📄 কোরাইশ গোত্র
মদিনার অধিবাসী এবং অন্যান্য আরব হইতে মক্কার কোরাইশরা আগে হইতেই অনেক উন্নত ছিল। কাবা ঘরের রক্ষক হিসেবে সমগ্র আরব উপদ্বীপে তারা সম্মানিত ছিল। হজরত ইব্রাহিমের আমল হইতে আরবের বিভিন্ন এলাকা হইতে লোকেরা মক্কায় হজ করিতে আসিত। কোরাইশগণ তাদের তত্ত্বাবধান করিত এবং আহার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করিত। পৌত্তলিক যুগে কোরাইশগণ ছিল কাবা ঘরের পুরোহিত। তাই তারা কৌলীন্যের দাবি করিত। এইসব কারণে কোরাইশগণ বাণিজ্য উপলক্ষে বিদেশে গেলে অন্যান্য বণিক অপেক্ষা অধিক সুযোগ-সুবিধা লাভ করিত।
আরব উপদ্বীপের বাহিরেও তাদের বাণিজ্যের ক্ষেত্র বিস্তৃত ছিল। বাণিজ্য ব্যপদেশে তারা পারস্য, গ্রিস, রোম, মিসর, আবিসিনিয়া প্রভৃতি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে যাতায়াত করিত এবং তাদের সভ্যতা ও কৃষ্টির সংস্পর্শে আসিত। এইভাবে তারা বিস্তৃত অভিজ্ঞতার অধিকার হইত। ঐ সকল প্রাচীন দেশের শাসক ও সম্রাটদের দরবারে ইহাদের প্রতিনিধিগণ সম্মানের সহিত গৃহীত হইত। এইসব কারণে ইহারা ব্যবহারে মার্জিত এবং জ্ঞান-বুদ্ধির দিক দিয়া অন্যান্য আরব-গোত্র অপেক্ষা অগ্রসর ছিল। আত্মরক্ষার্থে ইহারা প্রত্যেকে যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করিত এবং বহু খ্যাতনামা পাহালোয়ান ইহাদের ভিতর জন্ম গ্রহণ করিয়াছে। সঙ্গীত ও কবিতা ইত্যাদি ললিতকলার ও ইহাদের রুচি ছিল এবং নারী-পুরুষ মিলিয়া এগুলোর চর্চা করিত। বাণিজ্য ইহাদের সমৃদ্ধি দান করেছিল এবং সমৃদ্ধির সঙ্গে বিলাসিতা ও সাজসজ্জার যেসব উপকরণ আসিয়া থাকে, সে সবই ইহাদের সমাজে অনুপ্রবেশ করিয়া ছিল। মক্কায় কোনো রাজকীয় শাসন প্রচলিত ছিল না। নাগরিকরা যৌথভাবে তার শাসনকার্য চালাইত এবং কোরাইশরাই সেই পৌরশাসনে নেতৃত্ব করিত। নগর রক্ষার দায়িত্ব তাদের উপরই ন্যস্ত ছিল। তাই তারা শাসনকার্য ও কূটনীতি ভাল বুঝিত; শত্রুর সহিত সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করিতেও তারা অভ্যস্ত ছিল। এহেন গোত্রকে দাবাইয়া রাখা শাসকদের পক্ষে কঠিন ছিল। স্বভাবত ইহাদের প্রভুত্ব ও ক্ষমতার লিপ্সা ছিল অদম্য। তাই হজরত উমর তাদের সম্বন্ধে খুবই শঙ্কিত থাকতেন। সামান্য প্রশ্রয় পাইলেই যে ইহারা অপর সকলের কাঁধে সওয়ার হয়ে বসিবে, একথা তিনি ভালো করিয়াই জানিতেন। তাই তিনি কোরাইশদের ওপর সর্বদা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিতেন এবং তাদের সামান্য ঔদ্ধত্য বা অপরাধও বরদাশত করিতেন না। কিন্তু আগেই বলা হয়েছে, হজরত উমরের সেই মনোবল হজরত ওসমানের ভিতর ছিল না। তিনি তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করিতে পারেন নাই। মাত্র ছয় বৎসরের ভিতর রাষ্ট্রের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদ কেরাইশদের হাতে চলিয়া যায় এবং সর্বত্র তারা ক্ষমতার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সম্বন্ধে ওলিদ বিন ওব্বার একটি অকপট উক্তি বেশ অর্থবহ। কথিত আছে, তিনি যখন সাদ বিন আবি ওক্কাসের স্থলে কুফায় গভর্নর নিযুক্ত হয়ে যান এবং সাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, সাদ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছ, না শাসনকর্তা হয়ে আসিয়াছ? জানি না আমি কি নির্বোধ হয়ে গেলাম, না তুমি খুব বড় বুদ্ধিমান হয়ে পড়িলে।' উত্তরে ওলিদ বলিয়াছিলেন, 'তুমিও কোনো বোকা হও নাই, আমিও বুদ্ধিমান হয়ে পড়ি নাই; আসল কথা গোত্রের হাতে ক্ষমতা আসিয়াছে, তারাই নির্বাচন করিয়াছে।'
টিকাঃ
১. The population through out the empire was divided into four social classes. The hightest consisted naturally of the ruling Muslims headed by caliphal household & the aristocracy of Arabian conquerors. * * * *
Next below Arabian Muslims came the Neo-Muslims * * * * The third class was made up of members of tolerated sects, professor, Jews & Sabians with whom the Muslims had made covenant. * * At the bottom of the society stood the slaves -The Arabs (A short History by P. K. Hitti. P. 74-76.
📄 আনসার শ্রেণি
মদিনার আনসারদের প্রতি ইসলামের ঋণ অপরিশোধধ্য। নবী তাদের উপকার কখনও ভুলিতে পারেন নাই। তিনি বরাবর তাহাদের স্নেহের চোখে দেখিয়াছেন এবং মর্যাদা দিয়াছেন। নবীর ওফাতের পর খেলাফতের প্রশ্নে যখন আনসার ও মুহাজিরদের ভিতর বিতর্ক উঠে। তখন হজরত আবু বকর নবীর একটি প্রসিদ্ধ উক্তির উদ্ধৃতি দ্বারা আনসারদের ভাগ্যে চিরদিনের জন্য সীলমোহর আঁটিয়া দেন। 'আল আইয়িমাতো মিনাল কোরাইশ'-ইমাম (অর্থাৎ জাতির নেতা) কোরাইশদের ভিতর হইতে হইবে-নবীর এই উক্তির মূলে একটি বিশেষ তাৎপর্য ছিল। গোত্রকলহ-বিক্ষুব্ধ আরবে কোরাইশ ছাড়া অন্যকোনো গোত্রই এমন ছিলনা যাকে সকল সম্প্রদায় মানিয়া লইবে। অন্য যেকোনো গোত্র নেতৃত্ব করিল সমগ্র আরব-ভূখণ্ডে সঙ্গে সঙ্গে গৃহযুদ্ধ ও তলোয়ারের খেলা শুরু হইবার সম্ভাবনা বিদ্যমান ছিল এবং সেরূপ কিছু ঘটিলে ইসলাম ও মুসলিম রাষ্ট্রেরও ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠিত। তাই ভবিষ্যদ্দর্শী নবী এই একটি বিষয়ে কোরাইশদের প্রাধান্য দিতে স্বীকৃত হয়েছিলেন এবং তাহা যে খুবই সঙ্গত হয়েছিল, ভাবি ইতিহাসের ধারা তাহা প্রমাণিত করিয়াছে। আনসারগণও হজরত আবু বকরের যুক্তি নির্বিবাদে মানিয়া লইয়াছিল এবং ইহার পর আর কখনও তারা খিলাফতের দাবি উত্থাপন করে নাই। কিন্তু ইহা সুস্পষ্ট, এই ঘটনার পর মদিনার আনসারগণ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মক্কার