📄 কুরআনের প্রতি ঈমান ও এর বৈশিষ্ট্য
কুরআন, হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নববীর সংজ্ঞা এবং শেষোক্ত দু'টির মধ্যে পার্থক্য:
কুরআন কারীম হল আল্লাহর বাণী যা তাঁর কাছ থেকে প্রকাশ পেয়েছে (আমাদের জানা) কোন অবয়ব ছাড়াই এবং তিনি স্বীয় রাসূলের উপর ওহীরূপে তা অবতীর্ণ করেছেন। আর মু'মিনগণও তেমনিভাবে একে সত্য হিসাবে মেনে নিয়েছে এবং এ দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করেছে যে, তা প্রকৃতই আল্লাহর বাণী, যা জিবরীল আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা'আলার কাছ থেকে শুনেছেন এবং এর শব্দ ও অর্থসহ আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর তা নাযিল করেছেন। মুতাওয়াতির পন্থায়¹ তা বর্ণিত, একীন ও প্রত্যয় সৃষ্টি করে, মুসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ এবং সকল পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হতে সংরক্ষিত²。
আর হাদীসে কুদসী হল যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শব্দ ও অর্থসহ স্বীয় প্রতিপালকের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন। আর তা আমাদের কাছে অল্পসংখ্যক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে, কিংবা মুতাওয়াতির পন্থায় বর্ণিত হয়েছে, তবে মুতাওয়াতির হওয়ার ব্যাপারটি কুরআনের সমপর্যায় পর্যন্ত পৌছতে পারেনি।
এর উদাহরণ হল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আবু যর গিফারীর হাদীস। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় মহান প্রতিপালকের কাছ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: “হে আমার বান্দাগণ! আমি আমার নিজের উপর যুলুম করাকে হারাম করেছি এবং তোমাদের মধ্যেও তা হারাম করে দিয়েছি। সুতরাং তোমরা যুলুম করো না”¹。
হাদীসে নববী হল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে যে কথা, কাজ, মৌন সম্মতি অথবা গুণাবলীর সম্বন্ধ স্থাপন করা হয়²。
কুরআন, হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নববীর মধ্যে পার্থক্য হল : কুরআনের তেলাওয়াত ইবাদাত হিসাবে গণ্য, এর শব্দমালা মু'জিযা স্বরূপ যদ্বারা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া হয়েছিল। অযু নেই এমন ব্যক্তির জন্য তা স্পর্শ করা, অপবিত্র ব্যক্তি ও অনুরূপ কারোর জন্য তা তেলাওয়াত করা এবং (শব্দ বাদ দিয়ে শুধু) এর অর্থ রেওয়ায়েত করা হারাম। নামাযে তা পাঠ করা অপরিহার্য। এর পাঠককে প্রত্যেক হরফের বিনিময়ে একটি নেকী দেয়া হবে এবং প্রত্যেক নেকী দশ নেকীতে পরিণত হবে। হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নববী এর ব্যতিক্রম; কেননা এ দু'টি তদনুরূপ নয়।
আর হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নববীর মধ্যে পার্থক্য হল : হাদীসে কুদসীর শব্দ ও অর্থ দু'টোই আল্লাহর বাণীর অন্তর্গত, যা হাদীসে নববীর বিপরীত; কেননা হাদীসে নববী শব্দ ও অর্থের দিক থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীর অন্তর্গত। আর হাদীসে কুদসী হাদীসে নববীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ; কেননা আল্লাহর বাণী সৃষ্টিজগতের বাণীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ³。
