📄 ওমরপুত্র ওবায়দুল্লাহর বিচার
খলিফার আসনে বসিয়া হজরত ওসমানকে সর্বপ্রথম যে কঠিন কার্যে হস্তক্ষেপ করিতে হয়, সে ছিল হজরত উমরের কনিষ্ঠ পুত্র ওবায়দুল্লাহ্ মদিনায় তিন ব্যক্তিকে হত্যা করে। ইহারা ছিল পারস্য হইতে আগত হরমুজান, সা'দের ক্রীতদাস জুফাইন এবং হজরত উমরের আততায়ী ফিরুষের এক কন্যা। হরমুজান ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদিনায় বাস করিতে থাকেন। জুফাইনা ছিল জাতিতে খ্রিস্টান। ফিরূয ওরফে আবু লুলু ছিল জাতিতে পারসিক। কোন এক যুদ্ধে সে মুসলিমদের হস্তে বন্দি হয় এবং দাসরূপে বিক্রি হয়। পরে সে ইসলাম গ্রহণ করিয়া মুক্তি অর্জন করে এবং আরও পরে খ্রিস্ট-ধর্ম অবলম্বন করে। কিছুকাল সে কুফায় শিল্পকাজ করিয়া জীবিকা অর্জন করিত।
কিন্তু কোনো কারণে সে হজরত উমরের উপর বিদ্বেষ পোষণ করিত এবং তাঁকে হত্যা করার সুযোগের প্রতীক্ষায় ছিল। কোনো সময়ে সে মদিনায় আসে, জানা যায় না। মদিনার মসজিদে সে খলিফাকে অতর্কিত অবস্থায় পাইয়া বিষাক্ত ছুরিকা দ্বারা আঘাত করে। সেই আঘাতেই হজরত উমর মৃত্যুমুখে পতিত হন। আততায়ী আঘাতে সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে কিন্তু জবানবন্দির পূর্বেই সে আত্মহত্যা করায় এই হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য অনুদ্ঘাটিত থাকিয়া যায়।
কথিত আছে, হজরত উমর যেদিন আহত হন, তার পূর্বদিন সন্ধ্যায় ওবায়দুল্লাহ্ বেড়াইতে বাহির হয়ে কোনও এক নির্জন স্থানে হরমুজান, জুফাইনা ও ফিরূয ওরফে আবু লুলুকে গোপনে কানাকানি করিতে দেখে। ওবায়দুল্লাহকে দেখিয়া তারা উঠিয়া দাঁড়ায় এবং তাদের হাতের খঞ্জর খসিয়া পড়ে। হজরত উমরের প্রাণবায়ু নিঃশেষ হইবার পর ওবায়দুল্লাহ তরবারি হাতে বাহির হয়ে যায় এবং প্রথমে হরমুজানের এবং তারপর জুফাইনার শিরশ্ছেদন করার পর ফিরূযের গৃহে যায়। সেখানে সে ফিরুযের কন্যাকে সম্মুখে পাইয়া তাহারই প্রাণ-সংহার করে।
এই ব্যাপার লইয়া শহরে খুব চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। নতুন খলিফার পক্ষে ওবায়দুল্লাহর বিচার ছিল এক পরীক্ষা-ক্ষেত্র। অনেকে মনে করেছিল, বিচারেও ওবায়দুল্লাহর প্রাণদণ্ড হইবে, কেননা হরমুজান ছিলেন মুসলমান। উপযুক্ত কারণ ব্যতিরেকে একজন মুসলমানকে কেহ হত্যা করিলে শরীয়ৎ অনুযায়ী তাহাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হয়। জুফাইনা ছিল খ্রিস্টান সুতরাং জিম্মি; সে কারণে সেও ছিল বিনা বিচারে অবাধ্য। ফকীহ্ অর্থাৎ ভাষ্যকারগণ শাস্ত্র ঘাঁটিয়া দেখিলেন, মৃত্যুই এরূপ অপরাধে শরীয়তের একমাত্র বিধান। শরীয়তের বিশেষজ্ঞ হজরত আলিও ছিলেন এই দলে। কারণ ওবায়দুল্লাহ স্বেচ্ছায় আল্লাহর নির্ধারিত কানুনের খেলাপ করেছিল। পক্ষান্তরে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধেও অনেকে মত প্রকাশ করে এই বলিয়া যে, মাত্র সেদিন হজরত উমরকে শহীদ করা হইল, আজ আবার তাঁর পুত্রকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইবে? আমর ইবনে আল আ'স হজরত ওসমানের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া বলিলেন, 'আল্লাহ্ আপনাকে ঝনঝাট হইতে বাঁচাইয়াছেন। আর কেন। যাহা হইবার হয়েছে, আপনি আর ইহাতে হস্তক্ষেপ করিবেন না।'
