📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 মুযহারাইট ও হিমারাইট দ্বন্দ্ব

📄 মুযহারাইট ও হিমারাইট দ্বন্দ্ব


মুন্‌হারাইট ও হিমারাইটসের দ্বন্দ্ব কোনও মতবাদঘটিত ছিল না। উহা ছিল তাদের জাতিগত। তাদের এই জাতিগত বিরোধ সম্বন্ধে সৈয়দ আমির আলি লিখিয়াছেন: 'ইসলামের আবির্ভাবকালে আরবে যে সব পুরাতন জাতি বাস করিত তাদের ভিতর দুইটি ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইহাদের একটি পূর্বপুরুষ ছিলেন কাহান (তাঁকে জোকতানও বলা হয়) এবং অপরটি ছিলেন হজরত ইব্রাহিমের পুত্র ইসমাইল। কাহতান বংশীয়েরা প্রধানত ইয়েমেনে বসবাস করিত আর ইসমাইল বংশীয়েরা বাস করিত হিজাজে। কাহানের এক পুত্র ইয়ারিব অত্যন্ত পরাক্রান্ত হয়ে ওঠেন। তাঁরই নাম অনুসারে আরব দেশ ও আরব জাতির নামকরণ হয়েছে বলিয়া উল্লেখ আছে। এই বংশের আর এক পরাক্রান্ত রাজা ছিলেন আদেশ্ শামস্, যার উপাধি ছিল সাবা। এজন্য কাহানীগণকে সাবিয়ানও বলা হয়। ইয়েমেনের রাজধানীরও নামকরণ হয় সাবা। এই আদেশ শামসের জনৈক বংশধর হিমারের নাম অনুসারে কাহতান বংশীয়রা পরে হিমারাইট নামে অভিহিত হয়। আরব লেখকরা তাহাদের 'ইমেনাইট' ও বলিতেন। ইহারা সভ্যতায় অতিশয় উন্নত এবং শক্তিশালী ছিল। খ্রিস্টীয় ৭ম শতক পর্যন্ত ইহারা নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করিয়া চলিয়াছে। ইহারা নানা দেশ জয় করে এবং বহু ইমারত নির্মাণ করিয়া তাদের রাজধানী সাবা শহরকে সুসজ্জিত করে। কালক্রমে এই বংশের লোকেরা উত্তর আরব, মদিনা, মক্কার পার্শ্ববর্তী বতনমার এবং কুফা প্রভৃতি অঞ্চলে ছড়াইয়া পড়ে এবং বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়। বর্তমানে এই বংশীয় লোকদের খোযা (পৃথক) বলা হইত। মদিনায় এই বংশীয় লোকেরা আউস গোত্র ও খাযরাজ গোত্র নামে পরিচিত ছিল। কুফায় ইহাদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল।
ইসমাইলের বংশধরেরা প্রধানত মক্কায় বাস করিত এবং তথা হইতে হিজাজের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়াইয়া পড়ে। সভ্যতার দিক দিয়া ইহারা আরব জাতির গৌরব স্বরূপ ছিল। বস্তুত আরব-সভ্যতা বলিতে ইহাদের প্রবর্তিত সভ্যতাকেই বুঝাইয়া থাকে। সুপ্রসিদ্ধ কাবা ঘরের নির্মাতা ইসমাইলের বংশধর হিসাবে এ জাতি পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিশিষ্ট সম্মানজনক স্থান অধিকার করিয়া আছে। সা'দ ইবনে আদনান ছিলেন ইসমাইলের এক প্রখ্যাত বংশধর। সা'দের পৌত্র মুহার ছিলেন ততোধিক প্রখ্যাত। এই মুযহারের 'নাম অনুসারে ইসমাইল বংশীয় লোকেরা পরে মুযহারাইট নামে অভিহিত হয়। ইহাদের এক শাখা বনি কোরাইশ বা কোরাইশ বংশ। বনি কায়েস, বনি বকর প্রভৃতি এই বংশেরই অন্যান্য শাখা।
মুযহারাইট ও হিমারাইট এই দুই প্রাচীন গোষ্ঠীর ভিতরকার দ্বন্দু ছিল যুগান্তরব্যাপী। একমাত্র মদিনা ব্যতীত আরবের আর কোথাও এই দুই জাতির লোক এক হইতে পারে নাই। শুধু মদিনাতেই মহান নবীর জীবদ্দশায় তাঁর অলৌকিক ব্যক্তিত্বের প্রবভবে উহা সম্ভবপর হয়েছিল।
মুসলিম রাষ্ট্রের খলিফাদের এই দুই বিশাল জাতির মজ্জাগত বিরোধের দরুন চিরদিনই অপরিসীম দুর্ভোগ সহ্য করিতে হয়েছে। হজরত ওসমানও সে দুর্ভোগ হইতে বাদ পড়েন নাই।
বৃদ্ধ খলিফা সাম্রাজ্যময় এইসব দ্বন্দ্ব, কোলাহল ও অসন্তোষের দরুন সতত উদ্বিগ্ন থাকতেন। তাঁর অধীনস্থ কর্মচারী ও শাসকদের ওপর তাঁর উপদেশ ছিল, তাঁরা যেন জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা না করিয়া যথাসাধ্য তাদের সন্তোষ বিধানের চেষ্টা করেন।

টিকাঃ
৪. দেখা গিয়াছে, কুফায়ই কোরাইশ, বিদ্বেষ সর্বাপেক্ষা তীব্র ছিল।
৫. A Short History of the Saracens. p. 3 and pp. 73-74.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00