📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 অশান্ত আরব ও খলিফার নিঃসঙ্গতা

📄 অশান্ত আরব ও খলিফার নিঃসঙ্গতা


হজরত ওসমানের দুর্ভাগ্য, যাঁরা নবীর সহকর্মী ছিলেন এবং তাঁর জীবনাদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, তাঁরা প্রায় সকলেই পৃথিবী হইতে অন্তর্হিত হয়েছিলেন। হজরত আবু বকর, হজরত উমর, আবু ওবায়দা, খালেদ, বেলাল প্রমুখ যাঁরা মুসলিম রাষ্ট্রের শক্তি-স্তম্ভস্বরূপ ছিলেন এবং যাঁহাদের বিরাট ব্যক্তিত্ব ও অপূর্ব ত্যাগ ইসলামে নবদীক্ষিত জাতিসমূহের সম্মুখে বিস্ময়, সম্ভ্রম ও সমীহের কারণ ছিল, তাঁহাদের সহযোগিতা হইতে হজরত ওসমান এখন বঞ্চিত। এক নতুন নেতৃত্ব, নতুন সমাজ, তাঁহাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিল, যাদের সহিত সত্তর বছর বয়স্ক, প্রাচীন আদর্শবাদের ধজাধারী খলিফা কিছুতেই নিজেকে খাপ খাওয়াইতে পারতেছিলেন না। যুগের পরিবর্তনে মানুষের মনেরও পরিবর্তন সাধিত হয়। নবীর তিরোধানের পর প্রায় বিশ বৎসর অতীতের গর্ভে বিলীন হয়েছে। ইতোমধ্যে আরব জাতির চরিত্র ও ধর্মীয় ঐক্যেও অনেক বিবর্তন ঘটিয়াছে; নবীর প্রবর্তিত ত্যাগের আদর্শ দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসিতেছিল; ভোগের আদর্শ মানুষকে আকৃষ্ট করিতেছিল। বহু সমৃদ্ধ দেশ আরব জাতির পদানত হওয়ায় বিজয়ী আরবরা পূর্বের তুলনায় অনেক বিত্তশালী হয়ে উঠিয়াছিল। আর, যেখানে বিত্তশালিতা ও বৈভব সেখানেই বিলাসিতা ও আত্মম্ভরিতা বিস্তার লাভ করে। যে সকল অনারব জাতি বিজিত হয়েছিল, তাদের মনে ছিল হৃত স্বাধীনতা ও অবলুপ্ত কৃষ্টির জন্য অনন্ত বিক্ষোভ। ইসলামি শিক্ষা ও মুসলিম জীবনাদর্শ তাদের ভিতর সম্যকরূপ লাভ করার পূর্বেই, স্বয়ং নবী এবং হজরত আবুবকর ও হজরত উমর প্রমুখ আদর্শ শাসকগণ তাদের দৃষ্টির অন্তরালে চলিয়া গেলেন। এক অশান্ত সাম্রাজ্য চাপিল নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় খলিফা ওসমানের উপর, যাঁহা অতীতের জনপ্রিয়তা তরুন দলের নিকট ছিল একটা কাহিনি মাত্র। যাঁহাদের সুখ-দুঃখের তিনি দরদী সঙ্গী ছিলেন, তাঁহাদের অধিকাংশ এখন জীবনের পরপারে। বিরোধী দলের নেতা আবু সুফইয়ান ইসলামের যত বড় দুশমনই হউন, তিনি একজন বিরাট ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। ইসলামে দীক্ষা গ্রহণের পর নবীর প্রতি তিনি বিশ্বস্ততার খিলাফ করেন নাই। মহান শত্রু, মিত্র হিসেবেও মহান হইতে পারে। হজরত ওসমান হয়ত তাঁর উপর নির্ভর করিতে পারিতেন। বিশেষত তিনি হজরত ওসমানের জ্ঞাতিভ্রাতা ছিলেন। কিন্তু হিজরি ৩২ সনে কোরাইশদের নেতৃত্বের মঞ্চ হইতে তিনিও অবসৃত হন। তিনি তখন অন্ধ ও অকর্মণ্য হয়ে পড়িয়াছিলেন। ইহার পর দারুন দারিদ্র্যের ভিতর দিয়া তাঁর জীবন কাটিতে থাকে এবং মাত্র কয়েক বৎসর পর, অষ্ট-উত্তর অশীতি বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়।
