📄 গভর্নর মুসা আল আশারির পদচ্যুতি এবং আবদুল্লাহ বিন আমিরের নিয়োগ
হিজরি ২৪ হইতে ২৯ সন পর্যন্ত খলিফা বসরার রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে কোনও রূপ হস্তক্ষেপ করেন নাই। মুসলিম সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক দিয়া কুফার পরেই ছিল বসরার স্থান। কুফা উত্তর-ইরাকের এবং বসরা দক্ষিণ ইরাকের রাজধানী ছিল। বসরার অবস্থান-আরব-আজমের সীমা রেখার ওপর। এজন্য উহাকে আরব-আজমের সন্ধিস্থল বলা যাইতে পারে। এখান হইতে খলিফার নিয়োজিত গভর্নর দক্ষিণ-পারস্য, 'বেলুচিস্তান ও মধ্য এশিয়া পর্যন্ত হকুমাত চালাইতেন। দক্ষিণে কুয়াইত এলাকাও ইঁহারই শাসনাধীন থাকিত। ইরাকের বুদ্ধিজীবী ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের অধিকাংশের আবাসভূমি ছিল এই বসরা। প্রসিদ্ধ তাপস হাসান বসরী ও আবেদা রাবিয়ার পুণ্যস্মৃতি বহন করিয়া উহা ধন্য হয়েছে। মুক্তবুদ্ধির প্রতীক সুতাজিলা মতবাদও এইখানেই লালিত হয়েছিল। হজরত উহাকে আন্তর্জাতিক বন্দরে পরিণত করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির বাণিজ্যতরীসমূহ এই বসরার কূলে আসিয়া ভিড়িত। দক্ষিণ-ভারতের পণ্যসম্ভারও তৎকালে এই বসরার পথেই মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশ লাভ করিত।
হিজরি ২৪ সনে হজরত উমর কর্তৃক আবু মুসা আশারী বসরার গভর্নর নিযুক্ত হন। তদবধি তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। কথিত আছে, দীর্ঘকাল একই স্থানে শাসক নিযুক্ত থাকার ফলে আবু মুসার ব্যবহারে বৈষম্য দেখা দিয়েছিল। কিছু সংখ্যক লোক তাঁর প্রিয়পাত্র হয় এবং অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা লাভ করিতে থাকে। তাঁর অসীম ক্ষমতা তাঁকে কিছুটা আত্মম্ভরীও করেছিল। তিনি যাহা খুশি তাহাই করিতেন এবং একটি দল সর্বদা তাঁকে সমর্থন করিত। জনসাধারণ তাঁর স্বেচ্ছাচারিতায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। শেষ পর্যন্ত তিনি একটি সীমাবদ্ধ দলের বাহিরে তাঁর জনপ্রিয়তা হারাইয়া বসেন। এই সুযোগে বসরায় তাঁর বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বিরোধীদল গড়িয়া উঠে। হজরত উমরের সময় এই প্রকার দল সৃষ্টি কয়েকবার হয়েছিল। কিন্তু হজরত উমর তাহাদের কঠোরভাবে শাসাইয়া দিতেন। রাজদ্রোহমূলক কার্যকলাপ রোধ করার জন্য তিনি সর্বদাই কড়া ব্যবস্থা অবলম্বন করিতেন। হজরত উমরের মৃত্যুর পর লোকেরা সাহস সঞ্চয় করে এবং প্রবলভাবে আবু মুসার বিরুদ্ধাচরণ করিতে থাকে। এই মনোভাব নিকটবর্তী অন্যান্য এলাকায়ও ছড়াইয়া পড়ে এবং কারদুন নামক একটি এলাকা গভর্নরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।
