📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 মিসর ও লিবিয়া বিজয়

📄 মিসর ও লিবিয়া বিজয়


মিসরে সামরিক অভিযান পরিচালনায় মুসলমানদের যথেষ্ট কারণ ছিল। তারা ইসলামের বাণীকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। আর ফিলিস্তিনের পরেই ছিল মিসরের অবস্থান। এ জন্য এটা খুব স্বাভাবিক যে, মুসলমানগণ ফিলিস্তিন বিজয়ের পরেই তার সংলগ্ন এলাকা মিসরের দিকে দৃষ্টি দেবেন। সিরিয়া বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিম বাহিনী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে। তাদের মধ্যে সমুদ্র-পথ ছাড়া যোগাযোগের আর কোনো মাধ্যম ছিল না। মিসর এবং উত্তর আফ্রিকায় বাইজেন্টাইন সামরিক বাহিনী ও ঘাঁটি ছিল। আর তাদের ছিল শক্তিশালী নৌবাহিনী। মিসর বাইজেন্টাইনদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সিরিয়ায় মুসলমানগণ নিজেদের পরিপূর্ণভাবে নিরাপদ মনে করতে পারেনি। মিসর ছিল একটি ধনী দেশ, কন্সটেন্টিনোপলে খাদ্য সরবরাহের অন্যতম উৎস। মুসলমানগণ যদি মিসর বিজয় করতে সক্ষম হয়, তাহলে সিরিয়া ও হিজাযে তারা আরও বেশি নিরাপদ অনুভব করবে। আর নতুবা বাইজেন্টাইনদের জন্য মিসর ব্যবহার করে হিজাযে আক্রমণ পরিচালনা করা সহজ হয়ে উঠবে।

আরেকটি কারণ হলো, মিসরের আদি অধিবাসী কিবতিরা বাইজেন্টাইনদের শাসনে এক দুর্বিসহ জীবন কাটাচ্ছিল; তাদের কেবল সামরিক বাহিনীর সদস্য হিসাবে ঘাঁটি পাহারার কাজে নিয়োজিত রাখা হতো। সুতরাং এ সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক নয়, যেখানে তাদের কাছে ইতিমধ্যে মুসলমানদের ন্যায়পরায়ণতার কথা পৌঁছে গিয়েছে। আর বাইজেন্টাইন সৈন্যদের অন্তরও ভয়ে প্রকম্পিত হয়ে আছে। তারা তাদের সম্রাটকে দেখেছে সিরিয়া ছেড়ে পালিয়ে যেতে, যা মুসলমানদের দখলে চলে গেছে।

আমর ইবনুল আস এ সবই খুব গভীরভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হলেন। তিনি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে, মিসরবাসী মুসলমানদের আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হবে না। কিন্তু যদি মিসর মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে সেটি এ অঞ্চলের জন্য হুমকি হিসাবে থেকে যাবে। এটিই আমর ইবনুল আস বর্ণনা করেছেন। পাশাপাশি আরও অনেক বর্ণনা রয়েছে। অনেকে বলেছেন মিসর বিজয়ে সর্বপ্রথম আমর ইবনুল আস অথবা খলীফা নিজেই চিন্তা করেছিলেন। আর খলীফার সিদ্ধান্তে আমর ইবনুল আসের কোনো ভূমিকা ছিল না অথবা আমর ইবনুল আসের চাপে পড়ে খলীফা এ অভিযানে রাজি হয়েছিলেন। এসব ভিন্নতা সত্ত্বেও মিসর অভিযান কেবল আমর ইবনুল আসের চিন্তাপ্রসূত পরিকল্পনা ছিল না, যা খলীফা অনুমোদন দেননি, অথবা মিসরের পরিপূর্ণ প্রেক্ষাপট, ভৌগোলিক চিত্র ও শত্রুসৈন্যের পরিসংখ্যান তাদের নিকট ছিল না। আমি যা বলেছি তা ঐতিহাসিকভাবে সত্য। ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, সিরিয়া বিজয়ের পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আমর ইবনুল আসের নিকট প্রেরিত চিঠিতে লেখেন: আপনি লোকদের মিসরের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করুন এবং যে কেউ যেতে ইচ্ছুক, তাকে সঙ্গে নিন। আত-তাবারি বলেন, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আলিয়ায় কিছুদিন অবস্থান করেন। তিনি সেখানকার জনগণের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করার পর শহরে প্রবেশ করেন। তারপর তিনি আমর ইবনুল আসকে মিসরে প্রেরণ করেন এবং যদি আল্লাহ তার হাতে মিসরের বিজয় দান করেন, তাহলে তাকেই সেখানকার গভর্নর হতে বলেন। তারপর তিনি যুবায়ের ইবনে আওয়ামকে সাহায্য-সৈন্যসহ তার নিকট প্রেরণ করেন। এ থেকেই এ তথ্যের সত্যতা প্রমাণিত হয় যে, সাহায্য-সৈন্য মিলিত হওয়ার পর মিসরে মুসলিম বাহিনীর সৈন্য-সংখ্যা বারো হাজারে পৌঁছায়। তিনি তাকে আলেকজান্দ্রিয়া বিজয় করারও নির্দেশ দেন এবং এতে কোনো দ্বিমত নেই।

খলীফার অনুমোদন ছাড়া আমর ইবনুল আসের পক্ষে মিসরের অভ্যন্তরে অভিযান পরিচালনা করা কি সম্ভব? আমরা জানি, সাধারণ মুসলমান অথবা সেনাপতি—সবাই ছিলেন চরম অনুগত এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ। সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, মিসর অভিযান ছিল খলীফা ও তার সেনাপতিদের যৌথ পরিকল্পনা; এটি সময়ের স্রোতে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না।

২.১। মিসরে ইসলামের বিজয়
রোমানদের প্রসিদ্ধ অঞ্চলসমূহ বিজয়ের ক্ষেত্রে মিসর বিজয়কে তৃতীয় ধাপ হিসাবে ধরা হয়। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সমুদ্রের সমান্তরাল পথ ধরে ফিলিস্তিন থেকে মিসর অভিমুখে রওনা হন। তিনি রাফাহ থেকে প্রথমে আরিস হয়ে ফারমা (পেলুসিয়াম) পৌঁছেন। তারপর তিনি কায়রো হয়ে আলেকজান্দ্রিয়ায় যান। এখান থেকে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সামরিক অভিজ্ঞতার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি এমন এক পথ অনুসরণ করেন যেখানে বাইজেন্টাইনদের শক্তিশালী কোনো সামরিক ঘাঁটি না থাকারই সম্ভাবনা ছিল যেমনটি সিরিয়ায় ছিল; অথবা এ পথের ব্যাপারে তিনি সম্যক জ্ঞান রাখতেন। বিজয়ের ধাপগুলো পর্যায়ক্রমে নিচে বর্ণনা করা হলো।

২.১.১। ফারমা বিজয়
আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন এবং ফারমা এলাকায় পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত তিনি কোনো বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীর দেখা পাননি। তিনি যে এলাকাই অতিক্রম করেছেন, সেখানকার জনগণ তার সঙ্গে স্বপ্রণোদিত হয়ে দেখা করেছে এবং তাকে স্বাগত জানিয়েছে। ফারমায় পৌঁছার পরই মুসলিম বাহিনী প্রথম রোমান সেনাদের মুখোমুখি হয়। বাইজেন্টাইন বাহিনী শহরে নিজেদের অবস্থান মজবুত করে। তারা মুসলমানদের প্রতিহত করা এবং শহর রক্ষায় নিজেদের সামর্থ্যের ব্যাপারে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী ছিল। তাদের মনে এ আত্মবিশ্বাস আরও দৃঢ় হয় যখন তারা জানতে পারে মুসলমানদের সৈন্য-সংখ্যা তাদের তুলনায় অনেক কম, অস্ত্রশস্ত্র অপর্যাপ্ত এবং অবরোধ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেরও অভাব রয়েছে। অন্যদিকে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শত্রুদের সৈন্য-সংখ্যা ও তাদের পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিলেন। বাইজেন্টাইন সৈন্য-সংখ্যা ছিল মুসলমানদের তুলনায় অনেক বেশি। তার নিকট ফারমা বিজয়ের দুটি উপায় ছিল: হয় সরাসরি আক্রমণ ও গেইট উন্মুক্তকরণ অথবা অবরোধ অব্যাহত রেখে ধৈর্য ধারণ করা, যতক্ষণ-না ক্ষুধার তাড়নায় তারা বাইরে বেরিয়ে আসে। সুতরাং মুসলিম বাহিনী ফারমা শহর অবরোধ করল এবং বাইজেন্টাইনদের জেদও বাড়তে লাগল। কয়েক মাস পর্যন্ত অবরোধ অব্যাহত থাকল। এর মধ্যে বাইজেন্টাইনদের কিছু সেনাদল মুসলমানদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় যুদ্ধ করার জন্য বাইরে বেরিয়ে আসে, তবে মুসলিম বাহিনী তাদের সকলকে হত্যা করে ফেলে।

আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলমানদের আবেগময় ভাষণ দিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। তিনি বলেন, 'হে ইসলাম ও ঈমানের ঝান্ডাবহনকারী, হে কুরআনের বাহক, হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবায়ে কেরাম! ধৈর্যধারণ করুন এবং দৃঢ়পদ থাকুন; পেছনে সরে আসবেন না। বর্শা আরও ধারালো করুন এবং বর্মে নিজেকে রক্ষা করুন এবং আল্লাহর স্মরণে অবিচল থাকুন। আমার নির্দেশ ছাড়া কোনো কিছু করার চেষ্টা করবেন না।'

একদিন একদল বাইজেন্টাইন সৈন্য মুসলমানদের ধাওয়া করতে বের হয় এবং মুসলিম বাহিনী তাদের পরাজিত করে। বাইজেন্টাইনরা তখন শহরের দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু মুসলমানদের গতি ছিল তাদের চেয়ে বেশি। তারা দ্রুত গিয়ে গেইটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। আসমিকা প্রথম মুজাহিদ হিসাবে শহরে প্রবেশ করে এবং এটি ছিল স্পষ্ট বিজয়। এটি বলা আবশ্যক যে, মিসরীয় কিবতিরা মুসলমানদের সাহায্য করে এবং রোমানদের দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে দেয়। তারা আতমিদায় মুসলমানদের স্বাগত জানায়। ফারমায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে মুসলিম বাহিনী শহরের দেয়াল ও দুর্গগুলো ভেঙে দেয়। কারণ, আল্লাহ না করুন, যদি কোনো কারণে বাইজেন্টাইনরা আবার এ শহরে জমা হয়, তাহলে এসব যেন তাদের কোনো কাজে না লাগে। তারপর আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সৈন্যদের উদ্দেশে বলেন :

হে লোকসকল, আল্লাহর জন্য সকল প্রশংসা, যিনি আমাদের বিজয় দান করেছেন। আল্লাহ অতি মহান, তিনি আমাদের ইসলাম দিয়ে সম্মানিত করেছেন। কিন্তু সতর্ক থাকুন, এ কথা মনে করবেন না যে, আমরা যা চেয়েছি, তার সবই অর্জন করে ফেলেছি। এ বিজয় যেন আপনাদের প্রসন্ন না করে তোলে। আমাদের সামনে এখনো বিস্তর বন্ধুর পথ এবং খলীফা যে লক্ষ্যে আমাদের প্রেরণ করেছেন, সেটি সম্পন্ন করতে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আপনাদের ধৈর্যধারণ করতে হবে এবং সেনাপতিদের নির্দেশ মেনে চলতে হবে। এখানকার লোকজনকে বুঝতে দিতে হবে যে, আমরা শান্তিকামী সেনা। সুতরাং আমাদের দ্বারা যেন কোনো অন্যায় না হয়; বরং আমরা অন্যায় প্রতিরোধ করব এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করব।

আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিশ্চিত হলেন যে, আশ্রয় গ্রহণকারীদের জন্য এই শহর আর নিরাপদ নয়। তিনি এ যুদ্ধে কী হারিয়েছেন, তার হিসেব- নিকেশ করলেন। যখন দেখলেন যে, এমন কিছু মুজাহিদ এ যুদ্ধে শহীদ হয়ে গিয়েছেন, যারা মিসর বিজয়ে খুব আগ্রহী ছিলেন। তারা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছার আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি আশঙ্কা করলেন, এভাবে যদি একের পর এক লড়াই অব্যাহত থাকে, তাহলে তিনি তার লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হবেন না। তবে যাদের তিনি হারিয়েছেন, আল্লাহ তা'আলা তাকে তাদের পরিবর্তে নতুন মুজাহিদ দান করেন। জাবাল আল-হিলালে বসবাসরত আরব গোত্র রাশিদা ও লাখম থেকে অনেক মুজাহিদ তার বাহিনীতে যোগদান করে। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বাহিনী নিয়ে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। বাইজেন্টাইনদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই তিনি আল- কাওয়াসিরে পৌঁছেন। সেখান থেকে দক্ষিণে যাত্রা করে ওয়াদি আত- তামবালানে এসে তাঁবু গাড়েন। এটি ছিল আত-তেল আল-কাবিরের নিকটবর্তী এলাকা। তারপর তিনি দক্ষিণ দিকেই অগ্রসর হতে থাকেন এবং বালবিসে এসে পৌঁছেন। আন-নুযুম আয-যাহিরাহ কিতাবের লেখক বলেন, 'আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বালবিসে পৌঁছা পর্যন্ত খুব কমই প্রতিরোধের সম্মুখীন হন।'

২.১.২। বালবিস বিজয়
বালবিসে বাইজেন্টাইনরা বিশাল বাহিনী নিয়ে আবির্ভূত হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল, আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ব্যবলিয়নের দিকে সুরক্ষিত দুর্গের দিকে অগ্রসর হতে বাধা দেওয়া এবং তাদের যুদ্ধ করতে বাধ্য করা। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের বললেন, 'যুদ্ধের জন্য তাড়াহুড়া কোরো না। আগে আমাদের বক্তব্য শোনো। আবু মারইয়াম ও আবু মিরইয়ামকে আমাদের নিকট পাঠাও।' তখন তারা যুদ্ধ করার ইচ্ছা থেকে বিরত হয় এবং ওই দুজন মুসলমানদের সেনাপতির সঙ্গে দেখা করার জন্য যায়। তিনি তাদের ইসলামের দিকে আহ্বান করেন, অথবা জিযিয়া দিতে বলেন। আরও বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে গিয়েছেন, ইসমাইল আ.-এর মা হাজেরা আ.-এর জন্য মিসরের জনগণের সঙ্গে সদাচরণ করবে। সহীহ মুসলিমে রয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِنَّكُمْ سَتَفْتَحُونَ مِصْرَ وَهِيَ أَرْضٌ يُسَمَّى فِيهَا الْقِيرَاطُ فَإِذَا فَتَحْتُمُوهَا فَأَحْسِنُوا إِلَى أَهْلِهَا فَإِنَّ لَهُمْ ذِمَّةً وَرَحِمًا " . أَوْ قَالَ " ذِمَّةً وَصِهْرًا
তোমরা শীঘ্রই মিসর বিজয় করবে যেখানে কিরাত প্রচলন করবে। যখন তোমরা তা বিজয় করবে তখন সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করবে। কারণ, তোমাদের ওপর তাদের অধিকার রয়েছে এবং তারা তোমাদের আত্মীয়ও। অথবা তিনি বলেছেন, তোমাদের ওপর তাদের অধিকার রয়েছে এবং তারা তোমাদের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়ও।

তারা বলল, 'এটি খুব দূরবর্তী আত্মীয়তা; নবী ছাড়া অন্য কেউই এই আত্মীয়তার বন্ধনে সাড়া দেবে না। আমরা ফিরে আসা পর্যন্ত আমাদের নিরাপত্তা দিন।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমার মতো লোক কখনো ধোঁকা দেবে না। আমি তোমাদের তিন দিন সময় দিলাম।' তারা বলল, 'আমাদের আরও সময় দিন।' তখন তিনি তাদের আরও এক দিন সময় বাড়িয়ে দিলেন। তারা মিসরের শাসনকর্তা আল-মুকাওকিস এবং বাইজেন্টাইন গভর্নর আরতাবুনের নিকট গিয়ে মুসলমানদের অভিপ্রায় জানায়। আরতাবুন মুসলমানদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং যুদ্ধের জন্য তাগিদ দেয়। মুসলিম বাহিনী তাদের পরাজিত করে এবং আলেকজান্দ্রিয়া পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যায়। উল্লেখ্য, এ ঘটনায় মুসলমানদের মহান চরিত্র ও দুঃসাহসিকতা ফুটে ওঠে। আল্লাহ তা'আলা বালবিসে মুসলমানদের বিজয় দান করলে তারা আল-মুকাওকিসের কন্যা আরমানুসাহকে বন্দী করে। তিনি তার পিতার কাছেই ছিলেন। রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল, যা তিনি পছন্দ করেননি। এ বিয়ে এড়ানোর জন্য তিনি তার দাসী বারবারার সঙ্গে বালবিস ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। যখন কয়েকজন মুসলমান আরমানুসাহকে বন্দী করতে সক্ষম হয়, তখন আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবীদের জমা করে আল্লাহর বাণী স্মরণ করিয়ে দেন :

هَلْ جَزَاءُ الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ
সৎকাজের প্রতিদান উত্তম পুরস্কার ব্যতীত কী হতে পারে?

তারপর তিনি বলেন, 'আল-মুকাওকিস রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট উপহার প্রেরণ করেছিলেন; আমার মনে হয়, তার কন্যাসহ যাদের আমরা বন্দী করেছি এবং তাদের যত সম্পদ আমরা অধিগ্রহণ করেছি, সবই তার নিকট আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।' সাহাবায়ে কেরাম এতে রাজি হন। সুতরাং আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আরমানুসাহকে তার দাস-দাসী ও অলংকারাদিসহ সম্মানের সঙ্গে তার পিতার নিকট প্রেরণ করেন। তার দাসী বারবারা ফিরে যাওয়ার সময় আরমানুসাহকে বলল, 'হে আমার মনিব, আরবরা আমদের চারিদিকে ঘিরে ফেলেছে।' আরমানুসাহ জবাবে বলল, 'আরবদের তাঁবুতেই আমি আমার সম্মান ও ইয্যত বেশি নিরাপদ মনে করি। তবে আমি আমার পিতার প্রাসাদে তা নিরাপদ মনে করি না।' যখন তিনি তার পিতার নিকট ফিরে গেলেন, তিনি তার কন্যার সঙ্গে মুসলমানদের শিষ্টাচারপূর্ণ আচরণে খুব সন্তোষ প্রকাশ করলেন।

২.১.৩। উম্মে দানিনের যুদ্ধ
ইবনে আব্দুল হাকিম বর্ণনা করেন, আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বাহিনী নিয়ে প্রায় এক মাস যুদ্ধ করে বালবিস বিজয় করেন। তারপর তিনি উম্মে দানিনের দিকে অগ্রসর হন। জায়গাটি মুকাসসাস নামেও পরিচিত। এটি নীল নদের তীরে অবস্থিত। এ এলাকায় মুসলিম বাহিনী কঠিন যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফার নিকট সাহায্য-সৈন্য চেয়ে পাঠান। খলীফা তার সাহায্যার্থে চার হাজার সৈন্য প্রেরণ করেন। আর প্রতি এক হাজারের জন্য এমন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেন, যারা এক হাজার লোকেরই সমকক্ষ ছিল। তারা হলেন যুবায়ের ইবনে আওয়াম, মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ, উবাদা ইবনে সামিত এবং মাসলামাহ ইবনে মুখাল্লাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু (অন্য এক বর্ণনামতে চতুর্থ জন ছিলেন খারিযা ইবনে হুযাফা রাযিয়াল্লাহু আনহু)। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার নিকট প্রেরিত চিঠিতে বলেন: মনে রেখো, তোমার সঙ্গে বারো হাজার সৈন্য রয়েছে। আর বারো হাজার সৈন্য কখনো স্বল্পতার অজুহাতে পরাজিত হতে পারে না। বাইজেন্টাইনরা মিসরীয়দের সঙ্গে নিয়ে মুসলমানদের মোকাবিলায় বের হয়ে আসে। এ যুদ্ধে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সামরিক অভিজ্ঞতাকে সুনিপুণভাবে কাজে লাগান, যেমনটি কাজে লাগিয়েছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ইরাক যুদ্ধে। তিনি তার বাহিনীকে তিনটি দলে বিভক্ত করেন; এক দলকে শত্রুর জন্য আল-জাবাল আল-আহমারে এবং আরেক দলকে উম্মে দানিনের নিকটে নীল নদের তীরে অপেক্ষায় রাখেন। বাকি এক দল শত্রুর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। যখন উভয় পক্ষে ভীষণ যুদ্ধ শুরু হয়, তখন আলজাবাল আল-আহমারে অপেক্ষারত দলটি রণক্ষেত্রে আবির্ভূত হয়ে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুসলিম বাহিনী শত্রুর লাইন ভেঙে ফেলে এবং শত্রুরা উম্মে দানিনের দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। সেখানে গিয়ে তারা মুসলমানদের আরেকদলের মুখোমুখি হয় যারা পূর্ব থেকেই সেখানে শত্রুর প্রতীক্ষায় ছিল। এভাবে তারা মুসলমানদের তিন দলের হাতে অসহায় অবস্থায় দেখতে পায় এবং অনিবার্যভাবে তারা পরাজয় বরণ করে। শত্রুবাহিনী সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং কিছু শত্রুসেনা পালিয়ে ব্যবলিয়নে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এভাবে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে এবং আল্লাহ তা'আলা তার বিশেষ অনুগ্রহে মুসলমানদের শত্রুর অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন। আর এটি সম্ভব হয়েছিল মুসলমানদের সেনাপতির বিস্ময়কর সামরিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কারণে; যা শত্রুকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

