📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 ইরাক ও পূর্বাঞ্চল বিজয়ে শিক্ষাসমূহ

📄 ইরাক ও পূর্বাঞ্চল বিজয়ে শিক্ষাসমূহ


৫.১। মুজাহিদদের ওপর কুরআন ও হাদীসের প্রভাব
কুরআনের যেসব আয়াত ও হাদীসে জিহাদের ফযীলত সম্পর্কে বলা হয়েছে, সেগুলো মুজাহিদদের মনোবল বৃদ্ধিতে খুবই প্রভাব ফেলত। আল্লাহ মুজাহিদদের প্রতিটি কাজের বিনিময়েই পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,

مَا كَانَ لِأَهْلِ الْمَدِينَةِ وَ مَنْ حَوْلَهُمْ مِّنَ الْأَعْرَابِ أَنْ يَتَخَلَّفُوا عَنْ رَّسُولِ اللَّهِ وَلَا يَرْغَبُوا بِأَنْفُسِهِمْ عَنْ نَفْسِهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ لَا يُصِيبُهُمْ ظَمَا وَ لَا نَصَبٌ وَلَا مَخْمَصَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَطَئُونَ مَوْطِئًا يَغِيظُ الْكُفَّارَ وَلَا يَنَالُونَ مِنْ عَدْةٍ نَّيْلًا إِلَّا كُتِبَ لَهُمْ بِهِ عَمَلَ صَالِحٌ إِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ وَلَا يُنْفِقُونَ نَفَقَةً صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً وَ لَا يَقْطَعُونَ وَادِيًا إِلَّا كُتِبَ لَهُمْ لِيَجْزِيَهُمُ اللَّهُ أَحْسَنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
মদীনার অধিবাসী ও তার আশপাশের মরুবাসীদের জন্য সংগত নয় যে, রাসূলুল্লাহ থেকে পেছনে থেকে যাবে এবং রাসূলের জীবন অপেক্ষা নিজেদের জীবনকে অধিক প্রিয় মনে করবে। এর কারণ এই যে, আল্লাহর পথে তাদের যে পিপাসা, ক্লান্তি আর ক্ষুধা পায় এবং তাদের এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করায় কাফিরদের যে ক্রোধের কারণ হয়ে থাকে, আর দুশমনদের হতে তারা যা কিছু প্রাপ্ত হয়—এর প্রত্যেকটি সৎ কাজ বলে গণ্য হবে। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না। আর তারা স্বল্প কিংবা অধিক যা-ই ব্যয় করে এবং অতিক্রম করে যে প্রান্তরই, তা তাদের জন্য লিখে দেওয়া হয়, যাতে তারা যা আমল করত, আল্লাহ তাদের তার চেয়ে উত্তম প্রতিদান দেন।

প্রথম যুগের মুসলমানগণ নিশ্চিতভাবেই জানতেন, জিহাদ একটি সফলতম ব্যবসা। আল্লাহ বলেন,

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَىٰ تِجَٰرَةٍ تُنجِيكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ
تُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَتُجَٰهِدُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ بِأَمْوَٰلِكُمْ وَ أَنفُسِكُمْ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَ يُدْخِلْكُمْ جَنَّٰتٍ تَجْرِى مِن تَحْتِهَا ٱلْأَنْهَٰرُ وَمَسَٰكِنَ طَيِّبَةً فِى جَنَّٰتِ عَدْنٍ ذَٰلِكَ ٱلْفَوْزُ ٱلْعَظِيمُ وَأُخْرَىٰ تُحِبُّونَهَا نَصْرٌ مِّنَ ٱللَّهِ وَفَتْحٌ قَرِيبٌ وَبَشِّرِ ٱلْمُؤْمِنِينَ
হে ঈমানদারগণ, আমি কি তোমাদের এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দেব, যা তোমাদের যন্ত্রণাদায়ক আযাব থেকে রক্ষা করবে? তোমরা আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে। তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর তোমাদের এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত এবং চিরস্থায়ী জান্নাতসমূহে উত্তম আবাসগুলোতেও (প্রবেশ করবেন)। এটাই মহাসাফল্য। এবং আরও একটি (অর্জন) যা তোমরা খুব পছন্দ করো। (অর্থাৎ) আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য ও নিকটবর্তী বিজয়। আর মুমিনদের তুমি সুসংবাদ দাও।

