📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 দ্বিতীয় পত্র

📄 দ্বিতীয় পত্র


মক্কায় সমবেত হাজিদেরকে খলিফা লিখিলেন, 'দাতা ও দয়ালু আল্লাহ্ রাব্বুল আ'লামিনের নামে শুরু করিতেছি। আল্লাহর বান্দা আমিরুল মুমিনীন ওসমানের পক্ষ হইতে সমবেত মুসলিম ভাইদের প্রতি তস্লিম।
'আমি তোমাদের সামনে সেই আল্লাহর প্রশংসা করিতেছি, যিনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নাই।'
"যিনি আমাদের কল্যাণ দান করিয়াছেন, আমি সেই আল্লাহকে স্মরণ করিবার জন্য তোমাদের বলিতেছি। তিনি তোমাদের ইসলামের শিক্ষা দান করিয়া বিপদ হইতে রক্ষা করিয়াছেন। কুফরির অভিশাপ হইতে মুক্ত করিয়াছেন। তোমাদের বুদ্ধি বিকাশের জন্য নানা নিদর্শনাবলী দিয়াছেন। তিনিই তোমাদের জীবিকার পথ প্রশস্ত করিয়াছেন। সকল শত্রুর উপর জয়যুক্ত করিয়াছেন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রাচুর্য দান করিয়া তোমাদের তিনি পরিপূর্ণ করিয়াছেন। আল্লাহ্ বলেন- 'তোমরা যদি আল্লাহ্র দানসমূহের কথা গণনা করিতে চাও, তবে কখনও তাহা গণনা করিয়া শেষ করিতে পারিবে না। তবুও মানুষ সীমা লঙ্ঘনকারী-অকৃতজ্ঞ। ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে সঠিকভাবে ভয় কর। আর মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করিও না। এবং তোমরা সকলে সমবেতভাবে আল্লাহ্র রজ্জুকে ধারণ কর, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইও না।
'তোমরা আল্লাহর সেই অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর-তোমরা ছিলে পরস্পরের প্রতি শত্রু ভাবাপন্ন। তারপর তিনি তোমাদের সকলের অন্তরে প্রীতি ভালোবাসা সৃষ্টি দিয়াছেন। ফলে তোমরা সকলে ভাই ভাই হয়ে গিয়াছ। বস্তুত তোমরা একটি প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে পরিপূর্ণ একটি গর্তের কিনারায় অবস্থান করিতে ছিলে, আল্লাহ্ তোমাদের সেই বিপদ হইতে রক্ষা করেন। এইভাবেই আল্লাহ্ পাক তোমাদের মুক্তির পথ সন্ধান করার পর খুলিয়া দিয়াছেন।
'তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা সৎকার্যের প্রতি লোকদের আহ্বান করিবে, পুণ্যকর্মে উৎসাহ দিবে এবং অসৎকার্য হইতে লোকদের নিরস্ত করিবে। তারাই পরিণামে সাফল্য লাভ করিবে।
'তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী আসার পর তোমরা তাদের ন্যায় হইও না, যারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝগড়া-বিবাদে নিমগ্ন হয়েছিল, তাদের প্রতি কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রহিয়াছে।
'তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহ্ সেই অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো। আর তোমরা তৎসঙ্গে স্মরণ করো, তোমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলে, আমরা সকল কথা শুনিলাম এবং তাহা মানিয়া লইলাম।
"ইমানদাররা! তোমাদের নিকট যদি কোনও ফাছেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ লইয়া উপস্থিত হয়, তবে তাহা প্রথমে যাচাই করো। যেন সম্প্রদায়ের প্রতি অন্যায়ভাবে ক্রোধান্বিত না হও বা প্রতিশোধ গ্রহণ করিয়া পরিণামে সে জন্য তোমাদের অনুতপ্ত হইতে না হয়। জানিয়া রাখ, তোমাদের অনুতপ্ত হইতে না হয়। জানিয়া রাখ, তোমাদের মধ্যেই আল্লাহ্র রসুল রহিয়াছেন।
