📄 তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহর অর্থ, এবং এর উপর কোরআন, সুন্নাহ, যুক্তি, ও ফিতরাত (স্বাভাবিক মানবপ্রকৃতি) এর দলীল-প্রমাণাদি
প্রথমত: রুবুবিয়্যাহ-এর সংজ্ঞা
ক. আভিধানিক অর্থে রুবুবিয়্যাহ শব্দটি "رب" ক্রিয়াটির মাস্দার (ক্রিয়ামূল)। এ থেকেই 'رب' শব্দটি উদ্ভূত। অতএব রুবুবিয়্যাহ হচ্ছে আল্লাহর গুণ, যা 'আর-রব' নাম থেকে গৃহীত। আর শব্দটি আরবী ভাষায় কয়েকটি অর্থে ব্যবহৃত হয়, যেমন মালিক, অনুসৃত মনিব, সংস্কারক।
খ. পরিভাষায় তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ (প্রভুত্বে একত্ববাদ) হলোঃ আল্লাহকে তাঁর যাবতীয় কাজের ক্ষেত্রে এক বলে স্বীকৃতি দেয়া।
আর আল্লাহর কার্যাবলীর মধ্যে রয়েছেঃ সৃষ্টি করা, রিষিক দেয়া, সার্বিক নেতৃত্ব, নেয়ামত দেয়া, আধিপত্য করা, আকৃতি দেয়া, দান করা, নিষেধ করা, উপকার-অপকার করা, জীবন দেয়া, মৃত্যু দান করা, সুদৃঢ় পরিচালনা, ফয়সালা করা ও ভাগ্য নির্ধারণ করা ইত্যাদি যে সমস্ত কাজে তাঁর কোন শরীক নেই। আর এজন্যই এর প্রত্যেকটি বিষয়ের উপর ঈমান রাখা বান্দার উপর ওয়াজিব।
দ্বিতীয়তঃ রুবুবিয়্যাহ-এর প্রমাণ
ক. কুরআন থেকে প্রমাণঃ
আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ
خَلَقَ السَّمَوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا وَالْقَى فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ وَبَكَ فِيهَا مِنْ كُلِّ دَابَّةٍ وَأَنزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَنْبَتْنَا فِيهَا مِنْ كُلِّ زَوْجٍ كَرِيمٍ * هَذَا خَلْقُ اللَّهِ فَأَرُونِي مَاذَا خَلَقَ الَّذِينَ مِنْ دُونِهِ بَلِ الظَّلِمُونَ فِي ضَال مبين (لقمان: ۱۰-۱۱)
“তিনি খুঁটি ব্যতীত আসমানসমূহ সৃষ্টি করেছেন তোমরা তা দেখছ, তিনি যমীনে স্থাপন করেছেন পর্বতমালা, যাতে যমীন তোমাদেরকে নিয়ে কাত হয়ে না পড়ে, আর এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্ব প্রকার জন্তু, আর আমরা আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছি। অতঃপর তাতে উৎপন্ন করেছি কল্যাণকর সবকিছু। এটি আল্লাহর সৃষ্টি। অতঃপর আমাকে দেখাও আল্লাহ ব্যতীত অন্যরা কি সৃষ্টি করেছে? বরং যালিমরা সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিপতিত রয়েছে”। [সূরা লুকমানঃ১০-১১]
আর আল্লাহর বাণীঃ
امْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَى أَمْ هُمُ الْخَلِقُونَ الله (الطور : ٣٥)
"তারা কি আপনা আপনিই সৃজিত হয়েছে কোন বস্তু ব্যতিরেকে? নাকি তারা নিজেরাই স্রষ্টা”। [সূরা আত-তূরঃ৩৫]
খ. হাদীস থেকে প্রমাণঃ
আব্দুল্লাহ ইবনে শিখীর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে ইমাম আহমাদ ও আবু দাউদ কর্তৃক বর্ণিত মারফু' হাদীসে রয়েছে:
"মহান আল্লাহই হচ্ছেন 'আস্সাইয়্যেদ'..." । «السيد الله تبارك وتعالى ...»
এছাড়াও তিরমিযী ও আরো অনেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে অসিয়ত করার প্রাক্কালে বলেনঃ
... واعلم أن الأمة لو اجتمعت على أن ينفعوك بشيء لم ينفعوك إلا بشيء قد كتبه الله لك، وإن اجتمعوا على أن يضروك بشيء لم يضروك إلا بشيء قد كتبه الله عليك، رفعت الأقلام وجفت الصحف»
"...আর জেনে রাখ, যদি উম্মতের সকলে তোমার কোন কল্যাণ করতে একত্রিত হয়, তারা তোমার ততটুকু কল্যাণই করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। আর যদি তারা তোমার কোন ক্ষতি করার উপর একতাবদ্ধ হয় তারা তোমার ততটুকু ক্ষতি করতে পারবে যতটুকু তোমার ব্যাপারে আল্লাহ লিখে রেখেছেন। কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, আর কাগজ শুকিয়ে গেছে (অর্থাৎ তাকদীর নির্দিষ্ট হয়ে গেছে)"¹।
গ. যুক্তিনির্ভর প্রমাণঃ
আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্ব ও তিনি যে এককভাবে রুবুবীয়্যাহ বা প্রভুত্বের অধিকারী এবং সৃষ্টির উপর যে তাঁর পরিপূর্ণ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রয়েছে- এ সকল কিছুর উপর সুস্থ বিবেক প্রমাণ বহন করছে। আর তা হবে আল্লাহর উপর প্রমাণবাহী তাঁর আয়াত (নিদর্শন) সমূহে চিন্তাভাবনার মাধ্যমে। আল্লাহর আয়াত সমুহের বিভিন্নতার ভিত্তিতে সে গুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করা ও তদ্বারা তাঁর প্রভুত্বের উপর প্রমাণ পেশের অনেকগুলো পন্থা রয়েছে। এ পদ্ধতিগুলোর মধ্যে প্রসিদ্ধতম পন্থা দু'টিঃ
