📄 খলিফার কৈফিয়ত
হিজরি ৩৫ সন। মদিনার আকাশে-বাতাসে একটা শঙ্কার ভাব। মানুষগুলো যেন হঠাৎ বৃদ্ধ হয়ে পড়িয়াছে। রাস্তাঘাটে হাসিমুখ দেখা যায় না। সর্বত্র কেমন একটা থমথমে ভাব, একটা গুমট। কি যেন কি ঘটিতে যাইতেছে, এমনি একটা অজানা উদ্বেগ সকলের মুখে প্রকট। খলিফার শাসনব্যবস্থায় লোকে আস্থা হারাইয়াছে। যেন যা খুশি তাই করাতেও শান্তির কোনও ঝুঁকি নাই।
হিজরি ৩৪ কি ৩৫ সনের কথা। রাজধানীর বুকে প্রথম যিনি খলিফার হুকুম রদ করেন তিনি ছিলেন মজলিশে শুরার সভাপতি স্বয়ং আবদুর রহমান বিন আউফ। কথিত আছে, একদিন এক বেদুইন সর্দারের নিকট হইতে খলিফার নিকট কিছু খাজনা আসে, আর ঐ সঙ্গে আসে একটি সুদৃশ্য উট। উহাও খিরাজের শামিল ছিল। এমন মনোহর উট নাকি সচরাচর দৃষ্ট হইত না। খলিফা উটটি তাঁর এক প্রিয় জ্ঞাতিকে উপহার দেন। আবদুর রহমান ইহা জানিতে পারিয়া খলিফার কাজের ঘোর নিন্দা করেন এবং বলেন, উটটি যখন বায়তুল মালের অন্তর্ভুক্ত উহা গরিব-দুঃখীদের প্রাপ্য। বায়তুল মাল কাহারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নহে। ব্যক্তি বিশেষকে খুশি করার জন্য খলিফা উহা দান করিবেন, এমন অধিকার শরিয়ত তাঁকে দেয় নাই। আবদুর রহমান শুধু এইটুকু করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই। উটটি যখন দান গৃহীত তার বাড়িতে লইয়া যাওয়া হইতেছিল, আবদুর রহমান বাধা দেন এবং রাস্তা হইতে উহা ছিনাইয়া লন। তৎপর উহা জবেহ করিয়া তিনি তার সমুদয় গোশত গরীব-দুঃখীদের ভিতর বিতরণ করেন।
প্রকাশ্য রাস্তায় এমন একটি ঘটনা ঘটিল, অথচ ইহার জন্য আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে কেহ কোনও উচ্চবাচ্য করিল না। খলিফা নিজেও কিছু বলিলেন না। লোকদের মনে প্রতীতি জন্মিল, এরূপ অকর্মণ্য লোক দ্বারা একটা বিশাল সাম্রাজ্যের শাসনকার্য চলিতে পারে না। শহরের নির্যাতিত লোকেরা খলিফার বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ হইতে লাগিল। তারা এমন কথাও বলাবলি করিতে লাগিল, রাষ্ট্রের শাসনকার্য সংশোধন করিতে হইলে প্রদেশের চাইতে সম্ভবত রাজধানীতেই তরবারির প্রয়োগ আগে দরকার হইবে।
মদিনার প্রধান প্রধান নাগরিকরা অবস্থার গুরুত্ব উপলব্ধি করিয়া হজরত আলিকে খলিফার নিকট পাঠাইলেন, তাঁকে সদুপদেশ দেওয়ার জন্য। হজরত আলি খলিফার নিকট গিয়া বলিলেন, 'নাগরিকগণ আমাকে অনুরোধ করিয়াছে, আপনার সহিত বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা করিতে এবং একটা সমঝোতায় উপনীত হইতে। কিন্তু আমি আপনাকে কি বলিব, আপনি রাসুলে করিমের জামাতা এবং একজন প্রবীণ ব্যক্তি। এমন কি আপনাকে বলিবার আছে, যাহা আপনার জানা নাই। আপনি সবই জানিতে পারিতেছেন এবং এ অবস্থায় কি করা দরকার