📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 ফেতনা ও এর ভয়াবতা নিয়ে আলোচনা

📄 ফেতনা ও এর ভয়াবতা নিয়ে আলোচনা


৫.১। ফেতনা ও এর ভয়াবহতা উমর রা. এবং হুযাইফাহ রা.-এর মধ্যে নিয়ে আলোচনা
হুযাইফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে তিনি বলেন, একবার আমরা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। হঠাৎ তিনি বললেন, ফেতনা সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য তোমাদের মধ্যে কে স্মরণ রেখেছে? হুযাইফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন) মানুষ নিজের পরিবার, ধন- সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও প্রতিবেশীর ব্যাপারে যে ফেতনায় পতিত হয়, সালাত, সদাকাহ, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ তার সে পাপকে মুছে ফেলে। তিনি বললেন, আমি তোমাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিনি এবং সে ফিতনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছি, যা সাগর লহরির মতো ঢেউ খেলবে। হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন, সে ফেতনায় আপনার কোনো অসুবিধা হবে না। কেননা, সে ফেতনা ও আপনার মাঝে একটি বন্ধ দরজা আছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, দরজাটি কি ভেঙে ফেলা হবে, না খুলে দেওয়া হবে? তিনি বললেন, না বরং ভেঙে ফেলা হবে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তাহলে তো সেটা আর কখনো বন্ধ করা যাবে না। (হুযাইফাহ বলেন) আমি বললাম, হ্যাঁ। (শাকীক বলেন) আমরা হুযাইফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করলাম, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কি দরজাটি সম্পর্কে জানতেন? উত্তরে তিনি বললেন, হ্যাঁ। যেমন আমি সুনিশ্চিতভাবে জানি যে আগামী দিনের পর রাত আসবে। কেননা, আমি তাকে এমন একটি হাদীস বর্ণনা করেছিলাম, যা ত্রুটিমুক্ত। (শাকীক বলেন) দরজাটি কে সে সম্পর্কে হুযাইফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করতে আমরা ভয় পাচ্ছিলাম, তাই আমরা মাসরুককে জিজ্ঞাসা করতে বললাম। তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, দরজাটি কে? উত্তরে তিনি বললেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু (নিজেই)।

হুযাইফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জানান যে, তিনি ছিলেন একটি শক্তিশালী দরজা, যা মুসলিম জাতিকে ফেতনা ও গৃহযুদ্ধ থেকে বিরত রেখেছে। কিন্তু এই দরজাটি ভেঙে ফেলা হবে, মানে তারপর কিয়ামত পর্যন্ত এ দরজা আর বন্ধ হবে না। এটাই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বুঝেছিলেন; মুসলমানদের মধ্যে ফেতনা ছড়িয়ে যাবে এবং তারা কখনোই আর সেটি দমাতে বা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে না। এ ক্ষেত্রে হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের ভাষ্য বা ব্যক্তিগত চাওয়ার কথা বলেননি। কারণ, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না; বরং তিনি এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট শুনেছিলেন, তা অনুধাবন করেছিলেন এবং অন্তরে ধারণ করেছিলেন। এটিই তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এভাবে বর্ণনা করেছিলেন : আমি একটি হাদীস বর্ণনা করেছি এবং আমি তাতে ভুল করিনি—মানে এটি সহীহ এবং তা বানানো বা মিথ্যা নয়—কারণ, আমি এটি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট থেকে শুনেছি। অধিকন্তু হুযাইফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু যা বলেছেন, এ ব্যাপারে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সজাগ ছিলেন। তিনি ভালো করেই জানতেন, তার শাসনামল মুসলমানদের মধ্যে ফেতনা সৃষ্টির বড় বাধা এবং তার জীবদ্দশায় কখনো ফেতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট থেকে শুনেছিলেন যে, তাকে হত্যা করা হবে এবং তিনি শহীদ হিসাবেই আল্লাহর নিকট হাজির হবেন। আনাস ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, (একবার) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবু বকর, উমর, উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু উহুদ পাহাড়ে আরোহণ করেন। পাহাড়টি নড়ে উঠল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে উহুদ, থামো। তোমার ওপর একজন নবী, একজন সিদ্দীক ও দুজন শহীদ রয়েছেন।

