📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 (২) মিসরে বিক্ষোভ

📄 (২) মিসরে বিক্ষোভ


ভূমধ্যসাগরে গ্রিক-নৌশক্তির প্রাণকেন্দ্র সাইপ্রাস ও রোডস দ্বীপের মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হজরত ওসমানের রাজত্বের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আমর-বিন-আল- আসের মতো ধুরন্ধর সময়-নায়কও ধারণা করিতে পারে নাই, মুসলিমগণ সাগর-বুকে এত দ্রুত নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করিতে সক্ষম হইবে। হজরত উমরও তাঁর যুক্তিতে মানিয়া লইতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু হজরত উমরের দেহত্যাগের মাত্র চারি বৎসর পরে, হজরত ওসমান আমির মু'য়াবিয়ার প্রার্থনামতো সাইপ্রাস অভিযানের অনুমতি দিয়াছিলেন। এই বিজয়ের ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। আরব জাতির সামরিক- শক্তির বিস্ময়কর বিকীরণের পক্ষে এই সামুদ্রিক-বিজয় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করিয়া দেয়। মুসলিম সাম্রাজ্যের উপকূল এলাকাসমূহের সংরক্ষণও ইহার পর সহজ হয়েছিল। খলিফা হওয়ার পর হজরত ওসমান যদি উল্লেখযোগ্য আর কোনো কাজই না করিতেন, শুধু এই বিজয়ের জন্যই তিনি মুসলিম ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকতেন।
মুসলিম ঐতিহাসিকগণ এ সম্বন্ধে একমত যে, হজরত ওসমানের রাজত্বের প্রথম দশ বৎসর মুসলিম-বিজয়-স্রোত পূর্বের ন্যায় অব্যাহত ছিল। হজরত ওসমানের শাসনসংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়েরই তাঁর বিরুদ্ধপক্ষ তীব্র সমালোচনা করিয়াছে, কিন্তু তাঁর যুদ্ধনীতি ও দেশ জয়ের এই গোরবোজ্জ্বল অধ্যায় কেহ মসীলিংও করার চেষ্টা করে নাই, এমন কি তাঁর শত্রুরাও না। কি এশিয়া, কি আফ্রিকা, সর্বত্র জরত উমরের অধিকৃত এলাকাসমূহের সীমানা তিনি সযত্নে রক্ষা করিয়াছেন, কোথাও উহা তিল পরিমাণও সঙ্কুচিত হইতে দেন নাই। তাহা ছাড়া অনেক নতুন প্রদেশও তাঁর আমলে বিজিত হয়েছে। তাঁর বার্ধক্য ও স্বাভাবিক নম্রতাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করিয়া প্রান্তিক অঞ্চলসমূহ পুনঃপুনঃ বিদ্রোহ করিয়াছে; কিন্তু তাঁর অতন্দ্র দৃষ্টি তারা এড়াইতে সমর্থ হয় নাই। যখনই প্রয়োজন দেখা দিয়াছে, খলিফা ক্ষীপ্রতার সহিত যুদ্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছেন এবং তাঁর নির্দেশে আরব-তরবারি অবিলম্বে কোষমুক্ত হয়েছে।
কিন্তু নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, মুসলিম রাষ্ট্রের বিজয়-গৌরব অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য আরবের বীর সন্তানরা যখন খলিফার নির্দেশে দিকে দিকে যুদ্ধরত, সেই সময় কিছু সংখ্যক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও স্বার্থান্বেষী কোরাইশ-যুবক মিসরে বসিয়া তাহার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করিতে