📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 প্রজাস্বত্বের হস্তান্তর ও জমিদারি প্রথার উদ্ভব

📄 প্রজাস্বত্বের হস্তান্তর ও জমিদারি প্রথার উদ্ভব


হজরত উমরের আমলে জমির অধিকার তাদের থাকিত, যাহারা নিজে জমি চাষ করিত। হজরত ওসমানের আমলে এই নীতির পরিবর্তন হয়। বিত্তশালী নাগরিকরা ইচ্ছামতো কৃষি-জমি খরিদ করার সুযোগ লাভ করে। ইহাতে তারা খলিফার ওপর অবশ্য খুশি হয়েছিল। কেন না, হজরত আবু বকরের আমল হইতে ক্রমাগত দেশজয়ের ফলে মুসলিমদের অনেকের হাতে বিপুল অর্থ জমিয়া যায়। তাদের কেউ কেউ বৈদেশিক বাণিজ্যে অর্থ বিনিয়োগ করিয়াও জমিয়া যায়। তাদের কেউ কেউ বৈদেশিক বাণিজ্যে অর্থ বিনিয়োগ করিয়াও অবশিষ্ট অর্থ দ্বারা কি করিবে ভাবিয়া পাইতেছিল না। হজরত ওসমানের আমলে ইহারা ঐ অর্থ দ্বারা হিজায, সিরিয়া, ইরাক ও মিসরের গ্রাম অঞ্চলে নিজেদের সুবিধামতো জায়গায় জমি খরিদ করিয়া স্থাবর সম্পত্তির মালিক হওয়ার সুযোগ লাভ করে।
হজরত ওসমান কি কারণে উমরের অনুসৃত নীতির ব্যতিক্রম করেন, তার একটু ইতিহাস আছে। রাজত্বের অষ্টম কিম্বা নবম সনে হজরত ওসমান কুফার গভর্নর সাঈদের এক পত্র হইতে জানিতে পারে, কুফার লোকসংখ্যা অত্যন্ত বাড়িয়া গিয়াছে এবং তার ভিতর অভিজাত শ্রেণির লোকের তুলনায় নিম্নশ্রেণির লোকসংখ্যা অনেক বেশি। ইহার ফলে নাগরিক সভ্যতা ও শালীনতা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। শহরের নৈতিক মানও অত্যন্ত নামিয়া গিয়াছে। কারণ নবাগত অধিবাসীদের অধিকাংশই যাযাবর বেদুইন অথবা গ্রাম্য আরব। ইহারা অশিক্ষিত এবং বর্বর। ইহাদের রুচি কদর্য, ভাষা কর্কশ এবং ব্যবহার ঔদ্ধত্যপূর্ণ। কাটাকাটি হানাহানি ইহাদের চিরন্তন অভ্যাস। এজন্য শহরের শান্তিও বিপন্ন হয়ে পড়িয়াছে। এই অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল ক্রমাগত যুদ্ধবিগ্রহের ফলে। যুদ্ধের সময় খলিফার আহ্বানে গ্রাম অঞ্চল হইতে দলে দলে লোক শহরে আসিত এবং সৈন্যদলে ভর্তি হইত। যুদ্ধ ছিল সে যুগে একটি লাভজনক ব্যবসা। কেন না, যুদ্ধে জয়লাভ হইলে সৈন্যেরা মালে গণিমত অর্থাৎ যুদ্ধলব্ধ মালের রীতিমতো অংশ পাইত। এইসব লোক শহরে থাকিতে পসন্দ করিত এবং পরে তাদের পরিবারবর্গকেও শহরে আনিত। ইহারা সঙ্গে আনিত অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং উচ্ছৃঙ্খলতা।
ইহাদের ছাড়া আরও একশ্রেণির লোক দ্বারা নাগরিক তমদ্দুন কলুষিত হইতেছিল।
ইহারা ছিল যুদ্ধবন্দি নরনারী। বন্দি অবস্থায় শহরে আনীত হওয়ার পর ইহারা মালে গণিমত হিসাবে বণ্টিত হয়ে বিজয়ী যোদ্ধাদের ভিতর বিতরিত হইত। এই শ্রেণির লোকের সংখ্যা ছিল বিপুল। বিজয়ীদের গৃহে ইহারা দাসদাসী রূপে জীবনযাপন করিত। দাস-জীবন এবং ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে নৈরাশ্য ইহাদের প্রকৃতিতে আনিয়াছিল নীচতা, কপটতা এবং প্রতিহিংসাপরায়ণতা। ইহারা মনিব পক্ষকে শত্রু জ্ঞান করিত এবং সুযোগ পাইলেই তাদের সহিত প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করিত।
এইসব দাসদাসীর সন্তানসন্ততি ইহাদেরই মনোবৃত্তি লইয়া বর্ধিত হইত। তারা এবং গ্রাম-অঞ্চল হইতে আগত অশিক্ষিত আরব বংশধররা শহরে এক নিম্নস্তরের সমাজ গড়িয়া তুলে। ইহাদের সংস্রবে আসিয়া শহরের সম্ভ্রান্ত অধিবাসীরা, যাদের সংখ্যা ছিল নগণ্য আপনাদের কৃষ্টি ও শালীনতা ক্রমে হারাইয়া বসিতেছিল। এই অবস্থা শুধু কুফায় নয়, অন্যান্য শহরেও বর্তিয়াছিল।
হজরত ওসমান গভর্নর সাঈদের পত্র পাইয়া অতিশয় উদ্বিগ্ন হন। তিনি সাঈদকে এক সান্ত্বনাপূর্ণ জবাব লিখিলেন এবং তাঁকে ধৈর্যের সহিত পরিস্থিতির মোকাবিলা করিতে উপদেশ দিলেন। তিনি লিখিলেন, 'জনগণের প্রতি কল্যাণ ও ক্ষমার মনোভাব লইয়া অগ্রসর হইবে। শ্রেণিবিরোধজনিত দাঙ্গা-হাঙ্গামা যাহাতে না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখিবে। সর্বোপরি প্রাথমিক মুসলিমদের মর্যাদা অগ্রগণ্য জানিবে। কাহারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব করিবে না। প্রত্যেকের সহিত তাহার মর্যাদা অনুযায়ী ব্যবহার করিবে।'
গভর্নরকে এইভাবে উপদেশ দিয়া খলিফা এ বিষয়ে মন্ত্রী মারওয়ান এবং আমির মু'য়াবিয়ার সহিত আলোচনা করিলেন। তিনি স্পষ্টই বুঝিতে পারিয়াছিলেন পরিবর্তন শুরু হয়েছে এবং একটা বিপর্যয় অদূরবর্তী। এইসব চিন্তা করিয়া তিনি পরবর্তী জু'মার মসজিদে নববীতে এক গুরুত্বপূর্ণ খুৎবা দান করিলেন। প্রথমে তিনি সাঈদের চিঠি এবং তার উত্তরে তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহা উপস্থিত নাগরিকদের শুনাইলেন। তারা খলিফার জবাবের সমর্থন করিল। তারপর তিনি ঘোষণা করিলেন, 'এখন হইতে আরবের মধ্যে যে যেখানে বাস করে, তাহার প্রাপ্য গণিমতের অংশ সেইখানেই পাঠাইয়া দেওয়া হউক, যাহাতে বহিরাগত লোকদের শহরে থাকিয়া যাইতে না হয়। সামরিক বাহিনীর লোক ছাড়া অন্য যাদের সেখানে বাস করা একান্ত প্রয়োজন, শুধু তারা সেখানে বাস করিবে।' মদিনার লোকেরা খলিফার এই নুতন নির্দেশ শুনিয়া বিস্মিত হইল। কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করিল, 'গণিমত স্বরূপ যাহারা ভূমি লাভ করিবে, তাহাদের উহা কি ভাবে পৌঁছাইয়া দেওয়া হইবে?' ইহার উত্তরে খলিফা বলিলেন, 'হিজাযের চাষি যাদের নিকট সম্ভব, জমি খরিদ করা হইবে।' খলিফার এই উত্তরে মদিনার বিত্তশালী লোকেরা খুব খুশি হইল। কেন না, তারা বুঝিল, এ যাবৎ জমির খরিদ-বিক্রয়ে যে ধারা বলবৎ ছিল, এইবার নিশ্চিতরূপে তার অবসান হইল।
