📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 বিজয় অভিযানসমূহ থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

📄 বিজয় অভিযানসমূহ থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা


৪.১। ইসলামী বিজয়ের প্রকৃতি
অনেক প্রাচ্যবিদ ও খ্রিস্টান ইতিহাসবিদ খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে সংঘটিত ইসলামী বিজয় অভিযানসমূহকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে। তারা দাবি করে, এসব অভিযান ছিল ধর্মীয় যুদ্ধ। তারা নির্দিষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী হলেও ধর্মান্ধতার বশবর্তী হয়ে লোকজনকে জোর করে অধীন ও তাদের ধর্মীয় বিধান মানতে বাধ্য করে এবং নির্মম রক্তপাতে মেতে ওঠে। তারা আরও দাবি করে, মুসলমানগণ এক হাতে কুরআন এবং আরেক হাতে তরবারি বহন করত। যারা এসব ভ্রান্ত মতাদর্শ প্রচারে লিপ্ত ছিল, তাদের মধ্যে সিডিও, মুইর এবং নিপুর উল্লেখযোগ্য। মুইর নিপুরের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলে, 'ইসলাম ধর্মের টিকে থাকার স্বার্থে একের পর এক আক্রমণাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অপরিহার্য ছিল এবং তারা তরবারির জোরে সব লোকজনকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে থাকে, অথবা নিদেনপক্ষে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব বিস্তার করে। তবে যেকোনো ধর্মের অনুসারীদের জন্য এক পর্যায়ে যুদ্ধ এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং ইসলামের ক্ষেত্রে তা-ই ঘটেছিল।'

কিন্তু তাদের এই দাবি—মুসলমানগণ জোরজবরদস্তি করে ইসলামের প্রচার-প্রসার ঘটিয়েছে কিংবা তারা অন্য ধর্মাবলম্বীদের থেকে বেশি আক্রমণাত্মক ছিল—সম্পূর্ণ মিথ্যা ও অযৌক্তিক। কিছু প্রাচ্যবিদ এ দাবির অসারতা বর্ণনা করেছেন এবং তারা দেখিয়েছেন, ইসলামের বিজয়সমূহ ছিল মানবতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। ভন ক্রিমার বলেন, 'মুসলিম আরবগণ তাদের যুদ্ধে চমৎকার মানবিক আচরণ প্রদর্শন করেছেন। তাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাদরি, মহিলা, শিশু, অন্ধ কিংবা প্রতিবন্ধীদের হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি তাদের শস্য ও গাছ কেটে ফেলতেও নিষেধ করেছেন। মুসলমানগণ পরবর্তী সময়ে সকল যুদ্ধে এ নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছেন। তারা কোনো পবিত্র স্থান কিংবা ফসলের ক্ষতি করেনি। তবে বাইজেন্টাইনরা মুসলমানদের দিকে বিষযুক্ত তির নিক্ষেপ করেছে। তারা শত্রুদের প্রতি বিন্দুমাত্র সহমর্মিতা প্রদর্শন করেনি। শহর লুটতরাজ করা এবং তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া বাইজেন্টাইনদের জন্য ছিল খুবই স্বাভাবিক কাজ, যা তারা অগ্রসর বা পালিয়ে যাওয়া—উভয় ক্ষেত্রেই করেছে। কিন্তু মুসলমানগণ তাদের আদর্শ মেনে চলেছে এবং এসব কর্মকাণ্ডের কোনোটি কখনো করার চেষ্টা করেনি।'

রোসেনথাল বলেন, 'অন্য ভূখণ্ডে ইসলামের বিস্তৃতি, অন্যকে ইসলামের দিকে আহ্বান এবং ভিন্ন ধর্মের চিন্তাশীল জাতি-গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্তি-তর্ক করা—সবকিছুই ঘটেছে। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, ইসলামের বিজয় ভাষা ও কৃষ্টি-কালচারের প্রাচীন সব বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম হয় এবং এটি সকল মানুষ ও সভ্যতার সামনে এক বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের দৃষ্টান্ত পেশ করে, যার ভিত্তি ছিল পরিপূর্ণ সাম্য ও স্বাধীনতা।'

ঐতিহাসিক বাস্তবতা হচ্ছে, মুসলিম জাতি কাউকে জোর করে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেনি। কারণ, তারা আল্লাহর দেওয়া বিধান পরিপূর্ণভাবে মেনে চলেছে। আল্লাহ বলেন,

لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنْ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হিদায়াত স্পষ্ট হয়েছে ভ্রষ্টতা থেকে। অতএব, যে ব্যক্তি তাগূতকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, অবশ্যই সে মজবুত রশি আঁকড়ে ধরে, যা ছিন্ন হবার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

ইসলামের সৌন্দর্য দেখেই মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। এটি ছিল তাদের ওপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। তারা ইসলামের অনুশাসনে মুসলমানদের সদাচরণ প্রত্যক্ষ করেছে। তারা তাদের যাবতীয় আদেশ-নিষেধসহ ইসলামী শিক্ষার পরিপূর্ণ অনুসরণ করতে দেখেছে। তারা মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ও সৈনিকদের কথা ও আচরণে মিল খুঁজে পেয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে মুসলিম সৈনিকদের মতো মহান আচরণের দৃষ্টান্ত আর নেই। খলীফা এবং সেনাপতি তাদের সৈনিকদের আল্লাহর সাহায্য কামনা করা ও তার প্রতি ভয় ধারণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন, দুনিয়া থেকে আখেরাতকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন, একনিষ্ঠভাবে জিহাদে অংশগ্রহণ করতে আদেশ দিয়েছেন, যা কিছুই তারা করুক না কেন, তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি তালাশ ও গোনাহ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। তারা জাতি ও ব্যক্তিকে অন্যের পূজা করা থেকে বিরত রাখার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর ছিলেন, যাতে তারা কেবল এক আল্লাহর ইবাদত করতে পারে এবং তাদের দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবন মুক্ত হয়ে চিরস্থায়ী জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারেন।

মুসলিম সেনাপতিরা বাহিনীর সর্বাগ্রে থেকে লড়াই করেছেন, যুদ্ধের প্রথম আঘাত প্রতিহত করেছেন এবং তাদের অনেকে শাহাদাত বরণ করেছেন। আর শান্তির সময় সেনাপতিরা বাহিনীর পেছনে অবস্থান করেছেন, যাতে অন্যদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা যায়, দলের বোঝা বহন এবং দুর্বলদের সাহায্য করা যায়। দলের নেতারাই সর্বপ্রথম ও অগ্রগামী দাঈ, যারা রণক্ষেত্রে ইসলামী যুদ্ধের বিধি-বিধান পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করেছেন। বস্তুত মুসলমানগণ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই জিহাদ করেছেন এবং জাগতিক কোনো তাড়নায় তারা অন্যান্য জাতির মতো যুদ্ধে লিপ্ত হননি।

৪.২। সেনাপতি নির্ধারণে উমর রা.-এর কর্মপন্থা
বিভিন্ন অভিযানে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি নির্বাচনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা ছিল। তিনি এ জন্য বেশ কিছু শর্ত ও যোগ্যতা নির্ধারণ করেছিলেন। নিচে এগুলো বর্ণনা করা হলো।

৪.২.১। ইসলামী বিধি-বিধানে অভিজ্ঞ, ধার্মিক ও নেককার হওয়া
তিনি বলতেন, 'যদি কেউ জেনেশুনে কোনো সন্ত্রাসীকে কোনো পদে নিয়োগ দেয়, তাহলে সেও সন্ত্রাসী।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার কিছু অংশের গভর্নর হিসাবে সাঈদ ইবনে আমরকে নিয়োগ দেন। তাকে এ সংবাদ জানানো হলে তিনি তা গ্রহণে অস্বীকার করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'না। ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, আমার কাঁধে সব বোঝা চাপিয়ে নিজে ঘরে বসে থাকবেন না।'

৪.২.২। ধীরস্থিরতা ও সতর্কতা অবলম্বন
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু উবাইদ আস-সাকাফিকে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়ে তাকে বলেন, 'সুলাইতকে সেনাপতি নিয়োগ করতে আমাকে কেউ বাধা দিতে পারত না। যুদ্ধে তাড়াহুড়া করার মানসিকতার কারণেই আমি তা করিনি। পরিষ্কার নিদর্শন ছাড়া রণক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করলে নিশ্চিত পরাজয় বরণ করতে হবে। আল্লাহর কসম, যদি তার মধ্যে তাড়াহুড়া করার মানসিকতা না থাকত, তাহলে তাকেই সেনাপতি নির্বাচন করতাম। যুদ্ধে ধীরস্থির থাকার চেয়ে সঠিক কোনো কাজ নেই।'

৪.২.৩। সাহসী ও বীর এবং দক্ষ তিরন্দাজ
নাহাওয়ান্দ বিজয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম সেনাবাহিনীর একজন সেনাপতি নির্বাচন করতে চাইলেন। এ জন্য তিনি লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। তারা বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি ইরাকের লোকজনের ব্যাপারে ভালো জানেন। আপনার সৈন্যরাও এখানে এসেছে। আপনি তাদের দেখেছেন এবং তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি তাদের জন্য এমন একজন সেনাপতি নিয়োগ করতে চাই, যে রণক্ষেত্রে শত্রুর মোকাবিলায় প্রচণ্ড সাহসী ভূমিকা রাখতে পারবে।' তারা জিজ্ঞাসা করলেন, 'কে তিনি, হে আমীরুল মুমিনীন?' তিনি বললেন, 'আন-নুমান ইবনে মুকরিন আল-মুযানি।' তারা বললেন, 'তিনি এর যোগ্য।'