৫.১.১। শেষ হজে উমর রা.-এর দুআ (২৩ হি.)
সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব থেকে বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মিনা থেকে ফেরার পথে আবতাহ নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে সমতলভূমিতে একটি বালুর একটি স্তূপ তৈরি করেন এবং তার ওপর কাপড় বিছিয়ে হেলান দিয়ে বসেন। তারপর দু-হাত তুলে এই দুআ করেন : ‘হে আল্লাহ, আমি বয়োবৃদ্ধ হয়ে গিয়েছি। আমার শক্তি-সামর্থ্য দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমার অধীন প্রজারা বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছে। আমাকে এমতাবস্থায় আপনার কাছে নিয়ে যান (মৃত্যুর মাধ্যমে)- কারও হকের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি কিংবা ছাড়াছাড়ি করার আগেই।' তারপর তিনি মদীনার উদ্দেশে রওনা হন।

৫.১.২। উমর রা.-এর শাহাদাত কামনা
যায়েদ বিন আসলাম তার পিতা থেকে তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই দুআ করতেন : হে আল্লাহ, আমাকে আপনার পথে শাহাদাতের মৃত্যু দান করুন এবং আমার মৃত্যু যেন আপনার নবীর শহরে হয়। অন্যান্য বর্ণনায় ভিন্ন শব্দে রয়েছে : হে আল্লাহ, আপনার সন্তুষ্টির পথে আমাকে শাহাদাতের মৃত্যু দান করুন এবং আমি যেন আপনার নবীর শহরেই মৃত্যুবরণ করি।' কেউ একজন জিজ্ঞাসা করল, 'এটা কীভাবে সম্ভব-মদীনায় অবস্থান করে আল্লাহর পথে শাহাদাতের মৃত্যু?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'আল্লাহ চাইলে সবই সম্ভব।' শায়েখ ইউসূফ বিন হাসান উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত কামনার কথা উল্লেখ করে বলেন, 'শাহাদাত কামনা করা মুস্তাহাব। শাহাদাত কামনার অর্থ মৃত্যু কামনা নয়। এর মধ্যে পার্থক্য হলো, মৃত্যু কামনার অর্থ নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই মৃত্যু চাওয়া, অথচ মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নেক আমলও বাড়তে থাকে। আর শাহাদাত কামনা মানে শহীদ অবস্থায় নির্ধারিত সময়েই মৃত্যু কামনা করা; এটা নির্ধারিত সময়ের আগে মৃত্যু চাওয়া নয়; বরং গৌরবময় মৃত্যুর আশা করা।

৫.১.৩। আউফ ইবনে মালিক আল-আশাযির স্বপ্ন
আউf ইবনে মালিক বলেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম, আকাশ থেকে একটি রশি ঝুলে আছে এবং মানুষ সেটি ধরার জন্য চেষ্টা করছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখা গেল তিনি অন্যান্যদের চেয়ে তিন হাত পরিমাণ উঁচু। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এ রকম কেন? তিনি বললেন, তিনি যমীনে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং কোনো নিন্দুকের পরোয়া করবেন না। আর তাকে শহীদ করা হবে।' পরদিন সকালে আমি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গিয়ে স্বপ্নের কথা জানালাম এবং তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর বান্দা, আবু হাফসকে ডেকে আনো।' যখন তিনি এলেন, তখন বললেন, 'হে আউফ, স্বপ্নে যা দেখেছ, তা তাকে বলো।' আমি যখন তাকে বললাম যে, তিনি আল্লাহর খলীফাদের একজন হবেন, তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এসবই কি একজন ঘুমন্ত ব্যক্তি দেখেছে?' তারপর তাকে পুরো স্বপ্ন শোনানো হয়।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হওয়ার পর একবার জাবিয়া নামক স্থানে অবস্থান করেন। সেখানে তিনি যখন খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন আমাকে ডেকে কাছে বসতে বলেন। তিনি খুতবা শেষ করে বললেন, 'আমাকে তোমার স্বপ্নের কথা বলো।' আমি বললাম, 'আপনি কি আমাকে তা বলতে নিষেধ করেননি?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি তা বোঝাইনি।' আরেক বর্ণনামতে, তিনি বলেন, 'আপনি কি এগুলোকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেননি?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আমি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সম্মুখে নিজের প্রশংসা শুনে লজ্জা পাচ্ছিলাম। তারপর যখন আমি তাকে আমার পুরো স্বপ্নের কথা বললাম, তখন তিনি বললেন, 'আমার খলীফা হওয়ার কথা ছিল, খলীফা হয়েছি। আর কোনো নিন্দুকের পরোয়া করার ব্যাপারে কথা হলো, আমি কেবল আল্লাহকে ভয় করি। কোনো নিন্দুকের পরোয়া করি না। আমি আশা করি এটিও সত্য। কিন্তু আমার শাহাদাতের ব্যাপারে যা দেখেছ, তা কী করে সম্ভব, যেখানে আমি আরবেই বসবাস করছি (মানে এখানে তো কোনো জিহাদ করার সুযোগ নেই)?'

