📄 মদীনায় উমর রা.-এর শেষ খুতবা
৫.১.৪। মদীনায় উমর রা.-এর শেষ খুতবা
২১ যিলহজ, ২৩ হি.। শুক্রবার। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এদিন জুমুআর শেষ খুতবা প্রদান করেন। এ খুতবার কিছু অংশ আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, যা আমি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনীতে উল্লেখ করেছি। এ খুতবায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার নিজের দেখা একটি স্বপ্নের কথা বলেন এবং সেটি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, 'আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। আমি মনে করি তা ছিল আমার মৃত্যুর সংবাদ। আমি দেখেছি, একটি মোরগ আমাকে দু-বার ঠোকর মেরেছে এবং লোকে আমাকে আমার পরবর্তী খলীফা নির্বাচন করার জন্য তাগিদ দিচ্ছে। আল্লাহ তার এই দ্বীন অথবা খেলাফতের ধারাকে কখনো ধ্বংস করবেন না অথবা আল্লাহ তার রাসূলকে যে সত্যসহ প্রেরণ করেছিলেন, তা হারিয়ে যেতে দেবেন না। আমি যদি মৃত্যুবরণ করি, তাহলে ছয় সদস্য-বিশিষ্ট একটি শূরা কমিটি আমার পরবর্তী খলীফা নির্বাচিত করবে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমৃত্যু এই ছয় সদস্যের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন।
📄 ছুরিকাহত হওয়ার পূর্বে হুযাইফার সঙ্গে সাক্ষাৎ
৫.১.৬। ছুরিকাহত হওয়ার পূর্বে উমর রা.-এর হুযাইফাহ রা.-এরসঙ্গে সাক্ষাৎ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শহীদ হওয়ার চার দিন পূর্বে ২৩ যিলহজ ২৩ হি. রোজ রবিবার হুযাইফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং সাহল বিন হুনাইফ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি হুযাইফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দাজলা নদীর পানি দ্বারা সিঞ্চিত যমীনের খারায নির্ধারণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আর সাহল বিন হুরাইফ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ফোরাত নদীর পানির দ্বারা সিঞ্চিত যমীনের খারায নির্ধারণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি তাদের বলেন, 'তোমরা কীভাবে কাজ করছ? আমার তো ভয় হয়, তোমরা কৃষকদের ওপর এমন বোঝা চাপিয়ে দেবে যা বহন করার সাধ্য তাদের নেই।' তারা দুজনেই বললেন, 'আমরা সাধ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দিইনি।' তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যদি আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন, তাহলে আমি ইরাকের বিধবাদের ডেকে তাদের প্রয়োজন পূরণ করব এবং তারপর তাদের আর কারও মুখাপেক্ষী হতে হবে না।' কিন্তু এ কথা বলার চার দিন পরেই তিনি শহীদ হয়ে যান।
📄 খলীফাদের মদীনায় বসবাসের নিষেধাজ্ঞা
৫.১.৭। বন্দীদের মদীনায় বসবাসের নিষেধাজ্ঞা
মুসলমানদের বিজিত এলকায় যেসব বন্দী বসবাস করত, তাদের তিনি ইসলামী খেলাফতের রাজধানী মদীনায় প্রবেশের অনুমতি দেননি। তিনি ইরাক ও পারস্যের অগ্নিপূজকদের এবং সিরিয়া ও মিসরের খ্রিস্টানদের মদীনায় বসবাসে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। তবে তারা মুসলমান হলে অনুমতি দিতেন। এ সিদ্ধান্ত থেকে তার প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়। কেননা, তারা ছিল ইসলামের চরম দুশমন। সর্বদা মুসলমানদের মধ্যে ফেতনা সৃষ্টির পাঁয়তারা করত। এ কারণে তাদের অনিষ্ট থেকে মুসলিম জাতিকে বাঁচানোর লক্ষ্যে মদীনায় তাদের থাকার অনুমতি দেননি। কিন্তু কতক সাহাবীদের সাবায়ী গোলাম থাকায় তারা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট তাদের থাকার ব্যাপারে সুপারিশ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অনিচ্ছা সত্ত্বেও এর অনুমতি প্রদান করেন। ফলে তা-ই ঘটে, যার আশঙ্কা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন।
