📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 পুরাতন গভর্নরদের অপসারণ

📄 পুরাতন গভর্নরদের অপসারণ


মুসলিম রাষ্ট্রে প্রাদেশিক গভর্নরদের পদ নবীর আমলেই সৃষ্ট হয়েছিল। মক্কা ও আরব উপদ্বীপের অন্য যে কয়েকটি অঞ্চল তাঁর আমলে বিজিত হয় সে সমস্ত এলাকার প্রত্যেক প্রধান শহরে তিনি একজন করিয়া শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। তাঁরা নিজ নিজ রাজধানী ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার উপর হকুমাত চালাইতেন।
হজরত উমরের আমলে আরবের বাকি অংশ বিজিত হয় এবং মুসলিম রাষ্ট্রের সীমানা আরব উপদ্বীপের বাহিরে ছড়াইয়া পড়ে। ইরান ও মিসর তাঁর শাসনাধীনে আসে। তখন সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্রকে তিনি কুড়িটি প্রদেশে বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক প্রদেশে একজন করিয়া গভর্নর নিযুক্ত করেন। বড় বড় প্রদেশগুলোর গভর্নরদের আমির বলা হইত, ছোট প্রদেশের গভর্নরকে ওয়ালী বা নায়েব বলা হইত। এই নায়েব হইতেই নওয়াব বা নবাব শব্দের উৎপত্তি। হজরত উমরই মুসলিম রাষ্ট্রের প্রকৃত সংগঠক। তিনি প্রত্যেক গভর্নরের শাসন-এলাকার সীমা নির্দিষ্ট করিয়া দেন যাহাতে প্রান্তিকর্ণ অঞ্চলগুলোর শাসন সংরক্ষণ অবহেলিত না হয়। তিনি বিজিত প্রদেশগুলোর ভূমি জরিপ করাইয়াছিলেন, যাহাতে প্রত্যেক প্রদেশের রাজস্বের পরিমাণ বাস্তব ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজস্ব যাহাতে ঠিকমতো আদায় হয় তদুদ্দেশ্যে তিনি প্রত্যেক গবর্নরের অধীনে একটি করিয়া দিউয়ান বা রাজস্ব-বিভাগ প্রতিষ্ঠিত করেন। এই বিভাগের কাজ ছিল প্রদেশের আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা এবং বৎসরান্তে উদ্বৃত্ত খলিফার নিকট প্রেরণ করা। দিউয়ানের স্থায়ী দপ্তরে প্রদেশের যাবতীয় রাজস্ব-প্রদানকারী প্রজার তালিকা রাখা হইত। যাহারা সরকার হইতে বেতন বা ভাতা পাইতেন, তাদের নামেরও একটি রেজিস্টার এই বিভাগে রক্ষিত হইত। মদিনা সরকারে নিয়মিত সময়ে রাজস্ব প্রেরণ ছিল গভর্নরদের নিজস্ব দায়িত্ব।
প্রাদেশিক গভর্নরগণ শুধু দেশ শাসন করিতেন না, তাঁরা নিজ নিজ এলাকার সেনাবাহিনীরও সর্বাধিনায়ক ছিলেন। তাহা ছাড়া নবীর প্রতিনিধি হিসাবে তাঁরা প্রজাদের ধর্মীয় বিষয়ে নেতৃত্ব করিতেন এবং পদাধিকার বলে রাজধানীর জামে মসজিদে ইমামতি করেন। শুধু চারিটি প্রধান শহরের জন্য হজরত উমর পৃথক ইমামের পদ সৃষ্টি করেন। এই শহরগুলো ছিল জেরুসালেম, হেম্স, দামেস্ক এবং কিনিসরিন। এইসব ইমাম ছিলেন একাধারে প্রদেশের প্রধান বিচারপতি (কাজি-উল-কুয্যাত) এবং প্রধান ইমাম।
এইভাবে হজরত উমর নব-গঠিত মুসলিম সাম্রাজ্যের জন্য একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্রের উপযোগী দৃঢ়ভিত্তিক ও সুসংবদ্ধ শাসনতন্ত্র গঠন করিয়া দিয়া যান। তাঁর শাসন- নীতি পার্শ্ববর্তী কোন রাষ্ট্র হইতে ধার করা ছিল না। তার উৎস আল্ কুরআন, তার শিক্ষক স্বয়ং হজরত মোহাম্মদ (স) সাম্য, ন্যায় এবং আনুগত্য ইহার মূল ভিত্তি। হজরত ওসমান খলিফা হওয়ার পর এক বৎসরের ভিতর হজরত উমরের প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থায় কোনরূপ হস্তক্ষেপ করেন নাই। কিন্তু দ্বিতীয় বৎসর হইতে তিনি গভর্নর- পদে কিছু কিছু রদবদল আনিতে বাধ্য হন। এই বৎসর তিনি কুফায় গভর্নর মুগিরাকে অপসারিত করিয়া সাদ বিন আবি ওক্কাসকে তাঁর স্থলে নিযুক্ত করেন। কিন্তু বৎসর পূর্ণ না হইতেই তিনি সাদকেও অপসারিত করেন এবং ওলিদ বিন ওব্বাকে কুফায় গভর্নর করিয়া পাঠান। তৃতীয় সনে তিনি মিসরের গভর্নর আমর বিন আল আসের পদচ্যুতির হুকুম দেন, কিন্তু সে আদেশ কার্যকরী হইতে বিলম্ব হয় আলেকজান্দ্রিয়ায় গ্রিকদের বিদ্রোহের দরুন। বিদ্রোহ নিবারিত হইলে আমরকে সরাইয়া আবদুল্লাহ্ বিন আবি সারাহকে সমগ্র মিসরের গভর্নর করেন। খিলাফতের ষষ্ঠ বর্ষে তিনি বসরার গভর্নর মুসা আল আশারীকে পদচ্যুত করেন এবং আবদুল্লাহ্ (ওরফে ওবায়দুল্লাহ্) ইবনে আমিরকে তথায় গভর্নর করিয়া পাঠান। ঐ সনেই তিনি কুফার শাসন সংস্থায় পুনরায় হস্তক্ষেপ করেন। ওলিদকে অপসারিত করিয়া সাঈদ বিন আল আসকে তাঁর স্থলে গভর্নর নিয়োজিত করেন। ইহা ছাড়া রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রদেশেও তিনি এই ছয় বৎসরে পুরাতন গভর্নরদের অনেককে বরখাস্ত করেন এবং নতুন লোক দ্বারা তাদের স্থান পূরণ করেন। যে পরিস্থিতিতে এই সব রদবদল খলিফা অনুমোদন করেন, তাহা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। অনুসন্ধান করিলে দেখা যাইবে, এইসব রদবদলের কোনোটিই খলিফার নিজ খুশি-খেয়ালমতো সম্পন্ন হয় নাই। প্রত্যেকটি পদচ্যুতির মূলে শাসনসংক্রান্ত গুরুতর কারণ নিহিত ছিল। অথচ এই ব্যাপারে হজরত ওসমানের সম্পর্কে দুর্নাম কম রটিত হয় নাই।

টিকাঃ
১. হজরত উমরের আমলে গভর্নর-শাসিত প্রদেশগুলো এইভাবে গঠিত হয়েছিল; পর্ব-আরবে বাহরায়েন ও আহওয়ায লইয়া একটি; উত্তর-ইরাক ও দক্ষিণ-ইরাকে দুইটি; উত্তর-সিরিয়া ও দক্ষিণ-সিরিয়ায় দুইটি; পশ্চিম-আরবে প্যালেস্টাইন ও সমুদ্র উপকূল লইয়া একটি; কাস আরব অর্থাৎ হিজায ও ইয়েমেনে পাঁচটি; পারস্য উপসাগরের পূর্ব পারে সিজিস্তান, মেকরান ও কিরমান লইয়া একটি; পূর্ব পারস্যে খোরাসানও তাবারিস্তান লইয়া দুইটি; দক্ষিণ-পারস্যে তিনটি; মিসরের উত্তর ও দক্ষিণ-অঞ্চলে দুইটি এবং মিসরের পশ্চিমে লিবিয়া মরুভূমির অপর পারে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আফ্রিকান রাজ্যগুলো লইয়া মোট কুড়িটি। প্রদেশগুলোর ভিতর ইরাক, সিরিয়া ও মিসর ছিল সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর ইরাকের রাজধানী ছিল কুফা আর দক্ষিণ ইরাকের রাজধানী ছিল বসরা। সিরিয়ার উত্তর অঞ্চলের গভর্নর থাকতেন হেমস্ শহরে আর দক্ষিণ-সিরিয়ার গভর্নর থাকতেন দামেস্কে। মিসরের নীল নদবিধৌত উত্তরাংশ ছিল সর্বাধিক উর্বরা এবং সমৃদ্ধ। মিসর বিজয়ের পর আমর বিন আল আস উত্তর- মিসরের অন্তর্গত ফাস্তান শহরে বসিয়া সমগ্র মিসরের শাসন-কার্য চালাইতেন। দক্ষিণ-মিসরের একজন স্বতন্ত্র শাসনকর্তা নিযুক্ত থাকিলেও আমরই সমগ্র মিসরের উপর কর্তৃত্ব করিতেন। অনুরূপভাবে আমির মুয়াবিয়া সিরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত হওয়ার পর তিনি দামেস্ক হইতে সমগ্র সিরিয়া প্রদেশ শাসন করিতেন।
২. সৈয়দ আমির আলি প্রণীত-History of the saracens. ৬০-৬১ পৃষ্ঠা।

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 শাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রচেষ্টা

📄 শাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রচেষ্টা


ঘটনার স্রোত যেদিকেই চলুক, হজরত ওসমানের উদ্দেশ্যের ভিতরে যে কোনরূপ অসাধুতা ছিল না এবং তিনি যে প্রজাদের যথার্থ মঙ্গল চিন্তা করিতেন, এরূপ মনে করার যথেষ্ট হেতু রহিয়াছে। দেশ জয়ের পর বিজিত প্রদেশে তিনি হজরত উমরের নীতি অনুসরণ করিয়া প্রজাদের আর্থিক অবস্থা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সাধ্যমতো চেষ্টা করিতেন। তাদের যাতায়াত ও বাণিজ্যের সুবিধার জন্য রাস্তাঘাট নির্মাণ করাইতেন; যেখানে পানির অভাব সেখানে খাল কাটাইয়া কৃষি-জমির জন্য সেচের ব্যবস্থা করিতেন; পথিপার্শ্বে বৃক্ষ রোপণ করাইতেন এবং সরাইখানার সুব্যবস্থা করিতেন। পথিকদের নিরাপত্তার জন্য সর্বত্র পুলিশ প্রহরীর ব্যবস্থা করিতেন। বহিঃশত্রুর উপদ্রব হইতে সীমান্তবাসী প্রজাদের ধনপ্রাণ নিরাপদ করার জন্য তিনি স্থানে