📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 ইরাক ও পূর্বাঞ্চল বিজয়ে দ্বিতীয় ধাপ

📄 ইরাক ও পূর্বাঞ্চল বিজয়ে দ্বিতীয় ধাপ


আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে ইরাক বিজয়ের ঘটনা মদীনার পূর্ব দিকে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্প্রসারণে প্রথম ধাপ হিসাবে গণ্য করা হয়। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু শাখসিয়াতুহু ওয়া আসরুহু কিতাবে এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত লিখেছি। আর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে আরও বিস্তৃতি লাভ করে।

১.১। ইরাক যুদ্ধের নেতৃত্বে আবু উবাইদ আস-সাকাফি রহ.-এর নিয়োগ
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু মঙ্গলবার, ২২ জমাদুল আখিরা ১৩ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন এবং ওইদিন রাতেই তাকে দাফন করা হয়। পরের দিন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জনগণকে ইরাকে জিহাদ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন এবং তিনি এর পুরস্কারের কথাও মনে করিয়ে দেন। কিন্তু তাতে কেউ সাড়া দেয়নি। কারণ, তারা পার্সিয়ানদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আগ্রহী ছিল না। এর মূল কারণ ছিল রণক্ষেত্রে পার্সিয়ানদের শক্তি ও দুর্ধর্ষতা। তিনি জনগণকে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনও যুদ্ধের দিকে আহ্বান করতে থাকেন। কিন্তু কেউই সাড়া দিল না। মুসান্না ইবনে হারিসা রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব ভালো বক্তব্য দিলেন। তিনি জানালেন যে, ইরাকের বেশির ভাগ অঞ্চল আল্লাহ তা'আলা খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে বিজয় দান করেছেন এবং প্রচুর গনীমতের সম্পদ লাভ করেছেন। তারপরেও তৃতীয় দিনও কেউ সাড়া দিল না। চতুর্থ দিন প্রথম যে ব্যক্তি জিহাদের ডাকে সাড়া দিলেন তিনি ছিলেন আবু উবাইদ ইবনে মাসউদ আস-সাকাফি। [cite: ২] তারপর একে একে অন্যরাও জিহাদে নাম লেখাতে শুরু করেন। আবু উবাইদের পরেই সালিত ইবনে কাইস আল-আনসারী রাযিয়াল্লাহু আনহু জিহাদের ডাকে সাড়া দেন এবং বলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমি আল্লাহর জন্য নিজেকে সোপর্দ করলাম যেমনটি করেছে আমার অন্যান্য চাচাত ভাইয়েরা—যারা আসতে রাজি হয়েছে এবং অন্যদের মধ্যে যারা আমার সঙ্গে যোগ দিয়েছে।' [cite: ৪] সালিত রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই কথায় সকলের মধ্যে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করল, লোকজনকে উৎসাহিত করল, তাদের মনোবল বৃদ্ধি ও পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে জিহাদে তাদের অংশগ্রহণের ইচ্ছাকে বাড়িয়ে দিল। তারা খলীফাকে একজন মুহাজির অথবা আনসার সাহাবীকে তাদের সেনাপতি নিয়োগ করে দেওয়ার অনুরোধ করল। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি তাকেই এ কাজে সবচেয়ে বেশি যোগ্য মনে করছি যে সর্বাগ্রে লোকজনকে এ জিহাদে সাহস জুগিয়েছে। সালিত যদি যুদ্ধক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করত, তাহলে তাকেই আমি সেনাপতি নিয়োগ করতাম। যাই হোক, আবু উবাইদকে আমি সেনাপতি এবং সালিতকে তার পরামর্শক নিয়োগ করলাম।' [cite: ৫] লোকেরা বলল, 'আমরা তাদের মেনে চলব।'

আরেক বর্ণনামতে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু উবায়েদকে সেনাপতি নিয়োগ করেন যদিও তিনি সাহাবী ছিলেন না। [cite: ৬] তখন তাকে বলা হলো, 'আপনি কেন সাহাবাদের একজনকে তাদের নেতা নির্বাচন করেননি?' তিনি বলেন, 'বরং আমি ওই ব্যক্তিকে সেনাপতি বানিয়েছি যে কিনা সর্বপ্রথম জিহাদের ডাকে সাড়া দিয়েছে। ইসলামের জন্য কুরবানির জন্য তুমি অন্যদের থেকে অগ্রগামী হতে পার, কিন্তু সে-ই তোমার আগে সাড়া দিয়েছে।' [cite: ৬] তারপর তিনি আবু উবাইদকে কাছে ডাকেন এবং তাকে ব্যক্তিগত ব্যাপারে তাকওয়া অবলম্বন ও অধীন মুসলিম সৈন্যদের সঙ্গে সদাচরণ করার উপদেশ দেন। তিনি তাকে সাহাবাদের সঙ্গে পরামর্শ করার নির্দেশ দিলেন। সালিত ইবনে কাইসের সঙ্গেও পরামর্শ করতে বলেন। [cite: ৬]

আবু উবাইদকে উপদেশ দেওয়ার সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন : আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাদের সঙ্গে পরামর্শ করবে এবং তাদের সব ব্যাপারে কথা বলার সুযোগ দেবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না। যে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরস্থির হয় না, তার পক্ষে যুদ্ধ পরিচালনা করা কঠিন। শত্রুপক্ষের ওপর আক্রমণের উপযুক্ত সময় তাকেই নির্ধারণ করতে হবে। সালিতকে সেনাপতি নিয়োগ করতে আমাকে কেউ বাধা দিতে পারত না। কিন্তু তার তাড়াহুড়া করার মানসিকতার কারণেই আমি তা করিনি। পরিষ্কার নিদর্শন ছাড়া রণক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করলে নিশ্চিত পরাজয় বরণ করতে হবে। [cite: ৭] তারপর তিনি বলেন, 'তোমরা এমন এক ভূখণ্ডে জিহাদে গমন করছ যা বিশ্বাসঘাতকতা, বিদ্রোহ এবং অন্যায়-অবিচারে সয়লাব। তোমাদের প্রতিপক্ষ এমন, যারা দুষ্কর্মে পারদর্শী এবং অভিজ্ঞ; তারা ন্যায়-পরায়ণতার ধার ধারে না। সুতরাং ভেবেচিন্তে কাজ করবে। চিন্তা-ভাবনা করে কথা বলবে এবং নিজেদের গোপন বিষয় ফাঁস কোরো না। গোপনীয়তা রক্ষাকারী ব্যক্তি নিরাপদ। যদি সে তা না রাখে, তাহলে পরিণতিতে বিপর্যয় ডেকে আনবে। [cite: ৮]

তারপর তিনি মুসান্না ইবনে হারিসাকে অগ্রসর হতে বললেন এবং সামরিক বাহিনী তার পেছনে রওনা হয়ে তার সঙ্গে মিলিত হবে। তিনি তাকে এগিয়ে গিয়ে মুরতাদদের মধ্যে যারা সত্যিকার অর্থেই তাওবা করেছে, তাদের একত্র করতে নির্দেশ দিলেন। তিনি রওনা হয়ে গেলেন এবং আল-হেরায় গিয়ে পৌঁছলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইরাক ও সিরিয়ার ফ্রন্ট লাইনে যুদ্ধরত মুসলিম বাহিনীর সব খবরাখবর সংগ্রহ করতে লাগলেন। তাদের সাহায্য-সৈন্য প্রেরণসহ রসদপত্রও সরবরাহের ধারা অব্যাহত রাখেন। তাদের বিভিন্ন পরামর্শ ও নির্দেশ প্রেরণ করেন এবং যুদ্ধের গতিবিধি অনুযায়ী সমর পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন, যা তিনি নিজেই পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন।

মদীনা থেকে সাত হাজার মুজাহিদ ইরাকের উদ্দেশে রওনা হয়ে যায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠি প্রেরণ করেন, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে যে সকল সৈন্য ইরাক থেকে এসেছে তাদের পুনরায় ইরাকে পাঠিয়ে দিতে বললেন। তিনি দশ হাজার সৈন্য একত্র করে রণসাজে সজ্জিত করলেন এবং হাশিম ইবনে উতবার নেতৃত্বে ইরাকে প্রেরণ করেন। এদিকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জারির ইবনে আব্দুল্লাহ আল-বাজালির নেতৃত্বে চার হাজার সৈন্যের একটি বিশাল বাহিনী ইরাকে প্রেরণ করেন। জারির ইবনে আব্দুল্লাহ তার বাহিনী নিয়ে কুফায় পৌঁছেন। তারা ইরাকে পৌঁছে পারস্যে রাজনৈতিক গণ্ডগোলের সংবাদ পান। সর্বশেষ পরিস্থিতি দাঁড়ায়, রানি আযার মীদাখতকে হত্যা করে তারা বৃরান বিনতে কিসরাকে ক্ষমতার মসনদে বসায়। রani বৃরান রুস্তম ইবনে ফারাখযায নামের এক সাহসী বীর যোদ্ধার নিকট দশ বছরের জন্য রাজত্ব হস্তান্তর করে এই শর্তে যে, সে যুদ্ধ পরিচালনা করবে। এরপর রাজত্ব ফিরে আসবে কিসরার বংশধরদের নিকট। রুস্তম তা মেনে নেয়। এই রুস্তম ছিল একজন জ্যোতিষ্ক। জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে তার ছিল পর্যাপ্ত জ্ঞান। একদিন তাকে বলা হয়েছিল, আপনি জানতেন যে, এই রাজত্ব আর পূর্ণতা পাবে না। তবু এটি গ্রহণে কিসে আপনাকে উৎসাহিত করল? তিনি বললেন, 'লোভ-লালসা এবং মর্যাদা লাভের উচ্চাকাঙ্ক্ষা'। [cite: ৯]

১.২। নামারিকের যুদ্ধ, সাকাতিয়ার যুদ্ধ, এবং বারুসমার যুদ্ধ
১.২.১। নামারিকের যুদ্ধ (১৩ হি.)
আবু উবাইদ ইবনে মাসউদ আস-সাকাফি ইরাকে পৌঁছে সামরিক বহিনীর নেতৃত্ব বুঝে নেওয়ার পরই যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। তিনি ছিলেন সেনাপতি হিসাবে নতুন। সম্ভবত এ কারণেই পারসিকরা শুরুতেই আক্রমণ করে তাকে কাবু করতে চেয়েছে যাতে তার যুদ্ধ করার ইচ্ছা এবং জয়ের আশা গুঁড়িয়ে যায়। সুতরাং পারসিকরা সাধারণ জনগণকে প্রস্তুত করল এবং তাদের সৈন্যদের নিয়ে সম্মুখ ও পশ্চাৎ দিক থেকে মুসলমানদের মুখোমুখি হলো (নামারিকে)। তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিটি অঞ্চলের সর্দারদের বিদ্রোহ করার জন্য পত্র প্রেরণ করে এবং তারা প্রতিটি এলাকায় লোকজনকে উৎসাহিত করতে লোক প্রেরণ করে। তারা জাবানকে বাবাহাক্কাবায আল-আসফাল এবং নারসিকে কাসকার পাঠায়। তারা মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সৈন্য প্রেরণ করে। মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু এ সংবাদ পেয়ে সৈন্যদের সতর্ক করেন। বিভিন্ন জায়গায় চৌকি স্থাপন করে শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। সর্দাররা একের পর বিদ্রোহ শুরু করে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীরাও একের পর এক বিদ্রোহে যোগ দেয়। আবু উবাইদ এবং মুসান্না কাফফানে তাঁবু গাড়েন। তারপর নামারিকে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা পারসিকদের পরাজিত করেন। সেনাপতি জাবান এবং মারদানশাহ—যারা শত্রুদলের দুটি বাহুকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল—মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। [cite: ১০]

মাতার ইবনে ফুদ্দাহ আত-তামিমী নামে এক মুসলিম সৈনিক জাবানকে বন্দী করে। তিনি জাবানের পরিচয় জানতেন না। এই সুযোগে জাবান গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রতারণার আশ্রয় নেয়—কিছু উপঢৌকনের বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দিতে বলে। জাবানকে ছেড়ে দেওয়া হলেও অন্য মুসলিমরা তাকে আবার আটক করে সর্বাধিনায়ক আবু উবাইদের কাছে নিয়ে আসে। তারা তাকে বলেন, জাবানকে হত্যা করুন। কারণ, সে শত্রুপক্ষের প্রধান সেনাপতি। তিনি বলেন, ‘একজন মুসলমান তাকে নিরাপত্তা দিয়েছিল। এখন আমি তাকে হত্যা করার ব্যাপারে আল্লাহর আযাবের ভয় করছি।’ পুরো মুসলিম জাতি পারস্পরিক ভালোবাসা আর সম্প্রীতিতে একটি শরীরের মতো। একজন যদি নিরাপত্তা দেয়, তাহলে তা পুরো মুসলিম জাতির পক্ষ থেকেই দেওয়া হয়। তারা বলল, ‘সে-ই শত্রুসৈন্যের প্রধান ব্যক্তি।’ তিনি বললেন, ‘যা-ই হোক। আমি ওয়াদা ভঙ্গ করব না (মানে জনৈক মুসলিম তাকে একবার নিরাপত্তা দিয়েছে)। তাকে ছেড়ে দাও। [cite: ১১]

আবু উবাইদ-এর এই আচরণ ইসলামের ইতিহাসে মুসলমানদের ধৈর্য ও চুক্তি বাস্তবায়নে একনিষ্ঠতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে আছে, যদিও এতে তাদের খুব কম লোকই রাজি ছিল। নিঃসন্দেহে এই অবিশ্বাস্য আচরণ মানুষকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে বিশাল ভূমিকা রাখে। শীঘ্রই এই খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল যে, মুসলমান বাহিনীর সর্বাধিনায়ক তাদের চরম শত্রুপক্ষের এক পারসিক নেতাকে ছেড়ে দিয়েছে; কারণ, একজন সাধারণ মুসলিম সৈন্য মুক্তিপণের বিনিময়ে তাকে আগেই ছেড়ে দেওয়ার ওয়াদা করেছিল। এ ঘটনায় মানুষজন ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হয়; এটি কোনো সাধারণ ধর্ম নয় যেখানে এমন মানুষ তৈরি হয়! যখন আবু উবাইদ সর্বাধিনায়ক হিসাবে নিয়োগ পেয়ে প্রথমবারের মতো ইরাকের উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন মুসান্না ইবনে হারিসার বিস্ময়কর আচরণকে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। তিনি একজন সুযোগ্য সেনাপতি এবং সুদক্ষ সৈনিক। এটাই ছিল মুসান্নার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ক্ষেত্রেও তিনি একই কাজ করেছিলেন এবং ইসলামে তার অবদান-সেনাপতি কিংবা সৈনিক হিসাবে-একই। তারা এমনই মহান ব্যক্তি ছিলেন! [cite: ১২]

১.২.২। কাসকারে সাকাতিয়ার যুদ্ধ
তারপর আবু উবাইদ পরাজিত পারসিক সৈনিকদের তাড়া করতে বের হলেন। তারা তখন কাসকার [cite: ১৩] মহলে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। সেটির শাসক ছিল কিসরার খালাত ভাই নারসী। আবু উবাইদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সে তাদের সাহায্য করেছিল। আবু উবাইদ তাদের সঙ্গে সাকাতিয়ায় [cite: ১৪] মোকাবিলা করেন। তিনি তাদের ওপর আক্রমণ করে পরাজিত করেন এবং প্রচুর গনীমতের মাল ও খাদ্যদ্রব্য লাভ করেন। [cite: ১৫] নারসী পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়। মুসলমানরা ওই ভূখণ্ডের দখল নিলে তাদের গুদামে প্রচুর খাদ্যদ্রব্যের সন্ধান পায়।

আবু উবাইদ কাসকারে অবস্থান করেন এবং পারসিকদের তাড়া করতে সৈন্যদল প্রেরণ করেন। তিনি আশেপাশের এলাকার লোকজনের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন যারা চুক্তি ভঙ্গ করে পারসিকদের সাহায্য করেছিল। এই জয়ের ফলে মুসলমানরা এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। কয়েকজন গভর্নর স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে শান্তিচুক্তি করে। তাদের মধ্যে দুজন আবু উবাইদের জন্য তাদের সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার নিয়ে আসে। বলে, এটি আপনার প্রতি আমাদের সম্মানের প্রতীক হিসাবে আনা হয়েছে। তিনি বললেন, 'তোমরা কি একই ভাবে পুরো মুসলিম বাহিনীকে সম্মান দেখিয়েছ? তারা বলল, 'এটি সহজ নয়, তবে আমরা চেষ্টা করব।' আবু উবাইদ বললেন, 'আমাদের এর কোনো প্রয়োজন নেই যদি-না তা সকল সৈন্যের জন্য পর্যাপ্ত হয়।' তারপর তারা ভয় পেয়ে যায় এবং নিজেদের জীবনের আশঙ্কা করে। আবু উবাইদ বলেন, 'তোমরা কি জানো যে, আমি কেবল তখনই এই খাবার গ্রহণ করব যখন আমাদের সকল সৈন্যের একই খাবার সরবরাহ করা হবে?' তারা বলল, 'কেউই এই খাবার থেকে বঞ্চিত হয়নি এবং গুদামে আরও খাবার মজুদ আছে।' যখন তিনি এটি নিশ্চিত হলেন, তখন তিনি তাদের খাবার গ্রহণ করলেন। তিনি এর কিছু নিজে খেলেন এবং বাকি মেহমানদের খেতে দিলেন যাদের তিনি দাওয়াত দিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। মেহমানরা পার্সিয়ান খাবার খেল এবং তারা চিন্তাও করতে পারেনি যে, আবু উবাইদের নিকট এ ধরনের খাবার রয়েছে। তারা ভেবেছিলেন, আবু উবাইদ তাদের সাধারণ খাবারই খেতে দাওয়াত দিয়েছেন, যা তিনি সাধারণত খেয়ে থাকেন। আর তাদের সামনে যে খাবার দেওয়া হয়েছিল, তার সবটুকুই তারা খেলেন। তারা বলল, 'সর্বাধিনায়ককে বলো, তিনি আমাদের যা কিছু খেতে দেবেন, তা আমরা না খেয়ে থাকতে চাই না।' তিনি খবর পাঠালেন, 'এখানে অনেক পার্সিয়ান খাবার রয়েছে। আসো এবং তোমরা যা খাও, তার সঙ্গে তুলনা করে দেখো।'

এই মহান ও বিনয়ী সেনাপতি দু-বার না করে দেওয়ার পর পার্সিয়ান খাবার খান। কারণ, তৃতীয়বার তিনি জানতে পান যে, একই খাবার সকল সৈন্যদের দেওয়া হয়েছে। তিনি মেহমান ছাড়াও খেতে চাননি। এ জন্য তাদের ডেকে খেতে অনুরোধ করেন। তিনি জানতেন, তারা এ রকম খাবার আরও খেয়েছে এবং তিনি খাবারের তালিকা তৈরি করে তাদের তার সঙ্গে খাবার খেতে উৎসাহিত করেছেন। এটি একটি মহৎ গুণ এবং নেতৃত্বের জন্য একটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই আচরণ থেকে সাহাবা এবং তাদের অনুসারীদের ঈমান ও তাকওয়ার উঁচু অবস্থান সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। [cite: ১৬]

১.২.৩। বারুসমার যুদ্ধ
তারপর তারা কাসকার এবং সাকাতিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ স্থানটির নাম বারুসমা। নারসীর বাহিনীর ডান এবং বাম পার্শ্বের সেনাদলের দায়িত্ব ছিল তার দুই মামাত ভাইয়ের ওপর; বানদাবিয়্যাহ ও বায়রাবিয়্যাহ। এদিকে রুস্তম জালীনূসের নেতৃত্বে একটি সুসজ্জিত দল প্রেরণ করে। এ সংবাদ অবগত হয়ে আবু উবাইদ ত্বরিত গতিতে নারসী বাহিনীর ওপর আক্রমণ করেন। জালীনূসের বাহিনী তাদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগেই তিনি এই আক্রমণ করেন। যুদ্ধ প্রচণ্ড আকার ধারণ করে এবং পারসিকরা পরাজিত হয়। নারসী পালিয়ে যায়। আবু উবাইদ মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এবং অন্যান্য সেনাদলকে নাহর জুর ও অন্যান্য সীমান্তের দিকে প্রেরণ করেন। তারা অবস্থাভেদে শক্তি প্রয়োগ ও সন্ধির মাধ্যমে ওইসব স্থান জয় করেন এবং স্থানীয় জনগণের ওপর জিযিয়া কর নির্ধারণ করেন। সেখানে তারা অনেক গনীমতের মাল লাভ করেন। আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা। তারা জালীনূসকে পরাজিত করেন যে জাবানকে সাহায্যের জন্য আগমন করে এবং তার বাহিনী থেকে প্রচুর গনীমতের মাল জব্দ করেন। তার ব্যক্তিগত সম্পদও জব্দ করেন। অপমানিত, লাঞ্ছিত ও পরাজিত হয়ে জালীনূস তার সম্প্রদায়ের নিকট পালিয়ে যায়। [cite: ১৭]

সুতরাং সামান্য সময়ের ব্যবধানে পারস্যের তিনটি সেনাদল মুসলমানদের নিকট পরাজয় বরণ করে। পারসিকরা চাইলে তিনটি দলকে একত্র করে মুসলমানদের ওপর চারিদিক থেকে আক্রমণ পরিচালনা করতে পারত, কারণ, তারা সংখ্যায় ছিল অনেক। কিন্তু আল্লাহ তাদের সন্দেহে পতিত করেছেন এবং তাদের অন্তরে মুসলমানদের ব্যাপারে ভয় সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আর তাদের প্রত্যেক সেনাপতি আশা করেছে, অন্যরা আগে আক্রমণ করে মুসলমানদের দুর্বল করে ফেলবে এবং পরিশেষে সে আক্রমণ করে বিজয়ের দাবি করবে। শত্রুদের ধীর মুভমেন্টের সুযোগে মুসলমানরা ত্বরিত গতিতে আক্রমণ করায় এই বিজয় লাভ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছে। [cite: ১৮]

১.৩। আবু উবাইদ-এর সেতু যুদ্ধ (১৩ হিজরী)
মুসলমানদের হাত থেকে জালীনূস পালিয়ে যাওয়ার পর পারসিকরা মহাবীর রুস্তমের নিকট সমবেত হয়। সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিশাল এক সেনাদল প্রেরণ করে। এদের সেনাপতি ছিল বাহমান হাদাবিয়্যাহ। সে তার হাতে দূরকাশ কবিয়ান পতাকা তুলে দেয়। পারসিকরা এই পতাকা দ্বারা বরকত ও শুভযাত্রা কামনা করত। এই পতাকা ছিল চিতা বাঘের চামড়ায় তৈরি। পতাকাটির প্রস্থ ছিল আট হাত। তারা মুসলমানদের নিকটে এসে পৌঁছে। উভয়পক্ষের মধ্যে একটি নদী ছিল। সেখানে ছিল একটি সেতু। তারা খবর পাঠাল, 'হয় তোমরা নদী পার হয়ে আমাদের নিকট আসো নতুবা আমরা তোমাদের নিকট যাব।' মুসলমানরা আবু উবাইদকে বলল, 'তাদের বলুন আমাদের নিকট আসতে। তিনি বললেন, 'তারা আমাদের চেয়ে বেশি সাহসী নয়।' তারপর তিনি সেতু পার হয়ে নিজ সৈন্যসহ তাদের নিকট পৌঁছে গেলেন। সংকীর্ণ এ জায়গায় সকলে সমবেত হলো। উভয় পক্ষে সেখানে ভীষণ যুদ্ধ হয়। এমন যুদ্ধ দেখা যায়নি।

মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় দশ হাজার। পারসিকরা সঙ্গে করে বড় বড় হাতি নিয়ে এসেছিল। আর হাতির পিঠে ছিল প্রচণ্ড শব্দ সৃষ্টিকারী ঘণ্টা। হাতিগুলো দাঁড়িয়ে ছিল, যাতে মুসলমানদের ঘোড়াগুলো হাতি দেখে আর শব্দ শুনে ভয় পায়। তারা মুসলমানদের ওপর হামলা চালায়। বস্তুত বিশাল বিশাল হাতি দেখে এবং প্রচণ্ড ঘণ্টাধ্বনি শুনে মুসলমানদের ঘোড়াগুলো ভয়ে পালিয়ে যেতে থাকে। শক্তিপ্রয়োগে মাত্র অল্পসংখ্যক ঘোড়াকে ধরে রাখা সম্ভব হয়। অন্যদিকে মুসলমানগণ যখন তাদের ওপর আক্রমণে অগ্রসর হতে চায় তখন হাতির ভয়ে তাদের ঘোড়াগুলো সামনে এগুতে চায় না। তা ছাড়া প্রচণ্ড তির নিক্ষেপে পারসিকরা সেগুলো রক্তাক্ত করে ফেলে। ফলে বহু মুসলমানকে তারা হত্যা করে ফেলে। পক্ষান্তরে মুসলমানগণও প্রায় ছয় হাজার শত্রু হত্যা করেন। [cite: ১৯]

মুসলমানদের ঘোড়াগুলো হাতির ঘণ্টাধ্বনিতে ভয় পেয়ে গেল। এ অবস্থায় মুসলমানগণ ঘোড়া নিয়ে শত্রুর কাছাকাছি যেতে পারল না। আবু উবাইদ ঘোড়া থেকে নেমে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বাকিরাও তাকে অনুসরণ করল। মুসলমানগণ তরবারি দিয়ে শত্রুকে আক্রমণ করতে লাগল। মুসলমানগণ তাদের ঘোড়া হারিয়ে পদাতিক বাহিনীতে পরিণত হলো। এ বাহিনীকে এখন শত্রুপক্ষের হস্তিবাহিনী, ঘোড়সওয়ার ও পদাতিক বাহিনীসহ তিরন্দাজদের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে। কয়েকটি ঘোড়াকে অতি কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করে অগ্রসর হতে চাইলেই এসব তিরন্দাজেরা তির নিক্ষেপ করছে এবং ঘোড়াগুলো সামনে অগ্রসর হচ্ছে না। এটি ছিল খুবই কঠিন পরিস্থিতি। এদিন মুসলমানগণ এত বেশি আত্মত্যাগ ও সাহসের পরিচয় দিয়েছে যে, ইতিহাসে এর নজির খুব একটা পাওয়া যায় না। তারা রণকৌশল ও যুদ্ধাস্ত্রে অগ্রগামী পারসিকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। মুসলমানরা এর আগে কোনো যুদ্ধে হস্তিবাহিনীর মুখোমুখি হয়নি। হাতির কারণে মুসলমানদের সৈন্যদল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। আবু উবাইদ তাদের ডেকে হাতিদের প্রতি মনোযোগ দিতে নির্দেশ দেন। তিনি প্রথমে হাতির জিন আসন কেটে দিতে এবং তার বাহককে ধরাশায়ী করতে বলেন। তিনি নিজেই একটি সাদা হাতির এগিয়ে যান; তিনি সেটির জিন আসন কেটে দেন এবং এতে এর বাহক মাটিতে পড়ে যায়। মুসলমান সৈন্যগণও তাকে অনুসরণ করে। তারা প্রতিটি হাতির ওপর আক্রমণ করে শত্রুসেনাকে হত্যা করতে থাকে। কিন্তু প্রশিক্ষিত হাতির আক্রমণ বন্ধ হয় না।

আবু উবাইদ এসব হাতির আক্রমণ প্রতিহত করার উপায় নিয়ে চিন্তা করছিলেন। তিনি হাতি হত্যা করার কৌশল সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তখন তাকে বলা হলো, শুঁড় কেটে দিলেই হাতি মৃত্যুবরণ করবে। তারপর তিনি সাদা হাতিটির ওপর তরবারির আঘাত হানেন। হাতির শুঁড় কেটে যায়। হাতি মাতাল ও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং ভয়ংকর একটি চিৎকার দিয়ে সেনাপতি আবু উবাইদ-এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দু-পায়ে তাকে দলিত-মথিত করে ফেলে। তিনি শাহাদাত বরণ করেন। আবু উবাইদ-এর ভাই আল-হাকাম ইবনে মাসউদ পতাকা তুলে নেন এবং হাতির ওপর আক্রমণ করে আবু উবাইদ-এর নিথর দেহ সরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু হাতিটি তাকেও মেরে ফেলে। এভাবে আবু উবাইদের মনোনীত সাত জন সেনাপতি নিহত হন যার মধ্যে তার তিন জন ছেলেও ছিল; ওয়াহব, মালিক এবং জাবর। শেষ পর্যন্ত সেনাপতির দায়িত্ব পান মুসান্না ইবনে হারিসা।

কিছু মুসলমান সৈন্য সেতু পার হয়ে এপারে চলে এল। তারা রণক্ষেত্র থেকে পেছনে পালাতে লাগল। আব্দুল্লাহ ইবনে মারসাদ আস-সাকাফি এ দৃশ্য দেখে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সেতুটি কেটে দেয় এবং বলে, 'তোমাদের সেনাপতিগণ যে কারণে মৃত্যুবরণ করেছে, তোমরাও একই কারণে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করো অথবা বিজয় অর্জন করো।' সে সেতু পার হয়ে রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া থেকে মুসলিম সৈন্যদের প্রতিহত করতে চেয়েছে। লোকেরা তাকে ধরে সেনাপতি মুসান্নার নিকট নিয়ে আসে। তিনি তাকে ভীষণ জোরে আঘাত করেন, কারণ, তার কর্মকাণ্ডে তিনি খুব রাগান্বিত হন। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কেন এমন করলে? সে বলল, 'যেন তারা লড়াই অব্যাহত রাখে।' কিন্তু তার এ ধারণা সঠিক ছিল না। সেতুটি কেটে দেওয়াতে অনেক মুজাহিদ পানিতে পড়ে যায় এবং ডুবে মৃত্যুবরণ করে। তবে বেঁচে যাওয়া মুসলমানদের রক্ষা করার কৌশলই তখন সঠিক ছিল। এ জন্য মুসান্না সেতুটি দ্রুত মেরামত করার নির্দেশ দেন।

মুসান্না এবং তার সঙ্গে আরও কয়েকজন বীর মুজাহিদ ওই পারে থেকে মুসলমানদের পাহারা দিতে থাকে যতক্ষণ তারা সেতু পার হয়। মুসান্না বলেন, 'হে লোকসকল, আমরা আপনাদের নিরাপত্তা দেব; ধীর-স্থিরভাবে সেতু পার হন এবং তাড়াহুড়া করবেন না। আপনাদের সকলে পার না হওয়া পর্যন্ত আমরা সেতু পার হব না। অহেতুক পানিতে পড়ে মৃত্যুবরণ করা থেকে নিজেকে রক্ষা করুন।' এ-সময় মুসান্নার পাশে ছিলেন আসিম ইবনে আমর এবং আল-খালয আদ-দাব্বি। তারা সকলের শেষে সেতু পার হন।

বাহমান যাজাওয়াহ বেঁচে যাওয়া মুসলমানদের শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সে তা করতে সক্ষম হয়নি। মুসলমানদের রক্ষা করার দায়িত্ব নেওয়ার পর মুসান্না তার ওপর আক্রমণ করে তাকে প্রতিহত করেন। নিঃসন্দেহে এসব বীর মুজাহিদ মুসলমানদের নিরাপত্তায় তাদের জান বাজি রেখেছিলেন। তারা পাঁচ হাজার মুসলমানের জীবন রক্ষা করতে পেরেছিলেন। আর চার হাজার পেছনে রেখে যান যারা শাহাদাত বরণ করেন। এর মধ্যে বিরাটসংখ্যক সাহাবা ছিল; বিশেষ করে যারা মদীনা থেকে আবু উবাইদ-এর সঙ্গে এসেছিলেন। দুই হাজার সৈন্য মদীনায় ও অন্যান্য এলাকায় ফিরে যান। বাকি তিন হাজার সৈন্য মুসান্নার সঙ্গে অবস্থান করেন। চরম বিরূপ পরিস্থিতি সত্ত্বেও মুসলমানগণ ছয় হাজার শত্রুসেনাকে হত্যা করে, যা মুসলমানদের দৃঢ় মনোবল ও সাহসের প্রতীক হয়ে আছে। [cite: ২০]

সেতুযুদ্ধ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা
১.৩.১। সত্য স্বপ্ন
সেনাপতি আবু উবাইদ-এর স্ত্রী দাওমা একটি স্বপ্ন দেখেন যে, একজন ব্যক্তি আকাশ থেকে তার নিকট নেমে এসেছেন। তার হাতে একটি পানীয়-ভর্তি পাত্র। আবু উবাইদ, তার কয়েকজন সন্তান এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য সেখান থেকে পান করেন। তিনি এ ঘটনা তার স্বামীকে জানান। তখন আবু উবাইদ বলেন, 'এতে আমাদের শাহাদাতের ইশারা রয়েছে।' আবু উবাইদ লোকদের উদ্দেশে বলেন, 'যদি আমি শাহাদাত বরণ করি, তাহলে আমার গোত্রের অমুক অমুক সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবে।' এভাবে তিনি সাকিফ গোত্রের সাত জনের নামের তালিকা ঘোষণা করেন, যারা সবাই তার আত্মীয় ছিল। যখন তাদের শেষজন শাহাদাত বরণ করেন, তখন সেনাপতির দায়িত্ব বুঝে নেন মুসান্না ইবনে হারিসা। [cite: ২১]

১.৩.২। দুটি ভুল, যা পরাজয়কে ত্বরান্বিত করে
আবু উবাইদ তার সঙ্গে থাকা রণকৌশলে বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট সামরিক ব্যক্তিদের পরামর্শের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। তারা তাকে সেতু অতিক্রম না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি এতে কর্ণপাত করেননি। তিনি তার মতো কাজ করেছেন এবং প্রচণ্ড সাহস ও শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সেতু অতিক্রম করে শত্রু-এলাকায় গমন করেছেন এবং যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় রণকৌশলও প্রণয়ন করেননি। তিনি শত্রুপক্ষের যুদ্ধক্ষেত্র ঠিকমতো পর্যবেক্ষণ করেননি। [cite: ২২] তিনি এমন এক জায়গায় নিজেকে আবদ্ধ করেছেন যেখানে তার বহির্গমনের পথ ছিল খুবই সংকুচিত। ফলে তিনি যথাযথ নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি। মনে হয় তিনি তার বাহিনীকে কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই একটি ফাঁদে জড়িয়ে ফেলেছেন। তিনি তার দক্ষ সৈন্যদের সঙ্গে থাকা বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ, যুদ্ধে অশ্বারোহীরা কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি। তাদের পদাতিক বাহিনীতে পরিণত হয়ে শত্রুদের পদাতিক, অশ্বারোহী ও হস্তিবাহিনীর মোকাবিলা করতে হয়েছে। এ যুদ্ধে দক্ষ নেতৃত্বেরও বিপর্যয় ঘটে, যতক্ষণ না মুসান্না সেনাপতি হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং তার পূর্বেই সাত জন সেনাপতি শাহাদাত বরণ করতে বাধ্য হন। তিনি রণক্ষেত্রের স্বল্প পরিসরে মুসলিম সৈন্যদের যথাযথভাবে পরিচালনা করতে পারেননি। বিরাটসংখ্যক মুসলিম সৈন্যরা কার্যত বিরূপ ভূমিতে অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং তিনি যুদ্ধে জয়ের জন্য গঠনমূলক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতেও সফল হননি। তিনি সবকছুই হারিয়েছেন এবং বস্তুত তিনি তার সামর্থ্যকে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহারের নিমিত্তে শত্রুর হাতে অর্পণ করেছেন। [cite: ২৩]

আরেকটি ভুল সিদ্ধান্তের জন্য আবু উবাইদের ভুলগুলো চরম বিপর্যয়ের কারণ হয়ে ওঠে। আর এ সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে মারসাদ আস-সাকাফি। তিনি সেতুটি কেটে দিয়ে মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদপসরণে বাধা সৃষ্টি করেন, যাতে কেউই রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেতে না পারে। যদি আল্লাহর সাহায্য না থাকত এবং মুসান্নার দৃঢ় সিদ্ধান্ত কার্যকর না হতো, তাহলে তখনো যারা বেঁচে ছিলেন, তাদের সকলকেই হয়তো সেদিন শাহাদাত বরণ করতে হতো। [cite: ২৪]

১.৩.৩। শক্তিশালী নেতৃত্বের বিকল্প নেই
সেতুযুদ্ধ প্রমাণ করে, রণক্ষেত্রে শক্তিশালী নেতৃত্বের বিকল্প নেই। পরবর্তী সময়ে মুসান্না এবং তার সঙ্গী সেনাপতিরা এর স্বাক্ষর রাখেন। মুসলিম সেনাবাহিনীর ওপর দুর্যোগ নেমে এলে তারা সেনাসদস্যদের কঠিন পরিস্থিতি থেকে নিরাপদে বের করে আনেন। [cite: ২৫] বীর সেনাদের সহযোগিতায় মুসান্না মুসলিম বাহিনীকে রক্ষা করতে সমর্থ হন এবং তিনিই সর্বশেষ ব্যক্তি, যিনি সেতু পার হন। এটি মহান আত্মত্যাগের একটি বাস্তব নমুনা। [cite: ২৬]

১.৩.৪। আল-মুসান্না সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধি করেন
মুসলিম সেনাবাহিনীর দশ হাজার সৈন্যের মধ্যে বেঁচে যাওয়া চার হাজার সৈন্যকে নিয়ে রণক্ষেত্র থেকে মুসান্না নিরাপদে পেছনে ফিরে আসেন। তিনি দুই পারসিক সেনাপতি জাবান ও মারদানশাহকে আলিস (আস-সামাওয়াহ)-এর দিকে ধাওয়া করেন। তিনি তাদের অনেক দূর পর্যন্ত তাড়িয়ে নেন যাতে পারসিকরা মুসলমানদের পশ্চাদপসরণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুনর্বার আক্রমণ করতে না পারে। তিনি যখন আস-সামাওয়াহতে পৌঁছন, তখন তিনি তার অশ্বারোহী বাহিনীর সহযোগিতায় শত্রুপক্ষের ওপর অকস্মাৎ এক কঠিন আঘাত হানেন। তিনি নিজেই এর নেতৃত্ব দেন এবং তাদের পরাজিত করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে এ রকম হঠাৎ আক্রমণ এবং যে সেনাবাহিনী তাদের অধিকাংশ সদস্যকেই হারিয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে এ রকম পাল্টা আক্রমণ তারা চিন্তাও করতে পারেনি। পারসিকরা এতে হতবিহ্বল হয়ে যায় এবং তারা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। মুসান্না ওই দুই পারসিক নেতাকে বন্দী করেন এবং হত্যা করেন। এ ঘটনা ও বিজয় তার সঙ্গে থাকা সৈন্যদের মনোবল অনেকাংশে বৃদ্ধি করে। স্থানীয় অধিবাসীরাও এতে আশ্বস্ত হয়। পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহ এবং মুসলিম সেনাদের নিকট এতে মুসান্নার মর্যাদাও বৃদ্ধি পায়। [cite: ২৭]

১.৩.৫। যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতিতে আল্লাহ মুসলমানদের সাহায্য করেন
আল-মুসান্না ইরাকে অবস্থান করেন। তার সঙ্গে থাকা সেনাবাহিনী ভূমির নিরাপত্তা ও মুসলমানদের বিজিত এলাকা রক্ষা করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। পারসিক বাহিনী অবশিষ্ট মুসলিম বাহিনীকে ইরাক থেকে বিতাড়িত করতে পারত এবং তারা তাদের অনুগত আরবদের নিয়ে মুসলিম বাহিনীকে মরুভূমির দিকে তাড়িয়ে দিতে পারত। কিন্তু আল্লাহ মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে ছিলেন যেমন তিনি সর্বদা সব জায়গায় ঈমানদারদের সাহায্য করে থাকেন। যখনই একনিষ্ঠ মুসলমানগণ কোনো বিপদের সম্মুখীন হন, তখন আল্লাহ তাদের উদ্ধার করেন। আল্লাহ এমন কিছু করলেন যাতে পারসিকরা মুসলমানদের ব্যাপারে বিভ্রান্ত হয়ে গেল এবং তারা দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। তাদের একটি দল ছিল রুস্তমের নেতৃত্বে এবং অন্যটি ছিল ফাইরাযানের হাতে। পারস্যের রাজা বাহমান জাযওয়াহর নিকট এ খবর পৌঁছলে তিনি দ্রুত মাদাইনে ফিরে আসেন। কারণ, তিনিই পারস্যের রাজনৈতিক বিষয়াদি দেখভাল করতেন। এভাবে আল্লাহ মুসলমানদের যুদ্ধ করা থেকে হেফাজত করেন এবং তাদের দুর্যোগ থেকে রক্ষা করেন। এই সুযোগে মদীনা থেকে অতিরিক্ত সৈন্য এসে তাদের সঙ্গে যোগদান করে এবং তারা এ অঞ্চলে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করতে সমর্থ হন। [cite: ২৮]

১.৪। বুওয়াব-এর যুদ্ধ (১৩ হিজরী)
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকজনকে জিহাদের জন্য প্রস্তুত করে ইরাকে সাহায্য-সৈন্য প্রেরণ করেন। এসব সৈন্যদের মধ্যে জারির ইবনে আব্দুল্লাহ আল-বাযালি ও তার গোত্রের লোকজন এবং হানযালা ইবনে আর-রাবিও ছিলেন। তিনি হিলাল ইবনে আলকামা এবং খাসাম গোত্রের একদল লোককে আব্দুল্লাহ ইবনে যিসাহমাইনের নেতৃত্বে প্রেরণ করেন। তিনি তাদের ইরাকে অবস্থানরত মুসলিম সেনাবাহিনীতে যোগদান করার নির্দেশ দেন। ইমর ইবনে রিবি ইবনে হানযালা.ও তার লোকজন এবং রিবি ইবনে আমির ইবনে খালিদ-উভয়ে খলীফার নিকট আগমন করেন এবং খলীফা তাদেরও ইরাকে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য প্রেরণ করেন। এভাবে ইরাকে একের পর এক সাহায্য-সৈন্য আসতে থাকে। একই সময় আল-মুসান্না ইবনে হারিসা আস-শাইবানি ইরাকে অবস্থানরত অন্যান্য মুসলিম সেনাপতিদের নিকট সাহায্য চেয়ে পাঠান এবং তারাও সাহায্য-সৈন্য প্রেরণ করে মুসলিম বাহিনীর কলেবর বৃদ্ধি করেন।

পারসিকরা যখন দেখল, সেনাপতি মুসান্নার বাহিনীতে বিরাটসংখ্যক সৈন্য জমা হয়েছে, তখন তারা মাহরান আল-হামাযানির নেতৃত্বে একটি অশ্বারোহী বাহিনীকে মুসান্নার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রেরণ করে। মুসান্না এ খবর পেয়ে তার সাহায্যে এগিয়ে আসা সেনাদলের নিকট জরুরি পত্র প্রেরণ করেন এবং তাদের বুওয়ায়ব নামক স্থানে মিলিত হতে বলেন। [cite: ২৯] এই সাহায্য-সেনাদলের নেতৃত্বে ছিলেন জারির ইবনে আব্দুল্লাহ। তার নিকট প্রেরিত চিঠিতে মুসান্না লেখেন, 'এ অঞ্চলে নতুন যুদ্ধ- পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং আপনাদের আগমন পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সুতরাং দ্রুত আমাদের সঙ্গে যোগদান করুন এবং বুওয়ায়বে আমাদের সাক্ষাৎ হবে ইনশাআল্লাহ।' সুতরাং তারা বুওয়ায়বে মিলিত হলেন।

বুওয়ায়বে মুসলিম বাহিনী ও পারসিক বাহিনী অবস্থান গ্রহণ করল। উভয়পক্ষের মাঝে একটি নদী ছিল। মুসান্না অপেক্ষা করতে লাগলেন। একসময় শত্রুসেনাপতি মাহরান তাকে লিখে পাঠাল : হয় তোমরা নদী পার হয়ে আমাদের নিকট আসো নইলে আমরা নদী অতিক্রম করে তোমাদের নিকট যাব।' মুসান্না বললেন, 'তোমরাই নদী পার হয়ে আসো।' সুতরাং সেনাপতি মাহরান তার বাহিনী নিয়ে নদী পার হয়ে এল। এটি ১৩ হিজরীর রমযান মাসে সংঘটিত হয়। মুসান্না দাঁড়িয়ে তার সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে বলেন, 'আপনারা নিশ্চয়ই রোযা রেখেছেন এবং রোযা আপনাদের দুর্বল করে রেখেছে। আমার মতে আপনাদের রোযা ভেঙে ফেলা উচিত এবং শক্তি অর্জনের জন্য কিছু পানাহার করা প্রয়োজন।' তারা তার কথায় একমত পোষণ করল এবং রোযা ভেঙে ফেলল।

মুসান্না তার বাহিনীকে রণসাজে সজ্জিত করলেন এবং ঘুরে ঘুরে তাদের উৎসাহ দিতে লাগলেন। প্রতিটি দলের নিকট গিয়ে বললেন, 'আমি আশা করি, আপনাদের জন্য আরবরা পরাজিত হবে না। আল্লাহর কসম, আজকের দিনে আমি নিজের জন্য এমন কিছু চাই না যা আপনাদের জন্যও আশা করি না।' বর্ণনাকারী বলেন, মুসান্না কথা ও কাজে তাদের প্রতি দয়ালু ছিলেন। তিনি তাদের সঙ্গে শান্তির সময় যেমন পাশে থেকেছেন, তেমনি কঠিন অবস্থায়ও পাশে থেকেছেন; কেউই তার কথা ও কাজে কোনো ত্রুটি খুঁজে পায়নি। [cite: ৩০] এ থেকে তার সৎ নেতৃত্ব ও মহান গুণাবলির পরিচয় পাওয়া যায়। তার অধীনস্থ সকল সৈন্য ভালোবাসা ও আগ্রহের সঙ্গেই তাকে মেনে চলত। নিজ সেনাবাহিনীর প্রস্তুতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে মুসান্না বলেন, 'আমি তিনবার আল্লাহু আকবার বলব। তাতে সকলে প্রস্তুত হয়ে যাবে। আমি চতুর্থবার আল্লাহু আকবার বলার সঙ্গে সঙ্গে শত্রুপক্ষের ওপর আক্রমণ করবে।' কিন্তু তিনি যখন প্রথম তাকবির বলেন, তখনই পারসিকরা মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করে বসে। তখন মুসলমানগণও প্রথম তাকবিরের সঙ্গে সঙ্গেই শত্রুপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তবে যুদ্ধে পারসিকদের এত দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা না। এটা তাদের রীতিবিরুদ্ধ। সম্ভবত সেতুযুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পরাজয় তাদের অন্তর থেকে মুসলমানদের প্রতি ভয় কিছুটা কমিয়ে দিয়েছিল। সুতরাং পারসিকরা প্রথমে আক্রমণ করে এবং মুসলমানরা তার প্রতিরোধে দৃঢ়ভাবে লড়তে থাকে। যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের পাশাপাশি মুসান্না তার বাহিনীর প্রতিও সতর্ক দৃষ্টি রাখছিলেন। যখনই সৈন্যদের সারিতে কোথাও কোনো দুর্বলতা বা ত্রুটি পেতেন, তিনি সেখানে একজন লোক পাঠাতেন। সে গিয়ে তাদের বলত : সেনাপতি তোমাদের সালাম জানিয়েছেন। আর বলেছেন যে, মুসলমানদের আজ বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়ো না।' তারা এতে সম্মত হতো এবং সারির মধ্যে সৃষ্ট ঘাটতি পূরণ করে নিত। [cite: ৩১]

যুদ্ধ ভয়ংকর আকার ধারণ করে এবং দীর্ঘক্ষণ ধরে চলতে থাকলে মুসান্না আনাস ইবনে হিলালকে বলেন, 'হে আনাস, আমি মাহরানের ওপর আক্রমণ করব। তুমি আমাকে পেছন দিক থেকে সাহায্য করবে।' তিনি একই কথা ইবনে মারদি আল-ফাহরকেও বললেন। তারপর মুসান্না মাহরানকে আক্রমণ করলেন। তাকে তার স্থান থেকে সরিয়ে দিলেন। মাহরান তার সৈনিকদের ডান পার্শ্বস্থ দলে ঢুকে গেল। মুসান্না মাহরানের বাহিনীর ওপর আক্রমণ অব্যাহত রাখেন। উভয়পক্ষের কেন্দ্রীয় বাহিনী সম্মুখ লড়াইতে অবতীর্ণ হলো এবং চারিদিক ধূলিতে ভরে উঠল; সাধারণ সৈনিকদের সারিতেও যুদ্ধ চলছে। তবে তারা তাদের নেতাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারছে না—মুসলিম ও মুশরিকদের উভয় পক্ষেই একই অবস্থা। মুসলিম পদাতিক বাহিনীর প্রধান মাসউদ ইবনে হারিসা তার সৈন্যদের উদ্দেশে বলেন, 'যদি আমি মৃত্যুবরণ করি, তাহলে তোমরা যুদ্ধ বন্ধ কোরো না। তাহলে শত্রুপক্ষ তোমাদের ওপর বিজয়ী হবে এবং তোমরা পরাজয় বরণ করবে। তোমরা তোমাদের অবস্থানে দৃঢ় থাকো এবং কোনোভাবেই শূন্যতা তৈরি কোরো না।' [cite: ৩২]

মাসউদসহ আরও কয়েকজন মুসলিম কমান্ডার শহীদ হয়ে গেলেন। মাসউদ চরম আহত অবস্থায় লক্ষ করলেন, তার সৈনিকরা দোদুল্যমানতায় ভুগছে। তিনি তখন তাদের বললেন, হে বকর ইবনে ওয়ালির সৈনিকরা, তোমাদের পতাকা উঁচু করো, আল্লাহ তোমাদের বিজয় দান করবেন! আমার মৃত্যুতে লড়াই বন্ধ কোরো না।' মুসান্নাও তার ভাইয়ের মৃত্যু স্বচক্ষে দেখলেন এবং তিনি তার লোকদের উদ্দেশে বললেন, 'হে মুসলমানগণ, আমার ভাইয়ের মৃত্যুতে দুঃখ কোরো না; বরং এমন উত্তম মৃত্যুই কামনা করো।' [cite: ৩৩]

আনাস ইবনে হিলাল আন-নুমাইর শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত লড়াই করলেন। মুসান্না তার ভাই মাসউদ এবং আনাস ইবনে হিলালের মৃতদেহ বহন করে তাঁবুতে আনলেন। তখনো সবদিকেই যুদ্ধ চলছে। তবে ভেতরে ভেতরে যুদ্ধের স্রোত পারসিকদের বিপরীতে যেতে শুরু করেছে। মুসলিম কেন্দ্রীয় বাহিনীর সৈনিকরা পারসিকদের কেন্দ্রীয় বাহিনীকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সমর্থ হয়। মুসান্না তীব্র আক্রমণে পারসিকদের বাহিনীর কেন্দ্রীয় সারি একেবারে চিরে ফেলেন। তার সঙ্গে আর যারা পারসিক সৈনিকদের সারি ভেদ করে এগিয়ে যান, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন জারির ইবনে আব্দুল্লাহ, বাজির, ইবনে আল-হাওবার, এবং আল-মুনযির ইবনে হাসান ও তার সঙ্গে থাকা দাব্বাহর লোকজন। কুরত ইবনে জামাহ আল-আবদি লড়াই করে নিজ হাতে শত্রুর অনেক বর্ম ও তরবারি ভেঙে ফেলেন; তিনি পারসিক নেতা ও অশ্বারোহী বাহিনীর প্রধান শাহর বারাযকে হত্যা করেন। যুদ্ধ চলতেই থাকে। একসময় মুসলিম বাহিনী পারসিক সেনাদের কেন্দ্রীয় দলকে সমূলে ধ্বংস করে ফেলে। সৈনিকদের সারিতে যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। [cite: ৩৪]

