📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 পরবর্তী ব্যয়নীতি

📄 পরবর্তী ব্যয়নীতি


হজরত ওসমানের সময় সরকারি কর ও যুদ্ধলব্ধ আয়ের প্রাচুর্য হেতু বায়তুল মালে অর্থ জমিত প্রচুর। কারণ ইতোমধ্যে মুসলিম বিজয় অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। পশ্চিমে ত্রিপলী হইতে পূর্বে তুর্কিস্তান ও কাবুল পর্যন্ত তখন মুসলিম শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে হজরত ওসমান বায়তুল মালের খরচ বাদে উদ্বৃত্ত অংশ বংশ করিতে গিয়া হজরত উমরের নীতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন নাই, কিছুটা নিজের বিচার-বুদ্ধির উপর নির্ভর করিয়াছেন। বলা বাহুল্য হজরত আবু বকরের সময় বায়তুল মালে অর্থ জমিত অতি সামান্য। হজরত উমরের সময় হইতে তার পরিমাণ বৃদ্ধি পাইতে থাকে। কিন্তু তাঁরা কেহই নিজেদের জন্য বা নিজের আত্মীয়বর্গের জন্য বায়তুল মাল হইতে কিছু গ্রহণ করিতেন না।
হজরত আবু বকর খলিফা হওয়ার পর প্রথম ছয় মাস পত্নী হাবিবাসহ সুনাহ্ নামক পল্লীতে একজন সাধারণ আরব শে'খের মতো সাদাসিধাভাবে জীবন করিতেন। অথচ, হজরত রাসুলের ওফাতের পর তিনিই বিশৃঙ্খল আরব জাতিকে বশে আনিয়াছিলেন এবং শিশু রাষ্ট্রকে বিপর্যয়ের কবল হইতে রক্ষা করেছিলেন। এহেন প্রতিপত্তিশালী মহান খলিফা প্রত্যহ নিজ গৃহ হইতে মসজিদে নববী পর্যন্ত পায়ে হাঁটিয়া যাতায়াত করিতেন এবং মসজিদের আঙিনায় বসিয়া রাষ্ট্রসংক্রান্ত সকল কাজ সম্পন্ন করিতেন; কোনও প্রকার পারিশ্রমিক লইতেন না। পরবর্তী খলিফা, মুসলিম রাষ্ট্রের সংগঠনকারী হজরত উমরও, খলিফা হওয়ার পর অনেক দিন পর্যন্ত ব্যবসা দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিতেন এবং সেই সঙ্গে শাসনকার্যের দায়িত্বও পালন করিতেন। বায়তুল মাল হইতে সংসার চালানোর কথা তিনি কখনও মনে স্থান দেন নাই। হজরত উমর সাধারণ আরব হইতে প্রায় দেড় ফুট উঁচু ছিলেন। তাঁর এই সুদীর্ঘ দেহ আবৃত করার জন্য বড় কুর্তার দরকার হইত। কথিত আছে, তাঁর লম্বা জামা দেখিয়া লোকেরা প্রশ্ন করেছিল, 'ইয়া ইবনে খাত্তাব, আপনি কি রেশনে আমাদের চাইতে অধিক বস্ত্র সংগ্রহ করেন?' উত্তরে তিনি তাঁর পুত্রকে দেখাইয়া বলিয়াছিলেন, 'দেখ, তাহার জামা অপেক্ষাকৃত খাটো। তাহার প্রাপ্য বস্ত্র হইতে আমি কিঞ্চিৎ কাটিয়া লইয়াছি।' তাঁর সংকল্পই ছিল, ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে সর্বপ্রকার দুর্নীতি মুক্ত করা। নিজেকেও তিনি দুর্নীতির সংস্রব আনিতে পারে এমন পরিবেশ হইতে সতর্কতার সহিত দূরে রাখিতেন। ইসলামের সতর্ক এমন পরিবেশ হইতে সতর্কতা সহিত দূরে রাখতেন। ইসলামের সতর্ক প্রহরী হিসেবে আরব জাতির ক্রমোন্নতি ও নিরাপত্তা বিধান ছিল তাঁর ধ্যান জ্ঞান ও স্বপ্ন। এই ব্রতের উদ্যাপনে তিনি নিজের সর্বশক্তি নিয়োজিত করেছিলেন, অথচ এত করিয়াও প্রতিদানে কিছুটা গ্রহণ করেন নাই। তাঁর পরিধেয় একটি মাত্র কামিজ ও কুর্তা, তাহাও ছিল তালিযুক্ত। গাছের তলায় বসিয়া তিনি হুকুমাত চালাইতেন। তারই প্রভাবে কত শক্তিধর সম্রাটের মসনদ উল্টে গেছে এবং কত সুরক্ষিত রাজধানীর লৌহতোরণ ধুলায় লুটাইয়াছে। তাঁর দেহরক্ষী ছিল না; তাঁর নিরাপত্তার জন্য রাজকোষ হইতে একটি কপর্দকও ব্যয় করা হইত না। খেজুর পাতায় তাঁর শয্যা রচিত হইত। খেজুর গাছের ছায়ায় তিনি নিঃশঙ্ক চিত্তে নিদ্রা যাইতেন।