তরুণ বয়স্ক ওবায়দুল্লাহ্ যে পিতৃশোকে অত্যন্ত অভিভূত হয়ে এই হত্যাকাণ্ড করেছিল তাতে সন্দেহ নাই। খলিফার সম্মুখে দুইটি সমস্যা বিদ্যমান ছিল। একদিকে একজন মুসলমান ও একজন জিম্মির হত্যা, যার জন্য হতব্যক্তিদের ওয়ারিশরা বিচারপ্রার্থী হয়েছে। অপর দিকে হজরত উমরের শোকসন্তপ্ত পরিবারের গভীর মর্মবেদনা। শেষ পর্যন্ত হৃদয়ের জয় হইল আইনের শুষ্ক বিধানের উপর। খলিফা বাদী-পক্ষের অভিভাবকরূপে ওবায়দুল্লাহকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে অর্থদণ্ড করিলেন এবং ওবায়দুল্লাহ্ অভিভাবকরূপে নিজ অর্থ হইতে বাদীপক্ষের রক্তের ক্ষতিপূরণ করিলেন।
ইহাতে অনেকে খুশি হইল কিন্তু একদল লোক বলিতে লাগিল, 'কে, ওবায়দুল্লাহ্র তা কিছুই হইল না, এমনকি তাহাকে কিছুদিন কারাগারেও থাকিতে হইল না।' তারা আওয়াজ তুলিল, খলিফা ইতোমধ্যেই শরীয়তের বিধান হইতে সরিয়া গিয়াছেন। যিয়াদ ইবনে লবিদ নামক মদিনার এক কবি এই বিচারকে লক্ষ্য করিয়া এক ব্যঙ্গ-কবিতা লেখে। ইহাতে ওবায়দুল্লাহ ও খলিফা উভয়ের বিরুদ্ধে শ্লেষ উদ্দ্গীরণ করা হয়েছিল। সে মদিনার রাস্তায় রাস্তায় উহা গাহিয়া বেড়াইত। একদিন হজরত ওসমান তাহাকে খুবই ধমকাইয়া দিলেন। তারপর সে শুধু বন্ধুমহলে তার আবৃত্তি করিত।
📄 নাগরিকদের ভাতা বৃদ্ধি
হজরত ওসমান যখন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ঐ সময় মদিনায় খাদ্যাভাবের দরুন নাগরিকদের অত্যন্ত কষ্ট হইতেছিল। মদিনায় সে সময় অজন্মা ঘটিয়াছিল। সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলোরই কষ্ট হয়েছিল অত্যধিক। খলিফা ইহা অনুভব করিয়া করুণায় বিগলিত হইলেন তাঁর খিলাফতের বয়স যখন মাত্র নয় দিন, সেই সময় তিনি এক ফরমান জারি করিয়া রাজধানী সকল স্বাধীন নাগরিকের ভাতা সমান হারে একশত দিরহামে (রৌপ্যমুদ্রা) করিয়া বাড়াইয়া দিলেন। লোকেরা ইহাতে খুশি হইল। তবে ব্যক্তি বিশেষের বেলায় ইহাতে বিলাসিতার দিকে প্রবণতা দেখা না দিয়াছিল, এমন নয়। হজরত উমর এই জিনিসটাই সর্বদা ভয় করিতেন। তিনি বলিতেন, "আহার ও পরিধানে কখনও বিলাসিতা করিও না। আরবের সরলতা যতদিন তোমাদের ভিতর বিরাজ করিবে, ততদিন তোমরা বিজয়লাভ করিবে; আর যে-দিন তোমরা তাহা ত্যাগ করিবে, সেইদিন হইতে তোমাদের ভাগ্য-বিপর্যয় ঘটিবে।' হজরত উমরের এই উক্তি পরবর্তীকালে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু উপস্থিত সময়ে মদিনার পরিস্থিতি এমন দাঁড়াইয়াছিল, কোমল হৃদয় হজরত ওসমান এক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ না করিয়া পারেন নাই।
