📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 আবুজর গিফারি

📄 আবুজর গিফারি


হজরত ওসমানের বল্গাহীন রাজস্ব-নীতির বিরুদ্ধে যে-সব সাহাবি তুমুল প্রতিবাদ তুলিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে হজরত আবু জর গিফারীর নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি কেনানগোত্রের লোক ছিলেন। প্রাক-ইসলামি অন্ধকার যুগে তাঁর জন্ম হয়। তিনি সেইসব লোকের একজন ছিলেন, যাহারা সে যুগেও আরব জাতির আমোদ-উল্লাস হইতে দুরে থাকতেন এবং সত্যের সন্ধানের জন্য চিন্তামগ্ন থাকতেন। বাল্যজীবন হইতে আবু জর সংসার-বিরাগী ছিলেন। প্রাপ্ত বয়সে তিনি একবার মক্কায় আসিয়া হজরত রাসুল্লাহ্র বাণী শুনিতে পান এবং তাতে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। নবীর হিজরত যুগে তিনিও মদিনায় চলিয়া যান এবং হজরত রাসুলের সাহচর্য লাভ করেন। প্রাথমিক মুসলমান ও বিশ্বস্ত অনুচর হিসাবে তিনি অতিশয় প্রিয়পাত্র ছিলেন। নবী আদর করিয়া বলিতেন, দুনিয়ায় আবু জরের চাইতে সাচ্চা আমি কাউকে দেখি না। হজরত আবুবকর হজরত উমর এবং হজরত ওসমানের রাজত্বের প্রথম কয়েক বৎসর পর্যন্ত তিনি মদিনায় ছিলেন। তারপর তাঁর জীবনে অনেক মুসিবৎ নামিয়া আসে এবং তিনি দেশান্তরী হন। সাধক হিসাবে তিনি যতটা প্রসিদ্ধি অর্জন করেন, তার চাইতে বেশি প্রসিদ্ধ ছিলেন তিনি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলনের অগ্রদূত হিসাবে। তিনি ছিলেন মজলুম মানুষদের দরদী বন্ধু। তাদের ব্যথায় ব্যথিত হয়ে তিনি হজরত ওসমানের রাজস্ব ও অর্থনীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেন।' একদিন তিনি দেখিতে পান খলিফা মারওয়ানকে অনেক অর্থ দিতেছেন এবং' তাঁর ভাই হারিস বিন আবি হাকামকে তিন লাখ ও জায়েদ বিন সাবেত আনসারীকে এক লাখ দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) দান করছেন। আবু জরের নিকট ইহা অসঙ্গত ও আপত্তিজনক মনে হয়েছিল। তিনি বলিয়াছিলেন; 'ধন-সঞ্চয়কারীদের আগুনের সুসংবাদ দাও।' ইহার পর তিনি এই সম্পর্কে অবতীর্ণ কুরআনের আয়াত পাঠ করেন। মারওয়ান ইহাতে কূপিত হয়ে খলিফার নিকট আবু জরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। হজরত ওসমান আবু জরের নিকট তাঁর এক ভৃত্যকে পাঠাইয়া আবু জরকে এইসব কথা বলিতে নিষেধ করেন। আবু জর তাতে উত্তর করেন, 'আল্লাহর কুরআন পাঠ করিতে এবং আল্লাহর হুকুমের না-ফরমানদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিতে হজরত ওসমান আমাকে নিষেধ করছেন। তাঁকে বলিও, খলিফাকে সন্তুষ্ট করার চাইতে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করাই আমার নিকট অধিক প্রিয়।' হজরত ওসমান এবার সহ্য করিয়া গেলেন, কিন্তু আবু জর তাঁর প্রতিবাদ হইতে নিবৃত্ত হইলেন না। তিনি ধন-লিঙ্গুদের বিরুদ্ধে জোরের সহিত প্রচার কার্য চালাইতে লাগিলেন।
কথিত আছে, একদিন আবুজর হজরত ওসমানের নিকট বসিয়াছিলেন। সে সময় ইহুদি বংশীয় কবি আবদুল্লাহ বিন আহানও সেখানে উপস্থিত ছিল। হজরত ওসমান তাঁকে জিজ্ঞাসা করিলেন, খলিফার পক্ষে 'বায়তুল মাল' হইতে কর্জ গ্রহণ বৈধ কি না। উত্তরে আবদুল্লাহ্ বিন আহান বলেন, 'আমি তো মনে করি ইহাতে অন্যায় কিছু নাই' ইহাতে কবির সহিত আবু জরের বিতণ্ডা হয় এবং আবু জর রাগান্বিত হয়ে বলেন, 'ইহুদি সন্তান; তুমি আমাকে 'দীন' শিক্ষা দিতেছ?' হজরত ওসমান এই ব্যাপারে আবু জরের প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট হন এবং তাঁকে সিরিয়ায় চলিয়া যাইতে বলেন।
