📘 উসূলুল ঈমান (ঈমানের মৌলিক নীতিমালা) > 📄 শির্ক, কুফর ও এতদুভয়ের প্রকারণ

📄 শির্ক, কুফর ও এতদুভয়ের প্রকারণ


সন্দেহ নেই, মুসলমান যদি শির্ক ও কুফ্র, এগুলোর কার্যকারণ, উপায়- উপকরণ এবং প্রকারসমূহ জানতে পারে, তবে তাতে বিরাট উপকার রয়েছে, যদি এসব অনিষ্ট থেকে মুক্ত থাকার জন্য এবং এসব বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার ইচ্ছায় সে এ সম্পর্কিত জ্ঞান লাভ করে থাকে। সত্যের পথ জেনে নেয়া আল্লাহ পছন্দ করেন, যেন সে পথকে ভালবেসে সে পথে চলা যায়। আর বাতিলের পথসমূহ জেনে নেয়াও আল্লাহ পছন্দ করেন, যেন সে পথকে ঘৃণা করে সে পথ থেকে সরে থাকা যায়।

কল্যাণকে বাস্তবায়নের জন্য কল্যাণের পথ জেনে নেয়া যেমন একজন মুসলমানের জন্য কাম্য, তেমনি অনিষ্টের পথসমূহ থেকে সতর্ক থাকার জন্য সেগুলো জেনে নেয়াও তার জন্য কাম্য। এজন্য সহীহ বুখারী ও মুসলিমে হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে সাব্যস্ত হয়েছে, তিনি বলেছেন: 'মানুষ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কল্যাণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করত। আর অনিষ্ট আমাকে পেয়ে বসবে এ ভয়ে তাকে আমি অনিষ্ট সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতাম”¹。

উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: 'যে ব্যক্তি জাহেলিয়াত সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না, সে ইসলামের মধ্যে প্রতিপালিত হলে ইসলামের রশি একটি একটি করে ছিঁড়ে যাবে'।

কুরআন কারীম সে সকল আয়াতে ভরপুর যা শির্ক ও কুফরের বর্ণনা দিয়েছে, শির্ক ও কুফরে লিপ্ত হওয়া থেকে সতর্ক করে দিয়েছে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে এতদুভয়ের মন্দ পরিণামের উপর প্রমাণ বহন করছে। বরং এটা কুরআন কারীম ও পবিত্র সুন্নার একটা মহান উদ্দেশ্য। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَكَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَتِ وَلِتَسْتَبِينَ سَبِيلُ الْمُجْرِمِينَ (الأنعام : ٥٥)
"এভাবে আমরা আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করি; আর যেন এতে অপরাধীদের পথ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়”। [সূরা আল-আন'আম ঃ৫৫]

নিচে এদিকের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ করা হল।

প্রথম বিষয়: শির্ক

ক. সংজ্ঞা: অভিধানে শির্কের অর্থ হল দু'টো বস্তুর মধ্যে সমতা বিধান করা। আর শরীয়তে এর দু'টো অর্থ রয়েছে: ব্যাপক অর্থ ও বিশেষ অর্থ।

১. ব্যাপক অর্থ: মহান আল্লাহর যে সব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেসবের কোন কিছুতে পায়রুল্লাকে তাঁর সাথে সমান করে দেয়া। এ অর্থের অধীনে রয়েছে তিনটি প্রকার:

প্রথম : রুবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বে শির্ক করা। আর তা হল গায়রুল্লাহ (তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু)কে আল্লাহর সাথে এমন ক্ষেত্রে সমান বলে নির্ধারণ করা, যা প্রভুত্বের বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত। অথবা সেসব বৈশিষ্ট্যের কোন কিছু গায়রুল্লার প্রতি সম্পর্কিত করা (অর্থাৎ সে বৈশিষ্ট্যগুলো গায়রুল্লার আছে এমনটি বলা)। যেমন সৃষ্টিকরা, রিযিক দান, অস্তিত্ব প্রদান, মৃত্যু দান করা, বিশ্বজগতের পরিচালনা ইত্যাদি। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ يَرْزُقُكُو مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلا هُوَ فَأَنَّى تُؤْفَكُونَ ﴾ (فاطر: ৩)
"আল্লাহ ব্যতীত কি কোন স্রষ্টা আছে, যে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন হতে রিযিক দান করে? তিনি ব্যতীত কোন হকু ইলাহ্ নেই। সুতরাং কিভাবে তোমরা ফিরে যাচ্ছ? [সূরা ফাতির : ৩]

দ্বিতীয়: আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে শির্ক করা। আর তা হল গায়রুল্লাকে এসবের কোন কিছুতে আল্লাহর সমান বলে নির্ধারণ করা। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ (الشورى: ۱۱)
"কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”। [সূরা আশ-শূরা :১১]

তৃতীয় : উলুহিয়‍্যাহ তথা ইবাদাতের ক্ষেত্রে শির্ক করা। আর তা হল গায়রুল্লাকে এমন কিছুতে আল্লাহর সমান বলে নির্ধারণ করা, যা আল্লাহর ইলাহ্ হওয়ার বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত। যেমন সালাত, সিয়াম, দো'আ, বিপদাপদ থেকে উদ্ধারের প্রার্থনা, যবেহ করা, মানত করা ইত্যাদি।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللهِ أَنْدَادًا يوم حب الله ﴾ (البقرة : ١٦٥)
"মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ ছাড়া অপরকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে এবং আল্লাহকে ভালবাসার ন্যায় তাদেরকে ভালবাসে”। [সূরা আল-বাকারাহ: ১৬৫]

