📄 নবী কন্যার পাণিগ্রহণ
দুর্যোগ একা আসে না। নবী যখন কুরাইশদের হস্তে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হইতেছেন তখন তাঁর দুই কন্যা রোকাইয়া ও উম্মে কুলসুমের স্বামী আতিবা ও ওতায়বা, দুই ভাই তাঁহাদের তালাক দিয়া তাড়াইয়া দেয়। রোকাইয়া তখন সবেমাত্র যৌবনে পদার্পণ করিয়াছেন। উম্মে কুলসুম তখনও নাবালিকা। নবুয়তের পূর্বে তাঁহাদের বিবাহকার্য সম্পন্ন হয়েছিল। এক্ষণে নবীর সঙ্গে বিরোধের দরুন তাঁর নিরপরাধ কন্যা দুইটির উপর এই অন্যায় অত্যাচার নবীর প্রাণে শেলের ন্যায় বিদ্ধ হয়েছিল। তাঁর পত্নী বিবি খাদিজাও মর্মাহত হয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিকারের উপায় ছিল না। নবী সমস্তই সহ্য করিলেন, প্রচার-কার্য হইতে ক্ষান্ত হইলেন না।
নবী-পরিবারে এই অবস্থা দেখিয়া, বিশেষ করিয়া বালিকা দুইটির দুর্ভাগ্য চিন্তা করিয়া কোমল হৃদয় হজরত ওসমান রোকাইয়াকে বিবাহ করিতে প্রস্তাব দিলেন। নবী তাঁকে অনেক করিয়া বুঝাইলেন, এই বিবাহ দ্বারা তিনি কতবড় ঝুঁকি মাথায় লইতেছেন। কিন্তু ওসমান তাঁর সঙ্কল্পে অটল রহিলেন। বিবাহ যথারীতি সম্পন্ন হয়ে গেল।
কিন্তু নবীর আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। হজরত ওসমানকে এই বিবাহের জন্য অনন্ত দুঃখ-সাগরে ভাসিতে হয়েছিল। তাঁর চাচা আশা করেছিলেন, মক্কার সর্বাপেক্ষা ধনাঢ্য ঘরে ভাতিজাকে বিবাহ দিবেন। তাঁর সে আশা তো পূর্ণ হইলই না, পরন্তু ভাতিজা এমন এক ব্যক্তির কন্যাকে বিবাহ করিল, কুরাইশদের ধর্মের এবং দেবদেবীর নিন্দুক। হজরত ওসমান আত্মীয়স্বজনদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠিলেন।
📄 হিজরত
এই সময় নবীর যাবতীয় শিষ্যের উপরই কুরাইশদের অত্যাচার চলিতেছিল। নবীর শিষ্যদের ভিতর বেশির ভাগ লোক ছিল দরিদ্র। তারা কেহ কেহ মজুরি করিত, কতক ছিল গৃহভৃত্য বা ক্রীতদাস। তাদের মতিগতি বিগড়াইয়া গেলে নাগরিকদের সমাজ জীবনে দারুণ বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে, এই আশঙ্কায় মক্কার অভিজাত সম্প্রদায় সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে। তারা এই দরিদ্র লোকগুলোর উপর যেরূপ কঠোর অত্যাচার চালায় ইতিহাসে তাহার তুলনা বিরল। কিন্তু তথাপি ইহাদের কেহই নবীর মতানুসরণ হইতে নিবৃত্ত হইল না। আশ্চর্য ছিল ইহাদের ইমানের তেজ! কুরাইশদের অত্যাচার যখন কিছুতেই নিবৃত্ত হইল না, তখন ইহারা জন্মভূমি ত্যাগ করিয়া অন্যত্র যাওয়ার সঙ্কল্প করিল। প্রথমেই খ্রিস্টান শাসিত প্রতিবেশী-রাষ্ট্র আবিসিনিয়ার কথা তাদের মনে পড়িল। শিষ্যদের তথায় হিজরত নবী অনুমোদন করেছিলেন, কারণ জালিমদের অত্যাচার হইতে রক্ষা করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। ইহাদের প্রথম দলের সহিত হজরত ওসমান ও বিবি রোকাইয়া জন্মভূমির মায়া কাটাইয়া আবিসিনিয়ায় যাত্রা করিলেন। হজরত ওসমান ইচ্ছা করিলে নবী ধর্ম ত্যাগ করিয়া নিজের আত্মীয়দের নিকট ফিরিয়া যাইতে পারিতেন। কিন্তু তৌহিদে বিশ্বাস ও আল্লাহর প্রতি ইমান তাহাকে পার্থিব সকল প্রকার দুঃখ সহিবার মতন শক্তি ও ধৈর্য দিয়াছিল।
কুরাইশদের নিকট হইতে পলায়নও সহজ ব্যাপার ছিল না। তাই, লোক জানাজানির ভয়ে রজনীর অন্ধকারে এই দুঃসাহসী যাত্রীর দল নগরসীমা অতিক্রম করেছিল এবং যথাসাধ্য ত্বরিতগতিতে লোহিত সাগরের তীরে উপনীত হয়েছিল। কিন্তু এত সতর্কতা সত্ত্বেও এতগুলো মুসলমানের নগর হইতে অনুপস্থিতি কুরাইশদের দৃষ্টি এড়ায় নাই। তারা পলাতক শিকারগুলোর সন্ধানে চতুর্দিকে চর প্রেরণ করিল। চরেরা লোহিত সাগরের তীর পর্যন্ত ধাবিত হয়েছিল। কিন্তু তারা যখন সেখানে পৌঁছে ততক্ষণে যাত্রীর দল সাগর বুকে তরী ভাসাইয়াছে। চরেরা নিরাশ হয়ে ফিরিয়া আসিল।