📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 উমর রা.-এর হত্যাকাণ্ড এবং শূরা কমিটি গঠন

📄 উমর রা.-এর হত্যাকাণ্ড এবং শূরা কমিটি গঠন


৫.২। উমর রা.-এর হত্যাকাণ্ড এবং শূরা কমিটি গঠন
৫.২.১। উমর রা.-এর হত্যাকাণ্ড
আমর ইবনে মায়মূন রহ. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি তার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম এবং তার ও আমার মাঝে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দু-কাতারের মধ্য দিয়ে চলার সময় বলতেন, কাতার সোজা করে নাও। যখন দেখতেন কাতারে কোনো ত্রুটি নেই, তখন তাকবীর বলতেন। তিনি অধিকাংশ সময় সূরা ইউসুফ, সূরা নাহল অথবা এ ধরনের সূরা প্রথম রাকাতে তিলাওয়াত করতেন, যেন অধিক পরিমাণে লোক প্রথম রাকাতে শরীক হতে পারেন। তাকবীর বলার পরেই আমি তাকে বলতে শুনলাম, একটি কুকুর আমাকে আঘাত করেছে অথবা বলেন, আমাকে আক্রমণ করেছে। ঘাতক 'ইলজ' দ্রুত পলায়নের সময় দু-ধারি খঞ্জর দিয়ে ডানে বামে আঘাত করে চলেছে। এভাবে তেরো জনকে আহত করল। এদের মধ্যে সাত জন শহীদ হলেন।

এ অবস্থা দেখে এক মুসলিম তার লম্বা চাদরটি ঘাতকের ওপর ফেলে দিলেন। ঘাতক যখন বুঝতে পারল সে ধরা পড়ে যাবে তখন সে আত্মহত্যা করল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাত ধরে সামনে এগিয়ে দিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকটে যারা ছিল শুধু তারাই ব্যাপারটি দেখতে পেল। আর মসজিদের শেষে যারা ছিল তারা ব্যাপারটি এর অধিক বুঝতে পারল না যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে না। তাই তারা 'সুবহানাল্লাহ সুবহানাল্লাহ' বলতে লাগলেন। আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের নিয়ে সংক্ষেপে সালাত আদায় করলেন। যখন মুসল্লীগণ চলে গেলেন, তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে ইবনে আব্বাস, দেখো তো, কে আমাকে আঘাত করল?' তিনি কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করে এসে বললেন, 'মুগীরাহ ইবনে শুবাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর গোলাম (আবু লুলু)।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, 'ওই কারিগর গোলামটি?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহ তার সর্বনাশ করুন। আমি তার সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নেব। দিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার মৃত্যু ইসলামের দাবিদার কোনো ব্যক্তির হাতে ঘটাননি। হে ইবনে আব্বাস, তুমি এবং তোমার পিতা মদীনায় কাফির গোলামের সংখ্যা বৃদ্ধি পছন্দ করতে। আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট অনেক অমুসলিম গোলাম ছিল। ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যদি আপনি চান তবে আমি কাজ করে ফেলি অর্থাৎ আমি তাদের হত্যা করে ফেলি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি ভুল বলছ। কেননা, তারা তোমাদের ভাষায় কথা বলে, তোমাদের কিবলামুখী হয়ে সালাত আদায় করে, তোমাদের মতো হজ করে।'

অতঃপর তাকে তার ঘরে নেওয়া হলো। আমরা তাঁর সঙ্গে চললাম। মানুষের অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল, ইতিপূর্বে তাদের ওপর এত বড় মুসিবত আর আসেনি। কেউ কেউ বলছিলেন, ভয়ের কিছু নেই। আবার কেউ বলছিলেন, আমি তাঁর সম্পর্কে আশঙ্কাবোধ করছি। অতঃপর খেজুরের শরবত আনা হলো, তিনি তা পান করলেন। কিন্তু তা তার পেট হতে বেরিয়ে পড়ল। অতঃপর দুধ আনা হলো, তিনি তা পান করলেন; তাও তার পেট হতে বেরিয়ে পড়ল। তখন সকলেই বুঝতে পারলেন, মৃত্যু তার অবশ্যম্ভাবী। আমরা তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। অন্যান্য লোকজনও আসতে শুরু করল। সকলেই তার প্রশংসা করতে লাগল। তখন যুবক বয়সী একটি লোক এসে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনার জন্য আল্লাহর সু-সংবাদ রয়েছে; আপনি তা গ্রহণ করুন। আপনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য গ্রহণ করেছেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগেই আপনি তা গ্রহণ করেছেন, যে সম্পর্কে আপনি নিজেই অবগত আছেন। অতঃপর আপনি খলীফা হয়ে ন্যায় বিচার করেছেন। অতঃপর আপনি শাহাদাত লাভ করেছেন।'