২. বিশেষ অর্থ: আর তা হল আল্লাহর জন্য একজন সমকক্ষ স্থির করে তাকে এমনভাবে আহ্বান করা যেভাবে আল্লাহকে আহ্বান করা হয়, তার কাছে এমনভাবে শাফা'আত চাওয়া যেভাবে আল্লাহর কাছে চাওয়া হয়, তার কাছে এমনভাবে আশা করা যেভাবে আল্লাহর কাছে আশা করা হয়, তাকে এমনভাবে ভালবাসা যেভাবে আল্লাহকে ভালবাসা হয়। কুরআন ও সুন্নায় 'শির্ক' শব্দ ব্যবহৃত হলে এ অর্থই সর্বপ্রথম মনে উদিত হয়।

খ. শির্কের নিন্দা জ্ঞাপন এবং এর ভয়াবহতা বর্ণনার উপর দলীল-প্রমাণাদি :

শির্কের নিন্দা জ্ঞাপন, তা থেকে সতর্ককরণ এবং মুশরিকদের উপর দুনিয়া ও আখিরাতে শির্কের বিপদ ও মন্দ পরিণাম সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নার দলীলসমূহ বিভিন্নভাবে প্রমাণ পেশ করছে।

১. আল্লাহ তা'আলা জানিয়েছেন যে, শির্ক হচ্ছে সেই পাপ যা তিনি মৃত্যুর পূর্বে তা থেকে তাওবা করা ছাড়া কোনমতেই ক্ষমা করবেন না। তিনি বলেন:
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ ﴾ (النساء : ٤٨)
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এতদ্ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন"। [সূরা আন-নিসা : ৪৮]

২. আল্লাহ শির্ককে সবচেয়ে বড় যুলুম বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেনঃ
﴿إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ ﴾ (لقمان: ۱۳)
"নিশ্চয়ই শির্ক বড় যুলুম”। [সূরা লুকমান: ১৩]

৩. আল্লাহ আরো জানিয়েছেন যে, শির্ক আমলসমূহকে নষ্ট করে দেয়। তিনি বলেনঃ
وَ لَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ ﴾(الزمر : ٦٥)
“আপনার প্রতি ও আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি নিশ্চয়ই ওহী পাঠানো হয়েছে যে, আপনি শির্ক করলে অবশ্যই আপনার আমল নষ্ট হয়ে যাবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন”। [সূরা আয-যুমার: ৬৫]

৪. আল্লাহ আরো বর্ণনা করেছেন যে, শির্ক করার মধ্যে রয়েছে বিশ্বজগতের প্রভু আল্লাহর প্রতি ত্রুটি আরোপ এবং তাঁর সাথে অন্যের সমতা বিধান। তিনি বলেন:
قَالُوا وَهُمْ فِيهَا يَخْتَصِمُونَ * تَاللهِ إِنْ كُنَّا لَفِي ضَلَلٍ مُبِينٍ * إِذْ نُسَوِيكُمْ بِرَبِّ الْعَلَمِينَ ) (الشعراء: ٩٦-٩٨)
“তারা সেখানে বিতর্কে লিপ্ত হয়ে বলবে, আল্লাহর শপথ! আমরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিলাম, যখন আমরা তোমাদেরকে জগতসমূহের প্রতিপালকের সমকক্ষ গণ্য করতাম”। [সূরা আশ-শু'আরা: ৯৬-৯৮]

৫. তিনি আরো জানিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি শির্ক অবস্থায় মারা যায়, সে সর্বদা জাহান্নামের আগুনে অবস্থান করবে। তিনি বলেনঃ
إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ ) (المائدة: ۷۲)
“কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই নিষিদ্ধ করবেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৭২]

এগুলো ছাড়াও রয়েছে আরো বহু প্রকার দলীল। কুরআন কারীমে সেসবের সংখ্যা অনেক।

গ. শির্কে নিপতিত হওয়ার কারণ:

বনী আদমের মধ্যে শির্ক সংঘটিত হওয়ার মূল কারণ সৎ ও মহান ব্যক্তিদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি এবং তাদের প্রশংসা, স্তুতিবর্ণনা ও গুণকীর্তনে সীমাতিক্রম করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَقَالُو لَا تَذَرُنَّ الْهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَ وَدًّا وَلَا سُوَاعَاهُ وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسُرًا * وَقَدْ أَضَلُّوا كَثِيرًا وَلَا تَزِدِ الظَّلمين الاضللًا (نوح: ٢٣-٢٤)
“আর তারা বলেছিল, 'তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের উপাস্যদেরকে, পরিত্যাগ করো না ওয়াদ, সুওয়া', ইয়াগুছ, ইয়াউ'ক ও নাস্ত্রকে'। এরা অনেককে বিভ্রান্ত করেছে। আর যালিমদেরকে বিভ্রান্তি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করো না”। [সূরা নূহ: ২৩-২৪]