কিন্তু হজরত ওসমান তাঁর বিরাট ব্যবসার-হেতু পূর্ব হইতেই ধনী ছিলেন। তাঁর ধনে বহু দরিদ্র লোক প্রতিপালিত হয়েছে। তিনি নিজেও স্বচ্ছল জীবনযাপন করিতেন। মদিনার মুহাজির পল্লীতে তাঁর প্রাসাদ ছিল সর্বাপেক্ষা সুদৃশ্য। তাঁর দানের হস্ত ছিল অবারিত। খলিফা হওয়ার পর তাঁর দানের ক্ষেত্র আরও বাড়িয়া যায়। নিজের অর্থ সকল দান সম্ভবপর না হইলে তিনি সরকারি তহবিল হইতে ইচ্ছামতো দান করিতেন। তিনি মনে করিতেন, বায়তুল মালের অর্থ জমাইয়া রাখার জন্য সংগৃহীত হয় নাই, জনসাধারণের উপকরের জন্যই তার সৃষ্টি। জনগণের সেবায় উৎসর্গিত প্রাণ খলিফাও, যেহেতু তিনি নিজের ব্যক্তিগত আয় হইতে বঞ্চিত হয়েছেন, 'নিজের ও পরিবারবর্গের ভরণ-পোষণের জন্য বায়তুল মালের তহবিল হইতে অর্থগ্রহণ করিতে পারেন কি না, এ প্রশ্ন তাঁর মনে জাগিয়াছিল। কথিত আছে, একদিন তিনি কথা প্রসঙ্গে এই প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন এবং উপস্থিত লোকদের ভিতর কবি আহান উত্তরে বলিয়াছিলেন, ইহাতে অবৈধ কিছু তিনি দেখিতে পান না। তখন পার্শ্বে উপবিষ্ট প্রবীণ সাহাবি আবুজর ইহার ঘোর প্রতিবাদ করেন এবং উক্ত ইহুদি কবিকে ইসলামি শরিয়ত সম্বন্ধে অনধিকার চর্চার জন্য ধমকাইয়া দেন, একথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
হজরত ওসমানের দানের হস্ত এমনই দরাজ ছিল, তিনি শুধু বিপন্নের সাহায্যে বায়তুল মাল হইতে অর্থ প্রদান করেন নাই, ধনী ব্যক্তিদেরও ব্যবসায় পরিচালনা অথবা ভূমি খরিদ বাবদে অর্থ দান করিয়াছেন। হজরত উমর বায়তুল মালের অর্থ এইভাবে বিতরণ করা কল্পনায়ও আনিতেন না। তাঁর সময় বায়তুল মাল সম্বন্ধে কড়াকড়ি এত অধিক ছিল যে, শুধু রমযান মাসে তিনি মদিনার লোকদের জন্য মাথাপিছু এক দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা এবং নবী-পত্নীদের প্রত্যেকের জন্য দুই দিরহাম ব্যয় মঞ্জুর করিতেন। তাতেই মদিনার লোকেরা খুশি থাকিত। সরকারি মুসাফিরখানায় তিনি পরিমিত অর্থ বরাদ্দ করিতেন, যাহাতে শুধু অভাবগ্রস্ত লোকেরাই খাইয়া বাঁচিতে পারিত, অলস ব্যক্তিদের সেখানে আড্ডা জমিত না। কিন্তু হজরত ওসমান রমযান মাসে মদিনাবাসীদের মাথাপিছু ওযিফার হার সন্তোষজনকভাবে বাড়াইয়া দিতেন এবং সরকারি মুসাফিরখানার দ্বার অবারিত রাখিবার নির্দেশ দিতেন, যাহাতে শুধু অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিগণ নয়, যে কেউ সেখানে উপস্থিত হইত সে-ই অবাধে আহার্য পাইত। ইহা হজরত ওসমানের স্বাভাবিক উদারতার পরিচায়ক সন্দেহ নাই, কিন্তু ইহার ফলে সরকারি অর্থে উদর পূর্তির এমন একটা লালসা মানুষের মনে জাগিত, যাহারা রমজান মাসে বর্ধিত হারে ওযিফা পাইত তাদেরও অনেকে ঐ অর্থ বাঁচাইবার জন্য সরকারি লোঙরখানায় আসিয়া আহার করিত। কিন্তু হজরত ওসমানের দরদি হৃদয় এতটুকু করিয়া তৃপ্ত হয় নাই। বিশেষ বিশেষ সাহাবিকে তিনি অনেক সময় নির্ধারিত ওযিফার উপরেও অতিরিক্ত সাহায্য মঞ্জুর করিতেন।
হজরত ওসমান যে সমস্ত লোককে ব্যবসায়ের মূলধন হিসাবে বায়তুল মাল হইতে অর্থ সাহায্য করিয়াছেন, তাদের ভিতর তালহা ও জুবায়েরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইবনে সাদ নামক এক ব্যক্তি বর্ণনা করিয়াছেন, হজরত ওসমান তালহা ও জুবায়েরের সাহায্যার্থে সরকারের নিকট তাঁহাদের পূর্বের সমস্ত দেনা মাফ করিয়া দেন এবং তাহা ছাড়া অতিরিক্ত আরও দুই লাখ দিরহাম তালহাকে এবং ছয় লাখ দিরহাম যুবায়েরকে বায়তুল মাল হইতে প্রদান করেন। তাঁরা উভয়ে ইহা হইতে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যবসায়ে নিয়োগ করিয়া অবশিষ্টাংশ দ্বারা জমি ও ঘরবাড়ি ক্রয় করেছিলেন। ইঁহারা উভয়ে হজরত ওসমানের বিশিষ্ট বন্ধু ছিলেন। অন্যত্র উল্লেখ আছে, হজরত ওসমান মারওয়ানকে আফ্রিকার যুদ্ধলব্ধ আয়ের পঞ্চমাংশের পঞ্চমাংশ অথবা তার পরিশোধ-মূল্য, যাহা তাঁর নিকট রাষ্ট্রের প্রাপ্য ছিল, তাহা মাফ করিয়া দিয়াছিলেন এবং তাহা ছাড়া তাঁকে নগদ অর্থও অনেক দিয়াছিলেন। মারওয়ানের পিতা হাকামকে এবং তৎপুত্র হারিসকে তিনি বায়তুল মাল হইতে তিন লাখ দিরহাম দান করেছিলেন এবং আবদুল্লাহ্ ইবনে খালেদ ও ইবনে সাদ বিন উম্মীয়াকে তিন লাখ দিরহাম দিয়াছিলেন বলিয়া কথিত আছে।