'তিনি যদি কোনও কাজে ক্রুদ্ধ হয়ে তোমাদের অনুসরণ করেন, তবে পরিণামে তোমরাই বিপদে পতিত হইবে। আল্লাহ্ তোমাদের অন্তরে ইমান বদ্ধমূল করিয়া দিয়াছেন। তোমাদের অন্তরকে ইমানের সম্পদে সমৃদ্ধ করিয়াছেন। আর কুফরি, নাফরমানি, গোনাহর কাজ প্রভৃতির প্রতি আমাদের অন্তরে ঘৃণা সৃষ্টি করিয়া দিয়াছেন। ইহা আল্লাহ্ এক বিশেষ অনুগ্রহ। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ।
'যাহারা আল্লাহর প্রতি অঙ্গীকারের বিনিময়ে দুনিয়ার তুচ্ছ বস্তু ক্রয় করে, আখিরাতের জীবনে তাদের কোনই অংশ নাই। কিয়ামতের কঠিন দিনে আল্লাহ্ তাদের সঙ্গে কথা বলিবেন না, এমনকি তাদের প্রতি দৃষ্টিপাতও করিবেন না। আর তাদের পবিত্রও করিবেন না। তাদের জন্য ভয়াবহ আজাব নির্দিষ্ট রহিয়াছে। সুতরাং তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করিয়া চল এবং শ্রবণ করো, অনুগত হও এবং নিজেদের কল্যাণের জন্য ভয় করো। মনে রাখিও যারা লোভ-লালসা হইতে আত্মসংবরণ করিতে সক্ষম, তারাই সফলকাম হয়েছে।
'তোমার পরস্পরে যখন আল্লাহর নামে কোনো অঙ্গীকার করো, তখন তাহা পূর্ণ করিবে। আর, পাকাপাকাভাবে কোনো শপথ করিবার পর তাহার আর অন্যথা করিও না। কেননা এর দ্বারা তোমরা আল্লাহকে জামিন করিয়া থাক। তোমরা যাহা কিছুই কর না কেন, সে বিষয় আল্লাহ্ পাকের জানা রহিয়াছে। তোমরা সেই লোকের ন্যায় হইও না, যে অতি কষ্টে সূতা কাটার পর তাহা টুকরা টুকরা করিয়া ছিন্নভিন্ন করিয়া ফেলে। শপথকে তোমরা বাহানা বানাইও না। তোমাদের পরস্পরের মধ্যে একদল অন্যদল হইতে অগ্রবর্তী থাকিবেই। ইহা আল্লাহ্র তরফ হইতেই তোমাদের প্রতি একটি পরীক্ষা বিশেষ। তোমরা পরস্পরের মধ্যে যে বিষয় লইয়া ঝগড়া করিতেছ, কেয়ামতের দিন তাহা পরিষ্কার হয়ে যাইবে। আল্লাহ্ যদি চাহিতেন, তবে তোমাদের সকলকে একই দলভুক্ত করিয়া দিতেন। তবে তিনি যাহাকে ইচ্ছা গোমরাহ্ করেন এবং যাহাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাহাকে ইচ্ছা সুপথ দেখান। তোমরা যা করো, সে বিষয়ে তোমরা জিজ্ঞাসিত হইবে।
'তোমরা প্রতারণার উদ্দেশ্যে শপথ করিও না। এতে ইমানের উপর পা দৃঢ় হওয়ার পর পুনরায় তাহা পিছুলিয়া যাইবে। আর আল্লাহ্র রাস্তায় বাধা সৃষ্টির জন্য তোমরা শাস্তি ভোগের যোগ্য হইবে। তুচ্ছ কোনো স্বার্থের বিনিময়ে তোমরা আল্লাহ্ নামে যে ওয়াদা করিয়াছ, তাহা ভঙ্গ করিওনা যদি তোমরা উপলব্ধি করিয়া থাক, আল্লাহ্র নিকট রহিয়াছে, তাহাই তোমাদের জন্য উত্তম; তোমাদের হাতে যাহা রহিয়াছে, তাহা শেষ হয়ে যাইবে, আর আল্লাহ্র নিকট যাহা আছে তাহা অক্ষয়।-(কোরআন)।
'অতঃপর শোন: একদল লোক আমার বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করিয়াছে। মুখে মুখে তারা আমাকে আল্লাহ্র কিতাবের প্রতিই আহ্বান জানাইতেছেন। তারা প্রকাশ করছে, দুনিয়ার কোনো স্বার্থই তাদের উদ্দেশ্য নয়। অতঃপর সত্য যখন তাদের সম্মুখে প্রকাশ করিয়া দেওয়া হইল তখন তাদের মধ্যেই নানা মতভেদের সৃষ্টি হইল। একদল লোক পথে ফিরিয়া আসিয়াছে। কিন্তু অন্যদল বিরুদ্ধাচরণ করিয়াই চলিয়াছে। গায়ের বলে তারা অন্যায়ভাবে খেলাফত দখল করার মতলবে সত্যকে অস্বীকার করছে। আমার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দুরাশার সূত্রও দীর্ঘতর হইতেছে। এখন তারা দ্রুত কাজ করিতে বদ্ধপরিকর, তারা আপনাদের লিখিয়া জানাইয়াছে, আমার ওয়াদা ভঙ্গেই তারা পুনরায় আসিয়া মদিনা অবরোধ করিয়াছে। আমি তাদের নিকট কোনো ওয়াদা করিয়া তাহা রক্ষা করি নাই, এমন কথা আমার মনে পড়ে না। কিছু লোক সম্পর্কে তারা আমার নিকট দণ্ডবিধান দাবি করছে।