📄 উমর রা.-এর হত্যাকাণ্ড এবং শূরা কমিটি গঠন
৫.২। উমর রা.-এর হত্যাকাণ্ড এবং শূরা কমিটি গঠন
৫.২.১। উমর রা.-এর হত্যাকাণ্ড
আমর ইবনে মায়মূন রহ. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি তার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম এবং তার ও আমার মাঝে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দু-কাতারের মধ্য দিয়ে চলার সময় বলতেন, কাতার সোজা করে নাও। যখন দেখতেন কাতারে কোনো ত্রুটি নেই, তখন তাকবীর বলতেন। তিনি অধিকাংশ সময় সূরা ইউসুফ, সূরা নাহল অথবা এ ধরনের সূরা প্রথম রাকাতে তিলাওয়াত করতেন, যেন অধিক পরিমাণে লোক প্রথম রাকাতে শরীক হতে পারেন। তাকবীর বলার পরেই আমি তাকে বলতে শুনলাম, একটি কুকুর আমাকে আঘাত করেছে অথবা বলেন, আমাকে আক্রমণ করেছে। ঘাতক 'ইলজ' দ্রুত পলায়নের সময় দু-ধারি খঞ্জর দিয়ে ডানে বামে আঘাত করে চলেছে। এভাবে তেরো জনকে আহত করল। এদের মধ্যে সাত জন শহীদ হলেন।
এ অবস্থা দেখে এক মুসলিম তার লম্বা চাদরটি ঘাতকের ওপর ফেলে দিলেন। ঘাতক যখন বুঝতে পারল সে ধরা পড়ে যাবে তখন সে আত্মহত্যা করল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাত ধরে সামনে এগিয়ে দিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকটে যারা ছিল শুধু তারাই ব্যাপারটি দেখতে পেল। আর মসজিদের শেষে যারা ছিল তারা ব্যাপারটি এর অধিক বুঝতে পারল না যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে না। তাই তারা 'সুবহানাল্লাহ সুবহানাল্লাহ' বলতে লাগলেন। আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের নিয়ে সংক্ষেপে সালাত আদায় করলেন। যখন মুসল্লীগণ চলে গেলেন, তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে ইবনে আব্বাস, দেখো তো, কে আমাকে আঘাত করল?' তিনি কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করে এসে বললেন, 'মুগীরাহ ইবনে শুবাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর গোলাম (আবু লুলু)।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, 'ওই কারিগর গোলামটি?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহ তার সর্বনাশ করুন। আমি তার সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নেব। দিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার মৃত্যু ইসলামের দাবিদার কোনো ব্যক্তির হাতে ঘটাননি। হে ইবনে আব্বাস, তুমি এবং তোমার পিতা মদীনায় কাফির গোলামের সংখ্যা বৃদ্ধি পছন্দ করতে। আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট অনেক অমুসলিম গোলাম ছিল। ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যদি আপনি চান তবে আমি কাজ করে ফেলি অর্থাৎ আমি তাদের হত্যা করে ফেলি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি ভুল বলছ। কেননা, তারা তোমাদের ভাষায় কথা বলে, তোমাদের কিবলামুখী হয়ে সালাত আদায় করে, তোমাদের মতো হজ করে।'
অতঃপর তাকে তার ঘরে নেওয়া হলো। আমরা তাঁর সঙ্গে চললাম। মানুষের অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল, ইতিপূর্বে তাদের ওপর এত বড় মুসিবত আর আসেনি। কেউ কেউ বলছিলেন, ভয়ের কিছু নেই। আবার কেউ বলছিলেন, আমি তাঁর সম্পর্কে আশঙ্কাবোধ করছি। অতঃপর খেজুরের শরবত আনা হলো, তিনি তা পান করলেন। কিন্তু তা তার পেট হতে বেরিয়ে পড়ল। অতঃপর দুধ আনা হলো, তিনি তা পান করলেন; তাও তার পেট হতে বেরিয়ে পড়ল। তখন সকলেই বুঝতে পারলেন, মৃত্যু তার অবশ্যম্ভাবী। আমরা তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। অন্যান্য লোকজনও আসতে শুরু করল। সকলেই তার প্রশংসা করতে লাগল। তখন যুবক বয়সী একটি লোক এসে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনার জন্য আল্লাহর সু-সংবাদ রয়েছে; আপনি তা গ্রহণ করুন। আপনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য গ্রহণ করেছেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগেই আপনি তা গ্রহণ করেছেন, যে সম্পর্কে আপনি নিজেই অবগত আছেন। অতঃপর আপনি খলীফা হয়ে ন্যায় বিচার করেছেন। অতঃপর আপনি শাহাদাত লাভ করেছেন।