📄 দ্বিতীয় পর্যায়- খলিফার সকাশে বিদ্রোহী দল
বিদ্রোহীদের মদিনা ত্যাগের পর কয়েক দিন যাইতে না যাইতে সহসা দেখা গেল, তাদের তিনটি দলই পুনরায় মদিনার উপকণ্ঠে ফিরিয়া আসিয়াছে। নাগরিকদের একটি দল হজরত আলিকে পুরোভাগে রাখিয়া বিদ্রোহীদের নিকট গেল এবং ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিল। তারা তখন একখানি দলিল দেখাইল। একখানি চিঠি, গভর্নরের বরাবর লিখা। ইহাতে খলিফার সীলমোহর অঙ্কিত ছিল এবং লিখা ছিল, 'বিদ্রোহীরা ফিরিয়া গেলে তাহাদের ধৃত করিবে, পীড়ন করিবে, কতককে কারাগারে নিক্ষেপ করিবে এবং অবশিষ্টগুলোকে কতল করিবে।' তারা বলিল, এই দলিল তারা পথে খলিফার একজন ভৃত্যের নিকট হইতে উদ্ধার করিয়াছে। ভৃত্যটি ইহা লইয়া মিসরের পথে যাইতেছিল।
হজরত আলি ইহাকে বিদ্রোহীদের একটি যড়যন্ত্র বলিয়া সন্দেহ করিয়া প্রশ্ন করিলেন, 'সে লোক যদি মিসর যাইতেছিল এবং ফাস্তাতের পথে মিসরীয় প্রত্যাবর্তনকারী দল কর্তৃক ধৃত হয়ে থাকে, তবে এত তাড়াতাড়ি সে খবর কি করিয়া সম্পূর্ণ বিপরীত পথের যাত্রী অর্থাৎ কুফা ও বসরাগামী দুইটি দলের নিকট পৌঁছিল এবং কি করিয়াই বা তিনটি দল এর ভিতর পুনরায় ফিরিয়া আসিয়া একত্রিত হইল।'
উত্তরে তারা বলিল, 'আপনি যাই বলুন, উক্ত চিঠি আমাদের কাছে বিদ্যমান আছে এবং উহাতে খলিফার নামাঙ্কিক সীলমোহর রহিয়াছে।'
হজরত আলি খলিফার নিকট আসিয়া সকল কথা বিবৃত করিলেন। খলিফা বলিলেন, এমন কোনও চিঠি লেখা হয়েছে বলিয়া তিনি কিছু অবগত নহেন। কিন্তু তথাপি তিনি উক্ত অভিযোগের কিনারা করিবার জন্য বিদ্রোহীদের নেতৃবর্গের ভিতর কতিপয় প্রতিনিধিকে সাক্ষাৎ দান করিতে রাজি হইলেন। তারা নির্ধারিত সময়ে খলিফার সমীপে উপস্থিত হইলে হজরত আলি তাদের পরিচয় প্রদান করিলেন। কিন্তু তারা কেহ মাথা নোয়াইল না, বা অভিবাদন করিল না। পরন্তু উদ্ধতভাবে খলিফার সামনে আসিল এবং তাদের অভিযোগগুলোর পুনরাবৃত্তি করিল। তারা বলিল, 'আমরা খলিফার ওয়াদা পাইয়াছিলাম, আমাদের অসন্তোষের প্রতিকার করা হইবে এবং সেই বিশ্বাস লইয়া আমরা স্বদেশে যাইতেছিলাম; কিন্তু প্রতিকারের পরিবর্তে এ কি কাণ্ড? খলিফার এই সেই নিজস্ব ভৃত্য যাকে আমরা ধরিয়া আনিয়াছি এবং খলিফার এই সেই বিশ্বাস ভঙ্গকারী পত্র যাহা লইয়া সে মিসর যাইতে ছিল' তারা উক্ত পত্র ও খলিফার সেই ভৃত্যকে সভাস্থলে হাযীর করিল।
