📄 নির্বাচন-প্রতিযোগিতা
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ২৪ হিজরিতে গুপ্তঘাতক কর্তৃক আহত হন। আহত অবস্থায় তিনি তিনদিন জীবিত ছিলেন। বিষাক্ত ছুরিকর আঘাত হইতে তিনি বুঝিতে পারেন, তিনি আর বাঁচিবেন না। তাই তিনি মৃত্যুর পূর্বে তাঁর পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। অনেকে মনে করেছিলেন, হজরত আবুবকরের ন্যায় হজরত উমরও কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তিকে তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করিয়া যাইবেন। কিন্তু হজরত উমর তাহা করিলেন না। তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের চরম সমর্থক। একদা তিনিই হজরত রাসূলকে তাঁর প্রতিনিধি নির্বাচন করিতে বারণ করেছিলেন।
ইসলামি আদর্শের একনিষ্ঠ অনুসারী হজরত উমর নিজে তাঁর ব্যতিক্রম করিলেন না। তিনি প্রথমে আবদুর রহমান বিন আউফকে আহ্বান করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি খিলাফত গ্রহণে ইচ্ছুক কিনা। নবীর এই সাহাবির উপর হজরত উমরের অগাধ বিশ্বাস ছিল। 'কিন্তু আবদুর রহমান এই গুরু দায়িত্ব গ্রহণে নিজের অক্ষমতা জ্ঞাপন করিলেন। তখন হজরত উমর তাঁকে একটি নির্বাচনী কমিটি (মজলিশে শুরা) আহ্বান করিতে অনুরোধ করিলেন এবং হজরত আলি, হজরত ওসমান, আয-যুবায়ের ইবনে আল আ'বাম, তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ এবং সাদ ইবনে আবি ওক্কাস এই পাঁচ ব্যক্তিকে উক্ত কমিটিতে গ্রহণ করিতে বলিলেন। ইহারা সকলেই ছিলেন মুসলমানদের ভিতর গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং নবীর বিশ্বস্ত সাহাবা। ইসলামের জন্য ইহাঁদের প্রত্যেকের অবদান ছিল অসামান্য।
তিনি এই নেতৃবর্গকে তিন দিনের সময় দিলেন এবং শর্ত করিয়া দিলেন, তাঁদের ভিতর হইতে যদি কেহ খলিফা নির্বাচিত হন, অথবা অপর যে কেহ তাঁদের দ্বারা খলিফা-পদের জন্য মনোনীত হয়, তিনি নিজ বংশের লোকদের কখনই অপরের অপেক্ষা অধিক অনুগ্রহ প্রদর্শন করিতে পারিবেন না। তিন দিনে খিলাফৎ-প্রশ্নের কোনও মীমাংসা হইল না। তখন হজরত উমর তাহাদের ডাকিয়া পাঠাইলেন এবং তাঁহাদেরই অনুরোধে সা'দ বিন যায়েদ নামক আর একজন গোষ্ঠীপতিকে তাঁহাদের কমিটির অন্তর্ভুক্ত করিয়া দিলেন। তাঁরা হজরত উমরের পুত্র গুণবান আবদুল্লাহকেও তাঁহাদের ভিতর রাখিতে চাহিলেন। কিন্তু হজরত উমর তাতে অনিচ্ছা প্রকাশের পর এই শর্তে সম্মতি দিয়াছিলেন, আবদুল্লাহ শুধু মতামত প্রকাশ করিতে পারিবে কিন্তু নিজে খিলাফতের প্রার্থী হইতে পারিবে না। কথিত আছে, এই সম্পর্কে তিনি বলিয়াছিলেন- 'খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করিয়া একা আমিই আল্লাহর কাছে কি কৈফিয়ত দিব, ভাবিয়া পাইতেছি না; এ অবস্থায় আমার বংশের উপর আর অধিক দায়িত্ব চাপাইতে চাই না।'
