📄 সাহাবি, উলেমা সম্প্রদায় ও হযরত ওসমান
হজরত ওসমানের যাবতীয় কার্যই প্রাচীন উলেমা-সমাজ শরীয়তের দিক হইতে বিচার করিতেন। যে যুগে ইহাই ছিল বিচারের পদ্ধতি। তাঁর স্বপক্ষ বিপক্ষ উভয় দলই এই একই পদ্ধতির অনুসরণ করিয়াছেন। তাঁহাদের ভিতর তফাৎ উভয় দলই এই একই পদ্ধতি অনুসরণ করিয়াছেন। তাঁহাদের ভিতর তফাৎ ছিল শুধু শরীয়তের ব্যাখ্যা লইয়া। যাহা মোটেই ধর্মীয় নহে, একান্তভাবে পার্থিব, তার উপরও তাঁরা শরীয়তী দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া কিছুই ধর্মীয় বিধানের আওতাভুক্ত, এমন কি রাজনীতিও এই কারণেই খলিফার নিছক শাসনঘটিত নির্দেশসমূহের ভিতরও তাঁরা উহাতে মানুষের কল্যাণ-অকল্যাণের সম্ভাবনা কতখানি নিহিত আছে, তাহার বিচার করার চাইতে উহাতে কুফরি কতখানি প্রবেশ করিয়াছে সেই প্রশ্নে উপর গুরুত্ব দিতেন বেশি। অথচ খলিফাকে ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক সকল ব্যাপারের উপরই অভিমত প্রকাশ করিতে হইত এবং নির্দেশ যারি করিতে হইত। সামাজিক ব্যাপার গুলোতে খলিফা অনেক সময় নিজের বিবেক-বুদ্ধির উপর নির্ভর না করিয়া পারিতেন। রাজনৈতিক ব্যাপারেও তাঁকে অনেক সময় ঐ পন্থা অবলম্বন করিতে হইত। মুসলিম মুতাজিলা সম্প্রদায়, যাঁরা ইসলামি শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন, খলিফার এই প্রকার বিচার-বুদ্ধির স্বাধীনতা সমর্থন করিয়াছেন। কিন্তু সে অনেক পরের কথা। প্রাচীন আলিমরা ভুলিয়া যাইতেন যে, তাঁরা নিজেরাই অনেক বিষয় একমত হইতেন না, সেখানে খলিফা যাঁরা সম্মুখে অনন্ত সমস্যা বিরাজিত থাকিত এবং পরিস্থিতির জটিলতাও দুর্ভেদ্য ছিল, যদি অবস্থা গতিকে সুষ্ঠু রায় প্রদানে ভুল-ভ্রান্তি করিয়াও বসেন, তার জন্য তাঁকে গুরুতর অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত করা সমীচীন নহে। এতটুকু উদারতা তাঁরা দেখাইতে পারিলে খলিফার শাসন ব্যবস্থার পরিণতি হয়ত অন্য রূপ ধারণ করিত। দৃষ্টান্তস্বরূপ হজরত ওসমান কর্তৃক ওবায়দুল্লাহ্র বিচারের কথা উল্লেখ করা যাইতে পারে। ওবায়দুল্লাহ্ তাহার পিতার খুনের ব্যাপারে যে তিনজন লোককে ষড়যন্ত্রকারী সন্দেহে হত্যা করেছিল, তাদের ভিতর দুইজন ছিল জিম্মি এবং একজন পারস্য দেশীয় মুসলমান। ইসলামে মুসলমান ও জিম্মির জীবন 'রক্ষিত' বলিয়া প্রচার করা হয়েছে। মুসলমান বা জিম্মিকে কেহ ভুলবশত ছাড়া ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করিলে ইসলামে হত্যার শাস্তি প্রাণদণ্ড। এ সম্বন্ধে বিভিন্ন সূরায় আল্লাহ্র নিকট হইতে নির্দেশ আসিয়াছে। তাতে আল্লাহ্ 'কেসাস' অর্থাৎ প্রতিশোধ গ্রহণ বৈধ করিয়াছেন, কিন্তু মায়দা এবং সুরা আশূয়ার এই প্রতিশোধ গ্রহণের বিভিন্ন শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা বাকারায়, অবস্থাভেদে অপরাধীকে ক্ষমা প্রদর্শনও অনুমোদিত হয়েছে। ওবায়দুল্লাহ্ যে ইচ্ছা করিয়াই তিন ব্যক্তিকে হত্যা করেছিল, ভুল করিয়া নহে, তাতে সন্দেহ নাই। সে দিক দিয়া তাহার প্রাপ্য ছিল চরম দণ্ড। কিন্তু ইহাও সত্য, সে পিতৃশোকে অধীর হয়েই আত্মসংবরণে অক্ষম হয়েছিল এবং ইহাদের নিশ্চিতরূপে তাহার পিতার হত্যার কারণ বলিয়া বিশ্বাস করিয়া তাদের উপর তরবারি চালনা করেছিল। পরিস্থিতির এই জটিলতায় হজরত ওসমান নিজ বিবেক-বুদ্ধির অনুসরণ করেছিলেন এবং শেষ বিচারের মালিক আল্লাহ্ হাতে ওবায়দুল্লাহ্র শাস্তির ভার ন্যস্ত রাখিয়া শুধু সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার্থে যতটুকু প্রয়োজন মনে করিয়াছেন ততটুকু শান্তি তাহাকে দিয়াছিলেন। অথচ এই বিচারের জন্য তাঁকে কি কঠোর সমালোচনারই না সম্মুখীন হইতে হয়েছিল। একদল আলিম মত প্রকাশ করেন, ওবায়দুল্লাহকে শুধু অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করিয়া ছাড়িয়া দেওয়া শরীয়ত-বিরুদ্ধ হয়েছে যদিও তাঁহাদের বিপরীত মতের পোষণকারীরাও এ প্রশ্নে নীরব ছিলেন না।
