📄 সাধারণ আরব
কোরাইশ ও আনসারদের পরবর্তী পর্যায় ছিল আরবের সাধারণ অধিবাসীরা। কিন্তু এই সাধারণ আরবদের ভিতর আবার ইরাক, সিরিয়া, হিজায ও ইয়েমেনের মুসলমানরা অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমান হইতে নিজদের উচ্চতর মর্যাদার অধিকারী মনে করিত। কারণ, তারা হজরত আবু বকর ও হজরত উমরের আমলে ইসলামের সকল বিজয় অভিযানে অংশ গ্রহণ করিত এবং তাদের শৌর্যবীর্য ইসলামি রাষ্ট্রকে দুনিয়ার বুকে স্থায়িত্ব দান করেছিল। হজরত উমর তাদের এই সহযোগিতার উপযুক্ত স্বীকৃতি দান করেছিলেন এবং তাদের ভিতর হইতে কতিপয় ব্যক্তিকে প্রাদেশিক গবর্নরের দায়িত্বশীল পদে নিযুক্ত করেছিলেন।
এদিকে মক্কার কোরাইশরা, ইরাক, ইয়েমেন প্রভৃতি প্রান্তিক প্রদেশের সাধারণ মুসলমানদের নিজেদের সমপর্যায়ে আসন দিতে কখনও রাজি হন নাই। এই সম্পর্কে কুফার গভর্নর সাঈদ বিন আল আসের সময়কার একটি ঘটনা ইতোপূর্বে উল্লেখ হয়েছে।
কোরাইশদের ঔদ্ধত্য ও আভিজাত্যের গর্ব সাধারণ আরবদের মনে পীড়া দিত। কথিত আছে, ওলিদ বিন ওব্বা যখন কুফার গভর্নর-পদ হইতে অপসারিত হন এবং সাঈদ বিন আল আস উক্ত পদে নিযুক্ত হন, তখন কুফার লোকেরা দুঃখ করিয়া বলিয়াছিল, 'এক কুরাইশ যাইবে, অন্য কুরাইশ আসিবে, তাদের ভাগ্য যেমন তেমনই রহিয়া যাইবে।' সাধারণ আরবদের মনের ক্ষোভ আরও বাড়িয়া যায় এই কারণে যে হজরত ওসমান হজরত উমরের নিয়োজিত বহু অভিজ্ঞ গভর্নরকে অপসারিত করিয়া তাদের স্থলে আপন আত্মীয়-স্বজন ও স্বগোত্রীয় লোকদের নিয়োগ করেন, যদিও ইহাদের ভিতর কেহ কেহ বয়সে নিতান্ত তরুণ ও শাসনকার্যে অনভিজ্ঞ।
পূর্বেই বলা হয়েছে, হজরত ওসমানের অর্থনীতি সাধারণ আরবদের পক্ষে অকল্যাণকর হয়েছিল। ধনী ব্যক্তিরা হজরত ওসমানের আমলে হিযাজ, মিসর, সিরিয়া ও ইরাকের কৃষকদের জমি লইয়া ছিনিমিনি খেলিতে থাকে। ইহাদের অধিকাংশ ছিল কোরাইশ। তারা কৃষকদের দারিদ্র্যের সুযোগ লইয়া তাদের কৃষিজমি কিনিয়া জমিদার হইত, আর বিক্রয়কারী প্রজারা ঐ সব জমিদারের খামার জমিতে মজুর খাটিয়া জীবিকা নির্বাহ করত। আবার আজ যিনি জমিদার আছেন, কিছুদিন পর দেখা যাইত তিনি অন্যের সঙ্গে জমি বদল করিয়া সরিয়া গিয়াছেন এবং নতুন লোক তাঁর স্থলে জমিদার হয়েছেন। এই সব নতুন মালিক সাধারণত নতুনভাবে পীড়ন করিত প্রজার নিকট হইতে অধিকতর কর আদায় করিয়া লাভবান হইবার জন্য। সাধারণ আরবদের এক বিপুল অংশ এইভাবে কোরাইশ ভূস্বামীদের প্রজা অথবা মজুর শ্রেণিতে পরিণত হয়েছিল। হিজাজ, ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়া প্রভৃতি আরব এলাকার জনসাধারণ ইহাতে মনে মনে ক্ষুণ্ণ হয়েছিল।
📄 অন-আরব
সাধারণ বিজিত প্রদেশসমূহের অধিবাসীরা অনারব ছিল। তাদের কতক লোক ইসলামে দীক্ষা গ্রহণ করেছিল। অবশিষ্ট লোকেরা স্বধর্মে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইহাদের জিম্মি বলা হইত। যাহারা ইসলামে দীক্ষা গ্রহণ করেছিল, তাহাদের হজরত উমর নিয়মিত কর প্রদান ও খলিফার আনুগত্য সাপেক্ষে সাধারণ আরব প্রজার সমান অধিকার মঞ্জুর করেছিলেন। তারা যাহাতে তাদের ঘরবাড়ি ও জমিজমা হইতে উৎখাত না হয় এবং তাদের' কৃষি-জমির যাহাতে উৎকর্ষ সাধিত হয় সে-সম্পর্কে তিনি নানারূপ ব্যবস্থা অবলম্বন করেছিলেন। কিন্তু হজরত ওসমানের আমলে জমি হস্তান্তরের অনুমতি এবং জমিদারি ও জায়গিরদারি প্রথার উদ্ভব তাহাদের দ্রুত অধঃপতনের দিকে টানিয়া লইয়াছিল। ভূস্বামীগণ সাধারণত কোরাইশ ছিলেন। তাঁহাদের অধীনে কিছু সংখ্যক লোকের অবশ্য কর্ম-সংস্থান হইত, কিন্তু