প্রথম পন্থাঃ মানবসত্তা সৃষ্টির ক্ষেত্রে আল্লাহর নিদর্শন সমূহে চিন্তাভাবনা করা, যা 'মানবসত্তাজাত প্রমাণ' নামে পরিচিত; কেননা মানবসত্তা হচ্ছে আল্লাহর সেই মহান নিদর্শন সমূহের একটি নিদর্শন যা এ প্রমাণই বহন করছে যে, তিনি প্রভু হিসাবে একক, তাঁর কোন শরীক নেই, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ ﴾ (الذاريات: ۲۱)
"আর তোমাদের নিজেদের মধ্যে রয়েছে নিদর্শন, তোমরা কি তা লক্ষ্য করছ না?”। [সূরা আয-যারিয়াতঃ২১]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ
وَنَفْسِ وَمَا سَونَهَا ﴾ (الشمس : ٧)
"আর শপথ মানবসত্তার এবং তাঁর যিনি তা সুবিন্যস্ত করেছেন”। [সূরা আশ- শামসঃ৭]
আর এ জন্যই যদি কোন মানুষ তার নিজের সত্তা ও তাতে আল্লাহর যে আশ্চর্য্য কীর্তি রয়েছে, তা গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তবে অবশ্যই তা তাকে এদিকে দিক নিদর্শনা দান করে যে, তার এমন একজন রব রয়েছেন যিনি সৃষ্টিকর্তা, বিজ্ঞ ও সর্বজ্ঞ; কেননা যে বীর্য থেকে মানুষের উৎপত্তি হয়েছে, মানুষ নিজে সে বীর্য সৃষ্টি করতে পারে না, কিংবা বীর্যকে রক্ত পিন্ডেও পরিণত করতে পারে না, এবং রক্তপিন্ডকে মাংসপিন্ডে পরিণত করতে পারে না, আর মাংসপিন্ডকে অস্থিতে পরিণত করতে কিংবা অস্থিকে মাংসে আবৃত করতে পারে না।
দ্বিতীয় পন্থাঃ জগত সৃষ্টির ক্ষেত্রে আল্লাহর নিদর্শন সমূহ নিয়ে চিন্তা- গবেষণা করা, যা 'জাগতিক প্রমাণ' নামে পরিচিত। এটিও অনুরূপভাবে আল্লাহর সে সব মহান নিদর্শনাবলীর অন্যতম একটি নিদর্শন যা তার রবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বের উপর প্রমাণ বহন করছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
سَنُرِيهِمْ آيَتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنْفُسِهِمْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ أَوَلَمْ يَكْفِ بِرَبِّكَ أَنَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ ﴿فصلت: ৫৩﴾
"অচিরেই আমরা তাদেরকে আমাদের নিদর্শনাবলী দেখাব (আসমান ও যমীনের) দিগন্ত সমুহে, এবং তাদের নিজেদের সত্তায়, যাতে তাদের কাছে স্পষ্ট হয় যে, এ (কুরআন) সত্য, আপনার প্রভু সব কিছুর উপর সাক্ষ্যদাতা হিসাবে কি যথেষ্ট নয়”। [সূরা ফুসিলাতঃ৫৩]
দিগন্ত জোড়া সৃষ্টি জগত এবং তাতে যে আসমান ও যমীন রয়েছে, আর আকাশে যে তারকারাজী, গ্রহ, সূর্য্য ও চন্দ্রের সমাহার ঘটেছে, এবং যমীনে যে পাহাড়-পর্বত, বৃক্ষরাজী, সাগর-মহাসাগর, নদ-নদীর অস্তিত্ব রয়েছে, আর এ সবের পাশাপাশি তাতে রাত-দিনের যে আবর্তন ও সুক্ষ্ম নিয়ম মাফিক বিশ্বজগতের পরিক্রমণ- এ সবকিছু নিয়ে যদি কেউ চিন্তা-গবেষণা করে, তা তাকে সে দিকেই দিক-নির্দেশনা দান করে যে, এ জগতের এমন একজন স্রষ্টা রয়েছেন যিনি এগুলোকে সৃষ্টি করেছেন ও সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় পরিচালনা করছেন। যখনই কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি এ সৃষ্টিজগত নিয়ে গবেষণা করে এবং জগতের আশ্চর্য্য বিষয় সমূহ নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়, তখনি সে জানতে পারে যে, এ সবকিছুই সৃষ্টি করা হয়েছে সঠিক উদ্দেশ্যে এবং যথাযথভাবে, আর আল্লাহ স্বীয় সত্তা সম্পর্কে যে সকল সংবাদ দিয়েছেন এগুলো হচ্ছে সে সবের উপর ব্যাপক নিদর্শন ও প্রকৃষ্ট প্রমাণ এবং তাঁর একত্ববাদের দলীল।
কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ (প্রভুত্বে একত্ববাদ) প্রমাণে একদল লোক ইমাম আবু হানীফা রাহেমাহুল্লার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতে চেয়েছিল। তিনি তাদেরকে বললেনঃ "এ বিষয়ে কথা বলার আগে তোমরা আমাকে টাইগ্রিস নদীতে চলমান একটি জাহাজ সম্পর্কে তোমাদের কি মত তা জানাও, এটি নিজে নিজেই খাদ্য দ্রব্য ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ হয়ে নিজে নিজেই ফিরে আসছিল, এরপর নিজে নিজেই নোঙ্গর করছিলো আবার ফিরেও যাচ্ছিল, এসব কিছুই হচ্ছিল অথচ কেউই তা পরিচালনা করছিলো না"।
তারা বললঃ এটা অসম্ভব ব্যাপার, কক্ষণো হতে পারে না, তিনি তখন তাদের বললেনঃ "যদি একটি জাহাজের ব্যাপারে এটা অসম্ভব হয় তাহলে এ বিশ্ব জগতের উপর-নিচ সবটার ব্যাপারে তা কিভাবে সম্ভব হতে পারে?"