তাহাও আপনার অজানা নহে। কিন্তু আপনি তার পন্থা দেখিয়াও দেখিতেছেন না, চক্ষু বন্ধ করিয়া বসিয়া আছেন। আপনি কি খেয়াল করছেন না, রক্তপাত একবার শুরু হইলে তাহা আর বন্ধ করা যাইবে না, কোনও দিন যাইবে না, বরাবর তার স্রোত চলিতে থাকিবে। ন্যায়নীতি দুনিয়া হইতে বিলুপ্ত হইবে এবং বিশ্বাসঘাতকতা ও রাজদ্রোহিতা সারা মুসলিম-জাহান প্লাবিত করিবে।' হজরত আলি খলিফার নিয়োজিত শাসকবর্গের অত্যাচার, অবিচার ও অহমিকার দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন। কারণ, তাঁহাদের ব্যবহারই রাজ্যময় অশান্তি সৃষ্টি করেছিল এবং বিদ্রোহের মূল কারণ ছিল। হজরত ওসমান ইহা শুনিয়া এই বলিয়া আক্ষেপ করিলেন, হজরত আলির মতো যাঁরা রাষ্ট্রের শক্তিস্তম্ভ, তাঁরা সহিত বন্ধুচিত আচরণ করছেন না এবং খলিফার এরূপ অভিযোগ হয়ত নিতান্ত ভিত্তিহীনও ছিল না। তিনি বলিলেন, 'প্রজাবর্গের ক্ষোভ নিবারণের জন্য আমার যথাসাধ্য আমি করিয়াছি। কিন্তু তুমি যে সমস্ত লোকের সম্বন্ধে অভিযোগ করিতেছ, তাঁহাদের সম্বন্ধে একে একে ভাবিয়া দেখ-কুফার গভর্নর মুগীরা প্রথম কাহার দ্বারা নিযুক্ত হয়েছিল? সে কি স্বয়ং হজরত উমর কর্তৃক নিয়োজিত শাসক নহে? বসরার গভর্নর ইবনে আমির আমার আত্মীয় বলিয়া দোষারোপ করছে, কিন্তু আমার আত্মীয় বলিয়াই কি সে ব্যক্তিকে অযোগ্য মনে করিতে হইবে? এমন কি সে করিয়াছে যাহার জন্য তাহাকে দোষ দেওয়া যাইতে পারে? হজরত আলি কহিলেন, 'ইহা সত্য যে মুগীরাকে এবং আর কেহ কেহকে হজরত ওমর নিযুক্ত করিয়া গিয়াছিলেন, কিন্তু হজরত ওমর তাঁহাদের কড়া শাসনে রাখিতেন। তাঁরা অন্যায় কিছু করিলে কঠিন দণ্ড দিতেন। পক্ষান্তরে আপনি এরূপ ক্ষেত্রে নরম ব্যবহার দেখান, যেহেতু তাঁরা আপনার আত্মীয়।'
খলিফা কহিলেন, 'মু'য়াবিয়াকেও তো হজরত উমরই সিরিয়ার গভর্নর নিয়োজিত করিয়া গিয়াছেন?” উত্তরে হজরত আলি কহিলেন, 'হ্যাঁ, ইহা সত্য, কিন্তু ইহাও আমি কসম করিয়া বলিতে পারি, হজরত উমরের গৃহভৃত্যেরাও প্রভুকে ততখানি ভয় করিত না, যতখানি মু'য়াবিয়া ভয় করিত হজরত উমরকে। আর এখন? সে যা-খুশি তাই করে, আর বলে, আমি খলিফার মতো অনুযায়ী করিতেছি। আর আপনি এ সব জানিয়া-শুনিয়াও তাঁকে ছাড়িয়া দিতেছেন।'
হজরত ওসমানের ইহার উত্তরে বিশেষ কিছু বলিবার ছিল না। হজরত আলি তাঁর বক্তব্য শেষ করিয়া খলিফার নিকট হইতে প্রস্থান করিলেন। রাষ্ট্রীয় অবস্থার কোনও উন্নতির লক্ষণ তিনি দেখিলেন না। তিনি খলিফাকে প্রথমেই বলিয়াছিলেন, তিনি জনগণের পক্ষ হইতে আসিয়াছেন। তাই খলিফা সরাসরি মসজিদে নববীতে গিয়া মিম্বরে দাঁড়াইলেন এবং নামাযের জন্য উপস্থিত জনসঙ্ঘকে সম্বোধন করিয়া বক্তৃতা করিলেন। তিনি তাহাদের ভর্ৎসনা করিয়া বলিলেন, 'তোমরা খলিফার