📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 (১) সাইপ্রাসে দ্বিতীয় অভিযান

📄 (১) সাইপ্রাসে দ্বিতীয় অভিযান


মিসরে আমরের পদচ্যুতির পর হইতে অশান্তি লাগিয়াই ছিল। মিসরের নয়া শাসনকর্তা আবদুল্লাহ্ বিন আবি সারাহ্-এর দুর্ভাগ্য, তিনি ত্রিপলী ও সাইপ্রাসে অপ্রত্যাশিত বিজয় লাভ করিয়াও মিসরবাসীদের চিত্ত জয়ে সমর্থ হন নাই। তাঁর যুদ্ধ-খ্যাতির অন্তরালে মিসরে তাঁর জন্য এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করা হইতেছিল। অথচ তিনি যে শাসনকার্যে অপটু ছিলেন না, পরবর্তী ইতিহাস তার সাক্ষ্য বহন করছে। আবদুল্লাহ্ যখন মিসরে নিজের মসনদ লইয়া বিব্রত, সেই সময় সাইপ্রাসের লোকেরা সন্ধি-শর্ত ভঙ্গ করিয়া বসিল। ২৮ হিজরিতে তারা যখন আমির মু'য়াবিয়ার সহিত সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয়, তখন তাতে একটি শর্ত এই ছিল, তারা বাইজেনটাইন গ্রিকদের সহিত কোনো প্রকার সম্পর্ক রাখিবে না, এমনকি বিবাহাদিও নয়। তারা তিন বৎসর কাল এইসব শর্ত বিশ্বস্তভাবে মানিয়া চলে। কিন্তু ৩১ হিজরিতে তারা কতিপয় গ্রিক জাহাজকে আশ দান করে। তখন আমির মু'য়াবিয়া আবার সাইপ্রাস দ্বীপে অভিযান করেন এবং এই অভিযানে নেতৃত্ব করার জন্য মিস সারাহকে পুনরায় সাইপ্রাসে পাঠাই
ব্যাপার
সমরোপকরণের দিক দিয়া ন্যূন হইলেও সাহসী ছিল। ইহাদের লইয়া আবদুল্লাহ্ সাইপ্রাস অভিমুখে দ্রুত অগ্রসর হইলেন। কিন্তু আলেকজান্দ্রিয়ার অদূরেই গ্রিক রণতরীসমূহ দৃষ্ট হইল। আবদুল্লাহ্ উহাদের গতিরোধ করিয়া দাঁড়াইলেন।
গ্রিক রণতরীগুলোর সংখ্যা ছিল মুসলমানদের তুলনায় বিপুল। বাতাস থামিয়া যাওয়ায় উভয়পক্ষের জাহাজগুলো পরস্পর মুখামুখী হয়ে সাগরবক্ষে নোঙর করিল। মুসলমানরা সমস্ত রাত্রি উপাসনায় কাটাইল। গ্রিকরা রাত্রি কাটাইল পান ভোজন ও আমোদ-আহলাদে। রজনীর অবসান হইলে উভয় পক্ষে রণ-দামাম বাজিয়া উঠিল এবং শুরু হইল এক ভয়াবহ যুদ্ধ। জলস্রোত প্রবল ছিল, উলন্মত্ত বাতাসে তার তরঙ্গগুলো ভীষণ গর্জনের সহিত একের উপর অন্য লাফাইয়া পড়িতে লাগিল। নাবিকগণ তরী আর সামাল দিতে পারিল না। উজান হইতে গ্রিক জাহাজগুলো মুসলিম নৌবহরের উপর আসিয়া চাপিয়া পড়িল। প্রবল বাতাসের সম্মুখে আরব রণতরীগুলোকে তিষ্ঠিয়া রাখা দায় হয়ে উঠিল। কিন্তু আরব যোদ্ধারা