📄 মুসলিম নৌবাহিনী গঠন ও সাইপ্রাস অধিকার (২৮ হি.)
উত্তর-আফ্রিকায় গ্রিক অর্থাৎ পূর্ব-রোমক উদ্ধত শক্তি প্রতিহত হইলেও সমগ্র ভূমধ্যসাগর তাদের করতলগত থাকায় মুসলিম সাম্রাজ্যের বিপদাশঙ্কা দূরীভূত হয় নাই। এই বিশাল সাগর পূর্বে এশিয়ার এবং দক্ষিণে আফ্রিকার উপকূলভাগ বিধৌত করায় এখান হইতে এই উভয় মহাদেশের উপকূলবর্তী জনপদসমূহের উপর হামলা চালাইবার সুযোগ ছিল। ভূমধ্যসাগরে অবস্থিত দ্বীপসমূহের ভিতর গ্রিক অধিকৃত সাইপ্রাস ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাইপ্রাসের পার্শ্ববর্তী রোডস দ্বীপও গ্রিকদের অধিকারে ছিল। সাইপ্রাস ছিল পূর্বাঞ্চলে তাদের রণতরীসমূহের বৃহত্তম ঘাঁটি।
সাইপ্রাসকে আরবেরা করস বলিত। এই করস ছিল তাদের নিকট এক বিরাট রহস্যঘেরা দেশ। এই অজানা দেশকে আশ্রয় করিয়া কত না কল্পনা তাদের চিত্তে অহর্নিশ দোলা দিত। এই দ্বীপের গ্রিকনাম কাইপ্রস (Kypros) এবং এই কাইপ্রসই আরবি 'কবরস'। উহা পূর্ব মেডিটারেনীয়ান এলাকায় অবস্থিত। সিরিয়া হইতে তার দূরত্ব প্রায় ৬০ মাইল।
এখানে মুসলিমদের প্রবেশাধিকার ছিল না। শুধু বাণিজ্যিক আদান-প্রদান ছাড়া এই বৃহৎ লোকালয়ের সহিত তাদের কোনও প্রকার সম্পর্ক ছিল না। পক্ষান্তরে এখানকার গ্রিক নৌবহর আরব জাতির পক্ষে বরাবরই ত্রাসের কারণ ছিল।
সিরিয়া প্রদেশের দূরদর্শী গভর্নর আমির মু'য়াবিয়া নামক অনেক দিন হইতে ভূমধ্যসাগরে মুসলিম অধিকার স্থাপন করিয়া গ্রিকদের আক্রমণ হইতে মুসলিম দেশগুলোকে নিরাপদ করার বাসনা পোষণ করিতেছিলেন। কিন্তু এ কাজের জন্য জলযুদ্ধে অবতরণ করার প্রয়োজন। অথচ আরবদের তখন রণতরী বা নৌবাহিনী গড়িয়া ওঠে নাই। স্থলযুদ্ধে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন রণাঙ্গনে অজেয় প্রতিপন্ন হইলেও জলযুদ্ধে এ যাবৎ তারা শক্তি পরীক্ষার সুযোগ পায় নাই। ইতোপূর্বে হজরত উমরের আমলে মু'য়াবিয়া একবার লেভান্ট দ্বীপে অভিযান প্রেরণের উদ্দেশ্যে একটি নৌবাহিনী গঠনের অনুমতি চাহিয়া ছিলেন। লেভান্ট সিরিয়া দেশের পশ্চিম-উপকূলের সন্নিকটে অবস্থিত।
এশিয়া মাইনরের দক্ষিণ-উপকূল হইতেও তা দূরে নয়। এই দ্বীপ হইতে গ্রিকরা যুগপৎ সিরিয়ার পশ্চিম-উপকূল ও এশিয়া মাইনরের দক্ষিণ-উপকূল শাসন করত। সিরিয়ার পশ্চিম-উপকূলে অবস্থিত লেভান্ট শহর। তার সহিত লেভান্ট দ্বীপের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। লেভান্ট শহর ছিল গ্রিকদের স্থলসৈন্যের অন্যতম সেনানিবাস; আর লেভান্ট দ্বীপে থাকিত তাদের শক্তিশালী নৌবহর। হজরত ওসমানের রাজত্বের দ্বিতীয় বর্ষে সিরীয় সৈন্যগণ যখন এশিয়া মাইনরে অভিযান পরিচালনা করে ঐ সময় তারা লেভান্ট শহর অধিকার করিয়া লয়, একথা পূর্বে বলিয়াছি। কিন্তু তার বহুপূর্বে হজরত উমরের আমলে আমির