📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমান আনয়নের পদ্ধতি

📄 গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমান আনয়নের পদ্ধতি


আল্লাহর গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমানের বিভিন্ন দিক রয়েছে। আরকানুল ঈমানের এ মহান রুকনটিকে বাস্তবায়নের জন্য সেদিকগুলোর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তা দৃঢ়ভাবে সাব্যস্ত করা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে কুরআন-সুন্নার দলীল প্রমাণ বহন করছে। সে দিকগুলো হলঃ

১. এ বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা যে, এ গ্রন্থগুলোর প্রতিটিই আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়েছে। এগুলো আল্লাহ তা'আলারই বাণী অন্য কারো বাণী নয় এবং এগুলো দ্বারা আল্লাহ বাস্তবিকই কথা বলেছেন যেমন তিনি ইচ্ছা করেছেন এবং যে পদ্ধতিতে তিনি চেয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿ اللهُ لا إِلهَ إِلا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ * نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنْزَلَ الثَّوريةَ وَالْإِنجيلَ * مِنْ قَبْلُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَأَنْزَلَ الْفُرْقَانَ إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِ اللهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَاللهُ عَزِيزٌ ذُو انْتِقَامٍ ﴾ (آل عمران : ٢-٤)
“আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন প্রকৃত ইলাহ্ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তিনি সত্যসহ আপনার প্রতি গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন, যা তার পূর্বের গ্রন্থসমূহের সত্যতা প্রতিপন্নকারী। আর তিনি অবর্তীর্ণ করেছিলেন তাওরাত ও ইঞ্জিল - ইতিপূর্বে মানবজাতির হেদায়াতের জন্য। আর তিনি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন। যারা আল্লাহর নিদর্শনকে অস্বীকার করে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী”। [সূরা আলে-ইমরান: ২-৪]

আল্লাহ তা'আলা অবহিত করেছেন যে, তিনি উল্লেখিত গ্রন্থসমূহ তথা তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআন তাঁর নিজের পক্ষ থেকে নাযিল করেছেন। এদ্বারা বোঝা যাচ্ছে যে, তিনিই এগুলো দ্বারা বক্তব্য প্রদানকারী এবং তাঁরই পক্ষ থেকে এসকল বাণীর উদ্ভব হয়েছে, অন্য কারো পক্ষ থেকে নয়। এজন্যই তিনি বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ঐ ব্যক্তিকে কঠিন শাস্তির ভয় প্রদর্শন করেছেন যে আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে।

তিনি তাওরাত সম্পর্কে খবর দিয়ে বলেন:
﴿ إِنَّا أَنزَلْنَا التَّوْرَيةَ فِيهَا هُدًى وَنُورُ ﴾ (المائدة : ٤٤)
"অবশ্যই আমরা তাওরাত অবতীর্ণ করেছি, যাতে রয়েছে হেদায়াত ও আলো"। [সূরা আল-মায়িদাহ : ৪৪]

আল্লাহ তা'আলা জানিয়েছেন যে, তিনিই তাওরাত অবতীর্ণ করেছেন এবং এতে যে হেদায়াত ও আলো রয়েছে তা তাঁরই পক্ষ থেকে।

আল্লাহ তা'আলা অন্য আরেকটি প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে, তাওরাত তাঁরই বাণী। একথা তিনি বলেছেন ইয়াহুদীদের সম্পর্কে খবর দিতে গিয়ে:
﴿ أَفَتَطْمَعُونَ أَنْ يُؤْمِنُو اللَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَّمَ اللهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ ﴾ (البقرة: ٧٥)
"তোমরা কি এ আশা কর যে, তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? অথচ তাদের একদল আল্লাহর বাণী শ্রবণ করে, তারপর তারা তা অনুধাবন করার পর বিকৃত করে”। [সূরা আল-বাকারাহ : ৭৫]

সুদ্দী, ইবনে যায়েদ ও একদল মুফাসসির বলেন, এখানে আল্লাহর যে বাণী তারা শ্রবণ করার পর বিকৃত করেছিলো তা হল তাওরাত।

আল্লাহ তা'আলা ইঞ্জিল সম্পর্কে বলেন:
﴿ وَلْيَحْكُمُ أَهْلُ الْإِنْجِيلِ بِمَا أَنزَلَ اللهُ فِيهِ ﴾ (المائدة : ٤٧)
"ইঞ্জিল অনুসারীগণ যেন আল্লাহ তাতে যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে হুকুম দেয়”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৭] অর্থাৎ সে সকল নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞা যা আল্লাহরই বাণীর অন্তর্ভুক্ত।

তিনি কুরআন কারীম সম্পর্কে বলেন:
﴿ الركب أَحْمَتُ ابْتُهُ ثُمَّ فَصَلَتْ مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍ ﴾ (هود: 1)
"আলিফ-লাম-রা, এমন গ্রন্থ, যার আয়াতসমূহ সুবিন্যস্ত ও পরে প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞের নিকট হতে বিশদভাবে বিবৃত”। [সূরা হুদঃ ১]

আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেন:
﴿ وَإِنَّكَ لَتُلَقَّى الْقُرْآنَ مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ عَلِيمٍ ﴾ (النمل: ٦)
"আর নিশ্চয়ই আপনাকে আল-কুরআন দেয়া হচ্ছে প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞের নিকট হতে”। [সূরা আন-নামলঃ ৬]

আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قُلْ نَزَّلَهُ رُوحُ الْقُدُسِ مِنْ رَبِّكَ ﴾ (النحل : ١٠٢)
"বলুন, রূহুল কুদ্দুস (জিবরীল) আপনার প্রতিপালকের নিকট হতে তা অবতীর্ণ করেছেন”। [সূরা আন-নাহল: ১০২]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَإِنْ أَحَدٌ مِنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجْرُهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلمَ اللهِ ﴾ (التوبة : ٦ )
"মুশরিকদের মধ্যে কেউ আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে আপনি তাকে আশ্রয় দেবেন যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়”। [সূরা আত-তাওবাহঃ ৬]

তাদেরকে ঐ কুরআন শ্রবণ করার নির্দেশই শুধু দেয়া হয়েছিলো যা আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর নাযিল করেছিলেন। অতএব তা প্রকৃতই আল্লাহর বাণী।

২. এ বিষয়ের প্রতি ঈমান আনয়ন করা যে, এ সকল গ্রন্থের প্রতিটিই একমাত্র আল্লাহর ইবাদাতের দিকে আহ্বান করেছে এবং যাবতীয় কল্যাণ, হেদায়াত, আলো ও জ্যোতি নিয়ে এসেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
مَا كَانَ لِبَشَرِ أَن يُؤْتِيَهُ اللهُ الْكِتٰبَ وَالْحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ ثُمَّ يَقُولَ لِلنَّاسِ كُونُوا عِبَادُ انِي مِنْ دُونِ اللهِ (آل عمران: ۷۹)
"কোন ব্যক্তির জন্য এটা সঙ্গত নয় যে, আল্লাহ তাকে গ্রন্থ, নির্দেশ ও নবুওয়াত দান করার পর সে মানুষকে বলবে, আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা আমার দাস হয়ে যাও”। [সূরা আলে-ইমরান: ৭৯]

আল্লাহ তা'আলা এখানে বর্ণনা করেছেন যে, কোন মানবের জন্য এটা সমীচীন নয় - যাকে আল্লাহ গ্রন্থ, নির্দেশ ও নবুওয়াত দান করেছেন - মানুষকে এ নির্দেশ দেয়া যে, তারা যেন আল্লাহর পরিবর্তে তাকেই ইলাহ্ হিসাবে গ্রহণ করে নেয়; কেননা আল্লাহর গ্রন্থসমূহ ইবাদাতকে একমাত্র আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করার নির্দেশ নিয়েই এসেছে।

আল্লাহর গ্রন্থসমূহ যে, সত্য ও হেদায়াত নিয়ে এসেছে সে কথা বর্ণনা করে আল্লাহ বলেনঃ
نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنْزَلَ التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ * مِنْ قَبْلُ هُدًى لِلنَّاسِ (آل عمران : ٣-٤)
"তিনি সত্যসহ আপনার প্রতি গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন যা তার পূর্বের গ্রন্থসমূহের সত্যতা প্রতিপন্নকারী। আর তিনি অবতীর্ণ করেছিলেন তাওরাত ও ইঞ্জিল - ইতিপূর্বে মানবজাতির হেদায়াতের জন্য"। [সূরা আলে-ইমরান: ৩-৪]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَتَ اللهُ النَّبِّيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ وَأَنْزَلَ مَعَهُمُ الكتب بِالْحَقِّ (البقرة : ۲۱۳)
"সমস্ত মানুষ ছিলো একই উম্মাত। অতঃপর আল্লাহ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেন এবং তাদের সাথে সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেন"। [সূরা আল-বাকারাহ : ২১৩]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ ﴾ (المائدة : ٤٤)
"নিশ্চয়ই আমরা তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলাম, এতে ছিলো হেদায়াত ও আলো"। [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৪]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَآتَيْنَهُ الْإِنْجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورُ ﴾ (المائدة : ٤٦)
"আর আমরা তাকে ইঞ্জিল দিয়েছিলাম, এতে রয়েছে হেদায়াত ও আলো"। [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৬]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ (البقرة : ١٨٥)
"রামাদান মাস, এতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানুষের জন্য হেদায়াতস্বরূপ এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে"। [সূরা আল-বাকারাহ : ১৮৫]