হজরত ওসমান মনে করিতেন, লোকদের তাদের প্রয়োজনের সময় অর্থদান করার অধিকার তাঁর আছে। কারণ, জাতির সেবার জন্যই আল্লাহ্ তাঁকে মুসলমানদের উপর খলিফা করিয়াছেন। তাঁর নিয়োজিত গভর্নরদেরও তিনি বায়তুল মাল হইতে প্রয়োজনমতো দান বা কর্জ প্রদান করিতেন। এইরূপ এক ঘটনা হইতে কুফার কোষাধ্যক্ষ আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদকে তাঁর চাকরিতে ইস্তফা দিতে হয়েছিল। ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের এই প্রকার ঋণ বা দান গ্রহণ জনসাধারণের ভিতর দারুণ অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল। কারণ, বায়তুল মালের তহবিল শূন্য হইলে ঘাটতি পূরণের জন্য খাজনা ও ট্যাক্স আদায়ের কড়াকড়ি অত্যধিক বাড়িয়া যাইত।
হজরত ওসমান তাঁর চাচা হাকাম ও তাঁর সন্তানদের প্রতি যে প্রকার অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছিলেন তাহা লইয়া সাহাবিদের ভিতর বিশেষ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ, এই হাকাম নবীর মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন শুধু প্রাণ বাঁচাইবার জন্য। তাহার প্রমাণ, ইসলাম গ্রহণের পরও তিনি রাস্তায় নবীর পিছু লইতেন, চক্ষু দ্বারা ব্যঙ্গসূচক ইঙ্গিত করিতেন এবং নবীর পথচলার ভঙ্গি অনুকরণ করিয়া বিদ্রুপ করিতেন। একদিন তিনি সরাসরি নবীর কামরায় ঢুকিয়া পড়েন। নবী ইহাতে অতিশয় বিরক্ত হন এবং তাঁকে মদিনা হইতে তাড়াইয়া দেন। ইহার পর হজরত ওসমান একে একে নবীর ও প্রথম দুই খলিফার নিকট হাকামের মদিনায় প্রত্যাবর্তনের জন্য সুপারিশ করেন, কিন্তু কৃতকার্য হন নাই। খলিফা হওয়ার পর তিনি নিজের বিচারবুদ্ধির অনুসরণ করিয়া হাকামকে এবং তাঁর সন্তানদের মদিনা লইয়া আসেন। হজরত ওসমানের মতে হাকামের উপর নির্বাসন দণ্ড যাবজ্জীবনের জন্য ছিল না। প্রত্যেক অপরাধেরই দীর্ঘকাল দণ্ডভোগের পর দণ্ডের মিয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে থাকে। পরবর্তীকালে মুতাজেলিরা খলিফার বিচার বুদ্ধির এই প্রকার স্বাধীনতা থাকার কথা স্বীকার করেন। কিন্তু যে সময়ের ঘটনা, তখন মুতাজেলি মতবাদ গড়িয়া উঠে নাই। সরলচেতা সাহাবিরা কূটতর্কের ধার ধারিতেন না। তাঁরা সরাসরি রায় দিতেন এবং খলিফার এই কাজকে নবী ও তাঁর দুই প্রতিনিধির মতের প্রকাশ্য খিলাফ বলিয়া প্রচার করেন। হজরত ওসমান যে হাকাম ও তাঁর সন্তানদের রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধার অগ্রাধিকার ও প্রাধান্য দিতে অতিরিক্ত আগ্রহী ছিলেন, তাঁর কতগুলো আচরণ হইতে তাহা প্রমাণিত হয়। হাকাম-গোষ্ঠী নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হইলে হজরত ওসমানের বাহু সুদৃঢ় হইবে, এরূপ উদ্দেশ্য অনেকে তাঁর উপর আরোপ করে। হাকাম এবং তাঁর পুত্র তারিসকে তিনি শুধু প্রচুর অর্থই দেন নাই, হাকামের মৃত্যুর পর তাঁর কবরের উপর একটি খিমা তৈয়ার করিয়া দিয়াছিলেন। হারিসকে তিনি মদিনার বাজারের কর্তৃত্ব দিয়াছিলেন। কিন্তু সততা ও ধর্মের প্রতি নিষ্টার অভাবে হারিস তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন।
মুতাজেলিদের মতে, ব্যক্তিবিশেষের প্রতি খলিফার অতিরিক্ত অনুকম্পা প্রদর্শন লৌকিক ব্যাপার মাত্র, উহাতে দীন-ইসলাম ক্ষুণ্ণ হয় নাই; ইসলামের মূলনীতিরও কোনও পরিবর্তন তিনি ঘটান নাই। অধিকন্তু নিজের বিবেক বুদ্ধির অনুসরণ অর্থাৎ ইস্তিহাদের অধিকার প্রত্যেক খলিফার থাকা উচিত এবং হযর ওসমানেরও তাহা ছিল।