এগুলো হল নূহ আলাইহিস সালামের জাতির সৎ লোকদের নাম। যখন তারা মারা গেল, লোকেরা তাদের আকৃতিতে মূর্তি তৈরী করল এবং তাদের নামে সেগুলোর নাম রাখল। উদ্দেশ্য ছিলো তাদেরকে সম্মান করা, তাদের স্মৃতিকে অমর করে রাখা এবং তাদের মর্যাদাকে স্মরণ রাখা। এমন করে শেষ পর্যন্ত তারা সেসব ব্যক্তিবর্গের ইবাদাতে লিপ্ত হল।

একথার পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করছে সে বর্ণনাটি, যা ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে করা হয়েছে। তিনি বলেন: 'নূহের জাতির মধ্যে যে মূর্তিসমূহ ছিল, তা এরপর আরবদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। ওয়াদ্দ ছিলো দাওমাতুল জান্দাল নামক স্থানে কালব গোত্রের। আর সুওয়া' ছিলো হুযাইল গোত্রের এবং ইয়াগুস ছিলো মুরাদ গোত্রের, অতঃপর সাবার নিকটস্থ জাওফ নামক স্থানে বনী গাতীফের। আর ইয়াউক ছিলো হামাদান গোত্রের এবং নাসর ছিলো হিমইয়ার গোত্রের আলে যিল কিলা'-এর। এসবই ছিলো নূহের জাতির সৎ লোকদের নাম। তারা যখন মারা গেল, শয়তান তাদের জাতির কাছে এ নির্দেশ পাঠাল যে, তারা যে সব স্থানে বসতেন সেখানে তোমরা মূর্তি স্থাপন কর এবং তাদের নামে সেগুলোর নামকরণ কর। অতঃপর তারা তাই করল। তবে তখনো সেগুলোর উপাসনা করা হত না। এরপর যখন (মূর্তিনির্মাণকারী) এসব লোকেরা ধ্বংস হয়ে গেল এবং জ্ঞান¹ রহিত হল, তখনই সে সব মূর্তির উপাসনা শুরু হল²。

ইবনে জারীর ত্বাবারী আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ الْمَتَكُمُ
এর ব্যাখ্যাকালে মুহাম্মাদ ইবনে কায়েস থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: ‘তারা বনী আদমের কতিপয় সৎ ব্যক্তি ছিল। তাদের ছিলো অনেক অনুসারী, যারা তাদের অনুসরণ করত। তারা মারা গেলে তাদের অনুসরণকারী সঙ্গীরা বলল, যদি আমরা তাদের ছবি বানিয়ে নেই, তাহলে যখনই আমরা তাদেরকে স্মরণ করব, তা ইবাদাতে আমাদের আগ্রহ আরো বৃদ্ধি করবে। এরপর তারা সে সব লোকের ছবি তৈরী করল। অতঃপর তারা যখন মারা গেল এবং অন্য লোকেরা (তাদের স্থানে) এল, ইবলিস তাদেরকে প্ররোচিত করে বলল, ওরা তো তাদের উপাসনাই করত এবং তাদের অসীলা দিয়ে বৃষ্টি পেত। ফলে এরা তাদের উপাসনা করল’¹। এরা একত্রে দু'টো ফিতনা সৃষ্টি করলঃ

প্রথমত: তাদের কবরের কাছে অবস্থান।

দ্বিতীয়ত: তাদের আকৃতির ছবি তৈরী করা এবং বসার স্থানে সেগুলোকে স্থাপন করে সেগুলোর প্রতি মনোনিবেশ করে বসা।

এর ফলে মানবতার ইতিহাসে প্রথমবারের মত শির্ক সংঘটিত হল। অতএব প্রত্যেক যুগে ও প্রত্যেক স্থানে উপরোক্ত দুটি বিষয়ই হচ্ছে শির্কের সবচেয়ে বড় উপকরণ।

ঘ. শির্কের প্রকারভেদ :

শির্ক দু'ভাগে বিভক্ত : বড় শির্ক ও ছোট শির্ক।

১. বড় শির্ক : আল্লাহর সাথে এমন একজন সমকক্ষ গ্রহণ করা, আল্লাহর ইবাদাতের মতই যার ইবাদাত করা হবে। এ শির্ক মুসলিম মিল্লাত থেকে বের করে দেয়, সমস্ত আমল বিনষ্ট করে দেয় এবং এ প্রকার শির্কে লিপ্ত মুশরিক যদি শির্কের উপর মারা যায়, তাহলে সে চিরতরে জাহান্নামের অগ্নিতে দগ্ধ হতে থাকবে। তার ব্যাপারে এমন নির্দেশ দেয়া হবে না যাতে সে মারা যাবে এবং জাহান্নামের আযাবও তার থেকে হ্রাস করা হবে না।

বড় শির্কের প্রকারভেদ : বড় শির্ক চার ভাগে বিভক্ত :

• দো'আর শির্ক : কেননা দো'আ সবচেয়ে বড় ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত। বরং তা ইবাদাতের মূল। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন
الدعاء هو العبادة
অর্থাৎ দো'আই ইবাদাত। আহমাদ ও তিরমিযী হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিরমিযী বলেছেন, এটি ‘হাসান-সহীহ হাদীস’¹। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ، إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُوْنَ جَهَنَّمَ دُخِرِينَ (غافر : ٦٠ )
“তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয়ই যারা অহংকারবশতঃ আমার ইবাদাত হতে বিমুখ হয়, তারা অবশ্যই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে”। [সূরা গাফির: ৬০]