আরও একটি ঘটনা হজরত ওসমানের হস্তকে দুর্বল করেছিল। সমগ্র আরব উপদ্বীপের ভিতর সিরিয়া ছিল সর্বাপেক্ষা সমৃদ্ধ দেশ। তথাকার গভর্নর আমির মু'য়াবিয়া ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী শাসক। তাঁর এলাকায় বিশৃঙ্খলা ঘটিত খুব কম। এজন্য মক্কার অধিকাংশ বিত্তশালী কোরাইশ এবং মদিনা হইতেও উমাইয়া বংশীয় অনেকে সিরিয়ায় গিয়া বসতি স্থাপন করে। হজরত ওসমান ইহাদের সক্রিয় সহযোগিতা হইতে বঞ্চিত হন। হজরত ওসমানের জ্ঞাতিদের ভিতর তাঁর নিকটতম সহযোগী ছিলেন তাঁর চাচাতো ভাই মারওয়ান। তাঁর যোগ্যতা ন্যূন ছিল না। হজরত ওসমানের পশ্চাতে থাকিয়া খিলাফৎ তিনিই পরিচালনা করিতেন। কিন্তু এই ব্যক্তির দুর্নীতিপরায়ণতা ও কুটিলতাই হজরত ওসমানের পতনের কারণ হয়। সরলচিত্ত খলিফা সম্ভবত প্রথম দিকে তাঁর দূরভিসন্ধি ধরিতে পারেন নাই। কিন্তু যখন ধরিতে পারিলেন, তখন অবস্থা আয়ত্তের বাহিরে চলিয়া গিয়াছে।
যে সকল কোরাইশ সিরিয়ায় না গিয়া মদিনায়ই বাস করিত, হজরত ওসমান যদি তাদেরও সকলের সক্রিয় সহযোগিতা লাভ করিতে পারিতেন, তাহা হইলে তাঁর রাজ্যশাসন যথেষ্ট শক্তিশালী হইতে পারিত। কিন্তু তাহাও তিনি পান নাই। হাশেমি গোত্রের লোকেরা খলিফা নির্বাচনে হজরত আলির পরাজয়ের পরও, হজরত ওসমানের প্রতি বিশ্বস্ততা রক্ষা করিয়া চলিতে ছিল। খলিফা যদি তাহাদের ভিতর হইতে যোগ্য ব্যক্তিদের বাছিয়া লইয়া শাসনকার্যে ও সামরিক দায়িত্বে অংশ গ্রহণ প্রদান করিতেন, তাহা হইলে তাদের ক্ষোভের কোনও কারণ থাকিত না। কিন্তু মন্ত্রী মারওয়ানের জন্য তাহা হয়ে ওঠে নাই। ইহার ফলে হাশেমি গোত্রের লোকেরা এবং মদিনায় যে সমস্ত লোক তাদের অনুরক্ত ছিল, খলিফা তাদের আন্তরিক সহযোগিতা হারাইয়া বসেন।
দেশ জয়ের ফলে আরবের যে সকল অংশ বেশি লাভবান হয়েছিল, তন্মধ্যে প্রধান ছিল ইরাকের অন্তর্গত কুফা ও বসরা। এই দুই স্থানের লোকেরা ছিল সাধারণত যুদ্ধ ব্যবসায়ী। যুদ্ধলব্ধ মালে তারাই সমৃদ্ধ হয় বেশি। আর তারই ফলে ইহারা শাসন-সংস্থার প্রতিকূলে কন্টক স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। ইহাদের অস্থিরচিত্ততা, ক্ষমতার গর্ব এবং বিজয়ী যোদ্ধা হিসাবে প্রতিপত্তি, ইহাদের ঔদ্ধত্য, অসংযত ও লোভ করেছিল। হজরত উমরকেও ইহারা কম জ্বালাতন করেন নাই, কিন্তু হজরত উমরের বজ্র-কঠিন পৌরুষের মোকাবিলায় ইহাদের সকল আস্ফালন ব্যর্থ হয়ে যাইত। হজরত ওসমান ছিলেন স্বভাবত লাজুক ও নম্র প্রকৃতির। কোনও অবস্থায়ই তিনি কঠোর হইতে পারিতেন না। জনগণের প্রতি শুভেচ্ছা ও বিরোধী দলের সহিত সমঝোতার মাধ্যমে তিনি সব কিছু মীমাংসা করিতে চাহিতেন। তিনি জানিতেন না, শয়তান যেখানে আসন পাতে সেখানে মানুষের যাবতীয় সুকুমার বৃত্তি তাহার উষ্ণশ্বাসে বাষ্প হয়ে মিলাইয়া যায়। যেরূপ পরিস্থিতির যথার্থ প্রতিষেধক হইতেছে রূঢ় কঠোরতা ও ইস্পাতের তীক্ষ্ণধার।
আরব উপদ্বীপের বাহিরে যে সকল বৈদেশিক এলাকা আরব জাতির অধিকারে আসিয়াছিল, যে সব স্থানের অধিকাংশ আঞ্চলিক শাসক এবং উপজাতীয় সর্দার উপস্থিত সময় পরাজয়ের দুর্ভোগ এড়াইবার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছিল, কিন্তু অন্তরে অন্তরে তারা ইসলামকে তথা মুসলিম-শক্তিকে ধ্বংস করিবার জন্য সুযোগের প্রতীক্ষা করিত। ইহারা খানা-পিনা ও পোষাক পরিচ্ছদে মুসলমান থাকিয়াও সর্বদা চেষ্টা করিত রাষ্ট্রীয় শাসনকে দুর্বল ও বিপন্ন করিতে। মিসর, পারস্য প্রভৃতি দূরবর্তী; দেশগুলোতে এই শ্রেণির লোক ছিল বেশি। ইহারা খলিফার বিরুদ্ধে সক্রিয় বিদ্রোহ ফেনাইয়া তুলিতে সর্বদাই তৎপর ছিল।