স্থানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপিত করেন এবং শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য শক্তিশালী সেনাবাহিনী সর্বদা মোতায়েন রাখার ব্যবস্থা করেন। উপকূল বিভাগসমূহ গ্রিকদের আক্রমণ হইতে সুরক্ষিত করার জন্য তিনি মহাশক্তিশালী বাইজেনটাইন সম্রাটের বিপুল সমরায়োজনের বিরুদ্ধেও নৌ-অভিযান প্রেরণে কুণ্ঠিত হন নাই। তাঁরই সুব্যবস্থার ফলে আরব সেনানিরা ভূমধ্যসাগরে গ্রিক-শক্তি খর্ব করিয়া নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করিতে সমর্থ হয়েছিল।
বেসামরিক দিক দিয়াও হজরত ওসমানের শাসন-নীতির ভিতর তাঁর আন্তরিকতার পরিচয সুপরিস্ফুট। প্রজাদের ওপর শাসকদের ব্যবহার কিরূপ শাসকগণ কিভাবে তাঁহাদের দায়িত্ব পালন করেন, সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করিতে তাঁরা কি প্রকারের অসুবিধা বোধ করেন এবং কি ধরনের বাধার সম্মুখীন তাদের হইতে হয়, এই সমস্ত জানার জন্য তিনি প্রবীণ ও বিশ্বস্ত সাহাবিদের লইয়া কতিপয় পর্যবেক্ষকদল গঠন করেন তাদের কাজ ছিল রাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকা ভ্রমণ করিয়া প্রজাদের অবস্থা সাক্ষাৎভাবে অবগত হওয়া এবং গভর্নরদের আবশ্যক মতো উপদেশ প্রদান করা। ভ্রমণ শেষে তাঁরা খলিফাকে সকল তথ্য অবগত করাইতেন।
হজরত ওসমানের সময় রাজধানীতে প্রতি বৎসর গভর্নরদের একটি সম্মেলন আহুত হইত। হজের মৌসুমই এ কাজের উপযুক্ত সময় মনে করিয়া খলিফা তাহাদের হজের পর মদিনায় তাঁর দরবারে হাযীর হইবার জন্য আহ্বান জানাইতেন। গভর্নররা প্রায় সকলেই হজ করিতে মক্কায় আসিতেন। হজ সমাপ্ত হইলে তাঁরা মদিনায়ও আসিতেন হজরত রাসুলুল্লাহর মাজার জেয়ারত করিতে। কাজেই রাজধানীর বার্ষিক সম্মেলনে যোগদান করিতে তাঁহাদের কোনও অসুবিধা হইত না। এই সম্মেলনে খলিফা তাঁহাদের সহিত তাঁহাদের নিজ নিজ এলাকার সমস্যাবলী সম্বন্ধে খোলাখুলি আলোচনা করিতেন। খলিফার কোনো নির্দেশ সম্পর্কে তাঁহাদের কাহারও কিছু বলিবার থাকিলে এই সময় তাঁহারা তাহা খলিফার নিকট পেশ করিতে পারিতেন। গভর্নরদের কাহারও আচরণ সম্বন্ধে খলিফার নিকট কোনও অভিযোগ আসিয়া থাকিলে সে-সম্পর্কেও খলিফা উক্ত সম্মেলনে তাঁর কৈফিয়ৎ লইতে পারিতেন।
হজরত ওসমানের রাজত্বে প্রজাগণ সুখে আছে কিনা ইহা জানার জন্য তাঁর আগ্রহের অন্ত ছিল না। তাদের অবস্থা সাক্ষাৎভাবে অবগত হওয়ার জন্য তিনি প্রত্যেক জু'মার দিন খুৎবা আরম্ভ হওয়ার পূর্বে, নানাস্থান হইতে আগত প্রজাদের সহিত সরাসরিভাবে বাক্যালাপ করিতেন। তাদের প্রতিবেশীবর্গ, যাহারা মসজিদে আসে নাই, তাদের অবস্থা সম্পর্কেও তিনি এইসব লোকের নিকট জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া জানিয়া লইতেন। কোথাও লোকের দুরবস্থার সংবাদ পাইলে তিনি যথাসম্ভব সত্বর তাহা মোচন করার চেষ্টা করিতেন। কোন স্থানে খাদ্যাভাবের কথা জানিতে পারিলে, তিনি ঐ অঞ্চলের বুভুক্ষুদের জন্য বায়তুল মালের ধনভাণ্ডার উন্মুক্ত করিয়া দিতেন।
হজরত ওসমান প্রদেশগুলোর অভ্যন্তরীণ শাসন-সংস্থারও উন্নতি সাধনের চেষ্টা করেন। সে আমলে গভর্নরদের সর্বদাই যুদ্ধ বিগ্রহে বিব্রত থাকিতে হইত। অনেক সময় তাহাদের স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়া সেনাবাহিনী পরিচালনা করিতে হইত। হজরত ওসমান ইহা লক্ষ করিয়া প্রদেশগুলোতে উপযুক্ত সংখ্যক জেলায় বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক জেলার জন্য স্থানী গবর্নরের অধীনে একজন করিয়া জেলা-শাসক নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। এই সকল জেলা শাসক প্রজাদের সহিত সরাসরি সম্পর্কে রাখিতে পারিতেন এবং তাদের অভাব অভিযোগের প্রতি সময়মতো মনোযোগ দিতে পারিতেন। এই ব্যবস্থার ফলে প্রজাদের ভিতরকার কলহ ও মামলা-মোকদ্দমার বিচারও তাদের গৃহের নিকটতর হয়।