যখন এটা সাব্যস্ত হল যে, দো'আ ইবাদাত, অতএব গায়রুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য তা নিবেদন করা শির্ক। সুতরাং যে ব্যক্তি কোন নবী, ফিরিস্তা, অলী, কবর কিংবা পাথর প্রভৃতি সৃষ্টজগতের কোন কিছুকে আহ্বান করবে, সে হবে মুশরিক ও কাফির। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَمَنْ يَدْعُ مَعَ اللهِ إِلهَا آخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِنْدَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُقْلِمُ الكفرون (المؤمنون: ۱۱৭)
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে ডাকে, এ বিষয়ে তার নিকট কোন প্রমাণ নেই, তার হিসাব তো তার প্রতিপালকের নিকটই আছে। নিশ্চয়ই কাফিরগণ সফলকাম হবে না”। [সূরা আল-মু'মিনূন: ১১৭]

দো'আ যে ইবাদাত এবং এর কোন কিছু আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য পালন করা শির্ক, এ ব্যাপারে আরো যে সব দলীল আছে, তম্মধ্যে রয়েছে আল্লাহর বাণী:
فَإِذَا رَكِبُوا فِي الْفُلْكِ دَعَوُا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَةَ فَلَمَّا نَجْهُمُ إِلَى الْبَرِّ إِذَا هُمْ يُشْرِكُونَ (العنكبوت : ٦٥)
"তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে, তখন বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন স্থলে এনে তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখন তারা শির্কে লিপ্ত হয়”। [সূরা আল-'আন্‌কাবৃত : ৬৫]

আল্লাহ তা'আলা এসব মুশরিকদের সম্পর্কে এ সংবাদই দিয়েছেন যে, তারা তাদের স্বাচ্ছন্দাবস্থায় আল্লাহর সাথে শির্ক করে এবং বিপদে আপদে আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠাবান হয়ে যায়। সুতরাং ঐ ব্যক্তিদের অবস্থা কি হবে, যারা স্বচ্ছন্দ ও দুঃখ-কষ্ট উভয়াবস্থায় আল্লাহর সাথে শরীক করে থাকে? এ থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।

• নিয়্যত, ইচ্ছা ও সংকল্পের ক্ষেত্রে শির্ক: আর তা হল - স্বীয় আমল দ্বারা প্রকৃত মুনাফিকদের মত দুনিয়া কিংবা লোকদেখানো অথবা জনশ্রুতি অর্জনের পরিপূর্ণ ইচ্ছা পোষণ করা এবং আমল দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতে মুক্তির ইচ্ছা না করা। এমন যে করবে সে হবে বড় শির্কে লিপ্ত মুশরিক। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الحَيَوةَ الدُّنْيَا وَ زِينَتَهَا نُوَتِ إِلَيْهِمُ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ * أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَطِلُ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ) (هود: ١٥-١٦)
"যে কেউ পার্থিব জীবন ও এর শোভা কামনা করে, দুনিয়াতে আমরা তাদের কর্মের পূর্ণফল দান করি এবং এখানে তাদেরকে কম দেয়া হবে না। তাদের জন্য আখিরাতে জাহান্নামের আগুন ব্যতীত অন্য কিছুই নেই এবং তারা দুনিয়াতে যা করেছে তা নষ্ট হবে। আর তারা যে আমল করে তা নিরর্থক"। [সূরা হুদ : ১৫-১৬]

এ প্রকার শির্ক খুবই সুক্ষ্ম এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক।

• আনুগত্যের ক্ষেত্রে শির্ক: আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা হালাল সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে কিংবা আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা হারাম সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সৃষ্টির আনুগত্য করে এবং অন্তর দিয়ে তা বিশ্বাস করে, অর্থাৎ সে তাদের জন্য হালাল ও হারাম সাব্যস্ত করার বৈধতা প্রদান করে এবং সে ক্ষেত্রে সে তার নিজের ও অন্যের জন্য উক্ত বিধানের আনুগত্যের অনুমতিও দান করে, যদিও সে জানে যে, এটা ইসলাম বিরোধী। অতএব সে আল্লাহ ব্যতীত তাদেরকে রব হিসাবে গ্রহণ করল এবং আল্লাহর সাথে বড় ধরনের শির্ক করল। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلهَا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبُحْنَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ ) (التوبة: ٣١)
“তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের পাদ্রীগণকে এবং সংসার বিরাগীগণকে তাদের প্রভুরূপে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়াম পুত্র মাসীহকেও। অথচ এক ইলাহের ইবাদাত করার জন্যই তারা আদিষ্ট হয়েছিল। তিনি ব্যতীত আর কোন প্রকৃত ইলাহ্ নেই। তারা যাকে শরীক করে তা হতে তিনি কত পবিত্র!” [সূরা আত-তাওবাহ: ৩১]