ইহা লক্ষণীয় যে, নির্বাচন কমিটি কুরাইশদের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শাখার কোনো একটি হইতে অধিক লোক লওয়া হয় নাই। কমিটির নেতা আবদুর রহমান অদলীয় লোক ছিলেন। তবে তাঁর পত্নীদের ভিতর একজন ছিলেন হজরত ওসমানের মাতার গর্ভজাত কন্যা। সম্ভবত সেই সম্পর্কে লক্ষ্য করিয়াই হজরত আলি তাঁকে ভোটের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকিতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু আবদুর রহমান যেরূপ তেজস্বী পুরুষ ছিলেন, তাতে পক্ষপাতিত্ব তাঁর পক্ষে সম্ভবপর মনে হয়না। ইনি সেই আবদুর রহমান, যিনি মদিনায় হিজরত করার পর সা'দ বিন রাবী নামক আনসারের গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন এবং সা'দ যখন তাঁকে ভাই হিসাবে নিজের বিপুল ধনসম্পত্তির একাংশ দিতে চাহেন এবং স্ত্রীর ভিতর একজনকে তাঁর পত্নী করার উদ্দেশ্যে ত্যাগ করিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন তিনি উত্তরে বলিয়াছিলেন, 'ভাই সা'দ আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন; আমার এ-সব কিছুই দরকার নাই। কাল ভোরে তুমি আমাকে বাজারের রাস্তা দেখাইয়া দিও, আমি রোযগার করিয়া খাইব।' আর নিজের রোজগার দ্বারাই তিনি মদিনার একজন বড় ধনী হয়েছিলেন।
প্রার্থীদের ভিতর যুবায়ের ছিলেন সম্ভবত সর্বাপেক্ষা ধনী ব্যক্তি। তিনি বংশের দিক দিয়া আবদুল মুত্তালিবের দৌহিত্র ছিলেন। তিনি বীর পুরুষ ছিলেন এবং সকল যুদ্ধেই হজরত রসুলুল্লাহ সহকারী ছিলেন। ইরাকের দুই প্রধান শহর কুফা ও বসরায় এবং মিসরের প্রধান শহর ফাস্তাতে তিনি জমি ক্রয় করেছিলেন। ঐ সব স্থানে তাঁর বাণিজ্যিক কারবার ছিল। খাস মদিনা শহরে তিনি এগারটি বাড়ির মালিক ছিলেন। কথিত আছে, মৃত্যুকালে তিনি কয়েক ক্রোর দেরহাম (রৌপ্য-মুদ্রা) মূল্যের সম্পত্তি রাখিয়া যান।
পারস্য বিজয়ী বীর হিসেবে মদিনায় সা'দের অসাধারণ সম্মান ছিল। ক্যাডেসিয়ার ঐতিহাসিক যুদ্ধে তিনি মুসলিমদের জন্য বিজয়-মাল্য আহরণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন প্রাথমিক মুসলমানদের মধ্যে অন্যতম এবং কুরাইশদের সহিত নবীর সকল সংগ্রামে তিনি নবীর সহকারী ছিলেন। তাঁর বিশিষ্ট নীতি ছিল, জিহাদকে তিনি যতদিন সত্যিকার জিহাদ মনে করিতেন ততদিন উহাতে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং হজরত রসুল হইতে হজরত আবুবকর ও হজরত উমরের সময় পর্যন্ত তিনি জিহাদ পরিচালনা করেছিলেন। কথিত আছে, ৫০ কি ৫৫ হিজরিতে তাঁর ইন্তিকাল হইলে উম্মুল মু'মেনীনগণ তাঁর জানাজায় শরীক হয়েছিলেন।
তালহা প্রাক্ ইসলামি যুগ হইতেই একজন বিশিষ্ট সওদাগর ছিলেন এবং হজরত ওসমানের একজন বন্ধু ছিলেন। তিনিও প্রাথমিক مسلمانوں একজন ছিলেন এবং বদর, ওহোদ ও অন্যান্য সকল যুদ্ধে হজরত রসুলের সঙ্গী ছিলেন। ওহোদ যুদ্ধে নবীর আহত হয়ে পতনের পর কুরাইশগণ যখন তাঁর প্রতি তীর নিক্ষেপ করিতে থাকে, তখন তালহা নিজ শরীর দ্বারা তাঁকে আড়াল করেছিলেন, এবং শত্রুর তীর নিজে দেহে গ্রহণ করিয়াছেন। এই যুদ্ধে তিনি এত বেশি জখম হয়েছিলেন, নবী তাঁকে দেখিয়া সাহাবিদের বলিয়াছিলেন, 'যদি কোনো মৃতব্যক্তিকে মাটির উপর দিয়া চলাফেরা করতে দেখতে চাও, তবে তালহাকে দেখে লও।'
