📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 আবদুল্লাহ ইবনে সাবা

📄 আবদুল্লাহ ইবনে সাবা


দুই মুহম্মদের প্রচারণার ফলে মিসরের আকাশে-বাতাসে যখন খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্বেষের সুর বহিতেছিল, সেই সময় ইয়েমেন হইতে আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা নামক এক বাতিকগ্রস্ত মিশনারি আসিয়া তথায় উপনীত হন। ইনি জাতিতে ইহুদি ছিলেন। তিনি ইয়েমেনের অন্তর্গত সা'না নামক স্থানের অধিবাসী ছিলেন। হজরত ওসমানের রাজত্বকালে ইনি বসরায় গিয়া কিছুকাল অবস্থান করেন এবং তথায় ইসলাম ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। ইহুদিরা ইসলামকে কোনদিনই অন্তরের সহিত গ্রহণ করিতে পারে নাই। তাদের অনেকেই ইসলাম কবুল করেছিল পার্থিব সুযোগ-সুবিধা ও চাকরি লাভের আশায়। তারা একটা ঐতিহ্যবাহী পুরাতন ধর্মের উত্তরাধিকারী ছিল, কিন্তু জাতীয় অবনতির যুগে ধ্বংসোন্মুখ জাতিসমূহের ভিতর যে-সব কুসংস্কার বাসা বাঁধে, তারাও তাহা হইতে মুক্ত ছিল না। তাই ইসলামে প্রবেশ করিয়াও তারা অন্তরের দিক দিয়া পরিচ্ছন্ন চিন্তার অধিকারী হইতে পারে নাই পারসিকদের অবস্থাও অনুরূপ ছিল। আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা সম্ভবত বসরায় পারসিক মুসলমানদের সংশ্রবে আসিয়াছিলেন। যে-কোনও কারণেই হউক আবদুল্লাহ্ হজরত আলির একজন অন্ধ ভক্ত হয়ে পড়েন। এমন কি ক্রমে তিনি চিন্তার দিক দিয়া অবতারবাদের কাছাকাছি যাইয়া পড়েন। হজরত আলির প্রতি তাঁর অহেতুক ভক্তির জন্য বসরার তদানীন্তন গভর্নর আবদুল্লাহ্ বিন আমির তাঁকে বসরা হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দেন। আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা অবশ্য অর্থ বা ক্ষমতা লোভ ছিলেন না। বসরা ছাড়ার পর তিনি ভ্রাম্যমাণ প্রচারক (Traveling Missionary)-এর পেশা অবলম্বন করিয়া একস্থান হইতে অন্য স্থানে যাইতেন এবং মুসলমানদের তাঁর মতে টানিয়া বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করিতেন। তিনি কিছুকাল হিজাযে অবস্থান করেন এবং তথা হইতে বসরায় চলিয়া যান। তিনি কুফায়ও গমন করেন এবং কুফা হইতে সিরিয়ায় যান। কুফাবাসীরা হজরত আলির ভক্ত ছিল কিন্তু সিরিয়া ছিল ইহার বিপরীত। নানা দেশ ভ্রমণের পর তিনি মিসরের স্থায়ী বাসিন্দা হন এবং মিসরকেই তাঁর কর্মভূমি রূপে বাছিয়া লন। মিসর ছিল তাঁর মতো প্রচারের পক্ষে সর্বাপেক্ষা অনুকূল ক্ষেত্র। কারণ, হজরত ওসমানের বিরুদ্ধবাদীর সংখ্যা মিসরে অল্প ছিল না।
আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা ইয়েমেনে তাঁর ভক্ত ও অনুগত লোকদের লইয়া একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় গঠন করেছিলেন। ইহাদের 'সাবায়ি' বলা হইত। অনুমান ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে এই সম্প্রদায়ের উৎপত্তি হয়। ইহারা সাক্ষাৎভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করিত না।
কিন্তু ইসলামের রাজনীতি ধর্ম হইতে পৃথক নহে। রাজনীতিকেরা তাদের মতবাদের সুযোগ গ্রহণ করেন। ধর্মের দিক দিয়াও তাদের মতবাদ ইসলামের উপকার ত করেই নাই, বরং ইসলামে বিভ্রান্তি ও বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি করিয়াছে। তারা খোদা-দত্ত অধিকার (The Theory of Divine Right) মতবাদে বিশ্বাসী ছিল এবং উহা হজরত আলির অনুকূলে প্রচার করিত। তাদের মতে হজরত আলিকে আল্লাহ্ তাহার প্রেরিত পুরুষ হজরত মোহাম্মদের (স.) পার্থিব ও আধ্যাত্মিক সকল ক্ষমতার উত্তরাধিকারী করিয়া পয়দা করিয়াছেন। ইহার নির্গলিত অর্থ এই দাঁড়ায়, হজরত আবু বকর, হজরত উমর এবং হজরত ওসমান নবীর খিলাফতের জবর দখলকারী (Usurper) ছিলেন। এই মতবাদকে ভিত্তি করিয়া ইবনে সাবা জনগণের ভিতর হজরত ওসমানের খিলাফতের বিরুদ্ধে এক মনস্তাত্ত্বিক আন্দোলনের সূত্রপাত করেন।
আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা এই প্রসঙ্গে আরও বলিতেন, 'এমন হাজার নবী জন্মিয়াছিলেন, যাদের প্রত্যেকের সঙ্গে একজন করিয়া ওহি (Wasi) অর্থাৎ সেক্রেটারি বা কর্মসচিব দেওয়া থাকিত। হজরত আলি ছিলেন হজরত মোহাম্মদের (স) এইরূপ একজন অছি। হজরত মোহাম্মদ দুনিয়ায় শেষ নবী ছিলেন, কাজেই হজরত আলি ছিলেন নবীর শেষ কর্মসূচি Executor of his mission)। একটু তলাইয়া দেখিলেই বুঝা যাইবে আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবাতে ইহুদিদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ছায়াপাত ঘটিয়াছে। তাদের ধর্মে হজরত মুসা ও হারুণের যে সম্বন্ধ, আবদুল্লাহ ইবনে সাবা হজরত মোহাম্মদ (সা.) ও হজরত আলির ভিতর তদ্রূপ একটি সম্বন্ধের অবতারণা করিয়াছেন। আর এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করিয়াই তিনি হজরত আলির পূর্ববর্তী তিন খলিফাকেই নবীর খিলাফতের জবর-দখলকারী বলিতেন। তিনি শুধু মিসরে তাঁর মতো প্রচার করিয়া ক্ষান্ত হন নাই, মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্যান্য প্রদেশের। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সহিতও এই সম্পর্কে তিনি গোপনে পত্র বিনিময় করিতেন এবং তাঁহাদের স্বমতে আনিবার চেষ্টা করিতেন।
ঐতিহাসিক শাহারস্তানি বলিয়াছেন-পরবর্তীকালে হজরত আলি যখন জানিতে পারেন, আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা তাঁকে 'আন্তা আন্তা' (Thou art Thou. i.e. Thou art Allah- তুমিই আল্লাহ) বলিতে শুরু করিয়াছেন, তখন ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে মিসর হইতে নির্বাসিত করেন। জনগণ আবদুল্লাহ্ হইতে এই শিক্ষা প্রাপ্ত হয়েছিল, প্রত্যেক পয়গম্বরের ভিতর যে 'পবিত্র আত্মা বাস করে এবং যাহা এক পয়গম্বর হইতে অন্য পয়গম্বরে অবিচ্ছিন্ন ধারায় প্রয়াণ করে উহা হজরত মোহাম্মদের (সা.) ওফাতের পর (তিনি শেষ নবী ছিলেন বলিয়া) হজরত আলির ভিতর প্রবেশ করে (transfused হয়)। তদনন্তর উহা হজরত আলি হইতে তাঁর সেই সব বংশধরের ভিতরে প্রবেশ করিবে, যারা তাঁর পর ইমামতির অধিকারী হইবে।
বস্তুত আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবার কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকুক বা না থাকুক, তাঁর প্রচারণার ফলে হজরত ওসমানের উপর জনগণের শ্রদ্ধা হ্রাস পাইতে থাকে। আর সেই সঙ্গে হজরত ওসমান কর্তৃক নিয়োজিত রাজকর্মচারীদের উপরও তাদের আস্থা কমিতে থাকে। হজরত আবুবকর ও হজরত উমরের আমলে সরকারি কর্মচারীরা জনগণের নিকট যে সম্মান লাভ করিতেন, হজরত ওসমানের আমলে তদ্রূপ ছিল না। তাহা থাকিলে হয়ত ওসমানের ভাগ্যের অমন শোচনীয় পরিণতি ঘটিত না, রাজ্যময় অত মারাত্মক বিপ্লবও ঘটিতে পারিত না। আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা হজরত আলির মতো একজন আদর্শ মুসলিমকে প্রজাপুঞ্জের সম্মুখে তুলিয়া ধরায় প্রজাদের ভিতর এই আশা লালিত হয়েছিল, হজরত ওসমানের অপসারণে তারা লাভবানই হইবে। সুশাসনের পরশ পাইয়া আবার তারা সুখী হইবে। জনগণের ভিতরকার এই মানসিকতা যে রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষীদের পথ সুগম করেছিল এবং হজরত ওসমানের পতন ত্বরান্বিত করেছিল তাতে সন্দেহ নাই।

