📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 কুফায় শাসক শক্তির প্রকাশ্য বিরোধিতা

📄 কুফায় শাসক শক্তির প্রকাশ্য বিরোধিতা


কুফার এক বৈঠকে সোয়াত উপত্যকার অধিকার সম্পর্কে গভর্নর সাঈদের একটি উক্তির ফলে কিভাবে দাঙ্গা হয়েছিল, তাহা পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। আর একদিনের ঘটনা: গভর্নরের দরবারে বিশিষ্ট সাহাবি তালহা সম্বন্ধে কথাবার্তা চলিতেছিল। লোকেরা তাঁর দান-খয়রাতের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করিতেছিল। গভর্নর বলিলেন, 'তালহা যেরূপ ধনী, তাতে এরূপ দানখয়রাত তো তিনি করিবেনই। তাঁর মতো ধন-সম্পদ আমার থাকিলে আমিও ধান-খয়রাত করিয়া তোমাদের খুশি করিতাম।' ইহাতে বনি-আওসাদ বংশীয় এক যুবক বলে, ফোরাত-তীরের অমুক জমিগুলো আমিরের হইলে কি সুখের হইত। আমরা মালে গণিমত হিসাবে তার চাষ-আবাদ করিতে পারিতাম। কথাটি গল্পচ্ছলে বলা হয়ে থাকিলেও উপস্থিত লোকদের উহা মনঃপুত হয় নাই। নাই তারা যুবকটির প্রতিবাদ করে। আওসাদ গোত্র শক্তিশালী ছিল। ক্রমে দুইদলে বচসার সৃষ্টি হইল এবং বচসা হইতে হাতাহাতি ও রক্তারক্তি হয়ে গেল। যুবকটি এত মার খাইল, সভাস্থলে যে সংজ্ঞা হারাইয়া ফেলিল।
সাঈদ অত্যন্ত অপ্রতিভ হইলেন এবং দুই দলের ভিতর বারটি আপসে মিটাইয়া ফেলার চেষ্টা করিলেন। কিন্তু কোন ফলোদয় হইল না। লোকদের মন পূর্ব হইতেই তিক্ত ছিল। শহরে দলাদলি ও রেষারেষি চলিতে থাকায় এবং গণ-বিক্ষোভ চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়ায় দুর্বৃত্তপরায়ণ লোকেরা সুযোগ পাইয়া বসিল। তারা নানা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও লুটতরাজ করিতে লাগিল শহরের অবস্থা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠিতে লাগিল। শহরের শক্তিশালী ব্যক্তিদের অধিকাংশ তখন পারস্যের যুদ্ধ-শিবিরে, তারা জিহাদে রত ছিল। এ অবস্থায় গভর্নর নিজেকে অত্যন্ত বিব্রত বোধ করিলেন। ইতোমধ্যে তিনি খলিফার নিকট হইতে তাঁর পূর্ব-লিখিত পত্রের জবাব পাইলেন। খলিফা লিখিয়াছেন, 'নগরের শান্তি রক্ষার্থে বিদ্রোহ ভাবাপন্ন লোকগুলোকে সিরিয়ায় পাঠাইয়া দাও। সেখানে মু'য়াবিয়ার শাসনাধীনে তারা সংশোধিত হইবে।' খলিফা আমির মুয়াবিয়াকেও তাঁর আদেমের কথা জানাইয়া দিয়াছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন, মু'য়াবিয়ার শাসনাধীনে তারা সংশোধিত হইবে।' খলিফা আমির মু'য়াবিয়াকেও তাঁর আদেমের কথা জানাইয়া দিয়াছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন, মু'য়াবিয়ার শক্তিশালী শাসনে এবং সিরিয়ার জনগণের অবিচলিত রাজভক্তির সংস্রবে এই রাষ্ট্রদ্রোহী লোকদের মনোবৃত্তির পরিবর্তন ঘটিবে।
