📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 নাহাওয়ান্দ যুদ্ধ (চতুর্থ পর্যায়), ২১ হি. ২৫৭

📄 নাহাওয়ান্দ যুদ্ধ (চতুর্থ পর্যায়), ২১ হি. ২৫৭


পারসিক বাহিনীর ওপর মুসলমানগণ একের পর এক অসংখ্য যুদ্ধে জয়লাভ করেছে। তারা পালিয়ে যাওয়া শত্রুদের পেছনে এমনভাবে ধাওয়া করেছে যাতে শত্রুরা কোথাও গিয়ে স্থির হতে পারেনি। কাদেসিয়া যুদ্ধে মুসলমানদের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর নাহাওয়ান্দ অভিযান প্রায় চার বছর পরে সংঘটিত হয়। মুসলিম বাহিনী হয়তো পারসিক সম্রাটের সর্বশেষ সৈন্যকেও পাকড়াও করতে সক্ষম হতো, যদি-না উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের অভিযান জাগহারুস (জাগরুস) পর্বত পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখতে না বলতেন। মুসলিম বাহিনীকে পুনর্গঠন এবং বিজিত এলাকায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার জনই এ রকম আদেশ জারি করা হয়েছিল। [cite: ২৩০]

কাদেসিয়ার পর একের পর এক যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে পরাজয়ের গ্লানি পারসিকদের উত্তেজিত ও ক্ষুব্ধ করে তোলে। মনে হচ্ছিল, তারা এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তাদের নেতৃবৃন্দ এবং সেনাপতিরা পারস্য সম্রাট ইয়াযদগিরদের নিকট পত্র প্রেরণ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ করার আহ্বান জানায়। সম্রাট তাতে রাজি হন। সৈন্য-সামন্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি—যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তিনি তাই নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পুনরায় লড়াই করতে মনস্থ করেন। তিনি আল-বাব থেকে সাফিস্তান এবং খোরাসান পর্যন্ত পাহাড়ি এলাকার অধিবাসীদের চিঠি দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে নির্দেশ দেন। সবাইকে নাহাওয়ান্দ শহরে এসে মিলিত হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি এ স্থানটিকেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য নির্দিষ্ট করেন। এটি ছিল সুরক্ষিত। এর চারিদিকে পাহাড় এবং কঠিন গিরিপথ অতিক্রম না করে এতে প্রবেশ করার উপায় ছিল না। পারসিকরা এখানে এসে সমবেত হয়। ইয়াযদগিরদ এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার সৈন্য জমা করতে সমর্থ হন; এর মধ্যে তিরিশ হাজার ছিল আল-বাব ও হুলওয়ান এলাকার মধ্যবর্তী অঞ্চলের, ষাট হাজার ছিল খোরাসান ও হুলওয়ানের মধ্যবর্তী অঞ্চলের এবং একই সংখ্যক সৈন্য সাফিস্তান ও হুলওয়ান এলাকার। ইয়াযদগিরত এ বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে ফাইরাযানকে মনোনীত করেন।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট পারসিকদের এই নতুন তৎপরতা সম্পর্কে বিস্তারিত লিখে জানানো হয়। তাকে ওই অঞ্চলের পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কেও অবহিত করা হয়। মুসলমানগণ তার নির্দেশের অপেক্ষায় থাকেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ বিষয়ে মদীনার বড় বড় সাহাবী ও বিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে পরামর্শ করেন। তারপর তিনি পারসিকদের সর্বশেষ ঘাঁটি নাহাওয়ান্দে আক্রমণ করার জন্য মুসলিম বাহিনী প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ওই সময় নুমান ইবনে মুকাররিন কাসকারের গভর্নর ছিলেন। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এক চিঠিতে লেখেন : আমার এবং কাসকারের মধ্যে সম্পর্ক একজন যুবকের পাশে সুন্দরী ও আকর্ষণীয় বেশ্যার মতোই। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে এ পদ থেকে অব্যাহতি দিন এবং আমাকে কোনো মুসলিম সেনাবাহিনীতে অংশগ্রহণের সুযোগ দিন। [cite: ২৩১] তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শূরা কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে নুমান ইবনে মুকাররিনকেই নাহাওয়ান্দে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে নিয়োগ দেন। নাহাওয়ান্দে সমর-পরিকল্পনা প্রণয়নে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন :

১। নুমান ইবনে মুকাররিন (কাসকারের গভর্নর) মুসলিম সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক।
২। হুযাইফা ইবনে আল-ইয়ামিন কুফার বিয়োজিত বাহিনীর সেনাপতি।
৩। আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু (বসরার গভর্নর) বসরার বিয়োজিত বাহিনীর সেনাপতি।
৪। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু মুহাজির ও আনসারদের নিয়ে গঠিত বাহিনীর সেনাপতি।
৫। সালমা ইবনে আল-কায়্যিন, হারমালা ইবনে মুরাইতা, জার ইবনে কুলাইব, আসওয়াদ ইবনে রাবিআ এং আল-আহওয়ায ও পারস্যের অন্যান্য মুসলিম সেনাপতি নিজ নিজ এলাকায় সৈন্য সমাবেশ করবে, যাতে শত্রুদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নর ও সেনাপতিদের উদ্দেশে যুদ্ধের বিস্তারিত নির্দেশ লিখে পাঠান এবং তিনি প্রায় তিরিশ হাজার সৈন্যের এক সামরিক বাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হন। [cite: ২৩২] নুমান ইবনে মুকাররিন মুসলিম বাহিনী নিয়ে নাহাওয়ান্দের দিকে রওনা হন। তারা সেখানে পৌঁছে দেখেন, জায়গাটি সত্যিই খুব দুর্গম। চারিদিকে গভীর পরিখা রয়েছে। আর পরিখার সম্মুখভাগে ধারালো পেরেক পুঁতে রাখা হয়েছে, যা আক্রমণকারীদের জন্য অতিক্রম করা কঠিন। আর এতে ঘোড়াগুলোও আহত হয়ে যাবে এবং তারা আর অগ্রসর হতে পারবে না। দেয়াল ঘেরা শহরের অভ্যন্তরে পারসিক বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত অবস্থায় অবস্থান করছে। কাদেসিয়া যুদ্ধে যারা উপস্থিত ছিল না তারা নাহাওয়ান্দ সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয় এবং মুসলমানদের সম্ভাব্য আক্রমণ পথে ফাইযান তার তিরন্দাযদের অবস্থান নিতে বলে, যাতে মুসলমানরা অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলেই তাদের তিরের আঘাতে কাবু করা সম্ভব হয়। [cite: ২৩৩] মুসলমানদের অগ্রগামী দল অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ধারালো পেরেকে তারা বাধাপ্রাপ্ত হয়। ইতিমধ্যে পারসিকরা তির নিক্ষেপ করতে থাকে। তারা কোনোমতে শহরের দেয়ালের আড়ালে আশ্রয় নেয়।

এভাবে দু-দিন অতিবাহিত হয়ে গেল। নুমান বাহিনীর সকল সেনাপতিকে নিয়ে পরামর্শ-সভা ডাকলেন। পরিস্থিতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সবাই তাদের অভিমত ব্যক্ত করলেন। তুলাইহা ইবনে খুওয়ালিদ আল-আসদি এক চমৎকার পরিকল্পনার প্রস্তাব করলেন, যাতে সবাই সম্মত হলেন। পরিকল্পনাটি হলো : মুসলমানদের অগ্রগামী দল অগ্রসর হয়ে পারসিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করবে এবং শত্রুদের পাল্টা আক্রমণে উৎসাহিত করবে, যাতে তারা তাদের দেয়ালের বাইরে বের হয়ে আসে। যখন পারসিকরা বাইরে বের হয়ে আসবে, তখন মুসলমানদের অগ্রগামী দলটি পেছনে সরে আসবে যেন শত্রুরা মনে করতে থাকে দুর্বলতার কারণেই তারা পশ্চাতে পলায়ন করছে। এতে তারা বিজয়ের আশা করে মুসলমানদের ধাওয়া করবে। এই সুযোগে মুসলমানদের অপর দল গোপন জায়গা থেকে বের হয়ে পারসিকদের ওপর অকস্মাৎ আক্রমণ করবে। আর এটি ঘটবে তাদের দুর্গ থেকে অনেক দূরে। [cite: ২৩৪]

নুমান এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নিমিত্তে তার বাহিনীকে ছোট ছোট দলে এভাবে বিভক্ত করেন :

১। প্রথমে অগ্রগামী দল এবং এ দলের নেতৃত্ব থাকবে কাকা ইবনে আমরের হাতে; তাদের মূল লক্ষ্য শত্রুকে ধোঁকা দেওয়া, যা ওপরে বর্ণনা করা হয়েছে—তারা প্রথমে শত্রু-শহরের দেয়ালের ওপর আক্রমণ করবে যাতে যুদ্ধ শুরু করা যায়।
২। দ্বিতীয় দল থাকবে স্বয়ং সর্বাধিনায়কের হাতে। তারা গোপন জায়গায় লুকিয়ে থাকবে এবং পরসিক সৈন্যদের জন্য অপেক্ষা করবে। হাতের নাগালে এলেই শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং মুখোমুখি লড়াই করবে।
৩। তৃতীয় দলটি অগ্রগামী দলেরই আরেকটি অংশ, যা বাহিনীর সেরা ও চৌকশ সেনাদের সমন্বয়ে গঠিত। তারাও গোপন জায়গায় লুকিয়ে থাকবে এবং শত্রুরা হাতে নাগালে এলেই দু-দিক থেকে আক্রমণ করবে।

নুমান মুসলমানদের তাদের নির্দিষ্ট গোপন জায়গায় লুকিয়ে থাকার নির্দেশ দেন এবং তার অনুমতি ছাড়া আক্রমণ করতে নিষেধ করেন। [cite: ২৩৫] মুসলিম সেনারা তার আদেশ মেনে চলে এবং আক্রমণের জন্য তার নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রগামী দল নিয়ে কাকা ইবনে আমর শত্রুদের ধোঁকা দিতে শুরু করেন এবং অবিশ্বাস্যভাবে তিনি তাতে সফল হন। শত্রুরা মুসলমানদের পশ্চাদপসরণে ধাওয়া করতে এলে মুসলিম বাহিনী চারিদিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলে। এ দৃশ্য দেখে শত্রুরা বিস্মিত হয়ে যায়। তারা তাদের দুর্গের দিকে পালাতে থাকে। কিন্তু তারা তাদের খনন করা পরিখায় আর ধারালো পেরেকে পড়তে থাকে। মুসলিম বাহিনী তাদের ধাওয়া করে এবং পেছন থেকে শত্রুদের তরবারির আঘাতে হত্যা করতে থাকে। এর মধ্যে হাজার হাজার মুশরিক পরিখায় পড়ে আত্মাহুতি দেয়। কাকা পারসিক সেনাপতি ফাইরাযানকে ধাওয়া করে ধরে ফেলে এবং তাকে হত্যা করে। এই যুদ্ধের পর মুসলিম বাহিনী প্রথমে নাহাওয়ান্দ এবং পরে হামাযানে প্রবেশ করে। তারপর তারা পুরো পারসিক এলাকার বাকি অংশে অভিযান পরিচালনা করে। বলার অপেক্ষা রাখে না, তারা এতে তেমন কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি। নাহাওয়ান্দের পর পারসিকরা আর কখনো ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি এবং মুসলমানগণ তাদের পুরো সাম্রাজ্য দখল করে নেন। এ জন্য নাহাওয়ান্দ যুদ্ধকে ‘বিজয়ের বিজয়’ বলা হয়। [cite: ২৩৬]