হজরত ওসমানের আমলে বসরার বিরোধীদল আবু মুসার বিরুদ্ধে নয়া অভিযোগ উত্থাপনের সুযোগ খুঁজিতেছিল। একটি সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া তারা তুমুল আন্দোলন সৃষ্টি করে। ঘটনাটি এই-একদিন আবু মুসা মসজিদে জিহাদ সম্বন্ধে বক্তৃতা দান করিতেছিলেন। তিনি লোকদের এই মর্মে উপদেশ দেন, আল্লাহ্ পথে (অর্থাৎ জিহাদে) চলিত সকলের পায়দলে চলা উচিত, অশ্ব বা উষ্ট্রের জন্য দাবি করা উচিত নয়। আরাম আয়েশ ত্যাগ করিয়া প্রত্যেকেরই কষ্ট স্বীকার করা উচিত। এই বক্তৃতার পর অনেক মু'মীন মুসলমান পায়ে হাঁটিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে যাইতে প্রস্তুত হয়। এমন কি যাদের ঘোড়া মজুদ ছিল তারাও এই নীতি গ্রহণ করে। কিন্তু অবশিষ্ট লোকেরা তাদের হাকিম অর্থাৎ গভর্নরের যুদ্ধযাত্রা না দেখা পর্যন্ত নিজেদের পায়ে হাঁটা না হাঁটার প্রশ্ন মুলতবি রাখে। পরদিন প্রভাতে মুসলিম মুজাহিদগণ যখন গভর্নরের প্রাসাদের সম্মুখে সমবেত হইল, তখন তারা বিস্ময়ের সহিত লক্ষ্য করিল, আবু মুসা একটি সুন্দর তুর্কি ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে প্রাসাদ হইতে নির্গত হইতেছেন এবং তাঁর সা'মান ও আসবাব বোঝাই চল্লিশটি খচ্চর সারি বাঁধিয়া অগ্রসর হইতেছে। তখন লোকেরা তাঁর সমীপবর্তী হয়ে তাঁর অশ্বের বল্লা ধরিল এবং অশ্বগমনে বাধাপ্রদান করিয়া বলিল, 'আপনার কথা ও কাজে এত পার্থক্য কেন? লোককে উপদেশ দেন, নিজে তাহা পালন করেন না কেন? আপনি বরং চড়িবার জন্য ঐ জানোয়ারগুলো আমাদের দিন এবং নিজে পায়ে হাঁটিয়া কষ্ট সহিষ্ণুতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন।' আবু মুসা আল আশারী লোকদের ধমকাইয়া দিলেন। তাদের অভিযোগের কোনও সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারিলেন না।
এই সময় একদল বিরুদ্ধবাদী তাঁর সম্বন্ধে অভিযোগ লইয়া মদিনায় গমন করে। তারা খলিফার নিকট তাঁর পদচ্যুতির জন্য দাবী জানায়। অবশ্য উপরোক্ত ঘটনাই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের একমাত্র ভিত্তি ছিল না। তারা আরও অভিযোগ করে, আবু মুসা অমিতব্যয়ী এবং কোরায়েশদের খুশি রাখার জন্য অন্যান্য আরব-গোত্রের উপর অবিচার করিয়া থাকেন।
খলিফা আবু মুসার কার্যকলাপে অসন্তুষ্ট হয়ে ২৯ হিজরিতে তাঁকে পদচ্যুত করেন এবং তাঁর স্থলে আবদুল্লাহ বিন আমর নামক একজন অজ্ঞাত অখ্যাত ব্যক্তিকে বসরার গভর্নর নিযুক্ত করিয়া পাঠান।
উপযুক্ত প্রমাণ প্রয়োগ ছাড়াই শুধু লোকদের কথামতো খলিফা ষাট বৎসর বয়স্ক একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে এইভাবে অপসারিত করায় এবং তাদের পছন্দমতো ব্যক্তিকে তাঁর স্থলবর্তী করায় শুধু নিন্দাভাজন হন না, একজন শক্তিশালী জননায়কের সহযোগিতা হইতেও বঞ্চিত হন। নব নিযুক্ত গভর্নর আবদুল্লাহ বিন আমর বসরার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় শাসন পরিচালনায় সক্ষম হন নাই। এজন্য অল্পদিন পরেই খলিফা নিজের চব্বিশ বৎসর বয়স্ক এক মামাতো ভাইকে তাঁর স্থলে বসরার গভর্নর নিযুক্ত করেন। ইঁহার নাম ওবায়দুল্লাহ ওরফে আবদুল্লাহ্ ইবনে আমির। হজর গোত্রের লোকেরা নাকি খলিফাকে বলিয়াছিল, 'আপনার কি তরুণ-বয়স্ক কোনও পুত্র নাই, যিনি বৃদ্ধ মুসার