৪.২.৪। জ্ঞানী ও বিনয়ী হওয়া
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমার ওপর আপনাদের এই অধিকারও রয়েছে যে, আমি আপনাদের আত্মঘাতী কোনো অভিযানে পাঠাব না অথবা সীমান্ত চৌকিতে দীর্ঘদিন ধরে পাহারায় রাখব না।' আজনাদিন যুদ্ধে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তার সেনাবাহিনী বাইজেন্টাইনদের মোকাবিলা করছিল। বাইজেন্টাইন কমান্ডার ছিল আরতাবুন। সে ছিল বাইজেন্টাইনদের মধ্যে সবচেয়ে ধূর্ত ও বুদ্ধিমান, দূরদর্শী ও চরম বিশ্বাসঘাতক। রামলা এবং ইলিয়া (জেরুযালেম)-এ সে প্রচুর সৈন্য মোতায়েন করে রাখে। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণসহ খলীফার নিকট পরামর্শ ও নির্দেশনা চেয়ে চিঠি প্রেরণ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বিখ্যাত উক্তি করেন : আমরা বাইজেন্টাইন আরতাবুনের বিরুদ্ধে আরবের আরতাবুনকে প্রেরণ করেছি। দেখি আমরা কীভাবে এর মীমাংসা হয়।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেই যখন আরতাবুন ও তার বাহিনী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে গমন করেন যাতে একটি জুতসই যুদ্ধ পরিকল্পনাপ্রণয়ন করতে সক্ষম হন, তখন তিনি বাইজেন্টাইন নেতার ঘাঁটিতে প্রবেশ করেন। তিনি প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি পৌঁছে গিয়েছিলেন, কিন্তু আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু আরতাবুনকে ধোঁকা দিতে সক্ষম হন। এ সংবাদ পেয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমর তাকে পরাজিত করেছে। আমর কতই-না বিচক্ষণ ব্যক্তি!'

৪.২.৫। সেনাপতিকে বিচক্ষণ ও বাগ্মী হতে হবে, যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে গভীর জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ হতে হবে।
আল-মুগনির লেখক (ইবনে কুদামাহ আল-হাম্বলী) বলেন, 'সামরিক নেতাকে হতে হবে বুদ্ধিমান, কৌশলী। শত্রুর গতিবিধি সম্পর্কে দূরদর্শী হওয়ার সঙ্গে তার যুদ্ধ সম্পর্কেও গভীর জ্ঞান রাখতে হবে। তাকে সৈন্যদের প্রতি বিশ্বস্ত, দয়ালু এবং একনিষ্ঠ হতে হবে।' এ কারণেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকজনের সঙ্গে পরামর্শ করে ইরাক যুদ্ধে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সেনাপতি নির্বাচন করেন।

৪.২.৬। দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনপদ্ধতির একটি নীতি ছিল, তিনি এমন কাউকে কোনো কাজের দায়িত্ব দিতেন না, যে কাজে ব্যক্তির কোনো আগ্রহ নেই এবং সংশ্লিষ্ট কাজের ব্যাপারে তার জ্ঞানও যথেষ্ট নয়। একান্ত অপারগ না হলে তিনি এর ব্যত্যয় ঘটাতেন না। তার মূল লক্ষ্যই ছিল প্রতিটি কাজ যেন সুষ্ঠুভাবেই সম্পন্ন হয়। একদিন তিনি লোকজনকে পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার আহ্বান জানান। কিন্তু কেউই স্বেচ্ছায় রাজি হয়নি। পরের দিন তিনি আবার একই আহ্বান করেন, সেদিনও কেউ দাঁড়ায়নি। তৃতীয় দিনও একই ঘটনা ঘটে। চতুর্থ দিন প্রথম ব্যক্তি হিসাবে আবু উবাইদ ইবনে মাসউদ আস-সাকাফি উঠে দাঁড়ান। পরবর্তী সময়ে লোকজন তাকে অনুসরণ করে। তিনি আবু উবাইদকে দলের সেনাপতি নির্বাচন করেন। কারণ, তিনি এ কাজের যোগ্য বিবেচিত হন, যদিও তিনি সাহাবী ছিলেন না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলা হলো, 'আপনি সাহাবীদের মধ্য হতে একজনকে সেনাপতি নিয়োগ করলেন না কেন?' তিনি জবাব দিলেন, 'আমি তাকে নিয়োগ দিয়েছি কারণ, সে-ই প্রথম জিহাদে সাড়া দিয়েছে।' এসব গুণ সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মধ্যে সমুজ্জ্বল ছিল।

৪.৩। উমর রা.-এর প্রেরিত চিঠি থেকে আল্লাহ ও সেনাপতির অধিকার
৪.৩.১। আল্লাহর হক
চিঠি ও সকল আলাপ-আলোচনায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সেনাপতি ও সৈন্যদের সব সময় আল্লাহর হক সম্পর্কে সচেতন থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। এসব হকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে :

সহ্যক্ষমতা ও ধৈর্য শত্রুর চেয়ে বেশি হওয়া
মহান আল্লাহ বলেন,

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধরো ও ধৈর্যে অটল থাকো এবং পাহারায় নিয়োজিত থাকো। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফল হও।

সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ইরাকে প্রেরণের পূর্বে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে ধৈর্যধারণের গুরুত্ব মনে করিয়ে দেন এবং বলেন : 'মনে রাখবেন, প্রতিটি ভালো কাজের জন্যই কিছু গুণ থাকা আবশ্যক। ভালো কাজের জন্য প্রয়োজন ধৈর্য। আপনার ওপর আপতিত সকল বিপদ ও ঘটনায় যদি ধৈর্যধারণ করতে পারেন, তাহলে আপনি আল্লাহর ভয় অর্জন করতে সক্ষম হবেন। তিনি সিরিয়ায় অবস্থানরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লেখেন: 'ধৈর্যশীলদের জন্যই আল্লাহর প্রশংসা। আল্লাহ বলেন,

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ كَفَرُوا وَ قَالُوا لِإِخْوَانِهِمْ إِذَا ضَرَبُوا فِي الْأَرْضِ أَوْ كَانُوا غُزَّى لَوْ كَانُوا عِنْدَنَا مَا مَاتُوا وَ مَا قُتِلُوا
لِيَجْعَلَ اللَّهُ ذَلِكَ حَسْرَةً فِي قُلُوبِهِمْ وَ اللَّهُ يُحْيِ وَيُمِيتُ وَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ وَلَئِنْ قُتِلْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ مُتُّمْ لَمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللهِ وَرَحْمَةٌ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ وَلَئِنْ مُّتُّمْ أَوْ قُتِلْتُمْ لَا إِلَى اللَّهِ تُحْشَرُونَ
আর কত নবী ছিল, যার সাথে থেকে অনেক আল্লাহওয়ালা লড়াই করেছে। তবে আল্লাহর পথে তাদের ওপর যা আপতিত হয়েছে তার জন্য তারা হতোদ্যম হয়নি। আর তারা দুর্বল হয়নি এবং তারা নত হয়নি। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন। আর তাদের কথা শুধু এই ছিল যে, তারা বলল, 'হে আমাদের রব, আমাদের পাপ ও আমাদের কর্মে আমাদের সীমালঙ্ঘন ক্ষমা করুন এবং অবিচল রাখুন আমাদের পা-সমূহকে, আর কাফির কওমের ওপর আমাদের সাহায্য করুন'। অতঃপর আল্লাহ তাদের দিলেন দুনিয়ার প্রতিদান এবং আখিরাতের উত্তম সওয়াব। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।

এ দুনিয়ার পুরস্কার হচ্ছে বিজয় ও গনীমত। আর আখেরাতের পুরস্কার হচ্ছে ক্ষমা ও জান্নাত।'
আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু চিঠিটি সকলের সম্মুখে পড়ে শোনান। তিনি তাদের আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জিহাদ করতে বলেন এবং তাদের ধৈর্যধারণ করতে বলেন, যাতে আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখেরাতের পুরস্কার দান করেন।

আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য করাই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব ভালোভাবেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথাকে হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন : 'আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার জন্য যে লড়াই করবে, তা মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই।' এ জন্য আমরা দেখি, তার জীবন, তার উপদেশ এবং তার চিঠিপত্রে এই গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাই প্রতিফলিত হয়েছে।

আমানত রক্ষা করা
মহাকরুণাময় আল্লাহ বলেন,

وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ وَمَنْ يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيمَةِ ۚ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
আর কোনো নবীর জন্য উচিত নয় যে, সে খিয়ানত করবে। আর যে খিয়ানত করবে, কিয়ামতের দিনে উপস্থিত হবে তা নিয়ে, যা সে খিয়ানত করেছে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে পুরোপুরি দেওয়া হবে, যা সে উপার্জন করেছে এবং তাদের ওপর যুলুম করা হবে না।

সেনাপতি ও সৈন্যদের প্রতি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর একটি অন্যতম উপদেশ হলো, বণ্টন করার আগেই কেউ যেন গনীমতের মাল চুরি না করে। তিনি বলেন, 'শত্রুর মোকাবিলায় পিছু হটে যেয়ো না এবং গনীমতের সম্পদ সংগ্রহের পর তা থেকে কোনো কিছু চুরি কোরো না।'

আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যে কারও প্রতি পক্ষপাত কোরো না
পক্ষপাত সম্পর্কে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রসিদ্ধ একটি উক্তি হচ্ছে: 'যে কেউ কাউকে পক্ষপাতিত্ব করে কিংবা আত্মীয়তার কারণে নিয়োগ দেবে এবং এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো কারণ থাকবে না, তাহলে সে আল্লাহ ও তার রাসূলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল। আর যে কেউ পাপাচারী কোনো ব্যক্তিকে জেনেশুনে নিয়োগ দেবে, তাহলে সেও তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে।'

৪.৩.২। সেনাপতিদের হক
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার চিঠিপত্রে এবং আদেশ-নির্দেশে সেনাপতিদের হক সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন, যা নিচে দেওয়া হলো:

সম্পূর্ণ আনুগত্য
আবু উবাইদ ইবনে মাসউদ আস-সাকাফিকে ইরাক যুদ্ধে সেনাপতি হিসাবে প্রেরণের সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সঙ্গে সালামা ইবনে আসলাম আল-খাযরাযি রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং সুলাইত ইবনে কাইস আল-আনসারি রাযিয়াল্লাহু আনহুকেও প্রেরণ করেন। তিনি আবু উবাইদকে নির্দেশ দেন, তাদের পরামর্শ ছাড়া এককভাবে যেন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা না হয়। তাকে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তারা বদরী সাহাবী। তারপর আবু উবাইদ পারসিকদের সঙ্গে সেতুযুদ্ধে লিপ্ত হন। সুলাইত রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে সেতু ধ্বংস না করার এবং পারসিকরা যেখানে অবস্থান নিয়েছিল, সেখানে গমন না করার পরামর্শ দেন। কিন্তু আবু উবাইদ তার কথায় কর্ণপাত করেননি। পরিণতিতে মুসলমানগণ পরাজয় বরণ করে। সুলাইত রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি তার অবাধ্য হতে চাইনি। আর নতুবা আমি লোকজনকে তার নির্দেশ অমান্য করতে বলতাম। কিন্তু আমি তার কথা শুনেছি এবং অনুসরণ করেছি।'

অধীনরা সকল কাজে আমীরের ওপর আস্থা রাখবে
আল্লাহ বলেন,

وَ إِذَا جَاءَهُمْ أَمْرٌ مِّنَ الْأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُوا بِهِ وَ لَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُوْلِ وَإِلَى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَثْبِطُوْنَهُ مِنْهُمْ وَ لَوْ لَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لَا تَّبَعْتُمُ الشَّيْطَنَ إِلَّا قَلِيلًا
আর যখন তাদের নিকট কোনো শান্তি অথবা ভীতিজনক বিষয় উপস্থিত হয় তখন তারা ওটা রটনা করতে থাকে এবং যদি তারা ওটা রাসূলের কিংবা তাদের আদেশদাতাদের প্রতি সমর্পণ করত তাহলে তাদের মধ্যে সঠিক তথ্য পেয়ে যেত এবং যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা না হতো তাহলে অল্পসংখ্যক ব্যতীত তোমরা শয়তানের অনুসরণ করতে।

এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা লোকদের যাবতীয় বিষয়াদি আমীরের ওপর ন্যস্ত করতে উৎসাহিত করেছেন, যাতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। যদি তারা মনে করে, এর চেয়ে উত্তম সিদ্ধান্ত আমীরের দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে, সে ক্ষেত্রে তারা তাকে সতর্ক করবে এবং সেটি অনুসরণ করার পরামর্শ দেবে। এ জন্য সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার জন্য পরামর্শ করা খুবই জরুরি একটি বিষয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদের জন্য একজন আমীর নিয়োগ করেছেন, যাতে তারা তাদের সকল বিষয়াদি তার ওপর সোপর্দ করে এবং তাদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী কোনো সিদ্ধান্তের কারণে বিভক্তি সৃষ্টি না হয়।

যে বছর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নাহাওয়ান্দে মুসলিম বাহিনী প্রেরণ করেন এবং সেখানে সৈন্য সমাবেশ করতে বলেন, তখন সেখানে মদীনা, বসরা ও কুফার সেনাবাহিনী অংশগ্রহণ করে। মদীনার সৈন্যদের মধ্যে আনসার ও মুহাজির সাহাবীগণও ছিলেন। তাদের সেনাপতি ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু। বসরার সেনাবাহিনী আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে এবং কুফার সেনাবাহিনী হুযাইফা ইবনে আল-ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে এগিয়ে আসে। তারা সবাই নাহাওয়ান্দে জমা হওয়ার পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নির্দেশ পাঠান : 'সম্মিলিত বাহিনীর কমান্ডার হবে নুমান ইবনে মুকরিন আল-মুজানি।'

সেনাপতির নির্দেশ দ্রুত মান্য করা
খেলাফতের দায়িত্ব নিয়েই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকজনকে পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শরীক হতে বলেন। তিনি তিন দিন ধরে লোকজনকে আহ্বান করতে থাকেন, কিন্তু কেউই তাতে সাড়া দেয়নি। চতুর্থ দিন আবু উবাইদ ইবনে মাসউদ রহ. প্রথম সাড়া দেন এবং এ কারণেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে এ যুদ্ধের সেনাপতি নির্বাচন করেন। পরবর্তী সময়ে অনেক সাহাবী এসে যুদ্ধে যোগ দেন। কিন্তু খলীফার আহ্বানে দ্রুত সাড়া দেওয়ায় আবু উবাইদ ইবনে মাসউদই সেনাপতি পদে বহাল থাকেন।

উতবা ইবনে গাজওয়ানকে বসরায় প্রেরণের পূর্বে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে মনে করিয়ে দেন : আপনাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এ ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন এবং অহংকার থেকে বেঁচে থাকবেন। যদি অহংকারে পতিত হন, তাহলে তা আপনার ভাইদের থেকে আপনাকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবী; চরম অপমান-অপদস্থের জীবন থেকে আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করেছেন এবং দুর্বল অবস্থা থেকে শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন। আর এখন একটি বিশাল বাহিনীর সেনাপতির পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন যাকে লোকজন মেনে চলবে। আপনার কথা তারা শুনবে এবং নির্দেশ দিলেই তা বাস্তবায়ন করা হবে। কতই-না বরকতময় জীবন! তবে নিজের অবস্থা ভুলে যাবেন না এবং কারও প্রতি হেয় দৃষ্টি দেবেন না।'

গনীমতের সম্পদ বণ্টনে তর্ক করা যাবে না
গনীমতের সম্পদ বণ্টনের ব্যাপারে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'হে আল্লাহ, আপনি আমার গভর্নরদের জন্য সাক্ষী, আমি লোকজনকে আপনার দ্বীন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ শেখানোর জন্যই প্রেরণ করেছি। আর যাতে তারা গনীমতের সম্পদ সুষ্ঠুভাবে তাদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়। তারা যদি কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, তাহলে যেন সেটি আমার নিকট সোপর্দ করে।'

আল-আবলাহ বিজয়ের পর গনীমতের মাল বণ্টন করতে গিয়ে দেখা গেল একজনের ভাগে একটি কপারের পাত্র পড়েছে। যখন সে পাত্রটি হাতে নিল, তখন দেখলে সেটি স্বর্ণের। পাশে আরেকজন সেটি দেখে সেনাপতির নিকট অভিযোগ পেশ করল। সেনাপতি দ্বিধায় পড়ে গেলেন এবং সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট বিষয়টি উত্থাপন করলেন। জবাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যদি হস্তগত হওয়ার পূর্বে তার এটি জানা ছিল না বলে সে দাবি করে এবং এ ব্যাপারে কসম খায়, তাহলে পাত্রটি তাকে দিয়ে দাও। আর যদি এর ব্যতিক্রম হয়, তাহলে সেটি অন্যদের মধ্যে বণ্টন করে দাও।' তখন ওই সৈন্যটি কসম খায় এবং তাকে সেটি দিয়ে দেওয়া হয়।

জালুলাহর যুদ্ধে বিজয়ের পর গনীমতের মাল জমা করা হলে জারির ইবনে আব্দুল্লাহ আল-বাজালি বলেন, এর চার ভাগের এক তার এবং তার লোকজনের। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু এ বিষয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট পত্র প্রেরণ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বলেন, 'জারির সত্য বলেছে। আমি তাকে বলেছিলাম যে, তার লোকজনের অন্তর নরম করার প্রয়োজনে যদি গনীমতের সম্পদ থেকে ওই পরিমাণ দেওয়া হয়, তাহলেও তারা মুসলমানদের পক্ষে শত্রুদের বিরুদ্ধে বীরদর্পে যুদ্ধ করতে পারে। আর যদি তারা কেবলই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং আখেরাতের পুরস্কারকে যথেষ্ট মনে করে লড়াই করে, তাহলে তাদের সঙ্গে অন্যান্য মুসলমানদের মতোই আচরণ করা হবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এই জবাব পেয়ে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তা জারির ইবনে আব্দুল্লাহকে অবহিত করেন। তখন জারির বলেন, 'আমীরুল মুমিনীন সত্য বলেছেন। আমাদের এই সম্পদের প্রয়োজন নেই; বরং আমরা তো সাধারণ মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।'

৪.৩.৩। সৈন্যদের অধিকার
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার চিঠিপত্রে এবং আদেশ-নির্দেশে সৈন্যদের প্রাপ্য হক সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন, যা নিচে দেওয়া হলো :

সৈন্যদের নিয়মিত পরিদর্শন
বর্ণিত আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি নামায পড়াকালীন সেনাবাহিনীর বিন্যাস পরিকল্পনা প্রণয়ন করি।' এর কারণ, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হিসাবে জিহাদের অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে নির্দেশিত ছিলেন। মূলত তিনিই জিহাদের সর্বাধিনায়ক ছিলেন। সুতরাং তার এই নামায শত্রুদের মোকাবিলায় সালাতুল খাওফ নামাযের মতোই ছিল। যখন তিনি কাউকে সেনাপতির দায়িত্ব দিতেন, তিনি তাকে বিদায় দেওয়ার আগে পরিদর্শন করতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন। তিনি তার সেনাপতিদের যা বলতেন, তার মধ্যে এটিও বলতেন : ইজার ও রিদা পরে নাও, জুতা ও পোশাক ঠিকমতো পরো; নিশানা দেখে আঘাত করো এবং ভালোভাবে অশ্বচালনা শিখে নাও। আরবদের অনুসরণ করো এবং অনারবদের আমোদ-ফুর্তি ত্যাগ করো। তোমরা ততদিন শক্তিশালী থাকবে যতদিন অশ্বচালনা ও তির নিক্ষেপ প্রশিক্ষণ নিতে থাকবে।