এতদ্ব্যতীত আরো সে সকল আয়াতও এর অন্তর্ভুক্ত যাতে রয়েছে আল্লাহ তা'আলার গ্রন্থসমূহ তাঁরই পক্ষ থেকে হেদায়াত ও আলো নিয়ে এসেছে।

৩. এ বিষয়ে ঈমান আনয়ন করা যে, আল্লাহর গ্রন্থসমূহের একটি অন্যটিকে সত্য প্রতিপন্ন করে। অতএব এগুলোর মধ্যে কোন পরস্পর বিরোধ ও বৈপরীত্য নেই, যেমন আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেছেন:
﴿ وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّ قَالَمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنَّا عَلَيْهِ ﴾ (المائدة : ٤٨ )
"আমরা আপনার প্রতি সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি ইতিপূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহের সত্যতা প্রতিপন্নকারী ও সেগুলোর সত্যাসত্য নিরূপনকারীরূপে”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৪৮]

ইঞ্জিল সম্পর্কে তিনি বলেনঃ
﴿ وَاتَيْنَهُ الْإِنْجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورُ وَ مُصَدٍ قَالِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَيةِ ﴾ (المائدة : ٤٦)
"আর আমরা তাকে ইঞ্জিল দিয়েছিলাম, এতে রয়েছে হেদায়াত ও আলো, তা ছিলো পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সত্যতা প্রতিপন্নকারী”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৪৬]

সুতরাং এ বিষয়ে ঈমান আনয়ন করা এবং আল্লাহর গ্রন্থসমূহ যে সকল প্রকার পরস্পর বিরোধ ও বৈপরীত্য থেকে মুক্ত এ বিশ্বাস রাখা ওয়াজিব। এটা মূলতঃ সৃষ্টিজগতের গ্রন্থসমূহ থেকে স্বতন্ত্র আল্লাহর গ্রন্থসমূহের ও সৃষ্টির বাণী থেকে স্বতন্ত্র আল্লাহর বাণীর সুমহান বৈশিষ্ট্যেরই অন্তর্গত; কেননা সৃষ্টিজগতের গ্রন্থসমূহ ত্রুটি, বিচ্যুতি ও পরস্পর বিরোধিতার মুখোমুখি হতে পারে। যেমন আল্লাহ তা'আলা কুরআনের বর্ণনায় বলেছেন:
﴿ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا ﴾ (النساء: ۸۲)
“যদি তা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট হতে আসত, তবে তারা এতে অনেক অসংগতি পেত”। [সূরা আন-নিসা: ৮২]

৪. আল্লাহ তা'আলা সুনির্দিষ্টভাবে তাঁর যে সব গ্রন্থের নামোল্লেখ করেছেন সেগুলোর প্রতি ঈমান আনা এবং সেগুলোকে সত্য বলে স্বীকার করা। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সেগুলো সম্পর্কে যে সংবাদ দিয়েছেন তারও সত্যায়ন করা। এ গ্রন্থসমূহ হল:

ক. তাওরাত : এটি আল্লাহর সেই গ্রন্থ যা তিনি মূসা আলাইহিস সালামকে দিয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ مِنْ بَعْدِ مَا أَهْلَكْنَا الْقُرُونَ الْأُولَى بَصَائِرَ لِلنَّاسِ﴾ (القصص: ٤٣)
“পূর্ববর্তী বহু মানবগোষ্ঠীকে বিনাশ করার পর আমরা তো মূসাকে দিয়েছিলাম গ্রন্থ, মানব জাতির জন্য জ্ঞান-বর্তিকাস্বরূপ”। [সূরা আল-কাসাস: ৪৩]

ইমাম বুখারী ও মুসলিম আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস থেকে শাফা'আতের যে দীর্ঘ হাদীসটি মারফু' পন্থায় সঙ্কলন করেন তাতে রয়েছেঃ
.. فيأتون إبراهيم فيقول : لست هناكم ويذكر خطيئته التي أصابها ولكن ائتوا موسى عبداً آتاه الله التوراة وكلمه تكليماً
"... অতঃপর তারা ইব্রাহীমের কাছে আসবে। তিনি বলবেন, 'আমি তোমাদের ঐ কাজের উপযুক্ত নই' এবং তিনি নিজের সে ভুলের কথা উল্লেখ করবেন যা তিনি করেছিলেন, 'তোমরা বরং মূসার কাছে যাও, যিনি এমন এক বান্দা যাকে আল্লাহ তাওরাত প্রদান করেছেন এবং তার সাথে বাক্যালাপ করেছেন'.."¹। আল্লাহ মূসার উপর তাওরাত ফলকে লিপিবদ্ধ অবস্থায় নাযিল করেছেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:
﴿وَكَتَبْنَا لَهُ فِي الْأَلْوَاحِ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ مَوْعِظَةً وَتَفْصِيلًا لِكُلِّ شَيْءٍ﴾ (الأعراف: ١٤٥)
"আমরা তার জন্য ফলকে সর্ববিষয়ে উপদেশ ও সকল বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা লিখে দিয়েছি”। [সূরা আল-আ'রাফ: ১৪৫]

ইবনে আব্বাস বলেন, '(আলওয়াহ দ্বারা) আল্লাহ তাওরাতের ফলক বুঝিয়েছেন'। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনায় আদম ও মূসার বাদানুবাদের হাদীসে রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত:
.. قال له آدم يا موسى اصطفاك الله بكلامه وخط لك التوراة بيده»
"...আদম তাকে বললেন, 'হে মূসা! আল্লাহ আপনাকে স্বীয় বাণী দ্বারা মনোনীত করেছেন এবং নিজ হাতে আপনার জন্য তাওরাত লিখেছেন"¹। ইমাম বুখারী ও মুসলিম তাদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে অনেকগুলো সনদে এটি সঙ্কলন করেছেন।

তাওরাত বনী ইসরাঈলের সর্ববৃহৎ গ্রন্থ। এতে তাদের শরীয়ত এবং মূসার উপর আল্লাহ যে হুকুম-আহকাম নাযিল করেছেন তার বিশদ ব্যাখ্যা রয়েছে। মূসার পরে আগত বনী ইসরাঈলের নবীগণ এ গ্রন্থ মোতাবেক আমল করতেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿إِنَّا أَنزَلْنَا التَّوْرَيٰةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُواْ لِلَّذِينَ هَادُواْ وَالرَّبَّـٰنِيُّونَ وَالأَحْبَارُ بِمَا اسْتُحْفِظُواْ مِن كِتَـٰبِ اللَّهِ وَكَانُواْ عَلَيْهِ شُهَدَاء ۚ﴾ (المائدة : ٤٤)
"নিশ্চয়ই আমরা তাওরাত অবতীর্ণ করেছিলাম, এতে ছিলো হেদায়াত ও আলো। নবীগণ, যারা ছিলেন আল্লাহর অনুগত, তারা এবং আল্লাহওয়ালা ও বিদ্বানগণ ইয়াহুদীদেরকে তদনুসারে হুকুম দিতেন কারণ তাদেরকে আল্লাহর গ্রন্থ সংরক্ষনের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আর তারা ছিলো এর সাক্ষী”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৪]

ইয়াহুদীরা তাওরাতের যে বিকৃতি ও পরিবর্তন সাধন করেছিলো আল্লাহ স্বীয় গ্রন্থে সে সংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহ চাহেত অচিরেই পরবর্তী পরিচ্ছেদে এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আসবে।

খ. ইঞ্জিল : এটি হচ্ছে আল্লাহর সেই গ্রন্থ যা তিনি 'ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিমাস সালামের উপর নাযিল করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَقَفَّيْنَا عَلَىٰ آثَارِهِم بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَيٰةِ وَآتَيْنَاهُ الْإِنجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورٌ وَمُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَيٰةِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةً لِّلْمُتَّقِينَ ۚ﴾ (المائدة : ٤٦)
"আর আমরা তাদের পশ্চাতে মারইয়াম তনয় 'ঈসাকে তার পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সত্যতা প্রতিপন্নকারীরূপে প্রেরণ করেছিলাম। আমরা তাকে ইঞ্জিল দিয়েছিলাম, এতে রয়েছে হেদায়াত ও আলো, তা ছিলো পূর্বে অবতীর্ণ তাওরাতের সত্যতা প্রতিপন্নকারী এবং মুত্তাকীদের জন্য হেদায়াত ও উপদেশ”। [সূরা আল- মায়িদাহ: ৪৬]

আল্লাহ তা'আলা তাওরাতকে সত্য প্রতিপন্নকারী ও এর সমার্থকরূপে ইঞ্জিল অবতীর্ণ করেন, যেমনটি পূর্বেকার আয়াতটিতে বলা হয়েছে।