৫.১.৪। উমর রা.-এর মৃত্যু সম্পর্কে আবু মুসা আশআরী রা.-এর স্বপ্ন
আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম অনেকগুলো দ্রুতগামী ঘোড়া এবং সেগুলো এক এক করে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। অবশেষে আমি একটি ঘোড়ায় চড়ে যালাক পাহাড়ে পৌঁছি। সেখানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার পাশে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখতে পাই। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আসার অপেক্ষায় ছিলেন। আমি বললাম, 'আপনি কেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট চিঠি প্রেরণ করছেন না?' তিনি বললেন, 'আমি তাকে তার মৃত্যুর সংবাদ বলতে চাচ্ছি না।'

৫.১.৪। মদীনায় উমর রা.-এর শেষ খুতবা
২১ যিলহজ, ২৩ হি.। শুক্রবার। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এদিন জুমুআর শেষ খুতবা প্রদান করেন। এ খুতবার কিছু অংশ আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, যা আমি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনীতে উল্লেখ করেছি। এ খুতবায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার নিজের দেখা একটি স্বপ্নের কথা বলেন এবং সেটি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, 'আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। আমি মনে করি তা ছিল আমার মৃত্যুর সংবাদ। আমি দেখেছি, একটি মোরগ আমাকে দু-বার ঠোকর মেরেছে এবং লোকে আমাকে আমার পরবর্তী খলীফা নির্বাচন করার জন্য তাগিদ দিচ্ছে। আল্লাহ তার এই দ্বীন অথবা খেলাফতের ধারাকে কখনো ধ্বংস করবেন না অথবা আল্লাহ তার রাসূলকে যে সত্যসহ প্রেরণ করেছিলেন, তা হারিয়ে যেতে দেবেন না। আমি যদি মৃত্যুবরণ করি, তাহলে ছয় সদস্য-বিশিষ্ট একটি শূরা কমিটি আমার পরবর্তী খলীফা নির্বাচিত করবে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমৃত্যু এই ছয় সদস্যের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন।'

৫.১.৬। ছুরিকাহত হওয়ার পূর্বে উমর রা.-এর হুযাইফাহ রা.-এরসঙ্গে সাক্ষাৎ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শহীদ হওয়ার চার দিন পূর্বে ২৩ যিলহজ ২৩ হি. রোজ রবিবার হুযাইফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং সাহল বিন হুনাইফ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি হুযাইফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দাজলা নদীর পানি দ্বারা সিঞ্চিত যমীনের খারায নির্ধারণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আর সাহল বিন হুরাইফ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ফোরাত নদীর পানির দ্বারা সিঞ্চিত যমীনের খারায নির্ধারণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি তাদের বলেন, 'তোমরা কীভাবে কাজ করছ? আমার তো ভয় হয়, তোমরা কৃষকদের ওপর এমন বোঝা চাপিয়ে দেবে যা বহন করার সাধ্য তাদের নেই।' তারা দুজনেই বললেন, 'আমরা সাধ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দিইনি।' তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যদি আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন, তাহলে আমি ইরাকের বিধবাদের ডেকে তাদের প্রয়োজন পূরণ করব এবং তারপর তাদের আর কারও মুখাপেক্ষী হতে হবে না।' কিন্তু এ কথা বলার চার দিন পরেই তিনি শহীদ হয়ে যান।

৫.১.৭। বন্দীদের মদীনায় বসবাসের নিষেধাজ্ঞা
মুসলমানদের বিজিত এলকায় যেসব বন্দী বসবাস করত, তাদের তিনি ইসলামী খেলাফতের রাজধানী মদীনায় প্রবেশের অনুমতি দেননি। তিনি ইরাক ও পারস্যের অগ্নিপূজকদের এবং সিরিয়া ও মিসরের খ্রিস্টানদের মদীনায় বসবাসে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। তবে তারা মুসলমান হলে অনুমতি দিতেন। এ সিদ্ধান্ত থেকে তার প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়। কেননা, তারা ছিল ইসলামের চরম দুশমন। সর্বদা মুসলমানদের মধ্যে ফেতনা সৃষ্টির পাঁয়তারা করত। এ কারণে তাদের অনিষ্ট থেকে মুসলিম জাতিকে বাঁচানোর লক্ষ্যে মদীনায় তাদের থাকার অনুমতি দেননি। কিন্তু কতক সাহাবীদের সাবায়ী গোলাম থাকায় তারা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট তাদের থাকার ব্যাপারে সুপারিশ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অনিচ্ছা সত্ত্বেও এর অনুমতি প্রদান করেন। ফলে তা-ই ঘটে, যার আশঙ্কা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 শেষ হজ্জ উমর রা.-এর দুআ (২৩ হি.)