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি পছন্দ করি যে তা আমার জন্য ক্ষতিকর বা লাভজনক না হয়ে সমান সমান হয়ে যাক।' যখন যুবকটি চলে যেতে উদ্যত হলো, তখন তার লুঙ্গিটি মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যুবকটিকে আমার নিকট ডেকে আনো।' তিনি বললেন, 'হে ভাতিজা, তোমার কাপড়টি উঠিয়ে নাও। এটা তোমার কাপড়ের পরিচ্ছন্নতার জন্য এবং তোমার রবের নিকটও পছন্দনীয়। হে আবদুল্লাহ ইবনে উমর, তুমি হিসাব করে দেখো আমার ঋণের পরিমাণ কত।' তারা হিসাব করে দেখতে পেলেন ছিয়াশি হাজার (দিরহাম) বা এর কাছাকাছি। তিনি বললেন, 'যদি উমরের পরিবার-পরিজনের মাল দ্বারা তা পরিশোধ হয়ে যায়, তবে তা দিয়ে পরিশোধ করে দাও। অন্যথায় আদি ইবনু কা'ব এর বংশধরদের নিকট হতে সাহায্য গ্রহণ করো। তাদের মাল দিয়েও যদি ঋণ পরিশোধ না হয় তবে কুরাইশ কবিলা হতে সাহায্য গ্রহণ করবে, এর বাইরে কারও সাহায্য গ্রহণ করবে না। আমার পক্ষ হতে তাড়াতাড়ি ঋণ আদায় করে দাও। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার খিদমতে তুমি যাও এবং বলো উমর আপনাকে সালাম পাঠিয়েছে। 'আমীরুল মুমিনীন' শব্দটি বলবে না। কেননা, এখন আমি মুমিনগণের আমীর নই। তাকে বলো উমর ইবন খাত্তাব তার সাথিদ্বয়ের পাশে দাফন হবার অনুমতি চাচ্ছেন।' আব্দুল্লাহ ইবনু উমর আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার খিদমতে গিয়ে সালাম জানিয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন, 'প্রবেশ করো।' তিনি দেখলেন, আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বসে বসে কাঁদছেন। তিনি গিয়ে বললেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন এবং তার সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন হবার জন্য আপনার অনুমতি চেয়েছেন।' আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বললেন, 'তা আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু আজ আমি এ ব্যাপারে আমার ওপরে তাকে অগ্রগণ্য করছি।'

আবদুল্লাহ ইবনে উমর যখন ফিরে আসছেন তখন বলা হলো, এই যে আবদুল্লাহ ফিরে আসছে। তিনি বললেন, 'আমাকে উঠিয়ে বসাও।' তখন এক ব্যক্তি তাকে ঠেস দিয়ে বসিয়ে ধরে রাখলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী সংবাদ?' তিনি বললেন, 'আমীরুল মুমিনীন, আপনি যা কামনা করেছেন, তাই হয়েছে, তিনি অনুমতি দিয়েছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ। এর চেয়ে বড় কোনো বিষয় আমার নিকট ছিল না। যখন আমার মৃত্যু হয়ে যাবে তখন আমাকে উঠিয়ে নিয়ে, তাকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, উমর ইবনুল খাত্তাব আপনার অনুমতি চাচ্ছেন। যদি তিনি অনুমতি দেন, তবে আমাকে প্রবেশ করাবে, আর যদি তিনি অনুমতি না দেন তবে আমাকে সাধারণ মুসলিমদের গোরস্থানে নিয়ে যাবে।' এ সময় উম্মুল মুমিনীন হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে কতিপয় মহিলাসহ আসতে দেখে আমরা উঠে পড়লাম। হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহা তার নিকট গিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদলেন। অতঃপর পুরুষরা এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলে, তিনি ঘরের ভেতর গেলে ঘরের ভেতর হতেও আমরা তার কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তারা বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি অসীয়ত করুন এবং খলীফা মনোনীত করুন।'

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, খেলাফতের জন্য এ কয়েকজন ছাড়া অন্য কাউকে আমি যোগ্যতম পাচ্ছি না, যাদের প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ইন্তিকালের সময় রাজি ও খুশি ছিলেন। অতঃপর তিনি তাদের নাম বললেন, আলী, উসমান, যুবায়র, তালহা, সাদ ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ এবং বললেন, 'আবদুল্লাহ ইবনে উমর তোমাদের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু সে খেলাফত লাভ করতে পারবে না। তা ছিল শুধু সান্ত্বনামাত্র। যদি খেলাফতের দায়িত্ব সাদের রাযিয়াল্লাহু আনহু ওপর ন্যস্ত করা হয় তবে তিনি এর জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি। আর যদি তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ খলীফা নির্বাচিত হন তবে তিনি যেন সর্ববিষয়ে সাদের সাহায্য ও পরামর্শ গ্রহণ করেন। আমি তাকে অযোগ্যতা বা খিয়ানতের কারণে অপসারণ করিনি। আমার পরের খলীফাকে আমি অসীয়ত করছি, তিনি যেন প্রথম যুগের মুহাজিরগণের হক সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাদের মান-সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন। এবং আমি তাকে আনসার সাহাবীগণের যাঁরা মুহাজিরগণের আসার আগে এই নগরীতে (মদীনায়) বসবাস করে আসছিলেন এবং ঈমান এনেছেন, তাঁদের প্রতি সদ্ব্যবহার করার অসীয়ত করছি যে, তাদের মধ্যে নেককারগণের ওযর-আপত্তি যেন গ্রহণ করা হয় এবং তাঁদের মধ্যে কারও ভুলত্রুটি হলে তা যেন ক্ষমা করে দেওয়া হয়। আমি তাঁকে এ অসীয়তও করছি যে, তিনি যেন রাজ্যের বিভিন্ন শহরের অধিবাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করেন। কেননা, তাঁরাও ইসলামের হিফাযতকারী এবং তারাই ধন-সম্পদের জোগানদাতা। তারাই শত্রুদের চোখের কাঁটা। তাদের হতে তাদের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে কেবল তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ যেন যাকাত আদায় করা হয়। আমি তাকে পল্লিবাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করারও অসীয়ত করছি। কেননা, তারাই আরবের ভিত্তি এবং ইসলামের মূল শক্তি। তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ এনে তাদের দরিদ্রদের মধ্যে যেন বিলিয়ে দেওয়া হয়। আমি তাকে আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যিম্মিদের (অর্থাৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়) বিষয়ে অসীয়ত করছি যে, তাদের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার যেন পুরা করা হয়। তাদের পক্ষাবলম্বনে যেন যুদ্ধ করা হয়, তাদের শক্তি-সামর্থ্যের অধিক জিযিয়া যেন চাপানো না হয়।'