এখান থেকে সেনাবাহিনী প্রস্তুত করা ও তাদের যুদ্ধে পারদর্শী করে গড়ে তোলার ব্যাপারে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতা বোঝা যায়। তার নিয়োগকৃত সেনাপতিরাও তার নির্দেশক্রমে সৈন্যদের লাইনে দাঁড় করিয়ে পরিদর্শন করতেন এবং শত্রুর সম্মুখে শক্তির প্রদর্শন করতেন; সেটি কোনো রণক্ষেত্র কিংবা প্রস্তুতিমূলক সমাবেশ—যা-ই হোক না কেন। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু জুমুআর দিনে তার সৈন্যদের উদ্দেশে ভাষণ দিতেন এবং তাদের বাহনগুলোকে শক্তভাবে তৈরি করতে নির্দেশ দিতেন; তিনি তাদের সতর্ক করতেন, যদি তারা তা না করে, তাহলে তারা বেতন পাবে না। তিনি বলেন, 'আমি এ কথা শুনতে চাই না যে, কেউ তার দেহকে মোটাতাজা করেছে, কিন্তু তার ঘোড়াকে দুর্বল বানিয়ে ফেলেছে। মনে রেখো, আমি যেমন তোমাদের পরিদর্শন করি, তেমনি তোমাদের ঘোড়াগুলোও পরিদর্শন করব। যদি কেউ কোনো কারণ ছাড়াই তার ঘোড়াকে দুর্বল বানিয়ে ফেলবে, তাহলে আমি সে অনুযায়ী তার বেতন-ভাতা কেটে দেব।'

সিরিয়ায় মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন তাকে রাজার হালে দেখেন। তিনি তাকে এ জন্য তিরস্কার করে বলেন, 'তুমি কি সম্রাট কিসরার মতো আচরণ করছ, হে মুআবিয়া?' মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমরা শত্রুর মোকাবিলায় সম্মুখ সারির যোদ্ধা এবং তাদের সঙ্গে আমাদের জিহাদের ময়দানে সাজ-সজ্জায়ও প্রতিযোগিতা করতে হয়।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চুপ থাকলেন এবং তিনি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি। কারণ, মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু যা কিছু করছেন, তা ঈমান ও সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই।

সফরে সেনাদের সঙ্গে নম্র আচরণ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লেখেন : 'সফরে দলের সকল সদস্যদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন। যাত্রাপথে তাদের বেশি কষ্ট দেবেন না, যেন তারা শত্রুর নিকটবর্তী হতেই দুর্বল হয়ে না পড়ে। তারা এমন এক শত্রুক্রদলকে মোকাবিলা করতে যাচ্ছে যাদের সফরের প্রয়োজন নেই এবং তাদের রয়েছে শক্তিশালী ঘোড়া ও যোদ্ধা। আপনার এবং আপনার অধীন সব সৈন্যদের সপ্তাহে একদিন বিশ্রাম নেওয়া উচিত যাতে সবাই পুনরায় শক্তি অর্জন করতে পারে, নিজেদের অস্ত্র ও মালামাল গুছিয়ে নিতে পারে। এমন কোনো জনবসতির নিকট যাত্রাবিরতি করবেন না, যারা আমাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তিতে বা নিরাপত্তায় রয়েছে।'

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাঈদ ইবনে আমরের নেতৃত্বে সিরিয়ায় সাহায্য-সৈন্য প্রেরণ করেন। এ-সময় তিনি তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ঘোড়া ও রসদ সরবরাহ করেন। রওনা হওয়ার প্রাক্কালে তিনি তাদের একটু অপেক্ষা করতে বলেন। তারপর তিনি পদব্রজে বাহিনীর দিকে অগ্রসর হন এবং সাঈদ ইবনে আমরের উদ্দেশে বলেন, 'হে সাঈদ, আমি তোমাকে এই বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করেছি। তবে তুমি মনে কোরো না যে, তুমি তাদের মধ্যে সেরা, যদি-না তুমি আল্লাহকে ভয় করো। যখন অগ্রসর হবে পথে তাদের সঙ্গে নম্র আচরণ করবে, তাদের সম্মানে আঘাত করবে না এবং তাদের কাউকে বয়সে ছোট হওয়ার কারণে বাঁকা চোখে দেখবে না। আর শক্তিশালীদের প্রতি পক্ষপাত করবে না এবং তাদের কোনো গুহার ভেতর দিয়ে যাওয়ার আদেশ দেবে না। সমতল ভূমির ওপর দিয়ে অগ্রসর হবে এবং কোনো প্রসিদ্ধ রাস্তার ওপর তাঁবু গাড়বে না। আমি তোমাকে এবং তোমার বাহিনীকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করলাম।'

বিদায়ের সময় পরিদর্শন করা
কোনো বাহিনী অভিযানে রওনা হওয়ার প্রাক্কালে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের পরিদর্শন করতেন এবং তাদের ভালো আচরণ ও ইসলামী মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখার নির্দেশ দিতেন। তিনি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে শত্রুর প্রতিশ্রুতিকেও রক্ষা করতে বলেছেন, যখন তারা নিরাপত্তা প্রার্থনা করে এবং তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে নিষেধ করেছেন। ভুল করেও যদি কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে তা পুরো বাহিনীর দুর্বলতা ও পরাজয়ের কারণ হবে এবং শত্রুর শক্তিকে বৃদ্ধি করবে। তিনি তাকে মুসলমানদের জন্য অপমান ও লাঞ্ছনার প্রতীক না হওয়ার জন্য সতর্ক করেন।

রণক্ষেত্রে যুদ্ধের সময় নিজ বাহিনীর কারও অপরাধে শাস্তি প্রয়োগে নিষ্ক্রিয় থাকা
সেনাপতিদের উদ্দেশে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ কথাও বলেন, 'যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো বাহিনী কিংবা অভিযানের সেনাপতির জন্য উচিত নয় যে, সে কারও ওপর হদ শাস্তি প্রয়োগ করবে। তখন তা করা হলে শয়তান তাকে কাফেরদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করবে।'

একবার এক অভিযানে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সালমান ইবনে রাবিআ আল-বাহিলিকে সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসাবে প্রেরণ করেন। তার সঙ্গে আমর ইবনে মাযিকারিব এবং তুলাইহা ইবনে খুওয়ালিদও ছিলেন। আমর ইবনে মাযিকারিব এবং সালমান ইবনে রাবিআর মধ্যে একটি বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। বিষয়টি খলীফা পর্যন্ত গড়ায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন লিখে পাঠান: তুমি আমরের সঙ্গে যা করেছ, তা আমার কানে এসেছে এবং তুমি ঠিক করোনি। আমি যদি তোমার মতো যুদ্ধাবস্থায় থাকতাম, তাহলে আমি আমর ও তুলাইহার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতাম এবং তাদের পরামর্শ গ্রহণ করতাম। কারণ, সামরিক জ্ঞান ও যুদ্ধে তারা অভিজ্ঞ। মুসলিম প্রদেশে পৌঁছার পর তুমি তাদের অবস্থান অনুযায়ী মর্যাদা দেবে এবং ফিকহ ও কুরআনে পারদর্শীদের কাছে রাখবে। আর তিনি আমর ইবনে মাযিকারিবকে লেখেন: সেনাপতির সঙ্গে তোমার বচসায় লিপ্ত হওয়ার কথা আমি শুনেছি। তুমি তাকে অপমানও করেছ। আমি জেনেছি যে, তোমার নিকট আস-সামসামাহ নামে একটি তরবারি রয়েছে। তাহলে শুনে রাখো, আমার নিকট আল-মুসামমিম নামে একটি তরবারি রয়েছে। আল্লাহর কসম, সেটি দিয়ে যদি আমি তোমাকে আঘাত করি, সঙ্গে সঙ্গে তোমার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে।' এই চিঠি পেয়ে আমর বলেন, 'আল্লাহর কসম, যদি তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে সেটি অবশ্যই করবেন।'

এ ঘটনা দুটি থেকে পরিষ্কার যে, শত্রুর ভূখণ্ডে একজন সেনাপতির কেমন আচরণ করা উচিত, এ ব্যাপারে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুবই বিচক্ষণ ও দূরদর্শী ছিলেন। এ-সময় বাহিনীর সকল সদস্যদের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখা জরুরি; বিশেষ করে যখন তারা শীঘ্রই শত্রুর মোকাবিলা করবে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এটিও ভালোভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, যুদ্ধাবস্থায় রণকৌশলে জ্ঞানী ও অভিজ্ঞদের সঙ্গে সেনাপতির পরামর্শ করা উচিত এবং নিরাপদ স্থানে পৌঁছার পরও এ সম্পর্ক অটুট রাখতে হবে।

আর-রাহা যুদ্ধের সময়—ইয়ায ইবনে গানামের হাতে যা বিজিত হয়েছিল—উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশে ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান সিরিয়া থেকে বিসর ইবনে আবি আরতাহার নেতৃত্বে সাহায্য-সৈন্য প্রেরণ করেন। মুসলিম বাহিনী যখন শত্রু-এলাকায় অবস্থান করছিল, তখন ইয়ায ও বিসরের মধ্যে এক ব্যাপারে মতপার্থক্য দেখা দেয়। ইয়াযের সাহায্য-সৈন্যের কোনো প্রয়োজন ছিল না। এ জন্য তিনি ইয়াযকে সিরিয়ায় ফিরে যেতে বলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের ফিরে যাওয়ার সংবাদ পেয়ে ইয়াযকে এর কারণ দর্শাতে বলেন। মূলত তারা তার সাহায্যেই এসেছিল যাতে শত্রুদের মনে এই ভয় ছড়িয়ে পড়ে যে, মুসলিম বাহিনীর সাহায্যে একের পর এক বাহিনী এসে যোগ দিচ্ছে। এতে শত্রুদের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তারা দ্রুত আত্মসমর্পণ করবে। ইয়ায জবাবে লেখলেন : আমি আমার সেনাদলের মধ্যে বিদ্রোহ ও অনৈক্যের আশঙ্কা করেছি। কারণ, আমার কোনো সাহায্য-সৈন্যের প্রয়োজন ছিল না। এ জন্য আমি তাকে অনুরোধ করেছি—তিনি যেন ফিরে যান। এ কারণেই আমি তাকে ফেরত পাঠিয়েছি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার জবাব গ্রহণ করেন এবং তার জন্য দুআ করেন। যেহেতু তারা শত্রুর মোকাবিলা করছে, এ-সময় তাদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করলে তা পরাজয়কেই ত্বরান্বিত করবে।