📄 শেষ হজ্জ উমর রা.-এর দুআ (২৩ হি.)


৫.১.১। শেষ হজে উমর রা.-এর দুআ (২৩ হি.)
সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব থেকে বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মিনা থেকে ফেরার পথে আবতাহ নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে সমতলভূমিতে একটি বালুর একটি স্তূপ তৈরি করেন এবং তার ওপর কাপড় বিছিয়ে হেলান দিয়ে বসেন। তারপর দু-হাত তুলে এই দুআ করেন : ‘হে আল্লাহ, আমি বয়োবৃদ্ধ হয়ে গিয়েছি। আমার শক্তি-সামর্থ্য দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমার অধীন প্রজারা বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছে। আমাকে এমতাবস্থায় আপনার কাছে নিয়ে যান (মৃত্যুর মাধ্যমে)- কারও হকের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি কিংবা ছাড়াছাড়ি করার আগেই।' তারপর তিনি মদীনার উদ্দেশে রওনা হন।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 উমর রা.-এর শাহাদাত কামনা

📄 উমর রা.-এর শাহাদাত কামনা


৫.১.২। উমর রা.-এর শাহাদাত কামনা
যায়েদ বিন আসলাম তার পিতা থেকে তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই দুআ করতেন : হে আল্লাহ, আমাকে আপনার পথে শাহাদাতের মৃত্যু দান করুন এবং আমার মৃত্যু যেন আপনার নবীর শহরে হয়। অন্যান্য বর্ণনায় ভিন্ন শব্দে রয়েছে : হে আল্লাহ, আপনার সন্তুষ্টির পথে আমাকে শাহাদাতের মৃত্যু দান করুন এবং আমি যেন আপনার নবীর শহরেই মৃত্যুবরণ করি।' কেউ একজন জিজ্ঞাসা করল, 'এটা কীভাবে সম্ভব-মদীনায় অবস্থান করে আল্লাহর পথে শাহাদাতের মৃত্যু?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'আল্লাহ চাইলে সবই সম্ভব।' শায়েখ ইউসূফ বিন হাসান উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত কামনার কথা উল্লেখ করে বলেন, 'শাহাদাত কামনা করা মুস্তাহাব। শাহাদাত কামনার অর্থ মৃত্যু কামনা নয়। এর মধ্যে পার্থক্য হলো, মৃত্যু কামনার অর্থ নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই মৃত্যু চাওয়া, অথচ মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নেক আমলও বাড়তে থাকে। আর শাহাদাত কামনা মানে শহীদ অবস্থায় নির্ধারিত সময়েই মৃত্যু কামনা করা; এটা নির্ধারিত সময়ের আগে মৃত্যু চাওয়া নয়; বরং গৌরবময় মৃত্যুর আশা করা।

৫.১.৩। আউফ ইবনে মালিক আল-আশাযির স্বপ্ন
আউf ইবনে মালিক বলেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম, আকাশ থেকে একটি রশি ঝুলে আছে এবং মানুষ সেটি ধরার জন্য চেষ্টা করছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখা গেল তিনি অন্যান্যদের চেয়ে তিন হাত পরিমাণ উঁচু। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এ রকম কেন? তিনি বললেন, তিনি যমীনে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং কোনো নিন্দুকের পরোয়া করবেন না। আর তাকে শহীদ করা হবে।' পরদিন সকালে আমি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গিয়ে স্বপ্নের কথা জানালাম এবং তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর বান্দা, আবু হাফসকে ডেকে আনো।' যখন তিনি এলেন, তখন বললেন, 'হে আউফ, স্বপ্নে যা দেখেছ, তা তাকে বলো।' আমি যখন তাকে বললাম যে, তিনি আল্লাহর খলীফাদের একজন হবেন, তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এসবই কি একজন ঘুমন্ত ব্যক্তি দেখেছে?' তারপর তাকে পুরো স্বপ্ন শোনানো হয়।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হওয়ার পর একবার জাবিয়া নামক স্থানে অবস্থান করেন। সেখানে তিনি যখন খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন আমাকে ডেকে কাছে বসতে বলেন। তিনি খুতবা শেষ করে বললেন, 'আমাকে তোমার স্বপ্নের কথা বলো।' আমি বললাম, 'আপনি কি আমাকে তা বলতে নিষেধ করেননি?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি তা বোঝাইনি।' আরেক বর্ণনামতে, তিনি বলেন, 'আপনি কি এগুলোকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেননি?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আমি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সম্মুখে নিজের প্রশংসা শুনে লজ্জা পাচ্ছিলাম। তারপর যখন আমি তাকে আমার পুরো স্বপ্নের কথা বললাম, তখন তিনি বললেন, 'আমার খলীফা হওয়ার কথা ছিল, খলীফা হয়েছি। আর কোনো নিন্দুকের পরোয়া করার ব্যাপারে কথা হলো, আমি কেবল আল্লাহকে ভয় করি। কোনো নিন্দুকের পরোয়া করি না। আমি আশা করি এটিও সত্য। কিন্তু আমার শাহাদাতের ব্যাপারে যা দেখেছ, তা কী করে সম্ভব, যেখানে আমি আরবেই বসবাস করছি (মানে এখানে তো কোনো জিহাদ করার সুযোগ নেই)?'

