📄 জন্ম ও বংশ-পরিচয়
মক্কার লোকেরা বলত, কেহ যদি দুনিয়ায় হজরত ইউসুফের রূপরাশি দেখতে চায়, তাহাকে আফ্ফানের পুত্র ওসমানের দিকে তাকাইতে বল। ওসমান শুধু রূপেই অনিন্দ্য-সুন্দর ছিলেন না, গুণেও কুরাইশ-যুবকদের ভিতর তাঁর তুলনা ছিল বিরল। ফুলের মতো সুকুমার দেহ এবং শিশিরের মতো শুচিশুভ্র মন লইয়া তিনি মক্কার প্রসিদ্ধ সওদাগর আফ্ফানের গৃহ আলোকিত করেছিলেন। পিতামাতা স্বগৃহে তাঁর বাল্যশিক্ষার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। সেকালে মক্কায় স্কুল-মাদ্রাসার অভাব ছিল। ধনীর সন্তানরা নিজ নিজ গৃহেই লেখাপড়া শিখিত। ব্যবসায়ের জন্য বেশি লেখাপড়ার প্রয়োজন হইত না। হজরত ওসমান ঘরে বসিয়া মোটামুটি ভালো লেখাপড়া শিখিয়াছিলেন।
হজরত ওসমান কোনো সনে জন্মগ্রহণ করেন তার কোনো লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় না। কাহারও জন্ম-মৃত্যুর তারিখ লিখিয়া রাখার রীতি সেকালে আরবদের ভিতর বড় একটা প্রচলিত ছিল না। আরব জাতি অসাধারণ স্মরণশক্তির জন্য বিখ্যাত ছিল। তারা বিশেষ বিশেষ ঘটনাসমূহ সযত্নে মনে রাখিত এবং সেইসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন ঘটনার সময় নির্ণয় করিত। কথিত আছে, যে-সনে ইয়েমেনের গভর্নর আবরাহা হাতি লইয়া মক্কা আক্রমণ করিতে আসেন, তার সাত বৎসর পর হজরত ওসমানের জন্ম হয়। আবরাহার মক্কা আক্রমণ আরব জাতির ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা। উক্ত আক্রমণের সনকে আরবেরা 'হাতি সন' (the year of the elephant) বলিত। আল কুরআনের সুরা আলামতারায় উক্ত আক্রমণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ঐ সনে হজরত মোহাম্মদ (সা.) মক্কায় অবতীর্ণ হন। উহা খ্রিস্টীয় ৫৮০ সন। সে হিসাবে হজরত ওসমানের জন্ম-সন ৫৭৬ অথবা ৫৭৭ খ্রিস্টাব্দ। তাঁর বাল্য-নাম আবু আমর। তিনি মক্কার কুরাইশ বংশের উমাইয়া শাখার সন্তান ছিলেন। তাঁর পিতা আফ্ফান সততা ও উদার ব্যবহারের জন্য বণিক-মহলে সুপরিচিত ছিলেন। মিসর, সিরিয়া ও কুফায় তাহার বাণিজ্যিক কারবার ছিল। কিন্তু তাঁর বেশির ভাগ কারবার ছিল সিরিয়ার সঙ্গে।
বিধাতা চিরসুখ কাহারও ভাগ্যে লেখেন না। হজরত ওসমান বাল্য বয়সেই পিতৃহারা হন। তৎপর তিনি পিতৃব্য হাকামের আশ্রয়ে প্রতিপালিত হইতে থাকেন। বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর ওসমান পিতৃব্যের সহযোগিতায় বাণিজ্য ব্যবসায়ে লিপ্ত হন এবং বিদেশ গমন আরম্ভ করেন। এই প্রিয়দর্শন ব্যবসায়ীর কমনীয় কান্তি, অমায়িক ব্যবহার দেশে ও বিদেশে পণ্যের বাজারে তাঁর পক্ষে অনুকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি করিত। তাঁর আকৃতি-প্রकृति সম্বন্ধে রা'বীরা এই বর্ণনা দিয়াছেন; দেহ নাতিদীর্ঘ, নাভীস্থল ও সুঠাম। মুখমণ্ডল লাবণ্যময় ও কোমনীয়; বর্ণ সুপক্ব গমের মতো হরিদ্রাভ, আবার কারও কারও মতে শ্বেত-রক্তাভ। উচ্চতা মধ্যমাকৃতি, নাসিকা উন্নত, দেহ মাংসল, তদুপরি গুটিকার দাগ। শ্মশ্রু ঘন-বিন্যস্ত ও দীর্ঘ। মস্তকের কেশ গ্রীবাদেশ পর্যন্ত লম্বিত। রক্তিম ওষ্ঠাধরের পশ্চাতে শুভ্র দন্তপাঁটি, সর্বোপরি তাঁর নীলাভ আয়ত চক্ষুর স্নিগ্ধ দৃষ্টি-সমস্ত মিলিয়া দর্শকমাত্রকেই মোহিত করত। চরিত্রের দিক দিয়া হজরত ওসমান বাল্যকাল হইতেই সংযমী, সত্যনিষ্ঠ এবং ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। কখনও মদ্যপান করিতেন না এবং কুৎসিত আমোদ-প্রমোদে লিপ্ত হইতেন না।
তিনি লাজুক স্বভাব ও বিনয়ী ছিলেন। কাকেও কষ্ট দেওয়া তিনি সইতে পারিতেন না। এই সকল গুণরাশি তাঁকে যুব-সমাজে আদর্শ স্থানীয় করেছিল। বয়স্কদের নিকটও তিনি অতি আদরের পাত্র ছিলেন।
হজরত ওসমান বংশের দিক দিয়া হজরত রসুলের পর ছিলেন না। তাঁর পূর্বপুরুষ আব্দে মানাফ হজরত রসুলেরও পূর্বপুরুষ ছিলেন। তাঁর মাতা উরদী বিন্তে কারবাজ ছিলেন মানাফ বংশীয়া। আর মাতামহী বায়জা ওরফে উম্মুল হাকিম ছিলেন নবীর পিতা আব্দুল্লাহর দুধ-বোন। আরবে দুধ-ভাই ও দুধ-বোন সম্পর্কে আপন ভাই-বোন সম্পর্ক অপেক্ষা কোনও অংশে হীন ছিল না।
কিন্তু হজরত ওসমান ও হজরত রসুল পরস্পর আত্মীয় হইলেও কুরাইশ বংশের যে দুই শাখায় তাঁহাদের জন্ম উক্ত দুই শাখার ভিতর সম্প্রীতি ছিল না বরং শত্রুতা ছিল। তাঁহাদের পূর্বপুরুষ আবৃন্দে মানাফ ছিলেন মক্কার নেতা। তাঁর মৃত্যুর পর উক্ত নেতৃত্ব বর্তে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র হাশিমের ওপর কারণ জ্যেষ্ঠ আদেশ শাম্স অপেক্ষা তিনি অধিকতর কার্যদক্ষ ছিলেন। কিন্তু, আদেশ শাসের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র উমাইয়া উত্তরাধিকার সূত্রে নেতৃত্বের দাবি করেন এবং পিতৃব্য হাশিমের সঙ্গে বিরোধ শুরু করেন। তিনি সর্বদাই তাঁর পিতৃব্যকে অপদস্থ ও হেয় প্রতিপন্ন করিতে চেষ্টা করিতেন। ক্রমে উভয়ের ভিতরকার বিবাদ এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের সূচনা করে। কিন্তু মক্কার বিভিন্ন গোত্রের নেতৃবর্গের জন্য এই যুদ্ধ ঘটিতে পারে নাই। এরূপ জ্ঞাতি-বিরোধে কুরাইশ বংশের যাবতীয় শাখা জড়িত হয়ে পড়িতে পারে এবং ভয়াবহ রক্তপাত ঘটিতে পারে, এই আশঙ্কায় তাঁরা এক সালিশি মীমাংসার আয়োজন করেন। এই মীমাংসায় স্থির হয়, অতঃপর হাশিম কা'বা ঘরের সংরক্ষণ এবং হজযাত্রীদের খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ করিবেন, আর উমাইয়ার হস্তে থাকিবে নগরের শাসন সংরক্ষণ ও যুদ্ধঘটিত ব্যাপার নিয়ন্ত্রণ।
