📄 কুফার ঘটনাবলীর প্রতিক্রিয়া
প্রাদেশিক রাষ্ট্র-বিরোধিতার ঢেউ মদিনায় পৌঁছিতে বিলম্ব হয় নাই। সেখানকার মজলুম ও বঞ্চিত লোকেরা ইহাতে উল্লসিত হয়েছিল। মদিনায় তাদের সংখ্যা অল্প ছিল না। কিন্তু চিন্তাশীল লোকেরা শঙ্কিত হয়েছিল। খলিফা বিদ্রোহীদের নিকট নতি স্বীকার করায় তারা খলিফার উপর অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছিল। সে বিরক্তির অর্থ ইহা নয়, তারা গভর্নর সাইদের কার্যকলাপ সমর্থন করিতেন। তাদের কথা, রাষ্ট্রের শাসন অমান্যকারী লোকদের সমুচিত দণ্ড না দিয়া তাদেরই মনোনীত লোককে, তাদের গভর্নর নিযুক্ত করায় শাসনতান্ত্রিক দিক দিয়া অত্যন্ত খারাপ নজির স্থাপন করা হয়েছে। একজন গভর্নরকে যদি তাঁর প্রজারা বলপ্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন দ্বারা তাঁর নিজ এলাকা হইতে বিতাড়িত করিতে পারে এবং কেন্দ্রীয় সরকার যদি তাহাই মানিয়া লয় তাহা হইলে শাসনযন্ত্র অচল না হয়ে পারে না। খলিফার উচিত ছিল বিদ্রোহীদের সমূচিত দণ্ড দেওয়া এবং নিজের পছন্দমতো একজন ভালো লোককে তাদের গভর্নর করিয়া পাঠান। বিদ্রোহীরা খলিফাকে নিজ ইচ্ছামতো গভর্নর নির্বাচনের অধিকারও দেয় নাই। আর তিনি স্বচ্ছন্দে সেই হীনতা মানিয়া লইয়াছেন। একজন সার্বভৌম খলিফার পক্ষে ইহার চাইতে দুর্বলতা আর কি হইতে পারে! এরূপ ব্যক্তি এতবড় একটা বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনার পক্ষে সম্পূর্ণ অযোগ্য! ইহার পর ভাবিবে, খলিফায় আদেশ লঙ্ঘনে কোনও বিপদের আশঙ্কা নাই। আর এইরূপ মনোভাব বর্ধিত হইতে থাকিলে শুধু ইসলামের সংহতি বিনষ্ট হইবে না, বহু কষ্টে অর্জিত মুসলিম সাম্রাজ্যও খণ্ড হয়ে ভাঙিয়া পড়িবে।
নবীর অন্যান্য সাহাবিদের কথা দূরে থাকুক, যে পাঁচ ব্যক্তি হজরত উমর কর্তৃক 'মজলিশে শুরা' বা নির্বাচন কমিটির সদস্য নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং যাঁহাদের নির্বাচনে হজরত ওসমান খলিফা নিয়োজিত হয়েছিলেন, তাঁহাদের ভিতর সা'দ ইবনে আবি ওক্কাসের মনোভাব পূর্বে আলোচিত হয়েছে। এই উদার হৃদয় বীরপুরুষ হজরত ওসমান কর্তৃক কুফার গভর্নর-পদ হইতে অপসারিত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর প্রতি কখনও বিদ্বেষ প্রদর্শন করেন নাই। হজরত উমরের মতো তিনি স্বমতে থাকিলে হয়ত সা'দ তাঁর পক্ষ সমর্থনও করিতেন। কিন্তু সাদ নির্বিকার থাকেন। তাঁকে কেহ সে সম্বন্ধে প্রশ্ন করিলে তিনি বলিতেন, 'জিহাদের প্রয়োজন ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এ তরবারি কোষমুক্ত হইবে