কোরাইশদের সহিত একধাপ নিচে নামিয়া যায় এবং সামাজিক মর্যাদার দিক দিয়াও তাদের পশ্চাৎ পঙ্ক্তিতে আসন লাভ করে। হজরত আবু বকর ও হজরত উমর উভয়েই তাদের এই ভাগ্য-বিপর্যয় দরদের সহিত অনুভব করেছিলেন এবং সর্বদা তাদের স্বার্থের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করিতেন। তাঁরা রাষ্ট্রের সকল কাজে আনসারদের পরামর্শ গ্রহণ করিতেন এবং যথাসম্ভব তাহাদের শাসনকার্যে অংশ গ্রহণ করার সুযোগ দিতেন। হজরত উমর তাদের ভিতর হইতে কতিপয় ব্যক্তিকে যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রাদেশিক গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। হজরত ওসমানও তাদের অতীতের মহত্ত্ব বিস্মৃত হন নাই। খলিফা হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে তিনি তাদের পরামর্শ গ্রহণ করিতে ত্রুটি করিতেন না। নেতৃস্থানীয় আনসারগণ অনেক সময় হজরত ওসমান ও তাঁর বিরোধী দলের ভিতর সালিশি করিতেন। কিন্তু তাঁর রাজত্বের শেষার্ধে কোরাইশগণ রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা হস্তগত করায় আনসারদের সহযোগিতার ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। ক্ষমতার আসনগুলো হইতে তারা ক্রমেই অপসৃত হইতে থাকে এবং সাধারণ আরব ও তাদের মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য আর থাকে না।
মক্কার কোরাইশগণ আনসারদের কি চোখে দেখিত, বদরযুদ্ধের একটি ঘটনা তাহা ফুটাইয়া তুলেছিল। বদরে যখন উভয় পক্ষ যুদ্ধের জন্য মুকাবেলা করে, তখন সর্বপ্রথম ওৎবা নামক এক প্রখ্যাত পাহলোয়ান কোরাইশ শিবির হইতে নির্গত হয়ে রণক্ষেত্রে আস্ফালন করিতে থাকে এবং মুসলিম পক্ষকে যুদ্ধে আহ্বান করে। ওৎবার পৃষ্ঠরক্ষী ছিল তাহার এক ভ্রাতা এবং পুত্র ইতিহাস প্রসিদ্ধ ওলিদ। তাদের আস্ফালন দেখিয়া নবীর সেনাদল হইতে প্রথমে চারজন আনসার তরবারি হস্তে ময়দানে ঝাঁপাইয়া পড়ে। ওৎবা তখন চিৎকার করিয়া বলে, 'হে মোহাম্মদ, আমরা কি মদিনার এই চাষাদের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে আসিয়াছিল? আমাদের সামনে উপযুক্ত যোদ্ধা পাঠাও।' ইহার পর হজরত আলি ও মহাবীর হামজা ময়দানে অবতীর্ণ হন এবং ওৎবার আহ্বান গ্রহণ করেন।
মাত্র পঁচিশ-ছাব্বিশ বৎসর আগে যাহারা নবীর সহচরদের সাদরে নিজেদের সংসারে স্থান দিয়াছিলেন এবং নিঃস্বার্থভাবে তাহাদের নিজ নিজ পৈতৃক সম্পত্তির অংশ পর্যন্ত দিতে আগ্রহশীল ছিলেন, তারা এই ভাগ্য নিপর্যয়কে নিজেদের অদৃষ্টের লিখন বলিয়াই মানিয়া লইয়াছিলেন এবং কোনরূপ উষ্মা প্রকাশ করিতেন না। হজরত ওসমানের কার্যকলাপে তারা নির্বিকার থাকতেন এবং অধিকাংশ সময় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করিতেন। কিন্তু হিযরতের যমানায় যাহারা বালক