বিরুদ্ধে এখন মুখ খুলিয়াছ এবং তাঁর নিন্দায় মুখর হয়ে উঠিয়াছে। আর এমন সব নেতার অনুসরণ করছে যাদের উদ্দেশ্য হইল খলিফার নামে কলঙ্ক প্রচার ও তাহার সৎকার্যগুলো অনুক্ত রাখিয়া শুধু দোষ-ত্রুটিকে বড় করিয়া দেখান। তোমরা এমন সব কার্যের জন্য এখন আমার প্রতি দোষারোপ করিতেছ হজরত উমরের সময় তোমরা হাসিমুখে সহিয়াছ। তিনি তোমাদের পদদলিত করিয়াছেন এবং গালি-গালাজ করিয়াছেন। কিন্তু তোমরা নীরবে ধৈর্যের সহিত সে সমস্ত সহ্য করিয়াছ যাহা তোমরা পছন্দ করিতে না, সব ক্ষেত্রেই আমি তোমাদের সহিত ভদ্র ব্যবহার করিয়া আসিয়াছি, তোমাদের নিকট আমার পৃষ্ঠনত করিয়াছি, আমার জিহ্বাকে সংযত রাখিয়াছি কাহারও প্রতি কু-বাক্য প্রয়োগ হইতে এবং আমার হস্তকে সংযত রাখিয়াছি কাহাকেও আঘাত করা হইতে। আর এখন আমারই বিরুদ্ধে তোমরা মস্তক উত্তোলন করিয়াছ!'
অতঃপর তাঁর শাসন-আমলে সাম্রাজ্যের কি পরিমাণে শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে খাস আরবে ও বহিঃএলাকাসমূহে এবং তাঁর সময়ে কত প্রকারে তারা উপকার প্রাপ্ত হয়েছে, সেই সব বর্ণনা করিয়া খলিফা আবেদন করিলেন- 'অতএব, আমার অনুরোধ, আমার ও আমার অধীনস্থ শাসকদের সম্বন্ধে নিন্দা ও দোষারোপ হইতে নিবৃত্ত হও, যাহাতে বিদ্রোহ ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার আগুন জ্বলিয়া না ওঠে এবং রাজ্যময় ছড়াইয়া না পড়ে।'
উপস্থিত জনগণ খলিফার আবেদনে শান্ত হইল। খুব সম্ভব উহা তাদের অন্তর স্পর্শ করেছিল। কিন্তু সমস্তই পণ্ড হইল ঔদ্ধত্য, মন্ত্রী মারোয়ানের দ্বারা। খলিফার বক্তৃতা শেষ হইবামাত্র দাঁড়াইয়া চীৎকার করিয়া বলিল, 'এর পরও তোমরা যদি খলিফার বিরোধিতা কর, আমরা অচিরে তরবারির সাহায্যে এই বিষয়ের চূড়ান্ত মীমাংসা করিব।' খলিফা মারোয়ানকে ধমক দিয়া বসাইয়া দিলেন এবং বলিলেন, "তুমি চুপ করো, আমার লোকজনের সহিত আমাকে কথা বলিতে দাও। আমি কি পূর্বেই তোমাকে কথা বলিতে নিষেধ করি নাই?' মারোয়ান চুপ করিল। হজরত ওসমানও দুঃখের সহিত মিম্বর হইতে নামিয়া গেলেন। মারোয়ানের একটি কথায় খলিফার সব বক্তৃতা ও আবেদন ব্যর্থ হইল। ইহার পর জনগণের ভিতরকার অসন্তোষ ক্রমে বাড়িয়া চলিল এবং দিন দিন বিস্তৃতি লাভ করিতে লাগিল। খলিফার বিরুদ্ধে বৈঠক ও জটলাও বাড়িয়া চলিল।
হজরত ওসমানের রাজত্বের একাদশ বর্ষ-হিজরি ৩৫ সন-এইভাবে নানা তিক্ততার ভিতর দিয়া উত্তীর্ণ হইল। সময় বসিয়া থাকে না। এই বৎসরের শেষ ভাগে আসিল হজের মৌসুম। খলিফা অন্যান্য বৎসরের মতো এবারও হজ ব্রত সম্পাদনের জন্য প্রস্তুত হইলেন। কিন্তু তিনি হয়ত জানিতেন না, ইহাই তাঁর জীবনের শেষ হজ উদ্যাপন।
📄 আসন্ন বিপ্লব নিবারণে খলিফার প্রয়াস
