📄 খলিফার নিকট বিদ্রোহী-নেতা মালিক উশতারের পত্র
কুফার অধিবাসীগণ একের পর এক তাদের গভর্নর বদলাইতেছিল এবং তাদের আবদার দিন দিন সীমা ছাড়াইয়া চলিয়াছিল। উদার হৃদয় খলিফা দেশের সামগ্রিক বিপ্লবও অশান্তি পরিহারের আশায় এই দলগত আবদার সহিয়া যাইতেছিলেন। গভর্নর সাঈদ-সংক্রান্ত ঘটনাবলীর পরও খলিফা কুফাবাসীদের সম্বন্ধে আশা ছাড়িয়া দেন নাই। কারণ, বিরোধী দল তখনও স্বয়ং খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ প্রকাশ করেন নাই। তারা চলিয়াছিল বাদ্যতামূলকভাবে খলিফার নিকট হইতে দাবী আদায় করা। তাদের দাবি পূরণ হইলেই তারা খলিফার প্রতি তাদের আনুগত্য রক্ষা করিয়া চলিবে, এরূপ আশা করা তখন পর্যন্ত হজরত ওসমানের পক্ষে অযৌক্তিক হয় নাই। এ সম্বন্ধে বিরোধী দলীয় নেতা মালিক উত্তারের একখানা চিঠি প্রণিধানযোগ্য হজরত ওসমানকে মালিক উত্তার লিখিতেছেন:
'মালিক ইবনে হারিসের পক্ষ হইতে আচ্ছন্ন-বুদ্ধি, পথভ্রষ্ট এবং নবী ও কুরআনের নীতি-বিচ্যুত খলিফার প্রতি-
আপনার চিঠির মর্ম আমরা অবগত হয়েছি। খলিফা হিসেবে আপনার নিকট আমাদের দাবি এই, আপনাকে এবং আপনার নিয়োজিত শাসনকর্তাদের অন্যায় ও যুলম হইতে বিরত হইতে হইবে; ধার্মিক এবং পুণ্যবান লোকদের দেশ হইতে বহিষ্কৃত করা উচিত নহে। আমরা আপনার প্রতি আনুগত্যে সন্তুষ্ট। আপনার বিশ্বাস, আমরা বাড়াবাড়ি করিয়াছি এবং এই বিশ্বাসই আপনাকে ভ্রমে ফেলিয়াছে; তাই আপনি যুলমকে ইনসাফ এবং অন্যায়কে ন্যায় মনে করছেন। এখন আপনার প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও অনুরক্তির প্রশ্ন-তা আপনি পাইবেন, যদি আপনি বুযর্গ ব্যক্তিদের ওপর জুলুম করা থেকে, আমাদের ভক্তিভাজন পুণ্যচরিত্র লোকদের নির্বাসন দেওয়া হইতে, এবং যুবকদের আমাদের উপর শাসনকর্তা নিয়োগ করা হইতে ক্ষান্ত থাকেন। আপনি তওবা করুন, আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং আবদুল্লাহ্ ইবনে কায়েস মুসা আল আশারি এবং আবু হুজায়ফাকে আমাদের শাসক নিযুক্ত করুন। আপনার ওলিদ, আপনার সাঈদ এবং আপনার পরিবারের মনোনীত শাসনকর্তাগণ হইতে আমাদের অব্যাহতি দিন আস্ সালাম।
খলিফা দেখিলেন, কুফার লোকেরা চায় আবদুল্লাহ্ ইবনে কায়েস অথবা মূসা আল্ আশারিকে তাদের গভর্নররূপে এবং হুজায়ফা আল ইয়েমেনিকে রাজস্ব বিভাগের প্রধান রূপে। এতটুকু করিলেই কুফার লোকেরা তাঁর প্রতি আনুগত্যে অবিচল থাকিবে। তিনি বিদ্রোহীদের দাবী পূরণের জন্য সাঈদকে কুফার গভর্নর-পদ হইতে অপসারিত করিলেন এবং আবু মুসাকে তাঁর স্থলে