'আমি তাহাদের বলিয়াছি, যে ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোনও অপরাধ করিয়াছে তাদের দণ্ড বিধান কর। যে জুলুম করিয়াছে তাহার শাস্তির ব্যবস্থা করো। তারা বলিতেছে, কোরআনের বরাত দেখিয়া কাজ কর। আমি বলিয়াছি, তোমরাও কোরআনের বরাত খুঁজিতে পার, তবে আল্লাহ্ পাক যে বিধান নাজিল করেন নাই, তাহা লইয়া বাড়াবাড়ি করিও না।
'তারা গরিব ও নিঃস্বদের জন্য আর্থিক সাহায্য দাবি করছে। হুকুমতের অর্থ কল্যাণকর কাজে নিয়োগের কথা বলিতেছে। গণীমত ও জাকাতের অর্থ বিধিবহির্ভূত কোন পথে ব্যয় করা চলিবে না। সৎ, উপযুক্ত ও ধর্ম পরায়ণ লোকদের শাসনকর্তা নিযুক্ত করিতে হইবে। যাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে, তাহার প্রতিকার চাই। এ সমস্তই আমার করণীয় কাজ। অধিকন্তু আমি তাদের দাবি-দাওয়াও মঞ্জুর করিয়াছি।
'শাসনকর্তা নিয়োগের ব্যাপারে আমি উম্মুল মু'মিনীনের দরবারেও হাজির হয়েছি। তাঁরা বলিয়াছেন, আমার ইবনুল আসকে শাসনকর্তা নিযুক্ত কর। আমির মু'য়াবিয়া এবং আবদুল্লাহ্ ইবনে কাইয়ুমকে যথাস্থানে রাখিয়া দাও। তাহাদের পূর্ববর্তী খলিফাই শাসনকর্তা-পদে নিয়োজিত করিয়া ছিলেন। শাসন এলাকার জনসাধারণও তাদের উপর সন্তুষ্ট রহিয়াছে। আমর ইবনুল আসের প্রতিও তাঁর শাসন-এলাকার লোক সন্তুষ্ট ছিল, সুতরাং তাঁকে সেখানেই পুনঃনিয়োগ করো। এ সবই আমি করিয়াছি। কিন্তু তথাপি তারা আমার প্রতি বাড়াবাড়ি করিয়া সীমা অতিক্রম করিতেছে।
'আমি যখন আপনাদের এই পত্র লিখিতেছি, তখন খেলাফতের জন্য লালায়িত আমার সঙ্গীগণ ক্ষিপ্রতার সহিত কাজ করিয়া যাইতেছে। আমাকে তারা মসজিদে নামাজ পড়িতে যাইতে বাধা প্রদান করছে। মজিদে' যাওয়ার পথটুকুও তারা অবরোধ করিয়া রাখিয়াছে। মদিনায় তারা অরাজকতা সৃষ্টি ও লুটপাট করছে।
'এক্ষণে তারা আমার সম্মুখে তিনটি দাবি উত্থাপন করিয়াছে। (১) প্রথমত, সঙ্গত বা অসঙ্গতভাবে আমার হাতে যাহার যে ক্ষতি হয়েছে, তাহার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হইবে। (২) দ্বিতীয়ত, আমাকে খিলাফত হইতে সরিয়া দাঁড়াইতে হইবে, যাতে তারা অন্য কোনো লোককে খলিফা নির্বাচিত করিতে পারে। (৩) তৃতীয়ত, আমি যেন মদিনা ছাড়িয়া যে কোনো প্রদেশে চলিয়া যাই। "আমি তাদের বলিয়াছি, প্রথম দুই খলিফার দ্বারাও কিছু কিছু ভুলত্রুটি হয়েছে। কিন্তু কেহই তাঁদের নিকট ভুলের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করে নাই। খেলাফত হইতে পদত্যাগ করাও আমার অভিপ্রেত নহে। এরা যদি আমার প্রতি পাগলা কুকুরও পদত্যাগ করাও আমার অভিপ্রেত নহে। এরা যদি আমার প্রতি পাগলা কুকুরও পদত্যাগ করাও আমার অভিপ্রেত নহে। এরা যদি আমার প্রতি পাগলা কুকুরও লেলাইয়া দেয়, তথাপি আমি খেলাফত ত্যাগ করিয়া বিশৃঙ্খলার প্রশ্রয় দিতে পারি না।
'অন্য কোনো প্রদেশে চলিয়া যাওয়ার প্রশ্নও একই কারণে আসে না। আমি তোমাদের উপর জোর করিয়া শাসনকর্তা নিযুক্ত হই নাই। অন্য কোনো প্রদেশে যাইয়া লোকজনের উপর কর্তৃত্ব বিস্তার করিতে আমি চাই না। তোমরা এক সময় আল্লাহ্র সন্তুষ্টির আশায় আমার প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করিয়াছিলে। তোমাদের কেউ যদি দুনিয়ার জন্য আকাঙ্ক্ষিত হয়, তবে সে ততটুকুই পাইবে যা তার জন্য নির্ধারিত করিয়া রাখা হয়েছে। এর বেশি সে কখনও হাসিল করিতে পারিবে না।
'আর তোমাদের মধ্যে যাহারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ও পরকালের মঙ্গলপ্রার্থী, আর রাসুলে খোদা ও পূর্ববর্তী দুই খলিফার নীতির অনুসরণ প্রয়াসী, তাদের পুরস্কার আল্লাহই দিবেন। তাদের পুরস্কার দেওয়ার মতো সাধ্য আমার নাই।