কা'বা ঘরের সেবাইত ও হজযাত্রীদের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে হাশিম ও তাঁর বংশধররা সমগ্র আরবে সুপরিচিত ও সম্মানিত হন। অধিকন্তু, হজের মৌসুমে তাদের প্রচুর অর্থলাভ হইত। পক্ষান্তরে পৌর-শাসনে তেমন অর্থাগম হইত না। মক্কায় যুদ্ধ- বিগ্রহও বিশেষ ঘটিত না। কাজেই উমাইয়া বংশীয়েরা অর্থ ও খ্যাতি উভয় দিক দিয়া হাশিমীদের তুলনায় হীন হয়ে পড়িল। ইহার ফলে হাশিমীদের প্রতি তাদের ঈর্ষার ভাব দিন দিন বাড়িতে থাকে।
হাশিমের পুত্র আবদুল মুত্তালিবের সময় দুই শাখার ভিতর ইজ্জৎ ও প্রতিপত্তি ঘটিত পার্থক্য আরও বাড়িয়া যায়। আবদুল মুত্তালিব ছিলেন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব-সম্পন্ন পুরুষ। তাঁর অন্তঃকরণ ছিল উদার এবং ব্যবহার রাজোচিত। তিনি একাদশ পুত্রের পিতা ছিলেন। তখনকার সেই গোত্রীয় কলহের যুগে ইহা কম শ্লাঘার বিষয় ছিল না।
কেননা, তখন বংশের শক্তি নির্ভর করিত পুত্রদের সংখ্যার উপর। দেশে ও বিদেশে তাঁর বিপুল খ্যাতি এবং মক্কায় তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীহীন নেতৃত্বের জন্য লোকে তাঁকে মক্কার 'মুকুটহীন রাজ' (uncrowned king) বলিত। তাঁর পুত্র আবু তালিবও ছিলেন কুরাইশদের ভিতর অত্যন্ত প্রতিপত্তিশালী জননায়ক। এই আবু তালিবের পুত্র হইলেন হজরত আলি এবং ভ্রাতুষ্পুত্র বিশ্ববিশ্রুত নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)।
উমাইয়া বংশীয় লোকেরা হাশিমীদের এই সম্মান ও প্রতিপত্তি সহ্য করিতে পারে নাই। তাদের পুরুষানুক্রমিক চেষ্টা ছিল হাশিমীদের খর্ব করা। মক্কায় শাসন-সংরক্ষণ ও সামরিক নেতৃত্বের অধিকারী হয়ে তারা কূটনীতি ও সাহসিকতায় অভ্যস্ত হয়েছিল। অর্থের দিক দিয়া নিজেদের ন্যূনতম পূরণের জন্য তারা বৈদেশিক বাণিজ্যে অত্যধিক আগ্রহী হয় এবং দুই-তিন পুরুষের ভিতর বেশ সম্পদশালী হয়ে উঠে। শাসনক্ষমতা ও বৈভবের একত্র সমাবেশ তাহাদের আত্মম্ভরী ও বিলাসপরায়ণ করেছিল। পক্ষান্তরে হাশিমীগণ কা'বার সংশ্রবে থাকায় ধর্মাভাবাপন্ন ও সাত্ত্বিক স্বভাব হয়েছিল। এইসব বিভিন্নতা উমাইয়া এবং তাদের পক্ষভুক্ত অন্যান্য কুরাইশদের ইসলামের সহিত বিরোধিতার মূলেও সক্রিয়ভাবে কার্যকরী হয়েছিল। কারণ, ইসলাম যিনি আনিয়াছিলেন তিনি ছিলেন হাশিমী বংশীয়।
কিন্তু, বিধাতার সৃষ্টি বিচিত্র। উমাইয়ার এক পুত্র হারিবের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন আবু সুফ্ইয়ান; অপর পুত্র আবুল আ'সের ঔরসে জন্মে হাকাম ও আফ্ফান। তারা সকলেই হজরত রসুলের জানি দুশমন ছিলেন। অথচ আফ্ফানের পুত্র হজরত ওসমান ছিলেন পরম সাত্ত্বিক এবং প্রতিমা পূজার প্রতি আবাল্য বীতশ্রদ্ধ। পিতৃপুরুষদের অহমিকা ও বিলাসপ্রবণতা তাঁর চরিত্রে মোটেই দৃষ্ট হইত না। ইসলামের আহ্বানে মক্কায় প্রথম যে চল্লিশ ব্যক্তি তৌহিদে দীক্ষা গ্রহণ করেন, তাঁদেরই ভিতর ছিলেন এই হজরত ওসমান।
টিকাঃ
১. হজরত রসুল যে সময় মক্কা হইতে মদিনায় হিজরত করেন ঐ সময় হজরত ওসমানের বয়স ৪৭ বৎসর ছিল বলিয়া উল্লিখিত আছে। নবীর বয়স তখন ৫৩ বৎসর। সে হিসাবে হজরত ওসমানের জন্ম সন ৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে। প্রচলিত মতে, হজরত আবুবকর নবী অপেক্ষা দুই বৎসরের ছোট ছিলেন। এই হিসাবে হজরত আবুবকর হজরত ওসমান অপেক্ষা চার পাঁচ বৎসরের বড় ছিলেন। হজরত উমর ছিলেন নবী অপেক্ষা তের বৎসরের ছোট। সুতরাং তিনি হজরত ওসমান অপেক্ষা অন্তত ছয় বৎসরের ছোট ছিলেন। মু'য়রের মতে, নবীর মৃত্যুকালে হজরত আবুবকরের বয়স ষাট এবং হজরত উমরের বয়স পঁয়তাল্লিশ বৎসর ছিল। আর, আবু ওবায়দা, যিনি হজরত আবুবকর ও হজরত উমরের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন, বয়সে তাদের দুইজনের মাঝামাঝি ছিলেন।
📄 ইসলামে সেবা ও দানশীলতা
হজরত ওসমান আবিসিনিয়া হইতে মদিনায় আসার পর মাত্র চার পাঁচ বৎসরের ভিতর কিরূপ জনপ্রিয় হয়ে উঠিয়াছিলেন, হোদাইবিয়ার সন্ধিসঙ্কটে আমরা তার পরিচয় পাইয়াছি। তার মূল কারণ ছিল তাঁর মহত্ত্ব, জনসেবার প্রবৃত্তি ও অপূর্ব দানশীলতা। আবিসিনিয়ায় তিনি যে আর্থিক অনটন ভোগ করিতেছিলেন, মদিনায় আসার পর তা দূরীভূত হয়। এখানে তিনি ব্যবসায়ের সুযোগ পান এবং জীবন-যাত্রার জন্য কারও আনুকূল্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে অচিরে ব্যবসায়ে লিপ্ত হয়ে যান। বিদেশের বাজারে আফ্ফান-পরিবারের সুনাম ছিল। হজরত ওসমান নিজেও যৌবন বয়সেই ব্যবসায় ক্ষেত্রে সৎ বণিক হিসেবে যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করেন। ফলে মদিনায় আসার পর তাঁর কারবারে দ্রুত উন্নতি হইতে থাকে। অল্প দিনের ভিতরই তিনি বেশ সম্পদশালী হয়ে ওঠেন।