হজরত উমর বিশিষ্ট সাহাবিগণকে মদিনার সীমানার ভিতর বাস করিতে বাধ্য করেছিলেন এবং জরুরি কারণ ছাড়া কেহ রাজধানী ছাড়িয়া অন্যত্র গিয়া বাস করুক, ইহা চাহিতেন না। এইসব লোক ছিলেন খলিফার উপদেষ্টা ও শক্তির উৎস এবং রাষ্ট্রের পক্ষে স্তম্ভস্বরূপ। তিনি জানিতেন, ইঁহারা রাজধানী ছাড়িয়া দূরে গিয়া বাস করিলে নতুন রাষ্ট্রের পক্ষে তাহা ক্ষতিকর হইবে। এই সমস্ত লোকের ব্যক্তিত্বের প্রভাব ছিল অতিশয় মূল্যবান। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাড়া সামাজিক কল্যাণের দিক দিয়াও নবীর এইসব সহচরের চারিত্রিক আদর্শ অপরিসীম তাৎপর্য বহন করিত। প্রাক-ইসলামি যুগে আবস্থাপন্ন আরবরা, বিশেষ করিয়া মক্কার কোরাইশগণ বিলাসিতায় নিমজ্জিত ছিল। ইসলাম গ্রহণের পর তারা অনেকেই মদিনায় চলিয়া আসে। ইসলাম তাহাদের শরীয়তের অধীনে আনিয়া নিয়মতান্ত্রি জীবনযাপনে বাধ্য করেছিল। সাহাবিদের জীবনধারা তাহাদের প্রেরণা দিত। অন্যথা তারা হয়ত পুনরায় পৌত্তলিক যুগের জীবনধারায় প্রত্যাবর্তন করিত। তিনি কোরাইশদের ভিতরই লালিত হয়েছিলেন। কাজেই কোরাইশদের নাড়ি নক্ষত্রের খবর তিনি ভালো করিয়াই জানিতেন। হাসান বসরীর একটি উক্তি অবলম্বনে ঐতিহাসিক তাবারি লিখিয়াছেন, হজরত উমর যে বিশিষ্ট সাহাবিদের মদিনা ছাড়িয়া অন্যত্র বসবাস করার অনুমতি দিতেন না, এবং বিশেষ ক্ষেত্রে অনুমতি দিলেও তাহা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দিতেন, সেজন্য সাহাবিদের ভিতর হইতে প্রতিবাদ উঠিয়াছিল। এ সংবাদ হজরত উমরের গোচরীভূত হইলে তিনি দাঁড়াইয়া ওঠেন এবং সাহাবিদের সম্বোধন করিয়া বলেন, "দেখ, আমি ইসলামের জন্য উটের ন্যায় মঞ্জিল নির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছি। তার এক বয়সে এক এক অবস্থা হয়। হ্যাঁ, শুনিয়া রাখ, ইসলামের এখন অবোরোধের যুগ।' হজরত উমরের সময় ইসলামি শিক্ষা ও তমদ্দুনের বয়স ছিল অল্প। নাজুক বয়সে বাহিরের সংস্পর্শ যে তার পক্ষে ক্ষতিকর ছিল, তাতে সন্দেহ নাই।
হজরত উমরের এই প্রকার কড়াকড়িতে মদিনায় সাহাবিগণ যখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠিয়াছিলেন, এমন সময় হজরত উমরের ইন্তিকাল হয়। মৃত্যুর পূর্বে একদিন তিনি সাহাবিদের সম্বোধন করিয়া বলিয়াছিলেন, 'তোমাদের বিভিন্ন স্থানে ছড়াইয়া পড়ার ভিতর আমি রাষ্ট্র ও কওমের পক্ষে ভীষণ বিপদের আশঙ্কা করিতেছি।'
হজরত ওসমান দীর্ঘকাল হজরত উমরের এইসব নীতি মানিয়া চলেন। কিন্তু রাজত্বের অষ্টম বর্ষে তিনি কুফার গভর্নর সাঈদের পূর্বোক্ত পত্র পাইয়া বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি দেখিলেন, নাগরিক সভ্যতার শুচিতা রক্ষা, যাহা হজরত উমরের কাম্য ছিল, তাহা আর সম্ভবপর হইতেছে না। শহরের লোকদের গ্রামে গিয়া বসবাস করিতে না দিলেও, গ্রামীণ লোকেরাই শহরে চলিয়া আসিতেছে এবং শহরের শালীনতা বিনষ্ট করছে। সেক্ষেত্রে শহরের লোকদের ঠেকাইয়া রাখা নিরর্থক, বরং গ্রামীণ লোকেরা যাহাতে শহরে আসিয়া বাস করিতে উৎসাহিত না হয়, সেই চেষ্টাই অধিকতর প্রয়োজনীয়। তদনুসারে তিনি জমি স্থানান্তরে যাইয়া বাড়িঘর নির্মাণ করিতে ও বসতি করিতেও অনুমতি দিয়াছিলেন। শহর হইতে দূরে কেহ জমি খরিদ করিলে তাহার পক্ষে সেখানে গিয়া বাস করাও দরকার।
হজরত উমরের সম্মুখে এই পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল না। তখন গ্রামীণ লোকেরা একটা শহরমুখীন হয় নাই। তিনি গ্রামীণ লোকদের, বিশেষ করিয়া কৃষক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার জন্যই কৃষিজমির হস্তান্তর নিষিদ্ধ করেছিলেন। তিনি পরিষ্কারভাবে বুঝিতে পারেন, রাষ্ট্রের সম্পদ ও স্থায়িত্ব বিশেষভাবে নির্ভর করে কৃষির উন্নতির উপর। তাই তিনি বিজিত প্রদেশসমূহেও ঐ একই নীতির প্রবর্তন করেন এবং কৃষকদের ভূমি-বিক্রয় নিষিদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ী আরব জাতির উপরও এই নির্দেশ দেন, আরবের কোনো ব্যক্তি বিজিত প্রদেশে জমি খরিদ করিতে পারিবে না। বিজিত প্রদেশে কৃষির উন্নতির জন্য তিনি আরও নানা ব্যবস্থা অবলম্বন করেন। তার ফলে কৃষকরা তাদের জমি জমা হইতে উৎখাত হইত না, বরং উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির পথে অগ্রসর হইত।
