📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 কুফার গভর্নর সা’দ বিন আবি ওক্কাসের পদচ্যুতি এবং ওলিদের নিয়োগ

📄 কুফার গভর্নর সা’দ বিন আবি ওক্কাসের পদচ্যুতি এবং ওলিদের নিয়োগ


হিজরি ২৬ সনের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা কুফার গভর্নর সা'দ বিন আবি ওক্কাসের পদচ্যুতি ও তাঁর স্থলে ওলিদ বিন ওব্বার নিয়োগ। মুসলিম শাসনের প্রাথমিক যুগে রাজধানী মদিনা অপেক্ষা কুফা ও বসরার গুরুত্ব কম ছিল না। ইরাক প্রদেশের দুইটি রাজধানীই ছিল মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্যতম শক্তি-উৎস। তৎকালীন যুদ্ধ-বিগ্রহে বেশির ভাগ সৈন্য সংগৃহীত হইত এই কুফা ও বসরা হইতে এবং যুদ্ধলব্ধ আয়েরও বেশির ভাগই যাইত তাদের ঘরে। এইভাবে তারা মুসলিম-সাম্রাজ্যের ভিতর একটি বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী ছিল। হজরত উমর ইহাদের অভাব-অভিযোগের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখিতেন। মৃত্যুর কিছুকাল পূর্বে তিনি সা'দ বিন আবি ওক্কাসকে কুফার গভর্নর-পদ হইতে অপসারিত করিয়া মুগীরা বিন শায়েবাকে তাঁর স্থলে নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু মুগীরার ঔদ্ধত ব্যবহার ও ক্রুদ্ধ স্বভাবের জন্য কুফাবাসীগণ তাঁকে সহ্য করিতে পারিতেছিল না। হজরত ওসমানের আমলে তারা পুনঃপুনঃ দরখাস্ত করিতে থাকে মুগীরার অপসারণের জন্য। হজরত ওসমান কুফাবাসীদের আব্দার উপেক্ষা করিতে পারেন নাই। তিনি মুগীরাকে পদচ্যুত করিয়া পুনর্বার সা'দকে তথায় গভর্নর করিয়া পাঠান। সা'দই কুফানগরীর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সা'দ যখন পশ্চিম-পারস্যের রাজধানী মাদাইন অধিকার করেন ঐ সময় কুফা ছিল একটি বৃহৎ গ্রাম্য বাজার-মাত্র। মাদাইন মরুবাসী আরবদের জন্য অস্বাস্থ্যকর বিবেচিত হওয়ায় সা'দ কুফায় তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন এবং তথা হইতে ইরাক ও পশ্চিম-পারস্য শাসন করিতেন। কথিত আছে, হজরত উমর যদিও সা'দকে পদচ্যুত করেছিলেন, তিনি মুত্যুকালে ওসিয়ৎ করিয়া গিয়াছিলেন, সা'দ যদি মজলিশে শূরা কর্তৃক খলিফা-পদে নির্বাচিত না হয়, তাঁকে যেন কোনও প্রদেশের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়; কেননা, তিনি কোনও অসাধুতার জন্য পদচ্যুত হন নাই। সা'দের দোষ ছিল বিলাসিতা ও ব্যয়-বাহুল্য, যাহা হজরত উমর মোটেই বরদাস্ত করিতে পারিতেন না। কিন্তু যে দোষে সা'দ হজরত উমরের সময় গভর্নর পদ হইতে অপসারিত হয়েছিলেন, সেই বিলাসপ্রবণতা ও বাহুল্য ব্যয়ের অভ্যাস তিনি এবারেও ত্যাগ করিতে পারেন নাই। কুফায় পুনর্নিয়োগের পর তিনি নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বায়তুল মালের তহবিল হইতে মোটা অর্থ ঋণ গ্রহণ করেন। এই ঋণের টাকা তিনি সময় মতো শোধ করিতে অসমর্থ হন। মিয়াদ উত্তীর্ণ হইলে সরকারি হিসাবরক্ষক আবদুল্লাহ্ বিন মাসউদ তাঁকে পুনঃ পুনঃ তাগিদ দিতে থাকেন। ক্রমে এই ব্যাপারে