২.১.৪। ব্যবলিয়ন দুর্গের যুদ্ধ
আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বাহিনী নিয়ে ব্যবলিয়ন দুর্গের দিকে অগ্রসর হন এবং তা অবরোধ করেন। অবরোেধ সাত মাস ধরে অব্যাহত থাকে। এ সময়ের মধ্যে মুকাওকিস সমঝোতার জন্য আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট দূত প্রেরণ করে। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পরিষ্কারভাবে তাদের বলেন, হয় মুসলমান হয়ে যাও, অথবা জিযিয়া প্রদান করতে সম্মত হও, আর নতুবা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। মুকাওকিস জিযিয়া প্রদান করতে সম্মত হয় এবং বাইজেন্টাইন সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট তা করার অনুমতি প্রার্থনা করে। কিন্তু হিরাক্লিয়াস এর অনুমোদন দিতে অস্বীকার করেন; বরং তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তীব্রভাবে তিরস্কার করে তাকে কন্সটান্টিনোপলে ডেকে পাঠান। তারপর তাকে দেশান্তরিত করেন। ব্যবলিয়ন দুর্গ জয়ে দেরি হওয়াতে যুবায়ের ইবনে আওয়াম রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি আল্লাহর জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে যাচ্ছি এবং আমি আশা করি, এতে আল্লাহ মুসলমানদের বিজয় দান করবেন।' আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু ব্যবলিয়ন দুর্গ অবরোধ করে রেখেছিলেন। তারপর তারা রাতে দুর্গের দেয়াল বেয়ে ওপরে ওঠেন এবং শত্রুসেনাদের সঙ্গে এক ভয়াবহ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। প্রথম যিনি দেয়াল বেয়ে উপরে উঠেছিলেন, তিনি হলেন যুবায়ের ইবনে আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বার্ড মার্কেটের নিকটস্থ দেয়ালে সিঁড়ি লাগিয়ে উপরে ওঠেন। তিনি সঙ্গীদের বলেন, “আমি তাকবীর-ধ্বনি দিলে তোমরা দুর্গে ঢোকার চেষ্টা করবে।” সুতরাং যখনই যুবায়ের ইবনে আওয়াম তরবারি হাতে নিয়ে দুর্গের দেয়ালে উঠে তাকবীর-ধ্বনি দিলেন, তখন দুর্গের বাইরে থাকা মুসলমানরাও তাকবীর-ধ্বনি দিয়ে উঠল। দুর্গের ভেতরে থাকা শত্রুসেনারা এতো ভয় পেয়ে গেল এবং তারা ধরে নিল যে, মুসলমানরা দুর্গ দখল করে নিয়েছে। সুতরাং তারা পলায়ন করল। যুবায়ের ইবনে আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহু সঙ্গীদের নিয়ে দুর্গের গেইট খুলে দিলেন। আর সঙ্গে মুসলিম বাহিনী দুর্গে প্রবেশ করে পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তবে আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু দুর্গের অধিবাসীদের এই শর্তে নিরাপত্তা দিলেন যে, বাইজেন্টাইন সেনাদের কয়েকদিনের খাবার নিয়ে বের হয়ে যেতে হবে; আর ব্যাবিলন দুর্গের যাবতীয় সম্পদ ও যুদ্ধাস্ত্র মুসলমানদের গনীমত হিসাবে থাকবে। তারপর আবু আব্দুল্লাহ দুর্গের টাওয়ার ও দেয়াল ধ্বংস করে দেন।

২.২। আলেক্সজান্দ্রিয়া বিজয়
আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং তার বাহিনী ব্যাবিলন দুর্গে কয়েক মাস অবস্থান করেন। এতে সৈন্যদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ হয়। এদিকে আলেক্সজান্দ্রিয়া অভিযানে খলীফার অনুমতিরও অপেক্ষায় থাকেন। অনুমতি লাভ করার পর আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ব্যাবিলন দুর্গে একটি শক্তিশালী মুসলিম বাহিনী রেখে বাকিদের নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তিনি ব্যাবিলন থেকে ৬৪১ সালের মে মাসে (জমাদাল আখেরাহ, ২১ হিজরী) আলেক্সজান্দ্রিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। তার সঙ্গে অনেক মিসরীয় নেতৃবৃন্দও যোগ দেয়, যারা মুসলিম বাহিনীকে নিজেদের স্বার্থে সাহায্য করা অপরিহার্য মনে করেছি। তারা মুসলমানদের সুবিধার্থে রাস্তা-ঘাট, সেতু, বাজার-হাট ইত্যাদি মেরামত করে দেয়। বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের লক্ষ্য অর্জনে মিসরীয়রা আনসারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু নীল নদের বাম দিক দিয়ে অগ্রসর হতে থাকেন। বর্তমানে বুহাইরা প্রদেশ এদিকেই অবস্থিত। তা ছাড়া মরুভূমির বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘোড়া ও সৈন্যদের অবাধ বিচরণের সুযোগ করে দেয় এবং বাইজেন্টাইনদের সামরিক ঘাঁটি ও বাধা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন। তিনি যদি নীল নদের ব-দ্বীপ অঞ্চল দিয়ে অগ্রসর হতেন, তাহলে তার গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। মারফুত অথবা আত-তারানায় (ঐতিহাসিকগণ জায়গাটির এর নামই বলে থাকেন) সামান্য প্রতিবন্ধকতা ছাড়া তিনি তেমন কোনো বাধার সম্মুখীন হননি।

তারপর তিনি নীল নদ অতিক্রম করে এর পূর্বদিকে অবস্থিত প্রাচীর-ঘেরা নুকয়ূস শহরে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, এখানে একটি শক্তিশালী দুর্গ রয়েছে, যা পেছনে রেখে সামনে অগ্রসর হলে বিপদের আশঙ্কা ছিল। তবে রোমানরা দুর্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিবর্তে তারা নৌকা নিয়ে মুসলমানদের শহরে প্রবেশে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা মুসলমানদের প্রতি তির ছুড়ে মারে, যাতে তারা নদীর কাছাকাছি না আসতে পারে। কিন্তু তাদের প্রচেষ্ট ব্যর্থ হয় এবং নৌকা নিয়ে আলেকজান্দ্রিয়ার দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। আর যারা দুর্গে অবস্থান করছিল, তারা দ্রুত মুসলমানদের নিকট আত্মসমর্পণ করে। মুসলমানগণ বিজয়ীর বেশে তাদের শহরে প্রবেশ করে। তারা সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করে এবং নিজেদের আক্রমণ-পরিকল্পনা গুছিয়ে নেয়। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার এক সেনাপতি শারিক ইবনে সামিইকে পলায়নরত বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে ধাওয়া করতে পাঠান। তিনি যখন তাদের নাগাল পান, তখন তার সঙ্গে মুসলিম সৈন্যের সংখ্যা বেশি ছিল না। বাইজেন্টাইনরা এতে আশান্বিত হয়ে ওঠে এবং তাকে ঘিরে ফেলে। শারিক তখন এক পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেন এবং আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট সাহায্য-সৈন্য চেয়ে পাঠান। বাইজেন্টাইনরা যখন বুঝতে পারে মুসলমানদের সাহায্যে আরও অনেক সৈন্য এগিয়ে আসছে, তখন তারা পালিয়ে যায়।

দামানহুর থেকে ছয় মাইল দক্ষিণে সুলতাইস এলাকায় আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবার বাইজেন্টাইনদের মুখোমুখি হন। উভয়পক্ষে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং এতে শত্রুরা পরাজিত হয়ে পলায়ন করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বাইজেন্টাইনদের বিশাল এক বাহিনীর মোকাবিলা করে, যেখানে তাদের সৈন্যসংখ্যা ও সমরাস্ত্রের মজুদ ছিল খুবই নগণ্য। কয়েকজন ধরে এ যুদ্ধ চলতে থাকে। ঐতিহাসিকগণ এ যুদ্ধের ব্যাপারে কয়েক লাইন ব্যতীত তেমন কিছুই লিপিবদ্ধ করেননি, অথচ কাদিসিয়্যা, ইয়ারমুক ও নাহাওয়ান্দ যুদ্ধের ব্যাপারে শত শত পৃষ্ঠা লিখে গিয়েছেন। এ রকম আরেকটি যুদ্ধ, কিরন যুদ্ধ, সম্পর্কেও আরব ঐতিহাসিকগণ সঠিকভাবে বর্ণনা করেননি, যা ব্যবলিয়ন থেকে আলেকজান্দ্রিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত দুর্গের সর্বশেষ ঘাঁটি ছিল। বাইজেন্টাইন সেনাপতি থিওডোর নিজে সেই দুর্গে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং উভয়পক্ষের মধ্যে দশ দিন ধরে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতৎসত্ত্বেও ইবনে আব্দুল হাকিম এই যুদ্ধ সম্পর্কে কয়েক লাইন ব্যতীত আর তেমন কিছুই লিখে যাননি : মুসলমানগণ কিরনে বাইজেন্টাইনদের মুখোমুখি হয় এবং তারা সেখানে দশ দিন ধরে লড়াই করে। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর সম্মুখে থেকে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন এবং ওয়ারদান (আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আযাদকৃত গোলাম) মুসলিম বাহিনীর পতাকা বহন করেন। তারপর আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেদিন সালাতে খাওফ আদায় করেন এবং আল্লাহ মুসলমানদের বিজয় দান করেন। ওই সময় মুসলিম বাহিনী শত্রুদের অনেককে হত্যা করে এবং তাদের আলেকজান্দ্রিয়া পর্যন্ত ধাওয়া করে নিয়ে যায়। এ যুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর এবং ওয়ারদানের অনেক বীরত্বের বর্ণনা পাওয়া যায়।

মুসলমানদের হাতে পতনের সময় আলেকজান্দ্রিয়া ছিল মিসরের রাজধানী এবং কন্সটান্টিনোপলের পরে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর; এটি তখন সারা দুনিয়ার মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক শহর হিসাবেও প্রসিদ্ধ ছিল। বাইজেন্টাইনরা জানত মুসলমানরা যদি এই শহর দখল করে নেয়, তাহলে এটি হবে তাদের জন্য চরম আঘাত। এ জন্য এ শহরের নিরাপত্তার ব্যাপারে তারা খুবই সতর্ক ছিল। হিরাক্লিয়াস বলেন, 'মুসলিম বাহিনী যদি আলেকজান্দ্রিয়া দখল করে নেয়, তাহলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠবে।'

ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্তে এ কথা পাওয়া যায় যে, আলেকজান্দ্রিয়ায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য হিরাক্লিয়াস স্বয়ং প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। কিন্তু যখন তার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়, তখন আল্লাহ তা'আলা তাকে মৃত্যুমুখে পতিত করেন। এভাবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে মুসলমানদের সাহায্য করেন। হিরাক্লিয়াসের মৃত্যুর পর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তার দুই ছেলে, কন্সটান্টাইন ও হিরাক্লিয়াস-২, ক্ষমতা দখল করে। হিরাক্লিয়াস-২ এর মা মারতিনাও শাসনকার্যে ভূমিকা রাখে। হিরাক্লিয়াসের মৃত্যুর এক শ দিনের মধ্যেই কন্সটান্টাইন মৃত্যুবরণ করে। এ জন্য সবাই মারতিনাকে সন্দেহ করতে থাকে, যে কিনা তার সন্তানকে এককভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। ফলে মারতিনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়। এই অস্থিরতা ও দাঙ্গা কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে থাকে। একপর্যায়ে কন্সটান্টাইনের ছেলে কন্সটেনাস তার চাচার সঙ্গে ক্ষমতায় শরীক হলে দাঙ্গা বন্ধ হয়।

আলেকজান্দ্রিয়া একটি সুরক্ষিত শহর। এর চারপাশে বিস্তৃত ও শক্তিশালী দেয়াল এবং যথোপযুক্ত প্রতিরোধ-ব্যবস্থা এর নিরাপত্তা আরও জোরদার করেছে। এর উত্তরে সমুদ্র এবং তখন সমুদ্রে বাইজেন্টাইনদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। আর দক্ষিণে মারয়ুত লেক প্রতিরক্ষার জন্য যথেষ্ট ছিল। কারণ, এটি পার হওয়া অসম্ভব না হলেও চরম কষ্টসাধ্য ছিল। ওই সময় নীল নদের একটি শাখা, নাযাত আস-সাওবান নামে প্রসিদ্ধ, শহরটির পশ্চিম দিক ঘিরে রেখেছিল। সুতরাং শহরে প্রবেশের জন্য একদিকই খোলা ছিল। আর সেটি হলো পূর্ব দিক দিয়ে, যা কিরয়ুনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল।

অবরোধ কয়েক মাস ধরে চলছিল। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আশঙ্কা করলেন, হয়তো তার বাহিনী পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বে অথবা শত্রুদের পরাজিত করার আগেই পালিয়ে যেতে থাকবে। সুতরাং তিনি নীল নদের ব-দ্বীপ অঞ্চল এবং মিসরের ওপরের দিকে গ্রামাঞ্চলে অভিযান প্রেরণের সিদ্ধান্ত নিলেন। এত দীর্ঘ সময় ধরে অবরোধ অব্যাহত থাকে যে, খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুও চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি মুসলিম বাহিনীর সৈনিকদের জীবন বাজি রেখে লড়াইয়ে আগ্রহ ও উৎসাহের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে গেলেন। তিনি মনে করলেন, নিশ্চয়ই মুসলমানগণ কোনো গোনাহের কারণে এ রকম কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি এ বিষয়টি জানিয়ে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট চিঠি প্রেরণ করেন : আমি খুবই দুশ্চিন্তিত যে, আর কত দিন লাগবে মিসর জয় করতে! আপনারা গত দুই বছর যাবৎ লড়ছেন। মুসলমানদের কৃত কোনো গোনাহের কারণে এমন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে অথবা শত্রুদের মতো আপনারাও দুনিয়ার ভালোবাসায় নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা কেবল তার প্রতি একনিষ্ঠ ও অবিচল বান্দাদের বিজয় দান করেন। আমি আপনার নিকট চার জন বীর যোদ্ধা (মানে যুবায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তার সঙ্গীগণ) পাঠাচ্ছি এবং আমি বলেছি যে, আমার জানামতে তারা একেক জন এক হাজার লোকের সমতুল্য। আমার চিঠি পাওয়ামাত্র আপনি লোকজনকে নসীহত করবেন এবং তাদের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করবেন। তাদের ধৈর্যধারণে উৎসাহিত করবেন এবং নিয়ত ঠিক রাখতে বলবেন। আর আমার প্রেরিত চার জনকে নেতৃস্থানীয় পদমর্যাদায় নিযুক্ত করুন। আপনার অধীনদের বলুন, তারা যেন আমীরের নেতৃত্বে একসঙ্গে শত্রুর ওপর হামলা করে এবং সেটি করুন শুক্রবার দুপুরে। কারণ এ-সময় ঐশী রহমত নাযিল হয় এবং এ- সময় দুআও কবুল হয়ে থাকে। লোকজনকে আল্লাহর দিকে ধাবিত করুন এবং তার নিকট শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্য দুআ করতে বলুন।'

এই চিঠি পেয়ে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার অধীন সবাইকে জমা করেন এবং তাদের সম্মুখে চিঠিটি পড়ে শোনান। তারপর তিনি ওই চার জনকে ডেকে এনে সবার সামনে বিভিন্ন উপদলের সেনাপতির পদে নিযুক্ত করেন। তিনি সবাইকে তাদের অন্তর পবিত্র করার নির্দেশ দেন। এ লক্ষ্যে সকলকে দুই রাকাত নামায পড়ে আল্লাহর নিকট তাওবা-ইস্তেগফার করতে বলেন এবং তারপর তার নিকট বিজয়ের জন্য দুআ করতে বলেন। তারা তা-ই করেন এবং আল্লাহ তাদের বিজয় দান করেন।

বর্ণিত আছে, আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু মাসলামা ইবনে মুখাল্লাদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তাকে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, 'এসব লোকদের সঙ্গে যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে আমাকে কিছু পরামর্শ দিন।' মাসলামা বলেন, 'আমার মনে হয়, সাহাবীদের মধ্য থেকে আপনি একজন সমরবিদ ও অভিজ্ঞ কাউকে নির্বাচন করুন এবং তাকে যুদ্ধ শুরু করা ও তা পরিচালনার দায়িত্ব দিন।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবার জিজ্ঞাসা করেন, 'কাকে নির্বাচন করা যায়?' তিনি বলেন, 'উবাদা ইবনে আস- সামিত।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে ডেকে পাঠান এবং তিনি যখন নিকটে এসে হাজির হন, তখন বাহন থেকে নামার চেষ্টা করতেই আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি আপনাকে বাহন থেকে না নামার জন্য অনুরোধ করছি। আমাকে আপনার বর্শাটি দিন।' তিনি সেটি আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেন। তখন আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের পাগড়ি খুলে বর্শাটির মাথায় বিদ্ধ করেন এবং তাকে বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সেনাপতি নিযুক্ত করেন। আল্লাহ তাকে বিজয় দান করেন এবং ওই দিনই আলেকজান্দ্রিয়া মুসলমানদের হাতে চলে আসে।

আরেক বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, 'আমি এ বিষয়ে অনেক চিন্তা- ভাবনা করেছি। পরিশেষে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, ইসলামের প্রথম যুগে যারা মুসলমানদের বিজয় অর্জনে সহায়তা করেছেন, তাদের ছাড়া অন্য কেউ এ যুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবে না। তিনি আনসারদের দিকে ইশারা করেছেন। তারপর তিনি উবাদা ইবনে আস-সামিতকে যুদ্ধের সেনাপতি হিসাবে নিয়োগ দেন এবং আল্লাহ তার হাতে মুসলমানদের বিজয় দান করেন।

ইবনে আব্দুল হাকাম বর্ণনা করেন, আলেকজান্দ্রিয়া অবরোধ নয় মাস স্থায়ী হয় এবং ২০ হিজরীর মুহাররম মাসে (২১ ডিসেম্বর ৬৪০) বিজয় হয়। তবে বাল্টার তার গবেষণায় বলেন, আলেকজান্দ্রিয়া অবরোধ শুরু হয় জুন ৬৪০ সালে এবং শহরবাসীরা ৮ নভেম্বর ৬৪১ সালে (৭ যিলহজ ২১ হি.) আত্মসমর্পণ করে। এই মতটি বেশি যুক্তিসংগত মনে হয়। কারণ, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার চিঠিতে উল্লেখ করেন, 'আপনারা গত দুই বছর ধরে যুদ্ধ করছেন।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আল-আরিশে পদার্পণের তারিখ ডিসেম্বর ৬৩৯ এবং আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ের তারিখ নভেম্বর ৬৪১ সাল—যাতে দুই বছর পূর্ণ হয়।

আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আলেকজান্দ্রিয়ার লোকজনের কোনো ক্ষতি করেননি; তিনি তাদের হত্যা করেননি এবং তাদের মহিলাদের বন্দীও করেননি। বরং তিনি তাদের সঙ্গে ব্যবলিয়নের অধিবাসীদের মতো আহলে যিম্মি হিসাবে আচরণ করেন। সবকিছু শান্ত হয়ে এলে তিনি একদল সেনাকে আলেকজান্দ্রিয়া রক্ষায় নিযুক্ত করেন এবং বাকি সৈন্য নিয়ে তিনি বাইজেন্টাইনদের অবশিষ্ট অঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি বিজয়ে মনোনিবেশ করেন। এভাবে মেডিটেরিয়ান তীরবর্তী এলাকায় মুসলমানগণ তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। বড় বড় শহরের মধ্যে রাশিদ, দিমাইত এবং অন্যান্য শহরও মুসলমানদের অধীনে আসে। ফলে মুসলমানগণ ব-দ্বীপ এলাকা ও মিসরের ওপরের অঞ্চলসমূহে ইসলামের পতাকা উত্তোলন করেন।

২.৩। বারকাহ এবং ত্রিপলী বিজয়
মিসরে পূর্ণ মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পশ্চিম দিকে তার অভিযান অব্যাহত রাখেন। বারকাহ ও ত্রিপলীতে বাইজেন্টাইন সৈন্যদের ঘাঁটি ছিল। এ রকম আরও কিছু শহরে তারা মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। ২২ হি. আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বাহিনী নিয়ে বারকাহ অভিমুখে রওনা হন। আলেকজান্দ্রিয়া থেকে বারকাহ যেতে পথের দু-ধারে ছিল বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর ও ঘরবাড়ি। বারকাহ পর্যন্ত পৌঁছতে তিনি তেমন কোনো বাধার সম্মুখীন হননি। বারকাহতে পৌঁছে তিনি সেখানকার লোকজনের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেন এবং তাদের জন্য জিযিয়া (কর) ধার্য করে দেন। মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে আসায় বারকাহর অধিবাসীরা স্বঃপ্রণোদিত হয়ে মিসরের গভর্নরের নিকট খারাজ প্রেরণ করে। এ ব্যাপারে তাদের কেউ বাধ্য কিংবা নির্দেশও দেয়নি। তারা উত্তর আফ্রিকার সবচেয়ে ভদ্র জাতি এবং কখনো কোনো সমস্যা তৈরি করেননি।