থাকে। তাদের বাসনা ছিল, উচ্চপদ ও ক্ষমতাসীন হয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করা এবং যুদ্ধ জয়ের গৌরব ও গণিমতের অধিকারী হওয়া। অতীতে যাঁরা প্রাণ দিয়া ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁদের সেই ত্যাগ ও নিষ্ঠার ভাব এই তরুণদের ভিতর ছিল না। তাদের সম্মুখে একটি মাত্র প্রশ্ন প্রবল ছিল। সে হইল, একটি সুগঠিত ও উন্নতিশীল রাষ্ট্রের উপসত্ত্ব কে কতখানি করায়ত্ত করিতে পারে। তাদের ভিতর দুই ব্যক্তির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁহাদের একজন ছিলেন হজরত আবু বকরের কনিষ্ঠ পুত্র মুহম্মদ। দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রখ্যাত সাহাবি আবু হুজাইফার পুত্র মুহম্মদ। পিতার দিক দিয়া তারা উভয়েই মুসলিম-সমাজে সুপরিচিত ও সম্মানিত ছিলেন। তারাই পরে মিসরের গণবিদ্রোহের নেতৃত্ব করেন।

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 মুহম্মদ বিন আবু বক্কর

📄 মুহম্মদ বিন আবু বক্কর


কথিত আছে, হজরত আবু বকরের ইন্তিকালের পর হজরত আলি তাঁর কনিষ্ঠা পত্নীকে বিবাহ করেন এবং উক্ত রমণীর গর্ভজাত সন্তান মুহম্মদকে তিনি নাবালক অবস্থা হইতে প্রতিপালন করেন। হজরত আবু বকরের পুত্র এবং বিবি আয়েশার ভ্রাতা হিসেবে ইনি কোনও উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশা হৃদয়ে পোষণ করিতেন। কিন্তু নির্বাচন প্রতিযোগিতায় হজরত আলি পরাজিত হওয়ার পর স্বভাবতই এই যুবকের মনে নৈরাশ্যের সঞ্চার হয়। মারোয়ানের চক্রান্তে অধিকাংশ উচ্চপদ যখন উমাইয়াদের ভাগ্য নিরূপিত হইতে লাগিল এবং তাদের ভিতর এমন লোকও ছিল যাহারা তুলনায় মুহম্মদের চাইতে কোনও অংশে যোগ্যতর ছিল না, তখন তেজস্বী মুহম্মদ ক্রোধে ও অভিমানে মদিনা ত্যাগ করিয়া মিসরে চলিয়া যান এবং সেখানে খলিফার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা সাধনের উপায় খুঁজিতে থাকেন।
এই দুরাকাঙ্ক্ষী যুবকটিকে বিশেষভাবে চিনিয়া রাখা দরকার। কারণ, হজরত ওসমানের খিলাফতের শেষ পরিণতির সহিত এই যুবকের কার্যকলাপ বিশেষভাবে জড়িত। মিসরের গণ-বিদ্রোহের ইনিই ছিলেন উদ্যোক্তা এবং বিশিষ্ট পরিচালক। যে মর্মান্তিক ঘটনাবলীর ভিতর দিয়া হজরত ওসমানের জীবন-নাট্যের অবসান হয়, তারও প্রধানক নায়ক ছিলেন এই মুহম্মদ বিন আবু বকর। হজরত ওসমানের নিধনের ফলে ইসলামে যে অন্তর্বিপ্লবের সূত্রপাত হয়, তার নিবৃত্তি কখনও হয় নাই। হজরত আলির মতো ন্যায়বান শাসকও সেই অন্তর্বিপ্লব কাটাইয়া উঠিতে পারেন নাই। তাঁর দাহে ভস্মীভূত হয়েছিলেন। নবী-প্রবর্তিত ইসলামি রিপাবলিকেরও অপমৃত্যু ঘটে। সাম্রাজ্যবাদ হইল ইহার পরবর্তী অধ্যায়। সেদিক দিয়া দেখিলে ইহা না বলিয়া পারা যায় না যে, মুহম্মদ বিন আবু বকর ইসলামের যে ক্ষতি সাধন করিয়াছেন, তেমন অন্য কেহ করে নাই। হজরত আবু বকরের মতো লোকের ঔরসে যাহার জন্ম এবং হজরত আলির গৃহে যাহার শৈশব উত্তীর্ণ হয়, সেই ব্যক্তি কি করিয়া এমন বিপ্লবী-পন্থার অনুসারী হইলেন, ভাবিলে বিস্ময় হয়। দুরাকাঙ্ক্ষা এমনই ভয়াবহ জিনিস। অবশ্য তাঁর নিজের পক্ষে যে যুক্তি না ছিল এমন নহে। তাঁর প্রচারণার ধারাগুলো অনুসরণ করিলেই তাহা অনেকটা হৃদয়ঙ্গম করা যাইবে এবং তাঁর কার্যের সঙ্গতি-অসঙ্গতিও নির্ণয় করা যাইবে।