উভয়ের মধ্যে মনোমালিন্য ও বচসার সৃষ্টি হয় এবং ব্যাপারটি খলিফার গোচরে আসে। খলিফা তদন্ত করিয়া দেখিলেন, সা'দই দোষী। তিনি সা'দকে পদচ্যুত করিলেন। তাঁর চাকরির মেয়াদ তখন এক বৎসরও পূর্ণ হয় নাই। আবদুল্লাহ বিন মাসউদের উপরও খলিফা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করিবার জন্য। কিন্তু আবদুল্লাহ কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থে এই রূঢ়তা অবলম্বন করেন নাই সে জন্য খলিফা তাঁকে ক্ষমা করেন এবং স্বপদে বহাল রাখেন। সা'দের শূন্যপদে খলিফা প্রখ্যাত বীর ওলিদ বিন ওব্বাকে নিযুক্ত করিলেন।
ইতিহাস প্রসিদ্ধ কাডেশিয়া যুদ্ধের বিজয়ী বীর সা'দ ধনী ছিলেন না। কিন্তু অতিশয় সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। প্রাথমিক মুসলমানদের ভিতর তিনি অন্যতম ছিলেন এবং নবীর একজন বিশ্বস্ত সাহাবি ছিলেন। শাসক হিসেবেও ধীরবৃদ্ধি ও ন্যায়বান বলিয়া তাঁর সুনাম ছিল। হজরত উমর তাঁকে মজলিশে শূরার সদস্য নিযুক্ত করেছিলেন। হজরত ওসমান তাঁকে পদচ্যুত করিলেও তিনি হজরত ওসমানের বিরোধী দলের অনুকূলে অস্ত্রধারণ করেন নাই। তিনি বলিতেন, 'যতদিন জিহাদের জন্য প্রয়োজন ছিল, ততদিন অস্ত্র ধারণ করিয়াছি; জিহাদের জন্য প্রয়োজন হইলে সা'দের তরবারি পুনরায় কোষমুক্ত হইবে, অন্য প্রয়োজনে নয়।'
সা'দের স্থলে ওলিদ বিন ওব্বার নিয়োগ হজরত ওসমানের পক্ষে নিন্দার কারণ হয়েছিল। ওলিদ শুধু উমাইয়া বংশীয় ছিলেন না, হজরত ওসমানের সহোদর বৈপিত্র ভ্রাতা ছিলেন। তাঁর এই নিয়োগের ফলে মুসলিম-রাষ্ট্রের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র উমাইয়া বংশের হস্তে চলিয়া যায়। ওলিদ ছিলেন সেই কুখ্যাত ওব্বার পুত্র যিনি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে নবী ও ইসলামের ঘোরতর শত্রু ও নিন্দুক ছিলেন। এক যুদ্ধে তিনি হযরতের মুখে নিষ্ঠিবন নিক্ষেপ করেছিলেন। তিনি যখন যুদ্ধবন্দি হয়ে হযরতের সম্মুখে নীত হন, হজরত অন্য কতিপয় দুশমনের সহিত তাঁরও প্রাণদণ্ড দেন। তিনি তখন ঔদ্ধতভাবে নবীকে প্রশ্ন করেছিলেন, 'আমার প্রাণ বধ করা হইলে আমার শিশু সন্তান কি খাইবে?' নবী নাকি উত্তরে বলিয়াছিলেন, 'দোযখের আগুন'। কুফার লোকেরা এইসব কথা জানিতে পারে। তাছাড়া ওলিদ নিজেও ঔদ্ধত আচরণ ও ক্রুদ্ধ স্বভাবের জন্য সুপরিচিত ছিল। এমন একজন লোককে কুফাবাসীদের শাসক নিযুক্ত করায় তারা খলিফার উপর অসন্তুষ্ট হয় এবং তাঁর কুৎসা রটনা করিতে থাকে। তারা কয়েকবার খলিফার নিকট তাঁর ঔদ্ধত্যের সম্বন্ধে অভিযোগ আনয়ন করে। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণ অভাবে সেগুলো কার্যকরী হয় না।
তবে ঐতিহাসিকদের মতে ওলিদ উচ্ছৃঙ্খল হইলেও বীর ও কর্মী-পুরুষ ছিলেন এবং এই কারণে অল্প দিনের ভিতর তিনি প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জনে সমর্থ হন। পূর্বাঞ্চলের কতিপয় বিদ্রোহ তিনি ক্ষিপ্রতা ও কৃতিত্বের সহিত দমন করিয়া জনগণের বিস্ময় উৎপাদন করেন। আরব জাতি বীর ভক্ত। তাই এককালে যে সমস্ত লোক তাঁকে ঘৃণার চোখে দেখিত তিনি তাঁহাদেরও সৌহার্দ্য লাভে সমর্থ হন। ওলিদ ছয় বৎসর কুফার ভাগ্যবিধাতা ছিলেন। কিন্তু শাসকদের জীবন কখনও নিঃশত্রু হয় না। একদল চক্রান্তকারী তাঁর পিছনে লাগিয়াই ছিল এবং তাদের চেষ্টায় ৩০ হিজরিতে ওলিদ পদচ্যুত হন।