আশ্চর্য এই, একদল লোক ইহা লইয়াও বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। তাদের মতে, মদিনায় খাদ্য-সঙ্কট কোনও নতুন ব্যাপার নহে। যেখানে লোককে খাদ্যের জন্য কৃষির উপর অনেকখানি নির্ভর করিতে হয় এবং রৌদ্র বৃষ্টির জন্য প্রকৃতির মুখাপেক্ষী হয়ে থাকিতে হয়, সেখানে মধ্যে মধ্যে এরূপ দুর্ভোগ ঘটিবেই। তার জন্য বায়তুল মাল, অর্থাৎ জাতির সাধারণ তহবিল হইতে এমন মোটাহারে অর্থ ব্যয় সমীচীন হয় নাই।
📄 শাসন-সম্পর্কিত ফরমান জারি
খলিফা হজরত উমর তাঁর উত্তরাধিকারীর জন্য একটি সুশৃঙ্খল ও সুগঠিত রাজ্য রাখিয়া যান। কাজেই নতুন খলিফা প্রচলিত শাসন-পদ্ধতিতে সহসা কোনও পরিবর্তন আনিলেন না। হজরত উমরের সময়েই মিসর, সিরিয়া ইরাক ও ইরান দেশ বিজিত হয়ে মুসলিম-সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ইসলামি শাসননীতি ও আইনকানুন ঐ সব দেশে ইতিপূর্বেই প্রচলিত হয়েছিল। এজন্য শাসন-ক্ষেত্রে হজরত ওসমানের পথ অনেকটা পরিষ্কার ছিল। আপাতত তাঁর একমাত্র কর্তব্য ছিল, তাঁর পূর্ববর্তী খলিফা যে শাসন-সংস্থা গড়িয়া গিয়াছেন তাহাই অক্ষুণ্ণ রাখা। কিন্তু কিছুদিন যাইতেই তিনি লক্ষ্য করিলেন, শাসকগণ হজরত উমরের মৃত্যুর পর হইতে কিছুটা আরামপ্রিয় হয়েছেন এবং শাসনকার্যে শৈথিল্য প্রদর্শন করছেন। রাজস্ব আদায় ও সীমান্ত রক্ষার ব্যাপারে বিশৃঙ্খলার আভাস পাওয়া যাইতে লাগিল। ঐতিহাসিক তাবারী লিখিয়াছেন, 'হজরত ওসমান এই সময় শাসন বিভাগ, রাজস্ব-বিভাগ ও সামরিক-বিভাগকে লক্ষ্য করিয়া কয়েকটি ফরমান জারি করেন; তন্মধ্যে তিনটি উল্লেখযোগ্য।'
প্রথম ফরমান: এই ফরমানটিতে খলিফার উদ্দেশ্য ছিল শাসক ও শাসিতের ভিতরকার সমস্ত প্রশংসা ও স্তব আল্লাহর জন্য। তোমরা জানিয়া রাখ, আল্লাহ্ খলিফাদের উপর দায়িত্ব দিয়াছেন তাঁরই সৃষ্ট মানুষদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তাহাদের শোষণের জন্য নহে। নবীর উম্মতের উপর এ যাবৎ যাঁরা নেতৃত্ব করিয়াছেন (হজরত রাসুল, হজরত আবুবকর ও হজরত উমরকে এখানে লক্ষ্য করিয়া বলা হয়েছে। তাঁরা সকলেই উম্মতের রক্ষক ছিলেন, কেহই ভক্ষক ছিলেন না। কিন্তু দেখা যাইতেছে, অধুনা তোমাদের শাসকগণ রক্ষকের দায়িত্ব হইতে ক্রমেই দূরে সরিয়া যাইতেছেন এবং শোষকের ভূমিকা গ্রহণ করছেন। যদি এই অবস্থা চলিতে থাকে তবে একের প্রতি অপরের বিশ্বস্ততা, কৃতজ্ঞতা ও নির্ভরশীলতা উঠিয়া যাইবে এবং অন্যায় জুলুমবাজিতে কাহারও লজ্জা বোধ হইবে না। তোমরা মনে রাখিও, শাসিত জনগণের খিদমত এবং তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখাই যথার্থ ইনসাফ বা ন্যায়নিষ্ঠতা। তাদের দাবী পূরণ করিতে হইবে এবং তাদের যাহা দেয়, তাহাও তাদের নিকট হইতে আদায় করিতে হইবে। দায়িত্ব দ্বিমুখী-একদিকে তাদের দাবি পূরণ; অপর দিকে তাদের কর্তব্য পালনে তাহাদের বাধ্য করা। এইভাবে শাসক ও শাসিতের ভিতর তোমরা সংহতি সৃষ্টি কর এবং শত্রু দমনে অগ্রসর হও। তবেই জয়যুক্ত হইবে। সাবধান, একাজে সততার পথ হইতে কখনও বিচ্যুত হইও না।'