মু'য়াবিয়া লেভান্ট দ্বীপ অধিকারে অনুমতি চাহিয়া ছিলেন। হজরত উমর তখন তাঁকে অনুমতি দেন নাই। মু'য়াবিয়া খলিফাকে লিখিয়াছিলেন, এই দ্বীপটি আমাদের সীমান্তের এত নিকটবর্তী যে সেখানকার ভোরের মোরগ ডাকা এবং কুকুরের ঘেউ ঘেউ আমরা এপারে বসিয়া শুনিতে পাই। এমন একটি স্থান শত্রুর অধিকারে থাকা মুসলিম সাম্রাজ্যের পক্ষে কিরূপ বিপজ্জনক আমিরুল মু'মিনীন নিজেই তাহা বুঝিতে পারেন, আমার বুঝাইয়া বলা আবশ্যক করে না। পার্শ্বেই বিশাল সাগরবক্ষ উন্মুক্ত রহিয়াছে অথচ মুসলিমদের সেখানে স্থান নাই। এই দ্বীপ গ্রিক হস্তে থাকিলে সাগরে কোনও দিন মুসলমানগণ নিরাপত্তা লাভ করিতে পারিবে না। কথিত আছে, হজরত উমর ইহার পর মিসরের গভর্নর কূটনীতিবিশারদ আমর বিন আল আসের পরামর্শ চাহিয়া পাঠান।
আমর উত্তরে লিখেন-ইয়া আমীরুল মু'মিনীন, সমুদ্র এমন একটি স্থান যাকে কোনও মতেই বিশ্বাস করা যায় না। মানুষ যতবড় বুদ্ধিমান ও ক্ষমতাশালী হউক, সেখানে সে নিতান্তই অসহায়। তাদের রণতরীগুলো যতই বৃহৎ আর দৃঢ় হউক, সমুদ্রে যখন ঝড়-তুফানের তাণ্ডব চলিতে থাকে তখন সেগুলো কোনই কাজে আসে না। সাগর বুকে যখন তরঙ্গগুলো গর্জিয়া উঠে এবং পর্বতাকার ঢেউগুলো একের উপর অন্য ঝাঁপাইয়া পড়িতে থাকে সেখানে তারা ঐ রণতরীগুলো লইয়া কাগজের নৌকার মতো লুফালুফি খেলিতে থাকে এবং পরিশেষে আরোহীসহ সেগুলোকে গ্রাস করিয়া ফেলে। মানুষকে তখন একান্তভাবে প্রকৃতির দয়ার উপর নির্ভর করিতে হয়। তাহার তেজ, বীর্য, বুদ্ধি, বল ও রণ-কৌশলের কোনও কিছুই তখন কাজে লাগে না। এমন একটা অসহায় ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে আমাদের বীর সন্তানগণের মূল্যবান জীবনকে ঠেলিয়া দিতে আমি কোনও ক্রমেই আপনাকে পরামর্শ দিতে পারিনা। স্থলভাগে আমরা শক্তিশালী থাকিলে সমুদ্র হইতে শত্রুরা আমাদের কিছুই করিতে পারিবে না। হজরত উমর আমরের এই যুক্তির সারবত্তা অনুধাবন করিয়া মু'য়াবিয়াকে জলযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা হইতে নিবৃত্ত করেন।
কিন্তু আমির মু'য়াবিয়া যাহা সঙ্কল্প করিতেন তাহা হইতে বিচ্যুত হইবার পাত্র ছিলেন না। ২৭ হিজরিতে হজরত ওসমানের রাজত্বকালে তিনি পুনর্বার তাঁর আর্জি পেশ করেন। লেভান্ট শহর ইতোপূর্বেই মুসলিমদের শাসনাধীনে আসিয়াছিল। এবার তিনি সাইপ্রাস দ্বীপ আক্রমণের অনুমতি চাহিয়া পাঠান। তিনি খলিফাকে বুঝাইয়া বলেন, জলযুদ্ধকে যতটা ভয় করা হয়, আসলে উহা ততটা ভয়ের বস্তু নয়। হজরত ওসমান সাইপ্রাস দ্বীপের অবস্থিতি ও গুরুত্ব অনুধাবন করিয়া মু'য়াবিয়াকে লিখেন, 'তোমার বর্ণনা যদি সত্য হয়, তবে সাইপ্রাস অভিযানে আমার আপত্তি নাই। তবে শর্ত এই, যে সকল লোক স্বেচ্ছায় জলযুদ্ধে যোগদান করিতে চাহিবে, শুধু তাহাদেরই সৈন্য দলে গ্রহণ করিবে। জবরদস্তি করিয়া কাহাকেও এই যুদ্ধে যোগদান করিতে বাধ্য করিবে না।'