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি পছন্দ করি যে তা আমার জন্য ক্ষতিকর বা লাভজনক না হয়ে সমান সমান হয়ে যাক।' যখন যুবকটি চলে যেতে উদ্যত হলো, তখন তার লুঙ্গিটি মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যুবকটিকে আমার নিকট ডেকে আনো।' তিনি বললেন, 'হে ভাতিজা, তোমার কাপড়টি উঠিয়ে নাও। এটা তোমার কাপড়ের পরিচ্ছন্নতার জন্য এবং তোমার রবের নিকটও পছন্দনীয়। হে আবদুল্লাহ ইবনে উমর, তুমি হিসাব করে দেখো আমার ঋণের পরিমাণ কত।' তারা হিসাব করে দেখতে পেলেন ছিয়াশি হাজার (দিরহাম) বা এর কাছাকাছি। তিনি বললেন, 'যদি উমরের পরিবার-পরিজনের মাল দ্বারা তা পরিশোধ হয়ে যায়, তবে তা দিয়ে পরিশোধ করে দাও। অন্যথায় আদি ইবনু কা'ব এর বংশধরদের নিকট হতে সাহায্য গ্রহণ করো। তাদের মাল দিয়েও যদি ঋণ পরিশোধ না হয় তবে কুরাইশ কবিলা হতে সাহায্য গ্রহণ করবে, এর বাইরে কারও সাহায্য গ্রহণ করবে না। আমার পক্ষ হতে তাড়াতাড়ি ঋণ আদায় করে দাও। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার খিদমতে তুমি যাও এবং বলো উমর আপনাকে সালাম পাঠিয়েছে। 'আমীরুল মুমিনীন' শব্দটি বলবে না। কেননা, এখন আমি মুমিনগণের আমীর নই। তাকে বলো উমর ইবন খাত্তাব তার সাথিদ্বয়ের পাশে দাফন হবার অনুমতি চাচ্ছেন।' আব্দুল্লাহ ইবনু উমর আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার খিদমতে গিয়ে সালাম জানিয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন, 'প্রবেশ করো।' তিনি দেখলেন, আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বসে বসে কাঁদছেন। তিনি গিয়ে বললেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন এবং তার সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন হবার জন্য আপনার অনুমতি চেয়েছেন।' আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বললেন, 'তা আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু আজ আমি এ ব্যাপারে আমার ওপরে তাকে অগ্রগণ্য করছি।'
আবদুল্লাহ ইবনে উমর যখন ফিরে আসছেন তখন বলা হলো, এই যে আবদুল্লাহ ফিরে আসছে। তিনি বললেন, 'আমাকে উঠিয়ে বসাও।' তখন এক ব্যক্তি তাকে ঠেস দিয়ে বসিয়ে ধরে রাখলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী সংবাদ?' তিনি বললেন, 'আমীরুল মুমিনীন, আপনি যা কামনা করেছেন, তাই হয়েছে, তিনি অনুমতি দিয়েছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ। এর চেয়ে বড় কোনো বিষয় আমার নিকট ছিল না। যখন আমার মৃত্যু হয়ে যাবে তখন আমাকে উঠিয়ে নিয়ে, তাকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, উমর ইবনুল খাত্তাব আপনার অনুমতি চাচ্ছেন। যদি তিনি অনুমতি দেন, তবে আমাকে প্রবেশ করাবে, আর যদি তিনি অনুমতি না দেন তবে আমাকে সাধারণ মুসলিমদের গোরস্থানে নিয়ে যাবে।' এ সময় উম্মুল মুমিনীন হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে কতিপয় মহিলাসহ আসতে দেখে আমরা উঠে পড়লাম। হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহা তার নিকট গিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদলেন। অতঃপর পুরুষরা এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলে, তিনি ঘরের ভেতর গেলে ঘরের ভেতর হতেও আমরা তার কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তারা বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি অসীয়ত করুন এবং খলীফা মনোনীত করুন।