তারপর আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বাহিনী নিয়ে ত্রিপলীর দিকে অগ্রসর হন। সেখানে লোকজন সুরক্ষিত দুর্গে অবস্থান করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং সেখানে বাইজেন্টাইন সৈন্য-সংখ্যাও ছিল প্রচুর। তারা শহরের গেইট বন্ধ করে দেয় এবং কয়েক মাস যাবৎ মুসলমানদের হাতে অবরুদ্ধ থাকে। এ সময়ের মধ্যে মুসলমানরা উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন করতে পারেনি। শহরের আরেক দিকে ছিল সমুদ্র। সমুদ্রের তীর ঘেঁষেই বাইজেন্টাইনরা তাদের বাড়ি-ঘর নির্মাণ করেছিল। সমুদ্র এবং শহরের মধ্যে কোনো দেয়াল ছিল না। মুসলিম সৈন্যরা যখন এটি জানতে পারে, তখন তাদের একটি দল সমুদ্রপথে শহরে প্রবেশ করে তাকবীর-ধ্বনি দেয়। জাহাজ ছাড়া আর অন্য কোনোভাবেই বাইজেন্টাইনদের শহর থেকে পালাবার পথ ছিল না। এদিকে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বাহিনী নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যারা নৌকায় উঠতে সক্ষম হয়, তারা ছাড়া আর কেউই মুসলমানদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। মুসলমানগণ শহরের সব সম্পদ গনীমত হিসাবে সংগ্রহ করেন এবং আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সৈন্যদের আশপাশের এলাকায় প্রেরণ করেন। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আরও পশ্চিমে তিউনিসিয়া এবং অন্যান্য উত্তর আফ্রিকার সুদূর অঞ্চলে অভিযান পরিচালনায় আগ্রহী ছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি নিষেধ করেন। কারণ, নতুন অঞ্চল বিজয়ের পূর্বে বিজিত অঞ্চল সুরক্ষা করা বেশি প্রয়োজন ছিল। সুতরাং তিনি মুসলিম বাহিনীকে ত্রিপলী পর্যন্তই অভিযান সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দেন। এভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আমলে ইসলামী সাম্রাজ্য পূর্ব দিকে জিজন ও দরিয়ার সিন্ধ থেকে শুরু করে পশ্চিমে আফ্রিকার সীমান্ত পর্যন্ত, উত্তরে এশিয়ার কুচকে পাহাড়গুলো এবং আরমিনা থেকে দক্ষিণে কাহেল সমুদ্র ও নওবা পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। এটি ছিল এক আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র যেখানে নানা ধর্ম-বর্ণ, কৃষ্টি-কালচার ও নানা জাতিগোষ্ঠীর সম্মিলন ঘটে। এ রাষ্ট্রের জনগণ ন্যায় বিচার ও শান্তি-সৌহার্দের মধ্যে বসবাস করে। আর ইসলাম তাদের অধিকার সংরক্ষণ করে জাতিগত ভেদাভেদ থাকা সত্ত্বেও প্রত্যেকের সামাজিক মর্যাদা ও অবস্থান নিশ্চিত করে।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 মিসর বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

📄 মিসর বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা


৩.১। আল-মুকাওকিসের বিরুদ্ধে উবাদা ইবনে আস-সামিতের অভিযান
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু ব্যবলিয়ন দুর্গ অবরোধ করার পর মুকাওকিস তার নিকট এই চিঠি প্রেরণ করেন :

আপনারা আমাদের দেশে জোরজবরদস্তি প্রবেশ করেছেন এবং আমাদের যুদ্ধে প্রলুব্ধ করছেন। আর অনেকদিন ধরেই আপনারা আমাদের দেশে অবস্থান করছেন। আপনারা একটি ক্ষুদ্র দলমাত্র। বাইজেন্টাইনরা বিরাট প্রস্তুতি গ্রহণ করছে এবং শীঘ্রই তারা আপনাদের ওপর আক্রমণ করবে; তাদের নিকট রয়েছে বিপুল যুদ্ধাস্ত্র ও জনবল। নীল নদ আপনাদেরও অবরোধ করে রেখেছে এবং আপনারা মূলত আমাদের দেশে বন্দী হয়ে আছেন। আমাদের নিকট আপনাদের পক্ষ থেকে দূত প্রেরণ করুন যাতে আমরা আপনাদের বক্তব্য শুনতে পারি। সম্ভবত আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমূহ সংঘর্ষ এড়াতে পারব, যা উভয়পক্ষের জন্য কল্যাণকর হবে এবং বাইজেন্টাইনরা আক্রমণ করার পূর্বেই যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাবে। তারা একবার আক্রমণ করে বসলে আর আলোচনার সুযোগ থাকবে না। আপনাদের আশার বাইরে পরিণতির জন্য আমাদের আফসোস করা ছাড়া উপায় থাকবে না। আপনাদের দূত প্রেরণ করুন, যাতে আমরা একটা সমঝোতায় পৌঁছতে পারি যাতে উভয়পক্ষ স্বস্তি পেতে পারি।

মুকাওকিসের দূত এই চিঠি নিয়ে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট আগমন করলে তিনি তাদের দু-দিন ও দু-রাতের জন্য আটক করার নির্দেশ দেন। এক পর্যায়ে মুকাওকিস তাদের ব্যাপারে মন্দ কোনো পরিণতির আশঙ্কায় অস্থির হয়ে ওঠে এবং তার সাথিদের জিজ্ঞাসা করেন, 'তোমরা কি মনে করো মুসলমানরা আমাদের দূতদের হত্যা করে ফেলেছে অথবা আটকে রেখেছে? তাদের ধর্মে কি এর অনুমোদন রয়েছে?' আর আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর চেয়েয়ছিলেন, দূতগণ যেন মুসলমানদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পায় এবং এই বোধে উন্নীত হয় যে, মুসলমানগণ দুনিয়াবি কোনো প্রাপ্তির দিকে লালায়িত নন; বরং তাদের এ রকম কোনো চিন্তাও নেই। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দু-দিন পর দূতদের একটি চিঠি দিয়ে ফেরত পাঠালেন : আমার এবং আপনার মধ্যে কেবল তিনটি সুযোগ রয়েছে; হয় আপনারা ইসলাম গ্রহণ করবেন এবং একই অধিকার ও মর্যাদায় আমাদের ভাই হয়ে যাবেন; এটি না চাইলে আমাদের বশ্যতা স্বীকার করে জিযিয়া (কর) প্রদান এবং নিজেকে পদানত মনে করতে হবে (কুরআন ৯ : ২৯ দ্রষ্টব্য); আর নতুবা আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব এবং আল্লাহর ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করব। আর তিনিই উত্তম ফায়সালাকারী (কুরআন ১০ : ১০৯ দ্রষ্টব্য)।

দূতেরা ফিরে এলে মুকাওকিস তাদের জিজ্ঞাসা করেন, 'তোমরা তাদের কেমন দেখলে?' তারা বলল, 'আমরা এমন লোকদের দেখেছি যারা জীবনের চেয়ে মৃত্যুকে বেশি ভালোবাসে এবং উঁচু মর্যাদা থেকে বিনয়কে বেশি ভালোবাসে। তাদের কারও মধ্যেই দুনিয়ার প্রতি কোনো লোভ বা আকাঙ্ক্ষা নেই; বরং তারা মাটিতে বসে এবং হাঁটু গেড়ে বসে আহার করে। তাদের নেতা তাদেরই একজন। উচ্চ ও নিম্ন পদবির লোকদের অথবা মনিব ও গোলামদের মধ্যে পার্থক্য করা যায় না। যখন নামাযের সময় হয়, তখন আর কেউ পেছনে পড়ে থাকে না। তারা অযু করে এবং একনিষ্ঠভাবে নামাযে দাঁড়ায়।'

তখন মুকাওকিস বললেন, 'ওই সত্তার কসম, যার কসম করা হয়, তারা যদি পাহাড়ের সঙ্গেও লড়াই করতে চায়, তাহলে সেটিকেও চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে পারবে। কেউই তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সামর্থ্য রাখে না। আজকে আমরা যদি তাদের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছতে না পারি, যেখানে তারা এখন নীল নদী দ্বারা বেষ্টিত হয়ে আছে, তাহলে কাল যখন তারা এ থেকে পরিত্রাণ পাবে, তখন আর সন্ধির সুযোগ থাকবে না। মুকাওকিস তার দূতদের আবার মুসলিম বাহিনীর সেনাপতির নিকট প্রেরণ করেন এবং বলেন: আপনি আমাদের নিকট আপনাদের পক্ষ থেকে কাউকে প্রেরণ করুন, যাতে তার সঙ্গে আমরা আলোচনা করে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছতে পারি, যা আমাদের উভয়ের জন্য কল্যাণকর হবে।'

আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু দশ জনের একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করলেন। তাদের একজন ছিলেন উবাদা ইবনে আস-সামিত। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকেই মুসলমানদের পক্ষ থেকে কথা বলার নির্দেশ দিলেন। আর কঠোরভাবে তিনটির যেকোনো একটি ব্যতীত অন্য কোনো শর্তে রাজি হতে নিষেধ করলেন। কারণ, আমীরুল মুমিনীন এ রকমই নির্দেশ দিয়েছেন।

উবাদা ইবনে আস-সামিত দেখতে কালো ছিলেন। মুসলিম প্রতিনিধিদল নৌকায় চড়ে মুকাওকিসের দরবারে পৌঁছে। উবাদা ইবনে আস-সামিত কথা বলার জন্য অগ্রসর হলে তাকে দেখে মুকাওকিস ভয়ে আঁতকে ওঠেন। তিনি বলেন, 'এই কালো রঙের লোকটাকে সরিয়ে নাও। অন্য কাউকে নিয়ে এসো, আমার সঙ্গে কথা বলুক।' তখন মুসলিম প্রতিনিধিদলের বাকি সদস্যদের একজন বলল, 'এই কালো লোকটিই আমদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান। তিনি আমাদের নেতা এবং আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। আর তাকে আমাদের আমীর বানানো হয়েছে। আমরা সবাই তার পরামর্শ মেনে চলি এবং আমাদের সেনাপতি তাকেই আমাদের সর্দার নিযুক্ত করেছেন। আমরা তার নির্দেশের বাইরে যেতে পারব না।'

মুকাওকিস বলল, 'কেমন করে তোমরা এই কালো লোকটাকে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম বলছ? বরং তার অবস্থান তো সবার নিচেই হওয়ার কথা।' তারা বলল, 'না। তাকে আপনি কালো দেখছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি আমাদের নিকট বেশি মর্যাদার অধিকারী। তিনি আমাদের আগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং আমাদের চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখেন। কালো হওয়া আমাদের নিকট দূষণীয় কিছু নয়।'

মুকাওকিস উবাদাকে বললেন, ‘হে কালো মানুষ, আমার সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলবে। তোমার কালো রঙের কারণে আমি এমনিতেই ভীত-সন্ত্রস্ত। আর যদি কর্কশ ভাষায় কথা বলো, তাহলে আরও ভয় পেয়ে যাব।’

উবাদা এবার কথা বলা শুরু করলেন:
আপনি যা বলেছেন, তা আমি শুনেছি। মুসলিম বাহিনীতে আমার মতো হাজার হাজার কালো লোক রয়েছে; বরং আমার চেয়ে আরও বেশি কালো লোকও আছে। তারা দেখতে আরও ভয়াবহ। তাদের দেখলে আপনি আরও আতঙ্কিত হয়ে উঠবেন। আমার যৌবন শেষ হয়ে গেছে। এখন বার্ধক্যে উপনীত হয়েছি। তবু এখনো যদি এক হাজার শত্রুসেনা আমার সঙ্গে একসঙ্গে লড়তে আসে, আমি ভয় পাব না। এটি আমার সঙ্গীদের বেলায়ও সত্য। কারণ, আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জিহাদ করছি। আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করার উদ্দেশ্য দুনিয়া কামাই করা নয় অথবা সম্পদ কুক্ষিগত করাও নয়; বরং আল্লাহ আমাদের জন্য যুদ্ধলব্ধ গনীমতের সম্পদ জায়েয করেছেন। কিন্তু কে কী পেল— স্বর্ণমুদ্রা নাকি দিরহাম—কেউ খেয়াল করে না। কারণ, আমরা এ দুনিয়ায় ক্ষুধা নিবারণের জন্য প্রয়োজনীয় সামান্য একটু খাবার এবং নিজের আব্রু ঢাকার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ পোশাকই কামনা করি। আমাদের কেউ যদি তা পেয়ে যাই, তাতেই সন্তুষ্ট থাকি। আর যদি কেউ কিনতার বা স্বর্ণমুদ্রা পায়, তাহলে সে সেটি আল্লাহর পথেই ব্যয় করে এবং তার হাতে সামান্য সম্পদেই খুশি থাকে। কারণ, এ দুনিয়ার আনন্দ আসল আনন্দ নয় এবং এর ভোগ-বিলাস সত্যিকার ভোগ-বিলাস নয়; বরং আখেরাতের আনন্দ ও ভোগ-বিলাসই আসল। আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের এ শিক্ষাই দিয়েছেন; তিনি বলেছেন, এ দুনিয়ায় ক্ষুধা নিবারণে প্রয়োজনীয় খাবার এবং নিজের আব্রু ঢাকার জন্য সামান্য একটু কাপড়ই যথেষ্ট। আমাদের আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং এ লক্ষ্যেই আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদে অংশগ্রহণ করা।’

এ কথা শুনে মুকাওকিস তার সভাসদদের উদ্দেশে বললেন, ‘এই লোক যা বলছে, এ রকম কোনো কথা কি তোমরা জীবনে কখনো শুনেছ? তার বাহ্যিক অবয়ব দেখে আমি ভয় পেয়েছি। কিন্তু তার কথা আমাকে আরও বেশি ভীত করে তুলেছে। আল্লাহ এই লোক এবং সঙ্গীদের পুরো পৃথিবী ধ্বংস করার জন্য প্রেরণ করেছেন। আমার মনে হয়, তারা সারা দুনিয়ার ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে।'

তারপর মুকাওকিস উবাদার দিকে ফিরে বললেন, 'হে দূত, তুমি নিজের ও তোমার সঙ্গীদের সম্পর্কে যা বলেছ, আমি শুনলাম। তোমরা তোমাদের মহান গুণাবলির জন্যই এ পর্যন্ত বিজয় অর্জন করে এসেছ। আর দুনিয়াদারদের ওপরই তোমরা প্রাধান্য বিস্তার করেছ। বাইজেন্টাইনদের অসংখ্য সৈন্য তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য এগিয়ে আসছে। তারা বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য সুপরিচিত। তাদের কেউই শত্রুদের শক্তি-সামর্থ্যের পরোয়া করে না; বরং লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমরা জানি, তোমরা তাদের প্রতিরোধ করতে পারবে না; কারণ, তোমরা দুর্বল এবং সংখ্যায় নগণ্য। তোমরা আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছ। সংগত কারণেই তোমরা ক্লান্ত এবং ক্ষুধা ও কষ্টে জর্জরিত। আমরা তোমাদের দুর্বলতা ও সম্পদের স্বল্পতা দেখে দুঃখবোধ করছি। আমরা খুশি মনেই তোমাদের প্রত্যেককে দুই দিনার করে দিতে চাই; আর তোমাদের সেনাপতিকে এক শ দিনার এবং খলীফাকে এক হাজার দিনার। এগুলো নিয়ে তোমরা নিজেদের দেশে ফিরে যাও—তোমাদের ওপর এমন এক বাহিনী আক্রমণ করার আগেই, যা তোমরা মোকাবিলা করতে পারবে না।'

উবাদা ইবনে আস-সামিত বললেন, 'নিজেকে এবং নিজের সঙ্গীদের ধোঁকা দেবেন না। বাইজেন্টাইন সৈন্যদের শক্তি-মত্তা ও সংখ্যাধিক্য এবং তাদের প্রতিরোধে আমাদের অক্ষমতার কথা বলে আমদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করবেন না। কারণ, এটি এমন কোনো বিষয় নয়, যা দিয়ে আপনি আমাদের ভয় দেখাতে পারেন অথবা আমাদের পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেন; বরং আপনি যা বলছেন, তা যদি সত্য হয়, তাহলে সেটিই তাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করার জন্য উৎসাহ-উদ্দীপনার বিষয়। এটি আমাদের লড়াইকে আরও দৃঢ় করে তুলবে। কারণ, সেটি আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয়। যদি আমরা তাতে নিহত হই, তাহলে সেটি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করবে এবং তিনি আমাদের জান্নাত দান করবেন। আর এ থেকে অন্য কোনো কিছুই আমাদের নিকট বেশি প্রিয় নয়। যুদ্ধে ফলাফল যা-ই হোক, তা-ই আমাদের জন্য ভালো। আর যদি আমরা তোমাদের পরাজিত করতে সক্ষম হই, তাহলে দুনিয়ায় আমরা সফল হব; অথবা পরাজিত হলে আখেরাতে সফল হব। পরাজয়ের কারণে আখেরাতের সফলতাই আমাদের নিকট বেশি প্রিয় এবং এ জন্যই আমরা লড়াই করে যাচ্ছি। আল্লাহ বলেন,

কَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً كَثِيرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصُّبِرِينَ
সামান্য দলই বিরাট দলের মোকাবিলায় জয়ী হয়েছে আল্লাহর হুকুমে। আর যারা ধৈর্যশীল আল্লাহ তাদের সঙ্গে রয়েছেন।

আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে সকাল-সন্ধ্যায় শাহাদাত লাভ ও পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে না যাওয়ার জন্য দুআ করে না। আমাদের কেউই পশ্চাতে কী ফেলে এসেছে, এ জন্য আফসোস করে না। সবাই তাদের পরিবার-পরিজন আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে এসেছে। আমরা সবাই সম্মুখপানে চেয়ে আছি। আপনি যে রকম বলেছেন, আমরা ক্ষুধা ও পরিশ্রমে কষ্টে আছি, বিষয়টি সে রকম নয়; বরং এতেই আমরা খুশি। পুরো দুনিয়াও যদি আমাদের করতলগত হয়, তাহলেও আমরা এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করি না। এখন চিন্তা করে দেখুন, আপনি কী করবেন। তিনটির বাইরে আপনার-আমাদের মধ্যে অন্য কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়। সুতরাং এই তিনটির যেটি পছন্দ হয়, গ্রহণ করুন। নিজের মনমতো প্রস্তাব পেশ করবেন না। আমাদের সেনাপতি এই নির্দেশই দিয়েছেন। আর স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও একই নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন। হয় ইসলাম গ্রহণ করুন—আল্লাহর নিকট এটিই একমাত্র দ্বীন। তার সকল নবী-রাসূল ও ফেরেশতাদের ধর্মও এই ইসলাম। আর যারা এর বিরুদ্ধাচরণ করবে, তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ আমাদের যুদ্ধ করার হুকুম দিয়েছেন। আর যারা এতে প্রবেশ করে এবং তা ত্যাগ করে—পুনর্বার তাতে ফিরে না আসা পর্যন্ত তাদের সঙ্গেও লড়াই করার হুকুম দিয়েছেন। যে কেউ ইসলাম গ্রহণ করবে, তার ওপর আমাদের মতো একই অধিকার ও দায়িত্ব বর্তাবে এবং আল্লাহর পথে আমাদের ভাই হিসাবে পরিগণিত হবে। যদি আপনি এবং আপনার লোকজন ইসলামে দাখিল হন, তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম হবেন। আর আমরা যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকব এবং আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না। আর যদি এটি না করেন, তাহলে আমাদের বশ্যতা স্বীকার করে অবশ্যই জিযিয়া প্রদান করতে হবে এবং এবং নিজেকে পদানত মনে করতে হবে (কুরআন ৯ : ২৯ দ্রষ্টব্য) এবং আমরা এ জন্য আপনাদের সামর্থ্য অনুযায়ী বার্ষিক হারে কর নির্ধারণ করে দেব। আর আমরা আপনাদের নিরাপত্তায় যেকোনো শত্রুর বিরুদ্ধে আপনাদের হয়ে লড়াই করব। আমরা এটি তখনই করব যখন আপনারা আমাদের নিরাপত্তায় বসবাস করবেন এবং এটি একটি চুক্তির মাধ্যমে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে সম্পন্ন করা হবে। আর যদি এটিও আপনার পছন্দ না হয়, তাহলে তরবারিই আপনাদের এবং আমাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবে—যতক্ষণ আমরা নিহত হই অথবা বিজয় অর্জন করি। এই তিনটি ছাড়া আপনাদের জন্য কোনো পথই খোলা নেই। এখন যেটি ইচ্ছা গ্রহণ করুন।'

মুকাওকিস বললেন, 'এটি কখনো সম্ভব নয়। তুমি যা বলেছে, তাতে আজীবন আমাদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা ছাড়া অন্য কিছুই নয়।' উবাদা তাকে বললেন, 'এটি আপনার বিষয়; তিনটির যেকোনো একটি গ্রহণ করতে পারেন।' মুকাওকিস আবার জিজ্ঞাসা করেন, 'আমরা এর বাইরে অন্য কিছু কেন বেছে নিতে পারি না?' উবাদা হাত উঁচু করে বললেন, 'না। আকাশ-যমীনসহ সবকিছুর পালনকর্তার শপথ, আপনাদের জন্য এই বাইরে কিছু নেই। পছন্দ আপনার।' মুকাওকিস তার সভাসদদের দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কি সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছ কী করবে?' তারা বলল, 'কেউ কি এই অপমান মেনে নেবে? তারা আমাদের তাদের ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে চাচ্ছে—এটা তো কখনো সম্ভব নয়। আমরা যিশুর ধর্ম ত্যাগ করে এমন ধর্ম গ্রহণ করব না যেটি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। আর তারা যে আমাদের পদানত করে সারা জীবনের জন্য গোলাম বানিয়ে রাখতে চাচ্ছে—এর থেকে মৃত্যুই শ্রেয়। তারা যদি আমাদের নিকট আরও বেশি ধন-দৌলত কামনা করে, তাহলে আমরা সেটি দিতে প্রস্তুত আছি। আর সেটিই উত্তম।’ মুকাওকিস উবাদাকে বললেন, 'আমার লোকেরা তোমাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন তুমি কী করবে? তুমি তোমাদের সেনাপতির নিকট ফিরে যাও এবং তাকে বলো, আমরা তোমাদের আশাতীত ধন-সম্পদ দিতে চাই এবং সেগুলো নিয়ে তোমরা বিদায় হও।'

