📄 কসর নামাজের প্রশ্ন
হজরত ওসমান মদিনায় গিয়া কসর পড়িতেন না পুরা নামাজ আদায় করিতেন। ইহা লইয়াই সাহাবি ও উলামা সম্প্রদায়ের আপত্তি ছিল। তাঁহাদের প্রশ্নের জবাবে হজরত ওসমান বলিয়াছিলেন, আমি নিজকে মক্কার 'কায়েম মোকাম' (স্থায়ী অধিবাসী) বলিয়া মনে করি এবং মক্কায় আসিয়াই কেয়াম (প্রবাস-রীতি) ভঙ্গ করিয়াছি। কাজেই প্রবাসীদের জন্য নামাজের কিছু অংশ মওকুফের যে বিধান রহিয়াছে, মীনায় আমি সে সুযোগের অধিকারী বলিয়া মনে করি নাই। বলা বাহুল্য, মক্কা ও তায়েফে হজরত ওসমানের কিঞ্চিৎ ভূসম্পত্তি ছিল। আলিমদের কথা ছিল, নবী মদিনায় বসতি স্থাপনের পর মক্কার সঙ্গে নাগরিকতার সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন করেছিলেন এবং মক্কায় তাঁর অবস্থানকে প্রবাস বলিয়া মনে করিতেন। তাঁর সাহাবিরা যাহারা মক্কা ত্যাগ করিয়া আসিয়াছিল এবং মদিনায় আশ্রয় লইয়াছিল, তাঁরা মক্কাকে তাঁহাদের বাসভূমি মনে করুক বা মক্কার সঙ্গে নাগরিকতার সম্পর্ক রাখুক, ইহা তিনি সন্দ করিতেন না। কথিত আছে, সাদ বিন আবি ওক্কাস একবার মক্কায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন নবী দোয়া করেছিলেন, তাঁর যেন মক্কায় মৃত্যু না হয়। এ অবস্থায় হজরত ওসমানের মক্কার সহিত নাগরিক সম্বন্ধ পুনর্জীবিত করা সাহাবিগণ পছন্দ করেন নাই। যে সব সাহাবি মীনায় তাঁর সহিত পুরা নামাজ আদায় করেছিলেন তাঁহাদের অনেকে বলিয়াছিলেন যে, পাছে খলিফার অবাদ্যতা প্রকাশ পায় এই জন্য আমরা তাঁর পশ্চাতে পুরা নামাজ পড়িয়াছি, কিন্তু উহাতে আমাদের অন্তরের সায় ছিল না। তাঁরা ইহাও হজরত ওসমানকে জিজ্ঞাসা দ্বারা জানিয়া লইয়াছিলেন, তিনি স্বয়ং এবং তাঁর পূর্ববর্তী দুই খলিফা হজরত রাসুলের সঙ্গে মীনায় কসর পরিয়াছিলেন, বৎসরের পর বৎসর। কিন্তু সকল প্রশ্নে তিনি শেষ উত্তর দেন এই বলিয়া যে, মদিনায় আমি কসর না পড়াই সঙ্গত মনে করেছিলাম।
📄 অশ্বের উপর জাকাত আদায়
হজরত ওসমানের বিরুদ্ধে লোকদের আর এক অভিযোগ ছিল, অশ্বের উপর তিনি জাকাত গ্রহণের নির্দেশ দেন। আলিমদের মতে ইহাতে হজরত রাসুলের প্রবর্তিত নীতির খেলাফ করা হয়েছে। কেননা, হজরত রসুল ঘোড়া ও গোলাম এই দুই সম্পত্তির উপর জাকাত মাফ করিয়া দিয়াছিলেন। প্রথম দুই খলিফার আমলেও হজরত রাসুলের এই নীতি বহাল রাখা হয়েছিল।