না।' বলা বাহুল্য, হজরত রাসুলের সময় হইতে হজরত উমরের খিলাফৎ পর্যন্ত ইসলামের বহু যুদ্ধে সা'দ সেনাপতিত্ব করিয়াছেন এবং কখনও পরাজয় বরণ করেন নাই। হজরত ওসমানের অন্তিম দিনগুলো তিনি দেখিয়া যান নাই। কিন্তু তথাপি বিপ্লবের প্রথম উচ্ছ্বাস তিনি না দেখিয়াছেন এমন নয়। সে সময়ও তাঁর মতো প্রবীণ যোদ্ধার নিশ্চষ্ট হয়ে বসিয়া থাকা যথেষ্ট অর্থব্যঞ্জক।
'মজলিশে শুরা'র দ্বিতীয় সদস্য যুবাইর ইবনে আওয়াম হজরত আবু বকর কন্যা আসমার স্বামী এবং হজরত ওসমানের বিশিষ্ট বন্ধু ছিলেন। উভয়েই ধনী ব্যক্তি ছিলেন। ইসলামের বহু যুদ্ধে তাঁরা পাশাপাশি দাঁড়াইয়া তলোয়ার চালাইয়াছেন। খলিফা হয়ে হজরত ওসমান জুবাইরকে তাঁর ব্যবসায়ের উন্নতির জন্য বায়তুল মাল হইতে বিস্তর অর্থ ঋণদান করেছিলেন এবং তাঁর পুরাতন দেনা মওকুফ করিয়া দিয়াছিলেন জুবাইরের সম্পত্তির পরিমাণ কেহ আন্দাজ করিতে পারিত না। মিসরের নতুন রাজধানী ফাস্তাত ও পুরাতন রাজধানী আলেকজান্দ্রিয়ায় তাঁর প্রভৃত সম্পত্তি ছিল। ইরাকের দুই রাজধানী কুফা ও বসরায়ও তাঁর সম্পত্তি ছিল। খাস মদিনাতেই তাঁর এগারখানি বাড়ি ছিল। ইহা ছাড়া মক্কায়ও তাঁর ঘরবাড়ি ও ব্যবসায় ছিল। তিনি আজীবন হজরত ওসমানের সাথে সদ্ভাব রাখিয়া চলিয়াছেন। তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ হজরত ওসমানের অতিশয় প্রিয় ছিলেন। এহেন প্রতিপত্তিশালী লোকেরা ইচ্ছা করিলে বিপ্লবের সময় হজরত ওসমানের পক্ষে সমর্থনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করিতে পারতেন এবং তাহার ফল হইত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেখা গিয়াছে, যুবাইর বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের চেষ্টা দূরের কথা জোরের সহিত প্রতিবাদ পর্যন্ত করেন নাই। শুধু খলিফার গৃহ-অবরোধের সময় তিনি নিজের পুত্রকে পাঠাইয়াছিলেন তাঁর দেহরক্ষী হিসেবে।
'মজলিশে শুরার' তৃতীয় সদস্য প্রখ্যাত যোদ্ধা ও সওদাগর তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ্ ইসলামে দীক্ষা গ্রহণকারী হিসেবে হজরত ওসমানের সমসাময়িক ছিলেন। এবং নবীর আমল হইতে বহু জিহাদে উভয়ে একত্রে শরীক হয়ে ছিলেন। তিনিও হজরত ওসমানের খিলাফৎ আমলে বায়তুল মাল হইতে বিস্তর সাহায্য লাভ করেছিলেন। কথিত আছে, ওহোদ যুদ্ধে নবী যখন আহত ও শত্রুবেষ্টিত হন, তাল্হা নিজ দেহ দ্বারা তাঁকে আবৃত করেছিলেন এবং শত্রুর নিক্ষিপ্ত অসংখ্য তীরে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিলেন। অজস্র রক্তপাতে তিনি চলনশক্তি হারাইয়া