উবাদা এবং তার সঙ্গীরা মুকাওকিসের দরবার থেকে বিদায় নেয়। তারা চলে গেলে মুকাওকিস তার লোকজনকে বললেন, ‘আমার কথা শোনো এবং লোকজনকে তিনটির যেকোনো একটি মেনে নিতে বলো। আল্লাহর কসম, কোনো শক্তিই তাদের মোকাবেলা করতে পারবে না। যদি তোমরা তাদের নিকট স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ না করো, তাহলে অনিচ্ছায় এর চেয়ে কঠিন বিপদ ডেকে আনবে।’ তারা জিজ্ঞাসা করল, ‘আমরা কোনটি গ্রহণ করব?’ তিনি বললেন, ‘আমি তোমাদের বলে দেব। ধর্মান্তরিত হতে আমি বলব না। আর যুদ্ধের ক্ষেত্রে তোমরা তাদের কখনো পরাজিত করতে পারবে না। কারণ, তারা যা করে, তা তোমাদের করার যোগ্যতাই নেই। সুতরাং তৃতীয় উপায় ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই; জিযিয়া প্রদান।’ তারা বলল, ‘তাহলে কি আমরা চিরকাল তাদের দাস হয়ে থাকব?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ। দাস হবে ঠিকই, কিন্তু আমাদের দেশে আমাদের পূর্ণ অধিকার ও রাজত্ব থাকবে। তোমাদের সম্পদ, পরিবার-পরিজন সবই নিরাপদ থাকবে। তোমাদের সকলের মৃত্যুবরণ অথবা যুদ্ধবন্দী হয়ে তুমি, তোমার স্ত্রী ও সন্তানসহ চিরকালের জন্য দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়া থেকে এটি অনেক ভালো।’ তারা বলল, ‘এ থেকে মৃত্যুই শ্রেয়।'

উবাদা এবং মুকাওকিসের মধ্যে কথোপকথন থেকে উবাদার ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর বিরোধী-পক্ষ তাঁকে যেদিকে আহ্বান করছিল, তিনি তা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। তারা যে প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে ভিন্নখাতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, তা তাঁকে প্রভাবিত করেনি। আলোচনার সময় উবাদা মুকাওকিসকে ইসলামের দিকে আহ্বান ও ঈমান আনার ক্ষেত্রে উৎসাহ দিতে ভুলে যাননি। তিনি তাঁর সামনে অন্যান্য ধর্ম ও জাতির প্রতি ইসলামের উদারতাও তুলে ধরেন। এতে মুকাওকিসের ওপর ভালো প্রভাব পড়ে এবং শান্তিচুক্তি করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।

৩.২। মিসর বিজয়ে কিছু রণকৌশল
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু মিসর বিজয়ে অনেকগুলো রণকৌশল প্রয়োগ করেন। নিচে এর কয়েকটি আলোচনা করা হলো।

৩.২.১। মনস্তাত্ত্বিক লড়াই
মুকাওকিস ব্যবলিয়ন দুর্গের দেয়াল রক্ষায় নারীদের শহরের দিকে এবং সশস্ত্র লোকদের মুসলিম বাহিনীর দিকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর আদেশ জারি করেন, যাতে মুসলমানদের ভয় দেখানো যায়। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দূত প্রেরণ করে তার উদ্দেশে বলেন, 'তোমরা যেসব প্রস্ততি গ্রহণ করেছ, তা আমরা অবগত আছি। কিন্তু আমরা সংখ্যাধিক্যবলে কখনো শত্রুদের পরাজিত করিনি। আমরা তোমাদের সম্রাটের মুখোমুখি হয়েছি এবং তোমরা জানো, তার কী পরিণতি হয়েছে।' মুকাওকিস তার সঙ্গীদের বললেন, 'এই লোকগুলো সত্য বলেছে। তারা আমাদের সম্রাটকে তার রাজ্য থেকে উৎখাত করেছে এবং কন্সটান্টিনোপলে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। তাদের নিকট আমাদের আত্মসমর্পণ করাই উচিত।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন একজন সেনাপতি, যিনি শত্রুকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলার জন্য মনস্তাত্ত্বিক লড়াই করেছেন এবং ফলে তাদের যুদ্ধ করার আগ্রহই কমে গিয়েছে। যুদ্ধে তিনি প্রথমে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করতেন, তারপর নিজের বুদ্ধিমত্তা, রণকৌশল ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একটি লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যেতেন। আর সেটি হলো নিশ্চিত বিজয়।

৩.২.২। এমবুশ এবং সারপ্রাইজ এট্যাক
আয়ান শামসের যুদ্ধে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমবুশ ও সারপ্রাইজ এট্যাক পদ্ধতিও ব্যবহার করেছেন। তিনি এসব পদ্ধতি প্রয়োগের সময় পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন, যা সফলতা বয়ে আনে। তিনি এমবুশ টিমকে রাতেই সুনির্দিষ্ট স্থানে পাঠিয়ে দেন, যা তিনি ভালোভাবেই বেছে নিয়েছিলেন। তিনি তাদের জন্য আক্রমণের সময়ও নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। যখন উভয়পক্ষ যুদ্ধে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেছে, তখন ডান-বাম থেকে এমবুশ টিম হঠাৎ করে শত্রুদের ওপর আক্রমণ করে বসে। তিনি আক্রমণের জন্য সঠিক স্থান ও সময় নির্ধারণ করেছিলেন। এভাবে এমবুশ টিমকে সুনিপুণভাবে পরিচালিত করায় ইতিহাসে এটি সবচেয়ে সফল এমবুশ হিসাবে স্থান করে নেয়।

৩.২.৩। অবরোধের সময় এমবুশ
ব্যবলিয়ন দুর্গ অবরোধের সময়ও তিনি সফলভাবে এমবুশ পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। বাইজেন্টাইনরা নিশ্চিত ছিল যে, সুদৃঢ় প্রাচীর ও কঠোর প্রতিরোধের মুখে মুসলিম বাহিনী তাদের কোনো ক্ষতি করতে সমর্থ হবে না। তাদের রসদ সরবরাহে কোনো ঘাটতি ছিল না, প্রচুর পরিমাণে অস্ত্রশস্ত্রও মজুদ ছিল, নিরাপত্তা জোরদার করতে তারা প্রাচীরের গেইটগুলোর কাছে ধারালো পেরেক পুঁতে রেখেছিল এবং প্রাচীর ঘেঁষে নির্মাণ করেছিল গভীর পরিখা। তবে নীল নদীর পানির মাত্রা কমে গেলে পরিখায়ও পানি কমে যেত। এ রকম এক দিন হঠাৎ করেই যুবায়ের ইবনে আওয়াম রাযিয়াল্লাহু আনহু একদল সাহসী সেনাদল নিয়ে দেয়াল টপকে তাকবীর-ধ্বনি দিয়ে ওঠেন। শত্রুরা অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়ে যায় এবং তরবারির আঘাতে নিহত হতে থাকে। গেইটের প্রহরীরা পরাজিত হয় এবং শান্তিচুক্তি করার জন্য অনুরোধ করে ও নিরাপত্তা চায়। আর এতে মুসলিম বাহিনী বিজয়ী বেশে শহরে প্রবেশ করে।

৩.২.৪। অবরোধের সময় ধৈর্যধারণ
কিরয়ূন এবং আলেকজান্দ্রিয়া অবরোধের সময় আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অন্যতম অস্ত্র ছিল ধৈর্য। কিরয়ূনে বাইজেন্টাইনরা নিজেদের দুর্গে প্রতিরোধ গড়ে তুললে বিজয় অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি একবার আক্রমণ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু সেটি ব্যর্থ হয়। এ জন্য তিনি খণ্ডযুদ্ধেই সীমাবদ্ধ ছিলেন এবং কালক্ষেপণ করছিলেন যাতে রসদ ও যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ কমে গেলে শত্রুদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে। মূলত এ রকমই হয়েছিল। অবরোধ দশ দিন পর্যন্ত চলতে থাকলে বাইজেন্টাইনরা বুঝতে পারে যে, মুসলিম বাহিনী এটি অব্যাহত রাখার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর এবং তাদের নিকট আত্মসমর্পণ করে দুর্গ হস্তান্তর করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। আলেকজান্দ্রিয়া অবরোধের সময়ও একই ঘটনা ঘটে। তবে সেখানে অবরোধ আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলে; তিন মাস। কারণ, বাইজেন্টাইনরা পুরোপুরি সজাগ ছিল যে, এটিই তাদের সেনাবাহিনী বা সাম্রাজ্যের সর্বশেষ বাঁচা-মরার লড়াই; যদি তারা আলেকজান্দ্রিয়া ধরে রাখতে না পারে, তাহলে পুরো মিসর ও উত্তর আফ্রিকা হাতছাড়া হয়ে যাবে। বস্তুত তা-ই হয়েছিল।

৩.৩। খলীফার নিকট বিজয়ের সংবাদ প্রেরণ
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু মুআবিয়া ইবনে খাদিজকে বিজয়ের সংবাদ দিয়ে আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট প্রেরণ করেন। মুআবিয়া তাকে জিজ্ঞাসা করেন, 'আপনি তাকে চিঠি দিচ্ছেন না কেন?' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি কেন চিঠি লেখব? তুমি কি আরব নও, যে কিনা এ খবর পৌঁছাতে পারবে? তুমি কি সবকিছু দেখোনি?'

মুআবিয়া ইবনে খাদিজ আমীরুল মুমিনীনের নিকট এসে আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ের সকল ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেজদায় পড়ে যান এবং বলেন, 'আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা।' খলীফাকে বিজয়ের সংবাদ জানানোর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে মুআবিয়া ইবনে খারিজ বলেন : আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু আমাকে বিজয়ের সংবাদ দিয়ে খলীফার নিকট প্রেরণ করেন। আমি মদীনায় মসজিদে নববীতে পৌঁছে গেলাম এবং সেখানেই বসে ছিলাম। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাড়ি থেকে একজন দাসী বের হয়ে আসে এবং আমার দেহে সফরের পোশাক ও চেহারায় ক্লান্তির ছাপ দেখতে পায়। সে কাছে এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, 'আপনি কে?' আমি বললাম, 'আমি মুআবিয়া ইবনে খারিজ, আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর দূত।'

তারপর সে চলে যায়। একটু পর সে আবার খুব দ্রুত আমার দিকে আসতে থাকে। আমি তার পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। সে এসে বলে, 'চলুন। খলীফা আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।' আমি তাকে অনুসরণ করে পেছনে পেছনে গেলাম এবং ঘরে প্রবেশ করতেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখতে পেলাম। তিনি তখন এক হাতে চাদর ধরে আছেন, আর আরেক হাতে নিজের লুঙ্গি বাঁধছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী খবর নিয়ে এসেছ?' আমি বললাম, 'হে আমীরুল মুমিনীন, খুশির সংবাদ। আল্লাহ আমাদের আলেকজান্দ্রিয়ায় বিজয় দান করেছেন।' তিনি আমাকে মসজিদে নিয়ে গেলেন। মুআযযিনকে ডাকলেন এবং তাকে বললেন, 'তুমি জোরে লোকজনকে নামাযের জন্য ডাকো।' তারপর লোকজন জমা হলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আমাকে বললেন, 'দাঁড়াও। সকলকে বিজয়ের ঘটনা শোনাও।' সুতরাং আমি দাঁড়িয়ে আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ের পুরো ঘটনা তুলে ধরলাম। তারপর খলীফা নামায আদায় করলেন এবং নিজের ঘরে গিয়ে কিবলার দিকে ফিরে দুআ করলেন। তারপর তিনি বসে জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে বাঁদি, খাওয়ার কিছু আছে?' তখন সে কিছু রুটি ও তেল নিয়ে এল। খলীফা আমাকে সেখান থেকে খেতে বললেন। আমি সামান্যই খেলাম। কারণ, আমি লজ্জা পাচ্ছিলাম। তিনি বললেন, 'খাও। মুসাফিররা খাবার খেতে ভালোবাসে। আমার খাবারের প্রয়োজন থাকলে আমি তোমার সঙ্গে খেতাম।' তারপরেও আমি লজ্জায় বেশি খেতে পারলাম না।

খলীফা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে মুআবিয়া, মসজিদে এসে তুমি কি বলেছ?' আমি বললাম, 'আমি ভেবেছি, সম্ভবত খলীফা বিশ্রাম নিচ্ছেন।' তিনি বললেন, 'এ রকম বলা ঠিক হয়নি। এ রকম চিন্তাও ঠিক নয়। আমি যদি দিনে ঘুমাই, তাহলে প্রজাদের অবহেলা করলাম। আর যদি রাতে ঘুমাই, তাহলে নিজের প্রতি যুলুম করলাম। এই দুটি অবস্থা সামনে রেখে আমি কীভাবে ঘুমাব, হে মুআবিয়া?'

এই ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামের স্বর্ণযুগে মসজিদই ছিল রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খবরাখবর আদান-প্রদানের কেন্দ্র। আযান (আসসালাতু জামি‘য়াতুন) শুনে মুসলমানগণ সেখানে জমা হতেন। এই আযানে বোঝানো হতো, মুসলমানদের অবগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংবাদ রয়েছে। তারা জমা হলে রাষ্ট্রের সামরিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ফরমান পড়ে শোনানো হতো। এ ঘটনা থেকে খলীফা হিসাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবন-পদ্ধতি সম্পর্কেও জানা যায়; যেমনটি মুআবিয়া ইবনে খারিজ বলেন, ‘আমি যদি দিনে ঘুমাই, তাহলে প্রজাদের অবহেলা করলাম। আর যদি রাতে ঘুমাই, তাহলে নিজের প্রতি যুলুম করলাম। এই দুটি অবস্থা সামনে রেখে আমি কীভাবে ঘুমাব, হে মুআবিয়া?’ এ কথা থেকে প্রমাণিত হয়, তিনি নিজের হক এবং প্রজাদের হক সম্পর্কে পুরোপুরি যত্নবান ছিলেন। যদি কোনো মুসলমান এই দুটোর সম্মিলন ঘটাতে পারে, তাহলেই তিনি একজন সত্যিকার নেককার বান্দায় পরিণত হবেন।

৩.৪। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উমর রা.-এর সর্বাত্মক চেষ্টা
বিজয়ী মুসলিম বাহিনী যখন বিলহীবে পৌঁছল, তখন তাদের হাতে যুদ্ধবন্দীরাও ইয়েমেনে গিয়ে পৌঁছে। এ-সময় আলেকজান্দ্রিয়ার শাসক মুসলিম সেনাপতি আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট লিখে পাঠান : আমি আপনাদের চেয়ে ঘৃণিত শাসকদের জিযিয়া প্রদান করি; পার্সিয়ান এবং বাইজেন্টাইন। আমি আপনাদের জিযিয়া দিতেও রাজি আছি। তবে সেটি এই শর্তে যে, আমাদের দেশ থেকে যাদের আপনারা বন্দী করে নিয়ে গিয়েছেন, তাদের ফেরত দিতে হবে।’ আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ শর্ত পূরণ করার অনুমতি চেয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট চিঠি প্রেরণ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জবাব না আসা পর্যন্ত উভয়পক্ষ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে লেখেন: বস্তুত গনীমতের মালের চেয়ে জিযিয়া আমাদের নিকট বেশি প্রিয়। কারণ, গনীমতে মাল বণ্টন করার পর সেগুলোর অস্তিত্বই ছিল না। আর যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে এই শর্তারোপ করুন যে, তাদের সম্রাট জিযিয়া প্রদান করতে চাইলে বন্দীদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তবে তাদের এই অধিকার থাকবে যে, তারা চাইলে ইসলাম গ্রহণ করতে পারবে, অথবা নিজেদের ধর্মে থাকতে পারবে। যারা ইসলাম গ্রহণ করবে, তারা মুসলিম হিসাবে সব অধিকার ভোগ করবে। আর যারা আগের ধর্মেই থাকবে, তাদের ওপর জিযিয়া আরোপ করবেন। তবে যারা দাস হিসাবে ইতিমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় চলে গিয়েছে, তাদের আমরা ফিরিয়ে দিতে পারব না।'

আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আলেকজান্দ্রিয়ার সম্রাটের নিকট এই প্রস্তাব পেশ করেন এবং তিনি তা মেনে নেন। পরবর্তী সময়ে মুসলমানগণ বন্দীদের একত্র করেন। সেখানে খ্রিস্টানরাও এসে জমা হয়। তারা বন্দীদের এক এক করে সবাইকে সুযোগ দেওয়া হয়। যখনই কেউ ইসলাম পছন্দ করত, তখনই মুসলমানগণ তাকবীর দিয়ে উঠতেন। আর যখন কেউ খ্রিষ্টধর্মকেই বেছে নিত, তখন মুসলমানগণ আফসোস করতেন এবং তার ওপর জিযিয়া আরোপ করতেন।

এ ঘটনা থেকে সাহাবীদের দুনিয়ার প্রতি চরম বিমুখতার পরিচয় পাওয়া যায়। তারা কেবলই আখেরাতের দিকে ধাবিত ছিলেন। তারা একনিষ্ঠভাবে মানুষকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দিয়েছেন। কারণ, বন্দীদের ইসলাম গ্রহণ করাতে মুসলমানদের দুনিয়াবি কোনো সম্পদের মালিক হওয়ার সুযোগ ছিল না; বরং তারা যদি তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মে থেকে যেত, তাহলে তার নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করা সম্ভব হতো। এতৎসত্ত্বেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বন্দীদের ইসলাম অথবা জিযিয়া বেছে নেওয়ার সুযোগ দিতে আদেশ দিয়েছেন। এ আদেশ যখন পালন করা হয়, তখন দেখা যায় যে, সাহাবায়ে কেরাম ও অন্যান্য মুসলমানগণ বন্দীদের কেউ ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলে যুদ্ধ বিজয়ের আনন্দের চেয়েও অধিক জোরে তাকবীর-ধ্বনি দিয়েছেন। আর অন্যদিকে কেউ তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মে থেকে গেলে তারা অসন্তুষ্ট হয়েছেন। উল্লেখ্য, সাহাবায়ে কেরাম প্রতিশ্রুতি পালনে বদ্ধপরিকর ছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যেমন বলেছেন, 'তবে যারা (দাস হিসাবে ইতিমধ্যে) বিভিন্ন জায়গায় চলে গিয়েছে, তাদের আমরা ফিরিয়ে দিতে পারব না।' আরেক বর্ণনায় রয়েছে, তিনি বলেছেন, 'আমরা তার সঙ্গে এমন শর্তে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করতে চাই না, যা আমরা পূরণ করতে সক্ষম নই।’

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যেকোনো চুক্তি করার আগে তার শর্তসমূহের বাস্তবতা যাচাই করতেন যাতে পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের শর্তপূরণে অপারগতা প্রদর্শন করতে না হয়। এ থেকেই তাদের সুউচ্চ ঈমানের পরিচয় পাওয়া যায়—যা বিজয়ের পূর্বশর্ত—কারণ, যদি কেউ কোনো কিছু নিজের ওপর আবশ্যক করে নেয় এবং পরে সেটি পূরণে অপারগ হয়ে ওঠে, তাহলে হয়তো সেটি ক্ষমার যোগ্য, কিন্তু যদি পূর্ব থেকেই সতর্ক থাকে যেন তাকে পরে অপারগতা প্রকাশ করতে না হয়, তাহলে সেটি তার দূরদর্শিতা এবং দৃঢ় পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচ্য।

৩.৫। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা.
আমরা রাযিয়াল্লাহু আনহু আলেকজান্দ্রিয়া অভিমুখে অভিযান পরিচালনার সময় পথে বিভিন্ন জায়গায় শত্রুর মুখোমুখি হন এবং এতে বিজয় লাভ করেন। উল্লেখ্য, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কিরয়ূন যুদ্ধে বেশ কয়েকবার মারাত্মকভাবে আহত হন। তখন তার পিতার পক্ষ থেকে দূত এসে তার খোঁজখবর নিলে তিনি কবিতার মাধ্যমে এর জবাব দিতেন :

اقول اذا ما جائت النفس اصبري فعما قليل تحمدى أو تلامي
যখন ব্যথা খুব বেশি বেড়ে যায়, তখন আমি নিজেকে বলি ধৈর্যধারণ করো; কারণ, শীঘ্রই তুমি প্রশংসিত অথবা অপমানিত হবে।

দূত ফিরে গিয়ে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এ কথা জানালে তিনি বলেন, 'সত্যিই সে আমার ছেলে।'
এ রকমই ছিল আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার দৃষ্টান্ত। তিনি তার জ্ঞান ও ইবাদতের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি সাহস ও ধৈর্য দিয়ে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেন।

৩.৬। মিসরে খলীফার জন্য একটি বিশ্রামাগার নির্মাণ
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফাকে অবহিত করেন যে, ‘আমরা আপনার জন্য মসজিদের পাশে একটি বিশ্রামাগার নির্মাণ করেছি।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এর জবাবে লেখেন, ‘আমি তো হেজাজে থাকি। মিসরে বাড়ি দিয়ে আমি কী করব?’ তিনি এতে আদেশ দেন, ‘ওই জায়গায় মানুষের জন্য হাট-বাজার বানিয়ে দাও।’

এ ঘটনা থেকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিজেকে সংযত করা এবং তাঁর দুনিয়াবিরাগী মানসিকতার পরিচয় ফুটে ওঠে। যদি কোনো নেতা বা শাসক নিজেকে দুনিয়ার লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে রাখে, তাহলে তাঁর অধীনদের জন্য এসব বিষয় থেকে আরও দূরে থাকা উচিত।