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, খেলাফতের জন্য এ কয়েকজন ছাড়া অন্য কাউকে আমি যোগ্যতম পাচ্ছি না, যাদের প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ইন্তিকালের সময় রাজি ও খুশি ছিলেন। অতঃপর তিনি তাদের নাম বললেন, আলী, উসমান, যুবায়র, তালহা, সাদ ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ এবং বললেন, 'আবদুল্লাহ ইবনে উমর তোমাদের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু সে খেলাফত লাভ করতে পারবে না। তা ছিল শুধু সান্ত্বনামাত্র। যদি খেলাফতের দায়িত্ব সাদের রাযিয়াল্লাহু আনহু ওপর ন্যস্ত করা হয় তবে তিনি এর জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি। আর যদি তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ খলীফা নির্বাচিত হন তবে তিনি যেন সর্ববিষয়ে সাদের সাহায্য ও পরামর্শ গ্রহণ করেন। আমি তাকে অযোগ্যতা বা খিয়ানতের কারণে অপসারণ করিনি। আমার পরের খলীফাকে আমি অসীয়ত করছি, তিনি যেন প্রথম যুগের মুহাজিরগণের হক সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাদের মান-সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন। এবং আমি তাকে আনসার সাহাবীগণের যাঁরা মুহাজিরগণের আসার আগে এই নগরীতে (মদীনায়) বসবাস করে আসছিলেন এবং ঈমান এনেছেন, তাঁদের প্রতি সদ্ব্যবহার করার অসীয়ত করছি যে, তাদের মধ্যে নেককারগণের ওযর-আপত্তি যেন গ্রহণ করা হয় এবং তাঁদের মধ্যে কারও ভুলত্রুটি হলে তা যেন ক্ষমা করে দেওয়া হয়। আমি তাঁকে এ অসীয়তও করছি যে, তিনি যেন রাজ্যের বিভিন্ন শহরের অধিবাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করেন। কেননা, তাঁরাও ইসলামের হিফাযতকারী এবং তারাই ধন-সম্পদের জোগানদাতা। তারাই শত্রুদের চোখের কাঁটা। তাদের হতে তাদের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে কেবল তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ যেন যাকাত আদায় করা হয়। আমি তাকে পল্লিবাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করারও অসীয়ত করছি। কেননা, তারাই আরবের ভিত্তি এবং ইসলামের মূল শক্তি। তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ এনে তাদের দরিদ্রদের মধ্যে যেন বিলিয়ে দেওয়া হয়। আমি তাকে আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যিম্মিদের (অর্থাৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়) বিষয়ে অসীয়ত করছি যে, তাদের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার যেন পুরা করা হয়। তাদের পক্ষাবলম্বনে যেন যুদ্ধ করা হয়, তাদের শক্তি-সামর্থ্যের অধিক জিযিয়া যেন চাপানো না হয়।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তিকাল হয়ে গেলে আমরা তার লাশ নিয়ে পায়ে হেঁটে চললাম। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে সালাম করলেন এবং বললেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব অনুমতি চাচ্ছেন।' আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বললেন, 'তাকে প্রবেশ করাও।' অতঃপর তাকে প্রবেশ করানো হলো এবং তার সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন করা হলো।