টিকাঃ
১. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বনি জোহরা গোত্রের মিত্র ছিলেন এবং হজরত রাসুলে করীমের (সা.) একজন বিশ্বস্ত সাহাবা ছিলেন। হজরত রাসুলুল্লাহর সহিত তাঁর পরিচয় অতি শৈশবে। তখন তিনি আকাবা ইবনে আবু মুইতের ছাগল চড়াইতেন। তখনই তাঁর ন্যায়নিষ্ঠা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। কথিত আছে, একদিন আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ মাঠে ছাগল চড়াইতেছেন এমন সময় হজরত রাসুল তাঁর বন্ধু হজরত আবুবকরসহ তথায় উপস্থিত হন এবং বলেন 'দুধ থাকিলে খানিকটা দাও, পান করিব।' ইবনে মাসউদ উত্তর করিলেন, 'এই ছাগলগুলো আমার নয় অন্যের আমানত, কাজেই আমি আপনাকে দুধ পান করাইতে পারি না।"-(মৌলানা নুরুদ্দীন আহমদ কর্তৃক অনূদিত হজরত ওসমান, ১৮৬ পৃষ্ঠা। বলা বাহুল্য, ইসলাম গ্রহণের পর আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের চরিত্র এই দিকটা আরও পরিস্ফুট হয়।

📘 হযরত ওসমান (রাঃ) > 📄 মিসরের গভর্নর আমর বিন আল আ’সের অপসারণ

📄 মিসরের গভর্নর আমর বিন আল আ’সের অপসারণ


আলেকজান্দ্রিয়ায় গ্রিক-বিদ্রোহ দমনের সময়ই মিসরের সীমান্ত রক্ষার প্রশ্ন খলিফাকে চিন্তি করিয়া তোলে। তিনি সুযোগ পাইলেই আফ্রিকায় একটি অভিযান প্রেরণ করিবেন এবং গ্রিকরা যাহাতে পশ্চিম দিক হইতে মিসরকে বিপন্ন করিতে না পারে, তজ্জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, মনে মনে এইরূপ স্থির করেছিলেন। হিজরি ২৬ সনেই খলিফার অভিপ্রায় অনুযায়ী একটি শক্তিশালী আরব-বাহিনী মদিনা হইতে আফ্রিকায় যাত্রা করে। আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের এই নতুন অভিযাত্রী বাহিনীর নেতৃত্ব করেন।
মিসরে তখন শাসনসংক্রান্ত গোলযোগ চলিতেছিল। আমর রাজস্ব ও সেনা-বিভাগ উভয়ের উপর কর্তৃত্ব চালাইতেছিলেন, অথচ খলিফার ইহা অভিপ্রেত ছিল না। তিনি ইতোপূর্বে আমরের স্থলে আবদুল্লাহকে সমগ্র মিসরের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। আবদুল্লাহ্ বরাবর সেই স্বপ্ন দেখিতেন এবং আমরকে গভর্নর-পদে অনধিকার চর্চাকারী বলিয়া মনে করিতেন। এ অবস্থায় খলিফা নবপ্রেরিত আরব-বাহিনীর নেতৃত্ব আবদুল্লাহ্ ইবনে যুবায়েরের উপর ন্যস্ত রাখাই যুক্তিযুক্ত মনে করেন। পশ্চিম-আফ্রিকা এই সময় বহু সংখ্যক ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এগুলো বিভিন্ন গোত্রের দ্বারা শাসিত হইত। মিসরের নব প্রতিষ্ঠিত মুসলিম-রাষ্ট্রের প্রতি তাদের মনোভাব অনুকূল ছিল না। তারা যে-কোনো সময়ে ত্রিপলীতে অবস্থিত পূর্ব-রোমকদের সহিত মিলিত হয়ে মুসলিম রাষ্ট্রের ক্ষতি সাধন করিতে পারিত। আলেকজান্দ্রিয়ায় পরাজিত হওয়ার পর রোমকরাও ত্রিপলীতে তাদের অবস্থান দৃঢ়িতেছিল। তাই, খলিফা মিসরে ভাবি বিপদাশঙ্কা দূরীভূত করিবার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন।
