📄 তাওহীদুল উলূহিয়্যাহর দলীল ও গুরুত্বের বর্ণনা
প্রথম বিষয় তাওহীদুল উলুহিয়্যার প্রমাণ
ইবাদাত এককভাবে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা ওয়াজিব হওয়ার উপর কুরআন ও সুন্নায় বহু দলীল-প্রমাণ রয়েছে যা বিভিন্নভাবে সে বিষয়ের উপর প্রমাণ বহন করছে।
১. কখনো তা ইবাদাতের নির্দেশ প্রদানের মাধ্যমে প্রমাণ বহন করছে, যেমন মহান আল্লাহর বাণীতে রয়েছে:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ﴾ (البقرة : ٢١)
“হে মানবমন্ডলী! তোমরা তোমাদের সেই প্রভুর ইবাদাত কর যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর”। [সূরা আল-বাকারাহঃ২১]
এবং আল্লাহর বাণী:
وَاعْبُدُوا اللهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا (النساء: ٣٦)
"আর তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর ও তার সাথে কোন কিছুর শরীক করো না”। [সূরা আন-নিসাঃ ৩৬]
وَقَضَى رَبُّكَ أَلَا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ﴾ (الإسراء: ٢٣)
"আপনার প্রভু আদেশ করেছেন যে, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করো না”। [সূরা আল-ইসরা : ২৩]
এছাড়া অনুরূপ আরো বহু আয়াত রয়েছে।
২. কখনো সেসব দলীল বর্ণনা করছে যে, এ প্রকার তাওহীদই সৃষ্টজগতের অস্তিত্বের মূলভিত্তি এবং উভয় জগত সৃষ্টির উদ্দেশ্য, যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلا لِيَعْبُدُونِ (الذاريات : ٥٦)
“আর জ্বিন ও মানবকে আমি শুধু আমার ইবাদাতের জন্যই সৃষ্টি করেছি”। [সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬]
৩. কখনো বর্ণনা করছে যে, এটাই রাসূলগণকে প্রেরণের উদ্দেশ্য, যেমন মহান আল্লাহর বাণীতে রয়েছে :
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُونَ (النحل: ٣٦)
“আর নিশ্চয় আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তাগূতকে বর্জন কর”। [সূরা আন-নাহল: ৩৬]
আল্লাহর আরো বাণীঃ
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ (الأنبياء : ٢٥).
“আমরা আপনার পূর্বে কোন রাসূল প্রেরণ করিনি তাঁর প্রতি এ ওহী প্রেরণ ব্যতীত যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন হক্ব ইলাহ্ নেই। সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত কর”। [সূরা আল-আম্বিয়া: ২৫]
৪. কখনো বর্ণনা করছে যে, এটাই আল্লাহর গ্রন্থসমূহ অবতীর্ণ করার উদ্দেশ্য, যেমন মহান আল্লাহর বাণীতে রয়েছে :
يُنَزِّلُ الْمَليكة بالرُّوحِ مِنْ أَمْرِهِ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ أَنْ انْذِرُوا أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاتَّقُونِ (النحل : ٢)
“তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা স্বীয় নির্দেশ ওহীসহ ফিরিস্তাদেরকে এই বলে নাযিল করেন যে, তোমরা সতর্ক করে দাও যে, নিশ্চয়ই আমি ছাড়া কোন প্রকৃত ইলাহ্ নেই। অতএব আমাকে ভয় কর”। [সূরা আন-নাহল: ২]
৫. কখনো বর্ণনা করছে এ তাওহীদপন্থীদের বিশাল সাওয়াবের কথা এবং তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে যে মহান পুরস্কার ও মর্যাদাপূর্ণ নেয়ামতরাজি প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে, সে সবের কথা। যেমন মহান আল্লাহ বলেন:
الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ أُولَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُمْ مُهْتَدُونَ (الأنعام: ۸۲)
"যারা ঈমান এনেছে এবং ঈমানকে যুলুম দ্বারা কলুষিত করেনি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্য এবং তারাই সৎপথপ্রাপ্ত”। [সূরা আল-আন'আম : ৮২]
৬. কখনো এ তাওহীদের বিপরীত বস্তু হতে সতর্ক করছে, এর বিরোধিতার ভয়াবহতা বর্ণনা করছে এবং যে ব্যক্তি এ তাওহীদ ত্যাগ করছে তার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু যে মর্মন্তুদ শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন তা উল্লেখ করছে। যেমন মহান আল্লাহর বাণী:
﴿إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ أَنْصَارِ (المائدة : ۷۲)
"নিশ্চয়ই যে আল্লাহর সাথে শরীক করবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর যালেমদের কোন সাহায্যকারী হবে না”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৭২]
আল্লাহর আরো বাণী:
ولا تجعل مع اللهِ إلها آخر فتقعد ملوماً مذحوراً ) (الإسراء: ٣٩)
"আর আপনি আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহ্ সাব্যস্ত করবেন না, করলে আপনি নিন্দিত ও বিতাড়িত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবেন”। [সূরা আল-ইসরা : ৩৯]
অনুরূপ আরো বহু প্রকার দলীল রয়েছে, যা এ তাওহীদ সাব্যস্তকরন, সেদিকে আহ্বান, এর মর্যাদার ঘোষণা ও তাওহীদপন্থীদের সাওয়াবের বর্ণনা এবং এর বিরোধিতার বড় ভয়াবহতার দিকটি প্রতিপন্ন করছে।
অনুরূপভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ্ এ তাওহীদ ও তার গুরুত্বের উপর প্রমাণবাহী দলীল দ্বারা ভরপুর। সে সবের মধ্যে রয়েছে:
১. বুখারী তার স্বীয় সহীহ গ্রন্থে মু'আয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
(( يا معاذ أتدري ما حق الله على العباد؟ قال: الله ورسوله أعلم. قال: أن يعبدوه ولا يشركوا به شيئاً، أتدري ما حقهم عليه؟ قال: الله ورسوله أعلم. قال: أن لا يعذبهم))
“হে মু'আয! তুমি কি জান বান্দার উপর আল্লাহর কি অধিকার রয়েছে?” মু'আয বললেন : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক অবগত। তিনি বললেন: “তারা তাঁর ইবাদাত করবে এবং তাঁর সাথে কোন কিছু শরীক করবে না। তুমি কি জান আল্লাহর উপর তাদের কি অধিকার রয়েছে?” মু'আয বললেন : আল্লাহ ও তাঁর রাসূল অধিক অবগত। তিনি বললেন: “আল্লাহ তাদেরকে আযাব দেবেন না”¹।
২. ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মু'আযকে ইয়ামানে পাঠানের প্রাক্কালে বললেন,
«إنك تقدم على قوم من أهل الكتاب فليكن أول ما تدعوهم إلى أن يوحدوا الله تعالى فإذا عرفوا ذلك فأخبرهم أنَّ الله فرض عليهم خمس صلوات .... الحديث»
"তুমি আহলে কিতাবের এক সম্প্রদায়ের কাছে গমন করছ। অতএব তাদেরকে তুমি মহান আল্লাহর একত্ববাদ মেনে নেয়ার প্রতি সর্বপ্রথম আহ্বান করবে। এ বিষয়টি তারা জেনে নিলে তাদেরকে অবহিত করবে যে, আল্লাহ তাদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন....." আলহাদীস, বুখারী এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন²।
৩. ইবনে মাস'উদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ مات وهو يدعو مِن دونِ الله ندا دخل النار»
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সমকক্ষ স্থির করে আহ্বান করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে”। বুখারী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন³।
৪. জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ لقي الله لا يُشرك به شيئاً دخل الجنَّةَ، ومن لقيه يُشرك به شيئاً دخل النار»
"যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছুর শির্ক না করে তাঁর সাথে সাক্ষাত করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শির্ক করা অবস্থায় তাঁর সাক্ষাতে যাবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে"¹। মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
এ বিষয়ে আরো অনেক হাদীস রয়েছে।
দ্বিতীয় বিষয় এ তাওহীদের গুরুত্ব ও এ বর্ণনা যে, তা রাসূলগণের দাওয়াতের মূলভিত্তি
নিঃসন্দেহে তাওহীদুল উলুহিয়্যাহই মানবতার কল্যাণের জন্য সার্বিকভাবে মৌলিক বিষয়সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে পরিপূর্ণ, সর্বোত্তম ও সর্বাধিক অপরিহার্য। এ উদ্দেশ্যেই আল্লাহ জ্বিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। একে প্রতিষ্ঠার জন্যই তিনি সৃষ্টজগতকে সৃষ্টি করেছেন এবং শরীয়তসমূহ প্রণয়ন করেছেন। এ তাওহীদ বিরাজমান থাকলে কল্যাণ হয়, আর না থাকলে অনিষ্টতা ও বিপর্যয় দেখা দেয়। এ কারণেই এ তাওহীদ রাসূলগণের আহ্বানের মূলমন্ত্র, তাদেরকে প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য এবং তাদের দাওয়াতের মূলভিত্তি। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُونَ ﴾ (النحل : ٣٦)
"আর নিশ্চয় আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি (এ নির্দেশ দিয়ে) যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তাগূতকে বর্জন কর”। [সূরা আন-নাহল : ৩৬]
তিনি আরো বলেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا انَا فَاعْبُدُونِ ﴾ (الأنبياء: ٢٥)
"আমরা আপনার পূর্বে কোন রাসূল প্রেরণ করিনি তাঁর প্রতি এ ওহী প্রেরণ ব্যতীত যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন হক্ ইলাহ্ নেই। সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত কর"। [সূরা আল-আম্বিয়া : ২৫]
বহু স্থানে কুরআন কারীম এ প্রমাণ বহন করছে যে, তাওহীদুল উলুহিয়্যাহই রাসূলগণের দাওয়াতের উদ্বোধনী বিষয় এবং আল্লাহ প্রেরিত প্রত্যেক রাসূলই স্বীয় জাতিকে যে বিষয়ের প্রতি প্রথম আহ্বান করেন তা হল আল্লাহর একত্ববাদ এবং ইবাদাতকে তাঁর জন্য খালেস করে নেয়া। মহান আল্লাহ বলেনঃ
وَ إلى عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا قَالَ يُقَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُم مِنْ الهِ غَيْرُهُ ﴾ (الأعراف: ٦٥)
"আর 'আদ জাতির কাছে তাদের ভাই হুদকে পাঠিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের জন্য অন্য কোন হক্ক ইলাহ্ নেই”। [সূরা আল-আ'রাফ: ৬৫]
মহান আল্লাহ আরো বলেন:
وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَلِحًا قَالَ يُقَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُم مِّنَ اللَّهِ غَيْرُهُ ﴾ (الأعراف: ৭৩)
"আর সামূদ জাতির কাছে তাদের ভাই সালেহকে পাঠিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের জন্য অন্য কোন হকু ইলাহ্ নেই”। [সূরা আল-আ'রাফ: ৭৩]
وَإِلَى مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا، قَالَ يُقَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِنْ اللَّهِ غَيْرُهُ ﴾ (الأعراف : ৮৫)
"আর মায়ানবাসীদের কাছে তাদের ভাই শু'আইবকে পাঠিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের জন্য অন্য কোন হকু ইলাহ্ নেই”। [সূরা আল-আ'রাফ: ৮৫]
তৃতীয় বিষয় এ তাওহীদ রাসূলগণ ও তাঁদের জাতিসমূহের মধ্যকার বিবাদ-বিসম্বাদের মূল বিষয় ছিল
ইতিপূর্বে বলা হয়েছে যে, ইবাদাতের একত্ববাদই ছিল সকল রাসূলগণের দাওয়াতী কাজের উদ্বোধনী বিষয়। সুতরাং আল্লাহ যে রাসূলকেই প্রেরণ করেছেন, স্বীয় জাতির প্রতি তার প্রথম আহ্বান ছিলো আল্লাহর একত্ববাদ। এজন্যই নবীগণ ও তাদের জাতিসমূহের মধ্যকার বিবাদ ছিলো সে বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই। কেননা নবীগণ স্বীয় জাতির লোকদেরকে আহ্বান করতেন আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর জন্য ইবাদাতকে খালেস করে নেয়ার প্রতি, আর সে সব জাতির লোকেরা জেদ করত শির্ক ও প্রতিমা পূজার উপর থেকে যাওয়ার জন্য, শুধুমাত্র তাদের মধ্যকার ঐ ব্যক্তিবর্গ ছাড়া যাদেরকে আল্লাহ হেদায়াত দান করেছেন।
মহান আল্লাহ নূহ আলাইহিস সালামের জাতি সম্পর্কে বলেন;
وَقَالُوا لَا تَذَرُنَ الهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَذَا وَلَا سُوَاعَاهُ وَلَا يَعُونَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا * وَقَدْا ضَلُّوا كَثِيرًا وَلَا تَزِدِ الظَّلمين الاضلالا (نوح: ٢٣-٢٤)
"আর তারা বলেছিল, 'তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের উপাস্যদেরকে, পরিত্যাগ করো না ওয়াদ, সুওয়া', ইয়াগুছ, ইয়া'উক ও নাস্ত্রকে'। এরা অনেককে বিভ্রান্ত করেছে। সুতরাং যালিমদের বিভ্রান্তি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করো না”। [সূরা নূহঃ ২৩-২৪]
তিনি হুদ আলাইহিস সালামের জাতি সম্পর্কে বলেন:
قَالُوا اجْتَنَا لِتَأْفِكَنَا عَنْ الهَتِنَا فَأْتِنَا بِمَا تَعِدُنَا إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّدِقِينَ ﴾ (الأحقاف: ۲۲)
"তারা বলেছিল, আপনি কি আমাদের উপাস্যদের (পূজা) হতে আমাদেরকে ফিরিয়ে দিতে এসেছেন? আপনি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যে বিষয়ের ওয়াদা দিচ্ছেন, তা আনয়ন করুন"। [সূরা আল-আহক্বাফ : ২২]
قَالُوا يَهُودُ مَا جِئْتَنَا بَيِّنَةٍ وَمَا نَحْنُ بِتَارِيكَ الهَتِنَا عَنْ قَوْلِكَ وَمَا نَحْنُ لَكَ بمُؤْمِنِينَ (هود:٥٣)
"তারা বলল, হে হুদ! আপনি আমাদের নিকট কোন স্পষ্ট প্রমাণ আনয়ন করেননি। আর আপনার কথায় আমরা আমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করব না এবং আমরা আপনাতে বিশ্বাসী নই”। [সূরা হুদ : ৫৩]
আর সালেহ আলাইহিস সালামের জাতি সম্পর্কে বলেন:
قَالُوا يُصْلِحُ قَدْ كُنتَ فِينَا مَرْجُوا قَبْلَ هُذَا اتَهُنَا أَن تَعْبُدَ مَا يَعْبُدُ ابَاؤُنَا وَإِنَّنَا لَفِي شَكٍّ ما تَدْعُونَا إِلَيْهِ مُريب (هود : ٦٢ )
“তারা বলল, হে সালেহ! এর পূর্বে আপনি ছিলেন আমাদের মধ্যে আশার স্থল। আপনি কি আমাদেরকে নিষেধ করছেন তাদের ইবাদাত করা হতে, যাদের ইবাদাত করত আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা? আমরা অবশ্যই গুরুতর সন্দেহের মধ্যে রয়েছি সে বিষয়ে, যার প্রতি আপনি আমাদেরকে আহ্বান করছেন”। [সূরা হুদ: ৬২]
শু'আইব আলাইহিস সালামের জাতি সম্পর্কে তিনি বলেনঃ
قَالُوا يَشْعَيْبُ أَصَلُوتُكَ تَأْمُرُكَ أَنْ نَنْتُرُكَ مَا يَعْبُدُ ابَاؤُنَا أَوْ اَنْ نَفْعَلَ فِي أَمْوَالِنَا مَا نَشَؤُا * إِنَّكَ لَانْتَ الْحَلِيمُ الرَّشِيدُ (هود: ۸۷)
“তারা বলল, হে শু'আইব! আপনার সালাত কি আপনাকে নির্দেশ দেয় যে, আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা যার ইবাদাত করত আমাদেরকে তা বর্জন করতে হবে অথবা আমরা আমাদের ধন-সম্পদে ইচ্ছামত যা কিছু করে থাকি তাও ছেড়ে দিতে হবে? আপনি তো একজন সহিষ্ণু, ভাল মানুষ”। [সূরা হুদঃ ৮৭]
কুরাইশ বংশের কাফিরদের সম্পর্কে তিনি বলেনঃ
وَعَجِبُوا أَنْ جَاءَهُمْ مُنْذِرُ مِنْهُمْ وَقَالَ الْكَفِرُونَ هَذَا سَخِرُ كَذَّابٌ * أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهَا وَاحِدًا * إِنَّ هَذَا لَشَى عُجَابٌ * وَانْطَلَقَ الْمَلَأُ مِنْهُمْ أَنِ امْشُوا وَاصْبِرُوا عَلَى آلِهَتِكُمْ إِنَّ هَذَا لَشَى يُرَادُ * مَا سَمِعْنَا بِهَذَا فِي الْمِلَّةِ الْآخِرَةِ إِنْ هَذَا إِلَّا اخْتِلَاقُ (ص: ٤-٧)
“এরা বিস্ময়বোধ করছে যে, এদের নিকট এদেরই মধ্য হতে একজন সতর্ককারী আগমন করলেন। আর কাফিররা বলল, এ তো এক মিথ্যাবাদী যাদুকর। সে কি বহু ইলাহকে এক ইলাহ্ বানিয়ে নিয়েছে? এ তো এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার! তাদের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এ কথা বলে প্রস্থান করে যে, তোমরা চলে যাও এবং তোমাদের উপাস্যদের পূজায় দৃঢ় থাক। নিশ্চয়ই এ ব্যাপারটি উদ্দেশ্যমূলক। আমরা তো অন্য ধর্মাদর্শে এরূপ কথা শুনিনি। এ এক মনগড়া উক্তি মাত্র”। [সূরা সাদ : ৪-৭]
তিনি আরো বলেন:
وَإِذَا رَأَوْكَ إِن يَتَّخِذُونَكَ إِلَّا هُزُوًا أَهَذَا الَّذِي بَعَثَ اللَّهُ رَسُولًا * إِنْ كَادَ لَيُضِلُّنَا عَنْ آلِهَتِنَا لَوْ لَا أَنْ صَبَرْنَا عَلَيْهَا وَسَوْفَ يَعْلَمُونَ حِيْنَ يَرَوْنَ الْعَذَابَ مَنْ أَضَلُّ سَبِيلًا * أَرَعَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَاَنْتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا * أَمْ تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا ﴾ (الفرقان: ٤١-٤٤)
"তারা যখন আপনাকে দেখে, তখন তারা আপনাকে কেবল ঠাট্টা-বিদ্রূপের পাত্ররূপে গণ্য করে, বলে, এ-ই কি সে যাকে আল্লাহ রাসূল করে পাঠিয়েছেন? সে তো আমাদেরকে আমাদের উপাস্যগণ হতে দূরে সরিয়েই দিত, যদি না আমরা তাদের আনুগত্যের উপর অবিচল থাকতাম। আর যখন তারা শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে, তখন জানতে পারবে কে অধিক পথভ্রষ্ট। আপনি কি তাকে দেখেছেন, যে তার প্রবৃত্তিকে ইলারূপে গ্রহণ করে? তবুও কি আপনি তার যিম্মাদার হবেন? নাকি আপনি মনে করেন যে, তাদের অধিকাংশ শোনে ও বোঝে? তারা তো পশুর মতই, বরং তারা অধিক পথভ্রষ্ট”। [সূরা আল-ফুরকান: ৪১-৪৪]
