📄 পারস্য
হজরত উমরের মৃত্যু-সংবাদ পাইয়া মুসলিম-অধিকৃত পশ্চিম-পারস্য খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ইতোপূর্বে পারস্যের শুধু সেনাবাহিনী পর্যদস্ত হয়েছিল, কিন্তু জনসাধারণ পূর্বের ন্যায়ই স্থানীয় ভূ-স্বামীদের অধীনে নিয়মিত কর দিয়া বসবাস করিতেছিল। এক্ষণে মুসলিম শাসকরা যখন জনগণের উপর ইসলামি আইন মোতাবেক করধার্যের ব্যবস্থা প্রবর্তিত করিলেন, তারা বাঁকিয়া বসিল এবং মুসলিম-শাসন অগ্রাহ্য করিল। উত্তরে কাস্পিয়ান হইতে দক্ষিণে আরব সাগর পর্যন্ত সমগ্র দেশ আরব জাতির প্রতি বিদ্বেষে তরঙ্গায়িত হয়ে উঠিল। তাদের অভিযোগ ছিল, মুসলিমরা শুধু তাদের স্বাধীনতাই হরণ করে নাই, তাদের বহু যুগের ঐতিহ্যবাহী পুরাতন কৃষ্টি ও সনাতন সভ্যতারও তারা ধ্বংসকারী। পারস্যের পলাতক সম্রাট ইয়াদিগার্দকে ফিরাইয়া আনিয়া তাঁর শাসন ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য তারা সংঘবদ্ধ হইতে থাকে। ফলে পারস্যের বিরুদ্ধে হজরত ওসমানকে আবার নতুন অভিযান প্রেরণ করিতে হইল। সম্রাট ইয়াদিগার্দ পলাতক অবস্থায় ক্রমাগত এক দুর্গ হইতে অন্য দুর্গে এবং এক নগর হইতে অন্য নগরে আত্মগোপন করিয়া ফিরিতেছিলেন। নিরাপত্তার অভাবে অধিকাংশ সময় তিনি শিবিরে কাটাইতেন এবং প্রয়োজনমতো শিবির এক স্থান হইতে অন্য স্থানে সরাইয়া লইতেন। আরব বাহিনী তাঁর অনুসরণ করিতে করিতে ক্রমাগত আগাইয়া চলিত, আর সেই সঙ্গে নতুন নতুন এলাকা অধিকার করিয়া লইত। কায়খসরু ও নওশেরওয়াঁর বংশধরের এখন শিবিরই হয়েছিল রাজধানী।
এইভাবে ইয়াযদিগার্দ পারস্যের পূর্বপ্রান্তে পৌঁছেন এবং খোরাসানে আশ্রয় লন। মুসলমানরা তাঁর সন্ধানে খোরাসানেই উপনীত হইল এবং তাঁর শেষ আশ্রয় খোরাসান দখল করিয়া লইল। খোরাসান ছিল পারস্যের সর্বাপেক্ষা সমৃদ্ধ প্রদেশ। হজরত ওসমান ঘোষণা করেছিলেন, যে সেনাপতি খোরাসানে প্রথম প্রবেশ করিবে, সেই তথাকার শাসনকর্তা হইবে। ইহাতে খোরাসানের বিজয় ত্বরান্বিত হয়েছিল।
পারস্যের সহিত মুসলিমদের এবারের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। হজরত ওসমানের রাজত্বের অষ্টম বর্ষে (৬৫১ খ্রি.) ইয়াদিগার্দ গুপ্তঘাতক-হস্তে নিহত হন। তারপর পারস্যের প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারে ভাঙিয়া পড়ে। সারা পারস্যদেশ চূড়ান্তভাবে মুসলিম-অধিকারে চলিয়া আসে এবং তার পূর্ব সীমা জৈহুন নদী (অক্সাস) পর্যন্ত ইসলামি শাসন বিস্তৃত হয়।
একথা উল্লেখযোগ্য, পারস্যের বিদ্রোহ দমন ও সমগ্র পারস্যকে পদানত করিতে হজরত ওসমানের আট বছর সময় লাগিয়াছিল। খোরাসানে মুসলিম বাহিনীর হস্তে পরাজয় বরণের পর সম্রাট ইয়াদিগার্দ রণক্ষেত্র ত্যাগ করিয়া পারস্যের পূর্ব-সীমা জৈহুন নদীর ওপারে তুর্কিস্থানে পলায়ন করেন। মধ্য এশিয়ার দুস্তর মরুভূমি বহু কষ্টে অতিক্রম করিয়া তিনি ফর্গানায় পৌঁছেন এবং তাতারদের সাহায্যপ্রার্থী হন। ফর্গানার অধিপতি তার্থান তাঁকে অতিথিরূপে গ্রহণ করেন। তাহার আহ্বানে ফর্গানা ও সমরকন্দের তাতাররা ইয়াযিদগার্দের সাহায্যের জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। চীনের নরপতিগণও তাঁর অনুকূলে আরব জাতির বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন। ইয়াযদিগার্দ ইহাতে উৎসাহিত হয়ে স্ব-রাজ্য উদ্ধারের জন্য যাত্রা করেন। কিন্তু পথে অতর্কিত অবস্থায় এক অজ্ঞাত পরিচয় তাতারের গুপ্ত আঘাতে অনুর্ধ্ব চল্লিশ বৎসর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়। সেই সঙ্গে বিশ্ববিশ্রুত খসরুদের রাজত্বেরও চিরতরে অবসান ঘটে (হিঃ ৩১, খ্রি. ৬৫১ সন) কথিত আছে, তাঁর পুত্র-পৌত্রগণ কিছুকাল চীন-সম্রাটের আশ্রয়ে বাস করেছিলেন। তাঁহাদের মৃত্যুর পর প্রাচীন সাসানীয় রাজবংশ ভূপৃষ্ঠ হইতে মুছিয়া গিয়াছে।
অদৃষ্টের কি নির্মম পরিহাস! পনেরো বৎসর পূর্বে ৬০৬ খ্রিস্টাব্দে ইতিহাস প্রসিদ্ধ ক্যাডেশিয়া যুদ্ধে প্রাক্কালে, সম্রাট ইয়াযিদগার্দ যখন মুসলিমদের সহিত যুদ্ধায়োজনে ব্যাপৃত, সেই সময় হজরত উমরের নির্দেশে সেনাপতি সা'দ কয়েকজন ধীরবুদ্ধি আরব- দলপতিকে সন্ধির প্রস্তাবসহ তাঁর নিকট পারস্য-রাজধানী মাদাইনে প্রেরণ করেছিলেন। তাঁরা সম্রাট ইয়াযিদগার্দকে ইসলাম গ্রহণ করিয়া প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে শান্তিতে বাস করিতে অনুরোধ জানাইলে অষ্টাদশ বর্ষীয় উদ্ধত সম্রাট তাঁহাদের বলিয়াছিলেন, 'দূত অবধ্য, তাহা না হইলে আমি তরবারির দ্বারা তোমাদের ঔদ্ধত্যের জবাব দিতাম। বর্বর তস্করের দল, আমার সম্মুখ হইতে দূর হও! যে পারস্যের মৃত্তিকার জন্য বুভুক্ষু ও মরু- সন্তানগণ লালায়িত, সেই মৃত্তিকারও কিছু অংশ সঙ্গে নিয়া যাও।' অতঃপর সম্রাটের নির্দেশে দূতদের প্রত্যেকের স্কন্ধে এক বস্তা করিয়া মৃত্তিকা চাপাইয়া দিয়া তাহাদের আদেশ করা হয়, এইগুলো যেন ক্যাডেশিয়ার যুদ্ধ-শিবিরে মুসলিম সেনাপতিগণের হস্তে তাদের সমাধির নিশ্চিত চিহ্ন স্বরূপ অর্পণ করা হয়। দূতগণ ফিরিয়া আসিা সেনাপতি সা'দকে সমস্ত নিবেদন করে এবং বলে, 'প্রবাদ আছে, মৃত্তিকাই সাম্রাজ্যের নিদর্শন। হে সা'দ! এই মৃত্তিকার বস্তাগুলো আজ আপনার হাতে আসিয়াছে ইহা যেরূপ সত্য, সেইরূপ নিশ্চিতভাবে আল্লাহ্ একদিন পারস্য সাম্রাজ্যও বিশ্বাসীগণের হস্তে আনিয়া দিবেন।' হজরত ওসমানের আমলে তাদের এই ভবিষ্যদ্বাণী সম্পূর্ণরূপে ফলবতী হয়েছিল।