এভাবে জগতের সুন্দর অবয়ব, সুক্ষ্ম কারুকার্য এবং পরিপূর্ণ সৃষ্টি যে সৃষ্টিকর্তার একত্ববাদ ও এককত্বের উপর প্রমাণ বহন করে সেদিকে তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
টিকাঃ
¹ সুনান তিরমিযী (হাদীস নং ২৫১৬), মুসনাদ আহমাদ (১/৩০৭), হাদীসটিকে তিরমিযী হাসান সহীহ বলেছেন, আর হাকিমও তাকে সহীহ বলেছেন।
প্রথমত: রুবুবিয়্যাহ-এর সংজ্ঞা
ক. আভিধানিক অর্থে রুবুবিয়্যাহ শব্দটি "رب" ক্রিয়াটির মাস্দার (ক্রিয়ামূল)। এ থেকেই 'رب' শব্দটি উদ্ভূত। অতএব রুবুবিয়্যাহ হচ্ছে আল্লাহর গুণ, যা 'আর-রব' নাম থেকে গৃহীত। আর শব্দটি আরবী ভাষায় কয়েকটি অর্থে ব্যবহৃত হয়, যেমন মালিক, অনুসৃত মনিব, সংস্কারক।
খ. পরিভাষায় তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ (প্রভুত্বে একত্ববাদ) হলোঃ আল্লাহকে তাঁর যাবতীয় কাজের ক্ষেত্রে এক বলে স্বীকৃতি দেয়া।
আর আল্লাহর কার্যাবলীর মধ্যে রয়েছেঃ সৃষ্টি করা, রিষিক দেয়া, সার্বিক নেতৃত্ব, নেয়ামত দেয়া, আধিপত্য করা, আকৃতি দেয়া, দান করা, নিষেধ করা, উপকার-অপকার করা, জীবন দেয়া, মৃত্যু দান করা, সুদৃঢ় পরিচালনা, ফয়সালা করা ও ভাগ্য নির্ধারণ করা ইত্যাদি যে সমস্ত কাজে তাঁর কোন শরীক নেই। আর এজন্যই এর প্রত্যেকটি বিষয়ের উপর ঈমান রাখা বান্দার উপর ওয়াজিব।
দ্বিতীয়তঃ রুবুবিয়্যাহ-এর প্রমাণ
ক. কুরআন থেকে প্রমাণঃ
আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ
خَلَقَ السَّمَوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا وَالْقَى فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَنْ تَمِيدَ بِكُمْ وَبَكَ فِيهَا مِنْ كُلِّ دَابَّةٍ وَأَنزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَنْبَتْنَا فِيهَا مِنْ كُلِّ زَوْجٍ كَرِيمٍ * هَذَا خَلْقُ اللَّهِ فَأَرُونِي مَاذَا خَلَقَ الَِّينَ مِنْ دُونِهِ بَلِ الظَّلِمُونَ فِي ضَال مبين (لقمان: ۱۰-۱۱)
“তিনি খুঁটি ব্যতীত আসমানসমূহ সৃষ্টি করেছেন তোমরা তা দেখছ, তিনি যমীনে স্থাপন করেছেন পর্বতমালা, যাতে যমীন তোমাদেরকে নিয়ে কাত হয়ে না পড়ে, আর এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্ব প্রকার জন্তু, আর আমরা আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছি। অতঃপর তাতে উৎপন্ন করেছি কল্যাণকর সবকিছু। এটি আল্লাহর সৃষ্টি। অতঃপর আমাকে দেখাও আল্লাহ ব্যতীত অন্যরা কি সৃষ্টি করেছে? বরং যালিমরা সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিপতিত রয়েছে”। [সূরা লুকমানঃ১০-১১]
আর আল্লাহর বাণীঃ
امْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَى أَمْ هُمُ الْخَلِقُونَ الله (الطور : ٣٥)
"তারা কি আপনা আপনিই সৃজিত হয়েছে কোন বস্তু ব্যতিরেকে? নাকি তারা নিজেরাই স্রষ্টা”। [সূরা আত-তূরঃ৩৫]
খ. হাদীস থেকে প্রমাণঃ
আব্দুল্লাহ ইবনে শিখীর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে ইমাম আহমাদ ও আবু দাউদ কর্তৃক বর্ণিত মারফু' হাদীসে রয়েছে:
"মহান আল্লাহই হচ্ছেন 'আস্সাইয়্যেদ'..." । «السيد الله تبارك وتعالى ...»
এছাড়াও তিরমিযী ও আরো অনেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে অসিয়ত করার প্রাক্কালে বলেনঃ
... واعلم أن الأمة لو اجتمعت على أن ينفعوك بشيء لم ينفعوك إلا بشيء قد كتبه الله لك، وإن اجتمعوا على أن يضروك بشيء لم يضروك إلا بشيء قد كتبه الله عليك، رفعت الأقلام وجفت الصحف»
"...আর জেনে রাখ, যদি উম্মতের সকলে তোমার কোন কল্যাণ করতে একত্রিত হয়, তারা তোমার ততটুকু কল্যাণই করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। আর যদি তারা তোমার কোন ক্ষতি করার উপর একতাবদ্ধ হয় তারা তোমার ততটুকু ক্ষতি করতে পারবে যতটুকু তোমার ব্যাপারে আল্লাহ লিখে রেখেছেন। কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, আর কাগজ শুকিয়ে গেছে (অর্থাৎ তাকদীর নির্দিষ্ট হয়ে গেছে)"¹।
গ. যুক্তিনির্ভর প্রমাণঃ
আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্ব ও তিনি যে এককভাবে রুবুবীয়্যাহ বা প্রভুত্বের অধিকারী এবং সৃষ্টির উপর যে তাঁর পরিপূর্ণ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রয়েছে- এ সকল কিছুর উপর সুস্থ বিবেক প্রমাণ বহন করছে। আর তা হবে আল্লাহর উপর প্রমাণবাহী তাঁর আয়াত (নিদর্শন) সমূহে চিন্তাভাবনার মাধ্যমে। আল্লাহর আয়াত সমুহের বিভিন্নতার ভিত্তিতে সে গুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করা ও তদ্বারা তাঁর প্রভুত্বের উপর প্রমাণ পেশের অনেকগুলো পন্থা রয়েছে। এ পদ্ধতিগুলোর মধ্যে প্রসিদ্ধতম পন্থা দু'টিঃ
প্রথম পন্থাঃ মানবসত্তা সৃষ্টির ক্ষেত্রে আল্লাহর নিদর্শন সমূহে চিন্তাভাবনা করা, যা 'মানবসত্তাজাত প্রমাণ' নামে পরিচিত; কেননা মানবসত্তা হচ্ছে আল্লাহর সেই মহান নিদর্শন সমূহের একটি নিদর্শন যা এ প্রমাণই বহন করছে যে, তিনি প্রভু হিসাবে একক, তাঁর কোন শরীক নেই, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ ﴾ (الذاريات: ۲۱)
"আর তোমাদের নিজেদের মধ্যে রয়েছে নিদর্শন, তোমরা কি তা লক্ষ্য করছ না?”। [সূরা আয-যারিয়াতঃ২১]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ
وَنَفْسِ وَمَا سَونَهَا ﴾ (الشمس : ٧)
"আর শপথ মানবসত্তার এবং তাঁর যিনি তা সুবিন্যস্ত করেছেন”। [সূরা আশ- শামসঃ৭]
আর এ জন্যই যদি কোন মানুষ তার নিজের সত্তা ও তাতে আল্লাহর যে আশ্চর্য্য কীর্তি রয়েছে, তা গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তবে অবশ্যই তা তাকে এদিকে দিক নিদর্শনা দান করে যে, তার এমন একজন রব রয়েছেন যিনি সৃষ্টিকর্তা, বিজ্ঞ ও সর্বজ্ঞ; কেননা যে বীর্য থেকে মানুষের উৎপত্তি হয়েছে, মানুষ নিজে সে বীর্য সৃষ্টি করতে পারে না, কিংবা বীর্যকে রক্ত পিন্ডেও পরিণত করতে পারে না, এবং রক্তপিন্ডকে মাংসপিন্ডে পরিণত করতে পারে না, আর মাংসপিন্ডকে অস্থিতে পরিণত করতে কিংবা অস্থিকে মাংসে আবৃত করতে পারে না।