স্থানে বসিতে পারেন?' যাহা হউক, আবদুল্লাহর নিয়োগ-সংবাদ বসরায় পৌঁছিলে আবু মুসা লোকদের বলেন, না, এইবার তোমাদের মনের মতো ট্যাক্স আদায়কারী পেয়েছ, যার জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর (জ্ঞাতি-ভ্রাতা, মাতুল, পিতৃব্য ইত্যাদির) সংখ্যা বিপুল এবং যিনি ঐসব লোকের নিয়োগ দ্বারা তোমাদের ধন্য করিতে পারিবেন। আবু মুসার ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। আবদুল্লাহ্ ইবনে আমির জবরদস্ত শাসনকর্তা ছিলেন। তিনি অবিলম্বে স্থানীয় শাসন বিভাগের যাবতীয় উচ্চপদ ও পারস্যের সামরিক বিভাগের উল্লেখযোগ্য পদগুলো নিজের লোক দ্বারা পূর্ণ করেন। কঠোরভাবে শাসন চালাইয়া তিনি লোকদের ভিতর ত্রাস সৃষ্টি করেন। তার ফলে চতুর্দিকে যখন খলিফার বিরুদ্ধে এবং কোরায়েশদের প্রতিকূলে ষড়যন্ত্র চলিতে থাকে বসরায় তখন কোনও তৎপরতা দেখা যায় নাই। তিনি একজন তেজস্বী যোদ্ধাও ছিলেন এবং জঙ্গের ময়দানে সম্মুখের কাতারে দাঁড়াইয়া স্বয়ং তরবারি চালাইতেন। এদিক দিয়া তিনি মিসর-বিজয়ী আমর ইবনে আল আসকেও হার মানাইয়াছিলেন। মুসলিম রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব বিধান ও বিস্তারকল্পে তিনি বহু যুদ্ধ-বিগ্রহে অংশগ্রহণ করেছিলেন। খলিফার অনুকূলে তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তাহা প্রশংসনীয়। খলিফার বিরুদ্ধে যখন চতুর্দিকে বিদ্রোহের আগুন ধুমায়িত হয়, তখন বসরাকে তিনি শান্ত রাখিতে পারিয়াছিলেন।
📄 মধ্য এশিয়ায় বিজয় অভিযান
আবদুল্লাহ্ বিন আমিরকে গভর্নর-পদে নিযুক্ত হওয়ার পরই পূর্ব-পারস্য ও মধ্য এশিয়ায় বিদ্রোহ দমনের দায়িত্ব গ্রহণ করিতে হয়। বসরার গভর্নরই তৎকালে মুসলিম সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চল শাসন করিতেন, একথা পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। খোরাসান ছিল পূর্বাঞ্চলের সর্বাপেক্ষা উন্নত ও সমৃদ্ধ প্রদেশ। কিন্তু এই খোরাসান চিরকালই মুসলিম সাম্রাজ্যের পক্ষে বিপজ্জনক প্রতিপন্ন হয়েছে। হিজরি ৩০ সনে আবু মুসা আল আশারীর পদচ্যুতির সুযোগ গ্রহণ করিয়া খোরাসানবাসীরা মস্তকোত্তোলন করে। আবদুল্লাহ্ বিন আমির এই বিদ্রোহ দমনের জন্য সাঈদ বিন আল আস নামক এক তরুণ-বয়স্ক সেনাপতিকে এই অভিযানের পরিচালক নিযুক্ত করেন। তদনুসারে সাঈদ সসৈন্যে খোরাসানের দিকে নির্গত হয়ে যান। তাঁর সঙ্গে মদিনার বহু খ্যাতানামা যোদ্ধা এই যুদ্ধে তাঁহাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য আবদুল্লাহ ইবনে অপসারিত করিয়া সাঈদ বিন আল আসকে তাঁর স্থলে নিয়োজিত করেন। সাঈদ স্থানান্তর গমনের পর বসরার গভর্নর আবদুল্লাহ বিন আমির স্বয়ং এই যুদ্ধ পরিচালনা ভার গ্রহণ করেন।
আবদুল্লাহ্ বিন আমির বুঝিতে পারিয়াছিলেন, জৈহুন না তুর্কী জাতির বাস তারা পর্যুদস্ত না হওয়া পর্যন্ত পরিচালনার আশা সুদূরপরাহত। তাই করেছিলেন। তদনুসারে নিশাপুরের
📄 আর্মেনিয়া ও ককেসাস বিদ্রোহ