📄 মিসর
হিজরি ২৫ সনেই মিসরের শাসন-বিভ্রাট হজরত ওসমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্বে মিসর দেশ পূর্ব-রোমক সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন তার রাজধানী ছিল আলেকজান্দ্রিয়া। হজরত উমরের সময় উমাইয়া বংশীয় প্রখ্যাত সেনাপতি আমর ইবনে আল আ'স এই দেশ জয় করেন এবং এখানে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত করেন। আমর ইবনে আ'সকে আরবেরা সংক্ষেপে 'আমরু' বলিত। এই নামেই তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। এই আমর ওরফে আমরুই আলেকজান্দ্রিয়াও জয় করেন। হজরত উমর তাঁকে সমগ্র মিসরের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। তিনি মেক্ষিসের অদূরে মুসলিম প্রতিষ্ঠিত নতুন রাজধানী ফাসতাদ হইতে মিসরের শাসন-কার্য নির্বাহ করিতেন। কায়রো শহরের তখন পত্তন হয় নাই। আমর শুধু পরাক্রান্ত যোদ্ধাই ছিলেন না, শাসক হিসেবেও তিনি সুদক্ষ ছিলেন। নব বিজিত মিসরের শাসনসংস্থাকে তিনি নতুন ছাঁচে ঢালাই করেন এবং দেশের জনসাধারণের অবস্থার উন্নতির চেষ্টা করেন।
কিন্তু আক্ষেপের বিষয়, হজরত উমরের মৃত্যুর পর তিনি মদিনা সরকারের পূর্বের তুলনায় কম রাজস্ব পাঠাইতে থাকেন। ইহা লইয়া মদিনা সরকারের সহিত তাঁর বিরোধ ঘটে। নতুন খলিফা তাঁর নিকট সাবেক হারে রাজস্ব দাবি করিলে তিনি উত্তরে লিখেন, 'উষ্ট্রী ইহার চাইতে বেশি দুধ দিতে অসমর্থ।' ইহাতে খলিফা বিরক্ত হয়ে তাঁর পদচ্যুতি আদেশ দেন এবং তাঁর স্থলে পোর্ট-সাঈদের শাসনকর্তা আবদুল্লাহ বিন সা'দ ইবনে আবি সারাহকে সমগ্র মিসরের পবর্নর নিযুক্ত করেন। আবদুল্লাহ্ বিন সা'দ ইবনে আবি সারাহ্ হজরত উমরের আমল হইতে মিসরের পোর্ট সাঈদ ও তৎসংলগ্ন উপকূল অঞ্চলের সামরিক শাসনকর্তা নিয়োজিত ছিলেন। উপকূলের রাজস্ব আদায় করিতেন আবদুল্লাহ্ বিন আবি সারাহ্' কিন্তু সমগ্র মিসরে রাজস্বের জন্য দায়ী ছিলেন আমর। হজরত উমরের আমলে এই ব্যবস্থা কোনও অসুবিধার কারণ হয় নাই। কিন্তু হজরত ওসমানের আমলে অবস্থা দাঁড়ায় অন্যরূপ। আবদুল্লাহ্ বিন আবি সারাহ্ ছিলেন হজরত ওসমানের দুগ্ধ-ভ্রাতা এবং অনুগৃহীত ব্যক্তি এই পরিস্থিতি আমরের অনুকূলে ছিল না। অথচ আমরেরই পদচ্যুতি ঘটিল। খলিফার এই আদেশ আমর প্রসন্ন চিত্তে গ্রহণ করিতে পারেন নাই। তিনি খলিফার অবাধ্য হইলেন না, কিন্তু আবদুল্লাহকে শাসন ক্ষমতা ছাড়িয়া দিতে গড়িমসি করিতে থাকিলেন।