তারা এটিও জানতেন, হাজীদের পানি পান করান ও মসজিদুল হারাম আবাদ করার চাইতে জিহাদ শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ বলেন,

أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِّ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَ الْيَوْمِ الْآخِرِ وَ جَهَدَ فِي سَبِيلِ اللهِ لَا يَسْتَوُنَ عِنْدَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجْهَدُوا فِي سَبِيلِ اللهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَ انْفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللَّهِ وَ أُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ يُبَشِّرُهُمْ رَبُّهُمْ بِرَحْمَةٍ مِّنْهُ وَرِضْوَانٍ وَ جَنَّتٍ لَّهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ مُّقِيمٌ خُلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا إِنَّ اللَّهَ عِنْدَةً أَجْرٌ عَظِيمٌ
তোমরা কি হাজীদের পানি পান করান ও মসজিদুল হারাম আবাদ করাকে ওই ব্যক্তির মতো বিবেচনা করো, যে আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে। তারা আল্লাহর কাছে বরাবর নয়। আর আল্লাহ যালিম কওমকে হিদায়াত দেন না। যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে, আর আল্লাহর পথে নিজদের মাল ও জান দিয়ে জিহাদ করেছে, আল্লাহর কাছে তারা বড়ই মর্যাদাবান আর তারাই সফলকাম। তাদের প্রতিপালক তাদের নিজের পক্ষ থেকে সুসংবাদ দিচ্ছেন রহমত ও সন্তুষ্টির এবং এমন জান্নাতসমূহের যাতে রয়েছে তাদের জন্য স্থায়ী নিয়ামত। তথায় তারা থাকবে চিরকাল। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে রয়েছে মহাপুরস্কার।

তারা বিশ্বাস করতেন, সর্বক্ষেত্রেই জিহাদ মানেই বিজয়। আল্লাহ বলেন,

قُلْ هَلْ تَرَبَّصُونَ بِنَا إِلَّا إِحْدَى الْحُسْنَيَيْنِ وَ نَحْنُ نَتَرَبَّصُ بِكُمْ أَنْ يُصِيبَكُمُ اللهُ بِعَذَابٍ مِّنْ عِنْدَةٍ أَوْ بِأَيْدِينَا فَتَرَبَّصُوا إِنَّا مَعَكُمْ مُتَرَبِّصُونَ
বলো : তোমরা তো আমাদের জন্য দুটি কল্যাণের মধ্যে একটি কল্যাণের প্রতীক্ষায় রয়েছ; আর আমরা তোমাদের জন্য এই প্রতীক্ষা করছি যে, আল্লাহ তোমাদের ওপর কোনো শাস্তি সংঘটন করবেন—নিজের পক্ষ হতে অথবা আমাদের দ্বারা; অতএব তোমরা অপেক্ষা করতে থাকো, আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণ রইলাম।

শহীদদের মৃত্যু নেই; বরং তারা জীবিত। যেমন আল্লাহ বলেন,

وَلاَ تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُواْ فِي سَبِيلِ اللّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ فَرِحِينَ بِمَا آتَاهُمُ اللّهُ مِن فَضْلِهِ وَيَسْتَبْشِرُونَ بِالَّذِينَ لَمْ يَلْحَقُواْ بِهِم مِّنْ خَلْفِهِمْ أَلاَّ خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلاَ هُمْ يَحْزَنُونَ يَسْتَبْشِرُونَ بِنِعْمَةٍ مِّنَ اللّهِ وَفَضْلٍ وَأَنَّ اللّهَ لاَ يُضِيعُ أَجْرَ الْمُؤْمِنِينَ
যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের মৃত ভেবো না; বরং তারা জীবিত, তাদের প্রতিপালকের সান্নিধ্যে থেকে তারা রিযকপ্রাপ্ত হচ্ছে। আল্লাহ তাদের স্বীয় অনুগ্রহ হতে যা দান করেছেন তাতেই তারা পরিতুষ্ট; এবং তাদের ভাইয়েরা যারা এখনো তাদের সাথে সম্মিলিত হয়নি তাদের এই অবস্থার প্রতিও তারা সন্তুষ্ট হয় যে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না। তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামত ও অনুগ্রহ লাভে খুশি হয়। আর নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।