কোন কোন আলেম¹ বলেন, 'লোকেরা তাওরাতের যে সকল আহকামের মধ্যে মতভেদে লিপ্ত ছিলো তার খুব কম সংখ্যকের ক্ষেত্রেই ইঞ্জিল তাওরাতের খেলাফ করেছে, যেমন আল্লাহ মাসীহ সম্পর্কে খবর দিয়েছেন যে, তিনি বনী ইসরাঈলের উদ্দেশ্যে বলেছিলেনঃ
وَ لِاُحِلَّ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ (آل عمران : ٥٠)
“এবং তোমাদের জন্য যা নিষিদ্ধ ছিলো তার কিছু যেন আমি বৈধ করে দেই”। [সূরা আলে-ইমরান : ৫০]

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় গ্রন্থ কুরআন কারীমে জানিয়েছেন যে, তাওরাত ও ইঞ্জিল আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুসংবাদ দিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য পেশ করেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ (الأعراف: ١٥٧)
"যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নবীর, যার উল্লেখ তারা তাদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিপিবদ্ধ পায়"। [সূরা আল-আ'রাফ : ১৫৭]

তাওরাতে যে বিকৃতি ঘটেছিল, ইঞ্জিলেও সে একই বিকৃতি সাধন করা হয়েছিল, আল্লাহ চাহেত যার বর্ণনা আগত পরিচ্ছেদে করা হবে।

গ. যাবুর : এটি আল্লাহর সেই গ্রন্থ যা তিনি দাউদ আলাইহিস সালামের উপর নাযিল করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَآتَيْنَا دَاوُدَ زَبُورًا ﴾ (النساء: ١٦٣)
"আর আমরা দাউদকে যাবুর প্রদান করেছিলাম”। [সূরা আন-নিসা : ১৬৩]

কাতাদাহ আয়াতটির তাফসীরে বলেন: 'আমরা বলাবলি করতাম যে, এটা ছিলো এমন দো'আ যা আল্লাহ দাউদকে শিখিয়েছিলেন এবং মহান আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি এবং গৌরব ও মহিমা কীর্তন। এতে কোন হালাল ও হারাম এবং ফরয ও দন্ডনীয় শাস্তির বর্ণনা ছিলো না'।

ঘ. ইব্রাহীম ও মুসার সহীফাঃ কুরআনের দু'টি স্থানে এগুলোর উল্লেখ এসেছে। প্রথমটি হল সূরা আন-নাজমে আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত বাণীতেঃ
أَمْ لَمْ يُنَأُ بِمَا فِي صُحُفِ مُوسَى * وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِى وَفَى * أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى * وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى (النجم: ٣٦-৩৯)
“তাকে কি অবগত করা হয়নি যা আছে মূসার গ্রন্থে, এবং ইব্রাহীমের গ্রন্থে যিনি পালন করেছিলেন তার দায়িত্ব? তা এই যে, কোন বহনকারী অপরের বোঝা বহন করবে না, আর এই যে, মানুষ তা-ই পায় যা সে করে”। [সূরা আন-নাজম: ৩৬-৩৯]

আর দ্বিতীয় স্থানটি হল সূরা আল-আ'লার মধ্যে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى * وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّى * bَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَوةَ الدُّنْيَا * وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وابقى * إِنَّ هَذَا لَفِي الصُّحُفِ الأولى * صُحُفِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى (الأعلى: ১৪-১৯)
"নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে যে পবিত্রতা অর্জন করে এবং তার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করে ও সালাত আদায় করে। কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখিরাতই উৎকৃষ্টতর ও স্থায়ী। এতো আছে পূর্ববর্তী সহীফাসমূহে, ইব্রাহীম ও মুসার সহীফাসমূহে”। [সূরা আল-আ'লা: ১৪-১৯]

আল্লাহ তা'আলা এ সহীফাসমূহে স্বীয় রাসূলদ্বয় ইব্রাহীম ও মূসা আলাইহিমাস সালামের উপর যে ওহী নাযিল করেছিলেন তার কিয়দংশ সম্পর্কে এখানে অবহিত করেছেন। জ্ঞান আল্লাহর কাছেই রয়েছে।

৬. মহাগ্রন্থ আলকুরআন : এটি আল্লাহর সেই গ্রন্থ যা তিনি আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের উপর পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের সত্যায়নকারী ও সত্যাসত্য নিরূপনকারীরূপে অবতীর্ণ করেছেন। নাযিল হওয়ার দিক থেকে এ হল আল্লাহর সর্বশেষ গ্রন্থ এবং গ্রন্থসমূহের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ও সর্বাধিক পরিপূর্ণ। এটি পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থের রহিতকারী। জ্বিন ও মানব এ উভয় জাতির সবার জন্যই এর আহ্বান। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَّا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ (المائدة: ٤٨)
“আমরা আপনার প্রতি সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি ইতিপূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহের সত্যতা প্রতিপন্নকারী ও সেগুলোর উপর সাক্ষীরূপে”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৪৮]

আয়াতে বর্ণিত مُهَيْمِنًا শব্দের অর্থ হলঃ পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের উপর সাক্ষী ও সত্যাসত্য নিরূপকরূপে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قُلْ أَيُّ شَيْءٍ أَكْبَرُ شَهَادَةً قُلِ اللهُ شَهِيدٌ بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ وَأُوحِيَ إِلَيَّ هَذَا الْقُرْآنُ لِأُنذِرَكُمْ بِهِ وَمَن بَلَغَ (الأنعام: ١٩)
“বলুন, কোন্ জিনিস সবচেয়ে বড় সাক্ষী? বলুন, আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষ্যদাতা। আর এ কুরআন আমার নিকট ওহী করা হয়েছে যাতে তোমাদেরকে ও যাদের নিকট তা পৌঁছবে তাদেরকে এর দ্বারা আমি সতর্ক করি”। [সূরা আল-আন'আম : ১৯]

মহান আল্লাহ আরো বলেন:
تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا (الفرقان : ١)
“কত বরকতময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার উপর ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তিনি বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারেন”। [সূরা আল-ফুরকান: ১]

কুরআনের অনেকগুলো নাম রয়েছে। তম্মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হল: কুরআন, ফুরকান, আল-কিতাব, আত-তানযীল ও আয-যিক্র।

অতএব এ সকল গ্রন্থের যে সব নামের উল্লেখ কুরআন ও সুন্নার দলীলে এসেছে সে অনুযায়ী এগুলোর প্রতি ঈমান রাখা এবং এগুলো যাদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, এগুলো সম্পর্কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু অবহিত করেছেন ও এসব গ্রন্থধারীদের যে সকল কাহিনী আমাদের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে, সে সব কিছুর প্রতি ঈমান রাখা ওয়াজিব।

৫. এ বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে, (পূর্ববর্তী) যে সকল গ্রন্থ ও সহীফা আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের উপর নাযিল করেছিলেন, কুরআন কারীম দ্বারা সে সব গ্রন্থ রহিত হয়ে গেছে এবং মানব কিংবা জ্বিন কারো পক্ষেই এটা সম্ভব নয় - না পূর্ববর্তী গ্রন্থধারীদের কারো পক্ষে ও না তারা ব্যতীত অন্য কারো পক্ষে - যে, তারা কুরআন নাযিলের পর কুরআনে যে হুকুম এসেছে তার পরিবর্তে অন্য হুকুম দ্বারা আল্লাহর ইবাদাত করবে কিংবা বিচার ফয়সালার জন্য অন্য বিধানের দ্বারস্থ হবে। কুরআন ও সুন্নায় এ বিষয়ে দলীলের সংখ্যা অনেক। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
تَبْرَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَلَمِينَ نَذِيرًا (الفرقان : 1)
"কত বরকতময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার উপর ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তিনি বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারেন”। [সূরা আল-ফুরকান: ১]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
يَاَهْلَ الْكِتٰبِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتٰبِ وَيَعْفُوا عَنْ كَثِيرٍ قَدْ جَاءَكُمْ مِّنَ اللهِ نُورُ وَكِتٰبُ مُّبِينٌ * يَهْدِي بِهِ اللهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلٰمِ وَيُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ (المائدة: ١٥-١٦)
"হে গ্রন্থধারীগণ! আমাদের রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন। তোমরা গ্রন্থের যা গোপন করতে তিনি তার অনেক কিছু তোমাদের নিকট প্রকাশ করেন এবং অনেক কিছু ছেড়ে দিয়ে থাকেন। আল্লাহর নিকট হতে এক জ্যোতি ও স্পষ্ট গ্রন্থ তোমাদের নিকট এসেছে। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চায়, এ দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং নিজ অনুমতিক্রমে অন্ধকার হতে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান, আর তাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করেন”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ১৫-১৬]

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আহলে কিতাবদের মধ্যে কুরআন দ্বারা ফয়সালা করার নির্দেশ প্রদান করে বলেন:
فَاحْكُمُ بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللهُ وَلَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَ كَ مِنَ الحَقِّ (المائدة: ٤٨)
"সুতরাং আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুসারে আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ত্যাগ করে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৪৮]

তিনি আরো বলেন:
وَأَنِ احْكُمُ بَيْنَهُم بِمَا أَنْزَلَ اللهُ وَلَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ وَاحْذَرْهُمْ أَنْ يَفْتِنُوكَ عَنْ بَعْضِ مَا انزَلَ اللهُ إِلَيْكَ (المائدة : ٤٩)
“আর আপনি আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং তাদের খেয়াল-খশীর অনুসরণ করবেন না। আর তাদের ব্যাপারে সতর্ক হোন যাতে আল্লাহ আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছেন তারা এর কোন কিছু হতে আপনাকে বিচ্যুত না করে”। [সূরা আল-মায়িদাহ : ৪৯]

