📄 হজের মৌসুম
দেখিতে দেখিতে হজের মৌসুম আসিয়া পড়িল। হজরত ওসমান অবরুদ্ধ অবস্থায় ও খলিফা হিসেবে মুসলমানদের হজের সুব্যবস্থা করিয়া দেওয়ার দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি উদাসীন থাকিতে পারিলেন না। তিনি একদিন ছাদে উঠিয়া হজরত আব্বাসের প্রহরারত পুত্রকে নিকটে আহ্বান করিলেন এবং আগামী হজে মদিনার হজযাত্রীদের পরিচালনা ও নেতৃত্ব গঠনের দায়িত্ব অর্পণ করিলেন। ইবনে আব্বাস খলিফার সদর দরওয়াজা রক্ষা করিতেছিলেন। এই দায়িত্ব ত্যাগ করিতে তাঁর মন চাহিতেছিল না; কিন্তু খলিফা পুনঃপুনঃ তাঁকে হজযাত্রীদের পরিচালনা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করিতে পীড়াপীড়ি করায় তিনি অগত্যা সম্মত হইলেন। বিবি আয়েশাও হজ করিবার জন্য মদিনার কাফেলার সঙ্গিনী হইলেন। এমন কথাও শুনা গেল, প্রথম দিকে তিনি হজরত ওসমানের কাজকর্মে তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং বিদ্রোহীরা উহাতে উৎসাহিত হয়েছিল। কিন্তু এমন গুরুতর পরিস্থিতির উদ্ভব হইবে, ইহা হয়ত তিনি ভাবিতে পারেন নাই। এক্ষণে তিনি বিদ্রোহীদের হইতে দূরে চলিয়া যাইতে মনস্থির করিলেন, যাহাতে তারা তাঁর বিরক্তি ও তাদের সহিত অসহযোগ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে। তিনি আরও চাহিয়াছিলেন, তাঁর ভ্রাতা মুহম্মদকে সঙ্গে লইতে যাহাতে বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিন্ন হয়। কিন্তু মুহম্মদ ছিল মিসরিয় বিদ্রোহী দলের অন্যতম নেতা। ভগিনীর অনুরোধ সে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করিল এবং অবরোধকারীদের সঙ্গে রহিয়া গেল।
বিদ্রোহীরা ধ্বংসের নেশায় এমনই মাতিয়া গেল, তারা হজের আহ্বান উপেক্ষা করিল। উচ্ছৃঙ্খলতা ও জীঘাংসার এমনই একটা মাদকতা আছে, মানুষ যে কোনও অছিলাকে আকড়াইয়া থাকে, তাদের পাপ প্রবৃত্তি চরিতার্থ করিয়া উল্লাস উপভোগ করিবার জন্য। খলিফার অপসারণ এখন বিদ্রোহীদের নিকট ছিল একটা উপলক্ষ মাত্র। এই উপলক্ষে তারা হাজার হাজার লোক একত্রিত হয়ে যদৃচ্ছা চলাফেরা ও আমোদ-আহলাদ করিয়া বেড়াইতেছিল এবং মদিনার নিরীহ নাগরিকদের ধমকাইয়া শাসাইয়া নিজেদের শক্তি জাহির করিতেছিল। সে ছিল এক গর্ব মিশ্রিত আত্মতৃপ্তি। শরিয়তি-বিধান ও ন্যায়-নীতির খিলাফের অপরাধে তারা খলিফাকে শাস্তি দিতে জমায়েত হয়েছিল; কিন্তু ইসলামের এক শ্রেষ্ঠ বিধান হজকে তারা তুচ্ছ করিল।
হজরত ওসমান যখন কোনও মতেই বিদ্রোহীদের মন নরম করিতে পারিলেন না তখন তাঁর প্রজাপুঞ্জের সহানুভূতি লাভের জন্য একবার শেষ চেষ্টা করিয়া দেখিতে ইচ্ছা করিলেন। তিনি এই উদ্দেশ্যে দুইখানি পত্র লেখেন। দুইটি পত্রই অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। তার একটি লেখা হয় রাষ্ট্রের প্রতিপত্তিশালী নেতারা ও শাসকবর্গের নিকট; দ্বিতীয়খানি লিখিত হয় মক্কায় সমবেত হজযাত্রীদের উদ্দেশ্যে। ঐতিহাসিক ওয়াকেদি, বালাজুরী প্রমুখের গ্রন্থে এই দুইটি পত্রের উল্লেখ আছে।
দেখিতে দেখিতে হজের মৌসুম আসিয়া পড়িল। হজরত ওসমান অবরুদ্ধ অবস্থায় ও খলিফা হিসেবে মুসলমানদের হজের সুব্যবস্থা করিয়া দেওয়ার দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি উদাসীন থাকিতে পারিলেন না। তিনি একদিন ছাদে উঠিয়া হজরত আব্বাসের প্রহরারত পুত্রকে নিকটে আহ্বান করিলেন এবং আগামী হজে মদিনার হজযাত্রীদের পরিচালনা ও নেতৃত্ব গঠনের দায়িত্ব অর্পণ করিলেন। ইবনে আব্বাস খলিফার সদর দরওয়াজা রক্ষা করিতেছিলেন। এই দায়িত্ব ত্যাগ করিতে তাঁর মন চাহিতেছিল না; কিন্তু খলিফা পুনঃপুনঃ তাঁকে হজযাত্রীদের পরিচালনা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করিতে পীড়াপীড়ি করায় তিনি অগত্যা সম্মত হইলেন। বিবি আয়েশাও হজ করিবার জন্য মদিনার কাফেলার সঙ্গিনী হইলেন। এমন কথাও শুনা গেল, প্রথম দিকে তিনি হজরত ওসমানের কাজকর্মে তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং বিদ্রোহীরা উহাতে উৎসাহিত হয়েছিল। কিন্তু এমন গুরুতর পরিস্থিতির উদ্ভব হইবে, ইহা হয়ত তিনি ভাবিতে পারেন নাই। এক্ষণে তিনি বিদ্রোহীদের হইতে দূরে চলিয়া যাইতে মনস্থির করিলেন, যাহাতে তারা তাঁর বিরক্তি ও তাদের সহিত অসহযোগ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে। তিনি আরও চাহিয়াছিলেন, তাঁর ভ্রাতা মুহম্মদকে সঙ্গে লইতে যাহাতে বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিন্ন হয়। কিন্তু মুহম্মদ ছিল মিসরিয় বিদ্রোহী দলের অন্যতম নেতা। ভগিনীর অনুরোধ সে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করিল এবং অবরোধকারীদের সঙ্গে রহিয়া গেল।