এই যুদ্ধে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিভিন্ন ক্ষেত্রে দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়; মুসলমানদের সৈন্য সমাবেশ করা এবং শত্রুদের সৈন্য সমাবেশে বাধা প্রদান; উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কুফা, বসরা ও আরবে গভর্নরদের পারসিক বাহিনীর মোকাবিলায় সৈন্য সমাবেশ করার আদেশ প্রত্যাহার করেননি, অধিকন্তু তিনি আল-আহওয়ায এবং মুসলমানদের নিয়ন্ত্রিত অন্যান্য পারসিক এলাকায় সেনাপতিদের শত্রুদের সেনা সমাবেশ করতে বাধা প্রদান করতে বলেন। তিনি সালমা ইনে কায়্যিন, হারমালা ইবনে মুরাইতা, জার ইবনে কুলাইব, আল-আসওয়াদ ইবনে রাবিআ এবং অন্যান্যদের পারসিক এবং আল-আহওয়াযের সীমান্ত এলাকায় নাহাওয়ান্দে শত্রু সেনাদের আগমনে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বলেন। সুতরাং এভাবে সেনাপতিরা সীমান্ত এলাকায় পাহারা-চৌকি স্থাপন করে নাহাওয়ান্দে শত্রুদের সংখ্যাবৃদ্ধি প্রতিরোধ করেন। [cite: ২৩৭]

৩.১। যুদ্ধে সেনাপতি মৃত্যুবরণ করলে তার স্থলাভিষিক্ত নিয়োগ
মুতার লড়াইতে (৮ হি. / ৬২৯ খ্রি.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়েদ ইবনে হারিসা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সেনাপতি নিয়োগ করেন। তারপর তিনি বলেন, যদি যায়েদ শহীদ হয়ে যায়, তাহলে সেনাপতি হবে জাফর ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু। আর যদি জাফর রাযিয়াল্লাহু আনহু শহীদ হয়ে যায়, তাহলে সেনাপতি হবে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রাযিয়াল্লাহু আনহু। নাহাওয়ান্দ যুদ্ধে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একই কাজ করেন। তিনি এ যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসাবে নুমান ইবনে মুকাররিনকে নিযুক্ত করেন। যদি নুমান শহীদ হয়ে যায়, তাহলে তার স্থলাভিষিক্ত হিসাবে হুযাইফা ইবনে আল-ইয়ামানকে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে বলেন। আর যদি হুযাইফা শহীদ হয়ে যান, তাহলে সর্বাধিনায়ক হবেন নুআইম ইবনে মুকাররিন।

সামরিক বাহিনী পরিচালনায় নুমান ইবনে মুকাররিন অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন ছিলেন। নিচে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো :

৩.১.১। যুদ্ধ শুরু করার আগেই লড়াই করার জন্য অগ্রগামী দল প্রেরণ
নাহাওয়ান্দে সৈন্যবাহিনী নিয়ে রওনা হওয়ার আগেই (যা বিশের অধিক প্যারাসাং দূরে) তুলাইহা ইবনে খুওয়ালিদ আল-আসদি, আমর ইবনে আবি সালমা আল-আনযি এবং আমর ইবনে মাদি ইয়াকরিবকে অগ্রবাহিনী হিসাবে প্রেরণ করেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল, পথের নিরাপত্তা ও সম্মুখভাগে কোনো শত্রু-ছাউনি থাকলে তা খুঁজে বের করা। এই তিন জন এক দিন ও এক রাত সফর করেন। তারপর নিজ বাহিনীতে ফিরে আসেন এবং সর্বাধিনায়ককে অবহিত করেন যে নাহাওয়ান্দ পর্যন্ত শত্রুদের কোনো পাহারা বা ঘাঁটি নেই। আধুনিক সমরবিদ্যায় এটি রিকনেইসেন্স (প্রাথমিক নিরীক্ষণ) নামে পরিচিত, যেখানে সামরিক বহরের গতিপথে অগ্রগামী দল প্রেরণ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। অধিকন্তু তিনি সামরিক বাহিনীকে যেকোনো সময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেই নাহাওয়ান্দের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।

৩.১.২। শত্রুদের ধোঁকা দেওয়ার কৌশল
নাহাওয়ান্দের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী শত্রুদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য এমন এক চমৎকার রণকৌশল ব্যবহার করেন, যা ইতিপূর্বে পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো দেশ বা জাতি ব্যবহার করেনি—প্রাচীন কিংবা আধুনিককালেও না। মুসলিম বাহিনী দেখল, পারসিকদের দুর্গের প্রাচীর ভেদ করা সম্ভব হচ্ছে না—এটি পরিখা, ধারালো পেরেক ও অব্যর্থ তিরন্দাজ বাহিনী দ্বারা সুরক্ষিত এবং তাদের নিকট পর্যাপ্ত রসদপত্তর মজুদ থাকাতে অবরোধ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। তখন তারা এমন এক কৌশল অবলম্বন করতে চাইল, যাতে শত্রুরা তাদের সীমানা ছেড়ে বাইরে বের হয়ে আসতে বাধ্য হয় এবং নিজেদের সুবিধামতো জায়গায় তাদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া যায়। বস্তুত মুসলিম বাহিনীর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ীই সবকিছু সংঘটিত হয়। তারা পারসিকদের দুর্গ থেকে বের হয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করে এবং নিজেদের সুবিধামতো জায়গায় এনে তাদের ওপর অকস্মাৎ আক্রমণ পরিচালনা করে। এতে তারা বিস্মিত ও হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। উপায়ান্তর না দেখে পেছনে পালাতে থাকে। এভাবে কোনো শত্রুবাহিনীকে কৌশলে তাদের সুরক্ষিত স্থান থেকে বের করে হঠাৎ আক্রমণে পর্যুদস্ত করা এবং তাদের ওপর বিজয়ী হতে আর কোনো জাতিকে দেখা যায় না। [cite: ২৩৮]

৩.১.৩। আক্রমণের সময় নির্ধারণ
নুমান ইবনে মুকাররিন এবং তার বীর সেনারা সুবিধামতো স্থান ও সময়ে শত্রুর ওপর আক্রমণের ক্ষেত্রে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, যা ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। তাদের এই সময় নির্ধারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতকে অনুসরণ করা হয়—ঠিক মধ্যবেলায় যখন ছায়া দীর্ঘ হতে শুরু করে এবং বাতাসের ক্ষীণ প্রবাহ থাকে। নুমান ইবনে মুকাররিন এই যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। তার মৃত্যুর সংবাদ জেনে উমর রাযিয়াল্লাহু 'আনহু বলে ওঠেন, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাযিউন। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং খুবই দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি আরও যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের নাম জানতে চান। তাকে বলা হলে তিনি তাদের চিনতে পারেননি। তিনি বললেন, ‘যারা মুসলিম বাহিনীতে দুর্বল ও নিগৃহীত, কিন্তু যিনি তাদের শাহাদাতের মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করেছেন, তিনি তাদের চেহারা ও বংশপরিচয় খুব ভালো করেই জানেন; উমরের জানা বা অজানায় কী আসে-যায়! [cite: ২৩৯]

বলা বাহুল্য, নাহাওয়ান্দ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী যে গনীমতের লাভ করেছিল, তাতে দুটি সিন্দুক বোঝাই স্বর্ণ-রুপা ও মণি-মুক্তা ছিল। এগুলো সম্রাট কিসরার ভান্ডার থেকে পাওয়া গিয়েছিল। মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হুযাইফা সেগুলো সাইব ইবনে আকরার মাধ্যমে খলীফার নিকট প্রেরণ করেন। যখন সাইব ইবনে আকরা এগুলো উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট হাজির করলেন, তখন তিনি বললেন, 'এগুলো বাইতুল মালে রেখে দাও এবং তুমি তোমার ডিভিশনে গিয়ে যোগ দাও।' তিনি ফিরে যান। তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আরেকজনকে তার খোঁজে প্রেরণ করেন এবং তাকে কুফায় গিয়ে নাগাল পেয়ে মদীনায় ফেরত নিয়ে আসেন। [cite: ২৪০] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে দেখে বললেন, 'তুমি আমার নিকট কী নিয়ে এসেছ? যেদিন তুমি চলে গেলে, সেদিন সারা রাত আমি একই স্বপ্ন দেখলাম : ফেরেশতারা আমাকে ওইসব সিন্দুকের নিয়ে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে, যা আগুনে ভর্তি। তারা আমাকে সতর্ক করছে, আমি যদি সেগুলো বিলিয়ে না দিই, তাহলে তারা আমাকে আগুনে জ্বালাবে। সেগুলো নিয়ে যাও, বিক্রি করো এবং মুসলিম বাহিনীর প্রয়োজনে খরচ করো।' সুতরাং তিনি সেগুলো কুফার বাজারে বিক্রি করে দেন।

আল্লাহ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওপর সন্তুষ্ট হোন-তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদাঙ্কের পরিপূর্ণ অনুসরণকারী ছিলেন এবং আল্লাহ তাকে সম্মান ও মর্যাদা দান করেছিলেন। তার মাধ্যমে তিনি ইসলাম ও মুসলমানদেরও সম্মান ও মর্যাদা বাড়িয়েছেন। হে আল্লাহ, আমাদেরকে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলার তাওফিক নসীব করুন এবং সকল বাতিল ফিরকা থেকে হেফাজত করুন। [cite: ২৪১]

নাহাওয়ান্দ যুদ্ধের পরপরই হামাযান, তাবারিস্তান এবং ইসফাহানে পারসিক নেতারা দ্রুত মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে এগিয়ে আসে-একের পর এক। [cite: ২৪২]

টিকাঃ
২৩০. দেখুন: আল-ফানুল আসকারিল ইসলামি, পৃ. ২৫৫।
২৩১. তারিখ আত-তাবারি, ৫/১০৯।
২৩২. দেখুন: আল-ফানুল আসকারিল ইসলামি।
২৩৩. প্রাগুক্ত।
২৩৪. দেখুন: তারিখ আত-তাবারি, ৫/১১৩।
২৩৫. তারিখ আত-তাবারি, ৫/১১৪।
২৩৬. দেখুন : আল-ফানুল আসকারিল ইসলামি।
২৩৭. প্রাগুক্ত।
২৩৮. দেখুন : আল-ফানুল আসকারিল ইসলামি, পৃ. ২৯৫-২৯৬।
২৩৯. দেখুন: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১১৩।
২৪০. প্রাগুক্ত, ৭/১১৪।
২৪১. দেখুন: ইতমামুল ওয়াফা।
২৪২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৯-১০১।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 পারস্যের অভ্যন্তরে অভিযান (পঞ্চম পর্যায়)

📄 পারস্যের অভ্যন্তরে অভিযান (পঞ্চম পর্যায়)