আর সুন্নাহ্ থেকে দলীল হল জাবের ইবনে عبدالله রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস। তা হল উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এমন একটি গ্রন্থ নিয়ে এলেন যা তিনি আহলে কিতাবদের কারো কাছে পেয়েছিলেন। তিনি তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঠ করে শোনালেন। এতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রেগে গিয়ে বললেনঃ
أمتهوكون فيها يا ابن الخطاب والذي نفسي بيده لقد جئتكم بها بيضاء نقية، لا تسألوهم عن شيء فيخبروكم بحق فتكذبوا به أو بباطل فتصدقوا، والذي نفسي بيده لو أن موسى كان حياً، ما وسعه إلا أن يتبعني
"হে ইবনুল খাত্তাব! তোমরা কি আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে পেরেশান? যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! আমি তো শ্বেত-শুভ্র পরিচ্ছন্ন হুকুম নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছি। তোমরা আহলে কিতাবদেরকে কোন কিছু সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করো না; কেননা তারা তোমাদেরকে সত্য সংবাদ দিলে তোমরা তা মিথ্যা মনে করতে পার অথবা তারা কোন বাতিল খবর তোমাদেরকে দিলে তোমরা তা সত্য বলে ভাবতে পার। যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! যদি মূসা জীবিত থাকতেন, তবে আমার অনুসরণ না করার সাধ্য তার হতো না”¹। হাদীসটি আহমাদ, বাযযার, বায়হাকী ও অন্যান্য আরো অনেকে বর্ণনা করেছেন। সকল সনদ মিলে হাদীসটি হাসান (উত্তম)। হাদীসে ব্যবহৃত متهوکون শব্দটির অর্থ: পেরেশান।

সংক্ষিপ্তভাবে আল্লাহর গ্রন্থসমূহ সম্পর্কে এ বিশ্বাস রাখা ওয়াজিব। আল্লাহ তা'আলা চাহেত একটি পৃথক পরিচ্ছেদে বিশেষভাবে কুরআনের ক্ষেত্রে কি আক্বীদা পোষণ করা ওয়াজিব তার বিস্তারিত বিবরণ আসবে।

টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৭৪১০), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৯৩)
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৬৬১৪), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৬৫২), একটি বর্ণনায় এসেছে, "তিনি আপনার জন্য নিজ হাতে তাওরাত লিপিবদ্ধ করেছেন"。
¹ তাফসীরে ইবনে কাসীর (২/৩৬)
¹ মুসনাদে ইমাম আহমাদ (৩/৩৮৭), কাশফুল আসতার (১৩৪), শোআ'বুল ঈমান, বায়হাকী (১৭৭)

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 একথার বর্ণনা যে, তাওরাত, ইঞ্জিল ও অন্যান্য কতিপয় গ্রন্থে বিকৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং কুরআন তা থেকে মুক্ত

📄 একথার বর্ণনা যে, তাওরাত, ইঞ্জিল ও অন্যান্য কতিপয় গ্রন্থে বিকৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং কুরআন তা থেকে মুক্ত


আহলে কিতাব কর্তৃক আল্লাহর বাণীর বিকৃতি সাধন :

আহলে কিতাবগণ তাদের উপর অবতীর্ণ আল্লাহর গ্রন্থসমূহের যে বিকৃতি, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সাধন করেছিলো সে সম্পর্কে মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে অবহিত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদীদের সম্পর্কে বলেনঃ
﴿اَفَتَطْمَعُونَ اَنْ يُّؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِّنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلمَ اللهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ﴾ (البقرة: ٧٥)
"তোমরা কি এ আশা কর যে, তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? অথচ তাদের একদল আল্লাহর বাণী শ্রবণ করে, তারপর তারা তা অনুধাবন করার পর বিকৃত করে এমতাবস্থায় যে, তারা জানে”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ৭৫]

মহান আল্লাহ আরো বলেন:
﴿مِنَ الَّذِينَ هَادُوا يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَنْ مَوَاضِعِهِ ﴾ (النساء: ٤٦)
"ইয়াহুদীদের মধ্যে কিছু লোক কথাগুলো স্থানচ্যুত করে বিকৃত করে”। [সূরা আন-নিসা: ৪৬]

নাসারাদের সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿وَمِنَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصْرَى أَخَذْنَا مِيثَاقَهُمْ فَنَسُوا حَظًّا مِّمَّا ذُكِّرُوا بِهِ فَأَغْرَيْنَا بَيْنَهُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء إِلَى يَوْمِ الْقِيمَةِ وَسَوْفَ يُنَبِّئُهُمُ اللَّهُ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ * يَاهْلَ الْكِتٰبِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الكِتٰبِ وَيَعْفُوا عَنْ كَثِيرٍ ﴾ (المائدة: ١٤-١٥)
“যারা বলে, 'আমরা নাসারা' তাদেরও অঙ্গীকার আমরা গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিলো তার একাংশ তারা ভুলে গিয়েছে। সুতরাং আমরা তাদের মধ্যে ক্বিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী শত্রুতা ও বিদ্বেষ জাগরুক রেখেছি। আর তারা যা করত আল্লাহ অচিরেই তাদেরকে তা জানিয়ে দেবেন। হে গ্রন্থধারীগণ! আমাদের রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন। তোমরা গ্রন্থের যা গোপন করতে তিনি তার অনেক কিছু তোমাদের নিকট প্রকাশ করেন এবং অনেক কিছু ছেড়ে দিয়ে থাকেন”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ১৪-১৫]

এ আয়াতসমূহে এ প্রমাণ রয়েছে যে, ইয়াহুদী ও নাসারাগণ তাদের উপর অবতীর্ণ আল্লাহর গ্রন্থসমূহের বিকৃতি সাধন করেছে। কখনো এ বিকৃতি সাধিত হয়েছে (গ্রন্থে নতুন কিছু) সংযোজনের মাধ্যমে এবং কখনো (গ্রন্থের কিছু) বাদ দেয়ার মাধ্যমে।

সংযোজনের দলীল আল্লাহ তা'আলার বাণী:
۞ فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَٰذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا ۖ فَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ ۞ (البقرة : ٧٩)
"সুতরাং দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে গ্রন্থ রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে, 'এটা আল্লাহর নিকট হতে'। তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য তাদের ধ্বংস এবং তারা যা উপার্জন করেছে সে জন্য তাদের ধ্বংস”। [সূরা আল-বাকারাহ: ৭৯]

বাদ দেয়ার দলীল আল্লাহর বাণী:
۞ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ ۞ (المائدة: ١٥)
“হে গ্রন্থধারীগণ! আমাদের রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন। তোমরা গ্রন্থের যা গোপন করতে তিনি তার অনেক কিছু তোমাদের নিকট প্রকাশ করেন”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ১৫]

এবং আল্লাহর বাণী:
۞ قُلْ مَنْ أَنْزَلَ الْكِتَابَ الَّذِي جَاءَ بِهِ مُوسَىٰ نُورًا وَهُدًى لِلنَّاسِ ۖ تَجْعَلُونَهُ قَرَاطِيسَ تُبْدُونَهَا وَتُخْفُونَ كَثِيرًا ۞ (الأنعام: ٩١)
"বলুন, কে নাযিল করেছে মূসার আনীত গ্রন্থ মানুষের জন্য আলো ও হেদায়াতস্বরূপ, যা তোমরা বিভিন্ন পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ করে কিছু প্রকাশ কর ও অনেকাংশ গোপন রাখ”। [সূরা আল-আন'আম : ৯১]

তাওরাত ও ইঞ্জিলের বিকৃতি সাধন এবং এর দলীলঃ

ইতিপূর্বে যা বলা হয়েছে তা ছিলো আহলে কিতাবগণ আল্লাহর বাণী ও গ্রন্থসমূহের যে বিকৃতি সাধন করেছিলো সংক্ষিপ্তভাবে তার বর্ণনা। তবে বিশেষভাবে তাওরাত ও ইঞ্জিলে যে বিকৃতি সাধিত হয়েছে পুর্বে বর্ণিত কিছু দলীল ও অন্য আরো অনেক দলীল এর প্রমাণ বহন করছে।

তাওরাতে বিকৃতি সাধনের দলীলের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর বাণীঃ
قُلْ مَنْ أَنْزَلَ الْكِتَبَ الَّذِي جَاءَ بِهِ مُوسَى نُورًا وَ هُدًى لِلنَّاسِ تَجْعَلُونَهُ قَرَاطِيسَ تُبْدُونَهَا وَتُخْفُونَ كَثِيرًا وَعِلْمُهُمْ قَالَمْ تَعْلَمُوا أَنْتُمْ وَلَا آبَاؤُكُمْ قُلِ اللهُ ثُمَّ ذَرْهُمْ فِي خَوْضِهِمْ يَلْعَبُونَ (الأنعام: ٩١)
"বলুন, কে নাযিল করেছে মূসার আনীত গ্রন্থ মানুষের জন্য আলো ও হেদায়াতস্বরূপ, যা তোমরা বিভিন্ন পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ করে কিছু প্রকাশ কর ও অনেকাংশ গোপন রাখ এবং যা তোমাদের পিতৃপুরুষগণ ও তোমরা জানতে না তাও তোমাদেরকে শিক্ষা দেয়া হয়েছিল? বলুন, আল্লাহই; অতঃপর তাদেরকে তাদের বাতিল ধারণার উপর ছেড়ে দিন তারা খেলা করতে থাকুক”। [সূরা আল-আন'আম : ৯১]

