📄 শেষকৃত্য-জানাজা ও দাফন
অতঃপর জুবায়ের ইবনে মতিম, হাকিম ইবনে হিজাম (বিবি খাদিজার ভ্রাতুষ্পুত্র, তিনি নবীর 'শেস উপত্যকায়' নির্বাসিত জীবনযাপনকালে তাঁর ও বিবি খাদিজার জন্য গোপনে সেখানে খাদ্য সরবরাহ করিতেন) এবং আরও কতিপয় কোরাইশ নেতা হজরত আলির সহিত পরামর্শ করিয়া খলিফার জানাজার ব্যবস্থা করেন। বিদ্রোহীরা তখনও বিজয়-গর্বে শহরময় ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল। বিষাদাচ্ছন্ন মদিনার বুকে যখন সন্ধ্যার অন্ধকার নামিয়া আসি জুবায়ের, ইমাম হাসান এবং খলিফার কতিপয় আত্মীয়স্বজন জনবিরল এক গলিপথে গোপনে তাঁর মৃতদেহ লইয়া কবরস্থানের দিকে যাত্রা করিলেন। কিন্তু শবের মিছিল যখন কবরস্থান অভিমুখে অগগ্রর হইতেছে তখনও সেই শবাধারের উপর বিদ্রোহীরা প্রস্তর বর্ষণ করি ছাড়ে নাই। এমনই ছিল তাদের জিগাংসা। মৃত্যু যখন তাদের শিকারকে ছিনাইয়া লইয়াছে তখনও তাদের আক্রোশের নিবৃত্তি হয় নাই। যাহা হউক, হজরত আলির বিশেষ চেষ্টার ফলে খলিফার মৃতদেহ কোনও মতে বিদ্রোহীদের আক্রমণ হইতে রক্ষা পায় এবং নগরের বাহিরে 'জান্নাত বাকী'র ময়দানে নীত হয়।
শহরের সাধারণ কবরস্থান এই 'জান্নাত বাকী' আঙিনার ভিতর খলিফাকে দাফন করা সম্ভবপর হয় নাই। পার্শ্ববর্তী এক ফাঁকা জমিতে কোনও মতে দ্রুত ও সংক্ষিপ্ত দোয়াকালাম পাঠের পর মৃতদেহ সমাহিত করা হয়। দুই বৎসর পরে মারওয়ান উক্ত জমিকে 'জান্নাত বাকীর' সহিত জুড়িয়া দেন এবং কবরস্থানে পরিণত করেন। এই ঐতিহাসিক 'জান্নাত বাকী' ওহোদ যুদ্ধের বীর শহীদদান ও ইলামের বহু খ্যাতিমান বীরপুরুষের সমাধিক্ষেত্র। তার সংলগ্ন উক্ত নতুন জমিটিতে উমাইয়ারা ইহার পর দীর্ঘকাল ধরিয়া তাদের মৃত ব্যক্তিদের তাদের শহীদ-জ্ঞাতি হজরত ওসমানের সমাধির আশেপাশে কবর দিয়াছিল। তাদের প্রিয় এই নতুন ক্ষেত্রটিকে তারা 'হান্ত কভ' বা নক্ষত্রের বাগান বলিত। হও.-১২
অতঃপর জুবায়ের ইবনে মতিম, হাকিম ইবনে হিজাম (বিবি খাদিজার ভ্রাতুষ্পুত্র, তিনি নবীর 'শেস উপত্যকায়' নির্বাসিত জীবনযাপনকালে তাঁর ও বিবি খাদিজার জন্য গোপনে সেখানে খাদ্য সরবরাহ করিতেন) এবং আরও কতিপয় কোরাইশ নেতা হজরত আলির সহিত পরামর্শ করিয়া খলিফার জানাজার ব্যবস্থা করেন। বিদ্রোহীরা তখনও বিজয়-গর্বে শহরময় ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল। বিষাদাচ্ছন্ন মদিনার বুকে যখন সন্ধ্যার অন্ধকার নামিয়া আসি জুবায়ের, ইমাম হাসান এবং খলিফার কতিপয় আত্মীয়স্বজন জনবিরল এক গলিপথে গোপনে তাঁর মৃতদেহ লইয়া কবরস্থানের দিকে যাত্রা করিলেন। কিন্তু শবের মিছিল যখন কবরস্থান অভিমুখে অগগ্রর হইতেছে তখনও সেই শবাধারের উপর বিদ্রোহীরা প্রস্তর বর্ষণ করি ছাড়ে নাই। এমনই ছিল তাদের জিগাংসা। মৃত্যু যখন তাদের শিকারকে ছিনাইয়া লইয়াছে তখনও তাদের আক্রোশের নিবৃত্তি হয় নাই। যাহা হউক, হজরত আলির বিশেষ চেষ্টার ফলে খলিফার মৃতদেহ কোনও মতে বিদ্রোহীদের আক্রমণ হইতে রক্ষা পায় এবং নগরের বাহিরে 'জান্নাত বাকী'র ময়দানে নীত হয়।
