📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 মিসরের গভর্নর আমর বিন আল আ’সের অপসারণ

📄 মিসরের গভর্নর আমর বিন আল আ’সের অপসারণ


আলেকজান্দ্রিয়ায় গ্রিক-বিদ্রোহ দমনের সময়ই মিসরের সীমান্ত রক্ষার প্রশ্ন খলিফাকে চিন্তি করিয়া তোলে। তিনি সুযোগ পাইলেই আফ্রিকায় একটি অভিযান প্রেরণ করিবেন এবং গ্রিকরা যাহাতে পশ্চিম দিক হইতে মিসরকে বিপন্ন করিতে না পারে, তজ্জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, মনে মনে এইরূপ স্থির করেছিলেন। হিজরি ২৬ সনেই খলিফার অভিপ্রায় অনুযায়ী একটি শক্তিশালী আরব-বাহিনী মদিনা হইতে আফ্রিকায় যাত্রা করে। আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের এই নতুন অভিযাত্রী বাহিনীর নেতৃত্ব করেন।
মিসরে তখন শাসনসংক্রান্ত গোলযোগ চলিতেছিল। আমর রাজস্ব ও সেনা-বিভাগ উভয়ের উপর কর্তৃত্ব চালাইতেছিলেন, অথচ খলিফার ইহা অভিপ্রেত ছিল না। তিনি ইতোপূর্বে আমরের স্থলে আবদুল্লাহকে সমগ্র মিসরের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। আবদুল্লাহ্ বরাবর সেই স্বপ্ন দেখিতেন এবং আমরকে গভর্নর-পদে অনধিকার চর্চাকারী বলিয়া মনে করিতেন। এ অবস্থায় খলিফা নবপ্রেরিত আরব-বাহিনীর নেতৃত্ব আবদুল্লাহ্ ইবনে যুবায়েরের উপর ন্যস্ত রাখাই যুক্তিযুক্ত মনে করেন। পশ্চিম-আফ্রিকা এই সময় বহু সংখ্যক ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এগুলো বিভিন্ন গোত্রের দ্বারা শাসিত হইত। মিসরের নব প্রতিষ্ঠিত মুসলিম-রাষ্ট্রের প্রতি তাদের মনোভাব অনুকূল ছিল না। তারা যে-কোনো সময়ে ত্রিপলীতে অবস্থিত পূর্ব-রোমকদের সহিত মিলিত হয়ে মুসলিম রাষ্ট্রের ক্ষতি সাধন করিতে পারিত। আলেকজান্দ্রিয়ায় পরাজিত হওয়ার পর রোমকরাও ত্রিপলীতে তাদের অবস্থান দৃঢ়িতেছিল। তাই, খলিফা মিসরে ভাবি বিপদাশঙ্কা দূরীভূত করিবার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন।
আরব-বাহিনী খলিফার নির্দেশ মতো মিসর-সীমা অতিক্রম করিয়া ক্রমাগত পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়। তারা আলজিরিয়া ও মরক্কো পর্যন্ত মুসলিম বিজয়-স্রোত প্রবাহিত করে এবং মরক্কো-সীমান্তে পৌছিয়া স্পেনের মুখামুখী হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সমুদ্র পারের কোনও উপায় করিতে না পারায় সেই খানেই তারা এবারের অভিযান সমাপ্ত করে।
কিন্তু মিসরের স্বার্থে এতবড় একটা অভিযান পরিচালিত হইল অথচ মিসরের গভর্নর আমর ইহাতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাইলেন না, এই অপমান আমর বরদাশত করিতে পারেন নাই। পূর্ববর্তী দুই খলিফার আমলে যখনই কোনো বিজয়-অভিযানে রাজধানী হইতে বিদেশে সৈন্যবাহিনী প্রেরিত হয়েছে, স্থানীয় গভর্নরের হস্তে তার পরিচালনা ভার ন্যস্ত করা হয়েছে। আমির মু'য়াবিয়ার বেলায় হজরত ওসমান নিজেও এই নীতির অনুসরণ করেছিলেন। অথচ আমরের বেলায় তার ব্যতিক্রম হইল, ইহা কাহারও দৃষ্টি এড়ায় নাই। আলেকজান্দ্রিয়ার বিদ্রোহ দমনে আমর যে অসাধারণ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন এবং যে-ভাবে তিনি মুসলিম রাষ্ট্রকে বিপর্যয়ের মুখ হইতে রক্ষা করেন, বিপদের অবসানে খলিফা সে-সমস্ত বিস্মৃত হইলেন। কেহ কেহ এমন কথাও বলিয়াছিলেন, ইহার পর আমার ও আবদুল্লাহ্র বিরোধ ব্যাপারে খলিফা যে তদন্তের ব্যবস্থা করেন, উহা ছিল নামে মাত্র; আসলে খলিফার দুগ্ধভ্রাতাকে একটি মনের মতো পদে প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। অবশ্য একজনকে অপসারিত না করিয়া খলিফার উপায়ও ছিল না কেননা, আলেকজান্দ্রিয়া পুনর্বিজিত হইবার পর হইতে মিসরে যেভাবে দ্বৈতশাসন চলিতেছিল তাতে প্রজাগণের অসুবিধার সীমা ছিল না। আমার এবং আবদুল্লাহ্ উভয়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মাতিয়া শাসনসংক্রান্ত ব্যাপারে পরস্পরবিরোধী হুকুম জারি করিতেছিলেন। ফলে উভয়ের ভিতর মনোমালিন্য এত দূর গড়ায় যে, ২৭ হিজরিতে উভয়েই খলিফার নিকট অভিযোগ প্রেরণ করিতে বাধ্য হন।