এ সকল দলীল ও অনুরূপ অর্থ বিশিষ্ট অন্যান্য প্রমাণ এটাই স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করছে যে, নবীগণ ও তাদের স্ব স্ব জাতির মধ্যে যুদ্ধ-বিবাদ ছিলো ইবাদাতে একত্ববাদ ও আল্লাহর জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে নেয়ার প্রতি আহ্বানকে কেন্দ্র করেই।
সহীহ হাদীসে সাব্যস্ত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
أُمرت أن أُقَاتِلَ الناس حتى يَشْهَدُوا أَنْ لا إلهَ إلا الله وأن محمداً رسول الله، ويُقيموا الصلاةَ ، ويؤتوا الزكاةَ، فإذا فَعَلُوا ذلكَ عَصِمُوا مِنِّي دماءهم وأموالهم إلا بحق الإسلام ، وحِسَابُهم على الله »
"আমাকে মানুষের সাথে ততক্ষণ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার জন্য আদেশ করা হয়েছে, যতক্ষণ না তারা এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোন মা'বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, আর সালাত কায়েম করে ও যাকাত প্রদান করে। অতঃপর যখনই তারা সে কাজগুলো করবে, তখনই আমার থেকে স্বীয় জান-মাল রক্ষা করে নেবে, ইসলামের হকু¹ ব্যতীত। আর তাদের হিসাব-নিকাশের দায়িত্ব আল্লাহর উপর”*।
সহীহ হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আরো সাব্যস্ত হয়েছে - তিনি বলেছেন,
«مَنْ قَالَ لَا إِلهَ إلا الله وكفر بما يُعبدُ مِنْ دون الله حرم ماله ودمه وحسابه عَلَى الله »
“যে ব্যক্তি বলে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোন মা'বুদ নেই এবং আল্লাহ ব্যতীত আর যা কিছুর উপাসনা করা হয় তা সে অস্বীকার করে, তাহলে তার সম্পদ ও প্রাণ হানি করা হারাম এবং তার হিসাব নেয়ার ভার আল্লাহর উপর”¹।
টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৭৩৭৩)
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৭৩৭২)
³ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৪৪৯৭)
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৯৩)
¹ ইসলামের হকু বলতে বুঝায়ঃ ইসলামের দন্ডবিধি আইন। সুতরাং কেউ দন্ডনীয় অপরাধ করলে ইসলামের দাবী অনুযায়ী সে তার সাজা পাবেই। সেক্ষেত্রে আল্লাহর আইনানুসারে তার জান ও মালের নিরাপত্তা আর থাকবে না-অনুবাদক。
* সহীহ বুখারী (হাদীস নং ২৫) এবং সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২)
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৩)
📄 ইবাদাত শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা প্রসঙ্গে
এতে রয়েছে কয়েকটি বিষয়
প্রথম বিষয় ইবাদাতের অর্থ এবং যে সকল মূলনীতির উপর এর বুনিয়াদ
ইবাদাতের আভিধানিক অর্থ নম্র ও অনুগত হওয়া। বলা হয় مُعَبدُ بَعْسِيرٌ یعنی অবনত উট (যা আরোহণকারীদের অনুগত), এবং مُعَبَّدٌ طَرِيق یعنی উপযোগী রাস্তা, যখন পায়দল চলার কারণে তা চলাচলের উপযোগী হয়।
আর শরীয়তের পরিভাষায় ইবাদাত হচ্ছে: 'আল্লাহ তা'আলা ভালবাসেন এবং পছন্দ করেন এমন সব প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কথা ও কাজের ব্যাপক একটি নাম'।
ইবাদাতের কিছু প্রকারভেদ উল্লেখের সময় এর বিস্তারিত বিবরণ আসবে।
তিনটি রুকনের উপর ইবাদাতের ভিত্তি স্থাপিতঃ
এক: মা'বুদ তথা আল্লাহ পাকের জন্য পরিপূর্ণ ভালবাসা পোষণ করা। যেমন মহান আল্লাহ বলেনঃ
﴿ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلهِ ﴾ (البقرة : ١٦٥)
"আর যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহকে সর্বাধিক ভালবাসে”। [সূরা আল-বাকারাহ: ১৬৫]
দ্বিতীয়: পরিপূর্ণ আশা পোষণ করা। যেমন মহান আল্লাহ বলেন:
رحمته (الإسراء : ٥٧) ويرجون رحمته
“এবং তারা তাঁর দয়া প্রত্যাশা করে”। [সূরা আল-ইসরা : ৫৭]
তৃতীয়: আল্লাহকে পরিপূর্ণভাবে ভয় করা। যেমন মহান আল্লাহ বলেন:
وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ (الإسراء: ٥٧)
"এবং তারা তাঁর শাস্তিকে ভয় করে"। [সূরা আল-ইসরা : ৫৭]
এ তিনটি মহান রুকনকে আল্লাহ তা'আলা কুরআনের শুরুতে স্বীয় বাণীতে এভাবে একত্রিত করেছেন:
الْحَمْدُ لِلهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ * الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ * مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ
"সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য, যিনি দয়াময় পরম দয়ালু, প্রতিদান দিবসের মালিক"। [সূরা আল-ফাতিহা: ২-৪]
প্রথম আয়াতটিতে রয়েছে ভালবাসার বিষয়টি। কেননা আল্লাহ হচ্ছেন নেয়ামতদাতা। আর নেয়ামতদাতাকে তার নেয়ামতদানের পরিমাণ অনুযায়ী ভালবাসা হয়। দ্বিতীয় আয়াতটিতে রয়েছে আশার বিষয়টি। কেননা দয়ার গুণে গুণান্বিত সত্তার কাছেই রহমাতের আশা করা যায়। আর তৃতীয় আয়াতটিতে রয়েছে ভয়ের প্রতি ইঙ্গিত; কেননা প্রতিদান ও হিসাবের অধিপতির কাছে শান্তি পাওয়ার ভয় রয়েছে।
এজন্যই এর পর আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ إِيَّاكَ نَعْبُدُ অর্থাৎ হে প্রভু! আমি আপনার ইবাদাত করি এ তিনটি বিষয় সহকারে: আপনার প্রতি ভালবাসা পোষণ সহকারে, যার উপর প্রমাণ বহন করছে ﴾ الْحَمْدُ لِلهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ﴿ আর আপনার প্রতি আশা পোষণের সাথে, যার দলীল হল الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ এবং আপনাকে ভয় করার সাথে, যার উপর প্রমাণ হল مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ
আর ইবাদাত দু'টি শর্ত ছাড়া কবুল হয় না :
১. ইবাদাতে মা'বুদ তথা আল্লাহর জন্য ইখলাস থাকতে হবে। কেননা আল্লাহ শুধুমাত্র তাঁর উদ্দেশ্যে একনিষ্ঠভাবে কৃত আমল ছাড়া অন্য আমল কবুল করেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ (البيئة : ٥)
"তারা তো শুধু আল্লাহর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে তাঁর ইবাদাত করার জন্য আদিষ্ট হয়েছে”। [সূরা আল-বাইয়েনাহঃ ৫]
আল্লাহ আরো বলেন:
أَلَا لِلهِ الدِّينُ الْخَالِصُ (الزمر : ٣)
“জেনে রাখ, নিখুঁত ও খাঁটি আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য”। [সূরা আয-যুমার: ৩]
আল্লাহ আরো বলেন:
قُلِ اللهَ أَعْبُدُ مُخْلِصًا لَهُ دِينِي (الزمر: ١٤)
"বলুন, আমি আল্লাহরই ইবাদাত করি, তাঁর প্রতি আমার আনুগত্যকে একনিষ্ঠ রেখে”। [সূরা আয-যুমার: ১৪]
২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ থাকতে হবে; কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ মোতাবেক না হলে আল্লাহ কোন আমল কবুল করেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَا آتَكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ ۚ وَمَا نَهَكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا له (الحشر : ٧)
"আর রাসূল তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাক”। [সূরা আল-হাশর: ৭]
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا (النساء : ٦٥)
"কিন্তু না, আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা মু'মিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার উপর অর্পণ না করে; অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তারা তা মেনে নেয়”। [সূরা আন-নিসা: ৬৫]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
«مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌ»
"যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনে এমন কিছু উদ্ভাবন করবে, যা এর অন্তর্গত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত'। হাদীসের শব্দটির অর্থ مردود علیه অর্থাৎ তার প্রতি ফিরিয়ে দেয়া হবে।
অতএব ততক্ষণ পর্যন্ত কোন আমলই বিবেচনায় আসবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তা খালেসভাবে আল্লাহর জন্য এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত অনুযায়ী সঠিকভাবে করা না হবে।
মহান আল্লাহ তা'আলার বাণী -
)۲ : لِيَبْلُوَكُمْ أَيْكُمُ أَحْسَنُ عَمَلًا (هود: ۷، الملك
"যেন (আল্লাহ) তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন - তোমাদের মধ্য হতে কে কর্মে উত্তম” [সূরা হুদ ঃ৭, সূরা আল-মূলক ৪২]
এ আয়াতের أحسن عملا এর অর্থ সম্পর্কে ফুদাইল ইবনে ইয়াদ রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ
أَخْلَصه وأَصْوبه
অর্থাৎ সবচেয়ে বেশী খালেস আমল ও সর্বাধিক সঠিক আমল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলঃ হে আবু আলী! সবচেয়ে বেশী খালেস ও সর্বাধিক সঠিক আমল কোনটি? তিনি বললেনঃ 'আমল যখন খালেস হবে কিন্তু সঠিক হবে না, তখন তা কবুল হবে না। আর সঠিক হল কিন্তু খালেস হল না, তাও কবুল হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তা খালেস এবং সঠিক উভয়ই না হবে। খালেস হল যা আল্লাহর জন্য নিবেদিত হবে এবং সঠিক হল যা সুন্নাহ্ অনুযায়ী হবে”।
যে সকল আয়াত এ দু'টি শর্তকে একত্রে বর্ণনা করেছে তম্মধ্যে রয়েছে সূরা আল-কাহফ্ফের শেষে আল্লাহর বাণী:
قُل إنما أنا بشر مثلُكُمْ يُوحَى إِلَى أَنَّمَا الهُمُ الهُ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُو القَاء رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَلَا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكُ بعبادة ربة أَحَدًا (الكهف : ١١٠)
"বলুন, আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষই। আমার প্রতি এ প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের ইলাহই একমাত্র প্রকৃত ইলাহ্। সুতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে ও তার প্রতিপালকের ইবাদাতে কাউকেই শরীক না করে”। [সূরা আল-কাহফঃ ১১০]
দ্বিতীয় বিষয় ইবাদাতের কিছু প্রকারের বর্ণনা
ইবাদাতের অনেক প্রকার রয়েছে। প্রত্যেক সৎকর্ম যা আল্লাহ ভালবাসেন ও পছন্দ করেন, চাই তা কথা হোক কিংবা কাজ হোক, প্রকাশ্য হোক কিংবা অপ্রকাশ্য হোক, তা-ই ইবাদাতের প্রকারসমূহের একটি প্রকার। নীচে এর উপর কিছু উদাহরণ পেশ করা হলঃ
১. ইবাদাতের প্রকারসমূহের মধ্যে রয়েছে : দো'আ। প্রার্থনার দো'আ ও ইবাদাতের দো'আ দু'টোই এতে শামিল। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿ فَادْعُوا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ ﴾ (غافر : ١٤)
"সুতরাং আল্লাহকে ডাক তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে”। [সূরা গাফির: ১৪]
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
﴿ وَأَنَّ الْمَسْجِدَ لِلهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللهِ أَحَدًا (الجن : ۱۸)
"আর মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না”। [সূরা আল-জ্বিন : ১৮]
মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ
﴿وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُوا مِنْ دُونِ اللهِ مَنْ لا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيمَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَابِهِمْ غفِلُونَ * وَإِذَا حُشِرَ النَّاسُ كَانُوا لَهُمْ أَعْدَاء وَ كَانُوا بعبادتهم كفِرِينَ ﴾ (الأحقاف : ٥-٦)
"সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে আহ্বান করে যা ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্তও তার আহ্বানে সাড়া দিবে না? আর অবস্থা তো এরকম যে, এসব কিছু তাদের আহ্বান সম্পর্কে অবহিতও নয়। যখন (কিয়ামতের দিন) মানুষদেরকে একত্রিত করা হবে, তখন সে সকল কিছু হবে তাদের শত্রু এবং সেগুলো তাদের ইবাদাত অস্বীকার করবে”। [সূরা আল-আহকাফ: ৫-৬]
অতএব যদি কেউ আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে এমন কিছুর জন্য আহ্বান করে যা আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আর কেউ দিতে সমর্থ নন, তাহলে সে ব্যক্তি হবে মুশরিক ও কাফির, চাই আহুত ব্যক্তি জীবিত হোক কিংবা মৃত। আর যদি কেউ জীবিত কাউকে এমন বস্তুর জন্য আহ্বান করে যার উপর সে সামর্থবান, যেমন এমন বলা যে, হে অমুক আমাকে আহার করাও কিংবা হে অমুক! আমাকে পান করাও ইত্যাদি, তবে তাতে কোন সমস্যা নেই। আর যে ব্যক্তি মৃত কিংবা অনুপস্থিত কাউকে অনুরূপভাবে ডাকে, তাহলে সে হবে মুশরিক। কেননা মৃত ও অনুপস্থিত ব্যক্তির পক্ষে এরূপ করা সম্ভব নয়।
আর দো'আ দু' প্রকার : প্রার্থনার দো'আ ও ইবাদাতের দো'আ।
প্রার্থনার দো'আ হল - আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ চাওয়া। আর ইবাদাতের দো'আর মধ্যে নৈকট্য লাভের সকল প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে; কেননা যে আল্লাহর ইবাদাত করে, সে স্বীয় কথা ও অবস্থার ভাষায় তার রবের কাছে উক্ত ইবাদাত কবুল করার এবং এর উপর সাওয়াব দেয়ার আবেদন করে থাকে।
কুরআনে দো'আর যত নির্দেশ এসেছে, আর গায়রুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দো'আ করা থেকে যত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং দো'আকারীদের যত প্রশংসা করা হয়েছে, সে সবই প্রার্থনার দো'আ ও ইবাদাতের দো'আকে শামিল করে থাকে।
২, ৩, ৪. ইবাদাতের প্রকারসমূহের মধ্যে আরো রয়েছে : ভালবাসা, ভয় ও আশা। এ প্রকারগুলো সম্পর্কে ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে এবং বর্ণনা করা হয়েছে যে, এগুলো ইবাদাতের রুকন।
৫. ইবাদাতের প্রকারসমূহের মধ্যে আরো রয়েছে : তাওয়াক্কুল। তাওয়াক্কুল হল কোন কিছুর উপর নির্ভর করা।
আর আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল (নির্ভরতা) হল : কল্যাণ অর্জন ও ক্ষতি দূর করার যে উপায়সমূহ আল্লাহ তা'আলা প্রণয়ন করেছেন এবং বৈধ সাব্যস্ত করেছেন তা অবলম্বন করে তাঁর প্রতি ভরসা ও প্রত্যয় রেখে তাঁর কাছেই বিষয়টি সত্যিকারভাবে সোপর্দ করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَعَلَى اللهِ فَتَوَكَّلُوا إِنْ كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ (المائدة : ٢٣)
"আর আল্লাহর উপরই তোমরা নির্ভর কর যদি তোমরা মু'মিন হয়ে থাক"। [সূরা আল-মায়িদাহঃ২৩]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللهِ فَهُوَ حَسْبُهُ ﴾ (الطلاق: ۳)
“যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভর করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট”। [সূরা আত- জ্বালাকঃ ৩]
৬, ৭, ৮. ইবাদাতের প্রকারসমূহের মধ্যে আরো রয়েছে: আগ্রহ, ভীতি ও বিনয়।
আগ্রহ হল: প্রিয় বস্তুর কাছে পৌঁছার ভালবাসা ও টান। ভীতি হল: এমন ভয় যা ভয়ের বস্তু থেকে পলায়নের ফলে সৃষ্ট। আর বিনয় হল: আল্লাহর মহিমার কাছে এমনভাবে ছোট হওয়া ও বিনম্র হওয়া, যাতে তাঁর পার্থিব ও শরয়ী ক্ষেত্রের ফয়সালাকে সে মেনে নেয়। ইবাদাতের এ তিনটি প্রকার উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন:
﴿إِنَّهُمْ كَانُوا يُسْرِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ ﴾ (الأنبياء: ٩٠)
"তারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করত, তারা আমাদেরকে ডাকত আগ্রহ ও ভীতি সহকারে এবং তারা ছিলো আমাদের নিকট বিনীত”। [সূরা আল-আম্বিয়া: ৯০]
৯. ইবাদাতের প্রকারের মধ্যে আরো রয়েছে: সশ্রদ্ধ ভয়। আর তা হল সেই ভয়, যা ঐ সত্তার মহত্ত্ব ও পরিপূর্ণ ক্ষমতা সম্পর্কে অবগত থাকার উপর স্থাপিত, যে সত্তাকে সে ভয় করে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿فَلا تَخْتَوهُمْ وَاخْشُونَ ﴾ (البقرة : ١٥٠)
“সুতরাং তাদেরকে ভয় করো না এবং আমাকেই ভয় কর”। [সূরা আল-বাকারাহ: ১৫০]
﴿فَلا تَخْتُوهُمْ وَاخْشَوْنِ﴾ (المائدة : ٣)
"সুতরাং তাদেরকে ভয় করো না এবং আমাকেই ভয় কর”। [সূরা আল- মায়িদাহঃ ৩]
১০. তন্মধ্যে আরো আছে: ইনাবাহ (প্রত্যাবর্তন)। আর তা হল আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য করা ও তাঁর নাফরমানী থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَانِيبُوا إِلَى رَبِّكُمْ وَأَسْلِمُوالَهُ﴾ (الزمر : ٥٤)
"তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দিকে ফিরে আস এবং তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ কর”। [সূরা আয-যুমার : ৫৪]
১১. তন্মধ্যে রয়েছে : ইস্তে'আনা (সাহায্য প্রার্থনা)। আর তা হল দ্বীন ও দুনিয়ার বিষয়সমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ (الفاتحة : ٥)
"আমরা আপনারই ইবাদাত করি এবং আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি”। [সূরা আল-ফাতিহা : ৫]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনে আব্বাসকে অসিয়ত করার সময় বলেনঃ
إِذَا اسْتَنتَ فَاسْتَعِنْ بِالله.