বিদ্রোহীরা ধ্বংসের নেশায় এমনই মাতিয়া গেল, তারা হজের আহ্বান উপেক্ষা করিল। উচ্ছৃঙ্খলতা ও জীঘাংসার এমনই একটা মাদকতা আছে, মানুষ যে কোনও অছিলাকে আকড়াইয়া থাকে, তাদের পাপ প্রবৃত্তি চরিতার্থ করিয়া উল্লাস উপভোগ করিবার জন্য। খলিফার অপসারণ এখন বিদ্রোহীদের নিকট ছিল একটা উপলক্ষ মাত্র। এই উপলক্ষে তারা হাজার হাজার লোক একত্রিত হয়ে যদৃচ্ছা চলাফেরা ও আমোদ-আহলাদ করিয়া বেড়াইতেছিল এবং মদিনার নিরীহ নাগরিকদের ধমকাইয়া শাসাইয়া নিজেদের শক্তি জাহির করিতেছিল। সে ছিল এক গর্ব মিশ্রিত আত্মতৃপ্তি। শরিয়তি-বিধান ও ন্যায়-নীতির খিলাফের অপরাধে তারা খলিফাকে শাস্তি দিতে জমায়েত হয়েছিল; কিন্তু ইসলামের এক শ্রেষ্ঠ বিধান হজকে তারা তুচ্ছ করিল।
হজরত ওসমান যখন কোনও মতেই বিদ্রোহীদের মন নরম করিতে পারিলেন না তখন তাঁর প্রজাপুঞ্জের সহানুভূতি লাভের জন্য একবার শেষ চেষ্টা করিয়া দেখিতে ইচ্ছা করিলেন। তিনি এই উদ্দেশ্যে দুইখানি পত্র লেখেন। দুইটি পত্রই অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। তার একটি লেখা হয় রাষ্ট্রের প্রতিপত্তিশালী নেতারা ও শাসকবর্গের নিকট; দ্বিতীয়খানি লিখিত হয় মক্কায় সমবেত হজযাত্রীদের উদ্দেশ্যে। ঐতিহাসিক ওয়াকেদি, বালাজুরী প্রমুখের গ্রন্থে এই দুইটি পত্রের উল্লেখ আছে।
📄 প্রথম পত্র
খলিফা নেতারা ও শাসকদের লিখিলেন, 'পরম দাতা ও দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করিতেছি। আল্লাহ পাক মোহাম্মদ মোস্তফাকে সুসংবাদ দাতা ও অনাচারের পরিণতি সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি মানব জাতির নিকট আল্লাহর সকল নির্দেশই পৌছাইয়া দিয়া গিয়াছেন। তারপর আল্লাহ্ তাঁকে স্বীয় অনুগ্রহের নিচে ডাকিয়া নিয়াছেন। তিনি তাঁর কর্তব্য পালন করত; মানব-সন্তানদের প্রথপ্রাপ্তির জন্য আল্লাহর কিতাব রাখিয়া গিয়াছেন। এই কিতাব হালাল, হারাম এবং সর্বপ্রকার আদেশ-নিষেধ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বলিয়া দেওয়া হয়েছে। ইহাতে কাহারও সন্তুষ্টি বা অসন্তোষের পরওয়া করা হয় নাই।
'আল্লাহর রাসুলের বিদায়ের পর পর্যায়ক্রমে হজরত আবুবকর ও হজরত উমর খলিফা নির্বাচিত হন। উমরের অনুপস্থিতিতেই আমাকে খলিফা-পদে নির্বাচিত করা হয়। আমি তারপর হইতেই নেহায়েত অনুগত ও অনুসরণকারীর ন্যায় নিরপেক্ষভাবে কাজ করিয়া যাইতেছি। আমি মুসলিম জাতির উপর কোনও প্রকার প্রভুত্ব বিস্তার করিতে চাহি নাই। তাদের ব্যাপারে কোনরূপ সীমা লঙ্ঘন করি নাই।'
'কিন্তু একদল লোক এখন আমার বিরুদ্ধে নানা প্রকার হিংসাত্মক কথা ছড়াইতেছে। তারা অতীত কালের নানা অপ্রীতিকর কথা তুলিতেছে কোরআনের মূল- নীতির সহিত জড়িত বিষয় সম্পর্কে তারা বাড়াবাড়ি করছে। কোরআনের যে সব হুকুম আমি প্রয়োগ করিয়াছি, তৎসম্পর্কে তারা মনগড়া প্রচারণা চালাইতেছে। তারা কোনও এক কথায় স্থির থাকে না। একবার এক কথা বলে, পুনরায় যুক্তিপ্রমাণ ব্যতীতই অন্য কথা বলিতে শুরু করিয়া দেয়।'
'তারা আমার ও মদিনার একদল নিষ্ঠাবান মুসলমানের প্রতি নানা প্রকার দোষারোপ করছে। আমি এই সমস্ত হীন কার্য-কলাপের সম্মুখে বৎসরের পর বৎসর ধৈর্যধারণ করিয়াছি। কোন প্রকার দমনমূলক ব্যবস্থাটুকুও গ্রহণ করিতে অগ্রসর হই নাই। ফলে তাদের সাহস বাড়িয়া গিয়াছে। সম্প্রতি তারা মদিনার মর্যাদা সম্পন্ন লোকদের পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিতে প্রয়াস পাইতেছে। মরুবাসী বেদুঈনদের মধ্যে নানা প্রকার অপকথা প্রচার করিয়া তাদেরও আমার বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ করার চেষ্টায় নিয়োজিত রহিয়াছ। ইহারা মদিনা আক্রমণ ও অবরোধকারী 'আহযাব'দের অনুরূপ। (এখানে খন্দক যুদ্ধে সময়কার বহুদল কর্তৃক সমবেতভাবে মদিনা অবরোধের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।) যাহারা ওহুদের ময়দানে লড়াই করিতে আসিয়াছিল, তারা তাদের চাইতেও কম নহে। কিন্তু মুখে মুখে তারা অন্য কথা প্রচার করছে। এমতাবস্থায় যে যে পার, আমার সাথে আসিয়া শামিল হও।'
খলিফা নেতারা ও শাসকদের লিখিলেন, 'পরম দাতা ও দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করিতেছি। আল্লাহ পাক মোহাম্মদ মোস্তফাকে সুসংবাদ দাতা ও অনাচারের পরিণতি সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি মানব জাতির নিকট আল্লাহর সকল নির্দেশই পৌছাইয়া দিয়া গিয়াছেন। তারপর আল্লাহ্ তাঁকে স্বীয় অনুগ্রহের নিচে ডাকিয়া নিয়াছেন। তিনি তাঁর কর্তব্য পালন করত; মানব-সন্তানদের প্রথপ্রাপ্তির জন্য আল্লাহর কিতাব রাখিয়া গিয়াছেন। এই কিতাব হালাল, হারাম এবং সর্বপ্রকার আদেশ-নিষেধ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বলিয়া দেওয়া হয়েছে। ইহাতে কাহারও সন্তুষ্টি বা অসন্তোষের পরওয়া করা হয় নাই।
'আল্লাহর রাসুলের বিদায়ের পর পর্যায়ক্রমে হজরত আবুবকর ও হজরত উমর খলিফা নির্বাচিত হন। উমরের অনুপস্থিতিতেই আমাকে খলিফা-পদে নির্বাচিত করা হয়। আমি তারপর হইতেই নেহায়েত অনুগত ও অনুসরণকারীর ন্যায় নিরপেক্ষভাবে কাজ করিয়া যাইতেছি। আমি মুসলিম জাতির উপর কোনও প্রকার প্রভুত্ব বিস্তার করিতে চাহি নাই। তাদের ব্যাপারে কোনরূপ সীমা লঙ্ঘন করি নাই।'