বিরতি ও প্রস্থানের সময় সৈন্যদের পাহারায় রাখা
যেকোনো সামরিক ঘাঁটি কিংবা কোনো সেনাবাহিনীর জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পাহারার খুব গুরুত্ব দিতেন। এ জন্য তিনি সৈন্যদের এক দলকে পাহারায় নিযুক্ত করতে সেনাপতিদের নির্দেশ দিতেন, যাতে শত্রুরা অসতর্ক অবস্থায় আক্রমণ করার সুযোগ না পায়। তিনি কোনো যাত্রাবিরতি কিংবা সেখান থেকে রওনা হওয়ার সময় প্রহরী নিযুক্ত করতে বলতেন। শত্রু-এলাকায় প্রবেশ করার পরপরই তিনি সেনাপতিদের চারিদিকে স্কাউট ও গোয়েন্দা পাঠাতে নির্দেশ দিতেন যাতে, শত্রু-এলাকার প্রকৃতি ও তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিপূর্ণ তথ্য জানা যায়। তিনি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লিখে পাঠান : ‘শত্রুর কাছকাছি পৌঁছে গুপ্তচর প্রেরণ করবেন। তাদের কর্মকাণ্ডের কোনো কিছুই যেন আপনার নিকট গোপন না থাকে। এ কাজে আরব এবং স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে যারা বিশ্বস্ত, তাদের প্রেরণ করবেন। কারণ, মিথ্যাবাদীর সংবাদ আপনার কোনো উপকারে আসবে না, যদিও সে ভুলে সত্য বলে ফেলে। অসৎ লোকেরা আপনার গুপ্তচর হতে পারে না; বরং তারা আপনার বিরুদ্ধে কাজ করবে। শত্রুদলের খুব নিকটে পৌঁছে গেলে আপনি অগ্রগামী ও সহসা আক্রমণকারী দল প্রেরণ করবেন, যাতে তারা শত্রুর রসদ সরবরাহ লাইন কেটে দিতে পারে এবং তাদের দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করতে পারে। অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী ব্যক্তিদের এ কাজে নিযুক্ত করবেন এবং তাদের দ্রুতগামী ঘোড়া সরবরাহ করবেন। যদি তারা শত্রুর মোকাবেলা করে, তাহলে তাদের প্রথম আঘাতেই যেন শত্রুর অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে।'

এই গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ থেকে এটি পরিষ্কার যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেবল শত্রুদের বিরুদ্ধে গুপ্তচর প্রেরণ করার ব্যাপারেই সচেতন নন; বরং তিনি নিজেও গুপ্তচরের মাধ্যমে মুসলিম বাহিনীর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের খোঁজখবর রাখতেন। গভর্নর, সেনাপতি, সেনাদল—সকলের ব্যাপারেই তিনি গুপ্তচর নিয়োগ করেছিলেন। তিনি সঠিকভাবেই জানতেন, কী ঘটেছে বা কী ঘটতে যাচ্ছে। প্রতিটি বাহিনী এবং ঘাঁটিতে তার গুপ্তচর তাকে সংবাদ প্রেরণ করত।

উমাইর ইবনে সাদ আল-আনসারি খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট একটি অভিযোগ দায়ের করেন; তিনি সিরিয়ার এক দলের সঙ্গে মদীনায় এসে বলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমাদের এবং বাইজেন্টাইনদের মধ্যে আরবসুস নামে একটি শহর আছে। এর অধিবাসীরা মুসলমানদের সব দুর্বল দিক সম্পর্কে শত্রুকে অবহিত করে। কিন্তু তারা শত্রুদের সম্পর্কে আমাদের কোনো তথ্য দেয় না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেন, 'তুমি সেখানে ফিরে গিয়ে সবাইকে শহর ত্যাগ করার শর্তে একটি ভেড়ার পরিবর্তে দুটি ভেড়া, একটি উটের বিনিময়ে দুটি উট, সবকিছুতেই একটির বিনিময়ে দুটি দেওয়ার ঘোষণা দেবে। যদি তারা রাজি হয়, তাহলে তা তাদের দিয়ে শহর ত্যাগ করতে বলবে। তারপর শহরটি ধ্বংস করে দেবে। আর যদি প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে তাদের এক বছর সুযোগ দিয়ে শহর ধ্বংস করে দেবে।' উমাইর ইবনে সাদ আরবাসুসে ফিরে শহরবাসীকে ওই সুযোগ দেয়। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। সুতরাং তিনি তাদের এক বছর ছাড় দিয়ে পুরো শহর ধ্বংস করে দেন।

যুদ্ধে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপনে জায়গা নির্বাচন
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত লিপ্ত হতে নিষেধ করতেন যতক্ষণ না তিনি রণক্ষেত্রের অবস্থান ও প্রকৃতি সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞানার্জন করতে সক্ষম হবেন। এ ছাড়া পানির ব্যবস্থা, পশুচারণের জন্য সবুজ ভূমিসহ আরও নানাদিক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দিতেন। কাদিসিয়া যুদ্ধের পূর্বে তিনি তাকে নিজ ভূখণ্ডের কাছাকাছি অবস্থান করার জন্যও লিখে পাঠান। কারণ, এ এলাকা তাদের নিকট শত্রুদের থেকে বেশি পরিচিত। ফলে কোনো কারণে পিছু হটতে কিংবা নিজেদের বাঁচাতে চাইলে তা তাদের জন্য সহজ হবে। শত্রুরা তখন রাস্তা-ঘাট সম্পর্কে অনভিজ্ঞ থাকায় তাদের পিছু নিতে ভয় পাবে।

এতৎসঙ্গে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু, সালমান ফারসি রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হুযাইফা ইবনে ইয়ামান বাহিনীর আগে গিয়ে রণক্ষেত্র ও সৈনিকদের অবস্থানস্থল নির্বাচন করতে বলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড তার সেনাপতিদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন। আর সৈনিকদের জন্য ক্যাম্প স্থাপনের পূর্বে সেনাপতিদের নির্ধারিত স্থান পরিদর্শন করতে বলতেন এবং তা যেন কোনোভাবেই সুপ্রিম হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না করে। কারণ, হেডকোয়ার্টারের কাজই হলো রণকৌশল নির্ধারণ করা এবং সাহায্য-সৈন্য ও রসদপত্র সরবরাহ করা। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লেখেন : 'আপনার পরিদর্শনের আগে যেন তারা কোথাও ক্যাম্প না করে এবং আপনি তা পর্যবেক্ষণ করে দেখবেন সেটি উপযোগী কি না।'

সেনাবাহিনীর রসদপত্র সরবরাহ ও ঘোড়ার খাবারের ব্যবস্থা
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইরাকে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর রসদ হিসাবে মদীনা থেকে ছাগল ও উট পাঠাতেন। তা ছাড়া আন-নাক্বি ও আর-রাবাযাহ সরকারি পশুচারণ ভূমি থেকে জিহাদে ব্যবহৃত পশুদের জন্য ঘাস প্রেরণ করতেন। এ ছাড়া তিনি প্রত্যেক অঞ্চলে লোকজন থেকে অতিরিক্ত ঘোড়া সরকারি খাতে জমা করতেন এবং জিহাদের জন্য সেগুলো প্রস্তুত রাখতেন। কুফাতে এ রকম চার হাজার ঘোড়া ছিল। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রত্যেক মুসলিম প্রদেশে ঘোড়া সংরক্ষণ করা হতো। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন জেরুজালেমের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য সিরিয়া আগমন করেন, তখন সেখানে সৈন্যদের রসদ সরবরাহের নিমিত্তে একটি সাপ্লাই ডিপো নির্মাণ করেন। এর নাম ছিল আল-আহরা। আর সর্বপ্রথম আমর ইবনে আব্বাস এর দায়িত্ব লাভ করেন।

সৈনিকদের যুদ্ধে উৎসাহিত করা
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু উবাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে চিঠি লেখেন : বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আল্লাহর বান্দা উমর ইবনুল খাত্তাব থেকে মুসলিম বাহিনীর বিশ্বস্ত সেনাপতি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহর প্রতি। আসসালামু আলাইকুম। আমি প্রকাশ্যে ও গোপনে মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি এবং আমি আপনাকে আল্লাহর অবাধ্যতার ব্যাপারে সতর্ক করছি। আমি আপনাকে ওইসব ব্যক্তিদের মতো হওয়া থেকে সতর্ক করছি, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,

قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَ أَمْوَالُ اقْتَرَفْتُمُوْهَا وَ تِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَ مَسْكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللهِ وَ رَسُوْلِهِ وَ جِهَادٍ فِيْ سَبِيْلِهِ فَتَرَبَّصُوْا حَتّٰى يَأْتِيَ اللهُ بِأَمْرِهِ وَ اللهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفٰسِقِيْنَ ۝
বলো, ‘তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের সে সম্পদ, যা তোমরা অর্জন করেছ, আর সে ব্যবসা, যার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করছ এবং সে বাসস্থান, যা তোমরা পছন্দ করছ, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা করো আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।’

আল্লাহ খাতামুন নাবিয়্যিন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সেনাপতিদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা, যিনি সকল জগতের পালনকর্তা।