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তিকাল হয়ে গেলে আমরা তার লাশ নিয়ে পায়ে হেঁটে চললাম। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে সালাম করলেন এবং বললেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব অনুমতি চাচ্ছেন।' আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বললেন, 'তাকে প্রবেশ করাও।' অতঃপর তাকে প্রবেশ করানো হলো এবং তার সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন করা হলো।

অন্য বর্ণনায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সম্পর্কে আরও কিছু ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, যা আমর ইবনু মায়মুন রহ.-এর বর্ণনায় নেই। ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ভোরবেলা আঘাত করা হয়। তাকে মুগীরাহ ইবনে শুবাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর গোলাম আবু লুলু আঘাত করে। সে একজন অগ্নিপূজক ছিল।' আবু রাফে বলেন, 'মুগীরাহ ইবনে শুবাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর গোলাম আবু লulু পেষণযন্ত্র বানাত। এর বিনিময়ে মুগীরাহ ইবনে শুবাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার নিকট থেকে চার দিরহাম কেটে রাখত। আবু লুলু একদিন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে দেখা করে বলে, 'হে আমীরুল মুমিনীন, মুগীরাহ ইবনে শুবাহ আমার নিকট থেকে বেশি পরিমাণে কেটে রাখছে। তাকে এর পরিমাণ কমাতে বলুন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি আল্লাহকে ভয় করো এবং মনিবকে সন্তুষ্ট রাখো।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুগীরাহ ইবনে শুবাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর দেখা করে গোলামের বোঝা হালকা করার কথা বলবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু আবু লুলু খ্যাপে গিয়ে বলে ওঠে, 'হায়, তার ইনসাফ আমার বেলায় এসে হারিয়ে গেল!' এ জন্য সে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তারপর সে একটি দু-ধারি খঞ্জর বানায় এবং সেটি ধারালো করে তাতে বিষ মিশিয়ে রাখে। তারপর এটি নিয়ে হরমুযের কাছে যায়। তাকে জিজ্ঞাসা করে, 'খঞ্জরটি কেমন হলো?' সে জবাবে বলল, 'এটি দিয়ে যাকেই আঘাত করা হবে, সে-ই মারা যাবে।' রাবী বলেন, 'তারপর সে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর উদ্দেশে গমন করে এবং ফজরের নামাযে তার ঠিক পেছনে দাঁড়ায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকবীর বলার আগে লোকজনকে নামাযের কাতার সোজা করতে বলতেন। তারপর তাকবীর বলতেন। তিনি স্বাভাবিকভাবে অন্যান্য দিনের মতোই কাতার সোজা করতে বলে তাকবীর দেন। আর তখনই আবু লুলু তার কাঁধে ও কোমরে খঞ্জরটি দিয়ে আঘাত করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে পড়ে যান। আমর ইবনে মাইমূন রহ. বলেন, 'আমি তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলতে শুনেছি,

وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ قَدَرًا مَّقْدُورًا
আল্লাহর আদেশ নির্ধারিত, অবধারিত।

৫.২.২। উমর রা.-এর পরবর্তী খলীফা নির্বাচনে অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গুপ্তঘাতকের হাতে ছুরিকাহত হয়ে প্রচণ্ড কষ্ট ভোগ করছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি মুসলিম জাতির ঐক্য এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। নিঃসন্দেহে এটি ছিল ইতিহাসের একটি সংকটময় মুহূর্ত, যখন তার ঈমানের দৃঢ়তা, একনিষ্ঠতা এবং আত্মোৎসর্গের অনুপম দৃষ্টান্ত ফুটে উঠেছে। ওই দুঃসময়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পরবর্তী খলীফা নির্বাচনে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন নতুন এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন। এ ঘটনা থেকে উম্মতের মানসিকতাকে অনুধাবন এবং তাদের যাবতীয় বিষয়াদি দক্ষভাবে পরিচালনা করার জন্য তার যে অসাধারণ যোগ্যতা ছিল, তা পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করা যায়। তার পূর্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের কোনো উত্তরসূরি নির্বাচন না করেই ইন্তেকাল করেছেন। আর আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইন্তেকালের আগে প্রবীণ সাহাবীদের সঙ্গে আলোচনা করে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে খলীফা নির্বাচন করে গিয়েছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যুসজ্জায়ও যখন তাকে পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারে বলা হলো, তখন তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। তারপর এমন এক পদ্ধতি নির্ধারণ করলেন, যা ওই সময়ের জন্য ছিল সবচেয়ে বেশি উপযোগী।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়ত্ব সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য ছিল। সুতরাং তাকে খলীফা নির্বাচন করার ব্যাপারে কোনো ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা ছিল না। অধিকন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথা ও কাজে এই উম্মতকে দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন যে, তার মৃত্যুর পর এ উম্মতকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-ই সবচেয়ে বেশি যোগ্য। আর যখন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হিসাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নির্বাচন করেন, তখন তিনি জানতেন, সাহাবায়ে কেরাম সবাই এ বিষয়ে একমত যে, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরে দৃঢ়তা এবং দায়িত্ববোধের কারণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-ই রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিক যোগ্য। সুতরাং প্রবীণ সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে খলীফা মনোনীত করেন এবং এতে কেউই দ্বিমত পোষণ করেননি। এভাবে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতেই লোকজন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট বাইআত গ্রহণ করে।