শহরের সাধারণ কবরস্থান এই 'জান্নাত বাকী' আঙিনার ভিতর খলিফাকে দাফন করা সম্ভবপর হয় নাই। পার্শ্ববর্তী এক ফাঁকা জমিতে কোনও মতে দ্রুত ও সংক্ষিপ্ত দোয়াকালাম পাঠের পর মৃতদেহ সমাহিত করা হয়। দুই বৎসর পরে মারওয়ান উক্ত জমিকে 'জান্নাত বাকীর' সহিত জুড়িয়া দেন এবং কবরস্থানে পরিণত করেন। এই ঐতিহাসিক 'জান্নাত বাকী' ওহোদ যুদ্ধের বীর শহীদদান ও ইলামের বহু খ্যাতিমান বীরপুরুষের সমাধিক্ষেত্র। তার সংলগ্ন উক্ত নতুন জমিটিতে উমাইয়ারা ইহার পর দীর্ঘকাল ধরিয়া তাদের মৃত ব্যক্তিদের তাদের শহীদ-জ্ঞাতি হজরত ওসমানের সমাধির আশেপাশে কবর দিয়াছিল। তাদের প্রিয় এই নতুন ক্ষেত্রটিকে তারা 'হান্ত কভ' বা নক্ষত্রের বাগান বলিত। হও.-১২
📄 হযরত ওসমানের চরিত্র
প্রায় বিরাশি বৎসর বয়সে হজরত ওসমানের জীবন-লীলা দুঃখের ভিতর দিয়া সমাপ্ত হইল। তিনি যখন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখনই তিনি বৃদ্ধ। তথাপি মুসুলম-রাষ্ট্রের কর্ণধার হয়ে জীবনের আরাম-আয়েশ সমস্ত বিসর্জন দেন এবং সর্বতোভাবে জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। জনগণের কল্যাণ-সাধনই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। তাঁর পূর্ববর্তী দুই খলিফার আমলে আরদ্ধ মুসলিম বিজয়স্রোত তাঁর আমলে অব্যাহত থাকে। মুসলিম রাষ্ট্রে অধিকার কোথাও তিনি তিলমাত্র ক্ষুণ্ণ হইতে দেন নাই বরং তার পরিসর বৃদ্ধি করিয়াছেন। কাবুল হইতে মরক্কো পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। ভূমধ্য সাগরে মুসলিম-অধিকার প্রতিষ্ঠা তাঁর এক অমরকীর্তি। কুরআনের যে অবিসংবাদিত পাঠের জন্য মুসলিম জাতি গর্ব করে, তারও মূলে রহিয়াছে এই ধর্মপ্রাণ খলিফার উপচিকীর্যা। কুরআন ছিল তাঁর নিত্যকার সহচর ও প্রিয়পাঠ্য। তাঁর বীর সেনানিরা যখন পৃথিবীর বিভিন্ন রণাঙ্গনে দেশজয় ও আল্লাহ্র মহিমা প্রচারের জন্য যুদ্ধরত, তিনি তখন নীরবে দেশের অভ্যন্তরীণ কল্যাণমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখিতেন। অথচ যুগপৎ বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে রসদ ও সৈন্য-সাহায্য প্রেরণেও তাঁর কোনো দিন শৈথিল্য দেখা যায় নাই। খলিফার অক্ষমতা বা অমনোযোগিতার দরুন কোনও কোনও যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনী গুরুতর অসুবিধায় পড়িয়াছে, এমন কথা তাঁর শত্রুরও কখনও বলিতে পারে নাই। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও চারিতাখ্যায়ক মূ'য়র বলেন, 'দুর্বল ও অব্যবস্থিত চিত্ত হইলেও তাঁর হৃদয়-বৃত্তি ছিল কোমল ও উদার, যার জন্য শান্তির জমানা হইলে তিনি মুসলিম-জাহানে একজন জনপ্রিয় শাসক হিসেবে আদৃত হইতে পারিতেন। বস্তুত তাঁর দ্বাদশ বর্ষব্যাপী শাসন-আমলের প্রথমার্ধে তিনি তাহাই ছিলেন।