"যখন সাহায্য চাইবে, তখন আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও”¹।
১২. এতে আরো রয়েছে : ইস্তে'আযা (আশ্রয় চাওয়া)। আর তা হল অপছন্দনীয় বস্তু থেকে আশ্রয় দেয়ার ও রক্ষা প্রদানের আবেদন করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ * مِن شَرِّ مَا خَلَقَ ﴾ (الفلق: (۱، ۲)
"বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের পালনকর্তার, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট হতে”। [সূরা আল-ফালাক : ১-২]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ * مَلِكِ النَّاسِ * إِلَهِ النَّاسِ * مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ (الناس : ١-٤)
"বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি মানুষের পালনকর্তার, মানুষের অধিপতির, মানুষের ইলাহের নিকট, আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হতে”। [সূরা আন-নাস: ১-৪]
১৩. তাতে আরো রয়েছে: ইস্তেগাসা (উদ্ধারের আবেদন)। আর তা হল বিপদ-আপদ ও ধ্বংস থেকে উদ্ধারের আবেদন করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ﴾ (الأنفال: ٩)
"স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট উদ্ধার প্রার্থনা করছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের প্রার্থনা কবুল করলেন”। [সূরা আল-আনফাল : ৯]
১৪. এতে আরো রয়েছেঃ যবেহ করা। আর তা হল আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে বিশেষ পদ্ধতিতে রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে কোন প্রাণী বধ করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ﴾ (الأنعام: ١٦٢)
“বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু জগতসমূহের পালনকর্তা আল্লাহরই জন্য”। [সূরা আল-আন'আম : ১৬২]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
﴿فَصَلِّ لِرَبِّكَ وانحر﴾ (الكوثر : ٢)
"সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং যবেহ করুন”। [সূরা আল-কাউসার: ২]
১৫. তন্মধ্যে আছে: মানত করা। আর তা হল কোন ব্যক্তি তার নিজের উপর নিজেই কোন কিছু চাপিয়ে দেয়া, কিংবা ওয়াজিব নয় আল্লাহর আনুগত্যের এমন কোন কাজকে অপরিহার্য করে নেয়া। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿يُوفُونَ بِالنَّدْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ שׁَرُّهُ مُسْتَطِيرًا﴾ (الإنسان : ٧)
"তারা মানত পূর্ণ করে এবং সে দিনকে ভয় করে, যে দিনের অনিষ্ট হবে ব্যাপক”। [সূরা আল-ইনসান: ৭]
এগুলো হল ইবাদাতের প্রকারসমূহের কিছু উদাহরণ। এর সমস্ত কিছুই একমাত্র আল্লাহর অধিকারভূক্ত, যার কোন কিছুই আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা জায়েয নেই।
শরীরের যে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা ইবাদাত আদায় করা হয়, সে অনুযায়ী ইবাদাত তিন প্রকার :
প্রথম প্রকার : অন্তরের ইবাদাত। যেমন ভালবাসা, ভয়, আশা, (আল্লাহর দিকে) ফিরে আসা, সশ্রদ্ধ ভয়, ভীতি, তাওয়াক্কুল ইত্যাদি।
দ্বিতীয় প্রকার : জিহ্বার ইবাদাত। যেমন প্রশংসা করা, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা, তাসবীহ পাঠ, ইস্তেগফার, কুরআন তেলাওয়াত ও দো'আ প্রভৃতি।
তৃতীয় প্রকার : অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহের ইবাদাত। যেমন সালাত, সিয়াম, যাকাত, হজ্জ, সাদাকাহ, জিহাদ ইত্যাদি।
টিকাঃ
¹ সহীহ আল-বুখারী (হাদীস নং২৬৯৭)।
¹ হেলইয়াতুল আওলিয়া (৮/৯৫)
¹ সুনানে তিরমিযী (২৫১৬), মুসনাদে আহমাদ (১/৩০৭), তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান এবং হাকিম সহীহ বলেছেন।
📄 নবী মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাওহীদ সংরক্ষণ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় উম্মাতের ব্যাপারে সর্বাত্মকরূপে এ আগ্রহই পোষণ করতেন যে, তারা যেন আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ তথা একত্ববাদের বাস্তবায়নকারী ও শক্তিশালী সংরক্ষক হতে পারে, এবং তাওহীদ বিরোধী ও এর বিপরীত যাবতীয় উপায়-উপকরণকে পরিহার করতে পারে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُونَ رَّحِيمٌ ﴾ (التوبة: ١٢٨)
"নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য হতেই একজন রাসূল আগমন করেছেন, তোমাদের যে দুঃখ-কষ্ট হয়ে থাকে তা তার জন্য বড়ই বেদনাদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী। মু'মিনদের প্রতি করুণাশীল ও দয়ালু"। [সূরা আত-তাওবাহ : ১২৮]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শির্ক করা থেকে অতিমাত্রায় নিষেধ করেছেন। যে সমস্ত কথা ও কাজ দ্বারা তাওহীদে ঘাটতি হয় কিংবা তাতে ত্রুটি সৃষ্টি হয় তা থেকে উদার সত্যনিষ্ঠ দ্বীন তথা ইব্রাহীমের যে মিল্লাত দিয়ে তাকে প্রেরণ করা হয়েছে, সে মিল্লাতের সুরক্ষার জন্য তিনি বিশেষভাবে ও ব্যাপকভাবে বারংবার সতর্ক ও ভয় প্রদর্শন করেছেন। এ ব্যাপারটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত সুন্নায় প্রচুর এসেছে। ফলে তিনি প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সন্দেহ সংশয় নিরসন করেছেন, ওজরের পথ রুদ্ধ করেছেন এবং পথ সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন।
আগত বিষয়সমূহে এমন কিছু পেশ করা হবে যার মাধ্যমে নবী মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাওহীদ সংরক্ষণের বিষয়টি এবং তিনি যে শির্ক ও বাতিলের দিকে পরিচালনাকারী প্রত্যেক পথ বন্ধ করে দিয়েছেন সেটি সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে।
প্রথম বিষয়ঃ ঝাড়ফুঁক
ক. সংজ্ঞা: আরবীতে ঝাড়ফুঁককে الرقى বলা হয় যা رقية শব্দের বহুবচন। আর ঝাড়ফুঁক হল আরোগ্য ও সুস্থতা লাভের উদ্দেশ্যে কুরআন কারীম কিংবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত দো'আসমূহের কিছু পড়া ও ফুঁক দেয়া।
খ. হুকুম: এর হুকুম হল তা জায়েয। জায়েয হওয়ার কিছু দলীল নিচে দেয়া হলঃ
আওফ ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: "আমরা জাহেলী যুগে ঝাড়ফুঁক করতাম। অতঃপর এ সম্পর্কে আমরা জিজ্ঞাসা করলামঃ হে রাসূলুল্লাহ! এ ব্যাপারে আপনার মত কি? তিনি বললেনঃ
اعْرَضُوا عليَّ رُقَاكُم، لا بأس بالرقى ما لم يكن فيه شِرْكَ»
"আমার কাছে তোমাদের ঝাড়ফুঁক পেশ কর। ততক্ষণ পর্যন্ত ঝাড়ফুঁক করাতে কোন অসুবিধা নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত তাতে কোন শির্ক না থাকবে”।
মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন¹।
আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ
رخص رسولُ اللهِ ﷺ في الرقية من العين والحمة والنملة)
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চোখলাগা², বিষাক্ত জীব³ ও আঘাত⁴ থেকে ঝাড়ফুঁক করার জন্য আমাদেরকে অনুমতি দিয়েছেন”⁵।
মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
«مَنِ اسْتَطَاعَ أَنْ يَنفَعَ أَخاهُ فَلْيَفعل»
"যে ব্যক্তি স্বীয় ভ্রাতার উপকার করতে পারে, সে যেন তা করে"¹। মুসলিম এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন: আমাদের কোন ব্যক্তি যদি তার অসুস্থতার কথা জানাত, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডান হাত দিয়ে তাকে মাসেহ করে বলতেন:
أذهب الباس رب الناس واشف أنت الشافي لا شفاء إلا شفاؤك شفاء لا يُغادر سقماً»
“হে মানুষের প্রভু! আপনি বিপদ দূর করুন এবং আরোগ্য দান করুন। আপনিই তো আরোগ্যদাতা। আপনার আরোগ্যদান ছাড়া আর কোন আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দান করুন যাতে আর কোন রোগ-বালাই থাকবে না"। এ হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন²।
গ. ঝাড়ফুঁকের শর্তসমূহঃ ঝাড়ফুঁক জায়েয ও বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে।
প্রথম শর্ত: এমন বিশ্বাস পোষণ না করা যে, আল্লাহ ছাড়াই এ ঝাড়ফুঁক স্বয়ং নিজে উপকার করে থাকে। অতএব যদি কেউ বিশ্বাস করে যে, ঝাড়ফুঁক আল্লাহ ছাড়াই স্বয়ং উপকার করে থাকে, তাহলে এ বিশ্বাস হবে হারাম, বরং তা হবে শির্ক। তাই এমন বিশ্বাস রাখবে যে, ঝাড়ফুঁক এমন একটি উপকরণ যা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া উপকার করে না।
দ্বিতীয় শর্ত : ঝাড়ফুঁক এমন কিছু দ্বারা হতে পারবে না, যা শরীয়তের পরিপন্থী। যেমন গায়রুল্লার কাছে দো'আ করা কিংবা জ্বিনের কাছে বিপদ থেকে উদ্ধারের আবেদন বা অনুরূপ কোন বিষয় ঝাড়ফুঁকে শামিল থাকলে তা হবে হারাম, বরং তা শির্ক বলে গণ্য হবে।
তৃতীয় শর্ত : ঝাড়ফুঁক বোধগম্য এবং জ্ঞাত হতে হবে। অতএব ঝাড়ফুঁক যদি যাদু-মন্ত্র কিংবা ভেলকি জাতীয় কিছু হয়, তাহলে তা জায়েয হবে না।
ইমাম মালেক রাহেমাহুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল : কোন ব্যক্তি ঝাড়ফুঁক করতে ও ঝাড়ফুঁক করার আবেদন করতে পারবে কি? তিনি বললেন : “উত্তম বাণী দ্বারা ঝাড়ফুঁক করলে কোন অসুবিধা নেই"।
ঘ. নিষিদ্ধ ঝাড়ফুঁক : যে সকল ঝাড়ফুঁকে পূর্ববর্ণিত শর্তসমূহ পরিপূর্ণ হবে না, তা হারাম ও নিষিদ্ধ ঝাড়ফুঁক বলে গণ্য হবে। যেমন ঝাড়ফুঁককারী কিংবা ঝাড়ফুঁককৃত ব্যক্তি যদি এ বিশ্বাস করে যে, ঝাড়ফুঁক নিজেই উপকার ও প্রতিক্রিয়া করে থাকে; অথবা সে ঝাড়ফুঁকে যদি থাকে শির্কযুক্ত শব্দমালা ও কুফ্রী অসিলার শরণাপন্ন হওয়া এবং বেদ'আতী শব্দ ও অনুরূপ কোন কিছু; অথবা ঝাড়ফুঁক যদি মন্ত্র-তন্ত্র ও অনুরূপ কিছুর মত অবোধগম্য শব্দ দ্বারা হয়।
দ্বিতীয় বিষয় : তাবীয-কবচ
ক. সংজ্ঞা : তাবীয-কবচ হল কল্যাণ লাভ ও ক্ষতি দূর করার জন্য ঘাড়ে কিংবা অন্যত্র যে সকল তাবীয, মালা কিংবা হাড্ডি অথবা অনুরূপ কিছু ঝুলিয়ে রাখা হয়। জাহেলী যুগে আরবগণ তাদের সন্তানদের শরীরে এসব ঝুলিয়ে রাখত। তাদের বাতিল ধারণা ছিলো এ দ্বারা তাদের সন্তানগণ চোখলাগা থেকে বেঁচে থাকবে।
খ. হুকুম : এর হুকুম হল তা হারাম।
বরং তা এক প্রকার শির্ক; কেননা এতে রয়েছে গায়রুল্লার সাথে (নির্ভরতামূলক) সম্পর্ক স্থাপন। কারণ আল্লাহ ছাড়া আর কোন প্রতিরোধকারী নেই। একমাত্র আল্লাহ, তাঁর নামসমূহ ও গুণাবলীর মাধ্যমেই ক্ষতিকর ও কষ্টদানকারী বস্তু প্রতিরোধ করার আবেদন করা যায়।
ইবনে মাস'উদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন : আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে,
«إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتَّوَلَةَ شِرْكٌ»
"নিশ্চয়ই ঝাড়ফুঁক, তাবীয ও যাদুটোনা হচ্ছে শির্ক"।
আবু দাউদ ও হাকিম এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন¹।
আবদুল্লাহ ইবনে 'আকীম রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেনঃ
«مَنْ تعلق شيئاً وكِلَ إِلَيْهِ»
"যে ব্যক্তি কোন কিছু ঝুলিয়ে রাখে, তাকে সে জিনিসের প্রতি সোপর্দ করা হয়"।
হাদীসটি আহমাদ, তিরমিযী ও হাকিম বর্ণনা করেছেন²।
'উকবা ইবনে 'আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন:
«مَنْ تعلّق تميمةً فلا أتم الله له، وَمَنْ تَعلَّقَ ودَعَةً فلا ودع الله له»
"যে ব্যক্তি তাবীজ ঝুলিয়ে রাখে, আল্লাহ তার ইচ্ছা পূর্ণ না করুন। আর যে ব্যক্তি শামুক ঝুলায়, আল্লাহ তাকে নিরাপদ না রাখুন"।
হাদীসটি আহমাদ ও হাকিম বর্ণনা করেছেন³।
"উকবা ইবনে 'আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
«مَنْ علَّق تميمةً فَقَدْ أَشْرَكَ»
“যে ব্যক্তি তাবীজ লাগাল, সে শির্ক করল"⁴।
আহমাদ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
এ সকল দলীল ও অনুরূপ অর্থ বিশিষ্ট অন্যান্য দলীল শির্কযুক্ত সে সব ঝাড়ফুঁক থেকে সতর্ক করার ব্যাপারে পেশ করা হয়েছে, যা ছিলো আরবদের অধিকাংশ ঝাড়ফুঁক। এতে শির্ক থাকায় ও গায়রুল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করা হয় বিধায় এ থেকে নিষেধ করা হয়েছে।
গ. ঝুলানো বস্তুটি যদি কুরআন কারীমের অন্তর্গত কোন আয়াত হয় ٤
এ মাসআলায় ওলামাদের মতভেদ রয়েছে। কতিপয় আলেম এটি জায়েয বলে মত ব্যক্ত করেছেন। আর কেউ কেউ তা নিষেধ করেছেন এবং বলেছেন, আরোগ্য লাভের কামনায় কুরআন ঝুলানো জায়েয নেই। চারটি কারণে এ মতটি সঠিকঃ
১. তাবীজ ঝুলানো সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপকতা। আর সে ব্যাপকতাকে খাস ও নির্দিষ্ট করার কোন দলীল নেই।
২. (হারামের) পথ বন্ধ করার জন্য; কেননা কুরআন ঝুলানোর ব্যাপারটি কুরআন নয় এমন কিছু ঝুলানোর দিকে পরিচালিত করবে।
৩. কুরআন ঝুলানো হলে বাথরুমের প্রয়োজন সমাধা করার সময় কিংবা ইস্তেনজা ও অনুরূপ কোন কাজ করা অবস্থায় একে সাথে বহন করার কারণে এর অমর্যাদা হয়।
৪. কুরআনের দ্বারা আরোগ্য লাভের বিষয়টি একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় এসেছে। আর তা হল অসুস্থ ব্যক্তির উপর কুরআন পাঠ করা। অতএব এ অবস্থা অতিক্রম করে আর কিছু করা ঠিক হবে না।
তৃতীয় বিষয়ঃ আংটি, সুতা ও অনুরূপ কিছু পরিধান করা
ক. আংটি হল লোহা অথবা স্বর্ণ কিংবা রৌপ্য বা তাম্র অথবা অনুরূপ কিছু দ্বারা প্রস্তুতকৃত গোলাকার একটি খন্ড। আর সুতা সবার পরিচিত। তবে কখনো তা হয়ে থাকে পশমের কিংবা কাত্তান তৃণ থেকে তৈরীকৃত বুননের কিংবা অনুরূপ কিছুর। জাহেলী যুগে আরবগণ ক্ষতি প্রতিরোধ করার জন্য, কল্যাণ লাভের জন্য কিংবা চোখলাগা থেকে বেঁচে থাকার জন্য এ জাতীয় এবং অনুরূপ কিছু লাগাত। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قُلْ أَفَرَوَيْتُمُ مَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللهِ إِنْ أَرَادَ نِي اللهُ بِغَيْرٍ هَلْ هُنَّ كَشِفْتُ ضُرَّهُ أَوْ أَرَادَ نِي بِرَحْمَةٍ هَلْ هُنَّ مُسِكْتُ رَحْمَتِهِ قُلْ حَسْبِيَ اللهُ عَلَيْهِ يَتَوَكَّلُ الْمُتَوَكَّلُونَ (الزمر: ۳۸)
“বলুন, তোমরা কি ভেবে দেখেছ, আল্লাহ আমার অনিষ্ট চাইলে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে আহ্বান করছ তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করতে চাইলে তারা কি সে অনুগ্রহ রোধ করতে পারবে? বলুন আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তাঁর উপরই নির্ভরকারীগণ নির্ভর করে”। [সূরা আয-যুমার: ৩৮]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمُ مِنْ دُونِهِ فَلَا يَمْلِكُونَ كَشَفَ الفُرْعَنْكُمْ وَلَا تَحويلا (الإسراء : ٥٦)
"বলুন, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে ইলাহ্ মনে কর তাদেরকে আহ্বান কর। অতঃপর দেখবে তোমাদের থেকে অনিষ্ট রোধ করার ও পরিবর্তন করার মালিক তারা নয়”। [সূরা আল-ইসরা : ৫৬]
ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
أن النبي ﷺ رأى رجلاً في يده حلقة من صفر فقال: ما هذه؟ قال: من الواهنة، فقال: انزعها؛ فإنَّها لا تزيدك إلا وهنا، انبذها عنك، فإنَّك لو مت وَهِيَ عَليكَ ما أفلحت أبداً)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক লোককে তাম্রের একটি আংটি হাতে পরা দেখে জিজ্ঞাসা করলেন: এটা কি? সে বলল, এটি ওয়াহেনা (বাহু ব্যথা) রোগের কারণে (পরেছি)। তিনি বললেন: "এটি খুলে ফেল। কেননা এটা তোমার দুর্বলতাই শুধু বৃদ্ধি করবে। তোমার কাছ থেকে এটা ছুঁড়ে ফেলে দাও। কেননা তোমার হাতে এটা থাকা অবস্থায় যদি তুমি মৃত্যুবরণ করতে, তাহলে কখনোই সাফল্য লাভ করতে না"¹। আহমাদ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: তিনি এক ব্যক্তির হাতে জ্বরের কারণে পরা একটি সুতা দেখে তা কেটে ফেললেন। আর মহান আল্লাহর এ বাণী তেলাওয়াত করলেনঃ
﴿وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُم بِاللَّهِ إِلَّا وَهُم مُشْرِكُونَ ﴾ (يوسف : ١٠٦)
“তাদের অধিকাংশই শির্কে লিপ্ত অবস্থায়ই আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে”। [সূরা ইউসুফ : ১০৬]¹
খ. আংটি ও সুতা প্রভৃতি পরিধানের হুকুম : এগুলো হারাম; কেননা এগুলো পরিধানকারী যদি এ বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ ছাড়াই এগুলো নিজে নিজেই আছর করে, তাহলে সে হবে প্রভুত্বে একত্ববাদের ক্ষেত্রে বড় শির্কে লিপ্ত মুশরিক। কারণ সে আল্লাহর সাথে একজন স্রষ্টা ও পরিচালকের অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপন করেছে। আল্লাহ তাদের শির্ক থেকে পবিত্র ও মহান।
আর যদি এ বিশ্বাস করে যে, বিষয়টি একমাত্র আল্লাহরই ইচ্ছাধীন এবং এ জিনিসগুলো শুধু উপকরণ মাত্র, প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী নয়, তাহলে সে হবে ছোট শির্কে লিপ্ত মুশরিক। কেননা যা উপকরণ নয় এমন বস্তুকে সে উপকরণ বানিয়েছে এবং সে তার হৃদয় দিয়ে অন্য দিকে লক্ষ্য রেখেছে। তার এ কাজ বড় শির্কে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমরূপে গণ্য হবে, যদি এগুলোর সাথে তার হৃদয়ের সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং সে তা দ্বারা নেয়ামত লাভের ও মুসিবত দূর করার আশা পোষণ করে থাকে।
চতুর্থ বিষয় : গাছ-পালা, পাথর ইত্যাদি দ্বারা বরকত কামনা
আরবীতে তাবাররুক শব্দের অর্থ বরকত কামনা। বরকত কামনা দু'টি বিষয় থেকে মুক্ত নয়ঃ
১. শরীয়ত নির্দেশিত পন্থায় বরকত কামনা করা যেমন কুরআন দ্বারা। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿وَهَذَا كِتَبُ أَنزَلْنَهُ مُبْرَك ﴾ (الأنعام: ٩٢، ١٥٠)
“আর এটি বরকতময় গ্রন্থ যা আমরা নাযিল করেছি”। [সূরা আল-আন'আমঃ ৯২, ১৫৫]