তারা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই জিহাদ করতেন। আল্লাহ বলেন,

فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللّهِ الَّذِينَ يَشْرُونَ الْحَيَوةَ الدُّنْيَا بِالآخِرَةِ وَمَن يُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللّهِ فَيُقْتَلْ أَوْ يَغْلِبْ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا وَ مَا لَكُمْ لاَ تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَ النِّسَاء وَ الْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا ۚ وَ اجْعَلْ لَّنَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا ۚ وَ اجْعَلْ لَّنَا مِنْ لَّدُنْكَ
نَصِيرًا الَّذِينَ آمَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَ الَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَنِ ۚ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَنِ كَانَ ضَعِيفًا
অতএব যারা দুনিয়ার বিনিময়ে আখিরাত ক্রয় করে, তারা যেন আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে; এবং যে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, অতঃপর নিহত অথবা বিজয়ী হয়, তাহলে আমি তাকে মহা প্রতিদান প্রদান করব। তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছ না? অথচ নারী, পুরুষ এবং শিশুদের মধ্যে যারা দুর্বল তারা বলে: হে আমাদের রব, আমাদের অত্যাচারী এই নগর হতে নিষ্কৃতি দিন এবং স্বীয় সন্নিধান হতে আমাদের পৃষ্ঠপোষক ও নিজের নিকট হতে আমাদের জন্য সাহায্যকারী প্রেরণ করুন। যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে তারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে এবং যারা কাফির তারা শায়তানের পক্ষে যুদ্ধ করে; সুতরাং তোমরা শায়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো; নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল দুর্বল।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের নিকট জিহাদের ফযীলত বর্ণনা করেছেন এবং তার কথায় মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক জযবা সৃষ্টি হয়। এসব হাদীসের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য হাদীস : আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জিজ্ঞাসা করা হলো, 'হে আল্লাহর রাসূল, মানুষের মধ্যে কে উত্তম?' আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'সে-ই মুমিন, যে নিজ জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুজাহিদদের মর্যাদা নিয়েও কথা বলেছেন। তিনি বলেন : আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্য আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে এক শটি মর্যাদার স্তর প্রস্তুত রেখেছেন। দুটি স্তরের ব্যবধান আসমান ও যমীনের দূরত্বের মতো। তোমরা আল্লাহর নিকট চাইলে ফেরদাউস চাইবে। কেননা, এটাই হলো সবচেয়ে উত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শহীদদের গুণাবলি ব্যাখ্যা করে বলেন: যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জিহাদে বের হয়, তাদের জন্য আল্লাহ ঘোষণা করেন, যদি সে কেবল আল্লাহ ও তার রাসূলগণের ওপর ঈমানের কারণে জিহাদে বের হয়ে থাকে, তাহলে আমি তাকে নেকী ও গনীমতসহ (ঘরে) ফিরিয়ে আনব অথবা তাকে জান্নাতে দাখিল করব। যদি আমার উম্মতের জন্য কঠিন মনে না হতো, তাহলে আমি সব অভিযানেই সশরীরে অংশগ্রহণ করতাম। আমার মনের ইচ্ছা হলো, আমি আল্লাহর পথে নিহত হই, তারপর আবার জীবিত হই, আবার নিহত হই, আবার জীবিত হই, আবার নিহত হই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, জান্নাতে প্রবেশের পর আর কেউ দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে না, যদিও দুনিয়ার সকল জিনিস তাকে দেওয়া হয়— একমাত্র শহীদ ব্যতীত; সে দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে যেন দশবার শহীদ হয়। কেননা, সে শাহাদাতের মর্যাদা দেখেছে।

এমন আরও অনেক হাদীস রয়েছে, যা প্রথম যুগের মুসলিম ও তাদের অনুসারীদের অনুপ্রাণিত করত। প্রবীণ সাহাবায়ে কেরাম বৃদ্ধ বয়সেও জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন। লোকেরা তাদের জন্য দুঃখ অনুভব করতেন এবং তাদের জিহাদে না যাওয়ার অনুরোধ করতেন; কারণ, তাদের বার্ধক্যের কারণে না যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু তারা সূরা তাওবার আয়াত দিয়ে দলীল দিতেন, যা তাদের থামাতে পারেনি। তারা মনে করতেন, জিহাদে অংশগ্রহণ না করলে হয়তো তারা মুনাফিকদের দলভুক্ত হয়ে যাবেন!