কিন্তু তারপরই দুর্দিন ঘনাইয়া আসে তাঁর জীবনে। কোরাইশ ও অকোরাইশ আরব-গোত্রসমূহের ভিতরকার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরব জাতিকে অন্ত বিপ্লব গৃহযুদ্ধের দিকে দ্রুত ঠেলিয়া দেয়। ক্ষমতাসীন কোরাইশ গোত্র যদি তাদের সমগ্র শক্তি একত্রিত করিয়া তাদের বিরুদ্ধ পক্ষের মোকাবিলা করিত, তাহা হইলে এই গৃহযুদ্ধের শোচনীয় পরিণাম হইতে আরব জাতি ও খিলাফত নিরাপদ হইতে পারিত। কিন্তু তাঁর মতের পরিবর্তনশীলতা, শাসন পরিচালনায় স্বার্থ পরায়ণতা এবং স্বজনপ্রীতির ফলে মক্কার অভিজাত শ্রেণির ভিতরই বিভেদ সৃষ্টি হয় এবং গোষ্ঠীকলহের তিক্ততা এমন প্রবল হয়ে উঠে যে, তদ্দরুণ তাদের পুরুষানুক্রমিক প্রতিপত্তি ও ক্ষমতায় সৌধ ভাঙিয়া চুরমার হয়ে যায়। এইভাবে তারা ক্ষমতাসীন থাকার সুবর্ণ সুযোগ হারাইয়া বসে এবং খলিফা আবদুল মালিকের উত্থানের পূর্ব পর্যন্ত নেতৃত্বহীন অবস্থার দরুন গোটা আরব জাতির বিজয়স্রোত রুদ্ধ হয়ে যায়।'
হজরত ওসমানের পারিবারিক জীবনের ইতিহাস খুব সংক্ষিপ্ত, অর্থাৎ সামান্যই পরিজ্ঞাত। তাঁর দুই পত্নী-নবীর দুই কন্যা-নবীর জীবদ্দশায়ই পরলোক গমন করেন। তারপর তিনি অনেকগুলো বিবাহ করেন। তাঁর এইসব পত্নীর মধ্যে বিবি নায়লার নামই ইতিহাসে সুপরিচিত। তাঁর খিলাফতের পঞ্চম সনে, তাঁর বয়স যখন চুয়াত্তর বৎসর এবং আরও তিন স্ত্রী বর্তমান, সেই সময় তিনি নায়লাকে বিবাহ করেন। ইনি পূর্বে খ্রিস্টান ছিলেন কিন্তু খলিফার সহিত বিবাহের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। খলিফার দুর্দিনে এই মহিলা সর্বক্ষণ বিশ্বস্তভাবে তাঁর সঙ্গে ছিলেন এবং তাঁর জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর সকল দুঃখের অংশভাগিনী হয়েছিলেন। খলিফার জীবনে এমন দিন ঘিরিয়া আসিতেছিল, যখন এমনই একজন বিশ্বস্ত সহকারিণীর তাঁর খুবই প্রয়োজন ছিল। তাঁর শাহাদতের সময় মোট কয় পত্নী জীবিত ছিলেন, তাহা জানা যায় না। তবে চারজনের বেশি নয় নিশ্চয়ই; আর তার মধ্যে ছিলেন বিবি নায়লা।
হজরত ওসমানের মোট তেরটি সন্তান ছিল; তন্মধ্যে কেহই বাঁদী-গর্ভজাত ছিলেন না, ইহা তখনকার দিনে আশ্চর্য। হজরত ওসমানের পুত্রদের ভিতর সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ছিলেন আবান। ইনি বনি উমাইয়াদের শাসন-আমল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।