স্বভাবত দুঃসাহসী। তারা কোনও মতে তাদের স্বস্ব স্থানে টিকিয়া থাকিল। ফলে উভয়পক্ষের রণতরী এলোমেলো ভাবে মিশিয়া পড়িল এবং পরস্পর গায়ে গায়ে লাগালাগি হওয়ায় দুই পক্ষের সৈন্যদের ভিতর হাতাহাতি যুদ্ধ আরম্ভ হইল। একপক্ষ অপর পক্ষের জাহাজের ডেকে লাফাইয়া পড়িতে লাগিল এবং তলোয়ারে তলোয়ারে সংঘাত চলিল। আরবগণ বাঁচিবার আর আশা নাই দেখিয়া তরবারি ও খঞ্জর হস্তে 'আল্লাহু আকবর' রবে গর্জিয়া উঠিল এবং হিংস্র ব্যাঘ্রের মতো গ্রিকদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল। তাদের একের সহিত অন্যের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হইল, প্রত্যেকে যার যার মতো শত্রু হত্যা করিয়া পাগলের ন্যায় ছুটাছুটি করিতে লাগিল। সে ভয়াবহ আক্রমণ রোধ করার মতো শক্তি ও মনোবল গ্রিকদের ছিল না। তাদের ভিতর বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। সাগরবক্ষ এতগুলো রণতরীর দাপটে তচনচ ও ফেনিল হয়ে উঠিল। মানুষের রক্তে সাগরের শ্বেত ফেনা রঙিন হয়ে গেল। আহত ও নিহত যোদ্ধাদের রক্তাক্ত দেহ সাগর জলে পতিত হওয়ায় সাগর-বারি বহুদূর ব্যাপিয়া লোহিত হয়ে উঠিল। উভয় পক্ষেরই বহু সৈন্য হতাহত হইল। জাহাজগুলোর ফাঁকে ফাঁকে, কোথাও বা সেগুলোর তলদেশে মনুষ্যদেহ ইতঃস্তত ভাসিতে লাগিল। এরূপ ভয়াবহ যুদ্ধের তুলনা ইতিহাসে বিরল। বেলা বাড়িয়া চলিল। সৈন্যদল ক্লান্ত হয়ে পড়িল। কিন্তু আরবজাতি বুভুক্ষু থাকিতে চির অভ্যস্ত। তারা টলিল না। পক্ষান্তরে আরামে লালিত গ্রিকগণ নিস্তেজ হয়ে পড়িল। লৌহকঠিন আরব হস্তের তীক্ষ্ণ তরবারি গ্রিকগণ দীর্ঘকাল সহ্য করিতে পারিল না। অগণিত গ্রিক-সৈন্যের খণ্ডিত-দেহে জাহাজগুলোর ডেক যখন ভর্তি হয়ে গেল, স্থানাভাবে সৈন্যদের আবর্তন কঠিন হয়ে পড়িল। দিবা অবসানে অল্প সংখ্যক গ্রিকসৈন্য কোনও মতে প্রাণ লইয়া পলায়ন করিতে সমর্থ হইল। তাদের সেনাপতি কনস্টানটাইন তাঁর রণতরীসহ পশ্চাৎ দিক দিয়া উধাও হইলেন। পাছে বিজয়ী আরবগণ তাঁর পশ্চাদ্ধবন করে এই ভয়ে তিনি কোথাও না থামিয়া একেবারে সাইরাকিউস দ্বীপে গিয়া জাহাজ ভিড়াইলেন। সাইরাকিস ছিল গ্রিক এলাকা। কিন্তু তথাকার গ্রিকগণ তাঁর এই কাপুরুষতার সংবাদে ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে স্নানাগারের ভিতর হত্যা করে।