দ্বিতীয় পন্থাঃ জগত সৃষ্টির ক্ষেত্রে আল্লাহর নিদর্শন সমূহ নিয়ে চিন্তা- গবেষণা করা, যা 'জাগতিক প্রমাণ' নামে পরিচিত। এটিও অনুরূপভাবে আল্লাহর সে সব মহান নিদর্শনাবলীর অন্যতম একটি নিদর্শন যা তার রবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বের উপর প্রমাণ বহন করছে। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
سَنُرِيهِمْ آيَتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنْفُسِهِمْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ أَوَلَمْ يَكْفِ بِرَبِّكَ أَنَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ ﴿فصلت: ৫৩﴾
"অচিরেই আমরা তাদেরকে আমাদের নিদর্শনাবলী দেখাব (আসমান ও যমীনের) দিগন্ত সমুহে, এবং তাদের নিজেদের সত্তায়, যাতে তাদের কাছে স্পষ্ট হয় যে, এ (কুরআন) সত্য, আপনার প্রভু সব কিছুর উপর সাক্ষ্যদাতা হিসাবে কি যথেষ্ট নয়”। [সূরা ফুসিলাতঃ৫৩]
দিগন্ত জোড়া সৃষ্টি জগত এবং তাতে যে আসমান ও যমীন রয়েছে, আর আকাশে যে তারকারাজী, গ্রহ, সূর্য্য ও চন্দ্রের সমাহার ঘটেছে, এবং যমীনে যে পাহাড়-পর্বত, বৃক্ষরাজী, সাগর-মহাসাগর, নদ-নদীর অস্তিত্ব রয়েছে, আর এ সবের পাশাপাশি তাতে রাত-দিনের যে আবর্তন ও সুক্ষ্ম নিয়ম মাফিক বিশ্বজগতের পরিক্রমণ- এ সবকিছু নিয়ে যদি কেউ চিন্তা-গবেষণা করে, তা তাকে সে দিকেই দিক-নির্দেশনা দান করে যে, এ জগতের এমন একজন স্রষ্টা রয়েছেন যিনি এগুলোকে সৃষ্টি করেছেন ও সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় পরিচালনা করছেন। যখনই কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি এ সৃষ্টিজগত নিয়ে গবেষণা করে এবং জগতের আশ্চর্য্য বিষয় সমূহ নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়, তখনি সে জানতে পারে যে, এ সবকিছুই সৃষ্টি করা হয়েছে সঠিক উদ্দেশ্যে এবং যথাযথভাবে, আর আল্লাহ স্বীয় সত্তা সম্পর্কে যে সকল সংবাদ দিয়েছেন এগুলো হচ্ছে সে সবের উপর ব্যাপক নিদর্শন ও প্রকৃষ্ট প্রমাণ এবং তাঁর একত্ববাদের দলীল।
কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ (প্রভুত্বে একত্ববাদ) প্রমাণে একদল লোক ইমাম আবু হানীফা রাহেমাহুল্লার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতে চেয়েছিল। তিনি তাদেরকে বললেনঃ "এ বিষয়ে কথা বলার আগে তোমরা আমাকে টাইগ্রিস নদীতে চলমান একটি জাহাজ সম্পর্কে তোমাদের কি মত তা জানাও, এটি নিজে নিজেই খাদ্য দ্রব্য ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ হয়ে নিজে নিজেই ফিরে আসছিল, এরপর নিজে নিজেই নোঙ্গর করছিলো আবার ফিরেও যাচ্ছিল, এসব কিছুই হচ্ছিল অথচ কেউই তা পরিচালনা করছিলো না"।
তারা বললঃ এটা অসম্ভব ব্যাপার, কক্ষণো হতে পারে না, তিনি তখন তাদের বললেনঃ "যদি একটি জাহাজের ব্যাপারে এটা অসম্ভব হয় তাহলে এ বিশ্ব জগতের উপর-নিচ সবটার ব্যাপারে তা কিভাবে সম্ভব হতে পারে?"
এভাবে জগতের সুন্দর অবয়ব, সুক্ষ্ম কারুকার্য এবং পরিপূর্ণ সৃষ্টি যে সৃষ্টিকর্তার একত্ববাদ ও এককত্বের উপর প্রমাণ বহন করে সেদিকে তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
টিকাঃ
¹ সুনান তিরমিযী (হাদীস নং ২৫১৬), মুসনাদ আহমাদ (১/৩০৭), হাদীসটিকে তিরমিযী হাসান সহীহ বলেছেন, আর হাকিমও তাকে সহীহ বলেছেন।
📄 একথার বর্ণনায় যে, শুধুমাত্র তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহর প্রতি স্বীকৃতি দান আযাব থেকে মুক্তি দেয়না
ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ তাওহীদের তিন প্রকারের একটি প্রকার। এজন্যই কোন ব্যক্তির ঈমান তখনই বিশুদ্ধ হতে পারে এবং তাওহীদের প্রতি তার স্বীকৃতি দানও তখনই গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে যখন সে রুবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বে আল্লাহর তাওহীদের স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু এ প্রকার তাওহীদের স্বীকৃতি দানই রাসূলগণকে প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য নয়। আর শুধুমাত্র এ প্রকার তাওহীদই আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তি দেয় না, যতক্ষণ বান্দা এর অপরিহার্য পরিপূরক বলে বিবেচিত তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ তথা ইবাদাতে একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা না করে।
আর তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللهِ إِلا وَهُم مُشْرِكُونَ (يوسف : ١٠٦)
"আর তাদের অধিকাংশই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করে এমতাবস্থায় যে, তারা মুশরিক”। [সূরা ইউসুফ:১০৬]
অর্থাৎ তাদের অধিকাংশই আল্লাহকে রব তথা প্রভু, সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, পরিচালক হিসাবে স্বীকার করে। আর এসবই হচ্ছে তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ-এর অর্ন্তগত, কিন্তু এ সত্ত্বেও তারা তাঁর সাথে মূর্তি ও প্রতিমা প্রভৃতির ইবাদাত করার মাধ্যমে ইবাদাতে শির্ক করে থাকে, যা তাদের কোন উপকার বা অপকার কোনটাই করে না এবং তাদেরকে কোন কিছু প্রদানও করে না, প্রদান করা থেকে বাধাও দেয় না। তাফসীরকারক সাহাবী ও তাবেয়ীগণ আয়াতের এ তাফসীরই করেছেন।
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ 'তাদের ঈমান হলো এমন যে, যখন তাদেরকে বলা হয়ঃ কে আসমান সৃষ্টি করেছেন, কে যমীন সৃষ্টি করেছেন, কে পর্বতমালা সৃষ্টি করেছেন? তখন তারা বলেঃ আল্লাহ, অথচ তারা মুশরিক'।
ইকরিমা বলেনঃ 'আপনি যদি তাদেরকে প্রশ্ন করেন যে, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং কে আসমান সমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন? তবে তারা বলবেঃ আল্লাহ। এটাই হলো আল্লাহর প্রতি তাদের ঈমান, অথচ তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর ইবাদাত করে থাকে'।