এই চিঠি পেয়ে আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু সকলের সামনে তা পড়ে শোনান এবং তারা বুঝতে পারেন যে, খলীফা তাঁদের জিহাদে উৎসাহিত করেছেন। সৈন্যদের মধ্যে এমন কেউ ছিলেন না, যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর চিঠি পড়ে অপ্রস্তুত হননি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইরাকে অবস্থানরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর সেনাবাহিনীকে চিঠি প্রেরণ করে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেন, তাঁদের অন্তরে ইসলামের মহান গুণাবলি ধারণ করতে বলেন এবং গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আমলে সেনাপতিদের প্রতিও একই নির্দেশ ছিল, যেন তারা সৈন্যদের জিহাদে উদ্বুদ্ধ করে।

জিহাদে আল্লাহর পুরস্কার ও শাহাদাতের মর্যাদা সম্পর্কে মনে করিয়ে দেওয়া
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে কাদিসিয়া যুদ্ধের পূর্বে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা, সৈন্যদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের আল্লাহর পুরস্কারের কথা মনে করিয়ে দেন এবং তিনি তাদের বলেন, আল্লাহ তাদের জন্য আখেরাতে যা প্রস্তুত করে রেখেছেন, তার বিবরণ দেন। তিনি তাদের যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেন। আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্যের যে ওয়াদা করেছেন এবং ইসলামের বিজয় দান করবেন—তাও মনে করিয়ে দেন। তিনি তাদের বলেন, শত্রুর সকল সম্পদ, গনীমত ও তাদের ভূমি শীঘ্রই মুসলমানদের করতলগত হবে এবং তিনি কারীদের জিহাদের সূরা (সূরা আনফাল) তিলাওয়াত করতে বলেন।

একই ভাবে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ায় তার সৈন্যদের উদ্দেশে জিহাদের ফযিলত তুলে ধরেন। তিনি আল্লাহর প্রতিশ্রুত পুরস্কার, রহমত ও বরকত কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি তাদের বলেন, দুনিয়া ও এর যাবতীয় সবকিছু থেকে জিহাদ উত্তম।

এটা খুব প্রসিদ্ধ যে, আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু ফিলিস্তিনে তার সৈন্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘(জিহাদে) যে কেউ নিহত হবে, শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবে। আর যারা বেঁচে থাকবে, তারা বরকতময় জীবন যাপন করার সুযোগ পাবে।’ তিনি তার সৈন্যদের কুরআন তিলাওয়াত এবং ধৈর্যধারণ ও দৃঢ়পদ থাকার আহ্বান করেন। আর তাদের আল্লাহর প্রতিশ্রুত পুরস্কার ও জান্নাত লাভে দুআ করতে উদ্বুদ্ধ করেন।

আল্লাহর হক আদায়ে সচেষ্ট হওয়া
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তার বাহিনীকে এই উপদেশবাণী লিখে পাঠান: ‘আমি আপনাকে এবং আপনার অধীন সব সৈন্যদের সব পরিস্থিতিতে আল্লাহকে ভয় করার আদেশ করছি। কারণ, শত্রুর বিরুদ্ধে আল্লাহর ভয়ই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। আমি আপনাকে এবং আপনার অধীন সব সৈন্যদের শত্রুকে এড়ানোর চেয়ে গোনাহকে বেশি এড়িয়ে চলার আদেশ করছি। কারণ, শত্রুর চেয়ে গোনাহকে বেশি ভয় করা উচিত। শত্রুর কুফরীই মুসলমানদের প্রতি আল্লাহর সাহায্যের মূল কারণ।'

ব্যবসা, চাষাবাদ ও এ-জাতীয় কাজ থেকে বিরত থাকা
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতিদের প্রতি এই ফরমান জারি করলেন, তারা তাদের অধীন সৈন্যদের মধ্যে ঘোষণা করবে যে, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তাদের বেতন-ভাতা এবং তাদের পরিবারের প্রতি রেশন চালু করা হয়েছে। সুতরাং কেউ যেন চাষাবাদের লিপ্ত হয়ে না যায়; যারা এটি মেনে চলেনি, তিনি তাদের শাস্তিও দিয়েছেন। কারণ, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চেয়েছিলেন, তার সৈন্যরা পরিপূর্ণভাবে জিহাদ ও ইসলাম প্রচার- প্রসারে মনোনিবেশ করবে। তারা চাষাবাদের কাজে মগ্ন হয়ে গেলে আসল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে। এভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন এক সেনাবাহিনী গঠন করতে সমর্থ হয়েছিলেন, যারা পুরোপুরিভাবে জিহাদের কাজেই মগ্ন ছিল এবং ডাক দেওয়ামাত্রই সাড়া দিতে সক্ষম ছিল। তিনি তাদের কঠোরভাবে ফলমূল সংগ্রহ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাষাবাদের কাজে জড়িত হতে নিষেধ করেছেন।

৪.৪। সীমান্ত রক্ষায় গুরুত্বারোপ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম এবং ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষায় খুবই গুরুত্বারোপ করতেন। ক্রমশই ইসলামী রাষ্ট্র বিস্তার লাভ করছিল। তিনি বাইজেন্টাইনদের সঙ্গে লড়াই করতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেন, 'আল্লাহর কসম, আমি সন্তুষ্ট হতাম, যদি আমাদের এবং তাদের মধ্যে যদি আগুনের একটি প্রাচীর থাকত—তাহলে প্রাচীরের এ পাশে যা কিছু সব আমাদের হতো এবং বিপরীত দিকের সবকিছু বাইজেন্টাইনদের দখলে থাকত।' তিনি পারসিকদের সঙ্গে মুসলমানদের সীমান্ত নিয়ে একই কথা বলেছেন : আমি চাই আস-সাওয়াদ এবং পাহাড়ের মধ্যে এমন একটি প্রাচীর হতো, যাতে আমরা তাদের কাছে যেতে পারতাম না এবং তারাও আমাদের নিকট পৌঁছতে পারতাম না। আস-সাওয়াদ পর্যন্ত ভূখণ্ড আমাদের জন্য যথেষ্ট। আর আমি গনীমতের সম্পদের চেয়ে মুসলমানদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।'

তিনি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করার নির্দেশ দেন। তাদের জন্য বিভিন্ন রকম কাজ বণ্টন করেন। আমরা ইতিপূর্বে এগুলোর কিছু উল্লেখ করেছি। এসব ঘাঁটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বা সেনা সদর দপ্তরের ভূমিকা পালন করবে। এগুলোর অবস্থান হবে ইসলামী রাষ্ট্র ও বিজিত দেশসমূহের সীমান্তের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে, যাতে যেকোনো বিদ্রোহ দ্রুত দমন করা যায় এবং ইসলামের প্রচার-প্রসারে সৈন্যসমাবেশের কেন্দ্র হিসাবেও ভূমিকা রাখতে পারে। এসব ঘাঁটির মধ্যে বসরা ও কুফার ঘাঁটি ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এ ঘাঁটি দুটির সীমানা পারসিক সাম্রাজ্য ও মিসরের আল- ফুসতাত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মিসর ও সিরিয়ার সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় কিছু ঘাঁটি নির্মাণ করা হয়েছিল, যাতে বাইজেন্টাইনদের সমুদ্র আক্রমণ প্রতিহত করা যায়।

পরবর্তী সময়ে তিনি চারটি ঘাঁটি স্থাপন করেন যেগুলো হিমসের বাহিনী, দামেস্ক বাহিনী, জর্ডান বাহিনী এবং ফিলিস্তিন বাহিনী হিসাবে পরিচিত ছিল। আর সৈন্যরা যে বাহিনীতে নিযুক্ত হতো, সে বাহিনীর নামেই পরিচিত হতো। বাহিনীর নাম তাদের নিজেদের নামের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হতো। ফলে সেনাপ্রধান চাইলে তাদের সঙ্গে পারস্পরিক বিষয়াদি আলোচনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন—যুদ্ধাবস্থায় ও সৈন্যদের বেতন বণ্টনের সময়।

এ ছাড়া শত্রুর পরিত্যক্ত ক্যাম্প ও দুর্গকেও মুসলমানগণ দখল করে সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তরিত করেন। সেখান পর্যাপ্ত সৈন্য মোতায়েন করা হতো এবং বিজিত অঞ্চলসমূহের সীমান্ত রক্ষায় প্রহরী প্রেরণ করা হতো।

মুসলিম বাহিনী শত্রু-এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার পরই সর্বোচ্চ দূরত্বে সীমান্ত নির্ধারণ করতেন এবং তা রক্ষায় সেখানে সামরিক চৌকি স্থাপন করতেন। এসব স্থাপনায় একজন যোগ্য কমান্ডারের অধীনে পর্যাপ্ত চৌকশ সেনা নিযুক্ত করা হতো।

সীমান্ত রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল, সীমান্ত বরাবর চেকপোস্ট স্থাপন। ইসলামী রাষ্ট্র ও পারসিক সাম্রাজ্যের সীমান্ত এলাকায় এ রকম অনেক চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছিল। ইয়াযদগিরদের নেতৃত্বে পারসিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে পুনরায় লড়াই করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করলে মুসান্না ইবনে হারিসা খলীফাকে তা অবহিত করেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বলেন, 'পারসিকদের ভূখণ্ড থেকে বের হয়ে আসো। তোমাদের ও তাদের সীমান্তে মরুদ্যানে এসে আশ্রয় নাও।' মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু তা-ই করেন।

কাদিসিয়া যুদ্ধের পূর্বে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে উপদেশ দেন : কাদিসিয়া পৌঁছে এর প্রান্তসীমায় সীমান্ত-চৌকি স্থাপন করবেন।' জালুলাতে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট লেখেন: আল্লাহ যদি দুটি বাহিনী—মাহরান বাহিনী ও আনতাক বাহিনীকে পরাজিত করেন, তাহলে কাকা ইবনে আমরকে মুসলিম বাহিনী নিয়ে হালওয়ানের সীমান্ত-চৌকির দিকে অগ্রসর হতে বলবেন যাতে শত্রুদের অগ্রগতি রোধ করা যায় এবং মুসলিম বাহিনীর ক্যাম্পে অবস্থান করুক অথবা টহলরত থাকুক—নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হয়।