তিনি এই সম্পদের কোনরূপ অপব্যবহার না করিয়া মদিনাবাসী মুসলমানদের দুঃখ-কষ্ট মোচনে ব্যয়িত করেন। একটা নতুন ধর্মাবলম্বী ও নব প্রতিষ্ঠিত জাতি হিসেবে তাদের অভাব-অভিযোগের অন্ত ছিল না। স্থানীয় অমুসলমানদের হিংসাত্মক আচরণ এবং মক্কার কুরাইশদের বার বার ধ্বংসাত্মক আক্রমণ তাদের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করিয়া তুলেছিল। সেরূপ ক্ষেত্রে হজরত ওসমানের মতো সহৃদয় ও বিত্তবান লোকের সেখানে অতিশয় প্রয়োজন ছিল।
মদিনায় আসার পর প্রথমেই হজরত ওসমানের নজরে পড়ে মুসলমানদের পানীয় জলের অভাব। মরুভূমির দেশ; মাত্র গুটিকয়েক ঝরনা ও কূপের উপর সারা শহরের লোককে নির্ভর করতে হইত। হজরত ওসমানের হাতে উপযুক্ত অর্থ আসার পর তিনি মুসলমানদের জন্য এক দরিদ্র ইহুদির নিকট হইতে একটি কূপের অর্ধাংশ ক্রয় করিলেন। 'রুমা' নামে পরিচিত এই কূপটির বাকি অর্ধেক ইহুদিদের দখলে থাকায় পানি উঠান লইয়া তাদের সহিত শর্ত করিলেন তারা একদিন এবং মুসলমানরা তার পরের দিন পানি লইবে। কিছুদিন এইভাবে চলার পর পুনরায় বিরোধ দেখা দিল এই কারণে, ইহুদিরা তাদের নির্ধারিত দিনে এত বেশি পানি উঠাইত যে পরের দিন অতি সামান্য পানিই মুসলমানদের ভাগে পড়িত। এই অসুবিধা লক্ষ্য করিয়া হজরত ওসমান কূপটির সাবেক মালিক হইতে ন্যায্য মূল্যের অনেক বেশি দিয়া তার বাকি অর্ধাংশ ক্রয় করিয়া লইলেন। তারপর সম্পূর্ণ কূপটিতে তিনি স্থানীয় মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করিয়া দিলেন। ইহাতে মুসলিমগণ তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতায় অভিভূত হয়ে পড়িল। কেননা পানির কষ্ট প্রত্যেক পরিবারকেই পীড়া দিত।
যুদ্ধাদি বড় বড় ব্যাপারে হজরত ওসমানের দান অপর সকলের দানকে ছাড়াইয়া উঠিত। নবীর তাবুক-অভিযানের সম্বন্ধে এইরূপ বর্ণিত হয়েছে; হিজরি নবম সনে সিরিয়া-প্রত্যাগত লোকদের মুখে নবী শুনিতে পাইলেন, রোমকরা প্রায় এক লক্ষ লোক ও বহু উপজাতি সহকারে মদিনার দিকে অগ্রসর হইতেছে; সম্ভবত মদিনা আক্রমণ তাদের উদ্দেশ্য। সময়টি ছিল গ্রীষ্মকাল। পানির তখন সর্বত্র অভাব কিন্তু বাগানে তখন ফল পাকিতে আরম্ভ করিয়াছে। লোকেরা চাহিয়াছিল এই দারুণ গ্রীষ্মে কোথাও দূরের রাস্তায় বাহির না হয়ে, ঘরে গাছের ছায়ায় আরাম এবং ঠাণ্ডা ফল সম্পদ উপভোগ করিবে। যুদ্ধে যাইতে এ সময় কারও মন চাহিতেছিল না। কিন্তু নবী মনে করিলেন শত্রুকে বেশিদূর অগ্রসর হইতে দেওয়া অনুচিত। তাই তিনি কিছুমাত্র সময় নষ্ট না করিয়া মদিনা, মক্কা ও মরুভূমির সকল এলাকার অধিবাসীদের আহ্বান করিলেন এবং তাহাদের অবিলম্বে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইতে বলিলেন। মক্কা বিজয়ের পর সমগ্র আরবভূমিতে নবীর প্রভাব এত বাড়িয়া গেল, কেউ কোনো প্রতিবাদ করিল না। মাত্র কয়েক দিনের ভিতর তিরিশ হাজার পদাতিক ও দশ হাজার অশ্বারোহী নবীর পতাকা-তলে সমবেত হইল। নবী সকলকে বুঝাইলেন, সময়টি যদিও কষ্টকর কিন্তু শত্রুরা সংখ্যায় অনেক, কাজেই মুসলমানদের উপযুক্তভাবে প্রস্তুত হওয়া চাই। তিনি সাহাবিদের আল্লাহর কাজে যুদ্ধের জন্য যার যা সাধ্য দান করিতে বলিলেন। সৈন্য বাহিনীর জন্য যানবাহন, সাজ-সরঞ্জাম, খাদ্য এবং আরও অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়। তিরমিজি শরীফে উল্লেখ আছে; নবীর আদেশ পাইয়া হজরত উমর তাঁর সম্পত্তির অর্ধেক এবং হজরত আবুবকর তাঁর যা' কিছু ছিল সমস্তই নবীর চরণে সমর্পণ করিলেন। আর হজরত ওসমান দিলেন এক হাজার উট, সত্তরটি অশ্ব এবং নগদ এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা। নবী খুশি হয়ে বলিয়াছিলেন, 'তুমি 'গনি', আল্লাহ তোমাকে পুরস্কৃত করিবেন।' মরুভূমির বেদুইনরা এই অভিযানে যোগদান করেছিল।
চল্লিশ হাজার লোকের বিরাট বাহিনী লইয়া দারুণ গ্রীষ্মের ভিতর অসাধারণ কষ্ট স্বীকার করিয়া নবী ক্রমাগত অগ্রসর হইতে থাকিলেন। তাবুক পর্যন্ত অগ্রসর হওয়ার পর নবী জানিতে পারিলেন, আশপাশে কোথাও রোমক বাহিনীর চিহ্ন নাই, চল্লিশ হাজার লোক নবীর সঙ্গে আসিতেছে এবং সমগ্র মরুভূমি উজার করিয়া বেদুইনরা তাঁর পশ্চাতে আসিতেছে শুনিয়া তারা পালাইয়া গিয়াছে। স্থানীয় রোমক শাসনকর্তা যুহান্না বিন রুব নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিলেন এবং জিযিয়া প্রদানের অঙ্গীকারে সন্ধি স্থাপন করিলেন। স্থানীয় অধিবাসীদের সম্পত্তি ও ধর্মীয় অধিকারে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করা হইবে না, এই প্রতিশ্রুতি দিয়া নবী মদিনায় ফিরিয়া আসিলেন।