মুজাহিদ বলেনঃ 'তাদের ঈমান হলো একথা বলা যে, আল্লাহ আমাদের স্রষ্টা, এবং তিনি আমাদের রিযিক দান করেন এবং মৃত্যু দান করেন। এটাই হলো গায়রুল্লাহর ইবাদাতের মাধ্যমে শির্ক করার পাশাপাশি তাদের ঈমানের স্বরূপ'।
আবদুর রাহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম ইবনে যায়েদ বলেনঃ 'যে ব্যক্তিই আল্লাহর সাথে অন্যের ইবাদাত করে সেই আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এবং জানে যে, আল্লাহ তার রব, এবং আল্লাহ তার স্রষ্টা ও রিযিকদাতা। অথচ সে আল্লাহর সাথে শির্ক করে। আপনি কি দেখেননি ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম কিরূপ বলেছেন:
قَالَ أَفَرَيْتُم مَّا كُنتُمْ تَعْبُدُونَ * أَنتُمْ وَآبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُونَ * فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لِّي إِلَّا رَبَّ الْعَالَمِينَ (الشعراء: ٧٥-٧٧)
"তিনি (ইব্রাহীম) বললেনঃ তোমরা কি ভেবে দেখেছ, কিসের ইবাদাত তোমরা করে আসছ - তোমরা এবং তোমাদের পূর্ববর্তী বাপদাদাগণ, নিশ্চয়ই সারা বিশ্বের প্রতিপালক ব্যতীত এরা সবাই আমার শত্রু”। [সূরা আশ-শু'আরাঃ৭৫-৭৭]
এ অর্থে সালফে সালেহীন¹ থেকে বহু বক্তব্য রয়েছে। বরং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে মুশরিকগণ আল্লাহকে রব, স্রষ্টা, রিযিকদাতা, ও (সবকিছুর) পরিচালক হিসাবে স্বীকার করত। আর আল্লাহর সাথে তারা যে শির্ক করত তা ছিলো ইবাদাতের ক্ষেত্রে। কেননা তারা (আল্লাহর) এমন সব সমকক্ষ ও শরীক স্থির করেছিলো যাদেরকে তারা আহবান করত, তাদের কাছে সাহায্য চাইত এবং তাদের কাছে নিজেদের প্রয়োজন, চাহিদা ও দাবী দাওয়া পেশ করত।
কুরআন কারীম বহু জায়গায় আল্লাহর সাথে ইবাদাতে শরীক করার পাশাপাশি আল্লাহর রুবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বের প্রতি মুশরিকদের স্বীকৃতির কথা বর্ণনা করেছে। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর বাণীঃ
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَيَقُولُنَّ اللهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ (العنكبوت: ٦١)
"আর যদি আপনি তাদেরকে প্রশ্ন করেন, কে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, সূর্য ও চন্দ্র কে নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিয়েছেন? তবে তারা অবশ্যই বলবেঃ 'আল্লাহ'। তাহলে কিভাবে তারা ফিরে যাচ্ছে?”। [সূরা আল-আনকাবৃতঃ৬১]
এবং আল্লাহর বাণীঃ
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ مَنْ نَزَّلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ مِنْ بَعْدِ مَوْتِهَا لَيَقُولُنَّ اللَّهُ قُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ (العنكبوت: ٦٣)
"আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, তারপর মরে যাওয়ার পরে তার দ্বারা যমীনকে জীবিত করেন? তবে তারা অবশ্যই বলবে, 'আল্লাহ'। বলুন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই। বরং তাদের অধিকাংশই বোঝে না”। [সূরা আল-আনকাবূতঃ৬৩]
এবং আল্লাহর বাণীঃ
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَهُمْ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ ﴾ (الزخرف: ۸۷).
"আর যদি আপনি তাদেরকে প্রশ্ন করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তবে অবশ্যই তারা বলবে, 'আল্লাহ'। তারপর কিভাবে তারা ফিরে যাচ্ছে?” [সূরা আয- যুখরুফঃ৮৭]
অনুরূপভাবে আল্লাহর বাণীঃ
قُلْ لِمَنِ الْأَرْضُ وَمَنْ فِيهَا إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ * سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ * قُلْ مَنْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ * سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ * قُلْ مَنْ بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيْهِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ * سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ فَأَنَّى تُسْحَرُونَ ﴾ (المؤمنون: ٨٤-٨٩).
"বলুনঃ যমীন এবং এতে যা কিছু আছে এ গুলো (র মালিকানা) কার? যদি তোমরা জান (তবে বল)। অবশ্যই তারা বলবেঃ 'আল্লাহর'। বলুন, তবুও তোমরা কি শিক্ষা গ্রহণ করবে না?। বলুন, সাত আসমান ও মহা-আরশের রব কে?
অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ। বলুন, তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না?। বলুন, কার হাতে সমস্ত বস্তুর কর্তৃত্ব? যিনি আশ্রয় প্রদান করেন অথচ তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কাউকে আশ্রয় দিতে পারে না, যদি তোমরা জান (তবে বল)। অবশ্যই তারা বলবে, 'আল্লাহ'। বলুন, তাহলে কোথা থেকে তোমাদেরকে যাদু করা হচ্ছে?”। [সূরা আল-মু'মিনূনঃ ৮৪-৮৯]
সুতরাং মুশরিকগণ এটা বিশ্বাস করতো না যে, মূর্তিসমূহই বৃষ্টি বর্ষণ করে, জগতবাসীকে রিযিক দান করে এবং জগতের সবকিছু পরিচালিত করে। বরং তারা বিশ্বাস করতো যে, এগুলো মহান প্রভু আল্লাহরই বৈশিষ্ট্য। তারা স্বীকার করতো যে, আল্লাহ ব্যতীত যে সকল মূর্তিকে তারা আহবান করে সে গুলোও সৃষ্টবস্তু - যারা স্বয়ং নিজেদের জন্য এবং নিজেদের উপসনাকারীদের জন্যও কোন প্রকার ক্ষতি বা কল্যাণ সাধনের, মৃত্যু ও জীবন দেয়ার এবং পুণরুজ্জীবিত করার ক্ষমতা রাখে না। তারা শোনে না, দেখে না। তারা আরও স্বীকার করতো যে, আল্লাহই এ সব বৈশিষ্ট্যের একক অধিকারী, যাতে তার কোন শরীক নেই। এ সব বৈশিষ্ট্যের না কোন কিছু তাদের আছে, না আছে তাদের উপাস্য মূর্তিগুলোর। আর মহান আল্লাহই স্রষ্টা, তিনি ছাড়া আর সব কিছু সৃষ্ট, তিনিই রব (প্রভু), অন্য সবকিছু তাঁর প্রভুত্বের অধীন। অবশ্য তারা সৃষ্ট জগতের কতেককে আল্লাহর শরীক ও মাধ্যম সাব্যস্ত করেছে- যারা তাদের ধারণানুযায়ী আল্লাহর কাছে তাদের জন্য সুপারিশ করবে এবং তাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেবে। এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمُ الا ليُقربونا إلى الله زلفى (الزمر : ٣).