রাজ্যের ক্রমবর্ধমান সেনা-বিভাগের ভিতর শৃঙ্খলা স্থাপনের প্রশ্নেও খলিফার দৃষ্টি এড়ায় নাই। মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমানা তখন পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি প্রসারিত হয়েছিল। কাজেই সমর-বিভাগকেও অধিকতর সম্প্রসারিত করিতে হয়েছিল। মুসলিম-রাষ্ট্রকে যুগপৎ পৃথিবীর বহু রণাঙ্গণে যুদ্ধ চালাইতে হয়েছে, আর সেজন্য পৃথক পৃথক সেনাবাহিনী গঠন করিতে হয়েছে। এইসব সেনাবাহিনীতে নানা প্রদেশের নানা গোত্রের লোক থাকিত। তাদের ভিতর রীতি-নীতি ও আচার-ব্যবহারের পার্থক্য ছিল সুস্পষ্ট। ইহাদের সংযত ও সম্মিলিত রাখা এক দুরূহ ব্যাপার ছিল। এই কারণে, হজরত ওসমান প্রত্যেক সেনাবাহিনীতে প্রধান সেনাপতির অধীন কয়েকটি করিয়া মধ্যবর্তী সেনানায়কের পদ সৃষ্টি করেন। এইসব সেনানায়কের দায়িত্ব ছিল নিজ নিজ সৈন্যদলের ভিতর শৃঙ্খলা রক্ষা এবং তাদের দ্বারা প্রধান সেনাপতির আদেশ সুষ্ঠুভাবে তামিল করান। এই ব্যবস্থার ফলে একদিকে যেমন সৈন্যদলের ভিতর অধিকতর শৃঙ্খলা স্থাপিত হয়, অপরদিকে দেশের বহু যোগ্য ও যুদ্ধক্ষম ব্যক্তির কর্ম-সংস্থানের পথ উন্মুক্ত হয়।

টিকাঃ
4. "In the settlement of the new acquistions. the policy of Omar was foolowed. No sooner were these countries conquered than effective measures were set on foot for the development of their natural resources. Water courses were dug. roads made, fruit trees planted and security given to trade by the establishment of a regular police organisation. Byzantine inroads from the notrh led to an advance on the country. now called Asia Minor. Towards the Black Sea. In Africa. Tripoli and Barca and in the Meditrranean. Cyprys. were conquered. A large fleet sent by the Romans to reconquer Egypt was destroyed. -History of the Saracens. pp 46-47.

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 প্রতিক্রিয়া

📄 প্রতিক্রিয়া


ইতিহাসে হজরত ওসমান স্বজন-তোষণের দুর্নামে বিশেষ ভাবে নিন্দিত হয়েছেন। তাঁর দুর্ভাগ্য, হজরত উমরের পরেই তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। প্রজারা হজরত উমরের শাসননীতির সহিত তাঁর শাসনব্যবস্থার তুলনা করিয়া তাঁর প্রতি উম্মা প্রকাশ করিত। হজরত উমরের সময় গভর্নর নিয়োগে কোনো গোত্রের উপর অধিক অনুগ্রহ দেখান হইত না, তাঁর নিজের গোত্রের উপর তো মোটেই নয়। তাঁর আমলে যোগ্যতাই ছিল চাকরিতে বিনিয়োগের মাপকাঠি। আবার যোগ্যতা থাকিলেও একই গোত্রের বেশি লোককে চাকরি দিয়া অন্য গোত্রগুলোকে তিনি বঞ্চিত করিতেন না। তেমনি শুধু রাজধানীর লোক তাঁর আমলে উচ্চপদ পায় নাই, দূরবর্তী অঞ্চলসমূহ হইতেও তিনি যোগ্য লোক সংগ্রহ করিতেন এবং তাহাদের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করিতেন। তিনি কিভাবে গভর্নর নিয়োগ করিতেন নিম্নের তালিকা হইতে তাহা প্রতীয়মান হইবে।
মক্কার শাসনকর্তা নাফে বিন আবুল হারেস খাজায়ি গোত্রের লোক এবং কোরাইশ ছিলেন। কুফার গভর্নর মুগীরা বিন শায়েবা শকীফ গোত্রের লোক ছিলেন। তিনি কোরাইশ ছিলেন না। বসরার গভর্নর আবু মুসা আল আশারী ইয়েমেনী ছিলেন। তায়েফের গভর্নর সুফিয়ান বিন আবদুল্লাহ শকীফ গোত্রের লোক ছিলেন। কোরাইশ ছিলেন না। তায়েফের অধিবাসীরা শকীফ গোত্রের লোক ছিল। সানয়ার গভর্নর ইয়াইলী বিন মান্নাও কোরাইশ ছিলেন না। তিনি বনি নওফেল বিন আবদে মানাফের কোনও মিত্র গোষ্ঠীর লোক ছিলেন। জুন্দের গভর্নর আবদুল্লাহ বিন আবু রাবিয়াহ্ বনু মখজুম গোত্রের লোক ছিলেন এবং কোরাইশ ছিলেন না। মিসরের গভর্নর আমর বিন আল আস কোরাইশ এবং উমাইয়া বংশীয় ছিলেন। হেমসের গভর্নর উমাইর বিন সা'দ আনসার ছিলেন, কোরাইশ ছিলেন না। দামেস্কের গভর্নর মু'য়াবিয়া কোরাইশ এবং উমাইয়া ছিলেন। প্যালেস্টাইনের গভর্নর আবদুর রহমান কেনান দেশীয় লোক ছিলেন। বাহ্রাইন ও আহ্ওয়াযের গভর্নর ওসমান বিন আবুল আস শকীফ গোত্রের লোক ছিলেন। ইঁহারা কোরাইশ ছিলেন না। লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে, তাদের ভিতর অকোরাইশরাই সংখ্যায় অধিক এবং সা'দ গোষ্ঠীর লোক একজনও নাই।