আয়াতটির তাফসীরে এসেছে: 'অর্থাৎ মূসা যে গ্রন্থ নিয়ে এসেছিলেন তোমরা তাকে কাগজের পাতায় রাখ; যাতে তোমরা এর যে বিকৃতি ও পরিবর্তন সাধনসহ তাতে উল্লেখিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গুণাবলী গোপন করতে চাচ্ছ তা সম্পন্ন হয়'।

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
افَتَطْمَعُونَ أَنْ يُؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَمَ اللهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ ﴾ (البقرة : ٧٥)
“তোমরা কি এ আশা কর যে, তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? অথচ তাদের একদল আল্লাহর বাণী শ্রবণ করে তারপর তারা তা অনুধাবন করার পর বিকৃত করে”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ৭৫]

সুদ্দী আয়াতটির তাফসীরে বলেন, 'তা হল তাওরাত, যাকে তারা বিকৃত করেছিল'। ইবনে যায়েদ বলেন, 'যে তাওরাত আল্লাহ তাদের উপর নাযিল করেছিলেন তারা তা বিকৃত করে ফেলে, এর মধ্যে বর্ণিত হালালকে তারা হারাম, হারামকে হালাল, হককে বাতিল এবং বাতিলকে হকে পরিণত করে নিয়েছিল'।

আর ইঞ্জিলকে বিকৃত করার দলীল আল্লাহর বাণী:
﴿ وَمِنَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّا نَصْرَى أَخَذْنَا مِيْثَاقَهُمْ فَنَسُوا حَظَّامِمَّا ذُكِّرُوا بِهِ فَأَغْرَيْنَا بَيْنَهُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاء إِلَى يَوْمِ الْقِيمَةِ وَسَوْفَ يُنَبِّئُهُمُ اللَّهُ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ * يَاهْلَ الْكِتٰبِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِّمَّا كُنتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الكِتُبِ وَيَعْفُوا عَنْ كَثِيرٍ ﴾ (المائدة: ١٤-١٥)
"যারা বলে, 'আমরা নাসারা' তাদেরও অঙ্গীকার আমরা গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিলো তার একাংশ তারা ভুলে গিয়েছে। সুতরাং আমরা তাদের মধ্যে ক্বিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী শত্রুতা ও বিদ্বেষ জাগরুক রেখেছি। আর তারা যা করত আল্লাহ অচিরেই তাদেরকে তা জানিয়ে দেবেন। হে গ্রন্থধারীগণ! আমাদের রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন। তোমরা গ্রন্থের যা গোপন করতে তিনি তার অনেক কিছু তোমাদের নিকট প্রকাশ করেন এবং অনেক কিছু ছেড়ে দিয়ে থাকেন”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ১৪-১৫]

শেষোক্ত আয়াতটির তাফসীরে তাফসীরবিদ ইমামদের কেউ বলেন, 'অর্থাৎ তারা যার পরিবর্তন ও বিকৃতি সাধন করেছিলো এবং যাকে প্রকৃত অর্থ হতে ভিন্ন অর্থে প্রয়োগ করেছিলো ও এতে আল্লাহর উপর অপবাদ আরোপ করেছিল, রাসূল তা বর্ণনা করে দেবেন। আর তারা এতে যে পরিবর্তন এনেছিলো তার বহু কিছু সম্পর্কে তিনি চুপ থাকবেন, তা বর্ণনায় কোন লাভ নেই"¹。

তাওরাত ও ইঞ্জিলে বিকৃতি ও পরিবর্তন সাধিত হওয়ার উপর এ আয়াতগুলোতে প্রমাণ রয়েছে। এজন্যই মুসলিম ওলামাগণ এ বিষয়ে একমত যে, তাওরাত ও ইঞ্জিলে বিকৃতি ও পরিবর্তনের অনুপ্রবেশ ঘটেছে।

বিকৃতি থেকে কুরআনের মুক্তি ও আল্লাহ কর্তৃক এর সংরক্ষণ এবং তার দলীল : পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে যে বিকৃতি ও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে মহাগ্রন্থ আলকুরআন তা থেকে মুক্ত এবং আল্লাহর হেফাযত ও সংরক্ষণ দ্বারা সে সব কিছু থেকে তা সুরক্ষিত, যেমন আল্লাহ সে সম্পর্কে তাঁর নিম্নোক্ত বাণী দ্বারা জানিয়ে দিয়েছেন:
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَفِظُونَ ﴾ (الحجر: ٩)
"আমরাই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমরাই এর সংরক্ষক”। [সূরা আর- হিজর : ৯]

ত্বাবারী আয়াতটির তাফসীরে বলেন: 'আল্লাহ বলেন, আমি অবশ্যই কুরআনের হেফাযত করব তাতে কোন বাতিল সংযোজিত হওয়া থেকে যা কোনক্রমেই কুরআনের অন্তর্গত নয়, অথবা তার কোন হুকুম, শাস্তি ও ফরযের কোন কিছুতে ঘাটতি সৃষ্টি করা থেকে”¹。

অনুরূপভাবে আল্লাহ যে কুরআনকে সুদৃঢ় ও বিশদ ব্যাখ্যা সম্বলিত করেছেন এবং সকল প্রকার বাতিল হতে তাকে মুক্ত রেখেছেন, সে সম্পর্কে অন্যান্য আয়াতসমূহে তিনি সংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
﴿ لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ ﴾ (فصلت: ٤٢)
"কোন বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না - অগ্র হতেও নয়, পশ্চাত হতেও নয়। এটা প্রজ্ঞাময় প্রশংসিত আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ”। [সূরা ফুসিলাত : ৪২]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
الركب أحكمت ايته ثُمَّ فَصَلَتْ مِنْ لَدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍ ﴾ (هود: 1)
"আলিফ-লাম-রা, এমন গ্রন্থ যার আয়াতসমূহ সুবিন্যস্ত ও পরে প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞের নিকট হতে বিশদভাবে বিবৃত”। [সূরা হুদ: ১]

মহান আল্লাহ বলেনঃ
لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ * إِنَّ عَلَيْنَا جَمُعَهُ وَقُرَانَهُ ﴾ (القيامة : ١٦-١٧)
"তাড়াতাড়ি ওহী আয়ত্ত করার জন্য আপনি আপনার জিহ্বা এর সাথে সঞ্চালন করবেন না। এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমাদেরই”। [সূরা আল- কিয়ামাহঃ ১৬-১৭]

কুরআন নাযিল হওয়া থেকে শুরু করে সকল প্রকার পরিবর্তন ও রূপান্তর থেকে মুক্তাবস্থায় আল্লাহ নিজের কাছে তা উঠিয়ে নেয়ার অনুমতি দেয়া পর্যন্ত শব্দ ও অর্থের দিক দিয়ে তা যে আল্লাহর পরিপূর্ণ হেফাযতে রয়েছে এ আয়াতগুলোতে সে প্রমাণ বিদ্যমান; কেননা আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কুরআন শিক্ষা দেয়ার ভার নিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি তার বক্ষে তা জমা করেন। আর কুরআনের বর্ণনা ও ব্যাখ্যা রয়েছে তার পবিত্র সুন্নায়। এরপর আল্লাহ একদল বিশ্বস্ত লোক প্রস্তুত করে দিয়েছেন যারা বক্ষে ও লিপিবদ্ধ করে কুরআনকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হেফাযত করেছে। ফলে কুরআন থেকে গেছে সকল প্রকার বাতিল হতে নিরাপদ ও মুক্ত, যা দেশ-কাল ভেদে ছোট বড় সকলেই পাঠ করে, টাটকা তাজাবস্থায় যেভাবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর নাযিল হয়েছিল।

ওলামাগণ এ স্থানে একটি সুক্ষ্ম রহস্য ও চমৎকার বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যা তাওরাতে বিকৃতি সংঘটিত হতে পারা এবং কুরআনে তা সংঘটিত হতে না পারার সাথে সংশ্লিষ্ট, যেমনটি আবু 'আমর আদ-দানী বর্ণনা করেছেন আবুল হাসান আল-মুন্তাব থেকে। তিনি বলেছেন: 'আমি একদিন কাযী আবু ইসহাক ইসমা'ঈল ইবনে ইসহাকের কাছে ছিলাম। তাকে প্রশ্ন করা হল: তাওরাত অনুসারীদের উপর পরিবর্তন সাধনের ব্যাপারটি কেন ছাড়পত্র পেল অথচ কুরআন অনুসারীদের কাছে তা পেল না? কাযী সাহেব বললেন, মহান আল্লাহ তাওরাত গ্রন্থধারীদের ব্যাপারে বলেছেন:
بِمَا اسْتُحْفِظُوا مِن كتب الله (المائدة : ٤٤)
"কারণ তাদেরকে আল্লাহর গ্রন্থ সংরক্ষন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৪]