নিয়োজিত করিলেন। আবু মুসা কুফায় পৌঁছিলে বিপুল জনতা তাঁকে কুফার জামে মসজিদে অভ্যর্থনা জানাইল। কেল্লার সেনানায়কগণও ইহাতে যোগদান করিল। তিনি প্রথমে জনগণের নিকট হইতে খলিফার নামে বশ্যতার স্বীকৃতি আদায় করিলেন এবং তারপর মসজিদে বিরাট জনসংঘের নামাজে ইমামতি করিয়া নিজের পদ-দায়িত্ব গ্রহণ করিলেন। খলিফা যদি আপসমূলক মনোভাব প্রদর্শন না করিয়া বিদ্রোহের নেতাগণকে শাস্তি দিতেন, তাতে সাময়িকভাবে বিদ্রোহ দমন করা চলিত কিন্তু তার ফল বিপরীত হইত। বসরা, মিসর প্রভৃতি অন্যান্য বিদ্রোহ ভাবাপন্ন এলাকায় ইহার প্রতিক্রিয়া দেখা দিত এবং রাজ্যময় বিদ্রোহের আগুন জ্বলিয়া উঠিত। খলিফার সহৃদয়তার ফলে আপাতত কুফা শান্তূর্তি ধারণ করিল এবং এখন পর্যন্ত বিদ্রোহ কুফাতেই সীমাবদ্ধ রহিল।
টিকাঃ
২. ডক্টর তোহা হোসেন (মিসরি) প্রণীত হজরত ওসমান ১২৭-১২৮ পৃষ্ঠা।
📄 হাকিম ইবনে জাবালা
কুফায় যে সব ঘটনা ঘটিয়া গেল তাহার পশ্চাতে এক গোপন হস্তের অঙুলি সঞ্চালন লোকেরা সন্দেহ করিয়া থাকে। হাকীম ইবনে জাবালা নামক এক কূটনীতিবিশারদ জিম্মি তখন কুফায় অবস্থান করিতে ছিলেন। তাঁর পিতার জাবালা ছিলেন এশিয়া মাইনর প্রদেশের বাইজেনটাইন এলাকার এক খ্রিস্টান ভূস্বামী। ঐ অঞ্চলে তাঁর যথেষ্ট প্রতিপত্তি ছিল এবং অবিচল বিশ্বস্ততার দরুন তিনি বাইজেনটাইন সম্রাটের প্রিয়পাত্র ছিলেন। অনেক ব্যাপারে তিনি উক্ত সম্রাটের প্রতিনিধিত্ব করিতেন এবং সম্রাটের অনুগ্রহে তিনি সামন্ত রাজার মর্যাদা উপভোগ করিতেন। কিন্তু ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে প্রসিদ্ধ ইয়ারমুখ যুদ্ধে তিনি মুসলমানদের হস্তে বন্দি হন এবং খলিফা হজরত উমরের নিকট আনীত হন। সেখানে তিনি বন্দিত্ব হইতে মুক্তিলাভের আশায় ইসলাম ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। হজরত উমর তাঁকে ছাড়িয়া দেন।
অতঃপর কিছুকাল তিনি স্বাধীন নাগরিক হিসেবে মুসলিম এলাকায় বাস করেন, কিন্তু ইসলামে শরিয়তের কড়াকড়ি, বিশেষ করিয়া গীত বাদ্য ও মদ্য পানের প্রতি নিষেধাজ্ঞা তাঁর ভালো লাগে নাই। তিনি পুনরায় খ্রিস্টান সমাজে ফিরিয়া যান এবং পূর্বের ন্যায় উচ্ছৃঙ্খল জীবন উপভোগে লিপ্ত হন। কিন্তু এদিকে মুসলিমদের বিজয়-স্রোত অব্যাহত থাকে। সিরিয়া আর্মেনিয়া, প্যালেস্টাইন ও মিসর প্রভৃতি খ্রিস্টান শাসিত এলাকাগুলো খলিফার হস্তগত হয়। বাইজেনটাইন সম্রাট অস্ত্রের দ্বারা মুসলিমদের এই অগ্রগতি রোধ করিতে না পারিয়া ঐ সঙ্গে নানা কূটকৌশলেরও আশ্রয় লন। এই পরিস্থিতিতে