সময়ের পটভূমিকা এবং সম্ভাবনাপূর্ণ ঘটনাবলীর বিচিত্র যোগাযোগও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য কম দায়ী নয়। মুহম্মদ বিন আবু বকর যখন মদিনা হইতে মিসরে প্রস্থান করিলেন, তখন যদি আবদুল্লাহ্ বিন-আবি সারাহ্ ব্যতীত অন্য কেহ তথায় গভর্নর থাকতেন, অথবা আবদুল্লাহ্ বিন আবু হুজাইফার সহিত তাঁর যোগাযোগ না ঘটিত, অথবা আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবার মতো প্রচারকের সেখানে আবির্ভাব না ঘটিত, তবে মিসরের গণবিক্ষোভ কি রূপ ধারণ করিত এবং কোন খাতে প্রবাহিত হইত, কে জানে।

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 মুহম্মদ বিন আবু হুজাইফা

📄 মুহম্মদ বিন আবু হুজাইফা


মুহম্মদ বিন আবু হুজাইফাও সম্ভ্রান্ত বংশীয় যুবক ছিলেন। আবু হুজাইফার পিতা আতাবা ইবনে রাবিয়া কোরাইশদের ভিতর একজন প্রতিপত্তিশালী সর্দার ছিলেন। এই আতাবার কন্যাই ছিলেন হেনদা যিনি আবু সুফিয়ানের পত্নী ও মুয়াবিয়ার মাতা ছিলেন। আবু হুজাইফা প্রাথমিক দলের একজন মুসলমান ছিলেন এবং কোরাইশদের চরম অত্যাচারের যুগে পত্নী সহিলা-বিনতে-সোহাইল বিন আমরসহ আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। ইহার পর তিনি মদিনায় চলিয়া যান এবং ইসলামের সকল দুর্দিনে হযরতের পাশে থাকিয়া তাঁর সর্বপ্রকার দুঃখকষ্টে অংশগ্রহণ করিয়াছেন। হজরত আবু বকরের খিলাফতের আমলে তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর পুত্র মুহম্মদের জন্ম হয় আবিসিনিয়ায়। আবু হুজাইফা যখন মদিনায় আসেন, তখন মুহম্মদের বয়স মাত্র আট কি নয় বৎসর। আবু হুজাইফার মৃত্যুর পর কোমল হৃদয় হজরত ওসমান নাবালক মুহাম্মদের অভিভাবক হন এবং তাঁর প্রতিপালনের ভার গ্রহণ করেন। হজরত ওসমান খলিফা হইলে মুহম্মদ আশা করেছিলেন, অন্য অনেক কোরাইশ-যুবকের ন্যায় তাঁরও ভাগ্যে কোন উচ্চপদ মিলিবে। কিন্তু তাহার সে আশা পূর্ণ হয় নাই। কথিত আছে, তাঁর আচরণে খলিফা সন্তুষ্ট ছিলেন না। একদা তিনি কুসংসর্গে মিশিয়া মদ্যপান করার অপরাধে খলিফা কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। ইসলামের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল না। শরীয়তের বিধানসমূহও তিনি ঠিকভাবে পালন করিতেন না। যুবক যখন খলিফার নিকট কর্মপ্রার্থী হন, খলিফা তাঁকে এই বলিয়া বিদায় করেন, তোমার ভিতর যোগ্যতা দেখিতে পাইলে আমি নিশ্চয়ই তোমাকে কোনো দায়িত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করিতাম। ইহাতে যুবক ক্রুদ্ধ হয়ে মিসরে চলিয়া যান এবং মুহম্মদ বিন আবু বকরের সঙ্গে মিলিত হয়ে খলিফার বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক প্রচারণায় রত হন।