৫.২। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জিহাদের বিভিন্ন ফলপ্রসূ দিক
খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণ মুসলিম উম্মাহর স্বার্থে আল্লাহর পথে জিহাদকে অপরিহার্য মনে করতেন। তারা ইরাক, পূর্বাঞ্চল, সিরিয়া, মিসর এবং উত্তর আফ্রিকা বিজয়ে এই বাধ্যবাধকতাকে নিজেদের কর্তব্য স্থির করেছিলেন। আর এ কারণে মুসলিম জাতি অনেক ফলপ্রসূ দিকের সন্ধান লাভ করে; মানবজাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন, কুফর ও শিরকের শক্তি ও ক্ষমতাকে দমন, তাদের অবমাননাকর পরিণতির স্বীকার করা ও তাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করা এবং ইসলামের দাওয়াতের সত্যতাকে দিবালোকের মতো বাস্তবে পরিণত করা, যাতে দলে দলে লোক ইসলামে দাখিল হতে থাকে। এভাবে মুসলমানগণ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হন এবং মুশরিকদের লাঞ্ছনার পরিমাণকে বাড়িয়েছে। মুসলিম জাতি তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং তারা মানবজাতির জন্য হেদায়েত, ন্যায়বিচার ও ইসলামের কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত করেছে।

৫.৩। ইরাক ও পূর্বাঞ্চল বিজয়ে আল্লাহর বিধানের বাস্তব নিদর্শন
ইরাক ও পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন দেশ ও ভূখণ্ড বিজয়ের অভিযান খুব ভালোভাবে অধ্যয়ন করলে গবেষকগণ সহজেই সমাজ, জনগণ এবং রাষ্ট্রের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার স্বতঃসিদ্ধ কিছু নীতির প্রয়োগ প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হবেন।

৫.৩.১। উপায়-উপকরণ ব্যবহারে নিয়ম-নীতি
আল্লাহ বলেন,

وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمْ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ
আর প্রস্তুত করো তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যা-ই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি-সামর্থ্যের মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন প্রভাব পড়ে আল্লাহর শত্রুদের ওপর এবং তোমাদের শত্রুদের ওপর আর তাদের ছাড়া অন্যান্যদের ওপর ও যাদের তোমরা জানো না; আল্লাহ তাদের চেনেন। বস্তুত যা কিছু তোমরা ব্যয় করবে আল্লাহর রাহে, তা তোমরা পরিপূর্ণভাবে ফিরে পাবে এবং তোমাদের কোনো হক অপূর্ণ থাকবে না।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই আয়াতের শিক্ষাকে তার রাজ্যে প্রয়োগ করেন। জাগতিক ও আত্মিক উপায়-উপকরণ ব্যবহার করার ব্যাপারে তার নীতি ইতিপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে।

৫.৩.২। একজনের মাধ্যমে অন্যকে দমন করার নীতি
আল্লাহ বলেন,

وَلَوْ لَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَفَسَدَتِ الْأَرْضُ وَلَكِنَّ اللَّهَ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْعُلَمِينَ
আল্লাহ যদি একজনকে অপরজনের দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে গোটা দুনিয়া বিধ্বস্ত হয়ে যেত। কিন্তু বিশ্ববাসীর প্রতি আল্লাহ একান্তই দয়ালু, করুণাময়।
সকল অভিযানেই এ নীতির বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এটা আল্লাহর সৃষ্টিজগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি। মুসলিম জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সোনালি যুগের মুসলমানরা এ নীতি সঠিকভাবেই হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন এবং এর ভিত্তিতেই কাজ করেছেন। তারা জানতেন, সত্য প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন সংকল্প, সাহায্য করার দৃঢ় পদক্ষেপ; এটিকে জয়ী করার অদম্য কর্মস্পৃহা, ভালোবাসার মতো হৃদয় ও আবেগ-যা এটিকে অন্তরে গেঁথে রাখবে। এতে মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষা প্রয়োজন; কারণ, এ দুনিয়ায় এটিই আল্লাহর নিয়ম এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা বহাল থাকবে।