'আমি যদি কাহাকেও সমগ্র দুনিয়ার সম্পদও দিয়া দেই, তথাপি এর দ্বারা তার দীনের মূল্য দেওয়া হইবে না। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর নিকট যে অফুরন্ত পুরস্কার রহিয়াছে, তাহার পরিমাণ উপলব্ধি করিতে চেষ্টা করো।'
'তোমরা যাহারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিতে চাও, তাহা ভঙ্গ করিতে পার, তবে তা কোনো অবস্থাতেই পছন্দনীয় হইবে না। আল্লাহ্ এইরূপ অংগীকার ভঙ্গ করা পছন্দ করেন না। আমার সম্মুখে এখন যে পথ খোলা আছে, তাহা মৃত্যু। অন্য একজনকে খলিফা নির্বাচিত করা আল্লাহ্ নিয়ামত অগ্রাহ্য করা বলিয়া আমি মনে করি। হিংসা বিদ্বেষ, রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলা আমি ঘৃণা করি। তোমাদের আল্লাহ এবং ইসলামের নামে বলিতেছি, তোমরা সত্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ় থাক। আমাকে তোমরা এক অঙ্গীকারমূলে খলিফা বলিয়া বরণ করিয়াছিলে। এখন তোমরা অঙ্গীকার পালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হইবে।
'সর্বশেষে আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি। নিজেকে আমি নির্দোষ বলিতেছি না। হয়ত কোনো সময় কোনো ভুল-ত্রুটি করিয়াছি। নক্স মানুষকে ত্রুটির পথে পরিচালিত করে। কিছু সংখ্যক লোককে আমি শাস্তি দিয়াছি সত্য, তবে এতে আমার উদ্দেশ্য সৎ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না।
'আমি আমার প্রতি কাজই আল্লাহর হাতে সোপর্দ করিতেছি। তাঁর নিকটই আমার সকল প্রার্থনা। তিনি ব্যতীত ক্ষমা করার আর কেহ নাই। আল্লাহ্র রহমত সকল কিছুরই নিকটবর্তী রহিয়াছে। আমি আল্লাহ্র নিকট আমার ও তোমাদের সকলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি।
'আশা করি, মুসলিম সাধারণের অন্তর সত্য পথে ঐক্যবদ্ধ থাকিবে। অসদাচরণ হইতে তারা দূরে থাকিতে সমর্থ হইবে।'
স্বগৃহে বন্দি অবস্থায় লিখিত খলিফার এই দুইখানি মর্মস্পর্শী পত্রের প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিল, জানা যায় নাই। হয়ত কিছুই হয় নাই। না হওয়ার কারণও অবশ্য না ছিল এমন নহে। এক, হৃত-ক্ষমতা শাসনকর্তা আদেশ উপদেশ কম লোকেই গ্রাহ্য করে। দ্বিতীয়ত, পত্রগুলো যাদের উদ্দেশ্যে লেখা তাদের হস্তে যথাসময়ে, অথবা আদৌ পৌঁছইয়াছিল কিনা সন্দেহ। তৃতীয়ত, তখন হজের পুরা মৌসুম। দেশের গণমান্য লোকের অধিকাংশ তখন আরাফাতে অথবা খানায় কা'বার সান্নিধ্যে, পবিত্র হজব্রত উদযাপনের ব্যস্ত। বিদ্রোহীরা উদ্দেশ্যমূলকভাবেই এই সময়টি বাছিয়া লইয়াছিল তাদের অসৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। চতুর্থত, অবিদ্রোহী জনগণ হয়ত ভাবিতে পারে নাই, ক্রুব্ধ জনতা শেষ পর্যন্ত খোদ আমীরুল মু'মিনীনকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবে।
মোটের উপর খলিফার পত্র দুইটি দৃশ্যত নিষ্ফল আবেদনেই পর্যবসিত হয়েছিল। কোনো দিক হইতে কোনো রূপ সাহায্যের সাড়া মিলিল না। অদৃষ্ট বাম হইলে এইরূপই হয়। নিতান্ত আপন জনও অপরিচিতের মতো ব্যবহার করে। অন্যথা অন্তত উমাইয়া গোষ্ঠীর লোকেরা তাঁর পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইত।

টিকাঃ
১. দুইটি পত্রের তরজমা: মৌলানা মুহিউদ্দিন খান সম্পাদিত মাসিক 'মদিনা' ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল সংখ্যা হইতে উদ্ধৃত।