আল্লাহ হেফাযতের ভারটি তাদের উপর অর্পণ করেছেন। ফলে তাদের ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। অথচ কুরআন সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেনঃ
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَفِظُونَ ﴾ (الحجر : ٩)
“আমরাই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমরাই এর সংরক্ষক”। [সূরা আল- হিজর : ৯]

ফলে কুরআন অনুসারীদের ক্ষেত্রে পরিবর্তন হতে পারেনি'। আবু 'আমর বললেন, এরপর আমি আবু عبدالله আল-মুহামেলীর কাছে গেলাম। তাকে ঘটনাটি বললাম। তিনি বললেন, 'আমি এর চেয়ে সুন্দর কথা আর শুনিনি'।

টিকাঃ
¹ তাফসীরে ইবনে কাসীর (৩/৬৩)
¹ তাফসীরে ইবনে জারীর (১৪/৭)

📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 কুরআনের প্রতি ঈমান ও এর বৈশিষ্ট্য

📄 কুরআনের প্রতি ঈমান ও এর বৈশিষ্ট্য


কুরআন, হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নববীর সংজ্ঞা এবং শেষোক্ত দু'টির মধ্যে পার্থক্য:

কুরআন কারীম হল আল্লাহর বাণী যা তাঁর কাছ থেকে প্রকাশ পেয়েছে (আমাদের জানা) কোন অবয়ব ছাড়াই এবং তিনি স্বীয় রাসূলের উপর ওহীরূপে তা অবতীর্ণ করেছেন। আর মু'মিনগণও তেমনিভাবে একে সত্য হিসাবে মেনে নিয়েছে এবং এ দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করেছে যে, তা প্রকৃতই আল্লাহর বাণী, যা জিবরীল আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা'আলার কাছ থেকে শুনেছেন এবং এর শব্দ ও অর্থসহ আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর তা নাযিল করেছেন। মুতাওয়াতির পন্থায়¹ তা বর্ণিত, একীন ও প্রত্যয় সৃষ্টি করে, মুসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ এবং সকল পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হতে সংরক্ষিত²。

আর হাদীসে কুদসী হল যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শব্দ ও অর্থসহ স্বীয় প্রতিপালকের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন। আর তা আমাদের কাছে অল্পসংখ্যক বর্ণনাকারীর মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে, কিংবা মুতাওয়াতির পন্থায় বর্ণিত হয়েছে, তবে মুতাওয়াতির হওয়ার ব্যাপারটি কুরআনের সমপর্যায় পর্যন্ত পৌছতে পারেনি।

এর উদাহরণ হল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত আবু যর গিফারীর হাদীস। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় মহান প্রতিপালকের কাছ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: “হে আমার বান্দাগণ! আমি আমার নিজের উপর যুলুম করাকে হারাম করেছি এবং তোমাদের মধ্যেও তা হারাম করে দিয়েছি। সুতরাং তোমরা যুলুম করো না”¹。

হাদীসে নববী হল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে যে কথা, কাজ, মৌন সম্মতি অথবা গুণাবলীর সম্বন্ধ স্থাপন করা হয়²。

কুরআন, হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নববীর মধ্যে পার্থক্য হল : কুরআনের তেলাওয়াত ইবাদাত হিসাবে গণ্য, এর শব্দমালা মু'জিযা স্বরূপ যদ্বারা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া হয়েছিল। অযু নেই এমন ব্যক্তির জন্য তা স্পর্শ করা, অপবিত্র ব্যক্তি ও অনুরূপ কারোর জন্য তা তেলাওয়াত করা এবং (শব্দ বাদ দিয়ে শুধু) এর অর্থ রেওয়ায়েত করা হারাম। নামাযে তা পাঠ করা অপরিহার্য। এর পাঠককে প্রত্যেক হরফের বিনিময়ে একটি নেকী দেয়া হবে এবং প্রত্যেক নেকী দশ নেকীতে পরিণত হবে। হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নববী এর ব্যতিক্রম; কেননা এ দু'টি তদনুরূপ নয়।

আর হাদীসে কুদসী ও হাদীসে নববীর মধ্যে পার্থক্য হল : হাদীসে কুদসীর শব্দ ও অর্থ দু'টোই আল্লাহর বাণীর অন্তর্গত, যা হাদীসে নববীর বিপরীত; কেননা হাদীসে নববী শব্দ ও অর্থের দিক থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীর অন্তর্গত। আর হাদীসে কুদসী হাদীসে নববীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ; কেননা আল্লাহর বাণী সৃষ্টিজগতের বাণীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ³。

কুরআনের প্রতি ঈমানের বৈশিষ্ট্য : ইতিপূর্বে সাব্যস্ত হয়েছে যে, আল্লাহর গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন ঈমানের রুকনসমূহের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন। আর মহাগ্রন্থ আল-কুরআন যখন পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থের রহিতকারী, সেগুলোর সত্যাসত্যের নিরূপক এবং আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত লাভ ও তার উপর এ গ্রন্থ নাযিলের পর জ্বিন-ইনসান সকলের জন্য তা দ্বারা ইবাদাত পালন করা অপরিহার্য, তখন এ গ্রন্থের প্রতি ঈমান আনয়নের ব্যাপারটি অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ দ্বারা মহিমান্বিত। গ্রন্থসমূহের প্রতি ঈমান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে সব বিষয় সংক্ষিপ্তভাবে করা হয়েছিলো সেগুলো ছাড়াও কুরআনের প্রতি ঈমান পূর্ণ হওয়ার জন্য আরো কিছু বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ থাকা অত্যন্ত জরুরী। এ সব বৈশিষ্ট্য হল:

১. এ বিশ্বাস স্থাপন করা যে, কুরআনের দাওয়াত ব্যাপক এবং কুরআন যে শরীয়ত নিয়ে এসেছে তা জ্বিন ও ইনসান এ দু' জাতির সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর প্রতি ঈমান না এনে তাদের কোন গত্যন্তর নেই এবং এতে যা কিছু শরীয়তসম্মত করা হয়েছে তাছাড়া অন্য কিছু দ্বারা আল্লাহর ইবাদাত করার সাধ্য তাদের নেই। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
تَبْرَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَلَمِينَ نَذِيرًا ﴾ (الفرقان : (۱)
"কত বরকতময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তিনি বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারেন”। [সূরা আল-ফুরকান: ১]

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভাষায় সংবাদ দিয়ে আরো বলেন:
وَأُوحِيَ إِلى هذا القرآن الأَنْذِرَكُم بِهِ وَمَنْ أَبْلَم (الأنعام: ١٩)
“আর এ কুরআন আমার নিকট ওহী করা হয়েছে, যেন তোমাদেরকে এবং যার নিকট তা পৌঁছবে তাদেরকে এদ্বারা সতর্ক করতে পারি”। [সূরা আল-আন'আম : ১৯]

আল্লাহ তা'আলা জ্বিন সম্পর্কে খবর দিয়ে বলেনঃ
انا سمعنا قرانا عَجَبًا * يَهْدِى إِلَى الرشد قامنا يه (الجن: ١-٢)
"আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করেছি, যা সঠিক পথনির্দেশ করে; তাই আমরা তার উপরা ঈমান এনেছি”। [সূরা আল-জ্বিন: ১-২]

২. এ বিশ্বাস করা যে, কুরআন পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থকে রহিত করে দিয়েছে। অতএব কুরআন নাযিলের পরে আহলে কিতাবগণ ও অন্য কারো জন্য কুরআন ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা আল্লাহর ইবাদাত করা জায়েয নেই। অতএব কুরআন যা নিয়ে এসেছে তা ছাড়া অন্য কোন দ্বীন নেই এবং আল্লাহ কুরআনে যা প্রণয়ন করেছেন তা ছাড়া অন্য কোন ইবাদাত নেই। কুরআনে যা হালাল করা হয়েছে তা ছাড়া কোন হালাল নেই এবং কুরআনে যা হারাম করা হয়েছে তা ছাড়া কোন হারাম নেই। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ (آل عمران : ٨٥)
"কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হবে না"। [সূরা আলে-ইমরান: ৮৫]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ (النساء : ١٠٥)
"আমরা তো আপনার প্রতি সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি যাতে আপনি আল্লাহ আপনাকে যা জানিয়েছেন সে অনুযায়ী মানুষের মধ্যে বিচার মীমাংসা করেন"। [সূরা আন-নিসা: ১০৫]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে তার সাহাবাদেরকে আহলে কিতাবদের গ্রন্থসমূহ পাঠ করতে নিষেধ করেছিলেন জাবের ইবনে আব্দুল্লাহর হাদীসে সে কথা ইতিপূর্বে বলা হয়েছে। সেখানে তার এ বাণী রয়েছে:
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ أَنَّ مُوسَى كَانَ حَيًّا مَا وَسِعَهُ إِلَّا أَنْ يَتَّبِعَنِي
"... যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! যদি মূসা জীবিত থাকতেন তাহলে আমার অনুসরণ ব্যতীত তার আর কোন অবকাশ ছিলো না"¹。