৩.৭। মুসলমানদের কর্তৃক আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি পুড়িয়ে ফেলার অযৌক্তিক দাবি
ড. আব্দুর রহীম মুহাম্মাদ আব্দুল হামীদ বলেন: আমরা নির্ভরযোগ্য এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত বা বর্ণনা পাইনি যেখানে বলা হয়েছে যে, আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি পুড়িয়ে ফেলেছেন। কেবল ইবনে আল-কাফতির একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, যিনি ইবনে আল-আবারি (মৃ. ৬৮৫ হি./১২৮৬ খ্রি.) যেখানে বলা হয়েছে : ইয়াহইয়া আল-নাহাবিযে—মুসলমানদের হাতে পতনের পূর্ব পর্যন্ত আলেকজান্দ্রিয়ার অধিবাসী ছিল—আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখতে যান। ইয়াহইয়া তাঁর জ্ঞানের জন্য পরিচিত ছিলেন। সুতরাং আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে সম্মান করেন এবং তাঁর নিকট থেকে অনেক দার্শনিক কথা শোনেন, যেগুলোর সঙ্গে আরবরা পরিচিত ছিল।’ ইবনে আল-কাফতি এ ঘটনার শেষে বলেন, ‘আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বলেন, ‘আপনি আমাদের নিকট কী চান?’ তিনি বলেন, ‘রাজপ্রাসাদের লাইব্রেরিতে যেসব দর্শনের কিতাব রয়েছে, সেগুলো আমাকে দিয়ে দেন।’ তখন লাইব্রেরিতে প্রায় পঁয়তাল্লিশ হাজার এক শ বিশটি কিতাব ছিল। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই দাবিকে বাড়াবাড়ি মনে করে তিনি বলেন, 'আমি খলীফার নির্দেশ ব্যতীত এ রকম আদেশ দিতে পারব না।' তিনি খলীফার নিকট এ বিষয়ে চিঠি প্রেরণ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এর জবাবে লেখেন : তুমি কিতাবের ব্যাপারে তুমি যা লেখেছ, এসব কিতাবের বিষয়বস্তু যদি কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তাহলে সেগুলো রাখা যেতে পারে। আর যদি কোনো কিতাবের বিষয়বস্তু কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে সেগুলো আমাদের প্রয়োজন নেই। সুতরাং সেগুলো ধ্বংস করে ফেলো।' এ নির্দেশ পাওয়ার পর আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ওইসব কিতাব আলেকজান্দ্রিয়ার গোসলখানায় প্রেরণ করতে শুরু করেন যাতে সেখানে পানি গরম করার কাজে কিতাবগুলো ব্যবহার করা যায়। আমি গোসলখানার সংখ্যা জানতাম, কিন্তু এখন ভুলে গিয়েছি। লোকজন আমাকে বলেছে, সবগুলো কিতাব পুড়িয়ে ফেলতে ছয় মাস সময় লেগেছে। এ ঘটনা শুনে আমি বিস্ময় প্রকাশ করলাম।

তবে ইবনে আল-কাফতি এবং ইবনে আল-আবারির পূর্বেও এই কিতাব পোড়ানোর ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। আব্দুল লতীফ আল-বাগদাদী (মৃ. ৬৪৯ হি./১২৩১ খ্রি.) বলেন, 'আলেকজান্দ্রিয়া শহর গড়ে তোলার সময়ই আলেকজেন্দার একটি বিশাল লাইব্রেরি নির্মাণ করেন। এই লাইব্রেরির সব কিতাব আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশে পুড়িয়ে ফেলেন।'

এসব বর্ণনা বিশ্লেষণ করলে নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ লক্ষ করা যায় :
১। এই তিনটি বর্ণনা অথবা বর্ণনাকারীদের মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই, যদিও তারা একই সময় দুনিয়াতে ছিলেন।
২। এসব বর্ণনায় কোনো রাবীর নাম উল্লেখিত হয়নি; বরং এটি পরিষ্কার যে, এসব বর্ণনা স্বয়ং লেখকেরই কল্পনাপ্রসূত বর্ণনা।
৩। মিসর বিজয় ও আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগ থেকে অনেক পরে ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সুতরাং আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি এ ঘটনা পুরোটাই ভিত্তিহীন এবং এতে নিচের মন্তব্যসমূহ করা যায় :
৪। মিসর ও মিসর বিজয়ের ইতিহাস যারা লিপিবদ্ধ করেছেন, তাদের কেউ এই ঘটনা বর্ণনা করেননি। এসব ইতিহাসবিদ উল্লেখিত তিনজন লেখকের কয়েক শতাব্দী আগেই দুনিয়াতে এসেছিলেন।
৫। আল-ওয়াকিদি, আত-তাবারি, ইবনে আসির কিংবা ইবনে খালদুন কেউই এ ঘটনা বর্ণনা করেননি। ইবনে আব্দুল হাকাম এবং এমনকি ইয়াকুত আল-হামাবিও আলেকজান্দ্রিয়ার বর্ণনায় এর উল্লেখ করেননি।
৬। ক্রুসেডের সময়ই বাগদাদীর মাধ্যমে এই ঘটনাটির সূত্রপাত। সম্ভবত তিনি চাপের মুখে এই ভিত্তিহীন ঘটনা লিপিবদ্ধ করেন অথবা পরবর্তী সময়ে অন্য কেউ লিখে তার দিকে তা সম্পৃক্ত করেছে।
৭। আর যদি এ ধরনের কোনো লাইব্রেরির অস্তিত্ব থেকেই থাকে, তাহলে বাইজেন্টাইনরা আলেকজান্দ্রিয়া ত্যাগ করার সময় সেগুলো সঙ্গে নিয়ে গেছে এবং সম্ভবত তারা তা করেছে।
৮। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে না পুড়িয়ে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চাইলে মুহূর্তেই কিতাবগুলো সমুদ্রে ফেলে দিতে পারতেন। আর এটিই ঘটনাটি ভিত্তিহীন হওয়ার মূল কারণ। সুতরাং আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ ঘটনার ব্যাপারে কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট নন। এগুলো ওইসব লোকদের বানানো কিচ্ছাকাহিনি, যারা বাড়িয়ে বলতে পছন্দ করে এবং তারাই কল্পনাপ্রসূত এসব কাহিনি লিপিবদ্ধ করে গিয়েছে যা আসলে কখনো ঘটেনি।

৩.৮। আমর ইবনুল আস রা. এবং পাদরি বিন ইয়ামিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ
ইতিহাসবিদ ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, আলেকজান্দ্রিয়ায় একজন কিবতি পাদরি বসবাস করতেন, যার নাম বিন ইয়ামিন। খ্রিস্টান বাইজেন্টাইনদের হাতে ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব হওয়ায় তিনি মরুভূমিতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। যখন তিনি শুনলেন যে, মুসলিম সেনাপতি আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু মিসরে আগমন করেছেন, তখন তিনি কিবতিদের নিকট একটি চিঠি প্রেরণ করেন। তাতে তিনি লেখেন যে, বাইজেন্টাইনরা আর তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে না এবং শীঘ্রই তাদের সাম্রাজ্যের পতন ঘটবে। সুতরাং তিনি তাদের আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে স্বাগত জানানোর আহ্বান করেন।

বলা হয় যে, ফারমা যুদ্ধের দিন কিবতিরা আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য আনসারদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। ওই সময় কিবতি ইতিহাসবিদ সাবিরি ইবনে আল-মুকান্না কিবতিদের সর্দার ছিলেন এবং বিন ইয়ামিনের অনুপস্থিতিতে চার্চের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বিন ইয়ামিনের অজ্ঞাত স্থানের সন্ধান বলে দেন। এটিও বলেন, তিনি বাইজেন্টাইনদের ভয়েই পালিয়ে গিয়েছেন। তখন আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার নিযুক্ত প্রশাসকদের লিখে পাঠালেন তারা যেন বিন ইয়ামিনকে খুঁজে বের করে এবং তাকে নিজ এলাকায় চার্চ ও লোকজনের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রেরণ করে। এতে তার ভয়ের কোনো কারণ নেই এবং তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নিরাপত্তার অঙ্গীকার রয়েছে। এ খবর পেয়ে বিন ইয়ামিন তেরো বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসনের অবসান ঘটিয়ে অত্যন্ত খুশিমনে আলেকজান্দ্রিয়ায় ফিরে আসেন। তখন সমগ্র শহরর লোকজন তাকে পেয়ে আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার ফিরে আসার সংবাদ পেয়ে তাকে পূর্ণ সম্মান ও ইযযতের সঙ্গে তার সামনে হাজির করতে বলেন।

বিন ইয়ামিনকে দেখে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে তার প্রাপ্য সম্মান প্রদর্শন করেন এবং সঙ্গীদের বলেন, 'এ শহর অধিগ্রহণ পর থেকে তার মতো মানুষ আমি আর দেখিনি।' বিন ইয়ামিন দেখতে খুব সুদর্শন ছিলেন। কথা-বার্তায়ও খুব মার্জিত ছিলেন। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে লক্ষ করে বলেন, 'আপনার চার্চ ও লোকজনের দেখভাল করুন; তারা সবাই আপনার নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে এবং তাদের ব্যাপারাদির ব্যাপারে আপনিই দায়িত্বশীল।' প্রফেসর আশ-শারকাবি মন্তব্য করেন, 'আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে সঙ্গে রাখেন, যতক্ষণ-না তাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয় এবং মিসর বিজয়ী আরবরা প্রশান্তি অনুভব করে। তাদের গভর্নর আমর ইবনুল আস প্রথম জুমু'আয় লোকজনের উদ্দেশে বক্তব্যে বলেন, 'তোমাদের পড়শি কিবতিদের সঙ্গে ভালো আচরণ করবে। কারণ, তাদের নিরাপত্তা তোমাদের হাতে এবং বিবাহের সূত্রে তারা তোমাদের আত্মীয়ও বটে। সুতরাং তাদের কোনো ক্ষতি করবে না। তাদের মহিলাদের দিকে কোনো কুনজর দেবে না; বরং নজর নিচে রাখবে।'

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 বিজয় অভিযানসমূহ থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

📄 বিজয় অভিযানসমূহ থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা


৪.১। ইসলামী বিজয়ের প্রকৃতি
অনেক প্রাচ্যবিদ ও খ্রিস্টান ইতিহাসবিদ খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে সংঘটিত ইসলামী বিজয় অভিযানসমূহকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে। তারা দাবি করে, এসব অভিযান ছিল ধর্মীয় যুদ্ধ। তারা নির্দিষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী হলেও ধর্মান্ধতার বশবর্তী হয়ে লোকজনকে জোর করে অধীন ও তাদের ধর্মীয় বিধান মানতে বাধ্য করে এবং নির্মম রক্তপাতে মেতে ওঠে। তারা আরও দাবি করে, মুসলমানগণ এক হাতে কুরআন এবং আরেক হাতে তরবারি বহন করত। যারা এসব ভ্রান্ত মতাদর্শ প্রচারে লিপ্ত ছিল, তাদের মধ্যে সিডিও, মুইর এবং নিপুর উল্লেখযোগ্য। মুইর নিপুরের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলে, 'ইসলাম ধর্মের টিকে থাকার স্বার্থে একের পর এক আক্রমণাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অপরিহার্য ছিল এবং তারা তরবারির জোরে সব লোকজনকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে থাকে, অথবা নিদেনপক্ষে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব বিস্তার করে। তবে যেকোনো ধর্মের অনুসারীদের জন্য এক পর্যায়ে যুদ্ধ এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং ইসলামের ক্ষেত্রে তা-ই ঘটেছিল।'

কিন্তু তাদের এই দাবি—মুসলমানগণ জোরজবরদস্তি করে ইসলামের প্রচার-প্রসার ঘটিয়েছে কিংবা তারা অন্য ধর্মাবলম্বীদের থেকে বেশি আক্রমণাত্মক ছিল—সম্পূর্ণ মিথ্যা ও অযৌক্তিক। কিছু প্রাচ্যবিদ এ দাবির অসারতা বর্ণনা করেছেন এবং তারা দেখিয়েছেন, ইসলামের বিজয়সমূহ ছিল মানবতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। ভন ক্রিমার বলেন, 'মুসলিম আরবগণ তাদের যুদ্ধে চমৎকার মানবিক আচরণ প্রদর্শন করেছেন। তাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাদরি, মহিলা, শিশু, অন্ধ কিংবা প্রতিবন্ধীদের হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি তাদের শস্য ও গাছ কেটে ফেলতেও নিষেধ করেছেন। মুসলমানগণ পরবর্তী সময়ে সকল যুদ্ধে এ নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছেন। তারা কোনো পবিত্র স্থান কিংবা ফসলের ক্ষতি করেনি। তবে বাইজেন্টাইনরা মুসলমানদের দিকে বিষযুক্ত তির নিক্ষেপ করেছে। তারা শত্রুদের প্রতি বিন্দুমাত্র সহমর্মিতা প্রদর্শন করেনি। শহর লুটতরাজ করা এবং তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া বাইজেন্টাইনদের জন্য ছিল খুবই স্বাভাবিক কাজ, যা তারা অগ্রসর বা পালিয়ে যাওয়া—উভয় ক্ষেত্রেই করেছে। কিন্তু মুসলমানগণ তাদের আদর্শ মেনে চলেছে এবং এসব কর্মকাণ্ডের কোনোটি কখনো করার চেষ্টা করেনি।'

রোসেনথাল বলেন, 'অন্য ভূখণ্ডে ইসলামের বিস্তৃতি, অন্যকে ইসলামের দিকে আহ্বান এবং ভিন্ন ধর্মের চিন্তাশীল জাতি-গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্তি-তর্ক করা—সবকিছুই ঘটেছে। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, ইসলামের বিজয় ভাষা ও কৃষ্টি-কালচারের প্রাচীন সব বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম হয় এবং এটি সকল মানুষ ও সভ্যতার সামনে এক বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের দৃষ্টান্ত পেশ করে, যার ভিত্তি ছিল পরিপূর্ণ সাম্য ও স্বাধীনতা।'

ঐতিহাসিক বাস্তবতা হচ্ছে, মুসলিম জাতি কাউকে জোর করে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেনি। কারণ, তারা আল্লাহর দেওয়া বিধান পরিপূর্ণভাবে মেনে চলেছে। আল্লাহ বলেন,

لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ قَدْ تَبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنْ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى لَا انْفِصَامَ لَهَا وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হিদায়াত স্পষ্ট হয়েছে ভ্রষ্টতা থেকে। অতএব, যে ব্যক্তি তাগূতকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, অবশ্যই সে মজবুত রশি আঁকড়ে ধরে, যা ছিন্ন হবার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

ইসলামের সৌন্দর্য দেখেই মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। এটি ছিল তাদের ওপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। তারা ইসলামের অনুশাসনে মুসলমানদের সদাচরণ প্রত্যক্ষ করেছে। তারা তাদের যাবতীয় আদেশ-নিষেধসহ ইসলামী শিক্ষার পরিপূর্ণ অনুসরণ করতে দেখেছে। তারা মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ও সৈনিকদের কথা ও আচরণে মিল খুঁজে পেয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে মুসলিম সৈনিকদের মতো মহান আচরণের দৃষ্টান্ত আর নেই। খলীফা এবং সেনাপতি তাদের সৈনিকদের আল্লাহর সাহায্য কামনা করা ও তার প্রতি ভয় ধারণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন, দুনিয়া থেকে আখেরাতকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন, একনিষ্ঠভাবে জিহাদে অংশগ্রহণ করতে আদেশ দিয়েছেন, যা কিছুই তারা করুক না কেন, তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি তালাশ ও গোনাহ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। তারা জাতি ও ব্যক্তিকে অন্যের পূজা করা থেকে বিরত রাখার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর ছিলেন, যাতে তারা কেবল এক আল্লাহর ইবাদত করতে পারে এবং তাদের দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবন মুক্ত হয়ে চিরস্থায়ী জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারেন।

মুসলিম সেনাপতিরা বাহিনীর সর্বাগ্রে থেকে লড়াই করেছেন, যুদ্ধের প্রথম আঘাত প্রতিহত করেছেন এবং তাদের অনেকে শাহাদাত বরণ করেছেন। আর শান্তির সময় সেনাপতিরা বাহিনীর পেছনে অবস্থান করেছেন, যাতে অন্যদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা যায়, দলের বোঝা বহন এবং দুর্বলদের সাহায্য করা যায়। দলের নেতারাই সর্বপ্রথম ও অগ্রগামী দাঈ, যারা রণক্ষেত্রে ইসলামী যুদ্ধের বিধি-বিধান পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করেছেন। বস্তুত মুসলমানগণ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই জিহাদ করেছেন এবং জাগতিক কোনো তাড়নায় তারা অন্যান্য জাতির মতো যুদ্ধে লিপ্ত হননি।

৪.২। সেনাপতি নির্ধারণে উমর রা.-এর কর্মপন্থা
বিভিন্ন অভিযানে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি নির্বাচনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা ছিল। তিনি এ জন্য বেশ কিছু শর্ত ও যোগ্যতা নির্ধারণ করেছিলেন। নিচে এগুলো বর্ণনা করা হলো।

৪.২.১। ইসলামী বিধি-বিধানে অভিজ্ঞ, ধার্মিক ও নেককার হওয়া
তিনি বলতেন, 'যদি কেউ জেনেশুনে কোনো সন্ত্রাসীকে কোনো পদে নিয়োগ দেয়, তাহলে সেও সন্ত্রাসী।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার কিছু অংশের গভর্নর হিসাবে সাঈদ ইবনে আমরকে নিয়োগ দেন। তাকে এ সংবাদ জানানো হলে তিনি তা গ্রহণে অস্বীকার করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'না। ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, আমার কাঁধে সব বোঝা চাপিয়ে নিজে ঘরে বসে থাকবেন না।'

৪.২.২। ধীরস্থিরতা ও সতর্কতা অবলম্বন
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু উবাইদ আস-সাকাফিকে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়ে তাকে বলেন, 'সুলাইতকে সেনাপতি নিয়োগ করতে আমাকে কেউ বাধা দিতে পারত না। যুদ্ধে তাড়াহুড়া করার মানসিকতার কারণেই আমি তা করিনি। পরিষ্কার নিদর্শন ছাড়া রণক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করলে নিশ্চিত পরাজয় বরণ করতে হবে। আল্লাহর কসম, যদি তার মধ্যে তাড়াহুড়া করার মানসিকতা না থাকত, তাহলে তাকেই সেনাপতি নির্বাচন করতাম। যুদ্ধে ধীরস্থির থাকার চেয়ে সঠিক কোনো কাজ নেই।'

৪.২.৩। সাহসী ও বীর এবং দক্ষ তিরন্দাজ
নাহাওয়ান্দ বিজয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম সেনাবাহিনীর একজন সেনাপতি নির্বাচন করতে চাইলেন। এ জন্য তিনি লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। তারা বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি ইরাকের লোকজনের ব্যাপারে ভালো জানেন। আপনার সৈন্যরাও এখানে এসেছে। আপনি তাদের দেখেছেন এবং তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি তাদের জন্য এমন একজন সেনাপতি নিয়োগ করতে চাই, যে রণক্ষেত্রে শত্রুর মোকাবিলায় প্রচণ্ড সাহসী ভূমিকা রাখতে পারবে।' তারা জিজ্ঞাসা করলেন, 'কে তিনি, হে আমীরুল মুমিনীন?' তিনি বললেন, 'আন-নুমান ইবনে মুকরিন আল-মুযানি।' তারা বললেন, 'তিনি এর যোগ্য।'

৪.২.৪। জ্ঞানী ও বিনয়ী হওয়া
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমার ওপর আপনাদের এই অধিকারও রয়েছে যে, আমি আপনাদের আত্মঘাতী কোনো অভিযানে পাঠাব না অথবা সীমান্ত চৌকিতে দীর্ঘদিন ধরে পাহারায় রাখব না।' আজনাদিন যুদ্ধে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তার সেনাবাহিনী বাইজেন্টাইনদের মোকাবিলা করছিল। বাইজেন্টাইন কমান্ডার ছিল আরতাবুন। সে ছিল বাইজেন্টাইনদের মধ্যে সবচেয়ে ধূর্ত ও বুদ্ধিমান, দূরদর্শী ও চরম বিশ্বাসঘাতক। রামলা এবং ইলিয়া (জেরুযালেম)-এ সে প্রচুর সৈন্য মোতায়েন করে রাখে। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণসহ খলীফার নিকট পরামর্শ ও নির্দেশনা চেয়ে চিঠি প্রেরণ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বিখ্যাত উক্তি করেন : আমরা বাইজেন্টাইন আরতাবুনের বিরুদ্ধে আরবের আরতাবুনকে প্রেরণ করেছি। দেখি আমরা কীভাবে এর মীমাংসা হয়।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেই যখন আরতাবুন ও তার বাহিনী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে গমন করেন যাতে একটি জুতসই যুদ্ধ পরিকল্পনাপ্রণয়ন করতে সক্ষম হন, তখন তিনি বাইজেন্টাইন নেতার ঘাঁটিতে প্রবেশ করেন। তিনি প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি পৌঁছে গিয়েছিলেন, কিন্তু আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু আরতাবুনকে ধোঁকা দিতে সক্ষম হন। এ সংবাদ পেয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমর তাকে পরাজিত করেছে। আমর কতই-না বিচক্ষণ ব্যক্তি!'