হজরত উমর তাঁকে অতিশয় মর্যাদা দিতেন এবং সালিশি কমিটিতে তাঁকে স্থান দেন। কিন্তু তালহা প্রথম দিকে উক্ত বৈঠকের বিতর্ককালে উপস্থিত থাকিতে পারেন নাই। হজরত উমর যখন আহত হন ঐ সময় তিনি বাণিজ্য উপলক্ষে মদিনার বাহিরে ছিলেন। হজরত উমর নিজের অন্তিম সময়ে সকল সাহাবিকে মদিনায় ডাকিয়া পাঠান। সেই সংবাদে তালহা দ্রুত মদিনায় চলিয়া আসেন। কিন্তু ইত্যবসরে কমিটির সিদ্ধান্ত হজরত ওসমানের অনুকূলে ঘোষিত হয়েছিল। তালহা মুক্ত হস্তে দান করিতেন। তথাপি মৃত্যুকালে তিনি তিন লাখ দিরহাম (রৌপ্য-মুদ্রা মূল্যের স্বর্ণ, রৌপ্যমুদ্রা ও ভূ-সম্পত্তি রাখিয়া যান।
নির্বাচন কমিটির ভিতর একমাত্র আবদুর রহমানই খিলাফতের প্রার্থী ছিলেন না। অন্যদের প্রত্যেকেরই দাবির পেছনে যুক্তি ছিল, তবে তাঁহাদের ভিতর কেহই এত অধিক যোগ্যতার দাবি করিতে পারিতেন না, সেজন্য অপরদের সহিত বিনা প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হইতে পারিতেন। যুবায়ের ছিলেন হজরত আবুবকরের জামাতা। তিনি বিবি আয়েশার ভগ্নী আসমাকে বিবাহ করেছিলেন। সা'দ ছিলেন নবী-জননী বিবি আমিনার ভ্রাতুষ্পুত্র। হজরত ওসমান এবং হজরত আলি উভয়েই ছিলেন নবীর জামাতা। তালহা ছিলেন হজরত আবুবকরের সগোত্র। বয়সের দিক দিয়া সাদ যুবায়ের, তালহা এবং আলি ছিলেন পঞ্চাশের নিচে। হজরত ওসমানের বয়স ছিল সত্তরের কাছাকাছি। প্রথমোক্ত চারি ব্যক্তি বিশিষ্ট যোদ্ধা ছিলেন কিন্তু শাসন-ব্যাপারে তাঁহাদের যোগ্যতা ইতোপূর্বে কখনও প্রমাণিত হয় নাই। তাদের ভিতর হজরত আলি সর্বাপেক্ষা বয়োকনিষ্ঠ হইলেও চারিত্রিক মাহাত্ম্য, ইসলামের জন্য নিঃস্বার্থ সেবা এবং অসাধারণ বিদ্যাবত্তা তাঁকে অপর সকলের চাইতে গরীয়ান করেছিল। আবার হজরত ওসমান ছিলেন সর্বাপেক্ষা প্রবীণ, অভিজ্ঞ এবং দানের জন্য জনপ্রিয়। সকল দিক বিবেচনা করিয়া সালিশকারগণ হজরত আলি ও হজরত ওসমানের দাবিকেই অপর সকলের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর মনে করিলেন। কিন্তু শেষ-মীমাংসা আর হইতে চায় না। মীমাংসা যাহাতে ত্বরান্বিত হয় সে-জন্য হজরত উমর মে'কাব নামক এক ন্যায়নিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ সাহাবাকে সভার মধ্যস্থ নিরূপিত করিয়া দিলেন। মে'কাবকে লইয়া পরামর্শ সভার সভ্যগণ বিবি আ'য়িশার গৃহে সমবেত হন এবং তথায় তাঁহাদের পরামর্শ চলিতে থাকে।
মৃত্যু কোনো কিছুরই অপেক্ষা রাখে না। মুসলিম-জাহানের খিলাফতের মীমাংসায় বিলম্ব ঘটিলেও হজরত উমরের প্রাণবায়ু ক্রমেই নিঃশেষ হয়ে আসিতে লাগিল। পরিশেষে এই অচল অবস্থার নিরসনের জন্য আবদুর রহমান সকলকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, 'ভাইসব, আমি খিলাফতের প্রার্থী নই। অপর প্রার্থীগণও কেহ আমার আত্মীয় নহে। আপনারা বিতর্ক বন্ধ করিয়া দেই তাহা মানিতে প্রস্তুত আছেন কি-না?' ইহাতে সকলেই সম্মতি প্রকাশ করিলেন। তখন প্রত্যেক প্রার্থীকে তিনি একে একে নির্জন কক্ষে ডাকিয়া লইয়া বলিলেন, 'ভাত! আমার নিজের বিবেচনায় আপনার দাবি খুবই সঙ্গত। কিন্তু মনে করুন, নির্বাচনে আপনি যদি কৃতকার্য না হন তবে আপনার মতে খিলাফতের এই গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য অপর কে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত?' হজরত