📄 আলেকজান্ড্রিয়া
ইতোমধ্যে অপর এক দিক দিয়া বিপদের কালোমেঘ দেখা দিল। মিসরের শাসন- রজ্জুকে ধারণ করিবেন, ইহা লইয়া যখন আমর ও আবদুল্লাহ্ ভিতর رেষারেষি চলিতেছিল সেই সুযোগে আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রিকরা মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ইহা সত্য যে, হজরত উমরের মৃত্যুর পর একদিকে যেমন বৈদেশিক শক্তিবর্গ নব গঠিত মুসলিম রাষ্ট্রের উপর হামলা চালাইতে উদ্গ্রীব হয়, সেই সঙ্গে আরবের পার্শ্ববর্তী নব বিজিত দেশগুলোও স্বাধীনতা অর্জনের স্বপ্ন দেখিতে থাকে। এইসব দেশের অধিবাসীরা ছিল জাতিতে অনারব। তাঁরা আরব জাতির প্রভুত্ব সহ্য করিতে রাজি ছিল না। পারস্যের কথা পূর্বে বলা হয়েছে। অনুরূপভাবে আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রিকরাও মুসলিম শাসন অগ্রাহ্য করিয়া বসে।
আলেকজান্দ্রিয়া শহর তৎকালে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভিতর কিরূপ গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল তাহা না জানিলে গ্রিকদের বিদ্রোহের গুরুত্বও অনুধাবন করা যাইবে না। এ সম্পর্কে হজরত উমরকে লেখা আমরের একখানি পত্র উল্লেখযোগ্য। আলেকজান্দ্রিয়া জয়ের পর সেনাপতি আমর খলিফাকে লিখিতেছেন-
আমিরুল মু'মেনিন, আমি এমন একটি শহর আপনার অধিকারে আনিয়াছি যাহার পুরাপুরি বর্ণনা হইতে আমি ক্ষান্ত রহিলাম। শুধু এইটুকু বলিলে হইবে, তার ভিতর আমি চারি হাজার প্রাসাদ ও চারি হাজার হাম্মام (স্নানাগার) পাইয়াছি। চল্লিশ হাজার ইহুদি এখানে মাথা পিছু কর দিয়া বসতী করে। এই শহরে চারি শত ভোজনাগার রহিয়াছে, যেখানে রাজপুরুষরা এবং অভিজাত বংশীয় লোকেরা পানাহার ও আমোদ- প্রমোদ করিত।
আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাচীন ঐতিহ্য বর্ণনা করিতে গিয়া ঐতিহাসিক হিট্টি লিখিয়াছেন: ইহার এক পার্শ্বে সুপ্রসিদ্ধ সিরাপিয়ান, যার ভিতর দেবী সিরাপীর মন্দির ও আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত লাইব্রেরি অবস্থিত ছিল। অপর পার্শ্বে বিখ্যাত সিজারির মন্দির, যাহা মিসর-বিজয়ী জুলিয়াস সিজারের সম্মানার্থে রানি ক্লিওপেট্টা নির্মাণ করাইয়াছিলেন। মন্দিরটির নির্মাণ-কার্য সমাপ্ত হয় অগাস্টাস সিজারের সময়। পরে রোমকদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পর এই মন্দির সেন্ট মার্ক নামক গির্জায় পরিণত হয়। শহর হইতে কিঞ্চিৎ পশ্চিমে গ্রানাইট পাথরে তৈরি দুইটি আসোয়ান স্তম্ভ (Aswan Grannite Needles). যাহা ফেরাউন-সম্রাট তৃতীয় থুতমাস