"আর যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্যদেরকে অলী-অভিভাবকরূপে গ্রহণ করেছে তারা বলে, আমরা তো এ জন্যই তাদের উপাসনা করে থাকি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেবে”। [সূরা আয-যুমারঃ৩]।
অর্থাৎ তাদেরকে সাহায্য করায়, রিযিক প্রদানে ও দুনিয়ার অন্যান্য ব্যাপারে এসব অলী-আউলিয়াগণ আল্লাহর কাছে তাদের জন্য শাফা'আত করবে।
আল্লাহর রুবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বের প্রতি মুশরিকদের এ সাধারণ স্বীকৃতি সত্ত্বেও তারা ইসলামে দাখিল হয়নি। বরং তাদের ব্যাপারে আল্লাহর হুকুম হলো- তারা মুশরিক ও কাফির। আল্লাহ তাদেরকে জাহান্নামের ও এতে চিরস্থায়ী ভাবে থাকার ভয় দেখিয়েছেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের জান-মাল মুসলমানদের জন্য হালাল করে দিয়েছেন, কেননা তারা তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ-এর অপরিহার্য পরিপূরক তথা তাওহীদুল ইবাদাতকে প্রতিষ্ঠিত করেননি।
এতে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বে একত্ববাদের অপরিহার্য পরিপূরক তাওহীদুল ইবাদাত (ইবাদাতে একত্ববাদ)কে প্রতিষ্ঠিত না করে শুধুমাত্র প্রভুত্বে একত্ববাদের প্রতি স্বীকৃতি জ্ঞাপন যথেষ্ট নয় এবং তা আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তিও প্রদান করবে না। বরং সে স্বীকৃতি মানবজাতির উপর এমন একটি দলীল- যার দাবী হল দ্বীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করে নেয়া, যার কোন শরীক নেই এবং যা ইবাদাতকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদন করাকে অপরিহার্য্য করে দেয়।
টিকাঃ
¹ সলফে সালেহীন দ্বারা বুঝায়ঃ সাহাবাদের, এবং সঠিকভাবে তাদের অনুসারী তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীন ও ইমামগণকে- অনুবাদক।
ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ তাওহীদের তিন প্রকারের একটি প্রকার। এজন্যই কোন ব্যক্তির ঈমান তখনই বিশুদ্ধ হতে পারে এবং তাওহীদের প্রতি তার স্বীকৃতি দানও তখনই গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে যখন সে রুবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বে আল্লাহর তাওহীদের স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু এ প্রকার তাওহীদের স্বীকৃতি দানই রাসূলগণকে প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য নয়। আর শুধুমাত্র এ প্রকার তাওহীদই আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তি দেয় না, যতক্ষণ বান্দা এর অপরিহার্য পরিপূরক বলে বিবেচিত তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ তথা ইবাদাতে একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা না করে।
আর তাই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللهِ إِلا وَهُم مُشْرِكُونَ (يوسف : ١٠٦)
"আর তাদের অধিকাংশই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করে এমতাবস্থায় যে, তারা মুশরিক”। [সূরা ইউসুফ:১০৬]
অর্থাৎ তাদের অধিকাংশই আল্লাহকে রব তথা প্রভু, সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, পরিচালক হিসাবে স্বীকার করে। আর এসবই হচ্ছে তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ-এর অর্ন্তগত, কিন্তু এ সত্ত্বেও তারা তাঁর সাথে মূর্তি ও প্রতিমা প্রভৃতির ইবাদাত করার মাধ্যমে ইবাদাতে শির্ক করে থাকে, যা তাদের কোন উপকার বা অপকার কোনটাই করে না এবং তাদেরকে কোন কিছু প্রদানও করে না, প্রদান করা থেকে বাধাও দেয় না। তাফসীরকারক সাহাবী ও তাবেয়ীগণ আয়াতের এ তাফসীরই করেছেন।
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ 'তাদের ঈমান হলো এমন যে, যখন তাদেরকে বলা হয়ঃ কে আসমান সৃষ্টি করেছেন, কে যমীন সৃষ্টি করেছেন, কে পর্বতমালা সৃষ্টি করেছেন? তখন তারা বলেঃ আল্লাহ, অথচ তারা মুশরিক'।
ইকরিমা বলেনঃ 'আপনি যদি তাদেরকে প্রশ্ন করেন যে, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং কে আসমান সমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন? তবে তারা বলবেঃ আল্লাহ। এটাই হলো আল্লাহর প্রতি তাদের ঈমান, অথচ তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর ইবাদাত করে থাকে'।
মুজাহিদ বলেনঃ 'তাদের ঈমান হলো একথা বলা যে, আল্লাহ আমাদের স্রষ্টা, এবং তিনি আমাদের রিযিক দান করেন এবং মৃত্যু দান করেন। এটাই হলো গায়রুল্লাহর ইবাদাতের মাধ্যমে শির্ক করার পাশাপাশি তাদের ঈমানের স্বরূপ'।
আবদুর রাহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলাম ইবনে যায়েদ বলেনঃ 'যে ব্যক্তিই আল্লাহর সাথে অন্যের ইবাদাত করে সেই আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এবং জানে যে, আল্লাহ তার রব, এবং আল্লাহ তার স্রষ্টা ও রিযিকদাতা। অথচ সে আল্লাহর সাথে শির্ক করে। আপনি কি দেখেননি ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম কিরূপ বলেছেন:
قَالَ أَفَرَيْتُم مَّا كُنتُمْ تَعْبُدُونَ * أَنتُمْ وَآبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُونَ * فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لِّي إِلَّا رَبَّ الْعَالَمِينَ (الشعراء: ٧٥-٧٧)