জাকাত ও সাদ্‌কালব্ধ অর্থ ও খলিফা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করিতেন বলিয়া সাহাবিদের পক্ষ হইতে আপত্তি উঠিয়াছিল। সাক্কার সম্পত্তি ব্যয়ের জন্য কুরআনে তার ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, 'সাক্কা শুধু গরিব এবং অভাবগ্রস্তদের জন্য এবং তার আদায়কারীও যাদের হৃদয়ে সান্ত্বনা দেওয়া আবশ্যক তাদের জন্য এবং গোলামদের আযাদ করার জন্য এবং আল্লাহ্ পথের ও পথিকদের জন্য ইহা আল্লাহ্ কর্তৃক নির্দিষ্ট দাবি। আল্লাহ্ জ্ঞানী ও কৌশলময়।' যাকাতের অর্থ ব্যয় করার ক্ষেত্রও আল্লাহ সীমাবদ্ধ করিয়া দিয়াছে। সীমা লঙ্ঘনকারীরা শরিয়তের দৃষ্টিতে অপরাধী। মুতাজেলিগণ এ বিষয়টিও খলিফার ইস্তিহাদের অধিকারভুক্ত বলিয়া মতপ্রকাশ করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন, খলিফা এক্ষেত্রে নিয়মের ব্যতিক্রম করিয়াছে শুধু ঐ সময় যখন বায়তুল মালের তহবিলে প্রাচুর্য ছিল এবং সাময়িক প্রয়োজনের তাগিদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বায়তুল মালে অর্থের সঙ্গতি ঘটিলেই তিনি জাকাত অথবা সাক্কার তহবিলের ঘাটতি পূরণ করিবেন, এরূপ সদিচ্ছা যদি তাঁর থাকিয়া থাকে, তবে তাঁর কার্যকে দোষণীয় বলা যায় না। এক খাতের অর্থ বিশেষ প্রয়োজনে অন্য খাতে ব্যয় করার অধিকার প্রত্যেক রাষ্ট্রনায়কেরই থাকা উচিত এবং না থাকা অসঙ্গত।
কিন্তু সমকালীন ঐতিহাসিকরা হজরত ওসমানের এই প্রকার নীতিগত শৈথিল্যের নিন্দা করিয়াছেন। কাহারও কাহারও মতে হজরত ওসমান যদি তাঁর বিচারবুদ্ধি প্রসূত স্বেচ্ছাচারিতা কেবলমাত্র দান খয়রাতের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখিতেন, তাহা হইলে হয়ত তাঁর কার্যকলাপ শুধু সমালোচনারই বিষয়ীভূত হয়ে থাকিত, জনগণের মনে বিদ্রোহ জাগাইত না। কারণ, কতক সাহাবি এমন ছিলেন যাহারা খলিফার মতের বিরোধিতা করা বৈধ মনে করিতেন না। তাঁরা যে কোনো অবস্থায় নীরব থাকতেন, এই ধারণার বশবর্তী হয়ে, খলিফার কাজের জন্য তিনি নিজেই আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করিবেন। তাঁরা উহা বরদাশত করিয়া গেলে বরং আল্লাহর নিকট হইতে সওয়াবের অধিকারী হইবেন। কেননা আল্লাহ্ই ইমামের আনুগত্য মু'মিনদের জন্য বাধ্যতামূলক করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, 'হে ইমানদাররা, তোমরা আল্লাহর অনুগত হও এবং তাঁর রাসুলের অনুগত হও এবং অনুগত হও তোমাদের রাষ্ট্রচালকের।' আর এক শ্রেণির সাহাবি ছিলেন যাঁরা প্রয়োজন দেখা দিলে প্রতিবাদ করিতেন কিন্তু সীমালঙ্ঘন করিতেন না।
খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথা তারা মনেও আনিতেন না। হয়ত আবু জর গিফারি, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ এবং আম্মার ইবনে ইয়াসার প্রমুখ বয়োবৃদ্ধ সাহাবি এই দলের ছিলেন। হয়ত শেষ পর্যন্ত ইঁহারা হজরত ওসমানের বিচার আল্লাহ্র হস্তেই ছাড়িয়া দিতেন এবং নিজেরা কোনো সক্রিয় পন্থা অনুসরণ করিতেন না। কাহারও কাহারও মতে, হজরত ওসমান যদি রাষ্ট্রের দৌলত দ্বারা তাঁর শাসন-যুগকে শান্তিময় করিতে চাহিয়া থাকেন, তাতেই দোষের কি আছে। তবে মুশকিলের ব্যাপার ছিল এই যে, ঐ সব দানের বেশির ভাগ গেল খলিফার জ্ঞাতি-গোষ্ঠী ও অনুগত কোরাইশদের উপকারে যাহা জনসাধারণের দৃষ্টিতে অত্যন্ত বিসদৃশ লাগিয়াছিল। ঐতিহাসিক তাবারি লিখিয়াছেন, 'হজরত উমর কোরাইশদের প্রতি যে রূপ সতর্ক দৃষ্টি রাখিতেন, হজরত ওসমান তেমন পারেন নাই। ফলে সরকার কর্তৃক অনুগৃহীত ব্যক্তিরা নিজেদের সুবিধামতো ভূমি ক্রয় করিয়া তার রক্ষণাবেক্ষণের অজুহাতে মদিনার বাহিরে বিভিন্ন স্থানে ছড়াইয়া পড়েন এবং তার ফলে রাষ্ট্রের সংহতি বিনষ্ট হয়।'