'কিন্তু একদল লোক এখন আমার বিরুদ্ধে নানা প্রকার হিংসাত্মক কথা ছড়াইতেছে। তারা অতীত কালের নানা অপ্রীতিকর কথা তুলিতেছে কোরআনের মূল- নীতির সহিত জড়িত বিষয় সম্পর্কে তারা বাড়াবাড়ি করছে। কোরআনের যে সব হুকুম আমি প্রয়োগ করিয়াছি, তৎসম্পর্কে তারা মনগড়া প্রচারণা চালাইতেছে। তারা কোনও এক কথায় স্থির থাকে না। একবার এক কথা বলে, পুনরায় যুক্তিপ্রমাণ ব্যতীতই অন্য কথা বলিতে শুরু করিয়া দেয়।'
'তারা আমার ও মদিনার একদল নিষ্ঠাবান মুসলমানের প্রতি নানা প্রকার দোষারোপ করছে। আমি এই সমস্ত হীন কার্য-কলাপের সম্মুখে বৎসরের পর বৎসর ধৈর্যধারণ করিয়াছি। কোন প্রকার দমনমূলক ব্যবস্থাটুকুও গ্রহণ করিতে অগ্রসর হই নাই। ফলে তাদের সাহস বাড়িয়া গিয়াছে। সম্প্রতি তারা মদিনার মর্যাদা সম্পন্ন লোকদের পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিতে প্রয়াস পাইতেছে। মরুবাসী বেদুঈনদের মধ্যে নানা প্রকার অপকথা প্রচার করিয়া তাদেরও আমার বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ করার চেষ্টায় নিয়োজিত রহিয়াছ। ইহারা মদিনা আক্রমণ ও অবরোধকারী 'আহযাব'দের অনুরূপ। (এখানে খন্দক যুদ্ধে সময়কার বহুদল কর্তৃক সমবেতভাবে মদিনা অবরোধের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।) যাহারা ওহুদের ময়দানে লড়াই করিতে আসিয়াছিল, তারা তাদের চাইতেও কম নহে। কিন্তু মুখে মুখে তারা অন্য কথা প্রচার করছে। এমতাবস্থায় যে যে পার, আমার সাথে আসিয়া শামিল হও।'
📄 দ্বিতীয় পত্র
মক্কায় সমবেত হাজিদেরকে খলিফা লিখিলেন, 'দাতা ও দয়ালু আল্লাহ্ রাব্বুল আ'লামিনের নামে শুরু করিতেছি। আল্লাহর বান্দা আমিরুল মুমিনীন ওসমানের পক্ষ হইতে সমবেত মুসলিম ভাইদের প্রতি তস্লিম।
'আমি তোমাদের সামনে সেই আল্লাহর প্রশংসা করিতেছি, যিনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নাই।'
"যিনি আমাদের কল্যাণ দান করিয়াছেন, আমি সেই আল্লাহকে স্মরণ করিবার জন্য তোমাদের বলিতেছি। তিনি তোমাদের ইসলামের শিক্ষা দান করিয়া বিপদ হইতে রক্ষা করিয়াছেন। কুফরির অভিশাপ হইতে মুক্ত করিয়াছেন। তোমাদের বুদ্ধি বিকাশের জন্য নানা নিদর্শনাবলী দিয়াছেন। তিনিই তোমাদের জীবিকার পথ প্রশস্ত করিয়াছেন। সকল শত্রুর উপর জয়যুক্ত করিয়াছেন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রাচুর্য দান করিয়া তোমাদের তিনি পরিপূর্ণ করিয়াছেন। আল্লাহ্ বলেন- 'তোমরা যদি আল্লাহ্র দানসমূহের কথা গণনা করিতে চাও, তবে কখনও তাহা গণনা করিয়া শেষ করিতে পারিবে না। তবুও মানুষ সীমা লঙ্ঘনকারী-অকৃতজ্ঞ। ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে সঠিকভাবে ভয় কর। আর মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করিও না। এবং তোমরা সকলে সমবেতভাবে আল্লাহ্র রজ্জুকে ধারণ কর, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইও না।
'তোমরা আল্লাহর সেই অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর-তোমরা ছিলে পরস্পরের প্রতি শত্রু ভাবাপন্ন। তারপর তিনি তোমাদের সকলের অন্তরে প্রীতি ভালোবাসা সৃষ্টি দিয়াছেন। ফলে তোমরা সকলে ভাই ভাই হয়ে গিয়াছ। বস্তুত তোমরা একটি প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে পরিপূর্ণ একটি গর্তের কিনারায় অবস্থান করিতে ছিলে, আল্লাহ্ তোমাদের সেই বিপদ হইতে রক্ষা করেন। এইভাবেই আল্লাহ্ পাক তোমাদের মুক্তির পথ সন্ধান করার পর খুলিয়া দিয়াছেন।
'তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা সৎকার্যের প্রতি লোকদের আহ্বান করিবে, পুণ্যকর্মে উৎসাহ দিবে এবং অসৎকার্য হইতে লোকদের নিরস্ত করিবে। তারাই পরিণামে সাফল্য লাভ করিবে।
'তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী আসার পর তোমরা তাদের ন্যায় হইও না, যারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝগড়া-বিবাদে নিমগ্ন হয়েছিল, তাদের প্রতি কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রহিয়াছে।
'তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহ্ সেই অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো। আর তোমরা তৎসঙ্গে স্মরণ করো, তোমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলে, আমরা সকল কথা শুনিলাম এবং তাহা মানিয়া লইলাম।
"ইমানদাররা! তোমাদের নিকট যদি কোনও ফাছেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ লইয়া উপস্থিত হয়, তবে তাহা প্রথমে যাচাই করো। যেন সম্প্রদায়ের প্রতি অন্যায়ভাবে ক্রোধান্বিত না হও বা প্রতিশোধ গ্রহণ করিয়া পরিণামে সে জন্য তোমাদের অনুতপ্ত হইতে না হয়। জানিয়া রাখ, তোমাদের অনুতপ্ত হইতে না হয়। জানিয়া রাখ, তোমাদের মধ্যেই আল্লাহ্র রসুল রহিয়াছেন।
