📄 কুফায় গোলযোগ-ওলিদের পদচ্যুতি ও সইদ বিন আল আ’সের গভর্নর পদে নিয়োগ
কুফার ওলিদ বিন ওব্বা গভর্নর হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দিয়াছিলেন, একথা পূর্বে বলা হয়েছে। কিন্তু তাঁর শত্রুরও অভাব ছিল না। তারা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল এবং তাঁর কার্য-কলাপের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিত। খলিফার নিকট তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রেরণের জন্য তারা সুযোগ খুঁজিতেছিল। ইতোমধ্যে শহরে একটি খুন হয়ে গেল। গভর্নর সেই খুনের বিচারে তিন ব্যক্তির প্রাণদণ্ড করেন। তাহাদের নগর তোরণে প্রকাশ্য স্থানে বধ করা হয়। প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজনেরা ইহাতে গভর্নরের উপর অতিশয় ক্রুদ্ধ হয় এবং ইহার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তারা বদ্ধপরিকর হয়। ইহার কিছুকাল পরে একদিন গভর্নর যখন সুরাপানে বিভোর অবস্থায় ঘুমাইয়া পড়েন, তারা ঐ সময় কোনও কৌশলে তাঁর আঙুলী হইতে সরকারি সিলমোহরের অঙ্গুরীটি খুলিয়া লইতে সমর্থ হয়। একদল লোক এই অঙুরী লইয়া মদিনায় যায় এবং গভর্নরের অসংযত চরিত্রের অকাট্য প্রমাণ স্বরূপ উহা খলিফার নিকট উপস্থিত করে। তারা ইহার চাইতেও গুরুতর আর একটি অভিযোগ উপস্থিত করে এই বলিয়া, একদিন প্রভাতে গভর্নর যখন মসজিদে ফযরের নামাজে ইমামতি করিতেছিলেন, তখন তিনি এমনই নেশাগ্রস্ত ছিলেন, প্রথম দুই রাকাত নামাজের পর সালাম না ফিরাইয়া পরবর্তী দুই রাকাত আরম্ভ করিয়া দেন। ইহার চাইতে গুরুতর কেলেঙ্কারী ইসলামে আর কি হইতে পারে। শরীয়তের মর্যাদা কিছুতেই ক্ষুণ্ণ করা যায় না। এজন্য খলিফা এবার বাধ্য হয়ে তাঁকে পদচ্যুত করিলেন। কথিত আছে, তিনি মদিনায় আনীত হইলে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী তাঁকে বেত্রদণ্ড প্রদান করা হয়। ইহার ফলে খলিফা আর একজন শক্তিশালী বীর পুরুষের সহানুভূতি হইতে বঞ্চিত হইলেন।
গভর্নর ওলিদ খলিফার আদেশে অপসারিত হইলে, তাঁর স্থলে সাঈদ বিন আর আস নামক এক তরুণ বয়স্ক কোরাইশ গভর্নর নিযুক্ত হন। এই সাঈদ ছিলেন যুদ্ধ ব্যবসায়ী। ঐ সময় তিনি বসরার সেনাপতিরূপে খোরাসানের বিদ্রোহ দমনে লিপ্ত ছিলেন। খোরাসান আয়ত্তে আনিয়া তিনি যখন সসৈন্যে মধ্য এশিয়ার দিকে অগ্রসর হইতেছিলেন, এমন সময় তিনি খলিফার নিকট হইতে ফরমান লাভ করেন কুফার শাসনভার গ্রহণের জন্য। তিনি বসরার সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব ত্যাগ করিয়া কুফায় যাইতে বাধ্য হইলেন। তিনি কোরাইশ ছিলেন এবং কোরাইশদের যাবতীয় দোষ ও গুণ পূর্ণমাত্রায় তাঁহাতে বিদ্যমান ছিল। তিনি অ-কোরাইশদের হীন মর্যাদার লোক বিবেচনা করিতেন। বিশেষ করিয়া কুফার বেদুইন সম্প্রদায়ের প্রতিপত্তি দেখিয়া তিনি অত্যন্ত চটিয়া যান। তারা স্থানীয় কোরাইশদের নিকট নতি স্বীকার করিত না। অথচ কুফায় তারাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। এজন্য তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে খলিফাকে লিখিয়া পাঠান, এখানকার লোকেরা অত্যন্ত উদ্ধত ও বেয়াদব; ইহারা অভিজাত বংশীয় নহে। এই বিপুল সংখ্যক নাগরিকদের আমি লৌহ ডাণ্ডা দ্বারা শাসিত রাখিব। তাঁর ব্যবহারে কুফার অধিবাসীরা অল্পদিনের ভিতরই বুঝিতে পারিল, এক কোরাইশ গিয়াছে অন্য কোরাইশ আসিয়াছে, কিন্তু তাদের ভাগ্যেন্নতির আশা তাতে কিছুই নাই। কেন-না যিনি আসেন, তিনি পূর্বের জনের চাইতে উৎকৃষ্ট প্রতিপন্ন হন না। বরং তারা যেন তপ্ত কটাহ হইতে জ্বলন্ত আগুনে পতিত হয়। বলা বাহুল্য শাসক সম্প্রদায়ের সম্বন্ধে জনগণের মনে এইরূপ হতাশা ও বীতরাগ ক্রমেই দানা বাঁধিয়া থাকিলে, পরিশেষে উহা রাষ্ট্রদ্রোহ ও শাসকদের প্রতি অবাধ্যতায় রূপান্তরিত না হয়ে যায় না। কুফায় ঘটনা-স্রোত সেইদিকেই ধাবিত হইতেছিল।
নতুন গভর্নর সাঈদ অর্বাচীনের মতো কোরাইশদের অহমিকা ও ঔদ্ধত্যের পোষকতা করিয়া এবং স্থানীয় আরব যোদ্ধৃশ্রেণির দাবি-দাওয়া অগ্রাহ্য করিয়া দারুণ নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেন। কেন-না, ইহা অনস্বীকার্য ছিল, ইহাদের তরবারির জোরেই এ যাবৎ মুসলিম দ্বিগ্বিজয় সম্ভবপর হয়েছিল। তৎকালে একটি রীতি ছিল, গভর্নর দিনান্তে রাজকার্য সমাপ্ত করিয়া সন্ধ্যায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহিত বৈঠকে মিলিত হইতেন এবং তাঁহাদের সহিত গল্পগুজবে অবকাশ কাটাইতেন। এই বৈঠকে রাজনৈতিক, সামাজিক এমন কি ব্যক্তিগত অনেক কথা গল্পচ্ছলে আলোচিত হইত। নাগরিকগণও স্বচ্ছন্দে তাদের মনের কথা প্রকাশ করিতে পারিত। একদিন এমনই এক বৈঠকে সাঈদ প্রকাশ করেন যে, চ্যালডিয়ার মনোরম উপত্যকা (সোয়াদ) কোরাইশদেরই রক্ষিত উদ্যান। ইহাতে অ-কোরাইশ আরবগণ, বিশেষ করিয়া ইয়েমেনী অধিবাসীরা উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করিয়া উঠে, 'তবে কি আমাদের শক্তিশালী ও অব্যর্থ বর্শার সাহায্য ছাড়াই কোরাইশগণ কখনও ঐ উদ্যানগুলো দখলে আনিতে পারিত?' এক অর্বাচীন যুবক গভর্নরকে সমর্থন করিতে যাইয়া জনতার হস্তে মার খাইয়া মূর্ছিত হয়ে পড়িল। গভর্নরের দেহরক্ষীগণ উত্তেজিত জনতাকে থামাইতে গিয়া অপদস্ত হইল। গভর্নর ক্রুদ্ধ হয়ে বৈঠক ত্যাগ করিলেন। তদবধি তিনি আর এরূপ বৈঠকে আসেন নাই এবং এই সাধারণ মিলন-সংস্থা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মিলন-সংস্থা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মিলন-সংস্থা বন্ধ হয়ে গেলেও শহরে নানারূপ গুজব রটনা চলিতেই থাকে।
তার ফলে গণ-বিক্ষোভ চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়ে এবং রাস্তা-ঘাটে ও কফিখানায় রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা একরূপ প্রকাশ্যভাবেই চলিতে থাকে। অবস্থা এমন দাঁড়ায়, অসহায় গভর্নর তখন কুফার এই রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে খলিফার নিকট রিপোর্ট পাঠান ছাড়া আর কিছুই করার পথ পান নাই। হজরত ওসমান তাঁর রিপোর্ট পাঠ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তাহা পরে বিবৃত হইবে।