হজরত উমরের অতিরিক্ত কড়াকড়িতে সাহাবিগণের ভিতর যখন প্রতিবাদের গুঞ্জন শুনা যাইতেছিল, সেই সময় একদিন হজরত উমর সাহাবিদের সম্বোধন করিয়া বলিয়াছিলেন, 'কোরাইশ চাহে আল্লাহ্র দৌলত তাঁর দুস্থ বান্দাদের ছাড়া অন্য প্রয়োজনে ব্যয় করা হোক। স্মরণ রাখ, উমরের দেহে প্রাণ থাকিতে ইহা পারিবে না। আমি মক্কার পাহাড় হেরার ঘাঁটিতে কোরাইশগণের গর্দান ও কোমর ধরিয়া দাঁড়াইয়া থাকিব এবং তাহাদের অগ্নিতে ঝাঁপ দেওয়া হইতে বিরত রাখিব।' কিন্তু হজরত উমরের সেই দৃঢ়তা ও মনোবল হজরত ওসমানের ভিতর ছিল না। তিনি কোরাইশদের আবদার রক্ষা না করিয়া পারেন নাই। তাই প্রসিদ্ধ ধনী ব্যক্তিরা তাঁর অনুগ্রহে বায়তুল মালের অর্থ নিজেদের জন্য বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণ ও বিস্তীর্ণ জমিদারি সৃষ্টি করিতে সমর্থ হয়েছিলেন।

টিকাঃ
২. Abu Bakar. the conqueror & pacifier of Arabia lived in patriarchal simplicity. In the first six month of this short reign he travelled back & forth daily from Al-Sunh. where lived in a modest house hold with his wife Habibah, to his capital Medina and received no stipend, since the state had at that time hardly any income. All state business he transacted in the courtyard of the prophet's Mosque. Simple & frugal in manner his energetic & talented successor Umar. who was of towering height & strong physique, continued at least for some time after becoming Caliph to support himself by trade. He lived throughout his life in a style as unostentatious as that of a Bedouin Shiekh.
Umar whose name acording to Muslim tradition is the greatest in early Islam after that of Muhammad, has been idolised by Muslim writers for his piety. justice & patriarchal simplicity and treated as the personification of the virtues a Caliph ought to possess. He owned we are told. one shirt & one mantle only both conspicuous for their patch work, slept on a bed of palm leaves, and had no concern other than the maintenance of the purity of the faith, the upholding of justice and the ascendancy & security of Islam and the Arabians.
-The Arabs (A Short History by p. K. Hitti, pp. 45.
৩. To regulate the receipt & disbursement of the revenue he established the Department of Finace under the name of Dewan. The expense of The fiscal and civil administration of province constituted the first charge upon the revenue; the next was for military requirements; the surplas was applied to the support of nation. In these, all persons of the Arab race & their 'mawalis'. -A History of the Saracens by Syed Ameer Ali. pp. 61
৪. ১. ডক্টর তোয়াহা হোসাইন (মিসরি) প্রণীত হজরত ওসমানের মৌলানা নূরউদ্দীন আহমদ কৃত অনুবাদের ২১০-২২৬ পৃষ্ঠা।
৫. ডক্টর তোয়াহা হোসাইন (মিসরি) প্রণীত 'হজরত ওসমানের' গ্রন্থের মৌলানা নূরউদ্দীন আহমদ কৃত অনুবাদ ৫৩ পৃষ্ঠা।
৬. ডক্টর তোয়াহা হোসাইন (মিসরি) প্রণীত 'হজরত ওসমানের' মৌলানা নূরউদ্দীন আহমদ কৃত অনুবাদের ৫৩ পৃষ্ঠা।

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 প্রতিক্রিয়া

📄 প্রতিক্রিয়া


হজরত ওসমান হয়ত মনে করেন নাই, তিনি তাঁর পূর্ববর্তী খলিফাদের আদর্শের ব্যতিক্রম করছেন। দানই ছিল তাঁর স্বভাব। মুসলমানদের উপকারে দান-খয়রাত তিনি অন্যায় মনে করিতেন না। জনসাধারণও ইহাতে প্রথম দিকে অন্যায় কিছু দেখিতে পায় নাই; বিশেষ করিয়া প্রাথমিক মুসলমান, ইহাদের ভিতরই তাঁর বিশেষ দান সীমাবদ্ধ রাখিতেন তাহা হইলে প্রজাগণ অসন্তুষ্ট হইত না; তাঁর রাজত্বের ইতিহাসও হয়ত ভিন্ন রূপ ধারণ করিত।