আলি কহিলেন 'ওসমান'। হজরত ওসমান কহিলেন, 'আলি' সা'দ ও যুবায়ের কহিলেন, 'ওসমান'। এইরূপে প্রত্যেকের মতামত অবগত হয়ে আবদুর রহমান সভায় প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা করিলেন, 'অদ্যকার মীমাংসা এই হইল যে ওসমান ও আলির ভিতর একজন খলিফা হইবেন। অপর সকলের দাবি বাতিল করা হইল। আগামীকল্য সাধারণ সভায় এই দুইজনের ভিতর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। সভ্য ভঙ্গ হইল।'
আবদুর রহমান সে রাত্রি সম্পূর্ণ বিনিদ্র কাটাইলেন এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেতাদের গৃহে গিয়া তাঁহাদের সহিত আলোচনা করিলেন। এদিকে আবু সুইয়ান আমর বিন আ'স প্রমুখ উমাইয়া বংশীয় নেতাগণের হজরত ওসমানের অনুকূলে সমস্তরাত্রি কূট পরামর্শ চলিতেছিল।
পর দিবস এক সাধারণ সভা আহুত হইল। এই দিনের সভা ছিল সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। আবদুর রহমান সভাস্থলে দন্ডায়মান হয়ে যথোচিত গাম্ভীর্যের সহিত সমবেত জনতাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, 'বন্ধুগণ, আমাদের খলিফা হজরত উমরের স্থলে বসাইবার জন্য আমরা গতকল্যকার বিশেষ সভায় হজরত আলি ও হজরত ওসমানকে মনোনীত করিয়াছি। উভয়েই ইসলামের একনিষ্ঠ খাদেম এবং হজরত রাসুলে-করীমের প্রিয় সাহাবা। এক্ষণে এই উভয়ের ভিতর কে মুসলিম-জাহানের অধিনায়ক হইবেন তাহা অদ্যকার এই সাধারণ সভায় নির্ণীত হইবে।'
প্রবীণ জননায়ক আবদুর রহমানের ঘোষণা সকলে ঔৎসুক্যের সহিত শুনিল। তারপর আরম্ভ হইল সভায় প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য নানা রকম আলোচনা ও গুঞ্জন। পরস্পর বিরোধী জনমতও শ্রুত হইতে লাগিল।
পরিশেষে আবদুর রহমান পুনরায় দণ্ডায়মান হইলেন এবং সকলকে নিরস্ত করিয়া হজরত আলিকে নিকটে আহ্বান করিলেন। হজরত আলি নিকটবর্তী হইলে তাঁর হস্ত ধারণ করিয়া আবদুর রহমান কহিলেন, 'ভাত:, অদ্য আমরা তোমাকে নেতৃত্বে বরণ করিয়া তোমার হস্তে বয়াত হইতে চাই। তুমি আল্লাহর নামে প্রতিজ্ঞা কর যে, সর্বদা আল্লাহ ও রাসূলের হুকুম ও দুই বিগত খলিফার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া চলিবে এবং ইসলামের যাবতীয় শর্ত অক্ষরে অক্ষরে পালন করিবে।'
অতিরিক্ত ধর্মভীরু হজরত আলি মহা ফাঁপরে পড়িলেন এবং বিনীতভাবে উত্তর করিলেন, 'বন্ধুগণ, আমি প্রতিশ্রুতি দিতে পারিব না, তবে যতদূর সাধ্য চেষ্টা করিব এবং আল্লাহ্র নিকট মদৎ চাহিব, তিনি যেন তাঁর এই দাসানুদাসকে সকল শর্ত পালন করিতে তৌফিক দেন।'
আবদুর রহমান বিস্মিত ও বিরক্ত হইলেন। উপস্থিত জনতাও বিস্মিত হইল। আবদুর রহমান জনগণকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, 'এরূপ দুর্বলচিত্ত ব্যক্তিকে এই সমস্যা-সঙ্কুল মুসলিম জাহানের নেতৃত্বে প্রদান করিতে পারি না।' অতঃপর তিনি হজরত ওসমানকে নিকটে আহ্বান করিয়া তাঁকেও অনুরূপ ভাবে প্রতিজ্ঞা করিতে বলিলেন।