ছিল, আনসারদের সেইসব সন্তানগণ এখন সাবালক হয়েছে। তারা এই নব বিপর্যয়কে প্রসন্ন চিত্তে গ্রহণ করিতে পারে নাই। কোরাইশদের তুলনায় তাদের প্রতি অবিচার করা হইতেছে, ইহা তারা বেদনার সহিত অনুভব করিত এবং এই বেদনা ক্রমে ক্রমে ক্ষোভে রূপান্তরিত হইতে থাকে। একথা তাদের নিকট অবিদিত ছিল না যে, মক্কার কোরাইশগণ নবী ও ইসলামকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল এবং মদিনার আনসারদের আশ্রয় না পাইলে হয়ত অসহায় ইসলাম দুনিয়া হইতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাইত। আর আজ সেই কোরাইশগণই হয়েছে ইসলামি রাষ্ট্রে সর্বেসর্বা। তাই হিযরতের চৌত্রিশ বৎসর পরে, হজরত ওসমানের ভাগ্যাকাশে যখন কাল মেঘ ঘনাইয়া আসে, তখন মদিনার সাবেক অধিবাসীরা, যাহারা হিজরত-যুগের সেই মহানুভব আনসারদেরই সন্তান ছিল, তারা খলিফাকে রক্ষা করার জন্য অন্তরে বিশেষ তাগিদ অনুভব করে নাই। তাদের পিতৃপুরুষদের ভিতর যে দুই চারিজন জীবিত ছিলেন তারা বৃদ্ধ হয়েছিল। অতীত দিনের দুঃখের স্মৃতি এবং বহু যুগের বেদনাদায়ক ইতিহাস রোমন্থন করিয়া অশ্রু বিসর্জন ছাড়া বার্ধক্যের দুর্বহ দিনগুলো কাটাইবার অন্য কোনো অবলম্বন তাঁর খুঁজিয়া পাইতেন না।
টিকাঃ
২. ডক্টর তোয়াহা হোসাইন (মিসরি) প্রণীত 'হজরত ওসমানের' মৌলানা নূরউদ্দীন আহমদ কৃত অনুবাদ ২০৮ পৃষ্ঠা।
📄 সাধারণ আরব
কোরাইশ ও আনসারদের পরবর্তী পর্যায় ছিল আরবের সাধারণ অধিবাসীরা। কিন্তু এই সাধারণ আরবদের ভিতর আবার ইরাক, সিরিয়া, হিজায ও ইয়েমেনের মুসলমানরা অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমান হইতে নিজদের উচ্চতর মর্যাদার অধিকারী মনে করিত। কারণ, তারা হজরত আবু বকর ও হজরত উমরের আমলে ইসলামের সকল বিজয় অভিযানে অংশ গ্রহণ করিত এবং তাদের শৌর্যবীর্য ইসলামি রাষ্ট্রকে দুনিয়ার বুকে স্থায়িত্ব দান করেছিল। হজরত উমর তাদের এই সহযোগিতার উপযুক্ত স্বীকৃতি দান করেছিলেন এবং তাদের ভিতর হইতে কতিপয় ব্যক্তিকে প্রাদেশিক গবর্নরের দায়িত্বশীল পদে নিযুক্ত করেছিলেন।
এদিকে মক্কার কোরাইশরা, ইরাক, ইয়েমেন প্রভৃতি প্রান্তিক প্রদেশের সাধারণ মুসলমানদের নিজেদের সমপর্যায়ে আসন দিতে কখনও রাজি হন নাই। এই সম্পর্কে কুফার গভর্নর সাঈদ বিন আল আসের সময়কার একটি ঘটনা ইতোপূর্বে উল্লেখ হয়েছে।
কোরাইশদের ঔদ্ধত্য ও আভিজাত্যের গর্ব সাধারণ আরবদের মনে পীড়া দিত। কথিত আছে, ওলিদ বিন ওব্বা যখন কুফার গভর্নর-পদ হইতে অপসারিত হন এবং সাঈদ বিন আল আস উক্ত পদে নিযুক্ত হন, তখন কুফার লোকেরা দুঃখ করিয়া বলিয়াছিল, 'এক কুরাইশ যাইবে, অন্য কুরাইশ আসিবে, তাদের ভাগ্য যেমন তেমনই রহিয়া যাইবে।' সাধারণ আরবদের মনের ক্ষোভ আরও বাড়িয়া যায় এই কারণে যে হজরত ওসমান হজরত উমরের নিয়োজিত বহু অভিজ্ঞ গভর্নরকে অপসারিত করিয়া তাদের স্থলে আপন আত্মীয়-স্বজন ও স্বগোত্রীয় লোকদের নিয়োগ করেন, যদিও ইহাদের ভিতর কেহ কেহ বয়সে নিতান্ত তরুণ ও শাসনকার্যে অনভিজ্ঞ।