শুধু রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বা জাতীয় অভাব-অভিযোগেই যে হজরত ওসমান মুক্তহস্তে দান করিতেন, তা নয়। অনেক ব্যক্তিগত ব্যাপারেও তাঁর মোটা দানের দৃষ্টান্ত বিরল নহে। হজরত আলির বিবাহ এমনই একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। পরিখা-যুদ্ধে হজরত আলি যে অপূর্ব বীরত্ব প্রদর্শন করেন, মুসলমান মাত্রকেই তাহা মুগ্ধ ও বিস্মিত করেছিল। ইহার পূর্বে বদর ও ওহোদ যুদ্ধেও তিনি কম বীরত্ব প্রদর্শন করেন নাই। তাই পরিখা যুদ্ধের বিভীষিকা কাটিয়া গেলে নবীর সাহাবিদের মনে পড়িল, নবীর কনিষ্ঠা কন্যা ফাতেমার কথা। কিভাবে এই বিবাহ সংঘটিত হয় সে-সম্বন্ধে একটি চমৎকার বিবরণী 'ভাই গিরীশচন্দ্র' রচিত 'হযরতের চরিত্র-কথা' নামক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে। কাহিনিটি নিম্নে উদ্ধৃত্ত হইল;
'পরম রূপবতী ফাতেমা দেবীর যৌবন কাল, ধনশ্বর্যশালী সম্ভ্রান্ত কোরেশগণ তাঁর পাণি গ্রহণের প্রার্থী, হজরত তাঁহাদের প্রার্থনায় কিছুই মনোযোগ বিধান করিতেছিলেন না, ইহা দেখিয়া একদিন আমির আবুবকর হযরতের নিকট ফাতেমার বিবাহের প্রসঙ্গে উত্থাপন করেন। হজরত বলেন, 'ঈশ্বরের আজ্ঞার উপর এ কার্য নির্ভর করছে, আমি আজ্ঞার প্রতীক্ষা করিতেছি।' একদিন ওমরও এই প্রস্তাব উপস্থিত করেন, তাতেও হজরত এইরূপ বলেন। অন্য এক দিবস মন্দিরে আবুবকর ও ওমর এবং সয়িদ পরস্পর এইরূপ কথোপকথন করেন, 'কোরেশ দলপতিগণ এই কন্যারত্নকে গ্রহণ করিবার জন্য লালায়িত, হজরত কাহারও প্রার্থনা শ্রবণ করছেন না। আলি এইক্ষণও বিবাহ করেন নাই এবং বিবাহের ইচ্ছাও প্রকাশ করেন নাই আবুবকর বলিলেন, 'আমার বোধ হইতেছে দরিদ্রতাই আলির উদ্বাহে প্রতিবন্ধক হয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আলির জন্যই ফাতেমার পরিণয় ক্রিয়ার বিলম্ব হইতেছে, ঈশ্বর ও তাঁর প্রেরিতপুরুষ আলির সঙ্গে ফাতেমার পরিণয়ই অনুমোদন করিয়াছেন। তৎপর আবুবকর সয়িদ ও ওমরকে বলিলেন, 'চল, আমরা তিনজনে মিলিয়া আলির নিকটে যাই এবং ফাতেমার সম্বন্ধের প্রস্তাব করিয়া তাঁকে বিবাহ করিতে উত্তেজিত করি। যদি আলি অর্থাভাবশত; আপত্তি করেন আমরা সকলে তাঁকে সাহায্য করিব।' আবুবকরের এই প্রস্তাব ওমর ও সয়িদ সর্বান্তকরণে অনুমোদন করিলেন। তৎপর তাঁরা তিনজনে মিলিয়া আলির নিকটে গেলেন। তখন আলি একজন আনসার বন্ধুর উদ্যানে স্বীয় উষ্ট্রযোগে জল সিঞ্চন করিতেছিলেন। তিনি তাঁহাদের দেখিয়াই তাদের অভ্যর্থনার জন্য অগ্রসর হইলেন ও কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন। কথা প্রসঙ্গে আবুবকর বলিলেন, 'আলি, হযরতের তুমি অতিশয় আদরের পাত্র, তাঁর নিকটে তোমার যেরূপ গৌরব এরূপ অন্য কাহারও নয়। কোরেশ বংশীয় প্রধান পুরুষগণ কুমারি ফাতেমার পাণি গ্রহণের প্রার্থী হয়েছিলেন, হজরত তাঁহাদের কাহারও প্রার্থনা পূর্ণ করেন নাই, আমার বোধ হইতেছে তিনি তোমার হস্তে ফাতেমাকে সমর্পণ করিতে চাহেন, তুমি কেন ফাতেমার পাণি গ্রহণের প্রার্থী হইতেছ না? তোমার কি তাতে ইচ্ছা নাই?' এই কথা শ্রবণ করিয়া (আলি) অশ্রুপূর্ণ নয়নে বলিলেন, 'দেব আবুবকর, আর বায়ু সঞ্চালন করিবেন না, মনের অগ্নিকে অনেক কষ্ট প্রশমিত করিয়া রাখিয়াছি, এ বিষয়ে আমার ইচ্ছা আছে কি-না আপনি আর আমাকে স্মরণ করাইয়া কি দিতেছেন? এই সম্বন্ধের বিষয়ে আমার যেরূপ অভিলাষ বোধ করি অন্য কাহারও তদ্রূপ নয়, দরিদ্রতা ইহার প্রতিবন্ধক হয়েছে, এই কথা উত্থাপন করিবারও আমার ক্ষমতা নাই' আবুবকর বলিলেন, 'আলি, এ প্রকার বলিও না, ঈশ্বর ও তাঁর প্রেরিতপুরুষের নিকটে পার্থিব সম্পত্তির কোনো মূল্য নাই, সম্ভবত অর্থকৃচ্ছতা ও দারিদ্র্য কোনো প্রকারে এ বিষয়ে প্রতিবন্ধক হইতে পারে না।' এই কথা শুনিয়া আলি স্বীয় উষ্ট্রটিকে গৃহে লইয়া গিয়া বন্ধন করিলেন, তৎপর হজরত মোহাম্মদের নিকটে চলিয়া গেলেন।... যেমন কাহারও কোনো বিশেষ অভিলাষ আছে, সে লজ্জাপ্রযুক্ত ব্যক্ত করিতে না পারিয়া অধোমুখে বসিয়া থাকে, সেইভাবে আলি অবনত মস্তকে উপবিষ্ট রহিলেন। তাঁর ভাব দেখিয়া হজরত জিজ্ঞাসা করিলেন 'আলি, বোধ হইতেছে তোমার মনে কোনো আকাঙ্ক্ষা আছে, তুমি লজ্জাবশত তাহা বলিতে পারিতেছ না, কি অভিলাষ বল, সঙ্কোচ করিও না তোমার অভীষ্ট সিদ্ধ করিতে আমি যত্নবান হইব।' তখন আলি বলিলেন, দেব, আপনি আমাকে শৈশবাবধি জনক-জননী হইতে গ্রহণ করিয়া স্বীয় পবিত্র সহবাসে রাখিয়াছিলেন এবং আন্তরিক এবং বাহ্যিক শিক্ষাদানে আমার কল্যাণ বিধান করিয়াছেন, যে অনুগ্রহ ও উপকার আমি আপনার নিকটে লাভ করিয়াছি তাহার দশমাংশও স্বীয় পিতামাতার নিকটে প্রাপ্ত হই নাই। পরমেশ্বর আপনার সাহায্যে আমাকে পৈতৃক অসত্য ধর্ম হইতে মুক্ত করিয়া সত্য ধর্মে আশ্রয় দান করিয়াছেন। আপনি আমার জীবনের সম্বল, সুখ ও শান্তির মূল। দেব, এইক্ষণ তো আমি আপনা পদসেবাতে নিযুক্ত থাকিয়া সবল ও ভাগ্যবান হয়েছি এবং ঐহিক পারত্রিক কল্যাণ ও সমুন্নতি লাভ করিয়াছি, কিন্তু আমার নিজের কোনোরূপ গৃহ ও গৃহসম্পত্তি নাই হৃদয়-সখী ভার্য্য নাই, যিনি সুখে-দুঃখে আমার সঙ্গে সহানুভূতি করিবেন ও আমার মর্মজ্ঞা হইবেন। কিছুকাল হইতে এই ইচ্ছা যে কুমারি ফাতেমার পরিণয়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করি, কিন্তু