নাহাওয়ান্দ যুদ্ধে পরাজয়ের পর পারসিকরা মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে আর কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলমানদের পারসিক রাজ্যের অভ্যন্তরে অভিযান পরিচালনা করার অনুমতি প্রদান করেন। নাহাওয়ান্দের পরে মুসলিম বাহিনী ইসফাহান শহরে পৌঁছেন। সেখানে এক দীর্ঘ লড়াই শেষে পারসিকরা মুসলমানদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ তাদের শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে চুক্তি লিখে দেন। তবে তিরিশ জন ব্যক্তি ইসফাহান এলাকা থেকে পালিয়ে কারমান এলাকায় গমন করে এবং তারা মুসলমানদের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে রাজি হয়নি। ২১ হিজরীতে আবু মূসা কোম এবং কাসহান এলাকা জয় করেন। আর সুহাইল ইবনে আদিয়্যি কারমান শহর জয় করেন।

৪.১। দ্বিতীয়বারের মতো হামাযান শহর জয় (২২ হি.)
নাহাওয়ান্দের পরে মুসলিম বাহিনী হুলওয়ান এবং হামাযান জয় করেন। তবে হামাযানবাসীরা কাকা ইবনে আমরের সঙ্গে কৃত শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নাইম ইবনে মুকাররিনকে হামাযানের উদ্দেশে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি সেখানে পৌঁছে সানিয়াত আল-আসল এলাকায় তাঁবু গাড়েন। তারপর তিনি হামাযানের দিকে অগ্রসর হয়ে এর আশেপাশের এলাকা দখল করেন এবং হামাযান অবরোধ করেন। তারা তার সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে সম্মত হয়। তিনি শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে বারো হাজার মুসলিম বাহিনী নিয়ে হামাযান শহরে প্রবেশ করেন। হামাযানে অবস্থানকালেই দাইলাম এবং আজারবাইযানের নেতাদের চিঠি আদান-প্রদান হয় যারা তার বিরুদ্ধে বিশাল বাহিনী সমবেত করে। তিনি তার বাহিনী নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং ওয়ায আর-রুয়ায এলাকায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। তারা নাহাওয়ান্দের মতোই এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেন। দাইলামের শাসকসহ অসংখ্য মুশরিক এ যুদ্ধে নিহত হয়। আর যারা নিহত হয়নি, তারা রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়।

দাইলামের সঙ্গে নাইম ইবনে মুকাররিনই প্রথম যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। নাইম চিঠিতে খলীফাকে তার প্রতিপক্ষ সম্পর্কে জানালে তিনি খুব চিন্তিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু শীঘ্রই তার নিকট খুশির সংবাদ গিয়ে পৌঁছে। তিনি বার্তাবাহককে জিজ্ঞাসা করেন, 'তুমি কি বাশির (শুভসংবাদ বহনকারী)? বার্তাবাহক বুঝতে না পেরে জবাব দেয়, 'না। আমি উরওয়া।' খলীফা তাকে আবার একই প্রশ্ন করেন। এবার বার্তাবাহক বুঝতে পেরে জবাব দেয়, 'হ্যাঁ। আমি শুভ সংবাদ নিয়ে এসেছি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কি নাইম ইবনে মুকাররিন না সাম্মাক ইবনে উবাইদের পক্ষ থেকে এসেছ?' সে বলে, 'নাইম ইবনে মুকাররিন।' তিনি বলেন, 'কী খবর?' সে বলল, 'বিজয়ের সংবাদ গ্রহণ করুন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন এবং জনগণের সম্মুখে চিঠিটি পড়ে শোনাতে বললেন এবং লোকেরাও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল।

সাম্মাক ইবনে মাখরামা, সাম্মাক ইবনে উবাইদ এবং সাম্মাক ইবনে খারাসা কুফা থেকে প্রতিনিধিদল নিয়ে মদীনায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট খুমস (যুদ্ধলব্ধ গনীমতের এক-পঞ্চমাংশ) নিয়ে আসেন। তিনি তাদের বংশপরিচয় জিজ্ঞাসা করেন এবং তারা তা বলেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহ আপনাদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। হে আল্লাহ, আপনি তাদের দ্বারা ইসলামকে সাহায্য করুন এবং ইসলাম দ্বারা তাদের সাহায্য করুন।

৪.২। আর-রয়্যি বিজয় (২২ হি.)
নাইম ইবনে মুকাররিন হামাযানে ইয়াজিদ ইবনে কাইসকে স্থলাভিষিক্ত করে মুসলিম বাহিনী নিয়ে আর-রয়ি‍্যর উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে তারা বিশালসংখ্যক মুশরিক বাহিনীর মোকাবিলা করেন। রয়ি‍্য পাহাড়ের পাদদেশে এ লড়াই সংঘটিত হয়। ইসলামের শত্রুরা ভীষণভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তবে শেষ পর্যন্ত তারা পরাজিত হয়। নাইম ইবনে মুকাররিন নিজেই অনেক মুশরিককে হত্যা করেন। তারা এ যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ গনীমত লাভ করেন। এর পরিমাণ মাদাইন বিজয়ে প্রাপ্ত গনীমতের মতোই ছিল। তারপর নাইম ইবনে মুকাররিন এ বিজয়য়ের সংবাদ খলীফাকে অবহিত করেন এবং তার নিকট খুমস প্রেরণ করেন। আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা।

৪.৩। কুমীস ও যুরযান বিজয় (২২ হি.)
রয়্যি শহরের বিজয়-সংবাদ ও খুমস লাভ করে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নাইম ইবনে মুকাররিনকে পরবর্তী নির্দেশনাসহ চিঠি প্রেরণ করেন। তিনি তার ভাই সুওয়াইদ ইবনে মুকাররিনকে কুমীসের দিকে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সুতরাং সুওয়াইদ সেখানে যান এবং তিনি তেমন কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীন হননি। তিনি শান্তিপূর্ণভাবেই কুমীস শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হন। তিনি সেখানে অবস্থান করেন এবং লোকজনকে শান্তিচুক্তির আওতায় নিয়ে আসেন; তাদের জন্য নিরাপত্তার অঙ্গীকার করেন। এখানে অবস্থানকালেই তার নিকট বিভিন্ন শহরের লোকজন জিযিয়া কর প্রদানের মাধ্যমে শান্তিচুক্তির প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি যুরযান, তাবারিস্তানসহ সকলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেন এবং সবার জন্য পৃথক চুক্তিপত্র লিখে দেন।

৪.৪। আজারবাইযান বিজয় (২২ হি.)
হামাযান এবং রয়ি‍্য বিজয়ের পর নাইম ইবনে মুকাররিন অগ্রবর্তী দল হিসাবে বুকাইর ইবনে আব্দুল্লাহকে হামাযান থেকে আজারবাইযানে প্রেরণ করেন এবং তার পশ্চাতে সাম্মাক ইবনে খারাসাকে প্রেরণ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশ অনুযায়ীই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে এই সাম্মাক মানে তিনি প্রসিদ্ধ সাহাবী আবু দুযানা নন। সাম্মাক যোগ দেওয়ার আগেই বুকাইর তার বাহিনী নিয়ে আসফানদিয়া ইবনে ফাররুকজাযকে প্রতিরোধ করেন। মুশরিকরা পরাজয় বরণ করে এবং আল্লাহ মুসলমানদের বিজয় দান করেন। মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি বুকাইর আসফানদিয়াকে বন্দী করেন। তিনি তাকে বলেন, 'তোমার কাছে যুদ্ধ নাকি শান্তিচুক্তি বেশি প্রিয়?' আসফানদিয়া বলল, 'শান্তি।' তারপর সে তাকে তার সঙ্গে রাখার অনুরোধ করে। বুকাইর তাকে সঙ্গে রাখেন। সেখান থেকে তিনি আজারবাইযানে একের পর এক শহর দখল করতে থাকেন। উতবা ইবনে ফারকাদ আজারবাইযানের আরেক প্রান্তে একই ভাবে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশ আসে। তিনি বুকাইরকে আল-বাবের দিকে অগ্রসর হতে বলেন। বুরকাইর সাম্মাককে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে উতবা ইবনে ফারকাদের সহকারী হিসাবে মনোনয়ন দেন। আজারবাইযানের সকল বিজিত অঞ্চল উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতি উতবা ইবনে ফারকাদের হাতে অর্পণ করেন। বুকাইর আসফানদিয়াকে তার হাতে সোপর্দ করেন। বাহরাম ইবনে ফাররুকজায এগিয়ে এসে উতবা ইবনে ফারকাদের গতিরোধ করেন। তাদের মধ্যে যুদ্ধ হয়। উতবা বাহরামকে পরাজিত করেন এবং বাহরাম পালিয়ে যায়। আসফানদিয়া এ খবর শুনে বলল, 'এখন আর কোনো যুদ্ধ নয়, এখন শান্তির সময়।' সুতরাং শান্তিচুক্তিতে সবাই সম্মত হলো এবং আজারবাইযানের অধিবাসীদের মধ্যে শান্তি ফিরে এল। উতবা এবং বুকাইর খুমসসহ এ সংবাদ খলীফার নিকট প্রেরণ করেন। আজারবাইযানের গভর্নর হয়ে উতবা এ অঞ্চলের লোকদের জন্য শান্তিচুক্তি লিখে দিলেন।

৪.৫। আল-বাব বিজয় (২২ হি.)
আল-বাব অভিযানে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পত্র মারফত সুরাকা ইবনে আমর (যু আন-নুর নামে পরিচিত)-কে সেনাপতি নির্বাচন করেন এবং খলীফার নির্দেশ অনুযায়ী সুরাকা তার বাহিনী নিয়ে রওনা হন। মুসলিম বাহিনীর অগ্রগামী দল ছিল আব্দুর রহমান ইবনে রাবিআর নেতৃত্বে। আরমেনিয়ার রাজা শাহরাবারাজ, বনী ইসরাইলদের হত্যাকারীদের উত্তরসূরি এবং প্রাচীনকালে সিরিয়া বিজয়ী, আল-বাবে অবস্থান করছিলেন। আব্দুর রহমান ইবনে রাবিআ তার নিকট পৌঁছে যান। তখন শাহরাবারাজ নিরাপত্তা চেয়ে আব্দুর রহমানের নিকট পত্র প্রেরণ করেন। রাজা নিজেই এগিয়ে এসে আব্দুর রহমানের নিকট ধরা দেন। নিজেকে মুসলমানদের হিতাকাঙ্ক্ষী হিসাবে পরিচয় দেন এবং এ ব্যাপারে নিজের আগ্রহ ব্যক্ত করেন। তিনি তাকে বলেন, 'আমার ওপরে কর্তৃত্বশীল আরেকজন আছেন। আপনি তার নিকট যান।' আব্দুর রহমানের তাকে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি সুরাকা ইবনে আমরের নিকট প্রেরণ করেন। শাহরাবারাজ সুরাকার নিকট নিরাপত্তা চাইলে তিনি তার জন্য একটি চুক্তিনামা লিখে দেন, যাতে তার জন্য তখন থেকেই নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়।