রাবীরা আরও নানা ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন। যাহা হউক হজরত আবু জর ইহার পর সিরিয়ায় চলিয়া যান। কিন্তু সেখানেও তাঁর জীবন শান্তিময় হয় নাই, কারণ ধনশালীদের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ তিনি ক্ষান্ত করেন নাই। সেই কারণে তত্রতা গভর্নর মু'য়াবিয়া তাঁকে রাষ্ট্রের পক্ষে বিপদজনক ব্যক্তি বলিয়া মনে করেন এবং খলিফার নিকট তাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রেরণ করেন। খলিফা উত্তরে আবু জরকে পুনরায় মদিনায় পাঠানোর জন্য মু'য়াবিয়াকে নির্দেশ দেন। মু'য়াবিয়া দামেস্ক গভর্নরের বাসের জন্য বহু অর্থ ব্যয়ে 'খিজরা মহল' (সবুজ প্রাসাদ) নামক অট্টালিকা নির্মাণ করাইয়াছিলেন, আবু জর আপত্তি তুলিয়া বলেন, 'উহা প্রজার অর্থে প্রস্তুত হয়ে থাকিলে সরকারি তহবিলের অপচয় হয়েছে, আর মু'য়াবিয়ার নিজ অর্থে হয়ে থাকিলে উহা অপব্যয় ছাড়া অন্য কিছু নয়। মু'য়াবিয়া ইহাতে ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি ইহাও আশঙ্কা করেছিলেন, আবু জরের এই প্রকার আলোচনা চলিতে থাকিলে ধনী ও দরিদ্রের ভিতর সংঘর্ষ বাধিবে এবং দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লব অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠিবে। মু'য়াবিয়া খলিফার অনুমতি পাওয়া মাত্র আবু জরকে মদিনায় পাঠাইয়া দেন এবং তাঁর পথের সুখ-সুবিধা সম্পর্কে যথেষ্ট তাচ্ছিল্য প্রকাশ করেন।
মদিনায় ফিরিয়া আসিয়া আবু জর পূর্বের ন্যায় ধন-সঞ্চয়ের বিরুদ্ধে প্রচার কার্য চালাইতে লাগিলেন। তিনি বলিতেন, 'ধন সঞ্চয়কারীদের আগুনের সুসংবাদ দাও। তাদের ললাটসমূহে পঞ্জরসমূহে, পৃষ্ঠদেশে জ্বলন্ত অগ্নির শেক দেওয়া হইবে।' তিনি হজরত ওসমানের কার্যাবলী সম্পর্কেও আলোচনা করিতে ছাড়িতেন না। এই হেতুতে যে, তখন বায়তুল মালের ব্যবহার সম্পর্কে পূর্বের কড়াকড়ি হ্রাস পাইয়াছিল, শাসনকার্যে প্রবীণদের স্থলে নবীনদের নিযুক্ত করা হইতেছিল এবং মক্কায় কোরাইশগণ, যাহারা শুধু নিরাপত্তা অর্জনের উদ্দেশ্যে ইসলাম কবুল করেছিল, তারাই সরকারি পদসমূহে বহাল হইতেছিল। এই সব সমালোচনা হজরত ওসমানের পক্ষে অতিশয় যন্ত্রণাদায়ক হয়েছিল। তিনি আবু জরকে মদিনা হইতে চলিয়া যাইতে এবং কুফা, বসরা ও সিরিয়া ছাড়া অন্য যে কোনও যায়গায় গিয়া বাস করিতে নির্দেশ দেন। আবু জর ইহার পর স্বেচ্চায় হউক অথবা খলিফার হুকুমে হউক, 'রেবজাহ' নামক স্থানে চলিয়া যান এবং মৃত্যু পর্যন্ত তথায় থাকিতে বাধ্য হন। তাঁর সংসার এমনই দারিদ্র্য পীড়িত ছিল, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী তাঁর কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করিতেও অপারগ ছিলেন। হজরত ওসমান তাঁর মৃত্যু-সংবাদে ইসলামের রীতি অনুযায়ী তাঁর জন্য মাগফিরাত চাহিয়াছিলেন এবং তাঁর স্ত্রীকে খলিফার পোষ্য-বর্গের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
খলিফার নীতির প্রতি আবুজরের বিরোধিতা পরে রাজনৈতিক রূপ গ্রহণ করায় অবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠে। খলিফার আপত্তিকর কার্যের সমালোচনায় বাধাদান এবং মতবিরোধের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে শাস্তি প্রদান আবু জর গুরুতর অন্যায় বলিয়া মনে করিতেন। সমালোচকগণ তাঁর এই যুক্তিবাদে শাণিত হয়ে উঠে। জাতির নিম্নস্তরের লোকেরা বিপ্লবমুখীন হয়। তাঁর মরুভূমিতে নির্বাসন এবং নির্বাসনে জীবনাবসান, নির্যাতিত জনগণের অন্তরে আঘাত হানিয়াছিল এবং তাঁহাদের