এ জন্য ইরাকে মুসলিম বাহিনীর কমান্ডার সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সেনাদের পারস্যের দিকে অগ্রসর হতে উৎসাহিত করেন এবং তাদের বলেন, সীমান্ত এলাকা এবং গিরিপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং পশ্চাৎ দিক থেকে আক্রমণের ভয় নেই।

উল্লেখ্য, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আমলে সীমান্ত এলাকার চৌকিগুলো মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়কের নির্দেশক্রমেই স্থাপন করা হয়েছিল। তিনি তার সেনাপতিদের বলেছেন: পারসিকদের তোমাদের ভাইদের থেকে বিভ্রান্ত করো, তোমাদের উম্মত ও দেশকে রক্ষা করো এবং পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত পারস্য ও আহওয়াযের মধ্যবর্তী সীমান্তে প্রহরী নিযুক্ত করো।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আমলে কুফায় সীমান্ত-চৌকির সংখ্যা ছিল চারটি; হালওয়ান পোস্ট, যার সেনাপতি ছিলেন কাকা ইবনে আমর আত-তামিমি, মাসবাযান পোস্ট, যার সেনাপতি ছিলেন দিরার ইবনুল খাত্তাব আল-ফাহরি, কারকিসিয়া পোস্ট, যার সেনাপতি ছিলেন উমর ইবনে মালিক আজ-জুহরি এবং মুসল পোস্ট, যার সেনাপতি ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে মুতিম আবসি। প্রত্যেক সেনাপতির একজন ডেপুটি ছিল, যারা সেনাপতির অনুপস্থিতিতে চৌকির দায়িত্ব পালন করত।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মুসলিম বাহিনী যখনই কোনো সুরক্ষিত পোস্ট অথবা নতুন কোনো শহরের গোড়াপত্তন করেছে, প্রথম তারা সেখানে যে কাজটি করেছে, সেটি হলো মসজিদ নির্মাণ। কারণ, তখন মসজিদই সব কাজ-কর্মের কেন্দ্র ছিল; দাওয়াহ, তালীম এবং জিহাদ।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে সিরিয়ার একের পর এক শহর মুসলমানদের অধীনে আসতে থাকে। এ-সময় তিনি বাইজেন্টাইন ও সিরিয়ায় মুসলিম ফ্রন্টের মধ্যে সীমান্ত রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। এ জন্য তিনি অনেক রক্ষণাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন; পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ, সীমান্ত টহল দল গঠন, সীমান্ত-চৌকি স্থাপন এবং উপকূলবর্তী এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা ইত্যাদি। তিনি সিরিয়ার সম্পূর্ণ উপকূলবর্তী এলাকাকে একক সামরিক কমান্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন করেন। জেরুযালেমের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়া গমন করলে তিনি এসব সীমান্ত-চৌকির কয়েকটি পরিদর্শন করেন। তিনি প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থার উন্নতিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে যান। তারপর তিনি মদীনা ফিরে যান। তবে ফিরে যাওয়ার পূর্বে লোকজনের উদ্দেশে বলেন: আমাকে তোমাদের ওপর নিযুক্ত করা হয়েছে এবং আল্লাহ আমাকে তোমাদের জন্য যা কিছু করতে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি তা করেছি। ইনশাআল্লাহ আমরা তোমাদের মধ্যে ফাই সমভাবে বণ্টন করেছি। আমি তোমাদের জন্য সেনাদল নিযুক্ত করেছি এবং গনীমতের মালে তোমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে আমরা তোমাদের জীবনকে সহজ করে দিয়েছি।

আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার উত্তর সীমান্তে আনতাকিয়া বিজয় করেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে লেখেন : ‘একটি চৌকশ মুসলিম বাহিনী গঠন করে আনতাকিয়া রক্ষায় নিয়োজিত করবে এবং তাদের নিকট থেকে রসদ সরবরাহ অব্যাহত রাখবে।’ আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু হিমস এবং বালবেক থেকে কিছু সৈন্য বদলি করে আনতাকিয়ার সীমান্ত রক্ষায় নিয়োগ করেন। আর এ বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে হাবিব ইবনে মাসলামাহ আল-ফাহরিকে দায়িত্ব দেন। আর তিনি নিজে আনতাকিয়ার ঘাঁটিতে অবস্থান করে সীমান্তের বাইরে অভিযান পরিচালনায় মনোনিবেশ করেন। এখান থেকেই বাজেন্টাইনদের সঙ্গে যুদ্ধরত মুসলিম বাহিনীকে রসদ সরবরাহ করা হতো। এখান থেকেই জারযুমাহ এলাকা আক্রমণে সেনাদল প্রেরণ করা হয়। সেখানকার লোকজন মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে এবং তারা বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে সহযোগিতা, মুসলমানদের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি ও লিকাম পাহাড়ে সীমান্ত-চৌকি স্থাপনে রাজি হয়।

একই ভাবে আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বালিস-এর সীমান্ত-চৌকির দিকে অগ্রসর হন। তিনি সিরিয়ায় মুসলিম বাহিনীর আগমনের পর যারা মুসলমান হয়েছিল, তাদের মধ্য থেকে একদল যোদ্ধাকে বাছাই করেন। তাদের সুসংগঠিত করে বাইজেন্টাইন আক্রমণ থেকে সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত করেন।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের শেষ দিক এবং উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের শুরুতে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার উপকূলবর্তী এলাকায় প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। তিনি অনেকগুলো সুরক্ষিত দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন; আতারসুস, মারকিয়াহ, বালনিয়াস এবং বাইত সালিমাহ। সিরিয়ার উপকূলবর্তী এলাকায় বাইজেন্টাইনদের পরিত্যক্ত দুর্গগুলোও তিনি মেরামত করেন এবং সেখানে সৈন্যদের নিযুক্ত করেন। এসব সৈন্যদের জন্য জমিও বরাদ্দ দেন। উঁচু উঁচু পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করে পাহারাকে জোরদার করেন। প্রতিটি টাওয়ারেই একটি করে বেকন থাকত, যা দিয়ে নিকটস্থ লোকজনকে তথ্য সরবরাহ করা হতো, যতক্ষণ-না এটি শহরে ও অন্যান্য সামরিক পোস্টে পৌঁছে। এতে লোকজন দ্রুত শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সক্ষম হতো।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মিসর ও মুসলিম রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষায় অন্যান্য ফ্রন্টের মতোই প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। তিনি আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ফুসতাতে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের নির্দেশ দেন এবং এটিকে এ অঞ্চলের মুসলিম সেনাদের জন্য মিলনকেন্দ্রে পরিণত করেন। তিনি প্রতিটি গোত্রকে একজন সেনাপতির দায়িত্বে অর্পণ করেন। এটি ছিল উত্তর আফ্রিকা বিজয়ে মুসলমানদের প্রাথমিক প্রস্তুতি। এ ছাড়া মিসরে সামরিক অভিযান পরিচালনায় এটি ছিল অন্যতম ঘাঁটি, যেখান থেকে অন্যান্য অভিযানেও সাহায্য-সহযোগিতা করা হতো। এর অবস্থানগত কারণে এবং পূর্ববর্তী ঘাঁটিসমূহের অভিজ্ঞতার আলোকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর ও এ ঘাঁটির মধ্যবর্তী স্থানে কোনো লেক বা জলাশয় নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, যাতে যোগাযোগ-ব্যবস্থায় সমস্যা সৃষ্টি না হয়।

আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সৈন্যদের এ কথা মনে করিয়ে দিতেন যে, তাদের মিসরে অবস্থান মূলত ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষা। তিনি বলেন, 'মনে রেখো, কিয়ামত দিবস পর্যন্ত সীমান্ত রক্ষা করাই তোমাদের অন্যতম দায়িত্ব। কারণ, চারিদিকে শত্রুরা তোমাদের শেষ করে দেওয়ার জন্য ওত পেতে আছে এবং তারা এটি চাষাবাদ, সম্পদ ও অন্যান্য কল্যাণ লাভের আশায় দখল করে নিতে উদ্‌গ্রীব হয়ে আছে।' এ সময়ের মধ্যে মুসলিম বাহিনী শত্রুর পরিত্যক্ত যেসব দুর্গ ও অন্যান্য সামরিক চৌকি দখল করতে সমর্থ হয়েছিল, তারা সেগুলোর মেরামত ও উন্নতি সাধন করে এবং সেখানে সৈন্য নিয়োগ করে সীমান্ত পাহারা আরও জোরদার করে। মিসরের প্রথম সামরিক চৌকি ছিল আল-আরিশ।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মিসরের পুরো উপকূলবর্তী এলাকায় সামরিক চৌকি নির্মাণ করার নির্দেশ দেন। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ের পর সেখানে এক হাজার সশস্ত্র সেনাকে শহরের নিরাপত্তায় নিয়োগ করেন। তাদের এই সংখ্যা বাইজেন্টাইনদের নিকট অপ্রতুল মনে হয়। তারা সমুদ্র-পথে আক্রমণ করে অনেক সশস্ত্র মুজাহিদকে শহীদ করে এবং বাকিরা পালিয়ে যায়। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ফিরে এসে পুনরায় শহরটি দখল করেন এবং এবার তিনি তার বাহিনীর এক-চতুর্থাংশকে শহর রক্ষায় নিয়োজিত করেন। তিনি উপকূল এলাকা রক্ষায় আরেকটি সামরিক চৌকি স্থাপন করেন এবং সেখানে আরেক চতুর্থাংশ সৈন্য নিযুক্ত করেন। বাকি অর্ধেক সৈন্য নিয়ে তিনি ফুসতাতে অবস্থান করেন।