কিন্তু হজরত ওসমানের আমলে গভর্নর বিনিয়োগের ক্ষমতার এই ভারসাম্য রক্ষিত হয় নাই, ইহাই ছিল প্রজাদের অভিযোগ। তাদের আক্ষেপের আরও একটি কারণ ইহাই ছিল যে, নবীর দুঃখের দিনে যাঁরা তাঁর সাথী ছিলেন এবং তাঁর সকল দুঃখ-কষ্টে অংশগ্রহণ করেছিলেন, সেই সব মুহাজির ও আনসার এখন উপেক্ষিত; আর, তাদের পরিবর্তে এখন ক্ষমতাসীন হইতেছেন ঐসব লোক যাহারা নবীর মক্কা বিজয়ের পূর্বে পর্যন্ত তাঁর সহিত বিরোধিতা করিয়াছেন এবং ইসলামকে দুনিয়া হইতে মুছিয়া ফেলার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করিয়াছেন। ইসলামকে যাঁরা আপন জানমাল কোরবানি করিয়া দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাঁহাদের সন্তানরা এখন বেকার, আর যাহারা ইসলামকে গ্রহণ করিয়াছে শেষ মুহূর্তে এবং তাও শুধু আত্মরক্ষার গরজে, তার প্রতি অন্তরের আকর্ষণবশত নয়, তারাই এখন সকল প্রদেশে জনগণের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। হজরত উমরের শাসন-আমলে এই সকল 'অগত্যা-মুসলমান' বিশেষ সুবিধা করিয়া উঠিতে পারে নাই। এখন তাদের স্বগোত্র এক ব্যক্তি খিলাফতের আসনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তারা সর্বপ্রকার সুযোগ-সুবিধার অধিকারী হয়েছেন। তাদের বুঝিতে বিলম্ব হয় নাই যে, ইসলামি রাষ্ট্রে সুখ-সুবিধা ও মর্যাদার আসন লাভ করিতে হইলে ইহার শাসন-যন্ত্র হস্তগত করা দরকার। তাদের আসন লাভ করিতে হইলে তার শাসন-যন্ত্র হস্তগত করা দরকার। তাদের অভিসন্ধি সম্পর্কে হজরত উমর বিশেষভাবে সতর্ক ছিলেন; কারণ, তিনি তাদের নাড়ি-নক্ষত্রের খবর জানিতেন। হজরত ওসমানেরও তাহা জানার কথা, কিন্তু 'ভালো মানুষ' ছিলেন বলিয়া কর্তব্যের খাতিরেও তিনি আত্মীয়স্বজনের প্রতি কঠোর হইতে পারিতেন না; তাদের দাবি দাওয়ার বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়ানোর মতো দৃঢ়তা তাঁর ছিল না। এরূপ একটি পরিস্থিতির উদ্ভব হইতে পারে, হজরত উমর তাহা পূর্বেই অনুধাবন করিতে পারিয়াছিলেন। তাই তিনি মৃত্যুশয্যা হইতে যে নির্বাচনী কমিটি গঠন করিয়া দেন, যার ভিতর হজরত আলি ও হজরত ওসমানও ছিলেন-তার প্রত্যেক সদস্যকে তিনি সতর্ক করিয়া দেন, তিনি যদি খলিফা নির্বাচিত হন, তবে নিজের জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর লোকদের যেন অধিক অনুগ্রহ না দেখান। হজরত উমর লোক-চরিত্রের কিরূপ নিপুণ পাঠক ছিলেন, সে সম্পর্কে ঐতিহাসিক বালাজুরী তাঁর 'আনসার-উল-আশরাফ' গ্রন্থে হজরত উমর ও আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাসের ভিতরকার যে-কথোপকথনটির উল্লেখ করিয়াছেন, তাহা হইতেই অনেকটা ধারণা করা যাইবে। আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস, যিনি 'ইবনে আব্বাস' নামে অধিক পরিচিত-বর্ণনা করছেন; হজরত উমর আহত হইবার পূর্বে একদিন তাঁকে অত্যন্ত চিন্তাক্লিষ্ট দেখিয়া তিনি (ইবনে আব্বাস) ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। উত্তরে হজরত উমর বলেন: উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য কি ব্যবস্থা করিব, ইহা আমি বুঝিতে পারিতেছি না।
ইবনে আব্বাস: এ বিষয়ে আপনি চিন্তা করছেন কেন, আপনার স্থলবর্তী হইবার লোক যখন রহিয়াছে?