ইহা লক্ষ্যণীয়, ইসলাম যে শান্তি ভ্রাতৃত্ব ন্যায়নীতির আদর্শ লইয়া জগতে অবতীর্ণ হয়েছিল, সেই আদর্শই খলিফা তাঁর ফরমানে পরিষ্কারভাবে সকলের সামনে তুলিয়া ধরিয়াছেন।
দ্বিতীয় ফরমান: এই ফরমানে খলিফা তাঁর রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীদের সতর্ক করিয়াছেন। তিনি বলিতেছেন, 'আল্লাহ্ এই সারা জাহানের সৃষ্টিকর্তা। একমাত্র হক বা সত্যই তাঁর নিকট গ্রহণীয়। কাজেই তোমরা তোমাদের যাহা এক তাহা ঠিকভাবে আদায় কর এবং অপরের যাহা প্রাপ্য তাহাও তাদের দিয়া দাও। রাষ্ট্রের যাহা প্রাপ্য, তাহা আদায় কর। আমানত অর্থাৎ গচ্ছিত জিনিস সম্পর্কে বিশ্বস্ততা হইতেছে প্রধান কথা। তোমরা তোমাদের চরিত্রে বিশ্বস্ততা আয়ত্ত কর এবং বিশ্বাসহানিসূচক কোনও কাজে লিপ্ত হইও না, যাহাতে পরবর্তী লোকেরা তোমাদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করিয়া বিশ্বাসহন্তা না হয়। আর সততা, সততার প্রতি সর্বদা লক্ষ্য রাখিবে। এতিম ও জিম্মিদের উপর কখনও অত্যাচার করিও না; তাহা করিলে আল্লাহ্ স্বয়ং তার প্রতিশোধ গ্রহণ করিবেন।'
এখানে লক্ষণীয়, কি ব্যক্তিগত দেনা-পাওনা, কি সরকারি রাজস্ব আদায় সর্বক্ষেত্রে ন্যায্য দাবির মর্যাদা রক্ষা খলিফার প্রধান লক্ষ্য। সেই সঙ্গে তিনি বিশেষভাবে জোর দিয়াছেন পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ততা রক্ষা ও প্রতিশ্রুতি পালনের উপর, যাহা ব্যতিরেকে কোনও জাতি দুনিয়ায় উন্নতির পথে অগ্রসর হইতে পারে না।
তৃতীয় ফরমান: এই ফরমানে দেশের স্বাধীন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার মৌলিক সমস্যার প্রতি সমর-বিভাগের কর্মচারীদের মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যাবতীয় হাম্দ ও সালাত আল্লাহ্ জন্য। তোমরা মুসলিম-রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী, মুসলিম জাতির সাহায্যকারী এবং তাদের পক্ষ হইতে তোমরা দেশরক্ষী। আমার পূর্ববর্তী খলিফা হজরত উমর তোমাদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতি নির্ধারণ করিয়া গিয়াছেন। তোমাদের অনেকের সহযোগিতায় উক্ত নীতি নির্ধারিত হয়েছিল। তোমাদের সম্বন্ধে যেন এমন সংবাদ না আসে, তোমরা উক্ত নীতিতে কোনো রদবদল আনয়ন করিয়াছ। ইহা মনে রাখিও, সেরূপ করিলে আল্লাহ্ তোমাদের স্থলে অন্য লোককে বসাইবেন। তোমাদের কর্তব্য কি হওয়া উচিত তাহা তোমরাই চিন্তা করো। আমাকে আল্লাহ্ যে কাজের দায়িত্ব দিয়াছেন, আমি তার প্রতি লক্ষ্য রাখিতেছি।'