আয়াতটির যে তাফসীর করার মধ্যে কোন সমস্যা নেই, তা হল : আল্লাহর নাফরমানি করার ক্ষেত্রে (তথা আল্লাহর হুকুম পরিবর্তনে) ওলামা ও বান্দাদের আনুগত্য করা। তাদের কাছে দো'আ করা নয়। এ আয়াতের অনুরূপ তাফসীরই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছিলেন, যখন 'আদী ইবনে হাতেম তাকে প্রশ্ন করেছিলো ও বলেছিল, আমরা তাদের ইবাদাত করি না তো? তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন যে, তাদের ইবাদাত হল আল্লাহর নাফরমানি (তথা আল্লাহর হুকুম পরিবর্তন) এর ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করা। তিনি বললেন, "তারা কি ঐ বস্তুকে হারাম সাব্যস্ত করত না, যাকে আল্লাহ হালাল করেছেন, অতঃপর তোমরাও তাকে হারাম সাব্যস্ত করতে এবং তারা কি ঐ বস্তুকে হালাল সাব্যস্ত করত না, যাকে আল্লাহ হারাম করেছেন, অতঃপর তোমরাও তাকে হালাল সাব্যস্ত করতে"? আদী বললেন, হাঁ। তিনি বললেন, "ওটাই হল তাদের ইবাদাত করা"¹। তিরমিযী এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ও হাসান বলেছেন এবং ত্বাবারানী মু'জাম কাবীরে তা বর্ণনা করেছেন।

• ভালবাসার ক্ষেত্রে শির্ক : এ ভালবাসা দ্বারা বান্দার সেই ভালবাসাকে বুঝানো হয়েছে যা এমন সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন এবং নিজেকে ছোট করে এমন বিনয়াবনত হওয়াকে অপরিহার্য করে তোলে, যা কারো জন্য সমীচিন নয় একমাত্র আল্লাহ ছাড়া, যার কোন শরীক নেই। বান্দা যখন এ ভালবাসা গায়রুল্লার জন্য নিবেদন করবে, তখন সে এদ্বারা বড় শির্কে লিপ্ত হয়ে যাবে। এর দলীল আল্লাহর বাণী :
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُونَهُمْ حَبَ اللهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبَّا لِلهِ ) (البقرة : ١٦٥)
"মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ ছাড়া অপরকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে এবং আল্লাহকে ভালবাসার ন্যায় তাদেরকে ভালবাসে। কিন্তু যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ভালবাসায় তারা অধিক দৃঢ়”। [সূরা আল-বাকারাহ: ১৬৫]

২. শির্কের দ্বিতীয় প্রকার হল ছোট শির্ক:

ছোট শির্ক হল যা বড় শির্কের দিকে ধাবিত হওয়ার মাধ্যম এবং তাতে লিপ্ত হওয়ার কারণ। অথবা (কুরআন-সুন্নার) দলীলে যাকে শির্ক নামে অভিহিত করা হয়েছে, তবে তা বড় শির্কের সীমানা পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেনি। এটি আমলের দ্বারা ও মুখের কথার মাধ্যমে সংঘটিত হয়ে থাকে। এর হুকুম কবীরা গোনাহে লিপ্ত ব্যক্তির হুকুমের মতই আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে (তিনি চাইলে শাস্তি দেবেন কিংবা ক্ষমা করে দেবেন)।

এর উদাহরণের মধ্যে রয়েছে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো:

ক. সামান্য রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা): এর দলীল হল সে হাদীস, যা ইমাম আহমাদ ও অন্যান্য আরো অনেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “আমি তোমাদের উপর যে জিনিসটির ভয় সবচেয়ে বেশী করি তা হল ছোট শির্ক”। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন: ছোট শির্ক কি, হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, “রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা), কিয়ামতের দিন আল্লাহ যখন মানুষকে তাদের আমলের প্রতিদান দান করবেন তখন বলবেন : তোমরা সেই লোকদের কাছে যাও, দুনিয়ায় যাদেরকে তোমরা স্বীয় আমল প্রদর্শন করতে। সুতরাং দেখ, তাদের কাছে কোন প্রতিদান পাও কিনা”¹

খ. 'আল্লাহ এবং আপনি যা চেয়েছেন' এমন কথা বলা। আবু দাউদ তার সুনান গ্রন্থে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন: “তোমরা বলো না 'আল্লাহ এবং অমুক যেমন চেয়েছে', বরং তোমরা বলো, আল্লাহ যেমন চেয়েছেন তারপর অমুক যেমন চেয়েছে”²。

গ. 'যদি আল্লাহ এবং অমুক না থাকত' এমন কথা বলা অথবা 'যদি হাঁস না থাকত, তাহলে আমাদের কাছে চোর অবশ্যই আসত' ইত্যাদি বলা। ইবনে আবু হাতিম স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে আল্লাহ্র বাণী:
فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ
এর অর্থ বর্ণনায় ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করে বলেন, 'আয়াতে বর্ণিত الأنداد তথা সমকক্ষসমূহ স্থির করা এমন শির্ক যা রাতের অন্ধকারে কালো প্রশস্ত মসৃণ পাথরের উপর দিয়ে পিপিলিকার চলার চেয়েও গোপন। আর তা হল - এ কথা বলা যে, 'হে অমুক! আল্লাহর এবং তোমার জীবনের ও আমার জীবনের শপথ', আর এ কথা বলাও যে, 'যদি এর ছোট কুকুরটি না থাকত তাহলে চোর আমাদের কাছে আসত', এবং 'যদি ঘরে হাঁস না থাকত তাহলে চোর আসত', আর কোন ব্যক্তি তার সঙ্গীকে একথা বলা যে, 'আল্লাহ যা চেয়েছেন এবং আপনি যা চেয়েছেন', এবং এ কথাও বলা যে, 'যদি আল্লাহ ও অমুক না থাকত, 'অমুককে তাতে রেখো না'। এসবই হচ্ছে আল্লাহর সাথে শির্ক”¹。