৪.২.৫। সেনাপতিকে বিচক্ষণ ও বাগ্মী হতে হবে, যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে গভীর জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ হতে হবে।
আল-মুগনির লেখক (ইবনে কুদামাহ আল-হাম্বলী) বলেন, 'সামরিক নেতাকে হতে হবে বুদ্ধিমান, কৌশলী। শত্রুর গতিবিধি সম্পর্কে দূরদর্শী হওয়ার সঙ্গে তার যুদ্ধ সম্পর্কেও গভীর জ্ঞান রাখতে হবে। তাকে সৈন্যদের প্রতি বিশ্বস্ত, দয়ালু এবং একনিষ্ঠ হতে হবে।' এ কারণেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকজনের সঙ্গে পরামর্শ করে ইরাক যুদ্ধে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সেনাপতি নির্বাচন করেন।

৪.২.৬। দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনপদ্ধতির একটি নীতি ছিল, তিনি এমন কাউকে কোনো কাজের দায়িত্ব দিতেন না, যে কাজে ব্যক্তির কোনো আগ্রহ নেই এবং সংশ্লিষ্ট কাজের ব্যাপারে তার জ্ঞানও যথেষ্ট নয়। একান্ত অপারগ না হলে তিনি এর ব্যত্যয় ঘটাতেন না। তার মূল লক্ষ্যই ছিল প্রতিটি কাজ যেন সুষ্ঠুভাবেই সম্পন্ন হয়। একদিন তিনি লোকজনকে পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার আহ্বান জানান। কিন্তু কেউই স্বেচ্ছায় রাজি হয়নি। পরের দিন তিনি আবার একই আহ্বান করেন, সেদিনও কেউ দাঁড়ায়নি। তৃতীয় দিনও একই ঘটনা ঘটে। চতুর্থ দিন প্রথম ব্যক্তি হিসাবে আবু উবাইদ ইবনে মাসউদ আস-সাকাফি উঠে দাঁড়ান। পরবর্তী সময়ে লোকজন তাকে অনুসরণ করে। তিনি আবু উবাইদকে দলের সেনাপতি নির্বাচন করেন। কারণ, তিনি এ কাজের যোগ্য বিবেচিত হন, যদিও তিনি সাহাবী ছিলেন না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলা হলো, 'আপনি সাহাবীদের মধ্য হতে একজনকে সেনাপতি নিয়োগ করলেন না কেন?' তিনি জবাব দিলেন, 'আমি তাকে নিয়োগ দিয়েছি কারণ, সে-ই প্রথম জিহাদে সাড়া দিয়েছে।' এসব গুণ সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মধ্যে সমুজ্জ্বল ছিল।

৪.৩। উমর রা.-এর প্রেরিত চিঠি থেকে আল্লাহ ও সেনাপতির অধিকার
৪.৩.১। আল্লাহর হক
চিঠি ও সকল আলাপ-আলোচনায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সেনাপতি ও সৈন্যদের সব সময় আল্লাহর হক সম্পর্কে সচেতন থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। এসব হকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে :

সহ্যক্ষমতা ও ধৈর্য শত্রুর চেয়ে বেশি হওয়া
মহান আল্লাহ বলেন,

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধরো ও ধৈর্যে অটল থাকো এবং পাহারায় নিয়োজিত থাকো। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফল হও।

সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ইরাকে প্রেরণের পূর্বে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে ধৈর্যধারণের গুরুত্ব মনে করিয়ে দেন এবং বলেন : 'মনে রাখবেন, প্রতিটি ভালো কাজের জন্যই কিছু গুণ থাকা আবশ্যক। ভালো কাজের জন্য প্রয়োজন ধৈর্য। আপনার ওপর আপতিত সকল বিপদ ও ঘটনায় যদি ধৈর্যধারণ করতে পারেন, তাহলে আপনি আল্লাহর ভয় অর্জন করতে সক্ষম হবেন। তিনি সিরিয়ায় অবস্থানরত আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লেখেন: 'ধৈর্যশীলদের জন্যই আল্লাহর প্রশংসা। আল্লাহ বলেন,

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ كَفَرُوا وَ قَالُوا لِإِخْوَانِهِمْ إِذَا ضَرَبُوا فِي الْأَرْضِ أَوْ كَانُوا غُزَّى لَوْ كَانُوا عِنْدَنَا مَا مَاتُوا وَ مَا قُتِلُوا
لِيَجْعَلَ اللَّهُ ذَلِكَ حَسْرَةً فِي قُلُوبِهِمْ وَ اللَّهُ يُحْيِ وَيُمِيتُ وَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ وَلَئِنْ قُتِلْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ مُتُّمْ لَمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللهِ وَرَحْمَةٌ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُوْنَ وَلَئِنْ مُّتُّمْ أَوْ قُتِلْتُمْ لَا إِلَى اللَّهِ تُحْشَرُونَ
আর কত নবী ছিল, যার সাথে থেকে অনেক আল্লাহওয়ালা লড়াই করেছে। তবে আল্লাহর পথে তাদের ওপর যা আপতিত হয়েছে তার জন্য তারা হতোদ্যম হয়নি। আর তারা দুর্বল হয়নি এবং তারা নত হয়নি। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন। আর তাদের কথা শুধু এই ছিল যে, তারা বলল, 'হে আমাদের রব, আমাদের পাপ ও আমাদের কর্মে আমাদের সীমালঙ্ঘন ক্ষমা করুন এবং অবিচল রাখুন আমাদের পা-সমূহকে, আর কাফির কওমের ওপর আমাদের সাহায্য করুন'। অতঃপর আল্লাহ তাদের দিলেন দুনিয়ার প্রতিদান এবং আখিরাতের উত্তম সওয়াব। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।

এ দুনিয়ার পুরস্কার হচ্ছে বিজয় ও গনীমত। আর আখেরাতের পুরস্কার হচ্ছে ক্ষমা ও জান্নাত।'
আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু চিঠিটি সকলের সম্মুখে পড়ে শোনান। তিনি তাদের আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জিহাদ করতে বলেন এবং তাদের ধৈর্যধারণ করতে বলেন, যাতে আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখেরাতের পুরস্কার দান করেন।

আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য করাই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব ভালোভাবেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথাকে হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন : 'আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার জন্য যে লড়াই করবে, তা মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই।' এ জন্য আমরা দেখি, তার জীবন, তার উপদেশ এবং তার চিঠিপত্রে এই গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাই প্রতিফলিত হয়েছে।

আমানত রক্ষা করা
মহাকরুণাময় আল্লাহ বলেন,

وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ وَمَنْ يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيمَةِ ۚ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
আর কোনো নবীর জন্য উচিত নয় যে, সে খিয়ানত করবে। আর যে খিয়ানত করবে, কিয়ামতের দিনে উপস্থিত হবে তা নিয়ে, যা সে খিয়ানত করেছে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে পুরোপুরি দেওয়া হবে, যা সে উপার্জন করেছে এবং তাদের ওপর যুলুম করা হবে না।

সেনাপতি ও সৈন্যদের প্রতি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর একটি অন্যতম উপদেশ হলো, বণ্টন করার আগেই কেউ যেন গনীমতের মাল চুরি না করে। তিনি বলেন, 'শত্রুর মোকাবিলায় পিছু হটে যেয়ো না এবং গনীমতের সম্পদ সংগ্রহের পর তা থেকে কোনো কিছু চুরি কোরো না।'

আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যে কারও প্রতি পক্ষপাত কোরো না
পক্ষপাত সম্পর্কে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রসিদ্ধ একটি উক্তি হচ্ছে: 'যে কেউ কাউকে পক্ষপাতিত্ব করে কিংবা আত্মীয়তার কারণে নিয়োগ দেবে এবং এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো কারণ থাকবে না, তাহলে সে আল্লাহ ও তার রাসূলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল। আর যে কেউ পাপাচারী কোনো ব্যক্তিকে জেনেশুনে নিয়োগ দেবে, তাহলে সেও তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে।'

৪.৩.২। সেনাপতিদের হক
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার চিঠিপত্রে এবং আদেশ-নির্দেশে সেনাপতিদের হক সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন, যা নিচে দেওয়া হলো:

সম্পূর্ণ আনুগত্য
আবু উবাইদ ইবনে মাসউদ আস-সাকাফিকে ইরাক যুদ্ধে সেনাপতি হিসাবে প্রেরণের সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সঙ্গে সালামা ইবনে আসলাম আল-খাযরাযি রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং সুলাইত ইবনে কাইস আল-আনসারি রাযিয়াল্লাহু আনহুকেও প্রেরণ করেন। তিনি আবু উবাইদকে নির্দেশ দেন, তাদের পরামর্শ ছাড়া এককভাবে যেন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা না হয়। তাকে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তারা বদরী সাহাবী। তারপর আবু উবাইদ পারসিকদের সঙ্গে সেতুযুদ্ধে লিপ্ত হন। সুলাইত রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে সেতু ধ্বংস না করার এবং পারসিকরা যেখানে অবস্থান নিয়েছিল, সেখানে গমন না করার পরামর্শ দেন। কিন্তু আবু উবাইদ তার কথায় কর্ণপাত করেননি। পরিণতিতে মুসলমানগণ পরাজয় বরণ করে। সুলাইত রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি তার অবাধ্য হতে চাইনি। আর নতুবা আমি লোকজনকে তার নির্দেশ অমান্য করতে বলতাম। কিন্তু আমি তার কথা শুনেছি এবং অনুসরণ করেছি।'

অধীনরা সকল কাজে আমীরের ওপর আস্থা রাখবে
আল্লাহ বলেন,

وَ إِذَا جَاءَهُمْ أَمْرٌ مِّنَ الْأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُوا بِهِ وَ لَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُوْلِ وَإِلَى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَثْبِطُوْنَهُ مِنْهُمْ وَ لَوْ لَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لَا تَّبَعْتُمُ الشَّيْطَنَ إِلَّا قَلِيلًا
আর যখন তাদের নিকট কোনো শান্তি অথবা ভীতিজনক বিষয় উপস্থিত হয় তখন তারা ওটা রটনা করতে থাকে এবং যদি তারা ওটা রাসূলের কিংবা তাদের আদেশদাতাদের প্রতি সমর্পণ করত তাহলে তাদের মধ্যে সঠিক তথ্য পেয়ে যেত এবং যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা না হতো তাহলে অল্পসংখ্যক ব্যতীত তোমরা শয়তানের অনুসরণ করতে।

এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা লোকদের যাবতীয় বিষয়াদি আমীরের ওপর ন্যস্ত করতে উৎসাহিত করেছেন, যাতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। যদি তারা মনে করে, এর চেয়ে উত্তম সিদ্ধান্ত আমীরের দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে, সে ক্ষেত্রে তারা তাকে সতর্ক করবে এবং সেটি অনুসরণ করার পরামর্শ দেবে। এ জন্য সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার জন্য পরামর্শ করা খুবই জরুরি একটি বিষয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদের জন্য একজন আমীর নিয়োগ করেছেন, যাতে তারা তাদের সকল বিষয়াদি তার ওপর সোপর্দ করে এবং তাদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী কোনো সিদ্ধান্তের কারণে বিভক্তি সৃষ্টি না হয়।

যে বছর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নাহাওয়ান্দে মুসলিম বাহিনী প্রেরণ করেন এবং সেখানে সৈন্য সমাবেশ করতে বলেন, তখন সেখানে মদীনা, বসরা ও কুফার সেনাবাহিনী অংশগ্রহণ করে। মদীনার সৈন্যদের মধ্যে আনসার ও মুহাজির সাহাবীগণও ছিলেন। তাদের সেনাপতি ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু। বসরার সেনাবাহিনী আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে এবং কুফার সেনাবাহিনী হুযাইফা ইবনে আল-ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে এগিয়ে আসে। তারা সবাই নাহাওয়ান্দে জমা হওয়ার পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নির্দেশ পাঠান : 'সম্মিলিত বাহিনীর কমান্ডার হবে নুমান ইবনে মুকরিন আল-মুজানি।'

সেনাপতির নির্দেশ দ্রুত মান্য করা
খেলাফতের দায়িত্ব নিয়েই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকজনকে পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শরীক হতে বলেন। তিনি তিন দিন ধরে লোকজনকে আহ্বান করতে থাকেন, কিন্তু কেউই তাতে সাড়া দেয়নি। চতুর্থ দিন আবু উবাইদ ইবনে মাসউদ রহ. প্রথম সাড়া দেন এবং এ কারণেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে এ যুদ্ধের সেনাপতি নির্বাচন করেন। পরবর্তী সময়ে অনেক সাহাবী এসে যুদ্ধে যোগ দেন। কিন্তু খলীফার আহ্বানে দ্রুত সাড়া দেওয়ায় আবু উবাইদ ইবনে মাসউদই সেনাপতি পদে বহাল থাকেন।

উতবা ইবনে গাজওয়ানকে বসরায় প্রেরণের পূর্বে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে মনে করিয়ে দেন : আপনাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এ ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন এবং অহংকার থেকে বেঁচে থাকবেন। যদি অহংকারে পতিত হন, তাহলে তা আপনার ভাইদের থেকে আপনাকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবী; চরম অপমান-অপদস্থের জীবন থেকে আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করেছেন এবং দুর্বল অবস্থা থেকে শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন। আর এখন একটি বিশাল বাহিনীর সেনাপতির পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন যাকে লোকজন মেনে চলবে। আপনার কথা তারা শুনবে এবং নির্দেশ দিলেই তা বাস্তবায়ন করা হবে। কতই-না বরকতময় জীবন! তবে নিজের অবস্থা ভুলে যাবেন না এবং কারও প্রতি হেয় দৃষ্টি দেবেন না।'

গনীমতের সম্পদ বণ্টনে তর্ক করা যাবে না
গনীমতের সম্পদ বণ্টনের ব্যাপারে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'হে আল্লাহ, আপনি আমার গভর্নরদের জন্য সাক্ষী, আমি লোকজনকে আপনার দ্বীন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ শেখানোর জন্যই প্রেরণ করেছি। আর যাতে তারা গনীমতের সম্পদ সুষ্ঠুভাবে তাদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়। তারা যদি কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, তাহলে যেন সেটি আমার নিকট সোপর্দ করে।'

আল-আবলাহ বিজয়ের পর গনীমতের মাল বণ্টন করতে গিয়ে দেখা গেল একজনের ভাগে একটি কপারের পাত্র পড়েছে। যখন সে পাত্রটি হাতে নিল, তখন দেখলে সেটি স্বর্ণের। পাশে আরেকজন সেটি দেখে সেনাপতির নিকট অভিযোগ পেশ করল। সেনাপতি দ্বিধায় পড়ে গেলেন এবং সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট বিষয়টি উত্থাপন করলেন। জবাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যদি হস্তগত হওয়ার পূর্বে তার এটি জানা ছিল না বলে সে দাবি করে এবং এ ব্যাপারে কসম খায়, তাহলে পাত্রটি তাকে দিয়ে দাও। আর যদি এর ব্যতিক্রম হয়, তাহলে সেটি অন্যদের মধ্যে বণ্টন করে দাও।' তখন ওই সৈন্যটি কসম খায় এবং তাকে সেটি দিয়ে দেওয়া হয়।

জালুলাহর যুদ্ধে বিজয়ের পর গনীমতের মাল জমা করা হলে জারির ইবনে আব্দুল্লাহ আল-বাজালি বলেন, এর চার ভাগের এক তার এবং তার লোকজনের। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু এ বিষয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট পত্র প্রেরণ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বলেন, 'জারির সত্য বলেছে। আমি তাকে বলেছিলাম যে, তার লোকজনের অন্তর নরম করার প্রয়োজনে যদি গনীমতের সম্পদ থেকে ওই পরিমাণ দেওয়া হয়, তাহলেও তারা মুসলমানদের পক্ষে শত্রুদের বিরুদ্ধে বীরদর্পে যুদ্ধ করতে পারে। আর যদি তারা কেবলই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং আখেরাতের পুরস্কারকে যথেষ্ট মনে করে লড়াই করে, তাহলে তাদের সঙ্গে অন্যান্য মুসলমানদের মতোই আচরণ করা হবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এই জবাব পেয়ে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তা জারির ইবনে আব্দুল্লাহকে অবহিত করেন। তখন জারির বলেন, 'আমীরুল মুমিনীন সত্য বলেছেন। আমাদের এই সম্পদের প্রয়োজন নেই; বরং আমরা তো সাধারণ মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।'

৪.৩.৩। সৈন্যদের অধিকার
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার চিঠিপত্রে এবং আদেশ-নির্দেশে সৈন্যদের প্রাপ্য হক সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন, যা নিচে দেওয়া হলো :

সৈন্যদের নিয়মিত পরিদর্শন
বর্ণিত আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি নামায পড়াকালীন সেনাবাহিনীর বিন্যাস পরিকল্পনা প্রণয়ন করি।' এর কারণ, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হিসাবে জিহাদের অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে নির্দেশিত ছিলেন। মূলত তিনিই জিহাদের সর্বাধিনায়ক ছিলেন। সুতরাং তার এই নামায শত্রুদের মোকাবিলায় সালাতুল খাওফ নামাযের মতোই ছিল। যখন তিনি কাউকে সেনাপতির দায়িত্ব দিতেন, তিনি তাকে বিদায় দেওয়ার আগে পরিদর্শন করতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন। তিনি তার সেনাপতিদের যা বলতেন, তার মধ্যে এটিও বলতেন : ইজার ও রিদা পরে নাও, জুতা ও পোশাক ঠিকমতো পরো; নিশানা দেখে আঘাত করো এবং ভালোভাবে অশ্বচালনা শিখে নাও। আরবদের অনুসরণ করো এবং অনারবদের আমোদ-ফুর্তি ত্যাগ করো। তোমরা ততদিন শক্তিশালী থাকবে যতদিন অশ্বচালনা ও তির নিক্ষেপ প্রশিক্ষণ নিতে থাকবে।

এখান থেকে সেনাবাহিনী প্রস্তুত করা ও তাদের যুদ্ধে পারদর্শী করে গড়ে তোলার ব্যাপারে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর একনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতা বোঝা যায়। তার নিয়োগকৃত সেনাপতিরাও তার নির্দেশক্রমে সৈন্যদের লাইনে দাঁড় করিয়ে পরিদর্শন করতেন এবং শত্রুর সম্মুখে শক্তির প্রদর্শন করতেন; সেটি কোনো রণক্ষেত্র কিংবা প্রস্তুতিমূলক সমাবেশ—যা-ই হোক না কেন। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু জুমুআর দিনে তার সৈন্যদের উদ্দেশে ভাষণ দিতেন এবং তাদের বাহনগুলোকে শক্তভাবে তৈরি করতে নির্দেশ দিতেন; তিনি তাদের সতর্ক করতেন, যদি তারা তা না করে, তাহলে তারা বেতন পাবে না। তিনি বলেন, 'আমি এ কথা শুনতে চাই না যে, কেউ তার দেহকে মোটাতাজা করেছে, কিন্তু তার ঘোড়াকে দুর্বল বানিয়ে ফেলেছে। মনে রেখো, আমি যেমন তোমাদের পরিদর্শন করি, তেমনি তোমাদের ঘোড়াগুলোও পরিদর্শন করব। যদি কেউ কোনো কারণ ছাড়াই তার ঘোড়াকে দুর্বল বানিয়ে ফেলবে, তাহলে আমি সে অনুযায়ী তার বেতন-ভাতা কেটে দেব।'

সিরিয়ায় মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন তাকে রাজার হালে দেখেন। তিনি তাকে এ জন্য তিরস্কার করে বলেন, 'তুমি কি সম্রাট কিসরার মতো আচরণ করছ, হে মুআবিয়া?' মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমরা শত্রুর মোকাবিলায় সম্মুখ সারির যোদ্ধা এবং তাদের সঙ্গে আমাদের জিহাদের ময়দানে সাজ-সজ্জায়ও প্রতিযোগিতা করতে হয়।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চুপ থাকলেন এবং তিনি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেননি। কারণ, মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু যা কিছু করছেন, তা ঈমান ও সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই।

সফরে সেনাদের সঙ্গে নম্র আচরণ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লেখেন : 'সফরে দলের সকল সদস্যদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন। যাত্রাপথে তাদের বেশি কষ্ট দেবেন না, যেন তারা শত্রুর নিকটবর্তী হতেই দুর্বল হয়ে না পড়ে। তারা এমন এক শত্রুক্রদলকে মোকাবিলা করতে যাচ্ছে যাদের সফরের প্রয়োজন নেই এবং তাদের রয়েছে শক্তিশালী ঘোড়া ও যোদ্ধা। আপনার এবং আপনার অধীন সব সৈন্যদের সপ্তাহে একদিন বিশ্রাম নেওয়া উচিত যাতে সবাই পুনরায় শক্তি অর্জন করতে পারে, নিজেদের অস্ত্র ও মালামাল গুছিয়ে নিতে পারে। এমন কোনো জনবসতির নিকট যাত্রাবিরতি করবেন না, যারা আমাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তিতে বা নিরাপত্তায় রয়েছে।'

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাঈদ ইবনে আমরের নেতৃত্বে সিরিয়ায় সাহায্য-সৈন্য প্রেরণ করেন। এ-সময় তিনি তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ঘোড়া ও রসদ সরবরাহ করেন। রওনা হওয়ার প্রাক্কালে তিনি তাদের একটু অপেক্ষা করতে বলেন। তারপর তিনি পদব্রজে বাহিনীর দিকে অগ্রসর হন এবং সাঈদ ইবনে আমরের উদ্দেশে বলেন, 'হে সাঈদ, আমি তোমাকে এই বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করেছি। তবে তুমি মনে কোরো না যে, তুমি তাদের মধ্যে সেরা, যদি-না তুমি আল্লাহকে ভয় করো। যখন অগ্রসর হবে পথে তাদের সঙ্গে নম্র আচরণ করবে, তাদের সম্মানে আঘাত করবে না এবং তাদের কাউকে বয়সে ছোট হওয়ার কারণে বাঁকা চোখে দেখবে না। আর শক্তিশালীদের প্রতি পক্ষপাত করবে না এবং তাদের কোনো গুহার ভেতর দিয়ে যাওয়ার আদেশ দেবে না। সমতল ভূমির ওপর দিয়ে অগ্রসর হবে এবং কোনো প্রসিদ্ধ রাস্তার ওপর তাঁবু গাড়বে না। আমি তোমাকে এবং তোমার বাহিনীকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করলাম।'

বিদায়ের সময় পরিদর্শন করা
কোনো বাহিনী অভিযানে রওনা হওয়ার প্রাক্কালে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের পরিদর্শন করতেন এবং তাদের ভালো আচরণ ও ইসলামী মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখার নির্দেশ দিতেন। তিনি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে শত্রুর প্রতিশ্রুতিকেও রক্ষা করতে বলেছেন, যখন তারা নিরাপত্তা প্রার্থনা করে এবং তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে নিষেধ করেছেন। ভুল করেও যদি কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে তা পুরো বাহিনীর দুর্বলতা ও পরাজয়ের কারণ হবে এবং শত্রুর শক্তিকে বৃদ্ধি করবে। তিনি তাকে মুসলমানদের জন্য অপমান ও লাঞ্ছনার প্রতীক না হওয়ার জন্য সতর্ক করেন।