পরবর্তী খলীফা মনোনয়নের ক্ষেত্রে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নির্বাচন পদ্ধতিকেই বেছে নেন। তবে এ নির্বাচন সীমিতসংখ্যক সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত একটি শূরা কমিটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছয় জন সাহাবীকে নির্বাচন করেন, যারা প্রত্যেকেই খলীফা হওয়ার জন্য উপযুক্ত ছিলেন। তবে তাদের যোগ্যতার মধ্যে পার্থক্য ছিল। কীভাবে এবং কত দিনে খলীফা নির্বাচন করতে হবে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তা নির্দিষ্ট করে দেন। নতুন খলীফা নির্বাচনে কী পরিমাণ ভোটের প্রয়োজন হবে, তিনি তাও উল্লেখ করেন। তিনি একটি সৈন্যদল নিয়োগ দেন, যারা এ নির্বাচন-প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে এবং যদি কেউ গণ্ডগোল সৃষ্টির পাঁয়তারা করে, তাহলে তাকে সমুচিত শাস্তি দেবে। মজলিসে শূরার বৈঠকের নিরাপত্তা বিধান এবং তাতে যা আলোচিত হবে, তা যেন কেউ না শোনে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এটা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন।

মজলিসে শূরার সদস্যগণ
মজলিসে শূরার সদস্য ছিলেন ছয় জন। তারা হলেন :
✓ আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু,
✓ উসমান ইবনে আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু,
✓ আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু,
✓ সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু,
✓ যুবায়ের ইবনে আওয়াম রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং
✓ তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শূরার সদস্য হিসাবে সাঈদ ইবনে যায়েদ ইবনে নুফাইল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে রাখেননি যদিও তিনি বেহেশতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ জন সাহাবীদের একজন ছিলেন। সম্ভবত এর কারণ ছিল যে, তিনি ছিলেন বনু আদি গোত্রের (যা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর গোত্র)।

নির্বাচন পদ্ধতি
তিনি মজলিসে শূরার সদস্যদের তাদের একজনের বাড়িতে জমা হয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে বলেন। উপদেষ্টা হিসাবে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মজলিসে উপস্থিত থাকবেন, তবে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। এই আলোচনা চলাকালীন ইমামতির দায়িত্ব পালন করবেন সুহাইব আল-রুমি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেন, 'এই তিন দিনের জন্য আপনি নামাজের ইমাম। মজলিসে শূরার কোনো সদস্যকে তিনি নামাজের ইমামতির দায়িত্ব দেননি যাতে তাকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্বাচিত খলীফা হিসাবে কেউ ভুল না বোঝে। আল-মিসদাদ ইবনে আল-আসওয়াদ এবং আবু তালহা আল-আনসারী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সভা পর্যবেক্ষণ করার আদেশ দেন।

নির্বাচন-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সময় নির্ধারণ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নির্বাচন-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য তিন দিন সময় নির্ধারণ করেছিলেন, যা এ কাজের জন্য ছিল যথেষ্ট। যদি তারা এর চেয়ে বেশি সময় নেন, তাহলে ফিতনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। এ জন্য তিনি তাদের বলেন, 'খলীফা নির্বাচন ব্যতিরেকে যেন তোমাদের জন্য চতুর্থ দিন না আসে।'

খলীফা নির্বাচনে নির্ধারিত ভোট-সংখ্যা
ইতিহাসের কিছু কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মজলিসে শূরার সদস্যদের একত্র হয়ে আলোচনা করতে বলেছেন। তাদের মধ্যে পাঁচ জন যদি কারও ব্যাপারে একমত হয় এবং একজন তার বিপক্ষে থাকে, তাহলে তরবারি দিয়ে তার গর্দান উড়িয়ে দিতে হবে। আর চার জন যদি একমত হয় এবং বাকি দুজন বিপক্ষে থাকে, তাহলে সেই দুজনের গর্দান উড়িয়ে দিতে হবে। এটা জঘন্য একটি বর্ণনা, যার কোনো ভিত্তি নেই। এটা রাফিযি শিয়া আবু মাখনাফের বানানো হাদীস, যা সহীহ বর্ণনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি সাহাবায়ে কেরামের আদর্শিক আচরণগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেও বেমানান। আবু মাখনাফ বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সুহাইব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন : তাদের (মজলিসে শূরার লোকজনের) দিকে নযর রাখো। তাদের মধ্যে পাঁচ জন যদি কারও ব্যাপারে একমত হয় এবং একজন তার বিপক্ষে থাকে, তাহলে তরবারি দিয়ে তার গর্দান উড়িয়ে দিতে হবে। আর চার জন যদি একমত হয় এবং বাকি দুজন বিপক্ষে থাকে তাহলে সেই দুজনের গর্দান উড়িয়ে দিতে হবে। কিন্তু এটি একটি মিথ্যা বর্ণনা। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেমন করে এ রকম একটি জঘন্য আদেশ জারি করতে পারেন, যেখানে তিনি জানেন শূরার সদস্যগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানিত সাহাবী এবং তিনি নিজেই তাদের উন্নত গুণাবলি ও মর্যাদার কারণে এ কাজের জন্য নির্বাচন করেছেন? ইবনে সাদ থেকে বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আনসারদের উদ্দেশে বলেন: তাদের তিন দিন এক ঘরে অবস্থান করার সুযোগ দাও। যদি তারা ভালো কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে বের হয়ে আসে, তাহলে তো ভালো। আর নতুবা তাদের সকলের গর্দান উড়িয়ে দাও।' এটি একটি মুনকাতি বর্ণনা এবং এর সনদে সাম্মাক ইবনে হারব রয়েছে, যিনি যঈফ।