পারস্যের বিদ্রোহ দমন হইলে আমির মু'য়াবিয়া কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী এলাকা ও ককেসাস অঞ্চলকে সম্পূর্ণরূপে মুসলিম অধিকারে আনিবার জন্য মনোনিবেশ করিলেন। হিজরি ৩২ সনে তিনি সেনাপতি হাবিবকে ককেসাসের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। হাবিব ছয় হাজার সৈন্য লইয়া আর্মেনিয়ার উপর দিয়া দ্রুত অগ্রসর হইতে থাকেন এবং পথে রোমকদের সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে দরবন্দ নামক স্থানে উপনীত হন। দরবন্দ ছিল তুর্কিদের অধিকারে। তাহারা হাবিবের সহিত সন্ধি করিয়া আরবদের হস্তে দরবন্দ সমর্পণ করে। ইহার পর হাবিব ককেসাসের পর্বতমালা অতিক্রম করিয়া আরও উত্তরে অগ্রসর হন। ইতোমধ্যে বসরা হইতে সেনাপতি সালমান একদল সৈন্যসহ হাবিবের সহিত মিলিত হন। দুই বাহিনী একত্র হয়ে ককেসাসের আরও অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং বেলাঞ্জর নামক স্থানে তুর্কিদের গতিরোধ করে। বেলাঞ্জরে এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলিম বাহিনী যখন জয়ের মুখে উপনীত হয়েছে, তখন হঠাৎ আরব-সেনাপতি সালমান শত্রুর নিক্ষিপ্ত এক শরাঘাতে মৃত্যুমুখে পতিত হন। আরব শিবিরে নৈরাশ্য নামিয়া আসে। তারা আর অগ্রসর হইতে পারিল না।
ইরাকিদের সহিত সিরিয়াবাসীদের মনোমালিন্যের দরুন এই যুদ্ধ আরও জটিল হয়ে পড়ে। সিরিয়ার গভর্নর মু'য়াবিয়া এই দুর্ঘটনার সংবাদ পাইয়া এক বিরাট সিরীয় বাহিনী সালমানের সাহায্যার্থে পাঠাইয়া দেন। এই বাহিনী মেসেপটেমিয়া অতিক্রম করিয়া তাইগ্রিসের তীর দিয়া দ্রুত রণাঙ্গণে উপনীত হইল। কিন্তু তারা ইরাকিদের ভালো চক্ষে দেখিত না। ইরাকি সেনাপতির অধীনে কাজ করিতে তারা অস্বীকার করিল। বিরোধ ঘনীভূত হয়ে উঠায় ইরাকি বাহিনী স্ট্রিীয়া সেনাদলের সাহায্য অভাবে কামরান পর্বতের উপরে তুষারের ভিতর প্রাণ হারাইল। শুধু দুইটি প্রাণী কোনও মতে আত্মরক্ষা করিয়া তাদের শোচনীয় দুঃখের কাহিনি বলিতে ইরাকে উপনীত হইল। এই দুর্ঘটনার ফল হয় মারাত্মক। অল্প দিন পরে মধ্য এশিয়ার তুর্কিগণও বিদ্রোহ করে। কিন্তু ইরাকে নতুন সৈনিকের কখনও অভাব দেখা যায় নাই। দলের পর দল আরব বাহিনী কাস্পিয়ান তীর ও মধ্য এশিয়া আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। উপর্যুপরি সংঘর্ষের পরে তুর্কিগণ পুনরায় আরব জাতির পদানত হইল এবং খলিফার শাসন তাদের উপর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হইল।
এদিকে আরব জাতি যখন ককেসাস ও মধ্য এশিয়া লইয়া বিব্রত সেই সুযোগে হিজরি ৩৪ সনে খোরাসান আর একবার বিদ্রোহ করার চেষ্টা করে। আবদুল্লাহ্ ইবনে আমির এবার আখক বিন কায়েস নামক এক তরুণ সেনাপতিকে উক্ত বিদ্রোহ দমনে প্রেরণ করেন। বিদ্রোহীরা সহজেই আরব-আরব-বাহিনীর নিকট নতি স্বীকার করে এবং পুনরায় খলিফার শাসন মানিয়া লয়।
📄 কুফায় গোলযোগ-ওলিদের পদচ্যুতি ও সইদ বিন আল আ’সের গভর্নর পদে নিয়োগ