মুহম্মদ ইবনে আবু হুজাইফা অত্যন্ত উদ্ধত ও দুঃসাহসী ছিলেন। তিনি খলিফার শাসননীতির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর সময় মিসরের গভর্নর আবি সারাহকেও ছাড়িতেন না।
মুহম্মদ বিন আবু বকর ও মুহম্মদ বিন আবু হুজাইফার মতো দুইজন প্রতিপত্তিশালী কোরাইশ যুবক হঠাৎ মিসর দেশে কেন আবির্ভূত হইলেন ইহা লইয়া গভর্নর আবি সারাহ্ দারুণ সন্দেহে নিপতিত হইলেন। তাদের উদ্দেশ্য যে সাধু ছিল না, তাহা অনুধাবন করিতে তাঁর বিলম্ব হয় নাই। তিনি তাঁহাদের আহ্বান করিয়া সতর্ক করিয়া দিলেন, যেন রাজ্যের ভিতর তাঁরা কোনও উৎপাত সৃষ্টি না করেন। কিন্তু তাঁরা কেহই গবর্নরের ধমকে কর্ণপাত করিলেন না। উভয়েরই প্রচারণা পূর্ণোদ্যমে চলিতে থাকে। মুহম্মদ বিন আবু হুজাইফা এমনই ধৃষ্ট ছিলেন, গভর্নরকে অনেক সময় প্রকাশ্য জনসমাগমে অপমানসূচক কথা বলিতেন। গভর্নর তাঁকে এ বিষয়ে নিষেধ করিয়া দিলেও তিনি সংযত হন নাই।
অতঃপর হিজরি ৩২ সনে খলিফার নিকট হইতে সাইপ্রাসে দ্বিতীয় অভিযান প্রেরণের নির্দেশ আসে। গভর্নর তখন উভয় মুহম্মদকে তাঁর সঙ্গে যাইতে নির্দেশ দেন। কিন্তু মুহম্মদ বিন আবুবকর অসুস্থতার দোহাই দিয়া মিসরে থাকিয়া যান। মুহম্মদ বিন আবু হুজাইফা সেনাবাহিনীর সঙ্গে গেলেন বটে, কিন্তু আরব সেনাদের সঙ্গী না হয়ে মিসরিয় কিবতি সৈন্যদের জাহাজে উঠিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সৈন্যদের ভিতর খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ সৃষ্টি করা। এদিকে মুহম্মদ বিন আবুবকর গভর্নরের অনুপস্থিতির সুযোগে তাঁর এবং হজরত ওসমানের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহমূলক বক্তৃতা করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। মিসরের আদিম অধিবাসী কিবতিরা আরবদে প্রভুত্ব পছন্দ করিত না। তাই মুহম্মদ বিন আবু হুজাইফা তাহাদের শাসকবর্গের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করা সহজ হইবে মনে করিয়া বলিতেন, 'দেখ, তোমরা জিহাদের জন্য জীবন উৎসর্গ করিতে আসিয়াছ, কিন্তু তোমাদের আসল জিহাদের ক্ষেত্র এখানে নয়, মদিনায়। সেখানে তোমাদের বর্তমান খলিফা কুরআন হাদিসের খিলাফে এবং পূর্ববর্তী খলিফাদ্বয়ের আদর্শের বিরুদ্ধে হুকুমাৎ চালাইতেছেন। হজরত রাসুলের সাহাবাদের পদচ্যুত করিয়া তাঁহাদের স্থলে নিজের অযোগ্য লোকদের বসাইতেছেন। ইহারা বিলাসপরায়ণ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। তোমাদের বর্তমান গভর্নরকে দেখিলেই এ কথার সত্যতা বুঝিতে পারিবে। তিনি খলিফার দুধ-ভাই, তাহা ছাড়া তাঁর আর কি যোগ্যতা আছে? তিনি না সেই ব্যক্তি, যার রক্তপাত একদা রাসুলে আকরাম হালাল করেছিলেন। ইনি কি তোমাদের সহিত কঠোর ব্যবহার করছে না? তোমাদের দাবিদাওয়ার ভিতর পক্ষপাতিত্ব দেখাইতেছেন না? এবং তোমাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ করিতে বাধ্য করছেন না? এই ধরনের বিদ্রোহমূলক প্রচারণা মুহম্মদ বিন আবু হুজাইফা কর্তৃক সৈন্যদলে এবং মুহম্মদ বিন আবুবকর কর্তৃক মিসরের জনসাধারণের ভিতর জোরের সহিত চলিতে থাকে।