রণক্ষেত্রে ধূলির আস্তরণ বাড়ছেই। মুসান্না দৃঢ়পদে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ-পরিস্থিতি অবলোকন করছেন। মুশরিকদের সেন্ট্রাল কমান্ড শেষ করে দেওয়া হয়েছে। তাদের নেতা মাহরানকে হত্যা করা হয়েছে। তবে সৈনিকদের সারিতে তখনো যুদ্ধ চলছে। মুসলমান সৈনিকরা মাহরানের নিহত হওয়ার খবর পেয়ে নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়ে উঠল এবং পারসিকদের ধাওয়া করতে লাগল। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থাকা মুসান্না এবং তার সঙ্গী মুসলমানগণ বিজয়ের জন্য প্রার্থনা করতে লাগলেন যতক্ষণ না তারা পারসিকদের পরাজিত করে। তারপর মুসান্না পারসিকরা পৌঁছার পূর্বেই দ্রুত সেতুর নিকট গমন করেন এবং সেতুটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। তখন পারসিকরা ফোরাত নদীর তীরে ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম অশ্বারোহীরা তাদের ধাওয়া করে হত্যা করে। বর্ণনায় পাওয়া যায়, ওইদিন নিহতের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। [cite: ৩৫]

১.৪.১। যুদ্ধ-পরবর্তী আলোচনা
যুদ্ধ বন্ধ ঘোষণা করা হলো এবং মুসান্না ও অন্যান্য মুসলমানগণ হাজার হাজার লাশের সারির দিকে দৃষ্টি দিলেন; সম্পূর্ণ রণক্ষেত্র লাশের রক্তে ভিজে গেছে। তারপর তিনি মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ সম্পর্কে আলোচনায় বসলেন। তিনি প্রত্যেককে তাদের কৃতিত্বের বর্ণনা দিতে বললেন। মুসান্নার নিকট কেউ এগিয়ে এলেই তাকে জিজ্ঞাসা করতেন, 'তুমি এ যুদ্ধে কী করেছ, বলো।' তারা তাকে তার কৃতিত্বের কথা এবং যুদ্ধের অবস্থা বর্ণনা করলেন। মুসান্না বললেন, 'আরব এবং পারসিকরা জাহেলী যুগে ও ইসলাম আবির্ভাবের পর যুদ্ধ করেছে। আল্লাহর কসম, জাহেলী যুগে এক শ পারসিক সেনা আরবদের এক হাজার সৈনিকদের তুলনায় শক্তিশালী ছিল। আর আজ এক শ আরব সেনা এক হাজার পারসিক সেনা থেকে বেশি শক্তিশালী। আল্লাহ তাদের ক্ষমতা ও দম্ভ কেড়ে নিয়েছেন এবং তাদের দুর্বল করে দিয়েছেন। সুতরাং তাদের বাহ্যিক চাকচিক্য ও সংখ্যা দেখে বিমোহিত হয়ে যেয়ো না...। [cite: ৩৬]

এ সময় এ মন্তব্য ছিল যথার্থ। কারণ, মুসান্না তার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সুচারুভাবে বর্ণনা করেন যেখানে অনেক আরব প্রথমবারের মতো পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছিল। তিনি তার পূর্বের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এ যুদ্ধের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন। [cite: ৩৭]

১.৪.২। পশ্চাদপসরণের পথ রুদ্ধ করে দেওয়ায় মুসান্নার দুঃখ প্রকাশ
সেতু কেটে দিয়ে মুসান্না শত্রুপক্ষের পশ্চাদপসরণের পথ রুদ্ধ করে দেন এবং এ জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'আমি একটি ভুল কাজ করেছি। তবে আল্লাহ তা'আলা এর ক্ষতিকর প্রভাব কমিয়ে দিয়েছেন। আমি শত্রু পৌঁছার আগেই সেতুর কাছে চলে যাই এবং সেটি কেটে দিয়ে শত্রুপক্ষের পালানোর পথ বন্ধ করে দিই। আমি মনে করি, এ কাজটি সঠিক ছিল না, তোমরা কখনো এ রকম কোরো না এবং আমার দৃষ্টান্ত অনুসরণ কোরো না। কাউকে এ রকম অসহায় অবস্থায় অবরুদ্ধ করে ফেলা ঠিক নয়।' [cite: ৩৮]

মুসান্না তার বক্তব্যের শেষ দিকে এ ভুলের ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি অতীত যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, শত্রুর পশ্চাদপসরণের পথ রুদ্ধ করে দিলে যুদ্ধ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। যখন তার পালানোর কোনো পথ থাকে না, তখন সে নিজেকে বাঁচাতে আরও মরিয়া হয়ে লড়াই করে। এ জন্য শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করতে বেগ পেতে হয়। তবে আল্লাহ এ ব্যাপারে মুসলমানদের সাহায্য করেন। তিনি মুসলমানদের দৃঢ়পদ রাখেন এবং এতে শত্রুপক্ষ মুসলমানদের শক্তির কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। আল্লাহ মুশরিকদের অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দেন এবং তারা আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের সাহস হারিয়ে ফেলে।' [cite: ৩৮]

এ যুদ্ধে বিশাল বিজয় অর্জনের পরেও মুসান্না তার ভুল স্বীকার করেছেন। এতে তার দৃঢ় ঈমান ও নিঃস্বার্থপরতার পরিচয় পাওয়া যায়। কারণ, তিনি নিজের ওপর দলের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এটাই মহান ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক। [cite: ৩৯]

১.৪.৩। মুসান্নার সামরিক মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান
মুসান্না অন্যান্য গুণাবলির মধ্যে আরেকটি প্রণিধানযোগ্য গুণ হচ্ছে সামরিক ক্ষেত্রে তার মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান। রণভূমিতে নিজের ভাইয়ের মৃত্যুকে কীভাবে দেখতে হবে, এ ব্যাপারে তার দৃষ্টিকোণ সত্যিই প্রশংসাযোগ্য। যারা তার সঙ্গে রণক্ষেত্রে যুদ্ধে লিপ্ত, তাদের প্রতি তার বাঁধভাঙা ভালোবাসার প্রকাশ দেখে আমরা অভিভূত হই। এতে তার আবেগের স্বচ্ছতা ফুটে ওঠে। তাদের প্রতি তার ভাষণ এবং তার প্রতি তাদের অভিব্যক্তি থেকে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা দেখি, তিনি তার ঘোড়া আশ-শুমুসে চড়ে বিভিন্ন দলের নিকট গমন করছেন, তাদের উৎসাহ দিচ্ছেন, প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং তাদের সর্বোচ্চ বিলিয়ে দিতে অনুপ্রাণিত করছেন। তিনি তাদের বলেন, 'আল্লাহর কসম, আজকের দিনে আমি নিজের জন্য এমন কিছু চাই না যা আপনাদের জন্যও আশা করি না। [cite: ৪০] তারাও তার কথায় একই ভাবে সাড়া দেয়। বর্ণনাকারী বলেন, কেউই তার কথা ও কাজে কোনো ত্রুটি দেখতে পায়নি। [cite: ৪১] যখন তিনি পারসিকদের বিকট শব্দে আক্রমণে উদ্যত দেখতে পান এবং তিনি অনুধাবন করেন, এটি মুখোমুখি এবং কঠিন যুদ্ধ হতে যাচ্ছে, বিশেষভাবে আবু উবাইদের সেতুযুদ্ধের স্মৃতি শত্রুদের অন্তরে উজ্জ্বল—তখন তিনি তাদের মধ্যে এমন এক সাহসী বক্তব্য উচ্চারণ করেন, যা তাদের দৃঢ়পদ থাকতে উৎসাহিত করে। মুসলমানগণ ওই বিকট শব্দের যথোচিত জবাব প্রদান করেন। তিনি খুবই আশ্চর্যজনক শান্ত ভঙ্গিতে বলেন, 'তোমরা যা শুনছ, তা পরাজয়ের করুণ সুর। শান্ত থাকো এবং চুপেচুপে কথা বলো। [cite: ৪২]

যখন তার ভাই মাসউদ মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলেন, তখন তিনি যা বলেছেন তা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো: 'হে মুসলমানগণ, আমার ভাইয়ের মৃত্যুতে দুঃখ কোরো না; বরং এমন উত্তম মৃত্যুই কামনা করো। [cite: ৪২] আর তার ভাইয়ের উক্তিও কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, যা তিনি জীবনের শেষ মুহূর্তে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করার আগে আনন্দচিত্তেই উচ্চারণ করেছিলেন : তোমাদের পতাকা উঁচু করো, আল্লাহ তোমাদের বিজয় দান করবেন! আমার মৃত্যুতে লড়াই বন্ধ কোরো না।' মুসান্না এ যুদ্ধে শাহাদাত বরণকারী তার ভাইসহ আরও কয়েকজনের জানাযার নামায শুরু করার আগে বললেন, 'আমার সান্ত্বনার কারণ এটিই যে, তারা বুওয়ায়বের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে; তারা সম্মুখে অগ্রসর হয়ে এগিয়ে গিয়েছে এবং তারা তাতে আমৃত্যু দৃঢ়পদ ছিল। তারা ভীত হয়নি এবং পশ্চাদপসরণও করেনি। আর শহীদরা তো বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। [cite: ৪৩]

মুসান্না তার সৈন্যদের খুব ভালোবাসতেন এবং তিনি তাদের প্রতি সহমর্মী ছিলেন। তাদের অবস্থার খোঁজ-খবর নিতেন। তবে তিনি সামরিক শৃঙ্খলার দিক দিয়ে খুব কঠোর ও দৃঢ়সংকল্প ছিলেন। [cite: ৪৪] একবার তিনি এক সেনাকে খুব আগ্রহের সঙ্গে রণক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে দেখলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তার কী হয়েছে? লোকেরা বলল, 'সে সেতুযুদ্ধে রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। এ জন্য সে এখন অনুতপ্ত এবং যুদ্ধ করার জন্য মরিয়া হয়ে গেছে।' মুসান্না সেনাটিকে বর্শা দিয়ে মৃদু আঘাত করলেন এবং বললেন, 'তোমার সমস্যা কী? তুমি যেখানে আছ, সেখানেই অবস্থান করো। যখন তোমার সমতুল্য কাউকে পাবে, তখন তার ওপর আক্রমণ করো। কোনো কারণ ছাড়াই নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।' সে বলল, 'আমি তা-ই করব।' তারপর সে তার সারিতেই অবস্থান করল এবং স্থির হলো। মুসান্না যেমন তার সৈনিকদের প্রতি সহমর্মী ছিলেন, তেমনি তারাও তার প্রতি সহমর্মী ছিল। তার সৈনিকদের একজনের কবিতা আবৃত্তি থেকে এ বিষয়টি ফুটে ওঠে। সে তার কবিতায় পরিষ্কারভাবে বলে, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ এবং আবু উবাইদা আস-সাকাফি থেকে তার মুসান্নাকেই বেশি পছন্দ। এ কবি ছিল আবদ কাইস গোত্রের। সে বনু শাইবান কিংবা বনু বকর গোত্রের ছিল না। সুতরাং বলা যায় যে, স্বগোত্রের প্রতি তার দুর্বলতা ছিল। [cite: ৪৫] সেনাপতি মুসান্না সামরিক মনস্তাত্ত্বিক বিদ্যায় গভীর জ্ঞানী ছিলেন। শত বছর আগে কোনো এক প্রফেসর এ বিষয়ে একটি চিঠি লিখেছিলেন। [cite: ৪৬]

১.৪.৪। মহিলা মুজাহিদদের ভূমিকা
গনীমতের মাল হিসাবে প্রাপ্ত কিছু খাবার মুসলিম মহিলাদের নিকট পাঠানো হয়। তখন তাদের আচরণ বিশেষভাবে উল্লেখ করার দাবি রাখে। সেনাপতি মুসান্না খাবারগুলো একজন খিষ্টান আরব নেতা আমর ইবনে আব্দুল মাসীহ ইবনে বুকাইলি এবং তার কিছু লোকজনের মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন। মহিলারা যখন তাদের দেখে, তারা ভাবল এরা লুটতরাজ করতে এসেছে। এ জন্য তারা তাদের দিকে পাথর নিক্ষেপ করে নিজেদের সন্তানদের রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে উঠল। আমর ইবনে আব্দুল মাসীহ বললেন, 'মুসলিম বাহিনীর মহিলাদের এমনই হওয়া উচিত।' এই বলে তিনি তাদের বিজয়ের সুসংবাদ প্রদান করেন। [cite: ৪৭]

মহিলাদের এ আচরণ থেকে তাদের যথার্থ ইসলামী শিক্ষার পরিচয় পাওয়া যায়। এতে একজন আদর্শ মুসলমানের চরিত্র কেমন হওয়া উচিত, তারও ইশারা রয়েছে। পুরুষশূন্য পরিবেশে মুসলিম মহিলাদেরও আত্মরক্ষার কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান রাখা উচিত। এই একতরফা বিজয়ের কারণে মুসলমানরা দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ লাভ করে। মুসান্না আশেপাশের এলাকা মুসলিম শাসনের অধীনে আনার জন্য তার সেনাপতিদের প্রেরণ করেন। তারা সেখানে প্রচুর গনীমতের মাল লাভ করেন। এতে তাদের নতুন নতুন এলাকায় জিহাদের পথ সুগম হয়। [cite: ৪৮]

১.৪.৫। পালিয়ে যাওয়া শত্রুদের ধাওয়া
বিজয়ের আনন্দ মুসান্নাকে তার লক্ষ্য অর্জন থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটলে তিনি লোকজনকে পরাজিত বাহিনীকে আস-সাইয়িব পর্যন্ত ধাওয়া করতে নির্দেশ দেন। মুসলমানগণ পালিয়ে যাওয়া শত্রুদের পেছনে ধাওয়া করতে থাকেন। তাদের মধ্যে এমন অনেকেই ছিলেন যারা আবু উবাইদার সেতুযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন; তারা আস-সাবাত এলাকা পর্যন্ত বাড়ি-ঘর তল্লাশি চালায় এবং প্রচুর পরিমাণে গনীমতের মাল হস্তগত করে। তারপর তারা ফিরে এসে মুসান্নার দলে যোগদান করে। সেতুযুদ্ধে পরাজয়ের পর বুওয়াবের যুদ্ধের বিজয় শুধু সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধি করেনি; বরং দুই নদীর (ফোরাত ও দজলা নদী) মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এর আগে তারা ফোরাত নদী পর্যন্ত যুদ্ধ করেছে। তারপর তারা ফোরাত ও দজলা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল বিজয় করেছে। তারা পুরো এলাকায় নির্ভয়ে চলাচলের স্বাধীনতা লাভ করে। [cite: ৪৯] বুওয়াবের যুদ্ধ সিরিয়ার ইয়ারমুকের যুদ্ধের মতোই ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নেয়। [cite: ৫০]

১.৪.৬। পারসিকদের প্রতিক্রিয়া
এ রকম একটি ঘটনা পারস্যের অধিপতিদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না করে পারে না। এতে পারসিক নেতারা জমা হয়ে তাদের দুই সেনাপতি রুস্তম ও ফাইরাযানের সঙ্গে আলোচনা করে। নেতারা বলল, 'তোমরা কেন এত দলে বিভক্ত হয়ে পারসিকদের দুর্বল করে ফেলেছ এবং শত্রুদের সুযোগ করে দিয়েছ? আল্লাহর কসম, তোমাদের মতো সেনাপতিদের জন্যই আমাদের আজ এই দুরবস্থা। তোমরাই পারসিকদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করেছ এবং তাদের শত্রুদের থেকে বিভ্রান্ত করেছ। বাগদাদ, সাবাত এবং তাকরিত শত্রুরা দখল করে নিয়েছে। এখন মাদাইন ছাড়া আর কোনো এলাকা বাকি নেই। আল্লাহর কসম, হয় তোমরা একতাবদ্ধ হবে, আর নতুবা আমাদের দুর্ভাগ্যের কারণে কেউ খুশি হওয়ার আগেই আমরা তোমাদের দিয়েই দুর্ভাগ্যের সূচনা করব। যদি তোমাদের হত্যা করা আমাদের বিপর্যয়ের কারণ না হতো, তাহলে এখনই তোমাদের হত্যা করে ফেলতাম। যদি তোমরা এ কাজ ত্যাগ না করো (বিভক্তি), তাহলে আমরা তোমাদের হত্যা করে ফেলব এবং তোমাদের খুন করে আমরা মনের ক্ষোভ নিরসন করব। [cite: ৫১]

এ ঘটনার পর রুস্তম এবং ফাইরাযান বুরানের নিকট গমন করে এবং তাকে বলে : কিসরা সম্রাটের সকল পত্নী ও উপপত্নী এবং সম্রাটের আত্মীয়দের সকল পত্নী ও উপপত্নীদের আমাদের নিকট আসার জন্য পত্র প্রেরণ করো।' সে তা-ই করল। চিঠি পাঠিয়ে সকলকে আসতে বলল। তারা সবাই এল। তারপর তাদের কোনো একজনের হাতে সোপর্দ করা হলো যাতে তাদের নির্যাতন করে এবং সম্রাটের বংশের কোনো পুত্র সন্তান আছে কি না তা জানার চেষ্টা করে। এ পর্যায়ে তারা ইয়াযদগিরদের সন্ধান পায় যে সম্রাটের ছেলে শাহরিয়ারের ছেলে; তার মা ছিল বাদুরিয়া গোত্রের। তারা লোক পাঠিয়ে ইয়াযদগিরদের মাকে ধরে নিয়ে আসে এবং তার ছেলের সন্ধান চায়। যখন সকল মহিলাকে জমা করা হয়, তখন তার চাচা শিরাওয়াইহ শ্বেত প্রাসাদে অবস্থান করছিল এবং সেখানে অবস্থানরত রাজকীয় লোকদের মধ্যে যত পুরুষ ছিল, সবাইকে সে হত্যা করে; এতে সতের ভাই নিহত হয়। এর কারণ ছিল, যাতে কেউই পারস্যের ক্ষমতা লাভের জন্য প্রতিযোগিতা করতে না পারে। ইয়াযদগিরদের মা ছেলেকে লুকিয়ে তার মামার মাধ্যমে ইসতাখারে পাঠিয়ে দেয়।

শ্বেত প্রাসাদের শিরাওয়াইহ তার আপন ভাই শাহরিয়ারকেও হত্যা করে। সে ছিল কিসরার সম্রাট বারবিযের ছেলে এবং তার মা ছিল শীরীন। এই শাহরিয়ারই ছিল ইয়াযদগিরদের পিতা। তারা ইয়াযদগিরদের মায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং তার অবস্থান বলতে বাধ্য করে। তারপর তারা সম্রাটের বংশধরদের মধ্যে বেঁচে থাকা একমাত্র সন্তান হিসাবে ইয়াযদগিরদকে রাজা মনোনীত করে। তখন তার বয়স ছিল একুশ বছর। পারসিকরা তাকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হয়। সকল পারসিকরা তাকে মেনে নেয় এবং তার নির্দেশ মানার ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। তাকে তারা সাহায্য-সহযোগিতা করতে থাকে। তারা মনে করেছিল, এটিই তাদের সমস্যা থেকে মুক্তি লাভ করার একমাত্র উপায়। [cite: ৫২] ইয়াযদগিরদ সেনাপতি রুস্তম এবং ফাইরাযানের সহায়তায় তার ক্ষমতা প্রয়োগ করা শুরু করে। তারা আল-হিরা, আল-আনবার এবং আল-আবলাহতে নতুনভাবে সীমান্ত চৌকি নির্ধারণ করে এবং প্রতিটি চৌকি পাহারায় ভিন্ন ভিন্ন সেনাদল নিযুক্ত করে। [cite: ৫৩]

১.৪.৭। মুসান্নার প্রতি উমর রা.-এর নির্দেশ
ইয়াযদগিরদের এসব কর্মকাণ্ডের খবর মুসান্নার নিকট পৌঁছে। গুপ্তচরের মাধ্যমে তিনি আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। তিনি এসব বিষয়ে আমীরুল মুমিনীন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অবহিত করেন এবং সম্ভাব্য পাল্টা আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে তার পরামর্শ চান। মুসান্নার এই ধারণা সত্য হতে বেশিদিন লাগেনি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট তার চিঠি পৌঁছার আগেই দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলের অধিবাসীরা কুফরীতে ফিরে যায়, সন্ধি-চুক্তি ভঙ্গ করে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। যিম্মিরা যখন বিদ্রোহ ঘোষণা করে তখন পারসিকরা দ্রুত আক্রমণে তৎপর হয়ে ওঠে এবং যুদ্ধের জন্য অগ্রসর হতে থাকে। মুসান্না এ খবর পেয়ে অনুধাবন করলেন যে, তিনি এত বেশি এলাকা দখল করে ফেলেছেন যা তার সৈন্য-সামন্ত দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন; ফলে সেগুলো হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এ জন্য তিনি যুকার পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রেখে বাকি স্থান থেকে প্রহরী উঠিয়ে নেন এবং সৈন্যরা আ-তাফে এক ক্যাম্পে অবস্থান গ্রহণ করে। [cite: ৫৪]

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আরও বেশি সতর্ক ছিলেন। তিনি চিঠি প্রেরণ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে গিয়ে বললেন, 'পারসিকদের নাগালের মধ্য থেকে বের হয়ে মরুভূমির দিকে চলে আসো। পারসিকদের সীমান্ত এলাকা বরাবর মরুদ্যানে অবস্থান গ্রহণ করো; তোমাদের এবং তাদের সীমান্তের মধ্যে। রাবিআ গোত্রের কাউকে ফেলে এসো না। মুদার গোত্রের কোনো সৈন্য কিংবা অশ্বারোহী এবং তাদের মিত্ররা যেন বাদ না পড়ে। যদি তারা স্বেচ্ছায় আসে, ভালো। আর তা না হলে শক্তি প্রয়োগ করো। তোমাদের ও শত্রুদের সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করতে থাকো যতক্ষণ না পরবর্তী নির্দেশ পাও। [cite: ৫৫]

আল-মুসান্না যুকারে তাঁবু গাড়েন। আর মুসলমানরা আল-জুল এবং শারাফ থেকে গাদা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। [cite: ৫৬] ইরাকের মরুভূমির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত সকল মরুদ্যানেই সৈন্যরা অবস্থান গ্রহণ করে। গাদা থেকে আল-কাতকাতানা পর্যন্ত কিছু চৌকি স্থাপন করা হয় যেখান থেকে তারা একে অন্যকে দেখার সুযোগ পায় এবং যদি কোনো অঘটন ঘটে, তখন প্রয়োজনে একে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারে। এভাবে তারা পর্যবেক্ষণ এবং নতুন অভিযানের অপেক্ষায় প্রহর গুনতে লাগল।

একই সময় পারসিকদের সীমান্ত চৌকিগুলোও সতর্ক অবস্থায় ছিল এবং তারা যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল। তবে তারা মুসলমানদের আক্রমণের ভয়ে ভীত ও সন্ত্রস্ত ছিল। মুসলমানগণ যুদ্ধের জন্য উন্মুখ হয়ে ছিলেন, কিন্তু মুসলিম সেনাপতি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশ অনুযায়ী তাদের বিরত রাখে। তিনি সাহায্য-সৈন্যের অপেক্ষায় থাকেন। ১৩ হিজরীর যিলকদ মাসের শেষ দিকে (জানুয়ারি, ৬৩৫ খ্রি.) এ ঘটনা ঘটে। [cite: ৫৭] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর কসম, আমি আরব নেতৃত্ব দ্বারা অনারব রাজা-বাদশাদের আক্রমণ করব।'

তারপর তিনি সর্বপ্রথম ছোট ছোট গোত্র ও শহরের সেনাপতিদের নিকট চিঠি প্রেরণ করেন। তখন যিলহজ মাস থাকাতে সবাই হজের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মক্কা-মদীনার পথে প্রথমে একটি গোত্র তার নিকট আগমন করে। তাদের অনুসরণ করে আরও অনেক দল ইরাক থেকে যাত্রা করে মদীনার উপকণ্ঠে এসে পৌঁছে। তারা ফেরার পথে মদীনায় খলীফার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং খলীফাকে ইরাকে অবস্থানকারী লোকদের ইতিবৃত্ত অবহিত করে। ইরাকে পৌঁছে তারা মুসান্নার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। মুসলমানদের মধ্যে কোনো নেতা, বিদ্বান, সমাজের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বা ক্ষমতাধর ব্যক্তি কিংবা কোনো খতীব বা কবি—কাউকেই তিনি বাদ দেননি—সবাইকে তিনি পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রেরণ করেন। [cite: ৫৮]

টিকাঃ
২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৬।
৪. আল-ফুতুহু, ইবনে আসাম, ১/১৬৪; আল-আনসার ফিল আসরির রাশিদি, পৃ. ২১৬।
৫. আল-আনসার ফিল আসরির রাশিদি, পৃ. ২১৬।
৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৬।
৭. ইতমামুল ওয়াফা ফি সিরাতিল খুলাফা, পৃ. ৬৫।
৮. প্রাগুক্ত।
৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৯১।
১০. হারকাতুল ফাততিল ইসলামি, শুকরি ফায়সাল, পৃ. ৭২।
১১. আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৮৭।
১২. তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৩৪।
১৩. কাসকার : কুফা এবং বসরার মধ্যবর্তী একটি এলাকা।
১৪. সাকাতিয়া : কাসকারের একটি জেলা।
১৫. তারিখ আত-তাবারি, ৪/২৭২।
১৬. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৩৬।
১৭. তারতিব ওয়া তাহযিব আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ড. মুহাম্মাদ সামিল আস-সুলামি, পৃ. ৮৯।
১৮. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৩৭।
১৯. তারতিব ওয়া তাহযিব আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পৃ. ৯০ (ইফা, ৭/৫৭ দ্রষ্টব্য)।
২০. তারিখ আত-তাবারি, ৪/২৭৯; আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৪১।
২১. তারিখ আত-তাবারি, ৪/২৭৭।
২২. আওয়ামিল আন-নাসর ওয়াল হাযিমাহ, পৃ. ৫৫।
২৩. আত-তারিখ ইলাল-মাদায়িন, পৃ. ৪১৪।
২৪. আওয়ামিল আন-নাসর ওয়াল হাযিমাহ, পৃ. ৫৫।
২৫. আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ. ৪১৪।
২৬. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৪৩।
২৭. আল-হারব আস-নাফসিয়াহ, ড. আহমাদ নওফল, ১/১৬৭।
২৮. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৪৫, ৩৪৬।
২৯. আল-আমলিয়াতু তারিযিয়াতুদ দিফাইয়াহ, নিহাদ আব্বাস, পৃ. ১১৫।
৩০. তারিখ আত-তাবারি, ৪/২৮৮।
৩১. তারিখ আত-তাবারি, ৪/২৮৮।
৩২. প্রাগুক্ত।
৩৩. প্রাগুক্ত।
৩৪. প্রাগুক্ত।
৩৫. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৪৯; তারিখ আত-তাবারি, ৪/২৮৯।
৩৬. তারিখ আত-তাবারি, ৪/২৯০।
৩৭. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৫২।
৩৮. আত-তারিখুল ইসলামী, ১০/৩৫০।
৩৯. প্রাগুক্ত।
৪০. তারিখ আত-তাবারি, ৪/২৮৭; আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ. ৪৪৬।
৪১. তারিখ আত-তাবারি, ৪/২৮৭।
৪২. আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ. ৪৪৬।
৪৩. তারিখ আত-তাবারি, ৪/২৯১।
৪৪. আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ. ৪৪৭।
৪৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪৭।
৪৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪৮।
৪৭. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৫২; তারিখ আত-তাবারি, ৪/২৯২।
৪৮. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৫২।
৪৯. তারিখ আত-তাবারি, ৪/২৯৩।
৫০. তারতিব ওয়া তাহযিব আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া খিলাফা উমর, পৃ. ৯৩।
৫১. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩০০১।
৫২. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩০১; আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ. ৪৬৭।
৫৩. আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ. ৪৬৮।
৫৪. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩০১।
৫৫. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩০১।
৫৬. বসরার দিকে একটি পাহাড়।
৫৭. আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ. ৪৭০।
৫৮. আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ. ৪৭১।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 কাদিসিয়ার যুদ্ধ

📄 কাদিসিয়ার যুদ্ধ


উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন দেখলেন, পারসিকরা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে এবং তারা ইরাকে অবস্থানরত স্বল্পসংখ্যক মুসলিম বাহিনীকে সমূলে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছে, তখন তিনি বাধ্যতামূলকভাবে সৈন্য নিয়োগের আদেশ জারি করেন। কারণ, পরিস্থিতির চাহিদা এ রকমই ছিল। এ জন্য তিনি মুসান্নাকে নির্দেশ দেন, তিনি যেন আশেপাশের গোত্র থেকে যুদ্ধ করতে সক্ষম ব্যক্তিদের তার বাহিনীতে নিয়োগ দেন। এতে যদি কেউ স্বেচ্ছায় আসতে না চায়, তাহলে তাকে যেকোনো উপায়ে বাধ্য করতে হবে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ওই সময়কার পরিস্থিতি সাপেক্ষে এ বাধ্যবাধকতার নীতি জরুরি মনে করেছিলেন এবং তিনিই প্রথম ইসলামে এ আদেশ জারি করেন। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল-আসকারিয়াহ বইয়ের লেখক মুহাম্মাদ ফারায ভুল তথ্য সংযোজন করেছিলেন। কারণ, তিনি লিখেছেন, উমাইয়্যা খেলাফতকালে এ বাধ্যবাকতা আরোপ করা হয়। কিন্তু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-ই প্রথম এ আদেশ দিয়েছিলেন এবং সেটি বাস্তবায়িত হয়েছিল।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশ পেয়েই মুসান্না তা বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠেন এবং খলীফার পরিকল্পনা অনুযায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অন্যান্য প্রদেশের গভর্নরদের নিকট চিঠি প্রেরণ করে তাদের অধীনদের মধ্যে যাদের কাছে অস্ত্র, ঘোড়া রয়েছে এবং যারা দৈহিকভাবে সক্ষম বা বিদ্বান ব্যক্তি, তাদের সবাইকে ইরাকে মুসান্নার নিকট প্রেরণ করার নির্দেশ দেন। তিনি তাদের যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য করতে আদেশ দেন এবং ইরাকে নিয়োগ দিতে বলেন। [cite: ৫৯]

ইয়াযদগিরদ শাসনক্ষমতা বুঝে নেওয়ার পরই পারস্যের অবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। তাদের অবস্থা ছিল নিম্নরূপ :

১। ইয়াযদগিরদকে রাজা হিসাবে নিয়োগ দেওয়ার পরই পারস্যের আভ্যন্তরীন বিশৃঙ্খলা স্থিতিশীল হয় এবং তাকে কেন্দ্র করে লোকজন ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। পারসিকদের মনোবল ও শক্তি বৃদ্ধি পায়।
২। রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ ইয়াযদগিরদকে মেনে চলার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা শুরু করে এবং তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে থাকে। তারা সাধারণ ঘোষণার মাধ্যমে সকল যুবককে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করে; তারা মুসলমানদের দখলকৃত এলাকাসমূহে বিভিন্ন সৈন্যদল প্রেরণ করে।
৩। পরিশেষে তারা সকল গ্রাম, মহল্লা ও জনপদের লোকজনকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে থাকে। এতে তারা মুসলমানদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করে, মুসলমানদের নিরাপত্তা প্রত্যাহার করে এবং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। [cite: ৬০]

তখন মুসলমানদের অবস্থাও পরিবর্তিত হয় এবং তা ছিল নিম্নরূপ :

১। মুসান্না এবং তার অন্যান্য সেনাপতিরা ইরাকের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুসলমানদের সরিয়ে আনে এবং বিজিত এলাকাসমূহ ছেড়ে দেয়।
২। মুসলমানগণ আরব এবং ইরাকের সীমান্তে মরুভূমির মরুদ্যানে ছড়িয়ে পড়ে। মুসান্না যুকারে তাঁবু গাড়েন এবং অন্যান্য সেনারা আত-তাফে অবস্থান গ্রহণ করেন। তারা ইরাকে এমনভাবে সামরিক চৌকি স্থাপন করেন যেন একে অন্যকে দেখতে পান এবং বিপদে সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারেন।
৩। পারসিকদের বাধ্যতামূলভাবে সৈন্য নিয়োগের সঙ্গে মুসলমানদের বাধ্যতামূলক নিয়োগ সৈন্যসংখ্যায় ভারসাম্য নিয়ে আসে। [cite: ৬১]

২.১। ইরাকের সেনাপতি হিসাবে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.-কে নিয়োগ
এটি ছিল ইরাক বিজয়ে অভিযানের তৃতীয় ধাপ। আর এর শুরু হয় ইরাকে জিহাদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য মুসলিম সামরিক বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগদানের মধ্য দিয়ে। এটি ১৪ হিজরীর ঘটনা। পারসিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার আহ্বান জানিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ওই বছরের সূচনা করেছিলেন। মুহাররম মাসের প্রথম দিনেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিশাল এক সেনাবাহিনী নিয়ে মদীনা থেকে যাত্রা করেন এবং সিরার নামক এক জলাশয়ের নিকট গিয়ে তারা যাত্রাবিরতি করেন। [cite: ৬২] তিনি সেখানে তাঁবু গাড়েন। খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সশরীরে ইরাকীদের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করার পরিকল্পনা করেন। মদীনায় তার অনুপস্থিতিতে শাসনভার আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট অর্পণ করেন এবং উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু-সহ নেতৃস্থানীয় সাহাবাদের সঙ্গে নেন। নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত করার জন্য তিনি সাহাবীগণের উপস্থিতিতে এক পরামর্শ- সভার ব্যস্থা করেন। সভার দাওয়াত দিতে গিয়ে বলা হয়—আসসালাতু জামিআতুন (নামাযের জামাত অনুষ্ঠিত হবে)।

ইতিমধ্যে মদীনায় আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দাওয়াত দেওয়া হয়। তিনি মদীনা থেকে পরামর্শ-সভায় যোগ দেন। সকলে মিলে উদ্ভূত পরিস্থিতি ও তা মোকাবিলা করার বিষয়ে পরামর্শ করেন। আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রাযিয়াল্লাহু আনহু ব্যতীত সকলে একমত হন যে, খলীফা স্বয়ং ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন। আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি আশঙ্কা করছি, আল্লাহ না করুন, যদি যুদ্ধে আপনি নিহত হন, তাহলে সকল অঞ্চলের মুসলমান মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। তাদের মধ্যে সামগ্রিকভাবে হতাশা নেমে আসবে। আমি মনে করি, আপনার স্থলে অন্য কাউকে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়ে আপনি মদীনায় ফিরে যান।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সহ অন্যান্যরা আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথায় একমত পোষণ করলেন। তারপর তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনি সেনাপতি হিসাবে কাকে ইরাকে পাঠানো উচিত বলে মনে করেন?' আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাব দেন, 'আপনি ইতিমধ্যে তাকে পেয়ে গেছেন।' তখন তিনি বলেন, 'কে সেই লোক?' তিনি বললেন, 'সেই লোক হলেন আক্রমণে সিংহ-পুরুষ সাদ ইবনে মালিক যুহরী রাযিয়াল্লাহু আনহু (সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু)।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ প্রস্তাব পছন্দ করলেন। ইরাক অভিযানে তিনি তাকে সেনাপতি নিয়োগ করলেন। [cite: ৬৩]

২.১.১। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.-এর প্রতি খলীফার উপদেশ
যখন সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনায় আগমন করেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে ইরাকে সামরিক অভিযানে সেনাপতি নিয়োগ করেন এবং তাকে বলেন:

হে সাদ, আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাতুল গোত্রীয় ও তার সাহাবী এই মর্যাদা যেন আপনাকে মহান আল্লাহ সম্পর্কে ধোঁকায় না ফেলে। কারণ, আল্লাহ তা'আলা মন্দ দ্বারা মন্দ মোচন করেন না; বরং ভালো দ্বারা মন্দ মোচন করেন। একমাত্র পূর্ণ আনুগত্য ব্যতীত মহান আল্লাহর সাথে কারও কোনো বংশীয় সম্পর্ক নেই। আল্লাহর দৃষ্টিতে অভিজাত ও সাধারণ সকল মানুষ সমান। আল্লাহ সকলের মালিক, সবাই তার বান্দা। সততার গুণে তাদের মর্যাদার তারতম্য হয়। আনুগত্যের মাধ্যমে তারা আল্লাহর নিয়ামত অর্জন করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত-প্রাপ্তি থেকে শুরু করে আমাদের থেকে তাঁর বিদায় গ্রহণ পর্যন্ত তার নীতিমালা আপনি পর্যালোচনা করে অবশ্যই তার অনুসরণ করবেন। কারণ, মূলত ও প্রকৃত কর্ম তা-ই। এটি আমার পক্ষ থেকে আপনার জন্য উপদেশ। আপনি যদি তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং তা বর্জন করেন, তবে আপনার সকল কর্ম বিনষ্ট হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের দলভুক্ত হবেন। [cite: ৬৪]

একজন মহান ও বিজ্ঞ খলীফার পক্ষ থেকে এটি একটি চমৎকার উপদেশ। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দুর্বল বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন, যা সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে কাবু করতে পারে। তিনি চিন্তা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারেন এবং এতে হয়তো তার মনে অন্যান্য মুসলমানদের তুলনায় অহংকার দানা বাঁধতে পারে। এ জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে ইসলামের শাশ্বত নীতি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, দুনিয়ায় একজন মুসলমানের সম্মানের কারণ হচ্ছে—যেমন তাদের প্রতিপালক আল্লাহ বলেছেন এবং তারা তার বান্দা—এটাই চরম সত্য এবং তারা আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমেই তা অর্জন করতে পারে। অন্তরের পরিশুদ্ধতাই আনুগত্যের সর্বোচ্চ মাধ্যম। তিনি যেন বলছেন, গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর আনুগত্যের কারণেই মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা যায়। এটাই তাকওয়া (খোদাভীতি)। আল্লাহ মানুষের জন্য এটাকেই সম্মানের মানদণ্ড হিসাবে সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ বলেন,

يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْتُكُمْ شُعُوبًا وَقَبَابِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقُكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
হে মানব, আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হও। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সে-ই সম্ভ্রান্ত, যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন। [cite: ৬৫]

এটি ন্যায়সংগত এবং বরকতময় মানদণ্ড, যা প্রত্যেক মুসলমানই আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখেরাতের সুখ-শান্তি লাভের জন্য চেষ্টা করে অর্জন করতে সক্ষম। বক্তব্যের শেষ দিকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন যা সম্পূর্ণ দ্বীনকেই অনুসরণ এবং তা লোকদের ওপর প্রয়োগ করার শামিল। [cite: ৬৬]

২.১.২। অন্যান্য উপদেশ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আরও কিছু উপদেশ দেন। তিনি বলেন :

আমি আপনাকে ইরাকে যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য সেনাপতি নিয়োগ করেছি। সুতরাং আমার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনুন। আপনি একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন এবং সত্যের ওপর অটল থাকা ছাড়া সেখান থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। নিজেকে এ জন্য প্রস্তুত করুন। আপনার সঙ্গীদের ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করুন। ভালো কাজ দিয়েই সবকিছু শুরু করুন এবং জেনে রাখুন, ভালো অভ্যাস তৈরি করার উপায় রয়েছে। আর এ উপায় হচ্ছে ধৈর্যধারণ করা। আপনার ওপর আপতিত সকল বিপদ ও ঘটনায় যদি ধৈর্যধারণ করতে পারেন, তাহলে আপনি আল্লাহর ভয় অর্জন করতে সক্ষম হবেন। জেনে রাখুন, দুটি বিষয়ে মহান আল্লাহর ভয় রাখতে হয়। তার আনুগত্যে এবং তার অবাধ্যতা বর্জনে। দুনিয়াকে অবজ্ঞা করে আখেরাতের মহব্বতে যে তার আনুগত্য করেছে, সেটিই প্রকৃত আনুগত্য। দুনিয়ার মহব্বতে আখেরাতের অবজ্ঞায় যে তার অবাধ্য হয়েছে সেটিই প্রকৃত অবাধ্যতা। অন্তরসমূহের কিছু হাকীকত ও সত্য উপলব্ধি করার ক্ষমতা আছে। আল্লাহ তা'আলা সেগুলো সৃষ্টি করে দেন। গোপনীয়তা ও প্রকাশ্য সেগুলোর অন্তর্ভুক্ত। প্রকাশ্য হলো সত্যের অনুসরণে তার প্রশংসাকারী ও সমালোচনাকারী তার নিকট সমান। আর গোপনটি উপলব্ধি করা যায় তার অন্তর থেকে মুখের মাধ্যমে হিকমত ও প্রজ্ঞা প্রকাশের মাধ্যমে, তার প্রতি গণ-মানুষের মহব্বতের মাধ্যমে এবং মানুষের প্রতি তার মহব্বতের মাধ্যমে। সুতরাং মানুষের প্রতি মহব্বত স্থাপনে কমতি ও কার্পণ্য করবেন না। সকল নবী মানুষের মহব্বত প্রাপ্তি কামনা করেছেন। আল্লাহ তা'আলা যখন কাউকে ভালোবাসেন তখন সকলের ভালোবাসার পাত্র বানিয়ে দেন। আর তিনি কাউকে ঘৃণা করলে তাকে সকলের ঘৃণার পাত্র বানিয়ে দেন। সুতরাং মানুষের নিকটআপনার অবস্থানের নিরিখে আল্লাহর নিকট আপনার অবস্থান মূল্যায়ন করুন। [cite: ৬৭]

এ বক্তব্য থেকে অনেকগুলো শিক্ষা লাভ করা যায়। নিচে এর কয়েকটি উল্লেখ করা হলো :

১। সত্যকে আঁকড়ে থাকলে মুসলমানগণ বিপদাপদ থেকে রক্ষা পেতে পারেন। কারণ যে সত্যের পথে অবিচল থাকে, সে তো আল্লাহর সঙ্গেই রয়েছে। আর যে আল্লাহর সঙ্গে থাকে, আল্লাহ তার জন্য সাহায্য ও করুণা বর্ষণ করেন। এ অনুভূতি মুসলমানদের অন্তরে বিপদ ও কঠিন সময় মোকাবিলা করার স্পৃহাকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেবে। আর কথা ও কাজে যে সত্যকে অনুসরণ করবে, সে অন্তরে শান্তি অনুভব করবে। যে কিনা সত্রপথ থেকে বিচ্যুত হয়, তার পরিণতি হবে এর বিপরীত। তার অন্তর বিষাদ ও দুর্ভোগে অস্থির হয়ে উঠবে। যেমন : অপরাধী মানসিকতা তাকে ঘিরে ধরবে এবং লোকজনের ভয়ে সে তটস্থ থাকবে। এর সঙ্গে সত্য থেকে বিমুখ হওয়ায় অজানা পরিণতির আশঙ্কায় ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে।
২। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, সদগুণ অর্জন করার উপায় হচ্ছে ধৈর্যধারণ করা। কারণ সদগুণ অর্জনের পথ কার্পেটে মোড়া নয়, বরং বন্ধুর ও কণ্টকাকীর্ণ। এ পথে সফর করতে অনেক মুজাহাদার প্রয়োজন পড়ে। সুতরাং যে এ বিপদসংকুল পথে সফর করতে চায়, তাকে অবশ্যই ধৈর্যধারণ করতে হবে। নতুবা সে মাঝপথেই থেমে যাবে।
৩। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন যে, আল্লাহর ভয় মানে তার আনুগত্য এবং তার অবাধ্যতা বর্জন। তারপর তিনি ওই বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করেন যা তাকে এই ভয় অর্জনে উৎসাহিত করবে। আর তা হলো দুনিয়াকে অবজ্ঞা করা এবং আখেরাতকে ভালোবাসা। যা মানুষকে আল্লাহর অবাধ্যতায় বাধ্য করে, তা হলো, আখেরাতকে অবজ্ঞা করে দুনিয়ার ভালোবাসায় মেতে ওঠা।
৪। তারপর তিনি ঈমানী শক্তিতে উজ্জীবিত অন্তরের চিহ্ন বর্ণনা করেন। এ জন্য তিনি মানুষের আচরণের উদাহরণ দেন; যখন সত্যকে আঁকড়ে থাকার কারণে কেউ তার প্রশংসা বা সমালোচনা করে, তখন তার কি অনুভূতি হয় কারও প্রশংসায় সে প্রশংসাকারীকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে সত্য থেকে বিচ্যুত হন না। আবার সমালোচকদের সঙ্গে মন্দ আচরণও করেন না।

৫। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আরও বলেন, অন্তরের গোপন ঈমানের পরিচয় পাওয়া যায় তার মুখে হিকমত ও প্রজ্ঞা প্রকাশের মাধ্যমে, তার প্রতি মানুষের মহব্বত এবং মানুষের প্রতি তার মহব্বতের মাধ্যমে। কোনো বান্দার প্রতি আল্লাহর ভালোবাসা দুনিয়াতে তার প্রতি অন্যান্য মুসলিম ভাইদের ভালোবাসার সঙ্গে সম্পর্কিত; আল্লাহ তা'আলা যখন কাউকে ভালোবাসেন তখন তাকে সকলের ভালোবাসার পাত্র বানিয়ে দেন। [cite: ৬৮]

৬। যদি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট থেকে জান্নাতী হওয়ার সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য এ রকম উপদেশের প্রয়োজন হয়, তাহলে আমাদের উপায় কী হবে—যারা ইসলাম সম্পর্কে খুব কমই জ্ঞান রাখে এবং তা অনুসরণে চরম দুর্বলতার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে? [cite: ৬৯]

২.১.৩। উমর রা.-এর খুতবা
চার হাজার (অন্য বর্ণনায় ছয় হাজার) মুজাহিদ নিয়ে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ইরাকে গমন করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরার থেকে আওয়াস [cite: ৭০] পর্যন্ত তাদের এগিয়ে দেন। সেখানে সৈনিকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, 'মহান আল্লাহ আপনাদের জন্য উদাহরণ বর্ণনা করেছেন এবং আপনাদের জন্য বাণী প্রদান করেছেন যাতে অন্তরগুলো জীবন্ত হয়। কারণ মহান আল্লাহ যতক্ষণ পর্যন্ত বক্ষে থাকা অন্তর জীবিত না করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তা মৃতই থাকে। যে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছে, তা দ্বারা কল্যাণ অর্জন করা দরকার। কারণ ন্যায়পরায়ণতার কতক চিহ্ন ও কতক সৌন্দর্য রয়েছে। চিহ্নগুলো হলো লজ্জা, দানশীলতা, বিনয় ও নম্রতা, আর সৌন্দর্য হলো দয়া ও করুণা। মহান আল্লাহ সকল বিষয়ের জন্য দরজা সৃষ্টি করেছেন। সকল দরজা খোলার চাবি সহজলভ্য করে দিয়েছেন। ন্যায়পরায়ণতার দরজা হলো বিবেচনা-শক্তি ও শিক্ষা গ্রহণ, আর তার চাবি হলো সংযম ও আত্ম-নিয়ন্ত্রণ। শিক্ষা গ্রহণ হলো মৃত্যুর কথা স্মরণ করা এবং ধন-সম্পদ প্রেরণ করে তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। সংযম হলো সত্যগ্রহণকারীর নিকট সত্য অর্জন করা এবং সংসার ধর্ম পালনের জন্য ঠিক যতটুকু পার্থিব বস্তু দরকার, ততটুকুতে তুষ্ট থাকা। প্রয়োজন পরিমাণ বস্তু যাকে তুষ্ট করতে না পারে কোনো কিছুই তাকে তৃপ্ত করতে পারবে না। মহান আল্লাহ আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন যাতে তার নিকট কারও আহাজারি করতে না হয়। সুতরাং আপনাদের দুঃখ-কষ্টের কথা আমাকে জানাবেন। কেউ যদি সরাসরি আমার নিকট আসতে সক্ষম না হয়, তাহলে এমন কারও নিকট পেশ করবে যে তা আমার নিকট পৌঁছে দিবে। তাহলে বিনাকষ্টে আমরা তার অধিকার তাকে ফিরিয়ে দেব। [cite: ৭১]

২.১.৪। ইরাকে সাদ রা.-এর উপস্থিতি এবং মুসান্নার ইন্তেকাল
সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ইরাকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। তিনি নাজদ অঞ্চলে জারুদ [cite: ৭২] এলাকায় পৌঁছে যাত্রা বিরতি করলেন। খলীফা অতিরিক্ত চার হাজার সৈন্য পাঠিয়ে মুসলিম বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করলেন এবং সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নাজদ অঞ্চল থেকে আরও সাত হাজার সৈন্য দলে অন্তর্ভুক্ত করলেন। ইরাকে বারো হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে মুসান্না ইবনে হারিসা তার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন।

সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যারূদে অবস্থান করেন। পারসিকদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াই করার প্রস্তুতি নিতে থাকেন এবং খলীফার নির্দেশের অপেক্ষা করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ যুদ্ধের ব্যাপারে খুবই সতর্ক ছিলেন। তিনি শহরের কোনো বিদ্বান ব্যক্তি, সেনাপতি, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, ক্ষমতাধর, বক্তা বা কবি—কাউকেই বাদ দেননি—সবাইকে পারসিকদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছেন। তিনি সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও শক্তিশালী লোকদের তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছেন। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং তার বাহিনী যারূদে অবস্থানকালীন মুসান্না গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বর্ণনাকারী বলেন, সেতুযুদ্ধে তিনি মারাত্মকভাবে যখম ও আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। সেই ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। তিনি বুঝতে পারলেন যে, তার বিদায়ের সময় ক্ষনিয়ে এসেছে। ব্যথা খুব বেড়ে গেলে তিনি বশীর ইবনে খাসাসিয়্যাহকে তার স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেন। মুসান্না তার ভাই মুআন্নাকে কাছে ডাকেন। তাকে তার শেষ অসিয়ত করেন এবং সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এ খবর পৌঁছে দিতে বলেন। তারপর মুসান্না তাঁর পরম সৃষ্টিকর্তার নিকট তাঁর আত্মাকে সমর্পণ করেন। ইরাক বিজয়ে যে সূর্য তীব্র আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছিল, পরিশেষে তা অস্ত গেল। [cite: ৭৩]

সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি সর্বশেষ উপদেশ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ইসলামের শত্রুরা যখন পুরোপুরিভাবে তাদের সীমানার ভেতর প্রস্তুতি গ্রহণ করবে, তখন তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন না; বরং তাদের সীমান্ত এলাকায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হবেন যা কিনা আরব ভূমির নিকটবর্তী এবং পারস্যের রিফিউজি এলাকারও নিকটবর্তী। যদি আল্লাহ মুসলমানদের বিজয় দান করেন, তাহলে তারা তাদের পেছনের সব ভূমিই দখল করে নিতে পারবে। আর যদি যুদ্ধের ফলাফল এর বিপরীত হয়, তাহলে তারা পিছু হটতে পারবে এবং অন্যান্য মুসলমানদের সঙ্গে এসে যোগ দিতে পারবে। তখন তাদের পথ-ঘাট সম্পর্কে ভালো ধারণা তৈরি হবে এবং নিজের ভূমিতে তারা আরও বেশি সাহসী হয়ে উঠবে যতক্ষণ না আল্লাহ তাদের পক্ষে ফায়সালা করেন। [cite: ৭৪]

আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শেষ মুহূর্তের সঙ্গে মুসান্না বিদায়ের মুহূর্তের কি আশ্চর্য মিল! উভয়ে জীবনের শেষ মুহূর্তে মুসলমানদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করেছেন এবং বিজয় অভিযানের ব্যাপারে উপদেশ দিয়েছেন। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুর সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে উপদেশ দিয়েছেন এবং ইরাক বিজয়ের ব্যাপারে লোকজনকে উৎসাহ দিয়েছেন। আর মুসান্নাও তাঁর ইন্তেকালের পূর্ব মুহূর্তে পারসিকদের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ইরাক অভিযানে পরবর্তী সেনাপতি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি ব্যক্ত করছেন। তিনি তাঁর শেষ নিশ্বাস নেওয়ার সময় চিন্তা করছেন, পরিকল্পনা করছেন এবং সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পরামর্শ দিচ্ছেন। [cite: ৭৫]