হজরত ওসমানের ব্যক্তিগত চরিত্র ছিল খুবই সুন্দর ও আদর্শ স্থানীয় তিনি ছিলেন একাধারে স্নেহবান পিতা, হৃদয়বান স্বামী এবং উদার অন্তঃকরণ প্রতিবেশী। নবীর দীর্ঘ সাহচর্যের ফলে নবী-চরিত্রের যাবতীয় গুণরাশি তাঁর ভিতর প্রতিফলিত হয়েছিল। তিনি সর্বদা উত্তম পোষাক পরিতেন এবং আতর-গোলাপ লাগাইতেন। কিন্তু তাঁর পরিচ্ছদে বিলাসিতার কোনো চিহ্ন বা এমন শান-শওকাত ছিল না যাতে মনে অহঙ্কার আসে এবং নিজেকে অপরের অপেক্ষ মনে হয়। হজরত উমরের ন্যায় মোটা বস্ত্র তিনি পরতেন না বা পত্নীদের দিতেন না। সাধারণত তিনি তহবন্দ পরিতেন না। শাহাদতের সময় তিনি ইচ্ছা করিয়া পাজামা পরিয়াছিলেন যাহাতে শত্রুদের আক্রমণের মুখে তিনি বে-আবরু না হন। জনৈক প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনা করিয়াছেন, হজরত ওসমান মিম্বরে দাঁড়াইয়া খুৎবা পড়িতেন, তখন তিনি তাঁর পরিধানে তহবন্দ দেখিয়াছেন, আর সে তহবন্দের দাম পাঁচ দেরহামের (এক টাকার) বেশি নয়।
হজরত ওসমানের আকৃতি ও শারীরিক সৌন্দর্যের কথা পূর্বে বলা হয়েছে। তিনি মোটামুটি লেখাপড়া জানিতেন এবং হাফিজে কুরআন ছিলেন। নবীর আমলে তিনি নিজে কুরআন লিখিতেন। এইজন্য সুরাগুলোর 'শানে নযুল' অর্থাৎ কোন সময়ে কোন অবস্থায় কি সুরা নাজেল হয়েছিল, সে সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞান ছিল গভীর এবং নির্ভরযোগ্য।
তিনি অত্যন্ত রুচিবান ছিলেন। মসজিদে নববীর গঠন তিনি সৌন্দর্য মণ্ডিত করেছিলেন। তার পশ্চাতে ও উত্তর-পশ্চিমে তিনি নিজের যে আবাসগৃহ নির্মাণ করেছিলেন, উহাও সৌন্দর্য ও আয়তন মদিনার মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিল। আজ পর্যন্ত সে প্রাসাদ কালের আঘাত সহিয়া বিদ্যমান আছে। 'মোকানে ওসমান' নামে উহা মদিনায় প্রখ্যাত। তার কিছু অংশ পশ্চিমদেশীয় হাজিদের থাকার জন্য নির্ধারিত আছে। উক্ত প্রাসাদে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উহাকে 'দারুল কুতুব ওসমানী' বলা হয়। যতিও মসজিদে নববীর পশ্চাতে গলির ভিতর উহা অবস্থিত, এই বৃহৎ লাইব্রেরি হজরত ওাসমানের স্মৃতি বিতড়িত বলিয়া শতাব্দী ধরিয়া সকল দেশের আগন্তুকদের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করছে।
টিকাঃ