হজরত উমর: কে? তোমার বন্ধু (আলি)?
ইবনে আব্বাস: তিনি রাসুলুল্লাহ্র আত্মীয় এবং তাঁর জামাতা হিসাবে যোগ্যপাত্র। তাহা ছাড়া তিনি ইসলামে অগ্রবতী এবং বিপদ বরণকারীদের মধ্যে অন্যতম।
হজরত উমর: তাঁর ভিতর একাধারে রুচি ও বিচক্ষণতা বিদ্যমান।
ইবনে আব্বাস: তাল্‌ল্হা সম্বন্ধে আপনার কি মত?
হজরত উমর: তাঁর জাঁকজমকের অন্ত নাই।
ইবনে আব্বাস: আবদুর রহমান বিন আউফ? উত্তর: নেকমর্দ বটে, তবে ভীরু স্বভাব।
ইবনে আব্বাস: তবে সা'দ?
হজরত উমর: লড়াইয়া মানুষ, শাসন-দায়িত্ব দিলে সামলাইতে পারিবে না।
ইবনে আব্বাস: তাহা হইলে যুবাইর?
হজরত উমর: অস্থির চিত্ত, খুশির মু'মের গোস্বার কাফির, অত্যন্ত লোভী। খিলাফতের জন্য এমন একজন শক্তিমান ও সহানুভূতিশীল লোকের প্রয়োজন, যাহার শক্তিতে জুলুম ও সহানুভূতিতে পক্ষপাতিত্ব না থাকে। অধিকন্তু যে উদারচিত্ত, কিন্তু অপচয়ী না হয়।
ইবনে আব্বাস: তবে হজরত ওসমান সম্পর্কে আপনার মত কি?
হজরত উমর: যদি তাহাকে খলিফা করা হয়, তবে আবু মুইত গোত্রের লোকেরা অন্যদের গর্দান লইবে; আর তাই যদি হয়, তবে তারা একদিন তাঁকেও শেষ করিবে।
হজরত উমরের ধারণা যে নির্ভুল ছিল, ইতিহাস তার সাক্ষ্য বহন করছে। প্রজাদের ভিতর যখন অসন্তোষ তীব্র হয়ে উঠে, সেই অবস্থায় হজরত আলি একদিন প্রজাদের মনোভাব খলিফার নিকট ব্যক্ত করেন এবং তাঁকে সংশোধনের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে ফলোদয় হয় নাই। হজরত ওসমান মনে করিতেন, আত্মীয়স্বজনকে সাহায্য করার অধিকার তাঁর আছে। তিনি হজরত উমরের দৃষ্টান্ত দেখাইয়া বলেন, 'মুগীরা বিন শায়েবার বিশেষ কোনো যোগ্যতা ছিল না, অথচ হজরত উমর তাঁকে গভর্নর করেছিলেন। মু'য়াবিয়াকে হজরত উমরই সিরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন।' তিনি (হজরত ওসমান) তাঁকে স্বপদে বহাল রাখিয়াছেন মাত্র। হজরত আলি উত্তরে বলেন, 'আপনি সত্য কথাই বলিয়াছেন, কিন্তু হজরত উমর তাঁর নিয়োজিত শাসকদের উপর সর্বদা কড়া নজর রাখিতেন। কেউ চুলমাত্র ন্যায়নীতি হইতে সরিয়া গেলে, তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর দণ্ডবিধান করিতেন। কিন্তু আপনি তাহা করেন না। বিশেষ করিয়া আপনার আত্মীয়স্বজনদের প্রতি আপনি কঠোর হইতে পারেন না। মু'য়াবিয়ার সম্বন্ধে আপনি কি জানেন না, হজরত উমরের গৃহভৃত্য ইরফা তাঁকে যতখানি ভয় করিত মু'য়াবিয়া হজরত উমরকে তার চাইতেও বেশি ভয় করিতেন।' কিন্তু এ কথায় হজরত ওসমান নিজেকে সংশোধন করা দূরে থাকুক, উল্টা হজরত আলিকে ছিদ্র অন্বেষণকারী বলিয়া দোষারোপ করেন।
মদিনায় ক্ষুদ্র একটি দল ছিল, যাহারা উমাইয়া পক্ষীয় কোরাইশদের প্রতি হজরত ওসমানের ব্যবহার সমর্থন করিতেন। সাহাবিরা প্রায় সকলেই হজরত ওসমানের কাজের বিরূপ সমালোচনা করিতেন এবং তাঁকে পক্ষপাতিত্বের দোষে দোষী মনে করিতেন। পরবর্তীকালে মুতায়েলি ও আহলে সুন্নৎ জামাতের লোকেরা হজরত ওসমানের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করিয়াছেন এবং তাঁর কাজের ভিতর সঙ্গতি দেখানো চেষ্টা করিয়াছেন। একথা সত্য যে, হজরত উমরের আমলে দেশের পরিস্থিতি যে প্রকার ছিল, হজরত ওসমানের আমলে তদ্রূপ ছিল না। নবীর ওফাতের পর, বারো চৌদ্দ বৎসরের ভিতর দেশ আর্থিক সম্পদের দিক দিয়া অনেকখানি আগাইয়া যায়। আরব জাতি পৃথিবীর বহু প্রাচীন জাতির সংস্পর্শে আসে এবং তাদের সভ্যতা ও জীবনযাত্রা-প্রণালীর সহিত পরিচিত হয়। ঐ সব জাতির পোশাক পরিচ্ছদ, আহার্য বস্তু, ঘরবাড়ি ও ঐশ্বর্যের চাকচিক্য ইহাদের শুধু মুগ্ধ করিত না, প্রলুব্ধ করিত। কাইসারের স্বর্ণমুকুট, রত্নখচিত সিংহাসন, বিশাল দরবার