মুসান্না ইবনে হারিসার মৃত্যু সংবাদ এবং তাঁর দেওয়া পরামর্শ শুনে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর জন্য মাগফেরাতের দুআ করেন। তারপর তিনি তাকে সেখানেই দাফন করতে এবং তার পরিবারের দেখভাল করার নির্দেশ জারি করেন। [cite: ৭৬] প্রসংগত উল্লেখ্য, ইন্তেকালের পূর্বে মুসান্না তার স্ত্রী সালমা বিনতে খাসফাহ আত-তাইমিয়াকে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে বিবাববন্ধনে আবদ্ধ হতে নির্দেশ দিয়ে যান। ইদ্দতকালীন সময় শেষ হলে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন এবং তাকে বিয়ে করেন। এখানে দুটি প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে।

প্রথমটি হচ্ছে, ইসলামের একজন মহান বীর—যার সম্পর্কে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন—সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে বিবাববন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অনুমতি দিয়ে মুসান্না কি তার স্ত্রীর প্রতি অনুগ্রহ করেছেন? আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, তিনি কি তার স্ত্রীর মেধা, প্রজ্ঞা ও স্বামীর যুদ্ধ-অভিজ্ঞতার জ্ঞান থেকে মুসলিম উম্মতের উপকারের কথা চিন্তা করে এর অনুমতি দিয়েছিলেন? দুটিই হতে পারে। এটি মহান ব্যক্তিদের অনন্য গুণাবলির সামান্য একটি দৃষ্টান্তমাত্র। [cite: ৭৭]

২.১.৪। ইরাকে সাদ রা.-এর অভিযান এবং উমর রা.-এর উপদেশ
খলীফার পক্ষ থেকে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি যারূদ ত্যাগ করে ইরাক অভিমুখে চূড়ান্ত লড়াইয়ের নির্দেশ এল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন :

আমি আপনাকে এবং আপনার অধীন সব সৈন্যদের সব পরিস্থিতিতে আল্লাহকে ভয় করার আদেশ করছি। কারণ, শত্রুর বিরুদ্ধে আল্লাহর ভয়ই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। আমি আপনাকে এবং আপনার অধীন সব সৈন্যদের শত্রুকে এড়ানোর চেয়ে গোনাহকে বেশি এড়িয়ে চলার আদেশ করছি। কারণ, শত্রুর চেয়ে গোনাহকে বেশি ভয় করা উচিত। শত্রুর কুফরীই মুসলমানদের প্রতি আল্লাহর সাহায্যের মূল কারণ। যদি তা না হতো, তাহলে আমরা এত সামর্থ্য অর্জন করতে পারতাম না। কারণ, আমাদের সংখ্যা শত্রুদের মতো নয় এবং আমাদের অস্ত্রও তাদের মতো নয়। যদি উভয়ের গোনাহের পরিমাণ সমান হতো, তাহলে শত্রুরাই আমাদের ওপর বিজয়ী হতো। আর যদি সৎ গুণাবলির দিক দিয়ে আমরা তাদের চেয়ে অগ্রগামী না হতাম, তাহলে আমরা আমাদের শক্তি দিয়ে তাদের পরাজিত করতে পারতাম না।

মনে রাখবেন, আপনাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রহরী নিযুক্ত রয়েছে। তারা জানে, যা আপনারা করছেন। সুতরাং তাদের সামনে লজ্জা করা উচিত এবং কোনোভাবেই আল্লাহর অবাধ্য হবেন না। আপনারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জিহাদ করছেন; এ কথা বলবেন না যে, শত্রুরা আমাদের থেকে নিকৃষ্ট এবং আমরা গোনাহ করলেও তারা কখনো আমাদের ওপর বিজয়ী হতে পারবে না। নিকৃষ্ট লোকেরাও কখনো কখনো বিজয়ী হতে পারে, যেমন বনী ইসরাইল আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার কারণে অগ্নিপূজকদের কাছে পরাজিত হয়েছিল। আল্লাহ বলেন,

فَجَاسُوا خِلْلَ الدِّيَارِ وَكَانَ وَعْدًا مَّفْعُولًا
অতঃপর তারা প্রতিটি জনপদের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ল। এ ওয়াদা পূর্ণ হওয়ারই ছিল। [cite: ৭৮]

শত্রুদের বিরুদ্ধে আপনারা যেমন আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন, ঠিক তেমনি নিজেদের নফসের মন্দ চাহিদা ও প্রতারণা থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করুন। আমি নিজের জন্য, আপনাদের জন্য এবং সকলের জন্য এ বিষয়ে আল্লাহর সাহায্য কামনা করছি। সফরে দলের সকল সদস্যদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন। যাত্রাপথে তাদের বেশি কষ্ট দেবেন না যেন তারা শত্রুর নিকটবর্তী হতেই দুর্বল হয়ে না পড়ে। তারা এমন এক শত্রুদলকে মোকাবিলা করতে যাচ্ছে যাদের সফরের প্রয়োজন নেই এবং তাদের রয়েছে শক্তিশালী ঘোড়া ও যোদ্ধা। আপনার এবং আপনার অধীন সব সৈন্যদের সপ্তাহে একদিন বিশ্রাম নেওয়া উচিত, যাতে সবাই পুনরায় শক্তি অর্জন করতে পারে, নিজেদের অস্ত্র ও মালামাল গুছিয়ে নিতে পারে।

এমন কোনো জনবসতির নিকট যাত্রাবিরতি করবেন না যারা আমাদের সঙ্গে সন্ধি-চুক্তিতে বা নিরাপত্তায় রয়েছে। আর তাদের কারও সঙ্গে আপনার অধীন কর্তব্যপরায়ণ ও একনিষ্ঠ ব্যক্তি ছাড়া অন্য কাউকে মেলামেশার সুযোগ দেবেন না। কোনো জনবসতির লোকদের উত্ত্যক্ত করবেন না। কারণ, তাদের নিরাপত্তা বিধান ও সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়ন আপনাদের জন্য পরীক্ষা। ঠিক তাদের জন্য এ চুক্তির প্রতি ধৈর্যশীল থাকাও পরীক্ষা। যতক্ষণ তারা আপনাদের প্রতি তাদের ওয়াদা রক্ষা করে চলবে, আপনিও তাদের প্রতি আপনার ওয়াদা রক্ষা করে চলবেন। যাদের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে, তাদের নির্যাতন করে শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ের আশা করবেন না।

শত্রুর কাছকাছি পৌঁছে গুপ্তচর প্রেরণ করবেন। তাদের কর্মকাণ্ডের কোনোকিছুই যেন আপনার নিকট গোপন না থাকে। এ কাজে আরব এবং স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে যারা বিশ্বস্ত, তাদের প্রেরণ করবেন। কারণ, মিথ্যাবাদীর সংবাদ আপনার কোনো উপকারে আসবে না যদিও সে মাঝে মাঝে সত্য বলে ফেলে। অসৎ লোকেরা আপনার গুপ্তচর হতে পারে না; বরং তারা আপনার বিরুদ্ধে কাজ করবে। শত্রুদলের খুব নিকটে পৌঁছে গেলে আপনি অগ্রগামী ও সহসা আক্রমণকারী দল প্রেরণ করবেন যাতে তারা শত্রুর রসদ সরবরাহ লাইন কেটে দিতে পারে এবং তাদের দুর্বল পয়েন্ট বের করতে পারে। অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী ব্যক্তিদের এ কাজে নিযুক্ত করবেন এবং তাদের দ্রুতগামী ঘোড়া সরবরাহ করবেন। যদি তারা শত্রুর দেখা পায়, তাহলে তাদের পরামর্শের ভিত্তিতে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই সর্বোত্তম। মুজাহিদ, ধৈর্যশীল ও নির্ভীক লোকদের এসব আক্রমণকারী দলে নিয়োজিত করবেন এবং এ কাজে নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দেবেন না। তাহলে এটি পুরো বাহিনীর ওপর প্রভাব ফেলবে এবং দুর্যোগ বয়ে নিয়ে আসবে।

এমন কোনো জায়গায় এসব অগ্রগামী ও সহসা আক্রমণকারী দল প্রেরণ করবেন না যেখানে তাদের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠবে। যদি আপনি শত্রুদের দেখতে পান, তাহলে তাদের ফিরিয়ে আনবেন। বাধ্য না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করবেন না; বরং এ-সময় তাদের সবচেয়ে দুর্বল দিক এবং রণক্ষেত্রের পরিবশে-পরিস্থিতি সম্পর্কে স্থানীয় লোকদের মতো জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করবেন। যদি কোনো বন্দীকে আপনার নিকট আনা হয় যার ব্যাপারে মুসলমানদের কোনো চুক্তি নেই, তাহলে তাকে হত্যা করবেন যেন আপনাদের ও আল্লাহর শত্রুদের মনে ভীতির সৃষ্টি হয়। আল্লাহই আপনাদের সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক; তিনিই শত্রুর বিরুদ্ধে আপনাদের বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং আমরা আল্লাহর সাহায্যই কামনা করি। [cite: ৭৯]

প্রয়োজনীয় উপদেশবাণীতে সমৃদ্ধ এটি একটি মহান বক্তৃতা এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মহত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক— সমর-পরিকল্পনায় তাঁর সবিশেষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। এর প্রতিটি আদেশ ও নির্দেশে মহান আল্লাহ তা'আলার প্রত্যক্ষ সাহায্য ও অনুগ্রহ দৃশ্যমান। [cite: ৮০] আমরা এই বক্তৃতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নীতিমালা বের করতে পারি যা নিচে দেওয়া হলো।

১। সেনাবাহিনীকে আল্লাহকে ভয় করার এবং সকল পরিস্থিতিতে তাঁর প্রতি একনিষ্ঠ থাকার জন্য আদেশ দেওয়া হয়েছে। মুসলমানদের জন্য এটিই হচ্ছে প্রথম অস্ত্র এবং গোনাহ হচ্ছে প্রথম শত্রু। তারপর কাফেরদের দ্বিতীয় শত্রু হিসাবে গণ্য করতে বলা হয়েছে। তারপর তিনি এদিকে ইশারা করেন যে, ফেরেশতারা মুসলিম বাহিনীর ওপর সর্বক্ষণ দৃষ্টি রাখছে এবং গোনাহ করার ব্যাপারে তাদের লজ্জা করা উচিত। কারণ, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জিহাদ করতে গিয়ে রণক্ষেত্রে গোনাহ করার কোনো মানে হয় না। এটা কখনো সঠিক নয় যে, শত্রুর আচরণের সঙ্গে তুলনা করে মুসলিম বাহিনীর আচার-আচরণ বিচার করা। প্রতিমুহূর্তে আল্লাহর সাহায্য কামনা করা প্রয়োজন—এটিও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

২। প্রতিক্ষণে আল্লাহর ধ্যানে থাকা; জনবসতির লোকজনের সঙ্গে কৃত চুক্তি কিংবা তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও মুসলমানরা যেন তা ভঙ্গ না করে। মুসলমানদের ব্যাপারে কোনো মন্দ ধারণা যেন ছড়িয়ে না পড়ে, যাতে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে মানবিক বোধ ও সংবেদনশীলতায় কোনো ছেদ না পড়ে। এতে প্রয়োজনে মন্দ আচরণের জন্য অভিযুক্ত মুসলিম ব্যক্তিকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

৩। এ নীতি বাস্তবায়নের জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সেনাপতিকে এ আদেশ দেন যে, এমন পদ্ধতি ও উপায় অবলম্বন করতে হবে যাতে সৈনিকদের মনোবল দৃঢ় থাকে এবং রণক্ষেত্রে পৌঁছার পরও তাদের শক্তি-সামর্থ্য অটুট থাকে। তিনি বলেন, ‘সফরে দলের সকল সদস্যদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন যাতে সবাই পুনরায় শক্তি অর্জন করতে পারে, নিজেদের অস্ত্র ও মালামাল গুছিয়ে নিতে পারে।' মুসলিম বাহিনীর সৈনিক ও অস্ত্র- শস্ত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও রক্ষা করার ব্যাপারে গুরুত্বারোপের পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধের দিকে ইশারা করেন। তিনি কথা ও কাজের ভারসাম্য বজায় রেখে সঠিক ইসলামী আচরণে আবির্ভূত হওয়াকে মুসলিম বাহিনীর জন্য সর্বোত্তম একটি অস্ত্র হিসাবে সাব্যস্ত করেন। সতর্কতা হিসাবে তিনি এমন কোনো জনপদের নিকট তাঁবু গাড়তে নিষেধ করেন, যাদের সঙ্গে মুসলমানদের চুক্তি রয়েছে। ফলে যেকোনো বাড়াবাড়ির আশঙ্কাকে-যা সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় বাধা হতে পারে-এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এ জন্য বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কাউকে এসব জনপদে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না, যেন চুক্তির শর্তসমূহ লঙ্ঘিত না হয় এবং তারাও এর প্রতি একনিষ্ঠ থাকতে পারে।

৪। সম্পর্কের প্রকারভেদে লোকদের সঙ্গে আচরণের পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে এবং তাদের ওপর সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো বোঝা চাপানো যাবে না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সেনাপতিকে এ নির্দেশ দেন যে, শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে আনতে গিয়ে মুসলমানদের সঙ্গে যাদের চুক্তি রয়েছে, তাদের কারও প্রতি যেন অসদাচরণ কিংবা নির্যাতন করা না হয়। আর বিশ্বস্ত মনে করে বিজিত অঞ্চলের নিকটবর্তী কোনো অঞ্চল বা লোকদের সাহায্য গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে সেনাপতিকে নির্দেশ দিয়েছেন; তিনি যেন সম্পূর্ণ আস্থা অর্পণ করার ব্যাপারে সতর্ক থাকেন এবং বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে প্রান্তিকতা অবলম্বন না করেন।

৫। চৌকশ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত অগ্রগামী দল গঠন করে শত্রুদের তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে তিনি সেনাপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং তাদের বাহিনীর সর্বোৎকৃষ্ট ঘোড়া ও অস্ত্র সরবরাহের তাগিদ দিয়েছেন। কারণ, শত্রুরা তাদের চিহ্নিত করে ফেলতে পারে এবং তাদের লড়াইতে বাধ্য করতে পারে। এ জন্য তাদের যথেষ্ট শক্তিশালী ও নির্ভীক হতে হবে যেন সহজেই শত্রুসেনাদের ওপর মানসিকভাবে ত্রাস সৃষ্টি করা সম্ভব হয়। শত্রুরা যেন মনে করতে বাধ্য হয়, মুসলমানদের রয়েছে এক শক্তিশালী বাহিনী এবং তাদের আক্রমণের ধারও অনেক।

৬। শত্রুর তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্য এই নয় যে, তাদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে; বরং এর উদ্দেশ্য সতর্কতা অবলম্বন, যাতে শত্রুরা বাধ্য করলে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া সম্ভব হয়। সুতরাং তথ্য সংগ্রহের পর মুসলমানরা যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে, তবে যাবতীয় সতর্কতা অবলম্বন করে প্রয়োজনে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত থাকবে। [cite: ৮১]

২.১.৬। তওবাকারী ধর্মত্যাগীদের সাহায্য নেওয়া
মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এবং অন্যান্য অভিযানে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু কখনো পূর্বে ধর্মত্যাগীদের—যারা একবার ইসলাম ত্যাগ করে পুনর্বার ফিরে এসেছে—সাহায্য নেননি। তবে যারা সত্যিকার অর্থেই তাওবা করেছে, ঈমান-আমল ঠিক করে নিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ইসলামী শিক্ষাও অর্জন করেছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের জিহাদে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু তিনি কখনোই তাদের নেতৃত্বের পদে নিযুক্ত করেননি। [cite: ৮২]

এক বর্ণনায় রয়েছে, তিনি তুলাইহা ইবনে খুওয়াইলিদ আল-আসাদি এবং আমর ইবনে মাদি ইয়াকরিব আয-যুবাইদি সম্পর্কে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, ‘তাদের সাহায্য গ্রহণ করবে, কিন্তু তাদের ওপর কখনো এক শ লোকের দায়িত্ব অর্পণ করবে না।’ [cite: ৮৩]

সুতরাং আমরা ইসলামের দুই মহান খলীফা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর [cite: ৮৪] আচরণ থেকে এই শিক্ষা লাভ করি যে, যদি কেউ ইসলাম ত্যাগ করার পর অনুতপ্ত হয় এবং ফিরে আসে, তাহলে তার তাওবাকে কবুল করা হবে। সে তার জান-মালের নিরাপত্তা লাভ করবে। অন্যান্য মুসলমানদের মতোই সে ইসলামী রাষ্ট্রের সকল সুবিধা ভোগ করবে। তবে তাকে রাষ্ট্রীয় কোনো পদে বা দায়িত্বে নিয়োজিত করা যাবে না; বিশেষ করে নেতৃত্বে। কারণ, তার এই পরিবর্তনে মুনাফিকির একটা আশঙ্কা থেকেই যায়। আর যদি সত্যি সত্যি তা-ই হয়, তাহলে তাকে নেতৃত্ব দান করলে বড় ধরনের অঘটন সৃষ্টি করবে এবং মুসলমানদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করবে। সে তখন তার মতো মুনাফিকদের উস্কে দিয়ে সমাজ থেকে সত্যিকার ঈমানদারদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও পদ থেকে বহিষ্কার করবে। সংগত কারণেই ইসলামী সমাজব্যবস্থায় তখন জাহেলী যুগের আচার-আচরণ প্রতিষ্ঠিত হবে। মহান দুই খলীফা এই নীতি অনুসরণ করেই মুসলিম সমাজকে রক্ষা করার তাগিদে দুষ্কৃতকারীদের কখনোই নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করেননি। এ নীতি বাস্তবায়নের আরেকটি পরিপ্রেক্ষিত এই হতে পারে যে, তারা ধর্ম ত্যাগ করে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন করতে চেয়েছিল, তার বিরুদ্ধেই এ শাস্তি; যারা ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে আঁতাত করে নেতৃত্বের আশা করছে, তাদের জন্যও এটি একটি শিক্ষা।

২.১.৭। খলীফার পক্ষ থেকে সাদ রা.-এর প্রতি চিঠি
ইরাকের সীমান্তে শিরাফ এলাকায় তাঁবু গাড়ার সময় সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফার পক্ষ থেকে একটি চিঠি পান, যেখানে তাকে ইরাক অভিমুখে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে লেখা হয়েছে : 'আপনার নেতৃত্বাধীন সম্পূর্ণ বাহিনী নিয়ে শিরাফ থেকে ইরাক অভিমুখে রওনা হন। আল্লাহর ওপর ভরসা করুন এবং সকল পরিস্থিতিতে তার সাহায্য কামনা করুন। মনে রাখবেন, আপনারা এমন এক জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাচ্ছেন, যাদের সংখ্যা আপনাদের চেয়ে বেশি এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্রও উন্নত। তারা এক ভীতিকর দেশের কঠিন যোদ্ধা। তাদের ভূখণ্ড সমতল হলেও তা বিজয় করা কঠিন। কারণ, তাতে রয়েছে জলাশয়, নদী-নালা ও দুর্গম পর্বতমালা। যদি পথিমধ্যে তাদের কোনো ক্ষুদ্র সেনাদল দেখতে পান, তাহলে তাদের ওপর দ্রুত আক্রমণ করবেন। তাদের কোনোভাবেই প্রথম আক্রমণের পর দল ভারী করার সুযোগ দেবেন না। আর প্রতারিত হবেন না, কারণ তারা প্রতারক ও ধোঁকাবাজ জাতি। তাদের খুব গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে এবং তাদের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানতে হবে। কাদেসিয়া পৌঁছে সেখানে তাঁবু গাড়বেন। মুসলিম সৈন্যগণ যেন পাথর আর বালুময় স্থানের মাঝখানে অবস্থান নেয়। তারা যেন পারসিকদের চলাচলের রাস্তা ও সকল পথ আগলে থাকে। তারপর সেখানে অবস্থান করুন এবং স্থান ত্যাগ করবেন না। পারসিকরা যদি আপনাদের অবস্থানের টের পায়, তাহলে তারা সর্বশক্তি দিয়ে আপনাদের ওপর আক্রমণ করবে। এ কাজে তারা তাদের অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী ব্যবহার করবে। শত্রুর মোকাবিলায় যদি আপনারা ধৈর্যধারণ করেন এবং শত্রুকে আক্রমণের সময় আল্লাহর পুরস্কারের আশা করে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আপনারা বিজয়ী হবেন। তারা এমন ছত্রভঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে যে, কখনো আর একত্র ও ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে না। আর যদি হয়ও, তবু তারা এমন ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে যে, তারা যুদ্ধ করার সাহস হারিয়ে ফেলবে। আর যদি ফলাফল ভিন্ন হয়, তাহলে পেছনে গিয়ে পাথুরে অঞ্চলে অবস্থান গ্রহণ করবেন। কারণ, আপনাদের পাথুরে এলাকায় অবস্থান নেওয়ার সাহস আছে। তাদের এ সাহস নেই। তারা পাথুরে এলাকায় যুদ্ধে অনভিজ্ঞ।' [cite: ৮৫]

রণক্ষেত্রে কোথায় অবস্থান গ্রহণ করতে হবে, এ ব্যাপারে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশ আর সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি মুসান্নার পরামর্শ একই। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং মুসান্না এই স্থান নির্ধারণে একমত হয়েছিলেন। তিন বছরের অধিক সময় ধরে পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় মুসান্না তার এই পরামর্শ দিয়েছিলেন। এখান থেকেই রণকৌশল নির্ধারণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবিশ্বাস্য পারদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়, যদিও তিনি কখনোই ইরাকে পা রাখেননি। এ চিঠিতে সেনাদের শত্রুদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতেও উপদেশ দেওয়া হয়েছে যখন অগ্রগামী দলকে শত্রুদের বিব্রত করা ও তাদের বিরুদ্ধে তাদের অনুসারীদের উস্কে দিতে প্রেরণ করা হবে, যতক্ষণ না নিজেদের পছন্দমতো জায়গায় বড় লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে শত্রুদের নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। [cite: ৮৬]

২.১.৮। উমর রা.-এর দৃষ্টিতে বিজয়ের আধ্যাত্মিক মাধ্যম
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চিঠিতে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বিজয়ের আধ্যাত্মিক মাধ্যম সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেন, যা সবেচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তার চিঠিতে বলেন : 'নিজের আত্মিক অবস্থার দিকে (নিয়তের বিশুদ্ধতা) বেশি নযর রাখবেন। সেনাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলবেন, তাদের উৎসাহ দেবেন এবং তাদের নিয়তের বিশুদ্ধতা ও আত্ম-সমালোচনার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেবেন। তাদের ধৈর্যধারণ করতে বলবেন। আর নিয়ত অনুপাতে আল্লাহর সাহায্য আসে। নিষ্ঠা অনুপাতে সওয়াব আসে। আল্লাহর নিকট নিরাপত্তা কামনা করুন। বেশি বেশি করে লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়ি‍্যল আযীম (আল্লাহ ছাড়া আর কোনো আশ্রয় ও শক্তি নেই) পাঠ করুন। সৈন্যদের সকল অবস্থা ও বিবরণ আমাকে লিখে জানাবেন। আপনারা কোথায় থাকছেন, শত্রুগণ কোথায় অবস্থান করছে—সবকিছু অবহিত করবেন। আপনার চিঠির মাধ্যমে আপনাদের অবস্থা আমাকে এমনভাবে জানাবেন যেন আপনারা আমার দৃষ্টির সামনেই আছেন। আপনাদের সকল বিষয় আমার নিকট খোলাখুলিভাবে পেশ করবেন। আল্লাহকে ভয় করুন, তার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করুন এবং কোনো কিছুই নিশ্চিত মনে করবেন না। স্মরণ রাখবেন, আল্লাহ এই বিষয়টি আপনার প্রতি ন্যস্ত করেছেন। এই অভিযানে লক্ষ্য অর্জনে আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ আস্থা রাখুন। সতর্ক থাকুন—এই দায়িত্ব যেন আপনার নিকট থেকে প্রত্যাহার করতে না হয় এবং এ কাজের জন্য আপনাদের বাদ দিয়ে অন্য কাউকে নিযুক্ত করতে না হয়। [cite: ৮৭]

এই চিঠিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আত্মার পরিচর্যার দিকে খেয়াল রাখতে বলেছেন। কারণ, আত্মাই শরীরের ইঞ্জিন। যদি আত্মা সুস্থ থাকে, তাহলে পুরো শরীরই সুস্থ। তারপর তিনি তার সেনাদের উৎসাহ দিতে বলেন এবং আল্লাহর ইবাদতে একনিষ্ঠ ও তাঁর নিকট থেকেই পুরস্কার আশা করার কথা মনে করিয়ে দিতে বলেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, আল্লাহর সাহায্য এর সঙ্গেই সম্পর্কিত। তিনি তার দায়িত্ব সম্পর্কে সতর্ক করেন যাতে তাতে কোনো অবহেলা না হয়। তিনি আল্লাহর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং তাদের শক্তি-সামর্থ্য আল্লাহর সাহায্যের সঙ্গেই সম্পর্কিত। তিনি মুসলিম সেনাপতিকে আল্লাহর প্রতি ভয় ও আশার সম্পর্ক স্থাপন করতে বলেন। এটি একটি জরুরি বিষয়, যা তাওহীদের মূলমন্ত্র। তিনি তাকে বলেন, কোনো ভালো কাজ করলে কিংবা লোকজন তার প্রশংসা করলে তিনি যেন কোনো ফলাফলকে নিশ্চিত মনে না করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, আল্লাহ ঈমানদের জন্য বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং কুফরের ধ্বংস অনিবার্য করেছেন। তিনি তাকে বিজয়ের ব্যাপারে এসব উপায়-উপকরণ প্রয়োগে অবহেলা না করার জন্য সতর্ক করেছেন। কারণ, তার হাতে বিজয় নাও হতে পারে; বরং এটি হয়তো আল্লাহ অন্য কারও হাতে দান করবেন, যাকে তিনি পছন্দ করেন। [cite: ৮৮]

২.১.৯। রণক্ষেত্র কাদেসিয়ার বিবরণ-সম্বলিত সাদ রা.-এর চিঠি এবং উমর রা.-এর প্রত্যুত্তর
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফার নিকট চূড়াই লড়াই করার জন্য যে স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে, সে জায়গার বিস্তারিত বিবরণ লিখে পাঠালেন। তিনি লিখলেন, 'দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে যারা মুসলমানদের চুক্তির অধীনে এসেছিল, তারা সবাই পারসিকদের সহায়তা করছে। তারা তাদের নিকট আত্মসমর্পণ করেছে এবং আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। শত্রুপক্ষ পারসিকরা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য রুস্তম ও তার সমপর্যায়ের লোকদের নিযুক্ত করেছে। তারা আমাদের উস্কানি দিচ্ছে এবং আমাদের আগে যুদ্ধে জড়াতে চায়। আর আমরাও তাদের উত্ত্যক্ত করছি এবং যুদ্ধ শুরু করার প্রলোভন দেখাচ্ছি। অবিলম্বে আল্লাহর নির্দেশ কার্যকরী হবে। তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হবে। আমাদের পক্ষে-বিপক্ষে তার ফায়সালা মেনে নিতে হবে। আমরা আল্লাহর নিকট নিরাপত্তাসহ কল্যাণময় ফায়সালার জন্য প্রার্থনা করছি। [cite: ৮৯]

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে জবাবে লিখলেন, 'আপনার চিঠি পেয়েছি। সকল বিষয় অবগত হয়েছি। আপনি স্বস্থানে অবস্থান করুন যতক্ষণ না আল্লাহ শত্রুদের আপনাদের নিকটে না নিয়ে আসে এবং মনে রাখবেন, এ লড়াই হবে চূড়ান্ত ফায়সালার লড়াই। যদি আল্লাহ আপনাদের হাতে তাদের পরাজিত করেন, তাহলে সেখানেই ক্ষান্ত হবেন না। মাদাইন দখল করা পর্যন্ত আক্রমণ অব্যাহত রাখবেন। আর মাদাইনের পতন আপনাদের হাতেই ঘটবে ইনশাআল্লাহ। [cite: ৯০]

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রত্যুত্তর থেকে এটি স্পষ্ট যে, তিনি সঠিক সিদ্ধান্তই গ্রহণ করেছেন—সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার অবস্থানেই স্থির থাকবেন এবং স্থান ত্যাগ করবেন না। শত্রুকে মোকাবিলা করার জন্য তিনি তাড়াহুড়া করবেন না; বরং শত্রুকেই আগে যুদ্ধ শুরু করার সুযোগ দেবেন। তিনি বিজয়ী হলে মাদাইন পর্যন্ত আক্রমণ অব্যাহত রাখবেন এবং তা দখল করে নেবেন। [cite: ৯১] একই সময় তিনি বিজয় অর্জনের জন্য যাবতীয় জাগতিক প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন।

এ ক্ষেত্রে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আত্মিক বিষয়েও ছাড় দেননি। তিনি শত্রুর নিজ ভূখণ্ডে—তাদের প্রাচুর্যময় সাম্রাজ্যে—স্নায়ুযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন। তিনি সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লিখে পাঠিয়েছেন, 'আমার অন্তরে এই ভাব জন্মেছে যে, যখন আপনারা শত্রুর মোকাবিলা করবেন, তখন নিশ্চিতভাবেই তাদের পরাজিত করবেন। তারপর যদি আপনার অধীন কেউ ইঙ্গিতে বা কথায় (পারসিকদের) কাউকে নিরাপত্তা দেয়, তাহলে তাকে নিরাপত্তা দিতে হবে। কারণ, এটি যদিও ভুলক্রমে হয়ে থাকে, তবু ওয়াদা রক্ষা করতে হবে। ওয়াদা রক্ষা করার দ্বারাই বিজয় আসে এবং ওয়াদা ভঙ্গ করলে—যদিও তা ভুলক্রমে হয়—পরাজয় ডেকে আনে; এতে আপনারা দুর্বল হয়ে পড়বেন এবং শত্রুরা শক্তিশালী হয়ে উঠবে। [cite: ৯২]

দৃশ্যত মনে হয় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম বাহিনীর সঙ্গেই অবস্থান করছেন। তাদের খবর না পাওয়া পর্যন্ত তিনি আহার বা বিশ্রাম করতে পারতেন না। এ পরিস্থিতিতে এ খবর যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম হিসাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-র বিশাল বোঝাকে লাঘব করত এবং মুসলমানদের দৃঢ় ও তাদের অন্তরকে শক্তিশালী করে তুলতে সহায়তা করত। আমরা দেখি, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনাদের আত্মিক পরিচর্যার দিকে উদ্বুদ্ধ করেছেন তাদের আল্লাহর বড়ত্বের কথা বেশি বেশি পড়তে বলেছেন, কথায় সত্যবাদিতা অবলম্বন করতে বলেছেন এবং ওয়াদা রক্ষা করা আহ্বান জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে যদিও কোনো একজন মুসলিম কাউকে নিরাপত্তা দেওয়া ওয়াদা করে এবং এতে ভুল বোঝাবুঝি হয়—মুসলমানরা আসলে তাকে নিরাপত্তা দিতে চায়নি, কিন্তু শত্রু তা-ই বুঝেছে—তবু সে ওয়াদা রক্ষা করতে হবে। [cite: ৯৩]

২.২। পারস্যের সম্রাটের নিকট প্রতিনিধিদল পাঠাতে সাদ রা.-কে খলীফার নির্দেশ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট প্রেরিত চিঠিতে বলেন, 'শত্রুদের পক্ষ থেকে কোনো কিছুই যেন আপনাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করতে না পারে। তাদের শক্তিমত্তাও যেন আপনাকে ভীত-শঙ্কিত না করে। আপনি আল্লাহর সাহায্য কামনা করুন এবং তার ওপর তাওয়াক্কুল রাখুন। কয়েকজন দূরদর্শী ও বিচক্ষণ ব্যক্তিকে সম্রাট ইয়াযদগিরদ-এর নিকট পাঠান এ জন্য যে, তারা সম্রাটকে ইসলামের দাওয়াত দেবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রতিদিন চিঠি প্রেরণ করতে নির্দেশ দেন। [cite: ৯৪] সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু একদল বিচক্ষণ ও সাহসী লোক নির্বাচন করলেন। তারা হলেন :

১। নুমান ইবনে মুকাররিন আল-মুযানী
২। বিশর ইবনে আবি রহম আল-যুহানী
৩। হামলা ইবনে যুওয়াই ইল-কিনানী
৪। হানযালা ইবনে রাবী আত-তামিমী
৫। ফুরাত ইবনে হাব্বান আল-আযালী
৬। আদিয়্যি ইবনে সুহাইল
৭। মুগীরা ইবনে জুরারা ইবনে নাবাস ইবনে হাবীব [cite: ৯৫]

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ কাজে কয়েকজন সম্ভ্রান্ত, সুদর্শন এবং বিচক্ষণ ব্যক্তিকে নির্বাচন করেন :

১। আতারিদ ইবনে হাযিব আত-তামিমী
২। আশআস ইবনে কাইস আল-কিনদী
৩। হারিস ইবনে হাসান আয-যুহালী
৪। আসিম ইবনে আমর আত-তামিমী
৫। আমর ইবনে মাদি কারিব আজ-জুবাইদী
৬। মুগীরা ইবনে শুবাহ আস-সাকাফী
৭। মুআন্না ইবনে হারিসা আশ-শাইবানী [cite: ৯৬]

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশে এই চৌদ্দ জন দাঈকে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পারস্যের সম্রাটকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য প্রেরণ করেন। তারা সবাই স্ব-স্ব গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমনই চেয়েছিলেন। বিচক্ষণতা ও চমৎকার বাচনভঙ্গিতে সর্বোত্তম পন্থায় ইয়াযদগিরদকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে হবে। তারা অন্তরে এই আশা পোষণ করবে যে, আল্লাহ হয়তো তাকে হেদায়েত নসীব করবেন এবং উভয়পক্ষের রক্তপাত এড়ানো সম্ভব হবে। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই প্রতিনিধিদল নির্বাচন করা হয়। তারা সকলেই ছিলেন প্রচণ্ড ধীশক্তির অধিকারী এবং তাদের যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তা সুচারুভাবেই পালনে সক্ষম। তা ছাড়া তারা ছিলেন সুদর্শন, উঁচু মর্যাদার ও বিচক্ষণ এবং পারসিকদের সম্পর্কে তাদের পূর্ব-অভিজ্ঞতাও ছিল। তাদের কেউ কেউ পারসিকদের সঙ্গে লড়াই করেছেন, তাদের পরাজিত করেছেন এবং অতীতে বিভিন্ন অভিযানে যুদ্ধ করেছেন। আবার কেউ কেউ জাহেলী যুগে পারস্যের সম্রাটের নিকট প্রতিনিধি হিসাবে গিয়েছিলেন এবং কেউ কেউ পারস্যের ভাষাও জানতেন। দৃশ্যত মনে হয়, সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এই প্রতিনিধিদলকে বিভিন্ন মানসিক ও শারীরিক পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে নির্বাচন করেছেন। আর তারা যোগ্য হিসাবে এসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এতে তাদের শারীরিক সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার পাশাপাশি বাহ্যিক সৌন্দর্যেরও পরীক্ষা দিতে হয়েছে। [cite: ৯৭]

বরকতময় এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন নুমান ইবনে মুকাররিন। তারা মাদাইনে প্রবেশ করে পারস্যের সম্রাট ইয়াযদগিরদ-এর সঙ্গে দেখা করলেন। সম্রাট তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা এখানে কেন এসেছ? কী উদ্দেশ্যে তোমরা আমাদের আক্রমণ করেছ এবং আমাদের ভূখণ্ডের এত ভেতরে অনুপ্রবেশ করেছ? এটা কি এ জন্য যে, তোমাদের ব্যাপারে বিভ্রান্তির কারণে আমাদের ওপর আক্রমণ করতে তোমরা উৎসাহিত হয়েছ?' নুমান ইবনে মুকাররিন বললেন,

আল্লাহ আমাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন। আমাদের নিকট তার রাসূল প্রেরণ করেছেন যিনি আমাদের ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ করেন। আমাদের এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যদি আমরা তাকে অনুসরণ করি, তাহলে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ করতে পারব। খুব কম গোত্রই এতে সাড়া দিয়েছে। তারপর তিনি আরবদের মধ্যে যারা তার বিরোধিতা করেছে, তাদের সঙ্গে লড়াইয়ের নির্দেশ দেন। তখন আমরা তাদের সঙ্গে লড়াই শুরু করি। তখন তারা অনেকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে মেনে নেয় এবং পরবর্তী সময়ে এ জন্য আনন্দিত হয়; আর অনেকে স্বেচ্ছায় তার নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং কল্যাণ লাভ করে। আমরা যে শত্রুতা ও অজ্ঞতার মধ্যে জীবনযাপন করতাম, তার ওপর—তিনি যা নিয়ে এসেছেন—সেটাকে প্রাধান্য দিয়েছি। তারপর তিনি আমাদের নিকটবর্তী দেশ ও জাতির মধ্যে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে বললেন। আমরা তাদের সত্য ও ন্যায়ের দিকে আহ্বান করি। আমরা আপনাকে আমাদের ধর্ম ইসলামের দিকে দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা ভালোকে ভালো হিসাবে চিহ্নিত করে এবং মন্দকে নিশ্চিত মন্দ হিসেবে। যদি আপনি আমাদের এই আহ্বান না মেনে নেন, তাহলে দুটির একটি বেছে নিতে হবে; জিযিয়া এবং সেটি দিতে অস্বীকার করলে, যুদ্ধ। যদি আপনি ইসলাম গ্রহণ করেন, তাহলে আমরা আপনাকে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী রাজ্য শাসন করার স্বাধীনতা দিয়ে আমরা ফিরে যাব। আর যদি জিযিয়া দিতে রাজি হন, তাহলে আমরা সেটিও গ্রহণ করব এবং তাতে আপনার রাজ্য আপনার অধীনেই থাকবে। জিযিয়া করের বিনিময়ে আপনাদের নিরাপত্তা দেওয়া হবে। আর যদি তা না দিতে চান, তাহলে আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।

ইয়াযদগিরদ বললেন, 'আমি পৃথিবীর বুকে তোমাদের চেয়ে সংখ্যালঘু, দরিদ্র এবং শতধাবিভক্ত জাতি আর দেখিনি। আমরা সীমান্ত এলাকার কিছু গোত্রকে তোমাদের দেখভাল করার জন্য নিয়োজিত করতাম। তোমরা কখনোই পারস্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার সাহস পাওনি। যদি তোমরা সত্যিই মনে করো যে, আমাদের পরাজিত করতে সক্ষম হবে, তাহলে এটি হবে চরম বোকামি। তোমাদের দুরবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা খাদ্য-দ্রব্য দিয়ে সাহায্য করব যতদিন না তোমাদের অবস্থার উন্নতি হয়। আমরা তোমাদের সর্দারকে সম্মান করব এবং কাপড়-চোপড় দেব। আর তোমাদের জন্য একজন রাজা নির্বাচন করে দেব যে হবে তোমাদের প্রতি দয়ালু।'

এবার মুগীরা ইবনে জুরারা উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, 'আপনি আমাদের দুরবস্থার ব্যাপারে যা বলেছেন, তা সত্য; বরং এটি তার চেয়েও খারাপ ছিল।' তিনি আরবদের জাহেলী জীবনের চিত্র তুলে ধরেন এবং আল্লাহ তা'আলা রাসূল প্রেরণ করে কীভাবে তাদের ওপর দয়া করেছেন, তারও বিবরণ দেন—যেমনটি নুমান বলেছেন। তারপর তিনি বলেন, 'স্বেচ্ছায় জিযিয়া (কর) দিতে রাজি হোন এবং নিজেকে পদানত মনে করুন (কুরআন ৯ : ২৯ দ্রষ্টব্য) অথবা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হোন, অথবা ইসলাম কবুল করে নিজেকে রক্ষা করুন।'

ইয়াযদগিরদ বললেন, 'দূতদের হত্যা করার বিধান থাকলে আমি তোমাদের হত্যা করার আদেশ দিতাম। এখন আমার নিকট তোমাদের কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেই।' তারপর তিনি তার লোকদের এক ঝুড়ি মাটি নিয়ে আসতে হুকুম করল এবং বলল, 'এই মাটির ঝুড়িটি তাদের সবচেয়ে সম্মানি ব্যক্তির মাথায় তুলে দাও। তারপর তাকে তাড়িয়ে মাদাইন থেকে বের করে দাও।' আসিম ইবনে আমর বলে উঠলেন, 'আমি সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি।' আসিম মাটির ঝুড়ি কাঁধে নিয়ে নিজ সওয়ারীতে চড়লেন এবং দ্রুত গতিতে রওনা হয়ে গেলেন। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট পৌঁছলে তিনি তাকে বললেন, 'আল্লাহর কসম, মহান আল্লাহ তাদের রাজ্যের চাবি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। [cite: ৯৮]

তারপর সাবাত এলাকা থেকে রুস্তম তার বিশাল বাহিনী নিয়ে বের হলেন। এক লক্ষ কিংবা তার চেয়ে বেশি সৈন্য ছিল তার দলে। যখন সে মাদাইন ও বাবিল-এর মধ্যে কৃথা এলাকা অতিক্রম করছিল, তখন এক আরবের সাক্ষাৎ পেল। রুস্তম তাকে জিজ্ঞাসা করল, 'তুমি এখানে কী করছ? তুমি আমাদের নিকট কী চাও' তিনি বললেন, 'আমরা এসেছি আল্লাহর দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য। তিনি তোমাদের শহর-নগর ছিনিয়ে নেবেন, তোমাদের নারী ও শিশুদের বন্দী করে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ তুলে নিয়ে আমাদের হাতে সমর্পণ করবেন।' রুস্তম বললেন, 'তাহলে আমরা তোমাদের অধীন।' আরব লোকটি বলল, 'তোমাদের মন্দ কর্মই তোমাদের নিচে নামিয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তোমাদের আমাদের অধীন করে দিয়েছেন। দুনিয়ার চাকচিক্য দেখে ধোঁকায় পোড়ো না। তোমরা আসলে আমাদের সঙ্গে লড়াই করছ না; বরং আল্লাহর শাশ্বত বিধানের বিরোধিতা করছ।' রুস্তম রাগান্বিত হয়ে গেল এবং তাকে হত্যা করল।

তারপর রুস্তমের বাহিনী কৃথা ও হিল্লার মধ্যবর্তী বারাস এলাকা অতিক্রম করার সময় ওই এলাকার লোকদের যিম্মি করে তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করে, মদ্যপান করে এবং নারীদের ধর্ষণ করে। বারাসের লোকজন তার নিকট অভিযোগ করলে তিনি বলেন, 'আল্লাহর কসম, আরব সত্য কথাই বলেছে। আমাদের অপকর্মই আমাদের সর্বনাশ করেছে। আরবরা যুদ্ধাবস্থায় থাকলেও এসব লোকদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করেছে। [cite: ৯৯]

রুস্তমের সেনাবাহিনীর সংবাদ লাভ করে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আমর ইবনে মাদি ইয়াকরিব আজ-জুবাইদি এবং তুলাইহা ইবনে খুওয়ালিদের সঙ্গে আরও দশ জনের একটি দলকে শত্রুপক্ষের খবর সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করেন। তারা অনেক দূর পর্যন্ত চলে যায়। তারা দেখেন যে, শত্রুরা নদীর তীরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তাঁবু গেড়েছে। দলের সবাই ফিরে এলেও তুলাইহা তার মিশন অব্যাহত রাখে। শত্রুর সারিতে প্রবেশ করে তিনি আরও তথ্য সংগ্রহ করেন। তারপর তিনি সেনাপতির নিকট ফিরে গিয়ে তার প্রাপ্ত তথ্য সরবরাহ করেন। এই তুলাইহা একবার নিজেকে নবীরূপে দাবি করেছিলেন, পরে তাওবা করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এসব ব্যক্তিদের জিহাদে শরীক হওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন যদিও আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এর অনুমতি দেননি। তবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের কখনো নেতৃত্বের আসনে নিযুক্ত করেননি। তিনি তাদের ইসলামী শিক্ষা ও আচরণের ব্যাপারে খুব সতর্ক ছিলেন। আর তাদের অনেক সুযোগ দিয়েছেন যেখানে তারা তাদের একনিষ্ঠতা ও ঈমানের পরিচয় রাখতে পারেন। তুলাইহা ও আমর আজ-জুবাইবী ইরাক ও পারস্য যুদ্ধে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

২.৩। রুস্তমকে ইসলামের দাওয়াত দিতে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.-এর প্রতিনিধিদল প্রেরণ
রুস্তম তার বাহিনী নিয়ে আল-হেরা থেকে রওনা হয়ে কাদেসিয়ায় আ- আতীক নামে একটি সেতুর নিকট পৌঁছেন। তারা মুসলমানদের দিকে মুখ করে তাঁবু গাড়েন। দুই বাহিনীর মধ্যে দূরত্ব ছিল শুধু একটি নদী। পারসিকদের বাহিনীতে ৩৩টি হাতি ছিল। তারা তাঁবু ফেলে মুসলিম সেনাপতি সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট সংবাদ পাঠাল : 'এমন কাউকে পাঠান যার সঙ্গে আমরা কথা বলতে পারি।' সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু রিবঈ ইবনে আমিরকে পাঠালেন। তিনি রুস্তমের নিকট গেলেন। তার লোকেরা মজলিস সাজিয়েছিল সোনালি গদি ও রেশমি চাদর দিয়ে, থরে থরে ঝুলিয়ে রেখেছিল মহামূল্যবান মণিমুক্তো ও নয়নকাড়া সাজ-সজ্জায়। তার মাথায় ছিল মুকুট। সে বসেছিল স্বর্ণ-নির্মিত সিংহাসনে। মুসলিম প্রতিনিধি রিবঈ ইবনে আমির সেখানে প্রবেশ করেছিলেন পুরোনো পোশাক, তরবারি, ঢাল ও ছোট একটি ঘোড়া নিয়ে। তিনি ঘোড়ার পিঠেই ছিলেন। ঘোড়া গিয়ে রুস্তমের সুসজ্জিত বিছানা মাড়ায়। তারপর রিবঈ ঘোড়া থেকে অবতরণ করেন। একটি গদির সাথে সেটিকে বাঁধেন। হাতে অস্ত্র, পরিধানে বর্ম এবং মাথায় শিরস্ত্রাণ নিয়ে তিনি রুস্তমের দিকে এগিয়ে যান। রুস্তমের লোকজন তাকে বলল, 'অস্ত্র রেখে দিন।' তিনি বললেন, 'আমি স্বেচ্ছায় আসিনি। আমাকে ডেকেছ বলেই এসেছি। আমাকে এভাবে থাকতে দিলে থাকব নতুবা ফিরে যাব।' [cite: ১০০]

তিনি এলেন। বর্শায় ভর দিয়ে গদির ওপর দিয়ে তিনি অগ্রসর হচ্ছিলেন। বর্শার আঘাতে অনেক গদি ছিঁড়ে যায়। রুস্তমের নিকটে গিয়ে তিনি মাটিতে বসে পড়েন এবং বর্শাকে কার্পেটে বিদ্ধ করেন এবং বলেন, 'আমরা চেয়ারে বসি না।' রুস্তম তাকে জিজ্ঞাসা করেন, 'তোমরা এখানে কেন এসেছ?' তিনি বললেন, 'মহান আল্লাহ আমাদের প্রেরণ করেছেন। তিনি যাদের চান, আমরা তাদের মানুষের গোলামি থেকে বের করে আল্লাহর গোলামিতে নিয়ে যাই। দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে তার বিশালত্বে নিয়ে যাই। অন্যান্য ধর্মের হুকুম ও অত্যাচার থেকে বের করে ইসলামের ন্যায় বিচারের দিকে নিয়ে যাই। আল্লাহ পুরো সৃষ্টিজগতের জন্য তার রাসূলকে সত্য দ্বীন দিয়ে আমাদের নিকট পাঠিয়েছেন। যারা আমাদের দাওয়াত গ্রহণ করবে, আমরা তাদের ওই অবস্থা মেনে নিয়ে ফিরে যাব। আর যারা ওই দাওয়াত ও আহ্বান গ্রহণ করবে না, আমরা অবিরাম তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাব যাতে আমরা বিজয়ী কিংবা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। [cite: ১০১]

রুস্তম বললেন, 'আপনার বক্তব্য আমি শুনেছি। আমাদের কি একটু সময় দেবেন যাতে আমরা আরেকটু চিন্তা করতে পারি?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ। তবে আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার পর তিন দিনের বেশি অবকাশ দেওয়ার নিয়ম রেখে যাননি। সুতরাং আমরা আপনাদের তিন দিন সময় দিলাম। চিন্তা-ভাবনা করুন এবং তিনটির যেকোনো একটি গ্রহণ করে নিন; হয় ইসলাম কবুল করুন এবং আমরা আপনাদের অবস্থানে রেখে ফিরে যাব; নতুবা জিযিয়া প্রদান করুন এবং আমরা ফিরে যাব; অথবা চতুর্থ দিন যুদ্ধে লিপ্ত হোন, যদি না এর আগেই আপনারা শুরু করে দেন।' রুস্তম জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনি কি তাদের নেতা?' তিনি বললেন, 'না। তবে মুসলমান সম্প্রদায় একই দেহের ন্যায়; একে অন্যের অংশ। তাদের মধ্যে নিম্নস্তরের ব্যক্তিও যদি কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে উচ্চস্তরের লোকজনও সেটি বাস্তবায়ন করেন।' তারপর তিনি ফিরে আসেন। [cite: ১০২]

রুস্তম তার সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয় লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তিনি বলেন, 'এই ব্যক্তির কথার মতো কোনো কিছু আপনারা কখনো শুনেছেন?' তারা রিবঈর বাহ্যিক পোশাক-আশাক দেখে তুচ্ছতাচ্ছিল করল। কিন্তু রুস্তম বললেন, 'তোমাদের জন্য আফসোস, আমি তার বিচক্ষণতা, বক্তব্য ও চরিত্র নিয়ে ভাবছি। আরবগণ জামা-কাপড় তুচ্ছজ্ঞান করে। তারা নিজেদের ইযযত ও বংশ-মর্যাদা রক্ষা করে।'

দ্বিতীয় দিন, রুস্তম সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট সংবাদ পাঠাল, 'লোকটিকে আমাদের নিকট আবার প্রেরণ করুন।' কিন্তু সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হুযাইফা ইবনে মিহসানকে পাঠালেন। তিনি তা-ই বললেন, যা রিবঈ বলেছিলেন। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কারণ, তারা তো একই ছাঁচে তৈরি-ইসলামের অকুতোভয় বীর। রুস্তম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'প্রথম দিন যে এসেছিল, তিনি কেন আসেননি?' তিনি বলেন, 'আমাদের সেনাপতি সমর ও শান্তিতে সমানভাবে সকলের সঙ্গে একই আচরণ করেন। আজ আমার পালা।' রুস্তম বললেন, 'আমাদের হাতে আর কয়দিন আছে?' তিনি বললেন, 'তিন দিন, যা গতকাল থেকে শুরু হয়েছে।'

তৃতীয় দিন রুস্তম আবার সংবাদ পাঠালেন, 'আমাদের নিকট একজন লোক প্রেরণ করুন।' এবার সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুগীরা ইবনে শুবাহকে প্রেরণ করলেন। মুগীরা রুস্তমের দরবারে পৌঁছে এবং নিঃসংকোচে সোজা মঞ্চের ওপর উঠে রুস্তমের পাশে বসে পড়েন। কিন্তু রুস্তমের পারিষদবর্গ দ্রুত তার দিকে ধাবিত হয় এবং তাকে হাত ধরে টেনে এনে মঞ্চের নীচে বসিয়ে দেয়। তিনি তাদের বলেন, 'আমি আপনাদের বড়ত্বের কথা অনেক শুনেছি। কিন্তু আমি কখনো আপনাদের মতো বোকা লোক কখনো দেখিনি। আমরা আরববাসী, আমাদের সেখানে এ ব্যক্তি খোদা হবে, আর অন্যরা তার পূজা করবে—এমন বিধান নেই। আমি ভেবেছিলাম, আপনারাও আমাদের মতো সবাইকে সমানভাবে দেখেন। আমাকে আগে বলা উচিত ছিল যে, তোমরা কাউকে নিজেদের খোদা বানিয়ে নিয়েছ। তোমাদের অবস্থা যদি এমন হয়ে থাকে, খুব শীঘ্রই তোমরা বিলীন হয়ে যাবে।'