মক্কায় সমবেত হাজিদেরকে খলিফা লিখিলেন, 'দাতা ও দয়ালু আল্লাহ্ রাব্বুল আ'লামিনের নামে শুরু করিতেছি। আল্লাহর বান্দা আমিরুল মুমিনীন ওসমানের পক্ষ হইতে সমবেত মুসলিম ভাইদের প্রতি তস্লিম।
'আমি তোমাদের সামনে সেই আল্লাহর প্রশংসা করিতেছি, যিনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নাই।'
"যিনি আমাদের কল্যাণ দান করিয়াছেন, আমি সেই আল্লাহকে স্মরণ করিবার জন্য তোমাদের বলিতেছি। তিনি তোমাদের ইসলামের শিক্ষা দান করিয়া বিপদ হইতে রক্ষা করিয়াছেন। কুফরির অভিশাপ হইতে মুক্ত করিয়াছেন। তোমাদের বুদ্ধি বিকাশের জন্য নানা নিদর্শনাবলী দিয়াছেন। তিনিই তোমাদের জীবিকার পথ প্রশস্ত করিয়াছেন। সকল শত্রুর উপর জয়যুক্ত করিয়াছেন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রাচুর্য দান করিয়া তোমাদের তিনি পরিপূর্ণ করিয়াছেন। আল্লাহ্ বলেন- 'তোমরা যদি আল্লাহ্র দানসমূহের কথা গণনা করিতে চাও, তবে কখনও তাহা গণনা করিয়া শেষ করিতে পারিবে না। তবুও মানুষ সীমা লঙ্ঘনকারী-অকৃতজ্ঞ। ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে সঠিকভাবে ভয় কর। আর মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করিও না। এবং তোমরা সকলে সমবেতভাবে আল্লাহ্র রজ্জুকে ধারণ কর, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইও না।
'তোমরা আল্লাহর সেই অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর-তোমরা ছিলে পরস্পরের প্রতি শত্রু ভাবাপন্ন। তারপর তিনি তোমাদের সকলের অন্তরে প্রীতি ভালোবাসা সৃষ্টি দিয়াছেন। ফলে তোমরা সকলে ভাই ভাই হয়ে গিয়াছ। বস্তুত তোমরা একটি প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে পরিপূর্ণ একটি গর্তের কিনারায় অবস্থান করিতে ছিলে, আল্লাহ্ তোমাদের সেই বিপদ হইতে রক্ষা করেন। এইভাবেই আল্লাহ্ পাক তোমাদের মুক্তির পথ সন্ধান করার পর খুলিয়া দিয়াছেন।
'তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা সৎকার্যের প্রতি লোকদের আহ্বান করিবে, পুণ্যকর্মে উৎসাহ দিবে এবং অসৎকার্য হইতে লোকদের নিরস্ত করিবে। তারাই পরিণামে সাফল্য লাভ করিবে।
'তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী আসার পর তোমরা তাদের ন্যায় হইও না, যারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝগড়া-বিবাদে নিমগ্ন হয়েছিল, তাদের প্রতি কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রহিয়াছে।
'তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহ্ সেই অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো। আর তোমরা তৎসঙ্গে স্মরণ করো, তোমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলে, আমরা সকল কথা শুনিলাম এবং তাহা মানিয়া লইলাম।
"ইমানদাররা! তোমাদের নিকট যদি কোনও ফাছেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ লইয়া উপস্থিত হয়, তবে তাহা প্রথমে যাচাই করো। যেন সম্প্রদায়ের প্রতি অন্যায়ভাবে ক্রোধান্বিত না হও বা প্রতিশোধ গ্রহণ করিয়া পরিণামে সে জন্য তোমাদের অনুতপ্ত হইতে না হয়। জানিয়া রাখ, তোমাদের অনুতপ্ত হইতে না হয়। জানিয়া রাখ, তোমাদের মধ্যেই আল্লাহ্র রসুল রহিয়াছেন।
'তিনি যদি কোনও কাজে ক্রুদ্ধ হয়ে তোমাদের অনুসরণ করেন, তবে পরিণামে তোমরাই বিপদে পতিত হইবে। আল্লাহ্ তোমাদের অন্তরে ইমান বদ্ধমূল করিয়া দিয়াছেন। তোমাদের অন্তরকে ইমানের সম্পদে সমৃদ্ধ করিয়াছেন। আর কুফরি, নাফরমানি, গোনাহর কাজ প্রভৃতির প্রতি আমাদের অন্তরে ঘৃণা সৃষ্টি করিয়া দিয়াছেন। ইহা আল্লাহ্ এক বিশেষ অনুগ্রহ। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ।