হজরত উমর যে আরবদের বিজিত প্রদেশে গিয়া জমি খরিদ করিতে ও বসবাস করিতে নিষেধ করেছিলেন, তার ভিতর হয়ত তাঁর আরও একটি উদ্দেশ্য নিহিত ছিল। তিনি চাহিতেন না যে আরবরা, যাহারা সবেমাত্র এক মার্জিত বিশ্বাস ও উন্নত সভ্যতার অধিকারী হয়েছে, এক্ষণে আরবের বাহিরে বিজিত জাতিসমূহের ভিতর মিশিয়া গিয়া আপনাদের স্বাতন্ত্র্য হারাইয়া বসুক। কিন্তু এই একই প্রশ্ন হজরত ওসমান নিরীক্ষণ করেন অপর এক দৃষ্টিকোণ হইতে। রাষ্ট্রের অপ্রত্যাশিত বিস্তৃতির ফলে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন ঘটিতেছিল। যে স্রোতের মুখে বাধ্য হয়ে হজরত ওসমানকে তাঁর পূর্ববর্তী খলিফার অনুসৃত নীতি হইতে কিয়ৎ পরিমাণে সরিয়া দাঁড়াইতে হয়েছিল। হিজরি ৩৩ সনে তিনি ভূমির খরিদ-বিক্রয় সম্পর্কে অচল অবস্থার নিরসন করিলেন। ধনী ব্যক্তিরা ইহার পর জমির সন্ধানে ধাবিত হইলেন এবং যে যেখানে জমি খরিদ করিয়া সঞ্চিত অর্থের সদ্ব্যবহার করিতে লাগিলেন। কথিত আছে, পরবর্তী এক বৎসর ব্যাপিয়া এই খরিদ-বিক্রয়ের ধুম চলিয়াছিল। বড় বড় ব্যবসায়ী ও ধনপতিরা রাতারাতি জমিদার বনিয়া গেলেন। উচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মচারীরা খলিফা হইতে ভূমি-পুরস্কার লাভ করিয়া জায়গিরদার হয়ে গেলেন। এইভাবে অতি অল্প সময়ের বিতর মুসলিম-রাষ্ট্রে বহু জমিদার ও জায়গিরদারদের উদ্ভব হইল।
ইহার পর এক নতুন সমস্যা দেখা দিল। ভূমি-মালিকগণ প্রথমত: এলোমেলোভাবে নানা স্থানে জমি খরিদ করেছিলেন। কিন্তু সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ লইয়া অসুবিধা হইতেছিল। তাঁরা চাহিলেন এক প্রদেশের জমির সহিত অন্য প্রদেশের জমির এওয়ায দ্বারা যতটা সম্ভব জমিগুলো একত্রিত করিতে। নিজের জন্মস্থানে আপন জনগণের ভিতর বাস করিতে চাওয়া প্রত্যেকের পক্ষেই স্বাভাবিক। তাই ইয়েমেনের লোক চাহিল, তাহার মিসরের জমি বদল করিয়া ইয়েমেনে জমি লাভ করিতে। ইরাকের লোক চাহিল তাহার হিজাজের জমি বিক্রয় করিয়া ইরাকে জমি খরিদ করিতে। এইরূপ সর্বত্র। খলিফা তাদের অসুবিধার কথা বিবেচনা করিয়া এই প্রকার ভূমি এওয়াযের বন্দোবস্ত অনুমোদন করিলেন। প্রখ্যাত সাহাবি তালহা একজন বিরাট ব্যবসায়ী ছিলেন। কথিত আছে, তিনি তাঁর হিজাযের জমি হজরত ওসমানের নিকট বিক্রয় করেন এবং হজরত ওসমানের নিকট হইতে তাঁর ইরাকের জমি খরিদ করেন। হজরত ওসমান মনে করিতেন, এই প্রকার এওয়ায দ্বারা জনসাধারণ নিজ নিজ গ্রামে বাস করিতে আগ্রহশীল হইবে এবং শহরে তাদের হিজরত করার হিড়িক কমিয়া যাইবে। কিন্তু আসলে তাহা হয় নাই। পক্ষান্তরে বড় বড় ধনপতিদের পক্ষে ছোট ছোট ভূ-মালিকদের সম্পত্তি খরিদ করিয়া অধিক বড় হওয়ার সুযোগ প্রসারিত হয়েছিল। অনেকে আবার অনুর্বর জমি বিক্রয় করিয়া ভিন্নস্থানে উর্বর জমি আহরণ করিল। তালহা, যুবাইর, মারওয়ান প্রমুখ সকলেই বিস্তর ভূ-সম্পত্তির মালিক হইলেন। এইভাবে ভূমিহারা মজুরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইল। অপর দিকে বড় বড় জমিদার ও জায়গিরদারদের জমি চাষ-আবাদ উপলক্ষ্যে বহু গরীব প্রজা ও আজাদ দাসদাসীর কর্মসংস্থান হইল। এইভাবে সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্রে লোকদের জীবনধারায় এক আমূল পরিবর্তন নামিয়া আসিল। মক্কা, মদিনা, তায়েফ, বসরা প্রভৃতি সমৃদ্ধ শহরে বহুসংখ্যক পুঁজিপতি, আমির ও জমিদার সৃষ্ট হওয়ায় নতুন এক অভিজাত শ্রেণি গড়িয়া উঠিল। ইহারা মজুর খাটাইয়া খামার চালাইতেন, প্রজাদের নিকট হইতে কর পাইতেন এবং নিজেরা আমোদ-প্রমোদ ও বিলাসিতায় মজিয়া থাকতেন। কিন্তু ও অবকাশ হইতেই সৌখিনতার স্পৃহা জাগে। তার আনুসঙ্গিক নাচগান ও খেলার আসর অভিজাতবর্গের শুধু চিত্ত বিনোদন করিত না, তাদের ভিতর প্রতিযোগিতা বাড়াইত এবং খরচের বহর বৃদ্ধি করিত। যাহারা তাদের তাবেদারি করিত এবং আমোদ-প্রমোদের সরঞ্জাম জোগাইত তাদেরও সংখ্যা দিন দিন বাড়িতে থাকে এবং তাদের দ্বারা সমাজে এক নতুন শ্রেণির পত্তন হয়।
হজরত ওসমান সামরিক কর্মচারীদের জায়গির মঞ্জুর করিয়া অনুমতি দেন, তাঁর ইচ্ছা করিলে নিজ নিজ জায়গির এলাকার ভিতর বসবাস করিয়া সেনাবাহিনী ও প্রজাপুঞ্জ উভয় শ্রেণির কল্যাণজনক প্রভাব বিস্তার করিতে পারিবেন। বিজিত প্রদেশেও তাঁহাদের জায়গির লাভে বাধা ছিল না। ইহার ফলে কি আরব ভূখণ্ডে, কি বিজিত প্রদেশসমূহে, সর্বত্র জমিদারি ও জায়গিরদারী প্রথা বিস্তার লাভ করিল।