প্রবীণ ও সম্মানিত সাহাবিদের ভিতর যাঁরা হজরত ওসমানের কার্যের প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেন তাঁহাদের ভিতর আবু জর গিফারীর কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। খলিফা তাঁকে নির্বাসিত করেছিলেন। তাঁর বিশ্বস্ত বন্ধু আম্মার ইবনে ইয়াসার এবং অপর প্রখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদও প্রকাশ্যে খলিফার নির্বিচার দান-খয়রাতের প্রতিবাদ করার জন্য খলিফার বিরাগভাজন হয়েছিলেন। খলিফা যখন আবু জরকে নির্বাসন দণ্ড দেন, সেই সময় তাঁর অন্তরঙ্গ সুহৃদ আম্মার ইবনে ইয়াসারকেও তাঁর সঙ্গে রেবজাহ যাইতে নির্দেশ দিয়াছিলেন। কিন্তু ইহাতে আম্মারের মিত্র-গোষ্ঠী বনি মখজু গোত্র অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়। হজরত আলিও তীব্র প্রতিবাদ করেন। ফলে আম্মার সম্বন্ধে হজরত ওসমান তাঁর আদেশ প্রত্যাহার করিতে বাধ্য হন।
হজরত উমরের সময় তিনি জিহাদে যোগদান করেন এবং হেম্স শহরে থাকিয়া উত্তর-অঞ্চলের যুদ্ধের সহযোগিতা করেন। হজরত উমর তাহাকে কুফার কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত করেন। হজরত উমরের মৃত্যু হইলে তিনি হজরত ওসমানের হস্তে বায়াৎ হয়েছিলেন।
কিন্তু কতিপয় ঘটনার পর আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ হজরত ওসমানের বিরোধী হন। গভর্নর সাদ ইবনে আবি ওক্কাসের সহিত তাঁর কলহের কথা পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। ইহার পর ওলিদ যখন কুফার গভর্নর সেই সময় ওলিদও খলিফার অনুমতিক্রমে বায়তুল মাল হইতে ঋণ গ্রহণ করেন। ঋণ পরিশোধের নির্দিষ্ট সময় অতীত হইলে আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ' গভর্নরকে ত্যগিত দিতে থাকেন। ওলিদ ক্রমেই সময় লইতে থাকেন। কিন্তু ঋণ শোধ আর করেন না। ইবনে মাসউদও ছাড়িবার পাত্র নহেন। তিনি পুনঃপুনঃ গভর্নরকে উত্যক্ত করিতে লাগিলেন। ওলিদ তাঁর এই কড়াকড়িতে ক্রুব্ধ হয়ে খলিফার নিকট তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করিয়া পত্র প্রেরণ করিলেন। খলিফা তখন ইবনে মাসউদকে লিখিলেন, 'তুমি আমার খাজাঞ্চী মাত্র; বায়তুল মাল হইতে ওলিদ যে ঋণ গ্রহণ করিয়াছেন, তার জন্য তুমি কোনও পীড়াপীড়ি করিও না।' ইহাতে ইবনে মাসউদ অসন্তুষ্ট হইলেন এবং বায়তুল মালের চাবি বুঝাইয়া দিয়া গৃহে চলিয়া গেলেন। ইহার পর তিনি জনগণের হিদায়েতের জন্য বক্তৃতা করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। বক্তৃতার সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয় উত্থাপিত হইলে তিনি নির্ভীকভাবে খলিফার কাজের উপর মন্তব্য করিতেন। হজরত ওসমান যে কুরআনের পরিত্যক্ত কপিগুলো পোড়াইয়া দেন, সেজন্যও ইবনে মাসউদ বিরূপ সমালোচনা করিতেন। ইহার পর উভয়ের ভিতর বিরোধ কিভাবে পাকিয়া উঠে সে সম্বন্ধে জনৈক রাবী এইরূপ বর্ণনা করিয়াছেন:
'আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ প্রতি জুমা' রাত্রে ওয়াজ করিতেন এবং প্রসঙ্গক্রমে বলিতেন-'সর্বাপেক্ষা সত্যবাণী কুরআনের, সর্বাপেক্ষা উত্তম চরিত্র হজরত মোহাম্মদের (সা.), সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ বিদা'ৎ এবং প্রত্যেক নতুন কাজই বিদা'ৎ এবং প্রত্যেকটি বিদা'ৎ গুমরাহী এবং প্রত্যেকটি গুমরাহীই অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হইবে।' ওলিদ এই বিষয় উল্লেখ করত খলিফার নিকট পত্র লিখিলেন এবং উল্লেখ করিলেন যে, ইহা খলিফার প্রতি অবমাননা স্বরূপ। খলিফা ওসমান তাঁকে মদিনায় পাঠাইয়া দিতে বলিলেন। ইবনে মাসউদকে সেই অনুসারে মদিনায় প্রেরণ করা হইল। তাঁর কুফা পরিত্যাগ করার সময় সেখানকার অধিবাসিগণ তাঁর সম্পর্কে সীমাহীন আগ্রহ ও উত্তেজনা দেখাইয়াছিল।