আমর ইবনে আল আ'স আলেকজান্দ্রিয়ায় যুদ্ধজয়ের পর সেখান হইতে যুদ্ধবদ্ধ কিছু মালামাল সঙ্গে আনিয়াছিলেন। এই ব্যাপারকে ফলাও করিয়া খলিফার গোচরে আনা হয়। খলিফার নিকট সংবাদ পৌছে, আমর গ্রিকদের সহিত যুদ্ধে বিদ্রোহীদের ঘরবাড়ি লুণ্ঠন করিয়াছেন এবং তাঁহাদের লোকজনও বন্দি করিয়া গোলাম করিয়াছেন। খলিফার কোমল হৃদয় ইহাতে গলিয়া যায়। তিনি আমরের আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বন্দিদের অবিলম্বে মুক্তি প্রদান করিতে আদেশ দেন। ইহার পর আমর ও আবদুল্লাহ্ উভয়ের অভিযোগের উপর তদন্ত শুরু হয়। তদন্তে খলিফা আমরকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং তাঁকে গভর্নরের দায়িত্ব হইতে অব্যাহতি দিয়া শুধু সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব হাতে রাখিতে নির্দেশ দেন। আমর এই ব্যবস্থায় অত্যন্ত অপমানিত বোধ করেন এবং শুধু সেনাপতি হয়ে মিসরে থাকিতে অসম্মত হন। কারণ, সে থাকার অর্থ হয় আবদুল্লাহ্ অধীনতা স্বীকার করা। তেজস্বী আমর তাহা করিবেন কেন। তিনি ক্রুব্ধ হয়ে মদিনায় চলিয়া আসিলেন এবং খলিফার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনায় প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি সুযোগ পাইলেই খলিফাকে মুখের উপর কড়া কথা শুনাইতেন। খলিফা তাঁকে বিশেষ কিছু বলিতে পারিতেন না। তবে এই বৎসর মিসরের নতুন গভর্নর খলিফাকে বার্ষিক রাজস্ব হিসেবে চল্লিশ লক্ষ দিনার প্রেরণ করার পর খলিফা একদিন মসজিদের নামাজ অন্তে আমরকে শুনাইয়া বলিলেন, 'দেখ, শেষ পর্যন্ত উটনী তো বেশি দুধ দিল।' সঙ্গে সঙ্গে আমর জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, উট্রী বেশি দুধ দিয়াছে, কিন্তু বাচ্চা ভুখা' (অর্থাৎ প্রজাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কর আদায় করা হয়েছে)। তিনি নিজে পাঠাইতেন বার্ষিক মাত্র কুড়ি লাখ দিনার। যাহা হউক, মিসরের শাসন-ব্যবস্থায় এই রদবদল হজরত ওসমানের পক্ষে সুখের হয় নাই। মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ী অদ্বিতীয় বীর হিসেবে আমর সমগ্র মিসর দেশে যে খ্যাতি ও প্রতিপত্তির অধিকারী হয়েছিলেন আবদুল্লাহর তাহা ছিল না। তাঁর ব্যবহার ছিল ঔদ্ধত্যপূর্ণ। তাঁর জীবনের অতীত ইতিহাসও ছিল কদর্য। মিসরবাসীরা জানিতে পারিয়াছিল যে এই ব্যক্তি প্রথম জীবনে নবীর ওহি-লেখক নিযুক্ত হয়েছিলেন। হজরত ওসমানই তাঁকে নবীর নিকট লইয়া যান এবং ইসলামে দীক্ষা দেওয়াইয়া নবীর সন্নিকটে রাখিয়া দেন। তৎপর নবী তাঁকে ওহি লিখনের দায়িত্ব অর্পণ করেন। কিন্তু ওহী লেখার কাজে তিনি অবিশ্বাস্য প্রমাণিত হওয়ায় নবী তাঁকে তাড়াইয়া দেন। তিনি তখন পুনরায় কুরাইশ দলে ভিড়িয়া যান এবং নবীর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাইতে থাকেন। কুরআন ও ইসলামের উপর তাঁর শ্রদ্ধা ছিল না। নবীর মক্কা জয়ের পর যে কয়জন ব্যক্তিকে বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে নবী মৃত্যুদণ্ড দেন, তাদের ভিতর ইনিও ছিলেন। কথিত আছে, গোলমালের সময় তিনি কয়েকদিন হজরত ওসমানের গৃহে লুকাইয়া থাকেন। গোলমাল থামিয়া গেলে হজরত ওসমান তাঁকে নবীর নিকট লইয়া যান এবং তাহার প্রাণভিক্ষা চাহেন। নবী কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকেন।
তরপর হজরত ওসমানের প্রার্থনা মঞ্জুর করেন; কিন্তু বলিয়া দেন, ঐ ব্যক্তি যেন তাঁর সামনে আর না আসে। এহেন লোককে হজরত ওসমান শুধু প্রশ্রয় দিতেছেন না, মিসরের মতো বৃহৎ দেশের সর্বময় কর্তৃত্ব প্রদান করছেন, ইহা দেখিয়া জনসাধারণ হজরত ওসমানের উপর অসন্তুষ্ট না হয়ে পারে নাই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00