তখন সাধারণ লোকেরা বলল, 'আল্লাহর কসম, এই আরব লোকটি সত্য কথাই বলেছে।' পারসিক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা বলল, 'এমন কথা শোনার জন্যই আমাদের দাস-দাসীরা উদ্‌গ্রীব। আল্লাহ আমাদের পূর্বসূরিদের ওপর অভিশাপ বর্ষণ করুন। তারা জাতির জন্য এসব কিছুই করেনি।' তারপর রুস্তম আরবদের অবমাননা করে এবং পারসিকদের বড়ত্বের কথা বড়াই করে বলতে থাকেন। তিনি আরবদের দুর্দশা ও কষ্টকর জীবনের কথা তুলে ধরেন। [cite: ১০৩]

মুগীরা বলেন, 'আমাদের দুর্দশা ও কষ্টকর জীবন ও জাতিগত বিভক্তি সম্পর্কে যা কিছু বলেছেন, তা আমরা স্বীকার করি, অস্বীকার করি না। তবে দুনিয়ার এই চাকচিক্য চিরদিন থাকবে না এবং কষ্টের পরেই সুখ আসে। আল্লাহ আপনাদের যা দিয়েছেন, তার জন্য যদি শুকরিয়া আদায় করতেন, তাহলে ভালো হতো। কিন্তু প্রাপ্তির তুলনায় আল্লাহর প্রতি আপনাদের কৃতজ্ঞতা খুব কম। এ রকম অকৃতজ্ঞতার জন্য আপনাদের অবস্থার অবনতি হবে। আল্লাহ আমাদের নিকট একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন।' তারপর তিনি অন্যদের মতো আরও কথা বলেন। পরিশেষে তাকে তিনটির যেকোনো একটি বেছে নিতে বলেন; ইসলাম গ্রহণ, জিযিয়া অথবা যুদ্ধ। [cite: ১০৪]

রুস্তম পারসিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, 'তোমাদের তুলনায় তারা কেমন? প্রথম দুজন এল এবং নির্ভীকচিত্তে তোমাদের সামনে কথা বলে গেল। তারপর তৃতীয় জন একই ভঙ্গিতে কথা বলল। তারা সবাই একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছে এবং একই ভাবে কাজ করেছে। আল্লাহর কসম, এরাই প্রকৃত বীর, যদিও তারা একনিষ্ঠ কিংবা মিথ্যাবাদী হয়। আল্লাহর কসম, তাদের শৃঙ্খলা এবং ঈমান এ পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে সকলে একই পদ্ধতি অবলম্বন করে, কখনো তার ব্যত্যয় না হয়, তাহলে পৃথিবীতে তাদের মতোই কেউই উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। আর যদি তারা সত্যনিষ্ঠ হয়, তাহলে তাদের সামনে কেউই দাঁড়াতে পারবে না।' তারপর সভাষদদের মধ্যে যুক্তি-তর্ক ও শোরগোল শুরু হয়ে গেল।

২.৪। যুদ্ধের প্রস্তুতি
পারসিকরা ইসলামের আহ্বানে সন্তুষ্ট হলো না এবং এমন ঔদ্ধত্য পোষণ করল যাতে আল্লাহ যা নির্ধারণ করে রেখেছেন তা বাস্তবায়িত হয় (সূরা আনফাল, ৮:৪২)। পারসিকরা যুদ্ধের জন্য সমবেত হলো এবং মুসলমানগণও যুদ্ধের যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। পারসিকরা আতীক নদী অতিক্রম করে কাদেসিয়া প্রান্তরে এল। রুস্তম তার বিশাল বাহিনীকে নিম্নরূপ সজ্জিত করল :

১। কেন্দ্রীয় বাহিনী : যুল আল-হাযিব, তার সঙ্গে রয়েছে সৈন্য ও অস্ত্র বহনকারী আঠারোটি হাতি।
২। কেন্দ্রীয় বাহিনীর ডানে: জালিনূস
৩। ডান পার্শ্ব বাহিনী : হরমুযান, তার সঙ্গে রয়েছে সৈন্য ও অস্ত্র বহনকারী সাত কিংবা আটটি হাতি।
৪। কেন্দ্রীয় বাহিনীর বামে: বিরাযান
৫। বাম পার্শ্ব বাহিনী : মাহরান, তার সঙ্গে রয়েছে সৈন্য ও অস্ত্র বহনকারী সাত অথবা আটটি হাতি।

রুস্তম নদীর ওপর সেতুর নিকটে একটি অশ্বারোহী দল প্রেরণ করে, যাতে মুসলমানগণ নদী পার হয়ে তাদের বাহিনীর দিকে না আসতে পারে। সুতরাং মুসলিম বাহিনী ও মুশরিক বাহিনীর মাঝামাঝি ছিল সেতুটি। রুস্তম তার সৈন্যদের নিম্নলিখিতভাবে সাজালেন :

১। প্রথম সারিতে অশ্বারোহী বাহিনী, তাদের পেছনে রয়েছে হাতি এবং তার পেছনে পদাতিক বাহিনী। রুস্তমের জন্য বিশাল তাঁবু টাঙানো হয়, যার নিচে বসে রুস্তম যুদ্ধের গতিবিধি লক্ষ করছেন। [cite: ১০৫] মুসলমানগণও ছিল যুদ্ধের জন্য পূর্ণ প্রস্তুত। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বাহিনীকে আগেই রণসাজে সজ্জিত করেছেন। কমান্ডার ও দলনেতা নিযুক্ত করেছেন। পতাকা বহন করার জন্য এমন লোকদেরই নিযুক্ত করেন যাদের গুণাবলি ছিল প্রসিদ্ধ এবং অগ্রবাহিনী, পশ্চাদ্বাহিনী, দুই পার্শ্ব বাহিনী এবং অগ্রগামী দল নিযুক্ত করেন। তিনি কাদেসিয়ার রণসাজেই প্রবেশ করেন। তিনি তার বাহিনীকে নিম্নরূপে সজ্জিত করেন :

১। অগ্রগামী দল : যুহরা ইবনে হাবিয়া
২। ডান পার্শ্ব বহিনী : আব্দুল্লাহ ইবনে আল-মুতাম
৩। বাম পার্শ্ব বাহিনী : শুরাহবিল ইবনে আস-সামত আল-কিন্দি এবং তার ডেপুটি হিসাবে ছিলেন খালিদ ইবনে উরফাতাহ
৪। পশ্চাদ্বাহিনী : আসিম ইবনে আমর
৫। অগ্রগামী দলের দলনেতা: সাওয়াদ ইবনে মালিক
৬। অশ্বারোহী বাহিনীর দলনেতা: সালমান ইবনে রাবিআ আল-বাহিলি
৭। পদাতিক বাহিনীর দলনেতা: হাম্মাল ইবনে মালিক আল-আসাদি
৮। বাহনের দলনেতা: আব্দুল্লাহ ইবনে যি আস-সাহামাইন আল-হানাফি
৯। বিচারক : আব্দুর রহমান ইবনে রাবিআ আল-বাহিলি
১০। বাহিনীর সচিব (লেখক): যিয়াদ ইবনে আবি সুফিয়ান
১১। বাহিনীর পক্ষ থেকে নিযুক্ত বক্তা: সালমান আল-ফারসি।

উল্লেখ্য, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশেই পুরো সেনাবাহিনীকে এভাবে বিন্যস্ত করা হয়। [cite: ১০৬]

সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং কুরআন মাজীদের এই আয়াত তিলাওয়াত করেন :

وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِنْ بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصُّلِحُونَ
আমি উপদেশের পর যবুরে লিখে দিয়েছি যে, আমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণ অবশেষে পৃথিবীর অধিকারী হবে। [cite: ১০৭]

তিনি ক্বারীদের সূরা আনফাল তিলাওয়াত করতে বলেন এবং তারা তা-ই করে। সৈন্যগণ এতে দারুণ প্রভাবিত হন এবং তাদের অন্তরে প্রশান্তিতে ভরে যায়। সেনাপতি সবাইকে নিয়ে যোহরের নামায আদায় করেন। তারপর সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু চতুর্থ তাকবীরের সঙ্গে সঙ্গে শত্রুর ওপর আক্রমণ করতে আদেশ দিলেন এবং মুখে 'লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' পড়তে বললেন।

যুদ্ধ চার দিন স্থায়ী হয়েছিল। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অসুস্থ ছিলেন। ইরকুন-নিসা রোগে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। তাঁর শরীরে ফোড়া উঠেছিল। তিনি সওয়ারীতে আরোহণ করতে পারছিলেন না। তিনি কাদেসিয়ার প্রান্তরে কুদাইসের একটি সুউচ্চ দুর্গের মধ্যে বালিশের ওপর বসে বুকে ভর দিয়ে রণক্ষেত্রে সৈন্যদের ওপর নযর রাখছিলেন। তিনি খালিদ ইবনে উরফাতাহকে তার নির্দেশসমূহ মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি তাদের মধ্যে উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা দিতে বললেন: 'ঈর্ষা করার অনুমতি নেই। তবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জিহাদ করার ক্ষেত্রে তা বৈধ। হে লোকসকল, সুতরাং জিহাদে একে অন্যকে ঈর্ষা করো (মানে অন্যদের থেকে অগ্রগামী হওয়ার চেষ্টা করো)।' [cite: ১০৮]

যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতিনিধি খালিদ ইবনে উরফাতাকে নিয়ে গণ্ডগোল দেখা দিল। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমাকে নিয়ে চলো এবং এমন জায়গায় রাখো যেখান থেকে আমি তাদের দেখতে পাই।' সুতরাং তারা তাকে উঁচু করে তুলে ধরল। তিনি দুর্গের দেয়ালের নিচে দাঁড়ানো সৈন্যদের দিকে তাকালেন। তিনি খালিদকে নির্দেশ দিতেন, খালিদ লোকদের তা জানিয়ে দিত। খালিদ ওইসব ব্যক্তিদের একজন, যাদের জন্য কিছু প্রসিদ্ধ লোক গণ্ডগোল সৃষ্টির পাঁয়তারা করেছিল। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, শত্রুরা যদি তোমাদের নাকের ডগায় না থাকত, তাহলে আমি তোমাদের শাস্তি দিয়ে দৃষ্টান্ত তৈরি করতাম।' তিনি তাদের বন্দী করেন। এর মধ্যে আবু মিহযান আস-সাকাফিও ছিলেন। তাদের দুর্গে শেকল পরিয়ে আটকে রাখেন। জারির ইবনে আব্দুল্লাহ দলনেতার প্রতি আনুগত্যের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, 'আমি ব্যক্তিগতভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে এই মর্মে বাইআত গ্রহণ করেছি যে, আল্লাহ যাকেই নেতৃত্বের আসনে বসাবেন, আমি তার কথা শুনব এবং তাকে মেনে চলব—যদি সে হাবশার কৃতদাসও হয়।' সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, আর যদি কেউ একই সমস্যা সৃষ্টির চেষ্টা করে, মুসলমানদের শত্রুর মোকাবিলা করা থেকে বিভ্রান্ত করে, যখন তারা তাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত, আমি তাকে এমন শাস্তি দেব যা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। [cite: ১০৯]

এ ঘটনার পর সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উঠে দাঁড়ান এবং লোকদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। আল্লাহর হামদ ও দরূদের পর তিনি বলেন, 'আল্লাহই একমাত্র সত্য এবং তার কোনো অংশীদার নেই। তার প্রতিশ্রুতি কখনো ভঙ্গ হয় না। আল্লাহ বলেন,

وَ لَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِنْ بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصُّلِحُونَ
আমি উপদেশের পর যবুরে লিখে দিয়েছি যে, আমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণ অবশেষে পৃথিবীর অধিকারী হবে। [cite: ১১০]

এটি তোমাদের উত্তরাধিকার, যা আল্লাহ তোমাদের অঙ্গীকার করেছেন। আল্লাহ তিন বছর আগেই তোমাদের এই ভূমির দখল দান করেছিলেন এবং আজ পর্যন্ত তোমরা এর ফল ভোগ করছ। আর এর পেছনে তোমাদের পূর্বসূরিরা লড়াই করে গেছে। এখন শত্রুর দল এসে জমা হয়েছে। কিন্তু তোমরা আরবদের সর্দার এবং স্ব-স্ব গোত্রের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি—পরবর্তীদের জন্য যারা গর্ব ও অহংকার। যদি তোমরা দুনিয়ার প্রতি অবজ্ঞা ও আখিরাতের প্রতি আশা পোষণ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করবেন। এই জিহাদ কারও মৃত্যুকে কাছে ডেকে আনে না। যদি তোমরা ব্যর্থ হও এবং দুর্বল হয়ে পড়ো, তাহলে এ দুনিয়ায় যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি আখিরাতেও হবে লাঞ্ছিত। [cite: ১১১]

পতাকা বহনকারীদের উদ্দেশে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু লেখেন, ‘আমি খালিদ ইবনে উরফাতাহকে তোমাদের দলনেতা হিসাবে মনোনয়ন দিয়েছি। আমি অসুস্থ। আমার ঊরু ও নিতম্বে ফোড়া ও জখমের তীব্র ব্যথা। এটি না হলে এ কাজ নিজেই পালন করতাম। আমি বুকে ভর দিয়ে শুয়ে শুয়ে তোমাদের দেখছি। সুতরাং তার কথা শোনো ও তাকে মেনে চলো। কারণ, সে আমারই নির্দেশ ও আদেশ তোমাদের নিকট নিয়ে আসবে।’

এ চিঠি সৈন্যদের পড়ে শোনানো হয়। তারা এতে আশ্বস্ত হয় এবং তার সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়। একে অন্যকে তা অনুসরণ ও মেনে চলার জন্য উৎসাহ দিতে থাকে। তারা সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওযর ও অক্ষমতা মেনে নেয়। তার গৃহীত পদক্ষেপের সঙ্গে একমত পোষণ করে। [cite: ১১২] সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু দুর্গের চূড়াতেই অবস্থান করেন এবং সেখান থেকেই সৈনিকদের সুবিধা-অসুবিধা পর্যালোচনা করছিলেন। দুর্গটি সুরক্ষিত ছিল না। এটি সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাহসের প্রমাণ।

বর্ণিত আছে, উসমান ইবনে রাযা আস-সাদি বলেন, ‘সাদ ইবনে মালিক ছিলেন লোকদের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী ও ভয়ংকর। তিনি অরক্ষিত একটি দুর্গের চূড়ায় বসে দুই বাহিনীর লড়াই দেখছিলেন। তার সৈনিকদের অবস্থান দেখছিলেন। মুসলমানগণ যদি সামান্য পশ্চাদপদও হতো, তাহলে দুর্গটি শত্রুর নাগালে চলে আসত এবং পারসিকরা তাকে ধরে ফেলত। তারপর সে আর রক্ষা পেত না। আল্লাহর কসম, তিনি কখনো এ ব্যাপারে চিন্তিত ছিলেন না কিংবা যুদ্ধের কঠিন দিনগুলোতে একটু ভয়ও পাননি। [cite: ১১৩]

আযান শুনে রুস্তমের হতবিহ্বল হয়ে ওঠেন
নাযাফ এলাকায় তাঁবু গাড়ার পর রুস্তম মুসলমানদের তাঁবুতে গুপ্তচর প্রেরণ করে। এই গুপ্তচর কাদেসিয়ায় অবস্থানরত মুসলমানদের সারির ভেতর ঢুকে পড়ে। সে তাদের দেখে যে, তারা প্রতিওয়াক্তে নামাযের আগে মিসওয়াক ব্যবহার করছে। তারপর নামায আদায় করছে। নামাযের পর তারা যে যার কাজে চলে যাচ্ছে। সে রুস্তমের নিকট ফিরে মুসলমানদের এসব আচার-আচরণ তুলে ধরল। রুস্তম তাকে জিজ্ঞাসা করল, 'তারা কী খায়?' সে বলল, 'আমি তাদের সঙ্গে এক রাত অবস্থান করেছি। আল্লাহর কসম, আমি তাদের কিছু খেতে দেখিনি। তবে তারা সন্ধ্যায়, ঘুমানোর সময় এবং সকালে একধরনের কাঠের ছড়ি চুষে থাকে।'

রুস্তম আরও অগ্রসর হয়ে হাসন এবং আতীক-এর মধ্যবর্তী অঞ্চলে তাঁবু গাড়েন। [cite: ১১৪] তিনি যখন মুসলমানদের খুব কাছাকাছি চলে আসেন, তখন সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মুআযযিন ফজরের নামাযের আযান দিচ্ছিল। তিনি মুসলমানদের ঘুম থেকে জেগে উঠতে দেখলেন। তিনি ওই পারসিকদের ডাকলেন এবং দ্রুত বাহনে চড়তে বললেন। ওই গুপ্তচর তখন এর কারণ জানতে চাইলে রুস্তম বললেন, 'দেখো না, তোমাদের শত্রুরা যুদ্ধের ডাক দিয়েছে এবং তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে?' গুপ্তচর বলল, 'না। তারা নামাযের প্রস্তুতি নিচ্ছে। [cite: ১১৫]

যখন তারা সেতু পার হচ্ছিল, তখন মুসলমানদের তাঁবু থেকে যোহরের নামাযের আযান শোনা যাচ্ছিল। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নামায আদায় করলেন। আর রুস্তম বলে ওঠল , 'উমর আমাকে হত্যা করে ফেলছে। [cite: ১১৬]

মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রথম দিন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে সেনাপতি ও নেতাদের একত্র করেন। তাদের উদ্দেশে বলেন, 'সৈনিকদের সঙ্গে কথা বলুন, তাদের উৎসাহ দিন। কারণ, আরবদের মধ্যে আপনারা প্রসিদ্ধ ও মর্যাদাবান, কবি ও বক্তা এবং বিচক্ষণ ও নেতৃস্থানীয়।' সুতরাং তারা সৈন্যদের মুসলমানদের শৌর্য-বীর্যের কথা মনে করিয়ে দিল এবং জিহাদে উৎসাহ দিতে লাগল। [cite: ১১৭]

কাইস ইবনে হুবাইরা আল-আসাদি বললেন : হে লোকসকল, আল্লাহর প্রশংসা করো যিনি তোমাদের হেদায়েত নসীব করেছেন, তার অনুগ্রহ দান করেছেন এবং তিনি তা আরও বাড়িয়ে দেবেন ইনশাআল্লাহ। আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ রাখো এবং তার নিকট প্রার্থনা করো। গনীমত অথবা জান্নাত তোমাদের সামনে। এই দুর্গের পেছনে বিস্তীর্ণ পাথুরে আর মরুপ্রান্তর, যা পাড়ি দেওয়া অসম্ভব।

গালিব ইবনে আব্দুল্লাহ আল-লাইসি বললেন, 'হে লোকসকল, আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য তার প্রশংসা করো এবং তার নিকট আরও প্রার্থনা করো। তাকে ডাকো এবং তিনি সাড়া দেবেন। হে মুআদ্দের লোকসকল, আজ দেখি তোমরা কেমন বীরদর্পে লড়াই করো যেখানে তোমাদের রয়েছে ঘোড়া আর তরবারি? চিন্তা করো, আগামীকাল লোকেরা তোমাদের নিয়ে কী আলোচনা করবে। আর আগামীকাল তোমরাই সকল আলোচনার শীর্ষে থাকবে।'

বুসর ইবনে আবি রহম আল-জুহানি বললেন, 'আল্লাহর প্রশংসা করো এবং কথাকে কাজে পরিণত করো। ইসলামের পথে হেদায়েত লাভ করার জন্য তোমরা আল্লাহর প্রশংসা করেছ এবং তোমরা তার একক সত্তার ওপর ঈমান এনেছ—তিনি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই। তোমরা তার মর্যাদাকে সমুন্নত করেছ এবং তার নবী ও রাসূলের ওপর ঈমান এনেছ। মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না। তোমাদের চোখে দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে অবজ্ঞার যেন আর কিছুই না থাকে। যারা এ নিয়ে কম চিন্তা করে, তাদের নিকটই দুনিয়া বেশি ধরা দেয়। দুনিয়ার দিকে ধাবিত হোয়ো না, তাহলে তা তোমাকে বিপথে নিয়ে যাবে। আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করো এবং তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন।'

আসিম ইবনে আমর বললেন, 'হে আরব, তোমরা আরবের নেতা এবং তোমরা পারসিকদের নেতৃস্থানীয় লোকদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছ। জান্নাত লাভই তোমাদের পণ হওয়া উচিত। শত্রুদের দুনিয়া লাভের যে আগ্রহ, তা যেন তোমাদের জান্নাত লাভের আগ্রহ থেকে বেশি না হয়।

রাবী ইবনে আল-বিলাম আস-সাদি বললেন, 'হে আরব, দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য যুদ্ধ করো। আল্লাহ বলেন,

وَ سَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ
তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে ছুটে যাও, যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও যমীন, যা তৈরি করা হয়েছে পরহেযগারদের জন্য। [cite: ১১৮]

রাবি ইবনে আমির বললেন, 'আল্লাহ তোমাদের ইসলামের দিকে হেদায়েত নসীব করেছেন। তোমাদের ঐক্যবদ্ধ করেছেন এবং বিজয় দান করেছেন। ধৈর্যধারণেই শান্তি। সুতরাং ধৈর্যধারণে নিজেকে অভ্যস্ত করে তোলো এবং তখন এটি আর কঠিন মনে হবে না। আর ভীত-সন্ত্রস্ত হতে চেষ্টা কোরো না এবং পরে তা অভ্যাসে পরিণত হবে।

এবং বাকি সকলেই একই কথা বলেছেন। [cite: ১১৯]

২.৪.১। আরমাস দিবস
কাদেসিয়া যুদ্ধের প্রথম দিনকে আরমাস দিবস বলা হয়। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বাহিনীকে হুকুম দিলেন, ‘যে যেখানে আছ, সেখানেই অবস্থান করো। যোহরের নামায না পড়ে কেউ নড়বে না। যোহরের নামায হয়ে গেলে আমি তাকবীর বলব। তোমরাও তাকবীর বলবে এবং প্রস্তুত হয়ে যাবে। মনে রেখো, তোমাদের পূর্বে কারও জন্য তাকবীর দেওয়া হয়নি এবং এটি তোমাদের সাহায্যার্থেই দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় তাকবীর শোনার পর তোমরাও তাকবীর বলবে এবং প্রস্তুত থাকবে। তৃতীয় তাকবীর শোনার পর তাকবীর বলবে এবং অশ্বারোহী বাহিনী শত্রুদের মোকাবিলা করবে। আর আমি যখন চতুর্থ তাকবীর বলব, তখন সকলেই শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বলবে। [cite: ১২০]

সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যোহরের নামায শেষ করলেন। তার একজন গোলাম ছিল যাকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সঙ্গে থাকতে বলেছিলেন। এই গোলাম কুরআনে খুব পারদর্শী ছিল। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিহাদের সূরা (সূরা আনফাল) তিলাওয়াত করতে বললেন। সে নিকটস্থ সেনাদলের সামনে সূরা আনফাল তিলাওয়াত করল এবং অন্য সেনাদলগুলোতেও এই সূরা তিলাওয়াত করে শোনানো হলো। এত সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধি পেল এবং তাদের অন্তর প্রশান্তিতে ভরপুর হয়ে গেল। [cite: ১২১]

কুরআন তিলওয়াত শেষ হলে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকবীর বললেন। যারা তার আশেপাশে ছিল, তারাও তাকবীর বলল। তাদের থেকে শুনে শুনে সকলেই তাকবীর বলল। লোকজন সম্মুখে অগ্রসর হলো। তারপর তিনি দ্বিতীয় তাকবীর বললেন এবং লোকজন প্রস্তুত হয়ে গেল। তিনি যখন তৃতীয় তাকবীর বললেন, তখন কিছু অশ্বারোহী যুদ্ধের জন্য অগ্রসর হলেন। পারসিক বাহিনী থেকেও একই সংখ্যক লোক তাদের মোকাবিলা করার জন্য এগিয়ে এল। তাদের মধ্যে লড়াই শুরু হলো। [cite: ১২২]

মুসলিম বাহিনীর বীর যোদ্ধা গালিব ইবনে আব্দুল্লাহ আল-আসাদি, আসিম ইবনে আমর আত-তামিমী, আমর ইবনে মাদি কারিব আজ-বুবাইদি এবং তুলাইহা ইবনে খুওয়াইলিদ শত্রুর ওপর তীব্র আঘাত হানলেন। তারা শত্রুদের কতককে হত্যা করলেন, কতক পারস্যের বীরকে বন্দী করে নিয়ে এলেন। এ ক্ষেত্রে কোনো মুসলমানই আহত বা পারাজিত হয়নি। এ ধরনের দ্বৈত লড়াই যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন কৌশল। এতে হাতেগোনা কিছু বীর বেঁচে আসতে পারে। এটি বিজয়ীদের মনোবল বাড়িয়ে দেয়, তাদের সাহস বৃদ্ধি করে এবং পরাজিতদের মনোবল ভেঙে দেয় ও তাদের অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। ইসলামের প্রথম যুগের মুসলমানগণ এসব দ্বৈত লড়াইয়ে খুব বীরত্বের সঙ্গে লড়েছেন এবং সব সময়ই তারা শত্রুর চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। এভাবে তারা এ মল্লযুদ্ধ থেকে উপকৃত হয়েছিলেন। [cite: ১২৩] লোকজন চতুর্থ তাকবীরের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এ-সময় বনু নাহদ গোত্রের নেতা কাইস ইবনে হুযাইম ইবনে যারসুমাহ দাঁড়িয়ে বলেন, 'হে বনু নাহদের লোকসকল, শত্রুর দিকে দ্রুত ধাবিত হও (ইনহাদু)। তোমাদের নাম নাহদ। সুতরাং নামের মর্যাদা রাখবে।' তখন খালিদ ইবনে উরফাতাহ তাকে বলে পাঠালেন, 'আল্লাহর কসম, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করো। নতুবা তোমার পরিবর্তে আরেকজনকে নিয়োগ করব।' তারপর সে শান্ত হয়। [cite: ১২৪]

রুস্তম তার বাহিনীর কয়েকজনকে আক্রমণ করার আদেশ দেয়।
রুস্তম দেখল যে, দ্বৈত লড়াইয়ে মুসলমানরা সাফল্যে এগিয়ে গেছে এবং তারা তাদের শত্রুদের ধরাশায়ী করে ফেলেছে, তখন পরিকল্পনা অনুযায়ী সে আরও কিছু দ্বৈত লড়াইয়ের জন্য অপেক্ষা করেনি; বরং সে তার কিছু সৈন্যদের একটি মুসলিম সেনাদলের ওপর আক্রমণ করার জন্য আদেশ দেয় যেখানে ছিল বনু বাযিলা গোত্র ও অন্যান্যরা। এ আক্রমণে অনেকেই অবাক হয়। কারণ, পারসিকরা তাদের প্রায় অর্ধেক বাহিনীকে মুসলমানদের একটি ক্ষুদ্র ডিভিশনের ওপর আক্রমণ করার আদেশ দেয়। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দ্বৈত লড়াইয়ে পরাজয়ের হতাশাকে দমন করতে তারা এই আক্রমণ করে। এভাবে পারসিকরা মুসলিম বহিনীর একটি বাহুর ওপর তেরোটি হাতি নিয়ে আক্রমণ করে। আর পারসিকদের সামরিক বাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি হাতির সঙ্গে পদাতিক ও অশ্বারোহী মিলে ছিল চার হাজার সৈন্য। মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন অংশে হাতিগুলো ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু থাকে বনু বাযিলা এবং তাদের সঙ্গীরা। মুসলিম পদাতিক বাহিনী, যারা তাদের বীরত্বের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল, তারা শত্রুর বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

সাদ রা. বনু বাযিলার সাহায্যার্থে বনু আসাদকে প্রেরণ করেন
বনু বাযিলার ওপর আক্রমণের তীব্রতা লক্ষ করে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বনু আসাদের লোকজনকে খবর পাঠান, 'বনু বাযিলার সাহায্যে এগিয়ে যাও।' তুলাইহা ইবনে খুওয়ালিদ, হামমাল ইবনে মালিক, গালিব ইবনে আব্দুল্লাহ এবং আর-রিব্বাইল ইবনে আমর দ্রুত তাদের দল নিয়ে এগিয়ে গেলেন। আল-মারুরইবনে সুওয়াইদ এবং সাকীক বলেন, 'আল্লাহর কসম, তারা তাদের ওপর অনবরত তরবারির আঘাত করতে থাকে যতক্ষণ না আমরা হাতিগুলোকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হলাম। তারপর এক শক্তিশালী বীর এগিয়ে এল এবং তুলাইহা তার সঙ্গে দ্বৈত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হলো। খুব দ্রুতই তুলাইহা তাকে হত্যা করে ফেলল। পারসিকরা দেখল যে, বনু আসাদ অনবরত তিরের বর্ষণে হাতিগুলোর অবস্থা কাহিল করে দিচ্ছে। এ-সময় তারা মুসলমানদের ওপর প্রবল আক্রমণ শানিত করল। যুল হাযিব এবং জালিনূস—দুই পারসিক সেনাপতি—মুসলমানদের ওপর যৌথ আক্রমণ করে। আর এদিকে মুসলমানগণ চতুর্থ তাকবীর শোনার অপেক্ষায় ছিলেন। বনু আসাদকে পারসিক সৈন্যরা ঘিরে ফেলে। এতে তাদের হাতি তো ছিলই। কিন্তু আসাদ দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিরোধ করে। তারপর সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু চতুর্থ তাকবীর দেন। মুসলমানরা শত্রুর দিকে এগিয়ে যায়। আসাদের ওপর আক্রমণ অব্যাহত আছে এবং ডান-বাম দিকে থেকে হাতিগুলো মুসলমানদের ঘোড়াগুলোকে তাড়া করতে থাকে। হাতির কারণে ঘোড়াগুলো বেদিশা হয়ে যায়। তখন অশ্বারোহী সৈন্যগণ পদাতিক সৈন্যদের ঘোড়াগুলো হাতির দিকে ঠেলে দিতে বলে।

সাদ রা. বনু তামীমকে হাতি দমন করার দায়িত্ব দেন
সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আসিম ইবনে আমর আত-তামীমির নিকট আদেশ প্রেরণ করেন, 'হে তামীম, তোমরা উট আর ঘোড়ার মালিক না? তোমরা হাতির ব্যাপারে কিছু করতে পারবে না?' তারা বলল, 'ইনশাআল্লাহ পারব।' তারপর তিনি কিছু তিরন্দাজকে এবং কিছু অস্ত্রচালনায় দক্ষ ও ক্ষিপ্র ব্যক্তিকে ডাকলেন। তাদের তিনি বললেন, 'হে তিরন্দাজ, হাতির ওপরে আরোহী সৈন্যদের দিকে নিশানা করে তির নিক্ষেপ করো।' আরও বললেন, 'হে দক্ষ ও ক্ষিপ্র সৈনিক, হাতির পেছনে গিয়ে বাক্সগুলো কেটে দাও যাতে এর আরোহীরা নিচে পড়ে যায়।' সবাই আসাদের দিকেই লক্ষ রাখছিল। কিন্তু ডানে-বামেও তুমুল লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল। আসিমের লোকজন হাতির লেজ ও রশি কেটে দিল। তারপর হাতি উত্তেজিত হয়ে উঠল। ওইদিন এমন কোনো হাতি বাকি ছিল না যেগুলোর বাক্স কেটে ফেলা হয়নি এবং আরোহীকে হত্যা করা হয়নি। যুদ্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। আসাদের ওপর চাপও কমে আসল এবং পারসিকদের পেছনে হটিয়ে দেওয়া হলো। সূর্যাস্ত পর্যন্ত লড়াই চলল এবং রাতের শুরুতেই উভয় পক্ষ তাঁবুতে ফিরে গেল।

এদিন বনু আসাদের ৫০০ মুজাহিদ শাহাদাত বরণ করেন। তারা ছিল বাহিনীর অগ্রভাগে। আসিম এবং বনু তামীম লোকজনের ঢাল হিসাবে লড়াই করছিল। এ-ই ছিল প্রথম দিন, যা আরমাস দিবস নামে পরিচিত। [cite: ১২৫]

তুলাইহা ইবনে খুওয়ালিদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথায় বnu আসাদ গোত্রে আশ্চর্যজনক প্রভাব পড়ে। তুলাইহা ইবনে খুওয়ালিদ বলেন, 'হে আমার গোত্র, আমাদের ওপর সেনাপতির গভীর আস্থা রয়েছে। তিনি যদি জানতেন আমাদের ছাড়া অন্য কেউ এসব লোকজনের সাহায্যে এগিয়ে যেতে পারবে, তাহলে তিনি তাদেরই প্রেরণ করতেন। শত্রুর ওপর তীব্র আক্রমণ চালাও। অগ্নিশর্মা সিংহের মতো তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ো। তোমাদের বলা হয় আসাদ (সিংহ)। সুতরাং সিংহের মতোই আক্রমণ করবে। কখনো পশ্চাদপদ কিংবা পালানোর চেষ্টা করবে না। সামনে অগ্রসর হও এবং পেছনে ফিরবে না। রাবিআ কত উত্তম লড়াই করছে! আল্লাহর নামে তাদের ওপর আঘাত হানো। [cite: ১২৬]

এই কথাগুলো তার গোত্রের লোকদের ওপর বিস্ময়কর প্রভাব ফেলে। তাদের উৎসাহ এবং শক্তি জোগায়। তারা তাদের মতো বীরত্বের সঙ্গেই লড়াই করছিল যতক্ষণ না বনু তামীম তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। সেদিন তাদের ৫০০ জন শাহাদাত বরণ করে আগেই জান্নাতের পথে পাড়ি জমায়। [cite: ১২৭]

অন্যান্য গোত্র বনু আসাদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখে খুবই প্রভাবিত হয়। আল-আশআস ইবনে কাইস আল-কিন্দি বলেন, 'হে কিন্দা, বনু আসাদ কতই-না বীরত্বপূর্ণ লড়াই করছে।' এ কথা শুনে কিন্দার লোকজন রক্ষণশীল ভূমিকা থেকে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং তাদের সম্মুখে থাকা পারসিকদের তাড়িয়ে পশ্চাদপসরণে বাধ্য করে। [cite: ১২৮]

সামরিক হাসপাতাল
আল-উযাইব নামক এলাকায় যুদ্ধে আহতদের জন্য সামরিক হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। সেখানে মুজাহিদদের স্ত্রীরা অবস্থান গ্রহণ করে। তারা ধৈর্য ধরে অপেক্ষায় থাকে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কারের আশা করে। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা আহতদের চিকিৎসা সেবা দিতে থাকে। এ ছাড়া শহীদদের জন্য কবর খননের দায়িত্বও তারা পালন করে। আর এ কাজে তাদের শিশুরাও এগিয়ে আসে। চিকিৎসা-সেবা মহিলাদের জন্য সাধারণ কাজ হলেও কবর খনন সহজ ছিল না। পুরুষেরা সবাই জিহাদে ব্যস্ত থাকায় তাদের বাধ্য হয়েই এ কঠিন কাজ করতে হয়। ধৈর্য আর ঈমানী শক্তির কারণে তারা এ কাজের যোগ্য হয়ে ওঠেন। মুশাররিফ উপত্যকায়—আল-উযাইব ও আনি আশ-শামস অঞ্চলের মধ্যবর্তী একটি এলাকা— শহীদদের স্থানান্তর করা হতো। প্রথম দিন শেষে যুদ্ধবিরতির পর অনেক মুজাহিদ রাতে তাদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ লাভ করে।

যুদ্ধের আগের রাতে আল-খানসা বিনতে আমর কর্তৃক তার ছেলেদের যুদ্ধ করার জন্য উৎসাহ প্রদান।
আল-উযাইবে মহিলা ক্যাম্পে আল-খানসা বিনতে আমর—বনু সুলাইমের প্রসিদ্ধ মহিলা কবি, যার জীবন জাহেলী ও ইসলামী যুগে বিস্তৃত—তার চার ছেলেকে যুদ্ধ করার জন্য উৎসাহ দিতে থাকেন। তিনি বলেন, 'তোমরা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছ এবং নিজেদের সিদ্ধান্তেই হিজরত করেছ। তোমরা জানো যে, কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য আল্লাহ বিরাট পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর তোমরা এও জানো যে, আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবন এ দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের তুলনায় অনেক উত্তম। আল্লাহ বলেন,

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে ঈমানদারগণ, ধৈর্যধারণ করো এবং (কাফেরদের) মোকাবিলায় দৃঢ়তা অবলম্বন করো। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাকো যাতে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ হতে পার। [cite: ১২৯]

যদি তোমরা আগামীকাল প্রত্যুষে সুস্থ ও নিরাপদভাবে জেগে ওঠো, তাহলে ইনশাআল্লাহ যুদ্ধে শরীক হবে এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আর আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে তারই সাহায্য প্রার্থনা করবে। যখন দেখবে যে, যুদ্ধ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তখন সম্মুখেই অগ্রসর হবে। যদি তোমরা তা করো, তাহলে গনীমত লাভ করবে এবং আখেরাতে সম্মানিত হবে। [cite: ১৩০]

আন-নাখ গোত্রের জনৈক মহিলা কর্তৃক তার ছেলেকে জিহাদে যেতে উৎসাহ প্রদান।
আন-নাখ গোত্রের জনৈক মহিলার চার ছেলে ছিল, যারা কাদেসিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। প্রত্যুষে তিনি তার ছেলেদের বলেন, 'তোমরা ইসলাম গ্রহণ করেছ এবং তা ত্যাগ করোনি। তোমরা হিজরত করেছ ঠিকই, তবে মদীনায় হিজরত করোনি। তারপর তোমরা তোমাদের বৃদ্ধ মাকে নিয়ে এসে পারসিকদের মুখোমুখি করেছ। আল্লাহর কসম, তোমরা একই বাপের সন্তান, যেমন কিনা তোমরা একই মায়ের সন্তান। আমি তোমার পিতার অবাধ্য হইনি এবং তোমাদের মামাদেরও কোনো বেইজ্জত করিনি। যাও, যুদ্ধে অংশগ্রহণ করো এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করো।' তারপর তারা দ্রুত গিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। ছেলেরা চলে যাওয়ার পর বৃদ্ধ মা আকাশের দিকে হাত তুলে বলেন, 'হে আল্লাহ, আমার ছেলেদের রক্ষা করুন।' পরবর্তী সময়ে যুদ্ধ শেষে তার মায়ের কাছে ফিরে আসে। অসীম বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে এবং তাদের কেউই আহত হয়নি।'

কাদেসিয়া যুদ্ধের প্রথম দিনে কিছু মহীয়সী নারী এ রকমই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

২.৪.২। আগওয়াস দিবস
কাদেসিয়ার যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনকে আগওয়াস দিবস বলা হয়। এদিনে কাকা ইবনে আমরের নেতৃত্বে সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর একটি দল কাদেসিয়ায় পৌঁছে। আমীরুল মুমিনীন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার গভর্নর আবু উবাইদাকে ইরাক থেকে ফিরে এলে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাহিনীকে কাদেসিয়ায় সাহায্যের জন্য পাঠাতে বলেন। তিনি সৈন্যদের পাঠালেও খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিজের সঙ্গে রাখেন। কারণ, তাকে তার প্রয়োজন ছিল। তিনি হাশিম ইবনে উতবা ইবনে আবি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে এ দলকে কাদেসিয়ায় প্রেরণ করেন। তারা যখন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে ইরাক থেকে সিরিয়া আগমন করেন, তখন সৈন্যসংখ্যা ছিল নয় হাজার। সেখান থেকে ছয় হাজার ইরাকের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। হাশিম ইবনে উতবা অগ্রগামী দলের প্রধান হিসাবে কাকা ইবনে আসরকে নিযুক্ত করেন। এ দলের সৈন্যসংখ্যা ছিল এক হাজার। [cite: ১৩১]

কাকা ইবনে আমরের অসীম বীরত্ব
কাকা ইবনে আমর দ্রুত তার বাহিনী নিয়ে আগওয়াস দিবসে কadeসিয়ায় এসে পৌঁছেন। আসার পথে তিনি মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধির উপায় নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা করেছেন। তিনি তার বাহিনীকে এক শ’ উপদলে বিভক্ত করেন। প্রতিটি উপদলে দশ জন করে সৈন্য ছিল এবং তাদের একের পর এক কাদেসিয়ায় আবির্ভূত হতে নির্দেশ দিলেন। এ জন্য যখন একটি দল দৃষ্টিসীমানার বাইরে চলে যায়, তখন তারা পরবর্তীটি প্রেরণ করতে শুরু করে। তিনি প্রথম দশ জন নিয়ে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন। তারপর তাকে অনুসরণ করে একের পর উপদল প্রবেশ করে। কাকা ইবনে আমর যতবারই দিগন্তের দিকে দৃষ্টি দিতেন, তখন নতুন আরেকটি দলকে দেখতে পেতেন। তিনি তাকবীর বলে উঠতেন। অন্যান্য মুসলমানরা তাকে অনুসরণ করত এবং সবাইকে অনবরত যুদ্ধ করতে উৎসাহিত করতে লাগলেন। এ পদ্ধতিতে মুসলমানদের মনোবল অনেকাংশে বেড়ে যায়। মূলত ত্রিশ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনীতে মাত্র এক হাজার সৈন্য যোগ দিয়ে খুব বেশি শক্তিবৃদ্ধি করতে না পারলেও এ ক্ষেত্রে কাকা ইবনে আমর সফল হন। আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে তিনি যে পরিকল্পনা করেছেন, তাতে সামান্য শক্তিবৃদ্ধি হলেও সাধারণভাবে মুসলমানদের মনোবল বেড়ে যায়।

তিনি তাদের অনেক সাহায্য-সৈন্য আসার শুভসংবাদ প্রদান করেন এবং বলেন, ‘হে লোকসকল... আমি যা করি, তা-ই করো।’ তিনি সম্মুখে অগ্রসর হয়ে বললেন, ‘কে আছ আমার সঙ্গে লড়াই করবে?’ তার সম্পর্কে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু যে কথা বলেছিলেন, সবাই সে কথাই বলতে লাগল : ‘যে বাহিনীতে তার মতো লোক রয়েছে, সে বাহিনীকে কেউ পরাজিত করতে পারবে না।’ সবাই তাকে পেয়ে আনন্দিত হলো।

পারসিকদের পক্ষ থেকে যুল আল-হাযিব [cite: ১৩২] তার মোকাবিলায় এগিয়ে এল। কাকা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কে?' সে বলল, 'আমি বাহমান যাযাওয়াহ। সেতুযুদ্ধে তার নেতৃত্বেই পারসিকরা মুসলমানদের চরম বিপদের সম্মুখীন করে। ওই মুহূর্তে সেই দৃশ্য কাকার সামনে ভেসে ওঠে। তিনি ইসলামী চেতনায় উদ্বেলিত হয়ে চিৎকার করে বলে ওঠেন, 'আবু উবাইদ, সুলাইত এবং সেতুযুদ্ধের সব সহযোগীদের জন্য প্রতিশোধ!' যদিও এই পারসিক যোদ্ধা তার সাহসিকতার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল, কিন্তু কাকার এই চিৎকারে তার সাহস উবে গেল। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু কাকা সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন, 'এক হাজার সৈন্যের চিৎকারের চেয়ে কাকার গর্জন বেশি। ' [cite: ১৩৩] কীভাবে একজন মানুষ তা সহ্য করবে, যতই সে সাহসী ও দৃঢ় হোক না কেন? খুব ত্বরিত গতিতেই কাকা তাকে তার সৈন্যদের চোখের সামনে তরবারির আঘাতে দ্বিখণ্ডিত করেন। এভাবে তার তরবারির আঘাতের ভয়াবহতা দেখে পারসিকরা নার্ভাস হয়ে পড়ে এবং মুসলমানদের মনোবল বেড়ে যায়। কারণ, পারসিক এই নেতা ছিল বিশ হাজার সৈন্যের প্রধান।

তারপর কাকা আবার জোরে চিৎকার করে বলে ওঠে, 'কে আছ আমার সঙ্গে লড়বে?' পারসকিদের সারি থেকে দুজন বেরিয়ে এল; একজন বাইরাযান এবং আরেকজন ছিল বান্দাবান। আল-হারিস ইবনে জাবাইন ইবনে হারিস এসে কাকার সঙ্গে যোগ দেয়। কাকা বাইরাযানের সঙ্গে লড়াই করে এবং তাকে হত্যা করে। ইবনে জাবাইন বান্দাবানের সঙ্গে লড়াই করে এবং তাকে হত্যা করে। [cite: ১৩৪] বান্দাবান ছিল পারসিকদের মহাবীরদের একজন। এভাবে দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই কাকা পারসিকদের পাঁচ জন সেনাপতির দুজনকে শেষ করে দেন। নিশ্চিতভাবেই এটি ছিল পারসিকদের জন্য এক বিরাট ধাক্কা। এতে তাদের মনোবল ভেঙে যায়।

উভয়পক্ষ থেকে দুজন করে অশ্বারোহী লড়াইয়ের জন্য মুখোমুখি হয় এবং কাকা বলতে থাকেন, 'হে মুসলিম, তুমি তোমার তরবারি ব্যবহার করো এবং ফসল কেটে নাও।' লোকেরা একে অন্যকে এই কথা শোনাতে থাকে এবং তারা শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সন্ধ্যা পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকে। বর্ণনাকারী বলেন, কাকা তিরিশের অধিক আক্রমণ পরিচালনা করেন; যখনই তিনি নতুন কোনো দলকে আসতে দেখতেন, তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন। সর্বশেষে তার হাতে যে ব্যক্তিটি নিহত হয়, তার নাম ছিল বারয যামহার আল-হামাযানি।

আলবা ইবনে জাহশ আল-উজালি : যুদ্ধে তার পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যায়
পারসিকদের জনৈক সৈন্য বাকর ইবনে ওয়ালির সৈন্যদের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে বলে, 'কে আছ আমার সঙ্গে লড়াই করবে?' আলবা ইবনে জাহশ আল-উজালি তার সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করতে এগিয়ে যান। আলবা পারসিককে এমন আঘাত হানেন যা তার ফুসফুসকে বিদ্ধ করে। তারপর পারসিক সৈন্য আলবার পেটে আক্রমণ করে এবং তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যায়। তিনি মাটিতে পড়ে যান। পারসিক সৈন্য তখনই মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু আলবা বেঁচে ছিলেন, তবে দাঁড়াতে পারছিলেন না। তিনি তার নাড়িভুঁড়িগুলো পেটের ভেতর ঢুকাতে চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু পারেননি। পাশ দিয়ে মুসলিম সৈন্যদের কেউ যাচ্ছিল। তিনি তাকে বললেন, 'আমাকে সাহায্য করো।' তখন লোকটি তার নাড়িভুঁড়ি পেটে ঢুকিয়ে দেয়। আলবা তার ক্ষতস্থান হাত দিয়ে চেপে ধরে পারসিকদের সারির দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। মুসলিম সৈন্যটির দিকে আর ফিরেও তাকাননি। কিন্তু তিরিশ হাত দূরত্ব অতিক্রম করেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মৃত্যুর সময় তিনি বলতে থাকেন,

أرجو بها من ربنا ثواباً قد كنت ممن أحسن الضراباً
যুদ্ধে যারা ভালো করেছিল আমি ছিলাম তাদের একজন আমি আশা করি, আল্লাহ আমাকে পুরস্কৃত করবেন। [cite: ১৩৫]

আল-আরাফ ইবনে আল-আলম আল-উকাইলি
পারসিকদের যোদ্ধাদের একজন চিৎকার দিয়ে বলে, 'কে আছ আমার সঙ্গে লড়াই করবে?' আল-আরাফ ইবনে আল-আলম আল-উকাইলি এগিয়ে গিয়ে তার সঙ্গে মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং তাকে হত্যা করে। তারপর আরেকজন পারসিক যোদ্ধা তার সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করতে এগিয়ে আসে। আল-আরাফ ইবনে আল-আলম তাকেও হত্যা করেন। তারপর পারসিকদের অশ্বারোহীরা তাকে ঘিরে ফেলে এবং তাকে মাটিতে ফেলে দেয়। তিনি তার অস্ত্র মাটিতে ফেলে দেন এবং পারসিকরা তা দেখতে পায়। তিনি মাটির ধুলো তাদের চেহারার দিকে ছুড়ে মারেন। এই ফাঁকে তিনি তার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হন। [cite: ১৩৬]

খানসা রা.-এর চার ছেলের আত্মত্যাগ
ওইদিন খানসা রাযিয়াল্লাহু আনহার চার ছেলে শাহাদাত বরণ করেন। তারা প্রচণ্ড আগ্রহ-উদ্দীপনায় জিহাদে অংশগ্রহণ করে। প্রত্যেকেই কুরআন মাজীদের আয়াত তিলাওয়াত করে নিজেকে এবং ভাইদের উৎসাহ দিতে থাকেন। তারা একের পর এক রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেন এবং শহীদ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত লড়াই করেন। [cite: ১৩৭] চার ছেলের শাহাদাতের খবর খানসা রাযিয়াল্লাহু আনহার নিকট পৌঁছলে তিনি বলেন, 'আল্লাহর জন্য প্রশংসা, যিনি আমাদের ছেলেদের শাহাদাত নসীব করে আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমি আশা করি, আল্লাহর রহমতে তাদের সঙ্গে আমার জান্নাতে আবার সাক্ষাৎ হবে। [cite: ১৩৮]

কাকা রা.-এর অভূতপূর্ব রণকৌশল
আগওয়াস দিবসে কাকা এবং তার চাচাত ভাই তামীম এমন এক রণকৌশল প্রয়োগ করেন, যা পারসিকদের মারাত্মক ভয় ধরিয়ে দেয়। তিনি যখন জানলেন যে, প্রথম দিন পারসিক বাহিনীর হাতি মুসলমানদের ঘোড়াগুলোকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে, তখন তিনি আল্লাহর অনুগ্রহে নতুন এক কৌশল বের করলেন। তিনি উটগুলোকে ভীতিকর এক সাজে সাজালেন যাতে শত্রুপক্ষের ঘোড়াগুলো তা দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। তারা উটের ওপর কাপড় জড়ালেন, সাজ-সরঞ্জাম পরালেন এবং সেগুলোর চেহারায় মুখোশ পরিয়ে দিলেন। তারপর পদাতিক সৈন্যদের এসব উটের ওপর আরোহণ করতে বললেন। আর এদের নিরাপত্তায় চারিদিকে নিজেদের অশ্বারোহী বহর রাখলেন। তারপর তারা পারসিক বাহিনীর অশ্বারোহীদের ওপর আক্রমণ করলেন। ফলে আরমাস দিবসে মুসলমানদের ঘোড়াগুলোর যে দুর্গতি হয়েছিল, আগওয়াস দিবসেও পারসিকদের ঘোড়াগুলো একই আচরণ করল। ভয়ানক আকৃতির উটগুলো সেদিন ছোট-বড় সব শত্রুদলের ওপরই আক্রমণ করেছে। আর অশ্বারোহীরা সেগুলো ধাওয়া করে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে। মুসলমানদের অন্যান্য সেনাদল এ দৃশ্য দেখে তারাও একইভাবে উটগুলো সাজানো শুরু করে। ওইদিন মুসলমানদের উটের বহরের জন্য পারসিক বাহিনী এত বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়, যা মুসলমানগণ আরমাস দিবসে হাতির জন্য হয়েছিল। [cite: ১৩৯]

এ থেকে এটি স্পষ্ট যে, প্রথম যুগের মুসলমানগণ অভিনব রণকৌশল চিন্তা ও প্রয়োগে শত্রুদের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। পারসিকরা যুদ্ধের প্রথম দিন হাতি ব্যবহার করে মুসলমানদের তটস্থ করে রাখে। আর যেহেতু মুসলমানদের কোনো হাতি ছিল না, এ জন্য তারা তাদের বোকা বানানোর জন্য উটগুলোকে হাতির মতো সজ্জিত করে। এই জিনিয়াস কৌশল প্রয়োগ করে শত্রুদের ঘোড়াগুলোকে দিশেহারা করে তোলা সম্ভব হয় এবং সেগুলো পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। মুসলমানদের এমনই কাজ করা উচিত—জাগতিক সকল প্রস্তুতি নিয়ে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ লাভে এগিয়ে যাবে।