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 অন্যান্য যুদ্ধবিগ্রহ

📄 অন্যান্য যুদ্ধবিগ্রহ


অতঃপর বিজয়ী মুসলিমগণের অবিসংবাদিত অধিকার সাগরবক্ষে প্রতিষ্ঠিত হইল। এই যুদ্ধের ফলে নৌযোদ্ধা হিসেবে মুসলিমদের খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িল। সাইপ্রাস এবং রোডস দ্বীপ সম্পূর্ণরূপে মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং সিরিয়ার গভর্নর আমির মু'য়াবিয়ার হস্তে তার শাসনভার ন্যস্ত করা হয়। ইহার পর গ্রিকদের সেখানে পুনর্বার নৌঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাবনা চিরতরে অন্তর্হিত।
ত্রিপলীর বিদ্রোহ দমন : মিসরের গভর্নর আবদুল্লাহ বিন আবি সারাহ্ যখন সাইপ্রাসে যুদ্ধরত, ঐ সময় ত্রিপলী এলাকার কতিপয় সমস্ত রাজা বিদ্রোহের ধ্বজা উত্তোলন করেন। সাইপ্রাস হইতে ফিরিয়া আসিয়াই আবদুল্লাহ্ ত্রিপলীর বিদ্রোহ দমনে অগ্রসর হিজরি ৩৪ সনে ত্রিপলীতে নতুন অভিযান প্রেরিত হইল। আবদুল্লাহ্ স্বয়ং এই অভিযান পরিচালনা করেন এবং অল্পায়াসেই বিদ্রোহ দমনে সমর্থ হন। ইহার ফলে উত্তর-আফ্রিকা সম্পূর্ণরূপে খলিফার পদানত হয়।
কনস্টান্টিনোপল অভিযান : আরব-নৌবাহিনীর যখন সাইপ্রাসে যুদ্ধরত সেই সময় সিরিয়ার গভর্নর আমির মু'য়াবিয়া পূর্ব-রোমক সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল আক্রমণের আয়োজন করেন। কিন্তু কনস্টান্টিনোপলের পতন বোধ হয় আল্লাহ্ তখন অভিপ্রেত ছিল না। আমির মুয়াবিয়ার সুনিপুণ ব্যবস্থা সত্ত্বেও প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাঁর প্রেরিত অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় (হিজরি ৩২ সন)। কিন্তু আমির মু'য়াবিয়া সংকল্প গ্রহণের পর নিরস্ত হইবার লোক ছিলেন না। হিজরি ৩৩ সনে (৬৫২ খ্রি.) সিরীয় বাহিনী মু'য়াবিয়ার নির্দেশে স্থলপথে কনস্টানিনোপলে আক্রমণের জন্য অগ্রসর হয়। কিন্তু এবারেও তারা বিফলমনোরথ হয়। নব বিজিত এলাকায় দুর্গম পথে নানা অসুবিধার সম্মুখীন হওয়ায় সিরীয় বাহিনী কনস্টান্টিনোপল আক্রমণে সমর্থ হয় নাই।
ঐ সনেই মু'য়াবিয়া আর্জরূম প্রদেশের অন্তর্গত হা-আল মুরাত নামক এলাকা অধিকার করেন এবং আর্মেনিয়া বিজয় চূড়ান্ত করেন। ইহার পর ৬৫৪ খ্রিস্টাব্দে গ্রিকগণ আর্মেনিয়া পুনরাধিকারের চেষ্টা করে, কিন্তু অকৃতকার্য হয়।