প্রতিবছরই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনা থেকে আলেকজান্দ্রিয়ায় যোদ্ধাদের প্রেরণ করতেন। তিনি সেখানকার গভর্নরদের বলতেন, তারা যেন শহরটিকে অবহেলা না করে এবং আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিয়োগকৃত সৈন্যদের সঙ্গে আরও অতিরিক্ত সৈন্য জমা করে।

এভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পরিকল্পনা অনুযায়ী ইরাক, সিরিয়া এবং মিসরে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষায় দৃঢ় প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হন। তার কার্যক্রম শুধু এই প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তিনি শীত ও গ্রীষ্মকালীন সামরিক মহড়ারও আয়োজন করেছিলেন। সৈন্যরা শীত ও গ্রীষ্মে ইসলামী রাষ্ট্রের সকল সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত টহল দিত। কিছু মহান সামরিক নেতা এসব মহড়ার দায়িত্ব পালন করতেন; আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু, মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু, নুমান ইবনে মুকরিন এবং আরও অনেকে।

দূরবর্তী অঞ্চলে সীমান্ত প্রহরায় নিযুক্ত থাকায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের জন্য বর্ধিত বেতন-ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন এবং তাদের জন্য জমিও বরাদ্দ দিয়েছিলেন। ওই অঞ্চলের সেনাপতিরা সীমান্তে নিয়োজিত সৈন্যদের গনীমতের অংশ দিতেন, যেমন তারা জিহাদের অংশগ্রহণকারী সৈন্যদের দিতেন। কারণ, এসব সীমান্ত-প্রহরীরা মুসলমানদের জন্য প্রতিরক্ষা ব্যূহ হিসাবে কাজ করত এবং ওই দিক থেকে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করত। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন মৃত্যুসজ্জায়, তখন তিনি পরবর্তী খলীফার উদ্দেশে পরামর্শ দেন: 'আমার পরে যিনি খলীফা হবেন, তার জন্য আমার একটি উপদেশ হচ্ছে, সীমান্ত-প্রহরীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করবেন; কারণ, তারা ইসলামের ঢালস্বরূপ; তারা অর্থ সংগ্রহ করে এবং শত্রুদের উত্ত্যক্ত করে। তাদের প্রাপ্য থেকে কোনো কিছুই হ্রাস করবেন না। তবে তাদের সম্মতিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ নেওয়া যেতে পারে।'

৪.৫। উমর রা. এবং রাজা-বাদশাদের মধ্যে সম্পর্ক
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং পারসিক সম্রাটের মধ্যে ছিল যুদ্ধের সম্পর্ক। তার মৃত্যুর পরও মুসলিম বাহিনী ইয়াযদগিরদকে নিজ ভূখণ্ডে ধাওয়া করছিল এবং তার সাম্রাজ্য ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। বাইজেন্টাইন সম্রাটের সঙ্গে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সম্পর্কের ব্যাপারে জানা যায় যে, এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তিচুক্তি ছিল, যা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক সিরিয়া ও আল-জাজিরা বিজয়ের পর শেষ হয়ে যায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং বাইজেন্টাইন সম্রাটের মধ্যে চিঠিপত্র লেনদেন হয়েছিল।

আরব ঐতিহাসিকদের মতে এই চিঠিপত্র আদান-প্রদান হিরাক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘটিত হয়েছিল। তবে তারা এটি হিরাক্লিয়াস-১ অথবা হিরাক্লিয়াস-২ এর সঙ্গে হয়েছিল, তা স্পষ্ট করে বলেননি। হিরাক্লিয়াস-১ এর নিকট থেকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছিলেন। আর হিরাক্লিয়াস-২ হিরাক্লিয়াস কন্সটান্টাইন নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ৬৪১ খ্রিষ্টাব্দে (২১ হি.) মৃত্যুবরণ করেন এবং তার ছেলে একই বছর তার স্থলাভিষিক্ত হন; উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের দুই বছর আগে।

যার সঙ্গেই চিঠি লেনদেন হোক না কেন, তাদের মধ্যে পত্রবাহকের আসা-যাওয়া ছিল। উম্মে কুলসুম বিনতে আলী ইবনে আবি তালিব, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী, একবার হিরাক্লিয়াসের স্ত্রীর নিকট একটি উপহার পাঠিয়েছিলেন। উক্ত উপহারটি বাইজেন্টাইন সম্রাটের পক্ষ থেকে আগত পত্রবাহকের মাধ্যমেই প্রেরণ করা হয়েছিল। আর বাইজেন্টাইন সম্রাটের স্ত্রীও এর বিনিময়ে মূল্যবান অলঙ্কারাদি উপহার হিসাবে পাঠিয়েছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেগুলো বাইতুল মালে জমা করে দিয়েছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর চিঠির সঙ্গে উম্মে কুলসুম উপহার প্রেরণ করেছিলেন বলে ইতিহাসের বইতে পাওয়া যায়।

৪.৬। উমর রা.-এর বিজয়ের প্রভাব
১। মুসলিম বাহিনী কর্তৃক পারসিক ও বাইজেন্টাইন রোমান সাম্রাজ্য সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ফলে এই দুই পরাশক্তির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অহেতুক সংঘর্ষের পরাসমাপ্তি ঘটে। এই দুই অঞ্চলের অধিবাসীরা অনবরত যুদ্ধে বিপর্যস্ত ও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। এসব সংঘর্ষে শাসকদের ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানো ছাড়া অন্য কোনো কারণ ছিল না।
২। এই অঞ্চলে একক নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটে, যার অবস্থান ছিল পৃথিবীর মধ্যস্থল এবং পূর্বদিকে চীনের সীমান্ত থেকে বর্ধিত হয়ে পশ্চিমে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত, দক্ষিণে আরব উপসাগর থেকে উত্তরে এশিয়া মাইনর পর্যন্ত। মানবজাতি এ রকম নেতৃত্ব ইতিপূর্বে আর দেখেনি। পুরো রাজ্যে একই আইন, সামাজিক ব্যবস্থা ও কৃষ্টি-কালচারের বিকাশ ঘটেছিল।
৩। ইসলামী রাষ্ট্রের সকল অধিবাসীরাই ঐশী ব্যবস্থার আওতায় বসবাস শুরু করে। এখানে সকলের ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা ছিল। সমাজের কালো, লাল, সাদা কিংবা হলুদ বর্ণের মানুষদের মধ্যে নীতি ও আদর্শে কোনো পার্থক্য ছিল না; বরং সবাই ছিল আল্লাহর আইনে সমান এবং শ্রেষ্ঠত্বে মাপকাঠি ছিল কেবল তাকওয়া-পরহেজগারী। আল্লাহর আইনের বাস্তব প্রয়োগ ও সুফল মানুষ অনুধাবন করতে পেরেছিল, যা তাদের নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব, বরকত ও অনিঃশেষ রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করেছিল।
৪। বিশ্বে এক নতুন উম্মতের আবির্ভাব ঘটে, যারা তাওহীদ ও আল্লাহর বিধানের অধীনে একত্র হয়েছিল। গোত্র, বংশ ও অন্যান্য জাগতিক বন্ধনের লেশমাত্র ছিল না। সকল গোত্র থেকেই এ উম্মতের নেতারা উচ্চমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল, যা থেকে তাদের অবনমিত করার কোনো সুযোগ ছিল না। এ জন্য তারা যাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতো, তাদের বলত : যদি তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো, তাহলে তোমাদের জীবন পরিচালনায় আল্লাহর কিতাব প্রদান করব এবং যদি তোমরা এর বিধি-বিধান মেনে চলো, তাহলে আমরা ফিরে যাব এবং তোমাদের দেশ তোমাদের কাছে ছেড়ে যাব।
৫। সেখানে একটি সুসংহত, ভারসাম্যপূর্ণ ও সুসাদৃশ্য সভ্যতার বিকাশ ঘটে। একই সীমানার ভেতর বিভিন্ন জাতি ও মানুষের বন্ধন গড়ে উঠেছিল এবং সবাই আল্লাহর আইনের অধীন ছিল। ঐশী শাসনব্যবস্থা ও নীতির আলোকে সকল মানুষকেই এই সভ্যতার অংশ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল—কালো, হলুদ কিংবা সাদা। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন তার সময়ের শ্রেষ্ঠ নেতৃত্বের অনির্বচনীয় দৃষ্টান্ত, যিনি তার মেধা ও প্রজ্ঞা, শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব, বিশ্বাস ও কর্মে ছিলেন পরবর্তীদের জন্য অনুসরণীয়। আদর্শ। তিনি তার রাষ্ট্রের সকল সম্পদ, তার সৈন্য, তার অনুসারী ও তার জ্ঞানকে আল্লাহর দ্বীন ও মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছিলেন, যাতে আল্লাহর কালামকে সুউচ্চ করা যায়, মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনা যায়, বস্তু ও ব্যক্তির পূজা থেকে এক আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন করা সম্ভব হয়। এভাবে তিনি আল্লাহর বাণীতে সত্যে পরিণত করেন :

الَّذِينَ إِنْ مَكَّنْهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلوةَ وَآتَوُا الزَّكٰوةَ وَ آمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ
আমি তাদের পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎ কাজের আদেশ করবে ও অসৎ কার্য হতে নিষেধ করবে। সকল কাজের শেষ পরিণাম (ও সিদ্ধান্ত) আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ।

ইসলামী বিজয়সমূহ ইসলামের অধীনেই একটি গৌরবময় মানবসভ্যতার জন্ম দিয়েছিল। সুতরাং আমরা অনুধাবন করতে পারি, ঐশ্বরিকভাবে পরিচালিত সভ্যতা এমন একটি জাতিসত্তার পরিচয় বহন করে, যারা ইসলামী জীবনব্যবস্থায় সমগ্র পৃথিবী ও মানবজাতির জন্য কল্যাণকর নেতৃত্বের ধারক ও বাহক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00