কুরআনের বরকতের মধ্যে রয়েছে: তা অন্তকরণসমূহের জন্য হেদায়াত, বৃক্ষের জন্য আরোগ্য ও সুস্থতা, আত্মার জন্য সংশোধন, চরিত্রের জন্য সংস্কার প্রভৃতি আরো বহু বরকত।
২. এমন বিষয় দ্বারা বরকত কামনা করা যা শরীয়ত সম্মত নয়। যেমন গাছ- পালা, পাথর, কবর, গম্বুজ, ভূখন্ড ইত্যাদি দ্বারা বরকত কামনা করা। এসব কিছুই শির্কের অন্তর্ভুক্ত।
আবু ওয়াকিদ আল-লাইসী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
(خرجنا مع رسول الله ﷺ إلى حنين ونحن حدثاء عهد بكفر، وللمشركين سدرة يعكفون عندها وينوطون بها أسلحتهم، يُقال لها ذات أنواط، فمررنا بسدرة، فقلنا: يا رسول الله ﷺ اجعل لنا ذات أنواط كما لهم ذات أنواط، فقال رسول الله ﷺ: الله أكبر، إنها السنن، قلتُم والذي نفسي بيده كما قالت بنو إسرائيل لموسى: اجعل لنا إلها كما لهم آلهة . لتركبن سَنَن من كان قبلكم)
"আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হুনাইনে গেলাম। আমরা তখন সবেমাত্র কুফ্র ছেড়ে ইসলামে সমবেত হয়েছি। সে সময় মুশরিকদের একটি কুল বৃক্ষ¹ ছিল, যার পাশে তারা অবস্থান করত এবং তাতে তাদের অস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত। এ গাছটিকে 'যাত আনওয়াত' বলা হতো। এরপর আমরা একটি কুল বৃক্ষের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের জন্য একটি 'যাত আনওয়াত' (ঝুলানোর গাছ) নির্ধারণ করুন, যেমন মুশরিকদের রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: “আল্লাহু আকবার। এতো পূর্ববর্তী জাতিসমূহের অনুসৃত পন্থা। যার হাতে আমার প্রাণ, সেই সত্তার কসম! তোমরা সে রকমই বলেছ, যে রকম বনী ইসরাইলগণ মূসা (আলাইহিস সালাম) কে বলেছিল:
﴿ اجْعَل لَّنَا إِلَهَا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ ﴾ (الأعراف: ١٣٨)
“তাদের মা’বুদদের ন্যায় আমাদের জন্যও একজন মা’বুদ স্থির করে দিন”। [সূরা আল আ’রাফ : ১৩৮] তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের পথ অনুসরণ করবে”। হাদীসটি তিরমিযী বর্ণনা করে একে সহীহ বলেছেন¹。
এ হাদীসটি এ কথাই বুঝাচ্ছে যে, গাছ-পালা, কবর ও পাথর প্রভৃতির ব্যাপারে বরকত লাভে বিশ্বাসীরা সেগুলো দ্বারা যে বরকত কামনা করে, সেগুলোর পাশে অবস্থান করে এবং সেগুলোর উদ্দেশ্যে যবেহ করে, তা শির্ক। এজন্যই হাদীসে এ সংবাদ দেয়া হয়েছে যে, তাদের সে চাওয়া ছিলো বনী ইসরাইলদের চাওয়ার মতই, কেননা তারা মূসা আলাইহিস সালামকে বলেছিল: ﴿اجْعَل لَّنَا إِلَٰهًا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ ﴾ অর্থাৎ তাদের মা’বুদদের ন্যায় আমাদের জন্যও একজন মা’বুদ স্থির করে দিন। এ লোকেরা এমন একটি কুল বৃক্ষ কামনা করেছিলো যদ্বারা তারা বরকত প্রার্থনা করবে, যেরূপ মুশরিকগণ বরকত প্রার্থনা করত। আর (বনী ইসরাইলের) ঐ লোকেরা চেয়েছিলো একজন উপাস্য, যেমন মুশরিকদের অনেক উপাস্য ছিল। অতএব এ উভয় চাওয়ার মধ্যেই ছিলো তাওহীদ বিরোধী প্রবনতা। কেননা বৃক্ষ দ্বারা বরকত কামনা এক ধরণের শির্ক। আর গায়রুল্লাহকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করা তো স্পষ্ট শির্ক।
হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের পথ অনুসরণ করবে” -এর মধ্যে এদিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, ঐ ধরনের শির্কের কিছু তার উম্মাতের মধ্যেও সংঘটিত হবে। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটি বলেছিলেন নিষেধাজ্ঞার সূরে ও সতর্ককারীরূপে।
পঞ্চম বিষয়: কবরের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকান্ড থেকে নিষেধাজ্ঞা
ইসলামের প্রথম যুগে লোকজন জাহেলিয়াতের নিকটবর্তী সময়ে অবস্থান করায় কবর যিয়ারত নিষিদ্ধ হওয়ার নির্দেশই বলবৎ ছিল, যাতে তাওহীদের সুরক্ষা হয় এবং এর হেফাযত হয়। যখন ঈমান সুন্দর হয়ে উঠল, মানুষের মধ্যে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পেল, হৃদয়ে তা গেঁথে গেল এবং তাওহীদের প্রমাণাদি স্পষ্ট হল ও শির্কের সংশয়ের নিরসন হল, তখন কবর যিয়ারতের লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট করে এবং এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে বর্ণনা করে শরীয়তে এর বৈধতার নির্দেশ এল।
বুরাইদা ইবনুল হুসাইব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
نَهيتُكُمْ عَن زِيارَةِ القُبُورِ فَزُورَوْهَا»
"আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত থেকে নিষেধ করেছিলাম। অতঃপর (এখন) তোমরা তা যিয়ারত কর"। এ হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন¹।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
زُورُوا القُبور فإنَّها تُذكر الموت»
"তোমরা কবর যিয়ারত কর। কেননা তা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়”²।
আবু সা'ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إِنِّي نهيتُكُم عَن زيارة القبور فَزُورُوها فَإِنَّ فِيها عبرة »
"আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত থেকে নিষেধ করেছিলাম। তোমরা তা যিয়ারত কর; কেননা তাতে শিক্ষনীয় বিষয় রয়েছে"³।
আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
كنت نهيتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ القُبُورِ أَلاَ فزوروها؛ فإنَّها ترقُ القَلْبَ وتدمع العين وتذكر الآخرة، ولا تقولوا هجراً»
“আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত থেকে নিষেধ করেছিলাম। জেনে রাখ, তোমরা তা যিয়ারত করতে পার; কেননা তা অন্তরকে নরম করে, চোখে অশ্রু প্রবাহিত করে এবং আখিরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আর তোমরা ‘হুজর’ তথা নিষিদ্ধ কথা (কবরের পাশে) বলো না”¹。
বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ সাহাবারা কবরস্থানের উদ্দেশ্যে বের হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে (কবরবাসীদের জন্য দো‘আ) শেখাতেন। তখন তাদের কেউ বলত:
السَّلامُ عَلَيْكُم أهلَ الدِّيارِ مِنَ المؤمنينَ وَالمسلمينَ، وَإِنَّا إِن شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ للاحقون، أسأل الله لنا ولكم العافية
“আপনাদের প্রতি সালাম, হে কবরবাসী মু’মিন মুসলমান! আমরাও আল্লাহর ইচ্ছায় অবশ্যই আপনাদের সাথে মিলিত হব। আল্লাহর কাছে আমাদের এবং আপনাদের জন্য নিরাপত্তা কামনা করছি’²। হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন।
এ সকল হাদীস এবং এগুলোর অর্থে আরো যে সব হাদীস এসেছে, সবই এ প্রমাণ বহন করছে যে, কবর যিয়ারত নিষিদ্ধ থাকার পর তা আবার বৈধ করা হয় দু’টি মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে:
প্রথম : আখিরাত, মৃত্যু ও পরীক্ষাকে স্মরণ করে দুনিয়ায় ত্যাগী জীবন যাপন এবং কবরবাসীদের দ্বারা শিক্ষা গ্রহণ, যা ব্যক্তির ঈমানকে আরো বৃদ্ধি করে দেয়, তার প্রত্যয়কে আরো বলীয়ান করে এবং আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ককে মহীয়ান করে তোলে। আর তার থেকে আল্লাহ-বিমুখতা ও গাফলতি অপসৃত হয়ে যায়।
দ্বিতীয় : মৃত ব্যক্তিদের জন্য দো‘আ, তাদের উপর রহমত পাঠ, তাদের মাগফিরাত কামনা ও আল্লাহর কাছে তাদের ক্ষমা প্রাপ্তির প্রার্থনার মাধ্যমে তাদের উপকার সাধন।
এটাই দলীল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। এতদ্ব্যতীত অন্য কিছু যদি কেউ দাবী করে, তবে তাকে দলীল ও প্রমাণ পেশ করতে হবে।
তাওহীদকে হেফাযত ও সংরক্ষণ করার জন্য কবর ও কবর যিয়ারতের সাথে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু বিষয় থেকে নিষেধাজ্ঞার কথা সুন্নায় এসেছে। প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির উচিত তা জানা, যেন সে বাতিল থেকে নিরাপদ এবং ভ্রষ্টতা থেকে মুক্ত থাকতে পারে। সে সবের মধ্যে রয়েছে:
১. কবর যিয়ারতের সময় 'হুদ্র' (তথা নিষিদ্ধ উক্তি করা) থেকে নিষেধাজ্ঞাঃ
একটু আগেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী : "আর তোমরা 'মুজর' তথা নিষিদ্ধ কথা (কবরের পাশে) বলো না” উল্লেখ করা হয়েছে। 'হুদ্র' দ্বারা শরীয়তে নিষিদ্ধ প্রত্যেক ব্যাপারকে বুঝানো হয়েছে। এর পুরোভাগেই রয়েছে: কবরস্থদেরকে আহ্বান করে, আল্লাহর পরিবর্তে তাদের কাছে প্রার্থনা করে, তাদের কাছে বিপদে উদ্ধারের আবেদন জানিয়ে এবং তাদের কাছে সাহায্য ও অকল্যাণ থেকে মুক্তি কামনা করার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে শরীক করা। এসবই স্পষ্ট শির্ক ও প্রকাশ্য কুফ্র। এ থেকে স্পষ্টভাবে বাধা দিয়ে, নিষেধ করে এবং এ কাজে লিপ্ত ব্যক্তিকে লানত দিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অনেক হাদীস সাব্যস্ত হয়েছে। সহীহ মুসলিমে জুনদুব ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে বলতে শুনেছি,
«أَلَا إِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُم كانوا يتخذونَ قُبور أنبيائِهِمْ وَصَالِحِيهِمْ مساجد، ألا فلا تتخذوا القبور مساجدَ فَإِنِّي أَنْهاكُم عن ذلك»
"সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তীগণ নিজ নিজ নবী ও সৎকর্মপরায়ন ব্যক্তিবর্গের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছিল। সাবধান! তোমরা কবরকে মসজিদ বানিয়ো না। আমি তোমাদেরকে তা থেকে নিষেধ করছি”¹।
অতএব মৃতদেরকে আহ্বান করা, তাদের কাছে প্রয়োজন পূরণের প্রার্থনা করা এবং তাদের উদ্দেশ্যে কোন ইবাদাত নিবেদন করা হবে বড় শির্ক। আর কবরের কাছে অবস্থান করা, সেখানে দো'আ কবুল হওয়ার জন্য চেষ্টা সাধনা করা এবং অনুরূপভাবে যে সকল মসজিদে কবর রয়েছে সেখানে নামায আদায়ও নিকৃষ্ট বেদ'আতের অন্তর্ভুক্ত।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে রোগ থেকে আর (সুস্থ হয়ে) উঠতে পারেননি, সে রোগাবস্থায় বলেছেন:
«لَعَنَ الله اليهود والنصارى اتَّخَذُوا قبور أنبيائهم مساجد»
"আল্লাহ ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে লানত করুন। তারা তাদের নবীদের কবরসমূহকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে”¹।
২. কবরের কাছে যবেহ করা: যদি তা কবরবাসীদের নৈকট্য অর্জনের জন্য হয়ে থাকে, যেন তারা ব্যক্তির প্রয়োজন পূর্ণ করে, তবে তা হবে বড় শির্ক। আর যদি অন্য উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, তবে তা এমন ভয়াবহ বেদ'আতেরই অন্তর্গত, যা শির্কের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لا عَقَر في الإسلام»
"ইসলামে (কবরের পাশে) কোন যবেহ নেই"²। আবদুর রায্যাক বলেন: 'লোকেরা কবরের কাছে গাভী কিংবা বকরী যবেহ করত।
৩, ৪, ৫, ৬, ৭. কবরকে কবরের বাইরের ভূমির চেয়ে বেশী উচ্চ করা, কবরকে বাঁধানো, কবরের উপর লেখা, কবরের উপর সৌধ তৈরী, কবরের উপর বসা: এ সবই সে সব বেদ'আতের অন্তর্গত, যদ্বারা ইয়াহুদী ও নাসারারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। এগুলো ছিলো শির্কের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ
(نهى رسول الله ﷺ أن يُجصص القبر، وأن يُقعد عليه، وأن يُبنى عليه، وأن يزاد عليه، أو يُكتب عليه)
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরকে বাঁধাই করতে, কবরের উপর বসতে, কবরের উপর সৌধ তৈরী করতে, কবরকে বাড়িয়ে উঁচু করতে এবং কবরের উপর লিখতে নিষেধ করেছেন’¹। মুসলিম, আবু দাউদ ও হাকিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
১. কবরের দিকে ফিরে ও কবরের কাছে নামায পড়া : আবু মারসাদ আলগানাবী বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ
«لَا تُصَلُّوا إِلَى الْقُبُورِ، وَلَا تَجْلِسُوا عَلَيْهَا»
“কবরের দিকে ফিরে তোমরা নামায পড়ো না এবং কবরের উপর উপবেশন করো না”²। মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
আবু সা’ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«الْأَرْضُ كُلُّهَا مَسْجِدٌ، إِلَّا الْمَقْبَرَةَ وَالْحَمَّامَ »
“জমিনের পুরোটাই মসজিদ, শুধু কবরস্থান ও গোসলখানা ছাড়া”³। আবু দাউদ ও তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
২. কবরের উপর মসজিদ বানানো : এটি ইয়াহুদী ও নাসারাদের ভ্রষ্টতার অন্তর্গত একটি বেদ’আত। পূর্বোল্লেখিত আয়েশার হাদীসে বলা হয়েছে: “আল্লাহ ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে লানত করুন। তারা তাদের নবীদের কবরসমূহকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে”।
১০. কবরকে উৎসবের স্থানরূপে গ্রহণ করা : এটি এমন একটি বেদ’আত যার সম্পর্কে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে, এর ক্ষতির ভয়াবহতার কারণে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
لَا تَجْعَلُوا قَبْرِي عِيداً، وَلَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قُبُوراً، وَحَيْثُمَا كُنْتُمْ فَصَلُّوا عَلَيَّ، فإن صلاتكم تَبْلُغُنِي»
"আমার কবরকে উৎসবের বস্তু¹ বানিয়ো না, আর তোমাদের ঘরকে কবরে পরিণত করো না। যেখানেই থাকবে, আমার উপর দরূদ প্রেরণ করবে। কেননা তোমাদের দরূদ আমার কাছে পৌঁছে”²। আবু দাউদ ও আহমাদ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
১১. কবরের উদ্দেশ্যে সফর করা: এটি একটি নিষিদ্ধ বিষয়। কেননা তা শির্কের একটি মাধ্যম। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
لَا تُشَدُّ الرِّحَالُ إِلا إِلَى ثَلاثَةِ مَسَاجِدَ: المسجد الحرام، ومسجد الرسول ﷺ، ومسجد الأقصى»
"তিনটি মসজিদ ছাড়া আর কোথাও (সাওয়াবের নিয়তে) সফর করা যাবে নাঃ মসজিদুল হারাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মসজিদ ও মসজিদুল আকসা”³। বুখারী ও মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
ষষ্ঠ বিষয়: তাওয়াস্সুল (অসীলা ধরা)
ক. সংজ্ঞা: অভিধানে তাওয়াস্সুল শব্দটি وسيلة (অসীলা) থেকে গৃহীত। আর وسيلة এবং وصيلة উভয়ের অর্থই কাছাকাছি। অতএব তাওয়াস্সুল হল উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা এবং তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।
আর শরীয়তে তাওয়াস্সুলের অর্থ হল - আল্লাহ যা বৈধ করেছেন তা পালন করে এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন তা পরিত্যাগ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা ও জান্নাতে পৌঁছা।
খ. কুরআন কারীমে অসীলার অর্থ : অসীলা শব্দটি কুরআন কারীমে দু'টি স্থানে এসেছে:
১. আল্লাহ তা'আলার বাণী:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ وَجَاهِدُوا فِي سَبِيلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴾ (المائدة: ٣٥)
“হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তাঁর নৈকট্য অন্বেষণ কর এবং তাঁর পথে জিহাদ কর, যেন তোমরা সফলকাম হতে পার”। [সূরা আল-মায়িদাহ: ৩৫]
২. আল্লাহ তা'আলার বাণী:
أولئك الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْدُورًا ﴾ (الإسراء : ٥٧)
"তারা যাদেরকে আহ্বান করে ওরাই তো তাদের প্রতিপালকের নৈকট্য অন্বেষণ করে যে, তাদের মধ্যে কে কত নিকটতর হতে পারে এবং তাঁর দয়া প্রত্যাশা করে ও তাঁর শাস্তিকে ভয় করে। নিশ্চয়ই আপনার প্রতিপালকের শাস্তি ভয়াবহ"। [সূরা আল-ইসরা : ৫৭]
আয়াতদ্বয়ে অসীলার অর্থ হলঃ আল্লাহকে সন্তুষ্টকারী কাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন। হাফেয ইবনে কাসীর রাহেমাহুল্লাহ প্রথম আয়াতের তাফসীরে বলেন: ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত যে, অসীলার অর্থ নৈকট্য। অনুরূপ তিনি মুজাহিদ, আবু ওয়ায়িল, হাসান বসরী, আবদুল্লাহ ইবনে কাসীর, সুদ্দী, ইবনে যায়েদ ও আরো একাধিক ব্যক্তি হতে বর্ণনা করেন¹।
আর সম্মানিত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাস'উদ রাদিয়াল্লাহু আনহু দ্বিতীয় আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার প্রসংঙ্গ বর্ণনা করেন, যা এর অর্থ স্পষ্ট করে তোলে। তিনি বলেছেন: 'আয়াতটি আরবদের কিছুসংখ্যক লোকের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে, যারা কিছুসংখ্যক জ্বিনের উপাসনা করত। অতপর জ্বিনেরা ইসলাম গ্রহণ করল, অথচ তাদের উপাসনাকারী মানুষেরা তা টেরই পেল না²।
এটা স্পষ্ট যে, অসীলা দ্বারা সে সৎকর্ম ও মহান ইবাদাত বুঝানো হয়েছে, যদ্বারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জন করা যায়। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন:
أُولئِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ
অর্থাৎ তারা চায় আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সেই সব সৎকর্ম, যদ্বারা তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করবে।
গ. তাওয়াসুলের প্রকারভেদ:
তাওয়াসুল দু' প্রকার: শরীয়তসম্মত তাওয়াসুল ও নিষিদ্ধ তাওয়াসুল।
১. শরীয়তসম্মত তাওয়াসুলঃ তা হল শরীয়ত অনুমোদিত বিশুদ্ধ অসীলা দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন। আর তা জানার সঠিক পন্থা হল কুরআন ও সুন্নার দিকে প্রত্যাবর্তন এবং অসীলা সম্পর্কে এতদুভয়ে যা কিছু এসেছে সেগুলো জেনে নেয়া। অতএব যে বিষয়ে কুরআন ও সুন্নায় এ দলীল থাকবে যে, তা শরীয়ত অনুমোদিত, তাহলে তাই হবে শরীয়তসম্মত তাওয়াসুল। আর এতদ্ব্যতীত অন্য সব তাওয়াসুল নিষিদ্ধ।
শরীয়তসম্মত তাওয়াসুলের অধীনে তিন প্রকার তাওয়াসুল রয়েছেঃ
