📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি ও হযরত ওসমানের দৌত্য
হিজরি ষষ্ঠ সনে তিনি বনি গোত্রের ইহুদিরা নবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধায়োজন করার নবী তাহাদের আক্রমণ করেন। এই যুদ্ধে নবী জয়লাভ করেন এবং শত্রুপক্ষের অনেক নর-নারী মুসলিমদের হস্তে বন্দি হয়। ইহার পর মুসলিমদের মনের বল অনেক বাড়িয়া যায়। তাদের বাসনা হইল, এবার তারা মক্কায় হজ করিতে যাইবে এবং বহুদিন পর পুনরায় কা'বা দর্শন করিবে। সেখানে তারা শুধু হজ উদযাপন করিবে না, কুরাইশদের পর পর তিনটি ভয়াবহ আক্রমণ হইতে আল্লাহর অনুগ্রহে রক্ষা পাইয়াছে, এ জন্য তাঁরা আল্লাহর ঘরে বসিয়া তাঁর শোকর গোজারি করিবে। নবীর মনেও এবার আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল কা'বা সন্দর্শনের জন্য। তিনি শিষ্যদের সে কথা বলিলেন এবং যথাসময়ে চৌদ্দ শত মুসলিম নর-নারী এবং বহু সংখ্যক কোরবানির পশুসহ মক্কা যাত্রা করিলেন। হিজরতের পর ইহাই ছিল নবী ও তাঁর শিষ্যদের প্রথম হজযাত্রা।
নবীর শিষ্যরা কোনও যুদ্ধাস্ত সঙ্গে লয় নাই। তাতেই প্রমাণিত হয়, হজ ভিন্ন অন্য কোনও উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না। অথচ মক্কায় তাঁর শুক্ররা রাষ্ট্র করিয়া দেয়, নবী বহু সৈন্য-সামন্ত লইয়া মক্কা আক্রমণ করিতে আসিতেছেন। ফলে কুরাইগণ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয় এবং তাঁকে বাধা দানের জন্য প্রস্তুত হয়।
নবী পথে থাকিতেই জানিতে পারিলেন, কুরাইশ নেতাদের নির্দেশে মক্কার প্রথিতনামা যোদ্ধা খালেদ তাঁর অশ্বারোহী সৈন্যদল সহ নগরের প্রবেশ পথ আগলাইয়া আছেন, যাতে মুসলমানরা নগরে প্রবেশ করিতে না পারে। অগত্যা নবী মক্কা হইতে ছয় মাইল দূরবর্তী হোদাইবিয়া উপত্যকায় চাউনি ফেলিতেন। তাঁর ইচ্ছা, সেখান হইতে দূত মারফৎ তিনি কুরাইশদের জানাইয়া দিবেন যে, অন্যান্য গোত্রের যাত্রীদের মতোই তিনি হজ করিতে আসিয়াছেন, যুদ্ধ করিতে আসেন নাই, এবং হজ সমাধা হইলেই মদিনায় ফিরিয়া যাইবেন। এই সময় অনেক উপজাতীয় আরব হজ উদ্দেশ্যে মক্কায় আসিয়াছিল। তাদের সর্দারদের ভিতর দুই এক ব্যক্তি নবীর সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিল। নবী তাহাদের তাঁর উদ্দেশ্যের কথা বুঝাইয়া বলেন এবং কুরাইশদের জানাইতে বলেন। কিন্তু কুরাইশ নেতাগণ কাহারও কথায় কর্ণপাত করিল না। কুরাইশদের ভিতর হইতেও কেহ কেহ নবীর নিকট আসিয়া জানিয়া গেল, তাহার দলে কোনরূপ যুদ্ধ-প্রস্তুতি নাই। কিন্তু তাদের কথায়ও নেতৃস্থানীয় কুরাইশগণ নিঃসন্দেহ হইতে পারিল না। কথিত আছে ইহার পর নবী খিরাশ নামক এক ব্যক্তিকে কুরাইশদের নিকট পাঠান কিন্তু কুরাইশগণ তাহার উটের পা কাটিয়া দেয় এবং তাহাকে হত্যা করার মতলব করে। তবু হাবশি সৈন্যগণ বাধা দেওয়ায় সে ব্যক্তি প্রাণে বাঁচিয়া যায় এবং শিবিরে ফিরিয়া আসে। পরিস্থিতির এই অচলাবস্থা নিরসনের জন্য নবী এমন একজন লোককে কুরাইশদের দরবারে পাঠাইতে ইচ্ছা করিলেন, যিনি মুসলিমদের আস্থাভাজন, আবার কুরাইশদের ভিতরও যাহার প্রতিপত্তিশালী আত্মীয় রহিয়াছে এই দিক দিয়া নবী হজরত ওসমানকে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত মনে করিলেন। কুরাইশ নেতারা তাঁর বক্তব্য শুনিয়া বলিলেন, তুমি যদি কা'বা ঘর তওয়াফ করিতে চাও, তা করিতে পার। হজরত ওসমান বলিলেন, নবীকে ছাড়া তিনি একাজ করিতে পারেন না। কুরাইশরা তাঁর এই উত্তরে অতিশয় ক্রুদ্ধ হইল এবং তাঁকে বন্দি করিয়া রাখিল। কুরাইশদের পণ ছিল নবীকে বা নবীর অন্য কোন শিষ্যকে তারা কিছুতেই কা'বায় আসিতে দিবে না। অথচ হজরত ওসমান তাঁহাদের জন্যই দৌত্যগিরির ভার লইয়াছেন। নবীকে এবং তাঁর অন্যান্য শিষ্যদের তিনি কিছুতেই ছাড়িতে পারেন না। কুরাইশ দলপতিদের দরবারে বসিয়া, তাঁহাদের মুখের উপর এইভাবে তাঁহাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তাঁরা তাঁর আটকের আদেশ দেন। তাঁরা ভাবিয়া দেখেন নাই, ইহার পরিণাম ফল কতদূর গড়াইতে পারে।
এদিকে বাহিরে রাষ্ট্র হইল, হজরত ওসমানকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি যথাসময়ে শিবিরে না আশায় মুসলমানদের চিন্তার অবধি রহিল না। তারা নবীর নির্দেশক্রমে সকলে সমবেত হয়ে এক ভীষণ প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হইল। তার মর্ম এই, হজরত ওসমানের উপর এই অন্যায় আচরণের জন্য তারা যুদ্ধ না করিয়া দেশে ফিরিবে না। হয় তাঁর উদ্ধার, অথবা সমূলে শহীদ, ইহাই ছিল তাদের মৃত্যুপণ। পরিস্থিতির এই গুরুত্ব লক্ষ্য করিয়া কতিপয় উপজাতীয় নেতা ইহাতে হস্তক্ষেপ করেন এবং কুরাইশদের জানাইয়া দেন, তারা যদি অন্যায়ভাবে মুসলমানদের হজ করায় বাধা দেয়, তাহা হইলে উপজাতীয় সৈন্যগণকে উঠাইয়া লওয়া হইবে এবং কুরাইশদের সহিত তাঁরা সহযোগিতা বন্ধ করিয়া দিবেন।
কুরাইশগণ এই প্রকার চাপে পড়িয়া নবীর সহিত আলাপ-আলোচনায় রাজি হয় এবং অনেক বিতর্কের পর দুই পক্ষের ভিতর সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হয়। তাতে কতিপয় শর্তের ভিতর প্রধান শর্ত এই ছিল, এই বৎসর নবী তাঁর শিষ্যদের লইয়া হজ না করিয়া ফিরিয়া যাইবেন, যাহাতে অন্য জাতির লোকেরা মনে না করিতে পারে, কুরাইশরা ভয়ে কা'বা গৃহ মোহম্মদের সামনে উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছে। নবী এই শর্ত মানিয়া লইলে তিনি ও তাঁর শিষ্যেরা পরবর্তী বৎসর হইতে বিনা বাধায় হজ করিতে পারিবেন। নবী সেবার হজ না করিয়াই স্বশিষ্য ফিরিয়া যান। আপাতদৃষ্টিতে নবী হার মানিলেন, কিন্তু আসলে তিনি জিতিয়া গেলেন এই অর্থে যে, বিনা রক্তপাতে তিনি একটা মহা অধিকার আদায় করিয়া লইলেন, পরের সন হইতে প্রতি বৎসর বিনা বাধায় হজব্রত সম্পাদন করার জন্য। এই সন্ধি সম্পাদন ব্যাপারে নবীর অধিকাংশ শিষ্য তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছিল, কিন্তু নদী যে ইহাতে অসাধারণ দূরদর্শিতার পরিচয় দেন তাতে সন্দেহ নাই। কেননা, ঐ অবস্থায় জোর করিয়া নগর প্রবেশের চেষ্টা করিলে চৌদ্দ শত নিরস্ত্র মুসলিম নর-নারীর ধ্বংস ছিল অনিবার্য। হজের বাধাও তাতে দূরীভূত হইত না।
সন্ধির কথা যখন উত্থাপন করাই সম্ভবপর হয় নাই, সেই তিক্ততার ভিতর হজরত ওসমান যে নবীর দূতরূপে কুরাইশদের দরবারে গিয়াছিলেন, ইহাতে শুধু নবীর প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ আনুগত্য প্রকাশ পায় নাই; তাঁর নিজের যথেষ্ট আন্তরিকতা ও সাহসিকতারও পরিচয় ইহাতে পরিস্ফুট।