ফেলেন। ইঁহার সম্বন্ধেই নবী বলিতেন, 'কোনো মৃত ব্যক্তিকে যদি চলাফেরা করিতে দেখিতে চাও, তবে তাল্ল্হা ইবনে ওবায়দুল্লাহকে দেখিয়া লও।' হজরত উমরের আমল পর্যন্ত তিনি মদিনায় থাকতেন। হজরত ওসমানের আমলে তিনি তাঁর সহিত ভূমি দখল করিয়া এবং অন্যদের জমি ক্রয় করিয়া ইরাকে বিরাট জমিদারি মালিক হয়েছিলেন। কিন্তু বিপ্লবের সময় তাঁকেও হজরত ওসমানের পার্শ্বে দেখা যায় নাই। কোনো কোনো রাবীর বর্ণনা এই, খলিফার গৃহ অবরোধ হইলে বিদ্রোহীদের সহিত সহযোগিতা করেছিলেন এবং এই কারণেই জঙ্গে মারওয়ান তাঁর উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করেন এবং তাঁরই নিক্ষিপ্ত তীরে তালহার মৃত্যু হয়। কিন্তু অপর বিবরণে প্রকাশ এবং ইহাই গ্রহণযোগ্য মনে হয়, হজরত আলি ও জুবাইয়ের ন্যায় তাল্হাও নিজ পুত্রকে খলিফার গৃহরক্ষায় নিযুক্ত করেছিলেন এবং এই সকল যুবক সাহসের সহিত বিদ্রোহীদের গৃহ প্রবেশের চেষ্টা প্রতিহত করেছিল। মু'য়রও এই বিবরণ গ্রহণ করিয়াছেন। খলিফার খুনের পর তালহা এবং জুবায়ের যে এই খুনের ব্যাপার লইয়া হজরত আলির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, সে ঘটনাও শেষোক্ত বর্ণনাই সমর্থ করে।
'মজলিশে শুরার' অন্যতম সদস্য হজরত আলি ছিলেন খিলাফতের নির্বাচনে হজরত ওসমানের প্রবলতম প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু নির্বাচন সমাপ্ত হইলে তিনি অন্য সকলের মতোই হজরত ওসমানের হস্তে বায়াৎ হয়েছিলেন এবং তার পর হইতে উক্ত আনুগত্যে অবিচল থাকেন। কারণ, ইসলামে বিভেদ সৃষ্টি ও রাষ্ট্রের সংহতি নাশ তিনি কোনো দিনই চাহেন নাই। তাই হজরত ওসমান তাঁকে না ডাকিলেও তিনি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে তাঁকে ন্যায়ের পথে চালিত করার জন্য উপদেশ দিতেন। অথচ তিনি কখনও হজরত ওসমানের নিকট অর্থ সাহায্যের জন্য হাত পাতেন নাই। বায়তুল মাল হইতে তিনি যে সামান্য ওজিফা পাইতেন তাতেই কোনও মতে সংসার চালাইতেন। ইহাও সত্য, তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন না; শুধু জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান বিতরণই ছিল এ আমলে তাঁর কাজ। কিন্তু উপদেশ দিতে গিয়া তিনি বার বার হজরত ওসমান কর্তৃক উপেক্ষিত হয়েছেন, এমন কি তিরস্কৃতও হয়েছেন। কারণ, হজরত ওসমান মনে করিতেন, তাঁর দোষ উদ্ঘাটনই হজরত আলির উদ্দেশ্য। হজরত আলি যতই তাঁর দিকে সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করিয়াছেন, ততই কূটকৌশলী মারওয়ান তাঁকে দূরে সরাইয়া লইয়াছেন, যাহাতে তিনি কোন ফাঁকে