"তিনি (ইব্রাহীম) বললেনঃ তোমরা কি ভেবে দেখেছ, কিসের ইবাদাত তোমরা করে আসছ - তোমরা এবং তোমাদের পূর্ববর্তী বাপদাদাগণ, নিশ্চয়ই সারা বিশ্বের প্রতিপালক ব্যতীত এরা সবাই আমার শত্রু”। [সূরা আশ-শু'আরাঃ৭৫-৭৭]
এ অর্থে সালফে সালেহীন¹ থেকে বহু বক্তব্য রয়েছে। বরং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে মুশরিকগণ আল্লাহকে রব, স্রষ্টা, রিযিকদাতা, ও (সবকিছুর) পরিচালক হিসাবে স্বীকার করত। আর আল্লাহর সাথে তারা যে শির্ক করত তা ছিলো ইবাদাতের ক্ষেত্রে। কেননা তারা (আল্লাহর) এমন সব সমকক্ষ ও শরীক স্থির করেছিলো যাদেরকে তারা আহবান করত, তাদের কাছে সাহায্য চাইত এবং তাদের কাছে নিজেদের প্রয়োজন, চাহিদা ও দাবী দাওয়া পেশ করত।
কুরআন কারীম বহু জায়গায় আল্লাহর সাথে ইবাদাতে শরীক করার পাশাপাশি আল্লাহর রুবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বের প্রতি মুশরিকদের স্বীকৃতির কথা বর্ণনা করেছে। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর বাণীঃ
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لَيَقُولُنَّ اللهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ (العنكبوت: ٦١)
"আর যদি আপনি তাদেরকে প্রশ্ন করেন, কে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, সূর্য ও চন্দ্র কে নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিয়েছেন? তবে তারা অবশ্যই বলবেঃ 'আল্লাহ'। তাহলে কিভাবে তারা ফিরে যাচ্ছে?”। [সূরা আল-আনকাবৃতঃ৬১]
এবং আল্লাহর বাণীঃ
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ مَنْ نَزَّلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ مِنْ بَعْدِ مَوْتِهَا لَيَقُولُنَّ اللَّهُ قُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ (العنكبوت: ٦٣)
"আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, তারপর মরে যাওয়ার পরে তার দ্বারা যমীনকে জীবিত করেন? তবে তারা অবশ্যই বলবে, 'আল্লাহ'। বলুন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই। বরং তাদের অধিকাংশই বোঝে না”। [সূরা আল-আনকাবূতঃ৬৩]
এবং আল্লাহর বাণীঃ
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَهُمْ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ فَأَنَّى يُؤْفَكُونَ ﴾ (الزخرف: ۸۷).
"আর যদি আপনি তাদেরকে প্রশ্ন করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তবে অবশ্যই তারা বলবে, 'আল্লাহ'। তারপর কিভাবে তারা ফিরে যাচ্ছে?” [সূরা আয- যুখরুফঃ৮৭]
অনুরূপভাবে আল্লাহর বাণীঃ
قُلْ لِمَنِ الْأَرْضُ وَمَنْ فِيهَا إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ * سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ * قُلْ مَنْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ * سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ * قُلْ مَنْ بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيْهِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ * سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ فَأَنَّى تُسْحَرُونَ ﴾ (المؤمنون: ٨٤-٨٩).
"বলুনঃ যমীন এবং এতে যা কিছু আছে এ গুলো (র মালিকানা) কার? যদি তোমরা জান (তবে বল)। অবশ্যই তারা বলবেঃ 'আল্লাহর'। বলুন, তবুও তোমরা কি শিক্ষা গ্রহণ করবে না?। বলুন, সাত আসমান ও মহা-আরশের রব কে?
অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ। বলুন, তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না?। বলুন, কার হাতে সমস্ত বস্তুর কর্তৃত্ব? যিনি আশ্রয় প্রদান করেন অথচ তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কাউকে আশ্রয় দিতে পারে না, যদি তোমরা জান (তবে বল)। অবশ্যই তারা বলবে, 'আল্লাহ'। বলুন, তাহলে কোথা থেকে তোমাদেরকে যাদু করা হচ্ছে?”। [সূরা আল-মু'মিনূনঃ ৮৪-৮৯]
সুতরাং মুশরিকগণ এটা বিশ্বাস করতো না যে, মূর্তিসমূহই বৃষ্টি বর্ষণ করে, জগতবাসীকে রিযিক দান করে এবং জগতের সবকিছু পরিচালিত করে। বরং তারা বিশ্বাস করতো যে, এগুলো মহান প্রভু আল্লাহরই বৈশিষ্ট্য। তারা স্বীকার করতো যে, আল্লাহ ব্যতীত যে সকল মূর্তিকে তারা আহবান করে সে গুলোও সৃষ্টবস্তু - যারা স্বয়ং নিজেদের জন্য এবং নিজেদের উপসনাকারীদের জন্যও কোন প্রকার ক্ষতি বা কল্যাণ সাধনের, মৃত্যু ও জীবন দেয়ার এবং পুণরুজ্জীবিত করার ক্ষমতা রাখে না। তারা শোনে না, দেখে না। তারা আরও স্বীকার করতো যে, আল্লাহই এ সব বৈশিষ্ট্যের একক অধিকারী, যাতে তার কোন শরীক নেই। এ সব বৈশিষ্ট্যের না কোন কিছু তাদের আছে, না আছে তাদের উপাস্য মূর্তিগুলোর। আর মহান আল্লাহই স্রষ্টা, তিনি ছাড়া আর সব কিছু সৃষ্ট, তিনিই রব (প্রভু), অন্য সবকিছু তাঁর প্রভুত্বের অধীন। অবশ্য তারা সৃষ্ট জগতের কতেককে আল্লাহর শরীক ও মাধ্যম সাব্যস্ত করেছে- যারা তাদের ধারণানুযায়ী আল্লাহর কাছে তাদের জন্য সুপারিশ করবে এবং তাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেবে। এ জন্যই আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمُ الا ليُقربونا إلى الله زلفى (الزمر : ٣).