সুরাকা তারপর বুকাইর ইবনে আব্দুল্লাহ আল-লাইসি, হাবীব ইবনে মাসলামাহ, হুযাইফা ইবনে উসাইদ এবং সালমান ইবনে রাবিআকে আরেমিনয়ার পর্বত ঘেরা অঞ্চলে (আল-লান, তাফিলিস এবং মুকান) প্রেরণ করেন। বুকাইর মুকান বিজয় করেন এবং তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেন। তখন ওই অঞ্চলে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি সুরাকা ইবনে আমর ইন্তেকাল করেন। তার স্থলাভিষিক্ত নির্বাচিত হন আব্দুর রহমান ইবনে রাবিআ। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ খবর পেয়ে তা মেনে নেন এবং তাকে তুর্কীদের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করার নির্দেশ দেন।

৪.৬। তুর্কীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু
আব্দুর রহমান ইবনে রাবিআ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশ অনুযায়ী তুর্কীদের বিরুদ্ধে অভিযানে বের হন এবং আল-বাব অতিক্রম করছিলেন। এ-সময় শাহরাবারায তাকে জিজ্ঞাসা করেন, 'কোথায় যাচ্ছেন?' তিনি জবাব দেন, 'আমি তুর্কীদের রাজার খোঁজে বালানযারে যাচ্ছি।' শাহরাবারায তাকে বলেন, 'আমরা যদি তাদের নিয়ে মাথা না ঘামাই এবং তারাও আমাদের থেকে বিমুখ থাকে, তাহলেই ভালো হয়।' আব্দুর রহমান বললেন, 'আল্লাহ তা'আলা আমাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং তিনি নিজে বলে গিয়েছেন যে, ইসলাম বিজয়ী হবে। সুতরাং আমরা এ লক্ষ্যে কাজ করে যাব।' সুতরাং তিনি তুর্কীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন এবং বালানযারের অভ্যন্তরে দু শ প্যারাসাং দূরত্ব অতিক্রম করেন। অনেক খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ করে এগিয়ে যেতে থাকেন। পরবর্তীকালে উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে তুর্কীদের সঙ্গে মুসলমানদের বিশাল ও কঠিন যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

৪.৭। খোরাসান অভিযান (২২ হি.)
আহনাফ ইবনে কাইস আমীরুল মুমিনীন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পারসিক রাজ্যের আরও গভীরে অভিযান পরিচালনা করার পরামর্শ দেন যাতে পারসিক সম্রাট ইয়াযদগিরদকে দমন করা যায়। কারণ, ইয়াযদগিরদ এখনো পারসিক সাধারণ জনগণ ও সৈন্যদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উস্কানি দিচ্ছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আহনাফ ইবনে কাইসের এ পরামর্শের ভিত্তিতে অভিযানের অনুমতি প্রদান করেন। তিনি মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে আহনাফ ইবনে কাইসকে নিয়োগ দেন এবং তাকে খোরাসান আক্রমণ করার নির্দেশ দেন।

বিশাল এক বাহিনী নিয়ে আহনাফ ইবনে কাইস খোরাসানের উদ্দেশে রওনা হন। তার মূল লক্ষ্য ছিল ইয়াযদগিরদকে মোকাবিলা করা। তিনি খোরাসানে প্রবেশ করে হেরাত দখল করে নেন এবং সুহার ইবনে ফুলান আল-আবদিকে সেখানকার দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। তারপর তিনি মারভ শাহযানের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। সেখানেই ইয়াযদগিরদের অবস্থান ছিল। আহনাফ ইবনে কাইস অগ্রগামী দল হিসাবে মুতাররিফ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আস-সাখিরকে নিশাপুর এবং হারিস ইবনে হাসানকে সারখাসের দিকে প্রেরণ করেন। আহনাফ মুসলিম বাহিনী নিয়ে মারভ শাহযানের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে ইয়াযদগিরদ শহর ছেড়ে মারভ রুযে পালিয়ে যায়। আহনাফ মারভ শাহযান বিজয় করেন এবং সেখানে অবস্থান করেন।

ইয়াযদগিরদ মারভ রুযে পৌঁছে তিনি তুর্কী, আস-সাগদ এবং চীনের রাজাদের নিকট পত্র প্রেরণ করে সাহায্যের আবেদন করে। আহনাফ ইবনে কাইস মারভ শাহযানে হারিসা ইবনে নুমানকে দায়িত্ব দিয়ে মারভ রুযের দিকে ইয়াযদগিরদকে ধাওয়া করেন। এ-সময় মুসলমানদের সাহায্যে চার জন সেনাপতিসহ এক বিশাল সৈন্যবহর এসে আহনাফের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। এ সংবাদ পেয়ে ইয়াযদগিরদ বালখে পালিয়ে যায়। মুসলিম বাহিনী বালখে গিয়ে তার সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং আল্লাহ শত্রুদের পরাজিত করেন। ইয়াযদগিরদ কিছু সঙ্গীসহ নদী পার হয়ে পালিয়ে যান। এভাবে পুরো খোরাসান অঞ্চল আহনাফের অধীনে চলে আসে। তিনি এর প্রত্যেক শহরের জন্য একজন গভর্নর নিযুক্ত করেন। তারপর তিনি মারভ রুযে ফিরে যান এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এ পত্র-মারফত বিজয়ের সংবাদ অবহিত করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে তাকে নদী অতিক্রম করতে নিষেধ করেন এবং বলেন, 'খোরাসানেই তোমাদের নিয়ন্ত্রণ মজবুত করো।' ইয়াযদগিরদ যখন নিকটস্থ রাষ্ট্রসমূহের রাজাদের নিকট সাহায্যের আবেদন করে, তখন তারা এতে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। কিন্তু যখন সে নদী অতিক্রম করে তাদের রাজ্যে প্রবেশ করে, তখন প্রচলিত রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। তুর্কী রাজা খাকান তার সঙ্গে বালখ পর্যন্ত আসেন এবং তারা মারভ রুযে তাঁবু গাড়েন। আর আহনাফ ইবনে কাইসও এখানেই অবস্থান করছিলেন। বসরা ও কুফার প্রায় বিশ হাজার মুসলিম সৈন্য তার সঙ্গে ছিল। তিনি রাতে তাদের অবস্থার খোঁজখবর নিতেন। তখন এক ব্যক্তিকে বলতে শোনেন : সেনাপতি যদি বুদ্ধিমান হয় তাহলে তার উচিত হবে পাহাড়কে পেছনে রেখে যুদ্ধের ময়দানে অবস্থান গ্রহণ করা। আর তার সম্মুখভাগে থাকবে নদী, যা পরিখার মতো শত্রুর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এতে শত্রুরা কেবল একদিক থেকেই রণক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারবে।' পরের দিন আহনাফ এভাবেই তার সৈন্যদের অবস্থান গ্রহণ করতে নির্দেশ দেন এবং এটি ছিল উপযুক্ত রণকৌশল ও বিজয়ের পূর্বাভাস। তুর্কী ও পারসিকদের সমন্বয়ে এমন এক বিশাল বাহিনী সমবেত হয়, যা ভীতি সঞ্চার করার জন্য যথেষ্ট। আহনাফ সেনাদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে এক ভাষণে বলেন, 'তোমরা সংখ্যায় কম এবং তোমাদের শত্রুরা অসংখ্য। কিন্তু এতে আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কিছু নেই। আল্লাহ বলেন,

كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً كَثِيرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصُّبِرِينَ
সামান্য দলই বিরাট দলের মোকাবিলায় জয়ী হয়েছে আল্লাহর হুকুমে। আর যারা ধৈর্যশীল আল্লাহ তাদের সঙ্গে রয়েছেন।
তুর্কীরা দিনে যুদ্ধ করত এবং রাতে তারা কোথায় চলে যেত, আহনাফ তা জানতেন না। এ জন্য একরাতে তিনি একজন সেনাকে সঙ্গে নিয়ে খাকানের খোঁজে বের হলেন। রাত প্রায় শেষ দিকে। তখন এক তার্কিশ অশ্বারোহীকে ঢোল বাজিয়ে অগ্রসর হতে দেখেন। তার গলায় ছিল নেকলেস। আহনাফ তার দিকে এগিয়ে যান এবং তাকে চ্যালেঞ্জ করেন। দুজনের মধ্যে লড়াই শুরু হলে আহনাফ তাকে হত্যা করতে সক্ষম হন। তারপর আহনাফ তার নেকলেসটি নিয়ে নেন এবং তার স্থানে অপেক্ষা করতে থাকেন। আরেকজন তার্কিশ একই ভাবে গলায় নেকলেস পরে ড্রাম পিটিয়ে এগিয়ে আসে। আহনাফ তাকে হত্যা করেন এবং তার নেকলেসটি নিয়ে নেন। তৃতীয় আরেকজন একইভাবে নিহত হয় এবং আহনাফ তার নেকলেস নিয়ে নেন। তারপর আহনাফ দ্রুত বাহিনীর নিকট ফিরে আসেন। তুর্কীরা এ ঘটনার কিছুই টের পায়নি। তুর্কীদের নিয়ম ছিল, সর্বাগ্রে তিন জন অশ্বারোহী পরপর ড্রাম পিটিয়ে বের না হওয়া পর্যন্ত তারা করে হতো না। তারপর যখন তুর্কীরা বের হয়ে এল, তখন তারা তাদের মৃত অশ্বারোহী সৈন্যদের দেখতে পেল এবং তুর্কীদের রাজা এ ঘটনাকে অশুভ সংকেত মনে করলেন। তিনি তার সৈন্যদের বললেন, 'আমরা দীর্ঘ সময় ধরে বাইরে রয়েছি এবং এই তিন জন এমন এক জায়গায় নিহত হয়েছে, যা ইতিপূর্বে ঘটেনি। এই লোকদের সঙ্গে লড়াই করে লাভ নেই; চলো, আমরা ফিরে যাই।' সুতরাং তারা তাদের দেশে ফিরে গেল।

মুসলিম সৈন্যরা আহনাফকে জিজ্ঞাসা করল, 'আমরা কি অগ্রসর হয়ে তাদের ধাওয়া করব?' তিনি বললে, 'যেখানে আছ, সেখানেই থাকো। আর তাদের ছেড়ে দাও।' আহনাফ সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন। কারণ, হাদীসে এসেছে, ‘তুর্কীদের তাদের মতো থাকতে দাও যতক্ষণ তারা তোমাদের ওপর আক্রমণ না করে’।

وَرَدَّ اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ وَكَانَ اللَّهُ قَوِيًّا عَزِيزًا
আল্লাহ কাফিরদের ক্রুদ্ধাবস্থায় বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য করলেন। কোনো কল্যাণ তারা লাভ করেনি। যুদ্ধে মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ সর্বশক্তিমান, পরাক্রমশালী।
ইয়াযদগিরদ চরম হতাশ হয়ে পড়লেন। তিনি যা চেয়েছিলেন বা যাদের নিকট থেকে সাহায্যের আশা করেছিলেন তা অর্জন করতে পারেননি। সবাই তাকে ত্যাগ করেছে এবং আশাহত করেছে যখন তার সাহায্যের প্রয়োজন ছিল খুব বেশি।

وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ سَبِيلًا
আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তুমি কখনো তার জন্য কোনো পথ পাবে না।
তিনি পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। এখন তার কী করা উচিত, কিছুই ঠিক করতে পারলেন না। তারপর তিনি চীনের রাজার নিকট সাহায্যের আবেদন করেন। চীনের রাজা বার্তাবাহকের নিকট যারা তাদের দেশ দখল করেছে, তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলেন। বার্তাবাহক রাজাকে মুসলমানদের যাবতীয় বিষয়াদি তুলে ধরে; তারা কীভাবে ঘোড়া ও উট পরিচালনা করে, তারা কী করেছে এবং কীভাবে নামায পড়ে ইত্যাদি। রাজা সবকিছু শোনার পর ইয়াযদগিরদের নিকট চিঠি প্রেরণ করেন এবং তাতে লেখেন: আমি আপনার সাহায্যে কোনো সৈন্যবাহিনী এ জন্য প্রেরণ করিনি যে, আমি আসলে জানি না আপনার প্রতি আমার দায়িত্ব কতটুকু; বরং এর কারণ হলো, যারা আপনার সঙ্গে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, তারা যদি কোনো পাহাড়ের সঙ্গেও লড়াই করে, তাহলে সেটিকেও চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে সক্ষম। আমি যদি আপনার সাহায্যে এগিয়ে আসি, তাহলে তারা আমাকেও পরাজিত করবে। সুতরাং তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করাই যুক্তিসংগত।' পারসিক সম্রাট এবং তার পরিবার অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়ে কোনো এক অজানা স্থানে গিয়ে বসতি স্থাপন করে। তিনি সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন যতদিন না উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে নিহত হন।

আহনাফ চিঠিতে বিজয়ের সংবাদ ও খুমস মদীনায় প্রেরণ করেন। তিনি চিঠিতে বিস্তারিতভাবে যুদ্ধের বর্ণনা তুলে ধরেন; কীভাবে আল্লাহ তুর্কীদের সম্পদ মুসলমানদের হাতে অর্পণ করলেন, কীভাবে মুসলিম বাহিনী তাদের অনেককে হত্যা করল, কীভাবে আল্লাহ মুশরিকদের সাহায্যে এগিয়ে আসা সৈন্যদলকে ফিরিয়ে দিলেন এবং তারা সেখান থেকে কোনো সুবিধাই অর্জন করতে পারেনি। এ চিঠি পেয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মিম্বরে উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন : আল্লাহ তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্যিকার দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন। তিনি তাঁর অনুসারীদের দুনিয়া ও আখিরাতে পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,

هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
তিনিই প্রেরণ করেছেন আপন রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীনসহকারে, যেন এ দ্বীনকে অপরাপর দ্বীনের ওপর জয়যুক্ত করেন, যদিও মুশরিকরা তা অপ্রীতিকর মনে করে।
আল্লাহর জন্য সকল প্রশংসা, যিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন এবং তাঁর সৈন্যদের বিজয় দান করেছেন। আল্লাহ পারসিক সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করেছেন, তাদের ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছেন এবং এক মুষ্টি পরিমাণ জায়গাও তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, যা মুসলমানদের ওপর সামান্যতম প্রভাব বিস্তার করতে পারে। আল্লাহ তা'আলা তাদের বাড়ি-ঘর, ধন-সম্পদ ও লোকজনকে তোমাদের হাতে অর্পণ করেছেন। তিনি দেখতে চান, তোমরা এসব নিয়ে কী করো। সুতরাং তাঁর নির্দেশ মেনে চলো এবং তিনি তোমাদের প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন। তোমাদের আচরণে যেন কোনো পরিবর্তন সাধিত না হয়; আর নতুবা আল্লাহ তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে তা অর্পণ করবেন। আমার ভয় হয়, এই উম্মতের যদি কোনো অকল্যাণ হয়, তাহলে তা তোমাদের কারণেই হবে।

৪.৮। ইসতাখার বিজয় (২৩ হি.)
মুসলিম বাহিনী ২৩ হিজরীতে দ্বিতীয়বারের মতো ইসতাখার বিজয় করে। আল-আলআ ইবনে আল-হাদরামির বাহিনী এটি প্রথম বিজয় করে। তখন তারা বাহরাইন থেকে নদী পার হয়ে ইসতাখারে পৌঁছেছিলেন। তারা তাউস নামক স্থানে পারসিকদের দেখা পান। পরে আল-হিরবাযা জিযিয়া কর প্রদানের শর্তে মুসলমানদের সঙ্গে সন্ধি চুক্তি করে। পরবর্তীকালে শাহরাক চুক্তি ভঙ্গ করে এবং পারসিকদেরও একই কাজ করার জন্য উস্কানি দিতে থাকে। উসমান ইবনে আবি আল-আস তার ছেলে এবং ভাই আল-হাকামকে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রেরণ করেন। আল্লাহ মুশরিক বাহিনীকে পরাজিত করেন। আল হাকাম ইবনে আবি আল-আস শাহরাককে হত্যা করেন।

৪.৯। ফাসাউদারা বাযরুদ বিজয় (২৩ হি.)
সারিয়া ইবনে জুনাইম ফাসাউদারা বাযরুদ এলাকার দিকে অগ্রসর হন। তিনি সেখানে বিশালসংখ্যক পারসিক ও কুর্দীদের দেখা পান। মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওই রাতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের যুদ্ধ ও শত্রু সংখ্যাধিক্যের ব্যাপারে স্বপ্ন দেখেন; যুদ্ধটি দিনের বেলায় সংঘটিত হচ্ছে এবং তারা কোনো এক মরুপ্রান্তরে লড়াই করছেন। সেখানে পাহাড়ও ছিল। মুসলমানরা যদি পাহাড়কে পেছনে রাখে, তাহলে শত্রুরা শুধু একদিক থেকে আক্রমণের সুযোগ পাবে। পরের দিন তিনি আযান (আস-সালাতু জামিয়াহ—নামায শুরু হতে যাচ্ছে) দিতে নির্দেশ দিলেন। আর তিনি স্বপ্নে যে সময় যুদ্ধ সংঘটিত হতে দেখেছিলেন, সে সময়ও ঘনিয়ে এল। লোকজন জমা হলে তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন এবং স্বপ্নের কথা সবাইকে জানালেন। তখন তিনি হঠাৎ করেই বলে উঠলেন, ‘হে সারিয়া, পেছনে পাহাড়!’ তারপর লোকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আল্লাহর নিজস্ব সৈন্য (ফেরেশতা) রয়েছে এবং সম্ভবত তাদের কেউ আমার এই কথাকে তাদের নিকট পৌঁছে দেবে।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যা বলেছিলেন, মুসলিম বাহিনী তা-ই করেছিল এবং তাদের শত্রুদের ওপর বিজয় দান করেছিলেন। মুসলমানগণ ফাসাউদারা বাযরুদ দখল করে নেন।

৪.১০। কারমান এবং সাজিস্তান বিজয় (২৩ হি.)
সুহাইল ইবনে আদিয়্যি ২৩ হিজরীতে কারমান বিজয় করেন; এটিও প্রসিদ্ধ যে, আব্দুল্লাহ ইবনে বুদাইল ইবনে ওয়াকারা এটি বিজয় করেন। কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন যে, আসিম ইবনে আমর প্রচণ্ড যুদ্ধ করে সাজিস্তান বিজয় করেছিলেন। এতে অসংখ্য দুর্গ ছিল। আর বালখ নদী ও বাঁধের মধ্যে শহরগুলো একটি থেকে আরেকটি বেশ দূরে ছিল। মুসলমানগণ কান্দাহার ও তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল।

৪.১১। মুকরান বিজয় (২৩ হি.)
আল-হাকাম ইবনে আমর ২৩ হিজরীতে মুকরান বিজয় করেন। শিহাব ইবনে আল-মাখারিক সাহায্য সৈন্য নিয়ে আসেন এবং তার সঙ্গে সুহাইল ইবনে আদিয়্যি ও আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ এসে যোগ দেন। তারা সিন্দের রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করেন। আল্লাহ সিন্দের বাহিনীকে পরাজিত করেন এবং মুসলমানগণ বিরাট অঙ্কের গনীমত লাভ করেন। আল-হাকাম ইবনে আমর বিজয়ের সংবাদ জানিয়ে খলীফার নিকট চিঠি প্রেরণ করেন। সুহার আল-আবদির মাধ্যমে তিনি খুমসসহ চিঠিটি পাঠান। তিনি মদীনায় এলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার নিকট মুকরান এলাকা সম্পর্কে জানতে চান। সুহার বলেন, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, এটি একটি পর্বতময় এলাকা। এখানে পানির খুব সংকট, ফলমূল খুব নিম্নমানের, শত্রুরা খুব শক্তিশালী, এর খারাপই বেশি এবং ভালো বলতে তেমন কিছু নেই। সম্পদের প্রাচুর্য খুব কম এবং তাও পরিত্যক্ত। এ বাইরে যা কিছু আছে, সেগুলো এ চেয়ে আরও খারাপ।’ উমর রা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি কবি হতে চাচ্ছ?’ তিনি বললেন, ‘না। এটি কেবল একটি সংবাদ।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আল-হাকামকে মুকরানেই অবস্থান করার নির্দেশ দিলেন এবং নদীর এ পাড়েই থাকতে বললেন।

৪.১২। কুদীদের বিরুদ্ধে অভিযান
ইবনে জারির উল্লেখ করেন, কিছু কুর্দী কিছু পারসিকদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। তারা একত্রে জমা হয়। তিরা নদীর নিকটে বাইরুয এলাকায় তারা আবু মূসার মুখোমুখি হয়। তারপর আবু মূসা ইসফাহানে চলে যান। আল-মুহাজির ইবনে যিয়াদ নিহত হলে তার ভাই আর-রাবি ইবনে যিয়াদকে আবু মূসা তার স্থলাভিষিক্ত করে যান। তিনি যুদ্ধের দায়িত্ব নেন এবং শত্রুদের ব্যূহ তছনছ করে দেন। আল্লাহ শত্রুদের পরাজিত করেন। আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা। এভাবেই তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের সঙ্গে থাকেন, যারা ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন অনুসারী। তারপর খুমসসহ বিজয়ের সংবাদ খলীফার নিকট প্রেরণ করা হয়। এভাবে ইরাক ও ইরান উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আমলে বিজিত হয়। মুসলমানগণ পুরো এলাকায় শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলে। পারসিকদের পক্ষ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা ছিল। পূর্বাঞ্চলের বিজয় বেশ কষ্টসাধ্য ছিল এবং মুসলিম বাহিনীকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। কারণ, এর অধিবাসীদের সঙ্গে আরবদের কৃষ্টিগত পার্থক্য ছিল অনেক। ইরানের অধিবাসীরা ছিল পারসিয়ান, যারা ভাষা, আচার-আচরণ ও সংস্কৃতিতে আরবদের থেকে পুরোপুরিই ভিন্ন। আর জাতিগতভাবে ইরানীরা খুব ঐক্যবদ্ধ ছিল। তাদের ছিল দীর্ঘ ইতিহাস ও আদি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত। অধিকন্তু এসব যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে ইরানীদের কেন্দ্রীয় ভূমিতে এবং পারসিক পুরোহিতরা এর অধিবাসীদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে উৎসাহ জুগিয়েছে। আরও একটি কঠিন দিক হচ্ছে, এসব রণক্ষেত্র ছিল মুসলমানদের বসরা ও কুফার সামরিক ঘাঁটি থেকে অনেক দূরে। পর্বতময় এলাকা হওয়ায় এর অধিবাসীরা মুসলমানদের জন্য মারাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। এ জন্য দেখা যায়, বেশির ভাগ এলাকা মুসলমানদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ও উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগে পুনরায় অভিযান পরিচালনা করতে হয়।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 ইরাক ও পূর্বাঞ্চল বিজয়ে শিক্ষাসমূহ