'তিনি যদি কোনও কাজে ক্রুদ্ধ হয়ে তোমাদের অনুসরণ করেন, তবে পরিণামে তোমরাই বিপদে পতিত হইবে। আল্লাহ্ তোমাদের অন্তরে ইমান বদ্ধমূল করিয়া দিয়াছেন। তোমাদের অন্তরকে ইমানের সম্পদে সমৃদ্ধ করিয়াছেন। আর কুফরি, নাফরমানি, গোনাহর কাজ প্রভৃতির প্রতি আমাদের অন্তরে ঘৃণা সৃষ্টি করিয়া দিয়াছেন। ইহা আল্লাহ্ এক বিশেষ অনুগ্রহ। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ।
'যাহারা আল্লাহর প্রতি অঙ্গীকারের বিনিময়ে দুনিয়ার তুচ্ছ বস্তু ক্রয় করে, আখিরাতের জীবনে তাদের কোনই অংশ নাই। কিয়ামতের কঠিন দিনে আল্লাহ্ তাদের সঙ্গে কথা বলিবেন না, এমনকি তাদের প্রতি দৃষ্টিপাতও করিবেন না। আর তাদের পবিত্রও করিবেন না। তাদের জন্য ভয়াবহ আজাব নির্দিষ্ট রহিয়াছে। সুতরাং তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করিয়া চল এবং শ্রবণ করো, অনুগত হও এবং নিজেদের কল্যাণের জন্য ভয় করো। মনে রাখিও যারা লোভ-লালসা হইতে আত্মসংবরণ করিতে সক্ষম, তারাই সফলকাম হয়েছে।
'তোমার পরস্পরে যখন আল্লাহর নামে কোনো অঙ্গীকার করো, তখন তাহা পূর্ণ করিবে। আর, পাকাপাকাভাবে কোনো শপথ করিবার পর তাহার আর অন্যথা করিও না। কেননা এর দ্বারা তোমরা আল্লাহকে জামিন করিয়া থাক। তোমরা যাহা কিছুই কর না কেন, সে বিষয় আল্লাহ্ পাকের জানা রহিয়াছে। তোমরা সেই লোকের ন্যায় হইও না, যে অতি কষ্টে সূতা কাটার পর তাহা টুকরা টুকরা করিয়া ছিন্নভিন্ন করিয়া ফেলে। শপথকে তোমরা বাহানা বানাইও না। তোমাদের পরস্পরের মধ্যে একদল অন্যদল হইতে অগ্রবর্তী থাকিবেই। ইহা আল্লাহ্র তরফ হইতেই তোমাদের প্রতি একটি পরীক্ষা বিশেষ। তোমরা পরস্পরের মধ্যে যে বিষয় লইয়া ঝগড়া করিতেছ, কেয়ামতের দিন তাহা পরিষ্কার হয়ে যাইবে। আল্লাহ্ যদি চাহিতেন, তবে তোমাদের সকলকে একই দলভুক্ত করিয়া দিতেন। তবে তিনি যাহাকে ইচ্ছা গোমরাহ্ করেন এবং যাহাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাহাকে ইচ্ছা সুপথ দেখান। তোমরা যা করো, সে বিষয়ে তোমরা জিজ্ঞাসিত হইবে।
'তোমরা প্রতারণার উদ্দেশ্যে শপথ করিও না। এতে ইমানের উপর পা দৃঢ় হওয়ার পর পুনরায় তাহা পিছুলিয়া যাইবে। আর আল্লাহ্র রাস্তায় বাধা সৃষ্টির জন্য তোমরা শাস্তি ভোগের যোগ্য হইবে। তুচ্ছ কোনো স্বার্থের বিনিময়ে তোমরা আল্লাহ্ নামে যে ওয়াদা করিয়াছ, তাহা ভঙ্গ করিওনা যদি তোমরা উপলব্ধি করিয়া থাক, আল্লাহ্র নিকট রহিয়াছে, তাহাই তোমাদের জন্য উত্তম; তোমাদের হাতে যাহা রহিয়াছে, তাহা শেষ হয়ে যাইবে, আর আল্লাহ্র নিকট যাহা আছে তাহা অক্ষয়।-(কোরআন)।
'অতঃপর শোন: একদল লোক আমার বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করিয়াছে। মুখে মুখে তারা আমাকে আল্লাহ্র কিতাবের প্রতিই আহ্বান জানাইতেছেন। তারা প্রকাশ করছে, দুনিয়ার কোনো স্বার্থই তাদের উদ্দেশ্য নয়। অতঃপর সত্য যখন তাদের সম্মুখে প্রকাশ করিয়া দেওয়া হইল তখন তাদের মধ্যেই নানা মতভেদের সৃষ্টি হইল। একদল লোক পথে ফিরিয়া আসিয়াছে। কিন্তু অন্যদল বিরুদ্ধাচরণ করিয়াই চলিয়াছে। গায়ের বলে তারা অন্যায়ভাবে খেলাফত দখল করার মতলবে সত্যকে অস্বীকার করছে। আমার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দুরাশার সূত্রও দীর্ঘতর হইতেছে। এখন তারা দ্রুত কাজ করিতে বদ্ধপরিকর, তারা আপনাদের লিখিয়া জানাইয়াছে, আমার ওয়াদা ভঙ্গেই তারা পুনরায় আসিয়া মদিনা অবরোধ করিয়াছে। আমি তাদের নিকট কোনো ওয়াদা করিয়া তাহা রক্ষা করি নাই, এমন কথা আমার মনে পড়ে না। কিছু লোক সম্পর্কে তারা আমার নিকট দণ্ডবিধান দাবি করছে।
'আমি তাহাদের বলিয়াছি, যে ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোনও অপরাধ করিয়াছে তাদের দণ্ড বিধান কর। যে জুলুম করিয়াছে তাহার শাস্তির ব্যবস্থা করো। তারা বলিতেছে, কোরআনের বরাত দেখিয়া কাজ কর। আমি বলিয়াছি, তোমরাও কোরআনের বরাত খুঁজিতে পার, তবে আল্লাহ্ পাক যে বিধান নাজিল করেন নাই, তাহা লইয়া বাড়াবাড়ি করিও না।
'তারা গরিব ও নিঃস্বদের জন্য আর্থিক সাহায্য দাবি করছে। হুকুমতের অর্থ কল্যাণকর কাজে নিয়োগের কথা বলিতেছে। গণীমত ও জাকাতের অর্থ বিধিবহির্ভূত কোন পথে ব্যয় করা চলিবে না। সৎ, উপযুক্ত ও ধর্ম পরায়ণ লোকদের শাসনকর্তা নিযুক্ত করিতে হইবে। যাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে, তাহার প্রতিকার চাই। এ সমস্তই আমার করণীয় কাজ। অধিকন্তু আমি তাদের দাবি-দাওয়াও মঞ্জুর করিয়াছি।
'শাসনকর্তা নিয়োগের ব্যাপারে আমি উম্মুল মু'মিনীনের দরবারেও হাজির হয়েছি। তাঁরা বলিয়াছেন, আমার ইবনুল আসকে শাসনকর্তা নিযুক্ত কর। আমির মু'য়াবিয়া এবং আবদুল্লাহ্ ইবনে কাইয়ুমকে যথাস্থানে রাখিয়া দাও। তাহাদের পূর্ববর্তী খলিফাই শাসনকর্তা-পদে নিয়োজিত করিয়া ছিলেন। শাসন এলাকার জনসাধারণও তাদের উপর সন্তুষ্ট রহিয়াছে। আমর ইবনুল আসের প্রতিও তাঁর শাসন-এলাকার লোক সন্তুষ্ট ছিল, সুতরাং তাঁকে সেখানেই পুনঃনিয়োগ করো। এ সবই আমি করিয়াছি। কিন্তু তথাপি তারা আমার প্রতি বাড়াবাড়ি করিয়া সীমা অতিক্রম করিতেছে।