প্রথম : আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের কোন একটি নাম অথবা তাঁর মহান গুণাবলীর কোন একটি গুণ দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জন। যেমন মুসলিম
اللهم إني أسألك بأنك الرحمن الرحيم أن تعافيني :
অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি যে পরম করুণাময় ও দয়ালু সে অসীলা দিয়ে আমি আপনার কাছে আমাকে সুস্থতা দানের প্রার্থনা করছি। অথবা বলবে :
أسألك برحمتك التي وسعت كل شيء أن تغفر لي وترحمني
অর্থাৎ ‘আপনার করুণা যা সবকিছুতে ব্যপ্ত হয়েছে, তার অসীলায় আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি, যেন আমায় ক্ষমা করে দেন এবং দয়া করেন’, ইত্যাদি।
এ প্রকার তাওয়াস্সুল শরীয়তসম্মত হওয়ার দলীল হল আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ
﴿ وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ فَادْعُوهُ بِهَا ﴾ (الأعراف: ۱۸۰)
"আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাঁকে সে সব নামেই ডাক”। [সূরা আল-আ'রাফ: ১৮০]
দ্বিতীয় : সে সকল সৎ কর্ম দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জন, যা বান্দা পালন করে থাকে। যেমন এরকম বলা যে ,
اللهم بإيماني بك، ومحبتي لك، واتباعي لرسولك، اغفرلي
অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! আপনার প্রতি আমার ঈমান, আপনার জন্য আমার ভালবাসা ও আমা কর্তৃক আপনার রাসূলের অনুসরণের অসীলায় আমায় ক্ষমা করুন'। অথবা বলবে :
اللهم إني أسألك بحبي لنبيك محمد صلى الله عليه وسلم وإيماني به أن تفرج عني
অর্থাৎ 'হে আল্লাহ! আপনার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য আমার ভালবাসা এবং তাঁর প্রতি আমার ঈমানের অসীলায় আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি যেন আমায় বিপদমুক্ত করেন'। অথবা দো'আকারী ব্যক্তি মর্যাদাসম্পন্ন একটি সৎ কাজের উল্লেখ করবে যা সে করেছে, তারপর এর অসীলা দিয়ে সে স্বীয় প্রভুর কাছে নৈকট্য লাভের দো'আ করবে। যেমনটি ঘটেছে তিন গুহাবাসীর কাহিনীতে, একটু পরেই যার বর্ণনা আসছে।
এ প্রকার তাওয়াস্সুল শরীয়ত অনুমোদিত হওয়ার দলীল হল : আল্লাহ তা'আলার বাণী:
﴿ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ ﴾ (آل عمران : ١٦)
"যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি; সুতরাং আপনি আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব হতে রক্ষা করুন"। [সূরা আলে-ইমরান: ১৬]
এবং আল্লাহ তা'আলার বাণী:
رَبَّنَا آمَنَّا بِمَا أَنزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشهدِينَ (آل عمران: ٥٣)
“হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি যা অবতীর্ণ করেছেন তার প্রতি আমরা ঈমান এনেছি এবং রাসূলের অনুসরণ করেছি। সুতরাং আমাদেরকে সাক্ষ্যদানকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন”। [সূরা আলে-ইমরান: ৫৩]
আর এ বিষয়ের দলীলের মধ্যে রয়েছে তিন গুহাবাসীর কাহিনীও, যা আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, "তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির তিন ব্যক্তি পথ চলছিল। ইত্যবসরে বৃষ্টি নামল। ফলে তারা একটি গুহায় আশ্রয় নিল। অতঃপর তাদের উপর গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তাদের একজন অন্যদের বলল, ভাইসব! আল্লাহর কসম, সততা ছাড়া আর কিছু তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারবে না। তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত এমন কিছু দ্বারা দো'আ করা, যে সম্পর্কে সে জানে যে, তাতে সে সততা রক্ষা করেছে। তখন তাদের একজন বলল, হে আল্লাহ! যদি আপনি অবগত থাকেন যে, আমার একজন কর্মচারী ছিল। সে এক 'ফারাক"¹ পরিমাণ ধানের বিনিময়ে আমার কাজ করেছিল। অতঃপর ধান আমার কাছে রেখে কাজ ছেড়ে সে চলে যায়। আর আমি তার সে এক ফারাক ধান বপন করি। এরপর অবস্থা এমন হল যে, আমি তা দ্বারা একটি গাভী খরিদ করি। এরপর সে আমার কাছে তার মজুরী চাইতে আসলে আমি বললাম, এ গাভীটি নিয়ে যাও। সে বলল, আমি তো তোমার কাছে কেবল এক ফারাক ধানই প্রাপ্য। আমি তাকে বললাম, তুমি গাভীটি নিয়ে যাও; কেননা তা তোমার এক ফারাক ধান থেকেই এসেছে। এরপর সে তা নিয়ে গেল। যদি আপনি জেনে থাকেন যে, আমি তা আপনার ভয়ে করেছি, তাহলে আমাদের আপনি মুক্ত করুন। এতে পাথরটি তাদের উপর থেকে কিছুটা সরে গেল'²। অপর আরেক ব্যক্তি বলল: হে আল্লাহ! যদি আপনি জেনে থাকেন যে, আমার বাবা-মা ছিলো খুবই বৃদ্ধ। আমি তাদের জন্য প্রতি রাত আমার বকরীর দুধ নিয়ে আসতাম। একরাতে তাদের জন্য দুধ নিয়ে আসতে দেরী করে ফেললাম। আমি এমন সময়ে এলাম যে, তারা ঘুমিয়ে পড়েছে। এদিকে আমার পরিবার পরিজন ক্ষুধায় কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। আমার বাবা- মা পান না করা পর্যন্ত আমি তাদেরকে পান করাতাম না। আমি তাদেরকে জাগাতে চাইলাম না। আবার তাদের ছেড়ে যাওয়াও পছন্দ হল না। কেননা এতে তারা পান থেকে বঞ্চিত হবেন। এভাবে ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম। আপনার যদি জানা থাকে যে, আমি তা আপনার ভয়ে করেছি, তাহলে আমাদের মুক্ত করুন। এরপর তাদের উপর থেকে পাথর এতটুকু সরে গেল যে, তারা আকাশ দেখতে পেল। অপর আরেক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ! যদি আপনি জেনে থাকেন যে, আমার এক চাচাত বোন ছিল, যে ছিলো আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। আমি তাকে (আমার বাসনা চরিতার্থ করার জন্য) ফুসলিয়ে ছিলাম। কিন্তু একশত দিনার তাকে এনে না দেয়া পর্যন্ত সে রাজী হল না। এরপর উক্ত দিনারের সন্ধানে বের হয়ে আমি তা যোগাড় করতে সমর্থ হলাম। তার কাছে এসে তাকে তা প্রদান করলে সে আমার কাছে তার নিজেকে সমর্পণ করল। এরপর যখন আমি তার দু'পায়ের মাঝখানে উপবেশন করলাম। সে বলল, আল্লাহকে ভয় কর এবং অধিকার ছাড়া আংটি ভেঙ্গো না (অর্থাৎ শরীয়তসম্মত অধিকার ছাড়া আমার কুমারিত্ব নষ্ট করো না)। অতঃপর আমি উঠে গেলাম এবং একশত দিনার ছেড়ে দিলাম। যদি আপনি জেনে থাকেন যে, আমি তা আপনার ভয়েই করেছি, তবে আমাদের মুক্ত করুন। এরপর আল্লাহ তাদেরকে মুক্ত করলেন"¹। বুখারী এটি বর্ণনা করেছেন।
তৃতীয় : এমন সৎ ব্যক্তির দো'আর অসীলায় আল্লাহর নৈকট্য অর্জন, যার দো'আ কবুলের আশা করা যায়। যেমন এমন ব্যক্তির কাছে কোন মুসলমানের যাওয়া, যার মধ্যে সততা, তাকওয়া ও আল্লাহর আনুগত্যের হেফাযত লক্ষ্য করা যায় এবং তার জন্য আল্লাহর কাছে দো'আর আবেদন করা যাতে বিপদ থেকে মুক্তি ঘটে ও তার বিষয়টি সহজ হয়ে যায়।
শরীয়তে এ প্রকার অনুমোদিত হওয়ার দলীল হল: সাহাবাগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ব্যাপক ও নির্দিষ্ট সকল প্রকার দো'আ করার আবেদন জানাতেন।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে রয়েছেঃ
أَنَّ رَجُلًا دَخَلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ مِنْ بَابِ كَانَ وُجَاهَ الْمِنْبَرِ وَرَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَائِمٌ يَخْطُبُ، فَاسْتَقْبَلَ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَائِمًا فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلَكَتِ الْمَوَاشِي وَانْقَطَعَتِ السُّبُلُ، فَادْعُ اللَّهَ يُغِينَا، قَالَ : فَرَفَعَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَدَيْهِ فَقَالَ : اللَّهُمَّ اسْقِنَا، اللَّهُمَّ اسْقِنَا، اللَّهُمَّ اسْقِنَا ، قَالَ أَنَسٌ : وَلَا وَاللَّهِ مَا نَرَى فِي السَّمَاءِ مِنْ سَحَابٍ وَلَا قَزَعَةً وَلَا شَيْئًا، وَمَا بَيْنَنَا وَبَيْنَ سَلْعٍ مِنْ بَيْتٍ وَلَا دَارٍ، قَالَ: فَطَلَعَتْ مِنْ وَرَائِهِ سَحَابَةٌ مِثْلُ التُّرْسِ، فَلَمَّا تَوَسَّطَتِ السَّمَاءَ انْتَشَرَتْ، ثُمَّ أَمْطَرَتْ، قَالَ : وَاللَّهِ مَا رَأَيْنَا الشَّمْسَ سِنًّا، ثُمَّ دَخَلَ رَجُلٌ مِنْ ذَلِكَ الْبَابِ فِي الْجُمُعَةِ الْمُقْبِلَةِ – وَرَسُولُ اللَّهِ ﷺ قَائِمٌ يَخْطُبُ - فَاسْتَقْبَلَهُ قَائِمًا فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَلَكَتِ الْأَمْوَالُ، وَانْقَطَعَتِ السُّبُلُ، فَادْعُ اللَّهَ يُمْسِكُهَا، قَالَ: فَرَفَعَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَدَيْهِ ثُمَّ قَالَ: اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا، اللَّهُمَّ عَلَى الْآكَامِ وَالْجِبَالِ وَالظِّرَابِ وَمَنَابِتِ الشَّجَرِ، قَالَ: فَانْقَطَعَتْ، وَخَرَجْنَا نَمْشِي فِي الشَّمْسِ. قَالَ شَرِيكٌ: فَسَأَلْتُ أَنَسًا: أَهُوَ الرَّجُلُ الْأَوَّلُ؟ قَالَ: لَا أَدْرِي
'এক ব্যক্তি জুমার দিন মিম্বরমুখী দরজা দিয়ে (মসজিদে) প্রবেশ করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন দাঁড়িয়ে খুতবা দিচ্ছিলেন।
লোকটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, হে রাসূলুল্লাহ! গবাদি পশু ধ্বংস হয়ে গেছে এবং সকল পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। আল্লাহর কাছে দো'আ করুন, যেন তিনি আমাদের জন্য বৃষ্টি অবতরণ করেন'। আনাস বলেন: অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হস্তদ্বয় উঠিয়ে বললেন: "হে আল্লাহ! আমাদের পানি দিন, হে আল্লাহ! আমাদের পানি দিন"।
আনাস বলেন: আল্লাহর কসম, আমরা আকাশে কোন মেঘ, ছড়ানো ছিটানো মেঘের খন্ড বা কোন কিছুই দেখিনি। আমাদের মধ্যে ও সেলা' পাহাড়ের মধ্যে কোন ঘর-বাড়ী ছিলো না। তিনি বললেন: এরপর সেলা' পাহাড়ের পেছন থেকে ঢালের মত একখন্ড মেঘের উদয় হল। মেঘটি আকাশের মাঝ বরাবর এসে ছড়িয়ে পড়ল। তারপর বৃষ্টি হল। তিনি বললেন: আল্লাহর কসম, আমরা ছয়দিন সূর্য দেখিনি।
পরবর্তী জুমা'র দিন ঐ দরজা দিয়ে এক ব্যক্তি প্রবেশ করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়িয়ে খুতবা দিচ্ছিলেন। সে লোক তাঁর সামনে এসে বলল: হে রাসূলুল্লাহ! সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে, সকল পথ বন্ধ হয়ে গেছে। আল্লাহর কাছে দো'আ করুন যেন তিনি বৃষ্টি বন্ধ করেন। আনাস বলেন: অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হস্তদ্বয় উত্তোলন করে বললেন, “হে আল্লাহ! আমাদের চারপাশে বৃষ্টি দিন, আমাদের উপর নয়। হে আল্লাহ! টিলা, পাহাড়, উঁচু ভূমি ও গাছ-পালা উৎপন্নের স্থানে বৃষ্টি দিন। আনাস বলেন: অতঃপর বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেল। আর আমরা বের হয়ে রৌদ্রে চলাফেরা করলাম। শুরাইক বলেন: আমি আনাসকে জিজ্ঞাসা করলাম: এ কি সেই প্রথম ব্যক্তি? তিনি বললেন: আমি জানি না'¹。
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আছেঃ
أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ لَمَّا ذَكَرَ أَنَّ فِي أُمَّتِهِ سَبْعِيْنَ أَلْفاً يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ بِغَيْرِ حِسَابٍ وَّلَا عَذَابٍ وَقَالَ: هُمُ الَّذِيْنَ لَا يَسْتَرْقُوْنَ وَلَا يَكْتَوُوْنَ وَلَا يَتَطَيَّرُوْنَ وَعَلٰى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ، قَامَ عُكَّاشَةُ بْنُ مِحْصَنِ فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ ادْعُ اللهَ أَنْ يَجْعَلَنِيْ مِنْهُمْ فَقَالَ: أَنْتَ مِنْهُمْ)
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন উল্লেখ করলেন যে, তাঁর উম্মাতের মধ্যে সত্তর হাজার বিনা হিসাবে ও বিনা শাস্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং বললেন যে, “তারা সে সব লোক যারা ঝাড়ফুঁক চায় না, লোহা পুড়ে দেহে দাগ দেয় না, কোন কিছুকে কুলক্ষণ মনে করে না এবং আপন রবের উপর ভরসা রাখে”। তখন উকাশা ইবনে মিহসান দাঁড়িয়ে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কাছে দো'আ করুন তিনি যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি বললেন: "তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত”²。
এ বিষয়ে আরো রয়েছে সেই হাদীস যাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওয়াইস আল-ক্বারনীর কথা উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেনঃ
«فَاسْأَلُوْهُ أَنْ يَسْتَغْفِرَ لَكُمْ»
“তার কাছে চাও, যেন সে তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে”¹。
এ প্রকার তাওয়াস্সুল শুধু ঐ ব্যক্তির জীবদ্দশায়ই হতে পারে, যার কাছে দো'আ চাওয়া হয়। তবে তার মৃত্যুর পর এটা জায়েয নেই; কেননা (মৃত্যুর পর) তার কোন আমল নেই।
২. নিষিদ্ধ তাওয়াস্সুলঃ তা হল - যে বিষয়টি শরীয়তে অসীলা হিসাবে সাব্যস্ত হয়নি, তা দ্বারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জন। এটি কয়েক প্রকার, যার কোন কোনটি অন্যটি থেকে অধিক বিপজ্জনক। তম্মধ্যে রয়েছে:
* মৃত ও অনুপস্থিত ব্যক্তিদেরকে আহ্বান করার মাধ্যমে, তাদের দ্বারা পরিত্রাণের আবেদন এবং তাদের কাছে অভাব মোচন, বিপদ থেকে মুক্তিদান প্রভৃতি প্রার্থনা করার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জন। এটা শির্কে আকবার বা বড় শির্ক যা মুসলিম মিল্লাত থেকে বের করে দেয়।
* কবর ও মাযারের পাশে ইবাদাত পালন ও আল্লাহকে ডাকা, কবরের উপর সৌধ তৈরী করা এবং কবরে প্রদীপ ও গেলাফ দেয়া প্রভৃতির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন। এটা ছোট শির্কের অন্তর্ভুক্ত, যা তাওহীদ পরিপূর্ণ হওয়ার অন্তরায় এবং বড় শির্কের দিকে পৌঁছিয়ে দেয়ার মাধ্যম।
* নবীগণ ও সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিবর্গের সম্মান এবং আল্লাহর কাছে তাদের মান ও মর্যাদার অসীলায় আল্লাহর নৈকট্য অর্জন। এটা হারাম। বরং তা নবআবিষ্কৃত বেদ'আতের অন্তর্ভুক্ত। কেননা তা এমনই তাওয়াস্সুল যা আল্লাহ বৈধ করেননি এবং এর অনুমতিও দেননি। আল্লাহ তা'আলা বলেন : ﴿ اللهُ أَذِنَ لَكُمْ ﴾ (یونس: ۵۹) অর্থাৎ আল্লাহ কি তোমাদেরকে অনুমতি দিয়েছেন? [সূরা ইউনুস: ৫৯] আর এজন্যও যে, সৎ ব্যক্তিবর্গের সম্মান ও আল্লাহর কাছে তাদের মর্যাদা শুধু তাদেরই উপকার করবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
﴿ وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ الاماسعى ﴾ (النجم : ٣٩)
“আর মানুষ তা-ই পায়, যা সে করে”। [সূরা আন-নাজম: ৩৯]
এজন্যই এ ধরনের অসীলা অবলম্বন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের যুগে পরিচিত ছিল না। ওলামাদের একাধিক ব্যক্তি এ তাওয়াস্সুল থেকে নিষেধ করা ও তা হারাম হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে বলেছেন।
আবু হানীফা রাহেমাহুল্লাহ বলেন: 'দো'আকারী এ কথা বলা মাকরূহ যে, আমি আপনার কাছে অমুক ব্যক্তির যে হক্ব রয়েছে কিংবা আপনার অলীগণ ও রাসূলগণের যে হক্ক রয়েছে কিংবা বায়তুল্লাহ আলহারাম (কা'বা শরীফ) ও মাশ'আরুল হারামের যে হক্ক রয়েছে তার অসীলায় প্রার্থনা করছি'¹。
ঘ. তাওয়াসুলের ক্ষেত্রে উত্থাপিত সংশয় ও তার অপনোদন:
যারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআ'তের বিরোধী, তারা তাওয়াসুলের ব্যাপারে কিছু সংশয় ও প্রশ্ন উত্থাপন করে, যাতে তারা সেগুলো দ্বারা তাদের ভুল বক্তব্যকে শক্তিশালী করতে পারে এবং সাধারণ মুসলমানদেরকে তাদের মতের বিশুদ্ধতা প্রমাণে ভুল ধারণায় নিপতিত করতে পারে। এ সকল লোকদের সংশয়গুলো দু'টো বিষয় থেকে মুক্ত নয়:
প্রথম: সেগুলো দুর্বল কিংবা বানোয়াট হাদীস, যদ্বারা তারা তাদের মতের স্বপক্ষে দলীল পেশ করে। এগুলো বিশুদ্ধ নয়, আবার সাব্যস্তও নয় - এটা জানার মাধ্যমে এগুলোকে অপনোদন করা যায়। তম্মধ্যে রয়েছেঃ
১. হাদীসঃ "তোমরা আমার মর্যাদা দ্বারা অসীলা অবলম্বন কর; কেননা আল্লাহর কাছে আমার মর্যাদা মহান”। অথবা "যখন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে, তখন আমার মর্যাদার অসীলায় প্রার্থনা করবে; কেননা আল্লাহর কাছে আমার মর্যাদা মহান”। এটি একটি বাতিল হাদীস, যা ওলামাদের কেউই বর্ণনা করেননি এবং হাদীসের কোন গ্রন্থেও তা নেই।
২. হাদীসঃ "যখন তোমাদেরকে পরিস্থিতি অপারগ করে ফেলবে, তোমাদের কর্তব্য হবে কবরবাসীদের আঁকড়ে ধরা”, অথবা "তখন তোমরা কবরবাসীদের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়ার আবেদন কর"। ওলামাদের সর্বসম্মত মতানুযায়ী এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর অন্যায়ভাবে আরোপিত একটি মিথ্যা হাদীস।
৩. হাদীসঃ "যদি তোমাদের কেউ একটি পাথর সম্পর্কে সুধারণা রাখে, তাহলে পাথরটি তার উপকার করবে"। এটি দ্বীন ইসলাম বিরোধী একটি বাতিল হাদীস, যা কোন মুশরিক ব্যক্তি রচনা করেছে।
৪. হাদীসঃ "যখন আদম ভুল করলেন, বললেনঃ হে রব! আমি মুহাম্মাদের অধিকারের অসীলায় আমাকে ক্ষমা করার জন্য আপনার কাছে প্রার্থনা করছি। আল্লাহ বললেনঃ হে আদম! তুমি মুহাম্মাদের পরিচয় পেলে কিভাবে, অথচ তাকে আমি এখনো সৃষ্টি করিনি? তিনি বললেন : হে রব! আপনি যখন নিজ হাতে আমাকে সৃষ্টি করলেন এবং আমার মধ্যে আপনার রূহ থেকে ফুঁ দিয়ে দিলেন, তখন আমি আমার মাথা উঠিয়ে দেখলাম, আরশের স্তম্ভের উপর লিখা রয়েছে : আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। এতে আমার জানা হল যে, আপনি আপনার নামের পাশে আপনার কাছে সৃষ্টির প্রিয়তম ব্যক্তি ছাড়া অন্য কাউকে সংযোজন করেননি। আল্লাহ বললেন: আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। মুহাম্মাদ যদি না হত, তাহলে আমি তোমাকে সৃষ্টিই করতাম না”। এটি এমনই একটি বাতিল হাদীস যার কোন অস্তিত্বই নেই। অনুরূপ আরেকটি (বাতিল) হাদীস হল ঃ “যদি আপনি না হতেন, তাহলে আমি জগতসমূহ সৃষ্টিই করতাম না"¹。