হজরত ওসমান কোনোরূপ ইতস্তত না করিয়া আবদুর রহমানের কথামতো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইলেন। তখন আবদুর রহমান তাঁর হস্ত চুম্বন করিলেন এবং অন্যান্য লোককেও তাঁর হস্ত চুম্বন করিয়া বায়াত হইতে বলিলেন। হজরত আলি 'শঠতা, শঠতা', বলিয়া আওয়াজ তুলিয়া সভাস্থল ত্যাগ করিতে উদ্যত হইলেন। তখন আবদুর রহমান তাঁকে নিবৃত্ত করিয়া তাঁর পূর্ব ওয়াদার কথা স্মরণ করাইয়া দিলেন এবং বলিলেন, 'আপনি প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন, আমার মীমাংসা মানিয়া লইবেন। এক্ষণে আমি হজরত ওসমানকে নির্বাচিত করিয়াছি। আপনি তাঁর আনুগত্য (বায়াত) স্বীকার করুন; অন্যথা আপনি খলিফাকে অমান্য করার অপরাধে অপরাধী হইবেন।' হজরত আলি পূর্ব-শর্ত স্মরণ করিয়া লজ্জিত হইলেন এবং হজরত ওসমানের হস্তে বায়াত হইলেন। যুবায়ের প্রমুখ সভ্যস্থ অন্যান্য সকলেও বায়াত হইলেন। পরদিবস তালহা মদিনায় প্রত্যাবর্তন করিয়া সমস্ত অবগত হইলেন এবং তিনিও বিনা দ্বিধায় হজরত ওসমানকে খলিফা বলিয়া স্বীকার করিয়া লইলেন।
সভার শেষে আবদুর রহমান উপস্থিত সাহাবিদের সঙ্গে লইয়া মসজিদে নববীতে গিয়া সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা প্রদান করিলেন এবং হজরত ওসমানকে শরীয়ৎ অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম জাহানের খলিফা বলিয়া ঘোষণা করিলেন। হাশিমীরা ছাড়া উপস্থিত সকলেই একটা উদ্বেগপূর্ণ পরিস্থিতির অবসান হইল ভাবিয়া এই শান্তিপূর্ণ মীমাংসা খুশি মনে মানিয়া লইল। সর্বাপেক্ষা খুশি হয়েছিল উমাইয়াগণ। কেননা এতদিন তাঁরা মুসলিম-জাহানে যে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখিতেছিল, তাদের এক জ্ঞাতি-ভ্রাতার হস্তে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা অর্পিত হওয়ায় তাদের সেই স্বপ্ন এক্ষণে বাস্তবে রূপায়িত হওয়ার সুযোগ দেখা দিল।
📄 হজরত ওসমানের বংশ তালিকা
ফিহ্ কুরেশ
কুশায় (৬ষ্ঠ পুরুষ)
আবদে-দ্দার আবদে মানাফ আবুল উয্যা
আবদেশ শাম্স হাশীম জুবায়ের (৪র্থ পুরুষ)
উমাইয়া আবদুল মুত্তালিব
হাবিব আবুল আ'স
আবুসুফইয়ান হাকাম আফ্ফান হজরত ওসমান
মু'য়াবিয়া মারওয়ান
হারিস আবু তালিব আব্বাস অপর আবদুল্লাহ হামজা (৬ পুত্র)
জাফর হজরত আলি আব্বাসীয় খলিফাগণ হজরত মুহম্মদ (সঃ)
📄 গ্রন্থপঞ্জী
১. মৌলানা মুহম্মদ আলি- The Holy Quran
২. মৌলানা মুহম্মদ আলি- The Early Caliphate.
৩. সৈয়দ আমির আলি-- A Short History of the Saracens.
৪. সৈয়দ আমির আলি- The Spirit of Islam.
৫. স্যার উইলিয়াম মূ'য়র- The Caliphate : Its Rise Decline Falll.
৬. স্যার উইলিয়াম মূ'য়র- The Annals of the Early Caliphate
৭. পি, কে, হিট্টি- The History of the Arabs.
৮. আ, এ, নিকলসন্- The History of the Arabs.
৯. মৌলানা শিবলী নোমানী-সিরাতুন নবী (উর্দু)
১০. হাজি নইমউদ্দীন-খুলাফায়ে রাশেদীন (উর্দু)
১১. মৌলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ-মোস্তফা চরিত
১২. ডক্টর তো'হা হোসেন (মিসরি) প্রণীত 'হজরত ওসমানে'র মৌলানা নূরুদ্দীন আহমদ কৃত বঙ্গানুবাদ।
১৩. কাজী আবদুল ওদুদ-হজরত মোহাম্মদ ও ইসলাম
১৪. The Encyclopaedia of Islam
১৫. The Columbia Encyclopaedis.