৫.৩.৩। বিপদ-আপদের মাধ্যমে পরীক্ষার নীতি
আল্লাহ বলেন,

أمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُمْ مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلِكُمْ مَسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَ زُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَ الَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللهِ آلَآ إِنَّ نَصْرَ اللهِ قَرِيبٌ
তোমরা কি এমন ধারণা পোষণ করো যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ এখনো তোমাদের নিকট তাদের মতো কিছু আসেনি, যারা তোমাদের পূর্বে গত হয়েছে; তাদের বিপদ ও দুঃখ স্পর্শ করেছিল এবং তাদের প্রকম্পিত করা হয়েছিল; এমনকি রাসূল ও তৎসহ বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ বলেছিল : কখন আল্লাহর সাহায্য আসবে? সতর্ক হও, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।

ইরাক অভিযানের সময় বিপদ ও পরীক্ষা মুসলমানদের ওপর আপতিত হয়েছিল; বিশেষ করে আবু উবাইদের সেতুযুদ্ধ, যেখান হাজার হাজার মুসলমান শাহাদাত বরণ করেছিল এবং তাদের বাহিনী পরাজিত হয়েছিল। তারপর তারা পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয় এবং পারসিকদের বিরুদ্ধে বিরাট বিজয় লাভ করে। আল্লাহ বলেন,

لَتُبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ
অবশ্যই ধন-সম্পদ ও নিজ জীবন সম্পর্কে তোমাদের পরীক্ষা করা হবে।

এখানে উল্লেখ্য, আয়াতে যেভাবে মুসলিম উম্মাহকে পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে, তা জোরালোভাবেই ব্যক্ত করা হয়েছে। এটাই ঈমানদার ও ঈমানের দিকে আহ্বানকারীদের জন্য আল্লাহর নীতি; জীবনে অবশ্যই কিছু বিপদ আসবে, নিজের ও সম্পদের কিছু ক্ষতি সাধিত হবে এবং এতে সবর করাই প্রকৃত মুমিনের অন্যতম কাজ।

৫.৩.৪। অত্যাচারী ও অত্যাচারিতদের ব্যাপারে আল্লাহর নীতি
সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন,

ذلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْقُرَى نَقُصُّهُ عَلَيْكَ مِنْهَا قَائِمٌ وَ حَصِيدٌ وَ مَا ظَلَمْتُهُمْ وَلَكِنْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ فَمَا أَغْنَتْ عَنْهُمُ الهَتُهُمُ الَّتِي يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ لَمَّا جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ وَ مَا زَادُوهُمْ غَيْرَ تَثْبِيب
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ وَ كَذلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَ هِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ
এ হচ্ছে জনপদসমূহের কিছু সংবাদ, যা আমি তোমার কাছে বর্ণনা করছি। তা থেকে কিছু আছে বিদ্যমান এবং কিছু হয়েছে বিলুপ্ত। আর আমি তাদের ওপর যুলম করিনি; বরং তারা নিজেদের ওপর যুলুম করেছে। তারপর যখন তোমার রবের নির্দেশ এল, তখন আল্লাহ ছাড়া যেসব উপাস্যকে তারা ডাকত, তারা তাদের কোনো উপকার করেনি এবং তারা ধ্বংস ছাড়া তাদের আর কিছুই বৃদ্ধি করেনি। আর এরূপই হয় তোমার রবের পাকড়াও, যখন তিনি পাকড়াও করেন অত্যাচারী জনপদসমূহকে। নিঃসন্দেহে তাঁর পাকড়াও বড়ই যন্ত্রণাদায়ক, কঠোর।