খলিফার নির্দেশ অনুযায়ী গভর্নরবিরোধী পক্ষের দশজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে সিরিয়ায় নির্বাসিত করিলেন। কিন্তু ইহা লইয়া কুফার আলিম সমাজে নানা কূটতর্ক চলিতে লাগিল। একজন নাগরিককে কোন্ কোন্ অপরাধে তাহার ঘরবাড়ি হইতে উৎখাত করা যায়, কুরআনে তাহার উল্লেখ আছে। এই দশ ব্যক্তির অপরাধ তার গণ্ডীর ভিতর পড়ে কিনা তাহা লইয়া বিতর্কের সীমা রহিল না। নির্বাসিত লোকদের ভিতর শক্তিশালী জননায়ক ও যোদ্ধা মালিক উত্তারও ছিলেন। শহরে তাদের প্রতিপত্তিও ছিল অসাধারণ। তাঁহাদের জন্য নগরের অকোরাইশগণ আক্রোশে ফাটিয়া পড়িতে লাগিল।
নির্বাসিত ব্যক্তিরা দামেস্ক পৌঁছিলে মু'য়াবিয়া সেন্টমেরি নামক পরিত্যক্ত গির্জায় তাদের থাকার ব্যবস্থা করিয়া দিলেন। তিনি প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় ভ্রমণে যাওয়ার পথে এই লোকগুলোর সহিত সাক্ষাৎ করিতেন এবং তাহাদের কোরাইশদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাদের নিজেদের অপরাধের গুরুত্ব সম্বন্ধে নসিহত শুনাইয়া যাইতেন। তাঁর অহমিকাপূর্ণ কর্কশ ব্যবহারে কুফার এই লোকগুলো বিরক্ত হয়ে উঠে। কয়েক দিন অপমান সহ্য করার পর একদিন তারা অতিষ্ঠ হয়ে মু'য়াবিয়াকে কড়া কথা শুনাইয়া দিল। ইহাতে মু'য়াবিয়া ক্রুদ্ধ হয়ে তাহাদের হেম্স শহরে নির্বাসিত করেন।
হেম্স শহর উত্তর-সিরিয়ায় অবস্থিত। তথাকার গভর্নর ছিলেন মহাবীর খলিদের পুত্র আবদুল্লাহ্। ইনি অত্যন্ত গর্বিত ছিলেন। এক মাস কাল এই রাজবন্দিগণ তাঁর এলাকায় ছিল। যখনই গভর্নর অশ্বারোহণে বাহির হইতেন, এই লোকগুলোকে অপমান করিতেন। তিনি তাহাদের অসভ্য, বর্বর এবং ষড়যন্ত্রকারী বলিয়া কটূক্তি করিতেন এবং বলিতেন, তোমরাই ত মুসলিম সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করার জন্য যতদূর সাধ্য চেষ্টা করছে।
অত্যাচারে, অপমানে ও বন্দিত্বের ফলে নির্বাসিত নেতাদের মনোবল ভাঙিয়া পড়ে। তারা শেষে নিজেদের অনুতপ্ত বলিয়া প্রকাশ করে এবং এইভাবে নির্বাসন হইতে মুক্তি লাভ করে। কিন্তু তারা ইহার পর লজ্জাবশত কুফায় আর ফিরিয়া যায় নাই। সিরিয়াতেই থাকিয়া যায়। শুধু তাদের নেতা মালিক উত্তার রাজধানীর পরিস্থিতি অবগত হওয়ার জন্য গোপনে মদিনায় চলিয়া গেলেন। নির্বাসিত ব্যক্তিরা তাঁর প্রত্যাগমন প্রতীক্ষা করিতে থাকে। এদিকে তারা কুফায় না আসিলেও তাদের দুঃখের কাহিনি কুফাবাসীদের জানিতে বাকি ছিল না। অথচ ইহার কোনও প্রতিকারের উপায়ও তাঁরা খুঁজিয়া পাইতেছিল না। তাই রুদ্ধ আক্রোশ তাদের ভিতর এক ব্যাপক গণ-উত্থানের রূপ গ্রহণ করিতেছিল।
মাসের পর মাস যাইতে লাগিল, কিন্তু কুফার অবস্থার কোনও উন্নতি দেখা গেল না। রাজদ্রোহিতা পুরামাত্রায় বিরাজ করিতে থাকিল। যে সকল সম্ভ্রান্ত ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির সংসর্গ স্থানীয় ব্যক্তিদের ভিতর শান্তি রক্ষার পক্ষে অনুকূল প্রভাব বিস্তার করিতে পারিত তারা তখনও যুদ্ধব্যপদেশে পারস্যে অবস্থান করিতেছিল।