রণক্ষেত্রে যুদ্ধের সময় নিজ বাহিনীর কারও অপরাধে শাস্তি প্রয়োগে নিষ্ক্রিয় থাকা
সেনাপতিদের উদ্দেশে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ কথাও বলেন, 'যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো বাহিনী কিংবা অভিযানের সেনাপতির জন্য উচিত নয় যে, সে কারও ওপর হদ শাস্তি প্রয়োগ করবে। তখন তা করা হলে শয়তান তাকে কাফেরদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করবে।'

একবার এক অভিযানে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সালমান ইবনে রাবিআ আল-বাহিলিকে সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসাবে প্রেরণ করেন। তার সঙ্গে আমর ইবনে মাযিকারিব এবং তুলাইহা ইবনে খুওয়ালিদও ছিলেন। আমর ইবনে মাযিকারিব এবং সালমান ইবনে রাবিআর মধ্যে একটি বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। বিষয়টি খলীফা পর্যন্ত গড়ায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন লিখে পাঠান: তুমি আমরের সঙ্গে যা করেছ, তা আমার কানে এসেছে এবং তুমি ঠিক করোনি। আমি যদি তোমার মতো যুদ্ধাবস্থায় থাকতাম, তাহলে আমি আমর ও তুলাইহার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতাম এবং তাদের পরামর্শ গ্রহণ করতাম। কারণ, সামরিক জ্ঞান ও যুদ্ধে তারা অভিজ্ঞ। মুসলিম প্রদেশে পৌঁছার পর তুমি তাদের অবস্থান অনুযায়ী মর্যাদা দেবে এবং ফিকহ ও কুরআনে পারদর্শীদের কাছে রাখবে। আর তিনি আমর ইবনে মাযিকারিবকে লেখেন: সেনাপতির সঙ্গে তোমার বচসায় লিপ্ত হওয়ার কথা আমি শুনেছি। তুমি তাকে অপমানও করেছ। আমি জেনেছি যে, তোমার নিকট আস-সামসামাহ নামে একটি তরবারি রয়েছে। তাহলে শুনে রাখো, আমার নিকট আল-মুসামমিম নামে একটি তরবারি রয়েছে। আল্লাহর কসম, সেটি দিয়ে যদি আমি তোমাকে আঘাত করি, সঙ্গে সঙ্গে তোমার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে।' এই চিঠি পেয়ে আমর বলেন, 'আল্লাহর কসম, যদি তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে সেটি অবশ্যই করবেন।'

এ ঘটনা দুটি থেকে পরিষ্কার যে, শত্রুর ভূখণ্ডে একজন সেনাপতির কেমন আচরণ করা উচিত, এ ব্যাপারে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুবই বিচক্ষণ ও দূরদর্শী ছিলেন। এ-সময় বাহিনীর সকল সদস্যদের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখা জরুরি; বিশেষ করে যখন তারা শীঘ্রই শত্রুর মোকাবিলা করবে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এটিও ভালোভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, যুদ্ধাবস্থায় রণকৌশলে জ্ঞানী ও অভিজ্ঞদের সঙ্গে সেনাপতির পরামর্শ করা উচিত এবং নিরাপদ স্থানে পৌঁছার পরও এ সম্পর্ক অটুট রাখতে হবে।

আর-রাহা যুদ্ধের সময়—ইয়ায ইবনে গানামের হাতে যা বিজিত হয়েছিল—উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশে ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান সিরিয়া থেকে বিসর ইবনে আবি আরতাহার নেতৃত্বে সাহায্য-সৈন্য প্রেরণ করেন। মুসলিম বাহিনী যখন শত্রু-এলাকায় অবস্থান করছিল, তখন ইয়ায ও বিসরের মধ্যে এক ব্যাপারে মতপার্থক্য দেখা দেয়। ইয়াযের সাহায্য-সৈন্যের কোনো প্রয়োজন ছিল না। এ জন্য তিনি ইয়াযকে সিরিয়ায় ফিরে যেতে বলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের ফিরে যাওয়ার সংবাদ পেয়ে ইয়াযকে এর কারণ দর্শাতে বলেন। মূলত তারা তার সাহায্যেই এসেছিল যাতে শত্রুদের মনে এই ভয় ছড়িয়ে পড়ে যে, মুসলিম বাহিনীর সাহায্যে একের পর এক বাহিনী এসে যোগ দিচ্ছে। এতে শত্রুদের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তারা দ্রুত আত্মসমর্পণ করবে। ইয়ায জবাবে লেখলেন : আমি আমার সেনাদলের মধ্যে বিদ্রোহ ও অনৈক্যের আশঙ্কা করেছি। কারণ, আমার কোনো সাহায্য-সৈন্যের প্রয়োজন ছিল না। এ জন্য আমি তাকে অনুরোধ করেছি—তিনি যেন ফিরে যান। এ কারণেই আমি তাকে ফেরত পাঠিয়েছি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার জবাব গ্রহণ করেন এবং তার জন্য দুআ করেন। যেহেতু তারা শত্রুর মোকাবিলা করছে, এ-সময় তাদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করলে তা পরাজয়কেই ত্বরান্বিত করবে।

বিরতি ও প্রস্থানের সময় সৈন্যদের পাহারায় রাখা
যেকোনো সামরিক ঘাঁটি কিংবা কোনো সেনাবাহিনীর জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পাহারার খুব গুরুত্ব দিতেন। এ জন্য তিনি সৈন্যদের এক দলকে পাহারায় নিযুক্ত করতে সেনাপতিদের নির্দেশ দিতেন, যাতে শত্রুরা অসতর্ক অবস্থায় আক্রমণ করার সুযোগ না পায়। তিনি কোনো যাত্রাবিরতি কিংবা সেখান থেকে রওনা হওয়ার সময় প্রহরী নিযুক্ত করতে বলতেন। শত্রু-এলাকায় প্রবেশ করার পরপরই তিনি সেনাপতিদের চারিদিকে স্কাউট ও গোয়েন্দা পাঠাতে নির্দেশ দিতেন যাতে, শত্রু-এলাকার প্রকৃতি ও তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিপূর্ণ তথ্য জানা যায়। তিনি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লিখে পাঠান : ‘শত্রুর কাছকাছি পৌঁছে গুপ্তচর প্রেরণ করবেন। তাদের কর্মকাণ্ডের কোনো কিছুই যেন আপনার নিকট গোপন না থাকে। এ কাজে আরব এবং স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে যারা বিশ্বস্ত, তাদের প্রেরণ করবেন। কারণ, মিথ্যাবাদীর সংবাদ আপনার কোনো উপকারে আসবে না, যদিও সে ভুলে সত্য বলে ফেলে। অসৎ লোকেরা আপনার গুপ্তচর হতে পারে না; বরং তারা আপনার বিরুদ্ধে কাজ করবে। শত্রুদলের খুব নিকটে পৌঁছে গেলে আপনি অগ্রগামী ও সহসা আক্রমণকারী দল প্রেরণ করবেন, যাতে তারা শত্রুর রসদ সরবরাহ লাইন কেটে দিতে পারে এবং তাদের দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করতে পারে। অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী ব্যক্তিদের এ কাজে নিযুক্ত করবেন এবং তাদের দ্রুতগামী ঘোড়া সরবরাহ করবেন। যদি তারা শত্রুর মোকাবেলা করে, তাহলে তাদের প্রথম আঘাতেই যেন শত্রুর অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে।'

এই গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ থেকে এটি পরিষ্কার যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেবল শত্রুদের বিরুদ্ধে গুপ্তচর প্রেরণ করার ব্যাপারেই সচেতন নন; বরং তিনি নিজেও গুপ্তচরের মাধ্যমে মুসলিম বাহিনীর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের খোঁজখবর রাখতেন। গভর্নর, সেনাপতি, সেনাদল—সকলের ব্যাপারেই তিনি গুপ্তচর নিয়োগ করেছিলেন। তিনি সঠিকভাবেই জানতেন, কী ঘটেছে বা কী ঘটতে যাচ্ছে। প্রতিটি বাহিনী এবং ঘাঁটিতে তার গুপ্তচর তাকে সংবাদ প্রেরণ করত।

উমাইর ইবনে সাদ আল-আনসারি খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট একটি অভিযোগ দায়ের করেন; তিনি সিরিয়ার এক দলের সঙ্গে মদীনায় এসে বলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমাদের এবং বাইজেন্টাইনদের মধ্যে আরবসুস নামে একটি শহর আছে। এর অধিবাসীরা মুসলমানদের সব দুর্বল দিক সম্পর্কে শত্রুকে অবহিত করে। কিন্তু তারা শত্রুদের সম্পর্কে আমাদের কোনো তথ্য দেয় না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেন, 'তুমি সেখানে ফিরে গিয়ে সবাইকে শহর ত্যাগ করার শর্তে একটি ভেড়ার পরিবর্তে দুটি ভেড়া, একটি উটের বিনিময়ে দুটি উট, সবকিছুতেই একটির বিনিময়ে দুটি দেওয়ার ঘোষণা দেবে। যদি তারা রাজি হয়, তাহলে তা তাদের দিয়ে শহর ত্যাগ করতে বলবে। তারপর শহরটি ধ্বংস করে দেবে। আর যদি প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে তাদের এক বছর সুযোগ দিয়ে শহর ধ্বংস করে দেবে।' উমাইর ইবনে সাদ আরবাসুসে ফিরে শহরবাসীকে ওই সুযোগ দেয়। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। সুতরাং তিনি তাদের এক বছর ছাড় দিয়ে পুরো শহর ধ্বংস করে দেন।

যুদ্ধে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপনে জায়গা নির্বাচন
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত লিপ্ত হতে নিষেধ করতেন যতক্ষণ না তিনি রণক্ষেত্রের অবস্থান ও প্রকৃতি সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞানার্জন করতে সক্ষম হবেন। এ ছাড়া পানির ব্যবস্থা, পশুচারণের জন্য সবুজ ভূমিসহ আরও নানাদিক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দিতেন। কাদিসিয়া যুদ্ধের পূর্বে তিনি তাকে নিজ ভূখণ্ডের কাছাকাছি অবস্থান করার জন্যও লিখে পাঠান। কারণ, এ এলাকা তাদের নিকট শত্রুদের থেকে বেশি পরিচিত। ফলে কোনো কারণে পিছু হটতে কিংবা নিজেদের বাঁচাতে চাইলে তা তাদের জন্য সহজ হবে। শত্রুরা তখন রাস্তা-ঘাট সম্পর্কে অনভিজ্ঞ থাকায় তাদের পিছু নিতে ভয় পাবে।

এতৎসঙ্গে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু, সালমান ফারসি রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হুযাইফা ইবনে ইয়ামান বাহিনীর আগে গিয়ে রণক্ষেত্র ও সৈনিকদের অবস্থানস্থল নির্বাচন করতে বলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড তার সেনাপতিদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন। আর সৈনিকদের জন্য ক্যাম্প স্থাপনের পূর্বে সেনাপতিদের নির্ধারিত স্থান পরিদর্শন করতে বলতেন এবং তা যেন কোনোভাবেই সুপ্রিম হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না করে। কারণ, হেডকোয়ার্টারের কাজই হলো রণকৌশল নির্ধারণ করা এবং সাহায্য-সৈন্য ও রসদপত্র সরবরাহ করা। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লেখেন : 'আপনার পরিদর্শনের আগে যেন তারা কোথাও ক্যাম্প না করে এবং আপনি তা পর্যবেক্ষণ করে দেখবেন সেটি উপযোগী কি না।'

সেনাবাহিনীর রসদপত্র সরবরাহ ও ঘোড়ার খাবারের ব্যবস্থা
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইরাকে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর রসদ হিসাবে মদীনা থেকে ছাগল ও উট পাঠাতেন। তা ছাড়া আন-নাক্বি ও আর-রাবাযাহ সরকারি পশুচারণ ভূমি থেকে জিহাদে ব্যবহৃত পশুদের জন্য ঘাস প্রেরণ করতেন। এ ছাড়া তিনি প্রত্যেক অঞ্চলে লোকজন থেকে অতিরিক্ত ঘোড়া সরকারি খাতে জমা করতেন এবং জিহাদের জন্য সেগুলো প্রস্তুত রাখতেন। কুফাতে এ রকম চার হাজার ঘোড়া ছিল। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রত্যেক মুসলিম প্রদেশে ঘোড়া সংরক্ষণ করা হতো। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন জেরুজালেমের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য সিরিয়া আগমন করেন, তখন সেখানে সৈন্যদের রসদ সরবরাহের নিমিত্তে একটি সাপ্লাই ডিপো নির্মাণ করেন। এর নাম ছিল আল-আহরা। আর সর্বপ্রথম আমর ইবনে আব্বাস এর দায়িত্ব লাভ করেন।

সৈনিকদের যুদ্ধে উৎসাহিত করা
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু উবাইদা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে চিঠি লেখেন : বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আল্লাহর বান্দা উমর ইবনুল খাত্তাব থেকে মুসলিম বাহিনীর বিশ্বস্ত সেনাপতি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহর প্রতি। আসসালামু আলাইকুম। আমি প্রকাশ্যে ও গোপনে মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি এবং আমি আপনাকে আল্লাহর অবাধ্যতার ব্যাপারে সতর্ক করছি। আমি আপনাকে ওইসব ব্যক্তিদের মতো হওয়া থেকে সতর্ক করছি, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,

قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَ أَمْوَالُ اقْتَرَفْتُمُوْهَا وَ تِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَ مَسْكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِّنَ اللهِ وَ رَسُوْلِهِ وَ جِهَادٍ فِيْ سَبِيْلِهِ فَتَرَبَّصُوْا حَتّٰى يَأْتِيَ اللهُ بِأَمْرِهِ وَ اللهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفٰسِقِيْنَ ۝
বলো, ‘তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের সে সম্পদ, যা তোমরা অর্জন করেছ, আর সে ব্যবসা, যার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করছ এবং সে বাসস্থান, যা তোমরা পছন্দ করছ, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা করো আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।’

আল্লাহ খাতামুন নাবিয়্যিন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সেনাপতিদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা, যিনি সকল জগতের পালনকর্তা।

এই চিঠি পেয়ে আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু সকলের সামনে তা পড়ে শোনান এবং তারা বুঝতে পারেন যে, খলীফা তাঁদের জিহাদে উৎসাহিত করেছেন। সৈন্যদের মধ্যে এমন কেউ ছিলেন না, যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর চিঠি পড়ে অপ্রস্তুত হননি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইরাকে অবস্থানরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর সেনাবাহিনীকে চিঠি প্রেরণ করে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেন, তাঁদের অন্তরে ইসলামের মহান গুণাবলি ধারণ করতে বলেন এবং গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আমলে সেনাপতিদের প্রতিও একই নির্দেশ ছিল, যেন তারা সৈন্যদের জিহাদে উদ্বুদ্ধ করে।

জিহাদে আল্লাহর পুরস্কার ও শাহাদাতের মর্যাদা সম্পর্কে মনে করিয়ে দেওয়া
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে কাদিসিয়া যুদ্ধের পূর্বে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা, সৈন্যদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের আল্লাহর পুরস্কারের কথা মনে করিয়ে দেন এবং তিনি তাদের বলেন, আল্লাহ তাদের জন্য আখেরাতে যা প্রস্তুত করে রেখেছেন, তার বিবরণ দেন। তিনি তাদের যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেন। আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্যের যে ওয়াদা করেছেন এবং ইসলামের বিজয় দান করবেন—তাও মনে করিয়ে দেন। তিনি তাদের বলেন, শত্রুর সকল সম্পদ, গনীমত ও তাদের ভূমি শীঘ্রই মুসলমানদের করতলগত হবে এবং তিনি কারীদের জিহাদের সূরা (সূরা আনফাল) তিলাওয়াত করতে বলেন।

একই ভাবে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ায় তার সৈন্যদের উদ্দেশে জিহাদের ফযিলত তুলে ধরেন। তিনি আল্লাহর প্রতিশ্রুত পুরস্কার, রহমত ও বরকত কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি তাদের বলেন, দুনিয়া ও এর যাবতীয় সবকিছু থেকে জিহাদ উত্তম।

এটা খুব প্রসিদ্ধ যে, আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু ফিলিস্তিনে তার সৈন্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘(জিহাদে) যে কেউ নিহত হবে, শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবে। আর যারা বেঁচে থাকবে, তারা বরকতময় জীবন যাপন করার সুযোগ পাবে।’ তিনি তার সৈন্যদের কুরআন তিলাওয়াত এবং ধৈর্যধারণ ও দৃঢ়পদ থাকার আহ্বান করেন। আর তাদের আল্লাহর প্রতিশ্রুত পুরস্কার ও জান্নাত লাভে দুআ করতে উদ্বুদ্ধ করেন।

আল্লাহর হক আদায়ে সচেষ্ট হওয়া
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তার বাহিনীকে এই উপদেশবাণী লিখে পাঠান: ‘আমি আপনাকে এবং আপনার অধীন সব সৈন্যদের সব পরিস্থিতিতে আল্লাহকে ভয় করার আদেশ করছি। কারণ, শত্রুর বিরুদ্ধে আল্লাহর ভয়ই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। আমি আপনাকে এবং আপনার অধীন সব সৈন্যদের শত্রুকে এড়ানোর চেয়ে গোনাহকে বেশি এড়িয়ে চলার আদেশ করছি। কারণ, শত্রুর চেয়ে গোনাহকে বেশি ভয় করা উচিত। শত্রুর কুফরীই মুসলমানদের প্রতি আল্লাহর সাহায্যের মূল কারণ।'

ব্যবসা, চাষাবাদ ও এ-জাতীয় কাজ থেকে বিরত থাকা
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতিদের প্রতি এই ফরমান জারি করলেন, তারা তাদের অধীন সৈন্যদের মধ্যে ঘোষণা করবে যে, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তাদের বেতন-ভাতা এবং তাদের পরিবারের প্রতি রেশন চালু করা হয়েছে। সুতরাং কেউ যেন চাষাবাদের লিপ্ত হয়ে না যায়; যারা এটি মেনে চলেনি, তিনি তাদের শাস্তিও দিয়েছেন। কারণ, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চেয়েছিলেন, তার সৈন্যরা পরিপূর্ণভাবে জিহাদ ও ইসলাম প্রচার- প্রসারে মনোনিবেশ করবে। তারা চাষাবাদের কাজে মগ্ন হয়ে গেলে আসল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে। এভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন এক সেনাবাহিনী গঠন করতে সমর্থ হয়েছিলেন, যারা পুরোপুরিভাবে জিহাদের কাজেই মগ্ন ছিল এবং ডাক দেওয়ামাত্রই সাড়া দিতে সক্ষম ছিল। তিনি তাদের কঠোরভাবে ফলমূল সংগ্রহ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাষাবাদের কাজে জড়িত হতে নিষেধ করেছেন।

৪.৪। সীমান্ত রক্ষায় গুরুত্বারোপ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম এবং ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষায় খুবই গুরুত্বারোপ করতেন। ক্রমশই ইসলামী রাষ্ট্র বিস্তার লাভ করছিল। তিনি বাইজেন্টাইনদের সঙ্গে লড়াই করতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেন, 'আল্লাহর কসম, আমি সন্তুষ্ট হতাম, যদি আমাদের এবং তাদের মধ্যে যদি আগুনের একটি প্রাচীর থাকত—তাহলে প্রাচীরের এ পাশে যা কিছু সব আমাদের হতো এবং বিপরীত দিকের সবকিছু বাইজেন্টাইনদের দখলে থাকত।' তিনি পারসিকদের সঙ্গে মুসলমানদের সীমান্ত নিয়ে একই কথা বলেছেন : আমি চাই আস-সাওয়াদ এবং পাহাড়ের মধ্যে এমন একটি প্রাচীর হতো, যাতে আমরা তাদের কাছে যেতে পারতাম না এবং তারাও আমাদের নিকট পৌঁছতে পারতাম না। আস-সাওয়াদ পর্যন্ত ভূখণ্ড আমাদের জন্য যথেষ্ট। আর আমি গনীমতের সম্পদের চেয়ে মুসলমানদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।'

তিনি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করার নির্দেশ দেন। তাদের জন্য বিভিন্ন রকম কাজ বণ্টন করেন। আমরা ইতিপূর্বে এগুলোর কিছু উল্লেখ করেছি। এসব ঘাঁটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বা সেনা সদর দপ্তরের ভূমিকা পালন করবে। এগুলোর অবস্থান হবে ইসলামী রাষ্ট্র ও বিজিত দেশসমূহের সীমান্তের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে, যাতে যেকোনো বিদ্রোহ দ্রুত দমন করা যায় এবং ইসলামের প্রচার-প্রসারে সৈন্যসমাবেশের কেন্দ্র হিসাবেও ভূমিকা রাখতে পারে। এসব ঘাঁটির মধ্যে বসরা ও কুফার ঘাঁটি ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এ ঘাঁটি দুটির সীমানা পারসিক সাম্রাজ্য ও মিসরের আল- ফুসতাত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মিসর ও সিরিয়ার সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় কিছু ঘাঁটি নির্মাণ করা হয়েছিল, যাতে বাইজেন্টাইনদের সমুদ্র আক্রমণ প্রতিহত করা যায়।