কুরআনের প্রতি ঈমানের বৈশিষ্ট্য : ইতিপূর্বে সাব্যস্ত হয়েছে যে, আল্লাহর গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন ঈমানের রুকনসমূহের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন। আর মহাগ্রন্থ আল-কুরআন যখন পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থের রহিতকারী, সেগুলোর সত্যাসত্যের নিরূপক এবং আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত লাভ ও তার উপর এ গ্রন্থ নাযিলের পর জ্বিন-ইনসান সকলের জন্য তা দ্বারা ইবাদাত পালন করা অপরিহার্য, তখন এ গ্রন্থের প্রতি ঈমান আনয়নের ব্যাপারটি অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ দ্বারা মহিমান্বিত। গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে সব বিষয় সংক্ষিপ্তভাবে করা হয়েছিলো সেগুলো ছাড়াও কুরআনের প্রতি ঈমান পূর্ণ হওয়ার জন্য আরো কিছু বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ থাকা অত্যন্ত জরুরী। এ সব বৈশিষ্ট্য হল:
১. এ বিশ্বাস স্থাপন করা যে, কুরআনের দাওয়াত ব্যাপক এবং কুরআন যে শরীয়ত নিয়ে এসেছে তা জ্বিন ও ইনসান এ দু' জাতির সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর প্রতি ঈমান না এনে তাদের কোন গত্যন্তর নেই এবং এতে যা কিছু শরীয়তসম্মত করা হয়েছে তাছাড়া অন্য কিছু দ্বারা আল্লাহর ইবাদাত করার সাধ্য তাদের নেই। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
تَبْرَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَلَمِينَ نَذِيرًا ﴾ (الفرقان : (۱)
"কত বরকতময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তিনি বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারেন”। [সূরা আল-ফুরকান: ১]
আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাষায় সংবাদ দিয়ে আরো বলেন:
وَأُوحِيَ إِلى هذا القرآن الأَنْذِرَكُم بِهِ وَمَنْ أَبْلَم (الأنعام: ١٩)
“আর এ কুরআন আমার নিকট ওহী করা হয়েছে, যেন তোমাদেরকে এবং যার নিকট তা পৌঁছবে তাদেরকে এদ্বারা সতর্ক করতে পারি”। [সূরা আল-আন'আম : ১৯]
আল্লাহ তা'আলা জ্বিন সম্পর্কে খবর দিয়ে বলেনঃ
انا سمعنا قرانا عَجَبًا * يَهْدِى إِلَى الرشد قامنا يه (الجن: ١-٢)
"আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করেছি, যা সঠিক পথনির্দেশ করে; তাই আমরা তার উপরা ঈমান এনেছি”। [সূরা আল-জ্বিন: ১-২]
২. এ বিশ্বাস করা যে, কুরআন পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থকে রহিত করে দিয়েছে। অতএব কুরআন নাযিলের পরে আহলে কিতাবগণ ও অন্য কারো জন্য কুরআন ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা আল্লাহর ইবাদাত করা জায়েয নেই। অতএব কুরআন যা নিয়ে এসেছে তা ছাড়া অন্য কোন দ্বীন নেই এবং আল্লাহ কুরআনে যা প্রণয়ন করেছেন তা ছাড়া অন্য কোন ইবাদাত নেই। কুরআনে যা হালাল করা হয়েছে তা ছাড়া কোন হালাল নেই এবং কুরআনে যা হারাম করা হয়েছে তা ছাড়া কোন হারাম নেই। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ (آل عمران : ٨٥)
"কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হবে না"। [সূরা আলে-ইমরান: ৮৫]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ (النساء : ١٠٥)
"আমরা তো আপনার প্রতি সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি যাতে আপনি আল্লাহ আপনাকে যা জানিয়েছেন সে অনুযায়ী মানুষের মধ্যে বিচার মীমাংসা করেন"। [সূরা আন-নিসা: ১০৫]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে তার সাহাবাদেরকে আহলে কিতাবদের গ্রন্থসমূহ পাঠ করতে নিষেধ করেছিলেন জাবের ইবনে আব্দুল্লাহর হাদীসে সে কথা ইতিপূর্বে বলা হয়েছে। সেখানে তার এ বাণী রয়েছে:
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ أَنَّ مُوسَى كَانَ حَيًّا مَا وَسِعَهُ إِلَّا أَنْ يَتَّبِعَنِي
"... যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! যদি মূসা জীবিত থাকতেন তাহলে আমার অনুসরণ ব্যতীত তার আর কোন অবকাশ ছিলো না"¹。
৩. আল-কুরআন যে শরীয়ত নিয়ে এসেছে তা হল উদার এবং সহজ। পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের শরীয়ত ছিলো এর বিপরীত; কেননা সে সব শরীয়তে ছিলো বহু গুরুভার ও এমন সব শৃংখল যা সে শরীয়তের অনুসারীদের উপর আরোপ করে দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ (الأعراف: ١٥٧)
"যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নবীর, যার উল্লেখ তারা তাদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিপিবদ্ধ পায়, যিনি তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেন এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন, তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন ও অপবিত্র বস্তু হারাম করেন, আর তাদেরকে তাদের গুরুভার ও শৃংখল হতে মুক্ত করেন যা তাদের উপর ছিল”। [সূরা আল-আ'রাফ : ১৫৭]
৪. আল্লাহর গ্রন্থসমূহের মধ্যে কুরআনই একমাত্র সেই গ্রন্থ যার শব্দ এবং অর্থকে আল্লাহ শাব্দিক ও অর্থের দিক দিয়ে বিকৃতি হতে হেফাযত করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِكرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَفِظُونَ (الحجر: 9)
“নিশ্চয়ই আমরা কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমরাই এর সংরক্ষক"। [সূরা আল-হিজরঃ৯]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ (فصلت : ٤٢)
"কোন বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না - অগ্র হতেও নয়, পশ্চাৎ হতেও নয়। এটা প্রজ্ঞাময় প্রশংসিত আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ”। [সূরা ফুসিলাত: ৪২]
আল্লাহ তা'আলা যেমনটি চেয়েছেন এবং প্রণয়ন করেছেন সে অনুযায়ী কুরআনকে ব্যাখ্যা ও স্পষ্ট করার নিজ দায়িত্বের কথা বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন:
إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ * فَإِذَا قَرَأَنَهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ * ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَة (القيامة: ١٧-١٩)
"এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমাদেরই। সুতরাং যখন আমরা তা পাঠ করি আপনি সে পাঠের অনুসরণ করুন। অতঃপর এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্ব আমাদেরই”। [সূরা আল-ক্বিয়ামাহ : ১৭-১৯]
ইবনে কাসীর শেষের আয়াতটির তাফসীরে বলেন: 'অর্থাৎ কুরআনকে হেফাযত ও তেলাওয়াত করার পর আমি তা আপনার জন্য বর্ণনা করি, স্পষ্ট করে দেই এবং আমার ইচ্ছা ও প্রণীত শরীয়ত অনুযায়ী এর অর্থ আপনাকে জানিয়ে দেই'। আল্লাহ তা'আলা তাঁর গ্রন্থকে হেফাযত করার জন্য সুপন্ডিত ওলামাদের মধ্য থেকে এমন লোকদের প্রস্তুত করে দিয়েছেন যারা উত্তমভাবে এ দায়িত্ব পালন করেছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় থেকে আজ পর্যন্ত। তারা কুরআনের শব্দকে হেফাযত করেছেন, এর অর্থ উপলদ্ধি করেছেন এবং কুরআন অনুযায়ী আমলের উপর তারা সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তারা কুরআনকে হেফাযত করার ও কুরআনের খেদমাত করার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই বড় বড় গ্রন্থ সংকলন করেছেন। তাদের কেউ সংকলন করেছেন কুরআনের তাফসীর, কেউ সংকলন করেছেন এর লিখন ও পঠন পদ্ধতি, কেউ এর সুস্পষ্ট ও অবোধগম্য বিষয়গুলোকে সংকলিত করেছেন, কেউ সংকলন করেছেন এর মক্কী ও মাদানী আয়াতসমূহ, কেউ কুরআন থেকে হুকুম বের করার বিষয়টি সংকলন করেছেন, কেউ এর নাসেখ (রহিতকারী) ও মানসুখ (রহিত) সম্পর্কে লিখেছেন, কেউ লিখেছেন এর নাযিলের কারণসমূহ, কেউ সংকলন করেছেন এর উপমা ও প্রবচনসমূহ, কেউ এর মু'জিযা সম্পর্কে লিখেছেন, কেউ সংকলন করেছেন এর অপরিচিত শব্দমালা, আবার কেউ এর ই'রাব (বাক্যস্থিত পদ সম্পর্কিত আলোচনা) সংকলন করেছেন প্রভৃতি আরো সে সব ক্ষেত্র যার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক স্বীয় গ্রন্থের হেফাযতকার্য সম্পন্ন হয়েছে; কেননা তিনি তাঁর গ্রন্থ ও এর ইলমসমূহের খেদমাতের জন্য এ সকল ওলামাদেরকে প্রস্তুত করেছিলেন। ফলে কুরআন এমনই সংরক্ষিত থেকে যায় যে, তা ঠিক যেভাবে নাযিল হয়েছিলো সেরকম টাটকা ও সতেজ থেকে এর পঠন ও তাফসীর করার কাজ সম্পাদিত হচ্ছে।