এ ধরনের মিথ্যা হাদীসসমূহ এবং বাতিল মিশ্রিত বিভিন্নমুখী বর্ণনা দ্বারা দলীল পেশ করা ও দ্বীনী ব্যাপারে এগুলোর উপর নির্ভর করা তো দূরের কথা, বরং কোন মুসলিমের জন্য এগুলোর দিকে তাকানোই জায়েয নেই।
দ্বিতীয়: সেই সব বিশুদ্ধ হাদীসসমূহ যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হয়েছে। এরা সেগুলোকে সঠিকভাবে উপলদ্ধি করে না। সেগুলোর উদ্দিষ্ট অর্থ ও তাৎপর্য থেকে তারা সেগুলোকে বিকৃত করে দেয়। তম্মধ্যে রয়েছেঃ
১. বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে:
(أن عمر بن الخطاب كان إذا قحطوا استسقى بالعباس بن عبد المطلب، فقال: اللهم إنا كنا نتوسل إليك بنبينا فتسقينا، وإنا نتوسل إليك بعم نبينا فاسقنا، قال: فيسقون)
'লোকেরা দুর্ভিক্ষে পড়লে উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের মাধ্যমে এস্তেস্কা তথা বৃষ্টির দো'আ করাতেন। তিনি বলতেন: হে আল্লাহ! আমরা আমাদের নবীর মাধ্যমে আপনার কাছে অসীলা করতাম, ফলে আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করতেন। এখন আমরা আমাদের নবীর চাচার মাধ্যমে আপনার কাছে অসীলা অবলম্বন করছি। সুতরাং আমাদেরকে বৃষ্টি দান করুন'¹। বর্ণনাকারী বলেনঃ 'ফলে তাদেরকে বৃষ্টি দেয়া হত"।
এ হাদীস থেকে তারা বুঝেছে যে, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহ তা'আলার কাছে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর মান ও মর্যাদার অসীলা দিয়ে দো'আ করেছিলেন এবং তার কথার মর্ম হল: 'আমরা আমাদের নবীর মাধ্যমে [অর্থাৎ নবীর মর্যাদার অসীলায়] আপনার কাছে অসীলা করতাম, ফলে আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করতেন। এখন আমরা আমাদের নবীর চাচার মাধ্যমে [অর্থাৎ চাচার মর্যাদার অসীলায়] আপনার নিকট অসীলা করছি'।
সন্দেহ নেই এতে হাদীসটিকে ভুল বুঝা হয়েছে এবং এমন দূরবর্তী অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে, বক্তব্যের পূর্বাপর বিষয় যে অর্থের স্বপক্ষে কোন প্রমাণ পেশ করছে না, কাছ থেকেও নয় এবং দূর থেকেও নয়; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যক্তিসত্তা কিংবা মর্যাদার অসীলা করার ব্যাপারটি সাহাবাদের কাছে পরিচিত ছিলো না। তারা শুধু তার জীবদ্দশায় তার দো'আর অসীলা করতেন, যেমন ইতিপূর্বে এ ধরণের অর্থে কিছু কথা বলা হয়েছে। আর "আমরা আমাদের নবীর চাচার মাধ্যমে আপনার নিকট অসীলা করছি” এ কথা দ্বারা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার ব্যক্তিসত্তা কিংবা মর্যাদা বুঝাননি। বরং তিনি শুধু তার দো'আই বুঝিয়েছেন। যদি ব্যক্তিসত্তা কিংবা মর্যাদার অসীলা করা সাহাবাদের কাছে পরিচিত থাকত, তাহলে উমর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসীলা করা বাদ দিয়ে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর অসীলা অবলম্বনের প্রতি অগ্রসর হতেন না। বরং সাহাবারাও তখন তাকে এ কথাই বলতেন যে, কিভাবে আমরা আব্বাসের মত ব্যক্তির অসীলা করব, আর সৃষ্টির সর্বোত্তম ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসীলা করা থেকে সরে যাব? যখন সাহাবাদের কেউই সে কথা বললেন না, আর এ কথা সবার জানা যে, সাহাবারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায়ই তার দো'আর অসীলা করেছিলেন এবং তার মৃত্যুর পর তিনি ভিন্ন অন্যের দো'আর অসীলা করেছিলেন, তখন এটাও জানা হল যে, সাহাবাদের কাছে ব্যক্তির দো'আর অসীলা করাই শুধু বৈধ ছিল, তার সত্তার অসীলা নয়।
এদ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, হাদীসটিতে সে পক্ষে কোন দলীল নেই, যে ব্যক্তিসত্তা কিংবা মর্যাদার অসীলা করা জায়েয বলে থাকে।
২. উসমান ইবনে হুনাইফের হাদীস:
أَنَّ رَجُلًا ضَرِيرَ الْبَصَرِ أَتَى النَّبِيَّ ﷺ فَقَالَ: ادْعُ اللهَ أَنْ يُعَافِينِي، قَالَ: إِنْ شِئْتَ دَعَوْتُ وَإِنْ شِئْتَ صَبَرْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ، قَالَ: فَادْعُه، قَالَ: فَأَمَرَهُ أَنْ يَتَوَضَّأَ فَيُحْسِنَ وُضُوءَهُ وَيَدْعُوَ بِهَذَا الدُّعَاءِ: اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ وَأَتَوَجَّهُ إِلَيْكَ بِنَبِيِّكَ مُحَمَّدٍ نَبِيِّ الرَّحْمَةِ ، إِنِّي تَوَجَّهْتُ بِكَ إِلَى رَبِّي فِي حَاجَتِي هَذِهِ لِتُقْضَى لِي، اللَّهُمَّ فَشَفِّعْهُ فِي)
'এক অন্ধ ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল, আমার জন্য আল্লাহর কাছে দো'আ করুন, যেন আমাকে তিনি সুস্থ করে দেন। তিনি বললেন, তুমি যদি চাও তাহলে দো'আ করব। আর যদি চাও তো সবর করতে পার এবং এটাই তোমার জন্য অধিক কল্যাণকর। সে বলল, আপনি দো'আ করুন'। উসমান বলেনঃ 'তিনি তাকে সুন্দরভাবে অযু করে এ দো'আটি দিয়ে দো'আ করতে বললেন : হে আল্লাহ! আপনার নবী মুহাম্মাদ যিনি দয়ার নবী, তার দ্বারা আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি এবং আপনার দিকে ফিরছি। আমি আপনার মাধ্যমে আমার রবের দিকে আমার এ প্রয়োজনে মনোনিবেশ করছি, যেন তা পূরণ হয়। হে আল্লাহ! তাঁকে আমার ব্যাপারে শাফা'আতকারী বানিয়ে দিন'¹। হাদীসটি তিরমিযী ও আহমাদ বর্ণনা করেছেন। বায়হাকী বলেন, এর সনদ শুদ্ধ।
এ হাদীস থেকে তারা এটাই বুঝেছে যে, এদ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিংবা অন্য কোন সৎলোকের মর্যাদার অসীলা করা জায়েয হওয়ার ব্যাপারটি প্রমাণিত হয়। অথচ হাদীসে এমন কিছু নেই, যা সে কথার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। কেননা অন্ধ ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তার জন্য দো'আ করার আবেদন করেছিল, যাতে আল্লাহ তার দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দেন। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, “তুমি চাইলে সবর করতে পার, আর যদি চাও তো আমি দো'আ করতে পারি”। সে বলল, দো'আ করুন। এছাড়া হাদীসে ব্যবহৃত অন্য সকল কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে, তা ছিলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দো'আর অসীলা, তাঁর ব্যক্তিসত্তা কিংবা মর্যাদার অসীলা নয়। এজন্যই উলামাগণ এ হাদীসটিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মু'জেযা এবং তাঁর মাকবুল দো'আর অন্তর্গত বলে উল্লেখ করে থাকেন। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দো'আর বরকতে আল্লাহ এ অন্ধ ব্যক্তির দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আর এ জন্যই বায়হাকী হাদীসটিকে 'দালায়েলুন নুবুওয়াহ' গ্রন্থে আনয়ন করেছেন¹।
কিন্তু বর্তমানে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর এ ধরনের অসীলা করা সম্ভব নয়। কেননা মৃত্যুর পর কারো জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দো'আ করা অসম্ভব। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
«إذا مات الإنسان انقطع عمله إلا من ثلاث: صدقة جارية ، أو علم ينتفع به ، أو ولد صالح يدعو له»
"মানুষ যখন মারা যায়, তিনটি ক্ষেত্র ছাড়া তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। সেগুলো হলঃ সাদাকায়ে জারিয়া, সে ইলম যদ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তানের দো'আ"²। মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
দো'আ সে সৎকর্মসমূহের অন্তর্গত যা মৃত্যুর দ্বারা বন্ধ হয়ে যায়।
সর্বোপরি এসব লোকেরা যত কিছুই পেশ করছে, তাতে তাদের কোনই প্রমাণ নেই। হয় সেসব দলীল বিশুদ্ধ নয় এ কারণে, অথবা এ কারণে যে, তারা যে মত পোষণ করছে, সে মতের পক্ষে ঐসব দলীল অর্থ প্রদান করে না।
সপ্তম বিষয়: বাড়াবাড়ি
ক. সংজ্ঞা : অভিধানে غلو বা বাড়াবাড়ি হল সীমাতিক্রম করা। যেমন, যতটুকু হকদার তার চেয়েও বেশী কোন কিছুর প্রশংসায় কিংবা নিন্দায় অতিরঞ্জন করা।
আর শরীয়তের পরিভাষায় غلو বা বাড়াবাড়ি হল আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য শরীয়তের যে সীমা নির্ধারণ করেছেন তা অতিক্রম করা, চাই তা আক্বীদার ক্ষেত্রে হোক কিংবা ইবাদাতের ক্ষেত্রে।
খ. হুকুম : এর হুকুম হল তা হারাম। কেননা বাড়াবাড়ি থেকে নিষেধ ও সতর্ক করার ব্যাপারে এবং যারা বাড়াবাড়ি করে, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের মন্দ পরিণতির বর্ণনায় বহু দলীল এসেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَاهْلَ الكتبِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللهِ إِلا الحَقِّ (النساء : ١٧١)
"হে আহলে কিতাবগণ! স্বীয় দ্বীনের মধ্যে তোমরা বাড়াবাড়ি করো না ও আল্লাহ সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত কিছু বলো না”। [সূরা আন-নিসা: ১৭১]
قُلْ يَأَهْلَ الْكِتٰبِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ غَيْرَ الْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعُوا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوا مِنْ قَبْلُ وَأَضَلُّوا كَثِيرًا وَضَلُّوا عَنْ سَوَاءِ السَّبِيلِ (المائدة : ٧٧)
“বলুন, হে আহলে কিতাবগণ! তোমরা তোমাদের দ্বীন সম্বন্ধে অন্যায় বাড়াবাড়ি করো না। আর যে সম্প্রদায় ইতিপূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে ও অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৭৭]
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
إِيَّاكُمْ والغلو، فَإِنَّما هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُم بالغلو في الدين»
"তোমরা বাড়াবাড়ি পরিত্যাগ কর। কেননা তোমাদের পূর্বে যারা ছিল, তারা দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করে ধ্বংস হয়ে গেছে”। আহমাদ ও হাকিম হাদীসটি বর্ণনা করেন। আর হাকিম একে সহীহ বলেছেন এবং যাহাবী তার সাথে একমত হয়েছেন¹。
ইবনে মাস'উদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
« هَلكَ المتنطعون»
“বাড়াবাড়িকারীরা ধ্বংস হোক"। তিনি তা তিনবার বলেছেন। মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন²。
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
لا تُطروني كما أطرت النصارى عيسى ابن مريمَ، إِنَّمَا أَنَا عبد الله ورسوله »
"তোমরা আমার বাড়িয়ে প্রশংসা করো না, যেভাবে নাসারাগণ মারইয়াম পুত্র ঈসার ব্যাপারে করেছিল; কেননা আমি শুধু আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল”। বুখারী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন¹。
এ হাদীস দ্বারা যা বোঝানো উদ্দেশ্য, তা হলঃ 'তোমরা আমার প্রশংসা করে ভাতে বাড়াবাড়ি করো না, যেভাবে 'ঈসার ব্যাপারে নাসারাগণ বাড়াবাড়ি করে তার রব ও ইলাহ্ হওয়ার দাবী করেছিল। বরং আমি তো শুধু আল্লাহরই বান্দা। অতএব আমাকে সেভাবেই বর্ণনা কর, যেভাবে আমার রব আমার বর্ণনা দিয়েছেন। আর (আমাকে) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল বলে অভিহিত কর'। কিন্তু পথভ্রষ্টরা শুধুমাত্র তাঁর নির্দেশের বিরোধিতা এবং তার নিষেধের লংঘনই শুধু করতে চেয়েছে এবং মারাত্মকভাবে তার বিরোধিতা করে তাঁর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে ও তার প্রশংসায় অতিরঞ্জন করেছে। আর নাসারারা 'ঈসার ব্যাপারে যেরূপ দাবী করেছিল সেরূপ কিংবা তার কাছাকাছি দাবী তারাও করেছে। তারা তার কাছে গোনাহের মাফ, বিপদ থেকে মুক্তিদান, রোগ থেকে আরোগ্যদান প্রভৃতি সে সব বস্তু প্রার্থনা করছে, যা একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট, যার কোন শরীক নেই। এসব কিছুই দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ির নামান্তর।
টিকাঃ
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২২০০)
² العين বা চোখলাগা হচ্ছে- আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ী দৃষ্টি নিক্ষেপকারী নিজ চোখ দ্বারা অন্যকে আক্রান্ত করা।
³ আরবী শব্দটি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ হল বিষ। হাদীসের মর্ম হল- তিনি প্রত্যেক বিষাক্ত প্রাণী থেকে ঝাড়ফুঁক করার অনুমতি দিয়েছেন। যেমন অজগর কিংবা বিচ্ছু বা অনুরূপ কোন কিছুর ছোবল।
⁴ আরবী । শব্দটি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে, এর অর্থ পার্শ্বদেশে যে আঘাত প্রকাশ পায়।
⁵ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২১৯৬)
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২১৯৯)
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৫৭৪৩), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২১৯১)
¹ সুনান আবু দাউদ (হাদীস নং ৩৮৮৩), মুস্তাদরাক (৪/২৪১), হাকিম একে সহীহ বলেছেন এবং যাহাবী তার সাথে একমত হয়েছেন。
² মুসনাদ আহমাদ (৪/৩১০), সুনান তিরমিযী (হাদীস নং ২০৭২), মুস্তাদরাক হাকিম (৪/২৪১), হাকিম একে সহীহ বলেছেন。
³ মুসনাদ আহমাদ (৪/১৫৪), মুস্তাদরাক হাকিম (৪/২৪০), হাকিম একে সহীহ বলেছেন এবং যাহাবী তার সাথে একমত হয়েছেন。
⁴ মুসনাদ আহমাদ (৪/১৫৬), হাকিম একে সহীহ বলেছেন (৪/২৪৪), আবদুর রহমান ইবনে হাসান বলেন: এর বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত。
¹ আলমুসনাদ (৪/৪৪৫), বুসিরী বলেনঃ এ হাদীসের সনদ হাসান। আর হাইসামী বলেন ٤ এর বর্ণনাকারীগণ বিশস্ত。
¹ তাফসীর ইবনে আবি হাতেম (৭/২২০৭)
¹ হাদীসে السدرة বলা হয়েছে, অর্থাৎ কাঁটাযুক্ত একটি গাছ。
¹। সুনান তিরমিযী (হাদীস নং ২১৮০)
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৯৭৭)
² সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৯৭৫)
³ 'মুসনাদ আহমাদ (৩/৩৮), মুস্তাদরাক হাকিম (১/৫৩১)
¹ মুস্তাদরাক হাকিম (১/৫৩২)
² সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৯৭৫)
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৫৩২)
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ১৩৩০), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৫৩১)
² সুনান আবু দাউদ (হাদীস নং ৩২২২)
¹ সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৯৭০), সুনান আবু দাউদ (হাদীস নং ৩২২৫) ও (হাদীস নং ৩২২৬), মুস্তাদরাক হাকিম (১/৫২৫)
² সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৯৭২)
³ সুনান আবু দাউদ (হাদীস নং ৪৯২), সুনান তিরমিযী (হাদীস নং ৩১৭) হাকিম একে সহীহ বলেছেন এবং যাহাবী তার সাথে একমত হয়েছেন。
¹ ঈদ বা উৎসব হল যা বারবার ফিরে আসে, যেমন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। অতএব কোন মানুষ সালাম দেয়ার উদ্দেশ্যে যদি প্রতিদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবর বারবার যিয়ারত করতে থাকে, তাহলে সে যেন কবরকে ঈদ বানিয়ে নিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ থেকেই নিষেধ করেছেন এবং মুসলমানকে তার উপর দরূদ ও সালাম পেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন, যেখানেই সে থাকুক না কেন; কেননা আল্লাহর একদল বিচরণশীল ফেরেশতা রয়েছেন যারা রাসূলকে সালাম পৌঁচিয়ে দেন। এটা এ দ্বীন সহজ হওয়ার একটি দিক; কেননা প্রত্যেক মুসলমানের পক্ষে মদীনা আগমন সম্ভব নয়。
² সুনান আবু দাউদ (হাদীস নং ২০৪২), মুসনাদ আহমাদ (২/৩৬৭)
³ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ১১৮৯), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৩৯৭)
¹ তাফসীর ইবনে কাসীর (২/৫০)
² সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৩০৩০), সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৪৭১৪)
¹ ইবনুল আসীর বলেন: 'ফারাক' হল একটি পরিমাপ পাত্র。
² পাথরটি কিছুদূর সরল, কিন্তু তারা বের হতে পারল না। যেমনটি সালেমের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে。
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৪৬৫)
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ১০১৩), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৮৯৭)
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৫৭০৫), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২১৮)
¹ সিলুসলাতুল আহাদীস আদ-দাঈফা ওয়াল মাওদুআ', আলবানী, ১/৮৮, হাদীস নং ২৫
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ১০১০)
¹সুনান তিরমিযী (হাদীস নং ৩৫৭৮), মুসনাদ আহমাদ (৪/১৩৮)
¹ দালায়েলুন নুবুওয়াহ, বায়হাকী, (৬/১৬৭)
² সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৬৩১)
¹ মুসনাদ (১/৩৪১), মুস্তাদরাক (১/৬৩৮)
² সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ২৬৭০)
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৪৪৫)
📄 শির্ক, কুফর ও এতদুভয়ের প্রকারণ
সন্দেহ নেই, মুসলমান যদি শির্ক ও কুফ্র, এগুলোর কার্যকারণ, উপায়- উপকরণ এবং প্রকারসমূহ জানতে পারে, তবে তাতে বিরাট উপকার রয়েছে, যদি এসব অনিষ্ট থেকে মুক্ত থাকার জন্য এবং এসব বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার ইচ্ছায় সে এ সম্পর্কিত জ্ঞান লাভ করে থাকে। সত্যের পথ জেনে নেয়া আল্লাহ পছন্দ করেন, যেন সে পথকে ভালবেসে সে পথে চলা যায়। আর বাতিলের পথসমূহ জেনে নেয়াও আল্লাহ পছন্দ করেন, যেন সে পথকে ঘৃণা করে সে পথ থেকে সরে থাকা যায়।