দুঃসাহসিকতা হইবে ভাবিয়া এ পর্যন্ত প্রকাশ করিতে পারি নাই। ইহা সম্পন্ন হইবার কোনো সম্ভবনা আছে কি? আলির এই কথা শ্রবণ করিয়া হযরতের মুখমণ্ডল আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠিল। তিনি আলির প্রতি প্রসন্ন দৃষ্টি করিয়া ঈষৎ হাস্য করিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, 'আলি, বিবাহ করিতে যাহা প্রয়োজন তৎসম্বল কি তোমার আছে?' আলি বলিলেন, 'আর্য, আপনি আমার অবস্থা যেরূপ জানেন, আমার অন্য কোনো আত্মীয় বন্ধু সেরূপ অবগত নহেন। আপনার নিকটে কিছুই গুপ্ত নহে। আমার একটি করবাল, একটি বর্ম ও একটি উষ্ট্রমাত্র আছে। এ সকলের আপনিই অধিপতি, যাহা বিহিত বোধ করেন তাহাই হউক।' হজরত বলিলেন, 'তোমার জন্য করবালের প্রয়োজন, অনেক সময় ধর্মদ্রোহী শত্রুর সঙ্গে তোমাকে সংগ্রাম করিতে হইবে। তোমার আরোহণের জন্য উষ্ট্রেরও আবশ্যক। আমি কেবল তোমার বর্মটি চাই, তাতেই কার্য সিদ্ধ হইবে। আলি, তোমাকে আমি সুসংবাদ দান করিতেছি যে, ঈশ্বর তোমার সঙ্গে ফাতেমার বিবাহ মনোনীত করিয়াছেন স্বর্গে তোমাদের উভয়ের পরিণয় ক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।'... হযরতের কন্যার কাবিনস্বরূপ বরের বর্ম নির্ধারিত হইল। আলি বলিলেন, আমি ইহাতে সম্মতি দান করিলাম। সভ্যস্থ বন্ধুগণ, আপনারা এ বিষয়ে হযরতের সম্মতি জিজ্ঞাসা করুন এবং ইহার সত্যতা সম্বন্ধে সাক্ষী থাকুন।' সমাগত সম্ভ্রান্ত মোসলেমগণ হযরতের প্রতি দৃষ্টি করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, 'প্রেরিতপুরুষ, এই রূপেই কি উদ্বাহ সম্পাদন বিহিত করিয়াছেন?' হজরত হাঁ বলিয়া সম্মতি প্রকাশ করিলেন। তখন সভার চতুর্দিক হইতে 'ঈশ্বর আশীর্বাদ করুন,' এই ধ্বনি উত্থিত হইল। তদনন্তর হজরত গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন এবং আলিকে বলিলেন, 'যাও স্বীয় কবচ বিক্রয় করিয়া তাহার মূল্য লইয়া আইস। আলি এই বর্ম চারিশত দেরহাম মুদ্রা মূল্যে আমির ওসমানের নিকটে বিক্রয় করেন। কেহ কেহ বলেন, ওসমান চারিশত ষাট দেরহামে উহা ক্রয় করেছিলেন। সেই কবচ অতি উত্তম ও সুদৃঢ় ছিল, করবালের আঘাত তাতে কিছুমাত্র বসিতে পারিত না। বর্ম ওসমানকে প্রদান করিয়া মূল্য গ্রহণ করা হইলে পর ওসমান বলিলেন, 'আলি, তুমিই এই বর্মের উপযুক্ত পাত্র, তোমার অঙ্গেই ইহা শোভা পায়, ইহা আমি তোমাকেই প্রত্যর্পণ করিলাম।' আলি আমির ওসমানের এই প্রীতি ও বদান্যতা দেখিয়া তাঁকে কৃতজ্ঞতা দান করিলেন এবং তখনই হযরতের নিকট যাইয়া মুদ্রা ও বর্ম দুই-ই তাঁর নিকটে বাখিয়া দিলেন। হজরত মোহাম্মদ কবচ বিক্রয় না করিয়া মুদ্রা কিরূপে প্রাপ্ত হওয়া গেল ইহা জিজ্ঞাসা করিলে আলি ওসমানের বদান্যতার কথা জানাইলেন। হজরত শুনিয়া পুলকিত অন্তরে ওসমানকে আশীর্বাদ করিলেন। তিনি উক্ত মুদ্রাপুঞ্জ হইতে কিছু মুদ্রা গ্রহণ করিয়া আবুবকরের হস্তে প্রদানপূর্বক বিবাহিত কন্যার জন্য উপঢৌকন সামগ্রী ক্রয় করিয়া আনিতে বলিলেন। দ্রব্যজাত বহন করিয়া আনিবার জন্য সোলেমান ও বেলালকে তাঁর সঙ্গে পাঠাইলেন। আবুবকর তদ্দারা ফাতেমার নিমিত্ত এই সকল যৌতুক সংগ্রহ করিলেন, যথা-সুকোমল উর্ণাপুঞ্জে নির্মিত মিসর দেশীয় শয্যাবিশেষ এবং একটি চর্মময় গদি যাহার ভিতরে খোর্মা-বল্কলের তত্ত্ব নিহিত ছিল এবং খবিরের এক কম্বল এবং কতকগুলো মৃন্ময় পাত্র ও একটি কৌষের যবনিকা। আবুবকর এসমস্ত হযরতের নিকটে আনিয়া উপস্থিত করিলেন। হজরত এই সকল সামগ্রী দর্শন করিয়া অশ্রুপূর্ণ নয়নে বলিলেন: 'পরমেশ্বর, যাদের মৃন্ময়পাত্র প্রিয় সামগ্রী সেই সমস্ত লোককে তুমি আর্শীবাদ করো।' অনন্তর তিনি ইচ্ছানুরূপ অন্য আবশ্যকীয় দ্রব্যজাত ক্রয় করিবার জন্য অবশিষ্ট মুদ্রা ওম্মে সোলমার হস্তে অর্পণ করিলেন। কিছু সুগন্ধ দ্রব্য ক্রীত হইল।... আলি বলিয়াছেন, 'ফাতেমা কখনো আমাকে ক্রুব্ধ ও বিরক্ত করিয়া তোলেন নাই, যে পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। কখনো কোনোরূপ অবাধ্যতাচরণ করেন নাই এবং আমিও কোনো দিন তাঁকে ব্যথিত করি নাই।'
এইরূপ বহু দানের জন্য হজরত ওসমান স্মরণীয় হয়ে আছেন এবং তাঁর 'গনি' নাম সার্থক হয়েছিল। মুসলিম জাহানে তিনি 'ওসমান গনি' নামেই সুপরিচিত।
কিন্তু আল্লাহ নানাভাবে মানুষের ইমান ও ধৈর্যের পরীক্ষা করেন। তাবুক অভিযানের বৎসর (৯ম হিজরিতে) তাঁর নবী-বংশীয় দ্বিতীয় পত্নী উম্মে কুলসুম তাঁকে শোক-সাগরে ভাসাইয়া পরলোকগমন করেন। নবী-বংশের সহিত তাঁর শেষ বন্ধন- সূত্রটুকু ও এইভাবে ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু তদ্দরুন নবীর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা বা আনুগত্য কিছুমাত্র হ্রাস পায় নাই।
টিকাঃ