হজরত উমরের ওফাতের কিছুকাল পূর্বে জাবালার সুযোগ্য পুত্র হাকিম ইবনে জাবালা মুসলমানরূপে আরবে প্রবেশ করেন এবং মুসলিম সেনাবাহিনীর প্রধান উৎস ইরাককে নিজ কর্মক্ষেত্ররূপে আরবে প্রবেশ করেন এবং মুসলিম সেনাবাহিনীর প্রধান উৎস ইরাককে নিজ কর্মক্ষেত্ররূপে বাছিয়া লন। তিনি অবস্থান করিতেন রাজধানী শহর কুফায় এবং সেখান হইতে চতুর্দিকে যোগাযোগ রক্ষা করিতেন। মুসলিম ঐতিহাসিকদের অনেকের বিশ্বাস, হাকিম ইবনে জাবালা বাইজেনটাইন সম্রাটের গুপ্তচর ছিলেন এবং মুসলমানদের সংহতি বিনষ্ট করা ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। কেননা, সেনাদলের অটুট সংহতিই মুসলিমদের বিজয়ের অন্যতম কারণ ছিল, তাহা বুঝিতে বাইজেনটাইন সম্রাটের বিলম্ব হয় নাই।
ইবনে জাবালার অকস্মাৎ ইরাকে আবির্ভাব এবং তাহার পরেই কতকগুলো ঘটনার সংঘটন ঐতিহাসিকদের উক্ত অনুমানকে সভ্যতার মর্যাদা দেয়। ঐ ব্যক্তি কুফায় আবাস গ্রহণের পরই সেখান হইতে জিম্মি ও مسلمانوں পক্ষ হইতে স্থানীয় শাসনকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘন ঘন দরখাস্ত খলিফার নিকট পৌছিতে থাকে। শুধু তাহাই নয়, সঙ্ঘবদ্ধভাবে অভিযোগকারীদের পক্ষ হইতে খলিফার নিকট প্রতিনিধি প্রেরণও এই সময় হইতেই শুরু হয়। স্থানীয় অশিক্ষিত প্রজাগণ এই সব কায়দাকানুন জানিত না। হাকিম ইবনে জাবালার দুষ্টবুদ্ধিই এই সমস্তের মূলে সক্রিয় ছিল বলিয়া অনেকের বিশ্বাস। এই প্রচেষ্টার প্রথম পরিণতি হজরত উমর কর্তৃক সা'দ বিন আবি ওক্কাসের পদচ্যুতি।
হজরত উমরের মৃত্যু ও ঘটে একজন অমুসলমান জিম্মির হাতে। এই সকলের মূলে যে একটি গভীর ষড়যন্ত্র ছিল তাহা সহজেই অনুমেয়। হযরতের উমর পরলোকগমন করার পর ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হন তাঁর পরবর্তী খলিফা হজরত ওসমান।
কুফার লোকেরা সা'দের অপসারণের পর তাঁর স্থলবর্তী গভর্নর ওলিদের বিরুদ্ধে লাগিয়া যায়। ইহার ফলে হজরত ওসমান বাধ্য হয়ে ওলিদকে পদচ্যুতি করেন এবং সাঈদ ইবনে আল আসকে তাঁর স্থলে গভর্নর করিয়া পাঠান। কিন্তু সাঈদও সেখানে টিকিতে পারিলেন না। কুফাবাসীদের দাবি পূরণের জন্য আবু মুসা আল আশারিকে সেখানে প্রেরণ করিতে হইল। ইহাতেই বুঝা যায়, গভর্নরদের দোষ-গুণ যতই থাকুক, এবং দোষ-গুণ ছাড়া মানুষ হয় না-অভ্যন্তরীণ উস্কানি সেখানে কত প্রবল ছিল। ইরাক ও মিসর এই দুইটি দেশ ছিল সমৃদ্ধির দিক দিয়া মুসলিম সাম্রাজ্যের মুকুটমণি। আর খলিফার কি দুর্ভাগ্য, এই দুইটি দেশই বিভেদ সৃষ্টিকারীদের প্রধান আড্ডায় পরিণত হয়।