কল্যাণকে বাস্তবায়নের জন্য কল্যাণের পথ জেনে নেয়া যেমন একজন মুসলমানের জন্য কাম্য, তেমনি অনিষ্টের পথসমূহ থেকে সতর্ক থাকার জন্য সেগুলো জেনে নেয়াও তার জন্য কাম্য। এজন্য সহীহ বুখারী ও মুসলিমে হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে সাব্যস্ত হয়েছে, তিনি বলেছেন: 'মানুষ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কল্যাণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করত। আর অনিষ্ট আমাকে পেয়ে বসবে এ ভয়ে তাকে আমি অনিষ্ট সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতাম”¹。
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: 'যে ব্যক্তি জাহেলিয়াত সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না, সে ইসলামের মধ্যে প্রতিপালিত হলে ইসলামের রশি একটি একটি করে ছিঁড়ে যাবে'।
কুরআন কারীম সে সকল আয়াতে ভরপুর যা শির্ক ও কুফরের বর্ণনা দিয়েছে, শির্ক ও কুফরে লিপ্ত হওয়া থেকে সতর্ক করে দিয়েছে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে এতদুভয়ের মন্দ পরিণামের উপর প্রমাণ বহন করছে। বরং এটা কুরআন কারীম ও পবিত্র সুন্নার একটা মহান উদ্দেশ্য। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَكَذَلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَتِ وَلِتَسْتَبِينَ سَبِيلُ الْمُجْرِمِينَ (الأنعام : ٥٥)
"এভাবে আমরা আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করি; আর যেন এতে অপরাধীদের পথ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়”। [সূরা আল-আন'আম ঃ৫৫]
নিচে এদিকের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ করা হল।
প্রথম বিষয়: শির্ক
ক. সংজ্ঞা: অভিধানে শির্কের অর্থ হল দু'টো বস্তুর মধ্যে সমতা বিধান করা। আর শরীয়তে এর দু'টো অর্থ রয়েছে: ব্যাপক অর্থ ও বিশেষ অর্থ।
১. ব্যাপক অর্থ: মহান আল্লাহর যে সব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেসবের কোন কিছুতে পায়রুল্লাকে তাঁর সাথে সমান করে দেয়া। এ অর্থের অধীনে রয়েছে তিনটি প্রকার:
প্রথম : রুবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বে শির্ক করা। আর তা হল গায়রুল্লাহ (তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু)কে আল্লাহর সাথে এমন ক্ষেত্রে সমান বলে নির্ধারণ করা, যা প্রভুত্বের বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত। অথবা সেসব বৈশিষ্ট্যের কোন কিছু গায়রুল্লার প্রতি সম্পর্কিত করা (অর্থাৎ সে বৈশিষ্ট্যগুলো গায়রুল্লার আছে এমনটি বলা)। যেমন সৃষ্টিকরা, রিযিক দান, অস্তিত্ব প্রদান, মৃত্যু দান করা, বিশ্বজগতের পরিচালনা ইত্যাদি। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ يَرْزُقُكُو مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلا هُوَ فَأَنَّى تُؤْفَكُونَ ﴾ (فاطر: ৩)
"আল্লাহ ব্যতীত কি কোন স্রষ্টা আছে, যে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন হতে রিযিক দান করে? তিনি ব্যতীত কোন হকু ইলাহ্ নেই। সুতরাং কিভাবে তোমরা ফিরে যাচ্ছ? [সূরা ফাতির : ৩]
দ্বিতীয়: আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে শির্ক করা। আর তা হল গায়রুল্লাকে এসবের কোন কিছুতে আল্লাহর সমান বলে নির্ধারণ করা। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ (الشورى: ۱۱)
"কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”। [সূরা আশ-শূরা :১১]
তৃতীয় : উলুহিয়্যাহ তথা ইবাদাতের ক্ষেত্রে শির্ক করা। আর তা হল গায়রুল্লাকে এমন কিছুতে আল্লাহর সমান বলে নির্ধারণ করা, যা আল্লাহর ইলাহ্ হওয়ার বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত। যেমন সালাত, সিয়াম, দো'আ, বিপদাপদ থেকে উদ্ধারের প্রার্থনা, যবেহ করা, মানত করা ইত্যাদি।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللهِ أَنْدَادًا يوم حب الله ﴾ (البقرة : ١٦٥)
"মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ ছাড়া অপরকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে এবং আল্লাহকে ভালবাসার ন্যায় তাদেরকে ভালবাসে”। [সূরা আল-বাকারাহ: ১৬৫]
২. বিশেষ অর্থ: আর তা হল আল্লাহর জন্য একজন সমকক্ষ স্থির করে তাকে এমনভাবে আহ্বান করা যেভাবে আল্লাহকে আহ্বান করা হয়, তার কাছে এমনভাবে শাফা'আত চাওয়া যেভাবে আল্লাহর কাছে চাওয়া হয়, তার কাছে এমনভাবে আশা করা যেভাবে আল্লাহর কাছে আশা করা হয়, তাকে এমনভাবে ভালবাসা যেভাবে আল্লাহকে ভালবাসা হয়। কুরআন ও সুন্নায় 'শির্ক' শব্দ ব্যবহৃত হলে এ অর্থই সর্বপ্রথম মনে উদিত হয়।
খ. শির্কের নিন্দা জ্ঞাপন এবং এর ভয়াবহতা বর্ণনার উপর দলীল-প্রমাণাদি :
শির্কের নিন্দা জ্ঞাপন, তা থেকে সতর্ককরণ এবং মুশরিকদের উপর দুনিয়া ও আখিরাতে শির্কের বিপদ ও মন্দ পরিণাম সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নার দলীলসমূহ বিভিন্নভাবে প্রমাণ পেশ করছে।
১. আল্লাহ তা'আলা জানিয়েছেন যে, শির্ক হচ্ছে সেই পাপ যা তিনি মৃত্যুর পূর্বে তা থেকে তাওবা করা ছাড়া কোনমতেই ক্ষমা করবেন না। তিনি বলেন:
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ ﴾ (النساء : ٤٨)
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এতদ্ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন"। [সূরা আন-নিসা : ৪৮]
২. আল্লাহ শির্ককে সবচেয়ে বড় যুলুম বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেনঃ
﴿إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ ﴾ (لقمان: ۱۳)
"নিশ্চয়ই শির্ক বড় যুলুম”। [সূরা লুকমান: ১৩]
৩. আল্লাহ আরো জানিয়েছেন যে, শির্ক আমলসমূহকে নষ্ট করে দেয়। তিনি বলেনঃ
وَ لَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ ﴾(الزمر : ٦٥)
“আপনার প্রতি ও আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি নিশ্চয়ই ওহী পাঠানো হয়েছে যে, আপনি শির্ক করলে অবশ্যই আপনার আমল নষ্ট হয়ে যাবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন”। [সূরা আয-যুমার: ৬৫]
৪. আল্লাহ আরো বর্ণনা করেছেন যে, শির্ক করার মধ্যে রয়েছে বিশ্বজগতের প্রভু আল্লাহর প্রতি ত্রুটি আরোপ এবং তাঁর সাথে অন্যের সমতা বিধান। তিনি বলেন:
قَالُوا وَهُمْ فِيهَا يَخْتَصِمُونَ * تَاللهِ إِنْ كُنَّا لَفِي ضَلَلٍ مُبِينٍ * إِذْ نُسَوِيكُمْ بِرَبِّ الْعَلَمِينَ ) (الشعراء: ٩٦-٩٨)
“তারা সেখানে বিতর্কে লিপ্ত হয়ে বলবে, আল্লাহর শপথ! আমরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিলাম, যখন আমরা তোমাদেরকে জগতসমূহের প্রতিপালকের সমকক্ষ গণ্য করতাম”। [সূরা আশ-শু'আরা: ৯৬-৯৮]
৫. তিনি আরো জানিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি শির্ক অবস্থায় মারা যায়, সে সর্বদা জাহান্নামের আগুনে অবস্থান করবে। তিনি বলেনঃ
إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ ) (المائدة: ۷۲)
“কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই নিষিদ্ধ করবেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৭২]
এগুলো ছাড়াও রয়েছে আরো বহু প্রকার দলীল। কুরআন কারীমে সেসবের সংখ্যা অনেক।
গ. শির্কে নিপতিত হওয়ার কারণ:
বনী আদমের মধ্যে শির্ক সংঘটিত হওয়ার মূল কারণ সৎ ও মহান ব্যক্তিদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি এবং তাদের প্রশংসা, স্তুতিবর্ণনা ও গুণকীর্তনে সীমাতিক্রম করা। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَقَالُو لَا تَذَرُنَّ الْهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَ وَدًّا وَلَا سُوَاعَاهُ وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسُرًا * وَقَدْ أَضَلُّوا كَثِيرًا وَلَا تَزِدِ الظَّلمين الاضللًا (نوح: ٢٣-٢٤)
“আর তারা বলেছিল, 'তোমরা কখনো পরিত্যাগ করো না তোমাদের উপাস্যদেরকে, পরিত্যাগ করো না ওয়াদ, সুওয়া', ইয়াগুছ, ইয়াউ'ক ও নাস্ত্রকে'। এরা অনেককে বিভ্রান্ত করেছে। আর যালিমদেরকে বিভ্রান্তি ব্যতীত আর কিছুই বৃদ্ধি করো না”। [সূরা নূহ: ২৩-২৪]
এগুলো হল নূহ আলাইহিস সালামের জাতির সৎ লোকদের নাম। যখন তারা মারা গেল, লোকেরা তাদের আকৃতিতে মূর্তি তৈরী করল এবং তাদের নামে সেগুলোর নাম রাখল। উদ্দেশ্য ছিলো তাদেরকে সম্মান করা, তাদের স্মৃতিকে অমর করে রাখা এবং তাদের মর্যাদাকে স্মরণ রাখা। এমন করে শেষ পর্যন্ত তারা সেসব ব্যক্তিবর্গের ইবাদাতে লিপ্ত হল।
একথার পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করছে সে বর্ণনাটি, যা ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে করা হয়েছে। তিনি বলেন: 'নূহের জাতির মধ্যে যে মূর্তিসমূহ ছিল, তা এরপর আরবদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। ওয়াদ্দ ছিলো দাওমাতুল জান্দাল নামক স্থানে কালব গোত্রের। আর সুওয়া' ছিলো হুযাইল গোত্রের এবং ইয়াগুস ছিলো মুরাদ গোত্রের, অতঃপর সাবার নিকটস্থ জাওফ নামক স্থানে বনী গাতীফের। আর ইয়াউক ছিলো হামাদান গোত্রের এবং নাসর ছিলো হিমইয়ার গোত্রের আলে যিল কিলা'-এর। এসবই ছিলো নূহের জাতির সৎ লোকদের নাম। তারা যখন মারা গেল, শয়তান তাদের জাতির কাছে এ নির্দেশ পাঠাল যে, তারা যে সব স্থানে বসতেন সেখানে তোমরা মূর্তি স্থাপন কর এবং তাদের নামে সেগুলোর নামকরণ কর। অতঃপর তারা তাই করল। তবে তখনো সেগুলোর উপাসনা করা হত না। এরপর যখন (মূর্তিনির্মাণকারী) এসব লোকেরা ধ্বংস হয়ে গেল এবং জ্ঞান¹ রহিত হল, তখনই সে সব মূর্তির উপাসনা শুরু হল²。
ইবনে জারীর ত্বাবারী আল্লাহ তা'আলার বাণী:
وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ الْمَتَكُمُ
এর ব্যাখ্যাকালে মুহাম্মাদ ইবনে কায়েস থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: ‘তারা বনী আদমের কতিপয় সৎ ব্যক্তি ছিল। তাদের ছিলো অনেক অনুসারী, যারা তাদের অনুসরণ করত। তারা মারা গেলে তাদের অনুসরণকারী সঙ্গীরা বলল, যদি আমরা তাদের ছবি বানিয়ে নেই, তাহলে যখনই আমরা তাদেরকে স্মরণ করব, তা ইবাদাতে আমাদের আগ্রহ আরো বৃদ্ধি করবে। এরপর তারা সে সব লোকের ছবি তৈরী করল। অতঃপর তারা যখন মারা গেল এবং অন্য লোকেরা (তাদের স্থানে) এল, ইবলিস তাদেরকে প্ররোচিত করে বলল, ওরা তো তাদের উপাসনাই করত এবং তাদের অসীলা দিয়ে বৃষ্টি পেত। ফলে এরা তাদের উপাসনা করল’¹। এরা একত্রে দু'টো ফিতনা সৃষ্টি করলঃ
প্রথমত: তাদের কবরের কাছে অবস্থান।
দ্বিতীয়ত: তাদের আকৃতির ছবি তৈরী করা এবং বসার স্থানে সেগুলোকে স্থাপন করে সেগুলোর প্রতি মনোনিবেশ করে বসা।
এর ফলে মানবতার ইতিহাসে প্রথমবারের মত শির্ক সংঘটিত হল। অতএব প্রত্যেক যুগে ও প্রত্যেক স্থানে উপরোক্ত দুটি বিষয়ই হচ্ছে শির্কের সবচেয়ে বড় উপকরণ।
ঘ. শির্কের প্রকারভেদ :
শির্ক দু'ভাগে বিভক্ত : বড় শির্ক ও ছোট শির্ক।
১. বড় শির্ক : আল্লাহর সাথে এমন একজন সমকক্ষ গ্রহণ করা, আল্লাহর ইবাদাতের মতই যার ইবাদাত করা হবে। এ শির্ক মুসলিম মিল্লাত থেকে বের করে দেয়, সমস্ত আমল বিনষ্ট করে দেয় এবং এ প্রকার শির্কে লিপ্ত মুশরিক যদি শির্কের উপর মারা যায়, তাহলে সে চিরতরে জাহান্নামের অগ্নিতে দগ্ধ হতে থাকবে। তার ব্যাপারে এমন নির্দেশ দেয়া হবে না যাতে সে মারা যাবে এবং জাহান্নামের আযাবও তার থেকে হ্রাস করা হবে না।
বড় শির্কের প্রকারভেদ : বড় শির্ক চার ভাগে বিভক্ত :
• দো'আর শির্ক : কেননা দো'আ সবচেয়ে বড় ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত। বরং তা ইবাদাতের মূল। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন
الدعاء هو العبادة
অর্থাৎ দো'আই ইবাদাত। আহমাদ ও তিরমিযী হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং তিরমিযী বলেছেন, এটি ‘হাসান-সহীহ হাদীস’¹। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ، إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُوْنَ جَهَنَّمَ دُخِرِينَ (غافر : ٦٠ )
“তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয়ই যারা অহংকারবশতঃ আমার ইবাদাত হতে বিমুখ হয়, তারা অবশ্যই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে”। [সূরা গাফির: ৬০]
যখন এটা সাব্যস্ত হল যে, দো'আ ইবাদাত, অতএব গায়রুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য তা নিবেদন করা শির্ক। সুতরাং যে ব্যক্তি কোন নবী, ফিরিস্তা, অলী, কবর কিংবা পাথর প্রভৃতি সৃষ্টজগতের কোন কিছুকে আহ্বান করবে, সে হবে মুশরিক ও কাফির। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَمَنْ يَدْعُ مَعَ اللهِ إِلهَا آخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِنْدَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُقْلِمُ الكفرون (المؤمنون: ۱۱৭)
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে ডাকে, এ বিষয়ে তার নিকট কোন প্রমাণ নেই, তার হিসাব তো তার প্রতিপালকের নিকটই আছে। নিশ্চয়ই কাফিরগণ সফলকাম হবে না”। [সূরা আল-মু'মিনূন: ১১৭]
দো'আ যে ইবাদাত এবং এর কোন কিছু আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য পালন করা শির্ক, এ ব্যাপারে আরো যে সব দলীল আছে, তম্মধ্যে রয়েছে আল্লাহর বাণী:
فَإِذَا رَكِبُوا فِي الْفُلْكِ دَعَوُا اللهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَةَ فَلَمَّا نَجْهُمُ إِلَى الْبَرِّ إِذَا هُمْ يُشْرِكُونَ (العنكبوت : ٦٥)
"তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে, তখন বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন স্থলে এনে তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখন তারা শির্কে লিপ্ত হয়”। [সূরা আল-'আন্কাবৃত : ৬৫]
আল্লাহ তা'আলা এসব মুশরিকদের সম্পর্কে এ সংবাদই দিয়েছেন যে, তারা তাদের স্বাচ্ছন্দাবস্থায় আল্লাহর সাথে শির্ক করে এবং বিপদে আপদে আল্লাহর প্রতি নিষ্ঠাবান হয়ে যায়। সুতরাং ঐ ব্যক্তিদের অবস্থা কি হবে, যারা স্বচ্ছন্দ ও দুঃখ-কষ্ট উভয়াবস্থায় আল্লাহর সাথে শরীক করে থাকে? এ থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।
• নিয়্যত, ইচ্ছা ও সংকল্পের ক্ষেত্রে শির্ক: আর তা হল - স্বীয় আমল দ্বারা প্রকৃত মুনাফিকদের মত দুনিয়া কিংবা লোকদেখানো অথবা জনশ্রুতি অর্জনের পরিপূর্ণ ইচ্ছা পোষণ করা এবং আমল দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতে মুক্তির ইচ্ছা না করা। এমন যে করবে সে হবে বড় শির্কে লিপ্ত মুশরিক। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الحَيَوةَ الدُّنْيَا وَ زِينَتَهَا نُوَتِ إِلَيْهِمُ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ * أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَطِلُ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ) (هود: ١٥-١٦)
"যে কেউ পার্থিব জীবন ও এর শোভা কামনা করে, দুনিয়াতে আমরা তাদের কর্মের পূর্ণফল দান করি এবং এখানে তাদেরকে কম দেয়া হবে না। তাদের জন্য আখিরাতে জাহান্নামের আগুন ব্যতীত অন্য কিছুই নেই এবং তারা দুনিয়াতে যা করেছে তা নষ্ট হবে। আর তারা যে আমল করে তা নিরর্থক"। [সূরা হুদ : ১৫-১৬]
এ প্রকার শির্ক খুবই সুক্ষ্ম এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক।
• আনুগত্যের ক্ষেত্রে শির্ক: আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা হালাল সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে কিংবা আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা হারাম সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি সৃষ্টির আনুগত্য করে এবং অন্তর দিয়ে তা বিশ্বাস করে, অর্থাৎ সে তাদের জন্য হালাল ও হারাম সাব্যস্ত করার বৈধতা প্রদান করে এবং সে ক্ষেত্রে সে তার নিজের ও অন্যের জন্য উক্ত বিধানের আনুগত্যের অনুমতিও দান করে, যদিও সে জানে যে, এটা ইসলাম বিরোধী। অতএব সে আল্লাহ ব্যতীত তাদেরকে রব হিসাবে গ্রহণ করল এবং আল্লাহর সাথে বড় ধরনের শির্ক করল। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلهَا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبُحْنَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ ) (التوبة: ٣١)
“তারা আল্লাহ ব্যতীত তাদের পাদ্রীগণকে এবং সংসার বিরাগীগণকে তাদের প্রভুরূপে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়াম পুত্র মাসীহকেও। অথচ এক ইলাহের ইবাদাত করার জন্যই তারা আদিষ্ট হয়েছিল। তিনি ব্যতীত আর কোন প্রকৃত ইলাহ্ নেই। তারা যাকে শরীক করে তা হতে তিনি কত পবিত্র!” [সূরা আত-তাওবাহ: ৩১]
আয়াতটির যে তাফসীর করার মধ্যে কোন সমস্যা নেই, তা হল : আল্লাহর নাফরমানি করার ক্ষেত্রে (তথা আল্লাহর হুকুম পরিবর্তনে) ওলামা ও বান্দাদের আনুগত্য করা। তাদের কাছে দো'আ করা নয়। এ আয়াতের অনুরূপ তাফসীরই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছিলেন, যখন 'আদী ইবনে হাতেম তাকে প্রশ্ন করেছিলো ও বলেছিল, আমরা তাদের ইবাদাত করি না তো? তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন যে, তাদের ইবাদাত হল আল্লাহর নাফরমানি (তথা আল্লাহর হুকুম পরিবর্তন) এর ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করা। তিনি বললেন, "তারা কি ঐ বস্তুকে হারাম সাব্যস্ত করত না, যাকে আল্লাহ হালাল করেছেন, অতঃপর তোমরাও তাকে হারাম সাব্যস্ত করতে এবং তারা কি ঐ বস্তুকে হালাল সাব্যস্ত করত না, যাকে আল্লাহ হারাম করেছেন, অতঃপর তোমরাও তাকে হালাল সাব্যস্ত করতে"? আদী বললেন, হাঁ। তিনি বললেন, "ওটাই হল তাদের ইবাদাত করা"¹। তিরমিযী এ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ও হাসান বলেছেন এবং ত্বাবারানী মু'জাম কাবীরে তা বর্ণনা করেছেন।