ছোট শির্ক ও বড় শির্কের মধ্যে পার্থক্য:

ছোট শির্ক ও বড় শির্কের মধ্যে বহু পার্থক্য রয়েছে। তম্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণগুলো নিম্নরূপ:

১. বড় শির্ককারীকে আল্লাহ তা'আলা তাওবা ছাড়া কোনক্রমেই ক্ষমা করবেন না। কিন্তু ছোট শির্ক থাকবে আল্লাহর ইচ্ছাধীন।

২. বড় শির্ক সমস্ত আমলকে নষ্ট করে দেয়। তবে ছোট শির্ক তার সাথে সম্পৃক্ত আমলকেই শুধু নষ্ট করে।

৩. বড় শির্ক মুসলিম মিল্লাত থেকে শির্ককারীকে বের করে দেয়। কিন্তু ছোট শির্ক ইসলাম থেকে তাকে বের করে দেয় না।

৪. বড় শির্কে লিপ্ত ব্যক্তি চিরতরে জাহান্নামে থাকবে এবং জান্নাত হবে তার জন্য হারাম। আর ছোট শির্ক হচ্ছে অন্যান্য গোনাহের মতই।

দ্বিতীয় বিষয় : কুফ্র

ক. সংজ্ঞা: অভিধানে 'কুফ্র' আবৃত করা ও ঢেকে রাখার অর্থে ব্যবহৃত হয়।

আর শরীয়তের পরিভাষায় কুফ্র ঈমানের বিপরীত। আর তা হল আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান না রাখা, চাই তাঁদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হোক কিংবা না হোক, বরং তা যদি সন্দেহ ও সংশয় প্রসূতও হয়ে থাকে, কিংবা ঈর্ষা ও অহংকারবশতঃ বা রিসালাতের অনুসরণ থেকে ফিরিয়ে রাখে এমন কোন প্রবৃত্তির অনুসরণবশতঃ ঈমান থেকে দূরে সরে থাকার কারণেও হয়ে থাকে।

খ. কুফরের প্রকারভেদ :

কুফ্র দু' প্রকার : বড় কুফ্র ও ছোট কুফ্র।

বড় কুফ্র হল যা চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে অবস্থানকে অপরিহার্য করে। আর ছোট কুফ্র হল যা শান্তি পাওয়াকে অপরিহার্য করে, চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে অবস্থানকে নয়।

প্রথমত : বড় কুফ্র তা পাঁচ প্রকার :

১. মিথ্যা প্রতিপন্ন করার সাথে সম্পৃক্ত কুফ্র। আর তা হল রাসূলগণের মিথ্যাবাদী হওয়ার বিশ্বাস পোষণ করা। অতএব তারা যা কিছু নিয়ে এসেছেন, তাতে যে ব্যক্তি তাদেরকে প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে মিথ্যা সাব্যস্ত করল, সে কুফরী করল। এর দলীল হল আল্লাহর বাণী :
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِبًا أَوَكَذَبَ بِالْحَقِّ لَمَّا جَاءَهُ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِلْكَفِرِينَ ﴾ (العنكبوت : ٦٨)
"যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে অথবা তার কাছে সত্যের আগমন হলে তাকে সে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তার অপেক্ষা অধিক যালিম আর কে? জাহান্নামেই কি কাফিরদের আবাস নয়"? [সূরা আল-'আনকাবুত : ৬৮]

২. অস্বীকার ও অহংকারের মাধ্যমে কুফ্র। এটা এভাবে হয় যে, রাসূলের সত্যতা এবং তিনি যে আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য নিয়ে এসেছেন সে সম্পর্কে জ্ঞাত থাকা, কিন্তু অহংকার ও হিংসাবশতঃ তাঁর হুকুম না মানা এবং তাঁর নির্দেশ না শোনা। এর দলীল আল্লাহর বাণী :
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَكَةِ اسْجُدُوا لِلْأَدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَفِرِينَ ﴾ (البقرة : ٣٤)
"যখন আমি ফিরিশতাদের বললাম, আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলীস ব্যতীত সকলেই সিজদা করল। সে অমান্য করল ও অহংকার করল। সুতরাং সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হল”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ৩৪]