হজরত ওসমান ইহার পর ঘটনার স্রোতে দ্রুত ভাসিয়া চলিলেন। তাঁরা প্রধান হিতাকাঙক্ষী আবদুর রহমান বিন আউফ যিনি তাঁর আজীবন সহচর ও দুঃখের সমব্যথী ছিলেন, বিপদের মুখে যিনি নিঃসঙ্কোচে সতর্কবাণী উচ্চারণ করিতেন, তিনিও পরলোক গমন করিলেন। খলিফাকে তিনি স্নেহ করিতেন; দোষ দেখিলে গুরুজনের মতোই ভর্ৎসনা করিতেন। খলিফা ভুল আদেশ দিলে তিনি তাহা পাল্টাইতে পশ্চাদপদ হইতেন না, ইহাও আমরা লক্ষ্য করিয়াছি। এহেন একজন সহায় হারাইয়া খলিফা যেন ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখিলেন। কিন্তু তাঁর নৈরাশ্যের ইহাই প্রথম সূচনা নহে; ইহার দিনই তিনি বুঝিতে পারের তাঁর সৌভাগ্য-সূর্য মধ্য-গগন অতিক্রম করিয়াছে এবং অন্ত-পথে তার প্রয়াণ শুরু হয়েছে। হজরত ওসমানের রাজত্বের তখন সপ্তম বর্ষ। চতুর্দিকে আরব জাতির বিজয়-দুন্দভি সগৌরভে ঝষ্কৃত হইতেছে। খলিফার যশঃ রাশিতে দিক-দিগন্ত প্লাবিত। কি দানে, কি জাতির কল্যাণজনক কাজে, কি ধার্মিকতায়, কি সমবেদনায়, সকল দিক দিয়া তিনি একজন আদর্শ নৃপতির দুর্লভ গৌরবে মণ্ডিত। জনহিতকর কাজে তাঁর ব্যস্তাতার অবধি নাই। তার মধ্যে কূপ খনন ছিল একটি উল্লেখযোগ্য কার্য। আরবেরা পানির জন্য চিরকাঙ্গাল, কে না জানে। মদিনার পুরাতন কূপগুলো আরও গভীর করা এবং দরকারমতো শহরের আশপাশে নতুন কূপ খনন করা ছিল তাঁর একটি প্রিয় পেশা। একদিন শহরের প্রায় দুই মাইল দূরে আরিস নামক পল্লীতে তিনি একটি কূপের পাশে দাঁড়াইয়া অঙুলি দ্বারা শ্রমিকদের কাজ দেখাইতেছিলেন, সেই সময় হঠাৎ তাঁর অঙুলি হইতে নবীর ব্যবহৃত সীলমোহরের আংটিটি খসিয়া কূপের ভিতর পরে যায়। আংটি উদ্ধারের জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করা হইল। কূপের সমুদয় পানি উঠাইয়া ফেলা হইল। কাদা পর্যন্ত তোলা হইল। কিন্তু এত চেষ্টা করার পরও আংটির সন্ধান মিলিল না। আংটিটি রৌপ্য-নির্মিত ছিল এবং হজরত রাসুলের সীলমোহরের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করান হয়েছিল। উহাতে তিনটি শব্দ-মোহাম্মদ রাসুল উল্লাহ-খোদিত ছিল এবং শব্দগুলো নিচ হইতে উপরে এইভাবে সাজান ছিল। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে নবী যখন বিভিন্ন রাজন্যবর্গের নিকট ইসলামের দাওয়াত প্রেরণ করেন, তখন সেই লিপিগুলো এই আংটি দ্বারা সীল করা হয়েছিল। তাহা ছাড়া, যে সকল মূল্যবান দলিলে সীলমোহর অঙ্কিত করার প্রয়োজন হইত, সেগুলোতেও এই আংটি দ্বারা ছাপ মারা হইত। হজরত নিজে ইহা করিতেন; তাঁর পরবর্তী দুই খলিফাও তাহাই করিয়াছেন। তাঁদের পর আংটিটি হজরত ওসমানের ব্যবহারে আসে। কিন্তু মানুষের দুর্ভাগ্য যখন ঘনাইয়া আসে তখন নানা দিক দিয়াই ভুল-ভ্রান্তি ও বিভ্রাট ঘটিতে শুরু করে। হজরত ওসমানেরও চরম দুর্ভাগ্যের নিদর্শন