হাশেমি গোষ্ঠীর প্রভাবে গিয়া না পড়েন। আলি-ওসমা সম্পর্ক ব্যাপারে ঐতিহাসিক বালাজুরি তাঁর 'আন্সাফ-উল-আস্রাফ' গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের একটি উক্তির এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন: 'চতুর্দিকে অবস্থা যখন অত্যন্ত ঘোরাল হয়ে উঠিয়াছে, সেই সময় একদিন হজরত ওসমান আমার পিতার নিকট আসিয়া বলিলেন, 'মামু, আলি আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করিয়াছে এবং তোমার পুত্র আমার বিরুদ্ধে লোক লাগাইয়া দিয়াছে। হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তানগণ, তোমরা খিলাফৎ বনি-তামীম ও বনি আ'দের জন্য নির্দিষ্ট করিয়াছ কিন্তু আবদুল মানাফের সন্তানগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করো, এ দাবি তাঁরা করিতে পারে। তোমরা এ বিষয়ে তাদের সহিত কলহ করিও না।' ইহা শুনিয়া আমার পিতা দীর্ঘকাল চুপ করিয়া থাকিলেন। তারপর বলিলেন, 'হে ভ্রাতুষ্পুত্র, যদি আলি আপনার দৃষ্টিতে ভালো না হয়, তবে আপনিই বা আলির দৃষ্টিতে ভালো হইবেন কি রূপে? আত্মীয়তা এবং কর্মের দিক দিয়া যে সম্পর্ক, উহাতে আদৌ না বিরোধ আছে, না অস্বীকৃতি। এখন যদি ছাট-কাট করিয়া উঁচাকে নিচু এবং নিচুকে উঁচা করিয়া দিন তবেই উভয়ে কাছাকাছি হয়ে পড়িতে পারেন। ইহাই অধিকতর শোভন এবং সৌহার্দমূলক।' হজরত ওসমান বলিলেন, 'এই ব্যাপারে আমি তোমার উপর ভার দিলাম'।' আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস হয়ে পরবর্তী একদিনের কথা বর্ণনা করছেন: 'কথা খুবই ঘনাইয়াছিল কিন্তু আমি সেখান হইতে বাহির হয়ে আসিতেই মারওয়ান সেখানে যাইয়া প্রবেশ করিল। খলিফার লোক আমার পিতাকে ডাকিতে আসিল। তিনি সেখানে গেলে হজরত ওসমান বলিলেন: 'মামু! আমি আপনাকে যে ভার দিয়াছিলাম উহা আপাতত মূলতবী থাকুক। আমি বিষয়টি আরও চিন্তা করিয়া দেখিব।' ইহার পরে আমার পিতা বাহির হয়ে আসিলেন এবং আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন: 'এ লোক তো অন্যের বশীভূত।' ইহার পরে তিনি খোদার নিকট প্রার্থনা করিলেন: 'হে খোদা! তুমি আমাকে অশান্তির পূর্বেই উঠাইয়া লও, যাহাতে আমার কোনোই উপকার নাই সেজন্য আমাকে বাঁচাইয়া রাখিও না।' ইহার পরবর্তী জুমা না আসিতেই তাঁর ইন্তেকাল হইল।
হজরত আব্বাস উভয়ের মধ্যে সন্ধি-মৈত্রীর বহু চেষ্টা করেছিলেন এবং কিছু পরিমাণ সফলকামও হয়েছিলেন। হজরত ওসমান পুনরায় তাঁকে মধ্যস্থতার জন্য নিযুক্ত করেছিলেন এবং সম্ভবত তিনি কৃতকার্যও হইতে পারিতেন কিন্তু মারওয়ান তাঁর মতো ঘুরাইয়া দিয়াছিল, ফলে অবস্থা জটিল' হয়ে পড়িয়াছিল এবং হজরত আব্বাস যে অশান্তির আশঙ্কা করেছিলেন তাহাই পরিণামে দেখা দিয়াছিল।