আরব-বাহিনী খলিফার নির্দেশ মতো মিসর-সীমা অতিক্রম করিয়া ক্রমাগত পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়। তারা আলজিরিয়া ও মরক্কো পর্যন্ত মুসলিম বিজয়-স্রোত প্রবাহিত করে এবং মরক্কো-সীমান্তে পৌছিয়া স্পেনের মুখামুখী হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সমুদ্র পারের কোনও উপায় করিতে না পারায় সেই খানেই তারা এবারের অভিযান সমাপ্ত করে।
কিন্তু মিসরের স্বার্থে এতবড় একটা অভিযান পরিচালিত হইল অথচ মিসরের গভর্নর আমর ইহাতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাইলেন না, এই অপমান আমর বরদাশত করিতে পারেন নাই। পূর্ববর্তী দুই খলিফার আমলে যখনই কোনো বিজয়-অভিযানে রাজধানী হইতে বিদেশে সৈন্যবাহিনী প্রেরিত হয়েছে, স্থানীয় গভর্নরের হস্তে তার পরিচালনা ভার ন্যস্ত করা হয়েছে। আমির মু'য়াবিয়ার বেলায় হজরত ওসমান নিজেও এই নীতির অনুসরণ করেছিলেন। অথচ আমরের বেলায় তার ব্যতিক্রম হইল, ইহা কাহারও দৃষ্টি এড়ায় নাই। আলেকজান্দ্রিয়ার বিদ্রোহ দমনে আমর যে অসাধারণ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন এবং যে-ভাবে তিনি মুসলিম রাষ্ট্রকে বিপর্যয়ের মুখ হইতে রক্ষা করেন, বিপদের অবসানে খলিফা সে-সমস্ত বিস্মৃত হইলেন। কেহ কেহ এমন কথাও বলিয়াছিলেন, ইহার পর আমার ও আবদুল্লাহ্র বিরোধ ব্যাপারে খলিফা যে তদন্তের ব্যবস্থা করেন, উহা ছিল নামে মাত্র; আসলে খলিফার দুগ্ধভ্রাতাকে একটি মনের মতো পদে প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। অবশ্য একজনকে অপসারিত না করিয়া খলিফার উপায়ও ছিল না কেননা, আলেকজান্দ্রিয়া পুনর্বিজিত হইবার পর হইতে মিসরে যেভাবে দ্বৈতশাসন চলিতেছিল তাতে প্রজাগণের অসুবিধার সীমা ছিল না। আমার এবং আবদুল্লাহ্ উভয়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মাতিয়া শাসনসংক্রান্ত ব্যাপারে পরস্পরবিরোধী হুকুম জারি করিতেছিলেন। ফলে উভয়ের ভিতর মনোমালিন্য এত দূর গড়ায় যে, ২৭ হিজরিতে উভয়েই খলিফার নিকট অভিযোগ প্রেরণ করিতে বাধ্য হন।
আমর ইবনে আল আ'স আলেকজান্দ্রিয়ায় যুদ্ধজয়ের পর সেখান হইতে যুদ্ধবদ্ধ কিছু মালামাল সঙ্গে আনিয়াছিলেন। এই ব্যাপারকে ফলাও করিয়া খলিফার গোচরে আনা হয়। খলিফার নিকট সংবাদ পৌছে, আমর গ্রিকদের সহিত যুদ্ধে বিদ্রোহীদের ঘরবাড়ি লুণ্ঠন করিয়াছেন এবং তাঁহাদের লোকজনও বন্দি করিয়া গোলাম করিয়াছেন। খলিফার কোমল হৃদয় ইহাতে গলিয়া যায়। তিনি আমরের আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বন্দিদের অবিলম্বে মুক্তি প্রদান করিতে আদেশ দেন। ইহার পর আমর ও আবদুল্লাহ্ উভয়ের অভিযোগের উপর তদন্ত শুরু হয়। তদন্তে খলিফা আমরকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং তাঁকে গভর্নরের দায়িত্ব হইতে অব্যাহতি দিয়া শুধু সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব হাতে রাখিতে নির্দেশ দেন। আমর এই ব্যবস্থায় অত্যন্ত অপমানিত বোধ করেন এবং শুধু সেনাপতি হয়ে মিসরে থাকিতে অসম্মত হন। কারণ, সে থাকার অর্থ হয় আবদুল্লাহ্ অধীনতা স্বীকার করা। তেজস্বী আমর তাহা করিবেন কেন। তিনি ক্রুব্ধ হয়ে মদিনায় চলিয়া আসিলেন এবং খলিফার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনায় প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি সুযোগ পাইলেই খলিফাকে মুখের উপর কড়া কথা শুনাইতেন। খলিফা তাঁকে বিশেষ কিছু বলিতে পারিতেন না। তবে এই বৎসর মিসরের নতুন গভর্নর খলিফাকে বার্ষিক রাজস্ব হিসেবে চল্লিশ লক্ষ দিনার প্রেরণ করার পর খলিফা একদিন মসজিদের নামাজ অন্তে আমরকে শুনাইয়া বলিলেন, 'দেখ, শেষ পর্যন্ত উটনী তো বেশি দুধ দিল।' সঙ্গে সঙ্গে আমর জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, উট্রী বেশি দুধ দিয়াছে, কিন্তু বাচ্চা ভুখা' (অর্থাৎ প্রজাদের সাধ্যের অতিরিক্ত কর আদায় করা হয়েছে)। তিনি নিজে পাঠাইতেন বার্ষিক মাত্র কুড়ি লাখ দিনার। যাহা হউক, মিসরের শাসন-ব্যবস্থায় এই রদবদল হজরত ওসমানের পক্ষে সুখের হয় নাই। মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ী অদ্বিতীয় বীর হিসেবে আমর সমগ্র মিসর দেশে যে খ্যাতি ও প্রতিপত্তির অধিকারী হয়েছিলেন আবদুল্লাহর তাহা ছিল না। তাঁর ব্যবহার ছিল ঔদ্ধত্যপূর্ণ। তাঁর জীবনের অতীত ইতিহাসও ছিল কদর্য। মিসরবাসীরা জানিতে পারিয়াছিল যে এই ব্যক্তি প্রথম জীবনে নবীর ওহি-লেখক নিযুক্ত হয়েছিলেন। হজরত ওসমানই তাঁকে নবীর নিকট লইয়া যান এবং ইসলামে দীক্ষা দেওয়াইয়া নবীর সন্নিকটে রাখিয়া দেন। তৎপর নবী তাঁকে ওহি লিখনের দায়িত্ব অর্পণ করেন। কিন্তু ওহী লেখার কাজে তিনি অবিশ্বাস্য প্রমাণিত হওয়ায় নবী তাঁকে তাড়াইয়া দেন। তিনি তখন পুনরায় কুরাইশ দলে ভিড়িয়া যান এবং নবীর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাইতে থাকেন। কুরআন ও ইসলামের উপর তাঁর শ্রদ্ধা ছিল না। নবীর মক্কা জয়ের পর যে কয়জন ব্যক্তিকে বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে নবী মৃত্যুদণ্ড দেন, তাদের ভিতর ইনিও ছিলেন। কথিত আছে, গোলমালের সময় তিনি কয়েকদিন হজরত ওসমানের গৃহে লুকাইয়া থাকেন। গোলমাল থামিয়া গেলে হজরত ওসমান তাঁকে নবীর নিকট লইয়া যান এবং তাহার প্রাণভিক্ষা চাহেন। নবী কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকেন।
তরপর হজরত ওসমানের প্রার্থনা মঞ্জুর করেন; কিন্তু বলিয়া দেন, ঐ ব্যক্তি যেন তাঁর সামনে আর না আসে। এহেন লোককে হজরত ওসমান শুধু প্রশ্রয় দিতেছেন না, মিসরের মতো বৃহৎ দেশের সর্বময় কর্তৃত্ব প্রদান করছেন, ইহা দেখিয়া জনসাধারণ হজরত ওসমানের উপর অসন্তুষ্ট না হয়ে পারে নাই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00