পরবর্তী সময়ে তিনি চারটি ঘাঁটি স্থাপন করেন যেগুলো হিমসের বাহিনী, দামেস্ক বাহিনী, জর্ডান বাহিনী এবং ফিলিস্তিন বাহিনী হিসাবে পরিচিত ছিল। আর সৈন্যরা যে বাহিনীতে নিযুক্ত হতো, সে বাহিনীর নামেই পরিচিত হতো। বাহিনীর নাম তাদের নিজেদের নামের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হতো। ফলে সেনাপ্রধান চাইলে তাদের সঙ্গে পারস্পরিক বিষয়াদি আলোচনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন—যুদ্ধাবস্থায় ও সৈন্যদের বেতন বণ্টনের সময়।

এ ছাড়া শত্রুর পরিত্যক্ত ক্যাম্প ও দুর্গকেও মুসলমানগণ দখল করে সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তরিত করেন। সেখান পর্যাপ্ত সৈন্য মোতায়েন করা হতো এবং বিজিত অঞ্চলসমূহের সীমান্ত রক্ষায় প্রহরী প্রেরণ করা হতো।

মুসলিম বাহিনী শত্রু-এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার পরই সর্বোচ্চ দূরত্বে সীমান্ত নির্ধারণ করতেন এবং তা রক্ষায় সেখানে সামরিক চৌকি স্থাপন করতেন। এসব স্থাপনায় একজন যোগ্য কমান্ডারের অধীনে পর্যাপ্ত চৌকশ সেনা নিযুক্ত করা হতো।

সীমান্ত রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল, সীমান্ত বরাবর চেকপোস্ট স্থাপন। ইসলামী রাষ্ট্র ও পারসিক সাম্রাজ্যের সীমান্ত এলাকায় এ রকম অনেক চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছিল। ইয়াযদগিরদের নেতৃত্বে পারসিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে পুনরায় লড়াই করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করলে মুসান্না ইবনে হারিসা খলীফাকে তা অবহিত করেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বলেন, 'পারসিকদের ভূখণ্ড থেকে বের হয়ে আসো। তোমাদের ও তাদের সীমান্তে মরুদ্যানে এসে আশ্রয় নাও।' মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু তা-ই করেন।

কাদিসিয়া যুদ্ধের পূর্বে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে উপদেশ দেন : কাদিসিয়া পৌঁছে এর প্রান্তসীমায় সীমান্ত-চৌকি স্থাপন করবেন।' জালুলাতে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট লেখেন: আল্লাহ যদি দুটি বাহিনী—মাহরান বাহিনী ও আনতাক বাহিনীকে পরাজিত করেন, তাহলে কাকা ইবনে আমরকে মুসলিম বাহিনী নিয়ে হালওয়ানের সীমান্ত-চৌকির দিকে অগ্রসর হতে বলবেন যাতে শত্রুদের অগ্রগতি রোধ করা যায় এবং মুসলিম বাহিনীর ক্যাম্পে অবস্থান করুক অথবা টহলরত থাকুক—নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হয়।

এ জন্য ইরাকে মুসলিম বাহিনীর কমান্ডার সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সেনাদের পারস্যের দিকে অগ্রসর হতে উৎসাহিত করেন এবং তাদের বলেন, সীমান্ত এলাকা এবং গিরিপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং পশ্চাৎ দিক থেকে আক্রমণের ভয় নেই।

উল্লেখ্য, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আমলে সীমান্ত এলাকার চৌকিগুলো মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়কের নির্দেশক্রমেই স্থাপন করা হয়েছিল। তিনি তার সেনাপতিদের বলেছেন: পারসিকদের তোমাদের ভাইদের থেকে বিভ্রান্ত করো, তোমাদের উম্মত ও দেশকে রক্ষা করো এবং পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত পারস্য ও আহওয়াযের মধ্যবর্তী সীমান্তে প্রহরী নিযুক্ত করো।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আমলে কুফায় সীমান্ত-চৌকির সংখ্যা ছিল চারটি; হালওয়ান পোস্ট, যার সেনাপতি ছিলেন কাকা ইবনে আমর আত-তামিমি, মাসবাযান পোস্ট, যার সেনাপতি ছিলেন দিরার ইবনুল খাত্তাব আল-ফাহরি, কারকিসিয়া পোস্ট, যার সেনাপতি ছিলেন উমর ইবনে মালিক আজ-জুহরি এবং মুসল পোস্ট, যার সেনাপতি ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে মুতিম আবসি। প্রত্যেক সেনাপতির একজন ডেপুটি ছিল, যারা সেনাপতির অনুপস্থিতিতে চৌকির দায়িত্ব পালন করত।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মুসলিম বাহিনী যখনই কোনো সুরক্ষিত পোস্ট অথবা নতুন কোনো শহরের গোড়াপত্তন করেছে, প্রথম তারা সেখানে যে কাজটি করেছে, সেটি হলো মসজিদ নির্মাণ। কারণ, তখন মসজিদই সব কাজ-কর্মের কেন্দ্র ছিল; দাওয়াহ, তালীম এবং জিহাদ।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে সিরিয়ার একের পর এক শহর মুসলমানদের অধীনে আসতে থাকে। এ-সময় তিনি বাইজেন্টাইন ও সিরিয়ায় মুসলিম ফ্রন্টের মধ্যে সীমান্ত রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। এ জন্য তিনি অনেক রক্ষণাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন; পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ, সীমান্ত টহল দল গঠন, সীমান্ত-চৌকি স্থাপন এবং উপকূলবর্তী এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা ইত্যাদি। তিনি সিরিয়ার সম্পূর্ণ উপকূলবর্তী এলাকাকে একক সামরিক কমান্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন করেন। জেরুযালেমের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়া গমন করলে তিনি এসব সীমান্ত-চৌকির কয়েকটি পরিদর্শন করেন। তিনি প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থার উন্নতিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে যান। তারপর তিনি মদীনা ফিরে যান। তবে ফিরে যাওয়ার পূর্বে লোকজনের উদ্দেশে বলেন: আমাকে তোমাদের ওপর নিযুক্ত করা হয়েছে এবং আল্লাহ আমাকে তোমাদের জন্য যা কিছু করতে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি তা করেছি। ইনশাআল্লাহ আমরা তোমাদের মধ্যে ফাই সমভাবে বণ্টন করেছি। আমি তোমাদের জন্য সেনাদল নিযুক্ত করেছি এবং গনীমতের মালে তোমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে আমরা তোমাদের জীবনকে সহজ করে দিয়েছি।

আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার উত্তর সীমান্তে আনতাকিয়া বিজয় করেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে লেখেন : ‘একটি চৌকশ মুসলিম বাহিনী গঠন করে আনতাকিয়া রক্ষায় নিয়োজিত করবে এবং তাদের নিকট থেকে রসদ সরবরাহ অব্যাহত রাখবে।’ আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু হিমস এবং বালবেক থেকে কিছু সৈন্য বদলি করে আনতাকিয়ার সীমান্ত রক্ষায় নিয়োগ করেন। আর এ বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে হাবিব ইবনে মাসলামাহ আল-ফাহরিকে দায়িত্ব দেন। আর তিনি নিজে আনতাকিয়ার ঘাঁটিতে অবস্থান করে সীমান্তের বাইরে অভিযান পরিচালনায় মনোনিবেশ করেন। এখান থেকেই বাজেন্টাইনদের সঙ্গে যুদ্ধরত মুসলিম বাহিনীকে রসদ সরবরাহ করা হতো। এখান থেকেই জারযুমাহ এলাকা আক্রমণে সেনাদল প্রেরণ করা হয়। সেখানকার লোকজন মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে এবং তারা বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে সহযোগিতা, মুসলমানদের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি ও লিকাম পাহাড়ে সীমান্ত-চৌকি স্থাপনে রাজি হয়।

একই ভাবে আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বালিস-এর সীমান্ত-চৌকির দিকে অগ্রসর হন। তিনি সিরিয়ায় মুসলিম বাহিনীর আগমনের পর যারা মুসলমান হয়েছিল, তাদের মধ্য থেকে একদল যোদ্ধাকে বাছাই করেন। তাদের সুসংগঠিত করে বাইজেন্টাইন আক্রমণ থেকে সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত করেন।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের শেষ দিক এবং উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের শুরুতে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার উপকূলবর্তী এলাকায় প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। তিনি অনেকগুলো সুরক্ষিত দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন; আতারসুস, মারকিয়াহ, বালনিয়াস এবং বাইত সালিমাহ। সিরিয়ার উপকূলবর্তী এলাকায় বাইজেন্টাইনদের পরিত্যক্ত দুর্গগুলোও তিনি মেরামত করেন এবং সেখানে সৈন্যদের নিযুক্ত করেন। এসব সৈন্যদের জন্য জমিও বরাদ্দ দেন। উঁচু উঁচু পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করে পাহারাকে জোরদার করেন। প্রতিটি টাওয়ারেই একটি করে বেকন থাকত, যা দিয়ে নিকটস্থ লোকজনকে তথ্য সরবরাহ করা হতো, যতক্ষণ-না এটি শহরে ও অন্যান্য সামরিক পোস্টে পৌঁছে। এতে লোকজন দ্রুত শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সক্ষম হতো।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মিসর ও মুসলিম রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষায় অন্যান্য ফ্রন্টের মতোই প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। তিনি আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ফুসতাতে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের নির্দেশ দেন এবং এটিকে এ অঞ্চলের মুসলিম সেনাদের জন্য মিলনকেন্দ্রে পরিণত করেন। তিনি প্রতিটি গোত্রকে একজন সেনাপতির দায়িত্বে অর্পণ করেন। এটি ছিল উত্তর আফ্রিকা বিজয়ে মুসলমানদের প্রাথমিক প্রস্তুতি। এ ছাড়া মিসরে সামরিক অভিযান পরিচালনায় এটি ছিল অন্যতম ঘাঁটি, যেখান থেকে অন্যান্য অভিযানেও সাহায্য-সহযোগিতা করা হতো। এর অবস্থানগত কারণে এবং পূর্ববর্তী ঘাঁটিসমূহের অভিজ্ঞতার আলোকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর ও এ ঘাঁটির মধ্যবর্তী স্থানে কোনো লেক বা জলাশয় নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, যাতে যোগাযোগ-ব্যবস্থায় সমস্যা সৃষ্টি না হয়।

আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সৈন্যদের এ কথা মনে করিয়ে দিতেন যে, তাদের মিসরে অবস্থান মূলত ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষা। তিনি বলেন, 'মনে রেখো, কিয়ামত দিবস পর্যন্ত সীমান্ত রক্ষা করাই তোমাদের অন্যতম দায়িত্ব। কারণ, চারিদিকে শত্রুরা তোমাদের শেষ করে দেওয়ার জন্য ওত পেতে আছে এবং তারা এটি চাষাবাদ, সম্পদ ও অন্যান্য কল্যাণ লাভের আশায় দখল করে নিতে উদ্‌গ্রীব হয়ে আছে।' এ সময়ের মধ্যে মুসলিম বাহিনী শত্রুর পরিত্যক্ত যেসব দুর্গ ও অন্যান্য সামরিক চৌকি দখল করতে সমর্থ হয়েছিল, তারা সেগুলোর মেরামত ও উন্নতি সাধন করে এবং সেখানে সৈন্য নিয়োগ করে সীমান্ত পাহারা আরও জোরদার করে। মিসরের প্রথম সামরিক চৌকি ছিল আল-আরিশ।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মিসরের পুরো উপকূলবর্তী এলাকায় সামরিক চৌকি নির্মাণ করার নির্দেশ দেন। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ের পর সেখানে এক হাজার সশস্ত্র সেনাকে শহরের নিরাপত্তায় নিয়োগ করেন। তাদের এই সংখ্যা বাইজেন্টাইনদের নিকট অপ্রতুল মনে হয়। তারা সমুদ্র-পথে আক্রমণ করে অনেক সশস্ত্র মুজাহিদকে শহীদ করে এবং বাকিরা পালিয়ে যায়। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ফিরে এসে পুনরায় শহরটি দখল করেন এবং এবার তিনি তার বাহিনীর এক-চতুর্থাংশকে শহর রক্ষায় নিয়োজিত করেন। তিনি উপকূল এলাকা রক্ষায় আরেকটি সামরিক চৌকি স্থাপন করেন এবং সেখানে আরেক চতুর্থাংশ সৈন্য নিযুক্ত করেন। বাকি অর্ধেক সৈন্য নিয়ে তিনি ফুসতাতে অবস্থান করেন।

প্রতিবছরই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনা থেকে আলেকজান্দ্রিয়ায় যোদ্ধাদের প্রেরণ করতেন। তিনি সেখানকার গভর্নরদের বলতেন, তারা যেন শহরটিকে অবহেলা না করে এবং আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিয়োগকৃত সৈন্যদের সঙ্গে আরও অতিরিক্ত সৈন্য জমা করে।

এভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পরিকল্পনা অনুযায়ী ইরাক, সিরিয়া এবং মিসরে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষায় দৃঢ় প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হন। তার কার্যক্রম শুধু এই প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তিনি শীত ও গ্রীষ্মকালীন সামরিক মহড়ারও আয়োজন করেছিলেন। সৈন্যরা শীত ও গ্রীষ্মে ইসলামী রাষ্ট্রের সকল সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত টহল দিত। কিছু মহান সামরিক নেতা এসব মহড়ার দায়িত্ব পালন করতেন; আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু, মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু, নুমান ইবনে মুকরিন এবং আরও অনেকে।

দূরবর্তী অঞ্চলে সীমান্ত প্রহরায় নিযুক্ত থাকায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের জন্য বর্ধিত বেতন-ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন এবং তাদের জন্য জমিও বরাদ্দ দিয়েছিলেন। ওই অঞ্চলের সেনাপতিরা সীমান্তে নিয়োজিত সৈন্যদের গনীমতের অংশ দিতেন, যেমন তারা জিহাদের অংশগ্রহণকারী সৈন্যদের দিতেন। কারণ, এসব সীমান্ত-প্রহরীরা মুসলমানদের জন্য প্রতিরক্ষা ব্যূহ হিসাবে কাজ করত এবং ওই দিক থেকে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করত। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন মৃত্যুসজ্জায়, তখন তিনি পরবর্তী খলীফার উদ্দেশে পরামর্শ দেন: 'আমার পরে যিনি খলীফা হবেন, তার জন্য আমার একটি উপদেশ হচ্ছে, সীমান্ত-প্রহরীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করবেন; কারণ, তারা ইসলামের ঢালস্বরূপ; তারা অর্থ সংগ্রহ করে এবং শত্রুদের উত্ত্যক্ত করে। তাদের প্রাপ্য থেকে কোনো কিছুই হ্রাস করবেন না। তবে তাদের সম্মতিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ নেওয়া যেতে পারে।'

৪.৫। উমর রা. এবং রাজা-বাদশাদের মধ্যে সম্পর্ক
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং পারসিক সম্রাটের মধ্যে ছিল যুদ্ধের সম্পর্ক। তার মৃত্যুর পরও মুসলিম বাহিনী ইয়াযদগিরদকে নিজ ভূখণ্ডে ধাওয়া করছিল এবং তার সাম্রাজ্য ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। বাইজেন্টাইন সম্রাটের সঙ্গে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সম্পর্কের ব্যাপারে জানা যায় যে, এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তিচুক্তি ছিল, যা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক সিরিয়া ও আল-জাজিরা বিজয়ের পর শেষ হয়ে যায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং বাইজেন্টাইন সম্রাটের মধ্যে চিঠিপত্র লেনদেন হয়েছিল।

আরব ঐতিহাসিকদের মতে এই চিঠিপত্র আদান-প্রদান হিরাক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘটিত হয়েছিল। তবে তারা এটি হিরাক্লিয়াস-১ অথবা হিরাক্লিয়াস-২ এর সঙ্গে হয়েছিল, তা স্পষ্ট করে বলেননি। হিরাক্লিয়াস-১ এর নিকট থেকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছিলেন। আর হিরাক্লিয়াস-২ হিরাক্লিয়াস কন্সটান্টাইন নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ৬৪১ খ্রিষ্টাব্দে (২১ হি.) মৃত্যুবরণ করেন এবং তার ছেলে একই বছর তার স্থলাভিষিক্ত হন; উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের দুই বছর আগে।

যার সঙ্গেই চিঠি লেনদেন হোক না কেন, তাদের মধ্যে পত্রবাহকের আসা-যাওয়া ছিল। উম্মে কুলসুম বিনতে আলী ইবনে আবি তালিব, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী, একবার হিরাক্লিয়াসের স্ত্রীর নিকট একটি উপহার পাঠিয়েছিলেন। উক্ত উপহারটি বাইজেন্টাইন সম্রাটের পক্ষ থেকে আগত পত্রবাহকের মাধ্যমেই প্রেরণ করা হয়েছিল। আর বাইজেন্টাইন সম্রাটের স্ত্রীও এর বিনিময়ে মূল্যবান অলঙ্কারাদি উপহার হিসাবে পাঠিয়েছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেগুলো বাইতুল মালে জমা করে দিয়েছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর চিঠির সঙ্গে উম্মে কুলসুম উপহার প্রেরণ করেছিলেন বলে ইতিহাসের বইতে পাওয়া যায়।

৪.৬। উমর রা.-এর বিজয়ের প্রভাব
১। মুসলিম বাহিনী কর্তৃক পারসিক ও বাইজেন্টাইন রোমান সাম্রাজ্য সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ফলে এই দুই পরাশক্তির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অহেতুক সংঘর্ষের পরাসমাপ্তি ঘটে। এই দুই অঞ্চলের অধিবাসীরা অনবরত যুদ্ধে বিপর্যস্ত ও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। এসব সংঘর্ষে শাসকদের ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানো ছাড়া অন্য কোনো কারণ ছিল না।
২। এই অঞ্চলে একক নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটে, যার অবস্থান ছিল পৃথিবীর মধ্যস্থল এবং পূর্বদিকে চীনের সীমান্ত থেকে বর্ধিত হয়ে পশ্চিমে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত, দক্ষিণে আরব উপসাগর থেকে উত্তরে এশিয়া মাইনর পর্যন্ত। মানবজাতি এ রকম নেতৃত্ব ইতিপূর্বে আর দেখেনি। পুরো রাজ্যে একই আইন, সামাজিক ব্যবস্থা ও কৃষ্টি-কালচারের বিকাশ ঘটেছিল।
৩। ইসলামী রাষ্ট্রের সকল অধিবাসীরাই ঐশী ব্যবস্থার আওতায় বসবাস শুরু করে। এখানে সকলের ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা ছিল। সমাজের কালো, লাল, সাদা কিংবা হলুদ বর্ণের মানুষদের মধ্যে নীতি ও আদর্শে কোনো পার্থক্য ছিল না; বরং সবাই ছিল আল্লাহর আইনে সমান এবং শ্রেষ্ঠত্বে মাপকাঠি ছিল কেবল তাকওয়া-পরহেজগারী। আল্লাহর আইনের বাস্তব প্রয়োগ ও সুফল মানুষ অনুধাবন করতে পেরেছিল, যা তাদের নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব, বরকত ও অনিঃশেষ রসদ সরবরাহ নিশ্চিত করেছিল।
৪। বিশ্বে এক নতুন উম্মতের আবির্ভাব ঘটে, যারা তাওহীদ ও আল্লাহর বিধানের অধীনে একত্র হয়েছিল। গোত্র, বংশ ও অন্যান্য জাগতিক বন্ধনের লেশমাত্র ছিল না। সকল গোত্র থেকেই এ উম্মতের নেতারা উচ্চমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল, যা থেকে তাদের অবনমিত করার কোনো সুযোগ ছিল না। এ জন্য তারা যাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতো, তাদের বলত : যদি তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো, তাহলে তোমাদের জীবন পরিচালনায় আল্লাহর কিতাব প্রদান করব এবং যদি তোমরা এর বিধি-বিধান মেনে চলো, তাহলে আমরা ফিরে যাব এবং তোমাদের দেশ তোমাদের কাছে ছেড়ে যাব।
৫। সেখানে একটি সুসংহত, ভারসাম্যপূর্ণ ও সুসাদৃশ্য সভ্যতার বিকাশ ঘটে। একই সীমানার ভেতর বিভিন্ন জাতি ও মানুষের বন্ধন গড়ে উঠেছিল এবং সবাই আল্লাহর আইনের অধীন ছিল। ঐশী শাসনব্যবস্থা ও নীতির আলোকে সকল মানুষকেই এই সভ্যতার অংশ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল—কালো, হলুদ কিংবা সাদা। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন তার সময়ের শ্রেষ্ঠ নেতৃত্বের অনির্বচনীয় দৃষ্টান্ত, যিনি তার মেধা ও প্রজ্ঞা, শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব, বিশ্বাস ও কর্মে ছিলেন পরবর্তীদের জন্য অনুসরণীয়। আদর্শ। তিনি তার রাষ্ট্রের সকল সম্পদ, তার সৈন্য, তার অনুসারী ও তার জ্ঞানকে আল্লাহর দ্বীন ও মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছিলেন, যাতে আল্লাহর কালামকে সুউচ্চ করা যায়, মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনা যায়, বস্তু ও ব্যক্তির পূজা থেকে এক আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন করা সম্ভব হয়। এভাবে তিনি আল্লাহর বাণীতে সত্যে পরিণত করেন :

الَّذِينَ إِنْ مَكَّنْهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلوةَ وَآتَوُا الزَّكٰوةَ وَ آمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ
আমি তাদের পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎ কাজের আদেশ করবে ও অসৎ কার্য হতে নিষেধ করবে। সকল কাজের শেষ পরিণাম (ও সিদ্ধান্ত) আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ।

ইসলামী বিজয়সমূহ ইসলামের অধীনেই একটি গৌরবময় মানবসভ্যতার জন্ম দিয়েছিল। সুতরাং আমরা অনুধাবন করতে পারি, ঐশ্বরিকভাবে পরিচালিত সভ্যতা এমন একটি জাতিসত্তার পরিচয় বহন করে, যারা ইসলামী জীবনব্যবস্থায় সমগ্র পৃথিবী ও মানবজাতির জন্য কল্যাণকর নেতৃত্বের ধারক ও বাহক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00