কুফার ওলিদ বিন ওব্বা গভর্নর হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দিয়াছিলেন, একথা পূর্বে বলা হয়েছে। কিন্তু তাঁর শত্রুরও অভাব ছিল না। তারা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল এবং তাঁর কার্য-কলাপের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখিত। খলিফার নিকট তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রেরণের জন্য তারা সুযোগ খুঁজিতেছিল। ইতোমধ্যে শহরে একটি খুন হয়ে গেল। গভর্নর সেই খুনের বিচারে তিন ব্যক্তির প্রাণদণ্ড করেন। তাহাদের নগর তোরণে প্রকাশ্য স্থানে বধ করা হয়। প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজনেরা ইহাতে গভর্নরের উপর অতিশয় ক্রুদ্ধ হয় এবং ইহার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তারা বদ্ধপরিকর হয়। ইহার কিছুকাল পরে একদিন গভর্নর যখন সুরাপানে বিভোর অবস্থায় ঘুমাইয়া পড়েন, তারা ঐ সময় কোনও কৌশলে তাঁর আঙুলী হইতে সরকারি সিলমোহরের অঙ্গুরীটি খুলিয়া লইতে সমর্থ হয়। একদল লোক এই অঙুরী লইয়া মদিনায় যায় এবং গভর্নরের অসংযত চরিত্রের অকাট্য প্রমাণ স্বরূপ উহা খলিফার নিকট উপস্থিত করে। তারা ইহার চাইতেও গুরুতর আর একটি অভিযোগ উপস্থিত করে এই বলিয়া, একদিন প্রভাতে গভর্নর যখন মসজিদে ফযরের নামাজে ইমামতি করিতেছিলেন, তখন তিনি এমনই নেশাগ্রস্ত ছিলেন, প্রথম দুই রাকাত নামাজের পর সালাম না ফিরাইয়া পরবর্তী দুই রাকাত আরম্ভ করিয়া দেন। ইহার চাইতে গুরুতর কেলেঙ্কারী ইসলামে আর কি হইতে পারে। শরীয়তের মর্যাদা কিছুতেই ক্ষুণ্ণ করা যায় না। এজন্য খলিফা এবার বাধ্য হয়ে তাঁকে পদচ্যুত করিলেন। কথিত আছে, তিনি মদিনায় আনীত হইলে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী তাঁকে বেত্রদণ্ড প্রদান করা হয়। ইহার ফলে খলিফা আর একজন শক্তিশালী বীর পুরুষের সহানুভূতি হইতে বঞ্চিত হইলেন।
গভর্নর ওলিদ খলিফার আদেশে অপসারিত হইলে, তাঁর স্থলে সাঈদ বিন আর আস নামক এক তরুণ বয়স্ক কোরাইশ গভর্নর নিযুক্ত হন। এই সাঈদ ছিলেন যুদ্ধ ব্যবসায়ী। ঐ সময় তিনি বসরার সেনাপতিরূপে খোরাসানের বিদ্রোহ দমনে লিপ্ত ছিলেন। খোরাসান আয়ত্তে আনিয়া তিনি যখন সসৈন্যে মধ্য এশিয়ার দিকে অগ্রসর হইতেছিলেন, এমন সময় তিনি খলিফার নিকট হইতে ফরমান লাভ করেন কুফার শাসনভার গ্রহণের জন্য। তিনি বসরার সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব ত্যাগ করিয়া কুফায় যাইতে বাধ্য হইলেন। তিনি কোরাইশ ছিলেন এবং কোরাইশদের যাবতীয় দোষ ও গুণ পূর্ণমাত্রায় তাঁহাতে বিদ্যমান ছিল। তিনি অ-কোরাইশদের হীন মর্যাদার লোক বিবেচনা করিতেন। বিশেষ করিয়া কুফার বেদুইন সম্প্রদায়ের প্রতিপত্তি দেখিয়া তিনি অত্যন্ত চটিয়া যান। তারা স্থানীয় কোরাইশদের নিকট নতি স্বীকার করিত না। অথচ কুফায় তারাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। এজন্য তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে খলিফাকে লিখিয়া পাঠান, এখানকার লোকেরা