৫. কুরআন কারীমে মু'জিযার বেশ কিছু দিক রয়েছে যাতে অন্যান্য অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহও শরীক রয়েছে। সার্বিকভাবে কুরআন হল বিরাট মু'জিযা এবং আল্লাহর হৃদয়গ্রাহী স্থায়ী প্রমাণ যদ্বারা আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার অনুসারীদেরকে ক্বিয়ামত অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত সাহায্য করেছেন। ইমাম বুখারী ও মুসলিম আবু হুরায়রার হাদীস হতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন:
«ما من الأنبياء نبي إلا أعطي من الآيات ما مثله آمن عليه البشر، وإنما كان الذي أوتيته وحياً أوحاه الله إلي فأرجو أن أكون أكثرهم تابعاً يوم القيامة»¹
"আম্বিয়াগণের মধ্য হতে প্রত্যেক নবীকেই এমন নিদর্শন প্রদান করা হয়েছে যার মত নিদর্শনের উপর মানুষ ঈমান এনেছিলো, আর ওহীরূপে আমাকে যা দেয়া হয়েছিলো তা আল্লাহ শুধু আমার প্রতিই প্রেরণ করেছেন। আমি আশা করি কিয়ামাতের দিন আমিই নবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী অনুসারী নিয়ে উপস্থিত হব”।
কুরআন মু'জিযা হওয়ার দিকসমূহের মধ্যে রয়েছে এর সুন্দর সংকলন, বিশুদ্ধতা ও হৃদয়গ্রাহীতা। মানব ও জ্বিনের উদ্দেশ্যে কুরআনের অনুরূপ একটি গ্রন্থ কিংবা এর কিয়দংশ নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া হয়েছিলো তিনটি স্তরে:
কুরআনের অনুরূপ নিয়ে আসার জন্য আল্লাহ তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কিন্তু তারা অপারগ হয়ে তা করতে পারেনি। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
أَمْ يَقُولُونَ تَقَوَّلَهُ بَلْ لَا يُؤْمِنُونَ * فَلْيَأْتُوا بِحَدِيثٍ مِثْلِهِ إِن كَانُوا صَدِقِينَ (الطور : ٣٣-٣٤)
"তারা কি বলে, 'এ কুরআন তার নিজের রচনা'? বরং তারা ঈমান রাখে না। তারা যদি সত্যবাদী হয় তবে এর মত কোন বক্তব্য তারা উপস্থিত করুক না!" [সূরা আত-তুর: ৩৩-৩৪]
আল্লাহ তা'আলা এ কাজে তাদের অপারগতা নিশ্চিত করে বলছেন:
قُلْ لِينِ اجْتَمَعَتِ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لبعض ظهيرا (الإسراء: ۸۸)
"বলুন, যদি কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জ্বিন সমবেত হয় এবং যদি তারা পরস্পরকে সাহায্যও করে, তবু তারা এর অনুরূপ আনয়ন করতে পারবে না"। [সূরা আল-ইসরা : ৮৮]
এরপর তিনি তাদেরকে কুরআনের অনুরূপ দশটি সূরা নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। কিন্তু তারা এতেও সমর্থ হয়নি। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
أمْ يَقُولُونَ افْتَرَبْهُ قُلْ فَأْتُوا بِعَشْرِ سُورٍ مِثْلِهِ مُفْتَرَيْتٍ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ صَدِقِينَ (هود: ۱۳)
"তারা কি বলে, 'তিনি নিজে তা রচনা করেছেন'? বলুন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে তোমরা এর অনুরূপ দশটি স্বরচিত সূরা আনয়ন কর এবং আল্লাহ ব্যতীত অপর যাকে পার ডেকে নাও”। [সূরা হুদ: ১৩]
এরপর তৃতীয়বার তাদেরকে কুরআনের একটি সূরার অনুরূপ নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ করেন। কিন্তু তারা তাও পারল না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَابَهُ قُلْ فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِثْلِهِ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ صدقين (یونس: ۳۸)
"তারা কি বলে, 'তিনি তা রচনা করেছেন'? বলুন, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা আনয়ন কর এবং আল্লাহ ব্যতীত অপর যাকে পার আহ্বান কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও”। [সূরা ইউনুস: ৩৮]