৩. সংশয়-সন্দেহের কুফ্র। আর তা হল রাসূলগণের সত্যতা সম্পর্কে ইতস্তত করা এবং দৃঢ় বিশ্বাস না রাখা। একে ধারণা সম্পর্কিত কুফ্রও বলা হয়। আর ধারণা হল একীন ও দৃঢ় বিশ্বাসের বিপরীত। এর দলীল আল্লাহ তা'আলার বাণী :
وَ دَخَلَ جَنَّتَهُ وَ هُوَ ظَالِمُ لِنَفْسِهِ قَالَ مَا أَظُنُّ أَنْ تَبِيدَ هَذِهِ أَبَدًا * وَمَا أَظُنُّ السَّاعَةَ قَائِمَةً وَلَبِن رُودْتُ إِلَى رَبِّي لَاجِدَنَّ خَيْرًا مِنْهَا مُنْقَلَبًا * قَالَ لَهُ صَاحِبُهُ وَهُوَ يُحَاوِرُهُ الْفَرْتَ بِالَّذِي خَلَقَكَ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُطْفَةٍ ثُمَّ سَوَكَ رَجُلًا لَكِنَّا هُوَ اللَّهُ رَبِّي ولا أشرك بربي أَحَدًا (الكهف : ٣٥-٣٨)
"আর নিজের প্রতি যুলুম করে সে তার উদ্যানে প্রবেশ করল। সে বলল, আমি মনে করি না যে, এটি কখনো ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি মনে করি না যে, ক্বিয়ামত হবে। আর আমি যদি আমার প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তিত হই-ই, তবে আমি তো নিশ্চয়ই এ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্থান পাব। তদুত্তরে তার বন্ধু বিতর্কমূলকভাবে জিজ্ঞাসা করতঃ তাকে বলল, তুমি কি তাঁকে অস্বীকার করছ যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মৃত্তিকা ও পরে শুক্র হতে এবং তার পর পূর্ণাঙ্গ করেছেন পুরুষ আকৃতিতে? কিন্তু তিনিই আল্লাহ আমার প্রতিপালক এবং আমি কাউকেও আমার প্রতিপালকের শরীক করি না"। [সূরা আল-কাহফঃ ৩৫-৩৮]

৪. বিমুখ থাকার মাধ্যমে কুফ্র : এদ্বারা উদ্দেশ্য হল দ্বীন থেকে পরিপূর্ণভাবে বিমুখ থাকা এমনভাবে যে, স্বীয় কর্ণ, হৃদয় ও জ্ঞান দ্বারা ঐ আদর্শ থেকে দূরে থাকা যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়ে এসেছেন। এর দলীল আল্লাহর বাণী:
وَالَّذِينَ كَفَرُوا عَمَّا أُنْذِرُوا مُعْرِضُونَ (الأحقاف : ٣)
"কিন্তু যারা কুফরী করেছে তারা সে বিষয় থেকে বিমুখ যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে”। [সূরা আল-আহকাফ : ৩]

৫. নিফাকের মাধ্যমে কুফ্র: এদ্বারা বিশ্বাসগত নিফাক বুঝানো উদ্দেশ্য, যেমন ঈমানকে প্রকাশ করে গোপনে কুফ্র লালন করা। এর দলীল আল্লাহর বাণী:
ذَلِكَ بِأَنَّهُمُ امَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا فَطِيعَ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ (المنافقون : ٣)
“এটা এজন্য যে, তারা ঈমান আনবার পর কুফরী করেছে। ফলে তাদের হৃদয়ে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। অতএব তারা বুঝে না”। [সূরা আল-মুনাফিকূন : ৩]

নিফাক বা মোনাফেকী দু' প্রকার:

১. বিশ্বাসগত নিফাক : এটি বড় কুফ্র যা মুসলিম মিল্লাত থেকে বের করে দেয়। তা ছয় প্রকার: রাসূলকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা, অথবা রাসূল যে দ্বীন নিয়ে এসেছেন তার কোন কিছুকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা, কিংবা রাসূলকে ঘৃণা করা, অথবা রাসূল যে দ্বীন নিয়ে এসেছেন তাকে ঘৃণা করা, রাসূলের দ্বীনের ক্ষতিতে খুশী হওয়া অথবা রাসূলের দ্বীনের বিজয় অপছন্দ করা।

২. কর্মগত নিফাক : তা হল ছোট কুফ্র যা মুসলিম মিল্লাত থেকে বের করে না। তবে তা বড় ধরনের অপরাধ ও মহাপাপ। তম্মধ্যে রয়েছে সে আমল যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীসে উল্লেখ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন:
«أربع من كن فيه كان منافقاً خالصاً، ومن كانت فيه خصلة منهن كانت فيه خصلة من النفاق حتى يدعها : إذا اؤتمن خان، وإذا حدث كذب، وإذا عاهد غدر، وإذا خاصم فجر»
“যে ব্যক্তির মধ্যে চারটি আমল পাওয়া যায়, সে হবে প্রকৃত মুনাফিক। আর যার মধ্যে তা থেকে একটি স্বভাব পাওয়া যায়, সে তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে নিফাকের একটি স্বভাব বিদ্যমান থাকে। সেগুলো হল: যখন তার কছে আমানাত রাখা হয়, সে খেয়ানত করে। যখন সে কথা বলে, মিথ্যা বলে। যখন ওয়াদা করে, ভঙ্গ করে। আর যখন ঝগড়া করে, অশ্লীলভাবে করে”¹। মুত্তাফাকুন ‘আলাইহ্’

নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম আরো বলেনঃ
«آية المنافق ثلاث: إذا حدث كذب، وإذا وعد أخلف، وإذا اؤتمن خان»
“মুনাফিকের আলামত তিনটিঃ যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে। যখন ওয়াদা করে, ভঙ্গ করে। আর যখন তার কাছে আমানাত রাখা হয়, তখন সে খেয়ানত করে"¹। বুখারী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