'ইবনে মাসউদ মদিনায় পৌছিয়া যখন মসজিদে নববীতে প্রবেশ করিলেন, খলিফা তখন মিম্বরে দাঁড়াইয়া খুৎবা দিতেছিলেন। ইবনে মাসউদকে আসিতে দেখিয়া তিনি বলিয়া উঠিলেন- 'ঐ দেখ' নষ্টের কীট আসিতেছে। সে যে পাতে খায়, সেইখানেই বমি করে এবং মলত্যাগও করে। ইবনে মাসউদ ইহা শুনিয়া বলিলেন- 'আমি নিশ্চয়ই সেরূপ নই, আমি বাইয়াতে বিদওয়ানে এবং বদরের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহর সঙ্গী ছিলাম।' হজরত আয়েশা উচ্চস্বরে বলিলেন- 'হে ওসমান। আপনি রসুলুল্লাহর সাহাবিকে এরূপ বলিতেছেন?' ইবনে মাসউদকে জোরপূর্বক মসজিদ হইতে বহিষ্কৃত করা হইল। তাঁকে সজোরে মাটিতে ফেলিয়া দেওয়া হয়। সেই আঘাতে তাঁর পশ্চাদভাগের হাড় ভাঙিয়া যায়। ইহা দেখিয়া হজরত আলি উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং খলিফার প্রতিবাদ করিয়া বলিলেন: 'আপনি ওলিদের কথায় এইসব করছেন?' খলিফা বলিলেন- 'না আমি ওলিদের কথায় এইসব করিতেছি না, আমি জুবাইদ ইবনে কসিরকে পত্র প্রেরণ করেছিলাম, তিনি শুনিয়াছেন, ইবনে মাসউদ আমার খুন বৈধ সাব্যস্ত করিয়াছে।' হজরত আলি বলিলেন- 'জুবাইদ নির্ভরযোগ্য লোক নয়।' অতঃপর হজরত আলি ইবনে মাসউদকে গৃহে পৌছাইয়া দিবার হুকুম দিলেন।'
উপরোক্ত কাহিনি কতদূর সত্য বলা যায় না, কারণ হজরত ওসমানের চিরাচরিত স্বভাবের সহিত তার সঙ্গতি নাই। বিশেষত রাবীগণের ভিতরও এ বিষয়ে সমর্থন বিরল। যাহা হউক, ইবনে মাসউদ যে কুফা হইতে খলিফার বিরোধী হয়ে বহির্গত হয়েছিলেন এবং মদিনায়ও দুই তিন বৎসর তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাইয়াছিলেন, তাতে সন্দেহ নাই। ইহার পর তাঁর অন্তিম সময় আসিয়া উপস্থিত হইল। সেই সময় খলিফা যে তাঁর রোগ-শয্যা পাশে গিয়াছিলেন সে সম্বন্ধে রাবীগণের মতৈক্য দেখা যায়। এমনও বলা হয়েছে, ইবনে মাসউদ যখন শেষ-নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, খলিফাকে সে সংবাদ কেহ জানায় নাই। পরন্তু আম্মার ইবনে ইয়াসর তাঁর জানাজা সম্পাদন করেন এবং খলিফার অগোচরে তাঁর দাফন-কার্য সমাধা করা হয়। খলিফা পরে ইহা জানিতে পারিয়া খুবই দুঃখিত হয়েছিলেন।
যাহা হউক, হজরত আবু জর, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আম্মার ইবনে মাসউদ, আম্মার ইবনে ইয়াসার প্রমুখ মর্যাদাশালী সাহাবি ও মুহাজির ছিলেন খলিফার বিরোধীদলের (বিদ্রোহী দলের নয়) মুখপাত্র। আবদুর রহমান বিন আউফ, যিনি নির্বাচনী মজলিশে নেতৃত্ব করেছিলেন এবং হজরত ওসমানের অনুকূলে রায় প্রকাশ করেছিলেন, তিনিও শেষ পর্যন্ত হজরত ওসমানের উপর সন্তুষ্ট ছিলেন না। কোরাইশদের উৎপাতে মদিনার আনসারগণ রাজনীতিতে বিশেষ অংশগ্রহণ করিতেন না। তাদের ভিতর অল্প কিছু লোক খলিফার সর্বপ্রকার কার্যে তাঁর পক্ষ সমর্থন করিয়া নিজদের মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত রাখিতেন। তাদের ভিতর জায়েদ বিন সাবেত, হাসসান বিন সাবেত, আবদুল্লাহ বিন মালিক প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তারা খলিফার দরবারে থাকতেন। অন্যান্য নেতৃস্থানীয় আনসারগণ পুরোভাগে আসিতেন না, রাজনৈতিক দলাদলির ভিতরও থাকতেন না বরং দল নিরপেক্ষ হিসেবে অনেক সময় তাঁরা খলিফা ও বিরোধী দলের ভিতর মধ্যস্থতা করিতে আহূত হইতেন। তাদের ভিতর মুহম্মদ বিন মুসলিমার নাম নানা কারণে ইতিহাসে স্থান করিয়াছে।
মোটের উপর, হজরত ওসমানের অর্থনীতি যে তাঁর জনপ্রিয়তার সাংঘাতিকভাবে ক্ষতি সাধন করেছিল, সে বিষয়ে সমসাময়িক ঐতিহাসিকগণ প্রায় সকলেই একমত। অথচ তাঁর নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অন্যরূপ। তিনি বলিতেন, হজরত আবু বকর ও হজরত উমর যে বায়তুল মালের অর্থ নিজেরা গ্রহণ করিতেন না এবং অন্যদের বেলায়ও তার বিতরণে খুব কড়াকড়ি করিতেন, সে সময় সত্যই ইহার প্রয়োজন ছিল; কিন্তু পরিস্থিতির এখন উন্নতি হয়েছে, এক্ষণে সেরূপ কৃচ্ছতা অনাবশ্যক। তাই তিনি তাঁর স্বাভাবিক