বিপ্লবী-স্পৃহাকে উদ্দীপ্ত করিয়া তুলেছিল। কিন্তু আবু জর নিজে কখনও বিদ্রোহের প্ররোচনা দিতেন না। তিনি অন্যায়কে অন্যায় বলিতেন, তার সংশোধনের উদ্দেশ্যে। তাঁর ব্যক্তিগত কোনও মতলব ইহাতে ছিল না। খলিফা যখনই তাঁকে শাস্তি দিয়াছেন তিনি বিনা প্রতিবাদে উহা মানিয়া লইয়াছেন। খলিফার আদেশে তিনি বিনা আপত্তিতে সিরিয়ায় চলিয়া গিয়াছিলেন, আবার তাঁর রেবজাহ যাওয়ার আদেশেরও, তিনি বিরোধিতা করেন নাই। তিনি বলিতেন, শাসনকর্তা গোলাম হইলেও ইসলামে আমার প্রতি তাহার প্রতি আনুগত্যের হুকুম দেওয়া হয়েছে। আবু জরকে কেউ যদি ধ্বংসাত্মক বিরোধিতা চালাইতে অথবা তার নেতৃত্ব করিতে পরামর্শ দিত, তিনি তাহাকে বলিতেন, 'হজরত ওসমান যদি খেজুর গাছের সর্বোচ্চ শাখায় আমাকে শূলবিদ্ধ করেন আমি উহাতে আপত্তি করিব না।' তিনি আনুগত্যের সীমার ভিতর থাকিয়া অর্থাৎ বিদ্রোহ না করিয়া অন্যায়ের বিরোধিতা করিতেন এবং ইহাতে তাঁর অধিকার ছিল বলিয়া তিনি মনে করিতেন। ইহাই ছিল নবী-পরিকল্পিত ইসলামি নাগরিকত্বের প্রকৃত স্বরূপ। হজরত আবু জরের ভিতর তার রূপরেখা ষোলকলায় বিকশিত হয়েছিল। নির্যাতিত মজলুমদের জন্য এই নিঃস্বার্থ সাধকের মহান আত্মত্যাগের তুলনা ইতিহাসে বিরল। হজরত ওসমানের রাজস্ব ও অর্থনীতির সহিত, প্রতিপক্ষ হিসাবে তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।

টিকাঃ
৭. হজরত আবু জরের জীবন-কাহিনি বিচিত্র। তিনি দীর্ঘ সময় নামাজে দাঁড়াইয়া থাকতেন। রাত্রির পর রাত্রি তিনি ইবাদতে কাটাইতেন। তাঁর পত্নী বর্ণনা করিয়াছেন, সারাদিন তিনি নামাজে ও ধ্যানে কাটান এবং রাত্রের বেলায় এত বেশি বন্দেগি করেন, মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। কথিত আছে, তাবুক অভিযানের সময় মুসলমানেরা আর্থিক দিক দিয়া অত্যন্ত বিব্রত হয়ে পড়ে এবং সাহাবিরা যাহার যাহা ছিল সমস্ত সম্পদ এই যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহের জন্য নবীর চরণে সমর্পিত করেন। আবু জরের একটি মাত্র উট ছিল, দরিদ্র সাধক তাহাই লইয়া যুদ্ধযাত্রীদের সামিল হন। কিন্তু উটটি অত্যন্ত কৃশ ও দুর্বল। আবু জর উহা লইয়া সমানে চলিতে না পারিয়া পিছাইয়া পড়েন। লোকেরা বলাবলি করিতে থাকে, হয়ত বেচারা পথের ক্লেশ সহ্য করিতে না পারিয়া পিছন হইতে সরিয়া পড়িয়াছে। হজরত রাসুলের কানে এ কথা গেল। তিনি উহা বিশ্বাস করিলেন না; বলিলেন: 'ও কথা এখন ছাড়ো। সে যদি খালেছ নিয়তে বাহির হয়ে থাকে, আল্লাহ্ অবশ্য তাকে ঠিকমতো এখানে পৌছাইবেন।' আসলে কোনো এক মঞ্জিলে তিনি নামাজ অন্তে ধ্যানস্থ হয়ে পড়েন। ধ্যান ভঙ্গের পর দেখেন, কাফেলা অনেক দূর চলিয়া গিয়াছে। তিনি উটটিকে জোরে চালানোর চেষ্টা করেন কিন্তু তাতে সুবিধা হইল না। উটটি অতি মাত্রায় কৃশ ছিল এই জন্য ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পড়তেছিল। তখন তিনি উটটিকে ফেলিয়া নিজেই যতটা সামান পারিলেন মাথায় লইয়া ছুটিতে লাগিলেন। কাফেলার লোকেরা পাগলের মতো একটা লোককে তাদের পিছনে পিছনে ছুটিতে দেখিয়া সে-দিকে হযরতের দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। কেউ কেউ তাঁকে চিনিতে পারিয়া 'আবু জর' বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল। নবী আগে হইতে বুঝিতে পারিয়াছিলেন, আবু জর না আসিয়া পারে না। তিনি তাঁকে মন খুলিয়া আশীর্বাদ করিলেন।
৮.১. ডক্টর তোয়াহা হোসাইন (মিসরি) প্রণীত হজরত ওসমানের মৌলানা নূরউদ্দীন আহমদ কৃত অনুবাদের ১৯১-৯৬ পৃষ্ঠা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00