রণাঙ্গনের মূল পটভূমিতে আবু মিহজান আস-সাকাফি
আগওয়াস দিবসে মধ্যরাত অবধি যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। এ রাতকে লাইলাতুল আস-সাওয়াদ বলা হয়। উভয় পক্ষ পেছনে হটলে যুদ্ধ থামে। এই যুদ্ধবিরতিতে মুসলমানদের ব্যাপক লাভ হয়। এই সুযোগে তারা শহীদদের মুশারররিক উপত্যকায় দাফন করতে সমর্থ হয়। আর আহতদের আল-উযাইবে চিকিৎসা নিতে প্রেরণ করে। ওই রাতে আবু মিহজান আস-সাকাফি প্রথমবারের মতো এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। [cite: ১৪০] তিনি ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ কবি ও বীর। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে পায়ে শেকল দিয়ে বন্দী করে রেখেছিলেন। সন্ধ্যায় তিনি সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গমন করেন এবং তার নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করে মুক্তির আশা করেন। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে তিরস্কার করেন। তখন তিনি নিচে নেমে এসে সালমা বিনতে খাসাফার নিকট গিয়ে বলেন, 'হে সালামা, হে খাসাফার কন্যা, আপনি ভালো কিছু করতে চান?' সালামা বিনতে খাসাফা বলেন, 'সেটা কী?' তিনি বলেন, 'আমাকে ছেড়ে দিন এবং একটি ঘোড়া ধার দেন। আল্লাহর কসম, যদি আল্লাহ আমাকে অক্ষত রাখেন, তাহলে আবার এসে স্বেচ্ছায় এই বন্দীত্ব গ্রহণ করব।' তিনি বললেন, 'আমি কেন এ কাজ করব?' আবু মিহযান নিরাশ হয়ে এ কবিতা পাঠ করতে থাকেন,

كفى حزنًا أن تردي الخيل بالقنا وأترك مشرودًا علي وثاقياً إذا قمت عناني الحديد وأغلقت مصارع دوني قد تصم المناديا وقد كنت ذا مال كثير وإخوة فقد تركوني واحد الا أخاليا والله عهد لا أخيس بعهده لئن فرجت أن لا أزور الحوانيا
আমার জন্য এ দুশ্চিন্তাই যথেষ্ট যে, আরোহীরা পরাজিত বর্শাঘাতে, আর আমি শিকলে বন্দী অবস্থায় পরিত্যক্ত।
আমি যখন উঠতে চাই, শিকল আমাকে উঠতে দেয় না এবং দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর চিৎকারকারী চিৎকার করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়।
অথচ ইতিপূর্বে প্রচুর ধনসম্পদ ও জনবলে আমি ছিলাম গর্বিত আজ তারা আমাকে একা ফেলে চলে গেছে; আমার কোনো সাথী নেই।
আমি প্রতীজ্ঞা করেছি আল্লাহর সঙ্গে এবং তা আমি কিছুতেই ভঙ্গ করব না। যদি কোনোদিন এই জিঞ্জির ছুটে যায়, তবে কখনো ঐসব পশুদের চেহারা আর দেখব না। [cite: ১৪১]

সালামা বললেন, 'আমি ইস্তেখারা করেছি এবং তোমার প্রতিশ্রুতিতে আমার বিশ্বাস জন্মেছে।' তারপর তিনি আবু মিহজানকে ছেড়ে দেন এবং বলেন, 'তবে আমি তোমাকে কোনো ঘোড়া ধার দিতে পারব না।' তিনি তার ঘরে ফিরে গেলেন। কিন্তু আবু মিহজান ঘোড়াটি নিয়ে নিলেন এবং দুর্গের গেইট—যা পরিখার নিকটে ছিল—পার হয়ে তাতে চড়ে বসলেন। তারপর দ্রুত রণক্ষেত্রে মুসলমানদের ডান বাহুতে যোগ দেন। ভীষণ জোরে তাকবীর বলে শত্রু বাহিনীর বাম বাহুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন—শানিত তরবারির আঘাতে শত্রুদের কাবু করতে থাকেন। তারপর তিনি পেছনে সরে এসে মুসলমানদের বাম বাহুতে যোগ দেন। আবারও তাকবীর বলে শত্রু বাহিনীর ডান বাহুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন—তরবারির তীব্র আঘাতে শত্রুদের হত্যা করতে থাকেন। তারপর তিনি আবার পেছনে গিয়ে শত্রুদের মূল কেন্দ্রে আঘাত হানেন। তিনি মুশরিকদের বধ করতেই থাকেন; সেই রাতে বিস্ময়করভাবে লড়াই করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। কিন্তু কেউই জানত না এই লোকটি কে। কারণ, তারা তাকে যুদ্ধের শুরুতে দেখেনি। কেউ কেউ বলতে লাগল, 'তিনি নিশ্চয়ই হাশিমের কোনো সহযোগী হবেন অথবা হয়তো হাশীমই।' [cite: ১৪২]

দুর্গের ছাদে পেটে ভর দিয়ে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এ দৃশ্য দেখছিলেন। তিনি বললেন, 'এ বাহাদুর তো আবু মিহজানের মতো লাগে, কিন্তু সে তো কয়েদখানায় বন্দী। আর এ তো আমার আল-বালকা ঘোড়ার মতো লাগছে।' চারিদিকে আবু মিহজান সম্পর্কে গুজব রটে গেল, কে এই ব্যক্তি? মধ্যরাত্রিতে উভয়পক্ষ পেছনে সরে আসাতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলো। আবু মিহজান ফিরে এসে তার পায়ে বেড়ি পরে নিল। সালামা তাকে বললেন, 'হে আবু মিহজান, সেনাপতি তোমাকে কেন বন্দী করে রেখেছে?' তিনি বললেন, 'আমাকে মদ্যপানের অভিযোগে তিনি বন্দী করেননি। কারণ, আমি জাহেলী যুগে মদ্যপান করতাম; বরং আমি কবি। আমার মনে যা আসে, আমি তা-ই বলে ফেলি। আমার কথাই আমাকে বিপদে ফেলে। এ জন্য তিনি আমাকে বন্দী করেছেন। আমি আমার এক কবিতায় বলেছি,

إِذَا مِتُّ فَادْفِنِّي إِلَى أَصْلِ كَرْمَةٍ تُرَوِّي عِظَامِي بَعْدَ مَوْتِي عُرُوقُهَا وَلَا تَدْفِنَّنِي بِالْفَلَاةِ فَإِنَّنِي أَخَافُ إِذَا مَا مِتُّ أَلَّا أَذُوقُهَا وَتُرَوِّي بِخَمْرِ الْحِصِّ لَحْدِي فَإِنَّنِي أَسِيْرٌ لَّهَا مِنْ بَعْدِ مَا قَدْ أَسُوقُهَا
যদি আমি মারা যাই, তাহলে আমাকে আঙুর বাগানে কবর দিয়ো যাতে তার মাতাল রসে আমার শিরা-উপশিরা তৃপ্ত থাকে। আমাকে কোনো মরুভূমিতে কবর দিয়ো না; আমার ভয় হয়, আমি হয়তো কখনোই আর এর স্বাদ পাব না। আঙুরের মাদকতায় আমার কবরের সব ধূলিকণা সিক্ত হয়ে উঠবে আর আমি তখন তার স্বাদ আস্বাদন করব। [cite: ১৪৩]

পরদিন সালামা সেনাপতি সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট সব ঘটনা খুলে বলেন। তিনি তাকে ডেকে মুক্ত করে দিয়ে বলেন, 'এখন থেকে আমি আর কখনোই তোমাকে ধরব না যদি তুমি যা বলো, তা করে থাকো।' আবু মাহজান বললেন, 'আমি আর কখনো জিহ্বার মন্দ কথায় সাড়া দেব না'। [cite: ১৪৪]

আস-সাওয়াদ রাতের শেষ দিকে কাকা রা.-এর পরিকল্পনা
আস-সাওয়াদ রাতের শেষ অর্ধেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা সংঘটিত হয়। এ সময় কাকা ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পরের দিন মুসলমানদের মনোবল ও শক্তি বৃদ্ধিতে নতুন এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি তার বাহিনীকে রাতেই যুদ্ধ ময়দান ত্যাগ করে দূরে কোথাও অবস্থান নিতে বলেন। এক শ সৈন্যের ছোট ছোট দলে তাদের বিভক্ত করেন এবং পরের দিন প্রত্যুষে একের পর এক আবার রণক্ষেত্রে ফিরে আসার নির্দেশ দেন। তিনি তাদের বলেন, 'সূর্য ওঠার পর একসঙ্গে এক শ জন আসবে; যখনই কোনো দল দৃষ্টির আড়াল হবে, তখন আবার এক শ জনকে পাঠাবে। যদি হাশিমও একই নীতি অনুসরণ করে, তাহলে ভালো। আর তা নাহলে এভাবে আমরা আমাদের লোকজনের মনোবল ও শক্তি বৃদ্ধি করতে সক্ষম হব।'

সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কাকা রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রহরী নিযুক্ত করলেন। তিনি দূর থেকে এক অশ্বারোহী বাহিনীকে আসতে দেখে তাকবীর বলে উঠলেন এবং লোকজনও তাকবীর বলল। তারা বলতে লাগল, 'নতুন সাহায্য-সৈন্য এসে পড়েছে'। তার ভাই আসিম ইবনে আমরও একই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেন এবং তার লোকদের একই কাজ করতে বলেন। তারা রণক্ষেত্রে অন্য আরেক দিক থেকে প্রবেশ করে। কাকা রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাহিনীর শেষ দলটি আসার পরেই হাশিম ইবনে উতবাও সিরিয়া থেকে সাত শ মুজাহিদ নিয়ে প্রবেশ করেন।

কাকা রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাহিনীর শেষ দলটি এসে পৌঁছার পর হাশিম রাযিয়াল্লাহু আনহু সত্তর জন সৈন্য নিয়ে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। [cite: ১৪৫]

এখানে হাশিম ইবনে উতবার বিনয় দেখার মতো। তিনি কাকা রাযিয়াল্লাহু আনহুর রণকৌশল মেনে নেন। তিনি তার বাহিনীকে সত্তর জনের ছোট ছোট দলে বিভক্ত করেন, যেমন কিনা কাকা রাযিয়াল্লাহু আনহু করেছিলেন। তিনি তার অধীন এক সেনাপতির রণকৌশল মেনে নিতে কার্পণ্য করেননি। এ ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিত্ব কিংবা অবস্থান কোনো বাধা হয়ে ওঠেনি। তিনি তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে গড়া মানুষ, যারা ইসলামের স্বার্থে নিজেদের সব চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিতে শিখেছেন। ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমে এটাই তাদের বিজয়ের অন্যতম কারণ এবং তারা তদানীন্তন পরাশক্তিদের এ কারণেই পরাভূত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। [cite: ১৪৬]

২.৪.৩। ইমাস দিবস
এটি ছিল যুদ্ধের তৃতীয় দিন; ইমাস দিবস। পারস্যের সেনাপতিরা নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আবির্ভূত হয়। যুদ্ধের প্রথম দিন মুসলিম সেনারা তাদের হাতির বাক্স ও দড়ি কেটে দেয়। ফলে তারা যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল, তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রতিটি হাতির সঙ্গে পদাতিক বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে। আর পদাতিক সৈন্যদের রক্ষায় অশ্বারোহী সেনাদের নিযুক্ত করে। মুজাহিদরা হাতি, হাতির ওপরে ও চারিদিকে অবস্থানরত সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যায় এবং বস্তুত তারা এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলমানদের এই কঠিন অবস্থা দেখে বিচলিত হন। তিনি দলের সঙ্গে থাকা কিছু পারসিক মুসলমানকে ডেকে হাতি থেকে পরিত্রাণের উপায় ও তাদের দুর্বল দিক সম্পর্কে জানতে চান। তারা তাকে জানান যে, হাতির দুর্বল পয়েন্ট হচ্ছে শুঁড় ও চোখ; এগুলো অকেজো করে দিলে হাতি অনিবার্যভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। দ্রুত সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কাকা ইবনে আমর ও আসিম ইবনে আমরের নিকট নির্দেশ পাঠালেন: 'সাদা হাতিটাকে বধ করো।' কাকা হাতিটির ব্যাপারে জ্ঞাত ছিলেন এবং এর কাছাকাছিই ছিলেন। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হাম্মাল ইবনে মালিক এবং রুবাইবিল ইবনে আমর আল-আসদির নিকটও নির্দেশ প্রেরণ করেন, 'তোমরা ঘেয়ো হাতিটিকে শায়েস্তা করো।' তারাও এ হাতির ব্যাপারে জানতেন এবং কাছাকাছিই ছিলেন।

কাকা এবং আসিম কিছু পদাতিক ও অশ্বারোহী সদস্য নিয়ে হাতির দিকে এগিয়ে যান। তিনি তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, 'হাতিটিকে ঘিরে ফেলো এবং এটিকে বিভ্রান্ত করো।' সত্যি সত্যি হাতিটি ডান-বামে বিভ্রান্তের মতো ছুটোছুটি করতে লাগল। চারিদিকে মানুষ দেখে সে কোনদিকে তাড়া করবে, বুঝে উঠতে পারছে না। এই সুযোগে কাকা এবং আসিম হাতিটির নিকটে অগ্রসর হলেন। তারা তাদের বর্শা দিয়ে দুরন্ত নিশানায় হাতির চোখ দুটো ঘায়েল করে ফেলে। এতে হাতি উত্তেজিত হয়ে এর আরোহীকে ছুড়ে ফেলে। তারপর তরবারির এক আঘাতে কাকা হাতিটির শুঁড় কেটে দেন। হাতিটি তখন একদিকে কাত হয়ে পড়ে যায়। আর তাতে এর ওপরে থাকা পারসিক সৈন্যরা চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করে।

হাম্মাল ইবনে মালিক ঘেয়ো হাতির দিকে এগিয়ে যান এবং রিবাঈল ইবনে আমরকে বলেন, 'হয় তুমি হাতির শুঁড়ে আঘাত করো, তাহলে আমি এর চোখ বরাবর নিশানা করব। আর যদি তুমি এর চোখে আঘাত করতে চাও, তাহলে আমি এর শুঁড় কেটে দেব।' রুবাইবিল শুঁড়ে আঘাত করতে মনস্থ করেন। হাম্মাল বর্শা দিয়ে হাতিটির চোখ অন্ধ করে দেয়। হাতিটি পেছনে কাত হয়ে পড়ে যায়। এরপর সেটি উঠে দাঁড়ালে রুবাইবিল তরবারির আঘাতে এর শুঁড় কেটে দেয়। হাতির ওপর বসে থাকা পারসিক সৈন্য এ দৃশ্য দেখে এবং রুবাইবিলের মাথা ও নাক বরাবর কঠিন আঘাত করে। তবে রুবাইবিল ও হাম্মাল দুজনই অক্ষত ফিরে আসতে সক্ষম হন। এদিকে অন্যান্য হাতিগুলো নেতৃস্থানীয় দুটি হাতিকে হারিয়ে শূকরের মতো বিকট আওয়াজ করে রণক্ষেত্র থেকে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। পারসিক সেনাদের সারি ছত্রভঙ্গ করে আতীক নদীতে ঝাঁপ দেয় এবং মাদাইনের দিকে পালাতে থাকে। আর এসব হাতির সব আরোহীই নিহত হয়। [cite: ১৪৭]

রণক্ষেত্র হাতিমুক্ত হতেই উভয়পক্ষের সৈনিকরা একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকে এবং যুদ্ধ কঠিন আকার ধারণ করে। পারসিক বাহিনীতে কিছু বীর যোদ্ধা মজুদ ছিল। যদি তাদের কোনো সারিতে গ্যাপ তৈরি হতো, তখনই ইয়াযদগিরদ সেখানে সৈন্য পাঠিয়ে তা পূরণ করার চেষ্টা করত। ওই দিন উভয়পক্ষই সমানে সমান যুদ্ধ করে ক্ষান্ত হয়। [cite: ১৪৮]

আমর ইবনে মাদি কারিবের বীরত্ব
আমর ইবনে মাদি কারিব বলেন, 'আমি হাতি এবং এর চারিদিকে অবস্থানরত সৈনিকদের আক্রমণ করতে যাচ্ছি। একটি উটকে জবাই করতে যতক্ষণ সময় লাগে, এর চেয়ে বেশি সময় আমাকে একা ফেলে যেয়ো না। যদি এতে দেরি করো, তাহলে আবু সওরকে (মানে আমাকে) আর জীবিত পাবে না। আর তোমরা আবু সওরের মতো আরেকজন লড়াকু সৈনিক কোথায় পাবে? যদি তোমরা সময়মতো আসো, তাহলে আমার তরবারি আমার হাতেই দেখতে পাবে।' এ কথা বলেই আমর ইবনে মাদি কারিব শত্রুদের আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং অগ্রসর হতে হতে ধুলোর আস্তরণে হারিয়ে যায়। তারা সাথিরা বলাবলি করল, 'কিসের জন্য অপেক্ষা করছ? তোমরা তো তাকে হারিয়ে ফেলবে। আর যদি তাকে হারিয়ে ফেলো, তাহলে মুসলিম জাতি তাদের এক অভিজাত বীর সন্তানকে হারাবে।' তারপর তারাও শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুশরিকরা আমর ইবনে মাদি কারিবকে ছুরিকাহত করে মাটিতে ফেলে দেয়। কিন্তু তখনো তার হাতে তরবারি থাকায় তা দিয়ে তিনি শত্রুদের প্রতিহত করার চেষ্টা করছিলেন। তার ঘোড়াও আহত হয়। তিনি তার সঙ্গীদের দেখলেন এবং পারসিকরাও তখন তার থেকে দূরে সরে গেছে, তখন তিনি এক পারসিক সৈন্যের ঘোড়ার পা ধরে ফেলেন। পারসিক সৈন্যটি ঘোড়াকে চালানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে; ঘোড়া হোঁচট খেল এবং পারসিক সৈন্যটি আমরকে দেখতে পেল। সে তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলো। অন্যান্য মুসলমান সৈনিকরা দেখে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে। পারসিক সৈন্য ঘোড়া থেকে নেমে দৌড়ে তার সঙ্গীদের কাছে চলে যায়। আমর তখন বলেন, 'আমাকে ঘোড়ার রশিটি দাও।' তাকে তা দেওয়া হলে তিনি তার ওপর চড়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। [cite: ১৪৯]

তুলাইহা ইবনে খুওয়াইলিদ আল-আসাদি
তৃতীয় দিন রাতেও যুদ্ধ চলতে থাকে। তুলাইহা ইবনে খুওয়াইলিদ আল-আসাদি যুদ্ধ করতে করতে শত্রুপক্ষের পেছনের সারি ভেদ করে চলে যান। তখন তার আওয়াজ শোনা যায়। তিনি তাদের যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য করেন এবং তখন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তার চিৎকারে পারসিকরা ভয় পেয়ে যায় এবং মুসলমানগণ বিস্মিত হয়। তারা যুদ্ধ বন্ধ করে চারিদিক দেখতে থাকে যে, আসলে কী হচ্ছে। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে এমন স্থানে প্রেরণ করেন যেখানে মুসলমানদের বিপদে পড়ার আশঙ্কা ছিল। তিনি তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শত্রু-লাইন অতিক্রম করেন এবং পারসিকদের পেছন থেকে বেরিয়ে এসে তিনবার তাকবীর-ধ্বনি—আল্লাহু আকবার—দেন। [cite: ১৫০] তার এই কৌশল খুব কার্যকরী ছিল। যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাওয়াতে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাতে লড়াই করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

কাইস ইবনে আল-মাকশুহ
হাশিম ইবনে উতবার সঙ্গে তিনি সিরিয়া থেকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি তার লোকদের বলেন, ‘হে আরব, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ইসলামে দাখিল করে তার রহমতে সিক্ত করেছেন এবং তার রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দিয়ে সম্মানিত করেছেন। তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহে একে অন্যের ভাই হয়েছ। তোমাদের আহ্বান একই এবং তোমরা ঐক্যবদ্ধ। এর আগে তোমরা পরস্পর শত্রুতায় লিপ্ত ছিলে। একে অন্যের সঙ্গে সিংহের মতো লড়াই করতে এবং ভল্লুকের মতো অন্যের সম্পদ ছিনিয়ে নিতে। আল্লাহকে সাহায্য করো। তাহলে আল্লাহও তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তিনি পারসিকদের ওপর তোমাদের বিজয় দান করবেন। আল্লাহ তোমাদের ভাইদের সিরিয়ায় বিজয় দান করেছেন। তারা সেখানে লাল প্রাসাদ ও দুর্গ দখল করে নিয়েছে। [cite: ১৫১]

আল-হারির রজনি
চতুর্থ দিন শুরু হওয়ার আগের রাতেই আবার যুদ্ধ শুরু হয়। এ রাতকে হারির রজনি বলা হয়। পারসিকরা এ রাতে তাদের যুদ্ধকৌশলে পরিবর্তন আনে। রুস্তম উপলব্ধি করে যে, তার অশ্বারোহী বাহিনী মুসলমানদের অশ্বারোহীদের মতো বীরত্ব প্রদর্শন করতে পারছে না। এমনকি তার ধারে-কাছেও নেই। এ জন্য সে পুরো বাহিনী দিয়ে একত্রে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাহলে অতীতের মতো তাদের আর পেছনে সরে আসতে হবে না। এর আগের ঘটনায় সৈনিকদের মনোবল ধ্বংস করে দিয়েছে। মল্লযুদ্ধে মুসলমানদের বিস্ময়কর বীরত্ব দেখে আর কোনো পারসিক সেনা মল্লযুদ্ধ করার সাহস পায়নি। রুস্তম তার বাহিনীকে তেরোটি লাইনে সারিবদ্ধ করে; কেন্দ্রসহ উভয় বাহুতেই। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকবীর বলার আগেই বাহিনীর সেরাদের নিয়ে কাকা ইবনে আমর যুদ্ধ শুরু করে দেন। পরে তিনি তাদের থামিয়ে দেন এবং এ জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। তারপর তিনি তিনবার তাকবীর বলার পর সকল সেনাপতি ও সৈন্যরা তিন সারিতে সম্মুখে অগ্রসর হয়; তিরন্দাজ বাহিনী, অশ্বারোহী বাহিনী এবং পদাতিক বাহিনী। ওই রাতে যুদ্ধ মারাত্মক আকার ধারণ করে। তারা প্রথম রাত থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান। যুদ্ধের ময়দানে কোনো কথার আওয়াজ শোনা যায়নি। কেবল ঘোঁত ঘোঁত আওয়াজ (আল-হারির) ছাড়া। এ জন্য এ রাতকে হারির রজনি বলে। মুসলমানরা একে অন্যকে সর্বাত্মক শক্তি দিয়ে লড়াই করার জন্য উৎসাহ দিতে থাকেন। কারণ, তারা প্রচণ্ড লড়াইয়েরই আশঙ্কা করছিলেন। তাদের কথা-বার্তা অনুযায়ী এ রকমই মনে হয়। নিচে কিছু বর্ণনা করা হলো [cite: ১৫২]:

দুরাইদ ইবনে কাব আন-নাখাঈ লোকজনকে বলেন, 'আজ রাতে মুসলমানগণ সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সুতরাং তাদের প্রথম হওয়ার চেষ্টা করো; আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবার আগে জিহাদে অগ্রসর হও। আজ রাতে যে অন্যকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে, সে-ই আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত পুরস্কার লাভ করবে। শাহাদাতের জন্য মরিয়া হয়ে তাদের মোকাবিলা করো এবং মৃত্যুকে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করো। যদি তুমি বেঁচে থাকতে চাও, মৃত্যুকে এড়ানোর এটাই শ্রেষ্ঠ উপায়। আর যদি তা না চাও, তাহলে আখেরাত তেমনই, হবে যা তুমি খুঁজে বেড়াচ্ছ।'

আল-আশআস ইবনে কাইস বলেন, 'হে আরব, এসব লোকেরা (পারস্য বাহিনী) মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার ক্ষেত্রে তোমাদের থেকে বেশি উৎসাহিত এবং দুনিয়াকে অবজ্ঞা করার ক্ষেত্রে তোমাদের চেয়ে অগ্রগামী যেন না হয়। নিজেদের স্ত্রী-সন্তানদের জন্য লড়াইয়ে প্রতিযোগিতা করো এবং মৃত্যুকে ভয় পেয়ো না। কারণ, মহান লোকেরা এর মাধ্যমেই শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করার আকাঙ্ক্ষা করে। [cite: ১৫৩]

হুমাইদাহ ইবনে আন-নুমান আল-বারাকি বলেন, 'হারির রজনিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত এক পারসিক বাহিনী যুফা গোত্রের সম্মুখে ছিল। তারা তাদের দিকে অগ্রসর হয়ে তরবারি দিয়ে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়, কিন্তু তারা দেখতে পেল তাদের তরবারি তাদের শিরস্ত্রাণ ভেদ করতে পারছে না। এ জন্য তারা পেছনে সরে আসে।' হুমাইদাহ ইবনে আন-নুমান তাদের বলেন, 'তোমাদের কী হলো?' তারা বলল, 'আমাদের অস্ত্র তাদের বিরুদ্ধে কোনো কাজেই আসছে না।' তিনি বললেন, 'অপেক্ষা করো। আমি তোমাদের দেখাচ্ছি কীভাবে তা কাজে লাগাতে হয়।' সুতরাং তারা দেখতে লাগল। হুমাইদাহ ইবনে আন-নুমান শত্রুদের একজনকে পেছন থেকে আক্রমণ করলেন, বর্শার আঘাতে তাকে ধরাশায়ী করলেন।' তারপর লোকদের কাছে ফিরে এসে বললেন, 'তাদের হত্যা করার এটাই পদ্ধতি।' তারপর সবাই শত্রুদের বিরুদ্ধে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাদের বিতাড়িত করে। [cite: ১৫৪]

পারসিক এক কমান্ডার তুরক আত-তাবারির বাহিনী মুসলমানদের কিন্দা গোত্রের নিকটেই অবস্থান করছিল। আল-আশআস ইবনে কাইস আল-কিন্দি বললেন, 'হে লোকসকল, তাদের দিকে অগ্রসর হও।' তারপর তারা সাত শ মুজাহিদ নিয়ে ওই বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে এবং তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। আর তিনি নিজেই কামন্ডার তুরককে হত্যা করেন।

এ রাতে যুদ্ধ ভয়াবহ হয়ে ওঠে এবং অনবরত চলতে থাকে। গোত্রের নেতারা লোকজনকে দৃঢ়পদ ও ধৈর্যধারণে উৎসাহিত করতে থাকেন। আনাস ইবনে আল-হুলাইস থেকে আত-তাবারি কর্তৃক বর্ণিত এক বর্ণনা যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করা যায়। তিনি বলেন, 'আমি আল-হারির রজনিতে উপস্থিত ছিলাম। সে রাতে সকাল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অস্ত্রের ঝনঝনানি কামারের লোহা পেটানোর শব্দের মতোই প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। তারা সে রাতে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন এক রাত অতিক্রম করেন, যা তিনি কখনোই করেননি। আরব ও পারসিকরা এমন যুদ্ধ কখনো দেখেনি। রুস্তম কিংবা সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষ থেকে কোনো খবরই আসছিল না। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অর্ধরাত পর্যন্ত দুআয় মশগুল ছিলেন।

সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পেরেছিলেন, বিজয় খুব সন্নিকটে। এ জন্য সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু রাতে দুআয় মশগুল থাকেন এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করেন। এখানে উল্লেখ্য, সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন 'মুসতাজাবুদ দাওয়া', মানে তার দুআ কবুল করা হতো। [cite: ১৫৫]

২.৪.৪। কাদেসিয়া দিবস
চতুর্থ দিনেও যুদ্ধ অব্যাহত ছিল। কাকা ইবনে আমর লোকদের মধ্যে গিয়ে ঘোষণা করলেন, 'ধৈর্যধারণকারীদের জন্য বিজয় অনিবার্য। সুতরাং আর কিছু সময় ধৈর্যধারণ করো এবং প্রবল বিক্রমে আক্রমণ করো। ধৈর্যধারণের মাধ্যমেই বিজয় অর্জিত হয়। সুতরাং অস্থিরতার পরিবর্তে ধৈর্যকে প্রাধান্য দেবে।' অনেক নেতৃস্থানীয় লড়াকু বীর এসে তার চারিদিকে জমা হয়। তারপর তারা রুস্তমের কেন্দ্রীয় বাহুতে আক্রমণ করে এবং এক পর্যায়ে তারা তার খুব নিকটে পৌঁছে যায়। গোত্রের লোকেরা এ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলে তাদের নেতারা জ্বালাময়ী বক্তব্য দেন। কাইস ইবনে আবদি ইয়াগসুস, আশআস ইবনে কাইস, ইমর ইবনে মাদি ইয়াকরিব, ইবনে যি আস-সাহমাইন, খাসামি এবং ইবনে যি আল-বুরমাইন আল-হিলালি উঠে দাঁড়ান এবং বলেন, 'তোমাদের থেকে এসব লোকদের (পারসিক বাহিনী) মধ্যে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সাহস কখনোই বেশি নয়, অথবা দুনিয়াকে অবজ্ঞা করার ক্ষেত্রে তোমাদের চেয়ে তারা অগ্রগামীও নয়।' রাবিআ গোত্রের কয়েকজন দাঁড়িয়ে বলল, 'তোমরা পারসিক বাহিনী সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানো এবং ইতিপূর্বে তাদের বিরুদ্ধে অসীম সাহসিকতার পচিয় দিয়েছ। এখন অতীতের মতো সাহসী ভূমিকা রাখতে তোমাদের কিসে বাধা দিচ্ছে?' [cite: ১৫৬]

সুতরাং এ দৃষ্টিকোণ থেকে কাকা ইবনে আমরের বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। মূলত তার বিচক্ষণতা ও দূরদৃষ্টির অনেক ঘটনা রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাকে বিরল সাহস, বিচক্ষণতা এবং দৃঢ় ঈমান দান করেছিলেন। আর তিনি মুসলমান ও ইসলামের স্বার্থে সব যোগ্যতারই পরিপূর্ণ ব্যবহার করেছেন। কাকা অনুধাবন করতে সক্ষম হন যে, টানা এক দিন ও এক রাত যুদ্ধ করে পারসিকরা ধৈর্যহারা হয়ে পড়েছে। এর আগে দুদিন যুদ্ধের মধ্যে সামান্য সময় বিরতি পেয়েছিল। তার অভিজ্ঞতা ও দূরদৃষ্টির কারণে এবং আল্লাহর অনুগ্রহে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যুদ্ধের সাফল্য তাদের দিকেই ঝুঁকবে, যারা এ দীর্ঘ ও কষ্টকর লড়াইয়ে ধৈর্যধারণ করতে সক্ষম হবে। কাকা এবং তার সঙ্গে থাকা সাহসী বীরগণ পারসিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় বাহুতে আঘাত হানেন এবং দুপুর নাগাদ লড়াই করে রুস্তমকে তাদের হাতের নাগালে পেয়ে যান। আর এ মুহূর্তেই আল্লাহর সাহায্য নেমে আসে এবং তিনি তার প্রিয় ও নিকটতম বান্দাদের (আউলিয়ায়ে কেরাম) তার সৈন্যসামন্ত দিয়ে সাহায্য করেন; এক ভীষণ ঝড়, দাবুর বা পশ্চিমা বাতাস রুস্তমের রাজকীয় আসনের তাঁবু উড়িয়ে নিয়ে যায় এবং সেটিকে আতীন নদীতে নিক্ষেপ করে। তারপর ধূলিঝড়ে পারসিক বাহিনীর দৃষ্টিবিভ্রম ঘটে এবং তারা আত্মরক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। [cite: ১৫৭]

রুস্তমকে হত্যা করার ঘটনা
ধূলিঝড় প্রশমিত হলে কাকা এবং তার বাহিনী পারসিকদের সেনাপতি রুস্তমের সিংহাসন দেখতে পায়। রুস্তম সিংহাসন ছেড়ে একটি খচ্চরের পেছনে আশ্রয় নেয়, যা তার ওপর গিয়ে পড়ে এবং তার পাঁজরের একটি হাড় ভেঙে যায়। রুস্তম আতীক নদীর দিকে পালিয়ে গিয়ে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে, কিন্তু হিলাল তাকে ধরে ফেলে। তিনি তার পা ধরে হেঁচড়াতে থাকেন এবং তাকে হত্যা করেন। তারপর তিনি সিংহাসনে উঠে চিৎকার দিয়ে বলেন, 'কাবার রবের শপথ, আমি রুস্তমকে হত্যা করেছি।' পারসিক বাহিনীর মূল দল পলায়ন করে। মুসলমানগণ তাদের বিপরীতে অবস্থানরত পারসিক বাহিনীর দিকে অগ্রসর হয় এবং পারসিকরা পালিয়ে যায়।

রুস্তমের নিহত হওয়ার পর খবর পেয়ে জালিনূস নদীর বাঁধের ওপর দাঁড়ায় এবং পারসিকদের নদী পার হতে বলে। মৃত্যু থেকে বাঁচতে তারা নদী পার হতে থাকে। পারসিক সেনাদের মধ্যে যারা শেকল পরা ছিল— সংখ্যায় তিরিশ হাজার—তারা আতীক নদীর দিকে যেতে থাকে। মুসলমানগণ বর্শা দিয়ে তাদের হত্যা করে এবং তাদের কেউই প্রাণে বাঁচতে পারেনি। [cite: ১৫৮]

যুদ্ধের সমাপ্তি
আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে মুসলিম বীরদের সাফল্য ও সেনাপতি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিচক্ষণতায় যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। এটা ছিল এক ভয়াবহ ও কঠিন যুদ্ধ। সাধারণত মুসলমানগণ এক দিনেই শত্রুদের পরাজিত করে বিজয় লাভ করে থাকে। কিন্তু এখানে শত্রুরা তিন দিন ধরে মুসলিম মুজাহিদদের আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকে। পরিশেষে আল্লাহ মুসলমানদের চতুর্থ দিনে বিজয় দান করেন। শত্রুদের এই প্রতিরোধের অন্যতম কারণ, পারসিকরা এটিকে তাদের চূড়ান্ত লড়াই হিসাবে গণ্য করে: যদি তারা বিজয় লাভ করে, তাহলে তারা তাদের রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে, কিন্তু যদি পরাজিত হয়, তাহলে তারা চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। আর কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। আরেকটি কারণ, এই যুদ্ধে তাদের মহাবীর রুস্তম সশরীরে উপস্থিত ছিল। সে ছিল পারসিক সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং শত্রুর বিরুদ্ধে তার কোনো পরাজয়ের ইতিহাস ছিল না। এর সঙ্গে ছিল পারসিকদের উন্নত যুদ্ধাস্ত্র ও বিপুল সৈন্যসংখ্যা। পারসিক বাহিনীর মূল যোদ্ধা ছিল এক লাখ বিশ হাজার। এতে তাদের অনুসারীদের গণনা করা হয়নি। আবার এর বাইরে ইয়াযগিরদ প্রতিনিয়ত আরও সাহায্য-সৈন্য প্রেরণ করেছেন, যার সংখ্যাও ছিল অনেক। আর মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র তিরিশ হাজার। [cite: ১৫৯] সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মুসলমানগণ বিজয় লাভ করে এবং তাদের সাড়ে আট হাজার মুজাহিদ শাহাদাত বরণ করেন। [cite: ১৬০]

মুসলমানদের অন্য কোনো যুদ্ধে এত অধিকসংখ্যক শহীদ কোথাও হয়নি। এ থেকেই যুদ্ধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করা যায় এবং এই কঠিন পরিস্থিতিতেও মুজাহিদগণ নিজেদের জান বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠিত হননি। মহান আল্লাহ তা'আলা তাদের সকলের ওপর সন্তুষ্ট হোন। [cite: ১৬১]

পরাজিত বাহিনীকে ধাওয়া
সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলমানদের পরাজিত শত্রুদের পেছনে ধাওয়া করার আদেশ জারি করেন। তিনি কাকা ইবনে আমর এবং শুরাহবিল ইবনে আস-সামত আল-কিন্দিকে ডান-বামে শত্রুদের যারা আতীক নদী অতিক্রম করতে পারেনি, তাদের ধাওয়া করতে প্রেরণ করেন। আর যারা নদী অতিক্রম করে গিয়েছিল, তাদের ধাওয়া করার জন্য যুহরা ইবনে আল-হাওইয়্যাহকে তার দলসহ প্রেরণ করেন। পারসিকরা নদীর বাঁধে একটি ছিদ্র করে দেয়, যাতে মুসলমানগণ তাদের অনুসরণ করতে না পারে। কিন্তু যুহরা এবং তার সঙ্গে তিন শ অশ্বারোহী সেটি ভালোভাবেই অতিক্রম করেন। আর বাকিদের সেতু পার হয়ে তার সঙ্গে যোগ দিতে বলেন। সেতুটি একটু দূরে অবস্থিত ছিল। পারসিক বাহিনীর একজন নেতৃস্থানীয় সেনাপতি জালিনূস পালিয়ে যাওয়া পারসিক বাহিনীর নিরাপত্তায় সকলের পেছনে ছিল। যুহরা তাকে ধরে ফেলেন এবং তারা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। যুহরা তাকে হত্যা করেন এবং তার পরিধেয় বর্মটি খুলে নেন। তারা পারসিকদের আরও কিছু দূর পর্যন্ত ধাওয়া করেন, তাদের কয়েকজনকে হত্যা করেন এবং সন্ধ্যায় কাদেসিয়ায় ফিরে আসেন। [cite: ১৬২]

উমর রা.-এর নিকট বিজয়ের সংবাদ পৌঁছল
সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আমীরুল মুমিনীন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট কাদেসিয়া যুদ্ধের বিজয়-সংবাদ জানিয়ে পত্র প্রেরণ করেন। চিঠিটি বহন করে নিয়ে যান উমাইলা আল-ফাযারি। তিনি তার চিঠিতে বলেন, 'এক দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আল্লাহ তা'আলা আমাদের পারসিক বাহিনীর ওপর বিজয় দান করেছেন। আর আল্লাহ তাদের পূর্ববর্তীদের ন্যায় একই শাস্তি দিয়েছেন। তার এত অধিক সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা ইতোপূর্বে কেউ দেখেনি। কিন্তু আল্লাহ তাদের এ সংখ্যাধিক্য ও অস্ত্রশস্ত্রের কারণে কোনো কল্যাণ দেননি; বরং তিনি মুসলমানদের সাহায্য করেছেন। মুসলমানগণ পরাজিত শত্রুদের নদীপথে, বনে-বাদাড়ে এবং পার্বত্য পথে ধাওয়া করেছেন। মুসলমানদের মধ্যে সাদ ইবনে উবাইদ আল-কারি, অমুক অমুক নিহত হয়েছেন এবং এমন বহু মুসলমান নিহত হয়েছেন, যা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা জানেন। তাদের সম্পর্কে তো তিনিই সম্পূর্ণ জ্ঞাত। মুসলিম মুজাহিদগণ রাতের বেলা মৌমাছির গুঞ্জনের মতো গুনগুন করে কুরআন মাজীদ তিলওয়াত করতেন। আর দিনের বেলায় তারা সিংহের রূপ ধারণ করতেন, যে সিংহের কোনো তুলনা হয় না। যারা আখেরাতের পথে পাড়ি জমিয়েছেন, তারা জীবিতদের চেয়ে শাহাদাত বরণের বিশেষ মর্যাদা ছাড়া অন্য কোনো অতিরিক্ত মর্যাদা লাভ করতে পারেননি। কারণ, জীবিতদের জন্য শাহাদাত বরণ মঞ্জুর হয়নি—শুধু এতটুকু পার্থক্য। [cite: ১৬৩]

এই চিঠি থেকে অনেকগুলো শিক্ষা লাভ করা যায়। নিচে এর কয়েকটি দেওয়া হলো :

১। তাওহীদের ব্যাপারে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সচেতনতা এবং কীভাবে তিনি মহান আল্লাহর গৌরব বর্ণনা করেছেন। আর এ ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি নিজে কোনো ক্ষমতা বা শক্তির অধিকারী নন; শত্রুর ওপর এ বিজয় সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে এবং এটি মুসলমানদের শক্তি-সামর্থ্যের কারণে আসেনি, যদিও এতে তারা শত্রুপক্ষের সংখ্যাধিক্য ও শক্তির বিরুদ্ধে অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন। যুদ্ধের ফলাফল কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। তিনিই শত্রুদের শক্তি-সামর্থ্যকে অকেজো করে দিয়েছেন এবং তিনিই মুসলমানদের দুর্বল শক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ দিয়েছেন। মানুষ তো কেবল তার নির্ধারিত উপকার বা ক্ষতি পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম। আল্লাহই একমাত্র শক্তি, যিনি ক্ষতি দূর করতে পারেন অথবা উপকার বয়ে আনতে পারেন। সুতরাং তাওহীদের মর্ম সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব ভালোভাবেই হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন এবং তিনি তার সৈন্যদের এ বোধ থেকেই দিনের পর দিন পরিচালনা করেছেন।

২। তার চিঠিতে আমরা দেখতে পাই যে, তিনি সাহাবা এবং তাবেয়ীদের ইবাদত ও যুদ্ধে তারা সর্বাত্মক দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। তারা রাতে ইবাদতে মশগুল হতো, মৌমাছির গুঞ্জনের মতো তারা কুরআন তিলওয়াত করত। তারা কখনোই ক্লান্ত কিংবা অস্থির হননি। আর দিনে তারা ছিল বীর যোদ্ধা, যাদের সাহস ও দৃঢ়তা সিংহকেও হার মানায়। [cite: ১৬৪]

৩। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রতিদিন মদীনার বাইরে এসে কাদেসিয়া থেকে কোনো সংবাদবাহকের আগমনের অপেক্ষায় থাকতেন। তিনি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সেখানে বসে থাকতেন এবং তারপর মদীনায় ফিরে আসতেন। একদিন তিনি অভ্যাসমতো বসে আছেন। এমন সময় একজন উটারোহীকে দেখা গেল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কোত্থেকে এসেছ?' দূত জবাব দিল, কাদেসিয়া থেকে। তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর বান্দা, আমাকে বলো সেখানে কী হয়েছে!' সংবাদবাহক বলল, 'আল্লাহ শত্রুদের পরাজিত করেছেন।' দূত শহরের দিকে দ্রুত উট চালিয়ে যাচ্ছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পেছনে পেছনে দৌড়াতে লাগলেন, তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। উটের ওপর আসীন দূত বুঝতে পারেনি সে কার সঙ্গে কথা বলছে। তারপর তারা যখন মদীনায় প্রবেশ করল, তখন লোকেরা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আমীরুল মুমিনীন বলে সম্বোধন করে সালাম পেশ করতে শুরু করল। এ-সময় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে দূত বলল, 'আল্লাহ আপনার ওপর কল্যাণ বর্ষণ করুন, আপনি আমাকে আগে বলেননি কেন যে, আপনিই আমীরুল মুমিনীন? উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এ জন্য তুমি চিন্তিত হোয়ো না, হে আমার ভাই।' [cite: ১৬৫]

এ ঘটনা থেকে অনেকগুলো শিক্ষা লাভ করা যায়। নিচে এর কয়েকটি দেওয়া হলো :

১। উম্মতের কল্যাণের চিন্তায় অস্থির থাকতেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু। এ চিন্তাই তাকে প্রতিদিন মদীনার বাইরে উন্মুক্ত মরুপ্রান্তরে টেনে নিয়ে যেত। তিনি ইরাক থেকে আগত কোনো দূতের আশা করতেন, যার কাছ থেকে তিনি মুসলমান ও তাদের শত্রুদের অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারবেন। এ কাজে তিনি অন্য কাউকে দায়িত্ব দিলেও পারতেন, যে তার নিকট খবর নিয়ে আসতে পারত। কিন্তু মুসলিম উম্মাহর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও উৎকণ্ঠার কারণে তিনি তা করেননি। এটিই চরম কল্যাণকামিতা এবং পরিপূর্ণ দায়িত্ববোধ।

২। বিনয়ের চরম পরাকাষ্ঠা: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দূতের উটের সাথে সাথে দৌড়াচ্ছেন এবং যুদ্ধের বিভিন্ন তথ্য জানার চেষ্টা করছেন। দূত খলীফার নিকট পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত তাকে বিস্তারিত বলতে চায়নি এবং বুঝতেও পারেনি যে, সে যার সঙ্গে কথা বলছে তিনিই খলীফা। মদীনায় পৌঁছার পর লোকজনের প্রতিক্রিয়া দেখে সে খলীফার পরিচয় জানতে পারে। এটিই সর্বোত্তম চরিত্র ও আচরণ যে জন্য মুসলমানরা সারা জগতে সব জাতির ওপর গর্ব করতে পারে। এটিই ইসলামের মহান শিক্ষা ও চেতনা, যা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো ব্যক্তিত্ব তৈরি করতে পারে, যিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, দয়ার্দ্র, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও বিনয়ী। [cite: ১৬৬]

২.৫। শিক্ষা ও ফায়দা
২.৫.১। যুদ্ধের তারিখ এবং বিজয়ের ক্ষেত্রে এর প্রভাব
ইতিহাসবিদদের মধ্যে এই যুদ্ধের তারিখ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। প্রফেসর আহমাদ আদিল কামাল বিস্তারিতভাবে বিষয়টি গবেষণা করেন এবং এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, কাদেসিয়া যুদ্ধ ১৫ হিজরীর শাবান মাসে সংঘটিত হয়েছিল। [cite: ১৬৭] আমার নিকট এ মতটিই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়।

এতে কোনো সন্দেহ নেই, ইতিহাসে যতগুলো চূড়ান্ত লড়াই সংঘটিত হয়েছে তার মধ্যে কাদেসিয়ার যুদ্ধের অবস্থান সবার ওপরে এবং এ যুদ্ধে ঐশ্বরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়, যা কেবল ঈমানদারদের জন্যই বরাদ্দ। এ বিজয়ের ফলে মুসলমানদের জন্য ইরাক এবং পারস্যের সকল দরজা উন্মুক্ত হয়ে যায়। তারপর থেকে মুসলমানগণ একের পর এক বিজয় অর্জন করতে থাকেন। এ যুদ্ধ রাজনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটায় এবং ধর্মীয়ভাবে ম্যাগিয়ান ধর্মকে ধ্বংস করে। তখন থেকে পারস্য ছাড়িয়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইসলামের প্রচার-প্রসার শুরু হয়। কাদেসিয়া যুদ্ধে মুসলমানগণ পারসিক বাহিনীর ওপর এমন আঘাত হানেন, যা তারা আর কখনো সামলে উঠতে পারেনি। সুতরাং সংগত কারণেই ইতিহাসে কাদেসিয়া যুদ্ধ সকল চূড়ান্ত লড়াইয়ের শ্রেষ্ঠ লড়াই হিসাবে স্থান করে নেয়। [cite: ১৬৮]

২.৫.২। কাদেসিয়া যুদ্ধে বিজয়ের পর উমর রা.-এর ভাষণ
খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কাদেসিয়া যুদ্ধে বিজয় লাভের এই সুসংবাদ মিম্বরে দাঁড়িয়ে লোকজনকে জানালেন। তারপর তিনি তাদের বললেন, 'এখন আমাদের প্রত্যেকের যে সচ্ছলতা ও সামর্থ্য আছে, আমি মনে করি তাতে আমাদের সকলের অভাব পূরণ হয়ে যাবে। যদি তাতে সকল অভাব পূরণ না হয়, তাহলে আমরা কৃচ্ছতা সাধন করব যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণের পরিসীমাতে আমরা সকলে সমান হয়ে যেতে পারি। আমি আশা করছি যে, আপনাদের কল্যাণ সাধন সম্পর্কে আমার অন্তরে যে মনোভাব ও মানসিকতা আছে তা আপনারা জেনে নেবেন। আমি কাজ ছাড়া আপনাদের অন্য কিছু শিক্ষা দেব না। আমি আপনাদের রাজা নই যে, আপনাদের সাথে ক্রীতদাসের ন্যায় আচরণ করব। আমি বরং আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে এই আমানত দিয়েছেন। আমি যদি আপনাদের এটি ফেরত দিয়ে আমি আপনাদের অনুসরণ করি, আর তাতে আপনারা নিজ নিজ ঘরে বসে বিনাশ্রমে তৃপ্তির সঙ্গে পানাহার করতে পারেন, তবে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব। আর যদি ওই আমানত আমি বহন করি, আর আপনাদের আমার বাড়ির দিকে লাইন ধরতে বলি, তবে আমি নিজেকে দুর্ভাগা বলে গণ্য করব। তাতে আমি অল্পই খুশি হব এবং ভীষণভাবে দীর্ঘকাল ধরে দুঃখ পাব। কারণ, আমি তখন তা ফেরতও দিতে পারব না, ঠিকমতো রাখতেও পারব না। এমন অবস্থা থেকে আমি মুক্তি চাই। [cite: ১৬৯]

২.৫.৩। মুসলমানদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট আরেকটি চিঠি প্রেরণ করেন। তিনি তাতে ইরাকে আরব আহলে যিম্মিদের সঙ্গে করণীয় সম্পর্কে জানতে চান, যারা মুসলমানদের দুর্বল মুহূর্তে চুক্তি ভঙ্গ করেছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে লোকজনের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে বললেন, 'যদি কেউ নিজের খেয়াল-খুশিমতো কাজ করে, তাহলে গোনাহে লিপ্ত হয়ে পড়বে। আর এতে সে কেবল নিজেকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আর যে কেউ সুন্নাতকে অনুসরণ করবে, ইসলামের যাবতীয় বিধি-বিধান মেনে সত্যের ওপর অটল থাকবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি তালাশ করবে, সে-ই প্রকৃতভাবে ভালো কাজ করছে এবং সফল। আল্লাহ বলেন,

وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا
তারা তাদের কৃতকর্মকে সামনে উপস্থিত পাবে। আপনার পালনকর্তা কারও প্রতি যুলুম করবেন না। [cite: ১৭০]

মুসলমানরা তাদের শত্রুদের পরাজিত করেছে এবং মূল অধিবাসীরা পালিয়ে গিয়েছে। আর এমন কিছু লোক রয়ে গেছে যারা পূর্বের চুক্তির ভিত্তিতে মুসলমানদের নিকট আশ্রয়প্রার্থী হয়েছে। আপনি তাদের ব্যাপারে কী বলবেন যারা দাবি করে যে, শত্রুদের সঙ্গে যোগ দিতে তাদের বাধ্য করা হয়েছে; আর যারা এ দাবি করেনি, তারা স্বেচ্ছায় ভূখণ্ড ছেড়ে চলে গেছে এবং যারা চলে যায়নি আবার এ দাবিও করেনি, কিন্তু আত্মসমর্পণ করেছে?'