ইহা স্মরণীয়, হজরত ওসমান যখন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন মুসলিম-রাষ্ট্রের বয়স তখন পনেরো বিশ বৎসরের বেশি হয় নাই। চতুর্দিকে শত্রু-রাজ্য। তারা শুধু রাষ্ট্রীয় স্বার্থেই শত্রু ছিল না, ধর্মের দিক দিয়াও ছিল। ধর্ম ও কৃষ্টির বিরোধ, রাষ্ট্রীয় বিরোধ অপেক্ষাও বেদনাদায়ক এবং ব্যাপক। সেক্ষেত্রে মুসলিম সীমান্তরক্ষী ও দেশরক্ষী সেনাবাহিনী ও সিপাহসালারদের দায়িত্ব যে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাহা বুঝাইয়া বলা আবশ্যক করে না। নতুন খলিফা ইহা সম্যক উপলব্ধি কলিয়াই যথাসময়ে উপরোক্ত নির্দেশ প্রচার করেন।
চতুর্থ ফরমান: নৈতিক আদর্শভিত্তিক এই ফরমানটি যথেষ্ট মূল্যবান এবং খলিফার প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচায়ক। এই ফরমানে খলিফা তাঁর গোটা জাতিকে লক্ষ্য করিয়া বলিতেছেন, 'প্রথমে আল্লাহ্ হাম্দ ও সালাত। মুসলিমগণ, তোমরা আল্লাহ্ ও রাসুলের তাঁবেদারির ফলে দুনিয়ায় উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হয়েছে। সাবধান, দুনিয়া যেন তোমাদের জীবনের মূল লক্ষ্য হইতে বিচ্যুত না করে। কেননা, (আমার মনে হইতেছে) অচিরে এই জাতি বিদাতের দিকে আকৃষ্ট হইবে।"
কিভাবে এই বিদাত বা নীতিভ্রষ্টতার শুরু হইবে, সে সম্বন্ধে খলিফা স্বয়ং নিম্নলিখিত কয়েকটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করিয়াছেন।
(১) মুসলমানরা আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও সমৃদ্ধির উচ্চ শিখরে আরোহণ করিবে।
(২) বন্দিনী দাসীগণের গর্ভজাত সন্তানরা বয়োপ্রাপ্ত হইবে।
(৩) দেহাতি অর্থাৎ গ্রাম্য-আরবগণ এবং আজমি অর্থাৎ পূর্বদেশীয় অনারবগণ কুরআন পাঠ করিতে শিখিবে।
(৪) আজমিদের ভিতর কুফরি (পৌত্তলিক মনোবৃত্তি) থাকা হেতু তারা যখন কোনও বিষয় বুঝিতে অক্ষম হইবে, তখন ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হইবে।
খলিফা যথার্থই বুঝিয়াছিলেন যে অত্যধিক আর্থিক উন্নতি মানুষকে বিলাসিতার পথে টানিয়া লইতে পারে। আর বিজাতীয়া পত্নীদের গর্ভজাত সন্তানরা যে মূল জাতিকে মিশ্র জাতিতে পরিণত করে এবং মুক্তি ও ইমান উভয় দিক দিয়াই উহাকে দুর্বল করে, খলিফার এ উক্তিও অসত্য নয়।
অশিক্ষিত লোকদের সম্বন্ধে তাঁর আশঙ্কা এই, তারা কুরআন পাঠ করিতে শিখিলে কুরআনের ভুল পাঠ ও ভুল অর্থ করা তাদের পক্ষে বিচিত্র নয়। কুরআন পাঠ তারা করুক কিন্তু ঐরূপ ভুলভ্রান্তি যাহাতে না ঘটে সে-জন্য সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে, ইহাই খলিফার বক্তব্য। তাঁর সর্বশেষ উক্তি; যাহারা পৌত্তলিকতা ছাড়িয়া মুসলমান হয় তাদের মনের ভিতর পূর্ব-পুরুষাগত পৌত্তলিক মনোভাব কিছু কিছু থাকিয়াই যায়-এ মন্তব্যও অমূলক নয়।
টিকাঃ
১. ডক্টর তোয়াহা হোসাইন (মিসরি) প্রণীত এবং মৌলানা নূরউদ্দীন আহমদ কর্তৃক অনূদিত হজরত ওসমান গ্রন্থের ৩৮-৪৪ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।