আরব উপদ্বীপের ভিতরেও বহু উপজাতি ও বেদুঈন সম্প্রদায় বাস করিত, যাহারা পৌত্তলিক যুগে নানারূপ বিলাস-ব্যসনে মগ্ন থাকিত এবং যত বড় কু-কার্যই করুক, দেবতাকে ভোগ দিয়া মনে মনে বিশ্বাস করিত তাদের সমস্ত পাপের খণ্ডন হয়েছে। জীবনের গতি ছিল তাদের বল্গাহীন। কিন্তু ইসলাম উহাতে বল্গা পরায়। ইসলাম চাহে তাহাদের দুর্নীতির পথ হইতে ফিরাইয়া আনিতে এবং এক সুনিয়ন্ত্রিত জীবনধারার অনুসরণে বাধ্য করিতে। দেবতাকে বর্জন করিয়া একেশ্বর অনুসরণ তাদের পক্ষে ততটা কঠিন ছিল না। যত কঠিন ছিল তাদের ঐ অসংযত জীবনকে শরিয়তের গণ্ডির ভিতর বন্দি করিয়া রাখা। বনচারী মুক্ত অজগরকে সাপুড়ের পিঞ্জরে পুরা যত কঠিন, এই মরুচারী, চির স্বাধীন, প্রকৃতির সন্তানদের শরীয়তের শৃঙ্খল পরানও তেমনি কঠিন কার্য ছিল। ঐসব লোক সর্বদাই ইচ্ছা করিতে পুনরায় তাদের পূর্বের অবাধ সম্ভোগময় জীবনে ফিরিয়া যাইতে। আরব জাতির বিজয়ের দিনে তারা ইসলামের জয়গান গাহিত এই কারণে, তাদের অফুরন্ত কর্মশক্তি তারা একটা লাভজনক কাজে নিয়োগ করার সুযোগ পাইত। তারা এই বিজয়ের মাধ্যমে এক নতুন জীবনের আস্বাদ পাইত, যার ফলে তাদের দুঃসাহস বাড়িয়া যাইত। এ জন্য তারাও খলিফার জীবনে এক গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়েছিল।
এ সম্পর্কে আর, এ নিকলসনের নিম্নলিখিত মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। 'মদিনায় প্রচারিত ইসলামের রূপ' শীর্ষক নিবন্ধে তিনি বলিতেছেন, 'হজরত মোহাম্মদ (স.) মদিনায় যে ইসলাম জারি করেন, উহা প্রায় সামগ্রিকভাবেই খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের যে সব পৌরাণিক কাহিনি জনগণের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল, তাহা হইতে গৃহীত এবং এই কারণেই উহা পৌত্তলিক আরবের উপর অতি সামান্যেই প্রভাব বিস্তার করিতে পারিয়াছিল। পৌত্তলিক আরবদের ধর্মীয় ধারণাসমূহ সাধারণত অতি আদিম অবস্থায় ছিল (were generally of the most primitive kind) এখনকার এই ইসলামে আরবদের জাতীয় ভাবধারাকে (sentiments) আকৃষ্ট করার মতো কিছু না থাকিলেও মদিনায় ইহার বিস্তার দ্রুত হয়েছিল, কেননা পূর্ব হইতেই সেখানে ইহার জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত ছিল। কিন্তু এতদসত্ত্বেও ইহা হয়ত সন্দেহাতীত নহে, এই ধর্ম সমগ্র আরব উপদ্বীপে বিস্তার লাভ করিত না, যদি না ঘটনা-প্রবাহ মোহাম্মদকে বাধ্য করিত এই ধর্মের অদ্ভূত মতবাদকে পৌত্তলিক আরবের অতি প্রাচীন ধর্ম মন্দির কা'বা ঘরের সহিত সংযুক্ত করিতে।
'যে কা'বা মন্দির ভজনালয় হিসেবে সমগ্র আরব জাতির সার্বজনীন সম্মানের স্থান ছিল, মোহাম্মদের ধর্ম ইহাকে যাবতীয় মুসলমানদের উপাসনার (নামাজের) কেন্দ্রবিন্দু করায়, এই ধর্ম গ্রহণের আরব জাতির পক্ষে বিশেষ কোনও অসুবিধা ঘটে নাই। মোহাম্মদ ইহুদিদের সঙ্গে আপোষ অসম্ভব জানিয়া উক্ত কা'বাকে নামাজের কেবলারূপে গ্রহণ করিতে শিষ্যগণকে নির্দেশ দেন এবং বৎসর দু'এক পর, হজরত ইব্রাহিমের দ্বারা প্রবর্তিত বলিয়া কথিত, হজের সংশ্লিষ্ট আঙ্গিক ও অনুষ্ঠানসমূহ পালনকে ইসলামের অঙ্গীভূত করেন। তিনি সেই ইব্রাহিমের ধর্মই প্রচার করছে এবং ইব্রাহিম তাঁর পূর্ব পুরুষ এই বলিয়া মুক্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন।
