📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 খলিফার প্রতি প্রজাবর্গের বিরূপ মনোভাব

📄 খলিফার প্রতি প্রজাবর্গের বিরূপ মনোভাব


আরবের জনসাধারণ সকলেই যে ধর্মের প্রতি অনুরাগ বশত ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাহা নহে। কতক লোক বিপদে পড়িয়া আত্মরক্ষার্থ, কতক যুদ্ধ জয় ও মালে গণিমতের আশায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল। মদিনা হইতে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে এই ধরনের মুসলমানের ভিতর ইসলামি শিক্ষা ভালরূপে প্রচারিত হইবার পূর্বেই ইসলাম দিগ্বিজয়ে প্রবৃত্ত হয়। এই সব লোক তখন গৃহ ছাড়িয়া সামরিক ছাউনিতে জামায়েত হওয়ার জন্য বাহির হয়ে পড়ে। ইহাদের বাহুবল ও শোণিত-তর্পণ দ্বারাই ইসলাম সর্বত্র জয়যুক্ত হয়েছিল। কোরাইশরা এবং দুই চারজন আনসার জঙ্গের ময়দানে নেতৃত্ব করিলেও মূল সেনাদল গঠিত ছিল আরবের এই সব জনসাধারণ দ্বারা।
আরবের লোক ছিল চির স্বাধীনতা-প্রিয় এক বাঁধনহারা জাতি। ইসলামের দীনিয়াত ইহাদের ভিতর কার্যকরী হউক আর না হউক, তার নিকট ওয়াদা ছিল এইসব পেশী-সর্বস্ব, উত্তেজনাপ্রবণ, উচ্ছৃঙ্খল জন-সঙ্ঘের মূলধন। সে ছিল সাম্যের ওয়াদা। ইহারা ইসলাম গ্রহণের সময় নবী করীমের সেই ওয়াদাও ইহাদের শুনান হয়েছিল, যাহাতে বলা হয়েছে, যাহারা আল্লাহ্ ও রাসুলের প্রতি ইমান আনিবে, তারা পৃথিবীতে সম্মান ও পরকালে পুণ্যের রাসুলের প্রতি ইমান আনিবে, তারা পৃথিবীতে সম্মান ও পরকাল পুণ্যের অধিকারী হইবে। ইহারা কেহ কাহাকে মানিতে চাহিত না, কেবল তাদের সর্দার ব্যতীত। তাই সাম্যের ওয়াদা তাদের কাছে বড়ই মধুর লাগিয়াছিল। হজরত উমর যতদিন জীবিত ছিলেন, তিনি ইসলামের এই পবিত্র ওয়াদা অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করিতেন। শাসক নিযুক্ত করার সময় তিনি শুধু মদিনা ও মক্কার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিতেন না। দূরবর্তী অঞ্চলসমূহ হইতেও যোগ্য লোকদের নির্বাচিত করিতেন এবং তাদের হাতে শাসনক্ষমতা ন্যস্ত করিতেন। মদিনার সাহাবি ও আনসার যুবকগণ তাঁর আমলে শাসনকার্যে ন্যায্য অংশ পাইত বলিয়া রাজধানীর আনুগত্য সম্বন্ধে হজরত উমর নিশ্চিন্ত ছিলেন। লোকের আচার-ব্যবহার ও পোশাক-পরিচ্ছদেও হজরত উমর যথাসম্ভব সমতা রক্ষার পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ, আরবের লোকেরা ছিল অধিকাংশই দরিদ্র। ধনী ব্যক্তিদের আহার-বিহার ও জৌলুস তাদের মনে হীনমন্যতা ও বিচ্ছিন্নতার উদ্রেক করিতে পারিত। কথিত আছে, সাহাবি আবদুর রহমান বিন আউফ, যিনি অতুলনীয়' ধন-সম্পদের অধিকারী ছিলেন, দেহে খুজলি ব্যারামের জন্য নবীর নিকট রেশমি বস্ত্র পরিধানের অনুমতি পাইয়াছিলেন। হজরত উমর যখন খলিফা, সেই সময় একদিন তিনি পুত্র সহ খলিফার সহিত সাক্ষাৎ করিতে যান। উভয়ের পরিধানে রেশমি কুর্তা ছিল। হজরত উমর পুত্রটির জামার ভিতর হাত ঢুকাইয়া উহা লম্বালম্বি ফাড়িয়া