হজরত ওসমান কসম করিয়া বলিলেন, 'আমি এ সমস্তের কিছুই অবগত নহি।' ইহাতে বিদ্রোহী প্রতিনিধিরা দাবি করিল, 'তবে বলুন, কে সেই ব্যক্তি যে এই পত্র লিখিয়াছে।' খলিফা বলিলেন, 'আমি তাহা জানি না।' তারা বলিল, 'কিন্তু এ চিঠি আপনার চিঠি হিসেবে প্রেরিত হয়েছিল এবং আপনারই একজন ভৃত্য ইহা বহন করিতেছিল। এই দেখুন ইহাতে আপনার নামের সীলও অঙ্কিত রহিয়াছে। তথাপি আপনি বলিবেন, আপনি ইহার বিন্দুবিসর্গ কিছুই জানেন না?' ইহার পরও খলিফা বলিলেন, সত্যই তিনি এ ব্যাপার অবগত নহেন।
বিদ্রোহী নেতৃবৃন্দ ক্রুদ্ধ হয়ে উত্তেজিত স্বরে চেঁচাইয়া বলিল, 'হয় আপনি সত্য কথা বলিতেছেন, অথবা আপনি যাহা বলিতেছেন তাহা মিথ্যা। ইহার যে কোনও অবস্থায় আপনি যে খলিফা থাকার অনুপযুক্ত, তাহাই প্রমাণ হইতেছে। আমরা এক ব্যক্তির হাতে শাসনদণ্ড রাখিতে প্রস্তুত নহি, যিনি হয় অপদার্থ না হয় নির্বোধ এবং এত দুর্বল, অন্যকে শাসন করার ক্ষমতা তাঁর নাই। আপনি অবিলম্বে খিলাফৎ ত্যাগ করুন, কেননা আল্লাহ্ উহা আপনার হাত হইতে উঠাইয়া লইয়াছেন।'
হজরত ওসমান বলিলেন, 'আল্লাহ্ যে শাসনভার আমার উপর ন্যস্ত করিয়াছেন, আমি তাহা কোনও ক্রমেই ত্যাগ করিতে পারি না। তবে যে কোনও অন্যায়-অত্যাচার সম্বন্ধে আপনারা অভিযোগ করিবেন, আমি তাহা দূর করিতে প্রস্তুত আছি।'
তারা বলিল, 'এখন আর তাহা বলিলে কি হইবে? সে সময় পার হয়েছে। আপনি বহুবার প্রতিকারের ওয়াদা করিয়াছেন এবং সে সমস্তই খেলাফ করিয়াছেন। ইহার পর আপনার কোনও ওয়াদার ওপর আর আস্থা স্থাপন করা চলে না।' তারা খলিফাকে ইহাও জানাইয়া দিলেন, অতএব তারা তাঁর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিতে থাকিবে, যে পর্যন্ত না তিনি গদী ত্যাগ করেন অথবা নিহত হন।
📄 তৃতীয় পর্যায়- খলিফার উপর আক্রমণ ও গৃহ অবরোধ
আহত অভিমানে খলিফার ভিতরকার সুপ্ত ব্যক্তিত্ব জাগিয়া উঠিল। তিনি তাঁর পদোচিত মর্যাদা ও গাম্ভীর্য বজায় রাখিয়া দৃঢ়তার সহিত উত্তর করিলেন, 'মৃত্যুই আমি শ্রেয় মনে করি, ভয়ে পদত্যাগ অপেক্ষা। যুদ্ধের কথা বলিতেছেন, আমি তো পূর্বেই বলিয়াছি, আমার রোকেয়া আমার গদীরক্ষার জন্য যুদ্ধ বা রক্তপাত করিবে না। সেরূপ অভিপ্রায় আমার থাকিলে আমি বহু সৈন্য-সামন্ত আমার পাশে মোহায়েন রাখিতাম।'