মুসলমানগণ তাদের প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান জানাতে সম্মত হলেন যারা রয়ে গিয়েছে ও মুসলমানদের কোনো ক্ষতি করেনি; যারা শত্রুর বাধ্যবাধকতার দাবি করেছে এবং তা বিশ্বাস করা হয়েছে; আর যারা চুক্তি যথাযথ মেনে চলেছে। তবে যাদের কথা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি, তাদের নতুন চুক্তির আওতায় আনার জন্য বলা হলো। আর যারা নিজ ভূখণ্ড ছেড়ে পারসিকদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে, তারা চাইলে মুসলমানদের সঙ্গে আবার চুক্তি সম্পাদন করতে পারবে এবং তারা পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ করবে। কিন্তু যদি তারা তাতে সম্মত না হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। যারা এখনো অবস্থান করছে এবং আত্মসমর্পণ করেছে, তাদের জিযিয়া কর প্রদান অথবা তা দিতে সম্মত না হলে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে; কৃষকদেরও একই সুযোগ দেওয়া হলো। [cite: ১৭১]

উপরিউক্ত ঘটনা থেকে অনেকগুলো শিক্ষা লাভ করা যায়। নিচে এর কয়েকটি দেওয়া হলো :

১। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শূরা পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন। তিনি যদিও দূরদর্শী ও অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন, তবু তার প্রিয় অভ্যাস ছিল তিনি রাষ্ট্রের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমাজের বিদ্বান ও প্রবীণদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। এটিই অন্যতম কারণ, যার ফলে এই উম্মতকে সুচারুভাবে শাসন করার ক্ষেত্রে তিনি এত সফলতা অর্জন করেন। এখানে পরামর্শ শুরু করার পূর্বে তিনি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, প্রত্যেককে তার ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশি থেকে বিরত থাকতে হবে, নিয়তকে পরিশুদ্ধ করতে হবে এবং রাসূলের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরতে হবে। যে কেউ এ কাজগুলো করবে, আল্লাহ তাকে ন্যায় বিচারে ভুল-ত্রুটি থেকে রক্ষা করবেন, সবকিছু সঠিকভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ দেবেন এবং আখেরাতে পুরস্কারে ভূষিত করবেন। [cite: ১৭২] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এসব উপদেশ একত্র করে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট চিঠি প্রেরণ করেন। তিনি তাতে লেখেন: আল্লাহ তা'আলা সব ব্যাপারেই কিছু ছাড় দিয়েছেন। তবে দুটি জিনিস ছাড়া : ন্যায়বিচার ও যিকির। কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হওয়া যাবে না। আর আল্লাহ এটি ছাড়া কোনো কিছু কবুল করেন না। ন্যায়বিচারেও কোনো ছাড় নেই। এতে কঠিন বা সহজ পরিবেশ-পরিস্থিতি বলে কিছু নেই। যদি বিচারে শাস্তি লঘুও হয়, তবু এটি অবিচার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং অবিচার থেকে মিথ্যাকে দূর করার ক্ষেত্রে বেশি সক্ষম। ইরাকী আরবদের মধ্যে যারা চুক্তির প্রতি একনিষ্ঠ ছিল এবং কোনোভাবেই শত্রুকে সহায়তা করেনি, তারা মুসলমানদের নিরাপত্তায় থাকবে এবং জিযিয়া কর দেবে। আর যারা বলে যে, তারা চুক্তি ভঙ্গ করতে বাধ্য হয়েছিল, কিন্তু আপনার নিকট আসেনি বা ছেড়েও যায়নি অথবা অন্য কোথাও চলে গিয়েছে, তাদের কথা বিশ্বাস করবেন না যদি-না আপনি চান। যদি আপনি বিশ্বাস করতে না চান, তাহলে তাদের চুক্তি বাতিল করুন এবং তাদের পছন্দমতো নিরাপদ জায়গায় পাঠিয়ে দেবেন। [cite: ১৭৩]

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই জবাব থেকে অনেকগুলো শিক্ষা লাভ করা যায়। নিচে এর কয়েকটি দেওয়া হলো :

১। ন্যায়বিচার ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, রক্ষা এবং উন্নতির মূল ভিত্তি। এটি এ জগতেই কায়েম করতে হবে। আখেরাতে আর এর সুযোগ নেই। সেখানে অন্যায়-অবিচারকারীর পালানোর সুযোগ থাকবে না। কারণ, বান্দা যদি আল্লাহর কোনো হক নষ্ট করে, তাহলে তিনি তার অপার করুণায় তা ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু বান্দা যদি অন্য কোনো বান্দার হক নষ্ট করে থাকে, তাহলে কেয়ামতের দিন আল্লাহ অত্যাচারিত বান্দার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। প্রত্যেক মুসলমানের অন্তরে ও মুখে সর্বদা যিকির চালু থাকা উচিত, যাতে সবকিছুতে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য থাকে; তার সন্তুষ্টিমূলক কথাই সে বলে এবং তার সন্তুষ্টির জন্যই কাজ করে। তার একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত পৃথিবীতে কথা, কাজে ও বিশ্বাসে আল্লাহর স্মরণকে প্রতিষ্ঠা করা। যদি সে তা করতে পারে, তাহলে আচমকা-সুন্দর যুক্তি ও নিজের খেয়াল-খুশির কারণে উদ্ভূত সন্দেহ থেকে আল্লাহ তাকে রক্ষা করবেন।

২। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং তার লোকজন খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেন। তারা নিকটবর্তী এলাকাসমূহে খলীফার প্রস্তাবসমূহ প্রচার করেন। যারা ঘর-বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তাদের নতুন চুক্তি ও জিযিয়া কর প্রদানের মাধ্যমে নিরাপত্তা দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়। এখানে আমরা লোকদের অন্তঃকরণ জয় করার এক বিনম্র ও দূরদর্শী দৃষ্টান্ত খুঁজে পাই। যারা চুক্তি ভঙ্গ করেছিল, তারাও ইসলামের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয় এবং তারা পর্যায়ক্রমে ইসলামে দাখিল হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে তারা একনিষ্ঠ মুসলিম হিসাবে নিজেকে গৌরবান্বিত করে। [cite: ১৭৪]

২.৫.৪। কাদেসিয়া যুদ্ধে যোদ্ধাদের উমর রা. খুমস প্রদান করেন এবং বিশেষ দক্ষতার জন্য বীর সেনাদের পুরস্কৃত করেন
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নির্দেশ জারি করেন, কাদেসিয়ার খুমস সৈনিকদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফার এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই ইজতিহাদ ছিল তার মেধার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি আস-সাওয়াদ ভূমিকে [cite: ১৭৫] এর অধিবাসীদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি একই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। [cite: ১৭৬] তিনি মনে করেছেন, রাষ্ট্রীয় স্বার্থেই মুজাহিদদের মধ্যে খুমস বিতরণ করা উচিত যাতে তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা বৃদ্ধি পায়, তাদের জীবনকে সহজ করে তোলা যায় এবং তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষার যথাযথ কৃতজ্ঞতা জানানো সম্ভব হয়। [cite: ১৭৭]

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চারটি তরবারি এবং চারটি ঘোড়া সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট প্রেরণ করেন। যুদ্ধে যারা দৃষ্টান্তমূলক বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তিনি তাদের এগুলো পুরস্কার হিসাবে দিতে বলেন। তিনি এর তিনটি তরবারি বনু আসাদের তিন জনকে প্রদান করেন। তারা হলেন হাম্মাল ইবনে মালিক, রিবাঈল ইবনে আমর ইবনে রাবিআ এবং তুলাইহা ইবনে খুওয়ালিদ। আর চতুর্থ তরবারিটি দেন আসিম ইবনে আমর আত-তামীমিকে। তিনি কাকা ইবনে আমরকে একটি ঘোড়া এবং বাকি তিনটি ঘোড়া আগওয়াস দিবসে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য ইয়ারবুয়ি‍্যন গোত্রকে প্রদান করেন। [cite: ১৭৮] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এভাবেই মুজাহিদদের মনোবল বৃদ্ধি করার চেষ্টা করতেন যাতে মুসলমানদের মহান লক্ষ্য অর্জিত হয়।

২.৫.৫। যুহরা ইবনে হাবিয়ার সম্মান পুনরুদ্ধার
পরাজিত সৈন্যদের ধাওয়া শেষে যুহরা কাদেসিয়ায় ফিরে আসেন। জালিনূসকে হত্যা করার পর যুহরা তার সব পরিধেয় সামগ্রী খুলে নেন এবং বর্মটি পরিধান করেন। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট যে সকল পারসিক বন্দীরা ছিল, তারা সেটি দেখে চিনতে পারে এবং বলে ওঠে, 'এগুলো তো আমাদের সেনাপতি জালিনূসের।' সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'জালিনূসকে হত্যা করার ব্যাপারে তোমাকে কেউ সাহায্য করেছিল?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'কে?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ।' যুহরা বয়সে ছিলেন যুবক; জাহেলী যুগে গোত্রের নেতা ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে খুব মজবুত ঈমানের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিলেন। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করলেন কাজটিতে সীমালঙ্ঘন করা হয়েছে। এ জন্য তিনি তাকে বললেন, 'তুমি আমার অনুমতির জন্য অপেক্ষা করলে না কেন? [cite: ১৭৯]

এ খবর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পৌঁছল। তিনি সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট চিঠিতে জানালেন, 'আপনি কেমন করে যুহরার মতো মুজাহিদকে পাকড়াও করেছেন—সে কী করেছে, কোথায় করেছে, সামনে আরও অনেক যুদ্ধ বাকি রয়েছে—এখনই আপনি তার সাহস ও মনোবল ভেঙে দিতে চান? তাকে তার লুট করা মাল ফিরিয়ে দেন এবং তাকে আরও পাঁচ শ দিরহাম বেশি দিয়ে তার সঙ্গীদের ওপর তাকে প্রাধান্য দিন। আমি ঘোষণা দিচ্ছি, এখন থেকে জিহাদের ময়দানে কেউ যদি কোনো শত্রুকে হত্যা করে, তাহলে সে তার যাবতীয় বস্তুর মালিক হবে।' সুতরাং সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যুহরাকে বর্মটি ফেরত দিলেন এবং যুহরা বর্মটি সত্তর হাজারে বিক্রি করে দিলেন। [cite: ১৮০] এভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যুহরার সম্মান পুনরুদ্ধার করেন। [cite: ১৮১]

২.৫.৬। শহীদ মুজাহিদ এবং মুসলমানদের মধ্যে আযানের প্রতিযোগিতা
কাদেসিয়া যুদ্ধে কিছু আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা থেকে প্রথম যুগের মুসলমানদের দ্বীনী জযবা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে তাদের একনিষ্ঠতার পরিচয় পাওয়া যায়। যুদ্ধে অনেক মুজাহিদ শহীদ হন। আর যখন নামাযের সময় হতো, তখন তারা আযান দেওয়ার জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতেন। বিষয়টা এত মারাত্মক পর্যায়ে চলে যেত যে, মনে হতো আযান দেওয়ার সুযোগ পাওয়ার জন্য তারা নিজেরা তরবারি দিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের মধ্যে লটারির ব্যবস্থা করলেন। লটারিতে যার নাম উঠত, সে-ই আযান দিত। [cite: ১৮২] একটি নেক কাজ করার জন্য তাদের জযবা থেকে তাদের ঈমানের শক্তি বোঝা যায়। কারণ, আযান দিলে দুনিয়ার কোনো সম্পদ, মর্যাদা বা খ্যাতি লাভ করা যাবে না; বরং তাদের অন্তরে আখেরাতে মুয়াযযিনের জন্য আল্লাহর প্রতিশ্রুত প্রতিদানের গভীর আশা ছিল। এসব মহান লোকেরা যখন আযানের জন্য প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে পারেন, নিশ্চয়ই তারা দ্বীনের আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদিতেও একই কাজ করেছেন। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে জিহাদ ও মানুষকে ইসলামের দিকে ডাকার ক্ষেত্রে এটাই তাদের সফলতার গোপন অস্ত্র। [cite: ১৮৩]

২.৫.৭। যুদ্ধে ইসলামী সামরিক কৌশল
ইসলামের ইতিহাসে কাদেসিয়ার যুদ্ধ একটি অনবদ্য রণকৌশলের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মুসলিম মুজাহিদরা পরিস্থিতি সাপেক্ষে তাদের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করেছে। সৈন্য সংগ্রহে বাধ্যবাধকতা আরোপ ও তাদের যথাযথভাবে প্রেরণ এবং যুদ্ধে সকল উপায়-উপকরণ ব্যবহারে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অতুলনীয় দক্ষতা দেখিয়েছেন। এই যুদ্ধে খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাধারণ ও অভিজাত-উভয় বাহিনীর সেনাদের ব্যবহার করেছেন। তিনি সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠিতে অভিজ্ঞ ও সাহসী অশ্বারোহী সেনাদের বাছাই করে নিতে বলেন। এই যুদ্ধে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সত্তরের অধিক বদরী সাহাবী, বাইআতে রিদওয়ানের পরবর্তী তিন সহস্রাধিক সাহাবী, মক্কা বিজয়ে উপস্থিত ছিল এমন তিন শ সাহাবী এবং সাহাবায়ে কেরামের সাত শ সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করেন।

তিনি কোনো নেতৃস্থানীয়, বিদ্বান, প্রভাবশালী, বক্তা কিংবা কবি— কাউকেই বাদ দেননি। তিনি সবচেয়ে উত্তম এবং প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের এই যুদ্ধে শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। এভাবে তিনি সকল জাগতিক ও মানসিক উপায়-উপকরণ এই যুদ্ধে ব্যবহার করেন।

এই যুদ্ধে সৈন্যদের মুভমেন্টে নতুন কিছু পদ্ধতি দৃষ্টিগোচর হয়, যা ইতিপূর্বে দেখা যায়নি। সম্পূর্ণ সেনাবাহিনীর গঠন করার পূর্ব পর্যন্ত সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরারে বসে থাকেননি; বরং তিনি চার হাজার সৈন্য নিয়ে ইরাক অভিমুখে রওনা হয়ে যান এবং কাদেসিয়া প্রান্তরে পৌঁছার পর তার সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় সতেরো হাজার। এটি সৈন্য সংগ্রহের একটি নতুন পদ্ধতি, যা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আগে মুসলমানদের জানা ছিল না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চিঠিতে মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-উভয়কেই কোথায় চূড়ান্ত লড়াই করতে হবে, তা জানিয়ে দেন। আর তা ছিল কাদেসিয়া। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-ই প্রথম মুসলিম খলীফা, যিনি রণক্ষেত্রের অবস্থা ও পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে ম্যাপের ব্যবহার করেছিলেন। তিনি সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠিতে মুসলিম তাঁবুর অবস্থান ও রণক্ষেত্রের বিবরণ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করতে বলেন, যাতে তা তার চোখের সামনে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এই নির্দেশ অনুযায়ী কাদেসিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান-পরিখা ও আতীক নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল, রণক্ষেত্রের ডান-বামে স্থাপনা এবং সেখানকার পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের শত্রুভাবাপন্ন মানসিকতারও বিবরণ তুলে ধরেন। বর্ণনার আলোকে আমীরুল মুমিনীন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যুদ্ধের রণকৌশল নির্ধারণ করেন। [cite: ১৮৪]

শত্রুভূমিতে পা রাখার পর থেকেই মুসলমানগণ শত্রুর রসদ সরবরাহে আক্রমণ করার কৌশল অবলম্বন করে এবং এভাবে তাদের উপদ্রব করে অতিষ্ঠ করে তোলে। এ আক্রমণে প্রাপ্ত গনীমত মুসলিম বাহিনীর চাহিদা পূরণে সহায়তা করে। এটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে: শত্রুর প্রাণরস শুষে নেওয়া এবং স্থানীয় জনসাধারণকে যুদ্ধের প্রভাব ও কষ্ট বহনে সক্ষম করে তোলা।

মুসলমানগণ পারসিক সেনা ইউনিটের ছোট ছোট দলের ওপর অকস্মাৎ আক্রমণ করার কৌশলও অবলম্বন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল, শত্রুদের উত্তেজিত করে তোলা এবং তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া।

একবার বাকের ইবনে আব্দুল্লাহ আল-লাইস কয়েকজন মুসলিম অশ্বারোহী সেনা নিয়ে আস-সিরিন অভিমুখে খেজুর বাগান-বেষ্টিত পথে পারসিকদের এক কাফেলার ওপর অকস্মাৎ আক্রমণ করে। কাফেলাটিতে আল-হেরার শাসক আযামারদের বোনকে আস-সিরিনের শাসকের পাত্রী হিসাবে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল। কাফেলাটি এমবুসের জন্য নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছামাত্র মুসলিম দল তাদের ওপর আক্রমণ করে। বাকের পাত্রীর ভাই শিরযাদের নেতৃত্বে অগ্রগামী দলকে কাফেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেন। হঠাৎ আক্রমণে শত্রুদের ঘোড়াগুলো দিগ্বিদিক পালিয়ে যায়। মুসলমানগণ বাকি কাফেলাকে অবরোধ করে এবং আযামারদের কন্যাকে বন্দী করে। এর সঙ্গে গোত্রপ্রধানের অধীন আরও তিরিশ জন মহিলা এবং এক শ জন অনুসারীসহ সব মালামাল জব্দ করেন। কাফেলার সঙ্গে থাকা মণি-মুক্তাসহ বিভিন্ন দ্রব্যাদির মূল্য জানা যায়নি। [cite: ১৮৫]

এ যুদ্ধে মুসলমানগণ পরিস্থিতির পরিবর্তন সাপেক্ষে তাদের কৌশলেও পরিবর্তন আনেন। প্রথম দিন দেখা যায়, তারা হাতি দমন করতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। হাতির দিকে তির নিক্ষেপ করে তার ওপরের বাক্স ও রশি কেটে দিতে থাকে, যতক্ষণ না সেগুলো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যায়।

মুসলমানগণ সিরিয়া থেকে সাহায্য-সৈন্যের অপেক্ষায় ছিলেন। তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয় রণক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় যাতে বাহ্যিকভাবে সংখ্যাধিক্যের আশঙ্কায় শত্রুর মনে ভীতির সৃষ্টি হয়। তারপর তারা এক অভিনব পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তারা উটগুলো ভীতিকর এক সাজে সজ্জিত করে, যাতে সেগুলোকে দেখতে হাতির মতো মনে হয়। তারা সেগুলোকে শত্রুর সারিতে প্রেরণ করে এবং পারসিকদের ঘোড়াগুলো সত্যি হাতি দেখার মতোই বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে ও রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়। তৃতীয় দিনও মুসলিম সৈন্যরা হাতির বিরুদ্ধে লড়াই করে যেগুলো শত্রুদের অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর পাহারায় ছিল। তারা পারসিকদের বড় সাদা হাতিকে আক্রমণ করে তার চোখে তির বিদ্ধ করে ও শুঁড় কেটে দেয়; হাতি পালিয়ে যায়। তখন মুসলিম ও পারসিক সৈন্যরা রণক্ষেত্রে একই অবস্থানে চলে আসে; অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী। মুসলমানরা যখন দেখল, যুদ্ধ প্রলম্বিত হচ্ছে, তখন তারা যৌথভাবে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা সারিবদ্ধ হয়ে একদল হিসাবে অগ্রসর হয়। যখন শত্রুবাহিনী পিছু হটতে শুরু করল, তখন তাদের কেন্দ্রীয় বাহু অরক্ষিত হয়ে পড়ে; সেনাপতি রুস্তম মুসলমানদের নিশানায় চলে আসে। রুস্তম নিহত হলে পারসিক বাহিনী এক লজ্জাজনক পরাজয়ের সম্মুখীন হয়।

সুতরাং দেখা যায়, এই যুদ্ধের রণকৌশল প্রচলিত যুদ্ধের মতো ছিল না; বরং তারা প্রত্যেক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ করেছেন। তারা প্রাচীন কৌশল থেকে সরে আসে; যেমন: মল্লযুদ্ধ থেকে কৌশলগত আক্রমণ; উটকে ছদ্মবেশে উপস্থাপন, হাতির চোখ নষ্ট করে দেওয়া এবং রশি ও শুঁড় কেটে ফেলা; আর যুদ্ধের চিরায়ত পদ্ধতি অবলম্বন যেমন : দলনেতাকে টার্গেট করা। এ যুদ্ধের আরেকটি অন্যতম দিক হচ্ছে, সৈন্যদের গোত্রভিত্তিক লড়াই করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তাতে গোত্রগত একটি প্রতিযোগী মনোভাব সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে। [cite: ১৮৬]

কাদেসিয়া যুদ্ধে মুজাহিদদের ব্যবহৃত ইসলামী সামরিক কৌশল এমনই ছিল।

২.৬। মাদাইন বিজয়
সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কাদেসিয়ায় দুই মাস অবস্থান করেন। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় ছিলেন। একসময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মাদাইন অভিযানে বের হতে বলেন এবং মহিলা ও শিশুদের আতীক এলাকায় পর্যাপ্ত সৈন্যদের নিরাপত্তায় রেখে যেতে নির্দেশ দেন। তিনি এটিও বলেন, যেসব সৈন্য পেছনে রয়ে যাবে, তারাও প্রাপ্ত গনীমতের অংশীদার হবে। কারণ, তারা মুসলিম পরিবারের নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকার কারণেই পশ্চাতে অবস্থান করছে। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তা-ই করলেন এবং শাওয়াল মাসের শেষ দিকে তিনি সৈন্যবহর নিয়ে মাদাইনের উদ্দেশে রওনা হন।

কাদেসিয়ায় পরাজিত পারসিক বাহিনীর যেসব সেনাপতি বেঁচে গিয়েছিল, তারা নিজেদের আত্মরক্ষায় বাবিলে গিয়ে আশ্রয় নেয়। পারসিকদের একের পর এক শহর ও নগরের পতন হতে লাগল। মুসলমানগণ প্রথমে বারস, ফোরাত নদী অতিক্রম করে বাবিল, তারপর কুসা, সাবাত (এর কিছু অংশ যুদ্ধ করে এবং কিছু অংশ চুক্তিতে) দখল করে নেয়। [cite: ১৮৭]

সুশৃঙ্খল মুসলিম বাহিনী তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখে। তারপর তারা মাদাইন পৌঁছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নগরবাসীদের সঙ্গে ন্যায় আচরণ এবং চুক্তির প্রতি সম্মান জানাতে নির্দেশ দেন। এতে বিপুল পরিমাণ স্থানীয় অধিবাসীরা মুসলমানদের নিরাপত্তায় চলে আসে। তারা মুসলমানদের আচরণ, ন্যায়বিচার ও সাম্য দেখে অবাক হয়। কারণ, ইসলামের শিক্ষা এমনই। এখানে মহান প্রতিপালকের নিকট সেনাপতি আর সাধারণ সৈন্যের মধ্যে পার্থক্য নেই। তাদের মধ্যে কোনো অন্যায়-অবিচার ও দুর্নীতি নেই। তারা এতকাল যেমন পরাধীন ও দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল, মুসলমানদের মধ্যে এ রকম কোনো আচরণ দেখতে পায়নি। তারা কেবলই এক আল্লাহর দাস।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মাদাইন অভিমুখে রওনা হন। তিনি যুহরা ইবনে হাবিয়ার নেতৃত্বে অগ্রগামী দল প্রেরণ করেন। আর তার পেছনে আব্দুল্লাহ ইবনে মুআত্তাম ও শুরাহবিল ইবনে সামাত দুটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে তাকে অনুসরণ করেন। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের সহকারী হিসেবে খালিদ ইবনে উরফুতার পরিবর্তে হাশিম ইবনে উতবা ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে নিযুক্ত করেন। [cite: ১৮৮] তারপর সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বাকি সৈন্যসহ তাদের সঙ্গে মিলিত হন এবং খালিদ ইবনে উরফুতার হাতে পশ্চাদবাহিনীর নেতৃত্ব অর্পণ করেন।

অগ্রগামী দলের প্রধান সেনাপতি যুহরা পারসিক রাজ্যের রাজধানী মাদাইন শহরের দিকে অগ্রসর হন। শহরটি তাইগ্রিস নদীর পশ্চিম-পূর্ব পাড়ে অবস্থিত। নদীর পশ্চিম পাড়ের এলাকাকে বাহুরসির এবং পূর্ব পাড়ের এলাকাকে আসবানির ও তিসফুন বলা হতো। যুহরা বাহুরসিরে পৌঁছেন এবং এলাকাটি অবরোধ করেন। তারপর সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং সঙ্গে তার ভাই হাশিম ইবনে উতবাহর নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী নিয়ে মাদাইনের পশ্চিমাঞ্চলে উপনীত হন। সেখানেই ছিল পারসিক সম্রাট ইয়াযদগিরদ। মুসলমানগণ শহরটি দু-মাস অবরোধ করে রাখে। পারসিকরা কখনো কখনো বের হয়ে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করত, কিন্তু মুসলমানদের প্রতি-আক্রমণে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেত।

ঘটনাক্রমে যুহরার শরীরে শত্রুদের একটি তির বিদ্ধ হয়। কারণ, তার বর্মটির বিভিন্ন জায়গায় ছিদ্র হয়ে গিয়েছিল। লোকেরা বলল, 'আপনি একটু বর্মটি ঠিক করে নিলেই পারেন। তাহলে আপনার শরীরে আর তির বিদ্ধ হোতো না।' তিনি বললেন, 'কেন?' তারা বলল, 'আমরা আপনাকে নিয়ে শঙ্কিত।' তিনি বললেন, 'আমি আল্লাহর নিকট সবার চেয়ে পছন্দনীয় ব্যক্তি হব, যদি এই জিহাদে সবাইকে এড়িয়ে সর্বপ্রথম তিরটি এসে আমার বুকে বিদ্ধ হয়!' বস্তুত তিনি আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় ব্যক্তিই ছিলেন। তিনি যা চেয়েছিলেন, তা-ই হয়েছে। ওই দিন তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যার বুকে তির বিদ্ধ হয়েছে। এটি তাকে মারাত্মকভাবে আহত করে। লোকেরা কেউ কেউ বলল, 'তার জখম থেকে তিটি টেনে বের করো।' তিনি বললেন, 'তির যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকুক; বরং বের করার চেষ্টা করলেই আমার মৃত্যু হতে পারে। এ অবস্থায় আমি এখনো শত্রুদের কাউকে আঘাত করতে পারব।' তিনি যুদ্ধ করতে লাগলেন এবং আসতাখারের প্রসিদ্ধ বীর সেনাধ্যক্ষ শাহরিয়ারকে হত্যা করেন। [cite: ১৮৯]

মুসলমানগণ দুই মাস ধরে অবরোধ অব্যাহত রাখলেন। পারসিকদের মিত্র বাহিনীরা মুসলমানদের জন্য বিশটি মিনজানিক (ভারী পাথর নিক্ষেপের প্রাচীন যুদ্ধাস্ত্রবিশেষ) প্রস্তুত করে। এগুলো দিয়ে তারা পারসিকদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করত। এ থকে প্রতীয়মান হয় যে, বিজয়ে সহায়ক কোনো জাগতিক বস্তু ব্যবহারে তারা কার্পণ্য করেননি। তারা নিশ্চিতভাবেই আল্লাহর কালামকে সঠিক অর্থে বুঝেছিলেন :

وَاعِدُّوا لَهُمْ مَّا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ
আর প্রস্তুত করো তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যা-ই কিছু সংগ্রহ করতে পার, নিজের শক্তি-সামর্থ্যের মধ্যে থেকে। [cite: ১৯০]

এতৎসঙ্গে তাদের আত্মিক শক্তি বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছে, যা সবেচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ-আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল থাকা, তাকে স্মরণ করা এবং তার নিকট সাহায্যের জন্য প্রার্থনায় নিমগ্ন থাকা।

২.৬.১। আল্লাহ তার নিকটতম বান্দাদের সাহায্য ও সহযোগিতা করেন
বর্ণিত আছে, আনাস ইবনে আল-হালীস বলেন, 'আমরা বাহুরশির অবরোধ করে রাখার সময় পারস্যের এক দূত এসে বলে, 'আমাদের সম্রাট তোমাদের নিকট এই বার্তা পাঠিয়েছেন যে, তিনি তোমাদের সঙ্গে এই শর্তে চুক্তি করতে আগ্রহী : তাইগ্রিস ও আমাদের পাহাড়ের মধ্যবর্তী এলাকা হবে আমাদের এবং তাইগ্রিস ও তোমাদের পাহাড়ের মধ্যবর্তী এলাকা তোমরা শাসন করবে। যদি তোমরা এতে সন্তুষ্ট না হও, তাহলে হয়তো আর কখনোই সন্তুষ্ট হতে পারবে না।' মুসলমানদের মধ্যে কেউ কোনো কথা বলার আগেই আবু মুফাজ্জির আল-আসওয়াদ দাঁড়িয়ে এর জবাব দেন। তিনি এমন কিছু কথা বলেন, যার কিছুই আমরা বুঝতে পারিনি। এমনকি তিনি নিজেও কিছু বোঝেননি। তখন দূত ফিরে গেল। আমরা তাদের মাদাইনের পূর্বদিকে নদী পার হয়ে যেতে দেখলাম। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, 'হে আবু মুফাজ্জির, তুমি তাকে কী বলেছ?' তিনি বললেন, 'ওই সত্তার কসম, যিনি সত্যসহ মুহাম্মাদকে প্রেরণ করেছেন, আমি জানি না কী বলেছি। তবে মনে হয়, ভালো কিছুই বলেছি।' অন্যান্য লোকেরাও তাকে একই প্রশ্ন করতে লাগলেন। একসময় সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘটনা শুনলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'হে আবু মুফাজ্জির, তুমি তাকে কী বলেছ? আল্লাহর কসম, তারা সব পালিয়ে যাচ্ছে।' আবু মুফাজ্জির একই জবাব দিলেন। তিনি পারসিকদের ডাক দিলেন। একজন ছাড়া কেউ এল না। লোকটি নিরাপত্তা চাইলে আমরা তাকে নিরাপত্তা দিলাম। লোকটি বলল, 'শহরে কেউ নেই। কিসে তোমাদের বাধা দিচ্ছে?' সুতরাং তারা শহরে প্রবেশ করে সেটি দখল করে নিল।

পুরো শহরে সুনসান নীরবতা। কোনো জনমানব নেই। কিছু বন্দীকে পাওয়া গেল। তাদের আমরা পাকড়াও করলাম। লোকদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞাসা করা হলো এবং তারা বলল, 'আমাদের সম্রাট তোমাদের নিকট সন্ধির প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। তোমরা তাকে জানিয়েছ যে, কখনোই তোমাদের ও তার সঙ্গে সন্ধি হবে না যতক্ষণ না তোমরা কূসা শহরে এসে মধু পান না করবে।' তখন সম্রাট বলল, 'তোমরা জানো এটি কী? ফেরেশতারা তাদের ঠোঁটে কথা বলছে এবং আরবদের পক্ষে জবাব দিচ্ছে। আল্লাহর কসম, এই লোক যা বলছে, তার অর্থ হলো, আমাদের সবাইকে হত্যা করা হবে। সুতরাং শহরের অপর প্রান্তে পালিয়ে গিয়ে নিজেকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করো। [cite: ১৯১]

২.৬.২। মাযলাম সাবাতে পৌঁছার পর সাদ রা. কর্তৃক কুরআন তিলাওয়াত
হাশিম তার বাহিনী নিয়ে বাহুরশিরে পৌঁছার পর সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু মাযলাম সাবাতে যাত্রাবিরতি করেন। তারপর তিনি এই আয়াত তিলওয়াত করেন,

وَ اَنْذِرِ النَّاسَ يَوْمَ يَأْتِيهِمُ الْعَذَابُ فَيَقُولُ الَّذِينَ ظَلَمُوا رَبَّنَا أَخِّرْنَا إِلَى أَجَلٍ قَرِيبٍ تُجِبْ دَعْوَتَكَ وَ نَتَّبِعِ الرُّسُلَ أَوَ لَمْ تَكُونُوا أَقْسَمْتُمْ مِّنْ قَبْلُ مَا لَكُمْ مِنْ زَوَالٍ
মানুষকে ওই দিনের ভয় প্রদর্শন করুন, যেদিন তাদের কাছে আযাব আসবে। তখন যালেমরা বলবে, 'হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের সামান্য মেয়াদ পর্যন্ত সময় দিন, যাতে আমরা আপনার আহ্বানে সাড়া দিতে এবং পয়গম্বরগণের অনুসরণ করতে পারি। তোমরা কি ইতিপূর্বে কসম খেতে না যে, তোমাদের দুনিয়া থেকে যেতে হবে না? [cite: ১৯২]

তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করেন; কারণ, সেখানে সম্রাট কিসরার সৈন্য ছিল যাদের বুরান বলা হতো। তারা প্রতিদিন কসম করে বলত, 'আমরা জীবিত থাকতে পারসিক সাম্রাজ্যকে দুনিয়ার কোনো শক্তিই বিপন্ন করতে পারবে না। [cite: ১৯৩] যুরাহ ইবনে হাবিয়া তাদের পরাজিত করেন এবং শহীদ হওয়ার আগেই তাদের ছিন্নভিন্ন করে দেন। [cite: ১৯৪] মুসলমানগণ যখন মধ্যরাত্রিতে বাহুরশিরে প্রবেশ করে সম্রাট কিসরার শ্বেত প্রাসাদ দেখতে পান। যিরার ইবনে আল-খাত্তাব বলেন, 'আল্লাহু আকবার, সম্রাট কিসরার শ্বেত প্রাসাদ!' এটাই আল্লাহ এবং তার রাসূল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং তারা সকাল পর্যন্ত তাকবির-ধ্বনি দিতে থাকে। [cite: ১৯৫]

২.৬.৩। নদীর পার হওয়ার ব্যাপারে সাদ রা. এবং সৈন্যদের সঙ্গে পরামর্শ
সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু খবর পেলেন যে, সম্রাট কিসরা নদী পার হয়ে মাদাইনের পূর্বদিকে পাড়ি জমিয়েছেন এবং এ পাড়ে কোনো নৌকাও নেই, তখন তিনি একটু চিন্তিত হলেন। শত্রু হাতের নাগালে, কিন্তু মাঝখানে একটি নদী বাধা হয়ে আছে। কোনো জাহাজ বা নৌকা না থাকাচে সেটি পাড়ি দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আশঙ্কা করলেন, শত্রুরা এই সুযোগে আরও দূরে সরে যাবে এবং তিনি তাদের শেষ করতে পারবেন না। তখন পারসিক মিত্ররা এগিয়ে আসে। তারা নদীর একদিকে পানির গভীরতা কম রয়েছে বলে জানায় এবং সেখান দিয়ে একটু ঝুঁকি নিয়ে পার হওয়া সম্ভব। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এ প্রস্তাব বাতিল করলেন। কারণ, নদীতে পানির স্রোত ছিল প্রচুর। ঢেউয়ের ধাক্কা এসে পাড়ে লাগছিল। স্রোতে উত্থিত ফেনায় পানির বর্ণ কালো হয়ে গিয়েছিল।

সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এ-সময় একটি স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নে তিনি মুসলমানদের নিয়ে নদী পারও হওয়ার দৃশ্য দেখতে পান। তিনি নিজেই এ স্বপ্নের তাবির করেন যে, তারা নদী পার হবেন। তিনি লোকজন জমা করে আল্লাহ তা'আলার প্রশংসার পর বললেন, 'তোমাদের শত্রুরা এ নদী পার হয়ে তোমাদের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে এবং তোমরা তাদের পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না। কিন্তু তারা চাইলে নৌকা করে তোমাদের প্রান্তে পৌঁছতে পারবে। তোমাদের পশ্চাতে কোনো শত্রুর পক্ষ থেকে আক্রমণের ভয় নেই। তোমাদের পূর্ববর্তী মুজাহিদরা ওইসব শত্রুদের পরাজিত করেছে। আমি মনে করি, তোমাদের দ্রুত শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত। আমি নদী অতিক্রম করে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।' উপস্থিত সবাই বলল, 'আল্লাহ সহজ করুন; চলুন, তা-ই করি। [cite: ১৯৬]

এ থেকে নিম্নলিখিত শিক্ষাসমূহ লাভ করা যায় :

১। আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের সাহায্য করে থাকেন। আল্লাহর পক্ষ থেকেই সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এই ভালো স্বপ্ন দেখেছিলেন। এটি তার মনোবলকে দৃঢ় করেছে এবং নদী পার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে, যার পরিণতি তার জানা ছিল না। আল্লাহ অবশ্যই ঈমানদারদের পক্ষেই তার ফায়সালা অবতীর্ণ করবেন। হঠাৎ করেই নদী খুব তীব্র বেগে প্রবাহিত হতে শুরু করেছে এবং মনে হচ্ছিল, এটি পারসিকদের পক্ষেই যাচ্ছে। কারণ, এ দৃশ্য দেখে মুসলমানরা নদী পার হতে সাহস করবে না। বস্তুত এটি ছিল মুসলমানদের পক্ষেই। কাফেররা নিজেদের সুরক্ষিত মনে করেছে এবং তারা মুসলমানদের পক্ষ থেকে আক্রমণের কোনো আশাই করেনি। শত্রুরা পালিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সব জিনিস-পত্তর সঙ্গে নিতে পারেনি। সাহাবায়ে কেরাম তাদের সেনাপতির মতো একজন মহান ব্যক্তির স্বপ্নে দারুণভাবে উৎসাহিত হয়ে ওঠে। এটি তাদের এগিয়ে যেতে সাহসী করে তোলে। তারা আল্লাহর ব্যাপারে উচ্চ ধারণাই পোষণ করেছে এবং এ স্বপ্নকে তারা তাঁর পক্ষ থেকে সাহায্য হিসাবে নিয়েছে। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মুসলমানগণ তাদের সাহস ও দৃঢ় ঈমানের পরিচয় দিয়ে প্রতিটি সুযোগকেই সৈন্যদের উৎসাহিত করতে কাজে লাগিয়েছেন।

২। সুতরাং সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বাহিনীকে ঈমানের দৌলত ও ধার্মিকতার অস্ত্র ব্যবহার করে নদী পার হয়ে শত্রুকে আক্রমণ করার নির্দেশ দেন। তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করে সবার আগে নদীতে ঘোড়া চালিয়ে দেন। অবশ্যই মুসলিম বাহিনীর মধ্যে তার ঈমানের গভীরতাই ছিল সবচেয়ে বেশি। সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়ীনরা তাদের নেতাদের অনুসরণে সব সময়ই ছিলেন ঐকান্তিক এবং পরিপূর্ণ আনুগত্যকারী। তারা এই আনুগত্যকে শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে ফরয মনে করতেন এবং এমন উঁচু নেক কাজ মনে করতেন যার দ্বারা তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশা করতেন। [cite: ১৯৭]

২.৬.৪। নদী পার হয়ে শত্রুর ওপর আক্রমণ পরিচালনা
সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদের নদী হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বললেন, 'কে আছ নদীর পূর্ব দিক রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করবে, যাতে সবাই নিরাপদে নদী পার হতে পারে?' তিনি আসিম ইবনে আমর আত-তামীমিকে এই দায়িত্ব দেন। তিনি ছিলেন সাহসী এবং শক্তিশালী। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার অধীনে ছয় শ সেনা প্রেরণ করেন। তিনি তাদের নিয়ে নদীর পারে গিয়ে বলেন, 'আমার সঙ্গে কে শত্রুর হাত থেকে নদীর পূর্ব পার রক্ষায় যেতে আগ্রহী, যাতে সকল মুসলিম নিরাপদে ওই প্রান্তে পৌঁছতে পারে?' ষাট জন বীর এগিয়ে আসে। তারা আগে নদী অভিমুখে রওয়ানা হন এবং ছয় শ সৈন্য তাদের অনুসরণ করে। এভাবে মুসলিম বাহিনীর এলিট গ্রুপ গঠিত হয়, যাদের আহওয়াল স্কোয়াড্রন বলা হতো। এ দলের সদস্য-সংখ্যা ছয় শ। আসিম তাদের মধ্য থেকে ষাট জনকে নির্বাচন করেন এবং অগ্রগামী দল গঠন করেন। প্রথমে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং পরবর্তী সময়ে আসিম-এর বিজ্ঞ পরিকল্পনা খুবই কাজে দেয়। কারণ, বিশাল বাহিনী নিয়ে ঝুঁকি নেওয়া ঠিক নয়; বরং স্বল্পসংখ্যক সৈন্যবহর নিয়ে এই ঝুঁকি মোকাবিলা করা উচিত। কেননা, যদি শুরুতেই কম সাহস ও দক্ষতার সৈন্য ঝুঁকিতে অংশগ্রহণ করে, তাহলে শত্রুর আক্রমণে একবার যদি তারা পিছিয়ে আসে, তাহলে পুরো বাহিনীই পরাজয়ের মুখোমুখি হবে।

আসিম ষাট জন মরণপণ যোদ্ধা নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে নদী পার হলেন। বর্ণনায় পাওয়া যায়, যারা এই দলের অগ্রভাগে নদী পার হয়ে ওই পাড়ে গমন করেন, তারা হলেন : আসাম বানি ওয়াল্লাদ, আল-কালায আদ-দাব্বি, আবু মুফাজ্জির আল-আসওয়াদ ইবনে কুতবা, শুরাহবিল ইবনে আস-সামাত আল-কিন্দি, হাযল আল-আজলি, মালিক ইবনে কাব আল-হামাদানি এবং বনু হারিস ইবনে কাবের একজন যুবক। পারসিকরা তাদের দেখে যুদ্ধ করার জন্য অশ্বারোহীদের প্রস্তুত করে এবং তারা নদীর পূর্বপ্রান্তে মুখোমুখি হয়। আসিম গর্জে ওঠেন, 'বর্শা, বর্শা!' এবং তাদের শত্রুর চোখ বরাবর টার্গেট করতে নির্দেশ দেন। পারসিকরা মুসলমানদের বর্শার আঘাতে তীরবর্তী এলাকায় দ্রুত পালিয়ে যায়। ঘোড়াগুলো বর্শার আঘাতে দিশেহারা হয়ে যায় এবং তাদের সওয়ারীরা সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। মুসলমানরা ধাওয়া করে তাদের বেশির ভাগকে হত্যা করে; কিছু সৈন্য এক চোখে জখম নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এরপরেই মুসলিম বাহিনীর ছয় শ সৈন্য এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় এবং তারা পুরোপুরিভাবে নদীর পূর্ব পাড়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। [cite: ১৯৮]

২.৬.৫। মুসলিম সেনাবাহিনীর নদী অতিক্রম
সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন দেখলেন যে, আসিম ওই পাড়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে, তখন তিনি তার বাহিনীর সবাইকে নদী পার হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, সবাই এই দুআ পাঠ করো :

نَسْتَعِينُ بِاللَّهِ وَنَتَوَكَّلُ عَلَيْهِ حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِيِّ الْعَظِيمِ
আমরা আল্লাহর সাহায্য চাই এবং তারই ওপর ভরসা করি। আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কার্যসম্পাদনকারী। আল্লাহ ছাড়া আর কারও কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই, তিনিই সুউচ্চ মহান, চরম ক্ষমতাশীল। [cite: ১৯৯]

মুসলিম সৈন্যরা ঘোড়ায় চড়েই নদী পার হলেন। তাদের ঘোড়াগুলো খরস্রোতা নদীর ওপর দিয়ে এমনভাবে সাঁতরে যাচ্ছিল যেন হাঁস সাঁতরে যাচ্ছে এবং যমীনে পথ চলার সময় পরস্পরের মধ্যে যেমন কথাবার্তা হয়, তেমনি তারা একে অন্যের সঙ্গে কথা-বার্তা বলছিলেন। [cite: ২০০] সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর পাশাপাশি ছিলেন সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহু। তাদের ঘোড়াগুলো নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কেটে এগোতে থাকলে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন,

حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ وَاللَّهِ لَيَنْصُرَنَّ اللَّهُ وَلِيَّهُ وَلَيُظْهِرَنَّ اللَّهُ دِينَهُ وَلَيَهْزِمَنَّ اللَّهُ عَدُوَّهُ
আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কার্যসম্পাদনকারী। আল্লাহর কসম, আল্লাহ অবশ্যই তার প্রিয় বান্দাদের সাহায্য করবেন এবং তার দ্বীনকে বিজয়ী করবেন। আল্লাহ তার শত্রুদের পরাজিত করবেন (যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম বাহিনী-যাদের নেক কাজের পাল্লাই ভারী-সীমালঙ্ঘন বা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকবে)। [cite: ২০১]

সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'ইসলাম নতুন। যমীনের মতো নদী ও সমুদ্রকে তাদের অধীন করে দেওয়া হয়েছে। কসম ওই সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ, একদিন মানুষ দলে দলে (ইসলাম) ছেড়ে যাবে যেমন করে তারা দলে দলে তাতে প্রবেশ করেছে। [cite: ২০২]

সালমান রাযিয়াল্লাহু আনহু এখানে 'ইসলাম নতুন' বলে এ কথা বোঝাতে চেয়েছেন যে, ইসলাম এখনো বেঁচে আছে, এর অনুসারীরা ঈমান ও আমলে মজবুত এবং তারা এ জন্য গৌরববোধ করে। ইসলামই তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, যার জন্য তারা বাঁচে এবং মরে। তারা মানুষকে এর দিকে আহ্বান করে এবং এটিকে শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু শীঘ্রই এমন এক জাতি আসবে, যারা জন্মগতভাবে ইসলাম লাভ করবে এবং নিজের চেষ্টা-সাধনায় তা অর্জন করবে না। আর এটি তাদের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মূল বিষয় হবে না; বরং তাদের সকল চেষ্টার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে জাগতিক প্রাপ্তি ও আরাম-আয়েশের দিকে; ইসলাম তাদের জীবনে গৌণ বিষয় হয়ে উঠবে। এ-সময় মানুষ দলে দলে ইসলাম ছেড়ে যাবে, যেমন করে তারা একদিন দলে দলে তাতে প্রবেশ করেছে। [cite: ২০৩]

মুসলিম বাহিনী নিরাপদেই নদী পার হয়ে যায়। কারও কোনো ক্ষতি হয়নি। কেউ পানিতে পড়ে যায়নি একজন ছাড়া। বারিক গোত্রের একজন আরোহী ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু কাকা তৎক্ষণাৎ নিজ ঘোড়ার লাগাম নদীতে ফেলে তাকে অক্ষত ও সুস্থাবস্থায় উঠিয়ে নেন। ওই বারিকী—তার গোত্রের একজন শক্তিশালী মানুষ—বলেন, 'হে কাকা, কোনো মায়ের পক্ষেই আর তোমার মতো সন্তান জন্ম দেওয়া সম্ভব নয়।' তিনি কাকা ইবনে আমরের মামা ছিলেন। [cite: ২০৪]

মুসলিম বাহিনীকে এভাবে নদী পার হতে দেখে পারসিকরা ভয় পেয়ে যায়। ইয়াযদগিরদ রাজধানী ছেড়ে হুলওয়ানের দিকে পালিয়ে যায়। মুসলমানদের বাধা দেওয়া কেউ ছিল না। তারা বিনা বাধায় শহরে প্রবেশ করেন। সাদ রা, শ্বেত প্রাসাদে ইসলামী ঝান্ডা স্থাপন করেন। তিনি সেখানে নামাযের স্থান নির্ধারণ করেন এবং তারপর সুউচ্চ সুরম্য প্রাসাদ ও সবুজ শ্যামল সতেজ বাগিচাসমূহের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কুরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করেন :

كَمْ تَرَكُوا مِنْ جَنّٰتٍ وَّعُيُوْنٍۙ وَّزُرُوْعٍ وَّمَقَامٍ كَرِيْمٍۙ وَّنِعْمَةٍ كَانُوْا فِيْهَا فٰكِهِيْنَۙ كَذٰلِكَ وَاَوْرَثْنٰـهَا قَوْمًا اٰخَرِيْنَ
তারা ছেড়ে গিয়েছিল কত উদ্যান ও প্রস্রবণ; কত শস্যক্ষেত্র ও সুরম্য স্থান। কত সুখের উপকরণ, যাতে তারা খোশগল্প করত। এমনিই হয়েছিল এবং আমি ওগুলোর মালিক করেছিলাম ভিন্ন সম্প্রদায়কে। [cite: ২০৫]

সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু সেখানে আট রাকাত নামায আদায় করেন— বিজয়ের নামায। [cite: ২০৬]

মাদাইন শহরে সর্বপ্রথম মুসলিম বাহিনীর আহওয়াল স্কোয়াড্রন প্রবেশ করে, তারপর আল-খাসরা স্কোয়াড্রন। [cite: ২০৭] আহওয়াল স্কোয়াড্রনের নেতৃত্বে ছিলেন আসিম ইবনে আমর আত-তামীমি এবং আল-খাসরা স্কোয়াড্রনের নেতৃত্বে ছিলেন কাকা ইবনে আমর। [cite: ২০৮]

২.৬.৬. মুসলমানদের সততার দৃষ্টান্ত
আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা এবং আমি তাঁর পুরস্কারেই সন্তুষ্ট।
মুসলিম বাহিনী মাদাইন শহরে প্রাপ্ত সব গনীমতের মাল জমা করে। একজন একটি আশ্চর্যজনক বস্তু এনে গনীমতের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তির নিকট জমা দেয়। সে এবং তার সঙ্গীরা তখন বলে, ‘আমরা কখনো এমন জিনিস বা এর কাছাকাছি কোনো কিছুও পাইনি।’ তারা তাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কি এ থেকে কোনো কিছু নিয়েছ?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য না হতো, তাহলে হয়তো এটি আপনার নিকট আমি আনতামই না।’ তারা বুঝতে পারলেন যে, লোকটি খুবই সৎ। এ জন্য তাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার পরিচয় কী?’ সে বলল, ‘আল্লাহর কসম, আমি আমার পরিচয় দেব না। তোমরা আমার প্রশংসা শুরু করবে। আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা এবং আমি তার পুরস্কারেই সন্তুষ্ট।' লোকটি তার গোত্রের নিকট ফিরে যাওয়ার পথে একজন তাকে অনুসরণ করে। পরে তার নাম জানা গেল; আমির ইবনে আব্দ কাইস। [cite: ২০৯]

আসমা ইবনে হারিস আদ-দাব্বি বলেন, 'আমি লোকজনের সঙ্গে গনীমতের মাল সংগ্রহ করতে বের হই। আমি অনেক পথ অতিক্রম করার পর একজনকে গাধার পিঠে সওয়ার দেখতে পাই। সে তার কাছাকাছি থাকা আরেকজনকে নিয়ে পালিয়ে যেতে থাকে। তারা গাধা হাঁকিয়ে দ্রুত নদীর তীরে উপনীত হয়। কিন্তু নদীর ওপর সেতুটি ছিল ভাঙা। আমি তাদের নিকটে পৌঁছতেই তারা দুজন দু-দিকে দৌড়ে পালাতে থাকে। তাদের একজন আমার দিকে কিছু একটা ছুঁড়ে মারে। আমি তাকে ধাওয়া করে ধরে ফেলি এবং হত্যা করি। তারপর নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের দুটি গাধাকে নিয়ে এসে গনীমতের ইনচার্জের নিকট জমা দিই। তিনি প্রথম গাধাটির দিকে দৃষ্টি দিলেন। তাতে দুটি ব্যাগ ঝুলানো ছিল। একটি ব্যাগ খুলে তাতে একটি স্বর্ণের ঘোড়া পাওয়া যায়, যার বুকে ছিল ইয়াকৃত পাথর লাগানো। অন্যটিতে একটি রৌপ্যের উটনী পাওয়া যায় যার ওপর একটি স্বর্ণের গদি ছিল, আর লাগাম ছিল বহু মূল্যবান মুক্তায় গাঁথা। এ উটনীর আরোহী আপাদমস্তক মণিমুক্তার প্রলেপ যুক্ত ছিল। সম্রাট কিসরা এগুলো তার প্রাসাদে সাজিয়ে রেখেছিল, যা ছিল তাদের ইতিহাসের গৌরবগাঁথা। [cite: ২১০]

কাকা ইবনে আমরের মহত্ত্ব
কাকা ইবনে আমর একজন পারসিক লোককে ধরে ফেলেন এবং তাকে হত্যা করেন। লোকটির সঙ্গে দুটি বাক্স এবং দুটি থলে ছিল। বাক্সগুলোর একটিতে পাঁচটি এবং অন্যটিতে ছয়টি তরবারি ছিল। এগুলো ছিল পারস্যের রাজাদের তরবারি, যা দিয়ে তারা যুদ্ধ করেছিল। এর মধ্যে একটি সম্রাট কিসরা এবং হিরাক্লিয়াসের তরবারিও ছিল। আর ব্যাগে ছিল কিছু বর্ম। এতে সম্রাট কিসরা এবং হিরাক্লিয়াসেরও বর্ম ছিল। তিনি সেগুলো সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট নিয়ে এলেন। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'তুমি যেকোনো একটি তরবারি পছন্দ করে নাও।' তখন কাকা ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হিরাক্লিয়াসের তরবারিটি বেছে নেন। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বাহরামের বর্মটি প্রদান করেন। বাকিগুলো তিনি আল-খাসরা স্কোয়াড্রনকে প্রদান করেন। এই স্কোয়াড্রনের নেতৃত্ব ছিল কাকা ইবনে আমরের হাতে। তবে কিসরা ও নুমানের তরবারি দুটি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, আরবরা এ দুজনকে চিনত। [cite: ২১১]