আল্লাহর নীতি বাস্তবায়িত হবেই; অত্যাচারী জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। পারস্যের শাসকরা তাদের জনগণের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন করেছে এবং আল্লাহর নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। সুতরাং আল্লাহর শাশ্বত নীতিই তাদের ওপর বাস্তবায়িত হয়েছে এবং আল্লাহ তাদের শাসনক্ষমতা মুসলমানদের হাতে দিয়েছেন। আর পারসিকরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে।

৫.৩.৫। বিত্তশালীদের ব্যাপারে আল্লাহর নীতি
আল্লাহ তা'আলা বলেন,

وَ إِذَا أَرَدْنَا أَنْ تُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْ نَهَا تَدْمِيرًا
আমি যখন কোনো জনবসতিকে ধ্বংস করতে চাই তখন তাদের সচ্ছল ব্যক্তিদের আদেশ করি (আমার আদেশ মেনে চলার জন্য)। কিন্তু তারা অবাধ্যতা করতে থাকে। তখন সে জনবসতির প্রতি আমার আযাবের ফায়সালা সাব্যস্ত হয়ে যায়। তখন আমি তা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করে দিই।

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়, যখন কোনো জনপদ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়, তখন সেখানকার বিত্তবান, তাদের স্বেচ্ছাচারী শাসকশ্রেণি ও রাজাকে আল্লাহর আনুগত্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তারা সীমালঙ্ঘন করে এবং তাদের ওপর আযাব অবধারিত হয়ে যায়। যদিও এখানে আল্লাহর আনুগত্যের আদেশ সবার জন্যই দেওয়া হয়েছে, তবু আল্লাহ সমাজের বিত্তবানদের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন; কারণ, তারাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও গোমরাহীর মূল হোতা; আর বাকিরা তাদের অনুসরণ করার মাধ্যমেই গোমরাহী ও অপরাধে লিপ্ত হয় এবং এতে সচ্ছল ব্যক্তিরা তাদের উৎসাহিতও করে। সুতরাং তাদের সম্বোধন করাই অধিক যুক্তিসংগত।
পারস্যের শাসকবর্গের ওপর আল্লাহর এই নীতি বাস্তবায়িত হয়েছিল।

৫.৩.৬। স্বেচ্ছাচারী শাসকদের ব্যাপারে আল্লাহর নীতি
আল্লাহ বলেন,

إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْ صَادِ
তোমার প্রতিপালক অবশ্যই সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন (যেমন ঘাঁটিতে শত্রুর প্রতি দৃষ্টি রাখা হয়)।

এ আয়াতে গোনাহগারদের সাধারণভাবে সতর্ক করা হয়েছে; অনেকের মতে, এ আয়াতটি কাফেরদের জন্য সতর্কবার্তা, অথবা গোনাহগার ও অন্যান্যদের জন্য সতর্কবার্তা। তাফসীরে আল-কুরতুবীতে বলা হয়েছে, আল্লাহ প্রত্যেকের ওপরই সতর্ক দৃষ্টি রাখেন যতক্ষণ না তিনি তাকে পুরস্কৃত অথবা শাস্তি প্রদান করেন। তাফসীরবিদদের মতে, এ আয়াতে আল্লাহর একটি শাশ্বত নীতির কথা বলা হয়েছে, স্বেচ্ছাচারী শাসকদের ওপর দুনিয়াতেই আল্লাহর আযাব পতিত হয়। এটি আল্লাহর একটি চিরন্তন নিয়ম, যা আগেও ঘটেছে, বর্তমান ও ভবিষ্যতের স্বেচ্ছাচারী শাসকদের বেলায়ও ঘটবে। তাদের কেউই দুনিয়াতে আল্লাহর শাস্তিকে এড়িয়ে যেতে পারবে না, যেমন কিনা তারা আখেরাতে আল্লাহর শাস্তিকে এড়াতে পারবে না।