আবদুল্লাহ ইবনে সারাহ্ যুদ্ধশেষে তাঁহাদের এই প্রকার রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার সংবাদ অবগত হয়ে ক্রুদ্ধ হন এবং নির্দেশ দেন, এইসব সরকারিবিরোধী লোকদের অতঃপর আর কখনও যুদ্ধে লওয়া হইবে না। কিন্তু এইভাবে যুদ্ধজয়ের গৌরব ও মালে গণিমতের আশা হইতে বঞ্চিত হয়ে তাঁরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। আবি সারাহ্ সতর্কবাণী সত্ত্বেও তাঁর এবং খলিফার বিরুদ্ধে তাঁহাদের প্রচারণা বাড়িয়াই চলিল। তাঁরা অতঃপর প্রকাশ্যেই বলিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, খলিফা কর্তৃক আবি সারাহকে সাইপ্রাস যুদ্ধে নৌ-সেনাপতি নিয়োগ করা অবিবেচনা প্রসূত হয়েছে। আবি সারাহ্ বিরোধী পক্ষ মিসরে সংখ্যায় সামান্য ছিল না। তাদের দ্বারা গোপনে এইসব প্রচারণা চতুর্দিকে ছড়াইতে লাগিল। আবি সারাহ্ পলায়িত শত্রুর পশ্চাদ্ধাবন করেন নাই, ইহা তাদের নিন্দার আর এক নতুন সূত্র হয়ে দাঁড়াইল। জনগণের সম্মুখে ইহা কাপুরুষতা বলিয়া প্রচার করা হয়েছিল, শুধু তাঁর যশোরাশিকে ষ্ণা করার করার জন্য।
যুদ্ধশেষে সৈন্যবাহিনীর লোক ও জনসাধারণ যখন একত্র হইল, তারা দলে দলে মুহম্মদ ইবনে আবুবকর ও মুহম্মদ বিন আবু হুজাইফার নিকট আসিতে এবং তাঁহাদের কথা শুনিতে লাগিল। ক্রমে জনমত রূঢ় হয়ে উঠিতে লাগিল। গভর্নর আবি সারাহ্ এইসব সংবাদ অবগত হয়ে ইহার প্রতিবিধানের জন্য খলিফার অনুমতি চাহিয়া পত্র লিখিলেন। উত্তরে খলিফা লিখিলেন, 'মুহম্মদ বিন আবুবকর, হজরত আবুবকরের পুত্র এবং বিবি আয়েশার ভ্রাতা। মুহম্মদ বিন আবু হুজাইফাও খলিফার আশ্রিত ও তৎকর্তৃক প্রতিপালিত। অধিকন্তু সে একজন বিশিষ্ট সাহাবির পুত্র। ইহাদের মর্যাদার প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া ইহাদের যেন সদুপদেশ দিয়া অব্যাহতি দেওয়া হয়।'
কিন্তু খলিফার এই উদারতা ও কৃপা প্রদর্শন কোনও কাজে আসিল না। কেন-না যে দুইটি মৌলিক কারণে খলিফার ওপর তাদের মন তিক্ত হয়েছিল, সেগুলোর কোনও প্রতিকার হইল না। প্রথম কারণ ছিল, এক শ্রেণির কোরাইশ যুবকদের অর্থাৎ খলিফার স্ব-গোত্রীয় লোকদের প্রতি খলিফার বেশি মনোযোগ ও সহানুভূতি প্রদর্শন এবং অন্যান্য কোরাইশ যুবকদের দাবির প্রতি অবহেলা; দ্বিতীয় কারণ, যে-সমস্ত প্রাথমিক মুসলমান ইসলামের প্রতিষ্ঠার জন্য অশেষ দুঃখকষ্ট বরণ করেছিলেন, সেই সব মুহাজির ও আনসারদের পরিবর্তে এমন সব লোককে সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা যাহারা বংশ- মর্যাদায় যতই সম্মানিত হউন, ইসলামের সেবার দিক দিয়া অথবা চরিত্রগত সুনামের দিক দিয়া। অগ্রাধিকার লাভের যোগ্য ছিলেন না। বরং তাঁরা ছিলেন সেই সব কোরাইশ, যাহারা নবীর মক্কাজয়ের পূর্ব পর্যন্ত ইসলামের ঘোর শত্রু ছিলেন এবং মক্কা বিজিত হওয়ার পর শুধু আত্ম-রক্ষার্থ ইসলাম কবুল করেছিলেন। লোকেরা যখন এইসব শুনিত তাঁরা খলিফার বিরুদ্ধে উত্তেজিত হইত এবং জটলা করিত।