অন্য বর্ণনায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সম্পর্কে আরও কিছু ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, যা আমর ইবনু মায়মুন রহ.-এর বর্ণনায় নেই। ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ভোরবেলা আঘাত করা হয়। তাকে মুগীরাহ ইবনে শুবাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর গোলাম আবু লুলু আঘাত করে। সে একজন অগ্নিপূজক ছিল।' আবু রাফে বলেন, 'মুগীরাহ ইবনে শুবাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর গোলাম আবু লulু পেষণযন্ত্র বানাত। এর বিনিময়ে মুগীরাহ ইবনে শুবাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার নিকট থেকে চার দিরহাম কেটে রাখত। আবু লুলু একদিন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে দেখা করে বলে, 'হে আমীরুল মুমিনীন, মুগীরাহ ইবনে শুবাহ আমার নিকট থেকে বেশি পরিমাণে কেটে রাখছে। তাকে এর পরিমাণ কমাতে বলুন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি আল্লাহকে ভয় করো এবং মনিবকে সন্তুষ্ট রাখো।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুগীরাহ ইবনে শুবাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর দেখা করে গোলামের বোঝা হালকা করার কথা বলবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু আবু লুলু খ্যাপে গিয়ে বলে ওঠে, 'হায়, তার ইনসাফ আমার বেলায় এসে হারিয়ে গেল!' এ জন্য সে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তারপর সে একটি দু-ধারি খঞ্জর বানায় এবং সেটি ধারালো করে তাতে বিষ মিশিয়ে রাখে। তারপর এটি নিয়ে হরমুযের কাছে যায়। তাকে জিজ্ঞাসা করে, 'খঞ্জরটি কেমন হলো?' সে জবাবে বলল, 'এটি দিয়ে যাকেই আঘাত করা হবে, সে-ই মারা যাবে।' রাবী বলেন, 'তারপর সে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর উদ্দেশে গমন করে এবং ফজরের নামাযে তার ঠিক পেছনে দাঁড়ায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকবীর বলার আগে লোকজনকে নামাযের কাতার সোজা করতে বলতেন। তারপর তাকবীর বলতেন। তিনি স্বাভাবিকভাবে অন্যান্য দিনের মতোই কাতার সোজা করতে বলে তাকবীর দেন। আর তখনই আবু লুলু তার কাঁধে ও কোমরে খঞ্জরটি দিয়ে আঘাত করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে পড়ে যান। আমর ইবনে মাইমূন রহ. বলেন, 'আমি তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলতে শুনেছি,
وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ قَدَرًا مَّقْدُورًا
আল্লাহর আদেশ নির্ধারিত, অবধারিত।
৫.২.২। উমর রা.-এর পরবর্তী খলীফা নির্বাচনে অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গুপ্তঘাতকের হাতে ছুরিকাহত হয়ে প্রচণ্ড কষ্ট ভোগ করছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি মুসলিম জাতির ঐক্য এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। নিঃসন্দেহে এটি ছিল ইতিহাসের একটি সংকটময় মুহূর্ত, যখন তার ঈমানের দৃঢ়তা, একনিষ্ঠতা এবং আত্মোৎসর্গের অনুপম দৃষ্টান্ত ফুটে উঠেছে। ওই দুঃসময়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পরবর্তী খলীফা নির্বাচনে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন নতুন এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন। এ ঘটনা থেকে উম্মতের মানসিকতাকে অনুধাবন এবং তাদের যাবতীয় বিষয়াদি দক্ষভাবে পরিচালনা করার জন্য তার যে অসাধারণ যোগ্যতা ছিল, তা পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করা যায়। তার পূর্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের কোনো উত্তরসূরি নির্বাচন না করেই ইন্তেকাল করেছেন। আর আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইন্তেকালের আগে প্রবীণ সাহাবীদের সঙ্গে আলোচনা করে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে খলীফা নির্বাচন করে গিয়েছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যুসজ্জায়ও যখন তাকে পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারে বলা হলো, তখন তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। তারপর এমন এক পদ্ধতি নির্ধারণ করলেন, যা ওই সময়ের জন্য ছিল সবচেয়ে বেশি উপযোগী।