দানপ্রবণতা অক্ষুণ্ণ রাখিয়াছিলেন। শুধু অক্ষুণ্ণ রাখা হয়, উত্তরোত্তর তার ক্ষেত্র বৃদ্ধি পাইতেছিল। খলিফা হয়েই তিনি রাজধানীর লোকদের ওযিফা বৃদ্ধি করেন; তাতে পাত্র-অপাত্রের বিচার ছিল না। পরে রাষ্ট্রের অন্যান্য শহরেও তাঁর এই অনুকম্পা প্রসারিত হয়েছিল। প্রতিপত্তিশালী লোকদের, এমন কি, গভর্নরদেরও তিনি সরকারি তহবিল হইতে মোটা অর্থ ঋণ দান করিয়াছেন এবং বহুক্ষেত্রে তাঁহাদের পূর্বঋণ মওকুফ করিয়াছেন। এসব কারণে তাঁহাদের রাজত্বের প্রথম ছয় বৎসর যশ ও জনপ্রিয়তার ভিতর দিয়া অতিবাহিত হয়েছিল। সর্বত্র তাঁর জয়জয়কার চলিয়াছিল।
কিন্তু মুশকিল হয়েছিল এই, দানের সময় তাঁর নিকট পাত্র-অপাত্রের বিচার থাকিত না। যিনিই কোনো প্রয়োজনের উল্লেখ করিয়া অর্থ চাহিতেন, তাঁকেই খলিফা মুক্তহস্তে খয়রাত বা ঋণ দান করিতেন। প্রয়োজনের ত কোনও সংজ্ঞা নাই, ফলে ধনী ব্যক্তিরা ক্রমেই আরও ধনী হয়েছেন এবং বড় জমিদারির মালিক হয়েছেন; আর দরিদ্র প্রজারা তাঁহাদের শোষণ ও অত্যাচারে অধিকতর দরিদ্র হয়েছে এবং অনেকেই নিজেদের পৈতৃক ঘরবাড়ি ও জমিজমা হইতে উৎখাত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ইহারা সমাজে মজুর শ্রেণিতে হয়েছে। ইসলামের ধনসাম্য-নীতি ব্যাহত হওয়ায় পুঁজিপতি ও সর্বহারাদের ভিতরকার দূরত্ব নৈরাশ্যজনকভাবে বাড়িয়া চলিয়াছে। ধনীকেরা বিলাসিতার জীবনযাপন করিত এবং বসিয়া খাইত। তাতে জাতীয় আয় হ্রাস পাইত। উপরন্তু তারা অধিকাংশই মিতব্যয়িতার সীমালঙ্ঘন করিত ও শরীয়তের বিধান উপেক্ষা করিত। আর বিপুল সংখ্যক লোক তাদের চাকর, খানসামাও দাস-দাসীরূপে জীবনযাপন করিতে প্রলুব্ধ হওয়ায় জাতির জীবন হইতে তেজবীর্য ক্রমেই অন্তর্হিত হইতেছিল। যে জাতির এক বিপুল অংশ মজুর ও গোলাম সে জাতি পৃথিবীতে শাসক শ্রেণির মর্যাদা লাভ করিতে কোনো দিন সমর্থ হয় না, ইহা ঐতিহাসিক সত্য। পক্ষান্তরে সমাজে উচ্ছৃঙ্খল ধনীকের সংখ্যা বৃদ্ধি যে ন্যায়নীতি ও আধ্যাত্মিকতার অন্তরায় ইহাও অনস্বীকার্য। তাই রাজত্বের শেষভাগে হজরত ওসমান গোটা মুসলিম রাষ্ট্রের প্রজাদের সহানুভূতি হইতে নির্মমভাবে বঞ্চিত হয়েছিলেন।

টিকাঃ
৭. আম্মার ইবনে ইয়াসার ছিলেন প্রাথমিক মুসলিম দলের একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি। তাঁর পিতা ইয়েমেন দেশীয় বনি মখজুমদের সহিত মিত্রতা সূত্রে আবদ্ধ ছিলেন। মাতা এক সময় বনি মখজুমের এক ব্যক্তির দাসী ছিলেন। নবীর শিষ্য সংখ্যা যখন ত্রিশের ঊর্ধ্বে যায় নাই, সেই সময় আম্মার ও সুহাইল একত্রে নবীর নিকট আসিয়া দীক্ষা গ্রহণ করেন। আম্মারের পিতামাতাও পরে মুসলমান হয়েছিলেন; আম্মার অভিজাত বংশীয় ছিলেন না, পরন্তু মক্কার দুর্বল লোকদের অন্তর্গত ছিলেন। তারা ইসলাম গ্রহণ করিলে মক্কার কোরাইশগণ তাদের প্রতি অমানুসিক অত্যাচার করে। ইনি সেই আম্মার, যাহাকে তারা রৌদ্রের সময় মরুভূমির উত্তপ্ত বালুকার উপর শোয়াইয়া রাখিত, জ্বলন্ত অঙ্গার শরীরে চাপিয়া ধরিত, বুকে পাথর চাপা দিত এবং আরও নানা প্রকারের শাস্তি দিত। মুক্তির জন্য তারা তাহাকে দেবদেবীর প্রশংসা করিতে এবং হজরত রাসুলের শিষ্যত্ব ত্যাগ করিতে বলিত। কিন্তু আম্মার নিজ বিশ্বাসে অটল ছিলেন। নির্যাতন অসহ্য হওযায় তিনি আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। পরে আবিসিনিয়া হইতে মদিনায় চলিয়া যান এবং নবীর আশ্রয়ে বাকি জীবন অতিবাহিত করেন। নবীর সকল কাজে তিনি অংশ গ্রহণ করিতেন। বদর, ওহোদ ও ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন। হজরত উমর তাঁকে খুবই শ্রদ্ধা করিতেন।
৮. ডক্টর তোয়াহা হোসাইন (মিসরি) প্রণীত 'হজরত ওসমানের' গ্রন্থের মৌলানা নূরউদ্দীন আহমদ কৃত অনুবাদের ১৭৮-৮৮ পৃষ্ঠা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00