ফেলেন। আবদুর রহমান বিস্ময়ে বলিলেন, আপনি কি জানেন না, নবী এই প্রকার রেশমি বস্ত্র পরিধানের জন্য অনুমতি দিয়াছিলেন।' হজরত উত্তর করিলেন, 'হ্যাঁ' কিন্তু সে ছিল শুধু তোমার জন্য, তোমার পুত্রের জন্য নয়।' হজরত ওসমানের আমলে এই সাম্য-নীতিতে ভাটা নামিয়া আসে। গোত্রে গোত্রে, ব্যক্তিতে বৈষম্য তখন প্রকট হয়ে দেখা দেয়। ইহাতে সাধারণ আরবদের মনে দুঃখ জমিত। কারণ, তাদের ভিতর এই চেতনা সর্বদা ক্রিয়াশীল ছিল, তাদের শোণিত ও অস্থি-পঞ্জরের উপর ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে। অথচ সামাজিক মর্যাদায় তারা কত হীন। শাসক মণ্ডলীর নিকটও তাদের দাবি-দাওয়া অগ্রাধিকার পাইত না। তারা হজরত উমরের জমানার সহিত হজরত ওসমানের জমানার তুলনা করিত এবং ক্ষোভে অধীর হইত।
অথচ এ কথা সত্য, মাত্র বিশ বৎসর আগেও এইসব লোক অন্ধকার জমানার জীব ছিল এবং তাহাদের কেউ গ্রাহ্য করিত না। যে সময় তারা যে প্রকার গোত্রীয় কলহ, হিংসাত্মক মনোবৃত্তি, কুলের মাহাত্মা ও শৌর্যের অহঙ্কার লইয়া মাতিয়া থাকিত এবং স্বভাবের যে ঔদ্ধত্য তাহাদের কোন দিন নিজ গোত্র ছাড়া অন্য কাহারও সহিত মিলিত হইতে দেয় নাই, সেইসব প্রবৃত্তি তাদের ভিতর হইতে এখনও একেবারে মুছিয়া যায় নাই। তার উপর যুদ্ধজয়ের গৌরব ও মালে গণিমতের প্রাচুর্য তাদের ভিতর আত্মগরিমা ও মর্যাদাবোধ জাগ্রত করেছিল। উহা সুনিয়ন্ত্রিত না হইলে রাষ্ট্রের পক্ষে বিপদজনক পরিস্থিতির উদ্ভব খুবই স্বাভাবিক। তাই শাসক সম্প্রদায়ের কর্তব্য ছিল, এই বিরাট জনসঙ্ঘকে বশীভূত রাখা তাদের ভিতর হইতে কুরুচি, বর্বরতা প্রভৃতি সাবেক সংস্কারসমূহ দূরীভূত করা এবং ইসলামি শিক্ষায় তাহাদের মার্জিত ও উদ্ধৃত করা। কিন্তু তাঁহারা তাহা পারেন নাই, অথবা সেদিকে মনোযোগ দেন নাই। তাই হজরত ওসমানের নিজের হৃদয়ে প্রজা হিতৈষণা যথেষ্ট থাকিলেও উহা প্রজাদের অন্তর স্পর্শ করে নাই, কেননা, মাঝখানে, তাঁর প্রভুত্ব-প্রিয় ও আত্মসুখ সর্বস্ব কর্মচারীরা যে প্রাচীর রচনা করেছিল তাহা দুর্লঙ্ঘ্য ছিল।
হজরত আলিকে শাসনসংক্রান্ত ব্যাপারে হজরত ওসমান জড়িত না করিলেও তিনি, প্রয়োজন দেখা দিলে, রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে হজরত ওসমানকে উপদেশ দিতে যাইতেন। একদিন তিনি যখন হজরত ওসমানের সহিত তাঁর গভর্নর নিয়োগের ত্রুটি-বিচ্যুতি লইয়া আলোচনা করিতে ছিলেন, হজরত ওসমান আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য বলিয়াছিলেন, 'হজরত উমরও তো মুগীরা প্রমুখ তাঁরা অনুগত লোকদের শাসক নিযুক্ত করেছিলেন। কৈ, তখন তো কোনো কথা উঠে নাই। আমির মু'য়াবিয়াকে হজরত উমরই সিরিয়ার গভর্নর-পদে বহাল করেছিলেন।' উত্তরে হজরত আলি বলিয়াছিলেন, 'হ্যাঁ, তবে হজরত উমর তাঁর গভর্নরদের ওপর কড়া নজর রাখিতেন। মু'য়াবিয়ার কথা বলিতেছেন? মু'য়াবিয়া হজরত উমরকে যত ভয় করিত, তাঁর গৃহভৃত্য ইরফাও বোধ করি তাঁকে ততখানি ভয় করিত না। আপনার শাসনকর্তারা তো স্বাধীন, তারা