• ভালবাসার ক্ষেত্রে শির্ক : এ ভালবাসা দ্বারা বান্দার সেই ভালবাসাকে বুঝানো হয়েছে যা এমন সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন এবং নিজেকে ছোট করে এমন বিনয়াবনত হওয়াকে অপরিহার্য করে তোলে, যা কারো জন্য সমীচিন নয় একমাত্র আল্লাহ ছাড়া, যার কোন শরীক নেই। বান্দা যখন এ ভালবাসা গায়রুল্লার জন্য নিবেদন করবে, তখন সে এদ্বারা বড় শির্কে লিপ্ত হয়ে যাবে। এর দলীল আল্লাহর বাণী :
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُونَهُمْ حَبَ اللهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبَّا لِلهِ ) (البقرة : ١٦٥)
"মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ ছাড়া অপরকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে এবং আল্লাহকে ভালবাসার ন্যায় তাদেরকে ভালবাসে। কিন্তু যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ভালবাসায় তারা অধিক দৃঢ়”। [সূরা আল-বাকারাহ: ১৬৫]
২. শির্কের দ্বিতীয় প্রকার হল ছোট শির্ক:
ছোট শির্ক হল যা বড় শির্কের দিকে ধাবিত হওয়ার মাধ্যম এবং তাতে লিপ্ত হওয়ার কারণ। অথবা (কুরআন-সুন্নার) দলীলে যাকে শির্ক নামে অভিহিত করা হয়েছে, তবে তা বড় শির্কের সীমানা পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেনি। এটি আমলের দ্বারা ও মুখের কথার মাধ্যমে সংঘটিত হয়ে থাকে। এর হুকুম কবীরা গোনাহে লিপ্ত ব্যক্তির হুকুমের মতই আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে (তিনি চাইলে শাস্তি দেবেন কিংবা ক্ষমা করে দেবেন)।
এর উদাহরণের মধ্যে রয়েছে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো:
ক. সামান্য রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা): এর দলীল হল সে হাদীস, যা ইমাম আহমাদ ও অন্যান্য আরো অনেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “আমি তোমাদের উপর যে জিনিসটির ভয় সবচেয়ে বেশী করি তা হল ছোট শির্ক”। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন: ছোট শির্ক কি, হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, “রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা), কিয়ামতের দিন আল্লাহ যখন মানুষকে তাদের আমলের প্রতিদান দান করবেন তখন বলবেন : তোমরা সেই লোকদের কাছে যাও, দুনিয়ায় যাদেরকে তোমরা স্বীয় আমল প্রদর্শন করতে। সুতরাং দেখ, তাদের কাছে কোন প্রতিদান পাও কিনা”¹
খ. 'আল্লাহ এবং আপনি যা চেয়েছেন' এমন কথা বলা। আবু দাউদ তার সুনান গ্রন্থে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন: “তোমরা বলো না 'আল্লাহ এবং অমুক যেমন চেয়েছে', বরং তোমরা বলো, আল্লাহ যেমন চেয়েছেন তারপর অমুক যেমন চেয়েছে”²。
গ. 'যদি আল্লাহ এবং অমুক না থাকত' এমন কথা বলা অথবা 'যদি হাঁস না থাকত, তাহলে আমাদের কাছে চোর অবশ্যই আসত' ইত্যাদি বলা। ইবনে আবু হাতিম স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে আল্লাহ্র বাণী:
فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ
এর অর্থ বর্ণনায় ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণনা করে বলেন, 'আয়াতে বর্ণিত الأنداد তথা সমকক্ষসমূহ স্থির করা এমন শির্ক যা রাতের অন্ধকারে কালো প্রশস্ত মসৃণ পাথরের উপর দিয়ে পিপিলিকার চলার চেয়েও গোপন। আর তা হল - এ কথা বলা যে, 'হে অমুক! আল্লাহর এবং তোমার জীবনের ও আমার জীবনের শপথ', আর এ কথা বলাও যে, 'যদি এর ছোট কুকুরটি না থাকত তাহলে চোর আমাদের কাছে আসত', এবং 'যদি ঘরে হাঁস না থাকত তাহলে চোর আসত', আর কোন ব্যক্তি তার সঙ্গীকে একথা বলা যে, 'আল্লাহ যা চেয়েছেন এবং আপনি যা চেয়েছেন', এবং এ কথাও বলা যে, 'যদি আল্লাহ ও অমুক না থাকত, 'অমুককে তাতে রেখো না'। এসবই হচ্ছে আল্লাহর সাথে শির্ক”¹。
ছোট শির্ক ও বড় শির্কের মধ্যে পার্থক্য:
ছোট শির্ক ও বড় শির্কের মধ্যে বহু পার্থক্য রয়েছে। তম্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণগুলো নিম্নরূপ:
১. বড় শির্ককারীকে আল্লাহ তা'আলা তাওবা ছাড়া কোনক্রমেই ক্ষমা করবেন না। কিন্তু ছোট শির্ক থাকবে আল্লাহর ইচ্ছাধীন।
২. বড় শির্ক সমস্ত আমলকে নষ্ট করে দেয়। তবে ছোট শির্ক তার সাথে সম্পৃক্ত আমলকেই শুধু নষ্ট করে।
৩. বড় শির্ক মুসলিম মিল্লাত থেকে শির্ককারীকে বের করে দেয়। কিন্তু ছোট শির্ক ইসলাম থেকে তাকে বের করে দেয় না।
৪. বড় শির্কে লিপ্ত ব্যক্তি চিরতরে জাহান্নামে থাকবে এবং জান্নাত হবে তার জন্য হারাম। আর ছোট শির্ক হচ্ছে অন্যান্য গোনাহের মতই।
দ্বিতীয় বিষয় : কুফ্র
ক. সংজ্ঞা: অভিধানে 'কুফ্র' আবৃত করা ও ঢেকে রাখার অর্থে ব্যবহৃত হয়।
আর শরীয়তের পরিভাষায় কুফ্র ঈমানের বিপরীত। আর তা হল আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান না রাখা, চাই তাঁদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হোক কিংবা না হোক, বরং তা যদি সন্দেহ ও সংশয় প্রসূতও হয়ে থাকে, কিংবা ঈর্ষা ও অহংকারবশতঃ বা রিসালাতের অনুসরণ থেকে ফিরিয়ে রাখে এমন কোন প্রবৃত্তির অনুসরণবশতঃ ঈমান থেকে দূরে সরে থাকার কারণেও হয়ে থাকে।
খ. কুফরের প্রকারভেদ :
কুফ্র দু' প্রকার : বড় কুফ্র ও ছোট কুফ্র।
বড় কুফ্র হল যা চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে অবস্থানকে অপরিহার্য করে। আর ছোট কুফ্র হল যা শান্তি পাওয়াকে অপরিহার্য করে, চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে অবস্থানকে নয়।
প্রথমত : বড় কুফ্র তা পাঁচ প্রকার :
১. মিথ্যা প্রতিপন্ন করার সাথে সম্পৃক্ত কুফ্র। আর তা হল রাসূলগণের মিথ্যাবাদী হওয়ার বিশ্বাস পোষণ করা। অতএব তারা যা কিছু নিয়ে এসেছেন, তাতে যে ব্যক্তি তাদেরকে প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে মিথ্যা সাব্যস্ত করল, সে কুফরী করল। এর দলীল হল আল্লাহর বাণী :
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللهِ كَذِبًا أَوَكَذَبَ بِالْحَقِّ لَمَّا جَاءَهُ أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِلْكَفِرِينَ ﴾ (العنكبوت : ٦٨)
"যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে অথবা তার কাছে সত্যের আগমন হলে তাকে সে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তার অপেক্ষা অধিক যালিম আর কে? জাহান্নামেই কি কাফিরদের আবাস নয়"? [সূরা আল-'আনকাবুত : ৬৮]
২. অস্বীকার ও অহংকারের মাধ্যমে কুফ্র। এটা এভাবে হয় যে, রাসূলের সত্যতা এবং তিনি যে আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য নিয়ে এসেছেন সে সম্পর্কে জ্ঞাত থাকা, কিন্তু অহংকার ও হিংসাবশতঃ তাঁর হুকুম না মানা এবং তাঁর নির্দেশ না শোনা। এর দলীল আল্লাহর বাণী :
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَكَةِ اسْجُدُوا لِلْأَدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَفِرِينَ ﴾ (البقرة : ٣٤)
"যখন আমি ফিরিশতাদের বললাম, আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলীস ব্যতীত সকলেই সিজদা করল। সে অমান্য করল ও অহংকার করল। সুতরাং সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হল”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ৩৪]
৩. সংশয়-সন্দেহের কুফ্র। আর তা হল রাসূলগণের সত্যতা সম্পর্কে ইতস্তত করা এবং দৃঢ় বিশ্বাস না রাখা। একে ধারণা সম্পর্কিত কুফ্রও বলা হয়। আর ধারণা হল একীন ও দৃঢ় বিশ্বাসের বিপরীত। এর দলীল আল্লাহ তা'আলার বাণী :
وَ دَخَلَ جَنَّتَهُ وَ هُوَ ظَالِمُ لِنَفْسِهِ قَالَ مَا أَظُنُّ أَنْ تَبِيدَ هَذِهِ أَبَدًا * وَمَا أَظُنُّ السَّاعَةَ قَائِمَةً وَلَبِن رُودْتُ إِلَى رَبِّي لَاجِدَنَّ خَيْرًا مِنْهَا مُنْقَلَبًا * قَالَ لَهُ صَاحِبُهُ وَهُوَ يُحَاوِرُهُ الْفَرْتَ بِالَّذِي خَلَقَكَ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُطْفَةٍ ثُمَّ سَوَكَ رَجُلًا لَكِنَّا هُوَ اللَّهُ رَبِّي ولا أشرك بربي أَحَدًا (الكهف : ٣٥-٣٨)
"আর নিজের প্রতি যুলুম করে সে তার উদ্যানে প্রবেশ করল। সে বলল, আমি মনে করি না যে, এটি কখনো ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি মনে করি না যে, ক্বিয়ামত হবে। আর আমি যদি আমার প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তিত হই-ই, তবে আমি তো নিশ্চয়ই এ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্থান পাব। তদুত্তরে তার বন্ধু বিতর্কমূলকভাবে জিজ্ঞাসা করতঃ তাকে বলল, তুমি কি তাঁকে অস্বীকার করছ যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মৃত্তিকা ও পরে শুক্র হতে এবং তার পর পূর্ণাঙ্গ করেছেন পুরুষ আকৃতিতে? কিন্তু তিনিই আল্লাহ আমার প্রতিপালক এবং আমি কাউকেও আমার প্রতিপালকের শরীক করি না"। [সূরা আল-কাহফঃ ৩৫-৩৮]
৪. বিমুখ থাকার মাধ্যমে কুফ্র : এদ্বারা উদ্দেশ্য হল দ্বীন থেকে পরিপূর্ণভাবে বিমুখ থাকা এমনভাবে যে, স্বীয় কর্ণ, হৃদয় ও জ্ঞান দ্বারা ঐ আদর্শ থেকে দূরে থাকা যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়ে এসেছেন। এর দলীল আল্লাহর বাণী:
وَالَّذِينَ كَفَرُوا عَمَّا أُنْذِرُوا مُعْرِضُونَ (الأحقاف : ٣)
"কিন্তু যারা কুফরী করেছে তারা সে বিষয় থেকে বিমুখ যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে”। [সূরা আল-আহকাফ : ৩]
৫. নিফাকের মাধ্যমে কুফ্র: এদ্বারা বিশ্বাসগত নিফাক বুঝানো উদ্দেশ্য, যেমন ঈমানকে প্রকাশ করে গোপনে কুফ্র লালন করা। এর দলীল আল্লাহর বাণী:
ذَلِكَ بِأَنَّهُمُ امَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا فَطِيعَ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ (المنافقون : ٣)
“এটা এজন্য যে, তারা ঈমান আনবার পর কুফরী করেছে। ফলে তাদের হৃদয়ে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। অতএব তারা বুঝে না”। [সূরা আল-মুনাফিকূন : ৩]
নিফাক বা মোনাফেকী দু' প্রকার:
১. বিশ্বাসগত নিফাক : এটি বড় কুফ্র যা মুসলিম মিল্লাত থেকে বের করে দেয়। তা ছয় প্রকার: রাসূলকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা, অথবা রাসূল যে দ্বীন নিয়ে এসেছেন তার কোন কিছুকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা, কিংবা রাসূলকে ঘৃণা করা, অথবা রাসূল যে দ্বীন নিয়ে এসেছেন তাকে ঘৃণা করা, রাসূলের দ্বীনের ক্ষতিতে খুশী হওয়া অথবা রাসূলের দ্বীনের বিজয় অপছন্দ করা।
২. কর্মগত নিফাক : তা হল ছোট কুফ্র যা মুসলিম মিল্লাত থেকে বের করে না। তবে তা বড় ধরনের অপরাধ ও মহাপাপ। তম্মধ্যে রয়েছে সে আমল যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীসে উল্লেখ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন:
«أربع من كن فيه كان منافقاً خالصاً، ومن كانت فيه خصلة منهن كانت فيه خصلة من النفاق حتى يدعها : إذا اؤتمن خان، وإذا حدث كذب، وإذا عاهد غدر، وإذا خاصم فجر»
“যে ব্যক্তির মধ্যে চারটি আমল পাওয়া যায়, সে হবে প্রকৃত মুনাফিক। আর যার মধ্যে তা থেকে একটি স্বভাব পাওয়া যায়, সে তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে নিফাকের একটি স্বভাব বিদ্যমান থাকে। সেগুলো হল: যখন তার কছে আমানাত রাখা হয়, সে খেয়ানত করে। যখন সে কথা বলে, মিথ্যা বলে। যখন ওয়াদা করে, ভঙ্গ করে। আর যখন ঝগড়া করে, অশ্লীলভাবে করে”¹। মুত্তাফাকুন ‘আলাইহ্’
নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম আরো বলেনঃ
«آية المنافق ثلاث: إذا حدث كذب، وإذا وعد أخلف، وإذا اؤتمن خان»
“মুনাফিকের আলামত তিনটিঃ যখন কথা বলে, মিথ্যা বলে। যখন ওয়াদা করে, ভঙ্গ করে। আর যখন তার কাছে আমানাত রাখা হয়, তখন সে খেয়ানত করে"¹। বুখারী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
দ্বিতীয়ত: ছোট কুফ্র
এ ধরনের কুফরে লিপ্ত ব্যক্তি মুসলিম মিল্লাত থেকে বের হয়ে যাবে না এবং চিরতরে জাহান্নামে অবস্থান করাকেও তা অপরিহার্য করে না। এ কুফরে লিপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে শুধু কঠিন শাস্তির ধমক এসেছে। এ প্রকার কুফ্র হল নেয়ামত অস্বীকার করা। কুরআন ও সুন্নার মধ্যে বড় কুফ্র পর্যন্ত পৌঁছে না এ রকম যত কুফরের উল্লেখ এসেছে, তার সবই এ প্রকারের অন্তর্গত। এর উদাহরণের মধ্যে রয়েছে: আল্লাহ তা'আলার বাণীতে যা এসেছে:
﴿وَضَرَبَ اللهُ مَثَلًا قَرْيَةً كَانَتْ أَمِنَةً مُطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِّنْ كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللهِ فَأَذَاقَهَا اللهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ﴾ (النحل : ١١٢)
"আল্লাহ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এমন এক জনপদের যা ছিলো নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেখানে সর্বদিক হতে তার প্রচুর জীবিকা আসত। অতঃপর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করল। ফলে তারা যা করত তজ্জন্য আল্লাহ সে জনপদকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদন”। [সূরা আন-নাহল : ১১২]
এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীতে যা এসেছে:
«اثنتان في الناس هما بهم كفر، الطعن في النسب ، والنياحة على الميت»
"মানুষের মধ্যে দু'টো জিনিস আছে, যা তাদেরকে কুফ্রিতে লিপ্ত করে : বংশের ব্যাপারে অপবাদ দেয়া এবং মৃতের জন্য উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করা”²। হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীতে আরো এসেছে:
« لا ترجعوا بعدي كفاراً يضرب بعضكم رقاب بعض»
“আমার পরে তোমরা কাফের অবস্থায় ফিরে যেও না যে, তোমাদের একে অন্যের গর্দান উড়িয়ে দেবে”¹। হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন।
এটা এবং এর মত আমলগুলো হল বড় কুফরের চেয়ে ছোট আকারের কুফ্র। মুসলিম মিল্লাত থেকে তা বের করে দেয় না; কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
إِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدُهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ * إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ ﴾ (الحجرات: ৯-১০)
“মু'মিনদের দু' দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। আর তাদের একদল অপর দলের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করলে যারা বাড়াবাড়ি করে, তাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি তারা ফিরে আসে তাদের মধ্যে ন্যায়ের সহিত ফয়সালা কর এবং সুবিচার কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন। মু'মিনগণ পরস্পর ভাই ভাই; সুতরাং তোমরা তোমাদের ভ্রাতৃবৃন্দের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন কর। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হও”। [সূরা আল-হুজরাত : ৯-১০]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا ﴾ (النساء: ৪৮)
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এতদ্ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আর যে-ই আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে এক মহা পাপ করে"। [সূরা আন-নিসা: ৪৮]
এ মহান আয়াতটি এ কথারই প্রমাণ বহন করছে যে, শির্কের নিচের প্রত্যেক গোনাহ আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে অর্থাৎ আল্লাহ চাইলে গোনাহ পরিমাণ আযাব তাকে দেবেন এবং তিনি ইচ্ছা করলে শুরু থেকেই তাকে ক্ষমাও করে দিতে পারেন। তবে তাঁর সাথে শির্ক করাকে তিনি ক্ষমা করবেন না, যেমন তা এ আয়াতটিতে এবং আল্লাহ তা'আলার সেই বাণীতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যাতে তিনি বলেছেন:
إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَالظَّلِمِينَ مِنْ أَنْصَارِ (المائدة: ۷۲)
“কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করে দেবেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই”। [সূরা আল-মায়িদাহঃ ৭২]
টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৭০৮৪), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১৮৪৭)
¹ অর্থাৎ সে সব ছবির সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষ জ্ঞান।
² সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৪৯২০)
¹ তাফসীর তাবারী (১২/২৫৪)
¹ মুসনাদ আহমাদ (৪/২৬৭), সুনান তিরমিযী (হাদীস নং ২৯৬৯)
¹ সুনান তিরমিযী (হাদীস নং ৩০৯৫), মু'জাম কাবীর, ত্বাবারানী (১৭/৯২)
¹ মুসনাদ আহমাদ (৫/৪২৮), আলমুনযেরী বলেন, এর সনদ ভাল। আততারগীব ওয়াততারহীব (১/৪৮), হাইসামী বলেন, এর বর্ণনাকারীগণ সহীহ হাদীসের বর্ণনাকারী, মাজমা' (১/১০২)
² সুনান আবু দাউদ (হাদীস নং ৪৯৮০), যাহাবী মুখতাসারুল বায়হাকীতে (১/১৪০/২) বলেন, এর সনদ উপযুক্ত。
¹ তাফসীর ইবনে আবু হাতিম (১/৬২)
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৪), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৫৮)
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ৩৩)
² সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৬৭)
¹ সহীহ বুখারী (হাদীস নং ১২১), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৬৫)