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়ত্ব সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য ছিল। সুতরাং তাকে খলীফা নির্বাচন করার ব্যাপারে কোনো ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা ছিল না। অধিকন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথা ও কাজে এই উম্মতকে দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন যে, তার মৃত্যুর পর এ উম্মতকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-ই সবচেয়ে বেশি যোগ্য। আর যখন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হিসাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নির্বাচন করেন, তখন তিনি জানতেন, সাহাবায়ে কেরাম সবাই এ বিষয়ে একমত যে, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরে দৃঢ়তা এবং দায়িত্ববোধের কারণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-ই রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিক যোগ্য। সুতরাং প্রবীণ সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে খলীফা মনোনীত করেন এবং এতে কেউই দ্বিমত পোষণ করেননি। এভাবে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতেই লোকজন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট বাইআত গ্রহণ করে।
পরবর্তী খলীফা মনোনয়নের ক্ষেত্রে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নির্বাচন পদ্ধতিকেই বেছে নেন। তবে এ নির্বাচন সীমিতসংখ্যক সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত একটি শূরা কমিটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছয় জন সাহাবীকে নির্বাচন করেন, যারা প্রত্যেকেই খলীফা হওয়ার জন্য উপযুক্ত ছিলেন। তবে তাদের যোগ্যতার মধ্যে পার্থক্য ছিল। কীভাবে এবং কত দিনে খলীফা নির্বাচন করতে হবে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তা নির্দিষ্ট করে দেন। নতুন খলীফা নির্বাচনে কী পরিমাণ ভোটের প্রয়োজন হবে, তিনি তাও উল্লেখ করেন। তিনি একটি সৈন্যদল নিয়োগ দেন, যারা এ নির্বাচন-প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে এবং যদি কেউ গণ্ডগোল সৃষ্টির পাঁয়তারা করে, তাহলে তাকে সমুচিত শাস্তি দেবে। মজলিসে শূরার বৈঠকের নিরাপত্তা বিধান এবং তাতে যা আলোচিত হবে, তা যেন কেউ না শোনে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এটা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন।
মজলিসে শূরার সদস্যগণ
মজলিসে শূরার সদস্য ছিলেন ছয় জন। তারা হলেন :
✓ আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু,
✓ উসমান ইবনে আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু,
✓ আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু,
✓ সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু,
✓ যুবায়ের ইবনে আওয়াম রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং
✓ তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শূরার সদস্য হিসাবে সাঈদ ইবনে যায়েদ ইবনে নুফাইল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে রাখেননি যদিও তিনি বেহেশতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ জন সাহাবীদের একজন ছিলেন। সম্ভবত এর কারণ ছিল যে, তিনি ছিলেন বনু আদি গোত্রের (যা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর গোত্র)।
নির্বাচন পদ্ধতি