অত্যন্ত উদ্ধত ও বেয়াদব; ইহারা অভিজাত বংশীয় নহে। এই বিপুল সংখ্যক নাগরিকদের আমি লৌহ ডাণ্ডা দ্বারা শাসিত রাখিব। তাঁর ব্যবহারে কুফার অধিবাসীরা অল্পদিনের ভিতরই বুঝিতে পারিল, এক কোরাইশ গিয়াছে অন্য কোরাইশ আসিয়াছে, কিন্তু তাদের ভাগ্যেন্নতির আশা তাতে কিছুই নাই। কেন-না যিনি আসেন, তিনি পূর্বের জনের চাইতে উৎকৃষ্ট প্রতিপন্ন হন না। বরং তারা যেন তপ্ত কটাহ হইতে জ্বলন্ত আগুনে পতিত হয়। বলা বাহুল্য শাসক সম্প্রদায়ের সম্বন্ধে জনগণের মনে এইরূপ হতাশা ও বীতরাগ ক্রমেই দানা বাঁধিয়া থাকিলে, পরিশেষে উহা রাষ্ট্রদ্রোহ ও শাসকদের প্রতি অবাধ্যতায় রূপান্তরিত না হয়ে যায় না। কুফায় ঘটনা-স্রোত সেইদিকেই ধাবিত হইতেছিল।
নতুন গভর্নর সাঈদ অর্বাচীনের মতো কোরাইশদের অহমিকা ও ঔদ্ধত্যের পোষকতা করিয়া এবং স্থানীয় আরব যোদ্ধৃশ্রেণির দাবি-দাওয়া অগ্রাহ্য করিয়া দারুণ নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেন। কেন-না, ইহা অনস্বীকার্য ছিল, ইহাদের তরবারির জোরেই এ যাবৎ মুসলিম দ্বিগ্বিজয় সম্ভবপর হয়েছিল। তৎকালে একটি রীতি ছিল, গভর্নর দিনান্তে রাজকার্য সমাপ্ত করিয়া সন্ধ্যায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহিত বৈঠকে মিলিত হইতেন এবং তাঁহাদের সহিত গল্পগুজবে অবকাশ কাটাইতেন। এই বৈঠকে রাজনৈতিক, সামাজিক এমন কি ব্যক্তিগত অনেক কথা গল্পচ্ছলে আলোচিত হইত। নাগরিকগণও স্বচ্ছন্দে তাদের মনের কথা প্রকাশ করিতে পারিত। একদিন এমনই এক বৈঠকে সাঈদ প্রকাশ করেন যে, চ্যালডিয়ার মনোরম উপত্যকা (সোয়াদ) কোরাইশদেরই রক্ষিত উদ্যান। ইহাতে অ-কোরাইশ আরবগণ, বিশেষ করিয়া ইয়েমেনী অধিবাসীরা উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করিয়া উঠে, 'তবে কি আমাদের শক্তিশালী ও অব্যর্থ বর্শার সাহায্য ছাড়াই কোরাইশগণ কখনও ঐ উদ্যানগুলো দখলে আনিতে পারিত?' এক অর্বাচীন যুবক গভর্নরকে সমর্থন করিতে যাইয়া জনতার হস্তে মার খাইয়া মূর্ছিত হয়ে পড়িল। গভর্নরের দেহরক্ষীগণ উত্তেজিত জনতাকে থামাইতে গিয়া অপদস্ত হইল। গভর্নর ক্রুদ্ধ হয়ে বৈঠক ত্যাগ করিলেন। তদবধি তিনি আর এরূপ বৈঠকে আসেন নাই এবং এই সাধারণ মিলন-সংস্থা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মিলন-সংস্থা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মিলন-সংস্থা বন্ধ হয়ে গেলেও শহরে নানারূপ গুজব রটনা চলিতেই থাকে।
তার ফলে গণ-বিক্ষোভ চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়ে এবং রাস্তা-ঘাটে ও কফিখানায় রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা একরূপ প্রকাশ্যভাবেই চলিতে থাকে। অবস্থা এমন দাঁড়ায়, অসহায় গভর্নর তখন কুফার এই রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে খলিফার নিকট রিপোর্ট পাঠান ছাড়া আর কিছুই করার পথ পান নাই। হজরত ওসমান তাঁর রিপোর্ট পাঠ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তাহা পরে বিবৃত হইবে।