ক্রমে মিসরের বিদ্রোহী দলের সহিত কুফার বিদ্রোহী দলের যোগসূত্র স্থাপিত এবং জনগণের ভিতর সাহস উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। বিদ্রোহ আগাইয়া চলিল। এই অবস্থায় ভগ্নহৃদয় সাঈদ মদিনায় চলিয়া গেলেন এবং হজরত ওসমানের নিকট অভিযোগ উত্থাপন করিলেন। গভর্নরের এই সামরিক অনুপস্থিতির সুযোগে বিদ্রোহীরা প্রকাশ্যে আপনাদের সংগঠিত করিতে প্রবৃত্ত হইল। তারা সিরিয়া হইতে তাদের নির্বাসিত নেতৃবর্গকে ফিরাইয়া আনিল এবং মালিক উত্তারকেও মদিনা হইতে ডাকিয়া লইল। শহরে দারুণ উত্তেজনা চলিতে লাগিল।
একদিন মালিক উত্তার কুফার জামে মসজিদের দরজায় দাঁড়াইয়া, নামাজে আগত জনগণকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতে লাগিলেন- 'আমি এই মাত্র আমাদের উচ্ছৃঙ্খল শাসনকর্তা (সাঈদ) কে মদিনায় দেখিয়া আসিলাম। তিনি তথায় আমাদের ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রহিয়াছেন এবং খলিফাকে উপদেশ দিয়েছেন, আমাদের সামরিক বৃত্তি এমন কি অসহায় রমণীদের বৃত্তিও কাটিয়া দিতে এবং যে সকল প্রশস্ত ময়দান আমরা বাহুবলে দখল করিয়াছি সেগুলোকে কোরাইশদের উদ্যান সম্পত্তি বলিয়া গণ্য করিতে।
এদিকে গভর্নর সাঈদ মদিনা হইতে প্রত্যাবর্তন করিতেছিলেন। তিনি যখন কুফার নিকটবর্তী হয়েছেন, জনতা সংগবদ্ধ হয়ে অগ্রসর হইতে থাকিল এবং ক্যাডেসিয়া প্রান্তর পর্যন্ত পৌছিয়া তাঁকে দূত মারফৎ জানাইয়া দিল, কুফাবাসীরা তাঁকে দূত মারফৎ জানাইয়া দিল, কুফাবাসীরা তাঁকে আর চায় না। গভর্নর স্থানীয় ভদ্রলোকদের সহযোগিতায় বিদ্রোহী জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করিলেন। তিনি তাহাদের ধৈর্য ধারণ করিতে উপদেশ দিলেন। ইহাতে কাক্কা নামক প্রখ্যাত যোদ্ধা বিদ্রূপ করিয়া বলিলেন, 'জনগণ যা চায় তা তারা না পাওয়া পর্যন্ত তাদের কলরব থামাইবার চেষ্টা করার চাইতে বরং ঐ ফোরাত নদীতে যখন জোয়ার আসে তখন তাকে উল্টা দিকে প্রবাহিত করানোর চেষ্টা করিয়া দেখ।' নির্বাসিত জনৈক নেতার ইয়াযিদ নামক এক ভ্রাতা ইত্যবসরে একটি নিশান উড্ডীন করিয়া যাবতীয় বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে তার তলে আহ্বান করিল এবং অত্যাচারী গবর্নরের কুফায় প্রবেশ রোধ করিতে বলিল। সাঈদ এতটা আশঙ্কা করেন নাই। তিনি বলিলেন, 'তোমরা মদিনায় খলিফার নিকট তোমাদের অভিযোগ পাঠাইলেই ত চলিত; তা না করিয়া তোমরা হাজার লোক আসিয়াছ একজন লোকের বিরুদ্ধে।'
কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতা গভর্নরের কথায় কর্ণপাত করিল না। তাঁর ভৃত্য জনতার ভিতর দিয়া পথ করার চেষ্টা করিতে গিয়া মালিক উপ্তা কর্তৃক নিহত হইল। অগত্যা গভর্নর সাঈদ পুনরায় মদিনায় পালাইয়া গেলেন সেখানে গিয়া তিনি দেখিলেন, খলিফা ইতোপূর্বেই কুফার বিদ্রোহের সংবাদে' অভিভূত হয়ে পড়িয়াছেন এবং বিদ্রোহীরা যাহা চায় সেই দাবি পূরণের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছেন।

টিকাঃ
১. মৃ'য়র প্রণীত Annals of the Early Caliphate, ৩১৬-১৮ পৃষ্ঠা।

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 খলিফার নিকট বিদ্রোহী-নেতা মালিক উশতারের পত্র

📄 খলিফার নিকট বিদ্রোহী-নেতা মালিক উশতারের পত্র


কুফার অধিবাসীগণ একের পর এক তাদের গভর্নর বদলাইতেছিল এবং তাদের আবদার দিন দিন সীমা ছাড়াইয়া চলিয়াছিল। উদার হৃদয় খলিফা দেশের সামগ্রিক বিপ্লবও অশান্তি পরিহারের আশায় এই দলগত আবদার সহিয়া যাইতেছিলেন। গভর্নর সাঈদ-সংক্রান্ত ঘটনাবলীর পরও খলিফা কুফাবাসীদের সম্বন্ধে আশা ছাড়িয়া দেন নাই। কারণ, বিরোধী দল তখনও স্বয়ং খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ প্রকাশ করেন নাই। তারা চলিয়াছিল বাদ্যতামূলকভাবে খলিফার নিকট হইতে দাবী আদায় করা। তাদের দাবি পূরণ হইলেই তারা খলিফার প্রতি তাদের আনুগত্য রক্ষা করিয়া চলিবে, এরূপ আশা করা তখন পর্যন্ত হজরত ওসমানের পক্ষে অযৌক্তিক হয় নাই। এ সম্বন্ধে বিরোধী দলীয় নেতা মালিক উত্তারের একখানা চিঠি প্রণিধানযোগ্য হজরত ওসমানকে মালিক উত্তার লিখিতেছেন:
'মালিক ইবনে হারিসের পক্ষ হইতে আচ্ছন্ন-বুদ্ধি, পথভ্রষ্ট এবং নবী ও কুরআনের নীতি-বিচ্যুত খলিফার প্রতি-
আপনার চিঠির মর্ম আমরা অবগত হয়েছি। খলিফা হিসেবে আপনার নিকট আমাদের দাবি এই, আপনাকে এবং আপনার নিয়োজিত শাসনকর্তাদের অন্যায় ও যুলম হইতে বিরত হইতে হইবে; ধার্মিক এবং পুণ্যবান লোকদের দেশ হইতে বহিষ্কৃত করা উচিত নহে। আমরা আপনার প্রতি আনুগত্যে সন্তুষ্ট। আপনার বিশ্বাস, আমরা বাড়াবাড়ি করিয়াছি এবং এই বিশ্বাসই আপনাকে ভ্রমে ফেলিয়াছে; তাই আপনি যুলমকে ইনসাফ এবং অন্যায়কে ন্যায় মনে করছেন। এখন আপনার প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও অনুরক্তির প্রশ্ন-তা আপনি পাইবেন, যদি আপনি বুযর্গ ব্যক্তিদের ওপর জুলুম করা থেকে, আমাদের ভক্তিভাজন পুণ্যচরিত্র লোকদের নির্বাসন দেওয়া হইতে, এবং যুবকদের আমাদের উপর শাসনকর্তা নিয়োগ করা হইতে ক্ষান্ত থাকেন। আপনি তওবা করুন, আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং আবদুল্লাহ্ ইবনে কায়েস মুসা আল আশারি এবং আবু হুজায়ফাকে আমাদের শাসক নিযুক্ত করুন। আপনার ওলিদ, আপনার সাঈদ এবং আপনার পরিবারের মনোনীত শাসনকর্তাগণ হইতে আমাদের অব্যাহতি দিন আস্ সালাম।