মু'য়াবিয়া ইহাতে খুশি হইলেন। মুসলিম নৌ-বাহিনী গঠনের জন্য রাজধানীতে তোড়জোড় পড়িয়া গেল। বলা বাহুল্য, বীরপ্রসূ আরবে স্বেচ্ছাসেবকের অভাব ঘটিল না। দলে দলে যুবকেরা নৌবাহিনীতে নাম লেখাইতে লাগিল। অল্প দিনের ভিতর আবদুল্লাহ্ বিন কায়েস আল হারেসীর নেতৃত্বে এক শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়িয়া উঠিল। বহু বাণিজ্য-তরীকে রণ-তরীতে পরিণত করা হইল। এইভাবে উপযুক্ত নৌবহর গড়িয়া উঠার পর তারা 'আল্লাহ্ আকবর ধ্বনি তুলিয়া প্রথম সামুদ্রিক অভিযানে যাত্রা করিল (হিজরি ২৮ সন)
ঐতিহাসিকদের মতে ৬৪৯ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম নৌবাহিনী নিরাপদে করাস পৌছে। দ্বীপ হইতে অল্প দূরে তাদের রণতরীগুলো লঙ্গর করে। কব্রাসে উপস্থিত গ্রিক নৌবাহিনী তাদের অগ্রগতি রোধ করিয়া দাঁড়ায়। পরদিন উভয়পক্ষে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আরব সেনারা সুপ্রশস্ত স্থলভাগে যুদ্ধ করিয়া অভ্যস্ত, অপরিসর ডেকে দাঁড়াইয়া অস্ত্রচালনা ও রণকৌশল প্রদর্শন তাদের পক্ষে অসুবিধাজনক ছিল। পক্ষান্তরে গ্রিকগণ এই প্রকার যুদ্ধে পূর্ব হইতে অভ্যস্ত ছিল। যুদ্ধের প্রারম্ভেই সেনাপতি কায়েস শত্রুর আঘাতে গুরুতর রূপে আহত হন। তখন সুষ্ঠুয়ান বিন আউফ নামক অপর এক সেনাপতি আরববাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তারা কোনও মতে গ্রিক আক্রমণের সম্মুখে আত্মরক্ষা করিতে থাকিল। ইতোমধ্যে খলিফার নির্দেশক্রমে আবদুল্লাহ্ ইবনে আবি সারাহ্ একদল আরব সৈন্যসহ মিসর হইতে আসিয়া তাদের সঙ্গে মিলিত হইলেন।
এই সম্মিলিত বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে গ্রিকগণ পরাজিত হইল এবং বিজয়ী আরব-বাহিনী সাইপ্রাসে অবতরণ করিল। বহু গ্রিকসৈন্য এবং সাইপ্রাসের নৌযুদ্ধে যোগদানকারী অনেক নাগরিক আরবদের হস্তে বন্দি হয়েছিল। সাইপ্রাসের অধিবাসীরা মুসলিমদের নিকট আত্মসমর্পণ করিল এবং সন্ধিপ্রার্থী হইল। অতঃপর আমির মু'য়াবিয়ার নির্দেশক্রমে কতিপয় শর্তসাপেক্ষে এক সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হইল। স্থির হইল, দ্বীপবাসীগণ খলিফাকে বার্ষিক ৭০ হাজার দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) কর দিবে, কিন্তু তাদের শাসন-সংরক্ষণ তারা নিজেরাই চালাইবে, খলিফা তাতে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করিবেন না। শুধু পররাষ্ট্রীয় ব্যাপারে তাদের উপর এই দায়িত্ব থাকিবে যে, তাদের পার্শ্ববর্তী সাগর এলাকায় মুসলমানদের দুশমনের আগমন সংবাদ জানিতে পারিলে তারা তাহা মুসলমানদের গোচরে আনিবে। জিজিয়া কর তাহাদের দিতে হইবে না, কারণ, খলিফা তাহাদের শত্রুর আক্রমণ হইতে রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করিবেন না।