'কিন্তু এতসত্ত্বেও স্বাধীনভাবে বিচরণকারী ও স্বাধীন মনোবৃত্তির অধিকারী আরব জাতিকে এই ধর্মে পুরাপুরি আকৃষ্ট করা যায় নাই। কারণ, এই নতুন ধর্ম তাদের আনন্দ উপভোগ সীমিত করে, তাহাদের ট্যাক্স প্রদানে বাধ্য করে, নির্ধারিত সময়ে নামাজ পড়িতে আদেশ করে এবং যে সমস্ত গুণাবলি (virtues) তাদের অতি প্রিয়, সেগুলো বর্বরতা বলিয়া চিহ্নিত করে (stamped with barbarism)। পৌত্তলিক আরবদের আদর্শ ও কৃষ্টিরও সরাসরি বিরোধিতা করে ইসলাম। গোল্ডজিহার (Gldziher) বলিয়াছেন, ইসলামের বিস্তারের ব্যাপারে তার মৌলিকতা-যাহা খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্ম হইতে ধার করা-মূল কারণ নহে, মূল কারণ ছিল মোহাম্মদ ঐসব (খ্রষ্টীয় ও ইহুদীয়) নীতিকে যেমন অবিচ্ছিন্ন উৎসাহে (persistent enrgy) আরব জাতির জীবনাদর্শের বিরুদ্ধে প্রচার করেন এমন আর কেহ কখনও করে নাই।'
নিকলসনের পৌত্তলিক আরবের ধর্মীয় সংস্থা মুরুওয়া (Muruwwa) এবং ইসলাম-এর বিরোধীয় ক্ষেত্রসমূহ এই:
প্রথমত ইসলামের যাহা মৌলিক আদর্শ তাহা বেদুঈন আরবগণের নিকট বিজাতীয় ও দুর্বোধ্য (foreign & unintelligible) ছিল। তাদের প্রতিমাগুলোর ধ্বংস বাবদ তারা ইসলামের যতটা বিরোধিতা করেছিল, তার চাইতে তাদের বেশি বিরোধিতার কারণ ছিল ইসলাম ভিতর যে ভক্তিভাব (the spirit of devotion) জাগ্রত করিতে চাহিয়াছিল, তার জন্য। যথা, সমগ্র জীবনধারাকে আল্লাহর চিন্তা দ্বারা আবিষ্ট করা, মানুষের ভাগ্য-নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধীকে দণ্ডদান সম্পর্কে তাঁর, অন্যের সুপারিশ (intercession) নিরপেক্ষ, সার্বভৌম ক্ষমতায় বিশ্বাস স্থাপন, তাঁর জন্য নিয়মিত উপাসনা ও উপবাস, অনেক আকাঙ্ক্ষিত আমোদ-উল্লাসের পরিহার এবং ধন-সম্পত্তির কোরবানি, যাহা ইসলাম দাবি করিত আল্লাহর নামে। যদিও কুরআনে বলা হয়েছে, "লা দীনা ইন্না বিল' মুরুওয়াতি'-এমন ধর্ম নাই যার ভিতর কিছু না কিছু ভালো গুণ (virtue) না আছে-তথাপি বেদুইনগণ যখন ইসলাম গ্রহণ করিত, তাহাদের তাদের অ-লিখিত শাস্ত্রীয় বিধানের (unwritten code) বেশির ভাগ অংশই ভুলিতে বাধ্য করা হইত। ধার্মিক মুসলমান হইতে হইলে তাহাদের কাহারও অন্যায়ের প্রতিশোধ স্বরূপ তাহার মঙ্গল করিতে হইবে, শত্রুকে নির্যাতনের পরিবর্তে ক্ষমা করিতে হইতে। কেউ যদি মনে ক্ষোভ পাইত এবং দুনিয়ায় তাহার প্রতিকার না হইত, তাহাকে, মৃত্যুর পর সে, বেহেস্তে দাখিল হইবে, এই আশ্বাস হইতে তাহার মনের ক্ষতের প্রলেপ সংগ্রহ করিতে হইত।
পৌত্তলিক আরবদের সমাজবন্ধন ছিল মোটামুটি গোত্রভিত্তিক। পক্ষান্তরে ইসলামি সমাজের মূলনীতি ছিল, সকল মুসলমান একে অপরের ভাই এবং সকলে সমান। তাদের পদমর্যাদার পার্থক্য, কুলগত বৈষম্য, সমস্তই এই ধর্মীয় বন্ধনহেতু বিলুপ্ত হয়েছিল। এ কথাও বলা যাইতে পারে যে, উপজাতি উপজাতিতে যে কলহ এবং ইজ্জত ও রক্তের কৌলিন্য-ঘটিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যাহা এতকাল চলিয়া আসিতেছিল এবং যাহা আবহমান কাল ধরিয়া আরব জাতির পৌরুষের উৎস ছিল, নীতিগতভাবে (theoretically) ইসলাম তাহাও রহিত করে।
হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলিয়াছেন, 'হে জনগণ, আল্লাহ্র নিকট সর্বাপেক্ষা উচ্চ সম্মানিত ঐ ব্যক্তি, যে তাঁকে সব চাইতে বেশি ভয় করিয়া চলে।' এই প্রকার নৈতিক চাপের বিরুদ্ধে মরুচারী বেদুঈনদের পুরাতনপন্থী ও পার্থিব-সুখ-সমৃদ্ধি-লিঙ্গু অতৃপ্ত চিত্তে স্বভাবতই বিদ্রোহ জাপিত। যদিও ঝোকের মাথায় তারা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি, তাদের বেশির ভাগ লোকই ইসলামে সত্যিতার বিশ্বাসী ছিল না এবং জানিতও না ইসলামের তাৎপর্য কি? অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের ইসলাম গ্রহণের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সুবিধাবাদিতা। তারা মনে করিত, ইসলাম দ্বারা তাহাদের ভাগ্যোন্নতি হইবে। যে পর্যন্ত তারা দেহের দিক দিয়া সুস্থ থাকিত, তাদের ঘোটকী গুলো সুন্দর বাচ্চা দিত এবং তাদের স্ত্রীরা স্বাস্থ্যবান ও সুগঠিত সন্তান প্রসব করিত এবং তাদের ধন-দৌলত ও পশুপালন বৃদ্ধি পাইতে থাকিত, তারা বলিত, আমরা এই ধর্ম গ্রহণ করা অবধি ভাগ্যবান হয়েছি। তারা তখন মনে তৃপ্ত থাকিত। আর যদি এ সমস্তের ব্যতিক্রম ঘটিত, তারা সে জন্য ইসলামকে দোষ দিত এবং ইসলামের প্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিত। ইহারা যে সময় সময় ধর্মোন্মাদনায় মাতিতে পারিত, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ তাদের জয়লাভ সমূহ, যাহা তারা লাভ করেছিল অত্যল্প কাল পরে, দুইটি মহাশক্তিশালী সাম্রাজ্যের সুশিক্ষিত ও সুনিয়ন্ত্রিত সৈন্যবাহিনীর ওপর। কিন্তু ধর্মীয় আবেগের চাইতে যাহা বেশি প্রলুব্ধ করিত তাহাদের, সে ছিল লুণ্ঠন-লব্ধ সম্পদের লোভ এবং এই বিশ্বাস, আল্লাহ্ স্বয়ং তাদের পক্ষে যুদ্ধ করছেন।

টিকাঃ
১. দারিদ্র্যের তাড়নায় আবু সুফইয়ানের শেষজীবন খুবই কষ্টর হয়। কথিত আছে, বৃদ্ধ বয়সে তিনি তাঁর মুখরা পত্নী কুখ্যাত হেন্দাকে পরিত্যাগ করেন। পুত্র মু'য়াবিয়া পিতাকে কিছু কিছু সাহায্য দিতেন, কিন্তু তিনি এককালে মক্কায় সর্বশ্রেষ্ঠ জননায়ক ছিলেন তাঁর পক্ষে উহা যথেষ্ট ছিল না। স্বামী-পরিত্যক্তা হেন্দা হজরত ওসমানের নিকট হইতে অর্থ ধার লইয়া তদ্বারা বাজারের মাল খরিদ-বিক্রয় করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিত।
২. Literary History of the Arabs গ্রন্থের প্রণেতা।

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 দুইটি বিপরীত আদর্শের সংঘাত

📄 দুইটি বিপরীত আদর্শের সংঘাত


এ কথা অস্বীকার করা যায় না, মক্কার কোরাইশ অভিজাতবর্গ, যাহারা বরাবর হজরত মোহাম্মদের (সা.) বিরোধিতা করিয়া আসিতেছিল এবং তাঁর দেশত্যাগের পরও তাঁকে সশিষ্য ধ্বংস করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল, তারা পরিশেষে গ্রহণ করে ইসলামের প্রতি ভক্তি বশত নহে, পরন্তু যেহেতু নবীর মক্কা জয়ের পর ইহা তাদের পক্ষে অনিবার্য হয়ে পড়িয়াছিল। তারা ইসলামের অনুকূলে এবং মুসলিম রাষ্ট্রের বিস্তারে অস্ত্র ধারণও