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 আবদুল্লাহ ইবনে সাবা

📄 আবদুল্লাহ ইবনে সাবা


দুই মুহম্মদের প্রচারণার ফলে মিসরের আকাশে-বাতাসে যখন খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্বেষের সুর বহিতেছিল, সেই সময় ইয়েমেন হইতে আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা নামক এক বাতিকগ্রস্ত মিশনারি আসিয়া তথায় উপনীত হন। ইনি জাতিতে ইহুদি ছিলেন। তিনি ইয়েমেনের অন্তর্গত সা'না নামক স্থানের অধিবাসী ছিলেন। হজরত ওসমানের রাজত্বকালে ইনি বসরায় গিয়া কিছুকাল অবস্থান করেন এবং তথায় ইসলাম ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। ইহুদিরা ইসলামকে কোনদিনই অন্তরের সহিত গ্রহণ করিতে পারে নাই। তাদের অনেকেই ইসলাম কবুল করেছিল পার্থিব সুযোগ-সুবিধা ও চাকরি লাভের আশায়। তারা একটা ঐতিহ্যবাহী পুরাতন ধর্মের উত্তরাধিকারী ছিল, কিন্তু জাতীয় অবনতির যুগে ধ্বংসোন্মুখ জাতিসমূহের ভিতর যে-সব কুসংস্কার বাসা বাঁধে, তারাও তাহা হইতে মুক্ত ছিল না। তাই ইসলামে প্রবেশ করিয়াও তারা অন্তরের দিক দিয়া পরিচ্ছন্ন চিন্তার অধিকারী হইতে পারে নাই পারসিকদের অবস্থাও অনুরূপ ছিল। আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা সম্ভবত বসরায় পারসিক মুসলমানদের সংশ্রবে আসিয়াছিলেন। যে-কোনও কারণেই হউক আবদুল্লাহ্ হজরত আলির একজন অন্ধ ভক্ত হয়ে পড়েন। এমন কি ক্রমে তিনি চিন্তার দিক দিয়া অবতারবাদের কাছাকাছি যাইয়া পড়েন। হজরত আলির প্রতি তাঁর অহেতুক ভক্তির জন্য বসরার তদানীন্তন গভর্নর আবদুল্লাহ্ বিন আমির তাঁকে বসরা হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দেন। আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা অবশ্য অর্থ বা ক্ষমতা লোভ ছিলেন না। বসরা ছাড়ার পর তিনি ভ্রাম্যমাণ প্রচারক (Traveling Missionary)-এর পেশা অবলম্বন করিয়া একস্থান হইতে অন্য স্থানে যাইতেন এবং মুসলমানদের তাঁর মতে টানিয়া বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করিতেন। তিনি কিছুকাল হিজাযে অবস্থান করেন এবং তথা হইতে বসরায় চলিয়া যান। তিনি কুফায়ও গমন করেন এবং কুফা হইতে সিরিয়ায় যান। কুফাবাসীরা হজরত আলির ভক্ত ছিল কিন্তু সিরিয়া ছিল ইহার বিপরীত। নানা দেশ ভ্রমণের পর তিনি মিসরের স্থায়ী বাসিন্দা হন এবং মিসরকেই তাঁর কর্মভূমি রূপে বাছিয়া লন। মিসর ছিল তাঁর মতো প্রচারের পক্ষে সর্বাপেক্ষা অনুকূল ক্ষেত্র। কারণ, হজরত ওসমানের বিরুদ্ধবাদীর সংখ্যা মিসরে অল্প ছিল না।
আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা ইয়েমেনে তাঁর ভক্ত ও অনুগত লোকদের লইয়া একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় গঠন করেছিলেন। ইহাদের 'সাবায়ি' বলা হইত। অনুমান ৬৫০ খ্রিস্টাব্দে এই সম্প্রদায়ের উৎপত্তি হয়। ইহারা সাক্ষাৎভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করিত না।
কিন্তু ইসলামের রাজনীতি ধর্ম হইতে পৃথক নহে। রাজনীতিকেরা তাদের মতবাদের সুযোগ গ্রহণ করেন। ধর্মের দিক দিয়াও তাদের মতবাদ ইসলামের উপকার ত করেই নাই, বরং ইসলামে বিভ্রান্তি ও বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি করিয়াছে। তারা খোদা-দত্ত অধিকার (The Theory of Divine Right) মতবাদে বিশ্বাসী ছিল এবং উহা হজরত আলির অনুকূলে প্রচার করিত। তাদের মতে হজরত আলিকে আল্লাহ্ তাহার প্রেরিত পুরুষ হজরত মোহাম্মদের (স.) পার্থিব ও আধ্যাত্মিক সকল ক্ষমতার উত্তরাধিকারী করিয়া পয়দা করিয়াছেন। ইহার নির্গলিত অর্থ এই দাঁড়ায়, হজরত আবু বকর, হজরত উমর এবং হজরত ওসমান নবীর খিলাফতের জবর দখলকারী (Usurper) ছিলেন। এই মতবাদকে ভিত্তি করিয়া ইবনে সাবা জনগণের ভিতর হজরত ওসমানের খিলাফতের বিরুদ্ধে এক মনস্তাত্ত্বিক আন্দোলনের সূত্রপাত করেন।
আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা এই প্রসঙ্গে আরও বলিতেন, 'এমন হাজার নবী জন্মিয়াছিলেন, যাদের প্রত্যেকের সঙ্গে একজন করিয়া ওহি (Wasi) অর্থাৎ সেক্রেটারি বা কর্মসচিব দেওয়া থাকিত। হজরত আলি ছিলেন হজরত মোহাম্মদের (স) এইরূপ একজন অছি। হজরত মোহাম্মদ দুনিয়ায় শেষ নবী ছিলেন, কাজেই হজরত আলি ছিলেন নবীর শেষ কর্মসূচি Executor of his mission)। একটু তলাইয়া দেখিলেই বুঝা যাইবে আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবাতে ইহুদিদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ছায়াপাত ঘটিয়াছে। তাদের ধর্মে হজরত মুসা ও হারুণের যে সম্বন্ধ, আবদুল্লাহ ইবনে সাবা হজরত মোহাম্মদ (সা.) ও হজরত আলির ভিতর তদ্রূপ একটি সম্বন্ধের অবতারণা করিয়াছেন। আর এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করিয়াই তিনি হজরত আলির পূর্ববর্তী তিন খলিফাকেই নবীর খিলাফতের জবর-দখলকারী বলিতেন। তিনি শুধু মিসরে তাঁর মতো প্রচার করিয়া ক্ষান্ত হন নাই, মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্যান্য প্রদেশের। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সহিতও এই সম্পর্কে তিনি গোপনে পত্র বিনিময় করিতেন এবং তাঁহাদের স্বমতে আনিবার চেষ্টা করিতেন।