ইতিহাস দেখা যায়, ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের সময় নবী অথবা তাঁর মহান প্রতিনিধি হজরত উমর উহা ইচ্ছা করেন নাই যে প্রজারা তাদের জমিগুলো ভাগ বণ্টন দ্বারা খণ্ড বিখণ্ড করিয়া নিঃস্ব হয়ে পড়ুক। ভাগ বণ্টন দ্বারা কখনও কোনো পরিবার উন্নত হয় না বরং উহা দারিদ্র্যের কারণ হয়ে পড়ে। হজরত উমর মদিনাবাসীদের জমির বণ্টন, বিক্রি, এমন কি, ওয়াকফ্ দ্বারা হস্তান্তরও নিষিদ্ধ করেছিলেন বলিয়া উল্লেখিত আছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি হইতে তিনি বিজিত প্রদেশসমূহেও 'সাধারণের ব্যবহার্য' জমিগুলো (Public lands) বিজয়ী সৈনিকদের ভিতর বিলি না করে 'সরকারি খাস' হিসেবে পৃথক রাখিতেন। এইসব জমির আয় হইতে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বাদে যাহা উদ্বৃত্ত থাকিত শুধু সেই উদ্বৃত্ত আয়টুকু ন্যায্য প্রাপকদের ভিতর অংশমতো ভাগ করিয়া দিতেন। কিন্তু হজরত ওসমানের আমলে এই ব্যবস্থা অনুসৃত হয় নাই। তিনি তাঁর আত্মীয় ও গোত্রীয় লোকদের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা মিটাইবার জন্য সরকারি-খাস হিসেবে 'রক্ষিত ভূমিও' তাদের ভিতর বিতরণ করিতেন বলিয়া উল্লেখ আছে। কথিত আছে, সিরিয়ার সমুদয় খাস জমি এবং ইরাকের খাস জমিরও কিছু অংশ আমির মু'য়াবিয়াকে দেওয়া হয়েছিল। চ্যালডিয়ার অন্তর্গত সোয়াত এলাকার ভূমি অতিশয় উর্বরা। হজরত উমর উহা সরকারের 'পবিত্র আমানত' হিসেবে সুরক্ষিত রাখেন। কিন্তু হজরত ওসমান আত্মীয়দের অনুরোধ ফেলিতে না পরিয়া উহাও তাঁর এক নিকট আত্মীয়কে দান করেন। সামরিক কর্মচারীদের তাদের বিজিত এলাকায় জায়গির দান তাঁর সময়েই প্রথম শুরু হয়। বিজিত প্রজাদের পক্ষে সামরিক জায়গিরদাররা যে সর্বাপেক্ষা বিপজ্জনক মনিব তাহা বলাই বাহুল্য। হজরত ওসমান কর্তৃক সাহাবিদের মদিনা হইতে স্থানান্তরে বাসের অনুমতি দানও ছিল একটি বিপদজনক পদক্ষেপ। ইহার ফলে কেন্দ্রীয় সরকার শক্তিশালী জননায়কদের সহযোগিতা হারাইয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ হজরত ওসমানের বিশেষ অনুগৃহীত সাহাবি তাল্ল্হা ও সুবাইরের কথা উল্লেখ করা যাইতে পারে। হজরত ওসমানের চরম দুর্দিনে ও বিদ্রোহী প্রজাদের বিরুদ্ধে তাঁরা কেহ অস্ত্র ধারণ করেন নাই। তাল্ল্হা ইরাকে বিস্তীর্ণ জমিদারি অর্জন করিয়াছেন। তিনি অধিকাংশ সময় বিদেশে তাঁর বাণিজ্যিক কাফেলার সঙ্গে অথবা ইরাকে কাটাইতেন। জুবাইর ছিলেন মক্কার প্রসিদ্ধ ধনী ও সওদাগর। কুফা, বসরা ও মিসরে তাঁর বিপুল সম্পত্তি ছিল। হিজাযের জমি অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট বিধায় তিনি হিজাজের জমির সহিত ঐসব সম্পত্তির এওয়ায করেন নাই। নবীর আমল হইতে বরাবর তিনি মদিনায় থাকতেন। হজরত ওসমানের আমলে তিনি মক্কায় চলিয়া যান এবং সেখান হইতে তাঁর ইরাক ও মিসরস্থিত জমিদারির তত্ত্বধান করিতে থাকেন।
হজরত ওসমানের ভূমি বিলিসংক্রান্ত নতুন ব্যবস্থার ফলে মুসলিম রাষ্ট্রে যে অর্থনৈতিক বিপ্লব সংগঠিত হয়, তিনি তার শেষ পরিণতি দেখিয়া যাইতে পারেন নাই। হিজরি ৩৩ সনে এই বিপ্লবের সূচনা হয় এবং ইহার দুই বৎসর পরে তিনি নিহত হন। কিন্তু একথা সত্য, তিনি যে ফল আশা করেছিলেন তাহা ফলে নাই। শহরের নিম্ন শ্রেণির লোকদের হিজরত বন্ধ হয় নাই। যাযাবর-বেদুইন ও গ্রাম্য আরবেরা পূর্বের ন্যায়ই রাজধানীর আসিত যুদ্ধে অংশ গ্রহণের আশায়। যুদ্ধের প্রয়োজন তখনও মিটে নাই। গণিতের লোভ পূর্বের মতোই লোকদের আকর্ষণ করিত। তাহা ছাড়া নবসৃষ্ট রইস শ্রেণির গৃহে কর্ম সংস্থানের আশায়ও দলে দলে গরিব লোক গ্রাম ছাড়িয়া শহরে আসিত। রাইসদের একটি বিত্তশালী দল প্রাদেশিক ভূমির মালিক হয়ে পড়ায় তাদের মাধ্যমে ইসলামের সূচনাতেই সেই ধরনের বিলাসিতার ইহাতে অনুপ্রবেশ ঘটে, যাহা একদা বিরাট রোমক সাম্রাজ্যের ধ্বংসের কারণ হয়েছিল।

টিকাঃ
১. ডক্টর তোহা হোসেন মিসরি প্রণীত হজরত ওসমানের মৌলানা নুরুদ্দীন আহমদ কৃত অনুবাদের ৫১ পৃষ্ঠা।
২. ডক্টর তোহা হোসেন মিসরি প্রণীত হজরত ওসমানের মৌলানা নুরুদ্দীন আহমদ কৃত অনুবাদের ৫৪ পৃষ্ঠা।
৩. 'With a farsightedness often Wanting in rulers of later times he perceived that, the stability of the empire and its mater ial development depended upon the prosperity of the agricultural classes. To secure that object he forbade the sale of holdings and agricultural lands in the conquered ciuntries. As a farther protection against encroachment on the part of the Arabs. He ordained theat no Saracen should acquire land from the natives of the soil. The peasantry and land-owners were thus doubly protected form eviction. In making these rules he was probably also actuated by a motive to keep the Arab race distinct from. And prominent aming the people and communities among whom they settled a motive which is by no means infrequent in history, either ancient of modern' -History of the Saracens. pp 57.