১. নবীর দ্বিতীয় কন্যার গর্ভে একটি মাত্র পুত্র হয়েছিল, সে শৈশবেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। নবীর তৃতীয়া কন্যার গর্ভে কোনও সন্তান হয় নাই। হজরত ওসমানের তৃতীয় পত্নী ফাকতা বেন্তে গিসওয়ানের গর্ভে এক পুত্র জন্মে। তাঁরও শিশুকালে মৃত্যু হয়। তাঁর অপর পত্নী উম্মে উমর ওরফে বেন্তে জ্ঞানদার ছিলেন আমর, খালেদ, আবাদ, ওমর এবং মরিয়ম, এই পাঁচ সন্তানের জননী। অন্যান্য পত্নীর ভিতর ফাতেমা বেন্তে ওলিদের গর্ভে জন্মে দুই সন্তান-ওলিদ ও সাঈদ। উম্মুল বনিইন বেন্তে আয়ী নিয়াহ একটি মাত্র সন্তান আবদুল মালেককে গর্তে ধারণ করেন। কিন্তু সেই শৈশবেই মৃত্যুমুখে পতিত হয় রুমেলা বেন্তে শায়েলার ছিল তিন সন্তান, আ'য়িশা, উম্মে সাবান ও উম্মে ওমরু। সর্বশেষ পত্নী নায়লা বেন্তে আনহার ইবনে আফসাহ ছিলেন এবং সন্তানের মা-বাবার নাম ছিল মরিয়ম বেন্তে ওসমান।
প্রায় বিরাশি বৎসর বয়সে হজরত ওসমানের জীবন-লীলা দুঃখের ভিতর দিয়া সমাপ্ত হইল। তিনি যখন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখনই তিনি বৃদ্ধ। তথাপি মুসুলম-রাষ্ট্রের কর্ণধার হয়ে জীবনের আরাম-আয়েশ সমস্ত বিসর্জন দেন এবং সর্বতোভাবে জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। জনগণের কল্যাণ-সাধনই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। তাঁর পূর্ববর্তী দুই খলিফার আমলে আরদ্ধ মুসলিম বিজয়স্রোত তাঁর আমলে অব্যাহত থাকে। মুসলিম রাষ্ট্রে অধিকার কোথাও তিনি তিলমাত্র ক্ষুণ্ণ হইতে দেন নাই বরং তার পরিসর বৃদ্ধি করিয়াছেন। কাবুল হইতে মরক্কো পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। ভূমধ্য সাগরে মুসলিম-অধিকার প্রতিষ্ঠা তাঁর এক অমরকীর্তি। কুরআনের যে অবিসংবাদিত পাঠের জন্য মুসলিম জাতি গর্ব করে, তারও মূলে রহিয়াছে এই ধর্মপ্রাণ খলিফার উপচিকীর্যা। কুরআন ছিল তাঁর নিত্যকার সহচর ও প্রিয়পাঠ্য। তাঁর বীর সেনানিরা যখন পৃথিবীর বিভিন্ন রণাঙ্গনে দেশজয় ও আল্লাহ্র মহিমা প্রচারের জন্য যুদ্ধরত, তিনি তখন নীরবে দেশের অভ্যন্তরীণ কল্যাণমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখিতেন। অথচ যুগপৎ বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে রসদ ও সৈন্য-সাহায্য প্রেরণেও তাঁর কোনো দিন শৈথিল্য দেখা যায় নাই। খলিফার অক্ষমতা বা অমনোযোগিতার দরুন কোনও কোনও যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনী গুরুতর অসুবিধায় পড়িয়াছে, এমন কথা তাঁর শত্রুরও কখনও বলিতে পারে নাই। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও চারিতাখ্যায়ক মূ'য়র বলেন, 'দুর্বল ও অব্যবস্থিত চিত্ত হইলেও তাঁর হৃদয়-বৃত্তি ছিল কোমল ও উদার, যার জন্য শান্তির জমানা হইলে তিনি মুসলিম-জাহানে একজন জনপ্রিয় শাসক হিসেবে আদৃত হইতে পারিতেন। বস্তুত তাঁর দ্বাদশ বর্ষব্যাপী শাসন-আমলের প্রথমার্ধে তিনি তাহাই ছিলেন।