'যাহারা আল্লাহর প্রতি অঙ্গীকারের বিনিময়ে দুনিয়ার তুচ্ছ বস্তু ক্রয় করে, আখিরাতের জীবনে তাদের কোনই অংশ নাই। কিয়ামতের কঠিন দিনে আল্লাহ্ তাদের সঙ্গে কথা বলিবেন না, এমনকি তাদের প্রতি দৃষ্টিপাতও করিবেন না। আর তাদের পবিত্রও করিবেন না। তাদের জন্য ভয়াবহ আজাব নির্দিষ্ট রহিয়াছে। সুতরাং তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করিয়া চল এবং শ্রবণ করো, অনুগত হও এবং নিজেদের কল্যাণের জন্য ভয় করো। মনে রাখিও যারা লোভ-লালসা হইতে আত্মসংবরণ করিতে সক্ষম, তারাই সফলকাম হয়েছে।
'তোমার পরস্পরে যখন আল্লাহর নামে কোনো অঙ্গীকার করো, তখন তাহা পূর্ণ করিবে। আর, পাকাপাকাভাবে কোনো শপথ করিবার পর তাহার আর অন্যথা করিও না। কেননা এর দ্বারা তোমরা আল্লাহকে জামিন করিয়া থাক। তোমরা যাহা কিছুই কর না কেন, সে বিষয় আল্লাহ্ পাকের জানা রহিয়াছে। তোমরা সেই লোকের ন্যায় হইও না, যে অতি কষ্টে সূতা কাটার পর তাহা টুকরা টুকরা করিয়া ছিন্নভিন্ন করিয়া ফেলে। শপথকে তোমরা বাহানা বানাইও না। তোমাদের পরস্পরের মধ্যে একদল অন্যদল হইতে অগ্রবর্তী থাকিবেই। ইহা আল্লাহ্র তরফ হইতেই তোমাদের প্রতি একটি পরীক্ষা বিশেষ। তোমরা পরস্পরের মধ্যে যে বিষয় লইয়া ঝগড়া করিতেছ, কেয়ামতের দিন তাহা পরিষ্কার হয়ে যাইবে। আল্লাহ্ যদি চাহিতেন, তবে তোমাদের সকলকে একই দলভুক্ত করিয়া দিতেন। তবে তিনি যাহাকে ইচ্ছা গোমরাহ্ করেন এবং যাহাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাহাকে ইচ্ছা সুপথ দেখান। তোমরা যা করো, সে বিষয়ে তোমরা জিজ্ঞাসিত হইবে।
'তোমরা প্রতারণার উদ্দেশ্যে শপথ করিও না। এতে ইমানের উপর পা দৃঢ় হওয়ার পর পুনরায় তাহা পিছুলিয়া যাইবে। আর আল্লাহ্র রাস্তায় বাধা সৃষ্টির জন্য তোমরা শাস্তি ভোগের যোগ্য হইবে। তুচ্ছ কোনো স্বার্থের বিনিময়ে তোমরা আল্লাহ্ নামে যে ওয়াদা করিয়াছ, তাহা ভঙ্গ করিওনা যদি তোমরা উপলব্ধি করিয়া থাক, আল্লাহ্র নিকট রহিয়াছে, তাহাই তোমাদের জন্য উত্তম; তোমাদের হাতে যাহা রহিয়াছে, তাহা শেষ হয়ে যাইবে, আর আল্লাহ্র নিকট যাহা আছে তাহা অক্ষয়।-(কোরআন)।
'অতঃপর শোন: একদল লোক আমার বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করিয়াছে। মুখে মুখে তারা আমাকে আল্লাহ্র কিতাবের প্রতিই আহ্বান জানাইতেছেন। তারা প্রকাশ করছে, দুনিয়ার কোনো স্বার্থই তাদের উদ্দেশ্য নয়। অতঃপর সত্য যখন তাদের সম্মুখে প্রকাশ করিয়া দেওয়া হইল তখন তাদের মধ্যেই নানা মতভেদের সৃষ্টি হইল। একদল লোক পথে ফিরিয়া আসিয়াছে। কিন্তু অন্যদল বিরুদ্ধাচরণ করিয়াই চলিয়াছে। গায়ের বলে তারা অন্যায়ভাবে খেলাফত দখল করার মতলবে সত্যকে অস্বীকার করছে। আমার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দুরাশার সূত্রও দীর্ঘতর হইতেছে। এখন তারা দ্রুত কাজ করিতে বদ্ধপরিকর, তারা আপনাদের লিখিয়া জানাইয়াছে, আমার ওয়াদা ভঙ্গেই তারা পুনরায় আসিয়া মদিনা অবরোধ করিয়াছে। আমি তাদের নিকট কোনো ওয়াদা করিয়া তাহা রক্ষা করি নাই, এমন কথা আমার মনে পড়ে না। কিছু লোক সম্পর্কে তারা আমার নিকট দণ্ডবিধান দাবি করছে।