৩. আল-কুরআন যে শরীয়ত নিয়ে এসেছে তা হল উদার এবং সহজ। পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের শরীয়ত ছিলো এর বিপরীত; কেননা সে সব শরীয়তে ছিলো বহু গুরুভার ও এমন সব শৃংখল যা সে শরীয়তের অনুসারীদের উপর আরোপ করে দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ (الأعراف: ١٥٧)
"যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নবীর, যার উল্লেখ তারা তাদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিপিবদ্ধ পায়, যিনি তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেন এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন, তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন ও অপবিত্র বস্তু হারাম করেন, আর তাদেরকে তাদের গুরুভার ও শৃংখল হতে মুক্ত করেন যা তাদের উপর ছিল”। [সূরা আল-আ'রাফ : ১৫৭]

৪. আল্লাহর গ্রন্থসমূহের মধ্যে কুরআনই একমাত্র সেই গ্রন্থ যার শব্দ এবং অর্থকে আল্লাহ শাব্দিক ও অর্থের দিক দিয়ে বিকৃতি হতে হেফাযত করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِكرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَفِظُونَ (الحجر: 9)
“নিশ্চয়ই আমরা কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমরাই এর সংরক্ষক"। [সূরা আল-হিজরঃ৯]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ (فصلت : ٤٢)
"কোন বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না - অগ্র হতেও নয়, পশ্চাৎ হতেও নয়। এটা প্রজ্ঞাময় প্রশংসিত আল্লাহর নিকট হতে অবতীর্ণ”। [সূরা ফুসিলাত: ৪২]

আল্লাহ তা'আলা যেমনটি চেয়েছেন এবং প্রণয়ন করেছেন সে অনুযায়ী কুরআনকে ব্যাখ্যা ও স্পষ্ট করার নিজ দায়িত্বের কথা বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন:
إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ * فَإِذَا قَرَأَنَهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ * ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَة (القيامة: ١٧-١٩)
"এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমাদেরই। সুতরাং যখন আমরা তা পাঠ করি আপনি সে পাঠের অনুসরণ করুন। অতঃপর এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্ব আমাদেরই”। [সূরা আল-ক্বিয়ামাহ : ১৭-১৯]

ইবনে কাসীর শেষের আয়াতটির তাফসীরে বলেন: 'অর্থাৎ কুরআনকে হেফাযত ও তেলাওয়াত করার পর আমি তা আপনার জন্য বর্ণনা করি, স্পষ্ট করে দেই এবং আমার ইচ্ছা ও প্রণীত শরীয়ত অনুযায়ী এর অর্থ আপনাকে জানিয়ে দেই'। আল্লাহ তা'আলা তাঁর গ্রন্থকে হেফাযত করার জন্য সুপন্ডিত ওলামাদের মধ্য থেকে এমন লোকদের প্রস্তুত করে দিয়েছেন যারা উত্তমভাবে এ দায়িত্ব পালন করেছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় থেকে আজ পর্যন্ত। তারা কুরআনের শব্দকে হেফাযত করেছেন, এর অর্থ উপলদ্ধি করেছেন এবং কুরআন অনুযায়ী আমলের উপর তারা সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তারা কুরআনকে হেফাযত করার ও কুরআনের খেদমাত করার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই বড় বড় গ্রন্থ সংকলন করেছেন। তাদের কেউ সংকলন করেছেন কুরআনের তাফসীর, কেউ সংকলন করেছেন এর লিখন ও পঠন পদ্ধতি, কেউ এর সুস্পষ্ট ও অবোধগম্য বিষয়গুলোকে সংকলিত করেছেন, কেউ সংকলন করেছেন এর মক্কী ও মাদানী আয়াতসমূহ, কেউ কুরআন থেকে হুকুম বের করার বিষয়টি সংকলন করেছেন, কেউ এর নাসেখ (রহিতকারী) ও মানসুখ (রহিত) সম্পর্কে লিখেছেন, কেউ লিখেছেন এর নাযিলের কারণসমূহ, কেউ সংকলন করেছেন এর উপমা ও প্রবচনসমূহ, কেউ এর মু'জিযা সম্পর্কে লিখেছেন, কেউ সংকলন করেছেন এর অপরিচিত শব্দমালা, আবার কেউ এর ই'রাব (বাক্যস্থিত পদ সম্পর্কিত আলোচনা) সংকলন করেছেন প্রভৃতি আরো সে সব ক্ষেত্র যার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক স্বীয় গ্রন্থের হেফাযতকার্য সম্পন্ন হয়েছে; কেননা তিনি তাঁর গ্রন্থ ও এর ইলমসমূহের খেদমাতের জন্য এ সকল ওলামাদেরকে প্রস্তুত করেছিলেন। ফলে কুরআন এমনই সংরক্ষিত থেকে যায় যে, তা ঠিক যেভাবে নাযিল হয়েছিলো সেরকম টাটকা ও সতেজ থেকে এর পঠন ও তাফসীর করার কাজ সম্পাদিত হচ্ছে।

৫. কুরআন কারীমে মু'জিযার বেশ কিছু দিক রয়েছে যাতে অন্যান্য অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহও শরীক রয়েছে। সার্বিকভাবে কুরআন হল বিরাট মু'জিযা এবং আল্লাহর হৃদয়গ্রাহী স্থায়ী প্রমাণ যদ্বারা আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার অনুসারীদেরকে ক্বিয়ামত অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত সাহায্য করেছেন। ইমাম বুখারী ও মুসলিম আবু হুরায়রার হাদীস হতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন:
«ما من الأنبياء نبي إلا أعطي من الآيات ما مثله آمن عليه البشر، وإنما كان الذي أوتيته وحياً أوحاه الله إلي فأرجو أن أكون أكثرهم تابعاً يوم القيامة»¹
"আম্বিয়াগণের মধ্য হতে প্রত্যেক নবীকেই এমন নিদর্শন প্রদান করা হয়েছে যার মত নিদর্শনের উপর মানুষ ঈমান এনেছিলো, আর ওহীরূপে আমাকে যা দেয়া হয়েছিলো তা আল্লাহ শুধু আমার প্রতিই প্রেরণ করেছেন। আমি আশা করি কিয়ামাতের দিন আমিই নবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী অনুসারী নিয়ে উপস্থিত হব”।

কুরআন মু'জিযা হওয়ার দিকসমূহের মধ্যে রয়েছে এর সুন্দর সংকলন, বিশুদ্ধতা ও হৃদয়গ্রাহীতা। মানব ও জ্বিনের উদ্দেশ্যে কুরআনের অনুরূপ একটি গ্রন্থ কিংবা এর কিয়দংশ নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া হয়েছিলো তিনটি স্তরে:

কুরআনের অনুরূপ নিয়ে আসার জন্য আল্লাহ তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কিন্তু তারা অপারগ হয়ে তা করতে পারেনি। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
أَمْ يَقُولُونَ تَقَوَّلَهُ بَلْ لَا يُؤْمِنُونَ * فَلْيَأْتُوا بِحَدِيثٍ مِثْلِهِ إِن كَانُوا صَدِقِينَ (الطور : ٣٣-٣٤)
"তারা কি বলে, 'এ কুরআন তার নিজের রচনা'? বরং তারা ঈমান রাখে না। তারা যদি সত্যবাদী হয় তবে এর মত কোন বক্তব্য তারা উপস্থিত করুক না!" [সূরা আত-তুর: ৩৩-৩৪]

আল্লাহ তা'আলা এ কাজে তাদের অপারগতা নিশ্চিত করে বলছেন:
قُلْ لِينِ اجْتَمَعَتِ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لبعض ظهيرا (الإسراء: ۸۸)
"বলুন, যদি কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনয়নের জন্য মানুষ ও জ্বিন সমবেত হয় এবং যদি তারা পরস্পরকে সাহায্যও করে, তবু তারা এর অনুরূপ আনয়ন করতে পারবে না"। [সূরা আল-ইসরা : ৮৮]

এরপর তিনি তাদেরকে কুরআনের অনুরূপ দশটি সূরা নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। কিন্তু তারা এতেও সমর্থ হয়নি। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
أمْ يَقُولُونَ افْتَرَبْهُ قُلْ فَأْتُوا بِعَشْرِ سُورٍ مِثْلِهِ مُفْتَرَيْتٍ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ صَدِقِينَ (هود: ۱۳)
"তারা কি বলে, 'তিনি নিজে তা রচনা করেছেন'? বলুন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে তোমরা এর অনুরূপ দশটি স্বরচিত সূরা আনয়ন কর এবং আল্লাহ ব্যতীত অপর যাকে পার ডেকে নাও”। [সূরা হুদ: ১৩]

এরপর তৃতীয়বার তাদেরকে কুরআনের একটি সূরার অনুরূপ নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ করেন। কিন্তু তারা তাও পারল না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَابَهُ قُلْ فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِثْلِهِ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ صدقين (یونس: ۳۸)
"তারা কি বলে, 'তিনি তা রচনা করেছেন'? বলুন, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা আনয়ন কর এবং আল্লাহ ব্যতীত অপর যাকে পার আহ্বান কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও”। [সূরা ইউনুস: ৩৮]