যাহা হউক, হজরত আলি যে খলিফার গৃহ-অবরোধের সংবাদ পাইয়া তাঁর নিজের দুই পুত্রকে তাঁর দেহরক্ষী রূপে খলিফার গৃহে প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁরা বিদ্রোহীদের হস্তে আহত হয়েছিলেন, এই বিবরণ সম্পর্কে রাবীদের ভিতর অনৈক্য নাই। কাহারও মনে এইরূপ প্রশ্নের উদয় হইতে পারে, খয়বর বিজয়ী মহাবীর আলি স্বয়ং তরবারি ধারণ করিলে হয়ত খলিফার জীবননাশ ঘটিত না। কিন্তু আমাদের স্মরণ রাখিতে হইবে, বিদ্রোহীরা সংখ্যায় ছিল কয়েক সহস্র। তাদের মোকাবিলা করিতে হইলে রীতিমতো সেনাবাহিনী গঠন করিতে হইত। কিন্তু হজরত ওসমানের উহা অভিপ্রেত ছিল না। নিজের গদি রক্ষার উদ্দেশ্যে মদিনার বুকে গৃহযুদ্ধ এবং মুসলমান কর্তৃক মুসলমানের রক্তপাত তিনি চাহেন নাই। অন্যথা তাঁর সৈন্যবলের কিছুমাত্র অভাব ছিল না। মোটের উপর হজরত আলি কখনও হজরত ওসমানের বিরুদ্ধে যান নাই। তিনি তাঁর দোষ ধরিয়াছেন উহা সংশোধনের জন্য, তাঁকে উৎখাত করার জন্য নহে। কিন্তু খলিফার ভাগ্য মন্দ, তিনি এমন একজন হিতৈষী বন্ধুর আন্তরিকতায় আস্থা রাখিতে পারেন নাই; বারবার তাঁকে ভুল বুঝিয়াছেন।
মজলিশে শুরার সভাপতি আবদুর রহমান দিন আউফ, যিনি নির্বাচন দ্বন্দ্বে প্রসন্ন চিত্তে হজরত ওসমানকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিলেন, তিনিও শেষ পর্যন্ত তাঁর সম্বন্ধে দারুণ নৈরাশ্যে পতিত হয়েছিলেন। কথিত আছে, খলিফার শোচনীয় দুর্বলতা ও তজ্জনিত বিশৃঙ্খলাসমূহ দর্শনে আবদুর রহমান ব্যথিত হয়ে একদিন হজরত আলিকে বলিয়াছিলেন, 'তুমি তোমার তরবারি লও এবং আমি আমার তরবারি লই, তারপর তাহার পালা শেষ করিয়া আসি।' অবশ্য এই বৃদ্ধ সাহাবি হজরত ওসমানকে হত্যা করার বাসনা করেন নাই। অতিরিক্ত মনের খেদেই উপরোক্ত কথা বলিয়া থাকিবেন। এ যাবৎ খলিফা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াও আল্লাহ্ প্রেরিত রাসুলের প্রতিনিধি হিসাবে ব্যক্তিগতভাবে অতিশয় সম্মানিত ছিলেন। জনসাধারণের সমালোচনার তিনি ঊর্ধ্বে ছিলেন। এক্ষণে সেই দুর্লভ সম্মানের পরিবর্তে জনগণের নিকট তিনি অবহেলা ও তাচ্ছিল্য পাইতে লাগিলেন। রাস্তা-ঘাটে খলিফাকে দেখিলেই লোকেরা চীৎকার করিয়া বলিত, 'অত্যাচারী ইবনে আমিরকে সরাও নিরীশ্বর আবি সারাহকে বরখাস্ত কর, দুষ্ট মারওয়ানকে তোমার পার্শ্ব হতে দূর করে দাও।' মিসরের প্রাক্তন গভর্নর প্রখ্যাত বীর আমরু বরখাস্ত হওয়ার পর হইতেই খলিফার বিরুদ্ধে প্রচারণা করিয়া বেড়াইতেন। খলিফা ছিলেন তাঁর আপন চাচাতো ভাই। ভাইকে তিনি মুখের ওপরই কড়া কথা শুনাইয়া দিতেন। ভাইও তাতে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁকে কটূক্তি করিতেন এবং 'জামার ভিতরকার ইঁদুর' বলিয়া আখ্যায়িত করিতেন।
