📄 প্রাথমিক কথা
প্রত্যেক মুসলিমের কাছেই ঈমানের গুরুত্ব ও মর্যাদা, এবং দুনিয়া ও আখেরাতে মু'মিন ব্যক্তির উপর এর বহু উপকারিতা ও সুফল কি তা গোপন নয়। বরং দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কল্যাণ ঈমান বিশুদ্ধ হওয়ার উপর নির্ভরশীল। এটাই হল সবচেয়ে মহান ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য এবং মর্যাদাপূর্ণ লক্ষ্য। আর এর দ্বারাই বান্দা পবিত্র ও সুখী জীবন লাভ করবে, কষ্টদায়ক বস্তু, অনিষ্টতা ও যাবতীয় বিপদাপদ থেকে নাজাত পাবে এবং আখিরাতে সওয়াব, চিরস্থায়ী সুখ-শান্তি ও অনন্ত কল্যাণ লাভ করবে- যা কখনো বাধাগ্রস্ত হবেনা এবং দূরীভূত হবে না।
আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ
﴿مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُواْ يَعْمَلُونَ ﴾ (النحل : ٩٧)
"নর ও নারী যে কেউই ঈমানদার হয়ে সৎকাজ করে তাকে আমরা অবশ্যই পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদের উত্তম কাজ সমূহের বিনিময়ে তাদেরকে তাদের প্রতিদান দিব”। [সূরা আন-নাহলঃ৯৭]
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেনঃ
﴿وَمَنْ أَرَادَ الآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ كَانَ سَعْيُهُم مَّشْكُورًا ﴾ (الإسراء: ١٩)
"আর যারা ঈমানদার হয়ে আখিরাত চায় এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে তাদের প্রচেষ্টাই সাদরে স্বীকৃত হবে"। [সূরা আল-ইস্রাঃ১৯]
তিনি আরো বলেনঃ
﴿وَمَنْ يَأْتِهِ مُؤْمِنًا قَدْ عَمِلَ الصَّالِحَاتِ فَأُولَئِكَ لَهُمُ الدَّرَجَاتُ الْعُلَى (طه: ٧٥).
"আর নিশ্চয়ই যারা তাঁর কাছে সৎকর্ম করে মু'মিন অবস্থায় আসে তাদের জন্যই রয়েছে উচ্চতম মর্যাদা”। [সূরা ত্বা-হাঃ৭৫]
আল্লাহ আরো বলেনঃ
﴿إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا * خَالِدِينَ فِيهَا لَا يَعْبُون عَنْهَا حِوَلًا (الكهف : ١٠٧-١٠٨)
“নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদের আতিথেয়তার জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফিরদাউস, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে, সেখান থেকে তারা স্থানান্তরিত হতে চাইবে না”। [সূরা আল-কাহাফঃ ১০৭-১০৮]
এ অর্থে পবিত্র কুরআনে আরো বহু আয়াত রয়েছে।
কুরআন ও হাদীসের বহু দলীল দ্বারা প্রমাণিত যে, ঈমান ছয়টি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। সে গুলো হচ্ছেঃ আল্লাহর উপর ঈমান, তাঁর ফিরিস্তাদের উপর ঈমান, তাঁর গ্রন্থসমূহের উপর ঈমান, তাঁর রাসূলগণের উপর ঈমান, আখিরাতের উপর ঈমান ও তাকদীরের ভাল মন্দের উপর ঈমান। কুরআন কারীম ও সুন্নাতে নববীর বহু স্থানে এ মূলনীতিগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, তম্মধ্যেঃ
আল্লাহ তা'আলার বাণী:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنْزَلَ مِنْ قَبْلُ وَمَنْ يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا (النساء: ١٣٦)
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি, এবং সে গ্রন্থের প্রতি যা আল্লাহ তাঁর রাসূলের উপর অবতীর্ণ করেছেন ও সে গ্রন্থের প্রতিও যা তার পূর্বে তিনি নাযিল করেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফিরিশ্তাগণ, তাঁর গ্রন্থসমূহ, তাঁর রাসূলগণ ও শেষ দিবসের প্রতি কুফরী করে সে সুদূর বিভ্রান্তিতে পতিত হলো”। [সূরা আন-নিসাঃ ১৩৬]
আল্লাহর বাণীঃ
لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَ الْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ (البقرة : ١٧٧)
“সৎকর্ম শুধু এ নয় যে, পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমরা তোমাদের মুখ ফিরাবে, বরং প্রকৃত সৎকাজ হলো ঐ ব্যক্তির কাজ যে আল্লাহর প্রতি, শেষ দিবসের প্রতি, ফিরিস্তাগণের প্রতি এবং কিতাবসমূহ ও নবীগণের প্রতি ঈমান এনেছে”। [সূরা আল-বাকারাহঃ ১৭৭]
আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ
﴿آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلُّ أَمَنَ بِاللَّهِ وَمَلائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ﴾ (البقرة : ٢٨٥)
"রাসূল ঈমান এনেছেন ঐ জিনিসের প্রতি যা তাঁর প্রভুর পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ করা হয়েছে আর মু'মিনগণও, সবাই ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিস্তাগণের প্রতি, এবং তাঁর গ্রন্থসমূহ ও রাসূলগণের প্রতি, (তারা বলে) আমরা তাঁর কোন রাসূলের মধ্যে তারতম্য করিনা। আর তারা বলেঃ আমরা শুনেছি ও মেনে নিয়েছি, হে আমাদের রব! আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করি, আর আপনার কাছেই প্রত্যাবর্তন স্থল”। [সূরা আল-বাকারাহঃ২৮৫]
আল্লাহর বাণীঃ
﴿إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَهُ بِقَدَرٍ﴾ (القمر: ٤٩)
"নিশ্চয়ই আমরা প্রতিটি বস্তুকেই নির্ধারিত পরিমাপে সৃষ্টি করেছি”। [সূরা আল-কামারঃ৪৯]
সহীহ মুসলিমে উমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যা 'হাদীসে জিবরীল' নামে বিখ্যাত, তাতে রয়েছেঃ জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে জানতে চেয়ে বলেন যে, আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবহিত করুন, তিনি বললেনঃ
«أَنْ تُؤْمِنَ بِاللهِ، وَمَلائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّه»
"আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশতাগণের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমূহের প্রতি, তাঁর রাসূলগণ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনা, আর তাকদীরের ভাল ও মন্দের প্রতি ঈমান আনা"।
ঈমান এ মহান ছয়টি মূলনীতির উপর স্থাপিত। বরং এগুলোর প্রতি ঈমান আনয়ন করা ছাড়া কারো ঈমানের অস্তিত্বই থাকতে পারে না। এগুলো এমন মূলনীতি যা পরস্পর ওৎপ্রোতভাবে জড়িত ও একটির জন্য অন্যটি অপরিহার্য, একটি থেকে অন্যটি কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না। সুতরাং এগুলোর কোন একটির প্রতি ঈমান আনয়ন করা অন্য মূলনীতিগুলোর উপর ঈমান আনাকে অপরিহার্য করে। আর এগুলোর কোন একটি অস্বীকার করা অন্যগুলোকে অস্বীকার করার শামিল।
আর এজন্যই প্রত্যেক মুসলিমের উপর এ মূলনীতিগুলো শেখা, শিক্ষা দেয়া এবং বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে সবিশেষ গুরুত্বারোপ করা জরুরী।
নীচে এ মূলনীতিগুলো থেকে প্রথম মূলনীতি তথা আল্লাহর উপর ঈমানের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বর্ণনা করা হলো।
টিকাঃ
'সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১)