দ্বিতীয়ত: ছোট কুফ্র

এ ধরনের কুফরে লিপ্ত ব্যক্তি মুসলিম মিল্লাত থেকে বের হয়ে যাবে না এবং চিরতরে জাহান্নামে অবস্থান করাকেও তা অপরিহার্য করে না। এ কুফরে লিপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে শুধু কঠিন শাস্তির ধমক এসেছে। এ প্রকার কুফ্র হল নেয়ামত অস্বীকার করা। কুরআন ও সুন্নার মধ্যে বড় কুফ্র পর্যন্ত পৌঁছে না এ রকম যত কুফরের উল্লেখ এসেছে, তার সবই এ প্রকারের অন্তর্গত। এর উদাহরণের মধ্যে রয়েছে: আল্লাহ তা'আলার বাণীতে যা এসেছে:
﴿وَضَرَبَ اللهُ مَثَلًا قَرْيَةً كَانَتْ أَمِنَةً مُطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّنْ كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللهِ فَأَذَاقَهَا اللهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ﴾ (النحل : ١١٢)
"আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এমন এক জনপদের যা ছিলো নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেখানে সর্বদিক হতে তার প্রচুর জীবিকা আসত। অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল। ফলে তারা যা করত তজ্জন্য আল্লাহ সে জনপদকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদন”। [সূরা আন-নাহল : ১১২]

এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীতে যা এসেছে:
«اثنتان في الناس هما بهم كفر، الطعن في النسب ، والنياحة على الميت»
"মানুষের মধ্যে দু'টো জিনিস আছে, যা তাদেরকে কুফ্রিতে লিপ্ত করে : বংশের ব্যাপারে অপবাদ দেয়া এবং মৃতের জন্য উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করা”²। হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীতে আরো এসেছে:
« لا ترجعوا بعدي كفاراً يضرب بعضكم رقاب بعض»
“আমার পরে তোমরা কাফের অবস্থায় ফিরে যেও না যে, তোমাদের একে অন্যের গর্দান উড়িয়ে দেবে”¹। হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

এটা এবং এর মত আমলগুলো হল বড় কুফরের চেয়ে ছোট আকারের কুফ্র। মুসলিম মিল্লাত থেকে তা বের করে দেয় না; কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
إِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدُهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ * إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ ﴾ (الحجرات: ৯-১০)
“মু'মিনদের দু' দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। আর তাদের একদল অপর দলের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করলে যারা বাড়াবাড়ি করে, তাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি তারা ফিরে আসে তাদের মধ্যে ন্যায়ের সহিত ফয়সালা কর এবং সুবিচার কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন। মু'মিনগণ পরস্পর ভাই ভাই; সুতরাং তোমরা তোমাদের ভ্রাতৃবৃন্দের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন কর। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হও”। [সূরা আল-হুজরাত : ৯-১০]

আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا ﴾ (النساء: ৪৮)
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এতদ্ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আর যে-ই আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে এক মহা পাপ করে"। [সূরা আন-নিসা: ৪৮]

এ মহান আয়াতটি এ কথারই প্রমাণ বহন করছে যে, শির্কের নিচের প্রত্যেক গোনাহ আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে অর্থাৎ আল্লাহ চাইলে গোনাহ পরিমাণ আযাব তাকে দেবেন এবং তিনি ইচ্ছা করলে শুরু থেকেই তাকে ক্ষমাও করে দিতে পারেন। তবে তাঁর সাথে শির্ক করাকে তিনি ক্ষমা করবেন না, যেমন তা এ আয়াতটিতে এবং আল্লাহ তা'আলার সেই বাণীতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যাতে তিনি বলেছেন:
إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَالظَّلِمِينَ مِنْ أَنْصَارِ (المائدة: ۷۲)
“কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করে দেবেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৭২]

টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৭০৮৪), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৮৪৭)
¹ অর্থাৎ সে সব ছবির সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষ জ্ঞান।
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৪৯২০)
¹ তাফসীর তাবারী (১২/২৫৪)
¹ মুসনাদ আহমাদ (৪/২৬৭), সুনান তিরমিযী (হাদীস নং ২৯৬৯)
¹ সুনান তিরমিযী (হাদীস নং ৩০৯৫), মু'জাম কাবীর, ত্বাবারানী (১৭/৯২)
¹ মুসনাদ আহমাদ (৫/৪২৮), আলমুনযেরী বলেন, এর সনদ ভাল। আততারগীব ওয়াততারহীব (১/৪৮), হাইসামী বলেন, এর বর্ণনাকারীগণ সহীহ হাদীসের বর্ণনাকারী, মাজমা' (১/১০২)
² সুনান আবু দাউদ (হাদীস নং ৪৯৮০), যাহাবী মুখতাসারুল বায়হাকীতে (১/১৪০/২) বলেন, এর সনদ উপযুক্ত。
¹ তাফসীর ইবনে আবু হাতিম (১/৬২)
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৪), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৫৮)
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৩)
² সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৬৭)
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ১২১), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৬৫)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00