অত্যাচারিত জনসাধারণ রাজধানীর এই উত্তেজনার সংবাদ চতুর্দিকে প্রচার করিতে লাগিল। গোলযোগ এমনভাবে ঘুরপাক খাইতে লাগিল যে, রাজধানীর কোন্ দিকে, কিছুদিন যাবৎ তাহা নির্ণয় করা কঠিন হয়েছিল। জায়েদ ইবনে সাবিত (যিনি কুরআন সঙ্কলন করেছিলেন), কবি হাসান, তদীয় ভ্রাতা কা'ব ইবনে মালিক আবু ওয়াসীদ প্রমুখ লোকেরা, যাহারা এ যাবৎ খলিফার অনুগ্রহ ভোগ করিয়া আসিতেছিল, তারা এবং খলিফার অনেক নিকট-আত্মীয়ও এই উত্তেজনার হিড়িকে বিরোধী দলের সহিত হাত মিলাইয়াছিল।
টিকাঃ
১. ডক্টর তোহা হোসেন (মিসরি) প্রণীত 'হজরত ওসমান' মৌলানা নূরুদ্দীন আহমদ কৃত অনুবাদ ১৮৩-৮৪ পৃষ্ঠা।
📄 সাহাবি, উলেমা সম্প্রদায় ও হযরত ওসমান
হজরত ওসমানের যাবতীয় কার্যই প্রাচীন উলেমা-সমাজ শরীয়তের দিক হইতে বিচার করিতেন। যে যুগে ইহাই ছিল বিচারের পদ্ধতি। তাঁর স্বপক্ষ বিপক্ষ উভয় দলই এই একই পদ্ধতির অনুসরণ করিয়াছেন। তাঁহাদের ভিতর তফাৎ উভয় দলই এই একই পদ্ধতি অনুসরণ করিয়াছেন। তাঁহাদের ভিতর তফাৎ ছিল শুধু শরীয়তের ব্যাখ্যা লইয়া। যাহা মোটেই ধর্মীয় নহে, একান্তভাবে পার্থিব, তার উপরও তাঁরা শরীয়তী দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া কিছুই ধর্মীয় বিধানের আওতাভুক্ত, এমন কি রাজনীতিও এই কারণেই খলিফার নিছক শাসনঘটিত নির্দেশসমূহের ভিতরও তাঁরা উহাতে মানুষের কল্যাণ-অকল্যাণের সম্ভাবনা কতখানি নিহিত আছে, তাহার বিচার করার চাইতে উহাতে কুফরি কতখানি প্রবেশ করিয়াছে সেই প্রশ্নে উপর গুরুত্ব দিতেন বেশি। অথচ খলিফাকে ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক সকল ব্যাপারের উপরই অভিমত প্রকাশ করিতে হইত এবং নির্দেশ যারি করিতে হইত। সামাজিক ব্যাপার গুলোতে খলিফা অনেক সময় নিজের বিবেক-বুদ্ধির উপর নির্ভর না করিয়া পারিতেন। রাজনৈতিক ব্যাপারেও তাঁকে অনেক সময় ঐ পন্থা অবলম্বন করিতে হইত। মুসলিম মুতাজিলা সম্প্রদায়, যাঁরা ইসলামি শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন, খলিফার এই প্রকার বিচার-বুদ্ধির স্বাধীনতা সমর্থন করিয়াছেন। কিন্তু সে অনেক পরের কথা। প্রাচীন আলিমরা ভুলিয়া যাইতেন যে, তাঁরা নিজেরাই অনেক বিষয় একমত হইতেন না, সেখানে খলিফা যাঁরা সম্মুখে অনন্ত সমস্যা বিরাজিত