প্রকাশ পায় এই পবিত্র আংটির অন্তর্ধানে। অঙুরীর শোকে হজরত ওসমান মর্মান্তিক দুঃখ পাইয়াছিলেন এবং এই আকস্মিক ঘটনাকে ভবিষ্যতের জন্য একটা কুলক্ষণ মনে করিয়া তিনি দারুন দুশ্চিন্তায় নিপতিত হয়েছিলেন। কথিত আছে, ইহার পর অনুরূপ আর একটি আংটি তাঁর জন্য প্রস্তুত করানোর ব্যাপারে তাঁকে রাজি করিতে অনেক দিন সময় লেগেছিল এবং পরে-প্রস্তুত-করা এই নতুন আংটিটিও তাঁর শাহাদতের সময় হারাইয়া যায়, আর কখনও উহা পাওয়া যায় নাই।
যাহা হউক, আবদুর রহমান বিন আউফের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত রাজধানীতে একটা শালীনতা বিরাজ করিত। খলিফার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা গোপনে তাদের প্রচারকার্য চালাইত। কিন্তু এক্ষণে প্রকাশ্যভাবেই যেখানে-সেখানে তাদের জটলা এবং যুক্তি-পরামর্শ চলিতে লাগিল। খলিফার বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের এই প্রকার প্রস্তুতির কথা জনশ্রুতির মাধ্যমে রাজধানী হইতে দূরবর্তী প্রদেশসমূহে ছড়াইতে লাগিল। ইহা বড় বড় শহরের সম্ভ্রান্ত শ্রেণির লোকদের জন্য বিশেষ অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াইল। উচ্চ-নিচ সকল শ্রেণির নাগরিকের মনেই ভাবী রাষ্ট্র-বিপ্লব ও তজ্জনিত বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা জমা হইতে লাগিল। যাহারা মদিনায় বাস করিতেন তারা অনবরত দূরবর্তী অঞ্চলের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব হইতে চিঠিপত্র পাইতে লাগিলেন একটু সংবাদের জন্য চারিদিকের। এই সব অমঙ্গলসূচক জনরবের অর্থ কি এবং অদূর ভবিষ্যতে কি বিপদ আসিতে পারে। রাজধানীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা খলিফার দরবারে আসিতেন প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে খাঁটি তথ্য সংগ্রহের জন্য। কিন্তু সেখানেও ভিতরে ভিতরে শঙ্কাজনক কানাকানি ও চাপাচাপি চলিত; প্রকাশ্যে উপরে উপরে ঘূর্ণিঝড়ের প্রাক্কালীন প্রশান্তির মতোই পরিস্থিতি ঠাণ্ডা মনে হইত, যেন বিশেষ কিছুই ঘটিতে যাইতেছে না।
অবশেষে রাজধানীর প্রধান প্রধান ব্যক্তিবর্গের পরামর্শমতো খলিফা অবস্থা আয়ত্তে আনার জন্য তৎপর হইলেন এবং হজ-যাত্রার পূর্বেই চারিজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে চারটি প্রধান কেন্দ্রে পাঠাইলেন পরিস্থিতি সম্বন্ধে সরজমীন ওয়াকিফহাল হয়ে প্রকৃত তথ্য তাঁকে জানাইবার জন্য। কেন্দ্রগুলোর নাম কুফা, বসরা, ফাস্তাত (মিসরে) এবং দামেস্ক। পর্যবেক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছিলেন, (১) ওসামা ইবনে জায়েদ, যিনি হজরত রসুলের ওফাতের পর সিরিয়ায় প্রেরিত মুসলিম অভিযানে নেতৃত্ব