টিকাঃ
১. মিসরেই আবদুল্লাহ্, ইবনে সাবা হজরত মোহাম্মদ (স) সম্বন্ধে তাঁর 'পুনরাবির্ভাব' (Palingernesis) মতবাদ প্রচার শুরু করেন। তিনি বলিতেন, 'কি আশ্চর্য, লোকেরা হজরত ঈশার 'মশায়া' রূপে পুনরাবির্ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে, অথচ হজরত মোহাম্মদ (স) পুনরায় পৃথিবীতে আবির্ভূত হইবেন ইহা অবিশ্বাস করেন, যদিও আল্লাহ্ স্বয়ং আল-কুরআনে ইহা ঘোষণা করিয়াছেন।' এই মতবাদের ভিত্তি স্বরূপ আল-কুরআনে ২৮শ অধ্যায়ের ৮৫ সংখ্যক আয়াতের এই বাণী উল্লেখ করা হয়েছে; 'হে মোহাম্মদ (স) নিশ্চয়ই যিনি তোমার উপর কুরআন নাজিল করিয়াছেন, তিনি তোমাকে পুনঃ ফিরাইয়া আনিবেন একটি প্রত্যাবর্তনের স্থানে (to a place of return)'। এখানে কুরআনের 'প্রত্যাবর্তনের স্থান' অর্থে হযরতের জন্মভূমি মক্কার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, কিন্তু স্পষ্টত মক্কার নাম উল্লেখ না থাকায় আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা এখানে তাঁর নিজস্ব মন্তব্য অনুপ্রবিষ্ট করার সুবিধা, পাইয়াছিলেন। তিনি বলিতেন, 'পৃথিবীর শেষ যুগে হজরত মোহাম্মদ (স) পুনরায় পৃথিবীতে আসিবেন (অধর্মের বিনাশ ও সত্যধর্ম অর্থাৎ ইসলাম পুনপ্রতিষ্ঠার্থে)।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00