এইভাবে তর্ক ক্রমে কোলাহলে পরিণত হইল এবং উগ্র হয়ে উঠিল। কিন্তু মীমাংসা কিছুই হইল না দেখিয়া হজরত আলি বিরক্ত হয়ে সভাস্থল হইতে উঠিয়া গেলেন এবং ঘরে ফিরিয়া গেলেন। বিদ্রোহী নেতারাও যে যাহার দলে ফরিয়া গেল। কিন্তু তারা যে উদ্দেশ্যে রাজধানীতে আসিয়াছিল তাহা অনেকটা সফল হইল। তারা চাহিয়াছিল রাজধানীতে প্রবেশের সুযোগ ও একটু দাঁড়াইবার স্থান। সে সুযোগ তারা লাভ করিল। নাগরিকদেরও অনেককে তারা দলে ভিড়াইতে পারিবে বলিয়া আশা করিত, আর এই সুযোগের জন্যই তারা শহরে প্রবেশ লাভ করেছিল। মসজিদে নববীর রোজা নামাজে তারা মুসল্লিদের সহিত জামায়াতে শামিল হইতে লাগিল। হজরত ওসমান ইমামতি করার সময় তারা সুযোগ বুঝিয়া তাঁর মুখে ধূলি নিক্ষেপ করিত। তারা নাগরিকদের শাসাইত, তারা যেন খলিফার ব্যাপারে আগাইয়া না আসে এবং বলিত, এক ভয়াবহ দুর্যোগ অতি নিকটবর্তী। রাজধানীর ভিতরে বাহিরে সব মিলাইয়া তারা সংখ্যায় ছিল চারি সহস্র। কাজেই নাগরিকরা ভয় পাইয়া ছিল। সশস্ত্র বিরোধ ও রক্তপাতের পরিবর্তে তারা কামনা করিতেছিল খলিফা ও বিদ্রোহী দলের ভিতর একটা শান্তিপূর্ণ মীমাংসা।
খলিফার সহিত বিদ্রোহী নেতাদের সরাসরি বিতর্কের পর শুক্রবার আসিলে খলিফা যথারীতি জুমা'র নামায পরিচালিত করিলেন। নামাজ শেষে তিনি মিম্বরে বক্তৃতা দিতে উঠিলেন। তিনি প্রথমে নিয়মানুবর্তী নাগরিকদের প্রশংসা করিলেন। নামাজ শেষে তিনি মিম্বরে বক্তৃতা দিতে উঠিলেন। তিনি প্রথমে নিয়মানুবর্তী নাগরিকদের প্রশংসা করিলেন। কারণ তিনি জানিতেন, তারা বিদ্রোহীদের দ্বারা যতই ভীতিপ্রাপ্ত হউক, তারা বিরোধীদের আচরণ সমর্থন করেনা, বরং গর্হিত বলিয়া জানে। ঐ জামায়াতে বিদ্রোহী পক্ষের লোকেরাও ছিল। তাদের ভিতর হইতে এক ব্যক্তি উঠিয়া চিৎকার করিয়া বলিল, 'ওসমান, কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী তোমার জীবনযাপন কর।' হজরত ওসমান ধৈর্য ধারণ করিয়া তাহাকে বসিতে বলিলেন। লোকটি বসিল, কিন্তু কিছুকাল পরে আবার দাঁড়াইয়া তাঁর উক্তির পুনরাবৃত্তি করিল। খলিফা অতঃপর বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: 'তোমরা কি জান না, মদিনাবাসীরা তোমাদের নবীর অভিশপ্ত বলিয়া জানে? কেননা, তোমরা নবীর খলিফা ও প্রতিনিধির বিরুদ্ধে উত্থান করিয়াছ। এক্ষণে তোমরা তোমাদের এই আচরণের জন্য অনুতাপ করো, আর সুকার্য দ্বারা দুষ্কার্যের প্রায়শ্চিত্ত সম্পাদন করো।'