করেছিল, কিন্তু তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল নিজেদের আত্মপ্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তগত করা। হজরত ওসমানের শাসন আমলে তারা তাদের এই মনস্কামনা পূরণের পুরা সুযোগ লাভ করে। তখন হইতে তারা রাষ্ট্রের রসে জীবন ধারণ করিতে থাকে ('Lived on the fat of the land')। তাদের এই জীবনধারা আর ধর্ম-বিবর্জিত আচরণ ('ungodly behaviour') অনেকের মনে এই সংশয় উদ্রেক করেছিল, এই 'শেষমুহূর্তে দীক্ষাপ্রাপ্ত' দলটি তখনও অন্তরে অন্তরে পৌত্তলিক ছিল কিনা। কারণ, পৌত্তলিক যুগে সেই বিলাসপরায়ণতা, শানশওকত ও চারিত্রিক উচ্ছৃঙ্খলতা তাদের ভিতর ষোল আনাই বিদ্যমান ছিল।
পবিত্র শহর মক্কা-মদিনা এবং নব বিজিত দেশসমূহের যেখানেই এই কোরাইশ অভিজাতবর্গ আস্তানা করেছিল, সর্বত্র কলুষ-দুর্নীতি ও চারিত্রিক উচ্ছৃঙ্খলতার দ্রুত প্রসার ঘটিয়াছিল। ধর্মপরায়ণ নীতিনিষ্ঠ মুসলমানদের ইহা চক্ষুশুল হয়েছিল। কোরাইশদের এই ধনদৌলত ও ক্ষমতাভিত্তিক আভিজাত্যের প্রতিদ্বন্দ্বীরূপ মদিনায় নবীকে কেন্দ্র করিয়া আর এক নতুন অভিজাত শ্রেণির উদ্ভব হয়েছিল। তারা ছিল ইসলামি অভিজাতবর্গ। এই আভিজাত্যের স্বরূপ সম্বন্ধে হজরত উমর এইরূপ বর্ণনা দিয়াছেন:
- 'আমরা যে পৃথিবীতে মর্যাদার আসন লাভ করিয়াছি এবং পরলোকে আমরা যে আল্লাহর নিকট হইতে আমাদের সৎকর্মের বাবদ পুরস্কারের আশা রাখি এ সমস্তই হইতেছে আমাদের নবী হজরত মোহাম্মদের (সা.) দরুন।
তিনিই আমাদের এই আভিজাত্য দান করেছিলেন। তাঁর গোত্র আরবে সর্বাপেক্ষা উচ্চবংশ। তারপরই কৌলিন্যে ঐ সব ব্যক্তির স্থান, যাঁরা রক্তের সম্পর্কে তাঁর অধিকতর নিকটবর্তী। সত্যকথা বলিতে কি, আরব জাতি তাঁর দরুনই কৌলিন্যের অধিকারী হয়েছে।'
পাছে মদিনার এই ইসলামি নতুন আভিজাত্য কোরাইশ ও উমাইয়া আভিজাত্যের আকর্ষণীয় প্রভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, এই আশঙ্কায় মদিনার অভিজাত সমাজ কোরাইশ আভিজাত্যের প্রতিকূলে সক্রিয় হয়। এই নতুন সভ্যতার প্রতীক ছিলেন হজরত আলি, যুবায়ের ও তালহা। হজরত ওসমান ছিলেন এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর আভিজাত্যের সেতুবন্ধ। জন্মের দিক দিয়া তিনি উমাইয়া বংশীয় কোরাইশ ছিলেন, আর দীক্ষা ও কৃষ্টির দিক দিয়া ছিলেন নবীর ঘনিষ্ঠ সহচরদিগের ভিতর অন্যতম। এই উভয় কূলের ভিতর সংযোগ ও মৈত্রীরক্ষা তাহার পক্ষে ছিল এক কঠিন দায়িত্ব। তিনি এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থকাম হন। কারণ, দুই কূলের মাঝখানে আদর্শ ঘটিত বিরোধ খরস্রোতা ছিল, যাহা এক কূলকে অপর কূলের দিকে টানে নাই বরং দিন দিন ভাঙ্গন সৃষ্টি করিয়া মাঝের দূরত্ব ক্রমেই বাড়িয়ে দিয়েছে।

টিকাঃ
৩. Umar excluaimed... Verily we have not won superiority in the world, nor do we hope for recompose for works from God herdafter. save through Muhamad (peace be on hum). He is our title to nobility, his tribe are the noblest of the Arabs. and after them, those are the nobler that are nearer to him in blood. Truly the Arabs are ennobled by God's Apositle.