সাহাবায়ে কেরাম মুসলিম বাহিনীর সদস্যদের প্রশংসা করেন
প্রবীণ সাহাবীরা মুসলিম বাহিনীর সদস্যদের প্রশংসা করেন। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর কসম, এ বাহিনীর প্রতিটি সদস্য খুব সৎ। যদি বদরের সাহাবীদের মর্যাদা ইতিমধ্যে নির্ধারিত না হতো, তাহলে আমি বলতাম, তারা বদরের সাহাবীদের চেয়ে উত্তম। [cite: ২১২]

যাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর কসম, আমি কাদেসিয়ার সৈন্যবাহিনী থেকে উত্তম কোনো বাহিনী দেখিনি, যারা দুনিয়ার ওপর আখেরাতকে প্রাধান্য দিয়েছে। আমরা তিন জনের ব্যাপারে সন্দিহান ছিলাম। পরে আমাদের ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তাদের সততা এবং ধর্মভীরুতা অনেক উঁচু স্তরের।' তারা ছিলেন তুলাইহা ইবনে খুওয়াইলিদ, আমর ইবনে মাদি ইয়াকরিব এবং কাইস ইবনে আল- মাকশুহ।

তবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রশংসা এ সবকিছুকেই ছাড়িয়ে যায়। তিনি কাদেসিয়ার গনীমতের মালের মধ্যে তরবারি, কোমরবন্ধ এবং কিসরার হীরা-পান্না ও মণি-মুক্তা দেখতে পান, তখন বলেন, 'যারা এসব মূল্যবান সামগ্রী প্রেরণ করেছে, তারা সত্যিই সৎ।' আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আপনি যেহেতু সৎ, এ জন্য আপনার লোকজনও সৎ। আর যদি আপনি অসৎ হতেন, তাহলে তারাও অসৎ হতো। [cite: ২১৩]

গনীমতের মালের ব্যাপারে উমর রা.-এর আচরণ
কাদেসিয়া যুদ্ধের পর সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গনীমতের মালের এক- পঞ্চমাংশ খলীফার নিকট প্রেরণ করেন। সেগুলোর মধ্যে ছিল সম্রাট কিসরার উন্নত পরিধেয় বস্ত্র, তরবারি, কোমরবন্ধ, ব্রেসলেট, জামা- কাপড়, শিরস্ত্রাণ ইত্যাদি। এগুলো রেশম, স্বর্ণ ও মণি-মুক্তায় খচিত ছিল।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকদের দিকে দৃষ্টি দিয়ে একজন লম্বা ও সুঠামদেহী লোক বাছাই করেন। তিনি ছিলেন সুরাকা ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বললেন, 'হে সুরাকা, দাঁড়াও এবং এগুলো পরিধান করো।' সুরাকা রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি এগুলো পাওয়ার আশা করেছিলাম। সুতরাং আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং পরিধান করলাম।' তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'সবার সামনে একটু হেঁটে বেড়াও।' সুরাকা রাযিয়াল্লাহু আনহু হাঁটলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'ফিরে আসো।' তারপর তিনি ফিরে এলেন। তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'চমৎকার! মাদলায গোত্রের এক বেদুইন পারসিক সম্রাট কিসরার তরবারি, কোমরবন্ধ, ব্রেসলেট, জামা-কাপড়, শিরস্ত্রাণ পরেছে! আজ কি সৌভাগ্যের দিন, হে সুরাকা! আজ তোমার ও তোমার লোকদের জন্য কত সম্মান! এখন এসব খুলে ফেলো।'

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে আল্লাহ, আপনি আপনার রাসূলকে এসব থেকে বিরত রেখেছিলেন, যিনি আমার চেয়ে আপনার নিকট বেশি প্রিয় এবং আমার চেয়ে আপনার নিকট বেশি সম্মানিত। তারপর আবু বকরকে এসব থেকে বিরত রেখেছিলেন, যিনি আমার চেয়ে আপনার নিকট বেশি প্রিয় এবং আমার চেয়ে আপনার নিকট বেশি সম্মানিত। এখন আপনি আমাকে এসব দান করেছেন। আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি-না জানি আমি এসব দ্বারা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে যাই।' তারপর তিনি কাঁদতে থাকেন। লোকজন এসে তাকে সান্ত্বনা দিলেন। তিনি আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে বলেন, 'আপনি দ্রুত এগুলো বিক্রি করুন এবং সন্ধ্যার আগেই প্রাপ্ত মূল্য লোকদের মধ্যে বণ্টন করে দিন। [cite: ২১৪]

২.৭। জালুলার যুদ্ধ
পারসিকরা জালুলায় এসে সমবেত হলো। পারস্যের বিভিন্ন শহরে যাওয়ার রাস্তা এসে এখানে মিলিত হয়েছে। তারা নিজেদের মধ্যে একে অন্যকে দোষারোপ করতে লাগল। তারা বলল, 'আজ যদি তোমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও, তাহলে আর কখনো ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে না। আর যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি, তাহলে এখান থেকেই আমরা আলাদা হতে যাচ্ছি। চলো, আমরা আরবদের বিরুদ্ধে আবার ঐক্যবদ্ধ হই এবং তাদের সঙ্গে লড়াই করি। যদি আমরা বিজয়ী হই, তাহলে তো আমরা সফলকাম; আর যদি ব্যর্থ হই, তাহলে আমরা বলতে পারব যে, আমরা আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি।' সুতরাং তারা মাহরান আর-রাযির নেতৃত্বে পুনরায় সংগঠিত হলো। তারা নিরাপত্তার জন্য শহরের চারিদিকে গভীর পরিখা খনন করল এবং নিজেদের যাতায়াতের পথ ছাড়া বাকি অংশে কাঠের গজাল পুঁতে রাখে।

সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পারসিকদের এই প্রস্তুতির কথা যথাসময়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট লিখে পাঠান। এর জবাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে হাশিম ইবনে উতবার নেতৃত্বে বারো হাজার সৈন্য প্রেরণ করতে বলেন এবং সৈন্যবাহিনীর সম্মুখভাগে কাকা ইবনে আমর, ডানভাগে মাশআর ইবনে মালিক, বামদিকে আমর ইবনে মালিক ও পেছন দিকে আমর ইবনে মূররা প্রমুখ সেনাধ্যক্ষগণের ওপর সেনা পরিচালনার দায়িত্ব দিতে বলেন।

হাশিম তার বাহিনী নিয়ে জালুলায় গমন করেন এবং শহরটিকে অবরোধ করেন। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে অবরোধ চলতে থাকে। পারসিকরা সুযোগ বুঝে মাঝে মাঝে আক্রমণ করতে লাগল; এভাবে প্রায় আশিটি খণ্ডযুদ্ধ সংঘটিত হলো। আল্লাহ মুসলমানদের সাহায্য করলেন। তারা মুশরিকদের এসব যুদ্ধে প্রতিবারই পরাজিত করে এবং তাদের দুর্গে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে। শত্রুরা এবার শহরের চারিদিকে লোহার পেরেক পুঁতে রাখে। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অনবরত সাহায্য-সৈন্য প্রেরণ করতে থাকেন। অবরোধে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হতে থাকলে এবং মুসলমানদের ধৈর্যের কারণে তাদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছলে পারসিকরা আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোষণা করলেন, 'আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বাত্মক শক্তি দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করো যাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ পুরস্কার এবং গনীমতের মাল লাভ করতে পার।' তারা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। আল্লাহ শত্রুর বিরুদ্ধে এক ঘূর্ণিবায়ু প্রেরণ করলেন। ধূলিঝঞ্ঝায় চারিদিক অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল। পারসিকরা নিরুপায় হয়ে পেছাতে শুরু করে। অন্ধকারে পথ খুঁজে না পেয়ে তাদের ঘোড়াগুলো পরিখায় গিয়ে পড়তে লাগল এবং সেখান থেকে তারা আর উঠতে পারেনি। এভাবে তারা নিজেদের তৈরি পরিখায় প্রাণ হারাতে লাগল। [cite: ২১৫]

শত্রুদের দলে দলে পরিখায় পড়ে প্রাণ হারানোর সংবাদ পেয়ে মুসলিম সেনারা বলল, 'এটাই শত্রুদের আক্রমণ করার চূড়ান্ত সময়।' মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণ করতে দেখে শত্রুরা পরিখার চারিদিকে লোহার পেরেক পুঁততে থাকে যাতে তাদের ঘোড়াগুলো আক্রমণ করতে এগিয়ে আসতে না পারে। কিন্তু তারা নিজেদের জন্য কিছু জায়গা নিরাপদ রাখে যাতে তারা মুসলমানদের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করতে পারে। অতঃপর উভয়পক্ষে আক্রমণ শুরু হলো এবং এমন ভীষণ যুদ্ধ হলো যে, একামাত্র কাদেসিয়ার লাইলাতুল হারীর ব্যতীত আর কখনো এমন যুদ্ধ দেখা যায়নি। তবে এটি ছিল সংক্ষিপ্ত এবং দ্রুততর যুদ্ধ। কাকা ইবনে আমর বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করতে করতে দুর্গের ফটকে এসে পৌঁছেন এবং তিনি তা অবরোধ করেন। তিনি একজনকে জোরে ঘোষণা করতে বলেন, 'হে মুসলিম, সেনাপতি ফটকে এসে পড়েছে। তাড়াতাড়ি তার নিকট আসো। আসার পথে তার আর তোমাদের মধ্যে কোনো কিছুই যেন বাধা না হয়।' তিনি মুসলমানদের সাহস ও শক্তি বৃদ্ধি করার জন্যই এ আদেশ দিয়েছিলেন। সুতরাং মুসলমানগণ প্রবল বিক্রমে আক্রমণ করল এবং সৈন্যদের মধ্যে তাদের সেনাপতি হাশিম ইবনে আমরের উপস্থিত থাকার ব্যাপারে কারও কোনো সন্দেহ ছিল না। কোনো বাধাই তারা মানেনি। শেষ পর্যন্ত তারা দুর্গের ফটকে এসে পৌঁছে তারা কাকা ইবনে আমরকে দুর্গ অবরোধ করে রাখতে দেখে। মুশরিকরা চারিদিকে পালাতে থাকে। কিন্তু কোনোদিকে পালাবার পথ ছিল না। ফলে নিজেদের খনন করা খাদে পড়ে প্রাণ বিসর্জন দিতে লাগল।

ওইদিন শত্রুরা মুসলমানদের কৌশলের নিকট পরাস্ত হয়, নিজেদের পুঁতে রাখা লোহার পেরেকে তাদের ঘোড়াগুলো ক্ষত-বিক্ষত হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তারা পদাতিক বাহিনীতে পরিণত হয়। মুসলমানগণ তাদের ধাওয়া করে এবং কাউকেই রেহাই দেয়নি। ওইদিন এক লক্ষ পারসিক সেনা নিহত হয় এবং যমীনে লাশের স্তূপ জমে ওঠে। [cite: ২১৬]

২.৭.১। আমাদের সামরিক বাহিনীর গৌরবগাথাই আমাদের কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে।
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু সুসংবাদ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশসহ যিয়াদ ইবনে উবাইকে মদীনায় খলীফার নিকট প্রেরণ করেন। যিয়াদ সৈন্যদের তথ্য সংরক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি খলীফার নিকট গিয়ে সুন্দরভাবে যুদ্ধের বর্ণনা এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বিবরণ তুলে ধরেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তুমি কি লোকজনের সম্মুখে আমাকে যা বলেছ তা পুনরায় বলতে পারবে?' যিয়াদ তা-ই করলেন। তিনি যুদ্ধের একটি নিখুঁত চিত্র সবার সমানে অপূর্ব বাগ্মিতায় তুলে ধরলেন; যুদ্ধে তাদের ভূমিকা এবং কীভাবে তারা শত্রুদের দুর্গে আঘাত করেছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এটি একটি চমৎকার বাগ্মিতার দৃষ্টান্ত।' যিয়াদ বললেন, 'আমাদের সামরিক বাহিনীর গৌরবগাথাই আমাদের কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে।'

২.৭.২। জালুলার যুদ্ধলব্দ সম্পদ সম্পর্কে উমর রা.-এর প্রতিক্রিয়া
জালুলার যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে এবং প্রচুর পরিমাণে গনীমতের সম্পদ লাভ করে। তারা এর এক-পঞ্চমাংশ খলীফার নিকট প্রেরণ করেন। এ সম্পদ দেখে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহর কসম, এগুলো কোনো ছাদের নিচে রাখা যাবে না, যতক্ষণ না আমি এগুলো বিতরণ করে দিই।' তবে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় সেদিন বণ্টন করা সম্ভব হয়নি। সেগুলো মসজিদের বারান্দায় স্তূপীকৃত করে রাখা হলো। আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আকরাম রাযিয়াল্লাহু আনহু সারারাত ধরে এগুলো পাহারা দেন। পরের দিন সকালে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকজনসহ সম্পদগুলোর ওপর আবরণ সরিয়ে ফেলেন। তিনি স্তূপীকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য ও রাশিকৃত মণিমুক্তা দেখে কাঁদতে আরম্ভ করলেন। আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনি কেন কাঁদছেন, হে আমীরুল মুমিনীন? বরং এ-সময় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিত।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি এই ধনরাশির মধ্যে ধ্বংসের বীজ দেখতে পাচ্ছি। যেখানে ধন-সম্পদের প্রাচুর্য থাকে, সেখানে হিংসা-বিদ্বেষও দানা বেঁধে ওঠে। আর যদি হিংসা-বিদ্বেষ শুরু হয়, তাহলে তা শত্রুতা সৃষ্টি করে এবং জাতিকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলে। [cite: ২১৭]

এটি একজন পরম ধার্মিক ও একনিষ্ঠ ঈমানদারের দূরদর্শিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জাগতিক প্রাপ্তিতে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হতে পারে, এই আশঙ্কা তার মনকে এত তীব্রভাবে ব্যথিত করে যে, তিনি নিজের অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। এটি খুবই আশ্চর্যজনক যে, এত বড় ইসলামী রাষ্ট্রনায়ক, যাকে সবাই ভীষণভাবে ভয় পায়—মুসলিম, কাফের ও মুনাফিক একই ভাবে যার ভয়ে সন্ত্রস্ত—তিনি কাঁদছেন! আল্লাহ তাদের অন্তরে এতটাই ঈমানের দৌলত দিয়েছিলেন যেন তারা কুরআনের আয়াতের বাস্তব প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠেন :

مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَةَ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ۖ تَرَبَهُمْ رُكَعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ ۚ ذَٰلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَيَةِ ۚ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنجِيلِ ۚ كَزَرْعٍ اَخْرَجَ شَطْهُ فَأَزَرَةً فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَىٰ عَلَىٰ سُوقِهِ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ ۗ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًان
মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সাথে যারা আছে তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর; পরস্পরের প্রতি সদয়, তুমি তাদের রুকুকারী, সিজদাকারী অবস্থায় দেখতে পাবে। তারা আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করছে। তাদের আলামত হচ্ছে, তাদের চেহারায় সিজদার চিহ্ন থাকে। এটাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইনজীলে তাদের দৃষ্টান্ত হলো একটি চারাগাছের মতো, যে তার কচিপাতা উদ্‌দ্গত করেছে ও শক্ত করেছে, অতঃপর তা পুষ্ট হয়েছে ও স্বীয় কাণ্ডের ওপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়েছে, যা চাষীকে আনন্দ দেয়। যাতে তিনি তাদের দ্বারা কাফিরদের ক্রোধান্বিত করতে পারেন। তাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপ্রতিদানের ওয়াদা করেছেন। [cite: ২১৮]

২.৮। রামহরমুয বিজয়
এত কিছুর পরেও পারসিকরা তাদের রাজা ইয়াযদগিরদকে কেন্দ্র করে পুনরায় একত্র হওয়া শুরু করে। তারা সেনাপতি হরমুষের নেতৃত্বে রামহরমুযে জমা হয়। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু পারসিকদের এই জমা হওয়ার সংবাদ খলীফার নিকট প্রেরণ করেন। খলীফা তাকে নুমান ইবনে মুকাররিনের নেতৃত্বে কুফাবাসীদের মধ্য থেকে একটি বাহিনী প্রস্তুত করতে বলেন। তিনি বসরায় আবু মূসা আশআরীকে সাহল ইবনে আদিয়্যির নেতৃত্বে আরেকটি বাহিনী প্রস্তুত করতে বলেন। যখন এই দুই বাহিনী একত্র হবে, তখন সম্মিলিত বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে আবু সাবরাহ ইবনে আবি রুহম দায়িত্বভার গ্রহণ করবে এবং এরপর যারাই এ বাহিনীতে যোগ দেবে, তারা তার সাহায্য-সৈন্য হিসাবে গণ্য হবে।

নুমান ইবনে মুকাররিন কুফা থেকে সৈন্যবাহিনী নিয়ে রামহরমুযে অবস্থানরত সেনাপতি হরমুযানের উদ্দেশে রওনা হয়ে যান। এ সংবাদ পেয়ে হরমুযান নুমানের বাহিনীকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা নেয়। এতে নুমানের বাহিনীকে মুসলমানদের অন্য বাহিনীর সঙ্গে মিলে শক্তি বৃদ্ধির আগেই পরাস্ত করা সম্ভব হবে। হরমুযান তার বাহিনী গঠনে সদ্য যোগ দেওয়া পারসিকদের সাহায্য নেয়। হরমুযান এবং নুমান আরবাক নামক স্থানে মুখোমুখি হয় এবং উভয়পক্ষ মারাত্মক লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তা'আলা নুমানকে বিজয় দান করেন। হরমুয রামহরমুয ত্যাগ করে তাসতারে পালিয়ে যায়।

অন্যদিকে সাহল ইবনে আদিয়্যির নেতৃত্বে রামহরমুষের দিকে এগিয়ে আসা বসরার মুসলিম বাহিনী এ বিজয়ের সংবাদ লাভ করে। সুতরাং তারা হরমুযানের উদ্দেশ্যে তাসতারের দিকে গতিপথ পরিবর্তন করেন। [cite: ২১৯]

২.১। তাসতার বিজয়
নুমান এবং সাহলের সৈন্যবাহিনী এসে তাসতারে একত্র হয়। এ সম্মিলিত বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে আবু সাবরাহ ইবনে আবি রুহম দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। আবু সাবরাহ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট সাহায্য-সৈন্য চেয়ে পাঠান। খলীফা তখন বসরার সামরিক বাহিনীর সেনাপতি আবু মূসা আশআরীকে প্রেরণ করেন। আবু সাবরাহ পুরো বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। মুসলিম বাহিনী তাসতার কয়েক মাস ধরে অবরোধ করে রাখে এবং এ-সময় তারা প্রায় আশিটি খণ্ডযুদ্ধ করে। দ্বৈতযুদ্ধে অনেক মুসলিম বীরের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তাদের অনেকে এক শতেরও বেশি কাফেরকে মল্লযুদ্ধে হত্যা করে। এর পাশাপাশি খণ্ডযুদ্ধে শত্রু হত্যার ঘটনা তো আছেই। এসব বীরদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: বারা ইবনে মালিক, মাযজাহ ইবনে সাওর, কাব ইবনে সুর এবং আবু তামীমা। তারা সবাই ছিলেন বসরার সৈন্য। আর কুফাবাসীদের থেকে হাবীন ইবনে কুররাহ, রাবা ইবনে আমির এবং আমির ইবনে আব্দুল্লাহ আল-আসওয়াদ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। [cite: ২২০]

পরিশেষে মুসলিম বাহিনী শত্রুদের সঙ্গে চূড়ান্ত লড়াইয়ের মুখোমুখি হন। যুদ্ধ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। মুসলমানগণ বারা ইবনে মালিককে লক্ষ্য করে বলে, 'হে বারা, আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাদের বিজয় দান করেন।' বারা বলেন, 'হে আল্লাহ, আমাদের বিজয় দান করেন এবং আমাকে শহীদের মর্যাদা দান করুন।' তারপর মুসলমানগণ শত্রুদের ওপর প্রবল আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শত্রুরা এতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং পরাজয় বরণ করে। তারা তাদের পরিখা অতিক্রম করে দুর্গে আশ্রয় নেয় এবং মুসলিমরা তাদের ধাওয়া করে। পারসিকদের পক্ষে অবরোধ অসহনীয় হয়ে উঠলে তাদের দুজন আলাদাভাবে মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং শহর জয়ের পথ বলে দেয়; পানি নির্গমনের পথে প্রবেশ পথ রয়েছে বলে জানায়। নুমান এ সংবাদ পেয়ে লোকদের কিছু একটা করার জন্য অনুরোধ করে। কুফা এবং বসরার বীর সেনারা ওই স্থানে রাতের অন্ধকারে এসে সমবেত হয় এবং শহরে প্রবেশ করে। তারা শহরের গেইটের ভেতর থেকে তাকবীর-ধ্বনি দিতে থাকে এবং বাইরে থেকেও মুসলিম বাহিনী তাকবীর-ধ্বনি দিয়ে এর জবাব দেয়। তারপর ভেতর থেকে গেইট খুলে দিলে মুসলিম বাহিনী কোনো বাধা ছাড়াই শত্রুসেনাদের ওপর আক্রমণ করে এবং তাদের সমূলে ধ্বংস করে। [cite: ২২১]

এই যুদ্ধে হরমুযানের নিক্ষিপ্ত তিরের আঘাতে বারা ইবনে মালিক এবং মাযজাহ ইবনে সাওর শহীদ হন। তারা এমন এক সময় নিহত হন যখন মুসলমানরা যুদ্ধে বিজয় লাভ করেন এবং হরমুযান দুর্গের ভেতর আশ্রয় নেয়। মুসলিম বীর সেনারা, যারা পানিপথে শহরে প্রবেশ করেছিল, তারা দুর্গটিকে ঘিরে ফেলে। তারা হরমুযকে দেখতে পেয়ে তার দিকে ছুটে যায়। তখন হরমুয তাদের লক্ষ করে বলে, 'তোমরা কী চাও? তোমরা যদি মনে করো যে, আমি নিরুপায় হয়ে গেছি, তাহলে মনে রেখো, আমার থলেতে এক শ তির রয়েছে। আল্লাহর কসম, আমার কাছে একটি তিরও অবশিষ্ট থাকতে তোমার আমার নিকট আসতে পারবে না এবং একটি তিরও আমার লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না। তোমাদের এক শ জনকে হত্যা কিংবা আহত করার চাইতে আমাকে বন্দী করা তোমাদের জন্য উত্তম নয় কি?' মুসলমানগণ জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কী চাও?' হরমুয বলল, 'আমি চাই, তোমরা আমাকে বন্দী করে খলীফা উমরের কাছে নিয়ে যাও। তারপর তিনি যা ইচ্ছা করবেন।' তারা বলল, 'ঠিক আছে। তা-ই হবে।' তারপর হরমুয তার তিরের ভান্ডার ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিজেকে মুসলমানদের হাতে সোপর্দ করল। তারা তাকে শেকলে আবদ্ধ করে কঠিন সতর্কতার মধ্যে খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট প্রেরণ করল। তারপর তারা শহরের ধন-সম্পদ জমা করল। এর এক-পঞ্চমাংশ খলীফার নিকট প্রেরণ করে বাকি সম্পদ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিল। তাতে প্রত্যেক অশ্বারোহী সৈনিক তিন হাজার দিরহাম এবং পদাতিক সৈনিক এক হাজার দিরহাম লাভ করল। [cite: ২২২]

তাতার যুদ্ধের থেকে নিম্নলিখিত শিক্ষাসমূহ লাভ করা যায়:

আমি এক ওয়াক্ত নামাযের পরিবর্তে দুনিয়া এবং এর মধ্যস্থিত যাবতীয় বস্তুও কামনা করি না।
আনাস ইবনে মালিক, বারাআ ইবনে মালিকের ভাই, বলেন, ‘আমি তাতার অবরোধে ছিলাম। প্রত্যুষে যখন লড়াই তীব্র হয়ে ওঠে তখন মুসলিম সেনারা নামায পড়ার সুযোগ পায়নি। সূর্য উঠার পূর্ব পর্যন্ত আমরা নামায পড়তে পারিনি। তারপর আমরা ফজরের নামায আদায় করি। আমরা আবু মুসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে ছিলাম এবং আল্লাহ আমাদের বিজয় দান করেন। আনাস ইবনে মালিক আল-আনসারী বলেন, ‘আমি এক ওয়াক্ত নামাযের পরিবর্তে দুনিয়া এবং এর মধ্যস্থিত যাবতীয় বস্তুও কামনা করি না’। [cite: ২২৩]

বারাআ ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবন ছিল প্রশংসিত জীবন। তবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সম্পর্কে যা বলেছেন, এর চেয়ে উত্তম আর কিছু হতে পারে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘মাথায় উস্কোখুস্কো চুল ও দেহে ধূলিমলিন দু-খানা পুরনো কাপড় পরিহিত এরূপ অনেক ব্যক্তি রয়েছে, যার প্রতি লোকেরা দৃকপাত করে না। অথচ সে আল্লাহর নামে শপথ করে ওয়াদা করলে তিনি তা সত্যে পরিণত করেন। আল-বারাআ ইবনে মালিক তাদের দলভুক্ত’। [cite: ২২৪]

আল-বারাআ এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যার দোয়া কবুল করা হতো (মুস্তাজাবুদ দা’ওয়াত)। বিষয়টি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই হাদীসের কারণেই সবাই জানত। এ জন্য এই যুদ্ধে লোকেরা তাকে শত্রুর পরাজয়ের জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতে বলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে এ রকম সম্মানসূচক কথা শোনার পরও তার মধ্যে কোনো অহংকার কিংবা ঔদ্ধত্য ছিল না; বরং তিনি ছিলেন বিনয়ী, যে কিনা যুদ্ধে প্রচণ্ড ঝুঁকি গ্রহণ করতেন এবং অবিশ্বাস্য সাফল্য ছিনিয়ে আনতেন। আর তিনি কখনো নেতৃত্বের জন্য লালায়িত ছিলেন না। তিনি আল্লাহর নিকট বিজয়ের জন্য প্রার্থনা করেন, যা মুসলমানদের জন্য অনেক কল্যাণের কারণ হবে, তখনো তিনি নিজের অবস্থান ভুলে যাননি। তিনি একজন মুসলমানের জন্য পরম পাওয়া, শাহাদাত আকাঙ্ক্ষা করেন। প্রচণ্ড ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান না হলে এ রকম দুআ করা সম্ভব নয়। আল্লাহ তা'আলা তার দুআ মঞ্জুর করেন; তিনি মুসলমানদের শত্রুদের পরাজিত করেন এবং একই সঙ্গে তাকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করেন। [cite: ২২৫]

২.৯.১। খলীফা উমর রা. এবং হরমুয
আবু সাবরাহ ইবনে আবি রুহম, ওই যুদ্ধে মুসলিম সেনাপতি, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে হরমুযকে প্রেরণ করেন। মদীনায় প্রবেশের পূর্বে তারা হরমুযকে তার ব্যবহৃত পোশাকে সজ্জিত করেন। স্বর্ণের কারুকাজমণ্ডিত পোশাকের সঙ্গে মণিমুক্তাখচিত শিরস্ত্রাণও পরিধান করান যাতে খলীফা ও মদীনার লোকেরা তাকে তার স্বাভাবিক পোশাকে দেখতে পান। তারপর তারা তাকে খলীফার বাড়িতে নিয়ে যান। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন বাড়িতে ছিলেন না। তারা জানতে পারে, উমর রা, মসজিদে কুফা থেকে আগত একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। তারপর তারা মসজিদে এসেও তার দেখা পাননি। মসজিদ থেকে ফেরার পথে তারা কিছু শিশুকে খেলায় মত্ত দেখতে পান। শিশুরা জিজ্ঞাসা করল, 'আপনারা কাকে খুঁজছেন? আপনারা কি আমীরুল মুমিনীনকে খুঁজছেন? তিনি মসজিদের ডান দিকে তার পাগড়িতে মাথা রেখে শুয়ে আছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মাথায় একটি বিশেষ পাগড়ি পরিধান করে কুফার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বের হয়েছিলেন। প্রতিনিধিদল বিদায় নিলে তিনি পাগড়িটিকে পেঁচিয়ে বালিশ বানিয়ে তাতে মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। তারা আরও লোকজনসহ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গিয়ে হাজির হন। মসজিদে তিনি ছাড়া আর কোনো লোক ছিল না; ঘুমন্ত অথবা জাগ্রত। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে তার লাঠিটি ধরা ছিল। হরমুয জিজ্ঞাসা করল, 'উমর কোথায়?' তারা বলল, 'তিনিই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু।'

প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সবাইকে নীরবতা অবলম্বন করার জন্য ইশারা করেন। সবাই চুপচাপ বসে আছে। এ-সময় হরmuয জিজ্ঞাসা করে, 'খলীফার নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রহরী দল কোথায়?' তারা বলল, 'তার কোনো পাহারা কিংবা প্রহরী নেই। এমনকি তার কোনো সেক্রেটারিও নেই।' হরমুয বলল, 'তাহলে কি তিনি নবী?' তারা বলল, 'তিনি নবীদের কাজ করেন।'

চারপাশের আওয়াজে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ঘুম ভেঙে যায়। তিনি সোজা উঠে বসেন। তারপর তিনি হরমুষের দিকে তাকান এবং বলেন, 'এ ব্যক্তিই কি হরমুয?' তারা বলল, 'হ্যাঁ।' খলীফা হরমুষের দিকে ভালো করে লক্ষ করল। তার পোশাক-আশাক দেখে বললেন, 'আমি জাহান্নামের আগুন থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাই এবং আমি তার সাহায্য আশা করি।' তিনি আরও বলেন, 'আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা, যিনি ইসলামের মাধ্যমে এই ব্যক্তি ও তার অনুসারীদের লাঞ্ছিত করেছেন। হে মুসলমান, ইসলামকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরো, তোমাদের রাসূলের প্রদর্শিত পথে চলো এবং এ দুনিয়ার চাকচিক্যে প্রতারিত হোয়ো না। কারণ, দুনিয়া মানেই ধোঁকা।'

প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বলল, 'ইনি হচ্ছেন আল-আহওয়ায রাষ্ট্রের শাসক। তার সঙ্গে কথা বলুন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'কখনোই না। যতক্ষণ তার দেহ থেকে এই শানদার পোশাক অপসারণ না করা হবে, ততক্ষণ এই ব্যক্তির সঙ্গে কোনো কথা নেই।' সুতরাং হরমুযের দেহ থেকে ছতর ঢাকার মতো সামান্য কিছু ছাড়া সবই খুলে ফেলা হলো এবং তাকে একটা চাদরে আবৃত করা হলো। তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে হরমুয, এখন বলো, বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতি এবং আল্লাহর শাস্তি কেমন দেখলে?' সে বলল, 'হে উমর, জাহেলী যুগে আমাদের মধ্যে বিরোধ-মীমাংসায় কারও পক্ষেই আল্লাহর সাহায্য ছিল না। আমরা তোমাদের পরাজিত করেছি; কারণ, তিনি কোনো পক্ষেই ছিলেন না। এখন আল্লাহ তোমাদের পক্ষে। এ জন্য তোমরা আমাদের পরাজিত করেছ।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'জাহেলী যুগে তোমরা আমাদের পরাজিত করতে পেরেছিলে কারণ, তোমরা ছিলে ঐক্যবদ্ধ, আর আমরা ছিলাম বিভক্ত।'

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, 'বার বার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার কারণ কী?' সে বলল, 'আমার ভয় হচ্ছে, আমি আমার কথা শেষ করার আগেই হয়তো তুমি আমাকে হত্যা করে ফেলবে।' তিনি বললেন, 'ভয় পেয়ো না। তুমি কথা শেষ না করা পর্যন্ত তোমার কোনো ক্ষতি হবে না।' তখন হরমুয পানি পান করতে চায়। তাকে একটা অমসৃণ পাত্রে পানি দেওয়া হলো। সে বলল, 'পিপাসায় মারা গেলেও আমি এ গ্লাসে পানি পান করতে পারব না।' তারপর সুন্দর এক পাত্রে তার জন্য পানি আনা হলো। এবার সে খুশি হলো। তার হাত কাঁপা শুরু করল এবং সে বলল, 'আমার ভয় হচ্ছে, আমি পানি পান করা অবস্থায় তুমি আমাকে মেরে ফেলবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি পানি পান না করা পর্যন্ত তোমার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না।' তখন হরমুয পাত্রের পানি মাটিতে নিক্ষেপ করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলে উঠলেন, 'তাকে আরও কিছু পানি দাও। পিপাসার্ত অবস্থায় তাকে হত্যা কোরো না।' সে বলল, 'আমার আর পানির প্রয়োজন নেই। আমি কেবল আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলাম।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'আমি তোমাকে হত্যা করব।' সে বলল, 'তুমি আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছ।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি মিথ্যা বলছ।' আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন বলে উঠলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, সে সত্য বলেছে। আপনি তাকে নিরাপত্তার ঘোষণা দিয়েছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি বারাআ ইবনে মালিক ও মাযজাহ ইবনে সাওরের খুনিকে কীভাবে রেহাই দেব? আল্লাহর কসম, তুমি তোমার স্বপক্ষে কোনো সাক্ষী উপস্থিত করতে না পার, তবে আমি তোমাকে শাস্তি দেব।' আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আপনি তাকে বলেছেন—'তুমি কথা শেষ না করা পর্যন্ত তোমার কোনো ক্ষতি হবে না' এবং 'তুমি পানি পান না করা পর্যন্ত তোমার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না।' চারিদিকে উপস্থিত লোকেরাও একই কথা বলল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হরমুযের দিকে তাকালেন এবং বললেন, 'তুমি আমাকে প্রতারিত করেছ এবং কোনো মুসলমান যদি তোমার স্বপক্ষে কথা না বলত, তাহলে আমি এ প্রতারণা মেনে নিতাম না।' এ ঘটনায় হরমুয মুসলমান হয়ে যায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার জন্য দুই হাজার দিরহাম ভাতা নির্ধারণ করে দেন এবং তাকে মদীনায় থাকার অনুমতি প্রদান করেন। [cite: ২২৬]

২.১০। যুন্দাইসাবুর বিজয়
আবু সাবরাহ ইবনে আবি রুহম আশ-শূস এলাকা জয় করার পর তিনি সৈন্যসহ যুন্দাইসাবুরের দিকে অগ্রসর হন। যুন্দাইসাবুর ইতিমধ্যে জার ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে কুলাইব অবরোধ করে রেখেছিলেন। তারা সেখানে অবস্থান করতে থাকেন এবং শত্রুদের সঙ্গে খণ্ড যুদ্ধ চলতে থাকে। একসময় মুসলমানদের পক্ষ থেকে একজন তাদের নিরাপত্তা দেয়। এই শহরের বিজয় এবং নাহাওয়ান্দ অভিযানের মধ্যে সময়ের পার্থক্য ছিল দুই মাস।

মুসলমানরা হঠাৎ করেই দেখে, যুন্দাইসাবুরের দুর্গের সব গেইটগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে এবং লোকজন তাদের বেড়ার পাল নিয়ে, কেউ-বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দ্রব্যাদি নিয়ে বের হয়ে আসছে। মুসলিম বাহিনীর সৈন্যরা তাদের নিকট এর কারণ জিজ্ঞাসা করে। তারা বলে, 'আপনারা আমাদের নিরাপত্তা দিয়েছেন এবং আমরা তা মেনে নিয়েছি। আপনাদের নিরাপত্তার বিপরীতে আমরা জিযিয়া কর দেব।' তারা বলল, 'আমরা এ রকম কিছু বলিনি।' লোকেরা বলল, 'আমরা মিথ্যা বলছি না।' তখন মুসলমানগণ নিজেদের মধ্যে অনুসন্ধান করে আসল ঘটনা বের করল। একজন মুসলিম গোলাম তাদের নিকট চিঠি লিখেছে। তার নাম মাকনাফ এবং এ শহরের অধিবাসী ছিল। তখন সৈন্যরা বলল, 'সে তো একজন গোলাম।' তারা বলল, 'আমরা জানি না তোমাদের মধ্যে কে গোলাম আর কে স্বাধীন ব্যক্তি। আমরা এ রকম নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেয়েছি এবং আমরা তা অনুসরণ করব। আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করব না। যদি তোমরা তা না মানতে চাও, তাহলে যা ইচ্ছা, করো।'

মুসলিম বাহিনী তাদের ছেড়ে দিল এবং এ বিষয়ে চিঠিতে খলীফাকে অবহিত করল। তিনি তাদের লিখে পাঠালেন : আল্লাহ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তোমরা যদি তা না করো, তাহলে একনিষ্ঠ মুসলিম হতে পারবে না। যদি তোমাদের এ ব্যাপারে সন্দেহও হয়, তবু তোমরা এ চুক্তি মেনে নাও এবং তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করো।' সুতরাং মুসলিম বাহিনী তাদের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করে এবং তাদের ছেড়ে চলে আসে। [cite: ২২৭]

এ ঘটনা থেকে কাফের শত্রুদের সঙ্গেও মুসলমানদের ন্যায়সংগত আচরণ করতে দেখা যায়। নিঃসন্দেহে তাদের এই মহান আচরণ কাফেরদের দলে দলে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। [cite: ২২৮]

২.১০.১। নুমান ইবনে মুকাররিন এবং কাসকার শহর
নুমান ইবনে মুকাররিন কাসকার শহরের গভর্নর ছিলেন। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট একটি চিঠি প্রেরণ করেন। তিনি লেখেন : আমার এবং কাসকারের মধ্যে সম্পর্ক একজন যুবকের পাশে সুন্দরী ও আকর্ষণীয় বেশ্যার মতোই। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে এ পদ থেকে অব্যাহতি দিন এবং আমাকে কোনো মুসলিম সেনাবাহিনীতে অংশগ্রহণের সুযোগ দিন।' তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে জবাবে লেখেন, 'যাও, নাহাওয়ান্দে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যোগ দাও এবং তুমিই তাদের সেনাপতি। [cite: ২২৯]

টিকাঃ
৫৯. ইতমামুল ওয়াফা, পৃ. ৭০।
৬০. হারকাতুল ফাতহিল ইসলামি, পৃ. ৮০।
৬১. প্রাগুক্ত।
৬২. সিরার : মদীনা থেকে তি মাইল দূরত্বে অবস্থিত একটি এলাকা; মুজামুল বুলদান, ৩/৩৯৮।
৬৩. তারতিব ওয়া তাহযিব আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পৃ. ৯৬।
৬৪. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩০৬।
৬৫. সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১৩।
৬৬. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৬২।
৬৭. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩০৬, ৩০৭।
৬৮. আত-তারিখ আল-ইসলামী, ১০/৩৬৪।
৬৯. প্রাগুক্ত, ১০/৩৬৫।
৭০. আওয়াস : ইরাকের পথে একটি এলাকা। বর্তমানে সেখানে মদীনা বিমানবন্দর অবস্থিত।
৭১. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩০৮; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইফা, বাংলাদেশ, ৭/৭১ দ্রষ্টব্য।
৭২. জারুদ : ইরাক থেকে হাজীদের আসার পথে সালাবিয়া ও খুজাইমিয়ার মধ্যবর্তী একটি মরুভূমি অঞ্চল।
৭৩. আল-কাদিসিয়া, আহমাদ আদিল কামিল, পৃ. ২৯।
৭৪. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩১০।
৭৫. আল-কাদিসিয়া, আহমাদ আদিল কামিল, পৃ. ৩০।
৭৬. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩১৩।
৭৭. আত-তারিখুল ইসলামী, ১০/৩৭০, ৩৭১।
৭৮. সূরা বনী ইসরাইল, ১৭: ৫।
৭৯. আল-ফারুক উমর ইবনুল খাত্তাব রা., মুহাম্মাদ রাশীদ রেযা, পৃ. ১১৯-১২০।
৮০. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৭৪।
৮১. আদ-দাওরুস সিয়াসি লিস সাফওয়াতি ফি সাদrিল ইসলাম, পৃ. ৪২৯।
৮২. আত-তারিখুল ইসলামি, ৪/৩০৬।
৮৩. প্রাগুক্ত।
৮৪. সুনান, তিরমিযি, হাদীস নং ৩৭৪২।
৮৫. জাহেলিয়্যাতের যুগে পারস্য রাষ্ট্রে প্রধান প্রবেশপথ ছিল কাদেসিয়া। আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৭৯।
৮৬. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৭৯।
৮৭. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩১৫।
৮৮. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৭৯।
৮৯. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৩৮।
৯০. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৩৮ (ইফা, ৭/৭৪ দ্রষ্টব্য)।
৯১. আল-ফান আল-আসকারি আল-ইসলামি, পৃ. ২৫৩।
৯২. ইতমামুল ওয়াফা ফি সিরাতিল খুলাফা, পৃ. ৭৩।
৯৩. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৩৮১।
৯৪. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৩৮ (ইফা, ৭/৭৫ দ্রষ্টব্য)।
৯৫. দেখুন : আদ-দাওয়াতুল ইসলামিয়া ফি আহদি উমর ইবনুল খাত্তাব রা., হাসানি মুহাম্মাদ ইবরাহিম।
৯৬. দেখুন: আল-কামিল আত-তারিখ, ২/১০১।
৯৭. দেখুন: আল-কাদিসিয়্যাহ, আহমাদ আদিল কামিল, পৃ. ৭০।
৯৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৪৩।
৯৯. দেখুন: আল-কামিল ফিত-তারিখ, ২/১০৮।
১০০. প্রাগুক্ত।
১০১. প্রাগুক্ত।
১০২. প্রাগুক্ত।
১০৩. প্রাগুক্ত।
১০৪. প্রাগুক্ত।
১০৫. আল-ফানুল আসকারিল ইসলামি, পৃ. ২৫৫।
১০৬. প্রাগুক্ত।
১০৭. সূরা আম্বিয়া, ২১: ১০৫।
১০৮. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৫৬।
১০৯. প্রাগুক্ত।
১১০. সূরা আম্বিয়া, ২১: ১০৫।
১১১. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৫৭।
১১২. প্রাগুক্ত।
১১৩. আত-তারিখ আল-ইসলামী, ১০/৩৪৭।
১১৪. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৫৮।
১১৫. প্রাগুক্ত।
১১৬. প্রাগুক্ত।
১১৭. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৫৯।
১১৮. সূরা আল-ইমরান, ৩: ১৩৩।
১১৯. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৫৯।
১২০. প্রাগুক্ত, ৪/৩৬১।
১২১. প্রাগুক্ত, ৪/৩৬২।
১২২. প্রাগুক্ত।
১২৩. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৪৫।
১২৪. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৬৩।
১২৫. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৬৫।
১২৬. প্রাগুক্ত, ৪/৩৬৪।
১২৭. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৪৯।
১২৮. আল-কাদিসিয়া, আহমাদ আদিল কামাল, পৃ. ১৩৯; তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৬৪।
১২৯. সূরা আল-ইমরান, ৩: ২০০। আল-ইসতিআব, নং ২৮৭; নিসা আল-কাদেসিয়া, পৃ. ১৪৬-১৪৭।
১৩০. আল-ইসতিআব, নং ২৮৭; নিসা আল-কাদেসিয়া, পৃ. ১৪৬-১৪৭।
১৩১. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৬৭; আত-তারিখুল ইসলামি, ১৯/৩৬৭।
১৩২. একজন পার্সিয়ান বীর ও সেনাপতি যে কিনা মুসলমানদের সেতু যুদ্ধে পরাজিত করেছিল।
১৩৩. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৫৫।
১৩৪. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৬৮।
১৩৫. প্রাগুক্ত, ৪/৩৭০।
১৩৬. প্রাগুক্ত, ৪/৩৭০।
১৩৭. আল-কাদিসিয়া, আহমাদ আদিল শাকির, পৃ. ১৫৪।
১৩৮. আল-খানসা উন্মুষ শুহাদা, আব্দুল মুনইম আল-হাশিমি, পৃ. ৯৮।
১৩৯. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৬।
১৪০. প্রাগুক্ত, ১০/৪৬২।
১৪১. প্রাগুক্ত, ৪/৩৭৪।
১৪২. প্রাগুক্ত, ৪/৩৭৪।
১৪৩. প্রাগুক্ত, ৪/৩৭৪।
১৪৪. প্রাগুক্ত, ৪/৩৭৪।
১৪৫. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৭৫।
১৪৬. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৬৬।
১৪৭. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৬৮।
১৪৮. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৭৬।
১৪৯. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৭৮।
১৫০. প্রাগুক্ত, ৪/৩৮২।
১৫১. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৭৮।
১৫২. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৭২।
১৫৩. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৮৪।
১৫৪. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৮৬।
১৫৫. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৭৪।
১৫৬. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৮৭।
১৫৭. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৭৬।
১৫৮. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৮৮।
১৫৯. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৮৮।
১৬০. প্রাগুক্ত।
১৬১. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৭৯।
১৬২. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৮৯।
১৬৩. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪০৮; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ইফা, ৭/৯০।
১৬৪. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৮১।
১৬৫. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪০৮।
১৬৬. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৮৮।
১৬৭. আল-কাদিসিয়া, পৃ. ২৬৬; আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৮৮।
১৬৮. আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ. ৪৭৩-৪৭৪।
১৬৯. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ইফা, ৭/৯১; তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪০৯।
১৭০. সূরা আল-কাহফ, ১৮: ৪৯।
১৭১. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪১০।
১৭২. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৮৫।
১৭৩. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪১০।
১৭৪. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৮৭।
১৭৫. আস-সাওয়াদ (কালো ভূমি—আরব মরুভূমির বিপরীত অর্থবোধক): তাইগ্রিস নদীর পশ্চিমে ইরাকের সমতল উর্বর ভূমি।
১৭৬. আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব আল-খলীফা আল-মুজতাহিদ, আল-ইমরানি, পৃ. ১৬৩।
১৭৭. প্রাগুক্ত।
১৭৮. খিলাফত আস-সিদ্দীক ওয়াল ফারুক, আস-সাআলাবি, পৃ. ২৫৩।
১৭৯. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৯১।
১৮০. প্রাগুক্ত।
১৮১. আল-কাদিসিয়া, পৃ. ২০৪।
১৮২. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৩৯০।
১৮৩. আত-তারিখুল ইসলামি, ১০/৪৮০।
১৮৪. আল-ফানুল আসকারিল ইসলামি, পৃ. ২৭১-২৭২।
১৮৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭৩।
১৮৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭৪-২৭৫।
১৮৭. ইতমামুল ওয়াফা, পৃ. ৮২।
১৮৮. আত-তারিখুল ইসলামি, ১১/১৫৫।
১৮৯. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪৫৪।
১৯০. সূরা আনফাল, ৮:৬০।
১৯১. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪৫৫।
১৯২. সূরা ইবরাহিম, ১৪ : ৪৪।
১৯৩. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪৫১; আত-তারিখুল ইসলামি, ১১/১৬০।
১৯৪. আত-তারিখুল ইসলামি, ১১/১৬০।
১৯৫. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪৫১।
১৯৬. আত-তারিখুল ইসলামি, ১১/১৬৫।
১৯৭. আত-তারিখুল ইসলামি, ১১/১৬৭।
১৯৮. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪৫৬-৪৫৭।
১৯৯. আত-তারিখুল ইসলামি, ১১/১৬৯।
২০০. আত-তারিখুল ইসলামি, ১১/১৬৯।
২০১. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪৫৯।
২০২. প্রাগুক্ত।
২০৩. আত-তারিখুল ইসলামি, ১১/১৭১।
২০৪. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪৫৯।
২০৫. সূরা আদ-দুখান, ৪৪ : ২৫-২৮।
২০৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৬৭।
২০৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৬৭।
২০৮. ইতমামুল ওয়াফা, পৃ. ৮৫।
২০৯. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪৬৮।
২১০. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪৬৮।
২১১. প্রাগুক্ত।
২১২. আত-তারিখুল ইসলামি, ১১/১৮১; তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪৬৮।
২১৩. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪৬৮।
২১৪. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪৭২; আল-বিদিয়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৬৮।
২১৫. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪৭৫।
২১৬. তারিখ আত-তাবারি, ৪/৪৭৫।
২১৭. প্রাগুক্ত, ৪/৪৮০।
২১৮. সূরা আল-ফাতহ, ৪৮ : ২৯।
২১৯. তারিখ আত-তাবারি, ৫/৬১-৬২।
২২০. আত-তারিখুল ইসলামি, ১১/২০২।
২২১. প্রাগুক্ত, ১১/২০৪।
২২২. তারিখ আত-তাবারী, ৫/৬৩-৬৪১।
২২৩. আল-আনসার ফি আল-আসর আর-রাশিদা, পৃ. ২২০।
২২৪. সুনান, আত-তিরমিযী, ৫/৬৫, হাদীস নং ৩৮৫৪।
২২৫. আত-তারিখুল ইসলামি, ১১/২০৪।
২২৬. তারিখ আত-তাবারি, ৫/৬৬।
২২৭. তারিখ আত-তাবারি, ৫/৭২।
২২৮. আত-তারিখুল ইসলামি, ১১/২১৭।
২২৯. তারিখ আত-তাবারি, ৫/১০৯।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 নাহাওয়ান্দ যুদ্ধ (চতুর্থ পর্যায়), ২১ হি. ২৫৭

📄 নাহাওয়ান্দ যুদ্ধ (চতুর্থ পর্যায়), ২১ হি. ২৫৭


পারসিক বাহিনীর ওপর মুসলমানগণ একের পর এক অসংখ্য যুদ্ধে জয়লাভ করেছে। তারা পালিয়ে যাওয়া শত্রুদের পেছনে এমনভাবে ধাওয়া করেছে যাতে শত্রুরা কোথাও গিয়ে স্থির হতে পারেনি। কাদেসিয়া যুদ্ধে মুসলমানদের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর নাহাওয়ান্দ অভিযান প্রায় চার বছর পরে সংঘটিত হয়। মুসলিম বাহিনী হয়তো পারসিক সম্রাটের সর্বশেষ সৈন্যকেও পাকড়াও করতে সক্ষম হতো, যদি-না উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের অভিযান জাগহারুস (জাগরুস) পর্বত পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখতে না বলতেন। মুসলিম বাহিনীকে পুনর্গঠন এবং বিজিত এলাকায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার জনই এ রকম আদেশ জারি করা হয়েছিল। [cite: ২৩০]

কাদেসিয়ার পর একের পর এক যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে পরাজয়ের গ্লানি পারসিকদের উত্তেজিত ও ক্ষুব্ধ করে তোলে। মনে হচ্ছিল, তারা এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তাদের নেতৃবৃন্দ এবং সেনাপতিরা পারস্য সম্রাট ইয়াযদগিরদের নিকট পত্র প্রেরণ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ করার আহ্বান জানায়। সম্রাট তাতে রাজি হন। সৈন্য-সামন্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি—যা কিছু অবশিষ্ট আছে, তিনি তাই নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পুনরায় লড়াই করতে মনস্থ করেন। তিনি আল-বাব থেকে সাফিস্তান এবং খোরাসান পর্যন্ত পাহাড়ি এলাকার অধিবাসীদের চিঠি দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে নির্দেশ দেন। সবাইকে নাহাওয়ান্দ শহরে এসে মিলিত হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি এ স্থানটিকেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য নির্দিষ্ট করেন। এটি ছিল সুরক্ষিত। এর চারিদিকে পাহাড় এবং কঠিন গিরিপথ অতিক্রম না করে এতে প্রবেশ করার উপায় ছিল না। পারসিকরা এখানে এসে সমবেত হয়। ইয়াযদগিরদ এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার সৈন্য জমা করতে সমর্থ হন; এর মধ্যে তিরিশ হাজার ছিল আল-বাব ও হুলওয়ান এলাকার মধ্যবর্তী অঞ্চলের, ষাট হাজার ছিল খোরাসান ও হুলওয়ানের মধ্যবর্তী অঞ্চলের এবং একই সংখ্যক সৈন্য সাফিস্তান ও হুলওয়ান এলাকার। ইয়াযদগিরত এ বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে ফাইরাযানকে মনোনীত করেন।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট পারসিকদের এই নতুন তৎপরতা সম্পর্কে বিস্তারিত লিখে জানানো হয়। তাকে ওই অঞ্চলের পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কেও অবহিত করা হয়। মুসলমানগণ তার নির্দেশের অপেক্ষায় থাকেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ বিষয়ে মদীনার বড় বড় সাহাবী ও বিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে পরামর্শ করেন। তারপর তিনি পারসিকদের সর্বশেষ ঘাঁটি নাহাওয়ান্দে আক্রমণ করার জন্য মুসলিম বাহিনী প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ওই সময় নুমান ইবনে মুকাররিন কাসকারের গভর্নর ছিলেন। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এক চিঠিতে লেখেন : আমার এবং কাসকারের মধ্যে সম্পর্ক একজন যুবকের পাশে সুন্দরী ও আকর্ষণীয় বেশ্যার মতোই। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে এ পদ থেকে অব্যাহতি দিন এবং আমাকে কোনো মুসলিম সেনাবাহিনীতে অংশগ্রহণের সুযোগ দিন। [cite: ২৩১] তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শূরা কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে নুমান ইবনে মুকাররিনকেই নাহাওয়ান্দে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে নিয়োগ দেন। নাহাওয়ান্দে সমর-পরিকল্পনা প্রণয়নে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন :

১। নুমান ইবনে মুকাররিন (কাসকারের গভর্নর) মুসলিম সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক।
২। হুযাইফা ইবনে আল-ইয়ামিন কুফার বিয়োজিত বাহিনীর সেনাপতি।
৩। আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু (বসরার গভর্নর) বসরার বিয়োজিত বাহিনীর সেনাপতি।
৪। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু মুহাজির ও আনসারদের নিয়ে গঠিত বাহিনীর সেনাপতি।
৫। সালমা ইবনে আল-কায়্যিন, হারমালা ইবনে মুরাইতা, জার ইবনে কুলাইব, আসওয়াদ ইবনে রাবিআ এং আল-আহওয়ায ও পারস্যের অন্যান্য মুসলিম সেনাপতি নিজ নিজ এলাকায় সৈন্য সমাবেশ করবে, যাতে শত্রুদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়।

উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নর ও সেনাপতিদের উদ্দেশে যুদ্ধের বিস্তারিত নির্দেশ লিখে পাঠান এবং তিনি প্রায় তিরিশ হাজার সৈন্যের এক সামরিক বাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হন। [cite: ২৩২] নুমান ইবনে মুকাররিন মুসলিম বাহিনী নিয়ে নাহাওয়ান্দের দিকে রওনা হন। তারা সেখানে পৌঁছে দেখেন, জায়গাটি সত্যিই খুব দুর্গম। চারিদিকে গভীর পরিখা রয়েছে। আর পরিখার সম্মুখভাগে ধারালো পেরেক পুঁতে রাখা হয়েছে, যা আক্রমণকারীদের জন্য অতিক্রম করা কঠিন। আর এতে ঘোড়াগুলোও আহত হয়ে যাবে এবং তারা আর অগ্রসর হতে পারবে না। দেয়াল ঘেরা শহরের অভ্যন্তরে পারসিক বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত অবস্থায় অবস্থান করছে। কাদেসিয়া যুদ্ধে যারা উপস্থিত ছিল না তারা নাহাওয়ান্দ সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয় এবং মুসলমানদের সম্ভাব্য আক্রমণ পথে ফাইযান তার তিরন্দাযদের অবস্থান নিতে বলে, যাতে মুসলমানরা অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলেই তাদের তিরের আঘাতে কাবু করা সম্ভব হয়। [cite: ২৩৩] মুসলমানদের অগ্রগামী দল অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ধারালো পেরেকে তারা বাধাপ্রাপ্ত হয়। ইতিমধ্যে পারসিকরা তির নিক্ষেপ করতে থাকে। তারা কোনোমতে শহরের দেয়ালের আড়ালে আশ্রয় নেয়।

এভাবে দু-দিন অতিবাহিত হয়ে গেল। নুমান বাহিনীর সকল সেনাপতিকে নিয়ে পরামর্শ-সভা ডাকলেন। পরিস্থিতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সবাই তাদের অভিমত ব্যক্ত করলেন। তুলাইহা ইবনে খুওয়ালিদ আল-আসদি এক চমৎকার পরিকল্পনার প্রস্তাব করলেন, যাতে সবাই সম্মত হলেন। পরিকল্পনাটি হলো : মুসলমানদের অগ্রগামী দল অগ্রসর হয়ে পারসিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করবে এবং শত্রুদের পাল্টা আক্রমণে উৎসাহিত করবে, যাতে তারা তাদের দেয়ালের বাইরে বের হয়ে আসে। যখন পারসিকরা বাইরে বের হয়ে আসবে, তখন মুসলমানদের অগ্রগামী দলটি পেছনে সরে আসবে যেন শত্রুরা মনে করতে থাকে দুর্বলতার কারণেই তারা পশ্চাতে পলায়ন করছে। এতে তারা বিজয়ের আশা করে মুসলমানদের ধাওয়া করবে। এই সুযোগে মুসলমানদের অপর দল গোপন জায়গা থেকে বের হয়ে পারসিকদের ওপর অকস্মাৎ আক্রমণ করবে। আর এটি ঘটবে তাদের দুর্গ থেকে অনেক দূরে। [cite: ২৩৪]

নুমান এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নিমিত্তে তার বাহিনীকে ছোট ছোট দলে এভাবে বিভক্ত করেন :

১। প্রথমে অগ্রগামী দল এবং এ দলের নেতৃত্ব থাকবে কাকা ইবনে আমরের হাতে; তাদের মূল লক্ষ্য শত্রুকে ধোঁকা দেওয়া, যা ওপরে বর্ণনা করা হয়েছে—তারা প্রথমে শত্রু-শহরের দেয়ালের ওপর আক্রমণ করবে যাতে যুদ্ধ শুরু করা যায়।
২। দ্বিতীয় দল থাকবে স্বয়ং সর্বাধিনায়কের হাতে। তারা গোপন জায়গায় লুকিয়ে থাকবে এবং পরসিক সৈন্যদের জন্য অপেক্ষা করবে। হাতের নাগালে এলেই শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং মুখোমুখি লড়াই করবে।
৩। তৃতীয় দলটি অগ্রগামী দলেরই আরেকটি অংশ, যা বাহিনীর সেরা ও চৌকশ সেনাদের সমন্বয়ে গঠিত। তারাও গোপন জায়গায় লুকিয়ে থাকবে এবং শত্রুরা হাতে নাগালে এলেই দু-দিক থেকে আক্রমণ করবে।

নুমান মুসলমানদের তাদের নির্দিষ্ট গোপন জায়গায় লুকিয়ে থাকার নির্দেশ দেন এবং তার অনুমতি ছাড়া আক্রমণ করতে নিষেধ করেন। [cite: ২৩৫] মুসলিম সেনারা তার আদেশ মেনে চলে এবং আক্রমণের জন্য তার নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রগামী দল নিয়ে কাকা ইবনে আমর শত্রুদের ধোঁকা দিতে শুরু করেন এবং অবিশ্বাস্যভাবে তিনি তাতে সফল হন। শত্রুরা মুসলমানদের পশ্চাদপসরণে ধাওয়া করতে এলে মুসলিম বাহিনী চারিদিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলে। এ দৃশ্য দেখে শত্রুরা বিস্মিত হয়ে যায়। তারা তাদের দুর্গের দিকে পালাতে থাকে। কিন্তু তারা তাদের খনন করা পরিখায় আর ধারালো পেরেকে পড়তে থাকে। মুসলিম বাহিনী তাদের ধাওয়া করে এবং পেছন থেকে শত্রুদের তরবারির আঘাতে হত্যা করতে থাকে। এর মধ্যে হাজার হাজার মুশরিক পরিখায় পড়ে আত্মাহুতি দেয়। কাকা পারসিক সেনাপতি ফাইরাযানকে ধাওয়া করে ধরে ফেলে এবং তাকে হত্যা করে। এই যুদ্ধের পর মুসলিম বাহিনী প্রথমে নাহাওয়ান্দ এবং পরে হামাযানে প্রবেশ করে। তারপর তারা পুরো পারসিক এলাকার বাকি অংশে অভিযান পরিচালনা করে। বলার অপেক্ষা রাখে না, তারা এতে তেমন কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি। নাহাওয়ান্দের পর পারসিকরা আর কখনো ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি এবং মুসলমানগণ তাদের পুরো সাম্রাজ্য দখল করে নেন। এ জন্য নাহাওয়ান্দ যুদ্ধকে ‘বিজয়ের বিজয়’ বলা হয়। [cite: ২৩৬]

এই যুদ্ধে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিভিন্ন ক্ষেত্রে দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়; মুসলমানদের সৈন্য সমাবেশ করা এবং শত্রুদের সৈন্য সমাবেশে বাধা প্রদান; উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কুফা, বসরা ও আরবে গভর্নরদের পারসিক বাহিনীর মোকাবিলায় সৈন্য সমাবেশ করার আদেশ প্রত্যাহার করেননি, অধিকন্তু তিনি আল-আহওয়ায এবং মুসলমানদের নিয়ন্ত্রিত অন্যান্য পারসিক এলাকায় সেনাপতিদের শত্রুদের সেনা সমাবেশ করতে বাধা প্রদান করতে বলেন। তিনি সালমা ইনে কায়্যিন, হারমালা ইবনে মুরাইতা, জার ইবনে কুলাইব, আল-আসওয়াদ ইবনে রাবিআ এবং অন্যান্যদের পারসিক এবং আল-আহওয়াযের সীমান্ত এলাকায় নাহাওয়ান্দে শত্রু সেনাদের আগমনে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বলেন। সুতরাং এভাবে সেনাপতিরা সীমান্ত এলাকায় পাহারা-চৌকি স্থাপন করে নাহাওয়ান্দে শত্রুদের সংখ্যাবৃদ্ধি প্রতিরোধ করেন। [cite: ২৩৭]

৩.১। যুদ্ধে সেনাপতি মৃত্যুবরণ করলে তার স্থলাভিষিক্ত নিয়োগ
মুতার লড়াইতে (৮ হি. / ৬২৯ খ্রি.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়েদ ইবনে হারিসা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সেনাপতি নিয়োগ করেন। তারপর তিনি বলেন, যদি যায়েদ শহীদ হয়ে যায়, তাহলে সেনাপতি হবে জাফর ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু। আর যদি জাফর রাযিয়াল্লাহু আনহু শহীদ হয়ে যায়, তাহলে সেনাপতি হবে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রাযিয়াল্লাহু আনহু। নাহাওয়ান্দ যুদ্ধে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একই কাজ করেন। তিনি এ যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসাবে নুমান ইবনে মুকাররিনকে নিযুক্ত করেন। যদি নুমান শহীদ হয়ে যায়, তাহলে তার স্থলাভিষিক্ত হিসাবে হুযাইফা ইবনে আল-ইয়ামানকে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে বলেন। আর যদি হুযাইফা শহীদ হয়ে যান, তাহলে সর্বাধিনায়ক হবেন নুআইম ইবনে মুকাররিন।

সামরিক বাহিনী পরিচালনায় নুমান ইবনে মুকাররিন অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন ছিলেন। নিচে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো :

৩.১.১। যুদ্ধ শুরু করার আগেই লড়াই করার জন্য অগ্রগামী দল প্রেরণ
নাহাওয়ান্দে সৈন্যবাহিনী নিয়ে রওনা হওয়ার আগেই (যা বিশের অধিক প্যারাসাং দূরে) তুলাইহা ইবনে খুওয়ালিদ আল-আসদি, আমর ইবনে আবি সালমা আল-আনযি এবং আমর ইবনে মাদি ইয়াকরিবকে অগ্রবাহিনী হিসাবে প্রেরণ করেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল, পথের নিরাপত্তা ও সম্মুখভাগে কোনো শত্রু-ছাউনি থাকলে তা খুঁজে বের করা। এই তিন জন এক দিন ও এক রাত সফর করেন। তারপর নিজ বাহিনীতে ফিরে আসেন এবং সর্বাধিনায়ককে অবহিত করেন যে নাহাওয়ান্দ পর্যন্ত শত্রুদের কোনো পাহারা বা ঘাঁটি নেই। আধুনিক সমরবিদ্যায় এটি রিকনেইসেন্স (প্রাথমিক নিরীক্ষণ) নামে পরিচিত, যেখানে সামরিক বহরের গতিপথে অগ্রগামী দল প্রেরণ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। অধিকন্তু তিনি সামরিক বাহিনীকে যেকোনো সময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেই নাহাওয়ান্দের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।

৩.১.২। শত্রুদের ধোঁকা দেওয়ার কৌশল
নাহাওয়ান্দের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী শত্রুদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য এমন এক চমৎকার রণকৌশল ব্যবহার করেন, যা ইতিপূর্বে পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো দেশ বা জাতি ব্যবহার করেনি—প্রাচীন কিংবা আধুনিককালেও না। মুসলিম বাহিনী দেখল, পারসিকদের দুর্গের প্রাচীর ভেদ করা সম্ভব হচ্ছে না—এটি পরিখা, ধারালো পেরেক ও অব্যর্থ তিরন্দাজ বাহিনী দ্বারা সুরক্ষিত এবং তাদের নিকট পর্যাপ্ত রসদপত্তর মজুদ থাকাতে অবরোধ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। তখন তারা এমন এক কৌশল অবলম্বন করতে চাইল, যাতে শত্রুরা তাদের সীমানা ছেড়ে বাইরে বের হয়ে আসতে বাধ্য হয় এবং নিজেদের সুবিধামতো জায়গায় তাদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া যায়। বস্তুত মুসলিম বাহিনীর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ীই সবকিছু সংঘটিত হয়। তারা পারসিকদের দুর্গ থেকে বের হয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করে এবং নিজেদের সুবিধামতো জায়গায় এনে তাদের ওপর অকস্মাৎ আক্রমণ পরিচালনা করে। এতে তারা বিস্মিত ও হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। উপায়ান্তর না দেখে পেছনে পালাতে থাকে। এভাবে কোনো শত্রুবাহিনীকে কৌশলে তাদের সুরক্ষিত স্থান থেকে বের করে হঠাৎ আক্রমণে পর্যুদস্ত করা এবং তাদের ওপর বিজয়ী হতে আর কোনো জাতিকে দেখা যায় না। [cite: ২৩৮]

৩.১.৩। আক্রমণের সময় নির্ধারণ
নুমান ইবনে মুকাররিন এবং তার বীর সেনারা সুবিধামতো স্থান ও সময়ে শত্রুর ওপর আক্রমণের ক্ষেত্রে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, যা ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। তাদের এই সময় নির্ধারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতকে অনুসরণ করা হয়—ঠিক মধ্যবেলায় যখন ছায়া দীর্ঘ হতে শুরু করে এবং বাতাসের ক্ষীণ প্রবাহ থাকে। নুমান ইবনে মুকাররিন এই যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। তার মৃত্যুর সংবাদ জেনে উমর রাযিয়াল্লাহু 'আনহু বলে ওঠেন, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাযিউন। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং খুবই দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি আরও যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের নাম জানতে চান। তাকে বলা হলে তিনি তাদের চিনতে পারেননি। তিনি বললেন, ‘যারা মুসলিম বাহিনীতে দুর্বল ও নিগৃহীত, কিন্তু যিনি তাদের শাহাদাতের মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করেছেন, তিনি তাদের চেহারা ও বংশপরিচয় খুব ভালো করেই জানেন; উমরের জানা বা অজানায় কী আসে-যায়! [cite: ২৩৯]

বলা বাহুল্য, নাহাওয়ান্দ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী যে গনীমতের লাভ করেছিল, তাতে দুটি সিন্দুক বোঝাই স্বর্ণ-রুপা ও মণি-মুক্তা ছিল। এগুলো সম্রাট কিসরার ভান্ডার থেকে পাওয়া গিয়েছিল। মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হুযাইফা সেগুলো সাইব ইবনে আকরার মাধ্যমে খলীফার নিকট প্রেরণ করেন। যখন সাইব ইবনে আকরা এগুলো উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট হাজির করলেন, তখন তিনি বললেন, 'এগুলো বাইতুল মালে রেখে দাও এবং তুমি তোমার ডিভিশনে গিয়ে যোগ দাও।' তিনি ফিরে যান। তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আরেকজনকে তার খোঁজে প্রেরণ করেন এবং তাকে কুফায় গিয়ে নাগাল পেয়ে মদীনায় ফেরত নিয়ে আসেন। [cite: ২৪০] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে দেখে বললেন, 'তুমি আমার নিকট কী নিয়ে এসেছ? যেদিন তুমি চলে গেলে, সেদিন সারা রাত আমি একই স্বপ্ন দেখলাম : ফেরেশতারা আমাকে ওইসব সিন্দুকের নিয়ে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে, যা আগুনে ভর্তি। তারা আমাকে সতর্ক করছে, আমি যদি সেগুলো বিলিয়ে না দিই, তাহলে তারা আমাকে আগুনে জ্বালাবে। সেগুলো নিয়ে যাও, বিক্রি করো এবং মুসলিম বাহিনীর প্রয়োজনে খরচ করো।' সুতরাং তিনি সেগুলো কুফার বাজারে বিক্রি করে দেন।

আল্লাহ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওপর সন্তুষ্ট হোন-তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদাঙ্কের পরিপূর্ণ অনুসরণকারী ছিলেন এবং আল্লাহ তাকে সম্মান ও মর্যাদা দান করেছিলেন। তার মাধ্যমে তিনি ইসলাম ও মুসলমানদেরও সম্মান ও মর্যাদা বাড়িয়েছেন। হে আল্লাহ, আমাদেরকে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলার তাওফিক নসীব করুন এবং সকল বাতিল ফিরকা থেকে হেফাজত করুন। [cite: ২৪১]

নাহাওয়ান্দ যুদ্ধের পরপরই হামাযান, তাবারিস্তান এবং ইসফাহানে পারসিক নেতারা দ্রুত মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে এগিয়ে আসে-একের পর এক। [cite: ২৪২]

টিকাঃ
২৩০. দেখুন: আল-ফানুল আসকারিল ইসলামি, পৃ. ২৫৫।
২৩১. তারিখ আত-তাবারি, ৫/১০৯।
২৩২. দেখুন: আল-ফানুল আসকারিল ইসলামি।
২৩৩. প্রাগুক্ত।
২৩৪. দেখুন: তারিখ আত-তাবারি, ৫/১১৩।
২৩৫. তারিখ আত-তাবারি, ৫/১১৪।
২৩৬. দেখুন : আল-ফানুল আসকারিল ইসলামি।
২৩৭. প্রাগুক্ত।
২৩৮. দেখুন : আল-ফানুল আসকারিল ইসলামি, পৃ. ২৯৫-২৯৬।
২৩৯. দেখুন: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১১৩।
২৪০. প্রাগুক্ত, ৭/১১৪।
২৪১. দেখুন: ইতমামুল ওয়াফা।
২৪২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৯-১০১।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 পারস্যের অভ্যন্তরে অভিযান (পঞ্চম পর্যায়)

📄 পারস্যের অভ্যন্তরে অভিযান (পঞ্চম পর্যায়)


নাহাওয়ান্দ যুদ্ধে পরাজয়ের পর পারসিকরা মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে আর কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলমানদের পারসিক রাজ্যের অভ্যন্তরে অভিযান পরিচালনা করার অনুমতি প্রদান করেন। নাহাওয়ান্দের পরে মুসলিম বাহিনী ইসফাহান শহরে পৌঁছেন। সেখানে এক দীর্ঘ লড়াই শেষে পারসিকরা মুসলমানদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য হয়। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ তাদের শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে চুক্তি লিখে দেন। তবে তিরিশ জন ব্যক্তি ইসফাহান এলাকা থেকে পালিয়ে কারমান এলাকায় গমন করে এবং তারা মুসলমানদের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে রাজি হয়নি। ২১ হিজরীতে আবু মূসা কোম এবং কাসহান এলাকা জয় করেন। আর সুহাইল ইবনে আদিয়্যি কারমান শহর জয় করেন।

৪.১। দ্বিতীয়বারের মতো হামাযান শহর জয় (২২ হি.)
নাহাওয়ান্দের পরে মুসলিম বাহিনী হুলওয়ান এবং হামাযান জয় করেন। তবে হামাযানবাসীরা কাকা ইবনে আমরের সঙ্গে কৃত শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নাইম ইবনে মুকাররিনকে হামাযানের উদ্দেশে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি সেখানে পৌঁছে সানিয়াত আল-আসল এলাকায় তাঁবু গাড়েন। তারপর তিনি হামাযানের দিকে অগ্রসর হয়ে এর আশেপাশের এলাকা দখল করেন এবং হামাযান অবরোধ করেন। তারা তার সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে সম্মত হয়। তিনি শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে বারো হাজার মুসলিম বাহিনী নিয়ে হামাযান শহরে প্রবেশ করেন। হামাযানে অবস্থানকালেই দাইলাম এবং আজারবাইযানের নেতাদের চিঠি আদান-প্রদান হয় যারা তার বিরুদ্ধে বিশাল বাহিনী সমবেত করে। তিনি তার বাহিনী নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং ওয়ায আর-রুয়ায এলাকায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। তারা নাহাওয়ান্দের মতোই এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেন। দাইলামের শাসকসহ অসংখ্য মুশরিক এ যুদ্ধে নিহত হয়। আর যারা নিহত হয়নি, তারা রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়।

দাইলামের সঙ্গে নাইম ইবনে মুকাররিনই প্রথম যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। নাইম চিঠিতে খলীফাকে তার প্রতিপক্ষ সম্পর্কে জানালে তিনি খুব চিন্তিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু শীঘ্রই তার নিকট খুশির সংবাদ গিয়ে পৌঁছে। তিনি বার্তাবাহককে জিজ্ঞাসা করেন, 'তুমি কি বাশির (শুভসংবাদ বহনকারী)? বার্তাবাহক বুঝতে না পেরে জবাব দেয়, 'না। আমি উরওয়া।' খলীফা তাকে আবার একই প্রশ্ন করেন। এবার বার্তাবাহক বুঝতে পেরে জবাব দেয়, 'হ্যাঁ। আমি শুভ সংবাদ নিয়ে এসেছি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কি নাইম ইবনে মুকাররিন না সাম্মাক ইবনে উবাইদের পক্ষ থেকে এসেছ?' সে বলে, 'নাইম ইবনে মুকাররিন।' তিনি বলেন, 'কী খবর?' সে বলল, 'বিজয়ের সংবাদ গ্রহণ করুন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন এবং জনগণের সম্মুখে চিঠিটি পড়ে শোনাতে বললেন এবং লোকেরাও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল।

সাম্মাক ইবনে মাখরামা, সাম্মাক ইবনে উবাইদ এবং সাম্মাক ইবনে খারাসা কুফা থেকে প্রতিনিধিদল নিয়ে মদীনায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট খুমস (যুদ্ধলব্ধ গনীমতের এক-পঞ্চমাংশ) নিয়ে আসেন। তিনি তাদের বংশপরিচয় জিজ্ঞাসা করেন এবং তারা তা বলেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহ আপনাদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। হে আল্লাহ, আপনি তাদের দ্বারা ইসলামকে সাহায্য করুন এবং ইসলাম দ্বারা তাদের সাহায্য করুন।

৪.২। আর-রয়্যি বিজয় (২২ হি.)
নাইম ইবনে মুকাররিন হামাযানে ইয়াজিদ ইবনে কাইসকে স্থলাভিষিক্ত করে মুসলিম বাহিনী নিয়ে আর-রয়ি‍্যর উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে তারা বিশালসংখ্যক মুশরিক বাহিনীর মোকাবিলা করেন। রয়ি‍্য পাহাড়ের পাদদেশে এ লড়াই সংঘটিত হয়। ইসলামের শত্রুরা ভীষণভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তবে শেষ পর্যন্ত তারা পরাজিত হয়। নাইম ইবনে মুকাররিন নিজেই অনেক মুশরিককে হত্যা করেন। তারা এ যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ গনীমত লাভ করেন। এর পরিমাণ মাদাইন বিজয়ে প্রাপ্ত গনীমতের মতোই ছিল। তারপর নাইম ইবনে মুকাররিন এ বিজয়য়ের সংবাদ খলীফাকে অবহিত করেন এবং তার নিকট খুমস প্রেরণ করেন। আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা।

৪.৩। কুমীস ও যুরযান বিজয় (২২ হি.)
রয়্যি শহরের বিজয়-সংবাদ ও খুমস লাভ করে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নাইম ইবনে মুকাররিনকে পরবর্তী নির্দেশনাসহ চিঠি প্রেরণ করেন। তিনি তার ভাই সুওয়াইদ ইবনে মুকাররিনকে কুমীসের দিকে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সুতরাং সুওয়াইদ সেখানে যান এবং তিনি তেমন কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীন হননি। তিনি শান্তিপূর্ণভাবেই কুমীস শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হন। তিনি সেখানে অবস্থান করেন এবং লোকজনকে শান্তিচুক্তির আওতায় নিয়ে আসেন; তাদের জন্য নিরাপত্তার অঙ্গীকার করেন। এখানে অবস্থানকালেই তার নিকট বিভিন্ন শহরের লোকজন জিযিয়া কর প্রদানের মাধ্যমে শান্তিচুক্তির প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি যুরযান, তাবারিস্তানসহ সকলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেন এবং সবার জন্য পৃথক চুক্তিপত্র লিখে দেন।

৪.৪। আজারবাইযান বিজয় (২২ হি.)
হামাযান এবং রয়ি‍্য বিজয়ের পর নাইম ইবনে মুকাররিন অগ্রবর্তী দল হিসাবে বুকাইর ইবনে আব্দুল্লাহকে হামাযান থেকে আজারবাইযানে প্রেরণ করেন এবং তার পশ্চাতে সাম্মাক ইবনে খারাসাকে প্রেরণ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশ অনুযায়ীই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে এই সাম্মাক মানে তিনি প্রসিদ্ধ সাহাবী আবু দুযানা নন। সাম্মাক যোগ দেওয়ার আগেই বুকাইর তার বাহিনী নিয়ে আসফানদিয়া ইবনে ফাররুকজাযকে প্রতিরোধ করেন। মুশরিকরা পরাজয় বরণ করে এবং আল্লাহ মুসলমানদের বিজয় দান করেন। মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি বুকাইর আসফানদিয়াকে বন্দী করেন। তিনি তাকে বলেন, 'তোমার কাছে যুদ্ধ নাকি শান্তিচুক্তি বেশি প্রিয়?' আসফানদিয়া বলল, 'শান্তি।' তারপর সে তাকে তার সঙ্গে রাখার অনুরোধ করে। বুকাইর তাকে সঙ্গে রাখেন। সেখান থেকে তিনি আজারবাইযানে একের পর এক শহর দখল করতে থাকেন। উতবা ইবনে ফারকাদ আজারবাইযানের আরেক প্রান্তে একই ভাবে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশ আসে। তিনি বুকাইরকে আল-বাবের দিকে অগ্রসর হতে বলেন। বুরকাইর সাম্মাককে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে উতবা ইবনে ফারকাদের সহকারী হিসাবে মনোনয়ন দেন। আজারবাইযানের সকল বিজিত অঞ্চল উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতি উতবা ইবনে ফারকাদের হাতে অর্পণ করেন। বুকাইর আসফানদিয়াকে তার হাতে সোপর্দ করেন। বাহরাম ইবনে ফাররুকজায এগিয়ে এসে উতবা ইবনে ফারকাদের গতিরোধ করেন। তাদের মধ্যে যুদ্ধ হয়। উতবা বাহরামকে পরাজিত করেন এবং বাহরাম পালিয়ে যায়। আসফানদিয়া এ খবর শুনে বলল, 'এখন আর কোনো যুদ্ধ নয়, এখন শান্তির সময়।' সুতরাং শান্তিচুক্তিতে সবাই সম্মত হলো এবং আজারবাইযানের অধিবাসীদের মধ্যে শান্তি ফিরে এল। উতবা এবং বুকাইর খুমসসহ এ সংবাদ খলীফার নিকট প্রেরণ করেন। আজারবাইযানের গভর্নর হয়ে উতবা এ অঞ্চলের লোকদের জন্য শান্তিচুক্তি লিখে দিলেন।

৪.৫। আল-বাব বিজয় (২২ হি.)
আল-বাব অভিযানে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পত্র মারফত সুরাকা ইবনে আমর (যু আন-নুর নামে পরিচিত)-কে সেনাপতি নির্বাচন করেন এবং খলীফার নির্দেশ অনুযায়ী সুরাকা তার বাহিনী নিয়ে রওনা হন। মুসলিম বাহিনীর অগ্রগামী দল ছিল আব্দুর রহমান ইবনে রাবিআর নেতৃত্বে। আরমেনিয়ার রাজা শাহরাবারাজ, বনী ইসরাইলদের হত্যাকারীদের উত্তরসূরি এবং প্রাচীনকালে সিরিয়া বিজয়ী, আল-বাবে অবস্থান করছিলেন। আব্দুর রহমান ইবনে রাবিআ তার নিকট পৌঁছে যান। তখন শাহরাবারাজ নিরাপত্তা চেয়ে আব্দুর রহমানের নিকট পত্র প্রেরণ করেন। রাজা নিজেই এগিয়ে এসে আব্দুর রহমানের নিকট ধরা দেন। নিজেকে মুসলমানদের হিতাকাঙ্ক্ষী হিসাবে পরিচয় দেন এবং এ ব্যাপারে নিজের আগ্রহ ব্যক্ত করেন। তিনি তাকে বলেন, 'আমার ওপরে কর্তৃত্বশীল আরেকজন আছেন। আপনি তার নিকট যান।' আব্দুর রহমানের তাকে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি সুরাকা ইবনে আমরের নিকট প্রেরণ করেন। শাহরাবারাজ সুরাকার নিকট নিরাপত্তা চাইলে তিনি তার জন্য একটি চুক্তিনামা লিখে দেন, যাতে তার জন্য তখন থেকেই নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়।

সুরাকা তারপর বুকাইর ইবনে আব্দুল্লাহ আল-লাইসি, হাবীব ইবনে মাসলামাহ, হুযাইফা ইবনে উসাইদ এবং সালমান ইবনে রাবিআকে আরেমিনয়ার পর্বত ঘেরা অঞ্চলে (আল-লান, তাফিলিস এবং মুকান) প্রেরণ করেন। বুকাইর মুকান বিজয় করেন এবং তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেন। তখন ওই অঞ্চলে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি সুরাকা ইবনে আমর ইন্তেকাল করেন। তার স্থলাভিষিক্ত নির্বাচিত হন আব্দুর রহমান ইবনে রাবিআ। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ খবর পেয়ে তা মেনে নেন এবং তাকে তুর্কীদের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করার নির্দেশ দেন।

৪.৬। তুর্কীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু
আব্দুর রহমান ইবনে রাবিআ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশ অনুযায়ী তুর্কীদের বিরুদ্ধে অভিযানে বের হন এবং আল-বাব অতিক্রম করছিলেন। এ-সময় শাহরাবারায তাকে জিজ্ঞাসা করেন, 'কোথায় যাচ্ছেন?' তিনি জবাব দেন, 'আমি তুর্কীদের রাজার খোঁজে বালানযারে যাচ্ছি।' শাহরাবারায তাকে বলেন, 'আমরা যদি তাদের নিয়ে মাথা না ঘামাই এবং তারাও আমাদের থেকে বিমুখ থাকে, তাহলেই ভালো হয়।' আব্দুর রহমান বললেন, 'আল্লাহ তা'আলা আমাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং তিনি নিজে বলে গিয়েছেন যে, ইসলাম বিজয়ী হবে। সুতরাং আমরা এ লক্ষ্যে কাজ করে যাব।' সুতরাং তিনি তুর্কীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন এবং বালানযারের অভ্যন্তরে দু শ প্যারাসাং দূরত্ব অতিক্রম করেন। অনেক খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ করে এগিয়ে যেতে থাকেন। পরবর্তীকালে উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে তুর্কীদের সঙ্গে মুসলমানদের বিশাল ও কঠিন যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

৪.৭। খোরাসান অভিযান (২২ হি.)
আহনাফ ইবনে কাইস আমীরুল মুমিনীন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পারসিক রাজ্যের আরও গভীরে অভিযান পরিচালনা করার পরামর্শ দেন যাতে পারসিক সম্রাট ইয়াযদগিরদকে দমন করা যায়। কারণ, ইয়াযদগিরদ এখনো পারসিক সাধারণ জনগণ ও সৈন্যদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উস্কানি দিচ্ছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আহনাফ ইবনে কাইসের এ পরামর্শের ভিত্তিতে অভিযানের অনুমতি প্রদান করেন। তিনি মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে আহনাফ ইবনে কাইসকে নিয়োগ দেন এবং তাকে খোরাসান আক্রমণ করার নির্দেশ দেন।

বিশাল এক বাহিনী নিয়ে আহনাফ ইবনে কাইস খোরাসানের উদ্দেশে রওনা হন। তার মূল লক্ষ্য ছিল ইয়াযদগিরদকে মোকাবিলা করা। তিনি খোরাসানে প্রবেশ করে হেরাত দখল করে নেন এবং সুহার ইবনে ফুলান আল-আবদিকে সেখানকার দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। তারপর তিনি মারভ শাহযানের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। সেখানেই ইয়াযদগিরদের অবস্থান ছিল। আহনাফ ইবনে কাইস অগ্রগামী দল হিসাবে মুতাররিফ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আস-সাখিরকে নিশাপুর এবং হারিস ইবনে হাসানকে সারখাসের দিকে প্রেরণ করেন। আহনাফ মুসলিম বাহিনী নিয়ে মারভ শাহযানের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে ইয়াযদগিরদ শহর ছেড়ে মারভ রুযে পালিয়ে যায়। আহনাফ মারভ শাহযান বিজয় করেন এবং সেখানে অবস্থান করেন।

ইয়াযদগিরদ মারভ রুযে পৌঁছে তিনি তুর্কী, আস-সাগদ এবং চীনের রাজাদের নিকট পত্র প্রেরণ করে সাহায্যের আবেদন করে। আহনাফ ইবনে কাইস মারভ শাহযানে হারিসা ইবনে নুমানকে দায়িত্ব দিয়ে মারভ রুযের দিকে ইয়াযদগিরদকে ধাওয়া করেন। এ-সময় মুসলমানদের সাহায্যে চার জন সেনাপতিসহ এক বিশাল সৈন্যবহর এসে আহনাফের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। এ সংবাদ পেয়ে ইয়াযদগিরদ বালখে পালিয়ে যায়। মুসলিম বাহিনী বালখে গিয়ে তার সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং আল্লাহ শত্রুদের পরাজিত করেন। ইয়াযদগিরদ কিছু সঙ্গীসহ নদী পার হয়ে পালিয়ে যান। এভাবে পুরো খোরাসান অঞ্চল আহনাফের অধীনে চলে আসে। তিনি এর প্রত্যেক শহরের জন্য একজন গভর্নর নিযুক্ত করেন। তারপর তিনি মারভ রুযে ফিরে যান এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এ পত্র-মারফত বিজয়ের সংবাদ অবহিত করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে তাকে নদী অতিক্রম করতে নিষেধ করেন এবং বলেন, 'খোরাসানেই তোমাদের নিয়ন্ত্রণ মজবুত করো।' ইয়াযদগিরদ যখন নিকটস্থ রাষ্ট্রসমূহের রাজাদের নিকট সাহায্যের আবেদন করে, তখন তারা এতে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। কিন্তু যখন সে নদী অতিক্রম করে তাদের রাজ্যে প্রবেশ করে, তখন প্রচলিত রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। তুর্কী রাজা খাকান তার সঙ্গে বালখ পর্যন্ত আসেন এবং তারা মারভ রুযে তাঁবু গাড়েন। আর আহনাফ ইবনে কাইসও এখানেই অবস্থান করছিলেন। বসরা ও কুফার প্রায় বিশ হাজার মুসলিম সৈন্য তার সঙ্গে ছিল। তিনি রাতে তাদের অবস্থার খোঁজখবর নিতেন। তখন এক ব্যক্তিকে বলতে শোনেন : সেনাপতি যদি বুদ্ধিমান হয় তাহলে তার উচিত হবে পাহাড়কে পেছনে রেখে যুদ্ধের ময়দানে অবস্থান গ্রহণ করা। আর তার সম্মুখভাগে থাকবে নদী, যা পরিখার মতো শত্রুর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এতে শত্রুরা কেবল একদিক থেকেই রণক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারবে।' পরের দিন আহনাফ এভাবেই তার সৈন্যদের অবস্থান গ্রহণ করতে নির্দেশ দেন এবং এটি ছিল উপযুক্ত রণকৌশল ও বিজয়ের পূর্বাভাস। তুর্কী ও পারসিকদের সমন্বয়ে এমন এক বিশাল বাহিনী সমবেত হয়, যা ভীতি সঞ্চার করার জন্য যথেষ্ট। আহনাফ সেনাদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে এক ভাষণে বলেন, 'তোমরা সংখ্যায় কম এবং তোমাদের শত্রুরা অসংখ্য। কিন্তু এতে আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কিছু নেই। আল্লাহ বলেন,

كَمْ مِنْ فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً كَثِيرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ وَاللَّهُ مَعَ الصُّبِرِينَ
সামান্য দলই বিরাট দলের মোকাবিলায় জয়ী হয়েছে আল্লাহর হুকুমে। আর যারা ধৈর্যশীল আল্লাহ তাদের সঙ্গে রয়েছেন।
তুর্কীরা দিনে যুদ্ধ করত এবং রাতে তারা কোথায় চলে যেত, আহনাফ তা জানতেন না। এ জন্য একরাতে তিনি একজন সেনাকে সঙ্গে নিয়ে খাকানের খোঁজে বের হলেন। রাত প্রায় শেষ দিকে। তখন এক তার্কিশ অশ্বারোহীকে ঢোল বাজিয়ে অগ্রসর হতে দেখেন। তার গলায় ছিল নেকলেস। আহনাফ তার দিকে এগিয়ে যান এবং তাকে চ্যালেঞ্জ করেন। দুজনের মধ্যে লড়াই শুরু হলে আহনাফ তাকে হত্যা করতে সক্ষম হন। তারপর আহনাফ তার নেকলেসটি নিয়ে নেন এবং তার স্থানে অপেক্ষা করতে থাকেন। আরেকজন তার্কিশ একই ভাবে গলায় নেকলেস পরে ড্রাম পিটিয়ে এগিয়ে আসে। আহনাফ তাকে হত্যা করেন এবং তার নেকলেসটি নিয়ে নেন। তৃতীয় আরেকজন একইভাবে নিহত হয় এবং আহনাফ তার নেকলেস নিয়ে নেন। তারপর আহনাফ দ্রুত বাহিনীর নিকট ফিরে আসেন। তুর্কীরা এ ঘটনার কিছুই টের পায়নি। তুর্কীদের নিয়ম ছিল, সর্বাগ্রে তিন জন অশ্বারোহী পরপর ড্রাম পিটিয়ে বের না হওয়া পর্যন্ত তারা করে হতো না। তারপর যখন তুর্কীরা বের হয়ে এল, তখন তারা তাদের মৃত অশ্বারোহী সৈন্যদের দেখতে পেল এবং তুর্কীদের রাজা এ ঘটনাকে অশুভ সংকেত মনে করলেন। তিনি তার সৈন্যদের বললেন, 'আমরা দীর্ঘ সময় ধরে বাইরে রয়েছি এবং এই তিন জন এমন এক জায়গায় নিহত হয়েছে, যা ইতিপূর্বে ঘটেনি। এই লোকদের সঙ্গে লড়াই করে লাভ নেই; চলো, আমরা ফিরে যাই।' সুতরাং তারা তাদের দেশে ফিরে গেল।

মুসলিম সৈন্যরা আহনাফকে জিজ্ঞাসা করল, 'আমরা কি অগ্রসর হয়ে তাদের ধাওয়া করব?' তিনি বললে, 'যেখানে আছ, সেখানেই থাকো। আর তাদের ছেড়ে দাও।' আহনাফ সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন। কারণ, হাদীসে এসেছে, ‘তুর্কীদের তাদের মতো থাকতে দাও যতক্ষণ তারা তোমাদের ওপর আক্রমণ না করে’।

وَرَدَّ اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ وَكَانَ اللَّهُ قَوِيًّا عَزِيزًا
আল্লাহ কাফিরদের ক্রুদ্ধাবস্থায় বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য করলেন। কোনো কল্যাণ তারা লাভ করেনি। যুদ্ধে মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ সর্বশক্তিমান, পরাক্রমশালী।
ইয়াযদগিরদ চরম হতাশ হয়ে পড়লেন। তিনি যা চেয়েছিলেন বা যাদের নিকট থেকে সাহায্যের আশা করেছিলেন তা অর্জন করতে পারেননি। সবাই তাকে ত্যাগ করেছে এবং আশাহত করেছে যখন তার সাহায্যের প্রয়োজন ছিল খুব বেশি।

وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ سَبِيلًا
আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তুমি কখনো তার জন্য কোনো পথ পাবে না।
তিনি পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। এখন তার কী করা উচিত, কিছুই ঠিক করতে পারলেন না। তারপর তিনি চীনের রাজার নিকট সাহায্যের আবেদন করেন। চীনের রাজা বার্তাবাহকের নিকট যারা তাদের দেশ দখল করেছে, তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলেন। বার্তাবাহক রাজাকে মুসলমানদের যাবতীয় বিষয়াদি তুলে ধরে; তারা কীভাবে ঘোড়া ও উট পরিচালনা করে, তারা কী করেছে এবং কীভাবে নামায পড়ে ইত্যাদি। রাজা সবকিছু শোনার পর ইয়াযদগিরদের নিকট চিঠি প্রেরণ করেন এবং তাতে লেখেন: আমি আপনার সাহায্যে কোনো সৈন্যবাহিনী এ জন্য প্রেরণ করিনি যে, আমি আসলে জানি না আপনার প্রতি আমার দায়িত্ব কতটুকু; বরং এর কারণ হলো, যারা আপনার সঙ্গে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, তারা যদি কোনো পাহাড়ের সঙ্গেও লড়াই করে, তাহলে সেটিকেও চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে সক্ষম। আমি যদি আপনার সাহায্যে এগিয়ে আসি, তাহলে তারা আমাকেও পরাজিত করবে। সুতরাং তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করাই যুক্তিসংগত।' পারসিক সম্রাট এবং তার পরিবার অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়ে কোনো এক অজানা স্থানে গিয়ে বসতি স্থাপন করে। তিনি সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন যতদিন না উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে নিহত হন।

আহনাফ চিঠিতে বিজয়ের সংবাদ ও খুমস মদীনায় প্রেরণ করেন। তিনি চিঠিতে বিস্তারিতভাবে যুদ্ধের বর্ণনা তুলে ধরেন; কীভাবে আল্লাহ তুর্কীদের সম্পদ মুসলমানদের হাতে অর্পণ করলেন, কীভাবে মুসলিম বাহিনী তাদের অনেককে হত্যা করল, কীভাবে আল্লাহ মুশরিকদের সাহায্যে এগিয়ে আসা সৈন্যদলকে ফিরিয়ে দিলেন এবং তারা সেখান থেকে কোনো সুবিধাই অর্জন করতে পারেনি। এ চিঠি পেয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মিম্বরে উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন : আল্লাহ তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্যিকার দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন। তিনি তাঁর অনুসারীদের দুনিয়া ও আখিরাতে পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,

هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
তিনিই প্রেরণ করেছেন আপন রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীনসহকারে, যেন এ দ্বীনকে অপরাপর দ্বীনের ওপর জয়যুক্ত করেন, যদিও মুশরিকরা তা অপ্রীতিকর মনে করে।
আল্লাহর জন্য সকল প্রশংসা, যিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন এবং তাঁর সৈন্যদের বিজয় দান করেছেন। আল্লাহ পারসিক সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করেছেন, তাদের ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছেন এবং এক মুষ্টি পরিমাণ জায়গাও তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, যা মুসলমানদের ওপর সামান্যতম প্রভাব বিস্তার করতে পারে। আল্লাহ তা'আলা তাদের বাড়ি-ঘর, ধন-সম্পদ ও লোকজনকে তোমাদের হাতে অর্পণ করেছেন। তিনি দেখতে চান, তোমরা এসব নিয়ে কী করো। সুতরাং তাঁর নির্দেশ মেনে চলো এবং তিনি তোমাদের প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন। তোমাদের আচরণে যেন কোনো পরিবর্তন সাধিত না হয়; আর নতুবা আল্লাহ তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে তা অর্পণ করবেন। আমার ভয় হয়, এই উম্মতের যদি কোনো অকল্যাণ হয়, তাহলে তা তোমাদের কারণেই হবে।

৪.৮। ইসতাখার বিজয় (২৩ হি.)
মুসলিম বাহিনী ২৩ হিজরীতে দ্বিতীয়বারের মতো ইসতাখার বিজয় করে। আল-আলআ ইবনে আল-হাদরামির বাহিনী এটি প্রথম বিজয় করে। তখন তারা বাহরাইন থেকে নদী পার হয়ে ইসতাখারে পৌঁছেছিলেন। তারা তাউস নামক স্থানে পারসিকদের দেখা পান। পরে আল-হিরবাযা জিযিয়া কর প্রদানের শর্তে মুসলমানদের সঙ্গে সন্ধি চুক্তি করে। পরবর্তীকালে শাহরাক চুক্তি ভঙ্গ করে এবং পারসিকদেরও একই কাজ করার জন্য উস্কানি দিতে থাকে। উসমান ইবনে আবি আল-আস তার ছেলে এবং ভাই আল-হাকামকে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রেরণ করেন। আল্লাহ মুশরিক বাহিনীকে পরাজিত করেন। আল হাকাম ইবনে আবি আল-আস শাহরাককে হত্যা করেন।

৪.৯। ফাসাউদারা বাযরুদ বিজয় (২৩ হি.)
সারিয়া ইবনে জুনাইম ফাসাউদারা বাযরুদ এলাকার দিকে অগ্রসর হন। তিনি সেখানে বিশালসংখ্যক পারসিক ও কুর্দীদের দেখা পান। মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওই রাতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের যুদ্ধ ও শত্রু সংখ্যাধিক্যের ব্যাপারে স্বপ্ন দেখেন; যুদ্ধটি দিনের বেলায় সংঘটিত হচ্ছে এবং তারা কোনো এক মরুপ্রান্তরে লড়াই করছেন। সেখানে পাহাড়ও ছিল। মুসলমানরা যদি পাহাড়কে পেছনে রাখে, তাহলে শত্রুরা শুধু একদিক থেকে আক্রমণের সুযোগ পাবে। পরের দিন তিনি আযান (আস-সালাতু জামিয়াহ—নামায শুরু হতে যাচ্ছে) দিতে নির্দেশ দিলেন। আর তিনি স্বপ্নে যে সময় যুদ্ধ সংঘটিত হতে দেখেছিলেন, সে সময়ও ঘনিয়ে এল। লোকজন জমা হলে তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন এবং স্বপ্নের কথা সবাইকে জানালেন। তখন তিনি হঠাৎ করেই বলে উঠলেন, ‘হে সারিয়া, পেছনে পাহাড়!’ তারপর লোকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আল্লাহর নিজস্ব সৈন্য (ফেরেশতা) রয়েছে এবং সম্ভবত তাদের কেউ আমার এই কথাকে তাদের নিকট পৌঁছে দেবে।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যা বলেছিলেন, মুসলিম বাহিনী তা-ই করেছিল এবং তাদের শত্রুদের ওপর বিজয় দান করেছিলেন। মুসলমানগণ ফাসাউদারা বাযরুদ দখল করে নেন।

৪.১০। কারমান এবং সাজিস্তান বিজয় (২৩ হি.)
সুহাইল ইবনে আদিয়্যি ২৩ হিজরীতে কারমান বিজয় করেন; এটিও প্রসিদ্ধ যে, আব্দুল্লাহ ইবনে বুদাইল ইবনে ওয়াকারা এটি বিজয় করেন। কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন যে, আসিম ইবনে আমর প্রচণ্ড যুদ্ধ করে সাজিস্তান বিজয় করেছিলেন। এতে অসংখ্য দুর্গ ছিল। আর বালখ নদী ও বাঁধের মধ্যে শহরগুলো একটি থেকে আরেকটি বেশ দূরে ছিল। মুসলমানগণ কান্দাহার ও তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল।

৪.১১। মুকরান বিজয় (২৩ হি.)
আল-হাকাম ইবনে আমর ২৩ হিজরীতে মুকরান বিজয় করেন। শিহাব ইবনে আল-মাখারিক সাহায্য সৈন্য নিয়ে আসেন এবং তার সঙ্গে সুহাইল ইবনে আদিয়্যি ও আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ এসে যোগ দেন। তারা সিন্দের রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করেন। আল্লাহ সিন্দের বাহিনীকে পরাজিত করেন এবং মুসলমানগণ বিরাট অঙ্কের গনীমত লাভ করেন। আল-হাকাম ইবনে আমর বিজয়ের সংবাদ জানিয়ে খলীফার নিকট চিঠি প্রেরণ করেন। সুহার আল-আবদির মাধ্যমে তিনি খুমসসহ চিঠিটি পাঠান। তিনি মদীনায় এলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার নিকট মুকরান এলাকা সম্পর্কে জানতে চান। সুহার বলেন, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, এটি একটি পর্বতময় এলাকা। এখানে পানির খুব সংকট, ফলমূল খুব নিম্নমানের, শত্রুরা খুব শক্তিশালী, এর খারাপই বেশি এবং ভালো বলতে তেমন কিছু নেই। সম্পদের প্রাচুর্য খুব কম এবং তাও পরিত্যক্ত। এ বাইরে যা কিছু আছে, সেগুলো এ চেয়ে আরও খারাপ।’ উমর রা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি কবি হতে চাচ্ছ?’ তিনি বললেন, ‘না। এটি কেবল একটি সংবাদ।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আল-হাকামকে মুকরানেই অবস্থান করার নির্দেশ দিলেন এবং নদীর এ পাড়েই থাকতে বললেন।

৪.১২। কুদীদের বিরুদ্ধে অভিযান
ইবনে জারির উল্লেখ করেন, কিছু কুর্দী কিছু পারসিকদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। তারা একত্রে জমা হয়। তিরা নদীর নিকটে বাইরুয এলাকায় তারা আবু মূসার মুখোমুখি হয়। তারপর আবু মূসা ইসফাহানে চলে যান। আল-মুহাজির ইবনে যিয়াদ নিহত হলে তার ভাই আর-রাবি ইবনে যিয়াদকে আবু মূসা তার স্থলাভিষিক্ত করে যান। তিনি যুদ্ধের দায়িত্ব নেন এবং শত্রুদের ব্যূহ তছনছ করে দেন। আল্লাহ শত্রুদের পরাজিত করেন। আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা। এভাবেই তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের সঙ্গে থাকেন, যারা ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন অনুসারী। তারপর খুমসসহ বিজয়ের সংবাদ খলীফার নিকট প্রেরণ করা হয়। এভাবে ইরাক ও ইরান উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আমলে বিজিত হয়। মুসলমানগণ পুরো এলাকায় শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলে। পারসিকদের পক্ষ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা ছিল। পূর্বাঞ্চলের বিজয় বেশ কষ্টসাধ্য ছিল এবং মুসলিম বাহিনীকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। কারণ, এর অধিবাসীদের সঙ্গে আরবদের কৃষ্টিগত পার্থক্য ছিল অনেক। ইরানের অধিবাসীরা ছিল পারসিয়ান, যারা ভাষা, আচার-আচরণ ও সংস্কৃতিতে আরবদের থেকে পুরোপুরিই ভিন্ন। আর জাতিগতভাবে ইরানীরা খুব ঐক্যবদ্ধ ছিল। তাদের ছিল দীর্ঘ ইতিহাস ও আদি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত। অধিকন্তু এসব যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে ইরানীদের কেন্দ্রীয় ভূমিতে এবং পারসিক পুরোহিতরা এর অধিবাসীদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে উৎসাহ জুগিয়েছে। আরও একটি কঠিন দিক হচ্ছে, এসব রণক্ষেত্র ছিল মুসলমানদের বসরা ও কুফার সামরিক ঘাঁটি থেকে অনেক দূরে। পর্বতময় এলাকা হওয়ায় এর অধিবাসীরা মুসলমানদের জন্য মারাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। এ জন্য দেখা যায়, বেশির ভাগ এলাকা মুসলমানদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ও উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগে পুনরায় অভিযান পরিচালনা করতে হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00