'আমি যখন আপনাদের এই পত্র লিখিতেছি, তখন খেলাফতের জন্য লালায়িত আমার সঙ্গীগণ ক্ষিপ্রতার সহিত কাজ করিয়া যাইতেছে। আমাকে তারা মসজিদে নামাজ পড়িতে যাইতে বাধা প্রদান করছে। মজিদে' যাওয়ার পথটুকুও তারা অবরোধ করিয়া রাখিয়াছে। মদিনায় তারা অরাজকতা সৃষ্টি ও লুটপাট করছে।
'এক্ষণে তারা আমার সম্মুখে তিনটি দাবি উত্থাপন করিয়াছে। (১) প্রথমত, সঙ্গত বা অসঙ্গতভাবে আমার হাতে যাহার যে ক্ষতি হয়েছে, তাহার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হইবে। (২) দ্বিতীয়ত, আমাকে খিলাফত হইতে সরিয়া দাঁড়াইতে হইবে, যাতে তারা অন্য কোনো লোককে খলিফা নির্বাচিত করিতে পারে। (৩) তৃতীয়ত, আমি যেন মদিনা ছাড়িয়া যে কোনো প্রদেশে চলিয়া যাই। "আমি তাদের বলিয়াছি, প্রথম দুই খলিফার দ্বারাও কিছু কিছু ভুলত্রুটি হয়েছে। কিন্তু কেহই তাঁদের নিকট ভুলের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করে নাই। খেলাফত হইতে পদত্যাগ করাও আমার অভিপ্রেত নহে। এরা যদি আমার প্রতি পাগলা কুকুরও পদত্যাগ করাও আমার অভিপ্রেত নহে। এরা যদি আমার প্রতি পাগলা কুকুরও পদত্যাগ করাও আমার অভিপ্রেত নহে। এরা যদি আমার প্রতি পাগলা কুকুরও লেলাইয়া দেয়, তথাপি আমি খেলাফত ত্যাগ করিয়া বিশৃঙ্খলার প্রশ্রয় দিতে পারি না।
'অন্য কোনো প্রদেশে চলিয়া যাওয়ার প্রশ্নও একই কারণে আসে না। আমি তোমাদের উপর জোর করিয়া শাসনকর্তা নিযুক্ত হই নাই। অন্য কোনো প্রদেশে যাইয়া লোকজনের উপর কর্তৃত্ব বিস্তার করিতে আমি চাই না। তোমরা এক সময় আল্লাহ্র সন্তুষ্টির আশায় আমার প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করিয়াছিলে। তোমাদের কেউ যদি দুনিয়ার জন্য আকাঙ্ক্ষিত হয়, তবে সে ততটুকুই পাইবে যা তার জন্য নির্ধারিত করিয়া রাখা হয়েছে। এর বেশি সে কখনও হাসিল করিতে পারিবে না।
'আর তোমাদের মধ্যে যাহারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ও পরকালের মঙ্গলপ্রার্থী, আর রাসুলে খোদা ও পূর্ববর্তী দুই খলিফার নীতির অনুসরণ প্রয়াসী, তাদের পুরস্কার আল্লাহই দিবেন। তাদের পুরস্কার দেওয়ার মতো সাধ্য আমার নাই।
'আমি যদি কাহাকেও সমগ্র দুনিয়ার সম্পদও দিয়া দেই, তথাপি এর দ্বারা তার দীনের মূল্য দেওয়া হইবে না। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর নিকট যে অফুরন্ত পুরস্কার রহিয়াছে, তাহার পরিমাণ উপলব্ধি করিতে চেষ্টা করো।'
'তোমরা যাহারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিতে চাও, তাহা ভঙ্গ করিতে পার, তবে তা কোনো অবস্থাতেই পছন্দনীয় হইবে না। আল্লাহ্ এইরূপ অংগীকার ভঙ্গ করা পছন্দ করেন না। আমার সম্মুখে এখন যে পথ খোলা আছে, তাহা মৃত্যু। অন্য একজনকে খলিফা নির্বাচিত করা আল্লাহ্ নিয়ামত অগ্রাহ্য করা বলিয়া আমি মনে করি। হিংসা বিদ্বেষ, রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলা আমি ঘৃণা করি। তোমাদের আল্লাহ এবং ইসলামের নামে বলিতেছি, তোমরা সত্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ় থাক। আমাকে তোমরা এক অঙ্গীকারমূলে খলিফা বলিয়া বরণ করিয়াছিলে। এখন তোমরা অঙ্গীকার পালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হইবে।
'সর্বশেষে আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি। নিজেকে আমি নির্দোষ বলিতেছি না। হয়ত কোনো সময় কোনো ভুল-ত্রুটি করিয়াছি। নক্স মানুষকে ত্রুটির পথে পরিচালিত করে। কিছু সংখ্যক লোককে আমি শাস্তি দিয়াছি সত্য, তবে এতে আমার উদ্দেশ্য সৎ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না।
'আমি আমার প্রতি কাজই আল্লাহর হাতে সোপর্দ করিতেছি। তাঁর নিকটই আমার সকল প্রার্থনা। তিনি ব্যতীত ক্ষমা করার আর কেহ নাই। আল্লাহ্র রহমত সকল কিছুরই নিকটবর্তী রহিয়াছে। আমি আল্লাহ্র নিকট আমার ও তোমাদের সকলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি।
'আশা করি, মুসলিম সাধারণের অন্তর সত্য পথে ঐক্যবদ্ধ থাকিবে। অসদাচরণ হইতে তারা দূরে থাকিতে সমর্থ হইবে।'
স্বগৃহে বন্দি অবস্থায় লিখিত খলিফার এই দুইখানি মর্মস্পর্শী পত্রের প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিল, জানা যায় নাই। হয়ত কিছুই হয় নাই। না হওয়ার কারণও অবশ্য না ছিল এমন নহে। এক, হৃত-ক্ষমতা শাসনকর্তা আদেশ উপদেশ কম লোকেই গ্রাহ্য করে। দ্বিতীয়ত, পত্রগুলো যাদের উদ্দেশ্যে লেখা তাদের হস্তে যথাসময়ে, অথবা আদৌ পৌঁছইয়াছিল কিনা সন্দেহ। তৃতীয়ত, তখন হজের পুরা মৌসুম। দেশের গণমান্য লোকের অধিকাংশ তখন আরাফাতে অথবা খানায় কা'বার সান্নিধ্যে, পবিত্র হজব্রত উদযাপনের ব্যস্ত। বিদ্রোহীরা উদ্দেশ্যমূলকভাবেই এই সময়টি বাছিয়া লইয়াছিল তাদের অসৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। চতুর্থত, অবিদ্রোহী জনগণ হয়ত ভাবিতে পারে নাই, ক্রুব্ধ জনতা শেষ পর্যন্ত খোদ আমীরুল মু'মিনীনকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবে।