খলিফার বক্তৃতায় রাজভক্ত নাগরিকদের মধ্যে সাড়া জাগিল। তাদের ভিতর হইতে নবীর প্রিয় ও বিশ্বস্ত সাহাবা মুহম্মদ ইবনে আসলাম ও কুরআন সঙ্কলনকারী সাহাবা সায়েদ ইবনে সাবিত একে একে খলিফার বাক্যের সমর্থনে বক্তৃতা করিতে চেষ্টা করিলেন, কিন্তু কুফার হাকিম বিন জাবালা, মুহম্মদ ইবনে কোতাইবা প্রমুখ বিদ্রোহী নেতারা তাহাদের ঔদ্ধত্যভাবে বাধা দিয়া থামাইয়া দিল। মুসল্লিদের ভিতর মহা শোরগোলের সৃষ্টি হইল। মদিনার নিরীহ নাগরিকদের বিদ্রোহীরা প্রস্তর নিক্ষেপ করিতে করিতে মসজিদ ও আঙ্গিনা হইতে বাহির করিয়া দিল। একটি প্রস্তর হজরত ওসমানের মাথায় লাগায় তিনি মাটিতে পড়িয়া গেলেন এবং অজ্ঞান অবস্থায় তাঁকে মসজিদের পার্শ্ববর্তী তাঁর নিজ গৃহে বহিয়া নেওয়া হইল। আঘাত গুরুতর ছিল না। তিনি শিগগিরই জ্ঞানলাভ করিলেন এবং ইহার পর কিছুদিন মসজিদে পূর্ববৎ ইমামতি করিতে সমর্থ হইলেন। কিন্তু ক্রমেই বিদ্রোহীদের ঔদ্ধত্য ও দুর্বলতার মাত্রা ছাড়াইয়া উঠিতে লাগিল এবং অবশেষে তিনি নিজ গৃহেই সব সময় থাকিতে বাধ্য হইলেন। ফলে ইহা প্রকারান্তরে অন্তরীণ অবস্থায় পরিণত হইল। তাঁর নিরাপত্তার জন্য তাঁর আত্মীয়স্বজন ও কতিপয় সহৃদয় প্রতিবেশী অস্ত্রশস্ত্র লইয়া দেহরক্ষীরূপে তাঁর গৃহ পাহারা দিতে লাগিল। বাড়ির লোকজন যাহাতে নিরাপদে বাহিরে যাওয়া আসা করিতে পারে, তারা সেই দিকে লক্ষ্য রাখিল।
খলিফার গৃহরক্ষী এই বিশ্বস্ত বাহিনীতে হজরত আলি, জুবায়ের ও তাল্হা প্রত্যেকে একটি করিয়া পুত্র পাঠাইয়াছিলেন গোড়া হইতেই। কিন্তু তাঁরা নিজেরা কেহ অস্ত্র ধারণ করেন নাই। বস্তুত এই দুঃসময় পরিস্থিতির আরম্ভ হইতেই তাঁরা এই ব্যাপারে নির্লিপ্ততা প্রদর্শন করিতেছিলেন বলিয়া একশ্রেণীর রাবী আক্ষেপ করিয়াছেন। মসজিদের গণ্ডগোলের পর এবং খলিফা অজ্ঞান অবস্থায় গৃহে আনীত হইবার পর তাঁরা অন্যান্য নাগরিকদের সহিত খলিফার গৃহে গেলেন, তিনি কেমন আছেন জানার জন্য। কিন্তু তাঁরা প্রবেশ মাত্র মারওয়ান ও খলিফার অন্যান্য নিকট আত্মীয়রা, যাঁরা খলিফার শুশ্রূষা করিতেছিলেন, তাঁরা ক্রুদ্ধভাবে চীৎকার করিয়া উঠিলেন। হজরত আলির প্রতি এবং তিনি এই বিপদে মূল স্রষ্টা বলিয়া দোষারোপ করিলেন। এই বিপদ একদিন তাঁর নিজের উপরও আবর্তিত হইবে, এই বলিয়া তাঁরা অভিসম্পাত করিলেন।
এই দুর্ব্যবহারের পর হজরত আলি ক্রুদ্ধ হয়ে সেখান হইতে প্রস্থান করিলেন। তাঁর সঙ্গের লোকেরাও চলিয়া গেল। খলিফাকে এই সময় এইরূপে ত্যাগ করিয়া যাওয়া ছিল তাদের পক্ষে চরম নিষ্ঠুরতা ও ভীরুতা এবং ইহার বিষময় ফল শুধু একা ভোগ করেন নাই, তাঁহাদের প্রত্যেককেই ভূগিতে হয়েছিল। ইহা শুধু নৈতিক হিসাবেই অন্যায় কার্য ছিল না, রাজনীতির দিক দিয়াও একটা মারাত্মক ভুল