কর্তৃক আরব্ধ এবং রানি ক্লিওপেট্টার আমলে সমাপ্ত হয়েছিল বলিয়া কথিত আছে।। বস্তুত মুসলিম বিজয়ের সময় আলেকজান্দ্রিয়া প্রাচ্য-রোমক সাম্রাজ্যের মুকুটমণি ছিল। বহু সংখ্যক দুর্ভেদ্য কেল্লা দ্বারা উহা সুরক্ষিত ছিল। এই সমস্ত কেল্লায় তৎকালে পঞ্চাশ হাজার গ্রিক সৈন্য সর্বদা মোতায়েন থাকিত। তার পার্শ্বেই অবস্থান করিত পূর্ব-রোমক সম্রাটের বৃহত্তম রণতরী বহর। মুসলিমগণ যখন এই নগর অবরোধ করে, তখন তাদের রণতরী ছিল না; সৈন্যসংখ্যা ছিল গ্রিকদের তুলনায় নগণ্য; নগর অবরোধের উপযোগী যন্ত্রপাতিও তাদের ছিল না। মুসলিম সৈন্যগণ শুধু অস্ত্রশস্ত্রের দিক দিয়াই হীন ছিল না, তাদের সাহায্যার্থে কোনো সেনাবাহিনীও তাদের পশ্চাতে মওজুদ ছিল না। এই অবস্থায় তারা আমর ইবনে আল আ'সের নেতৃত্বে চৌদ্দ মাস অদম্য উৎসাহে যুদ্ধ করিয়া এই দুর্ভেদ্য নগরীর পতন ঘটায়। এই বিজয়ের কারণ স্বরূপ হিট্টী লিখিয়াছেন:
তারা অস্ত্রবলে বলীয়ান না হইলেও ইসলামের মহান তকবির, ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি ছিল তাদের এক মহামন্ত্র। এই ধ্বনি তাদের হৃদয়ে বল-সঞ্চার করিত, তাহাদের নিঃশঙ্ক চিত্তে মৃত্যুর পানে আগাইয়া দিত, আর শত্রু পক্ষের মনোবল ক্ষয় করিত। এই অমোঘ মন্ত্রবলেই তারা ২০ হিজরিতে (৬৪০ খ্রি.) আলেকজান্দ্রিয়ায় দুর্জয় গ্রিক-শক্তিকে পর্যুদস্ত করিতে পারিয়াছিল।
ইহার পর একে একে পাঁচ বৎসর অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়, কিন্তু গ্রিকরা আর মাথা তুলিতে সাহস করে নাই। তাদের সম্রাট হিরাক্লিয়াস আলেকজান্দ্রিয়ার মতো একটি প্রাচীন-কীর্তি সম্বলিত শহর ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র হস্তচ্যুত হওয়ার সংবাদে মর্মাহত হন। তাঁর স্বাস্থ্য একেবারেই ভাঙিয়া পড়ে এবং তিনি অল্প দিন পরে ভগ্ন হৃদয়ে প্রাণত্যাগ করেন। গ্রিকজাতিও এই পরাজয়ের গ্লানি কোনো দিন ভুলিতে পারে নাই। তাই যুবরাজ কনস্টানটাইন পিতার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর হইতেই আলেকজান্দ্রিয়া পুনরুদ্ধারের জন্য সুযোগের প্রতীক্ষায় থাকেন।
তাদের সেই বাঞ্ছিত সুযোগ দেখা দেয় হজরত উমরের মৃত্যুর এক বৎসর পর হিজরি ২৫ সনে। এই সময় নবনিযুক্ত খলিফা হজরত ওসমান মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ী আমরকে মিসরের শাসন কর্তৃত্ব হইতে অপসারিত করেন। গ্রিকরা সে সংবাদে আহলাদিত হয়েছিল। সম্রাট কনস্টানটাইন সুযোগ বুঝিয়া অবিলম্বে সেনাপতি ইমানুয়েলের নেতৃত্বে এক শক্তিশালী নৌবাহিনী মিসরে প্রেরণ করিলেন। শুধু আলেকজান্দ্রিয়াকে মুসলিম অধিকার হইতে মুক্ত করাই গ্রিকদের উদ্দেশ্য ছিল না, তারা সমগ্র মিসর ভূমিকে পুনরায় গ্রিক শাসনের অধীনে আনার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