মোটের উপর খলিফার পত্র দুইটি দৃশ্যত নিষ্ফল আবেদনেই পর্যবসিত হয়েছিল। কোনো দিক হইতে কোনো রূপ সাহায্যের সাড়া মিলিল না। অদৃষ্ট বাম হইলে এইরূপই হয়। নিতান্ত আপন জনও অপরিচিতের মতো ব্যবহার করে। অন্যথা অন্তত উমাইয়া গোষ্ঠীর লোকেরা তাঁর পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইত।
টিকাঃ
১. দুইটি পত্রের তরজমা: মৌলানা মুহিউদ্দিন খান সম্পাদিত মাসিক 'মদিনা' ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল সংখ্যা হইতে উদ্ধৃত।
মক্কায় সমবেত হাজিদেরকে খলিফা লিখিলেন, 'দাতা ও দয়ালু আল্লাহ্ রাব্বুল আ'লামিনের নামে শুরু করিতেছি। আল্লাহর বান্দা আমিরুল মুমিনীন ওসমানের পক্ষ হইতে সমবেত মুসলিম ভাইদের প্রতি তস্লিম।
'আমি তোমাদের সামনে সেই আল্লাহর প্রশংসা করিতেছি, যিনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নাই।'
"যিনি আমাদের কল্যাণ দান করিয়াছেন, আমি সেই আল্লাহকে স্মরণ করিবার জন্য তোমাদের বলিতেছি। তিনি তোমাদের ইসলামের শিক্ষা দান করিয়া বিপদ হইতে রক্ষা করিয়াছেন। কুফরির অভিশাপ হইতে মুক্ত করিয়াছেন। তোমাদের বুদ্ধি বিকাশের জন্য নানা নিদর্শনাবলী দিয়াছেন। তিনিই তোমাদের জীবিকার পথ প্রশস্ত করিয়াছেন। সকল শত্রুর উপর জয়যুক্ত করিয়াছেন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রাচুর্য দান করিয়া তোমাদের তিনি পরিপূর্ণ করিয়াছেন। আল্লাহ্ বলেন- 'তোমরা যদি আল্লাহ্র দানসমূহের কথা গণনা করিতে চাও, তবে কখনও তাহা গণনা করিয়া শেষ করিতে পারিবে না। তবুও মানুষ সীমা লঙ্ঘনকারী-অকৃতজ্ঞ। ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে সঠিকভাবে ভয় কর। আর মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করিও না। এবং তোমরা সকলে সমবেতভাবে আল্লাহ্র রজ্জুকে ধারণ কর, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইও না।
'তোমরা আল্লাহর সেই অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর-তোমরা ছিলে পরস্পরের প্রতি শত্রু ভাবাপন্ন। তারপর তিনি তোমাদের সকলের অন্তরে প্রীতি ভালোবাসা সৃষ্টি দিয়াছেন। ফলে তোমরা সকলে ভাই ভাই হয়ে গিয়াছ। বস্তুত তোমরা একটি প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে পরিপূর্ণ একটি গর্তের কিনারায় অবস্থান করিতে ছিলে, আল্লাহ্ তোমাদের সেই বিপদ হইতে রক্ষা করেন। এইভাবেই আল্লাহ্ পাক তোমাদের মুক্তির পথ সন্ধান করার পর খুলিয়া দিয়াছেন।
'তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা সৎকার্যের প্রতি লোকদের আহ্বান করিবে, পুণ্যকর্মে উৎসাহ দিবে এবং অসৎকার্য হইতে লোকদের নিরস্ত করিবে। তারাই পরিণামে সাফল্য লাভ করিবে।
'তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী আসার পর তোমরা তাদের ন্যায় হইও না, যারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝগড়া-বিবাদে নিমগ্ন হয়েছিল, তাদের প্রতি কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রহিয়াছে।
'তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহ্ সেই অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো। আর তোমরা তৎসঙ্গে স্মরণ করো, তোমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলে, আমরা সকল কথা শুনিলাম এবং তাহা মানিয়া লইলাম।
"ইমানদাররা! তোমাদের নিকট যদি কোনও ফাছেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ লইয়া উপস্থিত হয়, তবে তাহা প্রথমে যাচাই করো। যেন সম্প্রদায়ের প্রতি অন্যায়ভাবে ক্রোধান্বিত না হও বা প্রতিশোধ গ্রহণ করিয়া পরিণামে সে জন্য তোমাদের অনুতপ্ত হইতে না হয়। জানিয়া রাখ, তোমাদের অনুতপ্ত হইতে না হয়। জানিয়া রাখ, তোমাদের মধ্যেই আল্লাহ্র রসুল রহিয়াছেন।
'তিনি যদি কোনও কাজে ক্রুদ্ধ হয়ে তোমাদের অনুসরণ করেন, তবে পরিণামে তোমরাই বিপদে পতিত হইবে। আল্লাহ্ তোমাদের অন্তরে ইমান বদ্ধমূল করিয়া দিয়াছেন। তোমাদের অন্তরকে ইমানের সম্পদে সমৃদ্ধ করিয়াছেন। আর কুফরি, নাফরমানি, গোনাহর কাজ প্রভৃতির প্রতি আমাদের অন্তরে ঘৃণা সৃষ্টি করিয়া দিয়াছেন। ইহা আল্লাহ্ এক বিশেষ অনুগ্রহ। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ।
'যাহারা আল্লাহর প্রতি অঙ্গীকারের বিনিময়ে দুনিয়ার তুচ্ছ বস্তু ক্রয় করে, আখিরাতের জীবনে তাদের কোনই অংশ নাই। কিয়ামতের কঠিন দিনে আল্লাহ্ তাদের সঙ্গে কথা বলিবেন না, এমনকি তাদের প্রতি দৃষ্টিপাতও করিবেন না। আর তাদের পবিত্রও করিবেন না। তাদের জন্য ভয়াবহ আজাব নির্দিষ্ট রহিয়াছে। সুতরাং তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করিয়া চল এবং শ্রবণ করো, অনুগত হও এবং নিজেদের কল্যাণের জন্য ভয় করো। মনে রাখিও যারা লোভ-লালসা হইতে আত্মসংবরণ করিতে সক্ষম, তারাই সফলকাম হয়েছে।