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 (২) মিসরে বিক্ষোভ

📄 (২) মিসরে বিক্ষোভ


ভূমধ্যসাগরে গ্রিক-নৌশক্তির প্রাণকেন্দ্র সাইপ্রাস ও রোডস দ্বীপের মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হজরত ওসমানের রাজত্বের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আমর-বিন-আল- আসের মতো ধুরন্ধর সময়-নায়কও ধারণা করিতে পারে নাই, মুসলিমগণ সাগর-বুকে এত দ্রুত নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করিতে সক্ষম হইবে। হজরত উমরও তাঁর যুক্তিতে মানিয়া লইতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু হজরত উমরের দেহত্যাগের মাত্র চারি বৎসর পরে, হজরত ওসমান আমির মু'য়াবিয়ার প্রার্থনামতো সাইপ্রাস অভিযানের অনুমতি দিয়াছিলেন। এই বিজয়ের ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। আরব জাতির সামরিক- শক্তির বিস্ময়কর বিকীরণের পক্ষে এই সামুদ্রিক-বিজয় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করিয়া দেয়। মুসলিম সাম্রাজ্যের উপকূল এলাকাসমূহের সংরক্ষণও ইহার পর সহজ হয়েছিল। খলিফা হওয়ার পর হজরত ওসমান যদি উল্লেখযোগ্য আর কোনো কাজই না করিতেন, শুধু এই বিজয়ের জন্যই তিনি মুসলিম ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকতেন।
মুসলিম ঐতিহাসিকগণ এ সম্বন্ধে একমত যে, হজরত ওসমানের রাজত্বের প্রথম দশ বৎসর মুসলিম-বিজয়-স্রোত পূর্বের ন্যায় অব্যাহত ছিল। হজরত ওসমানের শাসনসংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়েরই তাঁর বিরুদ্ধপক্ষ তীব্র সমালোচনা করিয়াছে, কিন্তু তাঁর যুদ্ধনীতি ও দেশ জয়ের এই গোরবোজ্জ্বল অধ্যায় কেহ মসীলিংও করার চেষ্টা করে নাই, এমন কি তাঁর শত্রুরাও না। কি এশিয়া, কি আফ্রিকা, সর্বত্র জরত উমরের অধিকৃত এলাকাসমূহের সীমানা তিনি সযত্নে রক্ষা করিয়াছেন, কোথাও উহা তিল পরিমাণও সঙ্কুচিত হইতে দেন নাই। তাহা ছাড়া অনেক নতুন প্রদেশও তাঁর আমলে বিজিত হয়েছে। তাঁর বার্ধক্য ও স্বাভাবিক নম্রতাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করিয়া প্রান্তিক অঞ্চলসমূহ পুনঃপুনঃ বিদ্রোহ করিয়াছে; কিন্তু তাঁর অতন্দ্র দৃষ্টি তারা এড়াইতে সমর্থ হয় নাই। যখনই প্রয়োজন দেখা দিয়াছে, খলিফা ক্ষীপ্রতার সহিত যুদ্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছেন এবং তাঁর নির্দেশে আরব-তরবারি অবিলম্বে কোষমুক্ত হয়েছে।
কিন্তু নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, মুসলিম রাষ্ট্রের বিজয়-গৌরব অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য আরবের বীর সন্তানরা যখন খলিফার নির্দেশে দিকে দিকে যুদ্ধরত, সেই সময় কিছু সংখ্যক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও স্বার্থান্বেষী কোরাইশ-যুবক মিসরে বসিয়া তাহার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করিতে থাকে। তাদের বাসনা ছিল, উচ্চপদ ও ক্ষমতাসীন হয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করা এবং যুদ্ধ জয়ের গৌরব ও গণিমতের অধিকারী হওয়া। অতীতে যাঁরা প্রাণ দিয়া ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁদের সেই ত্যাগ ও নিষ্ঠার ভাব এই তরুণদের ভিতর ছিল না। তাদের সম্মুখে একটি মাত্র প্রশ্ন প্রবল ছিল। সে হইল, একটি সুগঠিত ও উন্নতিশীল রাষ্ট্রের উপসত্ত্ব কে কতখানি করায়ত্ত করিতে পারে। তাদের ভিতর দুই ব্যক্তির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁহাদের একজন ছিলেন হজরত আবু বকরের কনিষ্ঠ পুত্র মুহম্মদ। দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রখ্যাত সাহাবি আবু হুজাইফার পুত্র মুহম্মদ। পিতার দিক দিয়া তারা উভয়েই মুসলিম-সমাজে সুপরিচিত ও সম্মানিত ছিলেন। তারাই পরে মিসরের গণবিদ্রোহের নেতৃত্ব করেন।