৫.১.৪। উমর রা.-এর মৃত্যু সম্পর্কে আবু মুসা আশআরী রা.-এর স্বপ্ন
আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম অনেকগুলো দ্রুতগামী ঘোড়া এবং সেগুলো এক এক করে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। অবশেষে আমি একটি ঘোড়ায় চড়ে যালাক পাহাড়ে পৌঁছি। সেখানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার পাশে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখতে পাই। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আসার অপেক্ষায় ছিলেন। আমি বললাম, 'আপনি কেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট চিঠি প্রেরণ করছেন না?' তিনি বললেন, 'আমি তাকে তার মৃত্যুর সংবাদ বলতে চাচ্ছি না।'

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 আউফ ইবনে মালিক আল-আশযাহির স্বপ্ন

📄 আউফ ইবনে মালিক আল-আশযাহির স্বপ্ন


৫.১.৩। আউফ ইবনে মালিক আল-আশাযির স্বপ্ন
আউf ইবনে মালিক বলেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম, আকাশ থেকে একটি রশি ঝুলে আছে এবং মানুষ সেটি ধরার জন্য চেষ্টা করছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখা গেল তিনি অন্যান্যদের চেয়ে তিন হাত পরিমাণ উঁচু। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এ রকম কেন? তিনি বললেন, তিনি যমীনে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং কোনো নিন্দুকের পরোয়া করবেন না। আর তাকে শহীদ করা হবে।' পরদিন সকালে আমি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গিয়ে স্বপ্নের কথা জানালাম এবং তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর বান্দা, আবু হাফসকে ডেকে আনো।' যখন তিনি এলেন, তখন বললেন, 'হে আউফ, স্বপ্নে যা দেখেছ, তা তাকে বলো।' আমি যখন তাকে বললাম যে, তিনি আল্লাহর খলীফাদের একজন হবেন, তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এসবই কি একজন ঘুমন্ত ব্যক্তি দেখেছে?' তারপর তাকে পুরো স্বপ্ন শোনানো হয়।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হওয়ার পর একবার জাবিয়া নামক স্থানে অবস্থান করেন। সেখানে তিনি যখন খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন আমাকে ডেকে কাছে বসতে বলেন। তিনি খুতবা শেষ করে বললেন, 'আমাকে তোমার স্বপ্নের কথা বলো।' আমি বললাম, 'আপনি কি আমাকে তা বলতে নিষেধ করেননি?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি তা বোঝাইনি।' আরেক বর্ণনামতে, তিনি বলেন, 'আপনি কি এগুলোকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেননি?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আমি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সম্মুখে নিজের প্রশংসা শুনে লজ্জা পাচ্ছিলাম। তারপর যখন আমি তাকে আমার পুরো স্বপ্নের কথা বললাম, তখন তিনি বললেন, 'আমার খলীফা হওয়ার কথা ছিল, খলীফা হয়েছি। আর কোনো নিন্দুকের পরোয়া করার ব্যাপারে কথা হলো, আমি কেবল আল্লাহকে ভয় করি। কোনো নিন্দুকের পরোয়া করি না। আমি আশা করি এটিও সত্য। কিন্তু আমার শাহাদাতের ব্যাপারে যা দেখেছ, তা কী করে সম্ভব, যেখানে আমি আরবেই বসবাস করছি (মানে এখানে তো কোনো জিহাদ করার সুযোগ নেই)?'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00