এদ্বারা কুরআনের মু'জিযা সবচেয়ে সুন্দর ও সুদৃঢ় পন্থায় সাব্যস্ত হল। কেননা কুরআনের একটি সূরার অনুরূপ নিয়ে আসার সর্বনিম্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সৃষ্টি অপারগ হল। অথচ কুরআনের সবচেয়ে ছোট সূরা হল তিন আয়াতবিশিষ্ট।

৬. মানুষের দ্বীন, দুনিয়া, জীবিকা ও আখিরাতের যত কিছুর প্রতি সে মুখাপেক্ষী আল-কুরআনে আল্লাহ তা'আলা তার সব কিছুই বর্ণনা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَبَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْ وَهُدًى وَرَحْمَةً وَبُشْرَى لِلْمُسْلِمِينَ ﴾ (النحل: ۸۹)
"আর আমরা আপনার উপর গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি প্রত্যেক বস্তুর স্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরূপ এবং মুসলমানদের জন্য হেদায়াত, করুণা ও সুসংবাদস্বরূপ”। [সূরা আন-নাহল: ৮৯]

আল্লাহ তা'আলা বলেন:
ما فرطنا في الكتب من شي (الأنعام: ٣٨)
"এ গ্রন্থে আমরা কোন কিছুই বাদ দেইনি”। [সূরা আল-আন'আম: ৩৮]

ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'এ কুরআনে সকল জ্ঞান অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং কুরআনে আমাদের জন্য সব কিছু বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে'।

৭. আল্লাহ তা'আলা উপদেশ গ্রহণকারী ও চিন্তাশীলের জন্য কুরআনকে সহজ করে দিয়েছেন। এটা তার সবচেয়ে মহান বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَلَقَدْ يَتَرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ ﴾ (القمر : ١٧)
"অবশ্যই উপদেশ গ্রহণের জন্য আমরা কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?” [সূরা আল-কামার: ১৭]

মহান আল্লাহ আরো বলেন:
﴿كتبُ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَرَكُ لِيَدَّبَّرُوا آيَتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُوا الْأَلْبَابِ﴾ (ص: ۲۹)
"এ এক কল্যাণময় গ্রন্থ, আমরা তা আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ গ্রহণ করে উপদেশ”। [সূরা সাদঃ২৯]

মুজাহিদ প্রথম আয়াতটির তাফসীরে বলেন: 'অর্থাৎ এর পঠনকে আমি সহজ করে দিয়েছি'¹। আর সুদ্দী বলেন: 'আমরা এর তেলাওয়াতকে জিহ্বার জন্য সহজ করে দিয়েছি'। ইবনে আব্বাস বলেন: 'যদি আল্লাহ মানুষের বাকযন্ত্রের উপর একে সহজ করে না দিতেন, তাহলে সৃষ্টির কেউই আল্লাহর বাণী উচ্চারণ করতে সমর্থ হতো না'। ত্বাবারী এবং তাফসীরের ইমামদের আরো অনেকে উল্লেখ করেন যে, কুরআনকে সহজকরণের বিষয়টিতে শামিল রয়েছে তেলাওয়াতের জন্য এর শব্দকে সহজ করা এবং চিন্তাভাবনা ও উপদেশ গ্রহণের জন্য এর অর্থকে সহজ করা'²। আর কুরআনও মূলতঃ এরকমই, যেমনটি এ ব্যাপারে লক্ষ্য করা গেছে।

৮. কুরআনে আরো সন্নিবেশিত আছে পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের সকল শিক্ষার সারাংশ ও রাসূলগণের শরীয়তসমূহের মৌলিক দিকগুলো। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتٰبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتٰبِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ﴾ (المائدة : ٤٨)
"আমরা আপনার প্রতি সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি ইতিপূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহের সত্যতা প্রতিপন্নকারী ও সেগুলোর সত্যাসত্য নিরূপকরূপে”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৮]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ﴾ (الشورى ۱۳)
"তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই সব হুকুম প্রণয়ন করেছেন যার নির্দেশ দিয়েছেন নূহকে, আর যা আপনার প্রতি আমরা ওহী হিসাবে প্রেরণ করেছি, এবং যার নির্দেশ আমরা ইব্রাহীম, মুসা ও 'ঈসাকে দিয়েছিলাম এ মর্মে যে, তোমরা দ্বীন (তথা যাবতীয় আক্বীদা ও আহকাম) প্রতিষ্ঠা কর এবং এতে বিচ্ছিন্ন হয়োনা”। [সূরা আশ-শুরাঃ১৩]

৯. কুরআনে রয়েছে রাসূলগণ ও পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ইতিহাস এবং এর এমন বিশদ ব্যাখ্যা আগের কোন গ্রন্থে যার জুড়ি মেলে না। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَكُلًّا نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الرُّسُلِ مَا نَتَيْتُ بِهِ فُؤَادَكَ (هود: ۱۲۰)
"রাসূলদের ঐ সকল বৃত্তান্ত আমরা আপনার নিকট বর্ণনা করছি, যদ্বারা আমরা আপনার চিত্তকে দৃঢ় করি”। [সূরা হুদ: ১২০]

আল্লাহ আরো বলেন:
ذَلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْقُرَى نَقُصُّهُ عَلَيْكَ مِنْهَا قَالَمُ وَحَصِيدُ (هود: ۱۰۰)
“এটা জনপদসমূহের কিছু সংবাদ যা আমরা আপনার নিকট বর্ণনা করছি। সে জনপদের কিছু এখনো বিদ্যমান এবং কিছু নির্মূল হয়েছে”। [সূরা হুদঃ ১০০]

আল্লাহ আরো বলেন:
كَذلِكَ نَقْصُ عَلَيْكَ مِنْ أَبْنَاء مَا قَدْ سَبَقَ وَقَدْ بَيْنَكَ مِنْ لَدُنَا ذِكْرًا (طه: ۹۹)
“পূর্বে যা ঘটেছে তার সংবাদ আমরা এভাবে আপনার নিকট বর্ণনা করি এবং আমরা আমাদের নিকট হতে আপনাকে দান করেছি উপদেশ”। [সূরা ত্বাহা : ৯৯]

১০. নাযিলের দিক থেকে কুরআন আল্লাহর সর্বশেষ গ্রন্থ এবং অন্য গ্রন্থসমূহের উপর সাক্ষী। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقَا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنْزَلَ التَّوْرَيَةَ وَالْإِنْجِيلَ * مِنْ قَبْلُ هُدًى لِلنَّاسِ وَاَنْزَلَ الْفُرْقَانَ (آل عمران : ৩-৪)
"তিনি সত্যসহ আপনার প্রতি গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন, যা তার পূর্বের গ্রন্থসমূহের সত্যতা প্রতিপন্নকারী। আর তিনি অবর্তীণ করেছিলেন তাওরাত ও ইঞ্জিল - ইতিপূর্বে মানবজাতির হেদায়াতের জন্য। আর তিনি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন"। [সূরা আলে-ইমরান: ২-৪]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
(وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ )
( المائدة : ٤٨ )
“এবং আমরা আপনার প্রতি সত্যসহ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি ইতিপূর্বে অবতীর্ণ গ্রন্থসমূহের সত্যতা প্রতিপন্নকারী ও সেগুলোর সত্যাসত্য নিরূপকরূপে”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৮]

এ হল অন্যান্য গ্রন্থসমূহের উপর কুরআন কারীমের কিছু বৈশিষ্ট্য যার প্রতি বিশ্বাস রেখে ইলম ও আমলের দিক থেকে একে বাস্তবায়ন না করলে কুরআনের প্রতি ঈমান বাস্তবায়িত হয় না। আল্লাহ তা'আলাই অধিক অবগত।

টিকাঃ
¹ মুতাওয়াতির হল সে বর্ণনা যা এত অধিক সংখ্যক বর্ণনাকারীগণ কর্তৃক বর্ণিত হয় যে, বর্ণিত বিষয়ে তাদেরকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা অসম্ভব। ফলে বর্ণনাটি সকল সন্দেহের ঊর্ধে উঠে যায় এবং তাতে দৃঢ় প্রত্যয় ও আস্থা জন্মে - অনুবাদক。
² শরহ আলআক্বীদাতুত ত্বাহাবিয়্যাহ (১/১৭২), মাবাহিস ফী 'উলুমুল কুরআন, মান্না' আলকাত্তান (পৃঃ ২১), কাওয়া'য়েদুত তাহদীস, জামালুদ্দীন আলকাসেমী (পৃঃ ৬৫)
¹ এটি বর্ণনা করেছেন মুসলিম (হাদীস নং ২৫৭৭)
² মুস্তালাহুল হাদীস, ইবনে উসাইমীন পৃঃ৭, কাওয়ায়েদুস তাহদীস, কাসেমী (পৃঃ ৬১-৬২)
³ কাওয়া'য়েদুত তাহদীস, কাসেমী (পৃঃ ৬৫-৬৬)
¹ ইমাম আহমাদ এটি বর্ণনা করেছেন মুসনাদে (৩/৩৮৭), তিনি ছাড়া অন্যরাও এটি বর্ণনা করেন。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৪৯৮১), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৫২)。
¹ তাফসীরে ইবনে কাসীর (৮/৫৬৩)
² তাফসীরে ইবনে জারীর (২৭/৯৬)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00