গৃহ, বিচিত্র প্রাসাদাবলী এবং আলোয় ঝলমল প্রমোদ-ভবন মরুবাসী বেদুইন ও গ্রামীণ আরবদের স্তম্ভিত; তাদের পাতার কুটীর, নগণ্য পোশাক ও খর্জুর খাদ্যের সহিত এ সবের পার্থক্য স্মরণ করিয়া তারা অন্তরে আক্ষেপ ও দাহ অনুভব করিত। দ্বিগ্বিজয়ী আরব-সেনাপতিগণ ধ্বংসোন্মুখ প্রাচীন জাতিসমূহের ক্ষীয়মান জৌলুশ লোলুপ দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করিত এবং উত্তরোত্তর অধিকতর বিজয়ের জন্য উন্মাদ হয়ে উঠিত। হজরত উমরের সময় হইতে আরব জাতি এক নব জীবনের স্পন্দন অনুভব করিতে থাকে। তাদের দুর্যোগের তিমির রাত্রির তখন অবসান ঘটিয়াছে। নবীন আরব ছিল অতি মাত্রায় আত্মসচেতন; এ-যুগের তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা সবই ছিল আত্মকেন্দ্রিক। তাদের জীবনে স্বাদ ছিল, মোহ ছিল এবং উপভোগের আগ্রহ ছিল দুর্বার। কোন বাধা-নিষেধই তারা মানিতে চাহিত না। আরবের দূর প্রান্তিক অধিবাসীরা এবং বিশেষ করিয়া মক্কার সেই সব দাম্ভিক কোরাইশ যাহারা দীর্ঘকাল প্রতিরোধের পর শেষ মুহূর্তে ইসলামের নিকট নতি স্বীকার করেছিল এবং মুখ্যত আত্মরক্ষা ও পদোন্নতির জন্য মুসলিম সমাজে দাখিল হয়েছিল,-তারাই জীবনকে উপভোগের আয়োজনে আগাইয়া আসে বেশি। তাদের ভিতর ইসলামি সাম্য ও ত্যাগের শিক্ষা দানা বাঁধিবার পূর্বেই হজরত মোহাম্মদ (স) দুনিয়া ত্যাগ করেন। তাই ইসলামের বাহ্যিক দিকটা-তেজ ও শক্তিমত্তা-তাহাদের আকৃষ্ট করেছিল সমধিক। তাহা ছাড়া যে সব লোক নবুয়তের প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং নবীর সঙ্গে অশেষ দুঃখ-কষ্ট বরণ করেছিল, তাদের সন্তান-সন্ততিরাও এই নতুন যামানার নতুন আবহাওয়ার লালিত হওয়ায়, অধিকাংশেই তাদের পিতৃপুরুষদের মতো গভীরভাবে ইসলামের অনুরাগী ছিল না। নবীর মহান ব্যক্তিত্বের কল্যাণকর পরশ হইতে যামানা যতই দূরে সরিয়া যাইতেছিল লোকদের ভিতর ইসলামি শিক্ষা জীবনাদর্শের প্রতি অনুরাগ ততই ফিকে হয়ে আসিতেছিল। হিজরত যুগের দুঃখময় দিনগুলো এবং মুহাজির ও আনসারদের সেই অতুলনীয় আত্মত্যাগ সমস্তই এ যুগের তরুণদের নিকট ছিল কাহিনি মাত্র, যাহা তাদের অন্তরে অনুভূতির ততটা তীব্রতা জাগাইত না, যেমন জাগাইত নবীর-যুগের মানুষদের অন্তরে।
অবস্থা আরও জটিলাকার ধারণ করে এই জন্য যে, নবীন আরবের দৃষ্টি পথে দূর-দিগন্ত সর্বদাই নতুন আশার রঙ্গিন নিশান দোলাইয়া তাদের চিত্তকে উদ্বেল করিত। কি কোরাইশ কি অকোরাইশ তরুণেরা সর্বদাই উদ্‌গ্রীব থাকিত নতুন পথে পদক্ষেপ করিতে। বিরাট ভূখণ্ড তখন বিজিত হয়েছে; পৃথিবীর বহু ধন-ভাণ্ডার তাদের পায়ের নিচে আসিয়াছে। কিন্তু বিজয় তখন বিজিত হয়েছে; পৃথিবীর বহু ধন-ভান্ডার তাদের পায়ের নিচে আসিয়াছে। কিন্তু বিজয় তখনও সমাপ্ত হয় নাই। নতুন বিজয়ের বিপুল সম্ভাবনা তাদের সম্মুখে প্রসারিত। তাদের শিরাগুলো থাকিত এ কারণে উত্তপ্ত। কেননা, বিজয়ের সঙ্গে আসিত যশ, মর্যাদা ও পদোন্নতি, আর অজস্র গণিমত-অর্থ, সরঞ্জাম ও দাসদাসী। এ সবের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্ত ছিল না। প্রতিদ্বন্দ্বিতার পশ্চাতেই আসিত ব্যক্তিগত ও দলগত বিদ্বেষ এবং রেষারেষি। উচ্চপদ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ঐশ্বর্যের লালসা কাহাকে না আকর্ষণ করে। এহেন বিরোধ-বিক্ষুব্ধ, সমস্যা-সঙ্কুল বিশাল রাষ্ট্রের পরিচালনা ভার স্কন্ধে লইয়া জীর্ণ দেহ বৃদ্ধ খলিফা যে অত্যন্ত বিব্রত হয়ে পড়িবেন, তাতে আশ্চর্যের কি আছে। বিভিন্ন পক্ষের ভিতর ক্ষমতার বণ্টনে সমতা রক্ষা করা তাহার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। পুরাতনপন্থী নিষ্ক্রিয় সাহাবিদের