টিকাঃ
২. মৃ'য়র প্রণীত Annals of the Early Caliphate, ৩১৬-২০ পৃষ্ঠা।
📄 কুরআন দগ্ধ করার অভিযোগ
হজরত ওসমান একটি কুরআন নকল কমিটি (Syndicate) গঠন করেন এবং নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ও সাহাবাদের সহযোগিতায় সরকারি পর্যবেক্ষণে কুরআন সঙ্কলন করেন, ইহা পূর্বেই বলা হয়েছে। তিনি কতিপয় কপি প্রস্তুত করাইয়া 'তাহার এক এক খণ্ড মক্কা, মদিনা, কুফা, বসরা, দামেস্ক প্রভৃতি প্রাদেশিক প্রধান শহরে প্রেরণ করেন সরকারি হিফাযতে রক্ষিত হইবার জন্য এবং ইহা ব্যতীত পূর্বের বেসরকারি সঙ্কলনসমূহ দগ্ধীভূত করান। তাঁর এই কার্য সাধারণভাবে সকল শহরেই সমর্থন লাভ করে, একমাত্র কুফা ছাড়া। আবু মাসুদ নামক কুফায় এক ধার্মিক ব্যক্তি ছিল, সে দাবি করে, তাঁর নিজ হস্তে কৃত সঙ্কলন নির্ভুল ছিল এবং আয়াতগুলো যখন যেমন নবী করিমের মুখ হইতে নির্গত হয়েছে তখনই সেইভাবে উহাতে লিখিয়া রাখা হয়েছিল। এই সঙ্কলন পোড়াইবার কোনও উপযুক্ত হেতু ছিল না। এই বলিয়া তিনি খলিফার বিরুদ্ধে জোর প্রচারণা চালাইতে থাকেন। খলিফার কার্য ধর্ম-বিগর্হিত, এই ছিল তাঁর প্রচারণার মূল কথা। কুফার জনসাধারণ ছিল স্বভাবত চঞ্চলমতি। তারা আবু মাসুদের এই প্রকার ঘোষণায় মাতিয়া উঠিল এবং খলিফার বিরুদ্ধে দল পাকাইতে লাগিল। তাদের কথা ছিল, যে কাগজে কুরআনের আয়াত লিখিত হয় তাহা পোড়ান মহাপাপ। হজরত আলি যখন খলিফা হইলেন তখন পর্যন্ত ওসমানের বিরুদ্ধে উক্ত কুৎসা রটনা থামে নাই। পরিশেষে হজরত আলি তাহাদের থামাইয়া দেন এই বলিয়া যে, হজরত ওসমান একাকী কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন নাই, নেতৃস্থানীয় সাহাবাদের পরামর্শ লইয়াই কাজ করেছিলেন এবং তাঁহাদের ভিতর তিনি নিজেও ছিলেন। তিনি আরও বুঝাইয়া দেন, হজরত ওসমানের পরিবর্তে তিনি নিজে যদি ঐ সময় খলিফা থাকতেন তবে তিনিও হজরত ওসমান যেরূপ করিয়াছেন, তদ্রুপ করিতেন।
📄 সাধু আবু জররে নির্বাসন
সাহাবি আবু জর মানুষের ধন-সম্পত্তি সঞ্চয়ের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাইতেন এবং সবকিছু দান-খয়রাত করিয়া দিতে লোকদের উপদেশ দিতেন, এই অপরাধে সিরিয়ার গভর্নর আমির মু'য়াবিয়া তাঁকে খলিফার অনুমতিক্রমে নেদের মরুভূমিতে রেবাজা নামক স্থানে নির্বাসিত করেন, ইহা পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। মু'য়াবিয়ার আশঙ্কা ছিল, পাছে আবু জরের প্রচারণা হইতে ইসলামে সমাজতন্ত্রবাদ (Communistic Movement) শুরু হয়ে যায়। দুই বৎসর পর নির্বাসিত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। আবু মাসুদ তাঁর জানাযা-কার্য সম্পাদন করেন। একজন ধর্মপ্রাণ সাধুর প্রতি এই নিষ্ঠুর আচরণ শুধু মু'য়াবিয়ার বিরুদ্ধেই জনগণের মনে আক্ষেপের কারণ হয় না, পরোক্ষভাবে খলিফার উপরও তাদের আক্রোশ জন্মে।
📄 মদীনার মসজিদ সম্প্রসারণ
হজরত ওসমান কা'বা ঘরের চতুষ্পার্শ্বস্থ চতুষ্কোণ প্রাঙ্গণ বাড়াইবার চেষ্টা করেন, কিন্তু পার্শ্ববর্তী জমির মালিকদের প্রবল বিরোধিতায় খলিফার সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। কিন্তু মদিনার মসজিদ সম্প্রসারণের বেলায় কাহারও আপত্তি খলিফা গ্রাহ্য করেন না। যাদের জমি হুকুমদখল করার প্রয়োজন হয়েছিল তারা জমির অস্বাভাবিক মূল্য দাবি করায় খলিফা তাহাদের কারারুদ্ধ করেন। হজরত উমরের সময়ও এইরূপ করা হয়েছিল, যখন লোকেরা তাদের জমি ও কুটিরগুলো অত্যধিক মূল্য দাবি করেছিল এবং এইভাবে মসজিদের আঙিনা বাড়ানোর ব্যাপারে বাধা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তখন তাহা লইয়া ব্যাপার বেশি দূর গড়ায় নাই। অথচ হজরত ওসমানের বেলায় বিরোধী দল লইয়া মহাকলরবের সৃষ্টি করে।