📄 জঙ্গে আহযাব (পরিখা-যুদ্ধ)
কুরাইশরা ওহোদ যুদ্ধের পর মুসলমানদের পশ্চাদ্ধাবন না করিয়া মানে মানে মক্কায় ফিরিয়া গেল। কিন্তু মক্কার নাগরিকরা, বিশেষ করিয়া কুরাইশ ললনাগণ তাতে খুশি হইতে পারে নাই। যে-সমস্ত কুরাইশ ওহোদ যুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছিল, তারাও মনে মনে অসুখী বোধ করিতেছিল, মোহাম্মদকে (স) জীবিত অবস্থায় ছাড়িয়া আসার দরুন। কাজেই সমস্ত মক্কা প্রতীক্ষা করিতেছিল আর একটি বড় যুদ্ধের। ইহুদি গোত্রগুলোর আশ্বাস-বাণীতে মক্কায় কুরাইশদের ভিতর মুসলিম ধ্বংসের আয়োজন পুণ্যোদ্যমে চলিতে লাগিল।
বস্তুত এই যুদ্ধের আয়োজন ছিল পূর্বের সব যুদ্ধের চাইতে অনেক বেশি। কুরাইশদের সহিত অনেকগুলো শক্তিশালী ইহুদি গোত্র এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার কতিপয় পৌত্তলিক ও উপজাতীয় গোত্র এই যুদ্ধে যোগদান করে। এইজন্য এই যুদ্ধকে 'জঙ্গে আহযাব' বা 'জোটবদ্ধদের যুদ্ধ' বলা হয়েছে। দশ সহস্র লোকের এক সম্মিলিত বাহিনী হিজরি পঞ্চম সনে আবু সুফাইয়ানের নেতৃত্বে মদিনা অবরোধ করে। মুসলমানগণ ছিল সংখ্যায় মাত্র তিন হাজার। তাই তারা শত্রু আগমনের পূর্বেই নগর রক্ষার জন্য নবীর নির্দেশে নগরের তিন দিক দিয়া ১২ ফুট গভীর ও ১৮ ফুট প্রশস্ত এক পরিখা খনন করেছিল। পরিখাটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৯ হাজার ফুট। নগরের উত্তর দিক ছিল সালমা নামক পর্বত দ্বারা সুরক্ষিত। তাই, সেদিকে পরিখা খননের প্রয়োজন ছিল না। মুসলমানরা এক সপ্তাহ ধরিয়া স্বহস্তে কোদালি চালাইয়াছিল এবং মাটির ঝুড়ি মস্তকে বহিয়াছিল। নবী স্বয়ং তাঁহাদের সঙ্গে কোদালি ধরিয়াছিলেন। তাঁর অন্যান্য সাহাবিদের সঙ্গে হজরত ওসমানও এই পরিখা খননে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন।
তবে পরিখা-যুদ্ধে কুরাইশগণ সুবিধা করিতে পারে নাই। তিন সপ্তাহকাল নগর বেষ্টন করিয়া রাখার পর কুরাইশগণ প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিষ্ঠিতে না পারিয়া অবরোধ উঠাইয়া লয় এবং তাদের সহযোগী দলসমূহ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। অবশ্য এই তিন সপ্তাহকাল অবরোধকারীরা নিশ্চষ্টভাবে বসিয়া থাকে নাই। দিনের পর দিন যুদ্ধ চলিয়াছে এবং মুসলিমগণ পরিখার বেষ্টনীর ভিতর থাকিয়া অসীম বিক্রমে অবরোধকারীদের নগর প্রবেশের চেষ্টা ব্যর্থ করিয়া দিয়াছে।
কুরাইশগণ যখন দেখিল পরিখা অতিক্রম করা অসম্ভব, তখন তারা সালমা পর্বতের দিকে চাপ বৃদ্ধি করিতে থাকেন। কারণ ঐ দিকে পরিখা ছিল না। একদিন দেখা গেল, আমর বিন আব্দে ওদ্দ নামক এক খ্যাতনামা কুরাইশ যোদ্ধা একদল সৈন্যসহ সালমার এক গিরিবর্ত্র দিয়া নগরের দিকে অগ্রসর হইতেছে। হজরত আলি তৎক্ষণাৎ তাঁর জুলফিকার লইয়া 'আল্লাহু আকবর' রবে শত্রুর উপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। তাঁর অনুসরণ করিল। আমরের সঙ্গে হজরত আলির তুমুল যুদ্ধ হইল। কিছুক্ষণ পরে আমরের রক্তাক্ত মাথা দেহচ্যুত হয়ে ভূমিতলে গড়াইয়া পড়িল। সেবারের মতো কুরাইশদের নগর প্রবেশের চেষ্টা ব্যর্থ হইল। ইহার পর মহাবীর খালেদ তাঁর অশ্বারোহী সেনাসহ সালমার অপর এক গিরিবর্ত্র দিয়া মদিনার কেন্দ্রস্থল লক্ষ্য করিয়া অগ্রসর হইতে থাকে। কেন্দ্রস্থলেই ছিলেন স্বয়ং হজরত রাসূল। সেখান হইতে তিনি সৈন্যদের নির্দেশ দিতেছিলেন। খালেদ শিগগিরই নবীর উপর আপতিত হইতে পারেন এই আশঙ্কা দেখা দেওয়ায়, যে যেখানে ছিল ছুটিয়া আসিল এবং প্রচণ্ড বিক্রমে খালেদের অগ্রগতি রোধ করিতে লাগিল। মুসলিমগণ মরিয়া হয়ে লড়িতেছিল, কেননা যুদ্ধের জয়-পরাজয় মীমাংসা হইতে বেশিক্ষণ বাকি ছিল না। সকলের সমবেত চেষ্টায় খালেদ সসৈন্যে পশ্চাতে হটিতে বাধা হইলেন। মদিনা আর একবার শত্রুর কবল হইতে রক্ষা পাইল।
তার পর কুরাইশগণ নিরাশ হয়ে পড়ে। তার উপর শুরু হয় ভয়াবহ তুষার-ঝনঝা ও শিলাবৃষ্টি তিন সপ্তাহে কুরাইশদের খাদ্য-রসনও শেষ হয়ে আসিয়াছিল। তুষার-ঝঞ্ঝায় তাদের তাঁবুগুলো ছিন্নভিন্ন হয় এবং উড়িয়া যায়। অগ্নি জ্বালানোর উপায় না থাকায় তাদের আহার বন্ধ হয়; এমন কি এক পেয়ালা কফি পানেরও উপায় থাকে না। বাধ্য হয়ে তারা অবরোধ তুলিয়া লয় এবং মক্কায় প্রস্থান করে।
কি-যে ভয়াবহ অবস্থার ভিতর দিয়া মদিনার মুসলমানেরা নবীর সঙ্গে তিনটি সপ্তাহ কাটাইয়াছিল, তাহা কল্পনায় আনা যায় না। ইসলাম ও মুলমানদের জন্য ইহা ছিল জীবন-মরণের প্রশ্ন। আর এই নিদারুণ সঙ্কটে নবীর যাহারা বিশ্বস্ততম সহযোগী ছিলেন তাঁহাদের মধ্যে হজরত ওসমান ছিলেন অন্যতম।