মৃদু গুঞ্জন ছাপাইয়া শক্তিমান কোরাইশ ও তাদের সমপ্রবৃত্তি অকোরাইশদের কলকণ্ঠ খলিফার চতুষ্পার্শ্বে মুখর হয়ে উঠে এবং খলিফার হস্তের মধুভাণ্ডারের বেশির ভাগ অংশ তারাই শুষিয়া লয়। ইহার ফলে নিষ্ঠাবান পুরাতন দল অন্তরে অন্তরে ক্ষুব্ধ হয়। দুই দলের মানসিকতার ভিতর যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ ছিল, তাহা বলাই বাহুল্য। খলিফা যেই নতুন দলের মনস্তুষ্টির চেষ্টা করেছিলেন, পুরাতন দল আওয়াজ তুলিয়াছেন-'নতুন খলিফা তাঁর পূর্ববর্তী দুই খলিফার নীতি হইতে সরিয়া গিয়াছেন এবং নিজের পূর্ব-ওয়াদা খেলাপ করিয়াছেন।' তরুণদের ভিতর যাহারা আকাঙ্ক্ষিত লভ্য হইতে বঞ্চিত হইত, ক্রোধ ও আক্রোশ তাহাদের খলিফার বিরুদ্ধে প্ররোচিত করিত। বৈষম্যের পথ কোনও দিনই কঙ্করহীন ও মসৃণ হয় নাই। এই বিশৃঙ্খলতার যুগে আরব জাতির আদিম প্রবৃত্তি-গোত্রে গোত্রে কলহ এবং গোত্রের সর্দার ছাড়া অন্য কাহারও প্রভুত্ব না মানা-পুনরায় মাথাচাড়া দিয়া উঠে। এ অবস্থায় খলিফা যদি লোক নিয়োগের বেলায় পুরাপুরি নিরপেক্ষতা রক্ষা করিতে না পারিয়া থাকেন সেজন্য, মুতাযিলা ও আহলে সুন্নতদের মতে, খলিফাকে বিশেষ দোষ দেওয়া যায় না। দুনিয়ার যাহারা ইতিহাস সৃষ্টি করিয়াছেন তাঁরা বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ভিন্ন ভিন্ন নীতির অনুসরণ করেছিলেন। সেগুলোর সঙ্গতি অসঙ্গতি বিচার উত্তরকালে যতটা সহজ, সমকালে তেমন নয়। তাই হজরত ওসমানের শাসন-নীতির পর্যালোচনাকালে সমসাময়িক ঘটনাবলি ও সামাজিক পটভূমিকার প্রতি দৃষ্টি রাখা একান্ত দরকার। অনেকে এমন কথাও বলিয়াছেন, গভর্নর পরিবর্তন এবং নিজ আত্মীয়স্বজনকে সেই সব পদে বিনিয়োগ তাঁর পতনের কারণ নহে; তাঁর পতনের আসল কারণ ছিল তাঁর অসমঞ্জস্য অর্থনীতি, যার ফলে সমগ্র মুসলিম-রাষ্ট্র এক ব্যাপক সামাজিক ও শাসনতান্ত্রিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল।

টিকাঃ
৩. "Osman displaced most of the Lieutenants employed by Omar and appointed in their stead incompetent and worthless members of his own family. During the first six years of his rule, the people though grievoKUsy oppressed by the new governors remained quiet. And, in the outlying provinces the dangers to which the Saracen were exposed from the common enemies kept the armies employed. The incursions of the Tarks in Transaxlana led to the conquest of Balkh. Similarly were Herat. Kabul and Ghazni captured. The rising in Southern Persia led to subjugation of Kerman and sistan." -History of the Saracens. pp 46.
৫. "In the mean time, the weakness of Caliph & the wickedness of his favourites were creating a great ferment among the people. Loud complaints of exaction and oppression by his governors began pouring into the Capital. All expostulated several times with the Caliph on the manner in which he allowed the government to fail into the hands of his unworthy favourites. But Osman, under the influence of his evil genius. Merwan. paid no heed to he counsels. -History of the Saracens. pp 46-47.
৬. ডক্টর তোহা হোসেন (মিসরি) প্রণীত 'হজরত ওসমান' এর মৌলানা নুরুদ্দীন আহমদ কৃত অনুবাদের ৪৬ পৃষ্ঠা।
৭. ডক্টর তোহা হোসেন (মিসরি) প্রণীত 'হজরত ওসমান' এর মৌলানা নূরুদ্দীন আহমদ কৃত অনুবাদের ১৮৪-৮৫ পৃষ্ঠা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00