থাকিত এবং পরিস্থিতির জটিলতাও দুর্ভেদ্য ছিল, যদি অবস্থা গতিকে সুষ্ঠু রায় প্রদানে ভুল-ভ্রান্তি করিয়াও বসেন, তার জন্য তাঁকে গুরুতর অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত করা সমীচীন নহে। এতটুকু উদারতা তাঁরা দেখাইতে পারিলে খলিফার শাসন ব্যবস্থার পরিণতি হয়ত অন্য রূপ ধারণ করিত। দৃষ্টান্তস্বরূপ হজরত ওসমান কর্তৃক ওবায়দুল্লাহ্র বিচারের কথা উল্লেখ করা যাইতে পারে। ওবায়দুল্লাহ্ তাহার পিতার খুনের ব্যাপারে যে তিনজন লোককে ষড়যন্ত্রকারী সন্দেহে হত্যা করেছিল, তাদের ভিতর দুইজন ছিল জিম্মি এবং একজন পারস্য দেশীয় মুসলমান। ইসলামে মুসলমান ও জিম্মির জীবন 'রক্ষিত' বলিয়া প্রচার করা হয়েছে। মুসলমান বা জিম্মিকে কেহ ভুলবশত ছাড়া ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করিলে ইসলামে হত্যার শাস্তি প্রাণদণ্ড। এ সম্বন্ধে বিভিন্ন সূরায় আল্লাহ্র নিকট হইতে নির্দেশ আসিয়াছে। তাতে আল্লাহ্ 'কেসাস' অর্থাৎ প্রতিশোধ গ্রহণ বৈধ করিয়াছেন, কিন্তু মায়দা এবং সুরা আশূয়ার এই প্রতিশোধ গ্রহণের বিভিন্ন শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা বাকারায়, অবস্থাভেদে অপরাধীকে ক্ষমা প্রদর্শনও অনুমোদিত হয়েছে। ওবায়দুল্লাহ্ যে ইচ্ছা করিয়াই তিন ব্যক্তিকে হত্যা করেছিল, ভুল করিয়া নহে, তাতে সন্দেহ নাই। সে দিক দিয়া তাহার প্রাপ্য ছিল চরম দণ্ড। কিন্তু ইহাও সত্য, সে পিতৃশোকে অধীর হয়েই আত্মসংবরণে অক্ষম হয়েছিল এবং ইহাদের নিশ্চিতরূপে তাহার পিতার হত্যার কারণ বলিয়া বিশ্বাস করিয়া তাদের উপর তরবারি চালনা করেছিল। পরিস্থিতির এই জটিলতায় হজরত ওসমান নিজ বিবেক-বুদ্ধির অনুসরণ করেছিলেন এবং শেষ বিচারের মালিক আল্লাহ্ হাতে ওবায়দুল্লাহ্র শাস্তির ভার ন্যস্ত রাখিয়া শুধু সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার্থে যতটুকু প্রয়োজন মনে করিয়াছেন ততটুকু শান্তি তাহাকে দিয়াছিলেন। অথচ এই বিচারের জন্য তাঁকে কি কঠোর সমালোচনারই না সম্মুখীন হইতে হয়েছিল। একদল আলিম মত প্রকাশ করেন, ওবায়দুল্লাহকে শুধু অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করিয়া ছাড়িয়া দেওয়া শরীয়ত-বিরুদ্ধ হয়েছে যদিও তাঁহাদের বিপরীত মতের পোষণকারীরাও এ প্রশ্নে নীরব ছিলেন না।
টিকাঃ
২. মৃ'য়র প্রণীত Annals of the Early Caliphate, ৩১৬-২০ পৃষ্ঠা।
📄 কুরআন দগ্ধ করার অভিযোগ