করেছিলেন, (২) আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর, (৩) আম্মারা, যিনি হজরত উমরের খুব বিশ্বস্ত ছিলেন এবং (৪) মুহম্মদ ইবনে মুসলানা যাঁহাকে হজরত উমর অনেক সময় গোপন মিশনে পাঠাইতেন এবং স্বয়ং নবীও পাঠাইতেন। ইঁহাদের বলিয়া দেওয়া হয় যে, তাঁরা যেন বিশেষভাবে লক্ষ্য করেন, কোনখানে সন্দেহজনক কোন লক্ষণ নজরে পড়ে কিনা। তিন ব্যক্তি ফিরিয়া আসিয়া খলিফাকে জানাইলেন, শাসনকার্য শৃঙ্খলামতো চলিতেছে, কোথাও কোন ব্যতিক্রম বা শাসন-বিরোধিতা দৃষ্ট হইল না। চতুর্থ ব্যক্তি আম্মার ফিরিয়া আসিল না। ঐ ব্যক্তি মিসরিয় বিদ্রোহীদল কর্তৃক বশীভূত হয়েছিল। অতঃপর হজরত ওসমান এই মর্মে একটি ফরমান জারি করিলেন: 'আগামী হজ-মৌসুমে সকল প্রাদেশিক শাসনকর্তা প্রচলিত রীতি অনুযায়ী খলিফার দরবারে উপস্থিত হইবেন। কোন অভিযোগ তাঁহাদের বিরুদ্ধে থাকিলে তাহা, অথবা অন্য যে কোনও ক্ষোভের কারণ কাহারও থাকিলে, তাহা ঐ সময় তারা খলিফার দরবারে উপস্থিত করিতে পারিবে। তারা যেন প্রকাশ্য দরবারে তাদের অভিযোগ প্রমাণিত করে এবং তারা তাহা করিলে তাদের প্রতি অনুষ্ঠিত অন্যায়ের প্রতিবাদ করা হইবে। অন্যথা তাদের পক্ষে উচিত হইবে, যে সমস্ত ভিত্তিহীন নিন্দা প্রচারিত হওয়ার ফলে জনগণের মনে অশান্তির সৃষ্টি হয়েছে, সে সমস্ত প্রত্যাহার করা।'
ঘোষণাপত্র যথারীতি প্রচার করা হইল এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে লোক মারফত ইহা পড়াইয়া শুনান হইল। খলিফার এই করুণ আবেদন লোকেরা শুনিল এবং তাদের মনে উহা প্রভাব বিস্তারও করিল। অনেক স্থানে লোকেরা উহা শুনিয়া তাঁর জন্য দুঃখে অশ্রুপাত করিল এবং তাঁর কল্যাণের জন্য আল্লাহ্র কাছে রহমত চাহিয়া মোনাজাত করিল।
মক্কার হজ সমাপ্ত করিয়া গভর্নররা নির্ধারিত সময়ে মদিনায় উপস্থিত হইলেন; কিন্তু তাঁহাদের সম্বন্ধে কোনও স্থান হইতে অভিযোগ আসিল না। তাঁরাও কেহ স্বীকার করিল না যে, তাঁহাদের বিরুদ্ধে কাহারও কোনো অভিযোগ আছে। খলিফা যে তদন্ত পাঠাইয়াছিলেন, তাঁরাও অনুসন্ধান করিয়া কোথাও কোনো গোলমালের হেতু পান নাই। কিন্তু খলিফা নিশ্চিত হইতে পারিলেন না। তিনি গভর্নরদের সম্বোধন করিয়া কহিলেন, 'আফসোস এ সমস্ত শুনিতেছি আপনাদের সম্বন্ধে? আমর প্রিয় প্রতিনিধি ও শাসকগণ! আমার খুবই মনে হইতেছে, প্রজাপুঞ্জের অভিযোগের মূলে সত্যতা থাকিতে পারে। আর তাই যদি হয়, তবে তাহার দায়িত্ব আমার উপরই অর্পে, কেননা, আপনারা আমার হয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করছেন।' তাঁরা উত্তরে বলিলেন, 'আমরা নিজেদের কি বলিব খলিফাতুল মুসলেমিনে নিজের বিশ্বস্ত লোকেরাও তো স্থানীয় তদন্ত পরিচালনা করিয়া আসিয়াছেন। তাঁরাও তো নিন্দনীয় কিছু দেখিতে পান নাই।'