8. The subdivision of landed property was never within the contemplation of the prophet or his great lieutenant Omar. for it involved the eventual pauperistion of families. As a safeguard against this eventeality, the lands of the Medinites were protected from subdivision & alienation by entaliment (wakf): and with this same object. the public lands in the conquered countries. instead of being pareciled among the solders, were held by the State. and the income only. after defraying the charges. was distributed among the people entitled to it Unfortunately, under Osman, there was a complete reversal of the main features of his great predecessor's policy. He not only removed the efficient and capable governors whom Omar had placed in change of the provinces. but in order to gratify the grasping demends of his kinsmen. made a new distribution of the appointments. The State domains which were public property, were granted by his ill advised Caliph to his relations, In this way Muawiyah obtained all the public lands in Syria, and in part of Mesoptamia. The Sawad which was sacredly reserved by Omar for the purpose of the State, was given to another kinsman. The State Treasury which was a public Trust under Abu Baker and Omar was emptied from time after time for these unworthy favourities and the wealth of the provinces went to enrich the Ommeyads, and to help them in preparing for the struggle for power. Osman had withdrawn the privileges which ſad been granted to Non-Muslims and introduced various harsh rules in direct opposition to those of this predecessors. He allowed the sale of land was the first to create military fiefs. -History of the Saracens Syed Ameer Ali. pp 59-60.

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 জমিদার ও জায়গিরদারি প্রথার প্রতিক্রিয়া

📄 জমিদার ও জায়গিরদারি প্রথার প্রতিক্রিয়া


যে সব ধনী ব্যক্তি ও সামরিক কর্মচারী হজরত ওসমানের আনুকূল্যে আরবের কৃষকদের জমি ক্রয় করিয়া রাতারাতি জমিদার অথবা জায়গিরদার বনিয়া গেলেন তাঁরা নিজেরা কৃষি জানিতেন না। স্থানীয় চাষিদের ভিতর ঐ সব জমি বিলি করিয়া তাঁরা কর আদায় করিতেন। এইভাবে মুসলিম রাষ্ট্রের অধিবাসীদের ভিতর দুইটি বিশিষ্ট সামাজিক শ্রেণির উৎপত্তি হইল। এক, আভিজাত্য গর্বিত মালিক সম্প্রদায়; দ্বিতীয়, মালিকদের অধিনস্থ নির্যাতিত ও পদানত প্রজাশ্রেণী। ইসলামি সাম্য-নীতিতে এই প্রকার বৈষম্য অনুমোদিত নহে। কাজেই সমাজে একটা সংঘাত আসন্ন হয়ে উঠিল।
ধনী ব্যবসায়ী ও ভূমি মালিকদের তদানীন্তন জীবন ধারা এই সংঘাতের দিকেই ইন্ধন জোগাইতেছিল। কারণ, আরব জাতি বিগত কয়েক বৎসরের ভিতর পার্শ্ববর্তী কতিপয় পুরাতন সত্য জাতির সংস্রবে আসিয়া ঐসব জাতির জীবন ধারার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল। বিশ বৎসর আগেও যারা মাটির ঘরে অর্ধাহারে দিন কাটাইত, আজ তারা বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী। এই নতুন সৌভাগ্যের আত্মগরিমা তাদের ভিতর না আসিবে কেন? চির বুভুক্ষু জাতির সম্মুখে আজ সর্ববিধ ভোগের পথ উন্মুক্ত। তাই যাদের সামর্থ্যে কুলাইত তারা নিজ নিজ জমিদারির ভিতর পারসিক অথবা রোমক সামন্ত রাজাদের অনুকরণে জীবনযাপন করিতে প্রলুব্ধ হয়েছিল। তারা বিস্তর দাসদাসী, প্রজা এবং কর্মচারী দ্বারা পরিবৃত হয়ে বাস করিতে গৌরব বোধ করিত। এইসব ভাগ্যবান ব্যক্তির স্তাবক, মোসাহেব ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত খেদমতগারেরও অভাব হইত না। কেননা, স্তুতি ও খেদমত দ্বারাই অপদার্থ লোকেরা সুখে স্বাচ্ছন্দে দিন গুজরান করিয়া থাকে। অনেকে আবার অনাহুত হিতৈষী অথবা প্রমোদ-সহচর হিসেবেও ধনী ব্যক্তিদের দস্তরখানায় নিত্যকার শরীক হওয়ায় সৌভাগ্য লাভ করিত।