হজরত ওসমান একটি কুরআন নকল কমিটি (Syndicate) গঠন করেন এবং নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি ও সাহাবাদের সহযোগিতায় সরকারি পর্যবেক্ষণে কুরআন সঙ্কলন করেন, ইহা পূর্বেই বলা হয়েছে। তিনি কতিপয় কপি প্রস্তুত করাইয়া 'তাহার এক এক খণ্ড মক্কা, মদিনা, কুফা, বসরা, দামেস্ক প্রভৃতি প্রাদেশিক প্রধান শহরে প্রেরণ করেন সরকারি হিফাযতে রক্ষিত হইবার জন্য এবং ইহা ব্যতীত পূর্বের বেসরকারি সঙ্কলনসমূহ দগ্ধীভূত করান। তাঁর এই কার্য সাধারণভাবে সকল শহরেই সমর্থন লাভ করে, একমাত্র কুফা ছাড়া। আবু মাসুদ নামক কুফায় এক ধার্মিক ব্যক্তি ছিল, সে দাবি করে, তাঁর নিজ হস্তে কৃত সঙ্কলন নির্ভুল ছিল এবং আয়াতগুলো যখন যেমন নবী করিমের মুখ হইতে নির্গত হয়েছে তখনই সেইভাবে উহাতে লিখিয়া রাখা হয়েছিল। এই সঙ্কলন পোড়াইবার কোনও উপযুক্ত হেতু ছিল না। এই বলিয়া তিনি খলিফার বিরুদ্ধে জোর প্রচারণা চালাইতে থাকেন। খলিফার কার্য ধর্ম-বিগর্হিত, এই ছিল তাঁর প্রচারণার মূল কথা। কুফার জনসাধারণ ছিল স্বভাবত চঞ্চলমতি। তারা আবু মাসুদের এই প্রকার ঘোষণায় মাতিয়া উঠিল এবং খলিফার বিরুদ্ধে দল পাকাইতে লাগিল। তাদের কথা ছিল, যে কাগজে কুরআনের আয়াত লিখিত হয় তাহা পোড়ান মহাপাপ। হজরত আলি যখন খলিফা হইলেন তখন পর্যন্ত ওসমানের বিরুদ্ধে উক্ত কুৎসা রটনা থামে নাই। পরিশেষে হজরত আলি তাহাদের থামাইয়া দেন এই বলিয়া যে, হজরত ওসমান একাকী কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন নাই, নেতৃস্থানীয় সাহাবাদের পরামর্শ লইয়াই কাজ করেছিলেন এবং তাঁহাদের ভিতর তিনি নিজেও ছিলেন। তিনি আরও বুঝাইয়া দেন, হজরত ওসমানের পরিবর্তে তিনি নিজে যদি ঐ সময় খলিফা থাকতেন তবে তিনিও হজরত ওসমান যেরূপ করিয়াছেন, তদ্রুপ করিতেন।
📄 সাধু আবু জররে নির্বাসন
সাহাবি আবু জর মানুষের ধন-সম্পত্তি সঞ্চয়ের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাইতেন এবং সবকিছু দান-খয়রাত করিয়া দিতে লোকদের উপদেশ দিতেন, এই অপরাধে সিরিয়ার গভর্নর আমির মু'য়াবিয়া তাঁকে খলিফার অনুমতিক্রমে নেদের মরুভূমিতে রেবাজা নামক স্থানে নির্বাসিত করেন, ইহা পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। মু'য়াবিয়ার আশঙ্কা ছিল, পাছে আবু জরের প্রচারণা হইতে ইসলামে সমাজতন্ত্রবাদ (Communistic Movement) শুরু হয়ে যায়। দুই বৎসর পর নির্বাসিত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। আবু মাসুদ তাঁর জানাযা-কার্য সম্পাদন করেন। একজন ধর্মপ্রাণ সাধুর প্রতি এই নিষ্ঠুর আচরণ শুধু মু'য়াবিয়ার বিরুদ্ধেই জনগণের মনে আক্ষেপের কারণ হয় না, পরোক্ষভাবে খলিফার উপরও তাদের আক্রোশ জন্মে।