এদ্বারা কুরআনের মু'জিযা সবচেয়ে সুন্দর ও সুদৃঢ় পন্থায় সাব্যস্ত হল। কেননা কুরআনের একটি সূরার অনুরূপ নিয়ে আসার সর্বনিম্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সৃষ্টি অপারগ হল। অথচ কুরআনের সবচেয়ে ছোট সূরা হল তিন আয়াতবিশিষ্ট।
৬. মানুষের দ্বীন, দুনিয়া, জীবিকা ও আখিরাতের যত কিছুর প্রতি সে মুখাপেক্ষী আল-কুরআনে আল্লাহ তা'আলা তার সব কিছুই বর্ণনা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَبَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْ وَهُدًى وَرَحْمَةً وَبُشْرَى لِلْمُسْلِمِينَ ﴾ (النحل: ۸۹)
"আর আমরা আপনার উপর গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি প্রত্যেক বস্তুর স্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরূপ এবং মুসলমানদের জন্য হেদায়াত, করুণা ও সুসংবাদস্বরূপ”। [সূরা আন-নাহল: ৮৯]
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
ما فرطنا في الكتب من شي (الأنعام: ٣٨)
"এ গ্রন্থে আমরা কোন কিছুই বাদ দেইনি”। [সূরা আল-আন'আম: ৩৮]
ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'এ কুরআনে সকল জ্ঞান অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং কুরআনে আমাদের জন্য সব কিছু বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে'।
৭. আল্লাহ তা'আলা উপদেশ গ্রহণকারী ও চিন্তাশীলের জন্য কুরআনকে সহজ করে দিয়েছেন। এটা তার সবচেয়ে মহান বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَلَقَدْ يَتَرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ ﴾ (القمر : ١٧)
"অবশ্যই উপদেশ গ্রহণের জন্য আমরা কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?” [সূরা আল-কামার: ১৭]
মহান আল্লাহ আরো বলেন:
﴿كتبُ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَرَكُ لِيَدَّبَّرُوا آيَتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُوا الْأَلْبَابِ﴾ (ص: ۲۹)
"এ এক কল্যাণময় গ্রন্থ, আমরা তা আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ গ্রহণ করে উপদেশ”। [সূরা সাদঃ২৯]
মুজাহিদ প্রথম আয়াতটির তাফসীরে বলেন: 'অর্থাৎ এর পঠনকে আমি সহজ করে দিয়েছি'¹। আর সুদ্দী বলেন: 'আমরা এর তেলাওয়াতকে জিহ্বার জন্য সহজ করে দিয়েছি'। ইবনে আব্বাস বলেন: 'যদি আল্লাহ মানুষের বাকযন্ত্রের উপর একে সহজ করে না দিতেন, তাহলে সৃষ্টির কেউই আল্লাহর বাণী উচ্চারণ করতে সমর্থ হতো না'। ত্বাবারী এবং তাফসীরের ইমামদের আরো অনেকে উল্লেখ করেন যে, কুরআনকে সহজকরণের বিষয়টিতে শামিল রয়েছে তেলাওয়াতের জন্য এর শব্দকে সহজ করা এবং চিন্তাভাবনা ও উপদেশ গ্রহণের জন্য এর অর্থকে সহজ করা'²। আর কুরআনও মূলতঃ এরকমই, যেমনটি এ ব্যাপারে লক্ষ্য করা গেছে।
৮. কুরআনে আরো সন্নিবেশিত আছে পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের সকল শিক্ষার সারাংশ ও রাসূলগণের শরীয়তসমূহের মৌলিক দিকগুলো। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتٰبِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ﴾ (المائدة : ٤٨)
"আমরা আপনার প্রতি সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি ইতিপূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহের সত্যতা প্রতিপন্নকারী ও সেগুলোর সত্যাসত্য নিরূপকরূপে”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৮]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ﴾ (الشورى ۱۳)
"তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই সব হুকুম প্রণয়ন করেছেন যার নির্দেশ দিয়েছেন নূহকে, আর যা আপনার প্রতি আমরা ওহী হিসাবে প্রেরণ করেছি, এবং যার নির্দেশ আমরা ইব্রাহীম, মুসা ও 'ঈসাকে দিয়েছিলাম এ মর্মে যে, তোমরা দ্বীন (তথা যাবতীয় আক্বীদা ও আহকাম) প্রতিষ্ঠা কর এবং এতে বিচ্ছিন্ন হয়োনা”। [সূরা আশ-শুরাঃ১৩]
৯. কুরআনে রয়েছে রাসূলগণ ও পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ইতিহাস এবং এর এমন বিশদ ব্যাখ্যা আগের কোন গ্রন্থে যার জুড়ি মেলে না। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَكُلًّا نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الرُّسُلِ مَا نَتَيْتُ بِهِ فُؤَادَكَ (هود: ۱۲۰)
"রাসূলদের ঐ সকল বৃত্তান্ত আমরা আপনার নিকট বর্ণনা করছি, যদ্বারা আমরা আপনার চিত্তকে দৃঢ় করি”। [সূরা হুদ: ১২০]
আল্লাহ আরো বলেন:
ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْقُرَى نَقُصُّهُ عَلَيْكَ مِنْهَا قَالَمُ وَحَصِيدُ (هود: ۱۰۰)
“এটা জনপদসমূহের কিছু সংবাদ যা আমরা আপনার নিকট বর্ণনা করছি। সে জনপদের কিছু এখনো বিদ্যমান এবং কিছু নির্মূল হয়েছে”। [সূরা হুদঃ ১০০]
আল্লাহ আরো বলেন:
كَذلِكَ نَقْصُ عَلَيْكَ مِنْ أَبْنَاء مَا قَدْ سَبَقَ وَقَدْ بَيْنَكَ مِنْ لَدُنَا ذِكْرًا (طه: ۹۹)
“পূর্বে যা ঘটেছে তার সংবাদ আমরা এভাবে আপনার নিকট বর্ণনা করি এবং আমরা আমাদের নিকট হতে আপনাকে দান করেছি উপদেশ”। [সূরা ত্বাহা : ৯৯]
১০. নাযিলের দিক থেকে কুরআন আল্লাহর সর্বশেষ গ্রন্থ এবং অন্য গ্রন্থসমূহের উপর সাক্ষী। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقَا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنْزَلَ التَّوْرَيَةَ وَالْإِنْجِيلَ * مِنْ قَبْلُ هُدًى لِلنَّاسِ وَاَنْزَلَ الْفُرْقَانَ (آل عمران : ৩-৪)
"তিনি সত্যসহ আপনার প্রতি গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন, যা তার পূর্বের গ্রন্থসমূহের সত্যতা প্রতিপন্নকারী। আর তিনি অবর্তীণ করেছিলেন তাওরাত ও ইঞ্জিল - ইতিপূর্বে মানবজাতির হেদায়াতের জন্য। আর তিনি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন"। [সূরা আলে-ইমরান: ২-৪]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
(وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ )
( المائدة : ٤٨ )
“এবং আমরা আপনার প্রতি সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি ইতিপূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহের সত্যতা প্রতিপন্নকারী ও সেগুলোর সত্যাসত্য নিরূপকরূপে”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৮]
এ হল অন্যান্য গ্রন্থসমূহের উপর কুরআন কারীমের কিছু বৈশিষ্ট্য যার প্রতি বিশ্বাস রেখে ইলম ও আমলের দিক থেকে একে বাস্তবায়ন না করলে কুরআনের প্রতি ঈমান বাস্তবায়িত হয় না। আল্লাহ তা'আলাই অধিক অবগত।
টিকাঃ
¹ মুতাওয়াতির হল সে বর্ণনা যা এত অধিক সংখ্যক বর্ণনাকারীগণ কর্তৃক বর্ণিত হয় যে, বর্ণিত বিষয়ে তাদেরকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা অসম্ভব। ফলে বর্ণনাটি সকল সন্দেহের ঊর্ধে উঠে যায় এবং তাতে দৃঢ় প্রত্যয় ও আস্থা জন্মে - অনুবাদক。
² শরহ আলআক্বীদাতুত ত্বাহাবিয়্যাহ (১/১৭২), মাবাহিস ফী 'উলুমুল কুরআন, মান্না' আলকাত্তান (পৃঃ ২১), কাওয়া'য়েদুত তাহদীস, জামালুদ্দীন আলকাসেমী (পৃঃ ৬৫)
¹ এটি বর্ণনা করেছেন মুসলিম (হাদীস নং ২৫৭৭)
² মুস্তালাহুল হাদীস, ইবনে উসাইমীন পৃঃ৭, কাওয়ায়েদুস তাহদীস, কাসেমী (পৃঃ ৬১-৬২)
³ কাওয়া'য়েদুত তাহদীস, কাসেমী (পৃঃ ৬৫-৬৬)
¹ ইমাম আহমাদ এটি বর্ণনা করেছেন মুসনাদে (৩/৩৮৭), তিনি ছাড়া অন্যরাও এটি বর্ণনা করেন。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৪৯৮১), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৫২)。
¹ তাফসীরে ইবনে কাসীর (৮/৫৬৩)
² তাফসীরে ইবনে জারীর (২৭/৯৬)