বিশ্বস্ত সূত্রে ইবনে সা'দ বর্ণনা করেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সুহাইব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'আগামী তিন দিন নামাযে ইমামতি করুন এবং মজলিসে শূরার সদস্যদের আলোচনার জন্য অবকাশ দেন। যখন তারা কারও ব্যাপারে একমত হবে, তখন যদি কেউ দ্বিমত পোষণ করে, তাহলে তার গর্দান উড়িয়ে দেবেন (হত্যা করবেন)।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ আদেশ জারি করেন যে, যদি কেউ এই শূরার বিপক্ষে যায়, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে। আর এ আদেশ জারিতে রাসূলের নির্দেশকেই অনুসরণ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

مَنْ أَتَاكُمْ وَأَمْرُكُمْ جَمِيعٌ عَلَى رَجُلٍ وَاحِدٍ يُرِيدُ أَنْ يَشُقُ عَصَاكُمْ أَوْ يُفَرِّقَ جَمَاعَتَكُمْ فَاقْتُلُوهُ
এক ব্যক্তির বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকা অবস্থায় (একজন রাষ্ট্রপ্রধানের অধীনে থাকা অবস্থায়) কোনো ব্যক্তি যদি এসে তোমাদের ঐক্য বিনষ্ট করতে বা 'জামাআত' বিভক্ত করতে চায়, তবে তাকে হত্যা করবে।

মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে নির্দেশ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের পরামর্শ দিয়েছেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা মজলিসে উপস্থিত থাকবেন। তবে সেখানে তার কিছু বলার থাকবে না। কিন্তু তিনি তাদের বলেছেন: যদি তাদের তিন জন কাউকে মনোনীত করে এবং বাকি তিন জন অন্য কাউকে পছন্দ করে, তাহলে বিষয়টি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমার ওপর বর্তাবে। তিনি যে দলকে বিজয়ী ঘোষণা করবেন, সেখান থেকেই খলীফা নির্বাচন করবে। আর যদি তারা আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের সিদ্ধান্ত মানতে অপারগ হয়, তাহলে যে দলে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু থাকবেন, সে দল থেকেই খলীফা নির্বাচিত হবে।' তিনি আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বিজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ হিসাবে বর্ণনা করে বলেন, 'কী বিজ্ঞ লোকই-না আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, কতই-না অভিজ্ঞ! আল্লাহ তা'আলা তাকে হেদায়েত ও নিরাপত্তা দিয়েছেন। সুতরাং তার কথা শোনো।

নির্বাচন-প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং অরাজকতা নির্মূলে একদল মুসলমান সৈন্য নিয়োগ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু তালহা আল-আনসারী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'হে আবু তালহা, মহান আল্লাহ তা'আলা তোমার মাধ্যমে ইসলামকে সাহায্য করেছেন। আনসারদের মধ্যে পঞ্চাশ জন সৈন্য নিয়ে শূরা কমিটির নিরাপত্তায় নিয়োজিত করুন, যতক্ষণ-না তারা তাদের মধ্যে কাউকে নির্বাচিত করতে সক্ষম হয়। আর তিনি আল-মিসদাদ ইবনে আল-আসওয়াদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'আমাকে দাফন করার পর এই সেনাদের দলটিকে একসঙ্গে ওই ঘরের পাহারায় নিয়োজিত করো যতক্ষণ-না তারা তাদের সংখ্যা থেকে এক জনকে নির্বাচিত করে। তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনের সমাপ্তি ঘটে। তার ওপর যে বিপদ আপতিত হয়েছিল তা তিনি মুসলিম উম্মাহকে বুঝতে দেননি অথবা মৃত্যুর কঠিন যন্ত্রণাও তাকে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণচিন্তা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি অভিনব এক শূরা-কমিটি গঠন করেন যদিও এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, কুরআন ও সুন্নাহতে পূর্ব থেকেই শূরার মূলনীতি বর্ণিত রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইতিমধ্যে এসব মূলনীতি প্রয়োগ করেছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পূর্ণ নতুন কিংবা স্বচিন্তাপ্রসূত কোনো কিছুর প্রচলন করেননি; বরং তিনি খলীফা নির্বাচনে নতুন একটি পদ্ধতি বের করেছেন এবং কমিটির সদস্যদের একটি সংখ্যা নির্ধারণ করেছেন যেখান থেকে একজনকেই নির্বাচন করা হবে। এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অথবা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু করেননি; উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-ই প্রথম এটির প্রচলন করেছেন এবং এটি উম্মতের জন্য কল্যাণকর সাব্যস্ত হয়েছে। তখনকার সাহাবায়ে কেরামের জন্য এ পদ্ধতিই ছিল সবচেয়ে উপযোগী ও গ্রহণীয়।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 পরবর্তী খলীফার প্রতি উমর রা.-এর উপদেশ