গোটা জাতি ধীরে ধীরে নিঃস্ব হইতে চলিয়াছিল। হজরত উমরের আমলে বিজিত জাতির অন্তর্ভুক্ত প্রজারা যে সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করিত হজরত ওসমানের আমলে আরও কতক রদ করা হয় এবং কয়েকটি নতুন কর তাদের উপর ধার্য করা হয়। বিজিত জাতিগুলোর ভিতর যাহারা চিন্তাশীল ছিল তারা ইহা অনুভব করিত এবং অন্তরে অন্তরে খলিফার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হইত। প্রত্যেক যুগেই বিপ্লবের সূচনায় দেশের চিন্তানায়করাই জনসাধারণকে চালিত করে। তাই আরবের শাসকশ্রেণীর উপর চিন্তা নায়কদের এই প্রকার অনাস্থা ও বিরাগের ভিতর রাষ্ট্রের সমূহ বিপদের সম্ভাবনা নিহিত ছিল।
📄 জিম্মি
মুসলিম রাষ্ট্রে খ্রিস্টান, ইহুদি, অগ্নি-উপাসক প্রভৃতি নানা জাতীয় অমুসলমান প্রজাও বাস করিত। তাহাদের মুসলমানেরা কখনও ধর্মান্তর গ্রহণে বাধ্য করে নাই। সরকারের আনুগত্য এবং জিযিয়া প্রদান সাপেক্ষে তারা মুসলিম রাষ্ট্রে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ভোগ করিত এবং স্ব স্ব ধর্মমতে প্রতিষ্ঠিত থাকিত। রাষ্ট্র তাহাদের রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করায় তাহাদের জিম্মি অর্থাৎ রাষ্ট্রের আমানত বলা হইত। হজরত উমরের আমলে ইসলামের বিধান অনুযায়ী তাদের প্রতি মুসলমান প্রজাদের মতোই ব্যবহার করা হইত। তারা সরকারে দাবি পূরণ করিলে এবং সরকারের উপর তাদের দাবিসমূহ উপযুক্ত বিবেচিত হইলে, ইসলামের নির্ধারিত কোনো সুযোগ হইতেই তারা বঞ্চিত হইত না। হজরত ওসমানও এই নীতি মানিয়া চলিতেন। কিন্তু তাঁরা আমলে জিম্মিদের সংখ্যা ক্রমে হ্রাস পাইতে তাকে এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের আর সাড়া পাওয়া যায় না। তাদের অনেকে সম্ভবত ক্ষমতা ও চাকরি লাভের সুবিধার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং অবশিষ্ট লোকেরা ব্যবসায়-বাণিজ্যের খাতিরে স্থানীয় প্রতিবেশীদের সহিত নিজেদের এমনভাবে খাপ খাওয়াইয়া ছিল, তাদের পৃথক সত্তা আর অনুভব করা যায় নাই।
📄 দাস শ্রেণি
ক্রীতদাস ও যুদ্ধবন্দি উভয়ই দাসশ্রেণীভুক্ত ছিল। নবী অবশ্য ক্রীতদাসদের সরাসরি মুক্তির আদেশ দেন নাই, কিন্তু ক্রীতদাসকে মুক্তিদান অত্যধিক পুণ্যের কাজ বলিয়া ঘোষণা করেন। অধিকন্তু, তিনি ভবিষ্যতে পণ্য হিসাবে মানুষের ক্রয় বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছিলেন বলিয়া উল্লেখ আছে। যুদ্ধবন্দিগণ যতদিন তাদের আত্মীয়স্বজন তাহাদের মুক্তি করার ব্যবস্থা না করিত, স্ব স্ব মনিবের গৃহে দাসত্ব করিত। অবশ্য বহু যুদ্ধবন্দি ত্বরায় অথবা বিলম্বে মুক্তিপ্রাপ্ত হইত। ক্রীতদাসদের ভিতর আজাদিপ্রাপ্তদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়িতে থাকে। এইসব আজাদ গোলাম দিন-মজুরি করিয়া, তখনও বা ভূমি-মালিকদের খামারে কাজ করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিত। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইহাদের কোনো সত্তা ছিল না। কিন্তু হজরত ওসমানের আমলে দাস ও গ্রাম্য আরবদের সংযোগে এবং তাদের সন্তান-সন্ততি দ্বারা সমাজে এক স্বতন্ত্র স্তর গঠিত হয়। ইহাদের কোনো রাজনৈতিক সত্তা না থাকিলেও সমাজে ইহারা নানা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির হেতু হয়েছিল। তাদের অসংযত আচরণ ও শালীনতা-বিরোধী রুচির জন্য শাসকবর্গকে কিরূপ বিব্রত থাকিতে হইত, হজরত ওসমানের নিকট কুফার গভর্নর সাঈদ ইবনে আল আস কর্তৃক লিখিত পত্রে তাহা বিবৃত হয়েছে।