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 মুহম্মদ বিন আবু বক্কর

📄 মুহম্মদ বিন আবু বক্কর


কথিত আছে, হজরত আবু বকরের ইন্তিকালের পর হজরত আলি তাঁর কনিষ্ঠা পত্নীকে বিবাহ করেন এবং উক্ত রমণীর গর্ভজাত সন্তান মুহম্মদকে তিনি নাবালক অবস্থা হইতে প্রতিপালন করেন। হজরত আবু বকরের পুত্র এবং বিবি আয়েশার ভ্রাতা হিসেবে ইনি কোনও উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশা হৃদয়ে পোষণ করিতেন। কিন্তু নির্বাচন প্রতিযোগিতায় হজরত আলি পরাজিত হওয়ার পর স্বভাবতই এই যুবকের মনে নৈরাশ্যের সঞ্চার হয়। মারোয়ানের চক্রান্তে অধিকাংশ উচ্চপদ যখন উমাইয়াদের ভাগ্য নিরূপিত হইতে লাগিল এবং তাদের ভিতর এমন লোকও ছিল যাহারা তুলনায় মুহম্মদের চাইতে কোনও অংশে যোগ্যতর ছিল না, তখন তেজস্বী মুহম্মদ ক্রোধে ও অভিমানে মদিনা ত্যাগ করিয়া মিসরে চলিয়া যান এবং সেখানে খলিফার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা সাধনের উপায় খুঁজিতে থাকেন।
এই দুরাকাঙ্ক্ষী যুবকটিকে বিশেষভাবে চিনিয়া রাখা দরকার। কারণ, হজরত ওসমানের খিলাফতের শেষ পরিণতির সহিত এই যুবকের কার্যকলাপ বিশেষভাবে জড়িত। মিসরের গণ-বিদ্রোহের ইনিই ছিলেন উদ্যোক্তা এবং বিশিষ্ট পরিচালক। যে মর্মান্তিক ঘটনাবলীর ভিতর দিয়া হজরত ওসমানের জীবন-নাট্যের অবসান হয়, তারও প্রধানক নায়ক ছিলেন এই মুহম্মদ বিন আবু বকর। হজরত ওসমানের নিধনের ফলে ইসলামে যে অন্তর্বিপ্লবের সূত্রপাত হয়, তার নিবৃত্তি কখনও হয় নাই। হজরত আলির মতো ন্যায়বান শাসকও সেই অন্তর্বিপ্লব কাটাইয়া উঠিতে পারেন নাই। তাঁর দাহে ভস্মীভূত হয়েছিলেন। নবী-প্রবর্তিত ইসলামি রিপাবলিকেরও অপমৃত্যু ঘটে। সাম্রাজ্যবাদ হইল ইহার পরবর্তী অধ্যায়। সেদিক দিয়া দেখিলে ইহা না বলিয়া পারা যায় না যে, মুহম্মদ বিন আবু বকর ইসলামের যে ক্ষতি সাধন করিয়াছেন, তেমন অন্য কেহ করে নাই। হজরত আবু বকরের মতো লোকের ঔরসে যাহার জন্ম এবং হজরত আলির গৃহে যাহার শৈশব উত্তীর্ণ হয়, সেই ব্যক্তি কি করিয়া এমন বিপ্লবী-পন্থার অনুসারী হইলেন, ভাবিলে বিস্ময় হয়। দুরাকাঙ্ক্ষা এমনই ভয়াবহ জিনিস। অবশ্য তাঁর নিজের পক্ষে যে যুক্তি না ছিল এমন নহে। তাঁর প্রচারণার ধারাগুলো অনুসরণ করিলেই তাহা অনেকটা হৃদয়ঙ্গম করা যাইবে এবং তাঁর কার্যের সঙ্গতি-অসঙ্গতিও নির্ণয় করা যাইবে।
সময়ের পটভূমিকা এবং সম্ভাবনাপূর্ণ ঘটনাবলীর বিচিত্র যোগাযোগও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য কম দায়ী নয়। মুহম্মদ বিন আবু বকর যখন মদিনা হইতে মিসরে প্রস্থান করিলেন, তখন যদি আবদুল্লাহ্ বিন-আবি সারাহ্ ব্যতীত অন্য কেহ তথায় গভর্নর থাকতেন, অথবা আবদুল্লাহ্ বিন আবু হুজাইফার সহিত তাঁর যোগাযোগ না ঘটিত, অথবা আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবার মতো প্রচারকের সেখানে আবির্ভাব না ঘটিত, তবে মিসরের গণবিক্ষোভ কি রূপ ধারণ করিত এবং কোন খাতে প্রবাহিত হইত, কে জানে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00