১. 'ভাই গিরিশচন্দ্র সেন' কুরআন শরীফের প্রথম বঙ্গানুবাদক। তিনি ইসলাম সম্বন্ধে গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন এবং হযরতের একখানি জীবন-চরিতও লিখিয়াছিলেন। বহু গবেষণাপূর্ণ এই মূল্যবান গ্রন্থ দুইটি অধুনা বাজারে পাওয়া যায় না। খ্যাতনামা লেখক কাজী আবদুল ওদুদ প্রণীত 'হজরত মোহাম্মদ ও ইসলাম' নামক গ্রন্থে ভাই গিরীশচন্দ্র হইতে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে তাহাই এখানে পুনরুদ্ধৃত হইল।
📄 নির্বাচন-প্রতিযোগিতা
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ২৪ হিজরিতে গুপ্তঘাতক কর্তৃক আহত হন। আহত অবস্থায় তিনি তিনদিন জীবিত ছিলেন। বিষাক্ত ছুরিকর আঘাত হইতে তিনি বুঝিতে পারেন, তিনি আর বাঁচিবেন না। তাই তিনি মৃত্যুর পূর্বে তাঁর পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। অনেকে মনে করেছিলেন, হজরত আবুবকরের ন্যায় হজরত উমরও কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তিকে তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনীত করিয়া যাইবেন। কিন্তু হজরত উমর তাহা করিলেন না। তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের চরম সমর্থক। একদা তিনিই হজরত রাসূলকে তাঁর প্রতিনিধি নির্বাচন করিতে বারণ করেছিলেন।
ইসলামি আদর্শের একনিষ্ঠ অনুসারী হজরত উমর নিজে তাঁর ব্যতিক্রম করিলেন না। তিনি প্রথমে আবদুর রহমান বিন আউফকে আহ্বান করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি খিলাফত গ্রহণে ইচ্ছুক কিনা। নবীর এই সাহাবির উপর হজরত উমরের অগাধ বিশ্বাস ছিল। 'কিন্তু আবদুর রহমান এই গুরু দায়িত্ব গ্রহণে নিজের অক্ষমতা জ্ঞাপন করিলেন। তখন হজরত উমর তাঁকে একটি নির্বাচনী কমিটি (মজলিশে শুরা) আহ্বান করিতে অনুরোধ করিলেন এবং হজরত আলি, হজরত ওসমান, আয-যুবায়ের ইবনে আল আ'বাম, তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ এবং সাদ ইবনে আবি ওক্কাস এই পাঁচ ব্যক্তিকে উক্ত কমিটিতে গ্রহণ করিতে বলিলেন। ইহারা সকলেই ছিলেন মুসলমানদের ভিতর গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং নবীর বিশ্বস্ত সাহাবা। ইসলামের জন্য ইহাঁদের প্রত্যেকের অবদান ছিল অসামান্য।
তিনি এই নেতৃবর্গকে তিন দিনের সময় দিলেন এবং শর্ত করিয়া দিলেন, তাঁদের ভিতর হইতে যদি কেহ খলিফা নির্বাচিত হন, অথবা অপর যে কেহ তাঁদের দ্বারা খলিফা-পদের জন্য মনোনীত হয়, তিনি নিজ বংশের লোকদের কখনই অপরের অপেক্ষা অধিক অনুগ্রহ প্রদর্শন করিতে পারিবেন না। তিন দিনে খিলাফৎ-প্রশ্নের কোনও মীমাংসা হইল না। তখন হজরত উমর তাহাদের ডাকিয়া পাঠাইলেন এবং তাঁহাদেরই অনুরোধে সা'দ বিন যায়েদ নামক আর একজন গোষ্ঠীপতিকে তাঁহাদের কমিটির অন্তর্ভুক্ত করিয়া দিলেন। তাঁরা হজরত উমরের পুত্র গুণবান আবদুল্লাহকেও তাঁহাদের ভিতর রাখিতে চাহিলেন। কিন্তু হজরত উমর তাতে অনিচ্ছা প্রকাশের পর এই শর্তে সম্মতি দিয়াছিলেন, আবদুল্লাহ শুধু মতামত প্রকাশ করিতে পারিবে কিন্তু নিজে খিলাফতের প্রার্থী হইতে পারিবে না। কথিত আছে, এই সম্পর্কে তিনি বলিয়াছিলেন- 'খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করিয়া একা আমিই আল্লাহর কাছে কি কৈফিয়ত দিব, ভাবিয়া পাইতেছি না; এ অবস্থায় আমার বংশের উপর আর অধিক দায়িত্ব চাপাইতে চাই না।'
ইহা লক্ষণীয় যে, নির্বাচন কমিটি কুরাইশদের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শাখার কোনো একটি হইতে অধিক লোক লওয়া হয় নাই। কমিটির নেতা আবদুর রহমান অদলীয় লোক ছিলেন। তবে তাঁর পত্নীদের ভিতর একজন ছিলেন হজরত ওসমানের মাতার গর্ভজাত কন্যা। সম্ভবত সেই সম্পর্কে লক্ষ্য করিয়াই হজরত আলি তাঁকে ভোটের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকিতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু আবদুর রহমান যেরূপ তেজস্বী পুরুষ ছিলেন, তাতে পক্ষপাতিত্ব তাঁর পক্ষে সম্ভবপর মনে হয়না। ইনি সেই আবদুর রহমান, যিনি মদিনায় হিজরত করার পর সা'দ বিন রাবী নামক আনসারের গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন এবং সা'দ যখন তাঁকে ভাই হিসাবে নিজের বিপুল ধনসম্পত্তির একাংশ দিতে চাহেন এবং স্ত্রীর ভিতর একজনকে তাঁর পত্নী করার উদ্দেশ্যে ত্যাগ করিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন তিনি উত্তরে বলিয়াছিলেন, 'ভাই সা'দ আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন; আমার এ-সব কিছুই দরকার নাই। কাল ভোরে তুমি আমাকে বাজারের রাস্তা দেখাইয়া দিও, আমি রোযগার করিয়া খাইব।' আর নিজের রোজগার দ্বারাই তিনি মদিনার একজন বড় ধনী হয়েছিলেন।
প্রার্থীদের ভিতর যুবায়ের ছিলেন সম্ভবত সর্বাপেক্ষা ধনী ব্যক্তি। তিনি বংশের দিক দিয়া আবদুল মুত্তালিবের দৌহিত্র ছিলেন। তিনি বীর পুরুষ ছিলেন এবং সকল যুদ্ধেই হজরত রসুলুল্লাহ সহকারী ছিলেন। ইরাকের দুই প্রধান শহর কুফা ও বসরায় এবং মিসরের প্রধান শহর ফাস্তাতে তিনি জমি ক্রয় করেছিলেন। ঐ সব স্থানে তাঁর বাণিজ্যিক কারবার ছিল। খাস মদিনা শহরে তিনি এগারটি বাড়ির মালিক ছিলেন। কথিত আছে, মৃত্যুকালে তিনি কয়েক ক্রোর দেরহাম (রৌপ্য-মুদ্রা) মূল্যের সম্পত্তি রাখিয়া যান।