এইসব কারণে আরব জমিদার ও জায়গিরদারদের অর্থের প্রয়োজন লাগিয়াই থাকিত। সেইহেতু তাঁরা প্রজাদের উপর শোষণ চালাইতেন নির্মম ভাবে। ইহার ফলে প্রজাগণ ক্রমে নিঃস্ব মজুর শ্রেণিতে পরিণত হইতে থাকে। আর ভূ-স্বামিগণ তাহাদের উৎখাত করিয়া উত্তরোত্তর বড় হইতে থাকে। এই বিভেদ পরবর্তীকালে কখনও মুছিয়া যায় নাই বরং ক্রমেই স্পষ্টতর হয়েছে। অথচ এইরূপ একটা পরিস্থিতির যাহাতে উদ্ভব না হইতে পারে সে উদ্দেশ্যেই হজরত উমর তাঁর শাসননীতি প্রণয়নের সময় অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন। তাঁর জীবনে স্বপ্ন ছিল, গোটা আরব জাতিকে এক অখণ্ড মানব-গোষ্ঠীরূপে একত্রে গ্রথিত করা এবং বিজিত জাতিসমূহের ক্লেদাক্ত সভ্যতার ক্ষয়কর ছোঁয়াচ হইতে বাঁচাইয়া উহাতে অনন্য গৌরবে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু সে সমস্তই এখন শূন্যে বিলীন হইতে চলিল। প্রতিপত্তিশালী আরব নাগরিকগণ বিভিন্ন এলাকায় ছড়াইয়া অধঃপতিত বিজিত জাতিসমূহের সহিত তাঁহাদের ঘনিষ্ঠভাবে সংমিশ্রণের দরুণ বিজাতীয় সভ্যতার কলুষরাশি ইসলামি-সভ্যতার কোরকের ভিতর প্রবেশ করিতে পারে এই চিন্তা করিয়া হজরত উমর সাহাবিদের প্রতি সতর্কবাণী উচ্চারণ করিয়া বলিয়াছিলেন 'তোমাদের বিভিন্ন স্থানে ছড়াইয়া পড়ার ভিতর আমি রাষ্ট্র ও কওমের জন্য বিশেষ অমঙ্গল আশঙ্কা করিতেছি।" হজরত ওসমানের ইহা না জানার কথা নয়। কিন্তু যুগের বিবর্তনের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি কে রোধ করিতে পারে। হজরত ওসমানেরও তাহা করিবার ক্ষমতা ছিল না।
হজরত উমর পরলোকগত হইলেও নবীর আমলের প্রবীণ সাহাবিদের ভিতর তখনও যাঁরা জীবিত ছিলেন, তাঁরা যখন দেখিলেন, যে সাম্য ও মানবতার বাণী লইয়া নবী দুনিয়ায় আবির্ভূত হয়েছিলেন, দুঃস্থের অশ্রুমোচন এবং ধনীকে কিঞ্চিত খাটো করিয়া ও দরিদ্রকে কিঞ্চিৎ উন্নত করিয়া আর্থিক দিক দিয়া উভয়কে কাছাকাছি সংস্থাপন ছিল যাঁহার মূল নীতি, নবীর সেই মহান উদ্দেশ্য ক্ষুণ্ণ হইতে চলিয়াছে এবং লক্ষ লক্ষ নির্যাতিত নরনারীর রুদ্ধ হাহাকার আকাশে-বাতাসে কাঁপন জাগিয়াছে, তখন সেই সব সাহাবির অন্তর ব্যথিত হয়েছিল। তাঁরা প্রতিবাদ-মুখর হয়ে উঠিলেন। হজরত ওসমানও হয়ত এই নিদারুণ পরিস্থিতির আশা করেন নাই; কিন্তু মসজিদে নববীর মিম্বরে দাঁড়াইয়া তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করিলেন, যার ভিতর প্রজাদের স্বত্ত্ব হস্তান্তরের অধিকার স্বীকৃত হয়েছিল, তাহা হইতে তিনি আর পিছাইতে পারিলেন না। শক্তিশালী উমাইয়াগণ এবং তাদেরই মতো বিষয়াসক্ত অন্যান্য কোরাইশগণ তাঁর কণ্ঠরোধ করিয়া দাঁড়াইয়াছিল। আর, তাদেরই পক্ষভুক্ত ছিলেন তাঁর কুচক্রী মন্ত্রী মারওয়ান, তিনি সর্বদা তাঁকে নিজের পাখার দ্বারা ঘিরিয়া রাখিতে চেষ্টা করিতেন।
অধিকন্তু, ইহাও অস্বীকার করা চলে না যে, মুসলিম জাতির জীবনধারায় তখন যে বিরাট পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তাতে জনগণের ভিতর মতামত ও দাবি-দাওয়ার প্রশ্নের বিরোধ ও সংঘাত স্বাভাবিক ভাবেই আসন্ন হয়েছিল। বিগত বিশ বৎসর আরব জাতি যুদ্ধরত সেনানীরূপে, বিজিত প্রদেশের শাসক রূপে, অথবা ব্যবসায়ী সওদাগর রূপে, পৃথিবীর নানা জাতির সহিত মিশিয়াছে, নানা দেশের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়াছে এবং নানা বিচিত্র সভ্যতার সংস্পর্শে আসিয়াছে। এখন আর তারা একটি মাত্র বাঁধাধরা পথে চলিতে চাহে না। নতুন-পুরাতনের সংমিশ্রণে তারা এক অভিনব জীবন ধারার প্রবর্তনে উদ্যত হয়েছিল। ইহার ফলে মুসলিম শাসকদের নিত্য নতুন সমস্যার সম্মুখীন হইতে হয়েছিল। কিন্তু শরীয়তের একনিষ্ঠ সমর্থক পুরাতন সাহাবিগণ, যাঁরা কুরআন, সুন্নাহ এবং পূর্বতন দুই খলিফার শাসননীতির আদর্শকে দৃঢ় হস্তে আঁকড়িয়ে ধরিয়া ছিলেন, তাঁরা এই নতুন পরিস্থিতির জটিলতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করিতেন বলিয়া মনে হয় না। তাঁহাদের মতে, ন্যায়ের ভিত্তিতে, হজরত উমরের মতো কঠোর হস্তে সকল বিরোধের মূল উৎপাটন এবং সকল শ্রেণির প্রজার দাবি-দাওয়ার নিষ্পত্তিই ছিল যাবতীয় সমস্যা সমাধানের উৎকৃষ্ট পন্থা।

টিকাঃ
5. For the first time now. the sons of barren Arabia came into direct contact with luxuries and comforts. The royal place with its spacious audience chamber, granceful arches and sumptuous furnishings and decorations presented a sharp cotrasi to the mud hises of the peninsula. --The Arabs (A short History by P.K. HItti pp. 50
6. 'During the thirty years that the Republic lasted, the policy derived its character chiefly from Omar, both during his life time and after his death. His policy was to consolidate Arabia and to fuse the Arab tribes into a Nation. Forced by circumstances to moderate foreign conquests. he was anxious thet the Saracens should not in the foreign settlements lose their nationality or merge with the people of other lands.' -History of the Saracens Syed Ameer Ali. pp 57.