তিনি মজলিসে শূরার সদস্যদের তাদের একজনের বাড়িতে জমা হয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে বলেন। উপদেষ্টা হিসাবে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মজলিসে উপস্থিত থাকবেন, তবে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। এই আলোচনা চলাকালীন ইমামতির দায়িত্ব পালন করবেন সুহাইব আল-রুমি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেন, 'এই তিন দিনের জন্য আপনি নামাজের ইমাম। মজলিসে শূরার কোনো সদস্যকে তিনি নামাজের ইমামতির দায়িত্ব দেননি যাতে তাকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্বাচিত খলীফা হিসাবে কেউ ভুল না বোঝে। আল-মিসদাদ ইবনে আল-আসওয়াদ এবং আবু তালহা আল-আনসারী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সভা পর্যবেক্ষণ করার আদেশ দেন।
নির্বাচন-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সময় নির্ধারণ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নির্বাচন-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য তিন দিন সময় নির্ধারণ করেছিলেন, যা এ কাজের জন্য ছিল যথেষ্ট। যদি তারা এর চেয়ে বেশি সময় নেন, তাহলে ফিতনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। এ জন্য তিনি তাদের বলেন, 'খলীফা নির্বাচন ব্যতিরেকে যেন তোমাদের জন্য চতুর্থ দিন না আসে।'
খলীফা নির্বাচনে নির্ধারিত ভোট-সংখ্যা
ইতিহাসের কিছু কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মজলিসে শূরার সদস্যদের একত্র হয়ে আলোচনা করতে বলেছেন। তাদের মধ্যে পাঁচ জন যদি কারও ব্যাপারে একমত হয় এবং একজন তার বিপক্ষে থাকে, তাহলে তরবারি দিয়ে তার গর্দান উড়িয়ে দিতে হবে। আর চার জন যদি একমত হয় এবং বাকি দুজন বিপক্ষে থাকে, তাহলে সেই দুজনের গর্দান উড়িয়ে দিতে হবে। এটা জঘন্য একটি বর্ণনা, যার কোনো ভিত্তি নেই। এটা রাফিযি শিয়া আবু মাখনাফের বানানো হাদীস, যা সহীহ বর্ণনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি সাহাবায়ে কেরামের আদর্শিক আচরণগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেও বেমানান। আবু মাখনাফ বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সুহাইব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন : তাদের (মজলিসে শূরার লোকজনের) দিকে নযর রাখো। তাদের মধ্যে পাঁচ জন যদি কারও ব্যাপারে একমত হয় এবং একজন তার বিপক্ষে থাকে, তাহলে তরবারি দিয়ে তার গর্দান উড়িয়ে দিতে হবে। আর চার জন যদি একমত হয় এবং বাকি দুজন বিপক্ষে থাকে তাহলে সেই দুজনের গর্দান উড়িয়ে দিতে হবে। কিন্তু এটি একটি মিথ্যা বর্ণনা। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেমন করে এ রকম একটি জঘন্য আদেশ জারি করতে পারেন, যেখানে তিনি জানেন শূরার সদস্যগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানিত সাহাবী এবং তিনি নিজেই তাদের উন্নত গুণাবলি ও মর্যাদার কারণে এ কাজের জন্য নির্বাচন করেছেন? ইবনে সাদ থেকে বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আনসারদের উদ্দেশে বলেন: তাদের তিন দিন এক ঘরে অবস্থান করার সুযোগ দাও। যদি তারা ভালো কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে বের হয়ে আসে, তাহলে তো ভালো। আর নতুবা তাদের সকলের গর্দান উড়িয়ে দাও।' এটি একটি মুনকাতি বর্ণনা এবং এর সনদে সাম্মাক ইবনে হারব রয়েছে, যিনি যঈফ।
বিশ্বস্ত সূত্রে ইবনে সা'দ বর্ণনা করেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সুহাইব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'আগামী তিন দিন নামাযে ইমামতি করুন এবং মজলিসে শূরার সদস্যদের আলোচনার জন্য অবকাশ দেন। যখন তারা কারও ব্যাপারে একমত হবে, তখন যদি কেউ দ্বিমত পোষণ করে, তাহলে তার গর্দান উড়িয়ে দেবেন (হত্যা করবেন)।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ আদেশ জারি করেন যে, যদি কেউ এই শূরার বিপক্ষে যায়, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে। আর এ আদেশ জারিতে রাসূলের নির্দেশকেই অনুসরণ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ أَتَاكُمْ وَأَمْرُكُمْ جَمِيعٌ عَلَى رَجُلٍ وَاحِدٍ يُرِيدُ أَنْ يَشُقُ عَصَاكُمْ أَوْ يُفَرِّقَ جَمَاعَتَكُمْ فَاقْتُلُوهُ