ইহার উত্তরে হজরত ওসমানের কৈফিয়ত এই ছিল, প্রাথমিক যুগে মুসলমানদের ঘোড়ার সংখ্যা খুব অল্প ছিল; অথচ যুদ্ধাদি ব্যাপারে ইহার প্রয়োজনীয়তা ছিল খুব বেশি। বদর যুদ্ধে মুসলমানপক্ষে মাত্র দুইটি যুদ্ধাশ্ব ব্যবহৃত হয়েছিল। যার একটি ছিল প্রসিদ্ধ ধনী যুবায়ের ইবনে আবামের। কিন্তু হজরত উমরের আমল হইতে মুসলিমদের অশ্বের সংখ্যা বাড়িতে থাকে। কাজেই তাঁর আমলে ঘোড়ার সম্পর্কে জাকাত মাফের কোনও প্রশ্ন উঠে না। বহু উলেমা এবং অশ্ব মালিক, যাদের ভিতর নবীর কতক সাহাবিও ছিলেন, হজরত ওসমানের এই কর-নীতি পসন্দ করেন নাই। কর সব অবস্থায়ই অপ্রিয়। তাঁরা নিজ স্বার্থে রাষ্ট্রের প্রয়োজনকে লঘু করিয়া দেখিয়াছিলেন।
📄 চারণভূমি নির্ধারণ
হজরত ওসমান যখন বাকি নামক চারণভূমিকে সরকারি খাসরূপে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন লোকেরা তার প্রতিবাদ করে এবং এ ব্যাপারে খলিফার উপর তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থের আরোপ করে। আলিমরা বলেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুল পানি, বাতাস ও চারণভূমির উপর জনগণের অবাদ অধিকার রাখিয়াছেন। সে ক্ষেত্রে জনগণের অধিকার সঙ্কুচিত করার ক্ষমতা খলিফার নাই। খলিফা বলিয়াছিলেন, এ ব্যাপারে তাঁর নিজের স্বার্থ কিছু নাই, সাক্কার পশুগুলোর খাদ্যের জন্য চারণভূমি সংরক্ষণের প্রয়োজন দেখা দিয়াছে। অন্যথা সেগুলো অযত্নে মারা যাইবে। কিন্তু আলিমদের পোষকতায় জনগণ 'যখন তাদের প্রতিবাদে অবিচল রহিল, তখন খলিফা এ ব্যাপারে কড়াকড়ি হ্রাস করিয়া দিলেন।
📄 মালে গণিমত বণ্টন
যুদ্ধলব্ধ আয়ের বণ্টন ব্যাপারেও খলিফার প্রতি সাহাবিদের ভিতর অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তাঁহাদের কথা হইল, মালে গণিমত বণ্টন সম্পর্কে কুরআনে যে নির্দেশ রহিয়াছে, তার উপর খলিফার নিজেদের বিচার-বুদ্ধি খাটানো অসমীচীন। মুতাজেলিদের মতে খলিফা যদি কুরআনের মূলনীতি লঙ্ঘন না করিয়া তার আঙ্গিকের ভিতর সাময়িক প্রয়োজনে তাঁর নিজের বিবেকের অনুসরণ করেন তাতে অন্যায় কিছু নাই। রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিনায়কের এরূপ অধিকার থাকা উচিত, ইহাই তাঁহাদের অভিমত। কেননা তিনি যদি শুধু শাস্ত্রবাণীর আক্ষরিক অনুসরণ করিয়া চলেন, কোনও নতুন সমস্যা দেখা দিলে রাষ্ট্রের অগ্রগতি তখন থামিয়া যাইবে।
এইরূপে বিশ্লেষণ করিলে দেখা যাইবে, সাহাবি ও ওলেমা-সম্প্রদায় হজরত ওসমানের যে সব কাজের বিরূপ সমালোচনা করিয়াছেন, সেগুলো এমন কিছু গুরুতর রকমের ছিল না, যার জন্য খলিফাকে পদচ্যুত করার বিধান বৈধ হইতে পারে। সাহাবা ও ওলেমা-সমাজ অবশ্য খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন নাই। তবে বিদ্রোহ যাহারা সৃষ্টি করেছিল তারা এই সব গণ্যমান্য ব্যক্তির মতামতের সুযোগ গ্রহণ করেছিল এবং জনগণকে উত্তেজিত করার জন্য তাঁহাদের সামান্য উক্তিরও সার্থক ব্যবহার করেছিল।