পারস্য বিজয়ী বীর হিসেবে মদিনায় সা'দের অসাধারণ সম্মান ছিল। ক্যাডেসিয়ার ঐতিহাসিক যুদ্ধে তিনি মুসলিমদের জন্য বিজয়-মাল্য আহরণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন প্রাথমিক মুসলমানদের মধ্যে অন্যতম এবং কুরাইশদের সহিত নবীর সকল সংগ্রামে তিনি নবীর সহকারী ছিলেন। তাঁর বিশিষ্ট নীতি ছিল, জিহাদকে তিনি যতদিন সত্যিকার জিহাদ মনে করিতেন ততদিন উহাতে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং হজরত রসুল হইতে হজরত আবুবকর ও হজরত উমরের সময় পর্যন্ত তিনি জিহাদ পরিচালনা করেছিলেন। কথিত আছে, ৫০ কি ৫৫ হিজরিতে তাঁর ইন্তিকাল হইলে উম্মুল মু'মেনীনগণ তাঁর জানাজায় শরীক হয়েছিলেন।
তালহা প্রাক্ ইসলামি যুগ হইতেই একজন বিশিষ্ট সওদাগর ছিলেন এবং হজরত ওসমানের একজন বন্ধু ছিলেন। তিনিও প্রাথমিক مسلمانوں একজন ছিলেন এবং বদর, ওহোদ ও অন্যান্য সকল যুদ্ধে হজরত রসুলের সঙ্গী ছিলেন। ওহোদ যুদ্ধে নবীর আহত হয়ে পতনের পর কুরাইশগণ যখন তাঁর প্রতি তীর নিক্ষেপ করিতে থাকে, তখন তালহা নিজ শরীর দ্বারা তাঁকে আড়াল করেছিলেন, এবং শত্রুর তীর নিজে দেহে গ্রহণ করিয়াছেন। এই যুদ্ধে তিনি এত বেশি জখম হয়েছিলেন, নবী তাঁকে দেখিয়া সাহাবিদের বলিয়াছিলেন, 'যদি কোনো মৃতব্যক্তিকে মাটির উপর দিয়া চলাফেরা করতে দেখতে চাও, তবে তালহাকে দেখে লও।'
হজরত উমর তাঁকে অতিশয় মর্যাদা দিতেন এবং সালিশি কমিটিতে তাঁকে স্থান দেন। কিন্তু তালহা প্রথম দিকে উক্ত বৈঠকের বিতর্ককালে উপস্থিত থাকিতে পারেন নাই। হজরত উমর যখন আহত হন ঐ সময় তিনি বাণিজ্য উপলক্ষে মদিনার বাহিরে ছিলেন। হজরত উমর নিজের অন্তিম সময়ে সকল সাহাবিকে মদিনায় ডাকিয়া পাঠান। সেই সংবাদে তালহা দ্রুত মদিনায় চলিয়া আসেন। কিন্তু ইত্যবসরে কমিটির সিদ্ধান্ত হজরত ওসমানের অনুকূলে ঘোষিত হয়েছিল। তালহা মুক্ত হস্তে দান করিতেন। তথাপি মৃত্যুকালে তিনি তিন লাখ দিরহাম (রৌপ্য-মুদ্রা মূল্যের স্বর্ণ, রৌপ্যমুদ্রা ও ভূ-সম্পত্তি রাখিয়া যান।
নির্বাচন কমিটির ভিতর একমাত্র আবদুর রহমানই খিলাফতের প্রার্থী ছিলেন না। অন্যদের প্রত্যেকেরই দাবির পেছনে যুক্তি ছিল, তবে তাঁহাদের ভিতর কেহই এত অধিক যোগ্যতার দাবি করিতে পারিতেন না, সেজন্য অপরদের সহিত বিনা প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হইতে পারিতেন। যুবায়ের ছিলেন হজরত আবুবকরের জামাতা। তিনি বিবি আয়েশার ভগ্নী আসমাকে বিবাহ করেছিলেন। সা'দ ছিলেন নবী-জননী বিবি আমিনার ভ্রাতুষ্পুত্র। হজরত ওসমান এবং হজরত আলি উভয়েই ছিলেন নবীর জামাতা। তালহা ছিলেন হজরত আবুবকরের সগোত্র। বয়সের দিক দিয়া সাদ যুবায়ের, তালহা এবং আলি ছিলেন পঞ্চাশের নিচে। হজরত ওসমানের বয়স ছিল সত্তরের কাছাকাছি। প্রথমোক্ত চারি ব্যক্তি বিশিষ্ট যোদ্ধা ছিলেন কিন্তু শাসন-ব্যাপারে তাঁহাদের যোগ্যতা ইতোপূর্বে কখনও প্রমাণিত হয় নাই। তাদের ভিতর হজরত আলি সর্বাপেক্ষা বয়োকনিষ্ঠ হইলেও চারিত্রিক মাহাত্ম্য, ইসলামের জন্য নিঃস্বার্থ সেবা এবং অসাধারণ বিদ্যাবত্তা তাঁকে অপর সকলের চাইতে গরীয়ান করেছিল। আবার হজরত ওসমান ছিলেন সর্বাপেক্ষা প্রবীণ, অভিজ্ঞ এবং দানের জন্য জনপ্রিয়। সকল দিক বিবেচনা করিয়া সালিশকারগণ হজরত আলি ও হজরত ওসমানের দাবিকেই অপর সকলের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর মনে করিলেন। কিন্তু শেষ-মীমাংসা আর হইতে চায় না। মীমাংসা যাহাতে ত্বরান্বিত হয় সে-জন্য হজরত উমর মে'কাব নামক এক ন্যায়নিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ সাহাবাকে সভার মধ্যস্থ নিরূপিত করিয়া দিলেন। মে'কাবকে লইয়া পরামর্শ সভার সভ্যগণ বিবি আ'য়িশার গৃহে সমবেত হন এবং তথায় তাঁহাদের পরামর্শ চলিতে থাকে।
মৃত্যু কোনো কিছুরই অপেক্ষা রাখে না। মুসলিম-জাহানের খিলাফতের মীমাংসায় বিলম্ব ঘটিলেও হজরত উমরের প্রাণবায়ু ক্রমেই নিঃশেষ হয়ে আসিতে লাগিল। পরিশেষে এই অচল অবস্থার নিরসনের জন্য আবদুর রহমান সকলকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, 'ভাইসব, আমি খিলাফতের প্রার্থী নই। অপর প্রার্থীগণও কেহ আমার আত্মীয় নহে। আপনারা বিতর্ক বন্ধ করিয়া দেই তাহা মানিতে প্রস্তুত আছেন কি-না?' ইহাতে সকলেই সম্মতি প্রকাশ করিলেন। তখন প্রত্যেক প্রার্থীকে তিনি একে একে নির্জন কক্ষে ডাকিয়া লইয়া বলিলেন, 'ভাত! আমার নিজের বিবেচনায় আপনার দাবি খুবই সঙ্গত। কিন্তু মনে করুন, নির্বাচনে আপনি যদি কৃতকার্য না হন তবে আপনার মতে খিলাফতের এই গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য অপর কে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত?' হজরত আলি কহিলেন 'ওসমান'। হজরত ওসমান কহিলেন, 'আলি' সা'দ ও যুবায়ের কহিলেন, 'ওসমান'। এইরূপে প্রত্যেকের মতামত অবগত হয়ে আবদুর রহমান সভায় প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা করিলেন, 'অদ্যকার মীমাংসা এই হইল যে ওসমান ও আলির ভিতর একজন খলিফা হইবেন। অপর সকলের দাবি বাতিল করা হইল। আগামীকল্য সাধারণ সভায় এই দুইজনের ভিতর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। সভ্য ভঙ্গ হইল।'