কিন্তু তারপরই দুর্দিন ঘনাইয়া আসে তাঁর জীবনে। কোরাইশ ও অকোরাইশ আরব-গোত্রসমূহের ভিতরকার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরব জাতিকে অন্ত বিপ্লব গৃহযুদ্ধের দিকে দ্রুত ঠেলিয়া দেয়। ক্ষমতাসীন কোরাইশ গোত্র যদি তাদের সমগ্র শক্তি একত্রিত করিয়া তাদের বিরুদ্ধ পক্ষের মোকাবিলা করিত, তাহা হইলে এই গৃহযুদ্ধের শোচনীয় পরিণাম হইতে আরব জাতি ও খিলাফত নিরাপদ হইতে পারিত। কিন্তু তাঁর মতের পরিবর্তনশীলতা, শাসন পরিচালনায় স্বার্থ পরায়ণতা এবং স্বজনপ্রীতির ফলে মক্কার অভিজাত শ্রেণির ভিতরই বিভেদ সৃষ্টি হয় এবং গোষ্ঠীকলহের তিক্ততা এমন প্রবল হয়ে উঠে যে, তদ্দরুণ তাদের পুরুষানুক্রমিক প্রতিপত্তি ও ক্ষমতায় সৌধ ভাঙিয়া চুরমার হয়ে যায়। এইভাবে তারা ক্ষমতাসীন থাকার সুবর্ণ সুযোগ হারাইয়া বসে এবং খলিফা আবদুল মালিকের উত্থানের পূর্ব পর্যন্ত নেতৃত্বহীন অবস্থার দরুন গোটা আরব জাতির বিজয়স্রোত রুদ্ধ হয়ে যায়।'
হজরত ওসমানের পারিবারিক জীবনের ইতিহাস খুব সংক্ষিপ্ত, অর্থাৎ সামান্যই পরিজ্ঞাত। তাঁর দুই পত্নী-নবীর দুই কন্যা-নবীর জীবদ্দশায়ই পরলোক গমন করেন। তারপর তিনি অনেকগুলো বিবাহ করেন। তাঁর এইসব পত্নীর মধ্যে বিবি নায়লার নামই ইতিহাসে সুপরিচিত। তাঁর খিলাফতের পঞ্চম সনে, তাঁর বয়স যখন চুয়াত্তর বৎসর এবং আরও তিন স্ত্রী বর্তমান, সেই সময় তিনি নায়লাকে বিবাহ করেন। ইনি পূর্বে খ্রিস্টান ছিলেন কিন্তু খলিফার সহিত বিবাহের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। খলিফার দুর্দিনে এই মহিলা সর্বক্ষণ বিশ্বস্তভাবে তাঁর সঙ্গে ছিলেন এবং তাঁর জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর সকল দুঃখের অংশভাগিনী হয়েছিলেন। খলিফার জীবনে এমন দিন ঘিরিয়া আসিতেছিল, যখন এমনই একজন বিশ্বস্ত সহকারিণীর তাঁর খুবই প্রয়োজন ছিল। তাঁর শাহাদতের সময় মোট কয় পত্নী জীবিত ছিলেন, তাহা জানা যায় না। তবে চারজনের বেশি নয় নিশ্চয়ই; আর তার মধ্যে ছিলেন বিবি নায়লা।
হজরত ওসমানের মোট তেরটি সন্তান ছিল; তন্মধ্যে কেহই বাঁদী-গর্ভজাত ছিলেন না, ইহা তখনকার দিনে আশ্চর্য। হজরত ওসমানের পুত্রদের ভিতর সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ছিলেন আবান। ইনি বনি উমাইয়াদের শাসন-আমল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।
হজরত ওসমানের ব্যক্তিগত চরিত্র ছিল খুবই সুন্দর ও আদর্শ স্থানীয় তিনি ছিলেন একাধারে স্নেহবান পিতা, হৃদয়বান স্বামী এবং উদার অন্তঃকরণ প্রতিবেশী। নবীর দীর্ঘ সাহচর্যের ফলে নবী-চরিত্রের যাবতীয় গুণরাশি তাঁর ভিতর প্রতিফলিত হয়েছিল। তিনি সর্বদা উত্তম পোষাক পরিতেন এবং আতর-গোলাপ লাগাইতেন। কিন্তু তাঁর পরিচ্ছদে বিলাসিতার কোনো চিহ্ন বা এমন শান-শওকাত ছিল না যাতে মনে অহঙ্কার আসে এবং নিজেকে অপরের