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 শিয়া-সুন্নিদের দলীয় বিরোধ

📄 শিয়া-সুন্নিদের দলীয় বিরোধ


রাজনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন ছাড়া সম্প্রদায়গত মতবিরোধও মুসলিম রাষ্ট্রের কম ক্ষতি সাধন করে নাই। মুসলিম রাষ্ট্রের পরিচালকের সাফল্য নির্ভর করিত দুইটি বিশিষ্ট দলীয় মতের উপর। এক দলের মত ছিল খলিফা নিয়োগের ব্যাপারে সাধারণ নির্বাচনের স্বপক্ষে; সুন্নীরা ছিলেন এই মতের সমর্থক। আর এক বিশিষ্ট দল ছিল সাধারণ নির্বাচনের বিপক্ষে। ইহাদের মতে উত্তরাধিকার সূত্রে নবীর প্রতিনিধি নিযুক্ত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কেননা, ইসলামে খলিফা হইতেছেন নবীর প্রতিনিধি। নবীর বংশধরগণই পুরুষানুক্রমে সে পদের প্রকৃত অধিকারী। সুতরাং সাধারণ নির্বাচনের প্রশ্ন এক্ষেত্রে অবান্তর। শিয়াগণ ছিল এই মতের পরিপোষক। দীর্ঘকাল ধরিয়া উমাইয়াদের সময় হইতে নির্বাচন প্রথা রহিত হয়ে যায় এবং খিলাফৎ বংশগত হয়ে পড়ে; কিন্তু মুসলিম জাহান তার পরও শিয়া-সুন্নী মতবিরোধিতার অভিসম্পাত হইতে নিষ্কৃতি পায় নাই। খলিফা ওসমানের খিলাফৎ আমলেও এই প্রকার দলীয় মতভেদ তাঁকে জনগণের এক বৃহৎ অংশের সহানুভূতি হইতে বঞ্চিত রাখিয়াছিল। এই শ্রেণির লোকের হজরত আলির প্রতি এবং তথা হাশেমি বংশের প্রতি যতটা অনুরক্ত ছিল, উমাইয়া শাসকদের প্রতি ততটা ছিল না।
শুধু বনি হাশিম ও বনি উমাইয়া বিরোধই হজরত ওসমানের শাসনের অন্তরায় ঘটায় নাই, কোরাইশ ও অকোরাইশ আরব-গোত্রসমূহের ভিতরও রেষারেষি দেখা দেয় ক্ষমতার বৈষম্য লইয়া, ইহা পূর্বে বলিয়াছি। সাধারণ আরবগণ যুদ্ধে সময় ত্যাগ স্বীকার করিত, প্রাণদান করিত, অথচ শাসন বিভাগের অধিকাংশ বড় পদ ভোগ করিত কোরাইশ নেতারা। ইহা লইয়া' অ-কোরাইশদের মনে ক্ষোভের অন্ত ছিল না। খলিফা কোরাইশ উপর নিবর্তিত হয়। প্রদেশগুলোতে নিযুক্ত কোরাইশ কর্মচারীদের ঔদ্ধত্য ও শান-শওকাতও ছিল জনগণের পক্ষে তীব্র অসন্তোষের কারণ।

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 মুযহারাইট ও হিমারাইট দ্বন্দ্ব

📄 মুযহারাইট ও হিমারাইট দ্বন্দ্ব


মুন্‌হারাইট ও হিমারাইটসের দ্বন্দ্ব কোনও মতবাদঘটিত ছিল না। উহা ছিল তাদের জাতিগত। তাদের এই জাতিগত বিরোধ সম্বন্ধে সৈয়দ আমির আলি লিখিয়াছেন: 'ইসলামের আবির্ভাবকালে আরবে যে সব পুরাতন জাতি বাস করিত তাদের ভিতর দুইটি ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইহাদের একটি পূর্বপুরুষ ছিলেন কাহান (তাঁকে জোকতানও বলা হয়) এবং অপরটি ছিলেন হজরত ইব্রাহিমের পুত্র ইসমাইল। কাহতান বংশীয়েরা প্রধানত ইয়েমেনে বসবাস করিত আর ইসমাইল বংশীয়েরা বাস করিত হিজাজে। কাহানের এক পুত্র ইয়ারিব অত্যন্ত পরাক্রান্ত হয়ে ওঠেন। তাঁরই নাম অনুসারে আরব দেশ ও আরব জাতির নামকরণ হয়েছে বলিয়া উল্লেখ আছে। এই বংশের আর এক