📄 ইরাক ও পূর্বাঞ্চল বিজয়ে শিক্ষাসমূহ


৫.১। মুজাহিদদের ওপর কুরআন ও হাদীসের প্রভাব
কুরআনের যেসব আয়াত ও হাদীসে জিহাদের ফযীলত সম্পর্কে বলা হয়েছে, সেগুলো মুজাহিদদের মনোবল বৃদ্ধিতে খুবই প্রভাব ফেলত। আল্লাহ মুজাহিদদের প্রতিটি কাজের বিনিময়েই পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,

مَا كَانَ لِأَهْلِ الْمَدِينَةِ وَ مَنْ حَوْلَهُمْ مِّنَ الْأَعْرَابِ أَنْ يَتَخَلَّفُوا عَنْ رَّسُولِ اللَّهِ وَلَا يَرْغَبُوا بِأَنْفُسِهِمْ عَنْ نَفْسِهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ لَا يُصِيبُهُمْ ظَمَا وَ لَا نَصَبٌ وَلَا مَخْمَصَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَطَئُونَ مَوْطِئًا يَغِيظُ الْكُفَّارَ وَلَا يَنَالُونَ مِنْ عَدْةٍ نَّيْلًا إِلَّا كُتِبَ لَهُمْ بِهِ عَمَلَ صَالِحٌ إِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ وَلَا يُنْفِقُونَ نَفَقَةً صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً وَ لَا يَقْطَعُونَ وَادِيًا إِلَّا كُتِبَ لَهُمْ لِيَجْزِيَهُمُ اللَّهُ أَحْسَنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
মদীনার অধিবাসী ও তার আশপাশের মরুবাসীদের জন্য সংগত নয় যে, রাসূলুল্লাহ থেকে পেছনে থেকে যাবে এবং রাসূলের জীবন অপেক্ষা নিজেদের জীবনকে অধিক প্রিয় মনে করবে। এর কারণ এই যে, আল্লাহর পথে তাদের যে পিপাসা, ক্লান্তি আর ক্ষুধা পায় এবং তাদের এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করায় কাফিরদের যে ক্রোধের কারণ হয়ে থাকে, আর দুশমনদের হতে তারা যা কিছু প্রাপ্ত হয়—এর প্রত্যেকটি সৎ কাজ বলে গণ্য হবে। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না। আর তারা স্বল্প কিংবা অধিক যা-ই ব্যয় করে এবং অতিক্রম করে যে প্রান্তরই, তা তাদের জন্য লিখে দেওয়া হয়, যাতে তারা যা আমল করত, আল্লাহ তাদের তার চেয়ে উত্তম প্রতিদান দেন।

প্রথম যুগের মুসলমানগণ নিশ্চিতভাবেই জানতেন, জিহাদ একটি সফলতম ব্যবসা। আল্লাহ বলেন,

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَىٰ تِجَٰرَةٍ تُنجِيكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ
تُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَتُجَٰهِدُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ بِأَمْوَٰلِكُمْ وَ أَنفُسِكُمْ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَ يُدْخِلْكُمْ جَنَّٰتٍ تَجْرِى مِن تَحْتِهَا ٱلْأَنْهَٰرُ وَمَسَٰكِنَ طَيِّبَةً فِى جَنَّٰتِ عَدْنٍ ذَٰلِكَ ٱلْفَوْزُ ٱلْعَظِيمُ وَأُخْرَىٰ تُحِبُّونَهَا نَصْرٌ مِّنَ ٱللَّهِ وَفَتْحٌ قَرِيبٌ وَبَشِّرِ ٱلْمُؤْمِنِينَ
হে ঈমানদারগণ, আমি কি তোমাদের এমন এক ব্যবসায়ের সন্ধান দেব, যা তোমাদের যন্ত্রণাদায়ক আযাব থেকে রক্ষা করবে? তোমরা আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে। তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর তোমাদের এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত এবং চিরস্থায়ী জান্নাতসমূহে উত্তম আবাসগুলোতেও (প্রবেশ করবেন)। এটাই মহাসাফল্য। এবং আরও একটি (অর্জন) যা তোমরা খুব পছন্দ করো। (অর্থাৎ) আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য ও নিকটবর্তী বিজয়। আর মুমিনদের তুমি সুসংবাদ দাও।

তারা এটিও জানতেন, হাজীদের পানি পান করান ও মসজিদুল হারাম আবাদ করার চাইতে জিহাদ শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ বলেন,

أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِّ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَ الْيَوْمِ الْآخِرِ وَ جَهَدَ فِي سَبِيلِ اللهِ لَا يَسْتَوُنَ عِنْدَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجْهَدُوا فِي سَبِيلِ اللهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَ انْفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللَّهِ وَ أُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ يُبَشِّرُهُمْ رَبُّهُمْ بِرَحْمَةٍ مِّنْهُ وَرِضْوَانٍ وَ جَنَّتٍ لَّهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ مُّقِيمٌ خُلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا إِنَّ اللَّهَ عِنْدَةً أَجْرٌ عَظِيمٌ
তোমরা কি হাজীদের পানি পান করান ও মসজিদুল হারাম আবাদ করাকে ওই ব্যক্তির মতো বিবেচনা করো, যে আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে। তারা আল্লাহর কাছে বরাবর নয়। আর আল্লাহ যালিম কওমকে হিদায়াত দেন না। যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে, আর আল্লাহর পথে নিজদের মাল ও জান দিয়ে জিহাদ করেছে, আল্লাহর কাছে তারা বড়ই মর্যাদাবান আর তারাই সফলকাম। তাদের প্রতিপালক তাদের নিজের পক্ষ থেকে সুসংবাদ দিচ্ছেন রহমত ও সন্তুষ্টির এবং এমন জান্নাতসমূহের যাতে রয়েছে তাদের জন্য স্থায়ী নিয়ামত। তথায় তারা থাকবে চিরকাল। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে রয়েছে মহাপুরস্কার।

তারা বিশ্বাস করতেন, সর্বক্ষেত্রেই জিহাদ মানেই বিজয়। আল্লাহ বলেন,

قُلْ هَلْ تَرَبَّصُونَ بِنَا إِلَّا إِحْدَى الْحُسْنَيَيْنِ وَ نَحْنُ نَتَرَبَّصُ بِكُمْ أَنْ يُصِيبَكُمُ اللهُ بِعَذَابٍ مِّنْ عِنْدَةٍ أَوْ بِأَيْدِينَا فَتَرَبَّصُوا إِنَّا مَعَكُمْ مُتَرَبِّصُونَ
বলো : তোমরা তো আমাদের জন্য দুটি কল্যাণের মধ্যে একটি কল্যাণের প্রতীক্ষায় রয়েছ; আর আমরা তোমাদের জন্য এই প্রতীক্ষা করছি যে, আল্লাহ তোমাদের ওপর কোনো শাস্তি সংঘটন করবেন—নিজের পক্ষ হতে অথবা আমাদের দ্বারা; অতএব তোমরা অপেক্ষা করতে থাকো, আমরাও তোমাদের সাথে অপেক্ষমাণ রইলাম।

শহীদদের মৃত্যু নেই; বরং তারা জীবিত। যেমন আল্লাহ বলেন,

وَلاَ تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُواْ فِي سَبِيلِ اللّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ فَرِحِينَ بِمَا آتَاهُمُ اللّهُ مِن فَضْلِهِ وَيَسْتَبْشِرُونَ بِالَّذِينَ لَمْ يَلْحَقُواْ بِهِم مِّنْ خَلْفِهِمْ أَلاَّ خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلاَ هُمْ يَحْزَنُونَ يَسْتَبْشِرُونَ بِنِعْمَةٍ مِّنَ اللّهِ وَفَضْلٍ وَأَنَّ اللّهَ لاَ يُضِيعُ أَجْرَ الْمُؤْمِنِينَ
যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের মৃত ভেবো না; বরং তারা জীবিত, তাদের প্রতিপালকের সান্নিধ্যে থেকে তারা রিযকপ্রাপ্ত হচ্ছে। আল্লাহ তাদের স্বীয় অনুগ্রহ হতে যা দান করেছেন তাতেই তারা পরিতুষ্ট; এবং তাদের ভাইয়েরা যারা এখনো তাদের সাথে সম্মিলিত হয়নি তাদের এই অবস্থার প্রতিও তারা সন্তুষ্ট হয় যে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না। তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামত ও অনুগ্রহ লাভে খুশি হয়। আর নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।

তারা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই জিহাদ করতেন। আল্লাহ বলেন,

فَلْيُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللّهِ الَّذِينَ يَشْرُونَ الْحَيَوةَ الدُّنْيَا بِالآخِرَةِ وَمَن يُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللّهِ فَيُقْتَلْ أَوْ يَغْلِبْ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا وَ مَا لَكُمْ لاَ تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَ النِّسَاء وَ الْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا ۚ وَ اجْعَلْ لَّنَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا ۚ وَ اجْعَلْ لَّنَا مِنْ لَّدُنْكَ
نَصِيرًا الَّذِينَ آمَنُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَ الَّذِينَ كَفَرُوا يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ الطَّاغُوتِ فَقَاتِلُوا أَوْلِيَاءَ الشَّيْطَنِ ۚ إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَنِ كَانَ ضَعِيفًا
অতএব যারা দুনিয়ার বিনিময়ে আখিরাত ক্রয় করে, তারা যেন আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে; এবং যে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, অতঃপর নিহত অথবা বিজয়ী হয়, তাহলে আমি তাকে মহা প্রতিদান প্রদান করব। তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছ না? অথচ নারী, পুরুষ এবং শিশুদের মধ্যে যারা দুর্বল তারা বলে: হে আমাদের রব, আমাদের অত্যাচারী এই নগর হতে নিষ্কৃতি দিন এবং স্বীয় সন্নিধান হতে আমাদের পৃষ্ঠপোষক ও নিজের নিকট হতে আমাদের জন্য সাহায্যকারী প্রেরণ করুন। যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে তারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে এবং যারা কাফির তারা শায়তানের পক্ষে যুদ্ধ করে; সুতরাং তোমরা শায়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো; নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল দুর্বল।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের নিকট জিহাদের ফযীলত বর্ণনা করেছেন এবং তার কথায় মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক জযবা সৃষ্টি হয়। এসব হাদীসের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য হাদীস : আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জিজ্ঞাসা করা হলো, 'হে আল্লাহর রাসূল, মানুষের মধ্যে কে উত্তম?' আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'সে-ই মুমিন, যে নিজ জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুজাহিদদের মর্যাদা নিয়েও কথা বলেছেন। তিনি বলেন : আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্য আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে এক শটি মর্যাদার স্তর প্রস্তুত রেখেছেন। দুটি স্তরের ব্যবধান আসমান ও যমীনের দূরত্বের মতো। তোমরা আল্লাহর নিকট চাইলে ফেরদাউস চাইবে। কেননা, এটাই হলো সবচেয়ে উত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শহীদদের গুণাবলি ব্যাখ্যা করে বলেন: যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জিহাদে বের হয়, তাদের জন্য আল্লাহ ঘোষণা করেন, যদি সে কেবল আল্লাহ ও তার রাসূলগণের ওপর ঈমানের কারণে জিহাদে বের হয়ে থাকে, তাহলে আমি তাকে নেকী ও গনীমতসহ (ঘরে) ফিরিয়ে আনব অথবা তাকে জান্নাতে দাখিল করব। যদি আমার উম্মতের জন্য কঠিন মনে না হতো, তাহলে আমি সব অভিযানেই সশরীরে অংশগ্রহণ করতাম। আমার মনের ইচ্ছা হলো, আমি আল্লাহর পথে নিহত হই, তারপর আবার জীবিত হই, আবার নিহত হই, আবার জীবিত হই, আবার নিহত হই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, জান্নাতে প্রবেশের পর আর কেউ দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে না, যদিও দুনিয়ার সকল জিনিস তাকে দেওয়া হয়— একমাত্র শহীদ ব্যতীত; সে দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে যেন দশবার শহীদ হয়। কেননা, সে শাহাদাতের মর্যাদা দেখেছে।