নিজেদের ইচ্ছামতো হুকুম জারি করে এবং খলিফার নাম ব্যবহার করে। আপনি তাদের কিছুই করিতে পারেন না।' হজরত আলির কথার তাৎপর্য এই ছিল যে, বনি-মুইত ও বনি-উমাইয়া গোত্রের কোনও গভর্নরকেই তিনি পদচ্যুত করেন নাই, যতক্ষণ না লোকগণ তাঁকে এ কাজে বাধ্য করিয়াছে। হজরত ওসমান নির্বোধ ছিলেন না। তিনি নিজেও তাঁর দুর্বলতা অনুভব করিতেন এবং বলিতেন, 'উমরের মতো প্রকৃতি সকলের হয় না।' বায়তুল মালের বণ্টন লইয়া বিতর্ক উঠিলে একদিন তিনি মিম্বরে দাঁড়াইয়া বক্তৃতা করেন- 'খাত্তাবের পুত্র তোমাদের তিরস্কার করিত তোমাদের কথার কড়া জবাব দিত, তোমরা তাঁকে ভয় করিয়াছ এবং তাঁর ব্যবহারে সন্তুষ্ট রহিয়াছে। অথচ তোমরা সেই সব কথায় আমার উপর অসন্তুষ্ট হইতেছে এবং তাহা এই জন্য, আমি তোমাদের উপর হাত তুলি নাই।' হজরত ওসমান যে নিজেকে কতদূর অসহায় মনে করিতেন, তাঁর এই খেদ উক্তই তার প্রমাণ। অথচ এই অবস্থার প্রতিকারেরও উপায় ছিল না।
মদিনার সাহাবিদের সহানুভূতি তিনি হারাইয়া বসিয়াছিলেন। যে কোরাইশদের জন্য তিনি কলঙ্কের ডালি মাথায় বহিলেন, তারাও স্বার্থসিদ্ধির পর তাঁকে ছাড়িয়া গেল। জমিদারি অর্জনের পর তাঁরা সম্পত্তির রক্ষার অজুহাতে সাম্রাজ্যের নানা স্থানে ছড়াইয়া পড়ে। তাদের বেশির ভাগ যায় সিরিয়ায়। সেখানে আমির মু'য়াবিয়ার কঠোর শাসনে লোকজনের ভিতর শৃঙ্খলা বিরাজ করিত; বিলাসে নিমজ্জিত ধনী ব্যক্তিরা যাহা খুশি তাহাই করিয়া গেলেও জনসাধারণের উচ্চবাচ্য করার সাহস ছিল না। বিলাসের উপকরণও ছিল সেখানে প্রচুর। কারণ, পনেরো বিশ বৎসর আগেও উহা রোমক সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং দামেস্ক ছিল রোমকদের দ্বিতীয় রাজধানী। উমাইয়াদের প্রতিদ্বন্দ্বী হাশেমি গোষ্ঠী হজরত ওসমানের বিরোধিতা না করিলেও মারওয়ান কখনও হজরত ওসমানকে তাদের আওয়াত যাইতে দিতেন না, পাছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তাঁহাদের হস্তগত হয় এবং তারা শক্তি চঞ্চয় করে। তার ফলে হজরত ওসমান এই শক্তিশালী গোষ্ঠীরও সক্রিয় সহযোগিতা হইতে বঞ্চিত হন।
তাঁর কর্মচারীরা তাঁর নির্দেশসমূহ পুরাপুরি কার্যকরী করছেন কিনা তাহাও তাঁকে জানান হইত না। ফলে শুধু শক্তিশালী হাশেমি গোত্রেরই তিনি সহানুভূতি হারান নাই, অন্যান্য অনেক গোত্রেরও তিনি অপ্রিয় হয়ে ওঠেন। খলিফা হিসেবে তাঁর এই ত্রুটি ছিল অমার্জনীয় এবং ইহার জন্য তাঁকে নিজের শির দিয়া প্রায়শ্চিত্ত করিতে হয়েছিল। কিন্তু সে প্রায়শ্চিত্ত বিলম্বিত হয় আরব রাষ্ট্রের ওপর বৈধেদশক আক্রমণ আসন্ন হওয়ায়। বৈদেশিক শত্রুর সহিত শক্তি-পরীক্ষায় সমগ্র আরব জাতি মাতিয়া উঠে এবং খলিফার সহিত বিরোধী দলের বুঝাপড়া সেই কারণে সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায়।

টিকাঃ
১. ডক্টর তোয়াহা হোসাইন (মিসরি) প্রণীত হজরত ওসমানের মৌলানা নূরউদ্দীন আহমদ কত অনুবাদ ৬৭-৬৮ পৃষ্ঠা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00