সেনাপতি ইমানুয়েল একরূপ বিনাবাধায় আলেকজান্দ্রিয়া অধিকার করিয়া লইলেন। এইভাবে হিজরি ২৬ সনে উক্ত শহর সম্পূর্ণভাবে মুসলিম অধিকার হইতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়িল।
মিসরের অধিবাসীরা গ্রিকদের এই আকস্মিক উত্থানে শঙ্কিত হয়েছিল, কিন্তু প্রতিকারের পথ খুঁজিয়া পাইতেছিল না। অবশেষে তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা মদিনায় আসিয়া খলিফার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। তাঁহাদের অনুরোধ ছিল, অন্তত মিসরের স্বাধীনতা রক্ষার খাতিরে আমরকে পুনরায় গভর্নর-পদে বহাল করা হউক এবং তাঁকে অবিলম্বে আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রিকদের ঔদ্ধত্য দমন করিতে নির্দেশ দেওয়া হউক। খলিফা নিজেও চাহেন নাই যে, আলেকজান্দ্রিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর মুসলিম-সাম্রাজ্য হইতে স্খলিত হয়ে পড়ুক। তিনি তাঁর পূর্ব-আদেশ রদ করিলেন এবং আমরকে অবিলম্বে আলেকজান্দ্রিয়া পুনরাধিকারের জন্য নির্দেশ দিলেন। আমরও এইরূপ আদেশেরই প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। কারণ, তাঁর বহু কষ্টে বিজিত আলেকজান্দ্রিয়া শহর এইভাবে হস্তচ্যুত হইবে, এ-চিন্তা তাঁর অসহ্য ছিল। তিনি খলিফার নির্দেশ পাইবামাত্র সসৈন্যে আলেকজান্দ্রিয়া অভিমুখে ধাবিত হইলেন এবং ঝটিকার বেগে তার দ্বারদেশে উপনীত হইলেন।
আমর ছিলেন কূট-কৌশলী সেনাপতি ও কঠোর হৃদয় যোদ্ধা। তাঁর যুদ্ধ-নৈপুণ্যের কথা সমগ্র মিসর দেশ অবগত ছিল। আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রিকরাও তাঁকে ভালোরূপেই চিনিত। শত্রুর মনে ত্রাস-সঞ্চার করার পক্ষে 'আমরু' নামই যথেষ্ট ছিল। গ্রিকগণ তখনও ভাবে নাই, আমরু আবার ফিরিয়া আসিবে। তাঁর উপস্থিতিতে গ্রিক অধিবাসীরা অত্যন্ত দমিয়া গেল। সৈন্যেরা সামান্য বাধাদানের পরই তাঁর বশ্যতা স্বীকার করিতে প্রস্তুত হইল। অবস্থা বেগতিক দেখিয়া সেনাপতি ইমানুয়েল তাঁর সঙ্গীয় সৈন্যগণকে সঙ্গে লইয়া জাহাজে উঠিলেন এবং সাগর পথে নগর ত্যাগ করিলেন। আলেকজান্দ্রিয়া শহরে মুসলিম শাসন পুনরায় সুপ্রতিষ্ঠিত হইল।
হিজরি ২৬ সন এইভাবে কাটিয়া গেল। যুদ্ধের গোলমালে আমর মিসরের গভর্নর পদে থাকিয়াই গেলেন। সেনাবাহিনী ও রাজস্ব উভয় বিভাগে পূর্বের ন্যায় তাঁর কর্তৃত্ব চলিতেই লাগিল।