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 আবুজর গিফারি

📄 আবুজর গিফারি


হজরত ওসমানের বল্গাহীন রাজস্ব-নীতির বিরুদ্ধে যে-সব সাহাবি তুমুল প্রতিবাদ তুলিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে হজরত আবু জর গিফারীর নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি কেনানগোত্রের লোক ছিলেন। প্রাক-ইসলামি অন্ধকার যুগে তাঁর জন্ম হয়। তিনি সেইসব লোকের একজন ছিলেন, যাহারা সে যুগেও আরব জাতির আমোদ-উল্লাস হইতে দুরে থাকতেন এবং সত্যের সন্ধানের জন্য চিন্তামগ্ন থাকতেন। বাল্যজীবন হইতে আবু জর সংসার-বিরাগী ছিলেন। প্রাপ্ত বয়সে তিনি একবার মক্কায় আসিয়া হজরত রাসুল্লাহ্র বাণী শুনিতে পান এবং তাতে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। নবীর হিজরত যুগে তিনিও মদিনায় চলিয়া যান এবং হজরত রাসুলের সাহচর্য লাভ করেন। প্রাথমিক মুসলমান ও বিশ্বস্ত অনুচর হিসাবে তিনি অতিশয় প্রিয়পাত্র ছিলেন। নবী আদর করিয়া বলিতেন, দুনিয়ায় আবু জরের চাইতে সাচ্চা আমি কাউকে দেখি না। হজরত আবুবকর হজরত উমর এবং হজরত ওসমানের রাজত্বের প্রথম কয়েক বৎসর পর্যন্ত তিনি মদিনায় ছিলেন। তারপর তাঁর জীবনে অনেক মুসিবৎ নামিয়া আসে এবং তিনি দেশান্তরী হন। সাধক হিসাবে তিনি যতটা প্রসিদ্ধি অর্জন করেন, তার চাইতে বেশি প্রসিদ্ধ ছিলেন তিনি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলনের অগ্রদূত হিসাবে। তিনি ছিলেন মজলুম মানুষদের দরদী বন্ধু। তাদের ব্যথায় ব্যথিত হয়ে তিনি হজরত ওসমানের রাজস্ব ও অর্থনীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেন।' একদিন তিনি দেখিতে পান খলিফা মারওয়ানকে অনেক অর্থ দিতেছেন এবং' তাঁর ভাই হারিস বিন আবি হাকামকে তিন লাখ ও জায়েদ বিন সাবেত আনসারীকে এক লাখ দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) দান করছেন। আবু জরের নিকট ইহা অসঙ্গত ও আপত্তিজনক মনে হয়েছিল। তিনি বলিয়াছিলেন; 'ধন-সঞ্চয়কারীদের আগুনের সুসংবাদ দাও।' ইহার পর তিনি এই সম্পর্কে অবতীর্ণ কুরআনের আয়াত পাঠ করেন। মারওয়ান ইহাতে কূপিত হয়ে খলিফার নিকট আবু জরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। হজরত ওসমান আবু জরের নিকট তাঁর এক ভৃত্যকে পাঠাইয়া আবু জরকে এইসব কথা বলিতে নিষেধ করেন। আবু জর তাতে উত্তর করেন, 'আল্লাহর কুরআন পাঠ করিতে এবং আল্লাহর হুকুমের না-ফরমানদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিতে হজরত ওসমান আমাকে নিষেধ করছেন। তাঁকে বলিও, খলিফাকে সন্তুষ্ট করার চাইতে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করাই আমার নিকট অধিক প্রিয়।' হজরত ওসমান এবার সহ্য করিয়া গেলেন, কিন্তু আবু জর তাঁর প্রতিবাদ হইতে নিবৃত্ত হইলেন না। তিনি ধন-লিঙ্গুদের বিরুদ্ধে জোরের সহিত প্রচার কার্য চালাইতে লাগিলেন।
কথিত আছে, একদিন আবুজর হজরত ওসমানের নিকট বসিয়াছিলেন। সে সময় ইহুদি বংশীয় কবি আবদুল্লাহ বিন আহানও সেখানে উপস্থিত ছিল। হজরত ওসমান তাঁকে জিজ্ঞাসা করিলেন, খলিফার পক্ষে 'বায়তুল মাল' হইতে কর্জ গ্রহণ বৈধ কি না। উত্তরে আবদুল্লাহ্ বিন আহান বলেন, 'আমি তো মনে করি ইহাতে অন্যায় কিছু নাই' ইহাতে কবির সহিত আবু জরের বিতণ্ডা হয় এবং আবু জর রাগান্বিত হয়ে বলেন, 'ইহুদি সন্তান; তুমি আমাকে 'দীন' শিক্ষা দিতেছ?' হজরত ওসমান এই ব্যাপারে আবু জরের প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট হন এবং তাঁকে সিরিয়ায় চলিয়া যাইতে বলেন।
রাবীরা আরও নানা ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন। যাহা হউক হজরত আবু জর ইহার পর সিরিয়ায় চলিয়া যান। কিন্তু সেখানেও তাঁর জীবন শান্তিময় হয় নাই, কারণ ধনশালীদের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ তিনি ক্ষান্ত করেন নাই। সেই কারণে তত্রতা গভর্নর মু'য়াবিয়া তাঁকে রাষ্ট্রের পক্ষে বিপদজনক ব্যক্তি বলিয়া মনে করেন এবং খলিফার নিকট তাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রেরণ করেন। খলিফা উত্তরে আবু জরকে পুনরায় মদিনায় পাঠানোর জন্য মু'য়াবিয়াকে নির্দেশ দেন। মু'য়াবিয়া দামেস্ক গভর্নরের বাসের জন্য বহু অর্থ ব্যয়ে 'খিজরা মহল' (সবুজ প্রাসাদ) নামক অট্টালিকা নির্মাণ করাইয়াছিলেন, আবু জর আপত্তি তুলিয়া বলেন, 'উহা প্রজার অর্থে প্রস্তুত হয়ে থাকিলে সরকারি তহবিলের অপচয় হয়েছে, আর মু'য়াবিয়ার নিজ অর্থে হয়ে থাকিলে উহা অপব্যয় ছাড়া অন্য কিছু নয়। মু'য়াবিয়া ইহাতে ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি ইহাও আশঙ্কা করেছিলেন, আবু জরের এই প্রকার আলোচনা চলিতে থাকিলে ধনী ও দরিদ্রের ভিতর সংঘর্ষ বাধিবে এবং দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লব অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠিবে। মু'য়াবিয়া খলিফার অনুমতি পাওয়া মাত্র আবু জরকে মদিনায় পাঠাইয়া দেন এবং তাঁর পথের সুখ-সুবিধা সম্পর্কে যথেষ্ট তাচ্ছিল্য প্রকাশ করেন।