অপেক্ষ মনে হয়। হজরত উমরের ন্যায় মোটা বস্ত্র তিনি পরতেন না বা পত্নীদের দিতেন না। সাধারণত তিনি তহবন্দ পরিতেন না। শাহাদতের সময় তিনি ইচ্ছা করিয়া পাজামা পরিয়াছিলেন যাহাতে শত্রুদের আক্রমণের মুখে তিনি বে-আবরু না হন। জনৈক প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনা করিয়াছেন, হজরত ওসমান মিম্বরে দাঁড়াইয়া খুৎবা পড়িতেন, তখন তিনি তাঁর পরিধানে তহবন্দ দেখিয়াছেন, আর সে তহবন্দের দাম পাঁচ দেরহামের (এক টাকার) বেশি নয়।
হজরত ওসমানের আকৃতি ও শারীরিক সৌন্দর্যের কথা পূর্বে বলা হয়েছে। তিনি মোটামুটি লেখাপড়া জানিতেন এবং হাফিজে কুরআন ছিলেন। নবীর আমলে তিনি নিজে কুরআন লিখিতেন। এইজন্য সুরাগুলোর 'শানে নযুল' অর্থাৎ কোন সময়ে কোন অবস্থায় কি সুরা নাজেল হয়েছিল, সে সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞান ছিল গভীর এবং নির্ভরযোগ্য।
তিনি অত্যন্ত রুচিবান ছিলেন। মসজিদে নববীর গঠন তিনি সৌন্দর্য মণ্ডিত করেছিলেন। তার পশ্চাতে ও উত্তর-পশ্চিমে তিনি নিজের যে আবাসগৃহ নির্মাণ করেছিলেন, উহাও সৌন্দর্য ও আয়তন মদিনার মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিল। আজ পর্যন্ত সে প্রাসাদ কালের আঘাত সহিয়া বিদ্যমান আছে। 'মোকানে ওসমান' নামে উহা মদিনায় প্রখ্যাত। তার কিছু অংশ পশ্চিমদেশীয় হাজিদের থাকার জন্য নির্ধারিত আছে। উক্ত প্রাসাদে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উহাকে 'দারুল কুতুব ওসমানী' বলা হয়। যতিও মসজিদে নববীর পশ্চাতে গলির ভিতর উহা অবস্থিত, এই বৃহৎ লাইব্রেরি হজরত ওাসমানের স্মৃতি বিতড়িত বলিয়া শতাব্দী ধরিয়া সকল দেশের আগন্তুকদের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করছে।
টিকাঃ
১. নবীর দ্বিতীয় কন্যার গর্ভে একটি মাত্র পুত্র হয়েছিল, সে শৈশবেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। নবীর তৃতীয়া কন্যার গর্ভে কোনও সন্তান হয় নাই। হজরত ওসমানের তৃতীয় পত্নী ফাকতা বেন্তে গিসওয়ানের গর্ভে এক পুত্র জন্মে। তাঁরও শিশুকালে মৃত্যু হয়। তাঁর অপর পত্নী উম্মে উমর ওরফে বেন্তে জ্ঞানদার ছিলেন আমর, খালেদ, আবাদ, ওমর এবং মরিয়ম, এই পাঁচ সন্তানের জননী। অন্যান্য পত্নীর ভিতর ফাতেমা বেন্তে ওলিদের গর্ভে জন্মে দুই সন্তান-ওলিদ ও সাঈদ। উম্মুল বনিইন বেন্তে আয়ী নিয়াহ একটি মাত্র সন্তান আবদুল মালেককে গর্তে ধারণ করেন। কিন্তু সেই শৈশবেই মৃত্যুমুখে পতিত হয় রুমেলা বেন্তে শায়েলার ছিল তিন সন্তান, আ'য়িশা, উম্মে সাবান ও উম্মে ওমরু। সর্বশেষ পত্নী নায়লা বেন্তে আনহার ইবনে আফসাহ ছিলেন এবং সন্তানের মা-বাবার নাম ছিল মরিয়ম বেন্তে ওসমান।