং কুরআন ও সুন্নার দলীলের চাহিদা মোতাবেক তাদের প্রত্যেককে তার জন্য নির্দিষ্ট সম্মান ও মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা উম্মাতের উপর তাদের অধিকার।
৫. তাদের উপর সালাত ও সালাম পাঠ করা, কারণ আল্লাহ তা'আলা তা করার নির্দেশ দিয়েছেন, আর আল্লাহ এও জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি রাসূলদের জন্য পরবর্তী উম্মাতদের পক্ষ হতে উত্তম প্রশংসা ও সালাম অবশিষ্ট রেখেছেন। মহান আল্লাহ নূহ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেছেনঃ
وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ * سَلَمُ عَلَى نُوحٍ فِي الْعَلَمِينَ (الصافات: ۷۸-۷۹)
"আমরা তাকে পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি, সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহের উপর শান্তি বর্ষিত হোক”। [সূরা আস-সাফ্ফাতঃ ৭৮-৭৯]
ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম সম্পর্কেও বলেছেনঃ
وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ * سَلَمُ عَلَى إِبْرَاهِيمَ (الصافات: ۱۰۸-۱۰৯)
"আমরা তাকে পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি, ইব্রাহীমের উপর সালাম বর্ষিত হোক”। [সূরা আস-সাফ্ফাতঃ ১০৮-১০৯]
অনুরূপভাবে মূসা ও হারুন আলাইহিমাস সালাম সম্পর্কে বলেছেনঃ
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ وَتَرَكْنَا عَلَيْهِمَا فِي الْآخِرِينَ * سَلٰمٌ عَلٰى مُوْسٰى وَهٰرُوْنَ (الصافات: ۱۱۹-۱۲۰)
"আমরা তাদের দু'জনকে পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি, মূসা ও হারূনের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। [সূরা আস্-সাফ্ফাতঃ ১১৯-১২০]
আরো বলেছেনঃ
وَسَلٰمٌ عَلَى الْمُرْسَلِيْنَ (الصافات: ۱۸۱)
"আর সমস্ত রাসূলদের উপর সালাম"। [সূরা আস- সাফ্ফাতঃ ১৮১]
ইবনে কাসীর বলেনঃ 'মহান আল্লাহর বাণীঃ "সমগ্র বিশ্বের মধ্যে নূহের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক” (আস-সাফ্ফাতঃ৭৯) এ আয়াতের ব্যাখ্যা হলো তাকে ভালোভাবে স্মরণ ও তার উত্তম প্রশংসা অবশিষ্ট রাখা, কারণ যাবতীয় সম্প্রদায় তার উপর সালাম প্রেরণ করে। ইমাম 'নববী' সমস্ত নবীদের উপর সালাম দেয়া জায়েয হওয়া ও তা মুস্তাহাব হওয়ার উপর আলেমদের ইজমা' তথা সর্বসম্মত মত বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেনঃ 'তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দরূদ পড়ার উপর একমত হয়েছেন, অনুরূপভাবে ভিন্ন ভিন্নভাবে যাবতীয় নবী ও ফিরিস্তাদের উপরও দরূদ পড়া জায়েয হওয়ার ব্যাপারেও যাদের ঐক্যমত গ্রহণযোগ্য তারা সবাই একমত হয়েছেন। কিন্তু নবী-রাসূলগণ ব্যতীত অন্যদের উপর অধিকাংশ আলেমের মতে সরাসরি সালাত বা দরূদ পড়া যাবেনা।
উম্মতের উপর রাসূলদের কি কি অধিকার রয়েছে, কুরআন ও সুন্নার দলীল অনুসারে এবং আলেমদের মতামতের ভিত্তিতে এখানে তার কিছু বর্ণনা করা হলো। মহান আল্লাহ সবচেয়ে বেশী জানেন।
টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৩৪৬), মুসলিম (হাদীস নং ২৩৭৬), বুখারীর শব্দ চয়নে。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৪৬০৪)।