ছিল। সম্পূর্ণ নিয়মানুগভাবে যে ব্যক্তিকে শাসনক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে, আনুগত্যের প্রকাশ্য খেলাফে, এই উচ্ছৃঙ্খল গণ-উত্থান কোন মতেই সমর্থনযোগ্য ছিল না এবং সাহসের সহিত ও কঠোর হস্তে উহা দমন করার প্রয়োজন ছিল। এই সহজ সত্যটি তদানীন্তন একজন সাহাবির মুখে এইভাবে ব্যক্ত হয়েছিল- 'হে কোরাইশ, তোমাদের উপর অপর আরবদের হামলা আসিবে, সে সম্পর্কে এখন পর্যন্ত প্রবেশ-দরওয়াজা দৃঢ়ভাবে অর্গল বন্ধ রহিয়াছে; তোমরা কেন সেই দরওয়াজা ইচ্ছা করিয়া ভাঙ্গিয়া ফেলিতেছ?'
খলিফা যখন নিজ গৃহে অন্তরীণাবদ্ধ, সেই সুযোগে বিদ্রোহীরা মসজিদে নববী ও খলিফার প্রাসাদের দ্বার সম্পূর্ণ নিজেদের অধিকারে লইয়া লয়। তাদের ঔদ্ধত্য এতটা চরমে উঠে যে তাদের দলপতি অল্ গাফিকী (যাহাকে তারা আমির বা সর্বাধিনায়ক বলিত) মসজিদে নববীতে, যে আসনে দাঁড়াইয়া খলিফা নামাজের ইমামতি করিতেন, সেই আসন গ্রহণ করে।
দুর্ভাগ্যবশত মদিনায় কোনও সৈন্যবাহিনী ছিল না। সৈন্যরা রাজ্যের চতুর্দিকে যুদ্ধব্যপদেশে বিক্ষিপ্ত ছিল। যে সামান্য কয়েকজন যোদ্ধা খলিফার প্রসাদ রক্ষাচ্ছিল, তাদের উপরই খলিফাকে নির্ভর করিতে হয়। ইহারা ছিল খলিফার আত্মীয়স্বজন, একদল গৃহ-ভৃত্য এবং হজরত আলি, যুবায়ের ও তাহার পুত্রদের লইয়া মোট আঠার কি উনিশ জন। অবস্থা যখন এমন সঙ্গীন হয়ে উঠিল যে, হজরত ওসমানের অন্তিম দিবস আর বেশি দূরে নয় বলিয়া তাঁর মনে হইল, সেই অবস্থায় তিনি একদিন হজরত আলি, যুবায়ের ও তালহাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন, আর একবার সাক্ষাৎ ইচ্ছায়। তাঁরা আসিলেন এবং প্রবেশপথ না পাইয়া প্রাসাদের বাহিরে দাঁড়াইয়া থাকিলেন, তবে এত নিকটে যে ভিতরের কথা তাঁরা শুনিতে পান। খলিফা তাঁর গৃহের ছাদে উঠিয়া তাঁহাদের দেখা দিলেন এবং বসিতে অনুরোধ করিলেন। তাঁর কিছুক্ষণের জন্য বসিলেন। কিন্তু এ বসা নিরিবিলি ছিল, শত্রুমিত্র সব ছিল একত্রে।
হজরত ওসমান শক্তি সঞ্চয় করিয়া উচ্চকণ্ঠে বলিতে লাগিলেন, 'প্রিয় নাগরিকরা, আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর নিকট মোনাযাত করিয়াছি এই বলিয়া, আমাকে যখন তিনি নিবেন, তারপর খিলাফৎ যাতে ঠিকভাবে চলে, তিনি যেন সেই ব্যবস্থা করেন। অতঃপর তিনি জনগণের খিদমতে পূর্বে যাহা যাহা করিয়াছেন, তৎসমুদয় উল্লেখ করিলেন এবং কিভাবে আল্লাহ তাঁকে নবীর উত্তরাধিকারীরূপে খলিফা ও আমিরুল মু'মেনীন