এই যুদ্ধের প্রথম সেনাপতি কায়েস জলযোদ্ধা হিসেবে আরব-ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। নৌ-বাহিনীর গঠন তাঁরই কৃতিত্ব। জলে-স্থলে অন্যূন পঞ্চাশটি যুদ্ধে তিনি নেতৃত্ব করেন। গ্রিক অধিকৃত একটি দ্বীপে অভিযান চালাইতে গিয়া তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আবদুল্লাহ্ বিন আবি সারাহ্ ও এই জলযুদ্ধে প্রথম বিজয়ী সেনাপতি রূপে অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেন। আরব ইতিহাসে তিনি নৌসেনাপতি রূপেই অধিক পরিচিত, যদিও স্থলযুদ্ধেও তাঁর ক্ষমতা কম ছিল না। এই যুদ্ধের ফলে আরবজাতি জলযুদ্ধের কলাকৌশল আয়ত্ত করিয়া ফেলে এবং নৌযোদ্ধা রূপে তাদের কৃতিত্ব উত্তরোত্তর বর্ধিত হইতে থাকে। ইহার পর সমগ্র ভূমধ্যসাগরে আরব রণতরী ও বাণিজ্য তরীসমূহ সগর্বে বিহার করিতে থাকে।
টিকাঃ
১. বর্তমানে এই দ্বীপের অধিবাসী সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লক্ষের ওপর। তাদের অধিকাংশ গ্রিক। মুসলিম অধিবাসীর সংখ্যা ৮০ হাজারের উর্ধে। তারা তুর্কি জাতীয়। মাউন্ট ওলিমপাস এখানকার প্রসিদ্ধ পর্বত। এখানকার খনিজ দ্রব্যসমূহের ভিতর তামা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 'কাইপ্রস' শব্দ হইতে নাকি কপার (Copper) নামের উৎপত্তি। সাইপ্রাসের সভ্যতা সুপ্রাচীন। খনন-কার্যের ফলে ইহার ভূগর্ভ হইতে যে-সব পুরাতন সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে তাহা হইতে প্রত্নতাত্ত্বিকরা অনুমান করেন খ্রিস্ট-পূর্ব তিন হাজার হইতে চার হাজার বৎসরের ভিতর এখানে নিওলিথিক জাতীয় লোকদের বসতি ছিল। খ্রিস্টের জন্মের দেড় হাজার বৎসর পূর্বে এই দ্বীপ গ্রিকদের অধিকারে আসে এবং গ্রিক সভ্যতা দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবান্বিত হয়। খ্রিস্ট-পূর্ব অষ্টম শতকে ফিনিশীয় জাতি এখানে বসতী স্থাপন করে। ইহার পর এই দ্বীপ যথাক্রমে এশিরীয়, মিসর ও পারসিক সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ শাসন বরাবর স্থানীয় রাজাগণই চালাইয়া আসিয়াছেন। খ্রিস্ট-পূর্ব ৩৩৩ সনে উহা কিছু কালের জন্য গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডারের অধিকারে চলিয়া যায়। তারপর পুনরায় উহা মিসরের অধীনতা স্বীকার করে। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮ সনে রোমান জাতি এখানে উপনিবেশ স্থাপন করে। সেই হইতে দীর্ঘকাল উহা রোমকদের শাসনাধীনে ছিল। ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে মুসরিমগণ যখন এই দ্বীপ জয় করে তখনও উহা পূর্ব রোমক (বাইজেনটাইন) সম্রাটের শাসনাধীন ছিল।