পূর্বেই বলা হয়েছে, হজরত ওসমানের অর্থনীতি সাধারণ আরবদের পক্ষে অকল্যাণকর হয়েছিল। ধনী ব্যক্তিরা হজরত ওসমানের আমলে হিযাজ, মিসর, সিরিয়া ও ইরাকের কৃষকদের জমি লইয়া ছিনিমিনি খেলিতে থাকে। ইহাদের অধিকাংশ ছিল কোরাইশ। তারা কৃষকদের দারিদ্র্যের সুযোগ লইয়া তাদের কৃষিজমি কিনিয়া জমিদার হইত, আর বিক্রয়কারী প্রজারা ঐ সব জমিদারের খামার জমিতে মজুর খাটিয়া জীবিকা নির্বাহ করত। আবার আজ যিনি জমিদার আছেন, কিছুদিন পর দেখা যাইত তিনি অন্যের সঙ্গে জমি বদল করিয়া সরিয়া গিয়াছেন এবং নতুন লোক তাঁর স্থলে জমিদার হয়েছেন। এই সব নতুন মালিক সাধারণত নতুনভাবে পীড়ন করিত প্রজার নিকট হইতে অধিকতর কর আদায় করিয়া লাভবান হইবার জন্য। সাধারণ আরবদের এক বিপুল অংশ এইভাবে কোরাইশ ভূস্বামীদের প্রজা অথবা মজুর শ্রেণিতে পরিণত হয়েছিল। হিজাজ, ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়া প্রভৃতি আরব এলাকার জনসাধারণ ইহাতে মনে মনে ক্ষুণ্ণ হয়েছিল।
📄 অন-আরব
সাধারণ বিজিত প্রদেশসমূহের অধিবাসীরা অনারব ছিল। তাদের কতক লোক ইসলামে দীক্ষা গ্রহণ করেছিল। অবশিষ্ট লোকেরা স্বধর্মে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইহাদের জিম্মি বলা হইত। যাহারা ইসলামে দীক্ষা গ্রহণ করেছিল, তাহাদের হজরত উমর নিয়মিত কর প্রদান ও খলিফার আনুগত্য সাপেক্ষে সাধারণ আরব প্রজার সমান অধিকার মঞ্জুর করেছিলেন। তারা যাহাতে তাদের ঘরবাড়ি ও জমিজমা হইতে উৎখাত না হয় এবং তাদের' কৃষি-জমির যাহাতে উৎকর্ষ সাধিত হয় সে-সম্পর্কে তিনি নানারূপ ব্যবস্থা অবলম্বন করেছিলেন। কিন্তু হজরত ওসমানের আমলে জমি হস্তান্তরের অনুমতি এবং জমিদারি ও জায়গিরদারি প্রথার উদ্ভব তাহাদের দ্রুত অধঃপতনের দিকে টানিয়া লইয়াছিল। ভূস্বামীগণ সাধারণত কোরাইশ ছিলেন। তাঁহাদের অধীনে কিছু সংখ্যক লোকের অবশ্য কর্ম-সংস্থান হইত, কিন্তু গোটা জাতি ধীরে ধীরে নিঃস্ব হইতে চলিয়াছিল। হজরত উমরের আমলে বিজিত জাতির অন্তর্ভুক্ত প্রজারা যে সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করিত হজরত ওসমানের আমলে আরও কতক রদ করা হয় এবং কয়েকটি নতুন কর তাদের উপর ধার্য করা হয়। বিজিত জাতিগুলোর ভিতর যাহারা চিন্তাশীল ছিল তারা ইহা অনুভব করিত এবং অন্তরে অন্তরে খলিফার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হইত। প্রত্যেক যুগেই বিপ্লবের সূচনায় দেশের চিন্তানায়করাই জনসাধারণকে চালিত করে। তাই আরবের শাসকশ্রেণীর উপর চিন্তা নায়কদের এই প্রকার অনাস্থা ও বিরাগের ভিতর রাষ্ট্রের সমূহ বিপদের সম্ভাবনা নিহিত ছিল।