মদিনায় ফিরিয়া আসিয়া আবু জর পূর্বের ন্যায় ধন-সঞ্চয়ের বিরুদ্ধে প্রচার কার্য চালাইতে লাগিলেন। তিনি বলিতেন, 'ধন সঞ্চয়কারীদের আগুনের সুসংবাদ দাও। তাদের ললাটসমূহে পঞ্জরসমূহে, পৃষ্ঠদেশে জ্বলন্ত অগ্নির শেক দেওয়া হইবে।' তিনি হজরত ওসমানের কার্যাবলী সম্পর্কেও আলোচনা করিতে ছাড়িতেন না। এই হেতুতে যে, তখন বায়তুল মালের ব্যবহার সম্পর্কে পূর্বের কড়াকড়ি হ্রাস পাইয়াছিল, শাসনকার্যে প্রবীণদের স্থলে নবীনদের নিযুক্ত করা হইতেছিল এবং মক্কায় কোরাইশগণ, যাহারা শুধু নিরাপত্তা অর্জনের উদ্দেশ্যে ইসলাম কবুল করেছিল, তারাই সরকারি পদসমূহে বহাল হইতেছিল। এই সব সমালোচনা হজরত ওসমানের পক্ষে অতিশয় যন্ত্রণাদায়ক হয়েছিল। তিনি আবু জরকে মদিনা হইতে চলিয়া যাইতে এবং কুফা, বসরা ও সিরিয়া ছাড়া অন্য যে কোনও যায়গায় গিয়া বাস করিতে নির্দেশ দেন। আবু জর ইহার পর স্বেচ্চায় হউক অথবা খলিফার হুকুমে হউক, 'রেবজাহ' নামক স্থানে চলিয়া যান এবং মৃত্যু পর্যন্ত তথায় থাকিতে বাধ্য হন। তাঁর সংসার এমনই দারিদ্র্য পীড়িত ছিল, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী তাঁর কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করিতেও অপারগ ছিলেন। হজরত ওসমান তাঁর মৃত্যু-সংবাদে ইসলামের রীতি অনুযায়ী তাঁর জন্য মাগফিরাত চাহিয়াছিলেন এবং তাঁর স্ত্রীকে খলিফার পোষ্য-বর্গের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
খলিফার নীতির প্রতি আবুজরের বিরোধিতা পরে রাজনৈতিক রূপ গ্রহণ করায় অবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠে। খলিফার আপত্তিকর কার্যের সমালোচনায় বাধাদান এবং মতবিরোধের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে শাস্তি প্রদান আবু জর গুরুতর অন্যায় বলিয়া মনে করিতেন। সমালোচকগণ তাঁর এই যুক্তিবাদে শাণিত হয়ে উঠে। জাতির নিম্নস্তরের লোকেরা বিপ্লবমুখীন হয়। তাঁর মরুভূমিতে নির্বাসন এবং নির্বাসনে জীবনাবসান, নির্যাতিত জনগণের অন্তরে আঘাত হানিয়াছিল এবং তাঁহাদের বিপ্লবী-স্পৃহাকে উদ্দীপ্ত করিয়া তুলেছিল। কিন্তু আবু জর নিজে কখনও বিদ্রোহের প্ররোচনা দিতেন না। তিনি অন্যায়কে অন্যায় বলিতেন, তার সংশোধনের উদ্দেশ্যে। তাঁর ব্যক্তিগত কোনও মতলব ইহাতে ছিল না। খলিফা যখনই তাঁকে শাস্তি দিয়াছেন তিনি বিনা প্রতিবাদে উহা মানিয়া লইয়াছেন। খলিফার আদেশে তিনি বিনা আপত্তিতে সিরিয়ায় চলিয়া গিয়াছিলেন, আবার তাঁর রেবজাহ যাওয়ার আদেশেরও, তিনি বিরোধিতা করেন নাই। তিনি বলিতেন, শাসনকর্তা গোলাম হইলেও ইসলামে আমার প্রতি তাহার প্রতি আনুগত্যের হুকুম দেওয়া হয়েছে। আবু জরকে কেউ যদি ধ্বংসাত্মক বিরোধিতা চালাইতে অথবা তার নেতৃত্ব করিতে পরামর্শ দিত, তিনি তাহাকে বলিতেন, 'হজরত ওসমান যদি খেজুর গাছের সর্বোচ্চ শাখায় আমাকে শূলবিদ্ধ করেন আমি উহাতে আপত্তি করিব না।' তিনি আনুগত্যের সীমার ভিতর থাকিয়া অর্থাৎ বিদ্রোহ না করিয়া অন্যায়ের বিরোধিতা করিতেন এবং ইহাতে তাঁর অধিকার ছিল বলিয়া তিনি মনে করিতেন। ইহাই ছিল নবী-পরিকল্পিত ইসলামি নাগরিকত্বের প্রকৃত স্বরূপ। হজরত আবু জরের ভিতর তার রূপরেখা ষোলকলায় বিকশিত হয়েছিল। নির্যাতিত মজলুমদের জন্য এই নিঃস্বার্থ সাধকের মহান আত্মত্যাগের তুলনা ইতিহাসে বিরল। হজরত ওসমানের রাজস্ব ও অর্থনীতির সহিত, প্রতিপক্ষ হিসাবে তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।

টিকাঃ
৭. হজরত আবু জরের জীবন-কাহিনি বিচিত্র। তিনি দীর্ঘ সময় নামাজে দাঁড়াইয়া থাকতেন। রাত্রির পর রাত্রি তিনি ইবাদতে কাটাইতেন। তাঁর পত্নী বর্ণনা করিয়াছেন, সারাদিন তিনি নামাজে ও ধ্যানে কাটান এবং রাত্রের বেলায় এত বেশি বন্দেগি করেন, মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। কথিত আছে, তাবুক অভিযানের সময় মুসলমানেরা আর্থিক দিক দিয়া অত্যন্ত বিব্রত হয়ে পড়ে এবং সাহাবিরা যাহার যাহা ছিল সমস্ত সম্পদ এই যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহের জন্য নবীর চরণে সমর্পিত করেন। আবু জরের একটি মাত্র উট ছিল, দরিদ্র সাধক তাহাই লইয়া যুদ্ধযাত্রীদের সামিল হন। কিন্তু উটটি অত্যন্ত কৃশ ও দুর্বল। আবু জর উহা লইয়া সমানে চলিতে না পারিয়া পিছাইয়া পড়েন। লোকেরা বলাবলি করিতে থাকে, হয়ত বেচারা পথের ক্লেশ সহ্য করিতে না পারিয়া পিছন হইতে সরিয়া পড়িয়াছে। হজরত রাসুলের কানে এ কথা গেল। তিনি উহা বিশ্বাস করিলেন না; বলিলেন: 'ও কথা এখন ছাড়ো। সে যদি খালেছ নিয়তে বাহির হয়ে থাকে, আল্লাহ্ অবশ্য তাকে ঠিকমতো এখানে পৌছাইবেন।' আসলে কোনো এক মঞ্জিলে তিনি নামাজ অন্তে ধ্যানস্থ হয়ে পড়েন। ধ্যান ভঙ্গের পর দেখেন, কাফেলা অনেক দূর চলিয়া গিয়াছে। তিনি উটটিকে জোরে চালানোর চেষ্টা করেন কিন্তু তাতে সুবিধা হইল না। উটটি অতি মাত্রায় কৃশ ছিল এই জন্য ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পড়তেছিল। তখন তিনি উটটিকে ফেলিয়া নিজেই যতটা সামান পারিলেন মাথায় লইয়া ছুটিতে লাগিলেন। কাফেলার লোকেরা পাগলের মতো একটা লোককে তাদের পিছনে পিছনে ছুটিতে দেখিয়া সে-দিকে হযরতের দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। কেউ কেউ তাঁকে চিনিতে পারিয়া 'আবু জর' বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল। নবী আগে হইতে বুঝিতে পারিয়াছিলেন, আবু জর না আসিয়া পারে না। তিনি তাঁকে মন খুলিয়া আশীর্বাদ করিলেন।
৮.১. ডক্টর তোয়াহা হোসাইন (মিসরি) প্রণীত হজরত ওসমানের মৌলানা নূরউদ্দীন আহমদ কৃত অনুবাদের ১৯১-৯৬ পৃষ্ঠা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00