করার জন্য মঞ্জুরি প্রদান করেন, তাহা বলিলেন। সেই সঙ্গে বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করিয়া তিনি বলিতে লাগিলেন, 'আল্লাহ্ যাহাতে আমিরুল মু'মেনীন হিসেবে মঞ্জুরি দিয়াছেন, এখন তোমরা আল্লাহর সেই মনোনীত ব্যক্তিকে হত্যা করিতে কোমর বাঁধিয়াছ। হে লোকগণ, হুঁশিয়ার হও! মাত্র তিন অবস্থায় মানুষের জীবন লওয়া বিধেয়- ধর্ম-বিচ্যুতি ও কুফরিতে প্রত্যাবর্তন, নরহত্যা এবং ব্যভিচার। এইসব কারণ না থাকা সত্ত্বেও আমার জীবন নাশ করায় তোমরা তোমাদের নিজেদেরই গর্দানের ওপর তলোয়ার ঝুলাইয়া দিতেছ, যাহা যে-কোনো মুহূর্তে তোমাদের গর্দানে পড়িতে পারে। ইহার পরিণাম এই হইবে, রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও রক্তপাত হইবার পর তোমাদের মধ্য হইতে কোনও দিন তিরোহিত হইবে না।'
খলিফার কথা এই পর্যন্ত শুনার পর বিদ্রোহীরা চীৎকার করিয়া উঠিল এবং বলিল, 'ইহা ছাড়া আরও চতুর্থ একটি কারণ আছে, যে জন্য জীবন নাশ হালাল হইতে পারে- সে হইতেছে, যখন হক বাতিল হয় বে-ইনসাফ দ্বারা এবং লোকের ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ন হয় জুলুমের দ্বারা। আল্লাহর নাফরমানি এবং স্বেচ্ছাচারিতামূলক অত্যাচারের (tyranny) জন্য আপনাকে হয় গদি ছাড়িতে হইবে, না হয়, মৃত্যু বরণ করিতে হইবে।"
হজরত ওসমান, মুহূর্তকাল চুপ করিয়া রহিলেন, তারপর শান্তভাবে উঠিয়া নাগরিকগণকে গৃহে ফিরিয়া যাইতে বলিলেন। তিনি নিজেও অবস্থার কোনও প্রকার উন্নতির আশা না দেখিয়া ছাদ হইতে অবতরণ করিলেন এবং ক্ষুণ্ণ মনে পুনঃ নিজ নিরানন্দ গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন। আশ্চর্য এই, মদিনার অধিবাসীরা নীরবে সব সহ্য করিল। কোরাইশদের তো অধিকাংশ পূর্বেই সিরিয়ায় চলিয়া গেল।
খলিফা অবরুদ্ধ অবস্থায়ই কাল-যাপন করিতে লাগিলেন। কোনও কোনও বিবরণীতে দেখা যায়, তিনি প্রথম আক্রমণের পর ত্রিশদিন মসজিদে ইমামতি করেছিলেন এবং তারপর চল্লিশ দিন সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ অবস্থায় কাটাইয়া ছিলেন। আর ইহাই অধিকাংশ বর্ণনাকারীর মতো।
অবরোধের কয়েক সপ্তাহ পর সংবাদ রাষ্ট্র হইল, সিরিয়া ও বসরা হইতে খলিফার সাহায্যে সৈন্য আসিতেছে। এই সংবাদে বিদ্রোহীদল আরও দৃঢ় হইল এবং খলিফার গৃহ এমনভাবে ঘেরাও করিয়া রাখিল, অতঃপর একটি প্রাণীও আর সে গৃহে প্রবেশ করিবে বা তথা হইতে নির্গত হইবে এমন উপায় রহিল না।