📄 পরবর্তী খলীফার প্রতি উমর রা.-এর উপদেশ


৫.৩। পরবর্তী খলীফার প্রতি উমর রা.-এর উপদেশ
পরবর্তী খলীফার প্রতি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দেন। তিনি বলেন,
আমি আপনাকে এক আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি, যার কোনো শরীক নেই। মুহাজিরদের প্রতি সদাচরণ করবেন এবং তাদের অগ্রগামিতাকে প্রাধান্য দেবেন। আনসারদের সঙ্গেও সদাচরণ করবেন। তাদের মধ্যে যারা ভালো করবে, তাদের মূল্যায়ন করবেন এবং যারা ভুল করবে, তাদের ক্ষমা করবেন। রাষ্ট্রের সীমান্ত প্রহরায় নিয়োজিত লোকজনের সঙ্গেও ভালো আচরণ করবেন। কারণ, শত্রুর বিরুদ্ধে ঢালস্বরূপ এবং গনীমতের উৎস। তাদের নিকট থেকে তাদের প্রয়োজন না মেটা পর্যন্ত কোনো কিছু গ্রহণ করবেন না। গ্রামবাসীদের প্রতিও ভালো আচরণ করবেন। কারণ, তারাই আদি আরব এবং ইসলামের রক্ষক। তাদের সম্পদ থেকে অতিরিক্ত অংশ গ্রহণ করবেন এবং সেগুলো গরিবদের মধ্যে বণ্টন করে দেবেন। আমি আপনাকে মুসলমানদের অধীনে বসবাসরত ইহুদী-খ্রিস্টানদের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করার উপদেশ দিচ্ছি। তাদের শত্রুর বিরুদ্ধে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন এবং তাদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপাবেন না যদি তারা মুসলমানদের প্রতি তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো আদায় করে অথবা স্বেচ্ছায় জিযিয়া প্রদান করে এবং নিজেদের পদানত মনে করে।
আমি আপনাকে আল্লাহ এবং তার শাস্তিকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি যেন আপনি আবার অবিশ্বস্ত না হয়ে ওঠেন। আমি আপনাকে মানুষের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি। কিন্তু আল্লাহর ব্যাপারে মানুষকে ভয় করতে নিষেধ করছি। আমি মানুষের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করার আহ্বান জানাচ্ছি। তাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখভাল করার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করবেন এবং শত্রুর বিরুদ্ধে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। গরিবদের ওপর ধনীদের প্রাধান্য দেবেন না। এটা আপনার আত্মিক প্রশান্তির পথ সুগম করবে এবং আপনার গোনাহর সম্ভাবনা কমিয়ে দেবে। আর এটা আখেরাতের জন্য মঙ্গলময় হবে যতক্ষণ না আপনি ওই সত্তার মুখোমুখি হন, যে আপনার হৃদয়ের কথা জানেন। আল্লাহর আদেশ, আত্মীয়-অনাত্মীয়সহ সকল মানুষের আচরণের নির্ধারিত সীমা এবং তাদের অবাধ্যতার ব্যাপারে দৃঢ় থাকবেন। কারও অবাধ্যতার মাত্রা নির্ধারণ না করে তার প্রতি কোনো রকম দয়া প্রদর্শন করবেন না। সব মানুষকে সমানভাবে বিবেচনা করবেন। দোষী ব্যক্তির মর্যাদা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না অথবা সমালোচকদের সমালোচনার ভয় পাবেন না। আপনার দায়িত্বে থাকা গনীমতের মালের ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে কোনো রকম পক্ষপাতিত্ব করবেন না, যা কিনা আপনাকে অন্যায়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এটা থেকে দূরে থাকবেন।
আপনি এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছেন, যা এই দুনিয়া এবং আখেরাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। আপনি যদি দুনিয়াবি ব্যাপারাদিতে ন্যায়সংগত আচরণ করেন এবং পক্ষপাতিত্ব থেকে মুক্ত থাকতে পারেন, তাহলে সেটা আপনার ঈমান বৃদ্ধি ও আখেরাতে আনন্দের কারণ হবে। আর যদি নফসের তাড়নায় পড়ে যান, তাহলে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হবেন।
আমি আপনাকেসহ সবাইকে আহলে যিম্মি (মুসলমানদের অধীনে বসবাসরত ইহুদী-খ্রিস্টান)-দের সঙ্গে মন্দ আচরণ করা থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিচ্ছি।
আমি আপনাকে নিষ্ঠার সঙ্গে সৎ উপদেশ দিচ্ছি। সুতরাং এটা গ্রহণ করুন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখেরাতের সফলতা তালাশ করুন। আমি আপনাকে যে উপদেশ দিচ্ছি তা আমার এবং আমার সন্তানদের বেলায়ও প্রযোজ্য। আপনাকে যা বলেছি, আপনি যদি তা পালন করেন এবং আমার নসীহত অনুসরণ করেন, তাহলে আপনি অনেক লাভবান হবেন। আর যদি এসব নসীহত গ্রহণ না করেন অথবা গুরুত্ব না দেন এবং আল্লাহ সন্তুষ্টিকে সামনে রেখে যাবতীয় কাজ-কারবার না করেন, তাহলে সেটা আপনার দুর্বলতা এবং আপনি নিষ্ঠাবান হতে ব্যর্থ হবেন। কারণ, স্বেচ্ছাচার এবং কামনা-বাসনা একই। আর শয়তানই মানুষকে গোনাহে লিপ্ত করে। সে তাদের ধ্বংসের দিকেই আহ্বান করে। আপনার আগে অনেক জাতিকে সে ধ্বংস করেছে এবং তাদের জাহান্নামে নিয়ে গেছে। আর জাহান্নাম কী ভয়াবহ আবাসস্থল! আল্লাহর শত্রুকে বন্ধু হিসাবে নেওয়া কতই-না মন্দ কাজ, যে কিনা আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে আহ্বান করে। সত্যকে আঁকড়ে থাকবেন এবং তা প্রতিষ্ঠায় প্রাণপণ চেষ্টা করবেন। নিজেকে নিজে তিরস্কার করবেন।
আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি মুসলমানদের প্রতি দয়ার্দ্র হবেন, বড়দের সম্মান করবেন, ছোটদের স্নেহ করবেন এবং আলেমদের মূল্যায়ন করবেন। তাদের কোনো ক্ষতি করবেন না অথবা অসম্মান করবেন না এবং গনীমতের মাল কুক্ষিগত করবেন না, যা তাদের উত্তেজিত করবে। তারা ভাতা প্রাপ্য হলে তাদের বঞ্চিত করবেন না, যাতে তারা দরিদ্র হয়ে পড়ে। তাদের এত দীর্ঘ সময় ধরে অভিযানে ব্যস্ত রাখবেন না, যাতে তারা সন্তানশূন্য হয়ে যায়। কেবল ধনীদের মধ্যেই সম্পদের প্রসার ঘটাবেন না। আপনার দরজা যেন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে এবং অসহায়দের ওপর ক্ষমতাশীলদের চড়াও হতে দেবেন না। এগুলো আমার পক্ষ থেকে আপনার জন্য উপদেশ। আল্লাহ আমার সাক্ষী। মাআসসালাম।