'আমি তাহাদের বলিয়াছি, যে ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোনও অপরাধ করিয়াছে তাদের দণ্ড বিধান কর। যে জুলুম করিয়াছে তাহার শাস্তির ব্যবস্থা করো। তারা বলিতেছে, কোরআনের বরাত দেখিয়া কাজ কর। আমি বলিয়াছি, তোমরাও কোরআনের বরাত খুঁজিতে পার, তবে আল্লাহ্ পাক যে বিধান নাজিল করেন নাই, তাহা লইয়া বাড়াবাড়ি করিও না।
'তারা গরিব ও নিঃস্বদের জন্য আর্থিক সাহায্য দাবি করছে। হুকুমতের অর্থ কল্যাণকর কাজে নিয়োগের কথা বলিতেছে। গণীমত ও জাকাতের অর্থ বিধিবহির্ভূত কোন পথে ব্যয় করা চলিবে না। সৎ, উপযুক্ত ও ধর্ম পরায়ণ লোকদের শাসনকর্তা নিযুক্ত করিতে হইবে। যাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে, তাহার প্রতিকার চাই। এ সমস্তই আমার করণীয় কাজ। অধিকন্তু আমি তাদের দাবি-দাওয়াও মঞ্জুর করিয়াছি।
'শাসনকর্তা নিয়োগের ব্যাপারে আমি উম্মুল মু'মিনীনের দরবারেও হাজির হয়েছি। তাঁরা বলিয়াছেন, আমার ইবনুল আসকে শাসনকর্তা নিযুক্ত কর। আমির মু'য়াবিয়া এবং আবদুল্লাহ্ ইবনে কাইয়ুমকে যথাস্থানে রাখিয়া দাও। তাহাদের পূর্ববর্তী খলিফাই শাসনকর্তা-পদে নিয়োজিত করিয়া ছিলেন। শাসন এলাকার জনসাধারণও তাদের উপর সন্তুষ্ট রহিয়াছে। আমর ইবনুল আসের প্রতিও তাঁর শাসন-এলাকার লোক সন্তুষ্ট ছিল, সুতরাং তাঁকে সেখানেই পুনঃনিয়োগ করো। এ সবই আমি করিয়াছি। কিন্তু তথাপি তারা আমার প্রতি বাড়াবাড়ি করিয়া সীমা অতিক্রম করিতেছে।
'আমি যখন আপনাদের এই পত্র লিখিতেছি, তখন খেলাফতের জন্য লালায়িত আমার সঙ্গীগণ ক্ষিপ্রতার সহিত কাজ করিয়া যাইতেছে। আমাকে তারা মসজিদে নামাজ পড়িতে যাইতে বাধা প্রদান করছে। মজিদে' যাওয়ার পথটুকুও তারা অবরোধ করিয়া রাখিয়াছে। মদিনায় তারা অরাজকতা সৃষ্টি ও লুটপাট করছে।
'এক্ষণে তারা আমার সম্মুখে তিনটি দাবি উত্থাপন করিয়াছে। (১) প্রথমত, সঙ্গত বা অসঙ্গতভাবে আমার হাতে যাহার যে ক্ষতি হয়েছে, তাহার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হইবে। (২) দ্বিতীয়ত, আমাকে খিলাফত হইতে সরিয়া দাঁড়াইতে হইবে, যাতে তারা অন্য কোনো লোককে খলিফা নির্বাচিত করিতে পারে। (৩) তৃতীয়ত, আমি যেন মদিনা ছাড়িয়া যে কোনো প্রদেশে চলিয়া যাই। "আমি তাদের বলিয়াছি, প্রথম দুই খলিফার দ্বারাও কিছু কিছু ভুলত্রুটি হয়েছে। কিন্তু কেহই তাঁদের নিকট ভুলের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করে নাই। খেলাফত হইতে পদত্যাগ করাও আমার অভিপ্রেত নহে। এরা যদি আমার প্রতি পাগলা কুকুরও পদত্যাগ করাও আমার অভিপ্রেত নহে। এরা যদি আমার প্রতি পাগলা কুকুরও পদত্যাগ করাও আমার অভিপ্রেত নহে। এরা যদি আমার প্রতি পাগলা কুকুরও লেলাইয়া দেয়, তথাপি আমি খেলাফত ত্যাগ করিয়া বিশৃঙ্খলার প্রশ্রয় দিতে পারি না।
'অন্য কোনো প্রদেশে চলিয়া যাওয়ার প্রশ্নও একই কারণে আসে না। আমি তোমাদের উপর জোর করিয়া শাসনকর্তা নিযুক্ত হই নাই। অন্য কোনো প্রদেশে যাইয়া লোকজনের উপর কর্তৃত্ব বিস্তার করিতে আমি চাই না। তোমরা এক সময় আল্লাহ্র সন্তুষ্টির আশায় আমার প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করিয়াছিলে। তোমাদের কেউ যদি দুনিয়ার জন্য আকাঙ্ক্ষিত হয়, তবে সে ততটুকুই পাইবে যা তার জন্য নির্ধারিত করিয়া রাখা হয়েছে। এর বেশি সে কখনও হাসিল করিতে পারিবে না।
'আর তোমাদের মধ্যে যাহারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ও পরকালের মঙ্গলপ্রার্থী, আর রাসুলে খোদা ও পূর্ববর্তী দুই খলিফার নীতির অনুসরণ প্রয়াসী, তাদের পুরস্কার আল্লাহই দিবেন। তাদের পুরস্কার দেওয়ার মতো সাধ্য আমার নাই।