'তোমার পরস্পরে যখন আল্লাহর নামে কোনো অঙ্গীকার করো, তখন তাহা পূর্ণ করিবে। আর, পাকাপাকাভাবে কোনো শপথ করিবার পর তাহার আর অন্যথা করিও না। কেননা এর দ্বারা তোমরা আল্লাহকে জামিন করিয়া থাক। তোমরা যাহা কিছুই কর না কেন, সে বিষয় আল্লাহ্ পাকের জানা রহিয়াছে। তোমরা সেই লোকের ন্যায় হইও না, যে অতি কষ্টে সূতা কাটার পর তাহা টুকরা টুকরা করিয়া ছিন্নভিন্ন করিয়া ফেলে। শপথকে তোমরা বাহানা বানাইও না। তোমাদের পরস্পরের মধ্যে একদল অন্যদল হইতে অগ্রবর্তী থাকিবেই। ইহা আল্লাহ্র তরফ হইতেই তোমাদের প্রতি একটি পরীক্ষা বিশেষ। তোমরা পরস্পরের মধ্যে যে বিষয় লইয়া ঝগড়া করিতেছ, কেয়ামতের দিন তাহা পরিষ্কার হয়ে যাইবে। আল্লাহ্ যদি চাহিতেন, তবে তোমাদের সকলকে একই দলভুক্ত করিয়া দিতেন। তবে তিনি যাহাকে ইচ্ছা গোমরাহ্ করেন এবং যাহাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাহাকে ইচ্ছা সুপথ দেখান। তোমরা যা করো, সে বিষয়ে তোমরা জিজ্ঞাসিত হইবে।
'তোমরা প্রতারণার উদ্দেশ্যে শপথ করিও না। এতে ইমানের উপর পা দৃঢ় হওয়ার পর পুনরায় তাহা পিছুলিয়া যাইবে। আর আল্লাহ্র রাস্তায় বাধা সৃষ্টির জন্য তোমরা শাস্তি ভোগের যোগ্য হইবে। তুচ্ছ কোনো স্বার্থের বিনিময়ে তোমরা আল্লাহ্ নামে যে ওয়াদা করিয়াছ, তাহা ভঙ্গ করিওনা যদি তোমরা উপলব্ধি করিয়া থাক, আল্লাহ্র নিকট রহিয়াছে, তাহাই তোমাদের জন্য উত্তম; তোমাদের হাতে যাহা রহিয়াছে, তাহা শেষ হয়ে যাইবে, আর আল্লাহ্র নিকট যাহা আছে তাহা অক্ষয়।-(কোরআন)।
'অতঃপর শোন: একদল লোক আমার বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করিয়াছে। মুখে মুখে তারা আমাকে আল্লাহ্র কিতাবের প্রতিই আহ্বান জানাইতেছেন। তারা প্রকাশ করছে, দুনিয়ার কোনো স্বার্থই তাদের উদ্দেশ্য নয়। অতঃপর সত্য যখন তাদের সম্মুখে প্রকাশ করিয়া দেওয়া হইল তখন তাদের মধ্যেই নানা মতভেদের সৃষ্টি হইল। একদল লোক পথে ফিরিয়া আসিয়াছে। কিন্তু অন্যদল বিরুদ্ধাচরণ করিয়াই চলিয়াছে। গায়ের বলে তারা অন্যায়ভাবে খেলাফত দখল করার মতলবে সত্যকে অস্বীকার করছে। আমার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দুরাশার সূত্রও দীর্ঘতর হইতেছে। এখন তারা দ্রুত কাজ করিতে বদ্ধপরিকর, তারা আপনাদের লিখিয়া জানাইয়াছে, আমার ওয়াদা ভঙ্গেই তারা পুনরায় আসিয়া মদিনা অবরোধ করিয়াছে। আমি তাদের নিকট কোনো ওয়াদা করিয়া তাহা রক্ষা করি নাই, এমন কথা আমার মনে পড়ে না। কিছু লোক সম্পর্কে তারা আমার নিকট দণ্ডবিধান দাবি করছে।
'আমি তাহাদের বলিয়াছি, যে ব্যক্তি তোমাদের নিকট কোনও অপরাধ করিয়াছে তাদের দণ্ড বিধান কর। যে জুলুম করিয়াছে তাহার শাস্তির ব্যবস্থা করো। তারা বলিতেছে, কোরআনের বরাত দেখিয়া কাজ কর। আমি বলিয়াছি, তোমরাও কোরআনের বরাত খুঁজিতে পার, তবে আল্লাহ্ পাক যে বিধান নাজিল করেন নাই, তাহা লইয়া বাড়াবাড়ি করিও না।
'তারা গরিব ও নিঃস্বদের জন্য আর্থিক সাহায্য দাবি করছে। হুকুমতের অর্থ কল্যাণকর কাজে নিয়োগের কথা বলিতেছে। গণীমত ও জাকাতের অর্থ বিধিবহির্ভূত কোন পথে ব্যয় করা চলিবে না। সৎ, উপযুক্ত ও ধর্ম পরায়ণ লোকদের শাসনকর্তা নিযুক্ত করিতে হইবে। যাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে, তাহার প্রতিকার চাই। এ সমস্তই আমার করণীয় কাজ। অধিকন্তু আমি তাদের দাবি-দাওয়াও মঞ্জুর করিয়াছি।
'শাসনকর্তা নিয়োগের ব্যাপারে আমি উম্মুল মু'মিনীনের দরবারেও হাজির হয়েছি। তাঁরা বলিয়াছেন, আমার ইবনুল আসকে শাসনকর্তা নিযুক্ত কর। আমির মু'য়াবিয়া এবং আবদুল্লাহ্ ইবনে কাইয়ুমকে যথাস্থানে রাখিয়া দাও। তাহাদের পূর্ববর্তী খলিফাই শাসনকর্তা-পদে নিয়োজিত করিয়া ছিলেন। শাসন এলাকার জনসাধারণও তাদের উপর সন্তুষ্ট রহিয়াছে। আমর ইবনুল আসের প্রতিও তাঁর শাসন-এলাকার লোক সন্তুষ্ট ছিল, সুতরাং তাঁকে সেখানেই পুনঃনিয়োগ করো। এ সবই আমি করিয়াছি। কিন্তু তথাপি তারা আমার প্রতি বাড়াবাড়ি করিয়া সীমা অতিক্রম করিতেছে।
'আমি যখন আপনাদের এই পত্র লিখিতেছি, তখন খেলাফতের জন্য লালায়িত আমার সঙ্গীগণ ক্ষিপ্রতার সহিত কাজ করিয়া যাইতেছে। আমাকে তারা মসজিদে নামাজ পড়িতে যাইতে বাধা প্রদান করছে। মজিদে' যাওয়ার পথটুকুও তারা অবরোধ করিয়া রাখিয়াছে। মদিনায় তারা অরাজকতা সৃষ্টি ও লুটপাট করছে।