"আর যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্যদেরকে অলী-অভিভাবকরূপে গ্রহণ করেছে তারা বলে, আমরা তো এ জন্যই তাদের উপাসনা করে থাকি যে, এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেবে”। [সূরা আয-যুমারঃ৩]।
অর্থাৎ তাদেরকে সাহায্য করায়, রিযিক প্রদানে ও দুনিয়ার অন্যান্য ব্যাপারে এসব অলী-আউলিয়াগণ আল্লাহর কাছে তাদের জন্য শাফা'আত করবে।
আল্লাহর রুবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বের প্রতি মুশরিকদের এ সাধারণ স্বীকৃতি সত্ত্বেও তারা ইসলামে দাখিল হয়নি। বরং তাদের ব্যাপারে আল্লাহর হুকুম হলো- তারা মুশরিক ও কাফির। আল্লাহ তাদেরকে জাহান্নামের ও এতে চিরস্থায়ী ভাবে থাকার ভয় দেখিয়েছেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের জান-মাল মুসলমানদের জন্য হালাল করে দিয়েছেন, কেননা তারা তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ-এর অপরিহার্য পরিপূরক তথা তাওহীদুল ইবাদাতকে প্রতিষ্ঠিত করেননি।
এতে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বে একত্ববাদের অপরিহার্য পরিপূরক তাওহীদুল ইবাদাত (ইবাদাতে একত্ববাদ)কে প্রতিষ্ঠিত না করে শুধুমাত্র প্রভুত্বে একত্ববাদের প্রতি স্বীকৃতি জ্ঞাপন যথেষ্ট নয় এবং তা আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তিও প্রদান করবে না। বরং সে স্বীকৃতি মানবজাতির উপর এমন একটি দলীল- যার দাবী হল দ্বীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করে নেয়া, যার কোন শরীক নেই এবং যা ইবাদাতকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদন করাকে অপরিহার্য্য করে দেয়।
টিকাঃ
¹ সলফে সালেহীন দ্বারা বুঝায়ঃ সাহাবাদের, এবং সঠিকভাবে তাদের অনুসারী তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীন ও ইমামগণকে- অনুবাদক。
📄 তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বে একত্ববাদের ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হওয়ার ধরন
যদিও প্রভুত্বে একত্ববাদের ব্যাপারটি মানবস্বভাবে প্রোথিত রয়েছে, মানবাত্মা স্বভাবগতভাবেই তার স্বীকৃতি দিচ্ছে, আর তা সাব্যস্তকরণে ভুরি ভুরি দলীল-প্রমাণও রয়েছে, তবুও মানুষের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যাদের ভেতর এ বিষয়ে বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিচ্যুতির ধরনসমূহ নিম্নলিখিতভাবে পেশ করা যেতে পারেঃ
১. আল্লাহর প্রভুত্বকে একেবারেই অস্বীকার করা এবং তাঁর অস্তিত্বকেও স্বীকার না করা। এরূপ বিশ্বাস পোষণ করে থাকে ঐ সকল নাস্তিকগণ যারা এ সৃষ্টজগতের সৃষ্টির কাজকে প্রকৃতি কিংবা দিবস-রজনীর আবর্তন কিংবা অনুরূপ কোন কিছুর প্রতি সম্পর্কিত করে থাকে। আল-কুরআনে বলা হয়েছেঃ
وَقَالُوا مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ (الجاثية : ٢٤)
“তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবন ছাড়া অন্য কোন জীবন নেই। আমরা মরি ও বাঁচি। শুধু কালই আমাদেরকে ধ্বংস করে”। [সূরা আল-জাসিয়াহঃ ২৪]
২. মহান প্রভু (আল্লাহ)র কোন কোন বৈশিষ্ট্য ও প্রভুত্বের কোন কোন গুণাবলীকে অস্বীকার করা। যেমন মৃত্যুদান করা কিংবা মৃত্যুর পর জীবিত করা অথবা উপকার কিংবা অপকার করা বা তদ্রূপ কোন কাজের উপর আল্লাহর ক্ষমতাকে যদি কেউ অস্বীকার করে।
৩. আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্য কারো জন্য রুবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বের বৈশিষ্ট্যসমূহের কোন কিছু স্থির করা। সুতরাং যে ব্যক্তি সৃষ্টি করা, বিলীন করা, জীবিত করা, মৃত্যুদান করা, কল্যাণ সাধন করা ও অকল্যাণ দূর করা ইত্যাদিসহ রুবুবিয়্যাহ-এর আরো যে সকল গুণাবলী জগত পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্ট রয়েছে, সেগুলোর কোন একটির ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে আরো কোন পরিচালনাকারীর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে, সে হবে মহান আল্লাহর সাথে শির্ক স্থাপনকারী।
যদিও প্রভুত্বে একত্ববাদের ব্যাপারটি মানবস্বভাবে প্রোথিত রয়েছে, মানবাত্মা স্বভাবগতভাবেই তার স্বীকৃতি দিচ্ছে, আর তা সাব্যস্তকরণে ভুরি ভুরি দলীল-প্রমাণও রয়েছে, তবুও মানুষের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যাদের ভেতর এ বিষয়ে বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিচ্যুতির ধরনসমূহ নিম্নলিখিতভাবে পেশ করা যেতে পারেঃ
১. আল্লাহর প্রভুত্বকে একেবারেই অস্বীকার করা এবং তাঁর অস্তিত্বকেও স্বীকার না করা। এরূপ বিশ্বাস পোষণ করে থাকে ঐ সকল নাস্তিকগণ যারা এ সৃষ্টজগতের সৃষ্টির কাজকে প্রকৃতি কিংবা দিবস-রজনীর আবর্তন কিংবা অনুরূপ কোন কিছুর প্রতি সম্পর্কিত করে থাকে। আল-কুরআনে বলা হয়েছেঃ
وَقَالُوا مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ (الجاثية : ٢٤)
“তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবন ছাড়া অন্য কোন জীবন নেই। আমরা মরি ও বাঁচি। শুধু কালই আমাদেরকে ধ্বংস করে”। [সূরা আল-জাসিয়াহঃ ২৪]
২. মহান প্রভু (আল্লাহ)র কোন কোন বৈশিষ্ট্য ও প্রভুত্বের কোন কোন গুণাবলীকে অস্বীকার করা। যেমন মৃত্যুদান করা কিংবা মৃত্যুর পর জীবিত করা অথবা উপকার কিংবা অপকার করা বা তদ্রূপ কোন কাজের উপর আল্লাহর ক্ষমতাকে যদি কেউ অস্বীকার করে।
৩. আল্লাহ তা'আলা ছাড়া অন্য কারো জন্য রুবুবিয়্যাহ তথা প্রভুত্বের বৈশিষ্ট্যসমূহের কোন কিছু স্থির করা। সুতরাং যে ব্যক্তি সৃষ্টি করা, বিলীন করা, জীবিত করা, মৃত্যুদান করা, কল্যাণ সাধন করা ও অকল্যাণ দূর করা ইত্যাদিসহ রুবুবিয়্যাহ-এর আরো যে সকল গুণাবলী জগত পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্ট রয়েছে, সেগুলোর কোন একটির ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে আরো কোন পরিচালনাকারীর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে, সে হবে মহান আল্লাহর সাথে শির্ক স্থাপনকারী।