স্বেচ্ছাচারী শাসকশ্রেণির ওপর দুনিয়াতেই শাস্তি প্রয়োগে আল্লাহর যে শাশ্বত বিধান, তাতে অনেক শিক্ষা রয়েছে। এসব শিক্ষা কেবল তারাই গ্রহণ করতে পারে, যারা আল্লাহ ও তাঁর শাস্তিকে ভয় করে চলে। আর নিশ্চিতভাবেই জানে যে, আল্লাহর নীতি অবধারিত এবং কোনো কিছুই এর বাস্তবায়ন রোধ করতে সক্ষম নয়। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে স্বেচ্ছাচারী শাসকদের শাস্তি প্রদানের এই নীতি যারা বুঝেছিলেন এবং ফিরআউনের মন্দ পরিণতির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন,

فَأَخَذَهُ اللهُ نَكَالَ الْآخِرَةِ وَالْأُولَى إِنَّ فِي ذَلِكَ لَعِبْرَةً لِمَنْ يَخْشَى
অতঃপর আল্লাহ তাকে পরকালের ও ইহকালের শাস্তি দিলেন। যে ভয় করে তার জন্য অবশ্যই এতে শিক্ষা রয়েছে।

পারস্যের শাসকবর্গের জন্য আল্লাহর এই নীতিও বাস্তবায়িত হয়েছিল।

৫.৩.৭। ক্রমাগত উন্নতির নীতি
ইরাক ও পূর্বাঞ্চল বিজয়ের পটভূমি এ নীতিতেই অগ্রসর হয়েছে। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে এর প্রথম পর্বের সূচনা হয়েছে। তখন খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে আল-হেরা মুসলমানদের অধীন হয়। আর এর দ্বিতীয় পর্বের শুরু হয় যখন আবু উবাইদ আস-সাকাফি ইরাকে মুসলিম সেনাবাহিনীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং আল-বুওয়াইব যুদ্ধ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। তৃতীয় পর্বের শুরু হয় যখন সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ইরাকে জিহাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং নাহাওয়ান্দ যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। নাহাওয়ান্দ যুদ্ধের মাধ্যমে এর চতুর্থ পর্বের শুরু হয়। মুসলিম বাহিনী যখন পারস্যের অনেক ভেতরে পৌঁছে যায়, তখন শুরু হয় এর পঞ্চম পর্ব। এ উদাহরণ একজন মুসলমানকে আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে ক্রমাগত উন্নতিতে আল্লাহর যে বিধান রয়েছে, তার গুরুত্ব অনুধাবন করতে শেখায়। এ নীতির সারবস্তু হলো, পথ অনেক দীর্ঘ। সুতরাং ইসলামে যারা দাওয়াতের কাজ করছে, তাদের এ নীতি ভালো করেই বোঝা উচিত। ইরাক ও পূর্বাঞ্চলে ইসলামী শাসন একদিনেই কায়েম হয়ে যায়নি; বরং এটি এ নীতিকে অনুসরণ করেছে।

৫.৩.৮। নিজেকে পরিবর্তন করার নীতি
আল্লাহ বলেন,

إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ
আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।

সাহাবায়ে কেরাম এ নীতির আলোকেই ইরাক ও পূর্বাঞ্চল বিজয় শুরু করেন। বিজিত অঞ্চলে যারা ইসলাম কবুল করেছে, সাহাবায়ে কেরাম তাদের আগে কুরআন ও সুন্নাহ শিক্ষা দিয়েছেন; ঈমান ও একিন এবং চরিত্রের মহান গুণাবলি তাদের অন্তরে বদ্ধমূল করেছেন।

৫.৩.৯। গোনাহ ও মন্দকর্মের ব্যাপারে আল্লাহর নীতি
আল্লাহ বলেন,

أَلَمْ يَرَوْا كَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنْ قَرْنٍ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ مَا لَمْ نُمَكِّنْ لَكُمْ وَأَرْسَلْنَا السَّمَاءَ عَلَيْهِمْ مِدْرَارًا وَ جَعَلْنَا الْأَنْهُرَ تَجْرِى مِنْ تَحْتِهِمْ فَأَهْلَكْنَاهُمْ بِذُنُوبِهِمْ وَ أَنْشَأْنَا مِنْ بَعْدِهِمْ قَرْنًا آخَرِينَ
তারা কি দেখে না, আমি তাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি? যাদের যমীনে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যেভাবে তোমাদের প্রতিষ্ঠিত করিনি। আর তাদের ওপর বৃষ্টি পাঠিয়েছিলাম মুষলধারে এবং সৃষ্টি করেছিলাম নদীসমূহ, যা তাদের নীচে প্রবাহিত হতো। অতঃপর তাদের পাপের কারণে তাদের ধ্বংস করেছি এবং তাদের পরে অন্য প্রজন্মকে সৃষ্টি করেছি।