এমন আরও অনেক হাদীস রয়েছে, যা প্রথম যুগের মুসলিম ও তাদের অনুসারীদের অনুপ্রাণিত করত। প্রবীণ সাহাবায়ে কেরাম বৃদ্ধ বয়সেও জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন। লোকেরা তাদের জন্য দুঃখ অনুভব করতেন এবং তাদের জিহাদে না যাওয়ার অনুরোধ করতেন; কারণ, তাদের বার্ধক্যের কারণে না যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু তারা সূরা তাওবার আয়াত দিয়ে দলীল দিতেন, যা তাদের থামাতে পারেনি। তারা মনে করতেন, জিহাদে অংশগ্রহণ না করলে হয়তো তারা মুনাফিকদের দলভুক্ত হয়ে যাবেন!

৫.২। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জিহাদের বিভিন্ন ফলপ্রসূ দিক
খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণ মুসলিম উম্মাহর স্বার্থে আল্লাহর পথে জিহাদকে অপরিহার্য মনে করতেন। তারা ইরাক, পূর্বাঞ্চল, সিরিয়া, মিসর এবং উত্তর আফ্রিকা বিজয়ে এই বাধ্যবাধকতাকে নিজেদের কর্তব্য স্থির করেছিলেন। আর এ কারণে মুসলিম জাতি অনেক ফলপ্রসূ দিকের সন্ধান লাভ করে; মানবজাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন, কুফর ও শিরকের শক্তি ও ক্ষমতাকে দমন, তাদের অবমাননাকর পরিণতির স্বীকার করা ও তাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করা এবং ইসলামের দাওয়াতের সত্যতাকে দিবালোকের মতো বাস্তবে পরিণত করা, যাতে দলে দলে লোক ইসলামে দাখিল হতে থাকে। এভাবে মুসলমানগণ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হন এবং মুশরিকদের লাঞ্ছনার পরিমাণকে বাড়িয়েছে। মুসলিম জাতি তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং তারা মানবজাতির জন্য হেদায়েত, ন্যায়বিচার ও ইসলামের কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত করেছে।

৫.৩। ইরাক ও পূর্বাঞ্চল বিজয়ে আল্লাহর বিধানের বাস্তব নিদর্শন
ইরাক ও পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন দেশ ও ভূখণ্ড বিজয়ের অভিযান খুব ভালোভাবে অধ্যয়ন করলে গবেষকগণ সহজেই সমাজ, জনগণ এবং রাষ্ট্রের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার স্বতঃসিদ্ধ কিছু নীতির প্রয়োগ প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হবেন।

৫.৩.১। উপায়-উপকরণ ব্যবহারে নিয়ম-নীতি
আল্লাহ বলেন,

وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمْ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تُظْلَمُونَ
আর প্রস্তুত করো তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যা-ই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি-সামর্থ্যের মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন প্রভাব পড়ে আল্লাহর শত্রুদের ওপর এবং তোমাদের শত্রুদের ওপর আর তাদের ছাড়া অন্যান্যদের ওপর ও যাদের তোমরা জানো না; আল্লাহ তাদের চেনেন। বস্তুত যা কিছু তোমরা ব্যয় করবে আল্লাহর রাহে, তা তোমরা পরিপূর্ণভাবে ফিরে পাবে এবং তোমাদের কোনো হক অপূর্ণ থাকবে না।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই আয়াতের শিক্ষাকে তার রাজ্যে প্রয়োগ করেন। জাগতিক ও আত্মিক উপায়-উপকরণ ব্যবহার করার ব্যাপারে তার নীতি ইতিপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে।

৫.৩.২। একজনের মাধ্যমে অন্যকে দমন করার নীতি
আল্লাহ বলেন,

وَلَوْ لَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَفَسَدَتِ الْأَرْضُ وَلَكِنَّ اللَّهَ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْعُلَمِينَ
আল্লাহ যদি একজনকে অপরজনের দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তাহলে গোটা দুনিয়া বিধ্বস্ত হয়ে যেত। কিন্তু বিশ্ববাসীর প্রতি আল্লাহ একান্তই দয়ালু, করুণাময়।
সকল অভিযানেই এ নীতির বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এটা আল্লাহর সৃষ্টিজগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি। মুসলিম জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সোনালি যুগের মুসলমানরা এ নীতি সঠিকভাবেই হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন এবং এর ভিত্তিতেই কাজ করেছেন। তারা জানতেন, সত্য প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন সংকল্প, সাহায্য করার দৃঢ় পদক্ষেপ; এটিকে জয়ী করার অদম্য কর্মস্পৃহা, ভালোবাসার মতো হৃদয় ও আবেগ-যা এটিকে অন্তরে গেঁথে রাখবে। এতে মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষা প্রয়োজন; কারণ, এ দুনিয়ায় এটিই আল্লাহর নিয়ম এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা বহাল থাকবে।

৫.৩.৩। বিপদ-আপদের মাধ্যমে পরীক্ষার নীতি
আল্লাহ বলেন,

أمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُمْ مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِنْ قَبْلِكُمْ مَسَّتْهُمُ الْبَأْسَاءُ وَالضَّرَّاءُ وَ زُلْزِلُوا حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَ الَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللهِ آلَآ إِنَّ نَصْرَ اللهِ قَرِيبٌ
তোমরা কি এমন ধারণা পোষণ করো যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ এখনো তোমাদের নিকট তাদের মতো কিছু আসেনি, যারা তোমাদের পূর্বে গত হয়েছে; তাদের বিপদ ও দুঃখ স্পর্শ করেছিল এবং তাদের প্রকম্পিত করা হয়েছিল; এমনকি রাসূল ও তৎসহ বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ বলেছিল : কখন আল্লাহর সাহায্য আসবে? সতর্ক হও, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।

ইরাক অভিযানের সময় বিপদ ও পরীক্ষা মুসলমানদের ওপর আপতিত হয়েছিল; বিশেষ করে আবু উবাইদের সেতুযুদ্ধ, যেখান হাজার হাজার মুসলমান শাহাদাত বরণ করেছিল এবং তাদের বাহিনী পরাজিত হয়েছিল। তারপর তারা পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয় এবং পারসিকদের বিরুদ্ধে বিরাট বিজয় লাভ করে। আল্লাহ বলেন,

لَتُبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ
অবশ্যই ধন-সম্পদ ও নিজ জীবন সম্পর্কে তোমাদের পরীক্ষা করা হবে।

এখানে উল্লেখ্য, আয়াতে যেভাবে মুসলিম উম্মাহকে পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে, তা জোরালোভাবেই ব্যক্ত করা হয়েছে। এটাই ঈমানদার ও ঈমানের দিকে আহ্বানকারীদের জন্য আল্লাহর নীতি; জীবনে অবশ্যই কিছু বিপদ আসবে, নিজের ও সম্পদের কিছু ক্ষতি সাধিত হবে এবং এতে সবর করাই প্রকৃত মুমিনের অন্যতম কাজ।

৫.৩.৪। অত্যাচারী ও অত্যাচারিতদের ব্যাপারে আল্লাহর নীতি
সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন,

ذلِكَ مِنْ أَنْبَاءِ الْقُرَى نَقُصُّهُ عَلَيْكَ مِنْهَا قَائِمٌ وَ حَصِيدٌ وَ مَا ظَلَمْتُهُمْ وَلَكِنْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ فَمَا أَغْنَتْ عَنْهُمُ الهَتُهُمُ الَّتِي يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ لَمَّا جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ وَ مَا زَادُوهُمْ غَيْرَ تَثْبِيب
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ وَ كَذلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَ هِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ
এ হচ্ছে জনপদসমূহের কিছু সংবাদ, যা আমি তোমার কাছে বর্ণনা করছি। তা থেকে কিছু আছে বিদ্যমান এবং কিছু হয়েছে বিলুপ্ত। আর আমি তাদের ওপর যুলম করিনি; বরং তারা নিজেদের ওপর যুলুম করেছে। তারপর যখন তোমার রবের নির্দেশ এল, তখন আল্লাহ ছাড়া যেসব উপাস্যকে তারা ডাকত, তারা তাদের কোনো উপকার করেনি এবং তারা ধ্বংস ছাড়া তাদের আর কিছুই বৃদ্ধি করেনি। আর এরূপই হয় তোমার রবের পাকড়াও, যখন তিনি পাকড়াও করেন অত্যাচারী জনপদসমূহকে। নিঃসন্দেহে তাঁর পাকড়াও বড়ই যন্ত্রণাদায়ক, কঠোর।

আল্লাহর নীতি বাস্তবায়িত হবেই; অত্যাচারী জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। পারস্যের শাসকরা তাদের জনগণের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন করেছে এবং আল্লাহর নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। সুতরাং আল্লাহর শাশ্বত নীতিই তাদের ওপর বাস্তবায়িত হয়েছে এবং আল্লাহ তাদের শাসনক্ষমতা মুসলমানদের হাতে দিয়েছেন। আর পারসিকরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে।

৫.৩.৫। বিত্তশালীদের ব্যাপারে আল্লাহর নীতি
আল্লাহ তা'আলা বলেন,

وَ إِذَا أَرَدْنَا أَنْ تُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْ نَهَا تَدْمِيرًا
আমি যখন কোনো জনবসতিকে ধ্বংস করতে চাই তখন তাদের সচ্ছল ব্যক্তিদের আদেশ করি (আমার আদেশ মেনে চলার জন্য)। কিন্তু তারা অবাধ্যতা করতে থাকে। তখন সে জনবসতির প্রতি আমার আযাবের ফায়সালা সাব্যস্ত হয়ে যায়। তখন আমি তা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করে দিই।