এক ব্যক্তির বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকা অবস্থায় (একজন রাষ্ট্রপ্রধানের অধীনে থাকা অবস্থায়) কোনো ব্যক্তি যদি এসে তোমাদের ঐক্য বিনষ্ট করতে বা 'জামাআত' বিভক্ত করতে চায়, তবে তাকে হত্যা করবে।
মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে নির্দেশ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের পরামর্শ দিয়েছেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা মজলিসে উপস্থিত থাকবেন। তবে সেখানে তার কিছু বলার থাকবে না। কিন্তু তিনি তাদের বলেছেন: যদি তাদের তিন জন কাউকে মনোনীত করে এবং বাকি তিন জন অন্য কাউকে পছন্দ করে, তাহলে বিষয়টি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমার ওপর বর্তাবে। তিনি যে দলকে বিজয়ী ঘোষণা করবেন, সেখান থেকেই খলীফা নির্বাচন করবে। আর যদি তারা আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের সিদ্ধান্ত মানতে অপারগ হয়, তাহলে যে দলে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু থাকবেন, সে দল থেকেই খলীফা নির্বাচিত হবে।' তিনি আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বিজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ হিসাবে বর্ণনা করে বলেন, 'কী বিজ্ঞ লোকই-না আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, কতই-না অভিজ্ঞ! আল্লাহ তা'আলা তাকে হেদায়েত ও নিরাপত্তা দিয়েছেন। সুতরাং তার কথা শোনো।
নির্বাচন-প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং অরাজকতা নির্মূলে একদল মুসলমান সৈন্য নিয়োগ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু তালহা আল-আনসারী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'হে আবু তালহা, মহান আল্লাহ তা'আলা তোমার মাধ্যমে ইসলামকে সাহায্য করেছেন। আনসারদের মধ্যে পঞ্চাশ জন সৈন্য নিয়ে শূরা কমিটির নিরাপত্তায় নিয়োজিত করুন, যতক্ষণ-না তারা তাদের মধ্যে কাউকে নির্বাচিত করতে সক্ষম হয়। আর তিনি আল-মিসদাদ ইবনে আল-আসওয়াদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'আমাকে দাফন করার পর এই সেনাদের দলটিকে একসঙ্গে ওই ঘরের পাহারায় নিয়োজিত করো যতক্ষণ-না তারা তাদের সংখ্যা থেকে এক জনকে নির্বাচিত করে। তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনের সমাপ্তি ঘটে। তার ওপর যে বিপদ আপতিত হয়েছিল তা তিনি মুসলিম উম্মাহকে বুঝতে দেননি অথবা মৃত্যুর কঠিন যন্ত্রণাও তাকে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণচিন্তা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি অভিনব এক শূরা-কমিটি গঠন করেন যদিও এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, কুরআন ও সুন্নাহতে পূর্ব থেকেই শূরার মূলনীতি বর্ণিত রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইতিমধ্যে এসব মূলনীতি প্রয়োগ করেছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পূর্ণ নতুন কিংবা স্বচিন্তাপ্রসূত কোনো কিছুর প্রচলন করেননি; বরং তিনি খলীফা নির্বাচনে নতুন একটি পদ্ধতি বের করেছেন এবং কমিটির সদস্যদের একটি সংখ্যা নির্ধারণ করেছেন যেখান থেকে একজনকেই নির্বাচন করা হবে। এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অথবা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু করেননি; উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-ই প্রথম এটির প্রচলন করেছেন এবং এটি উম্মতের জন্য কল্যাণকর সাব্যস্ত হয়েছে। তখনকার সাহাবায়ে কেরামের জন্য এ পদ্ধতিই ছিল সবচেয়ে উপযোগী ও গ্রহণীয়।