ঐতিহাসিক শাহারস্তানি বলিয়াছেন-পরবর্তীকালে হজরত আলি যখন জানিতে পারেন, আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা তাঁকে 'আন্তা আন্তা' (Thou art Thou. i.e. Thou art Allah- তুমিই আল্লাহ) বলিতে শুরু করিয়াছেন, তখন ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে মিসর হইতে নির্বাসিত করেন। জনগণ আবদুল্লাহ্ হইতে এই শিক্ষা প্রাপ্ত হয়েছিল, প্রত্যেক পয়গম্বরের ভিতর যে 'পবিত্র আত্মা বাস করে এবং যাহা এক পয়গম্বর হইতে অন্য পয়গম্বরে অবিচ্ছিন্ন ধারায় প্রয়াণ করে উহা হজরত মোহাম্মদের (সা.) ওফাতের পর (তিনি শেষ নবী ছিলেন বলিয়া) হজরত আলির ভিতর প্রবেশ করে (transfused হয়)। তদনন্তর উহা হজরত আলি হইতে তাঁর সেই সব বংশধরের ভিতরে প্রবেশ করিবে, যারা তাঁর পর ইমামতির অধিকারী হইবে।
বস্তুত আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবার কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকুক বা না থাকুক, তাঁর প্রচারণার ফলে হজরত ওসমানের উপর জনগণের শ্রদ্ধা হ্রাস পাইতে থাকে। আর সেই সঙ্গে হজরত ওসমান কর্তৃক নিয়োজিত রাজকর্মচারীদের উপরও তাদের আস্থা কমিতে থাকে। হজরত আবুবকর ও হজরত উমরের আমলে সরকারি কর্মচারীরা জনগণের নিকট যে সম্মান লাভ করিতেন, হজরত ওসমানের আমলে তদ্রূপ ছিল না। তাহা থাকিলে হয়ত ওসমানের ভাগ্যের অমন শোচনীয় পরিণতি ঘটিত না, রাজ্যময় অত মারাত্মক বিপ্লবও ঘটিতে পারিত না। আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা হজরত আলির মতো একজন আদর্শ মুসলিমকে প্রজাপুঞ্জের সম্মুখে তুলিয়া ধরায় প্রজাদের ভিতর এই আশা লালিত হয়েছিল, হজরত ওসমানের অপসারণে তারা লাভবানই হইবে। সুশাসনের পরশ পাইয়া আবার তারা সুখী হইবে। জনগণের ভিতরকার এই মানসিকতা যে রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষীদের পথ সুগম করেছিল এবং হজরত ওসমানের পতন ত্বরান্বিত করেছিল তাতে সন্দেহ নাই।

টিকাঃ
১. মিসরেই আবদুল্লাহ্, ইবনে সাবা হজরত মোহাম্মদ (স) সম্বন্ধে তাঁর 'পুনরাবির্ভাব' (Palingernesis) মতবাদ প্রচার শুরু করেন। তিনি বলিতেন, 'কি আশ্চর্য, লোকেরা হজরত ঈশার 'মশায়া' রূপে পুনরাবির্ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে, অথচ হজরত মোহাম্মদ (স) পুনরায় পৃথিবীতে আবির্ভূত হইবেন ইহা অবিশ্বাস করেন, যদিও আল্লাহ্ স্বয়ং আল-কুরআনে ইহা ঘোষণা করিয়াছেন।' এই মতবাদের ভিত্তি স্বরূপ আল-কুরআনে ২৮শ অধ্যায়ের ৮৫ সংখ্যক আয়াতের এই বাণী উল্লেখ করা হয়েছে; 'হে মোহাম্মদ (স) নিশ্চয়ই যিনি তোমার উপর কুরআন নাজিল করিয়াছেন, তিনি তোমাকে পুনঃ ফিরাইয়া আনিবেন একটি প্রত্যাবর্তনের স্থানে (to a place of return)'। এখানে কুরআনের 'প্রত্যাবর্তনের স্থান' অর্থে হযরতের জন্মভূমি মক্কার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, কিন্তু স্পষ্টত মক্কার নাম উল্লেখ না থাকায় আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা এখানে তাঁর নিজস্ব মন্তব্য অনুপ্রবিষ্ট করার সুবিধা, পাইয়াছিলেন। তিনি বলিতেন, 'পৃথিবীর শেষ যুগে হজরত মোহাম্মদ (স) পুনরায় পৃথিবীতে আসিবেন (অধর্মের বিনাশ ও সত্যধর্ম অর্থাৎ ইসলাম পুনপ্রতিষ্ঠার্থে)।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00