সভায় অভিজ্ঞ প্রাক্তন গভর্নরগণও উপস্থিত ছিলেন। খলিফা কহিলেন, 'তবে কি করা যায়?' উত্তরে সা'দ বিন আবি ওক্কাস বলিলেন, 'যে সমস্ত কুচক্রী অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়া প্রজাদের উস্কানি দিয়া বেড়াইতেছে, তাহাদের খুঁজিয়া বাহির করা হউক এবং তরবারির মুখে নিক্ষেপ করা হউক। তাহা হইলে বিদ্রোহের গোলমাল থামিয়া যাইবে।'
মু'য়াবিয়া কহিলেন, 'সিরিয়ায় কোনও রাষ্ট্র-বিদ্বেষী লোক নাই; আমার বিশ্বাস, অন্যান্য প্রদেশেও এইরূপ অবস্থা দাঁড়াইত যদি লোকদের উপর এক দিকে ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার করা হইত এবং অপর দিকে শাসন দৃঢ় করা হইত।'
সাঈদ ইবনে আল আ'স বলিলেন, 'রাজভক্তদের পুরস্কার স্বরূপ বার্ষিক বৃত্তি কমান বা রহিত করা হউক।'
আবদুল্লাহ বিন আমির কহিলেন, 'অশান্ত অস্থিরমতি লোকদের যুদ্ধে পাঠান হউক; তাহা হইলে তারা খুশি হইবে, এদিকে অশান্তিও দূর হইবে।'
আমরু পূর্ব হইতেই খলিফার উপর বিরূপ ছিলেন। তিনি খলিফার নির্বুদ্ধিতাকেই সকল গোলযোগের কারণ বলিয়া তাঁকে ভর্ৎসনা করিলেন।
স্থানীয় তদন্তে কিছু প্রকাশ পায় নাই সত্য এবং উপরে উপরে সমস্তই শান্ত ও স্বাভাবিক অবস্থা বলিয়াই মনে হইতেছে। অথচ চিন্তাশীল নাগরিকমাত্রেই অনুভব করিতেছিলেন, রাজনৈতিক সংস্থার ভিতর যে দুষ্টবিষ সংক্রমিত 'হয়েছে তাহা ইতোমধ্যেই গভীরে প্রবেশ করিয়াছে। উহা ভিতরে ভিতরে দ্রুতগতিতে প্রসার লাভিতেছিল। বিপন্ন খলিফা তাঁর প্রতিনিধিদের এবং রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সহানুভূতিযাজ্ঞা করেছিলেন এবং তাঁহাদের সকলের পরামর্শ চাহিয়াছিলেন। কিন্তু এরূপ জটিল পরিস্থিতিতে কিইবা পরামর্শ দেওয়া চলে। নানাজনে নানা উপদেশ দিলেন।
তাহার কোনটিই এমন ছিল না, সোজাসুজি অনুসরণ করা যাইতে পারে। এক শ্রেণির উপদেষ্টা বলিলেন, 'গভর্নরগণ তাঁহাদের আচরণ সংশাধন করুন, তাহা হইলেই সমস্ত ঠিক হয়ে যাইবে।' খলিফা এতসব উপদেশের গোলমালে হতবুদ্ধি হয়ে পড়িলেন। সমস্ত শুনিয়া তিনি একটি মন্তব্য অত্যন্ত দৃঢ়তার সহিত ব্যক্ত করিলেন। বলিলেন, 'লোকের প্রতি কঠোরতা ও জুলুম চলিবে এমন কোনো পন্থায় তিনি কখনই সম্মতি দিবেন না। যদি বিদ্রোহ বা রাষ্ট্র বিপ্লব আসেই অতঃপর কেউ তাঁকে সে জন্য দোষী করিতে পারিবে না।' কিন্তু উপস্থিত মতে তাঁর কিছু করণীয় ছিল না, নীরবে অবস্থার গতিক্রম লক্ষ্য করা ও কারও ওপর অত্যাচার না হয়, তাহার প্রতি লক্ষ্য রাখা ছাড়া। তিনি তাঁর প্রতিনিধি ও শাসকবর্গকে বিদায় দিলেন এবং বলিয়া দিলেন, যদি দূরদেশে অভিযান প্রেরণ করা হয়, তিনি তাতে সম্মতি দিবেন। অন্যথা তিনি নিজে যাহা ভালো মনে করেন তাহাই করিবেন।