'এক্ষণে তারা আমার সম্মুখে তিনটি দাবি উত্থাপন করিয়াছে। (১) প্রথমত, সঙ্গত বা অসঙ্গতভাবে আমার হাতে যাহার যে ক্ষতি হয়েছে, তাহার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হইবে। (২) দ্বিতীয়ত, আমাকে খিলাফত হইতে সরিয়া দাঁড়াইতে হইবে, যাতে তারা অন্য কোনো লোককে খলিফা নির্বাচিত করিতে পারে। (৩) তৃতীয়ত, আমি যেন মদিনা ছাড়িয়া যে কোনো প্রদেশে চলিয়া যাই। "আমি তাদের বলিয়াছি, প্রথম দুই খলিফার দ্বারাও কিছু কিছু ভুলত্রুটি হয়েছে। কিন্তু কেহই তাঁদের নিকট ভুলের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করে নাই। খেলাফত হইতে পদত্যাগ করাও আমার অভিপ্রেত নহে। এরা যদি আমার প্রতি পাগলা কুকুরও পদত্যাগ করাও আমার অভিপ্রেত নহে। এরা যদি আমার প্রতি পাগলা কুকুরও পদত্যাগ করাও আমার অভিপ্রেত নহে। এরা যদি আমার প্রতি পাগলা কুকুরও লেলাইয়া দেয়, তথাপি আমি খেলাফত ত্যাগ করিয়া বিশৃঙ্খলার প্রশ্রয় দিতে পারি না।
'অন্য কোনো প্রদেশে চলিয়া যাওয়ার প্রশ্নও একই কারণে আসে না। আমি তোমাদের উপর জোর করিয়া শাসনকর্তা নিযুক্ত হই নাই। অন্য কোনো প্রদেশে যাইয়া লোকজনের উপর কর্তৃত্ব বিস্তার করিতে আমি চাই না। তোমরা এক সময় আল্লাহ্র সন্তুষ্টির আশায় আমার প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করিয়াছিলে। তোমাদের কেউ যদি দুনিয়ার জন্য আকাঙ্ক্ষিত হয়, তবে সে ততটুকুই পাইবে যা তার জন্য নির্ধারিত করিয়া রাখা হয়েছে। এর বেশি সে কখনও হাসিল করিতে পারিবে না।
'আর তোমাদের মধ্যে যাহারা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ও পরকালের মঙ্গলপ্রার্থী, আর রাসুলে খোদা ও পূর্ববর্তী দুই খলিফার নীতির অনুসরণ প্রয়াসী, তাদের পুরস্কার আল্লাহই দিবেন। তাদের পুরস্কার দেওয়ার মতো সাধ্য আমার নাই।
'আমি যদি কাহাকেও সমগ্র দুনিয়ার সম্পদও দিয়া দেই, তথাপি এর দ্বারা তার দীনের মূল্য দেওয়া হইবে না। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর নিকট যে অফুরন্ত পুরস্কার রহিয়াছে, তাহার পরিমাণ উপলব্ধি করিতে চেষ্টা করো।'
'তোমরা যাহারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিতে চাও, তাহা ভঙ্গ করিতে পার, তবে তা কোনো অবস্থাতেই পছন্দনীয় হইবে না। আল্লাহ্ এইরূপ অংগীকার ভঙ্গ করা পছন্দ করেন না। আমার সম্মুখে এখন যে পথ খোলা আছে, তাহা মৃত্যু। অন্য একজনকে খলিফা নির্বাচিত করা আল্লাহ্ নিয়ামত অগ্রাহ্য করা বলিয়া আমি মনে করি। হিংসা বিদ্বেষ, রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলা আমি ঘৃণা করি। তোমাদের আল্লাহ এবং ইসলামের নামে বলিতেছি, তোমরা সত্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ় থাক। আমাকে তোমরা এক অঙ্গীকারমূলে খলিফা বলিয়া বরণ করিয়াছিলে। এখন তোমরা অঙ্গীকার পালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হইবে।
'সর্বশেষে আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি। নিজেকে আমি নির্দোষ বলিতেছি না। হয়ত কোনো সময় কোনো ভুল-ত্রুটি করিয়াছি। নক্স মানুষকে ত্রুটির পথে পরিচালিত করে। কিছু সংখ্যক লোককে আমি শাস্তি দিয়াছি সত্য, তবে এতে আমার উদ্দেশ্য সৎ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না।
'আমি আমার প্রতি কাজই আল্লাহর হাতে সোপর্দ করিতেছি। তাঁর নিকটই আমার সকল প্রার্থনা। তিনি ব্যতীত ক্ষমা করার আর কেহ নাই। আল্লাহ্র রহমত সকল কিছুরই নিকটবর্তী রহিয়াছে। আমি আল্লাহ্র নিকট আমার ও তোমাদের সকলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি।
'আশা করি, মুসলিম সাধারণের অন্তর সত্য পথে ঐক্যবদ্ধ থাকিবে। অসদাচরণ হইতে তারা দূরে থাকিতে সমর্থ হইবে।'
স্বগৃহে বন্দি অবস্থায় লিখিত খলিফার এই দুইখানি মর্মস্পর্শী পত্রের প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিল, জানা যায় নাই। হয়ত কিছুই হয় নাই। না হওয়ার কারণও অবশ্য না ছিল এমন নহে। এক, হৃত-ক্ষমতা শাসনকর্তা আদেশ উপদেশ কম লোকেই গ্রাহ্য করে। দ্বিতীয়ত, পত্রগুলো যাদের উদ্দেশ্যে লেখা তাদের হস্তে যথাসময়ে, অথবা আদৌ পৌঁছইয়াছিল কিনা সন্দেহ। তৃতীয়ত, তখন হজের পুরা মৌসুম। দেশের গণমান্য লোকের অধিকাংশ তখন আরাফাতে অথবা খানায় কা'বার সান্নিধ্যে, পবিত্র হজব্রত উদযাপনের ব্যস্ত। বিদ্রোহীরা উদ্দেশ্যমূলকভাবেই এই সময়টি বাছিয়া লইয়াছিল তাদের অসৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। চতুর্থত, অবিদ্রোহী জনগণ হয়ত ভাবিতে পারে নাই, ক্রুব্ধ জনতা শেষ পর্যন্ত খোদ আমীরুল মু'মিনীনকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবে।
মোটের উপর খলিফার পত্র দুইটি দৃশ্যত নিষ্ফল আবেদনেই পর্যবসিত হয়েছিল। কোনো দিক হইতে কোনো রূপ সাহায্যের সাড়া মিলিল না। অদৃষ্ট বাম হইলে এইরূপই হয়। নিতান্ত আপন জনও অপরিচিতের মতো ব্যবহার করে। অন্যথা অন্তত উমাইয়া গোষ্ঠীর লোকেরা তাঁর পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইত।
টিকাঃ
১. দুইটি পত্রের তরজমা: মৌলানা মুহিউদ্দিন খান সম্পাদিত মাসিক 'মদিনা' ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল সংখ্যা হইতে উদ্ধৃত।