খলিফা দেখিলেন, কুফার লোকেরা চায় আবদুল্লাহ্ ইবনে কায়েস অথবা মূসা আল্ আশারিকে তাদের গভর্নররূপে এবং হুজায়ফা আল ইয়েমেনিকে রাজস্ব বিভাগের প্রধান রূপে। এতটুকু করিলেই কুফার লোকেরা তাঁর প্রতি আনুগত্যে অবিচল থাকিবে। তিনি বিদ্রোহীদের দাবী পূরণের জন্য সাঈদকে কুফার গভর্নর-পদ হইতে অপসারিত করিলেন এবং আবু মুসাকে তাঁর স্থলে নিয়োজিত করিলেন। আবু মুসা কুফায় পৌঁছিলে বিপুল জনতা তাঁকে কুফার জামে মসজিদে অভ্যর্থনা জানাইল। কেল্লার সেনানায়কগণও ইহাতে যোগদান করিল। তিনি প্রথমে জনগণের নিকট হইতে খলিফার নামে বশ্যতার স্বীকৃতি আদায় করিলেন এবং তারপর মসজিদে বিরাট জনসংঘের নামাজে ইমামতি করিয়া নিজের পদ-দায়িত্ব গ্রহণ করিলেন। খলিফা যদি আপসমূলক মনোভাব প্রদর্শন না করিয়া বিদ্রোহের নেতাগণকে শাস্তি দিতেন, তাতে সাময়িকভাবে বিদ্রোহ দমন করা চলিত কিন্তু তার ফল বিপরীত হইত। বসরা, মিসর প্রভৃতি অন্যান্য বিদ্রোহ ভাবাপন্ন এলাকায় ইহার প্রতিক্রিয়া দেখা দিত এবং রাজ্যময় বিদ্রোহের আগুন জ্বলিয়া উঠিত। খলিফার সহৃদয়তার ফলে আপাতত কুফা শান্তূর্তি ধারণ করিল এবং এখন পর্যন্ত বিদ্রোহ কুফাতেই সীমাবদ্ধ রহিল।

টিকাঃ
২. ডক্টর তোহা হোসেন (মিসরি) প্রণীত হজরত ওসমান ১২৭-১২৮ পৃষ্ঠা।

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 হাকিম ইবনে জাবালা

📄 হাকিম ইবনে জাবালা


কুফায় যে সব ঘটনা ঘটিয়া গেল তাহার পশ্চাতে এক গোপন হস্তের অঙুলি সঞ্চালন লোকেরা সন্দেহ করিয়া থাকে। হাকীম ইবনে জাবালা নামক এক কূটনীতিবিশারদ জিম্মি তখন কুফায় অবস্থান করিতে ছিলেন। তাঁর পিতার জাবালা ছিলেন এশিয়া মাইনর প্রদেশের বাইজেনটাইন এলাকার এক খ্রিস্টান ভূস্বামী। ঐ অঞ্চলে তাঁর যথেষ্ট প্রতিপত্তি ছিল এবং অবিচল বিশ্বস্ততার দরুন তিনি বাইজেনটাইন সম্রাটের প্রিয়পাত্র ছিলেন। অনেক ব্যাপারে তিনি উক্ত সম্রাটের প্রতিনিধিত্ব করিতেন এবং সম্রাটের অনুগ্রহে তিনি সামন্ত রাজার মর্যাদা উপভোগ করিতেন। কিন্তু ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে প্রসিদ্ধ ইয়ারমুখ যুদ্ধে তিনি মুসলমানদের হস্তে বন্দি হন এবং খলিফা হজরত উমরের নিকট আনীত হন। সেখানে তিনি বন্দিত্ব হইতে মুক্তিলাভের আশায় ইসলাম ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। হজরত উমর তাঁকে ছাড়িয়া দেন।
অতঃপর কিছুকাল তিনি স্বাধীন নাগরিক হিসেবে মুসলিম এলাকায় বাস করেন, কিন্তু ইসলামে শরিয়তের কড়াকড়ি, বিশেষ করিয়া গীত বাদ্য ও মদ্য পানের প্রতি নিষেধাজ্ঞা তাঁর ভালো লাগে নাই। তিনি পুনরায় খ্রিস্টান সমাজে ফিরিয়া যান এবং পূর্বের ন্যায় উচ্ছৃঙ্খল জীবন উপভোগে লিপ্ত হন। কিন্তু এদিকে মুসলিমদের বিজয়-স্রোত অব্যাহত থাকে। সিরিয়া আর্মেনিয়া, প্যালেস্টাইন ও মিসর প্রভৃতি খ্রিস্টান শাসিত এলাকাগুলো