আল্লাহ পারসিকদের কৃত গোনাহের কারণে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আর তাদের সবচেয়ে বড় গোনাহ ছিল কুফর ও শিরক। এই আয়াতে একটি শাশ্বত ও চিরন্তন নীতির কথা বলা হয়েছে: যারা গোনাহ করে, গোনাহই তাদের ধ্বংস করে। আর আল্লাহ গোনাহের জন্য গোনাহগারদের ধ্বংস করেন। বিজয়ের জন্য সকল শর্ত ও আল্লাহর নীতির প্রতি অবিচল থাকার জন্যই তিনি মুসলমানদের পারসিক সাম্রাজ্যের শাসনক্ষমতা লাভ করার সুযোগ দিয়েছেন।

৫.৪। আল-আহনাফ ইবনে কাইসড়ইতিহাস পরিবর্তনকারী
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পারস্য জয় পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তিনি পূর্বাঞ্চলে বেশি ভেতরে অভিযান পরিচালনা করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, বিশেষ করে আল-হরমুযানের পতন এবং আল-আহওয়ায বিজয়ের পর। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'বসরাবাসীদের জন্য দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল এবং আল-আহওয়ায যথেষ্ট। আমি মনে করি, আমাদের ও পারস্যের মধ্যে একটি আগুনের পাহাড় রয়েছে, যা তাদের আমাদের দিকে এবং আমাদের তাদের দিকে অগ্রসর হতে বাধা হয়ে থাকবে।' তিনি কুফাবাসীকে বলেন, 'তাদের ও পাহাড়ের মধ্যে একটি আগুনের পাহাড় রয়েছে, যা তাদের আমাদের দিকে এবং আমাদের তাদের দিকে অগ্রসর হতে বাধা হয়ে থাকবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। তখন আল-আহনাফ বলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমাকে আপনার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আমরা যেন পারস্যের অভ্যন্তরে আর কোনো অভিযান পরিচালনা না করি। আর আপনি আমাদের বিজিত এলাকার মধ্যেই সীমিত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু পারস্যের সম্রাট এখনো তাদের মধ্যে রাজত্ব করছে। যতদিন রাজা বেঁচে আছেন, ততদিন তারা আমাদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করেই যাবে। দুজন রাজা কখনো একসঙ্গে রাজত্ব করতে পারে না যতক্ষণ না একজন অন্যজনকে বহিষ্কার করে। সম্ভবত আমরা কেবল তাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধেই এতদিন যুদ্ধ করেছি। পারস্যের সম্রাট তার জনগণকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে চলেছে। আমরা যতদিন না তাদের সমগ্র ভূখণ্ডে অভিযান চালাব এবং তাকে বিতাড়িত করব, ততদিন এ হীন প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আর এটা করা সম্ভব হলে পারসিকরা বিফল হবে এবং আত্মসমর্পণ করবে।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আহনাফকে বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছ। আল্লাহর কসম, তুমি যথার্থভাবেই বিষয়টি আমার সামনে উপস্থাপন করতে পেরেছ।’ সুতরাং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পারস্যের অভ্যন্তরে অভিযানের অনুমতি প্রদান করলেন। তিনি আহনাফের মতকে গ্রহণ করে এর যথাযথ মূল্যায়ন করলেন। তারপর মুসলিম বাহিনী পারস্যের অভ্যন্তরে লড়াই শুরু করে। আহনাফ খোরাসান অভিযানে সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত হন। অন্যান্য মুসলিম বীর সেনাপতিরা বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযানের দায়িত্ব পেলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের জন্য রণকৌশল নির্ধারণ করে দিলেন এবং পেছন থেকে সাহায্য-সৈন্য সরবরাহ করে তাদের শক্তিশালী করলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00