ওপরের উপদেশ-বাণী থেকে শাসনকার্য এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে তার রাষ্ট্র পরিচালনায় যুগপৎভাবে একটি নির্দিষ্ট ক্রমঃপদ্ধতি ও ধারার সমন্বয় ঘটেছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি এতে স্থান পেয়েছে। এটাকে একটি দুর্লভ নথি হিসাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ, এর মাধ্যমে শাসনকার্যের মূলনীতি জানা সম্ভব, যেখানে ধর্ম, রাজনীতি, সামরিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট আলোচিত হয়েছে।

৫.৩.১। ধর্মীয় দিক
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পরবর্তী খলীফাকে কথায় ও কাজে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে পূর্ণ ভয় করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। কারণ, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহই তাকে হেফাজত করবেন। তিনি খুব গুরুত্বের সঙ্গে বলেন, 'আমি আপনাকে এক আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি, যার কোনো শরীক নেই।' 'আমি আপনাকে আল্লাহকে এবং তার শাস্তিকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি।'

■ পরিচিত-অপরিচিত সকলের ওপর আল্লাহর বিধান সমভাবে কার্যকর করার জন্য অসীয়ত করেন: 'দোষী ব্যক্তির মর্যাদা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না অথবা সমালোচকদের সমালোচনার ভয় পাবেন না।' কেননা, এ সকল বিধি-বিধান শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত এবং তা আমাদের দ্বীনেরই অংশ। মানুষের জন্য এগুলো মেনে নেওয়া আবশ্যক। তাদের সকল কাজকর্মের মাপকাঠি হলো শরীয়ত। এ ক্ষেত্রে শিথিলতা দ্বীন ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর।

দৃঢ়ভাবে ইসলাম আঁকড়ে ধরার ক্ষেত্রে বলেন, فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ অতএব তুমি যেভাবে আদিষ্ট হয়েছ, দৃঢ় থাকো।
দৃঢ়তা দ্বীন ও দুনিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা প্রত্যেক নেতা ও সাধারণের জন্য কথায় ও কাজে আঁকড়ে ধরা আবশ্যক। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আরও বলেন, 'নিজেকে নিজে তিরস্কার করবেন।' 'আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখেরাতের সফলতা তালাশ করুন।'

৫.৩.২। রাজনৈতিক দিক
তিনি সুষ্ঠু রাজনীতির প্রতি উদ্বুদ্ধ করে বলেন, 'আমি মানুষের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করার আহ্বান জানাচ্ছি।' 'সব মানুষকে সমানভাবে বিবেচনা করবেন।' কেননা, ন্যায়-পরায়ণতাই হলো সুষ্ঠু বিচার-ব্যবস্থাপনার মূলমন্ত্র। এর মাধ্যমে নেতার প্রতি জনসাধারণের ভক্তি-শ্রদ্ধা বাড়ে এবং তার স্থায়িত্ব সুদৃঢ় হয়।

ইসলামের প্রথম সারির মুসলমানদের প্রতি বিশেষ লক্ষ রাখার অসীয়ত করেন। কেননা, ইসলামী রাজনীতি তাদের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তারা এ জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'মুহাজিরদের প্রতি সদাচরণ করবেন এবং তাদের অগ্রগামিতাকে প্রাধান্য দেবেন। আনসারদের সঙ্গেও সদাচরণ করবেন। তাদের মধ্যে যারা ভালো করবে, তাদের মূল্যায়ন করবেন এবং যারা ভুল করবে, তাদের ক্ষমা করবেন।'

৫.৩.৩। সামরিক দিক
সামরিক বাহিনীকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার উপদেশ দেন। কারণ, তাদের ওপরই ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কঠিন দায়িত্ব। তিনি সামরিক সদস্যদের সকল প্রয়োজন পূরণ করার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। সৈন্যদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে সীমান্ত প্রহরায় দীর্ঘদিন না রাখা তার বিশেষ নির্দেশনা ছিল। কারণ, এতে তাদের মধ্যে দায়িত্ব পালনে অনীহা সৃষ্টি হতে পারে। তাই তাদের নির্দিষ্ট সময় অন্তর ছুটি দেওয়ার আদেশ দেন যাতে তারা নতুন উদ্যম নিয়ে কাজে ফিরে আসতে পারে। আর এতে তাদের বংশক্রমও অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, 'তাদের এত দীর্ঘ সময় ধরে অভিযানে ব্যস্ত রাখবেন না যাতে তারা সন্তানশূন্য হয়ে যায়।' 'রাষ্ট্রের সীমান্ত প্রহরায় নিয়োজিত লোকজনের সঙ্গেও ভালো আচরণ করবেন। কারণ, তারা শত্রুর বিরুদ্ধে ঢালস্বরূপ এবং গনীমতের উৎস।'

সেনাবাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকে তার প্রাপ্য বেতন-ভাতা বুঝিয়ে দিতে আদেশ করেন যাতে তারা সর্বাবস্থায় যুদ্ধে গমন করার জন্য প্রস্তুত থাকেন এবং পরিবার-পরিজনের আর্থিক অসচ্ছলতা তার জন্য বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। এ সম্পর্কে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'গনীমতের মাল কুক্ষিগত করবেন না, যা তাদের উত্তেজিত করবে। তারা ভাতা প্রাপ্য হলে তাদের বঞ্চিত করবেন না, যাতে তারা দরিদ্র হয়ে পড়ে।'

৫.৩.৪। অর্থনৈতিক দিক
তিনি ন্যায় ও সুষ্ঠুভাবে সম্পদ বণ্টন করার আদেশ দেন এবং এক শ্রেণিকে বঞ্চিত করে আরেক শ্রেণির ধন-সম্পদ কুক্ষিগত করার ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন, 'কেবল ধনীদের মধ্যেই সম্পদের প্রসার ঘটাবেন না।'

■ রাষ্ট্রের নির্ধারিত কর আদায় করলে যিম্মিদের ওপর অতিরিক্ত কোনো বোঝা চাপানো যাবে না, যা তারা বহনে অক্ষম। তিনি বলেন, 'তাদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপাবেন না, যদি তারা মুসলমানদের প্রতি তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো আদায় করে।'

■ জনসাধারণের আর্থিক সুবিধার প্রতি লক্ষ রাখা এবং তাতে অবহেলা না করা; সাধ্যের অতীত কোনো বোঝা না চাপানো। তিনি বলেন, 'তাদের নিকট থেকে তাদের প্রয়োজন না মেটা পর্যন্ত কোনো কিছু গ্রহণ করবেন না।' 'তাদের সম্পদ থেকে অতিরিক্ত অংশ গ্রহণ করবেন এবং সেগুলো গরিবদের মধ্যে বণ্টন করে দেবেন।'

৫.৩.৫। সামাজিক দিক
■ জনগণের প্রতি লক্ষ রাখা, তাদের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের প্রয়োজন পূরণ করা এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, 'তারা ভাতা প্রাপ্য হলে তাদের বঞ্চিত করবেন না।'

■ স্বার্থপরতা, স্বজনপ্রীতি এবং নফসের অনুসরণ থেকে বিরত থাকা; কারণ, এগুলো নেতাকে বিপথে নিয়ে যায়, সমাজে দুর্নীতি সৃষ্টি করে এবং পারস্পরিক সম্পর্কে ভাঙ্গন সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, 'আপনার দায়িত্বে থাকা গনীমতের মালের ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে কোনো রকম পক্ষপাতিত্ব করবেন না।' 'গরিবদের ওপর ধনীদের প্রাধান্য দেবেন না।'

■ সর্বসাধারণকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। এতে সামাজিক বন্ধন অটুট থাকবে এবং নেতার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা জন্মাবে। এ ক্ষেত্রে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি মুসলমানদের প্রতি দয়ার্দ্র হবেন, বড়দের সম্মান করবেন, ছোটদের স্নেহ করবেন এবং আলেমদের মূল্যায়ন করবেন।'

■ মানুষের কাছাকাছি পৌঁছার চেষ্টা করা, তাদের অভিযোগ শোনা, তাদের সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে তাদের মনোবল বৃদ্ধি করা; আর তা না হলে জনগণের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং সামাজিক অবক্ষয় দেখা দেবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, 'আপনার দরজা যেন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে এবং অসহায়দের ওপর ক্ষমতাশীলদের চড়াও হতে দেবেন না।'

■ সত্য অনুসরণ এবং তা যেকোনো পরিস্থিতিতে সমাজের সর্বত্র বাস্তবায়ন করার জন্য সচেষ্ট থাকা; কারণ, তা আদর্শ সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সত্যকে আঁকড়ে থাকবেন এবং তা প্রতিষ্ঠায় প্রাণপণ চেষ্টা করবেন।' 'সব মানুষকে সমানভাবে বিবেচনা করবেন। দোষী ব্যক্তির মর্যাদা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না।'

■ অন্যায়-অবিচার থেকে বেঁচে থাকা, বিশেষ করে যিম্মিদের থেকে; কেননা, ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসরত সকল নাগরিকের সঙ্গেই ন্যায় বিচার করা আবশ্যক এবং এর মাধ্যমে সবাই ইসলামের সৌন্দর্য বুঝতে পারবে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি আপনাকেসহ সবাইকে আহলে যিম্মি (মুসলমানদের অধীনে বসবাসরত ইহুদী-খ্রিস্টান)-দের সঙ্গে মন্দ আচরণ করা থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিচ্ছি।'

■ গ্রামবাসীদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখা এবং তাদের খোঁজখবর নেওয়া। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, 'গ্রামবাসীদের প্রতিও ভালো আচরণ করবেন। কারণ, তারাই আদি আরব এবং ইসলামের রক্ষক।'

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অসীয়ত করতে গিয়ে আরও বলেন, আমি যাদের নিয়োগ দিয়েছি, তাদের কাউকে এক বছরের বেশি বহাল রাখবেন না। তবে আশআরীকে চার বছরের জন্য বহাল রাখবেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00