পরাক্রান্ত রাজা ছিলেন আদেশ্ শামস্, যার উপাধি ছিল সাবা। এজন্য কাহানীগণকে সাবিয়ানও বলা হয়। ইয়েমেনের রাজধানীরও নামকরণ হয় সাবা। এই আদেশ শামসের জনৈক বংশধর হিমারের নাম অনুসারে কাহতান বংশীয়রা পরে হিমারাইট নামে অভিহিত হয়। আরব লেখকরা তাহাদের 'ইমেনাইট' ও বলিতেন। ইহারা সভ্যতায় অতিশয় উন্নত এবং শক্তিশালী ছিল। খ্রিস্টীয় ৭ম শতক পর্যন্ত ইহারা নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করিয়া চলিয়াছে। ইহারা নানা দেশ জয় করে এবং বহু ইমারত নির্মাণ করিয়া তাদের রাজধানী সাবা শহরকে সুসজ্জিত করে। কালক্রমে এই বংশের লোকেরা উত্তর আরব, মদিনা, মক্কার পার্শ্ববর্তী বতনমার এবং কুফা প্রভৃতি অঞ্চলে ছড়াইয়া পড়ে এবং বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়। বর্তমানে এই বংশীয় লোকদের খোযা (পৃথক) বলা হইত। মদিনায় এই বংশীয় লোকেরা আউস গোত্র ও খাযরাজ গোত্র নামে পরিচিত ছিল। কুফায় ইহাদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল।
ইসমাইলের বংশধরেরা প্রধানত মক্কায় বাস করিত এবং তথা হইতে হিজাজের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়াইয়া পড়ে। সভ্যতার দিক দিয়া ইহারা আরব জাতির গৌরব স্বরূপ ছিল। বস্তুত আরব-সভ্যতা বলিতে ইহাদের প্রবর্তিত সভ্যতাকেই বুঝাইয়া থাকে। সুপ্রসিদ্ধ কাবা ঘরের নির্মাতা ইসমাইলের বংশধর হিসাবে এ জাতি পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিশিষ্ট সম্মানজনক স্থান অধিকার করিয়া আছে। সা'দ ইবনে আদনান ছিলেন ইসমাইলের এক প্রখ্যাত বংশধর। সা'দের পৌত্র মুহার ছিলেন ততোধিক প্রখ্যাত। এই মুযহারের 'নাম অনুসারে ইসমাইল বংশীয় লোকেরা পরে মুযহারাইট নামে অভিহিত হয়। ইহাদের এক শাখা বনি কোরাইশ বা কোরাইশ বংশ। বনি কায়েস, বনি বকর প্রভৃতি এই বংশেরই অন্যান্য শাখা।
মুযহারাইট ও হিমারাইট এই দুই প্রাচীন গোষ্ঠীর ভিতরকার দ্বন্দু ছিল যুগান্তরব্যাপী। একমাত্র মদিনা ব্যতীত আরবের আর কোথাও এই দুই জাতির লোক এক হইতে পারে নাই। শুধু মদিনাতেই মহান নবীর জীবদ্দশায় তাঁর অলৌকিক ব্যক্তিত্বের প্রবভবে উহা সম্ভবপর হয়েছিল।
মুসলিম রাষ্ট্রের খলিফাদের এই দুই বিশাল জাতির মজ্জাগত বিরোধের দরুন চিরদিনই অপরিসীম দুর্ভোগ সহ্য করিতে হয়েছে। হজরত ওসমানও সে দুর্ভোগ হইতে বাদ পড়েন নাই।
বৃদ্ধ খলিফা সাম্রাজ্যময় এইসব দ্বন্দ্ব, কোলাহল ও অসন্তোষের দরুন সতত উদ্বিগ্ন থাকতেন। তাঁর অধীনস্থ কর্মচারী ও শাসকদের ওপর তাঁর উপদেশ ছিল, তাঁরা যেন জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা না করিয়া যথাসাধ্য তাদের সন্তোষ বিধানের চেষ্টা করেন।

টিকাঃ
৪. দেখা গিয়াছে, কুফায়ই কোরাইশ, বিদ্বেষ সর্বাপেক্ষা তীব্র ছিল।
৫. A Short History of the Saracens. p. 3 and pp. 73-74.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00