আবদুর রহমান সে রাত্রি সম্পূর্ণ বিনিদ্র কাটাইলেন এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেতাদের গৃহে গিয়া তাঁহাদের সহিত আলোচনা করিলেন। এদিকে আবু সুইয়ান আমর বিন আ'স প্রমুখ উমাইয়া বংশীয় নেতাগণের হজরত ওসমানের অনুকূলে সমস্তরাত্রি কূট পরামর্শ চলিতেছিল।
পর দিবস এক সাধারণ সভা আহুত হইল। এই দিনের সভা ছিল সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। আবদুর রহমান সভাস্থলে দন্ডায়মান হয়ে যথোচিত গাম্ভীর্যের সহিত সমবেত জনতাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, 'বন্ধুগণ, আমাদের খলিফা হজরত উমরের স্থলে বসাইবার জন্য আমরা গতকল্যকার বিশেষ সভায় হজরত আলি ও হজরত ওসমানকে মনোনীত করিয়াছি। উভয়েই ইসলামের একনিষ্ঠ খাদেম এবং হজরত রাসুলে-করীমের প্রিয় সাহাবা। এক্ষণে এই উভয়ের ভিতর কে মুসলিম-জাহানের অধিনায়ক হইবেন তাহা অদ্যকার এই সাধারণ সভায় নির্ণীত হইবে।'
প্রবীণ জননায়ক আবদুর রহমানের ঘোষণা সকলে ঔৎসুক্যের সহিত শুনিল। তারপর আরম্ভ হইল সভায় প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য নানা রকম আলোচনা ও গুঞ্জন। পরস্পর বিরোধী জনমতও শ্রুত হইতে লাগিল।
পরিশেষে আবদুর রহমান পুনরায় দণ্ডায়মান হইলেন এবং সকলকে নিরস্ত করিয়া হজরত আলিকে নিকটে আহ্বান করিলেন। হজরত আলি নিকটবর্তী হইলে তাঁর হস্ত ধারণ করিয়া আবদুর রহমান কহিলেন, 'ভাত:, অদ্য আমরা তোমাকে নেতৃত্বে বরণ করিয়া তোমার হস্তে বয়াত হইতে চাই। তুমি আল্লাহর নামে প্রতিজ্ঞা কর যে, সর্বদা আল্লাহ ও রাসূলের হুকুম ও দুই বিগত খলিফার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া চলিবে এবং ইসলামের যাবতীয় শর্ত অক্ষরে অক্ষরে পালন করিবে।'
অতিরিক্ত ধর্মভীরু হজরত আলি মহা ফাঁপরে পড়িলেন এবং বিনীতভাবে উত্তর করিলেন, 'বন্ধুগণ, আমি প্রতিশ্রুতি দিতে পারিব না, তবে যতদূর সাধ্য চেষ্টা করিব এবং আল্লাহ্র নিকট মদৎ চাহিব, তিনি যেন তাঁর এই দাসানুদাসকে সকল শর্ত পালন করিতে তৌফিক দেন।'
আবদুর রহমান বিস্মিত ও বিরক্ত হইলেন। উপস্থিত জনতাও বিস্মিত হইল। আবদুর রহমান জনগণকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, 'এরূপ দুর্বলচিত্ত ব্যক্তিকে এই সমস্যা-সঙ্কুল মুসলিম জাহানের নেতৃত্বে প্রদান করিতে পারি না।' অতঃপর তিনি হজরত ওসমানকে নিকটে আহ্বান করিয়া তাঁকেও অনুরূপ ভাবে প্রতিজ্ঞা করিতে বলিলেন।
হজরত ওসমান কোনোরূপ ইতস্তত না করিয়া আবদুর রহমানের কথামতো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইলেন। তখন আবদুর রহমান তাঁর হস্ত চুম্বন করিলেন এবং অন্যান্য লোককেও তাঁর হস্ত চুম্বন করিয়া বায়াত হইতে বলিলেন। হজরত আলি 'শঠতা, শঠতা', বলিয়া আওয়াজ তুলিয়া সভাস্থল ত্যাগ করিতে উদ্যত হইলেন। তখন আবদুর রহমান তাঁকে নিবৃত্ত করিয়া তাঁর পূর্ব ওয়াদার কথা স্মরণ করাইয়া দিলেন এবং বলিলেন, 'আপনি প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন, আমার মীমাংসা মানিয়া লইবেন। এক্ষণে আমি হজরত ওসমানকে নির্বাচিত করিয়াছি। আপনি তাঁর আনুগত্য (বায়াত) স্বীকার করুন; অন্যথা আপনি খলিফাকে অমান্য করার অপরাধে অপরাধী হইবেন।' হজরত আলি পূর্ব-শর্ত স্মরণ করিয়া লজ্জিত হইলেন এবং হজরত ওসমানের হস্তে বায়াত হইলেন। যুবায়ের প্রমুখ সভ্যস্থ অন্যান্য সকলেও বায়াত হইলেন। পরদিবস তালহা মদিনায় প্রত্যাবর্তন করিয়া সমস্ত অবগত হইলেন এবং তিনিও বিনা দ্বিধায় হজরত ওসমানকে খলিফা বলিয়া স্বীকার করিয়া লইলেন।
সভার শেষে আবদুর রহমান উপস্থিত সাহাবিদের সঙ্গে লইয়া মসজিদে নববীতে গিয়া সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা প্রদান করিলেন এবং হজরত ওসমানকে শরীয়ৎ অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম জাহানের খলিফা বলিয়া ঘোষণা করিলেন। হাশিমীরা ছাড়া উপস্থিত সকলেই একটা উদ্বেগপূর্ণ পরিস্থিতির অবসান হইল ভাবিয়া এই শান্তিপূর্ণ মীমাংসা খুশি মনে মানিয়া লইল। সর্বাপেক্ষা খুশি হয়েছিল উমাইয়াগণ। কেননা এতদিন তাঁরা মুসলিম-জাহানে যে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখিতেছিল, তাদের এক জ্ঞাতি-ভ্রাতার হস্তে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা অর্পিত হওয়ায় তাদের সেই স্বপ্ন এক্ষণে বাস্তবে রূপায়িত হওয়ার সুযোগ দেখা দিল।
📄 হজরত ওসমানের বংশ তালিকা
ফিহ্ কুরেশ
কুশায় (৬ষ্ঠ পুরুষ)
আবদে-দ্দার আবদে মানাফ আবুল উয্যা
আবদেশ শাম্স হাশীম জুবায়ের (৪র্থ পুরুষ)
উমাইয়া আবদুল মুত্তালিব
হাবিব আবুল আ'স
আবুসুফইয়ান হাকাম আফ্ফান হজরত ওসমান
মু'য়াবিয়া মারওয়ান
হারিস আবু তালিব আব্বাস অপর আবদুল্লাহ হামজা (৬ পুত্র)
জাফর হজরত আলি আব্বাসীয় খলিফাগণ হজরত মুহম্মদ (সঃ)