সভা শেষ হইল কিন্তু দেশব্যাপী বিক্ষোভের নিরাবরণের বাবদ আশু কার্যকরী কোনো পন্থাই গ্রহণ করা সম্ভবপর হইল না। আমির মু'য়াবিয়া বৈঠক শেষে সিরিয়ায় যাত্রাকালে খলিফার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া বিদায় গ্রহণ করিলেন এবং তাঁকে তাঁর আসন্ন বিপদের কথা স্মরণ করাইয়া অনুরোধ করিলেন তাঁকে সিরিয়ায় যাইতে এবং সেখান হইতে শাসনকার্য পরিচালনা করিতে। তিনি খলিফাকে নিশ্চয়তা দিলেন, সেখানে বিপুল সংখ্যক রাজভক্ত লোক রহিয়াছেন, যাহারা বিপদ-কালে তাঁর পার্শ্বে দাঁড়াইতে প্রস্তুত।
উত্তরে খলিফা বলিলেন, 'আমার মসনদের কথা ধরি না, আমার নিজ জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজন হইলেও, নবীর আশ্রয়স্থল এই মদিনা শহর ত্যাগ করিয়া আমি কোথাও যাইব না। এই পুণ্যভূমিতেই তাঁর পবিত্র দেহ-মুবারক বিরাজ করছে।'
অতঃপর মু'য়াবিয়া নিবেদন করিলেন। তাহা হইলে অনুমতি করুণ, একদল বিশ্বস্ত সৈন্য আপনার দেহরক্ষী স্বরূপ পাঠাইয়া দেই।' 'সে হয় না'-এই উত্তর করিলেন খলিফা অত্যন্ত দৃঢ়তার সহিত। 'আমার দেহরক্ষার জন্য সৈন্য বাহিনীকে এখানে স্থান দিয়ে যাঁরা নবীর বসত বাটির আশপাশে বাস করেন তাঁহাদের উপর অত্যাচার হইতে পারে এবং নবীর পবিত্র রওযার অসম্মান হইতে পারে।'
মু'য়াবিয়া বিরক্ত হইলেন এবং বলিলেন, 'এ অবস্থায় ধ্বংস ছাড়া অন্য কোনও পরিণাম আপনার দেখিতেছি না।' বৃদ্ধ খলিফা ধীরভাবে উত্তর করিলেন, 'এ অবস্থায় আল্লাহ্ আমার রক্ষক এবং ইহাই আমার পক্ষে যথেষ্ট।' বিদায়, আপনার মঙ্গল হউক'- বলিয়া মু'য়াবিয়া প্রস্থান করিলেন। ইহাই তাঁহাদের শেষ সাক্ষাৎ। ইহার খলিফার মুখ তিনি আর দেখিতে পান নাই।
সিরিয়ার পথে রওয়ানা হয়ে তিনি রাস্তায় একদল কোরাইশের দেখা পাইলেন। তাদের ভিতর হজরত আলি ও যুবায়েরও ছিলেন। তিনি মুহূর্ত কাল থামিলেন, তাঁহাদের দুই একটি কথা বলিয়া সতর্ক করার অভিপ্রায়ে তিনি বলিলেন, 'তোমরা ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেকার সেই আইয়ামে জাহেলিয়াতে পুনরায় ফিরিয়া যাইতেছ। আল্লাহ্ মজলুম ও দুর্বলের পক্ষে শক্তিশালী প্রতিকারকারী।' সর্বশেষ বলিলেন, 'তোমাদের হাতে অসহায় বৃদ্ধ খলিফাকে সঁপিয়া দিয়া গেলাম। তাঁকে সাহায্য করিও; ইহা তোমাদের পক্ষে উত্তম। তোমরা সালামতে থাক।' এই বলিয়া মু'য়াবিয়া তাঁর গন্তব্য পথে অগ্রসর হইলেন।
কোরাইশ দলটি কিছুক্ষণ নীরবে চুপ করিয়া থাকিল। অতঃপর হজরত আলি প্রথম নীরবতা ভঙ্গ করিয়া বলিলেন, 'আমাদের সাধ্যমতো তাহাই করিতে হইবে, যেরূপ মু'য়াবিয়া বলিলেন'। 'আল্লাহ্র কসম' জুবায়ের বলিলেন, 'সত্যই তোমার উপর, এবং আমার উপরও, ওসমানের রক্ষা করার চাইতে কঠিন দায়িত্ব আর কখনও চাপে নাই।'
টিকাঃ
১. মৃ'য়র প্রণীত Annals of the Early caliphate