খলিফার হস্তগত হয়। বাইজেনটাইন সম্রাট অস্ত্রের দ্বারা মুসলিমদের এই অগ্রগতি রোধ করিতে না পারিয়া ঐ সঙ্গে নানা কূটকৌশলেরও আশ্রয় লন। এই পরিস্থিতিতে হজরত উমরের ওফাতের কিছুকাল পূর্বে জাবালার সুযোগ্য পুত্র হাকিম ইবনে জাবালা মুসলমানরূপে আরবে প্রবেশ করেন এবং মুসলিম সেনাবাহিনীর প্রধান উৎস ইরাককে নিজ কর্মক্ষেত্ররূপে আরবে প্রবেশ করেন এবং মুসলিম সেনাবাহিনীর প্রধান উৎস ইরাককে নিজ কর্মক্ষেত্ররূপে বাছিয়া লন। তিনি অবস্থান করিতেন রাজধানী শহর কুফায় এবং সেখান হইতে চতুর্দিকে যোগাযোগ রক্ষা করিতেন। মুসলিম ঐতিহাসিকদের অনেকের বিশ্বাস, হাকিম ইবনে জাবালা বাইজেনটাইন সম্রাটের গুপ্তচর ছিলেন এবং মুসলমানদের সংহতি বিনষ্ট করা ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। কেননা, সেনাদলের অটুট সংহতিই মুসলিমদের বিজয়ের অন্যতম কারণ ছিল, তাহা বুঝিতে বাইজেনটাইন সম্রাটের বিলম্ব হয় নাই।
ইবনে জাবালার অকস্মাৎ ইরাকে আবির্ভাব এবং তাহার পরেই কতকগুলো ঘটনার সংঘটন ঐতিহাসিকদের উক্ত অনুমানকে সভ্যতার মর্যাদা দেয়। ঐ ব্যক্তি কুফায় আবাস গ্রহণের পরই সেখান হইতে জিম্মি ও مسلمانوں পক্ষ হইতে স্থানীয় শাসনকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘন ঘন দরখাস্ত খলিফার নিকট পৌছিতে থাকে। শুধু তাহাই নয়, সঙ্ঘবদ্ধভাবে অভিযোগকারীদের পক্ষ হইতে খলিফার নিকট প্রতিনিধি প্রেরণও এই সময় হইতেই শুরু হয়। স্থানীয় অশিক্ষিত প্রজাগণ এই সব কায়দাকানুন জানিত না। হাকিম ইবনে জাবালার দুষ্টবুদ্ধিই এই সমস্তের মূলে সক্রিয় ছিল বলিয়া অনেকের বিশ্বাস। এই প্রচেষ্টার প্রথম পরিণতি হজরত উমর কর্তৃক সা'দ বিন আবি ওক্কাসের পদচ্যুতি।
হজরত উমরের মৃত্যু ও ঘটে একজন অমুসলমান জিম্মির হাতে। এই সকলের মূলে যে একটি গভীর ষড়যন্ত্র ছিল তাহা সহজেই অনুমেয়। হযরতের উমর পরলোকগমন করার পর ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হন তাঁর পরবর্তী খলিফা হজরত ওসমান।
কুফার লোকেরা সা'দের অপসারণের পর তাঁর স্থলবর্তী গভর্নর ওলিদের বিরুদ্ধে লাগিয়া যায়। ইহার ফলে হজরত ওসমান বাধ্য হয়ে ওলিদকে পদচ্যুতি করেন এবং সাঈদ ইবনে আল আসকে তাঁর স্থলে গভর্নর করিয়া পাঠান। কিন্তু সাঈদও সেখানে টিকিতে পারিলেন না। কুফাবাসীদের দাবি পূরণের জন্য আবু মুসা আল আশারিকে সেখানে প্রেরণ করিতে হইল। ইহাতেই বুঝা যায়, গভর্নরদের দোষ-গুণ যতই থাকুক, এবং দোষ-গুণ ছাড়া মানুষ হয় না-অভ্যন্তরীণ উস্কানি সেখানে কত প্রবল ছিল। ইরাক ও মিসর এই দুইটি দেশ ছিল সমৃদ্ধির দিক দিয়া মুসলিম সাম্রাজ্যের মুকুটমণি। আর খলিফার কি দুর্ভাগ্য, এই দুইটি দেশই বিভেদ সৃষ্টিকারীদের প্রধান আড্ডায় পরিণত হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00