'আমি যদি কাহাকেও সমগ্র দুনিয়ার সম্পদও দিয়া দেই, তথাপি এর দ্বারা তার দীনের মূল্য দেওয়া হইবে না। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর নিকট যে অফুরন্ত পুরস্কার রহিয়াছে, তাহার পরিমাণ উপলব্ধি করিতে চেষ্টা করো।'
'তোমরা যাহারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিতে চাও, তাহা ভঙ্গ করিতে পার, তবে তা কোনো অবস্থাতেই পছন্দনীয় হইবে না। আল্লাহ্ এইরূপ অংগীকার ভঙ্গ করা পছন্দ করেন না। আমার সম্মুখে এখন যে পথ খোলা আছে, তাহা মৃত্যু। অন্য একজনকে খলিফা নির্বাচিত করা আল্লাহ্ নিয়ামত অগ্রাহ্য করা বলিয়া আমি মনে করি। হিংসা বিদ্বেষ, রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলা আমি ঘৃণা করি। তোমাদের আল্লাহ এবং ইসলামের নামে বলিতেছি, তোমরা সত্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ় থাক। আমাকে তোমরা এক অঙ্গীকারমূলে খলিফা বলিয়া বরণ করিয়াছিলে। এখন তোমরা অঙ্গীকার পালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হইবে।
'সর্বশেষে আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি। নিজেকে আমি নির্দোষ বলিতেছি না। হয়ত কোনো সময় কোনো ভুল-ত্রুটি করিয়াছি। নক্স মানুষকে ত্রুটির পথে পরিচালিত করে। কিছু সংখ্যক লোককে আমি শাস্তি দিয়াছি সত্য, তবে এতে আমার উদ্দেশ্য সৎ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না।
'আমি আমার প্রতি কাজই আল্লাহর হাতে সোপর্দ করিতেছি। তাঁর নিকটই আমার সকল প্রার্থনা। তিনি ব্যতীত ক্ষমা করার আর কেহ নাই। আল্লাহ্র রহমত সকল কিছুরই নিকটবর্তী রহিয়াছে। আমি আল্লাহ্র নিকট আমার ও তোমাদের সকলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি।
'আশা করি, মুসলিম সাধারণের অন্তর সত্য পথে ঐক্যবদ্ধ থাকিবে। অসদাচরণ হইতে তারা দূরে থাকিতে সমর্থ হইবে।'
স্বগৃহে বন্দি অবস্থায় লিখিত খলিফার এই দুইখানি মর্মস্পর্শী পত্রের প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিল, জানা যায় নাই। হয়ত কিছুই হয় নাই। না হওয়ার কারণও অবশ্য না ছিল এমন নহে। এক, হৃত-ক্ষমতা শাসনকর্তা আদেশ উপদেশ কম লোকেই গ্রাহ্য করে। দ্বিতীয়ত, পত্রগুলো যাদের উদ্দেশ্যে লেখা তাদের হস্তে যথাসময়ে, অথবা আদৌ পৌঁছইয়াছিল কিনা সন্দেহ। তৃতীয়ত, তখন হজের পুরা মৌসুম। দেশের গণমান্য লোকের অধিকাংশ তখন আরাফাতে অথবা খানায় কা'বার সান্নিধ্যে, পবিত্র হজব্রত উদযাপনের ব্যস্ত। বিদ্রোহীরা উদ্দেশ্যমূলকভাবেই এই সময়টি বাছিয়া লইয়াছিল তাদের অসৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। চতুর্থত, অবিদ্রোহী জনগণ হয়ত ভাবিতে পারে নাই, ক্রুব্ধ জনতা শেষ পর্যন্ত খোদ আমীরুল মু'মিনীনকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবে।
মোটের উপর খলিফার পত্র দুইটি দৃশ্যত নিষ্ফল আবেদনেই পর্যবসিত হয়েছিল। কোনো দিক হইতে কোনো রূপ সাহায্যের সাড়া মিলিল না। অদৃষ্ট বাম হইলে এইরূপই হয়। নিতান্ত আপন জনও অপরিচিতের মতো ব্যবহার করে। অন্যথা অন্তত উমাইয়া গোষ্ঠীর লোকেরা তাঁর পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইত।

টিকাঃ
১. দুইটি পত্রের তরজমা: মৌলানা মুহিউদ্দিন খান সম্পাদিত মাসিক 'মদিনা' ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল সংখ্যা হইতে উদ্ধৃত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00