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়, যখন কোনো জনপদ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়, তখন সেখানকার বিত্তবান, তাদের স্বেচ্ছাচারী শাসকশ্রেণি ও রাজাকে আল্লাহর আনুগত্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তারা সীমালঙ্ঘন করে এবং তাদের ওপর আযাব অবধারিত হয়ে যায়। যদিও এখানে আল্লাহর আনুগত্যের আদেশ সবার জন্যই দেওয়া হয়েছে, তবু আল্লাহ সমাজের বিত্তবানদের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন; কারণ, তারাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও গোমরাহীর মূল হোতা; আর বাকিরা তাদের অনুসরণ করার মাধ্যমেই গোমরাহী ও অপরাধে লিপ্ত হয় এবং এতে সচ্ছল ব্যক্তিরা তাদের উৎসাহিতও করে। সুতরাং তাদের সম্বোধন করাই অধিক যুক্তিসংগত।
পারস্যের শাসকবর্গের ওপর আল্লাহর এই নীতি বাস্তবায়িত হয়েছিল।

৫.৩.৬। স্বেচ্ছাচারী শাসকদের ব্যাপারে আল্লাহর নীতি
আল্লাহ বলেন,

إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْ صَادِ
তোমার প্রতিপালক অবশ্যই সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন (যেমন ঘাঁটিতে শত্রুর প্রতি দৃষ্টি রাখা হয়)।

এ আয়াতে গোনাহগারদের সাধারণভাবে সতর্ক করা হয়েছে; অনেকের মতে, এ আয়াতটি কাফেরদের জন্য সতর্কবার্তা, অথবা গোনাহগার ও অন্যান্যদের জন্য সতর্কবার্তা। তাফসীরে আল-কুরতুবীতে বলা হয়েছে, আল্লাহ প্রত্যেকের ওপরই সতর্ক দৃষ্টি রাখেন যতক্ষণ না তিনি তাকে পুরস্কৃত অথবা শাস্তি প্রদান করেন। তাফসীরবিদদের মতে, এ আয়াতে আল্লাহর একটি শাশ্বত নীতির কথা বলা হয়েছে, স্বেচ্ছাচারী শাসকদের ওপর দুনিয়াতেই আল্লাহর আযাব পতিত হয়। এটি আল্লাহর একটি চিরন্তন নিয়ম, যা আগেও ঘটেছে, বর্তমান ও ভবিষ্যতের স্বেচ্ছাচারী শাসকদের বেলায়ও ঘটবে। তাদের কেউই দুনিয়াতে আল্লাহর শাস্তিকে এড়িয়ে যেতে পারবে না, যেমন কিনা তারা আখেরাতে আল্লাহর শাস্তিকে এড়াতে পারবে না।

স্বেচ্ছাচারী শাসকশ্রেণির ওপর দুনিয়াতেই শাস্তি প্রয়োগে আল্লাহর যে শাশ্বত বিধান, তাতে অনেক শিক্ষা রয়েছে। এসব শিক্ষা কেবল তারাই গ্রহণ করতে পারে, যারা আল্লাহ ও তাঁর শাস্তিকে ভয় করে চলে। আর নিশ্চিতভাবেই জানে যে, আল্লাহর নীতি অবধারিত এবং কোনো কিছুই এর বাস্তবায়ন রোধ করতে সক্ষম নয়। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে স্বেচ্ছাচারী শাসকদের শাস্তি প্রদানের এই নীতি যারা বুঝেছিলেন এবং ফিরআউনের মন্দ পরিণতির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন,

فَأَخَذَهُ اللهُ نَكَالَ الْآخِرَةِ وَالْأُولَى إِنَّ فِي ذَلِكَ لَعِبْرَةً لِمَنْ يَخْشَى
অতঃপর আল্লাহ তাকে পরকালের ও ইহকালের শাস্তি দিলেন। যে ভয় করে তার জন্য অবশ্যই এতে শিক্ষা রয়েছে।

পারস্যের শাসকবর্গের জন্য আল্লাহর এই নীতিও বাস্তবায়িত হয়েছিল।

৫.৩.৭। ক্রমাগত উন্নতির নীতি
ইরাক ও পূর্বাঞ্চল বিজয়ের পটভূমি এ নীতিতেই অগ্রসর হয়েছে। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে এর প্রথম পর্বের সূচনা হয়েছে। তখন খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে আল-হেরা মুসলমানদের অধীন হয়। আর এর দ্বিতীয় পর্বের শুরু হয় যখন আবু উবাইদ আস-সাকাফি ইরাকে মুসলিম সেনাবাহিনীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং আল-বুওয়াইব যুদ্ধ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। তৃতীয় পর্বের শুরু হয় যখন সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ইরাকে জিহাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং নাহাওয়ান্দ যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। নাহাওয়ান্দ যুদ্ধের মাধ্যমে এর চতুর্থ পর্বের শুরু হয়। মুসলিম বাহিনী যখন পারস্যের অনেক ভেতরে পৌঁছে যায়, তখন শুরু হয় এর পঞ্চম পর্ব। এ উদাহরণ একজন মুসলমানকে আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে ক্রমাগত উন্নতিতে আল্লাহর যে বিধান রয়েছে, তার গুরুত্ব অনুধাবন করতে শেখায়। এ নীতির সারবস্তু হলো, পথ অনেক দীর্ঘ। সুতরাং ইসলামে যারা দাওয়াতের কাজ করছে, তাদের এ নীতি ভালো করেই বোঝা উচিত। ইরাক ও পূর্বাঞ্চলে ইসলামী শাসন একদিনেই কায়েম হয়ে যায়নি; বরং এটি এ নীতিকে অনুসরণ করেছে।

৫.৩.৮। নিজেকে পরিবর্তন করার নীতি
আল্লাহ বলেন,

إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ
আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।

সাহাবায়ে কেরাম এ নীতির আলোকেই ইরাক ও পূর্বাঞ্চল বিজয় শুরু করেন। বিজিত অঞ্চলে যারা ইসলাম কবুল করেছে, সাহাবায়ে কেরাম তাদের আগে কুরআন ও সুন্নাহ শিক্ষা দিয়েছেন; ঈমান ও একিন এবং চরিত্রের মহান গুণাবলি তাদের অন্তরে বদ্ধমূল করেছেন।

৫.৩.৯। গোনাহ ও মন্দকর্মের ব্যাপারে আল্লাহর নীতি
আল্লাহ বলেন,

أَلَمْ يَرَوْا كَمْ أَهْلَكْنَا مِنْ قَبْلِهِمْ مِّنْ قَرْنٍ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ مَا لَمْ نُمَكِّنْ لَكُمْ وَأَرْسَلْنَا السَّمَاءَ عَلَيْهِمْ مِدْرَارًا وَ جَعَلْنَا الْأَنْهُرَ تَجْرِى مِنْ تَحْتِهِمْ فَأَهْلَكْنَاهُمْ بِذُنُوبِهِمْ وَ أَنْشَأْنَا مِنْ بَعْدِهِمْ قَرْنًا آخَرِينَ
তারা কি দেখে না, আমি তাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি? যাদের যমীনে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যেভাবে তোমাদের প্রতিষ্ঠিত করিনি। আর তাদের ওপর বৃষ্টি পাঠিয়েছিলাম মুষলধারে এবং সৃষ্টি করেছিলাম নদীসমূহ, যা তাদের নীচে প্রবাহিত হতো। অতঃপর তাদের পাপের কারণে তাদের ধ্বংস করেছি এবং তাদের পরে অন্য প্রজন্মকে সৃষ্টি করেছি।

আল্লাহ পারসিকদের কৃত গোনাহের কারণে ধ্বংস করে দিয়েছেন। আর তাদের সবচেয়ে বড় গোনাহ ছিল কুফর ও শিরক। এই আয়াতে একটি শাশ্বত ও চিরন্তন নীতির কথা বলা হয়েছে: যারা গোনাহ করে, গোনাহই তাদের ধ্বংস করে। আর আল্লাহ গোনাহের জন্য গোনাহগারদের ধ্বংস করেন। বিজয়ের জন্য সকল শর্ত ও আল্লাহর নীতির প্রতি অবিচল থাকার জন্যই তিনি মুসলমানদের পারসিক সাম্রাজ্যের শাসনক্ষমতা লাভ করার সুযোগ দিয়েছেন।

৫.৪। আল-আহনাফ ইবনে কাইসড়ইতিহাস পরিবর্তনকারী
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পারস্য জয় পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তিনি পূর্বাঞ্চলে বেশি ভেতরে অভিযান পরিচালনা করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, বিশেষ করে আল-হরমুযানের পতন এবং আল-আহওয়ায বিজয়ের পর। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'বসরাবাসীদের জন্য দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল এবং আল-আহওয়ায যথেষ্ট। আমি মনে করি, আমাদের ও পারস্যের মধ্যে একটি আগুনের পাহাড় রয়েছে, যা তাদের আমাদের দিকে এবং আমাদের তাদের দিকে অগ্রসর হতে বাধা হয়ে থাকবে।' তিনি কুফাবাসীকে বলেন, 'তাদের ও পাহাড়ের মধ্যে একটি আগুনের পাহাড় রয়েছে, যা তাদের আমাদের দিকে এবং আমাদের তাদের দিকে অগ্রসর হতে বাধা হয়ে থাকবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। তখন আল-আহনাফ বলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমাকে আপনার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আমরা যেন পারস্যের অভ্যন্তরে আর কোনো অভিযান পরিচালনা না করি। আর আপনি আমাদের বিজিত এলাকার মধ্যেই সীমিত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু পারস্যের সম্রাট এখনো তাদের মধ্যে রাজত্ব করছে। যতদিন রাজা বেঁচে আছেন, ততদিন তারা আমাদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করেই যাবে। দুজন রাজা কখনো একসঙ্গে রাজত্ব করতে পারে না যতক্ষণ না একজন অন্যজনকে বহিষ্কার করে। সম্ভবত আমরা কেবল তাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধেই এতদিন যুদ্ধ করেছি। পারস্যের সম্রাট তার জনগণকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে চলেছে। আমরা যতদিন না তাদের সমগ্র ভূখণ্ডে অভিযান চালাব এবং তাকে বিতাড়িত করব, ততদিন এ হীন প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আর এটা করা সম্ভব হলে পারসিকরা বিফল হবে এবং আত্মসমর্পণ করবে।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আহনাফকে বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছ। আল্লাহর কসম, তুমি যথার্থভাবেই বিষয়টি আমার সামনে উপস্থাপন করতে পেরেছ।’ সুতরাং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পারস্যের অভ্যন্তরে অভিযানের অনুমতি প্রদান করলেন। তিনি আহনাফের মতকে গ্রহণ করে এর যথাযথ মূল্যায়ন করলেন। তারপর মুসলিম বাহিনী পারস্যের অভ্যন্তরে লড়াই শুরু করে। আহনাফ খোরাসান অভিযানে সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত হন। অন্যান্য মুসলিম বীর সেনাপতিরা বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযানের দায়িত্ব পেলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের জন্য রণকৌশল নির্ধারণ করে দিলেন এবং পেছন থেকে সাহায্য-সৈন্য সরবরাহ করে তাদের শক্তিশালী করলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00